#অবশিষ্ট
#শেষ_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
কলমে অনিন্দিতা
একটা পুরোনো খাম মেঝেতে পড়ে গেল। নিচু হয়ে দেখল দীপ, হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম।
উপরে বাবার হাতের লেখা, “ব্যক্তিগত”।
ব্যক্তিগত কথাটাতে খুব আপত্তি দীপের। বাবা নয়! এটা মা শিখিয়েছে, কারোর ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিতে নেই। সেটা নাকি অন্যায়। কোনটা অন্যায়! বাবার ব্যক্তিগত জিনিসে! মানুষটাই তো নেই!
খামটা খুলবে কিনা ভাবছে! ঘুরিয়ে দেখল, মুখটা আটকানো নয়! চাইলেই খুলে দেখা যায়! কিন্তু বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। ছোটো থেকে এমন কিছু শিক্ষা শিপ্রা মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে বেরোনো খুব কঠিন। এই যেমন ব্যক্তিগত ব্যাপারটাই।
শিপ্রা বলত, তোমার পরিধি একটা নির্দিষ্ট জায়গা অবধি। সেটা তোমার বাবা হোক বা মা কিংবা বউ। পরিধি থেকে পা বের করলেই জানবে বিপদ। তখন কৌতূহল হয়ে দীপ জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, আমারও ব্যক্তিগত থাকতে পারে?”
শিপ্রা চোখ সরু করে ছেলেকে দেখে নিয়ে মুচকি হেসে বলল, “নিশ্চয়ই! তবে সেটা আঠেরো বছর হলে!”
খুব খুশি হয়েছিল দীপ যে আঠেরো বছর পর ওর নিজের ঘর হবে, ডায়েরি হবে, ওখানে লিখবে… ডায়েরির শেষ পাতাগুলো ভরে থাকবে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, টম ক্রুজ আর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের নাম দিয়ে। সত্যি, দীপের ছোটবেলাটা কালো-সাদা বেড়ার ঘরে কাটলেও এইসব সিনেমা, গল্পের বইয়ে কোনো কার্পণ্য করেনি ওর বাবা। পুজোয় জামা হয়তো একটা হত, কিন্তু পুজো বার্ষিকী ম্যাগাজিনগুলো সব এসেছিল।
বাবার কথা মনে পড়তেই আবার খামটার দিকে তাকাল দীপ। ব্যক্তিগত! মানুষটাই নেই! আর তার ব্যক্তিগত। আর এই সময় ছেলে হিসেবে জানার পুরো অধিকার আছে দীপের। কে জানে এমন কিছু ইনফরমেশন। হয়তো কেউ টাকা পায়, বা বাবা হয়তো পায়! এই মুহূর্তে সেরকম কিছু পেলে বড্ড উপকার হবে দীপের। ধার-দেনায় যা ডুবেছে ও!
তিন বছরের ট্রিটমেন্ট। রাজার মতো অসুখ। আর দীপ তো বেস্ট ট্রিটমেন্টটাই দিয়েছে। এই ভাবনা থেকেই খুলে ফেলল খামটা। একটা সাদা-কালো ছবি।
আর একটা চিঠি।
ছবিটা টেনে বের করল দীপ।
বাবা, অনেক কম বয়সের বাবা, আর পাশে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা। হাসছেন।
খুব সাধারণ মুখ। কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুত সুন্দর। কিন্তু বাবার এই ছবিটা কবেকার? কলেজের? এটা কে? মা কি? মায়ের ছোটবেলার খুব ছবি দেখেনি দীপ। দেখলেও মনে নেই। তবে মা নয়, এটা নিশ্চিত!
আবার হাত ঢোকাতেই চিঠিটা বের হল। বুকের ভেতরটা কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। একটু দ্বিধা, একটু খুলতেই প্রথম লাইনটা পড়ল—
“প্রিয় মীনা,”
মীনা? সে কে? কখনো তো শোনেনি দীপ। হাত দুটো কাঁপতে থাকল দীপের। কিন্তু কৌতূহল জিনিসটাই এমন যে মনের কোনো কথাই শোনে না।
“আজ তোমার বিয়ের খবর পেলাম। তোমাকে আটকানোর ক্ষমতা আমার কোনোদিনই ছিল না। শুধু একটা কথা বলতে চাই— জীবনে যদি কখনও মনে হয়, কেউ তোমাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবেসেছিল, তাহলে বিশ্বাস করো, সে মানুষটা আমি…”
দীপ থেমে গেল।
গলাটা শুকিয়ে আসছে।
চিঠির পরের লাইনগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সে আবার পড়তে শুরু করল।
“আমি সংসার করব, হয়তো সুখেও থাকব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমাকে ভুলে যাব। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, মনে রাখার জন্যই ভালোবাসা হয়।”
দীপ চুপ করে বসে রইল। তার বাবা সারাজীবন মাকে ভালোবেসেছেন। সেটাই জানত দীপ।
চোখ বন্ধ করে মা-বাবার সংসারের দিনগুলো মনে করার চেষ্টা করছে দীপ। কী সুন্দর সংসার করেছে দুজনে। ছোট্ট ঘর, একটা খাটে প্রায় গায়ের ওপর উঠে গিয়ে তিনজনে ঘুমোত। মা কতবার বলেছে মেঝেতে বিছানা করে শোয়, কিন্তু বাবা হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে মাকে। কোনোদিন দুজনকে ঝগড়া করতে দেখেনি। বরং দেখেছে, এক থালায় ভাত মেখে বাবা মাকে খাইয়ে দিচ্ছে, সঙ্গে নিজেও খাচ্ছে।
আবার সময় যখন ভালোর দিকে। বাবা দোকানে নিয়ে গিয়ে সুন্দর শাড়ি কিনে দিয়েছে মাকে। ওদের প্রেম দেখেই ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে। প্রেমে পড়তে ইচ্ছে হয়েছে। মাকে দেখেছে বাবার জন্য স্নান করে মোটা করে সিঁদুর পরে শাখায় লাগিয়ে প্রণাম করতে। বাবাকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখেছে যখন ডাক্তার এসে ডেথ সার্টিফিকেট দিল। সব এমনি এমনি! শুধুই দায়িত্ব পালন করেছেন।
খুব রাগ হচ্ছে দীপের। হঠাৎ বাবার ওপর খুব রাগ হচ্ছে। চিঠিটা আবার পড়তে শুরু করল—
“জানি এই চিঠি তোমার হাতে কোনোদিন পৌঁছাবে না। এটা আমার ব্যক্তিগত খামে আটকে থাকবে। আজ শিপ্রার প্রেগন্যান্ট পজিটিভ রিপোর্ট এল, মীনা। আমি বাবা হব! মীনা, তোমার সঙ্গে সংসার খেলার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু হয়নি। চাকরিটা বড্ড দেরি করে পেলাম। তোমার দাঁড়ানোর সময় ছিল না। ভালোই হয়েছে জানো, তোমার মতো রাজরানীকে ওই প্রাসাদেই মানায়। আমার কুঁড়ে ঘরে আলো করে শিপ্রাই থাক।”
“এই লেখাটা তো তাহলে অনেক পরে লেখা। তার মানে কি যোগাযোগ ছিল বাবার সঙ্গে ওই মীনার! পরকীয়া? শরীরের ভিতরে যেন কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। কষ্ট হচ্ছে মায়ের জন্য। এই চিঠি কি মায়ের হাতে কখনো পড়েনি? নাকি শুধু ‘ব্যক্তিগত’ লেখাটা দেখে খামটা খোলেনি? নৈতিক জ্ঞানটা বড্ড ছিল মায়ের। খুব কষ্ট হচ্ছে। বাবার আলমারিটা না গোছানোই ভালো ছিল। কিন্তু জানতে তো হবে কে এই মীনা! যাকে বাবা নিজের জীবনের এতটা জানাত। আবার পড়তে শুরু করল দীপ!
‘মীনা, আমার ছেলে হয়েছে। নাম রেখেছি দীপশেখর। ইচ্ছে ছিল মেয়ে হোক! নাম হোক শিখা। শিপ্রার ‘শ’ থাকল আর….’দীপশেখর তাহলে শিপ্রার জন্য নয়! শিখার জন্য। শিখাটা কে? মীনারই ভালো নাম কি?
আবার পড়ছে দীপ।
‘মীনা, ছেলেটা আজ কী সুন্দর জগন্নাথদেবের ছবি এঁকেছে! অপূর্ব আঁকার হাত ছেলেটার।’
দীপের মনে পড়ল, ও ছোটবেলায় সত্যি একটা ছবি এঁকেছিল। জগন্নাথদেবের। পুরী থেকে ফিরে এসে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সেই প্রথম ঘুরতে যাওয়া। সমুদ্রে স্নান করা! কী সুন্দর মুহূর্ত।
আবার পড়ছে দীপ—
‘মীনা, ছেলেটা দারুণ রেজাল্ট করেছে মাধ্যমিকে!’
‘মীনা, জানো ছেলেটা খুব মন দিয়ে পড়ছে।’
‘মীনা, জানো ছেলেটা প্রিলি ক্র্যাক করল!’
অসহ্য লাগছে দীপের। মোট বারো পাতার চিঠি। এখনো তিন পাতা বাকি। দীপ শেষের আগের পাতায় গেল। ওখানে লেখা—
‘মীনা, জানো আজ আমার লাঠিটা ভেঙে গেছে। আমার মীনা মানে আমার ছোটোবেলার শিখা, যাকে হারিয়ে আমি পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলাম। শিপ্রা লাঠি হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। চলে গেল জানো। জানতেই দেয়নি। ভেতর ভেতর বোধহয় বড্ড অভিমান ছিল ওর। ওকে বলেছিলাম আমার ছোটোবেলার শিখার কথা, এটাও বলেছিলাম আমি শিখাকে ভুলে আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না। ও শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, শিখা কে?
আমি বলেছিলাম, আমার বন্ধুর বোন। আমি ওকে মীনা বলে ডাকি। আর কখনো একটাও প্রশ্ন করেনি। চলে গেল আজ শিপ্রা। ডাক্তার বলল, ওর কিচ্ছু হয়নি, এমনি আয়ু শেষ! সেটা হয় না, হতে পারে না। ও আমার ওপর অভিমান করেই চলে গেল।’
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল দীপ। মা গো! মা! তুমি এত কষ্ট পেয়েছ! কেঁদেই যাচ্ছে দীপ। বারবার মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। খুব শান্ত, কোনোদিনও একটা উঁচু স্বরে কথা বলেনি। আর রাঘব! আজ বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করত দীপ— কেন মায়ের জীবনটা নষ্ট করলে? কেন বিয়ে করলে মাকে!
কিন্তু কী সূত্র ধরে জিজ্ঞেস করত! বাবা মানেই তো একজন সঠিক মানুষ। বাবা, জ্যামিতি বক্স লাগবে। বাবা, ফর্ম ফিল-আপের টাকা লাগবে। বাবা, নতুন টিউশন নিতে হবে। কোনোদিনও না করেনি। মায়ের যত্ন! না, দীপের চোখে কোনোদিনও তার ফাঁক ধরা পড়েনি।
তাহলে?
মা-বাবার বিয়াল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবন। পুরোটাই শূন্য! অভিনয়! দায়িত্ব দিয়ে ঠাসা!”
শেষ পাতা! পড়তে শুরু করল দীপ। বড্ড অস্পষ্ট লেখা, কেঁপে গিয়েছিল বোধহয় হাতটা লেখার সময়।
“মীনা, আজ আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। অ্যাডমিট থাকতে হবে বেশ কিছুদিন। শরীরে আর কিছু নেই। এটাই বোধহয় জীবনের শেষ চিঠি। আমি ভেবেছিলাম মরার আগে যদি একবার দেখা হত তোমার সঙ্গে! আমি চাইলে তোমার দাদাকে জিজ্ঞেস করতেই পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে হল না।
আজ জীবনের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি বোধহয় হেরেই গেলাম। আমার তোমার প্রতি ভালোবাসাটা বোধহয় একতরফাই ছিল। পারলে তো তুমিও পারতে বাবা-মায়ের পছন্দের ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে না করতে। পারতে তো পালিয়ে আসতে!
চাকরি তো পেয়েছিলাম। তোমার বরের মতো ইঞ্জিনিয়ার না হলেও সরকারি দপ্তরেই কাজ করতাম। আগে ভাবতাম তিনটে জীবন হয়তো নষ্ট হল। তোমার, আমার আর শিপ্রার। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তুমি হয়তো ভালোই আছ। নষ্ট হল আমার শিপ্রা, আর শেষ হলাম আমি।
শিপ্রার কাছে আমি চিরকাল অপরাধী হয়েই রয়ে গেলাম, মীনা। ও আমাকে সংসার দিয়েছে, বিশ্বাস দিয়েছে, একটা সুন্দর ছেলে দিয়েছে। আর আমি? আমি ওকে দিয়েছি দায়িত্ব, কর্তব্য আর মুখে আঁটা একটুকরো হাসি। ভালো স্বামী হওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে চেষ্টা করে হয় না।
অনেকবার ভেবেছি তোমাকে ভুলে যাব। শিপ্রার দিকে তাকিয়ে নতুন করে শুরু করব। কিন্তু মানুষের মনটা বড় অদ্ভুত। শরীর সংসারে থাকে, মন কোথায় যেন আটকে যায়।
আজ হাসপাতালের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে হঠাৎ মনে হল, যদি আর ফেরা না হয়? যদি এটাই শেষ লেখা হয়? তাই লিখে রাখলাম।
তোমার ওপর আর কোনো অভিমান নেই। বয়স মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। শুধু একটা আক্ষেপ থেকে গেল— একবার যদি জানতে পারতাম, তুমিও আমাকে মনে রেখেছ কি না! যদি মনে থাকে তবে সেই কথাটা আর কাউকে বলো না। এই পৃথিবীতে কিছু ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থাকাই বোধহয় তাদের নিয়তি। ভালো থেকো, মীনা।
এ জন্মে তো দেখা হল না আর। তবে পরের জন্মে আমি আর চাই না। পরের জন্মে আমি শিপ্রাকেই চাই। প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসায়, সোহাগে ওকে বুকের মাঝে রাখতে চাই। যাচ্ছি ওর কাছেই যাচ্ছি। আসছি শিপ্রা। আমি আসছি তোমার কাছে। খুব তাড়াতাড়ি।
— রাঘব
কেঁদেই যাচ্ছে দীপ। চিঠিটা হাত থেকে কখন মেঝেতে পড়ে গেছে, খেয়ালই নেই। বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটার ওপর রাগ হচ্ছিল, সেই রাগটা হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
আবার শেষ কয়েকটা লাইন পড়ল দীপ।
“পরের জন্মে আমি শিপ্রাকেই চাই।”
লাইনটার ওপর কয়েক ফোঁটা জল শুকিয়ে গিয়ে কালি ছড়িয়ে গেছে। রাঘবের চোখের জল, না নিজের, বুঝতে পারল না দীপ।
হঠাৎ একটা কথাই মাথায় এল।
বাবা যদি সত্যিই মীনাকেই ভালোবাসত, তাহলে এই চিঠিগুলো পাঠায়নি কেন? বন্ধুর বোন মানে চাইলেই পারত!
উল্টেপাল্টে দেখল, কোথাও ঠিকানা লেখা নেই। তার মানে এগুলো মীনার জন্য লেখা চিঠি নয়।
এগুলো নিজের ভেতরের একটা ঘরে আটকে থাকা মানুষের ডায়েরি। যে মানুষটা জীবনের একটা অধ্যায় বন্ধ করতে পারেনি, অথচ নতুন অধ্যায়ের প্রতি অন্যায়ও করতে চায়নি।
এ তো কোনো অন্যায় নয়! বরং সম্মানটা অনেক বেড়ে গেল বাবার প্রতি।
ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে থাকা ছবিটা তুলে নিল দীপ।ছবির মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর মায়ের একটা পুরোনো ছবি এনে পাশাপাশি রাখল।একজন ছিল বাবার প্রথম ভালোবাসা।
আর একজন ছিল বাবার শেষ আশ্রয়।
হয়তো ভালোবাসা দুজনকে দু’রকমভাবে দিয়েছিল রাঘব।
একজনকে পেয়েও হারিয়েছিল।আর একজনকে হারিয়ে বুঝেছিল, আসলে কতটা পেয়েছিল।
দীপের মনে পড়ল, মায়ের মৃত্যুর পর বাবা একদিন বলেছিল—
— “জানিস, তোর মা না থাকলে ঘরটা বড় ফাঁকা লাগে।”
সেদিন খুব সাধারণ একটা কথা মনে হয়েছিল।
আজ বুঝল, কথাটার ভেতরে কতটা শূন্যতা ছিল।
হয়তো মানুষ সবসময় যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাকে নিয়েই বাঁচে না।
আবার যার সঙ্গে বাঁচে, তাকে যে ভালোবাসে না, তাও নয়।
ভালোবাসারও বোধহয় অনেক রকম নাম আছে।
কিছু ভালোবাসা স্বপ্ন হয়ে থাকে।
আর কিছু ভালোবাসা প্রতিদিনের ভাত, ওষুধ, অপেক্ষা আর খোঁজ নেওয়ার মধ্যে নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন একটা অধ্যায় থাকে, যেটা সে কাউকে দেখায় না।একটা নাম।একটা মুখ।
একটা অসমাপ্ত গল্প।যাকে সে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকে।
আর পৃথিবী ভাবে, সে সব ভুলে গেছে।চিঠির প্রথম দিকে একটা লাইন ছিল।
“যদি কোনোদিন দেখা হয়, আমরা দুজনেই বলব— ভালো আছি। কারণ সত্যিটা বলার অধিকার তখন আর কারও থাকবে না।”
দীপ আলতো করে ছবিটা আবার খামের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর চিঠিগুলো গুছিয়ে রেখে খামের মুখটা বন্ধ করল।
খামের ওপর আবার চোখ গেল— “ব্যক্তিগত”।
আজ আর শব্দটার ওপর কোনো আপত্তি নেই ওর।
কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তবু মিথ্যে হয় না। আর কিছু সম্পর্ক ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেলেও সারাজীবনের আশ্রয় হয়ে থাকে।
আলমারির দরজা বন্ধ করতে করতে দীপ শুধু ফিসফিস করে বলল—
“”বাবা, তুমি কোনো অন্যায় করনি। ভালোবাসা পাপ নয়। কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তবু সারাজীবন মানুষের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে। আর তুমি তাকে সম্মান দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলে। কাউকে ঠকিয়ে নয়, কাউকে ভেঙে নয়।
তবে এ জন্মের যে অবশিষ্ট টুকু রইলো সেটা
পরের জন্মে সেটুকু শোধ করে দিও। পরের জন্মে তুমি শুধু শিপ্রারই হয়ো। প্রথম দিন থেকেই।”
——-শেষ —————
