#আয়না (অন্তিম পর্ব )
ডাইনিং টেবিলের ভারী নিস্তব্ধতা যেন পাথরের মতো চেপে বসেছে অনিমেষের বুকের ওপর। জানলা দিয়ে আসা দুপুরের চিলতে রোদটা মেঝেতে পড়া ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর ওপর পড়ে বিচ্ছুরিত হচ্ছে, ঠিক যেমন অনিমেষের চুরমার হয়ে যাওয়া অহংকারগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সুশোভনের শান্ত অথচ ধারালো কথাগুলো চাবুকের মতো তার পিঠে এসে পড়ছে। অনিমেষ কোনো কথা বলতে পারছে না, তার গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে আসছে। সে নিজের অজান্তেই তার হাতের আঙুলগুলো কামড়াচ্ছে, যে হাত দিয়ে সে একদিন মেঘনার দিকে গরম ইস্ত্রি ছুড়ে মারতে গিয়েছিল।
সুশোভন এগিয়ে এসে অনিমেষের কাঁধে হাত রাখল। এবার আর সেই রাগ নেই, বরং বড় ভাইয়ের মতো এক গভীর মমতা। “অনিমেষ, আজ আমি যা যা বললাম, সেগুলো কি তোমার নিজের কণ্ঠস্বর বলে মনে হচ্ছে না? তুমি যখন মেঘনাকে বলো ‘বাপের বাড়িতে শুধু ভাত ধ্বংস করতে শিখেছিস’, তখন কি একবারও ভেবে দেখেছো ওই মেয়েটার বাবা কতটা কষ্ট করে ওকে মানুষ করেছেন? তুমি যখন ওর হাতের রান্নায় সামান্য নুন-চিনির তফাত নিয়ে ওকে ‘অলক্ষ্মী’ বলো,তখন কি তোমার একবারও মনে হয় না যে এই মেয়েটা নিজের ঘর-বাড়ি, বাবা-মাকে ছেড়ে শুধু তোমার ওপর ভরসা করে এই অচেনা বাড়িতে এসেছে? আজ তোমার দিদির সম্মানে আঘাত লাগাতে তোমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে, অথচ পাশের ঘরে যে মেয়েটা রোজ তোমার এই বিষাক্ত বাণ সহ্য করে, তার কি কোনো সম্মান নেই? তার কি কোনো রক্ত-মাংসের হৃদয় নেই?”
অনিমেষ মুখ তুলল। তার চোখ দুটো টকটকে লাল, জল ছলছল করছে। সে দেখল রান্নাঘরের দরজার আড়ালে মেঘনা থরথর করে কাঁপছে। তার পড়নের নীল শাড়িটা চোখের জলে ভিজে সপসপ করছে। মেঘনা ভাবছিল হয়তো আজ সুশোভনদার সাথে অনিমেষের বড় কোনো ঝগড়া হয়ে যাবে, কিন্তু পরিস্থিতি যে এইভাবে পাল্টে যাবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। অনিমেষ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার পা দুটো যেন চলতে চাইছে না। সে টলতে টলতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
সুমিত্রা দেবী এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। তিনি দেখলেন তাঁর ছেলে আজ প্রথমবার মাথা নিচু করে হাঁটছে। যে ছেলে ঘরে ঢুকলেই বাঘের মতো হুঙ্কার দিত, সে আজ যেন এক অপরাধী আসামী। অনিমেষ মেঘনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘনা ভয়ে দু পা পিছিয়ে গেল, অভ্যাসবশত সে ভেবেছিল হয়তো আবারও কোনো ধমক বা তাচ্ছিল্য আসবে। কিন্তু অনিমেষের মুখে আজ কোনো কর্কশ ভাষা নেই। সে নিচু হয়ে মেঘনার ফোসকা পড়া আঙুলটা ধরার চেষ্টা করল।
“মেঘনা,” অনিমেষের গলাটা ভেঙে এল। “আমাকে ক্ষমা করতে পারবে? আমি আসলে কোনোদিন মানুষ ছিলাম না, আমি ছিলাম একটা পশু । আমি ভাবতাম স্বামী হওয়া মানেই শাসন করার লাইসেন্স পাওয়া। আমি ভাবতাম তুমি আমার দাসী, তোমার কোনো নিজস্ব সত্তা নেই। আজ সুশোভনদা যখন দিদির সাথে ওই ব্যবহারটা করছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি ওনাকে খু*ন করে ফেলি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল, আমি তো তোমার সাথে এর চেয়েও হাজার গুণ খারাপ ব্যবহার করি। আমার তো নিজেকেই খু*ন করা উচিত।”
মেঘনা বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে মানুষটা কোনোদিন তার দিকে ভালো করে তাকায়নি, সে আজ তার হাত ধরে ক্ষমা চাইছে? মেঘনার চোখের জল বাঁধ মানল না। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। নীলাঞ্জনা এগিয়ে এসে মেঘনাকে জড়িয়ে ধরল। “বৌমণি, আর কাঁদিস না। আজ থেকে এই বাড়িতে আর কোনো চিৎকার হবে না। ভাই ওর ভুল বুঝতে পেরেছে। আর যদি কোনোদিন ও তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে আমি আর জামাইবাবু এসে ওকে ঠিক করে দেব, কথা দিচ্ছি।”
সুশোভন হাসল। সে টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুক খেল। “অনিমেষ, সংসার মানে কিন্তু শুধু টাকা দেওয়া নয়। সংসার মানে হলো একে অপরের পরিপূরক হওয়া। তুমি কাজ করো বাইরে, আর ও কাজ করে ভেতরে। দুজনের কাজের গুরুত্বই সমান। আজ থেকে তুমি যদি ওকে সম্মান দিতে পারো , তবেই দেখবে এই বাড়িটা ঘর হয়ে উঠবে, জেলখানা নয়। আর শোনো , নুন কম হলে বা চিনি বেশি হলে আকাশ ভেঙে পড়ে না, কিন্তু মনের বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা জোড়া লাগানো খুব কঠিন।”
বিকেলের আকাশটা তখন মেঘমুক্ত হয়ে পরিষ্কার নীল বর্ণ ধারণ করেছে। অনিমেষ আলমারি থেকে একটা নতুন শাড়ি বের করে মেঘনার হাতে দিল। “এটা অনেকদিন আগে কিনেছিলাম তোমার জন্য, কিন্তু কোনোদিন দেওয়ার মতো মানসিকতা ছিল না। আজ থেকে আমরা নতুন করে শুরু করব। তুমি আমাকে মানুষ হওয়ার একটা সুযোগ দেবে তো?” মেঘনা শুধু মাথা নাড়ল। তার ছয় মাসের দীর্ঘ জমাট বাঁধা দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন এক মুহূর্তের বর্ষণে ধুয়ে মুছে গেল। সুমিত্রা দেবী হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢুকলেন বড় এক হাড়ি পায়েস বসাতে। আজ এই বাড়িতে খুশির উৎসব হবে, কোনো নাটকের জন্য নয়, বরং এক মানবিকবোধের জাগরণের জন্য।
সমাপ্ত
কলমে -#SupriyaGhosh
#ব্যক্তিগত #অভিমত” অন্যের বোন বা কন্যার প্রতি নিজের ব্যবহার বিচার করার সময় কল্পনা করুন আপনার নিজের বোন বা কন্যাকে কেউ ঠিক একইভাবে অপমান করছে। সম্মান ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না, সম্মান অর্জন করতে হয় অন্যকে সম্মান দেওয়ার মাধ্যমে। একটি সুখী সংসারের ভিত্তি পাথরের দেওয়ালে নয়, বরং পারস্পরিক মর্যাদা ও সহমর্মিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যা আপনি নিজের পরিবারের জন্য সহ্য করতে পারবেন না, তা অন্যের পরিবারের মেয়ের ওপর প্রয়োগ করবেন না”।
**পুরো গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন 🙏🙏??**
