#আয়না (পর্ব১)
কলমে -#SupriyaGhosh
“চায়ের কাপটা কি ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে? নাকি মুখ ফুটে বলতে হবে যে চিনি হয়নি? নাকি আমি এই বাড়িতে একটা জড় পদার্থ হিসেবে বাস করছি যার কোনো স্বাদ-আহ্লাদ থাকতে নেই?” অনিমেষের গলার স্বর ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে রান্নাঘর পর্যন্ত আছড়ে পড়ল। সকালের শান্ত নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে তার চিৎকারটা যেন একটা ধারালো ছুরির মতো মেঘনার বুকে বিঁধল।
মেঘনা তখন রুটি সেঁকছিল। রুটিটা ফুলে উঠেছিল, কিন্তু অনিমেষের চিল চিৎকার শুনে তার হাত থমকে গেল। সে তড়িঘড়ি উনুন নিভিয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। মেঘনার মুখটা একটু বিবর্ণ, কপালে ঘামের বিন্দু। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “চিনি তো ঠিকই দিয়েছিলাম, আসলে চামচটা ছোট ছিল তো, হয়তো মাপে সামান্য কম হয়েছে। আমি এখনই বদলে দিচ্ছি,তুমি একটু বসো ।”
“রাখো তোমার অজুহাত! মাপে কম হয়েছে মানে? মগজ বলে কি কিছু আছে নাকি ওটা বাপের বাড়িতেই ফেলে রেখে এসেছ? গত ছয় মাস ধরে এই একই নাটক চলছে। বিয়ের সময় তো তোমার বাবা খুব বলেছিল মেয়ে আমার দশভুজা, সব কাজে পটু। এখন দেখছি বাপের বাড়িতে শুধু বসে ভাত ধ্বংস করতেই শিখেছিলে। একটা চা বানানোর ন্যূনতম জ্ঞান নেই যার, সে আবার একটা আস্ত সংসার করবে কী করে? তোমাকে বিয়ে করে আনাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।” অনিমেষ টিপয় থেকে খবরের কাগজটা এক ঝটকায় সরিয়ে মেঝের দিকে ছুড়ে দিল। প্লেটে রাখা দুটো বিস্কুটের টুকরো ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল, যেন মেঘনার আত্মসম্মানটাই চুরমার হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে লাল মেঝের ধুলোয়।
মেঘনা কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চায়ের কাপটা তুলে নিতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে অনিমেষ কর্কশ স্বরে আবার চেঁচিয়ে উঠল, “হাত দিও না ওটাতে! একবার যে চা তেতো হয়েছে, সেটা দ্বিতীয়বার চিনি দিলেও বিস্বাদই লাগে। ঠিক তোমার মতো। মানুষের জীবনের প্রতিদিনের সকালের স্বাদ মাটি করার জন্য তোমার মতো একটা অলক্ষ্মী মেয়েই যথেষ্ট। আমার সামনে থেকে যাও এখন, তোমার মুখ দেখলেও আমার পিত্তি জ্বলে যায়।”
সুমিত্রা দেবী পাশের ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন, “অনিমেষ, সকালবেলাতেই এত চিৎকার কেন করছিস বাবা? চা-টা না হয় ও আবার করে দিচ্ছে। তুই তো জানিস ও কাল রাত বারোটা পর্যন্ত জেগে তোর অফিসের নীল শার্ট আর প্যান্ট ইস্ত্রি করেছে, ঘরদোর মুছেছে, তারপর আবার ভোর চারটেয় উঠে বাসি কাজ সেরেছে। শরীরে তো কুলায় না সব সময়, একটু হয়তো ভুল হয়েছে। মানুষ তো যন্ত্র নয়।”
“মা, তুমি মাঝখানে একদম আসবে না,” অনিমেষ সোফা থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের দামি ঘড়িটা ঠিক করতে করতে বলল। “তোমার এই আদিখ্যেতা আর প্রশ্রয় পেয়েই ও মাথায় চড়েছে। ভুল? প্রতিদিন কি ভুল হয় মা? কাল রাতে তরকারিতে নুন হয়নি, আজ চায়ের চিনি নেই, পরশু রাতে কাপড় কাচায় সাবান লেগে ছিল। এটা ভুল নয় মা, এটা চরম গাফিলতি আর আমাকে তাচ্ছিল্য করা। ও আসলে জানে যে এই বাড়িতে ও রানী হয়ে বসে থাকবে আর আমরা সবাই ওর সেবা করব। ও ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে কান্নাকাটি করবে আর তুমি গলে জল হবে, ওসব আমার কাছে চলবে না।”
মেঘনা আর সামলাতে পারল না। সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে প্রায় দৌড়ে চলে গেল। রান্নাঘরের স্লাবের ওপর রাখা লঙ্কা, হলুদ আর জিরের কৌটোগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল তার চোখের নোনা জলে। সে জানত, একটু পরেই অনিমেষ স্নান করতে ঢুকবে, তখন সাবানের ফেনা বা তোয়ালেটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা নিয়ে আবার এক প্রস্থ অশান্তি হবে। জীবনের প্রতিটি দিন যেন একটা রণক্ষেত্র। মেঘনা কলের তলায় কাপটা ধুতে গিয়ে দেখল তার হাতগুলো থরথর করে কাঁপছে। সে ভাবছিল, তার বাবা যদি আজ জানত যে তার আদরের মেয়েকে প্রতিদিন সকালে এইরকম গালিগালাজ শুনতে হয়, তবে হয়তো হার্ট অ্যাটাক করে মারা যেতেন।
সুমিত্রা দেবী অনিমেষের সামনে গিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি দেখলেন ছেলের চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং একটা বিকৃত আনন্দ আছে কাউকে দাবিয়ে রাখার। তিনি ধীর অথচ কঠোর গলায় বললেন, “অনিমেষ, তুই কি ভেবেছিস এই মেয়েটার কোনো মান-সম্মান নেই? ও কি তোর পায়ের তলার মাটি যে যখন খুশি পা দিয়ে মাড়াবি? মনে রাখিস ও কারোর ঘরের মেয়ে, কারোর আদরের বোন। ও তোর ঘরটা আগলে রেখেছে বলেই তুই শান্তিতে অফিস যেতে পারিস। আজ যদি ও ছেড়ে চলে যায়, তবে বুঝবি এক গ্লাস জল খাওয়ার লোকও পাবি না।”
অনিমেষ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা ঠিক করতে করতে বলল, “ছেড়ে চলে যাবে? কোথায় যাবে? ওর বাপের যা অবস্থা, তাতে দুদিন ভাত দেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের। ওই বাপের বাড়ির অহংকার ওর কাছে আছে, আমার কাছে নেই। আর শোনো মা, এ বাড়িতে আমি টাকা দিই, আমি খেটে মরি। তাই আমার মেজাজ সহ্য করার ক্ষমতা ওর থাকা উচিত। যার নুন খাই, তার গুণ গাইতে হয়। আর যদি ওর আত্মসম্মানে খুব লাগে, তবে দরজা তো খোলা আছে। যে কোনো দিন বিদায় হতে পারে।”
এই কথাগুলো বলে অনিমেষ গটগট করে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বারান্দার সিমেন্টের মেঝেতে তার ভারী বুটের আওয়াজটা অনেকক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মেঘনা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে হচ্ছিল এই লোহার কড়াই, খুন্তি আর মশলার গন্ধ মাখা দেওয়ালগুলোই যেন তার শেষ আশ্রয়। সে দেখল চালের ড্রামটার ওপর এক চিমটি নুন পড়ে আছে। গত রাতে এই সামান্য নুনটুকু দিতে ভুলে গিয়েছিল বলে অনিমেষ তার স্বর্গীয় ঠাকুমাকে টেনেও কটু কথা শুনিয়েছে।
সুমিত্রা দেবী রান্নাঘরে ঢুকে মেঘনার পিঠে হাত রাখলেন। মেঘনা মেঝেতে বসেই মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরল। “মা, আমি কি সত্যিই খুব অপদার্থ? কেন ও আমাকে সামান্য কুকুর-বেড়ালের মতোও মর্যাদা দেয় না? আমি তো ওর পছন্দমতোই সব করার চেষ্টা করি। শরীরটা খুব ম্যাজম্যাজ করছিল কাল, তাও রাতে সব গুছিয়ে তবে শুয়েছি। আমার কী অপরাধ মা?”
সুমিত্রা দেবীর নিজের চোখেও জল এসে গিয়েছিল। তিনি দেখলেন মেঘনার শাড়ির এক কোণ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে সে নিজের আর্তনাদ চাপার চেষ্টা করছে যাতে পাড়ার লোক কিছু না শোনে। তিনি নিজের আঁচলে চোখ মুছে স্থির করলেন, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। সহ্যের একটা সীমা থাকে। তিনি দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে ফোনটা হাতে নিলেন। তাঁর নিজের মেয়ে নীলাঞ্জনা আর জামাই সুশোভন যদি আজ পাশে না দাঁড়ায়, তবে এই পরিবারটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
তিনি ফোনে নীলাঞ্জনার নম্বরটা ডায়াল করলেন। ওপাশে ফোনটা দুবার বাজার পরেই নীলাঞ্জনা ধরল। সুমিত্রা দেবী গলা নামিয়ে চাপা কান্নায় বললেন, “নীলা, তুই আর সুশোভন কি কাল একবার এ বাড়িতে আসতে পারবি? তোর ভাইকে আমি আর একা সামলাতে পারছি না রে। ও পাগল হয়ে গেছে। মেঘনা মেয়েটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাল তোরা না এলে কোনো একটা বড় অঘটন ঘটে যাবে। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার, না হলে ও মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করবে না।” নীলাঞ্জনা ওপাশ থেকে মায়ের হাহাকার শুনতে পাচ্ছিল, তার মনেও প্রশ্ন জেগে উঠল তার নিজের ভাইয়ের এই উদ্ধত আচরণের বিরুদ্ধে। সে শান্ত গলায় বলল, “তুমি শান্ত হও মা, আমি কালই আসছি এক নতুন পরিকল্পনা নিয়ে।”
চলবে….. (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
