#আয়না (পর্ব ৩)
সুশোভন নির্বিকার চিত্তে ভাতের থালাটা টেনে নিল, যেন কিছুই হয়নি। সে এক গ্রাস ভাত মুখে দিয়েই মুখটা বিকৃত করে থু-থু করে ফেলে দিল মেঝের ওপর। “নীলাঞ্জনা! এদিকে এসো !এটা কি রান্না করেছো ? তোমার মা তোমাকে রান্নায় নুন দেওয়ার নুন্যতম শিক্ষাটাও দেয়নি?”
নীলাঞ্জনা রান্নাঘরের চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। সে ধরা গলায় বলল, “আমি তো সব মেপেই দিয়েছি গো, মা-ও তো সাথে ছিল। নুন তো বেশি হওয়ার কথা নয়।”
“মুখে মুখে তর্ক করবি না! একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না!” সুশোভন থালাটা সশব্দে ঠেলে সরিয়ে দিল। স্টিলের থালাটা মেঝেতে পড়ে ঘরময় এক কর্কশ আওয়াজ তুলল। “তোর বাপের বাড়ির এই নোংরা স্বভাব আমি জানি। ভুল করবি আর তারপর চোখের জল ফেলে পার পাওয়ার চেষ্টা করবি। তোকে আজ আমি মেরেই ফেলতাম যদি না তোর ভাইয়ের সামনে বসে থাকতাম।”
অনিমেষের হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তার নিজের বাড়িতে, তার নিজের চোখের সামনে তার দিদিকে কেউ ‘অসভ্য’ বলছে, তাকে ‘মেরে ফেলার’ হুমকি দিচ্ছে—এটা সে নিতে পারছিল না। সে চেয়ার ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়াল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। অনিমেষ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সুশোভনদা, আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? একটা গ্লাস ভাঙলেন, তাও মেনে নিলাম। কিন্তু ভাতের থালাটা ফেলে দিলেন? আর আমার দিদিকে আপনি মারার ভয় দেখাচ্ছেন? আপনার সাহস তো কম নয়!”
সুশোভন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অনিমেষের চোখের দিকে তাকাল। “সাহস? কিসের সাহস অনিমেষ? আমি আমার বৌকে শাসন করছি, তাতে তোমার কী? ও আমার কেনা দাসী। আমি ওকে যা খুশি বলতে পারি। সামান্য নুন-চিনির জ্ঞান যার নেই, তাকে চাবুক মেরে সোজা করা উচিত।”
“খবরদার!” অনিমেষ চিৎকার করে উঠল। তার গলার স্বর ড্রয়িংরুমের ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। সে সুশোভনের দিকে দু পা এগিয়ে গিয়ে বলল, “আর একটাও কটু কথা যদি আমার দিদিকে বলেছেন, তবে ভুলে যাব আপনি আমার জামাইবাবু। ও এ বাড়ির মেয়ে। ওর একটা সম্মান আছে। আপনি কি মানুষ নাকি কসাই? সামান্য নুন কম হয়েছে বলে আপনি ওকে সবার সামনে অপমান করছেন? ওর ভাই কি মরে গেছে ভেবেছেন? ওর ভাই বেঁচে থাকতে ওকে কেউ একটা আঙুল ছোঁয়ালে আমি তার হাত ভেঙে দেব!”
নীলাঞ্জনা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে অনিমেষের হাতটা জড়িয়ে ধরল। “ভাই, তুই শান্ত হ। তোর জামাইবাবু তো ঠিকই বলছে। আমি হয়তো সত্যিই অপদার্থ। আমার তো নুন-চিনির জ্ঞান নেই।আমি হয়তো এমনই খারাপ যে একটা সংসার সামলাতে পারছি না। আমার তো গাল খাওয়াই উচিত, তাই না?”
অনিমেষ দিদির মাথায় হাত রেখে রুষ্ট গলায় বলল, “না দিদি, তুই একদম চুপ কর। তুই কেন গাল খাবি? মানুষ কি যন্ত্র? মানুষের ভুল হতে পারে না? সুশোভনদা কি ভগবান যে উনি ভুল করবেন না? আজ ওনার ব্যবহার দেখে আমার ঘেন্না হচ্ছে। আমি জানতাম না যে আমার জামাইবাবু এত নিচ মানসিকতার মানুষ। দিদি, তু্ই আজ থেকে আমাদের সাথেই থাকবি । এমন পশুর সাথে তোকে আমি এক মুহূর্ত থাকতে দেব না।”
সুশোভন এবার চেয়ার থেকে ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন আর সেই রাগ নেই, বরং এক গভীর বিষণ্ণতা আর করুণা। সে অনিমেষের কাঁধে হাত রাখল। অনিমেষ ঝটকা দিয়ে হাতটা সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু সুশোভন শক্ত করে ধরল। “অনিমেষ, শান্ত হও। তুমি বললে তো যে দিদির অপমানে তোমার রক্ত গরম হচ্ছে। দিদি এ বাড়ির মেয়ে বলে তোমার খুব লাগছে, তাই না? কিন্তু একবার পাশের ঘরের দিকে তাকাও তো।”
অনিমেষ অবাক হয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকাল। সেখানে মেঘনা থরথর করে কাঁপছে, তার চোখে আতঙ্ক আর জল। সুমিত্রা দেবী মেঘনার কাঁধে হাত দিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
সুশোভন শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল, “অনিমেষ, আজ আমি যা যা করলাম—গ্লাস ভাঙা, থালা ফেলা, তুচ্ছ কারণে গালিগালাজ করা, বাপের বাড়ি নিয়ে খোঁটা দেওয়া—এগুলো কি খুব চেনা লাগছে না? গত ছয় মাস ধরে এই ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে তো এই কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তুমি যখন মেঘনাকে চায়ের চিনির জন্য ‘অলক্ষ্মী’ বলো, তখন কি মেঘনার ভাইয়ের রক্ত গরম হয় না? তুমি যখন সামান্য নুনের জন্য ওর বাবাকে টেনে অপমান করো, তখন কি ওর বাবার আত্মা কাঁদে না? আজ তোমার দিদির গায়ে একটা সামান্য আঁচ লাগাতে গিয়ে তোমার যদি হাত ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে, তবে মেঘনার বাড়ির লোকের কী ইচ্ছে হওয়া উচিত? মেঘনাও তো কারোর আদরের বোন, কারোর কলিজার টুকরো মেয়ে।”
অনিমেষের সারা শরীর যেন হিম হয়ে এল। তার মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। সে দেখল নীলাঞ্জনা তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সেই চোখে একরাশ ধিক্কার। সুশোভন আবার বলল, “ভাই, আমি কোনোদিন নীলার সাথে একটা উচ্চস্বরে কথা বলিনি। আজ এই নাটকটা করতে গিয়ে আমার নিজের বুক ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু তোমাকে আয়না দেখানো দরকার ছিল। তুমি দিদিকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্যের ঘরের মেয়েকে মানুষ বলে মনে করো না? ও কি কেবল তোমার ঘর পরিষ্কার করার আর গালমন্দ খাওয়ার মেশিন? ওরও তো একটা মন আছে, ওরও তো একটা ভাই আছে যে হয়তো আজ এখানে নেই বলে সে মুখ বুজে সব সহ্য করে।”
অনিমেষের চোখের সামনে গত কয়েক মাসের সব দৃশ্য ছবির মতো ভেসে উঠল। মেঘনার ভয়ার্ত মুখ, সারারাত জেগে কাজ করা, আর সকালে তার দেওয়া বিষাক্ত গালিগালাজ। সে বুঝতে পারল, সে আসলে সুশোভনদার মধ্যে নিজেকেই দেখছিল এতক্ষণ। আর নিজেকে দেখতে গিয়েই তার এত ঘৃণা জন্মেছে। অপরাধবোধের এক বিশাল পাথর যেন তার বুকে আছড়ে পড়ল। সে টলতে টলতে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তার দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল সে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো চিৎকার নেই—ঘরের ভেতর শুধু এক অসহ্য নিস্তব্ধতা, যা কেবল মেঘনার কান্নার শব্দে মাঝে মাঝে ভেঙে যাচ্ছিল।
চলবে….. (অন্তিম পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh
