Monday, June 15, 2026







আয়না পর্ব-০২

#আয়না (পর্ব ২)
পরদিন সকাল থেকেই সুমিত্রা দেবীর মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। গতরাতের ফোন কলের পর থেকে তাঁর বুকের ভেতরটা টিপটিপ করছে। অনিমেষ অফিস বেরোনোর সময় আজও একচোট অশান্তি করে গেছে। আলমারির তাকে রাখা একটা শার্টের হাতা সামান্য কুঁচকে ছিল বলে সে মেঘনার দিকে ইস্ত্রিটা প্রায় ছুড়ে মারতে গিয়েছিল। মেঘনা কোনোমতে সরে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গরম ইস্ত্রির ছোঁয়া ওর আঙুলের ডগায় লেগে ফোসকা পড়ে গেছে। মেয়েটা টু শব্দ করেনি, শুধু কলতলায় গিয়ে ঠান্ডা জলে হাতটা ডুবিয়ে রেখেছিল অনেকক্ষণ। সুমিত্রা দেবী আড়াল থেকে সব দেখেছেন, তাঁর নিজের রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছিল।

বেলা এগারোটা নাগাদ গেটের সামনে ট্যাক্সি থামার শব্দ পাওয়া গেল। নীলাঞ্জনা আর সুশোভন এসেছে। নীলাঞ্জনা এ বাড়ির মেয়ে, তার বিয়ে হয়েছে বছর দুয়েক আগে। সুশোভন বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, শান্ত স্বভাবের কিন্তু চোখেমুখে বুদ্ধির ঝিলিক। সুমিত্রা দেবী দরজা খুলে ওদের ভেতরে আনলেন। মেঘনা তখন রান্নাঘরে ডাল সাঁতলাচ্ছিল, ফোড়নের গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করছে। ননদ আর নন্দাইকে দেখে সে আঁচলে হাত মুছে হাসিমুখে বেরিয়ে এল। তার চোখের তলার কালশিটে আর আঙুলের ফোসকাটা নীলাঞ্জনার নজর এড়ালো না।

নীলাঞ্জনা মেঘনার হাতটা ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। ফোসকা পড়া আঙুলটার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এটা কী করে হলো রে বৌমণি? রান্নার তেল ছিটকেছে নাকি ভাই আবার কিছু ছুঁড়ে মেরেছে?”

মেঘনা আমতা আমতা করে বলল, “না না, ওই তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে ইস্ত্রিতে হাত লেগে গেল। ও কিছু না, সেরে যাবে।”

সুশোভন সোফায় বসে সবটা লক্ষ্য করছিল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “মা, আপনি ফোনে যা যা বলেছিলেন, আমি আর নীলা আসার পথে সবটা আলোচনা করেছি। অনিমেষকে এভাবে চলতে দিলে ও একদিন বড় কোনো বিপদ ঘটিয়ে ফেলবে। ও ভাবছে ও বাড়ির একমাত্র রোজগেরে ছেলে বলে ওর সাত খুন মাপ। কিন্তু ও জানে না যে ক্ষমতার দাপট তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।”

সুমিত্রা দেবী নীলাঞ্জনার হাত ধরে সোফায় বসলেন। “বল তো মা, কী করব? আমি কতবার ওকে বুঝিয়েছি। ও তো আমাকেও মানে না। উল্টে বলে আমি নাকি বৌকে মাথায় তুলেছি। মেঘনা মেয়েটা বড় ভালো রে, ওর মতো বৌমা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু অনিমেষের অত্যাচারে ও তো শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেল।”

নীলাঞ্জনা তার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “মা, আজ দুপুরে ভাই যখন লাঞ্চ করতে বাড়ি ফিরবে, তখন আমরা একটা নাটক শুরু করব। সুশোভন আজ হবে ‘অনিমেষ’। মানে ভাই যেমন ব্যবহার মেঘনার সাথে করে, সুশোভন ও ঠিক সেই ব্যবহারটাই সবার সামনে আমার সাথে করবে। ভাই যখন দেখবে তার নিজের আদরের দিদিকে কেউ এভাবে অপমান করছে, তখন ওর রক্ত গরম হবেই। ও যখন প্রতিবাদ করবে, তখনই আমি ওর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেব যে ও নিজেও ঠিক এই কাজটাই করে।”

মেঘনা পাশে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ছিল। সে বলে উঠল, “না না দিদি , জামাইবাবু কেন তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন? ওনার মতো মানুষ কি ওসব পারেন? আর যদি উনি রেগে গিয়ে সত্যি সত্যিই কিছু বলে ফেলেন? আমি চাই না আমার জন্য তোমাদের সংসারে কোনো অশান্তি হোক।”

সুশোভন হাসল। “বৌমণি, চিন্তা করবেন না। এটা একটা থেরাপি। অনিমেষকে ওর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখাতে হবে। ও আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়, তাই আমরাই ওর সামনে আয়নাটা ধরব। আপনি শুধু দেখবেন আর নিজের কাজ করে যাবেন। কোনোভাবে ভয় পাবেন না।”

দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে অনিমেষ সাধারণত বাড়িতেই খেতে আসে। বাইকের আওয়াজ পাওয়া যেতেই সুমিত্রা দেবী সবাইকে ইশারা করলেন তৈরি হওয়ার জন্য। অনিমেষ ঘরে ঢুকেই দিদি আর জামাইবাবুকে দেখে একটু অবাক হলো। “আরে দিদি ! সুশোভনদা! আপনারা হঠাৎ? কোনো খবর না দিয়েই চলে এলেন?”

সুশোভন বেশ একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বসে ছিল। অনিমেষের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলল, “অনিমেষ, বোসো। খবর দেওয়ার আর সময় কোথায়? তোমার বোন তো বাড়িতে টিকতে দিচ্ছে না। সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান। ভাবলাম তোমাদের বাড়িতেই দিয়ে আসি কদিন।”

অনিমেষ অবাক হয়ে নীলাঞ্জনার দিকে তাকাল। নীলাঞ্জনা মাথা নিচু করে বসে আছে, যেন সে খুব অপরাধী। অনিমেষ হেসে বলল, “কী বলছেন সুশোভনদা? দিদি তো আমাদের খুব আদরের। ও কী এমন করল?”

সুশোভন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। “কী করল মানে? এই যে কাল রাতে আমি বললাম পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে রাখতে, ও সেটা ভুলে গেল। ওর জন্য আমাকে আজ সাধারণ শার্ট পরে বেরোতে হয়েছে। এই অপদার্থ মেয়েকে নিয়ে সংসার করা যায়? তোমাদের বাড়ির শিক্ষা কি এই?”

অনিমেষের হাসিটা একটু ফিকে হয়ে এল। সে দেখল সুশোভনদার গলার স্বর ক্রমশ চড়ছে। ঠিক যে সুরে সে মেঘনার সাথে কথা বলে, সুশোভনদাও ঠিক সেই সুরেই কথা বলছে। অনিমেষ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আরে সামান্য পাঞ্জাবির জন্য এত রাগ করার কী আছে? ঠিক আছে, পরে হবে খন। চলুন, খেতে বসি।”

খাবার টেবিলে বসার পর নাটকটা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিল। মেঘনা থালা সাজিয়ে দিচ্ছিল। নীলাঞ্জনা পাশে দাঁড়িয়ে জলের গ্লাস দিচ্ছিল। হঠাৎ সুশোভন জলের গ্লাসটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। মেঝেতে কাঁচের গ্লাসটা পড়ে ঝনঝন করে ভেঙে গেল। জলের ছিটে লাগল নীলাঞ্জনার শাড়িতে।

“জলটাতে নোংরা পড়ে আছে।চোখে দেখতে পাচ্ছ না?অন্ধ নাকি ?” সুশোভন প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সুমিত্রা দেবী আড়াল থেকে দেখছিলেন, তাঁর বুকটা কেঁপে উঠছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি জানতেন এটা প্রয়োজন। অনিমেষ থতমত খেয়ে গেল। সে বলল, “সুশোভনদা, গ্লাসটা ভাঙার কী দরকার ছিল? জলটা না হয় বদলে দিত। আর দিদির শাড়িটা ভিজে গেল তো!”

সুশোভন অনিমেষের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “তুমি ওর পক্ষ নিচ্ছ কেন? তোমরা কি জানো না বাড়ির বৌদের শাসন না করলে ওরা মাথায় চড়ে বসে? আজ নোংরা জল দিয়েছে , কাল খাবারে নুন হবে না। এই অসভ্য মেয়েগুলোকে এভাবেই সোজা করতে হয়।”

নীলাঞ্জনা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে রান্নাঘরের দিকে যেতেই সুশোভন পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, “কাঁদছ কেন? বাপের বাড়ির শেখানো অস্ত্র ব্যবহার করছ? যাও, নিজের ঘরে গিয়ে মরো। আমার সামনে ওসব নাটক চলবে না।”

অনিমেষের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছিল। তার দিদি, যাকে সে ছোটবেলা থেকে রাজকন্যার মতো আগলে রেখেছে, তাকে কেউ তার চোখের সামনে এভাবে গালিগালাজ করবে? সে আর সহ্য করতে পারছিল না। সে দেখল মেঘনা এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। অনিমেষের মনে হলো ঘরটা যেন হঠাৎ ছোট হয়ে আসছে। সুশোভনদার প্রতিটি শব্দ যেন চাবুকের মতো অনিমেষের পিঠে গিয়ে পড়ছে। সে বুঝতে পারছিল না, কেন এই দৃশ্যটা তার খুব চেনা লাগছে। কেন মনে হচ্ছে এই গালিগালাজ, এই চিৎকার, এই অসম্মান সে রোজ কোথাও না কোথাও শোনে।

তার মনের ভেতরে একটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। একপাশে তার দিদির চোখের জল, আর অন্যপাশে সুশোভনদার অকাট্য যুক্তি— “শাসন না করলে বৌরা মাথায় চড়ে বসে।” এই যুক্তিটা তো অনিমেষেরই নিজস্ব! আজ যখন অন্য কেউ সেটা প্রয়োগ করছে, তখন কেন তার এত রাগ হচ্ছে? কেন তার ইচ্ছে করছে সুশোভনদার কলার চেপে ধরতে?

চলবে….. (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ