#স্বপ্নপূরণ (পর্ব ৪)
দিনগুলো যেন আর কাটতে চায় না। নীলিমার ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট বেরোনোর কথা থাকলেও কোনো খবর নেই। এদিকে অনিমেষের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হচ্ছে। দোকানের ঘরভাড়া তিন মাস বাকি, মহাজন মাল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়িতে সরোজিনী দেবীর গঞ্জনা এখন চিৎকারে পরিণত হয়েছে।
সেদিন ছিল চৈত্র মাসের শেষ। কাঠফাটা রোদে সারা বাংলা যেন পুড়ছে। অনিমেষ ঘরে ফিরল খুব ক্লান্ত হয়ে। তার হাতে একটা ছোট মাটির হাঁড়ি। নীলিমা কাছে আসতেই অনিমেষ ম্লান হেসে বলল, “আজ দোকানে খুব একটা বিক্রি হয়নি গো। আসার পথে ভাবলাম আজ আমাদের বিয়ের আট বছর পূর্ণ হলো, তাই এই কটা রসগোল্লা আনলাম।”
নীলিমার বুকটা ধক করে উঠল। আট বছর! আটটা বছর ধরে এই মানুষটা পাথরের মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সে বিনিময়ে কী দিতে পেরেছে? শুধু একরাশ দুশ্চিন্তা আর অভাব। নীলিমা রসগোল্লার হাঁড়িটা হাতে নিয়ে কেঁদে ফেলল।
অনিমেষ ওর মাথায় হাত রেখে বলল, “কাঁদছ কেন পাগলি? সুবলরা আজ আমায় বাজারে খুব শুনিয়েছে। বলেছে, ‘অনি, তোর বউ তো মেমসাহেব হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তোকে তো সে ভুলেই গেছে। আট বছরে একটা ছেলেও দিতে পারল না, আর তুই তাকে বিডিও বানাবি?’ আমি ওদের কিচ্ছু বলিনি নীলিমা। আমি জানি, আমার নীলিমা আমায় কোনোদিন ছেড়ে যাবে না।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ।পাড়ার কেউ নয় ,ডাকপিয়ন। নীলিমা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। হাতে একটা খাম। নীলিমার হাত কাঁপছিল। সে খামটা খুলে পড়তে পড়তে পাথর হয়ে গেল।
অনিমেষ ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে নীলিমা? কোনো খারাপ খবর?”
নীলিমা কথা বলতে পারল না। সে শুধু খামটা অনিমেষের হাতে দিয়ে ওর পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। নীলিমার সিলেকশন হয়ে গেছে। সে এখন একজন গেজেটেড অফিসার। ডব্লিউবিসিএস-এর লিস্টে তার নাম জলজল করছে।
অনিমেষের চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ল। সে নীলিমাকে টেনে তুলল। “আমি জানতাম! আমি জানতাম তুমি পারবে!”
খবরটা আগুনের মতো পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল। সরোজিনী দেবী প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। যখন বুঝলেন তার বৌমা সত্যিই বড় সরকারি চাকরি পেয়েছে, তখন তার গলার সুর রাতারাতি বদলে গেল। পাড়ার সেই শশী পিসি, যে নীলিমাকে ‘বন্ধ্যা’ আর ‘অলক্ষ্মী’ বলত, সে আজ এক বাটি পায়েস নিয়ে হাজির।
“ও বৌমা, আমি জানতাম তুমি একদিন মুখ উজ্জ্বল করবে। আমাদের পাড়ার গর্ব তুমি!”
নীলিমা শুধু একটা মৃদু হাসি দিল। এই হাসির আড়ালে কত ঘৃণা আর কত যন্ত্রণা জমা ছিল, তা শুধু সে-ই জানে। কিন্তু আসল নাটকটা তখনো বাকি ছিল।
পরের মাসে নীলিমার প্রথম জয়েনিং।তার প্রথম মাসের মাইনেটা হাতে পেল যখন সবাই ভেবেছিল নীলিমা হয়তো এবার আলাদা ঘর ভাড়া করবে, দামী গয়না কিনবে অথবা অনিমেষকে ছেড়ে শহরে চলে যাবে। সুবলরা তো বাজি ধরে বসে আছে যে নীলিমা আর এই অভাবের সংসারে থাকবে না।
কিন্তু বিয়ের অষ্টম বিবাহ বার্ষিকীর ঠিক ছয় মাস পর, নীলিমা এক বিশাল আয়োজন করল। পাড়ার সবাইকে নিমন্ত্রণ জানানো হলো। এমনকি সুবল আর তার সেই বন্ধুদেরও। বাড়ির উঠোনে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। ভালো ক্যাটারিংয়ের রান্না হচ্ছে।
অনিমেষ কিছুটা অবাক। সে নীলিমাকে আড়ালে ডেকে বলল, “এত খরচ কেন করছ নীলিমা? আমার দোকানের দেনাগুলো তো মেটাতে হবে।”
নীলিমা শুধু বলল, “আপনি ধৈর্য ধরুন। আজ আমার পাওনা মেটানোর দিন।”
খাওয়াদাওয়ার পর নীলিমা সবাইকে উদ্দেশ্য করে এক জায়গায় জড়ো হতে বলল। সবার সামনে সে অনিমেষের হাতটা ধরল। তারপর সুবলদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপনারা গত আট বছর ধরে আমার স্বামীকে বলে এসেছেন যে আমি শিক্ষিত হলে ওকে ছেড়ে চলে যাব। আপনারা বলেছিলেন পড়াশোনা শিখলে মেয়েরা বেঈমান হয়। আজ আমি আপনাদের একটা কথা বলতে চাই— শিক্ষা মানুষকে বেঈমানি শেখায় না, বরং কৃতজ্ঞ থাকতে শেখায়।”
নীলিমা একটা ফাইল বের করে অনিমেষের হাতে দিল। “এই নিন। আপনার দোকানের পাশের বড় ঘরটা আমি লিজ নিয়েছি আপনার নামে। আর এই চেকে যে টাকাটা আছে, ওটা দিয়ে আপনি আপনার ব্যবসাটা বড় করবেন। আপনি আমায় পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন বলেই আজ আমি এই জায়গায়। আপনি আমার আকাশ, আর আকাশকে ছেড়ে পাখি কোথাও যেতে পারে না।”
সুবলরা মাথা নিচু করে ওখান থেকে সরে পড়ল। পাড়ার লোকেদের মুখ চুন হয়ে গেল। সরোজিনী দেবী কেঁদে ফেললেন। নীলিমা অনিমেষের দিকে তাকিয়ে হাসল। সেই হাসিতে কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল এক অগাধ শান্তি।
অনিমেষ দেখল, তার ছোট দোকানটা আজ আর ছোট নেই। নীলিমা শুধু তার ঘর আলো করেনি, সে তার ভাঙা ভাগ্যটাকেও জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে।
চলবে…..
