#স্বপ্নপূরণ (পর্ব ৩)
গ্রীষ্মকাল মানেই রুক্ষতা। চারিদিকে যেন লু বইছে, পুকুরের জল শুকিয়ে কাঁদা হয়ে গেছে। নীলিমার শরীরটাও যেন সেই রোদের তাপে তামাটে হয়ে গেছে। এম.এ. ফাইনাল পরীক্ষা সামনে, অথচ ঘরে অশান্তির আগুন নিভছে না। অনিমেষের স্টেশনারির দোকানে ইদানীং উইপোকা ধরেছে। স্টেশনের ধারের সেই বড় মলটা হওয়ার পর থেকে অনির দোকানে কেউ তেমন কিছু কিনতেও আসে না।
সরোজিনী দেবী এখন আর শুধু গজগজ করেন না, মাঝেমধ্যে চিৎকার করে নীলিমাকে অভিশাপ দেন। “ওরে অলক্ষ্মী, ঘরের হাঁড়ি চড়ছে না, আর তুই খাতা-পেন নিয়ে নবাবজাদি সেজেছিস? লোকে ঠিকই বলে, পড়াশোনা করা বউ মানেই ঘর জ্বালানি। অনিটা না খেয়ে মরছে, আর তুই এম.এ. পড়ছিস!”
নীলিমা সেদিন রান্নাঘরে ভাতের ফ্যান গালছিল। চোখের জলটা ভাতের হাঁড়ির ধোঁয়ায় মিশে গেল। সে জানত, অনিমেষ তাকে বলতে পারছে না, কিন্তু গত তিন মাস ধরে দোকানের ঘরভাড়া বাকি। অনির শরীরটাও ইদানীং ভালো যাচ্ছে না, সারাদিন রোদে টো টো করে ঘুরে ছোটখাটো অর্ডার জোগাড় করে সে।
রাতে ঘরে ফিরে অনিমেষ শুয়ে পড়ল। নীলিমা ল্যাম্পের শিখাটা কমিয়ে দিয়ে অনিমেষের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দেখল, মানুষটা বড্ড রোগা হয়ে গেছে। পাঞ্জাবির হাতাটা ছিঁড়ে গেছে, অথচ কদিন আগেই নীলিমা এম.এ-র বই কেনার জন্য অনিমেষের থেকে দু-হাজার টাকা নিয়েছে।
“শুনছেন ?” নীলিমা আলতো করে ডাকল।
অনিমেষ চোখ না খুলেই বলল, “বলো নীলিমা।”
“আমি ভাবছি আর পড়ব না। পরীক্ষাটা দেব না। দোকানের অবস্থা তো ভালো না, আমি বরং পাড়ার ছোট ছোট বাচ্চাদের টিউশনি পড়িয়ে কিছু টাকা দিই আপনাকে।”
অনিমেষ ধড়ফড় করে উঠে বসল। নীলিমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “খবরদার নীলিমা! এই কথা আর কোনোদিন মুখে আনবে না। আমি যদি রিকশা চালিয়েও তোমার পরীক্ষার ফি দিতে পারি, আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। সুবলরা বলে আমি নাকি আহাম্মক। তারা বলে, ‘অনি, তুই তো ফকির হবিই, বউকে তো ডানা লাগিয়ে দিয়েছিস, সে একদিন বড় আকাশ দেখে তোকে ভুলে যাবে।’ তুমি কি তাই করবে নীলিমা?”
নীলিমার বুকটা ফেটে কান্না এল। সে অনিমেষের বুকে মাথা রেখে বলল, “মানুষ কি নিজের আকাশকে ভুলে থাকতে পারে? আপনি না থাকলে তো আমি কবেই এই রুক্ষ মাটিতে শুকিয়ে যেতাম। আমি কথা দিচ্ছি, এই অন্ধকারের পরেই আলো আসবে।”
পরীক্ষা শেষ হলো। এবার শুরু হলো আসল পরীক্ষা— চাকরির লড়াই। নীলিমা একের পর এক চাকরির ফর্ম ফিলআপ করতে শুরু করল। কিন্তু ভাগ্য যেন সহায় ছিল না। কখনো এক নম্বরের জন্য কাট-অফ লিস্টে নাম আসত না, কখনো ইন্টারভিউতে গিয়ে ফিরে আসতে হতো।
পাড়া-পড়শিদের টিটকিরি আরও বাড়ল। শশী পিসি একদিন পুকুরঘাটে নীলিমাকে দেখে বললেন, “কীগো বিদুষী বৌমা! চাকরিটা কি হলো? নাকি শুধু অনির টাকাগুলোই জলে দিচ্ছ ? ওদিকে ঘরে চাল নেই, আর তুমি নাকি বিডিও হবে ? হাসালে বাপু!”
অনিমেষের বন্ধুরা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে। তারা এখন অনিমেষকে সামনে বসিয়ে নীলিমার নামে মিথ্যে কথা রটাতে শুরু করল। সুবল বলল, “শুনেছিস অনি? তোর বউকে নাকি স্টেশনে এক ছোকরার সাথে দেখা গেছে। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যায় না কি করতে যায়, কে জানে! বেশি পড়াশোনা শেখালে মেয়েরা কিন্তু হাতের বাইরে চলে যায়।”
অনিমেষ সুবলের কলার চেপে ধরেছিল সেদিন। “আমার নীলিমাকে নিয়ে একটা কথা বললে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে দেব সুবল। ও যদি আমায় ছেড়ে যায়, জানব সেটা আমার কপাল, কিন্তু ওর চরিত্র নিয়ে কথা বললে আমি ছেড়ে কথা বলব না।”
বাড়ি ফিরে অনিমেষ নীলিমাকে কিছু বলেনি, কিন্তু নীলিমা সবটা বুঝতে পেরেছিল অনির মুখ দেখে। নীলিমা সেই রাত থেকে খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিল। সারাদিন-রাত শুধু বই আর প্র্যাকটিস সেট। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, হাত দুটো শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে।
মাঝেমধ্যে নীলিমা ভাবত, সত্যিই কি সুবলরা ঠিক বলছে? পড়াশোনা কি তাকে অহংকারী করে তুলছে? না, সে নিজেকে তৈরি করছিল এক বড় লড়াইয়ের জন্য। সে জানত, একটা বড় চাকরি না পেলে সে অনিমেষের এই ঋণ শোধ করতে পারবে না।
এরই মধ্যে একদিন নীলিমার কাছে একটা বড় চিঠি এল। ডব্লিউবিসিএস (WBCS) এর প্রিলিমিনারি আর মেইন পাস করে সে ইন্টারভিউয়ের ডাক পেয়েছে। অনিমেষের আনন্দ আর ধরে না।অনেক কষ্ট করে অনিমেষ নীলিমায় জন্য একটা সুন্দর শাড়ী কিনে এনেছিলো।
শাশুড়ি মা গজগজ করে বললেন, “হ্যাঁ রে অনি, ঘরে নুন নেই, আর তুই আংটি বন্ধক দিয়ে বউয়ের ঢঙের শাড়ি কিনলি? এই বউ তোকে পথে বসাবে, দেখে নিস!”
নীলিমা সেই শাড়িটা হাতে নিয়ে মনে মনে বলল, ‘মা, এই শাড়িটা শুধু কাপড় নয়, এটা আপনার ছেলের বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের মর্যাদা আমি প্রাণ দিয়ে রাখব।’
ইন্টারভিউয়ের দিন অনিমেষ নীলিমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে এল। ট্রেনের জানলায় মুখ রেখে নীলিমা দেখল, রোদে পোড়া অনিমেষ তাকে হাত নাড়ছে। সেই ঘামে ভেজা পাঞ্জাবি পড়া মানুষটার চোখে কত আশা! নীলিমা জানত, আজ শুধু তার পরীক্ষা নয়, আজ তাদের আট বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ের ভাগ্য নির্ধারণ হবে।
ইন্টারভিউ দিয়ে ফেরার পর শুরু হলো দীর্ঘ অপেক্ষা। দিন কাটে না, রাত ফুরায় না। অভাব তখন ঘরের কোণে কোণে বাসা বেঁধেছে। এমনকি অনিমেষের দোকানে এখন মাল তোলার টাকাও নেই। নীলিমা নিজের মনেই কপালে সিঁদুরটা ঘষে ঘষে রাঙিয়ে রাখত আর ঠাকুরকে ডাকত।
সুবলরা তখন হাসাহাসি করে বেড়াচ্ছে— “অনির তো দেউলিয়া হওয়ার সময় হয়ে এল। বউ তো এখন বিডিও হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, অনির দোকান কি আর ওর চোখে পড়বে?”
কিন্তু ঝড় আসার আগে যেমন নিস্তব্ধতা থাকে, নীলিমার জীবনেও তেমনই একটা নিস্তব্ধতা ঘনিয়ে এল। তার কি চাকরিটা হবে? নাকি সুবলদের ভবিষ্যৎবাণীই সত্যি হবে?
চলবে…..
