#স্বপ্নপূরণ (পর্ব ২)
নীলিমার কলেজ জীবন শুরু হলো এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। সকালে সূর্য ওঠার আগেই নীলিমার দিন শুরু হয়। মেঠো পথ দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ শব্দে সাইকেল চালিয়ে অনিমেষ যখন বাজারের দোকানে যায়, নীলিমা তখন উনুনের ধোঁয়া আর গোয়াল ঘরের গোবরের গন্ধে মাখামাখি। শাশুড়ি সরোজিনী দেবীর মেজাজ ইদানীং সপ্তমে চড়ে আছে। পাড়ার মোড়ে গেলেই লোকে বাঁকা হাসি হেসে জিজ্ঞেস করে, “কী গো সরোজিনী,বৌমা তো এখন বড় কলেজে যাচ্ছে, বাড়িতে কি ওসব হাতা-খুন্তি ছোঁয়? নাকি সব কাজ তোমাকেই করতে হয়?”
সরোজিনী দেবী বাড়ি ফিরে নীলিমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন, “পোড়া কপাল আমার! লোকে ধিক্কার দিচ্ছে। ঘরের বউ পরের ঘরে ডানা মেলে উড়ছে, আর আমি এখানে হাড়কালি করছি। বলি ও বৌমা, কলেজের ওই মোটা মোটা বই কি পেট ভরাবে? বংশের প্রদীপ কৈ? পাড়ার মায়েরা তো নাতিনাতনি নিয়ে কোলে পিঠে করছে, আর আমি কি শুধু খাতা-পেন দেখেই মরব?”
নীলিমা মাথা নিচু করে সর্ষের শাক কুটছিল। চোখে জল এলেও সে মুখ খোলে না। সে জানে, প্রতিবাদ করলে অশান্তি বাড়বে, আর তার মাসুল দিতে হবে অনিমেষকে। অনিমেষ সারাদিন দোকানে লড়াই করে যেটুকু শান্তি চায়, নীলিমা তা নষ্ট করতে চায় না।
সেদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে নীলিমার দেখা হলো সুবলের সঙ্গে। সুবল অনিমেষের ছোটবেলার বন্ধু, কিন্তু তার মুখে সব সময় বিষ। সে বাইক থামিয়ে নীলিমাকে দেখে কুৎসিত একটা হাসি দিল।
“কী গো বৌদি, কলেজ কেমন চলছে? অনি তো পাগল, তাই তোমাকে লাই দিচ্ছে। কিন্তু সাবধান, বেশি ডানা গজালে আকাশ থেকে পড়ে যেতে সময় লাগে না। আমাদের অনিটা বড় সহজ-সরল মানুষ, ওকে যেন শেষে পথে বসিয়ে দিও না।”
নীলিমা থমকে দাঁড়াল।তার গলার স্বরটাও আজ একটু কঠিন হলো। সে বলল, “ঠাকুরপো, আকাশ থেকে কারা পড়ে জানি না, তবে যারা মাটির মানুষের হাত ধরে হাঁটে, তারা সহজে হোঁচট খায় না। আপনি অনিমেষের বন্ধু, ওনার পাশে দাঁড়ান, ওনার মনে বিষ ঢালবেন না।”
সুবল গজগজ করতে করতে চলে গেল। কিন্তু নীলিমার মনে একটা খটকা রয়ে গেল। সে জানে, এই বিষাক্ত কথাগুলো একদিন অনিমেষের কানেও যাবে।
রাতে খাওয়ার পর ল্যাম্পের আলোয় নীলিমা যখন ইতিহাসের মোটা বইটা নিয়ে বসেছে, অনিমেষ পাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীলিমা বই থেকে মুখ তুলে দেখল অনিমেষের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
“কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?” নীলিমা আলতো করে অনিমেষের কপালে হাত রাখল।
অনিমেষ ম্লান হেসে বলল, “না গো নীলিমা, শরীর ঠিক আছে। কিন্তু বাজারের অবস্থা খুব খারাপ। নতুন একটা বড় স্টেশনারীর দোকান খুলেছে স্টেশনের কাছে। আমাদের ছোট দোকানে এখন আর কেউ আসতে চায় না। দেনা বাড়ছে। মা আবার তোমার কলেজের ফি নিয়ে কথা শোনাচ্ছিলেন।”
নীলিমা অনিমেষের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। “আমি জানি কষ্ট হচ্ছে। আপনি একটা কাজ করুন, আমি না হয় এখন থেকে ঘরের জন্য আর একটা টাকাও চাইব না। আমার বাবার দেওয়া সেই দুটো সোনার বালা আছে, ওটা বিক্রি করে দোকানে মাল তুলুন।”
অনিমেষ চমকে উঠল। “ছিঃ! ওটা তোমার বাবার দেওয়া শেষ সম্বল। ওটা আমি কোনোদিন হাত দেব না। আমি বরং রাত জেগে পার্টটাইম কাজ খুঁজব। তুমি শুধু মন দিয়ে পড়ো নীলিমা। তোমার এই ডিগ্রিটাই হবে আমাদের দুঃখ ঘোচানোর রাস্তা।”
দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেল। নীলিমা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করল। ভালো নম্বর নিয়ে বিএ পাস করার পর তার জেদ আরও বাড়ল। সে এবার এমএ পড়তে চায় এবং সাথে সাথে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে চায়। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে নীলিমার কোলে কোনো সন্তান আসেনি। আর এটাই হয়ে দাঁড়াল পাড়ার লোকেদের প্রধান অস্ত্র।
পাড়ার শশী পিসি একদিন পুকুরঘাটে নীলিমাকে দেখে বললেন, “ও বৌমা, শরীরটা কি বেশি শুকিয়ে যাচ্ছে? নাকি পড়াশোনার গরমে পেটের সন্তান আসছে না? বলি, ডাক্তার-বদ্যি দেখাও। অনির তো বংশ রক্ষা করতে হবে। নাকি বই পড়লেই সব পাওয়া যায়?”
নীলিমা বাড়ি ফিরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে ভাবল, সত্যিই কি সে ভুল করছে? অনিমেষের এত ত্যাগ, এত ভালোবাসা— সে কি তার যোগ্য সম্মান দিতে পারছে? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, যদি সে আজ ভেঙে পড়ে, তবে অনিমেষের সব লড়াই বৃথা হয়ে যাবে।
অনিমেষ সেদিন দোকান থেকে ফেরার পথে এক গুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে এল। নীলিমাকে কাঁদতে দেখে সে সব বুঝতে পারল। সে নীলিমার চিবুকটা ধরে বলল, “যারা আজ তোমাকে বন্ধ্যা বলছে, কাল তারাই তোমার সামনে মাথা নিচু করবে। আমি জানি তুমি হীরে নীলিমা, একটু সময় দাও, নিজেকে ঘষেমেজে উজ্জ্বল করে নাও।”
শুরু হলো নীলিমার লড়াইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়। এমএ ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি সে চাকরির পরীক্ষার ফর্ম তুলতে লাগল। অনিমেষের ব্যবসার অবস্থা আরও খারাপ। একটা ভাঙা সাইকেল নিয়ে নীলিমা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে স্টেশনের কাছের কোচিং সেন্টারে যেত। মাঝে মাঝে তার মনে হতো সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, কিন্তু অনিমেষের সেই হাসি মুখটা মনে পড়লেই তার শরীরে নতুন শক্তি আসত।
বন্ধুরা অনিমেষকে প্রায়ই ক্ষ্যাপাতো।সুবলরা বলত, “অনি, তুই তো দেখছি ভিখারি হয়ে যাবি। বউকে চাকরি করাচ্ছিস, দেখিস একদিন লালবাতি জ্বলা গাড়ি চড়ে সে যখন বড় শহরে যাবে, তোকে তার তখন ভৃত্যের মতো মনে হবে। বেশি ওড়াস না রে, আকাশটা অনেক বড়।”
অনিমেষ শুধু হাসত। সে নীলিমাকে বিশ্বাস করত নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। কিন্তু গভীর রাতে যখন একা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, তার মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম ভয় উঁকি দিত। যদি সত্যিই নীলিমা তাকে ছেড়ে চলে যায়? যদি সত্যিই সে অনেক উঁচুতে উঠে এই গরিব ঘরের ছেলেকে চিনতে না পারে?
নীলিমা বুঝতে পারত অনিমেষের মনের এই টানাপোড়েন। সে কোনো কথা না বলে পড়াশোনার টেবিলে বসে থাকত। তার কলমের প্রতিটি আঁচড়ে থাকল এক প্রতিজ্ঞা— সে প্রমাণ করে দেবে, ভালোবাসা শুধু গ্রহণের নাম নয়, ভালোবাসা হলো আগলে রাখার নাম।
চলবে…..
কলমে -#SupriyaGhosh
