#স্বপ্নপূরণ (পর্ব ১)
বিকেলের পড়ন্ত রোদে লাল মোরামের রাস্তাটা যেন তামাটে হয়ে আছে। চারদিকে ধুলো উড়ছে। অনিমেষ তার ছোট স্টেশনারি দোকানের ঝাঁপটা টেনে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দোকানের তাকে ধুলো জমেছে, বিক্রিবাট্টা আজ তেমন হয়নি। কিন্তু বাড়িতে আজ উৎসব। কালই সে বিয়ে করে ঘরে এনেছে নীলিমাকে।
নীলিমা— নামটার মতোই মেয়েটা শান্ত। নীলিমার বাবা হারানবাবু একটা তেল মিলের কর্মচারী ছিলেন। অভাবের সংসারে চার চারটে মেয়ের বিয়ে দেওয়া মানে পাহাড় ভাঙার সমান। নীলিমা মেজ। পড়াশোনায় সে ছিল আগুনের মতো মেধাবী, কিন্তু ছোটবোনের চিকিৎসার খরচ আর দিদির বিয়ের দেনা মেটাতে গিয়ে নীলিমার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষাটা আর দেওয়া হয়নি। পরীক্ষার আগের দিন রাতে সে শুধু বইগুলো জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদেছিল। তারপর একদিন বাবার চোখের জল দেখে চুপচাপ বিয়ের পিঁড়িতে বসে গিয়েছিল।
ফুলসজ্জার রাত। ঘরে রজনীগন্ধার কড়া গন্ধ। নতুন খাটের পালিশের একটা চড়া ঘ্রাণ নাকে আসছে। নীলিমা লাল বেনারসিটা গায়ে জড়িয়ে আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিল খাটের এককোণে। জানলার বাইরে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। অনিমেষ ঘরে ঢুকল। পড়নে সিল্কের পাঞ্জাবি, চোখেমুখে একরাশ ক্লান্তি কিন্তু ঠোঁটে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
অনিমেষ খাটের পাশে এসে বসল। নীলিমা ঘোমটাটা আরও একটু টেনে দিল। অনিমেষ আলতো করে নীলিমার হাতটা ধরল। খসখসে হাত— রান্নাবান্না আর জল তোলার পরিশ্রমে আঙুলের ডগাগুলো একটু ফেটে গেছে। অনিমেষ নরম গলায় বলল, “খুব ভয় পাচ্ছ? দেখো নীলিমা, আমি জানি তুমি খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে। আমিও কোনো রাজপুত্তুর নই। আমার স্টেশনারির দোকান থেকে যা পাই, তাতে মা আর আমার বিধবা বোন ছায়ার গ্রাসাচ্ছাদন চলে যায়। তোমাকে হয়তো হিরে-জহরত দিতে পারব না, কিন্তু এইটুকু কথা দিচ্ছি, অসম্মান হতে দেব না।”
নীলিমা মাথা নিচু করে ছিল। হঠাৎ সে মাথা তুলল। তার চোখে জল টলটল করছে, কিন্তু সেই জলের নিচে এক গভীর তৃষ্ণা। সে কাঁপা গলায় বলল, “সবাই সোনাদানা চায়, শাড়ি চায়। আমি কি অন্য কিছু চাইলে আপনি রাগ করবেন?”
অনিমেষ অবাক হয়ে বলল, “কী চাইবে? বলো না।”
নীলিমা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, “আমি পড়তে চাই। অভাবের জন্য এইচএস পরীক্ষাটা দেওয়া হয়নি। আমার খুব জেদ, আমি অনেকদূর পড়াশোনা করব, নিজের পায়ে দাঁড়াব। আমি ঘরের সব কাজ করব, মা আর বোনের সেবা করব, কোনো অভিযোগ করব না। শুধু… শুধু আমায় কি আবার স্কুলে ভর্তি করে দেবেন?”
বাসর রাতে এই অদ্ভুত আবদার শুনে অনিমেষ থমকে গেল। সে ভাবল, যে মেয়েটা তার সারাজীবনের সঙ্গী হতে এসেছে, তার মনের কোণে যদি একটা ক্ষত থেকে যায়, তবে কি সেই ঘর সুখের হবে? সে নীলিমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “পড়বে? নিশ্চয়ই পড়বে। আমি ছোট ব্যবসায়ী হতে পারি নীলিমা, কিন্তু আমি জানি একটা মানুষের শিক্ষিত হওয়া কতটা জরুরি। কালই আমি বড় স্কুলের হেডমাস্টার মশাইয়ের কাছে যাব। তোমার স্বপ্ন আমি মরতে দেব না।”
বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো আসল লড়াই। পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে আড্ডা বসেছে। অনিমেষের বাল্যবন্ধু সুবল লিকার চায়ে চুমুক দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “কী রে অনি, শুনলাম নতুন বউ নাকি ব্যাগ কাঁধে ইস্কুলে যাবে? বলি, কচি খুকি দেখে বিয়ে করলি নাকি? এখন তোকে বাজারের ব্যাগ বইতে হবে, আর বউ বইবে ইশকুলের ব্যাগ! হাসালি ভাই!”
অনিমেষ শান্তভাবে জবাব দিল, “ওর পড়ার ইচ্ছে আছে সুবল। মানুষ হতে চায়, এতে হাসির কী আছে?”
সুবল বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “এখন তো মধুচন্দ্রিমা চলছে, তাই সব ভালো লাগছে। মনে রাখিস অনি, নদীর জল বাড়লে যেমন বাঁধ ভেঙে যায়, বউয়ের বুদ্ধি বাড়লে কিন্তু সংসার ভেঙে যায়। বেশি ডানা গজালে সেই পাখি কিন্তু তোর এই টিনের চালের ঘরে আর থাকবে না। একদিন তোর চেয়ে বড় কাউকে পেয়ে উড়াল দেবে, তখন পস্তাবি।”
বাড়িতেও ঝামেলার কমতি ছিল না। শাশুড়ি সরোজিনী দেবী হাতা-খুন্তি আছড়ে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ রে অনি, আমি কি সংসারের ঘানি টানতে টানতেই মরবো ?বৌমা ইসকুলে যাবে, আর আমি এই বুড়ো বয়সে উনুন সামলাব? লোকে বলছে অনির মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে নতুন বউ। ছি ছি, পাড়ায় মুখ দেখানো দায়!”
নীলিমা সব শুনত। সে ভোরে সূর্য ওঠার আগে উঠত। গোয়াল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে ঘর -দোর পরিষ্কার করা , পুকুর থেকে ঘড়ায় করে জল আনা, আর সবার রান্না শেষ করা— সব একা হাতে করত। তারপর সেই নীল রংয়ের শাড়িটা পরে তপ্ত রোদে মেঠো পথ ধরে হেঁটে স্কুলে যেত। বিকেলে ফিরে এসে আবার সেই গোয়াল ঘরের কাজ। রাতে হারিকেনের আলোয় নীলিমা যখন বই নিয়ে বসত, অনিমেষ পাশে বসে দোকানের হিসেব মেলাত। কোনোদিন হয়তো দোকানে লাভ কম হয়েছে বা বিক্রি কম হয়েছে, অনিমেষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ত। নীলিমা তখন বই থেকে চোখ তুলে বলত, “চিন্তা করবেন না, আমি তো আছি। একটু সময় দিন আমায়।”
উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোল। নীলিমা জেলায় মেয়েদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে পাস করল। স্কুলে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। পাড়ার সেই মহিলারা যারা জানলার ফাঁক দিয়ে নীলিমাকে দেখে হাসাহাসি করত, তারা এখন কপালে হাত দিয়ে বলতে লাগল, “ওরে বাবা! অনির বউ তো ডাকাত বিদুষী গো!”
অনিমেষ সেদিন বাজার থেকে বড় বড় রাজভোগ কিনে এনেছিল। নীলিমা পরম শান্তিতে সেই মিষ্টি নিজের হাতে অনিমেষকে খাইয়ে দিল। কিন্তু আনন্দটা স্থায়ী হলো না। রাতে বিছানায় শুয়ে অনিমেষ দেখল নীলিমা কাঁদছে।
“কী হয়েছে নীলিমা? এত ভালো রেজাল্ট করলে, কাঁদছ কেন?”
নীলিমা ফিসফিস করে বলল, “মা বলছিলেন— পড়াশোনা তো হলো, এবার কি ঘরে বংশের প্রদীপ আসবে না? পাড়ার লোক নাকি বলাবলি করছে আমি বন্ধ্যা, তাই পড়াশোনা নিয়ে নাটক করছি। আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?”
অনিমেষ নীলিমাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, “পাগলি! গাছ বড় হলে তবেই তো তাতে ফল ধরে। তুমি আগে ডালপালা মেলো, নিজেকে শক্ত করো। লোকের কথা থাক, আমি তো জানি তুমি কী। কালকে আমি কলেজের ফর্ম তুলতে যাব। তুমি বিএ পড়বে।”
নীলিমা অনিমেষের বুকে মাথা রেখে ভাবল, এই মানুষটা যে বিশ্বাস তার ওপর রেখেছে, সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা সে কখনও করবে না। কিন্তু সে জানত না, সামনে আরও কত কঠিন পাহাড় তাকে টপকাতে হবে। মধ্যবিত্ত জীবনের অভাব আর সমাজের বাঁকা চোখের বিষাক্ত তীরে তাদের সংসারটা নীল হয়ে উঠবে কি না, সেটা সময়ই বলবে।
চলবে……
কলমে -#SupriyaGhosh
