#কলঙ্কিনী (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
ভাবীর সঙ্গে যখন আমার স্বামীর বিয়ে ঠিক হয় তখন আমি চার মাসের গর্ভবতী। আমার স্বামী রাতুল। তার বড় ভাই রাসেল সাত মাস পূর্বে মা রা যায়। তার ভাবী স্বামীর মৃ ত্যুর পর শ্বশুড়বাড়িতেই ছিলো। তার বাবার বাড়িতে তার পরিবার নিয়ে যেতে চাইছিলো। কিন্তু ভাবী যায়নি। সে সবসময় বলতো,“এটা আমার স্বামীর ঘর। এখানে তার স্মৃতি রয়েছে। আমি এখানেই থাকবো। সে না থাকুক, তার গন্ধটা তো অনুভব করতে পারবো।”
বাহ্! স্বামীর প্রতি কি চমৎকার ভালোবাসা! কিন্তু ভুল। এটা তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসা নয়। যদি তার প্রতি এতই ভালোবাসা থাকতো তবে তার মৃ ত্যুর তিন মাসের মাথায় আমার স্বামীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতো না। আমি নিজ চোখে দেখেছি সে রাতুলের সামনে একটু খোলামেলা হয়ে যেতো যেন। ওড়না ছাড়া যখন তখন রাতুলের সামনে চলে আসতো। তার পাঁচ বছরের মেয়েটাকে তো একদিন রাতুলকেই বাবা ডাকতে বলে। এটা আমি লক্ষ্য করলে সে বলে,“চাচা তো বাবার মতোই। ওর তো বাবা নেই। ও নাহয় দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাক।”
আমি এটা মেনে নিতে পারলেও ঘন ঘন রাতুলের সামনে তার আসা। যেকোন প্রয়োজনে রাতুলকে ডাকা। এসব মেনে নিতে পারিনি। রাতের খাবার শেষে ভাবী রাতুলের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতো। প্রথম দিকে রাতুল ঘুমের কথা বলে আসতে চাইলে সে নানা বাহানায় রেখে দিতো। পরবর্তীতে রাতুলই রাত বারোটা অবধি কিংবা তারচেয়ে বেশি সময় অবধি গল্প করতো। এসব সহ্য করা যায়? আমি ঘরে তার অপেক্ষায়, সে ভাবীর সঙ্গে গল্প করছে।
আমার এসব একদম পছন্দ হয় না। আমি প্রথমেই শাশুড়ী মাকে কথাটা বলি। আমার এসব ভালো লাগছে না। জবাবে শাশুড়ী মা বলে,“মেয়েটা দুঃখী। এত অল্প বয়সে আমার ছেলেটা মা রা গেলো। সারাদিন তো মনমরাই থাকে। একটু নাহয় দেবরের সঙ্গে কথা বলছে, বলুক না। আর বাচ্চাটার বাবা নাই। ও তো চাচার কাছে বেশিই থাকবে। রাতুলও তো এই হিসাব করে তাকে আদর করছে।”
রিমিকে আদর করা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নাই। আমার সমস্যা রিমির মাকে নিয়ে। ভাবীর এমন মেলামেশা আমি মানতে পারছি না। আমি আমার এই সমস্যা শাশুড়ী মাকে বোঝাতে পারলাম না। তার কাছে এসব স্বাভাবিক। কিন্তু আমার কাছে লাগছিলো না। আমি এরপর সরাসরি রাতুলের সঙ্গে কথা বললাম। রাতুলের একই কথা, আমি শুধু শুধু হিংসা করছি। স্বামী হারা মানুষটার সঙ্গে এত হিংসে না করি। রাতুল তো আমারই। তাদের সম্পর্ক দেবর ভাবীর।
তবে বেশিদিন তাদের এই দেবর ভাবীর সম্পর্ক থাকলো না। এটা রূপ নেয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে। একই ঘরে থেকে এসব আমার চোখের আড়াল হয়নি। এসব নিয়ে কথা বলতে গেলাম, হয়ে গেলাম তাদের চোখের বিঁষ। এসব সহ্য করা যায়? স্বামী সে আমার। আমার ভালোবাসা। আমি তো প্রতিবাদ করবোই। আগে তো তাদের মেলামেশা পছন্দ নয় এটা বলতাম। এবার আমি সরাসরি তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলি। আর এটা তোলার সঙ্গে সঙ্গে রাতুল আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। চোরের মায়ের যেমন বড় গলা তেমন গলায় রাতুল বলে,“ছি। তুই না আমার বউ। বউ হয়ে তুই আমাদের ভাবী দেবরের পবিত্র সম্পর্কটা নিয়ে এভাবে নোংরা অপবাদ দিচ্ছিস। এত নোংরা চিন্তা আসলো কোথা দিয়ে?”
“আমার চিন্তাটা নোংরা নয় রাতুল। চোখ তো ভুল দেখে না। আমার চোখের আড়াল কিছুই হয় না।”
আমার বলা এই কথাটি রাতুলকে আরও রাগিয়ে দেয়। সে আবার আমার গায়ে হাত তোলে। এক পর্যায়ে আমার বংশ, পরিবার তুলে গালি দিতে থাকে। রাতুল বলে,“তুই একটা ছোটলোক। তোর চিন্তাধারা তো ছোটলোকের মতোই হবে। থাকতি তো বস্তির ছুপড়ি ঘরের মতো একটা ঘরে। মিশতি গ্রামের গেয়ো আনকালচার লোকজনের সঙ্গে। তোর চিন্তা ভাবনা তো তাদের মতোই হবে।”
সেদিন আমাদের মাঝে তুমুল ঝগড়া হয়। সবশেষে রাতুল বলে,“না পোষালে চলে যা।” পরক্ষণে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে,“যাবি কোথায়। সেই তো বাপের বাড়ির অবস্থা ভিখারির মতো। ওখানে গেলে তোর বাপ মা তুলবে ঘরে? নিজেরা খেতে পারে না, তোকে কি খাওয়াবে।”
তার এই বিদ্রুপ নিয়ে বলা কথার জবাবে আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কারণ কথাগুলো সত্যি। আমি গরিব ঘরের মেয়ে। গায়ের সাদা চামড়াটার জন্য রাতুল এবং তার পরিবার আমায় পছন্দ করে ঘরে তুলেছে। তবে বিয়ের পর সাদা চামড়া কিছু হয় না। সেটা তারা ভালোই বুঝেছে। তাই আমার বাবার সার্মথ্য নিয়ে ছোট বড় অনেক কথাই শুনতে হয়েছে। জবাব দিতে পারিনি। জবাব দিলে যে খারাপ হয়ে যাবো। আর খারাপ বউ ঘরে রাখবে? ঘরে না রাখলে জায়গা কই? যাক সেসব কথা। রাতুল আমার স্বামী। তাছাড়া আমার সত্যি যাবার কোন জায়গা নাই। তাই সারাজীবন তার ঘরেই থাকতে হবে। কিন্তু স্বামী অন্যের হয়ে যাবে সেটাও তো দেখতে পারবো না। তাই ভাবীর কাছে অনুরোধ করি। তার বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো। সেজন্য তো সে শাশুড়ীর চোখের মনি। ননদেরও প্রিয় ভাবী। রোজ ননদ ফোন করে তার সাথে কথা বলে। আমার খোঁজ কখনো নেয় না। বাড়িতে আসলেও আমাকে দেখতে পায় না যেন। সেসব মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আর পারছি না। ভাবীর হাতে পায়ে ধরে বললাম,“ভাবী আমি আমার স্বামীকে খুব ভালোবাসি। আপনি তার পিছু ছেড়ে দেন। আপনার তো বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো। সেখানে গিয়ে মাস খানেক থাকুন না। রাতুল তবে আপনাকে ভুলে যাবে। আপনি দয়া করে আমাকে বোন ভেবে এতটুকু করুন।”
“আমি কি করলাম? আমি আমার স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যাবো কেন? তাও তোমার কথায়? যাই হোক নিজের স্বামী ধরে রাখার মুরোদ নাই, এসেছে আমাকে বলতে। আমার হাতে পায়ে না ধরে রাতুলকে বলো আমার সঙ্গে না মিশতে, তাহলেই হয়।”
ভাবী খুব ভাবের সঙ্গেই কথাগুলো বলেন। আমি ছোট বোন হিসাবে দয়াভিক্ষা করি। তবে তার মায়া হয় না। আমার প্রতি মায়া থাকলে সে এমন সম্পর্কে জড়াতো। আমি বুঝে যাই এখানে বলে লাভ নাই। রাতুলের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে তাকে ভালোবেসে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। রাতে তার বুকে মাথা রেখে ভালোবাসাময় কন্ঠে জানতে চাইলাম,“আমি আমার কি পরিবর্তন করলে আপনি আমাকে ভালোবাসবেন?”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।
শুধু শুধু এসব কথা বলো না তো।”
রাতুল বেশ স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়। আমি মলিন কন্ঠে বলি,“আপনি যদি আমাকে ভালোই বাসেন তবে ভাবীর সঙ্গে কি? তার প্রতি এভাবে দূর্বল কেন হলেন? আমার প্রতি ভালোবাসা, আকর্ষণ বুঝি এতই ঠুনকো?”
”তুমি আবার এখন শুরু করো না তো।”
এটা বলে রাতুল আমাকে বুক থেকে সরিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে যায়। আমি তখন অনেক শান্ত গলায় বুঝায়। লাভ হয় না। রাতুল বা ভাবী কেউ শুধরায় না। দু’জনের ঘনিষ্ঠতা দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছিলো। আমি আর নিতে পারছিলাম না। বেশ কয়েকবার রাতুলের সঙ্গে তর্কে জড়াই। এরই মাঝে জানতে পারি আমি গর্ভবতী। এই বাচ্চার দোহাই দিয়ে তাকে এসব বন্ধ করতে বলি। শুনে তো নাই। বরং এরপর সে যা করে তার জন্য মোটেও আমি প্রস্তুত ছিলাম না৷ সে সরাসরি একদিন আমাকে প্রশ্ন করে,”এই বাচ্চা কার? তুই আমার অগোচরে কার সঙ্গে মেলামেশা করেছিস?”
“রাতুল!”
আমি তার মুখে এই কথা শুনে পুরো হতভম্ব হয়ে যাই। কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না। তবে রাতুল তার মুখ বন্ধ করে না। উল্টো সেদিন আমার গায়ে প্রচন্ডরকম হাত ধরে। প্রতিবেশীরা ঝগড়া শুনে আসলে তাদের সামনে অবধি আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের সামনে আমাকে কলঙ্কিনী প্রমাণ করে দেয়। অথচ এই আমি এতদিন চার দেওয়ালের মাঝে আমাদের অজস্রবার ঝগড়া হওয়ার পরও যখন প্রতিবেশী আসতো চুপ করে যেতাম। তারা ঝগড়ার কারণ জানতে চাইলে বলতাম। কি লাভ? ঘরের কথা পরকে বলে? দিনশেষে এই স্বামীর সঙ্গেই তো সংসার করতে হবে। সে চরিত্রহীন সারা দুনিয়া জানলে যে আমারই লজ্জা। কিন্তু সে এক মূহুর্তে আমাকে চরিত্রহীনা বানিয়ে দিলো। মূহুর্তেই আমি কলঙ্কিনী হয়ে গেলাম। শুধু তাই নয়, এরপর….
’
’
চলবে,
