তৃষা
বাবুরাম মন্ডল
সর্ব*নাশ! এটা তো সেই মেয়ে, যাকে কদিন আগে দেখতে গেছিলাম! অতিরিক্ত বড়লোক আর অসামান্য রূপের কারণে বাতিল করেছি।
হাভাতে ঘরের ছেলে আমি। ঘটক ভুল করে নিয়ে গেছিল। বাপরে বাপ জোর বাঁচা বেঁচেছি!
কিন্তু মেয়েটা এত সকালে যাচ্ছে কোথায়! কেমন যেন অবিন্যস্ত দেখাচ্ছে ওকে! অস্বাভাবিক লাগছে!
বেছে বেছে ট্রেনের এমন জায়গায় এসে বসেছি একেবারে মেয়েটির মুখোমুখি। এই মুহূর্তে উঠে না গেলে চোখা-চোখি হবেই। সেটা হবে ভারি লজ্জার।
মেয়েটি মাথা নিচু করে বসে। কিছু যেন গভীরভাবে ভাবছে। কোন স্টেশন আসছে খেয়াল করছে না। আশেপাশে যারা বসে তাদের দেখছে না। হাতে ব্যাগ নেই। সঙ্গে কেউ আছে কিনা সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।
হঠাৎ মনে হল নিশ্চিত পালাচ্ছে। বাড়ি থেকে কিছু না নিয়ে গোপনে বেরিয়ে এসেছে। রাতে ঘাপটি মেরে ছিল কোথাও। এখন ট্রেন ধরে যাচ্ছে। আশেপাশেই কোথাও ওর বয়ফ্রেন্ড আছে।
বারে বারে আমার চোখটা চলে যাচ্ছে ওর নিচু হয়ে থাকা মুখটার দিকে। এত সুন্দর মেয়ে আগে দেখিনি। সত্যিই দেখিনি! আশেপাশে অনেকেই ওকে দেখছে। দেখতে বাধ্য হচ্ছে।
এটা হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস। সব জায়গায় দাঁড়ায় না। কৃষ্ণনগর পার হয়ে ধুবুলিয়া ক্রস করতে হঠাৎ মনে হল কেলেঙ্কারি করেছে! আমার নামার কথা তো কৃষ্ণনগর! আমি যাচ্ছি কোথায়! এরপর সেই বেথুয়া! হয়ে গেল! আজকের মত অফিস নট।
বেথুয়া স্টেশন ঢোকার আগে হঠাৎ মেয়েটি চোখ তুলে চাইল। ওর নাম তৃষা। তখন জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম।
ও আমাকে দেখতে পেয়ে একেবারেই খুশি হলো না। আরো মন মরা হয়ে গেল। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
যেদিন দেখতে গেছিলাম সেদিন তো এমন ছিল না! কি সুন্দর হাসছিল। কটকট করে কথা বলছিল। একেবারে ছোট বাচ্চাদের মত।
তবে কি ওর জীবনে কোন ঝড় বয়ে গেছে! অথবা যার সঙ্গে পালাচ্ছে সে এসেছে কিনা নিশ্চিত নয়!
এসব ভেবে একটু কথা বলার লোভ হল। এটা আমার স্বভাব দোষ। বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারি না। পরিচিত লোক দেখলে তো নয়ই। সে কারণেই বাবা বলে ঠোঁট কাঁটা।
ধেততেরিকা! নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠলাম। কি বলতে কি বলবো ঠিক নেই! যদি উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেলি! থাক বাবা!
মেয়েটি এবার নড়েচড়ে বসলো। একটা হাই তুলল। তারপর আবার যেমনটি মনমরা হয়ে বসেছিল তেমনি উদাসী হয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আমাকে দেখেও দেখলো না। বাবুরাম_মন্ডল
ইট ইজ অপমান। আমি আগেই জানতাম এই মেয়ে আমার মতো করলাকে পছন্দ করবে না। এখন সেটা প্রমাণ হলো। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। বাপরে বাপ!
আর কিছুটা যাবার পর বোঝা গেল ওর সঙ্গে কেউ নেই। নইলে এতক্ষণ কথা বলতে আসতো। অথবা আমায় দেখে লজ্জায় উঠে যেত।
মেয়েটি এসে নামলো মুর্শিদাবাদ স্টেশনে। পিছে পিছে বাধ্য হয়ে আমিও নামলাম।
একে একে সমস্ত লোক স্টেশন ফাঁকা করে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তৃষা গেল না। একভাবে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। রোদের মধ্যে।
কি করব! আমিও দাঁড়িয়ে আছি। একটু দূরে। লক্ষ্য রাখছি। নিশ্চিত কিছু সমস্যা আছে বোঝাই যাচ্ছে। সঙ্গে কেউ নেই। ইভেন ব্যাগ পর্যন্ত না। সম্ভবত মোবাইলও নেই। নইলে এতটা পথ আসলো, একবারের জন্য হলেও বের করত।
হঠাৎ দেখি ধীরে ধীরে আমার দিকে আসছে। অত্যন্ত ক্লান্ত লাগছে ওকে। মনে হয় কাল সারা রাত ঘুমায়নি। খুব বিধ্বস্ত।
এভাবে একটা মেয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল গার্জিয়ান জানেনা! আশ্চর্য! কি কোয়ালিটির বাপ মা!
তৃষা মাথা নিচু করে এসে দাঁড়ালো আমার একেবারে কাছে। মনে হলো চোখে জল। গাল দুটো লাল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মাথা নিচু করেই বলল—
চলবে,,
