#অনুপমা
#শেষ_পর্ব
#মৃদুলা_রহমান
হাসপাতালের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম—বেঁচে থাকাটাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মৃত্যু অন্তত প্রশ্ন করে না, আর জীবন প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। উত্তর না দিলে অপরাধী বানিয়ে দেয়, উত্তর দিলেও বিশ্বাস করে না। মেয়ে তো! কোনঠাসা করলেই বা কে প্রতিবাদ করে?
আমার চোখ খুলতেই সাদা আলোয় ঝলসে উঠলো দৃষ্টি। কানে আসছিলো মনিটরের একটানা শব্দ। মনে হচ্ছিলো, আমি কোনো যন্ত্রের অংশ হয়ে গেছি—মানুষ নই। তাছাড়া এরকম শূন্য অনুভূতি নিয়ে যারা থাকে তাদের মানুষ বলেও না।
পাশে বসে থাকা আম্মার কাঁপা হাতটা আমার আঙুলের উপর এসে পড়তেই আমি বুঝলাম, আমি এখনো আছি। অথচ এই থাকা আমার নিজের কাছেই অপরাধের মতো লাগছিলো। কারণ আমি বেঁচে আছি মানেই লোকের চোখে আমি আবারো বিচারযোগ্য, আবারো সন্দেহভাজন, আবারো দোষী। আম্মা ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। কিছু বলছিলেন না, শুধু আমার কপালে হাত রেখে থাকছিলেন। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম, কারণ মায়ের চোখে তাকালে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না। আমার বেঁচে থাকা যেনো তাঁর কষ্টের নতুন অধ্যায়।
আচ্ছা, এই সমাজ পরিবার কি চায় একটা মেয়ের থেকে?
সেদিন যদি চাচির কথায় আম্মা রাজী হতো তাহলে সমস্যা হতো না। সমস্যা হয়েছে “না” বলায়। এ সমাজ কেনো মেয়েদের কোনঠাসা করে রাখে? কি স্বার্থ? তিল পরিমাণ সত্য না হওয়া একটা কথা এভাবে ছড়িয়ে গেলো, অথচ আমার আপনজনও প্রতিবাদ করলো না। আমি নাহয় বাহিরে চলি। কিন্তু আমার মা? ঘরকুনো এই মহিলা কেনো ছাড় পেলো না এসব নোংরামো থেকে? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর? তথাকথিত সমাজ? কিন্তু তারা তো অন্ধ, নির্বিকার। তাদের আবার এতসব দায় নেই। ওসব দায় দায়িত্ব, জবাবদিহিতা বাপজান থাকলে হয়তো তার উপর বর্তাতো। ডাক্তারের আসবে শুনে ধ্যান ভাঙলো আমার।
ডাক্তার এসে জানালেন আমি শারীরিকভাবে স্থিতিশীল, মানসিকভাবে দুর্বল। এই ‘দুর্বল’ শব্দটা শুনে আমার হাসি পেলো। সমাজ যে মানুষটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়, তাকেই আবার দুর্বল বলে দোষ চাপিয়ে দেয়—যেনো ভাঙার দায় সমাজের নয়, ভাঙার দায় ভাঙা মানুষের।
দুই দিন পর বাড়ি ফিরলাম। সেই বাড়ি, যেখানে দেয়ালগুলোও আমাকে সন্দেহ করে তাকায়। দরজার খিলটাও যেনো আমাকে প্রবেশাধিকার দিতে চায় না। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম। মুখটা আগের মতোই আছে, কিন্তু চোখের ভেতরের মেয়েটা বদলে গেছে।
সন্ধ্যায় আসমা আপা এসে চুপচাপ অনেকক্ষণ বসে ছিলো। তারপর বললো, “অনু, তুই যদি এখানেই থাকিস, একদিন তুই বেঁচে থেকেও মরবি।” আমি কোনো উত্তর দেইনি, কারণ কথাটা মিথ্যে ছিলো না। আসমা আপা ভালো না বাসলেও মিথ্যা বলবে না।
রাতে আম্মার পাশে শুয়ে আমি প্রথমবার নিজের ভবিষ্যৎটা কল্পনা করলাম। সেখানে কোনো স্বামী নেই, কোনো শ্বশুরবাড়ি নেই, কোনো সামাজিক স্বীকৃতির সার্টিফিকেট নেই। আছে শুধু আমি আর আমার লড়াই।
পরদিন কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপালের সামনে দাঁড়ালাম। স্থির গলায় বললাম—আমি পড়াশোনা শেষ করতে চাই। উনি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, এই মেয়েটা তো ভেঙে পড়ার কথা ছিলো। অন্য ক্যাম্পাসে ট্রান্সফার করলো আমাকে। আমি কাগজপত্র গুছিয়ে নিলাম, এক বান্ধবীর সাহায্য টিউশন যোগাড় করলাম। রাতে আম্মাকে বললাম, আমরা ঢাকায় চলে যাবো।
আম্মা ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভয়ের ভেতরেও একটা ভরসা ছিলো। কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে এখানে বাঁচা দায়।।
ঢাকা আমাদের নতুন শহর হলো—নতুন ভয়, নতুন সাহস, নতুন দায়িত্ব নিয়ে। আমরা ছোট একটা বাসায় উঠলাম। খুঁজে খুঁজে কিছু পুরনো ফার্নিচার কিনলাম। বাসার দেয়ালে রঙ ছিলো না, কিন্তু বাতাসে অপমান ছিলো না। মানুষ আমাদের চরিত্র জানতো না, জানার আগ্রহও দেখাতো না।
আমি ছোট্ট একটি কিন্ডারগার্টেনে চাকরি পেলাম। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে বাচ্চাগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো—এই চোখগুলো আমাকে বিচার করছে না, এই চোখগুলো আমাকে মানুষ হিসেবে দেখছে।
মাসের শেষে বেতন পেয়ে আম্মার হাতে টাকা তুলে দিতেই তিনি কাঁদলেন। আমি জানালার বাইরে তাকালাম। শহরের আলো তখন আমার ভেতরের অন্ধকারের সাথে লড়াই করছিলো।
ধীরে ধীরে আমি বুঝতে শিখলাম—সুখ মানে নিখুঁত সংসার নয়, সুখ মানে সম্মান নিয়ে শ্বাস নেওয়া।
মাঝেমধ্যে পুরনো জীবনের মানুষগুলো ফোন করতো। কেউ সহানুভূতি দেখাতো, কেউ কৌতূহল, কেউ আবার গোপনে জিজ্ঞেস করতো আমি আবার বিয়ে করবো কি না। আমি তখন শুধু হেসে বলতাম, “আমি এখন নিজের সাথে সংসার করছি।”
রাতের বেলা অনেক সময় ঘুম আসতো না। তখন মনে হতো, আমি কি সত্যিই ঠিক পথে আছি? তারপর মায়ের ঘুমন্ত স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতাম—হ্যাঁ, এই পথটাই ঠিক।
একদিন খবর পেলাম, আমার প্রাক্তন স্বামী আবার বিয়ে করেছে। লোকজন বললো, তার বউ খুব সুন্দর, খুব মানানসই। আমি মাথা নাড়লাম। মানানসই শব্দটার মানে আমি এখন জানি। মানানসই মানে চুপ থাকা, মানানসই মানে প্রশ্ন না করা, মানানসই মানে নিজের রঙ বদলে অন্যের রুচিতে ঢুকে পড়া। আমি আর মানানসই হতে চাই না। আমি নিজের মতো থাকতে চাই।
একদিন কলেজ থেকে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। আম্মার চোখে জল, আমার চোখে আলো। আমরা কেউ কিছু বললাম না। কারণ কিছু অনুভূতির ভাষা লাগে না—শুধু উষ্ণ অনুভুতির উপস্থিতি লাগে।
সেদিন রাতে আমি ডায়েরিতে লিখলাম—
“অনুপমা, আজ থেকে তুই কারো বোঝা না। তুই নিজের ভাঙাচোরা জীবনের একমাত্র লেখক।”
সমাজ আমাকে যে নামে ডাকতে চেয়েছিলো, আমি সে নামগুলো ছিড়ে ফেললাম—চরিত্রহীন, দুর্ভাগা, তালাকপ্রাপ্ত। এই শব্দগুলো আমার পরিচয় না। আমার পরিচয় আমি নিজে।
আজ আমি জানি—আমার গল্পটা শুরু হয়নি বিয়েতে, শেষ হয়নি ডিভোর্সে। আমার গল্পটা শুরু হয়েছে সেই দিনে, যেদিন আমি নিজেকে ক্ষমা করেছি। যেদিন আমি নিজের পাশে দাঁড়িয়েছি। যেদিন আমি সমাজের চোখের বদলে নিজের চোখে তাকাতে শিখেছি।
আমি অনুপমা।আমি পরিত্যক্ত নই। আমি ব্যর্থ নই।
আমি অপমানের নই।
আমি লড়াইয়ের নাম। আমি বেঁচে থাকার নাম। আমার দুঃখিনী মায়ের স্বপ্নের নাম আমি।
আমিই অনুপমা।
আমি ভাঙা সংসারের নয়—
আমি গড়ে তোলা নিজের জীবনের নাম।
সমাপ্ত
