Saturday, June 6, 2026







বসন্তের ঝরা ফুল পর্ব-২৫

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৫
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★

শিউলির মৃ”ত্যুর সংবাদটি মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। একদল মানুষ যখন মেয়েটার এই অকাল মৃ”ত্যুতে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, অন্যদল তখন বিষাক্ত কণ্ঠে বলে বেড়াচ্ছে,
“এসব খারাপ মেয়ে বেঁ”চে না থাকাই ভালো আপদ বিদায় হয়েছে।”

​মা”রা গিয়েও শিউলি সমাজপ্রদত্ত কলঙ্কের তিলক-টা মুছতে পারল না। কথিত আছে, মানুষের মৃ”ত্যুর পর আর কোনো শত্রুতা থাকে না, মৃ”ত লা”শের প্রতি কারও কোনো দাবি থাকে না। তবে কেন শিউলির বেলায় এই চিরন্তন সত্যটি মিথ্যে হয়ে গেল? কেন এখনও তার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে ঘৃণার বাণ? শুধু কি সে মেয়ে বলে? নাকি তার শরীরে জোরপূর্বক কলঙ্ক লেপে দেওয়া হয়েছিল বলে? হয়তো তাই! এই সমাজ মৃ”ত মানুষের চেয়ে তার গায়ে মাখা দাগগুলো নিয়ে বেশি চর্চা করতে ভালোবাসে।

​থানা থেকে পুলিশ এসেছে। আশেপাশে কয়েক গ্রামের শত শত কৌতুহলী মানুষ শিউলিদের বাড়িতে ভিড় জমিয়েছে। মানুষের চিরকালই অন্যের বিপর্যয় দেখার প্রতি এক অদ্ভুত আগ্রহ থাকে, আর আজ সেই আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এই ভিড়ে। পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে লা”শটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।
​শিমুলদের উঠানে এখনও শিউলির নিথর দে”হটি একটি সাধারণ চাদরে ঢাকা পড়ে আছে।

​শিমুল যে বারান্দায় বসে ছিল, সেখানেই পাথরের মতো স্থবির হয়ে আছে। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ মাটির দিকে। চোখের জল শুকিয়ে এখন কেবল সেখানে রক্তিম এক শূন্যতা। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন শিউলির শেষ নিঃশ্বাসের সাথে মিলিয়ে গেছে। তার আর ডুকরে কাঁদার মতো সামর্থ্যটুকুও অবশিষ্ট নেই।
​শিমুলের চোখের পর্দায় কেবল শিউলির সেই মায়াবী হাসিমাখা মুখটা ভাসছে। যে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অনায়াসেই একটা জীবন পার করে দেওয়া যেত, সেই প্রাণভোমরা আজ চিরতরে অচিন রাজ্যে উড়াল দিয়েছে। শিমুল এখনো মনে মনে এক অসম্ভব প্রার্থনা করে চলেছে যদি একবার, আর একটিবার শিউলি ফিরে এসে ‘শিমুল ভাই’ বলে ডাক দিত! কিন্তু নীরবতা ছাড়া আর কোনো উত্তর ফিরছে না।

​ভেতর বাড়িতে জাবেদা বেগম মেয়ের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। ক্ষণিকের জন্য চেতনা ফিরলেও বাস্তবতাকে সইতে না পেরে আবারও তিনি অন্ধকারের কোলে ঢলে পড়ছেন। আর ইদ্রিস খন্দকার? তিনি যেন নিজের হাতে গড়া ধ্বংসস্তূপের সামনে এক জ্যান্ত লাশ হয়ে বসে আছেন। অপরাধবোধের তীক্ষ্ণ দহন তাকে তিল তিল করে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আছিয়া বেগম বারবার ছেলেকে জড়িয়ে ধরছেন, কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই আজ শিমুলের কানে পৌঁছাচ্ছে না।

​পুলিশ যখন শিউলির লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিল, তখন শিমুলের ভেতরে সুপ্ত থাকা আগ্নেয়গিরিটা হঠাৎ ফেটে পড়ল। সে পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে শিউলির নিথর দেহটা আবারও বুকে জাপ্টে ধরল। শিমুল হাউমাউ করে এক পৈশাচিক যন্ত্রণায় কেঁদে উঠল। কোনো পুরুষ মানুষের পক্ষে যে এতটা নিঃস্ব হয়ে কাঁদা সম্ভব, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

​পুলিশেরা তাকে সরিয়ে নিতে চাইলে সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“না! আমার শিউলিকে আমি নিয়া যাইতে দিব না! আমার ফুলটার শরীরটা ওরা নিয়া গিয়া কাটাছেঁড়া করবো? আমি ওর ওই ক্ষতবিক্ষত দেহ কেমন কইরা দেখমু? আপনারা সবাই চইলা যান। আমার শিউলি কোথাও যাইবে না। আমি সারাজীবন ওকে এভাবেই বুকের ভেতরে আগলাই রাখমু!”

​দুইজন পুলিশ মিলেও শিমুলকে শিউলির কাছ থেকে আলাদা করতে পারল না। শেষমেশ আরও কয়েকজন লোক মিলে এক প্রকার জোর করে শিমুলকে টেনে সরিয়ে নিল। শিউলির নিথর দে’হটা যখন গাড়িতে তোলা হলো, শিমুলের সেই গগনবিদারী হাহাকার গ্রামের আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলল। সে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখল, তার স্বপ্নের পৃথিবীটা ধুলো উড়িয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।

তামিমের দম্ভ আজ মাটির সাথে মিশে গেছে। যেখানটাতে সে আছড়ে পড়েছিল, সেখানেই সে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি একবার শিউলির নিথর দে”হের দিকে যাচ্ছে, তো পরক্ষণেই শিমুলের বুকফাটা হাহাকারের দিকে। তামিমের মস্তিষ্কে এখন একটাই সত্য হাতুড়ির মতো আঘাত করছে “আমি শিমুলের মতো করে শিউলিকে এক শতাংশও ভালোবাসতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম শিউলিকে জোর করে দখল করতে, আর শিমুল চেয়েছিল তাকে ভালোবেসে আগলে রাখতে।”

​তামিমের দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে। যে মানুষটা কোনোদিন অনুশোচনা শব্দটার সাথে পরিচিত ছিল না, আজ সে নিজেই নিজেকে বলছে,
“আজ শিউলির এই অকাল মৃত্যুর জন্য একমাত্র আমিই দায়ী।”

​শিউলির লা”শটা এখন থানার মর্গের হিমঘরে। সারাটি দিন বিষাদের চাদরে ঢাকা পড়ে পার হয়ে গেল, কিন্তু লাশের ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়ায় শিউলিকে এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। কাটাছেঁড়া আর আইনি জটিলতায় অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে।
​রাত এখন গভীর। রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত কৌতুহলী মানুষের আনাগোনা থাকলেও, এখন যে যার মতো নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে গেছে। থানা থেকে খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে শিউলির লাশ আজ আর আসবে না, সবকিছু প্রক্রিয়া শেষে আগামীকাল সকালে গ্রামে পৌঁছাবে।
★★★
সকাল হতেই শিউলির নিথর দে”হটা গ্রামে নিয়ে আসা হলো। রোদের তেজ বাড়ার আগেই দাফন সম্পন্ন করতে হবে, নতুবা এই নশ্বর দেহ পচতে শুরু করবে। সময়ের কী অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা! যে মেয়েটিকে চব্বিশ ঘণ্টা আগেও সবাই নাম ধরে, পরম আদরে ‘শিউলি’ বলে ডাকত, আজ সেই মানুষটিই সবার কাছে কেবল একটি ‘লা”শ’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। মানুষের অস্তিত্ব কত দ্রুত একটি বিশেষ্য থেকে বস্তুতে পরিণত হয়!

​শিউলির জানাজার আয়োজন করা হলো খুব সংক্ষেপে, দায়সারাভাবে। এই সমাজের এক অঘোষিত নিয়ম আত্মহত্যাকারী লাশের জানাজায় মানুষ সহজে শরিক হতে চায় না। গ্রামের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে শিউলির ঠাঁই হলো না, কারণ ‘পাপী’ মানুষের সেখানে দাফন হওয়া নাকি অনুচিত। তাই শিউলিদের বাড়ির পেছনেই নিরিবিলি এক কোণে তার শেষ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে।
চারপাশ থেকে গুটিকয়েক মানুষ এসেছে জানাজায় অংশ নিতে, তাদের চোখেমুখে শোকের চেয়ে অনীহা আর কৌতূহলই বেশি।

​জানাজা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, যখন এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল, তখন তামিম সবার সামনে এসে দাঁড়াল। আজ তার কণ্ঠে কোনো দম্ভ নেই, চোখেমুখে কোনো দস্যিপনা নেই। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“আমার একটা সত্য সবার সামনে প্রকাশ করার আছে।”

​উপস্থিত জনতা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তামিম এবার বুকফাটা এক হাহাকার নিয়ে বলল, “শিউলির এই মৃত্যুর জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। সেই রাতে শিউলির গায়ে কোনো কলঙ্ক লাগেনি। সবকিছু ছিল আমার সাজানো এক জঘন্য নাটক, যাতে ওকে অপবাদ দিয়ে আমি জোর করে বিয়ে করতে পারি। শিউলি নিষ্কলঙ্ক ছিল, শিউলি একটা পবিত্র ফুল। আমি নিজের হাতে সেই ফুলটাকে পিষে মেরেছি।”

​তামিমের এই স্বীকারোক্তি বজ্রপাতের মতো সবার কানে বাজল। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো। কেউ অবাক হলো, আবার কেউ ভাবল মেয়েটা ম”রে গেছে বলেই হয়তো তামিম মায়ায় পড়ে এসব মনগড়া কথা বলছে। সমাজের কাছে শিউলির পবিত্রতার চেয়ে তার গায়ে লেপে দেওয়া কলঙ্কটাই তখন বেশি বিশ্বাসযোগ্য ছিল।

এরই মাঝে দিলওয়ারা বেগম বুক চাপড়ে বলতে লাগলেন, “শিউলি মা কখনো কোনো পাপ করে নাই গো! তামিম পোলাডা চক্রান্ত করছিল আর আমি শয়তানের প্ররোচনায় তারে সাহায্য করছিলাম। বিশ্বাস করেন, শিউলি পবিত্র ছিল, তার সাথে কোনো খারাপ কাজ হয় নাই।”
দিলওয়ারা বেগমের সেই অকপট স্বীকারোক্তি যেন তপ্ত বালুর ওপর এক পশলা বৃষ্টির মতো পড়ল, কিন্তু সেই বৃষ্টিতে আর প্রাণ ফেরার উপায় ছিল না। শিউলিকে রক্ষা করার সময়টুকু অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে।

​মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা এক পাথুরে নিস্তব্ধতায় জমে গেল। উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে এবার লজ্জার কালশিটে পড়ে গেল। সেদিন রাতের সেই বীভৎস স্মৃতি সবার মনের আয়নায় ভেসে উঠল কেমন করে তারা কোনো বাছবিচার না করে, অন্যের কথায় কান দিয়ে এক নিষ্পাপ মেয়েকে কলঙ্কিত করেছিল, কেমন করে তাকে সমাজের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে দিয়েছিল।

​শিউলিকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে এই খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসের গতির চেয়েও দ্রুতবেগে তা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পৌঁছাল। যে মহিলারা কিছুক্ষণ আগেও নাক ছিটকে শিউলিকে অভিশাপ দিচ্ছিল, তারাই এখন শিউলির পবিত্রতার গল্প শুনে ডুকরে কেঁদে উঠল। অপরাধবোধে মাথা নুইয়ে এল পুরো গ্রামবাসীর। উন্মত্ত জনতা যখন তামিমকে আক্রমণ করতে উদ্ধত হলো, পুলিশ তখন বাধা দিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে থানার দিকে রওনা দিল।

​শিমুল তখনো শিউলির শিয়রে স্থির হয়ে বসে। তার ঠোঁটের কোণে এক বিধ্বংসী তাচ্ছিল্যের হাসি। সে শিউলির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “শুনলি শিউলি? তোর শরীর থাইকা সব দাগ মুছে গেছে রে। এবার তো তুই খুশি, তাই না? অনেক তো নাটক করলি, এবার অন্তত চোখ মেলে তাকা!”

​শিমুলের ভেতরে তখনো এক অদ্ভুত বিশ্বাস কাজ করছে হয়তো এই ডাকলেই শিউলি ঘুম থেকে জেগে উঠবে। সে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“কী হলো? কথা বলিস না কেন? তোর শিমুল ভাইয়ের যে বুক ফেটে যাইতাছে, সেটা কি তুই বুঝোস না? সবকিছু বুঝেও কেন এমন করোস?”
শিমুলের এই পাগলামি দেখে উপস্থিত সবার চোখের কোণ ভিজে উঠল।

​ফুলঝুরি, ছোট্ট সেই মেয়েটি, কাল থেকে বোনের শোকে পাথর হয়ে আছে। তার কান্না কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। পাশের বাড়ির এক মহিলা তাকে সান্ত্বনা দিতে এলে সে তেজস্বী হয়ে সবাইকে সরিয়ে দিল। সে তার ছোট্ট আঙুল উঁচিয়ে উপস্থিত সব নারীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, “খবরদার, আমায় ধরবেন না! আপনারা সবাই খারাপ। আমার আপাকে আপনারা সবাই মিলে কাঁদিয়েছেন। আমার আপা আপনাদের জন্য অনেক কেঁদেছে, আমি জানি!”

​ছোট্ট একটি শিশুর সেই সত্য উচ্চারণে সবাই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। শিউলির জানাজা শুরু হওয়ার কথা ছিল কয়েকজনকে নিয়ে, কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পুরো গ্রাম তো বটেই, পাশের কয়েক গ্রামের শত শত মানুষ এসে ভিড় জমাল।

সকাল ঠিক দশটা ত্রিশ মিনিট। যে সময়টাতে রোদ কড়া হতে শুরু করে, ঠিক তখনই শিউলিকে কবরের অন্ধকার কুঠুরিতে শুইয়ে দেওয়া হলো। শিমুল তখন উন্মাদের মতো চিৎকার করছে, তার গগনবিদারী আর্তনাদে বাতাসের বুক ফেটে যাচ্ছে। সে কোনোভাবেই তার শিউলিকে এই মাটির তলায় হারিয়ে যেতে দেবে না। অনেকগুলো জোয়ান ছেলে তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে, কিন্তু শিমুলের ভেতরের হাহাকার যেন কোনো শিকল দিয়েই মানা যাচ্ছে না।

​শিউলির সেই ছিপছিপে ফর্সা শরীরটা আজ নিস্তেজ, ফ্যাকাসে। ময়নাতদন্তের নিষ্ঠুর কাটাছেঁড়ায় তার পবিত্র শরীরটা আজ ক্ষতবিক্ষত। সেই বিধ্বস্ত দেহখানি সাদা কাফনে জড়িয়ে সাড়ে তিন হাত মাটির গর্তে নামিয়ে দেওয়া হলো। আজ কেবল শিউলিকে দাফন করা হচ্ছে না, দাফন করা হচ্ছে এক পবিত্র ভালোবাসার স্বপ্নকে। দাফন করা হচ্ছে শিমুলের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকু। যখন কবরের ওপর প্রথম কোদালের মাটি গিয়ে পড়ল, শিমুল তখন বুক চিরে চিৎকার করে উঠল,
​“ আমার ফুলরে মাটি দিয়েন না! ও বড় কষ্ট পাবে। এমনিতেই আমার ফুলটা দুনিয়ার মানুষের যন্ত্রণায় শেষ হয়ে গেছে, এবার ওকে একটু শান্তিতে থাকতে দেন! দরকার হলে আমারে কবর দেন, শিউলির সাথে আমারেও মাটি চাপা দিয়া দেন!”

​কিন্তু নিয়তির লিখন বড় অমোঘ, শিমুলের সেই আকুতি কেউ রাখল না। একসময় সে সবার বাঁধন ছিঁড়ে দৌড়ে গিয়ে শিউলির টাটকা কবরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাতে কাঁচা মাটি আঁকড়ে ধরে সে কবরের ওপর মুখ রেখে বলতে লাগল,
​“শিউলি, ও শিউলি! কই গেলি আমারে রাইখ্যা? ক্যান আমারে ভালোবাসা শিখাইলি? আমি যখন বোকা আছিলাম, যখন কিছু বুঝতাম না, তখনই তো ভালা ছিলাম! তুই আইসা আমারে সুখ কি, ভালোবাসা কি সব শিখাইলি। কিন্তু তুই তো শিখাইয়া গেলি না রে, কেমন কইরা তোরে ছাড়া আমি বাঁচব? ক্যান সেই বিদ্যা শিখাইলি না?তোরে সাদা জামাতে দেখতে পছন্দ করতাম বইলা তুই সারাজীবনে জন্য সাদা কাফন পইরা কেমনে গেলি তোর বুক কাঁপলো না?”

​পুরো গ্রামের মানুষ স্তব্ধ হয়ে শিমুলের এই নিঃস্ব রূপ দেখছিল। তাকে সেখান থেকে সরানোর সাধ্য কারো ছিল না। একপর্যায়ে শিমুল আকাশের দিকে দুই হাত তুলে গগন কাঁপানো এক আর্তনাদ করল, “আল্লাহ! আমারে মরণ দাও মাবুদ! আমি আর সইতে পারছি না, আমি আমার শিউলির কাছে যেতে চাই!”

কান্নার শব্দে আকাশ ভারী হয়ে উঠছে, হাজার হাজার মানুষের পদভারে ধুলো উড়ছে শিউলিদের উঠানে। কিন্তু এই আড়ম্বরে এখন কার কী লাভ? যে শিউলি নামক ফুলটি অভিমানে একবার বৃন্তচ্যুত হয়ে ধুলোয় মিশে গেছে, সহস্র মানুষের চোখের জল কি তাকে আবার জ্যান্ত করে ফেরাতে পারবে? কক্ষনো না।
​এই যে আজ অনুশোচনার জোয়ার উঠেছে, এ বড় ক্ষণস্থায়ী। আজ যারা ডুকরে কাঁদছে, দুই দিন পরেই তারা শিউলিকে ভুলে যাবে।কিন্তু সেই পৃরেমিক পুরুষ শিমুল কি তা ভুলতে পারবে? নিজেদের দৈনন্দিন ব্যস্ততায় বুক থেকে ঝেড়ে ফেলবে এই বিষাদ। চায়ের কাপে হয়তো দু-এক দিন এই গল্পের দুঃখপ্রকাশ করবে, তারপর শিউলি হয়ে যাবে এক পুরনো উপাখ্যান। কিন্তু সেই মেয়েটার কী হবে? যে তার পুরোটা জীবন, তার প্রতিটি পলকের সুখ বিসর্জন দিয়ে আজ নিথর হয়ে গেল? যে তার হাজারো রঙিন স্বপ্নকে ডানা মেলার আগেই গলা টিপে হত্যা করল? আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া যে মহাপাপ, তা হয়তো সে জানত তবুও কেন সেই যন্ত্রণার পথটাই তাকে বেছে নিতে হলো? এই প্রশ্নের দায় কি আমাদের সমাজের নয়?

​আমরা কবে মানুষ হবো? কবে আমরা অন্যের শেখানো মিথ্যে গীবত বিশ্বাস করার আগে নিজের বিবেককে একবার প্রশ্ন করতে শিখবো?
আমাদের তথাকথিত ‘সম্মান’ আর ‘আভিজাত্যের’ বলি হতে আর কত শিউলিকে এমন অকালে ঝরে যেতে হবে? আমরা মৃত মানুষের কফিনে ফুল দিতে জানি, কিন্তু জীবন্ত মানুষের চোখের জল মুছতে জানি না। আমরা লাশের বিচার করতে জানি, কিন্তু বেঁচে থাকা স্বপ্নের কদর করতে জানি না।
সমাজ নামক এই নিষ্ঠুর যন্ত্রটা পবিত্র আত্মাদের পিষে মারতে অভ্যস্ত। আজ হাজার হাজার মানুষের জানাজা প্রমাণ করে দেয় যে, মানুষ সত্যকে তখনই সম্মান দেয় যখন তা মৃতদেহে পরিণত হয়। এই ভণ্ডামির শেষ কোথায়? শিউলি চলে গেছে একরাশ অবজ্ঞা আর ঘৃণা নিয়ে, আমরা আজও মানুষ হতে পারলাম না, কেবল মাংসপিণ্ডের এক পৈশাচিক সমাজ হয়েই রয়ে গেলাম।

#চলবে…

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ