Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"বসন্তের ঝরা ফুলবসন্তের ঝরা ফুল পর্ব-২৩+২৪

বসন্তের ঝরা ফুল পর্ব-২৩+২৪

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৩
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
(অনেক বড় একটা পর্ব তাই কোথাও ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)

সকাল হতেই মেম্বার বাড়িতে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির আঙিনা জুড়ে এখন উৎসবের ধুম। আত্মীয়-স্বজন আর কাছের মেহমানদের পদচারণায় চারপাশ মুখরিত। গ্রামের মানুষও দলে দলে আসছে এই মহা-আয়োজনে। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যারা মাত্র দুদিন আগেও মেম্বারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা আর গালিগালাজ করছিল, তারাই আজ স্বার্থের টানে কী অবলীলায় মধুর বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে! এটাই বোধহয় মানুষের প্রকৃত ও নিষ্ঠুর রূপ বিপদের দিনে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, উৎসবের আমেজ পেলেই তারা আবার ফায়দা লুটতে ভিড় জমায়।

​সোহাগের পরিবার শিউলির ওপর লেপ্টে দেওয়া সেই কলঙ্কিত অপবাদের কথা জেনেই বিয়েটা নাকচ করে দিয়েছে। সোহাগ তবুও জেদ ধরেছিল, সব বাধা উপেক্ষা করে সে শিউলিকেই জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা-বাবার অনড় অবস্থানের সামনে সেই ভালোবাসার পরাজয় ঘটেছে। তবে তারা রাজি হলেও হয়তো খুব একটা লাভ হতো না, কারণ ইদ্রিস খন্দকারের চোখে এখন ক্ষমতার মোহ।

​পুরো বাড়ি এখন আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে, চারদিকে ফুলের ম ম গন্ধ। কিন্তু এই জাঁকজমকের ঠিক বিপরীতে শিউলি নিজের অন্ধকার ঘরে পাথরের মতো একা বসে আছে। হঠাৎ ছোট বোন ফুলঝুরির ডাকে তার ঘোর কাটল, “আপা…”

​ফুলঝুরির কণ্ঠটা আজ বড় বেশি করুণ আর অসহায় শোনাল। শিউলি ধীরলয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে ছোট বোনটাকে পরম মমতায় টেনে নিজের কোলের ওপর বসাল। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আড়াল করে আদুরে গলায় জানতে চাইল, “কী হয়েছে রে?”

​ফুলঝুরি বোনের বুকে মাথা রেখে ভিজে গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আপা, সত্যিই কি ওই নিষ্ঠুর লোকটার সাথেই তোমার বিয়া হয়ে যাইবে? ওই লোকটাকে আমার একটুও ভালা লাগে না রে আপা!”

ফুলঝুরির সরল মাখানো কথা শুনে শিউলি এক চিলতে ম্লান হাসল। সে শান্ত গলায় বলল,
“বিয়ে হবে না রে… তুই একদম চিন্তা করিস না।”

​শিউলির মুখে এমন কথা শুনে ফুলঝুরি বিস্ময়ভরা চোখে বড় বড় করে তাকাল। অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“বিয়ে হইবো না মানে!”

​শিউলি পরম মমতায় ফুলঝুরির ফোলা ফোলা গাল দুটো টেনে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“না, হবে না। তবে খবরদার! এই কথা যেন ভুলেও কাউকে বলিস না, বুঝলি?”

​বোনের কথায় একরাশ স্বস্তি পেল ফুলঝুরি। খুশিতে ডগমগ হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা, কাউরে কমু না।”
এরপর সে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

​ফুলঝুরি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘরে কয়েকজন মহিলার প্রবেশ ঘটল। তাদের হাতে একটা লালচে হলুদ রঙের শাড়ি। পাশের বাড়ির এক ভাবি শাড়িটা শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে উৎসাহের সাথে বললেন,
“নেও শিউলি, এই শাড়িটা চট করে পরে নাও। এখন তোমারে হলুদ দিয়ে গোসল করাইতে হবে।”

​শিউলির ভেতরটা প্রচণ্ড বিরক্তি আর বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। সে তিক্ত গলায় জবাব দিল,
“কিসের গোসল? আমি নিজের গোসল নিজেই করতে পারি। যেদিন দেহে প্রাণ থাকবে না, হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা থাকবে না সেদিন না হয় এসে তোমরা গোসল দিও।”

​কথাগুলো বলেই শিউলি শাড়িটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিল এবং ধীরপায়ে গোসলখানার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

গ্রামের বাড়িগুলোতে শোবার ঘর থেকে গোসলখানা সাধারণত একটু দূরেই হয়। শিউলিকে উঠান পেরিয়ে সেদিকে যেতে হচ্ছে। হাতে হলুদ শাড়ি নিয়ে শিউলি যখন ধীর পায়ে এগোচ্ছিল, তখন সে অনুভব করল বিষাক্ত কিছু দৃষ্টি তার শরীরকে কুরে কুরে খাচ্ছে। উঠানে ভিড় করা কিছু মানুষের কামুক চোখ তাকে পরখ করছে নির্লজ্জভাবে, যেন তাদের লোলুপ দৃষ্টি দিয়েই শিউলিকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে নিতে চায়। পুরুষত্বের নামে এই কদর্যতা শিউলিকে ভেতর থেকে সংকুচিত করে তুলল।

​সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে, শিউলি মাথার ওড়নাটা টেনে কপাল পর্যন্ত নামিয়ে দিল। নিজের সম্মানটুকু আড়াল করে সে দ্রুত গোসলখানায় ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল।
​বাইরে চারদিকে এত আয়োজন, এত বিশৃঙ্খলা আর এত কলুষতা অথচ এই বদ্ধ দরজার আড়ালে শিউলির মনে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে। এই নরক গুলজার থেকে মুক্তির পথ সে খুঁজে পেয়েছে। আজ গভীর রাতেই শিমুলের হাত ধরে সে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবে। ভাবতেই তার বুকটা এক অজানা সুখে কেঁপে উঠল। এই বিষণ্ন আবহেও শিমুলের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে, নিজেকে পবিত্র করে নিয়ে শিউলি ধীরস্থিরভাবে বেরিয়ে এল।
★★★

গোধূলির আকাশ তখন ম্লান হয়ে দিনের শেষ লগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে গোধূলির আলো-ছায়ার খেলা, অথচ শিউলির মনের ভেতর অস্থিরতার পারদ ততটাই বাড়ছে। সে প্রহর গুনছে রাত নামার, কিন্তু আজকের এই অভিশপ্ত দিনটি যেন শেষ হতেই চাইছে না। কারো জন্য অপেক্ষার প্রহর বুঝি এভাবেই অনন্তকাল হয়ে দেখা দেয়। শিউলির মনে একরাশ আক্ষেপ দানা বাঁধছে,গতকাল রাতেই যদি সে শিমুলের হাত ধরে বেরিয়ে যেত, তবে এতক্ষণে তারা বৈধ পরিণয়ে আবদ্ধ হতে পারত।

​কিন্তু গত রাতে না যাওয়ার পেছনে এক রূঢ় বাস্তবতা ছিল অর্থ। এই কঠিন পৃথিবীতে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতেও তো অর্থের প্রয়োজন। শিউলি জানত, শিমুলের কাছে যে সামান্য টাকা আছে, তা দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে একটু আগেই তার অতি যত্বের মাটির ব্যাংকটি ভেঙেছে। সেখানে জমে থাকা প্রায় পঁচিশ টাকা সে সযত্নে কুড়িয়ে নিয়েছে। এছাড়া বিয়ের জন্য গড়া নিজের কিছু গয়নাও সে সাথে রেখেছে এটাই এখন তার আগামীর সম্বল।

​হঠাৎ বাইরে থেকে তামিমের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে আসতেই শিউলি চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে টাকাগুলো বালিশের নিচে গুঁজে দিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। সে জানত, এই সুযোগ সন্ধানী লোকটা ঠিকই তার ঘরে হানা দেবে। তার আশঙ্কাই সত্যি হলো এক বুক ধৃষ্টতা নিয়ে তামিম ঘরে প্রবেশ করল।

​রুমে ঢুকেই শিউলিকে দেখে তামিম থমকে দাঁড়াল। পরনে হলুদ শাড়ি, সিক্ত কেশ আর ফর্সা শরীরে হলুদের সেই উজ্জ্বলতা শিউলিকে যেন স্বর্গের কোনো অপ্সরীর মতো ফুটিয়ে তুলেছে। তামিমের সেই লোলুপ ও কামুক চাহনি দেখে শিউলির গা ঘিনঘিন করে উঠল। ইচ্ছে করছিল এখনই নখ দিয়ে ওর চোখ দুটো উপড়ে ফেলতে, কিন্তু নিরুপায় শিউলি কেবল ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল।
​তামিম নির্লজ্জের মতো আয়েশ করে বলে উঠল,
“আহা শিউলি! তোমাকে এভাবে দেখলে তো যেকোনো পুরুষই পাগল হয়ে যাবে। এত রূপ আল্লাহ তোমাকে কেন দিল বলো তো?”

“এই রূপই তো আজ আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে!” শিউলি দাঁত চেপে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলল। “যদি রূপ না থাকতো, তবে তোদের মতো নরপশুরা আমার জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার সাহস পেত না।”

​তামিম মোটেও লজ্জিত হলো না, বরং মাথায় হাত বুলিয়ে এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,
“ইসস! জানো শিউলি, শখের নারীর তেজি কথাগুলোও শুনতে মধুর মতো লাগে। কিন্তু দেখো, আমি তোমাকে কত সম্মান দিয়ে ‘তুমি’ বলছি, আর তুমি আমাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করছো? এটা কি ঠিক হচ্ছে? আজ বাদে কালই তো তোমার স্বামী হতে যাচ্ছি, একটু ভালোবেসেও তো ডাকতে পারো, নাকি?”

​শিউলির রাগে-ঘৃণায় শরীর কাঁপছে। তামিম কিছুক্ষণ নীরব থেকে তার অস্থিরতা উপভোগ করল, তারপর আরও একধাপ এগিয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, এক কাজ করলে কেমন হয়? চলো এখনই বিয়েটা সেরে ফেলি! তারপর আজ রাতেই না হয় বাসরটা জাঁকিয়ে করা যাবে।”

​কথাটা শুনে শিউলি আক্ষরিক অর্থেই আঁতকে উঠল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল এখনই বিয়ে মানে তো সব শেষ! শিমুলের সাথে পালানোর সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। শিউলি ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“মানে? এখন… এখন বিয়ে মানে কী?”

​শিউলির চোখেমুখে ফুটে ওঠা সেই চরম আতঙ্ক দেখে তামিম পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠল। সে অট্টহাসি দিয়ে ঘর কাঁপিয়ে বলল,
“আরে এত ভয় পেও না! এখনই বিয়ে করা সম্ভব না, জাস্ট মজা করলাম। তবে চাইলে কিন্তু এখনই কাজী ডাকা যায়। তুমি যদি রাজি থাকো, তবে আমার কোনোই আপত্তি নেই!”

তামিমের কথা শুনে শিউলি যেন এক পশলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। খাঁচায় বন্দি পাখির মতো তার ছটফটে প্রাণটা যেন কোনোমতে প্রাণে বাঁচল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“দয়া করে এখন এখান থেকে যান। অন্তত আজকের দিনটা আমাকে একটু একা থাকতে দিন, অনুরোধ করছি।”
​তামিম বাঁকা হেসে উত্তর দিল, “ঠিক আছে, যাচ্ছি।”

​সে দরজার দিকে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর আবার শিউলির দিকে ফিরে, অনেকটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তবে একটা কথা সত্যি বলছি শিউলি তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমার এই নিজের জীবনের চেয়েও বেশি! এখন তুমি হয়তো বলবে, তবে কেন তোমার ওপর এত বড় কলঙ্ক লেপে দিলাম? আসলে শোনো, তোমাকে পাওয়ার আর কোনো উপায় আমার হাতে ছিল না। যেকোনো মূল্যে তোমাকে আমার চাই-ই ছিল। আর তার জন্যই এই পথ বেছে নেওয়া। এসবের জন্য আমি সত্যিই তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।”

​শিউলি অসীম তিক্ততায় মুখ ফিরিয়ে নিল। এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা তার কাছে বিষের মতো মনে হলো। শিউলির নীরবতা দেখে তামিম এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভীষণ কঠিন গলায় বলল,
“আর শোনো, খবরদার! কোনো ধরনের উল্টাপাল্টা করার চেষ্টা করবে না। তার পরিণতি কিন্তু খুব ভয়াবহ হবে। আমার কথা মেনে চললে ভালো, আর অবাধ্য হলে তামিম কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা ভাবতেও পারবে না!”

​বলেই তামিম তার সেই চিরাচরিত কুৎসিত হাসিটি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
★★★
সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার রাত নামতে শুরু করেছে। শিমুল নিঝুম পুকুরঘাটে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ সেখানে নিজের কিছু প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় আর মা আছিয়া বেগমের পরম মমতায় গুছিয়ে দেওয়া কিছু শুকনো খাবার। শিমুল যখন মাকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল, মা তাকে ফিরিয়ে দেননি,বরং অসীম সাহসে উৎসাহ দিয়েছেন শিউলিকে নিয়ে এই গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্য কোনো মা এমন পরিস্থিতিতে কী করতেন জানা নেই, কিন্তু আছিয়া বেগম সন্তানের ভালোবাসার মূল্য বুঝেছিলেন।

​শিমুল অনেকক্ষণ ধরে নির্জন এই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। ঝোপঝাড়ের মশাগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে এসে তার হাতে-পায়ে কামড়াচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। আধঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ শিউলির আসার কোনো নামগন্ধ নেই। শিমুলের বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল “যদি শিউলি শেষ মুহূর্তে আসতে না পারে? যদি ধরা পড়ে যায়?”

​এই ভয়টা তিমির অন্ধকারের মতো তাকে ক্রমেই গ্রাস করতে লাগল। অপেক্ষার প্রহর যত দীর্ঘ হচ্ছে, দুশ্চিন্তার পাহাড় ততটাই ভারি হচ্ছে। শিমুলের দুচোখ ছাপিয়ে জল আসতে চাইল। এত বড় ছেলের কান্না পায় শুনলে হয়তো যে কেউ হাসবে, কিন্তু মানুষ যখন চরম অসহায়ত্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছায়, তখন কান্না ছাড়া আর কোনো ভাষা থাকে না। সেখানে বয়সের কোনো বাছবিচার চলে না।

শিমুল আজ বড় একা, বড় নিরুপায়। এই পালিয়ে যাওয়া ছাড়া তো তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
​হঠাৎ আবছা অন্ধকারে দূরে কার যেন অবয়ব চোখে পড়ল। শিউলি! মেয়েটা প্রায় দৌড়ে এই দিকেই আসছে। মুহূর্তেই শিমুলের বিষণ্ণ ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তবে দুশ্চিন্তার ভারে সেই হাসি মুখে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। শিউলি শিমুলের কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে কেবল দুটি শব্দ বলল,
“চলো শিমুল ভাই, এখনই চলো।”

শিমুল কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এত দেরি হলো যে বড়?”

শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাড়িতে আজ মানুষের মেলা, সেটা তো জানোই। সবার ঘুমাতে যেতে বড্ড দেরি হচ্ছিল, তাই আমারও বেরোতে সময় লাগল।”

​শিমুল অন্ধকারেও শিউলির মুখটার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। শিউলি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে শক্ত করে শিমুলের হাতটা আঁকড়ে ধরে হাঁটা শুরু করল। চলতে চলতেই দৃঢ় গলায় বলল,
“শোনো, আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হলো বিয়ে করা। তারপর অন্য সব কিছু ভাবা যাবে।”

​শিউলির কথা শুনে শিমুলের ঠোঁটে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি দেখে শিউলি মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
“এখন অত হেসো না তো! এমনিতে তোমার হাসিতে আমি পাগল হয়ে যাই। এখন এই গভীর রাতে যদি ওভাবে হাসো, তবে দেখা যাবে আমি হাঁটা ভুলে তোমার হাসির দিকেই তাকিয়ে বসে আছি।”

​শিমুল সহজভাবে স্বীকারোক্তি দিল,
“আমি তাকাইয়া থাকি, এটা কি আমার দোষ? আমার চোখগুলো আজ বড় বেশরম হইয়া গেছে রে শিউলি। আমি না চাইতেই সেগুলো বারবার তোর দিকেই চইলা যায়।”

​শিমুল ভাইয়ের এমন সহজ স্বীকারোক্তি শুনে শিউলি খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আবেগমাখা কণ্ঠে বলল,
“জানো শিমুল ভাই, কত দিনের ইচ্ছা আমার পরম ভালোবাসায় তোমার বুকের ঠিক মাঝখানে মাথা রেখে একটু জিরিয়ে নেব। এতদিন পর আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। তোমাকে স্বামী রূপে বরণ করে নিয়ে তোমার বুকে মাথা রাখব, আর ভীষণ আয়েশে চোখ বন্ধ করে সেই সুখটুকু অনুভব করব।”

​শিমুল কোনো উত্তর দিতে পারল না।শিউলির প্রতি তার ভালোবাসা আজ মৌনতায় রূপ নিয়েছে। তারা আবার দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করল। সামনেই একটা ঘন জঙ্গল, যার বুক চিরে চলে গেছে সরু এক মেঠোপথ। এই জঙ্গলটা পার হতে পারলেই পাকা রাস্তা। কিন্তু এই শেষ রাতে সেখানে কোনো যানবাহন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শিমুলের মনে সংশয় দানা বাঁধছে।

​চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ সেই নির্জনতা চিরে এক কর্কশ কণ্ঠের ডাক ভেসে এল,
“কী! পালিয়ে যাচ্ছো নাকি?”

সেই কণ্ঠস্বর শুনে শিমুল আর শিউলি দুজনেরই পায়ের তলার পৃথিবী যেন কেঁপে উঠল। শিউলি আতঙ্কে শিমুলের হাতটা পাথরের মতো শক্ত করে চেপে ধরল, আর শিমুলও নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিল, সে পাশে আছে। কিন্তু দুজনে যখন ধীরপায়ে পেছনে ফিরে তাকাল, তখন তাদের সমস্ত চেতনা যেন অসাড় হয়ে গেল। শিমুলের হাত থেকে ব্যাগটা ধপাস করে ধুলোয় পড়ে গেল, আর শিউলির আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে গেল তার আগামীর সম্বলটুকু। এই গভীর রাতে কোনো অশরীরী ছায়া দেখলেও হয়তো তারা এতটা কুঁকড়ে যেত না, কিন্তু তাদের সামনে স্বয়ং যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন ইদ্রিস খন্দকার আর পৈশাচিক হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তামিম।

​ভয়ে শিউলির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। চোখের সামনে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসছে, পা দুটো যেন মাটির গভীর তলদেশে হারিয়ে যাচ্ছে। এতটা অসহায় বোধ সে তার পুরো জীবনেও কখনো করেনি। ঝাপসা চোখে সে একবার শিমুলের দিকে তাকাল। দেখল, সেই শান্ত ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও তার চোখেমুখে এক ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। সে শিউলির হাতটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন মৃত্যু না আসা পর্যন্ত এই বাঁধন আলগা হবে না।

​তামিম ঠোঁটের কোণে সিগারেট চেপে আয়েশ করে এগিয়ে এল। তার চোখে এক পৈশাচিক তৃপ্তি। সে উপহাসের সুরে বলল,
“তোকে বারণ করেছিলাম না শিউলি, এমন ভুল করিস না? তোরা এত বড় দুঃসাহস দেখালি কীভাবে? তোরা কী ভেবেছিলি আমি তোর বাড়ির চারদিকে পাহারাদার বসিয়ে রাখব না, আর তোরা হাত ধরাধরি করে পালিয়ে যাবি?”

​শিমুল নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বজ্রকণ্ঠে বলল, “তামিম, আমাদের পথ ছাড়। আমাদের যাইতে দে!”

​শিমুলের কথা শুনে তামিম এক বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সাথে সাথে ইদ্রিস খন্দকার আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের পৈশাচিক হাসি বনের স্তব্ধতা ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলল। ইদ্রিস খন্দকার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শিউলির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখের চাউনি যেন বিষ ঢালছে। তিনি গর্জে উঠে বললেন,
“কত্ত বড় সাহস তোর! আমাদের মুখে চুনকালি দিয়ে তুই পলাইয়া যাচ্ছিস? এই স্পর্ধা তোদের কে দিল? এই বংশের মান-সম্মান এভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার ফল কী হতে পারে, তা কি তোরা জানিস না?”

শিমুল এবার সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে দুই হাত জোড় করে ইদ্রিস খন্দকারের সামনে দাঁড়াল। ভাঙা গলায় সে আকুতি জানাল,
“চাচা, আমাদের একটু দয়া করেন। আমাদের যেতে দিন। আমরা এই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব, কেউ কোনোদিন আমাদের ছায়াও দেখবে না।”

​শিউলি কোনো কথা বলল না। সে জানে, এই পাথরহৃদয় নরপিশাচদের কাছে মিনতি করা মানে অরণ্যে রোদন। শিউলি শিমুলের হাতটা শক্ত করে ধরে অন্ধকারের বুক চিরে উল্টো দিকে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু দেখল চারপাশটা বিষধর সাপের মতো তামিম আর তার বাবার লোকেরা ঘিরে রেখেছে। মুক্তির সব কটা দরজা এক নিমেষে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। তাদের এক হওয়ার যে রঙিন স্বপ্নটুকু তারা এতক্ষণ বুকে লালন করছিল, তা বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল।

​তামিমের ইশারায় কয়েকজন লোক বুনো পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে শিমুলকে শিউলির কাছ থেকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিল। শিমুল রাগে-যন্ত্রণায় হুংকার ছেড়ে উঠল, “ছাড় আমাকে! হাত ছাড় তোরা!”

​কিন্তু পাষাণদের কানে সেই চিৎকার পৌঁছাল না। ইদ্রিস খন্দকার নির্দয়ভাবে আদেশ দিলেন শিমুলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। মুহূর্তের মধ্যে শিউলির চোখের সামনে কতগুলো ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো মানুষ শিমুলকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে মারতে শুরু করল। শিউলি পাগলের মতো সেদিকে ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু ইদ্রিস খন্দকার নিজের মেয়ের হাত লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরলেন।
​অন্ধকার জঙ্গলের নিস্তব্ধতা চিরে শিমুলের গগনবিদারী আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই চিৎকারে আকাশ-বাতাস যেন কেঁপে উঠছে। শিউলি ডুকরে কেঁদে উঠল, “আমার শিমুল ভাইরে মেরো না তোমরা! দোহাই লাগে তোমাদের, ওরে ছেড়ে দাও! ও আল্লাহ, তুমি আমার শিমুল ভাইরে বাঁচাও!”

​শিউলির সেই আকাশ ফাটানো আর্তনাদ বোরো ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বজ্রপাতের মতো বয়ে গেল। গাছের ডালে ডাকতে থাকা প্যাঁচাগুলোও সেই বীভৎস দৃশ্য সইতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রকৃতির বুক হয়তো এই হাহাকারে কেঁপে উঠছে, কিন্তু পরম মায়ায় শিউলিকে যে বাবা বড় করেছিলেন, সেই বাবার মনে আজ লেশমাত্র মায়া নেই।
​শিউলি এবার মরিয়া হয়ে তার বাবার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে শিমুলের রক্তাক্ত দেহের ওপর গিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পিশাচদের লাঠির আঘাত আর কিলঘুষি থামল না। ইদ্রিস খন্দকার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সেই নারকীয় ধ্বংসলীলা দেখছেন, আর তামিম এক কোণে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির অট্টহাসি হাসছে। শিউলি যখন দেখল কোনো আকুতিতেই কাজ হচ্ছে না, তখন সে দেখল তার ভালোবাসার মানুষটার নাক-মুখ ফেটে তাজা র’ক্তে মাটি ভিজে যাচ্ছে। শিমুলের প্রাণভোমরা যেন ধীরে ধীরে নিভে আসছে।

শিউলি এবার দিকভ্রান্ত হয়ে দৌড়ে গিয়ে তার বাবার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। তার মাথার ওড়নাটা ধস্তাধস্তিতে কোথায় যে খসে পড়েছে, সেই খেয়ালটুকুও তার নেই। দুহাতে বাবার পা দুটো জাপ্টে ধরে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, তবুও সে অনুনয় করে বলছে,
“ও আব্বা, ওরা আমার শিমুল ভাইরে মেরে ফেলবে গো আব্বা! তুমি ওদের বারণ করো। আব্বা, শিমুল ভাইয়ের খুব কষ্ট হচ্ছে, ওই দেখো ও কেমনে ছটফট করছে! ও মরে গেলে আমি বাঁচব না আব্বা, আমি নিশ্চিত মরে যাব। একবার একটু মায়া করো আব্বা, আমি তোমার পায়ে ধরি!”

​শিউলির এই বুক ফাটানো বিলাপে বনের বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও ইদ্রিস খন্দকারের পাষাণ হৃদয় একটুও টলল না। তিনি অবিকল এক কাঠের পুতুলের মতো নিস্পৃহ চোখে দূরে তাকিয়ে রইলেন। বাবার কাছে কোনো দয়া না পেয়ে শিউলি এবার ধুলোয় গড়াগড়ি খেয়ে তামিমের পায়ে গিয়ে পড়ল। আর্তনাদ করে বলল,
“তামিম, তুই ওদের থামতে বল! আমার শিমুল ভাই মরে যাবে রে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তামিম, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমায় একটু বাঁচতে দে! আমি তোকেই বিয়ে করব, কথা দিচ্ছি তুই যা বলবি আমি তা-ই শুনব, শুধু শিমুলকে ছেড়ে দিতে বল!”

​তামিমের পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষা যেন এতক্ষণে তৃপ্ত হলো। সে এক দম্ভভরা চিৎকারে লোকগুলোকে থামতে বলল। লোকগুলো সরে দাঁড়াতেই শিউলি দেখল, শিমুল নিথর হয়ে মাটির সাথে মিশে আছে। তার শুভ্র শরীরটা এখন মাটি আর কালচে রক্তের এক বীভৎস সংমিশ্রণ। শিউলি পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে শিমুলের রক্তাক্ত মাথাটা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। কাঁপাকাঁপা হাতে তার মুখটা আগলে ধরে গুমরে গুমরে কেঁদে বলল,
“ও শিমুল ভাই… ও শিমুল ভাই! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? একবার তাকাও!”

​শিমুলের চোখের পাতা নড়ছে না। শিউলি এবার আকাশের দিকে মুখ তুলে এক আকাশ সমান হাহাকার নিয়ে চিৎকার করল,
“ও আল্লাহ! তুমি আমার শিমুল ভাইকে ফিরিয়ে দাও! ওরে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না আল্লাহ!”

​শিউলির সেই আর্তনাদ যখন বনের নীরবতায় মিলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই শিমুল অনেক কষ্টে তার কাঁপাকাঁপা ঠোঁট দুটো একটু নাড়াল। অতি মৃদু, প্রায় অস্ফুট স্বরে সে ডাকল “ফুল…”

শিউলি অস্ফুট স্বরে শিমুলকে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই তামিম হিংস্র হায়েনার মতো এসে শিউলির হাতটা হ্যাঁচকা টানে ধরে ফেলল। শিউলিকে দাঁড় করিয়ে সে কর্কশ গলায় গর্জে উঠল,
“অনেক হয়েছে এসব ন্যাকামি! এবার বাড়ি চল। তোর এই প্রেমের নাটক আর সহ্য হচ্ছে না। মনটা চাইছে এই বলদের বাচ্চাকে এখনই জ্যান্ত কবর দিয়ে দিতে!”

​কথাটা শেষ করেই তামিম তার সবটুকু শক্তি দিয়ে শিমুলের পেটে এক প্রচণ্ড লাথি মারল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে শিমুলের নিথর শরীরটা ধুলোমাখা মাটিতে ছিটকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। শিউলি এবার ডুকরে কেঁদে উঠে অনুনয় করল, “দোহাই লাগে তোর, ওরে আর মারিস না তামিম! ওর অবস্থা দেখ, ও তো এমনিতেই শেষ হয়ে গেছে!”

​তামিম এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,
“আরে এত দুশ্চিন্তা করিস না! আমি ওর কিছু করব না। আমার লোকেরাই পরম যত্নে এই বলদটাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে।”

​বলেই তামিম শিউলির কোনো আপত্তি না শুনে তাকে পশুর মতো টেনে-হিঁচড়ে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে থাকল। পেছনে পড়ে রইল রক্তাক্ত শিমুল। সে মাটির সাথে মিশে থেকেও তার অবশ হয়ে আসা হাতটা শিউলির দিকে বাড়িয়ে দিল। অসীম যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে শেষবারের মতো করুণ স্বরে ডাকল,
“ফুল… শিউলি, যাস না তুই… যাস না!”
​শিমুলের সেই শেষ আকুতি অন্ধকারের নির্জনতায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, কিন্তু শিউলি তখন তামিমের কবলে পড়ে ক্রমশ তার স্বপ্নের কাছ থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যাচ্ছে।

#চলবে…

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৪
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
রাতের সেই বীভৎস তাণ্ডব শেষে যখন সকাল হলো, শিউলির মনে হলো, আজকের সকালটা বুঝি একটু বেশিই তাড়াতাড়ি চলে এলো। তার সাজানো পৃথিবীটা ধ্বংস করার জন্য আলোর বুঝি খুব তাড়া ছিল।
​শিমুলকে তামিমের লোকেরা তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। লোক দেখানো মহানুভবতা দেখাতে তামিম ডাক্তারকেও খবর দিয়েছিল।
শিউলি নিজের ঘরে জানালার ধারে পাথরের মতো বসে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি বাইরে শিউলি গাছটার ওপর নিবদ্ধ। কী অদ্ভুত! আজ গাছটায় একটি ফুলও অবশিষ্ট নেই, সব ঝরে গেছে। ধুলোমাখা মাটির ওপর সাদা রঙের ফুলগুলো অবহেলায় পড়ে আছে কিছুক্ষণ পরেই হয়তো কারও পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ওগুলো মিশে যাবে মাটির সাথে।

নিজের জীবনের পরিণতির সাথে মিল খুঁজে পেয়ে শিউলি এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি হাসল। তার বুকের ভেতরটা শিমুলকে একবার দেখার জন্য হাহাকার করে উঠছে।
​ইদ্রিস খন্দকার পাশের ঘরে বসে খাতা-কলম নিয়ে বিয়ের খরচের হিসাব মেলাচ্ছেন। কালকের অত বড় ঘটনার পর তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু জেদ। শিউলি ধীরপায়ে সেই ঘরে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়ের ছায়া দেখে ইদ্রিস খন্দকার মুখ না তুলেই কর্কশ স্বরে বললেন, “কী হয়েছে?”

​“আব্বা, আমার না খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।” শিউলির কণ্ঠস্বর আজ একেবারেই নিস্প্রাণ, যেন ওপার থেকে কেউ কথা বলছে।

​মেয়ের অদ্ভুত কথা শুনে ইদ্রিস খন্দকার এবার তার দিকে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এইটা আমারে কইতাছো ক্যান? যাও, গিয়া পানি খাও।”

​শিউলি এবার ভীষণ করুণ স্বরে, এক বুক হাহাকার নিয়ে বলল,
“না আব্বা, এই তৃষ্ণা সাধারণ পানি দিয়া মিটবে না। আমার শিমুল ভাইরে একবার দেখার বড় তৃষ্ণা পেয়েছে। তুমি শুধু অনুমতি দাও আব্বা, আমি একবার দেখেই চলে আসব।”

​মুহূর্তেই ইদ্রিস খন্দকারের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি হাতের কলমটা টেবিলে আছাড় দিয়ে ধমকে উঠলেন, “তোর কি লাজ-শরম সব চইলা গেছে? আমার সামনে খাড়াইয়া ওই পোলার কথা বলতে তোর বুক কাঁপতাছে না?”

শিউলি এক অদ্ভুত, শীতল হাসি হাসল। সে শান্ত গলায় বলল, “আমার কি আর কোনো মান-সম্মান অবশিষ্ট আছে আব্বা যে লাজ-শরম থাকবে? আপনি তো পিতা হয়ে নিজ হাতে জনসমক্ষে আমার সবটুকু সম্মান বিক্রি করে দিয়েছেন।”

​ইদ্রিস খন্দকার পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মেয়ের মুখের এই রূঢ় সত্য হজম করা কঠিন, কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করতে পারলেন না। শিউলি আবারও বলতে শুরু করল, “তবে আব্বা, আপনার ওপর আমার আর কোনো রাগ নেই, সত্যি বলছি। শুধু আপনার ওপর না, এই পৃথিবীর কারোর ওপরই আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। কষ্ট শুধু একটাই আমি আমার শিমুল ভাইরে পেলাম না। আমার জীবনের সব চাওয়া হয়তো পূর্ণ হবে আব্বা, কিন্তু এই একটা আজন্ম লালিত স্বপ্ন কোনোদিনও আর সত্যি হবে না।”

শিউলির কণ্ঠে কোনো কাঁপুনি ছিল না, চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও ছিল না। মৃত মানুষের মতো এক প্রাণহীন গলায় কথাগুলো বলে সে ধীর পায়ে নিজের রুমে ফিরে এল। সে খুব ভালো করেই জানে, তার পাথর-হৃদয় বাবা এই জন্মে অন্তত তাকে শিমুলের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেবেন না।
​শিউলি আবারও জানালার ধারে সেই আগের জায়গাটিতে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঝরে পড়া ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবল ‘আচ্ছা, শিমুল ভাইয়ের কি জ্ঞান ফিরেছে? নাকি সে এখনো অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন? তার জন্য বোধহয় অজ্ঞান হয়ে থাকাই ভালো। জ্ঞান ফিরলে তো সে আবারও আমায় খুঁজে না পেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করবে।’

​প্রেম কি আসলেই কখনো সুখ দেয়? নাকি এটি মানুষের জীবনে সবথেকে বড় দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? শিউলির কানে এখন এক করুণ সুর বাজছে। সে অস্ফুট স্বরে আপনমনে গুনগুন করে গাইতে লাগল,
​ “এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মিলে না,
শুধু সুখ চলে যায়,
এমনি মায়ারই ছলনায়…

​এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মিলে না,
এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়…”

​শিউলির গলার স্বর জানালার ওপারে বাতাসের সাথে মিশে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তার জীবনের সব সুর বুঝি আজ ওই ঝরে পড়া শিউলি ফুলগুলোর মতোই মলিন হয়ে গেছে।

হঠাৎ শিউলির ভীষণ জোরে হাসতে ইচ্ছে হলো। এক পৈশাচিক আর অদ্ভুত হাসিতে তার বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু কেন এই অকাল হাসি, তা সে নিজেও জানে না। হয়তো চরম শোক মানুষকে পাগল করে দেয়, অথবা ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর পরিহাস দেখে হাসি ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখা টকটকে লাল বেনারসিটা সে স্থির দৃষ্টিতে পরখ করে দেখল।
​ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন দিলওয়ারা বেগম। শিউলিকে দেখা মাত্রই তার মুখটা অপরাধবোধে কুঁচকে গেল। শিউলি তাকে দেখে আরও চওড়া হাসি হাসল, যেন সে কোনো পরম বন্ধুর দেখা পেয়েছে। সে শান্ত গলায় বলল,
“এসো খালা, বিছানায় এসে বসো।”

​মহিলাটা থরথর করে কাঁপছেন। তিনি পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে শিউলির থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে বিছানার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসলেন। শিউলি বিছানার সাথে হেলান দিয়ে, দুই হাঁটু ভাঁজ করে তার ওপর মাথা রাখল। তারপর নিস্প্রাণ স্বরে প্রশ্ন করল,
“খালা, শুনলাম তোমার নাতনির নাকি গতকালই অপারেশন হয়েছে?”

​দিলওয়ারা বেগম যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। শিউলি আবারও ম্লান হেসে বলল,
“চমকানোর কিছু নেই খালা। যে অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে পারোনি বলে কয়েকমাস ধরে কাজটা আটকে ছিল, সেই টাকা মাত্র দুই দিনে হয়ে গেল! যাক, ভালোই হলো, এবার তোমার নাতনি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে। কিন্তু এত টাকা কোথায় পেলে খালা?”

​দিলওয়ারা বেগম কোনোমতে কাঁপা গলায় জবাব দিলেন, “আমার… আমার কিছু জমানো টাকা ছিল, সেখান থেকেই…”

​বাকি কথাটুকু আর শেষ করতে দিল না শিউলি। সে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল,
“থাক খালা, কষ্ট করে আর নতুন কোনো মিথ্যে বলতে হবে না। আমি সব জানি। এই টাকা তোমাকে তামিম দিয়েছে, তাই না?”

​দিলওয়ারা বেগম চোরের মতো মাথা নিচু করে বসে রইলেন। শিউলি এবার সোজা হয়ে বসল। তার চোখের দৃষ্টি এবার আগুনের মতো জ্বলছে। সে আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে বলল, “তোমার নাতনির বয়স তো মোটে তেরো বছর, খালা। তোমার নাতনির চেয়ে আমি আর কতটুকুই বা বড়? জোর গেলে পাঁচ-ছয় বছরের। কীভাবে পারলে খালা? আমার ইজ্জত বিক্রির টাকা দিয়ে নিজের নাতনির চিকিৎসা করাতে তোমার হাত একবারও কাঁপল না?”

শিউলির তীক্ষ্ণ সত্যের সামনে দিলওয়ারা বেগমের মিথ্যে দেয়ালটা মুহূর্তেই ধসে পড়ল। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে শিউলির হাত ধরতে চাইলেন,
“আমারে মাফ কইরা দে শিউলি… আমি বড় পাপ করছি রে মা!”

​শিউলি ঘৃণাভরে হাতটা সরিয়ে নিল। শান্ত কিন্তু বিষণ্ন গলায় বলল, “থাক খালা, আর ক্ষমা চাইতে হবে না। একদিক দিয়ে আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেলেও অন্যদিক দিয়ে তো ভালোই হলো একটা নিষ্পাপ মেয়ের প্রাণ বাঁচল, এটাই বড় কথা। কিন্তু খালা, আমি যখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, তখন সবাইকে বুক ফেটে বলে দিও শিউলির শরীরে কোনো কলঙ্ক ছিল না। সেই রাতে যা রটেছিল, তার সবটাই ছিল সাজানো এক মিথ্যে।”

​দিলওয়ারা বেগম আর এক মুহূর্ত সেখানে বসার সাহস পেলেন না। অপরাধবোধের বোঝা নিয়ে তিনি প্রায় পালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
​শিউলি আবারও হাসল। আজ মেয়েটার মুখ থেকে হাসি যেন সরতেই চাইছে না অথচ কিছুক্ষণ পরেই তার জীবনের সেই অন্ধকার লগ্নটি ধেয়ে আসবে। সে মনে মনে সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা ভাবল। সালিশি মজলিসে যখন দিলওয়ারা বেগমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি কপালে করাঘাত করে বলেছিলেন যে, তিনি নাকি নাতিকে দেখতে সন্ধ্যায় বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। আর রাতে ফিরে এসে নাকি নিজের চোখে তামিম আর শিউলিকে আপত্তিকর অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন! সেই সাজানো সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই গ্রামের মানুষগুলো নেকড়ের মতো শিউলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অথচ শিউলির স্পষ্ট মনে আছে, সেই রাতের বিশৃঙ্খলার মাঝে দিলওয়ারা বেগম নিজেই চিৎকার করে আশেপাশের মানুষকে জড়ো করেছিলেন, যাতে শিউলির অপবাদ চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে যায়।
​তামিমদের বাড়ি থেকে এখানে আসতে বড়জোর আধা ঘণ্টা লাগে। সময় ফুরিয়ে আসছে। শিউলি জানে, খুব শিগগিরই তার সেই সাজানো যমদূত এসে দরজায় কড়া নাড়বে।
★★★
​শিমুলের কাছে বসে আছেন আছিয়া বেগম। আদরের সন্তানের এই রক্তাক্ত আর নিথর দেহ দেখে কেঁদে কেঁদে তার চোখের দুটো লাল হয়ে গেছে। সেই গত রাত থেকে এখন অবধি শিমুলের জ্ঞান ফেরেনি। তার ওপর প্রচণ্ড জ্বরে ছেলেটার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আছিয়া বেগমের বুকটা আজ অনুশোচনায় ফেটে যাচ্ছে। তাঁর মনে হচ্ছে, কেন তিনি তাদের এই পালানোর পথে সায় দিলেন? কেন তিনি বুঝতে পারলেন না যে, এই শকুনের সমাজে ভালোবাসা এত সহজে ডানা মেলতে পারে না!
​হঠাৎ শিমুলের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। জ্বরের ঘোরে সে অস্ফুট স্বরে বারবার কী যেন বলছে। আছিয়া বেগম কান পেতে শুনলেন, ছেলেটা জ্বরের ঘোরেও বিড়বিড় করছে, “শিউলি… যাস না তুই… শিউলি!”

​আছিয়া বেগম পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকলেন, “শিমুল… ওরে বাপ আমার, শুনতে পাচ্ছিস? চোখ মেল বাপ!”

​শিমুল খুব ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল। ঝাপসা চোখে সামনে মা-কে দেখেই সে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে হাহাকার ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আম্মা! শিউলি কই? শিউলি কি চলে গেছে?”

​আছিয়া বেগম ছেলের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “তুই শান্ত হ বাপ! তোর শরীরে অনেক চোট, তুই একটু শুয়ে থাক।”

​কিন্তু শিমুলের কানে তখন কোনো বারণ পৌঁছাচ্ছে না। সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে উন্মাদেরর মতো ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল। তার লক্ষ্য শিউলিদের বাড়ি। কিন্তু বাড়ির আঙিনা পার হওয়ার আগেই তামিমের আগে থেকে বসিয়ে রাখা পাহারাদারেরা লোহার মতো শক্ত হাতে তাকে জাপ্টে ধরল। তামিম জানত শিমুল শান্ত থাকবে না, তাই সে আগেই একদল গুণ্ডা শিমুলদের বাড়ির সামনে মোতায়েন করে রেখেছিল।
​শিমুল সেই দানবগুলোর কবজায় বন্দি হয়েও শরীরের শেষটুকু শক্তি দিয়ে শিউলিদের বাড়ির দিকে মুখ করে চিৎকার করে উঠল,
“শিউলি… ও শিউলি রে! তুই বিয়ে করিস না শিউলি!”

​কিন্তু সেই গগনবিদারী করুণ চিৎকার শিউলিদের বাড়ির উৎসবের বাজনার আড়ালে পৌঁছাল কি না, তা কেবল বিধাতাই জানেন।
★★★
শিউলিকে আজ অপূর্ব করে সাজানো হয়েছে। পরনে টকটকে লাল বেনারসি, মাথায় কারুকাজ করা ওড়না আর অঙ্গে জড়ানো সোনার গয়না সব মিলিয়ে তাকে এক অপার্থিব সুন্দরী লাগছে। প্রতিটি মেয়ের জীবনে এই সাজ সুখের বার্তা নিয়ে আসে, কিন্তু শিউলির কাছে এই লাল বেনারসি জ্বলন্ত এক কাফন। বাইরে বর সেজে দম্ভের সাথে হাজির হয়েছে তামিম। চলছে এলাহি কারবার। বিশালাকার ষাঁড় আর খাসি জবাই করে গ্রামের মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে। কোনো এক নিষ্ঠুর রাজ্য জয় করে আসা দস্যু রাজার মতো তামিমের মুখে আজ এক পৈশাচিক হাসি।

​ইদ্রিস খন্দকার বুক ফুলিয়ে মেহমানদারী তদারকি করছেন। বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আভিজাত্যে যেন কোনো কমতি না থাকে! কিন্তু এই উৎসবের বাদ্যি আর হইহুল্লোড়ের মাঝেই হঠাৎ ভেতর বাড়ি থেকে কয়েকটা কন্ঠ ভেসে আসলো কনে সাজানো মেয়েরা আর্তনাদ করে বলতে লাগল, “শিউলি! ও শিউলি, তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

​ইদ্রিস খন্দকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন, কনে সাজা শিউলি আগুনের গোলার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দিচ্ছে। তার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল এত মানুষের সামনে মেয়েটা আবারও তার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? তামিমও রাগে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
​শিউলির গন্তব্য আজ কোনো অজানায় নয়, সে দৌড়াচ্ছে তার শিমুল ভাইয়ের দিকে। এলোমেলো পায়ে, বেনারসির আঁচল ধুলোয় লুটিয়ে সে উন্মাদিনীর মতো ছুটছে। ইদ্রিস খন্দকার চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় শিউলির পথ আগলে ধরলেন এবং তার হাতটা লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরলেন। দাঁতে দাঁত পিষে তিনি গর্জে উঠলেন,
“শিউলি! তুই আমার সম্মান এভাবে সবার সামনে শেষ করে দিতে পারিস না!”

​শিউলি তার বাবার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা দৃষ্টি আজ উধাও; সেখানে খেলা করছে এক অপার্থিব স্থিরতা আর গভীর শূন্যতা। শিউলি নিস্পৃহ, নিস্তব্ধ কণ্ঠে বলল,
“আব্বা, এবার আমায় ছেড়ে দাও। আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। জীবনের এই শেষ বেলায় অন্তত একবার শিমুল ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে শান্তিতে মরতে দাও। খোদার কসম আব্বা, আমি আর তোমাদের কোনোদিন জ্বালাব না।”

​শিউলির সেই প্রাণহীন কথাগুলো যেন বাতাসের শীতিলতা বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে তখন এক চূড়ান্ত বিদায়ের আভা।
শিউলির সেই ভাঙা, হাহাকার ভরা কণ্ঠস্বরে এমন এক অদৃশ্য শক্তি ছিল যে, ইদ্রিস খন্দকারের পাথরের মতো শক্ত হাতজোড়াও অবশ হয়ে শিউলিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। শিউলি তার বাবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ এক চিলতে হাসি হাসল। যে হাতটা আজ শেষলগ্নে আলগা হলো, সেই হাতটা যদি গতকাল রাতে একবার মমতায় শিউলিকে ছেড়ে দিত, তবে কি আজ মেয়েটার এই করুণ দশা হতো?

​আশ্চর্যের বিষয়, সবসময় পিছু লেগে থাকা তামিমও আজ শিউলিকে আটকাল না। কেন সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, সেই উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। শিউলি আবার দৌড়াতে শুরু করল। লাল বেনারসির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, গয়নাগুলো শব্দ করে ঝরছে। কয়েক কদম গিয়েই সে হোঁচট খেয়ে ধুলোয় আছড়ে পড়ল। কিন্তু তার গন্তব্য যে আজ ধ্রুবতারা! সেই ব্যথার তোয়াক্কা না করে সে আবারও উঠে দৌড়াতে লাগল।

​ঠিক তখনই ভেতর বাড়ি থেকে শিউলির মা জাবেদা বেগম বুকফাটা চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটি কাঁচের শিশি। তিনি উঠানে আছাড় খেয়ে পড়ে বিলাপ করতে করতে বললেন,
“ও শিউলির বাপ! শিউলির ঘরে আমি এই খালি বিষের শিশিটা পাইছি গো! আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!”

​এক মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে গেল। চারদিকে রটে গেল শিউলি তার অপমান আর যন্ত্রণার বোঝা সইতে না পেরে নীল বিষ পান করেছে।
​ওদিকে শিউলি টলতে টলতে শিমুলদের উঠানে গিয়ে এক অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠল,
“শিমুল ভাই… ও শিমুল ভাই!”

​শিউলির সেই আর্তচিৎকার শুনে শিমুল উন্মত্তের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু সামনে তাকিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। শিউলিকে দেখে তার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল না, বরং এক চরম বিভীষিকা গ্রাস করল তাকে। বনের কোনো বিশাল বৃক্ষকে গোড়া থেকে কুঠার দিয়ে কেটে ফেললে তা যেভাবে মাটির দিকে নুয়ে পড়ে, শিউলি নামক সেই মায়াবী ফুলটিও আজ ঠিক সেভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার জন্য নেতিয়ে পড়েছে।

শিমুল উন্মত্তের মতো দৌড়ে গিয়ে শিউলিকে ধরতে চাইল, কিন্তু তার আগেই শিউলির শরীরটা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শিমুল ধপাস করে মাটিতে বসে শিউলির মাথাটা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল। তার কণ্ঠ আজ এতটাই ভাঙা আর রুদ্ধ যে, শব্দগুলো যেন ঠিকমতো বেরোতে চাইছে না। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“কী হয়েছে তোর শিউলি? কেন তুই এভাবে ঢলে পড়লি?”

​শিউলি কাঁপাকাঁপা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল তার প্রিয় মানুষটির দিকে। পরম মমতায়, জীবনের শেষ স্পর্শটুকু দিয়ে সে শিমুলের মুখখানায় হাত বুলাল। তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি তো বলেছিলাম অন্য কারো নামে কবুল পড়ার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়। আমি তো মিথ্যে বলিনি। তাই তো মৃত্যুকে হাসিমুখে কবুল করে নিলাম।”

​শিমুল হাহাকার করে উঠল, তার চোখ ফেটে রক্তবর্ণ অশ্রু ঝরতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল,
“কী কইতাছোস এসব আবোল-তাবোল! চল, তোরে এহনই হাসপাতালে নিতে হইবো। তোর কিছু হইতে দেব না আমি!”

​শিউলি এবার এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরও কাঁপা কণ্ঠে বলল, “নড়ো না শিমুল ভাই… তোমার এই মুখখানা শেষবারের মতো দুচোখ ভরে দেখে নিতে দাও। আচ্ছা শিমুল ভাই, তোমার বুকে কি একবার আমায় মাথা রাখতে দেবে? আমার যে বড্ড ইচ্ছে তোমার বুকের ওই মাঝখানটায় একটু আশ্রয় নিতে!শেষ ইচ্ছে কি পূরণ হবে?”

​শিমুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শিউলির কথা শেষ হওয়ার আগেই সে তাকে দুহাতে পরম মমতায় নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জাপ্টে ধরল। শিউলি আজ তার স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছেছে। তার মনে হলো, যদি এভাবে আরও কয়েকশ বছর বেঁচে থাকা যেত! শিমুলের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে শুনতে শিউলির চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে ভারি হয়ে এল।

​শিমুল আকাশের দিকে মুখ তুলে এক বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে পড়ল,
“আল্লাহ! আমার ফুলকে তুমি এভাবে কেড়ে নিও না আল্লাহ! দোহাই লাগে তোমার, ওকে ফিরিয়ে দাও!”

​কিন্তু বিধাতার লিখন বড়ই নিষ্ঠুর। শিমুলের সেই গগনবিদারী চিৎকার গ্রামের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিলেও, শিউলির দেহটা শিমুলের বুকের ওপর ধীরে ধীরে নিথর হয়ে এল। একটি অপূর্ণ প্রেমের ইতি ঘটল একরাশ নীল বিষের বিষাদে।শিউলির ইচ্ছে পূরন হলো সে তার শিমুল ভাইয়ের বুকে মাথা রাখতে পেরেছে।

শিমুল হঠাৎ অনুভব করল, তার বুকের ওপর রাখা শিউলির দেহটা অদ্ভুতভাবে শীতল হয়ে আসছে। যে তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো একটু আগেও তার বুকে আছড়ে পড়ছিল, সেগুলো এখন একদম শান্ত। শিমুলের মনে হলো, হঠাৎ করে পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়িয়েছে চারপাশের সব শব্দ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা দৃষ্টিতে শিউলির মুখের দিকে তাকাল। শান্ত, স্নিগ্ধ দুটি চোখ বন্ধ হয়ে আছে ঠিক যেন গভীর ঘুমে নিমগ্ন কোনো রাজকন্যা।

​শিমুল আবারও শিউলিকে নিজের বুকের সাথে উন্মাদের মতো জাপ্টে ধরল। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল শিউলির নিথর মুখে গিয়ে পড়ছে। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আমারে ভালোবাসা শিখাইয়া এখন কার কাছে রাইখা যাইতাছোস রে শিউলি? ও খোদা, তুমি ক্যান শুধু ওরে নিলা? আমাকেও সাথে নিয়ে যাও!”

​ততক্ষণে শিউলিদের বাড়ির উৎসবের কোলাহল শিমুলদের উঠানে এসে আছড়ে পড়েছে। তামিম যখন দেখল শিউলি লাল বেনারসি পরে নিথর হয়ে শিমুলের বুকে পড়ে আছে, তখন তার সমস্ত দম্ভ আর নিষ্ঠুরতা মাটির সাথে মিশে গেল। এক অদৃশ্য আঘাতে সে থমকে দাঁড়িয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। যে শিউলিকে সে জয় করতে চেয়েছিল, সে আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে এক অন্য জগতে চলে গেছে।
​শিমুল তখনও শিউলির নাম ধরে আর্তনাদ করে চলেছে,
“ফুল… ও ফুল! একবার চোখ মেল। আমারে ছেড়ে যাস না। তোর শিমুল ভাইরে এখন কে সান্ত্বনা দেবে? কে আমারে শাসন করবে? বল না তোর মতো করে আর কে আমারে ভালোবাসবে?”

শিমুল এবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে হাহাকার ভরা কন্ঠে বলল,
“ও আম্মা আমার শিউলি কথা কয় না ক্যান?ওরে কথা কইতে কও।শিউলি চুপ কইরা রইলো কেন।ও কি ঘুমাইতাছে?শিউলি তুই উঠ আমাদের একটা সুন্দর সংসার হইবো।তোর স্বপ্নের সংসার না কইরা তুই কেমনে বিদায় নিবি?আ্যইজ তোর শিমুল ভাই অনেক বোঝদার, আ্যইজ দরকার পড়লে সবাইরে খু’ন কইরা তোরে নিয়া পালাইয়া যামু।কথা দিতাছি শিউলি তুই খালি একবার চোখ খুল।”
শিউলি উঠলো না।একই ভাবে পড়ে রইল একটা লা’শ হয়ে।
​শিমুলের সেই বুকফাটা হাহাকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলো, উপস্থিত সবার চোখ জলে ভিজে গেল। কিন্তু শিউলি আর উঠল না। সে সমস্ত অপমান, অপবাদ আর না-পাওয়ার বেদনা থেকে মুক্তি নিয়ে চিরদিনের জন্য অভিমানী এক লা’শ হয়ে পড়ে রইল।
​শিউলি গাছ থেকে যেমন ভোরের আলো ফোটার আগে ফুল ঝরে যায়, শিউলি নামের মেয়েটিও জীবনের সব আলো ফোটার আগেই ঝরে গেল শিমুলের সেই শূন্য বুকে।
আজ বসন্তের শেষ দিন।বাংলায় চৈত্র মাসের ত্রিশ তারিখ।ইংরেজিতে এপ্রিল মাসের তেরো।বসন্তের শেষ দিনে শিউলি নামক একটা ফুল অকালে সারাজীবনের জন্য ঝরে গেল।এটা কে “বসন্তের ঝরা ফুল” নামেও ডাকা যায়।
ঝরে গেল সমাজের বুক থেকে একটা পবিত্র ভালোবাসা।ঝরে গেল একটা পবিত্র আত্মার সংসার করার স্বপ্ন।

#চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ