#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব২১
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
বসন্তের দুপুরের সময়। চারদিকে বসন্তের কোকিলের ডাক ভেসে আসছে। ইদ্রিস খন্দকার বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। এখনো তিনি শিউলির সাথে কোনো কথা বলেননি। ইদ্রিস খন্দকার কপালে হাত দিয়ে বসা তার মনে তখন কেবলই অপরাধবোধ আর অসহায়তা। জাবেদা বেগম স্বামীকে এমন চিন্তাযুক্ত দেখে বললেন,
“কী চিন্তা করছেন? এখন তো সমস্যা সমাধান হয়েই গেছে।”
ইদ্রিস খন্দকার কথা বললেন না। উনার বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ওই রাতটার কথা। মনে পড়ছিল শিউলির সেই অসহায় মুখটার কথা। তিনি তার মেয়ের অপমানের বিচার করতে পারেননি এই লজ্জা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
তখনি দেখা গেল শিমুল। সে এসে ইদ্রিস খন্দকারের সামনে এসে দাঁড়াল। জাবেদা বেগম বললেন,
“কী রে শিমুল? সকালে একবার আইলি, এহন আবার কেন?”
শিমুল ধীর কণ্ঠে বলল,
“আমার চাচার লগে কথা আছে।”
ইদ্রিস খন্দকার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আমার লগে কথা? কী কথা, বলে ফেল দেখি।”
শিমুল চোখ বন্ধ করে নিজের মাঝে সাহস সঞ্চয় করল। এই পরিস্থিতি, এই পরিবেশ সবকিছুই তার বিরুদ্ধে। তবুও সে দৃঢ় হলো। তারপর বলল,
“চাচা, আমি বিয়া করতে চাই।”
“হুম, বিয়া করবি, কর। এটা আমার সাথে এসে বলতাছো কেন? তোর আম্মারে গিয়া বল।”
শিমুল মাথা উঁচু করে স্থির দৃষ্টিতে ইদ্রিস খন্দকারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচা, আমি শিউলিরে ভালোবাসি। আমি শিউলিরে বিয়া করতে চাই।”
কথাটা ইদ্রিস খন্দকারের কর্ণপাত হতেই ওনার মুখের রং পাল্টে গেল। তিনি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি রাগে হুংকার করলেন,
“তোর মাথা ঠিক আছে রে শিমুল? তোর কত বড় সাহস আমার সামনে দাঁড়িয়ে এরুপ কথা কস!”
শিমুল মাথা নিচু করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“ভালোবাসলে সাহসের প্রয়োজন পরে না চাচা।”
ইদ্রিস খন্দকারের চিৎকারে শিউলি বাহিরে বেরিয়ে আসল। সে ভাবতে পারেনি শিমুল তার আব্বার কাছে বিয়ে করার কথা বলবে। শিউলি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল বিস্ময় আর আশঙ্কায়।
জাবেদা বেগম বললেন,
“এসব কী কইতাছোস তুই শিমুল? আমাদের মাইয়ারে তোর মতো পোলার লগে কেমনে বিয়া দিমু?”
শিমুল উত্তর দিল,
“ক্যান চাচি, আমাতে কী সমস্যা? আমি কি নেশাখোর নাকি! আমি তোমাদের মাইয়ারে ভালা রাখমু।”
হঠাৎ ইদ্রিস খন্দকার শিমুলের গালে কষিয়ে চড় বসিয়ে দিলেন।শিউলি দূরে থেকেও কেঁপে উঠল শিমুল ভাইয়ের সেই আঘাতে।
আবারও আরেকটা চড় দিতে চাইলেন ইদ্রিস খন্দকার, কিন্তু শিউলি গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গেল। বলল,
“দয়া করে শিমুল ভাইকে আর মেরো না আব্বা।”
এই কথার পরিবর্তে, সেই চড় এসে পড়ল শিউলির নরম গালে। চড়টা এতটাই তীব্র ছিল যে শিউলি গিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল। শিমুল দৌড়ে গিয়ে শিউলিকে উঠাল। ইদ্রিস খন্দকার রাগে চিৎকার করে বললেন,
“কত বড় সাহস! আমার মাইয়ারে বিয়া করবার চায়! তোর কী যেগ্যতা আছে?”
শিমুল কিছু বলার আগে শিউলি বলল,
“আব্বা, শিমুল ভাইয়ের যোগ্যতা অবশ্যই আছে। সে আমাকে ভালোবাসে সেটা তার যোগ্যতা। এর চেয়ে বড় যোগ্যতা আর কী থাকতে পারে?”
ইদ্রিস খন্দকার মেয়ের কথায় আরও রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“শিমুল, তুই এহান থাইকা যা! তা না হইলে আজ হয় আমার মাইয়া মরব, না হইলে তুই মরবি!”
শিমুল হঠাৎ জোর হাত করে মাথা নিচু করে আকুতি জানিয়ে বলল,
“আমি শিউলিরে ভালোবাসি চাচা। শিউলিরে ছাড়া আমি বাঁচুম না। দয়া করে শিউলিরে আমার করে দিয়ে দিন। আপনারে কথা দিতাছি, শিউলিরে ভালা রাখমু আমি। ভীষন ভালা রাখুম। দরকার পড়লে নিজের রক্ত বেইচ্ছা শিউলির মুখে খাওন তুইলা দিমু। তবুও শিউলিরে কষ্ট পাইতে দিমু না। শুধু আপনে শিউলিরে আমার লগে বিয়া দেন চাচা।”
শিউলি কান্না ভরা কণ্ঠে শিমুলের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু এতটা মিনতি করার পরেও ইদ্রিস খন্দকারের মন গলল না। তিনি তার কথায় অটল রইলেন।
শিমুল বুঝতে পারল, ইদ্রিস খন্দকারকে বুঝিয়ে লাভ হবে না। তিনি সমাজের ভয়ে এবং নিজের মর্যাদার কারণে এক কঠিন জেদ ধরে বসে আছেন।
শিমুল বলল,
“ঠিক আছে। আমি চলে যাইতাছি চাচা, কিন্তু আমি শিউলিরে ভালোবাসি। অন্য কোনো জায়গায় শিউলির বিয়া হইতে পারে না। আমি বিয়া করুম শিউলিরে।”
শিমুল শিউলির কান্নারত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না শিউলি। তোর বিয়া অন্য জায়গায় হইবো না। তুই তোর শিমুল ভাইয়েরই বউ হইবি।”
বলেই শিমুল গটগট পায়ে দ্রুত চলে গেল।
শিমুল চলে গেলে শিউলি এবার বাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। এই প্রথম সে বাবার কাছে অনুনয় করছে।
“আব্বা, আপনার কাছে কখনো কিছু চাই নাই। দয়া করে এবারের মতো শিমুল ভাইকে চাইতাছি আব্বা। আমি ওই তামিমরে বিয়া করতে পারুম না।”
ইদ্রিস খন্দকার জোরে চিৎকার করে উঠলেন। রাগে শিউলির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলেন।
পেছন থেকে জাবেদা বেগম এলেন,
“কী করছেন আপনি?”
তিনি জাবেদা বেগমের কথা না শুনে শিউলিকে শিউলির রুমে ধাক্কা দিয়ে ফেলে বাহির থেকে দরজায় তালা দিয়ে দিলেন। শিউলি দরজা ধাক্কিয়ে বলল,
“আব্বা, দরজা খুলেন। আমাকে এভাবে আটকিয়ে রাখতে পারেন না।”
ইদ্রিস খন্দকার বললেন, “আমি কী পারি আর কী পারি না, তা পরে দেখামু।”
ইদ্রিস খন্দকার জাবেদা বেগমের দিকে ফিরে বললেন,
“খবরদার! এই দরজা খুলবা না। যদি খোলো, তাইলে তোমারর আর এই বাড়িত থাহন হইবে না।”
বলেই ইদ্রিস খন্দকার বের হয়ে গেলেন। শিউলি কাঁদতে কাঁদতে দেওয়াল ঘেঁষে বসে পড়ল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে মেয়েটা।
“আমাদের বেলা কেন এতটা নিষ্ঠুর হচ্ছে আল্লাহ! শিমুল নামক পুরুষটাকে আমার করে দিতে ক্ষতি কী? আমার দোয়া কি আল্লাহ তুমি কবুল করবে না?”
★★★
শিমুল নিজেদের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। শিমুল বলল,
“আম্মা, আমি শিউলিরেই বিয়া করমু। আর কাউকে বিয়া করা আমার হইবো না।”
আছিয়া বেগম ছেলের গালে ঠাস করে চড় দিয়ে দিলেন। রাগি কণ্ঠে বললেন,
“তুই আসলেই একটা গাধা। তোর কি মনে হয় তোর লগে মেম্বার তার মাইয়ারে বিয়া দিব? তোর কথা লইয়া তবুও গেছিলাম বিয়ার প্রস্তাব লইয়া, কিন্তু কী হইলো? বরং হাজার খানা অপমান কইরা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিল। তবুও কইতাছোস ওই মাইয়ারেই বিয়া করবি।”
“হ আম্মা, মরার আগ পর্যন্ত কমু আমি শিউলিরে বিয়া করমু।” এবার শিমুল তার কণ্ঠ নরম করে, তার মায়ের হাত ধরে বলল, “ও আম্মা, আম্মা তুমি তো আমারে বিরাট ভালোবাসো। আমিও শিউলিরে বিরাট ভালোবাসি আম্মা। তুমি যেমনেই হোক মেম্বার চাচারে কইয়া শিউলির লগে বিয়া দাও। বিশ্বাস করো, শিউলি ওই চেয়ারম্যানের পোলার লগে ভালো থাকব না।”
আছিয়া বেগম ছেলের দিকে অসহায় নয়নে তাকালেন। তার ছেলের আবদার যে তিনি রক্ষা করতে পারবেন না। তবুও গিয়েছিলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে, কিন্তু মেম্বার রাজি হননি। আছিয়া বেগম বোঝানোর কণ্ঠে বললেন,
“বাপজান, আর মাত্র দুইদিন পরই শিউলির বিয়া। তুই শিউলিরে ভুইলা যা। শিউলি তোর কপালে নাই।”
শিমুল চিৎকার করে উঠল,
“কেডা কইছে শিউলি আমার কপালে নাই? যে আমি প্রেম কী বুঝতাম না, ভালোবাসা কী বুঝতাম না। সেই আমি আজ শিউলিরে ভালোবাইসা সব শিখলাম। তারে যদি না পাই আম্মা, আমি মইরা যামু। তোমার পোলা শেষ হইয়া যাইব। আমার যেমনেই হোক শিউলিরে আমার লাগব!”
★★★
বিকাল হয়ে এসেছে কিন্তু শিউলি এখনো ফ্লোরেই বসে আছে। এখনো একবারও দরজা খুলেনি। আজ সাতাশে চৈত্র। আর মাত্র দুই দিন হাতে সময়, তিন দিনের দিন তামিমের সাথে বিয়ে। শিউলির মাথা কাজ করছে না, সে কী করবে।
হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ হলো। দেখল তার মা দাঁড়িয়ে। শিউলি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল,
“তুমি দরজা খুললা কেন আম্মা? আব্বা তোমারে মারব তো।”
“তোর আব্বাই কইছে খোলার লাইগা। তামিম আইছে তোর লগে দেখা করনের লাইগা।”
শিউলি জেদি কণ্ঠে বলল,
“ওই কু’ত্তার বাচ্চারে কও বাড়ি থাইকা যাইতে। নাইলে ওরে আজ খুন কইরা ফেলমু!”
পেছন থেকে তামিম হাসতে হাসতে বলে উঠল,
“দুইদিন পর এই কু’ত্তার বাচ্চার বউ হয়েই তো কুত্তার বাড়িতে যেতে হবে।”
শিউলি চোখ বড় বড় করে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তামিম জাবেদা বেগমকে বলল,
“চাচি, আপনে যান। আমার শিউলির লগে কথা আছে।”
জাবেদা বেগম সরে গেলেন। তবে পুরোপুরি সরলেন না, একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন।
শিউলি তামিমকে বলে উঠল,
“আজ কেন এলেন এখানে? একবার বদনাম করে শখ মিঠেনি?”
তামিম সহজভাবে উত্তর দিল,
“কী আর করি বলো সুইটহার্ট। খুব করে বোঝালাম তোমাকে, কিন্তু তুমি নাছোড়বান্দা। আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলে না, তাই শেষ পর্যন্ত এই পন্থার আশ্রয়ই নিতে হলো। আজ আমি ভালো মানুষ হয়ে তোমার সাথে দেখা করতে আসলাম।”
শিউলি বলে উঠল,
“আপনি ভীষণ বড় অন্যায় করেছেন। এর শাস্তি আপনাকে পেতে হবে। আমার বদনাম করার সাথে সাথে আমার আব্বারও আপনি নাম খারাপ করছেন। এর শাস্তি ভয়াবহ হবে, দেখে নিয়েন।”
শিউলির কথায় তামিম অট্টহাসি হেসে বলল,
“আহারে! বাপের উপর এত মায়া তোমার! তোমার বাপও এত সাধু মানুষ না।”
শিউলি বলল, “মানে?”
“মানে তোমার আব্বাও তোমার বদনাম করার পেছনে ছিল,” সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল তামিম।
শিউলির চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। এসব কী বলছে তামিম! এসব কি সত্যি? শিউলি চিৎকার করে বলল,
“খবরদার! আরেকটা মিথ্যা বলবেন না। আমার আব্বা জীবনেও এরকম কিছু করতে পারেন না।”
তামিম হেসে বলল, “ওই রাতে তোমার আব্বা তোমার মামার অসুখের কথা বলে নিয়ে গেছিলো তোমার আম্মারে। কিন্তু সত্যি কথা এটাই যে, ওইদিন তো তোমার মামা অসুস্থই ছিল না।”
তামিমের কথা শুনে শিউলি যেন নিশ্বাস নেওয়াও ভুলে গেছে। তামিম আরও বলল,
“তোমার আব্বা এমনটা করার কারণ উনাকে আমি বলেছিলাম এটা করার জন্য। জানো তো, এরকম করাতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি। শুধু বলেছিলাম, সামনের বছর আমার বাবার পরে উনাকে চেয়ারম্যান বানাবো।”
তামিম কথা শেষ করে সিগারেট টানতে টানতে বের হয়ে গেল।শিউলি এখনো এভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার বাবা এটা করতে পারে। তার জন্মদাতা পিতা এতটা নিকৃষ্ট কাজ করতে পারে ক্ষমতার লোভে।
বাহিরে দাঁড়িয়ে জাবেদা বেগম সব শুনেছেন। এটা সত্যিই, ওইদিন গিয়ে সত্যিই দেখেছিলেন তার ভাই অসুস্থ না। তখনও বুঝতে পারেননি তার স্বামীর আসল রূপ।
জাবেদা বেগম কাঁপা পায়ে মেয়ের রুমে ঢুকলেন। শিউলি নড়ছে না, যেন পাথর হয়ে গেছে মেয়েটা। জাবেদা বেগমের চোখে পানি।
শিউলি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, যেন তার শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে এই নির্মম সত্য। সে চিৎকার করে কাঁদছে, আর সেই কান্নার তোড়ে ঘর-দালান সব কেঁপে উঠছে যেন।
“ও আম্মা, তুমি শুনলে? আমার জন্মের ঋণ আমি এইভাবেই শোধ করলাম! আমার বাবা, যিনি আমার মাথার উপর ছায়া হওয়ার কথা ছিল, তিনি আমাকে সমাজের সামনে, পৃথিবীর সামনে নগ্ন করে দিলেন! সামান্য একটা পদ সেই পদের জন্য আমার বাবা তার নিজের মেয়ের জীবনটা, তার পবিত্রতা সবকিছু তামিমের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন!”
সে জাবেদা বেগমের আঁচল খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“ও আম্মা, তুমি বলো! উনি কি আমার আসল পিতা না? আসল বাবা কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? এত সহজে নিজের মেয়ের গলায় অপমানের দড়ি পরাতে পারে? আমার দুনিয়াটা, আমার সব স্বপ্ন সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে আম্মা। আমার বুকটা এমন ভাবে ফেটে যাচ্ছে, আমার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তেই আমার আত্মাটা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাক!”
জাবেদা বেগমও দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তার স্বামী যে ক্ষমতার লোভে এতটা নীচে নামতে পারে, এতটা ঘৃণ্য হতে পারে এই সত্যটা ওনার বিস্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। মেয়ের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তিনি কিছু বলতে পারলেন না।
#চলবে…
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২২
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
পুরো গ্রামে শিউলির অপবাদ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের মুখে মুখে এখন শুধু একটাই আলোচনা। ছিঃ ছিঃ করছে সবাই। বিয়ের খবর শুনে কানাঘুষা কিছুটা কমলেও মানুষের বাঁকা চোখের চাহনি আর বিষাক্ত কথাগুলো থামেনি। ইদ্রিস খন্দকার বাজারে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে মানুষের কটু কথা আর তাচ্ছিল্য সইতে না পেরে মুখ নিচু করে বাড়ি ফিরে এসেছেন।
নিজের রুমে ঢুকতেই এক অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন তিনি। যে স্ত্রী জীবনে কখনো স্বামীর অবাধ্য হয়নি, যে স্ত্রী ‘আপনি’ ছাড়া সম্বোধন করেনি সেই জাবেদা বেগম আজ ইদ্রিস খন্দকারের পাঞ্জাবির কলার শক্ত করে চেপে ধরলেন। তার গলার রগ ফুলে উঠেছে, চিৎকার করে বললেন,
“কু’ত্তা! তুই বাপ হইয়া মাইয়াডারে এমন শিয়ালের মুখে কেমনে দিতে চাইলি? ক ক্যামনে পারলি তুই?”
ইদ্রিস খন্দকার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। মুহূর্তের জন্য তার জবান বন্ধ হয়ে গেল। তার শান্তশিষ্ট স্ত্রী আজ যেন এক ক্ষুধার্থ বাঘিনী! জাবেদা বেগমের চোখের মণি দুটো টকটকে লাল, যেন সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ঝরছে। ইদ্রিস খন্দকার সামলে নিয়ে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে দিলেন। নিজের স্বভাবসুলভ হুংকার ছেড়ে বললেন,
“কত্ত বড় সাহস তোর! তুই আমার কলার চেপে ধরস? জ্ঞান হারাইছোস নাকি?”
কিন্তু জাবেদা বেগম আজ আর সেই ভীতু নারী নন। তিনি স্বামীর হুংকারে দমে গেলেন না, বরং দ্বিগুণ তেজে ফেটে পড়লেন,
“হ, জ্ঞান হারাইছি! তোর মতো পিশাচের ঘর করতে করতে আমার বিচারবুদ্ধি সব গেছে! চেয়ারম্যানি পদের লোভে তুই নিজের কলিজার টুকরারে বেইচ্যা দিলি? নিজের সম্মান ধুলোয় মিশাইয়া নাটক সাজাইলি? তুই বাবা নামের কলঙ্ক! তুই পুরো বাবা জাতিরে দুনিয়ার সামনে ছোট করলি!”
ইদ্রিস খন্দকার এবার বুঝতে পারলেন, গোপন কথা আর গোপন নেই। তার সাজানো ছক আজ নিজের ঘরের মানুষের কাছেই ফাঁস হয়ে গেছে।
হঠাৎ জাবেদা বেগম বিছানায় নিচ থেকে একটা দা বের করে হাতে তুলে নিয়ে চিৎকার করলেন,
“তুই ওইদিন কেন আমারে আমার বাপের বাড়ি নিয়া গেছিলি মিথ্যা কথা বলে, সেটা এখন আমার কাছে পরিষ্কার। তোরে আমি খু’ন করে দিমু! তোর মতো স্বামী আমার লাগব না। তোরে শেষ কইরা সমাজ পরিষ্কার করমু। এর জন্য বড়জোর জাহান্নামের আগুনে জ্বলমু, এর চেয়ে তো বেশি কিছু না!”
ইদ্রিস খন্দকার কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে স্ত্রীর হাত থেকে দা-টা ছিনিয়ে নিলেন। কিন্তু তার চেহারায় আর সেই রাগী মেম্বারের ভাব নেই। তিনি যেন মুহূর্তেই কয়েক বছর বুড়ো হয়ে গেছেন। হঠাৎ তার কণ্ঠ ভেঙে এল, ফুঁপিয়ে উঠে বললেন,
“বিশ্বাস করো জাবেদা, আমি বুঝতে পারি নাই আমার মেয়ের জীবনে এতটা অন্ধকার নাইমা আসব। আমার সামান্য লোভ যে আমার মেয়ের জীবনটারে এভাবে তছনছ কইরা দিব, আমি ভাবি নাই। তুমিই বলো, কোনো বাপ কি চায় নিজের মেয়ের সর্বনাশ? তোমার কি মনে হয় জাবেদা, আমার মান-সম্মান যায় নাই? আমি বাজারে মুখ দেখাইতে পারি না, মানুষ আমার মুখে থুথু দেয়!”
জাবেদা বেগম স্তব্ধ হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে মানুষটা একটু আগেও সিংহের মতো গর্জন করছিল, সে এখন একটা খাঁচায় বন্দী অপরাধীর মতো কাঁপছে। ইদ্রিস খন্দকারের চোখে পানি টলমল করছে। তিনি আরও ভাঙা গলায় বললেন,
“আমি জানতাম না তামিম আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করব। ওইদিন সন্ধ্যায় ও আমারে লোভ দেখাইল, যদি ওর কথা শুনি তবে সামনের বছর চেয়ারম্যানের গদিতে আমারে বসাইয়া দিব। সেই লোভের মোহে পইড়া আমার বুদ্ধি লোপ পাইছিল জাবেদা। আমি ভাবছিলাম অন্য কিছু গ্রামে অপরাধ করব, কিন্তু সে যে আমার কলিজার টুকরারে এইভাবে অপবিত্র অপবাদ দিয়া কলঙ্কিনী বানাইয়া ছাড়ব সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই।”
ইদ্রিস খন্দকার বলতে বলতে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। জীবনের সব দম্ভ যেন এই এক কান্নায় ধুয়ে যাচ্ছে। তিনি বিছানায় ধপ করে বসে পড়লেন। জাবেদা বেগম এতক্ষণ রাগে কাঁপছিলেন, কিন্তু স্বামীর এই অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে তিনি কেমন স্থির হয়ে গেলেন। আমাদের সমাজের শিকড় এতটাই গভীরে যে, স্বামী যতই অন্যায় করুক, তার চোখের জল দেখলে স্ত্রীর মন শেষ পর্যন্ত গলে যায়। নারী হৃদয়ের চেয়ে নরম বোধহয় এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
জাবেদা বেগম ধীরে ধীরে স্বামীর পাশে গিয়ে বসলেন। তার মাথায় হাত রেখে ভাঙা গলায় বললেন,
“তাহলে আপনি তামিমের সাথে বিয়েটা ভেঙে দিন। ওই বিষধর সাপের হাতে কেমনে আমার মাইয়াডারে তুইল্যা দিমু? যে ছেলে নিজের হবু শ্বশুরের সাথে এমন চাল চালতে পারে, সে শিউলিরে কোনোদিন শান্তি দিব না। চাই না ওরকম খারাপ ছেলের সাথে আমার কলিজার টুকরার বিয়া দিতে।”
ইদ্রিস খন্দকার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার চোখের জল তখনো শুকায়নি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“সম্ভব না জাবেদা। বিয়েটা ভেঙে দেওয়া এখন আর সম্ভব না। যদি এই বিয়ে না হয়, এখন যা একটু সম্মান আছে, তখন তাও থাকবে না। আর চেয়ারম্যানের যা হাত ওরা চাইলে আমাদের এই ভিটেমাটি থেকেও উচ্ছেদ করে দিবে। আমাদের মাইয়াটারে তখন কেউ রক্ষা করতে পারবে না।”
জাবেদা বেগম ধীরপায়ে উঠে দাঁড়ালেন। স্বামীর অপরাধবোধ তাকে কিছুটা নরম করলেও, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা কমলো না। বরং তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন একদিকে সামাজিক অসম্মান, আর অন্যদিকে তামিমের মতো পিশাচের সাথে সারাজীবনের কারাবাস। শিউলির সামনে যেন শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।
★★★
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। গোধূলির আলো মুছে গিয়ে চারদিকে ধূসর আঁধার নেমে আসছে। শিউলি জানালার শিক ধরে উদাস নয়নে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। একঝাঁক পাখি কি সুন্দর ডানা মেলে নিজেদের কুলায়ে ফিরে যাচ্ছে। দিনভর খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ঘুরে দিনশেষে তারা ফিরে যাচ্ছে আপন ঠিকানায়, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তাদের প্রিয় জোড়া।
পাখিদের সেই অবাধ স্বাধীনতা আর নীড়ে ফেরার দৃশ্য দেখে শিউলির ঠোঁটে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল। সে আনমনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“উপরওয়ালার কী অপরূপ সৃষ্টি! একটা তুচ্ছ পাখিরও নিজ সঙ্গী আছে। কত সুখে আছে ওরা যখন যেখানে ইচ্ছে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। যাকে ভালোবাসে, তাকেই অনায়াসে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে যায়। নেই কোনো সমাজের বেড়াজাল, নেই কোনো কলঙ্কের ভয়, আর নেই কোনো পারিবারিক মান-সম্মানের মিথ্যা দোহাই। অথচ মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও কতই না অসহায়! কত হাহাকার আমাদের জীবনে। কেউ সারাজীবন চেয়েও তার প্রিয়জনকে পায় না, আবার কেউ বা ঘৃণা করা সত্ত্বেও কাউকে গলায় ঝুলিয়ে নিতে বাধ্য হয়।”
শিউলি এসব ভেবেই বিচিত্র এক হাসি হাসতে লাগল যে হাসিতে সুখ নেই, আছে কেবল বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। শিউলির ছোট বোন ফুলঝুরি তার সেই হাসি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বোনের কাছে গিয়ে বসল, জিজ্ঞেস করল,
“আপা, একলা একলা কী কইতাছো?”
শিউলি ছোট বোনটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাল। যে এখনো পৃথিবীর জটিলতা বোঝে না। শিউলি প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু না। আচ্ছা, বাইরে কিসের শব্দ হইতাছে এত?”
ফুলঝুরি বেশ উৎফুল্ল হয়ে বলল, “তোমার বিয়ার লাইগা বাড়ি সাজানি লাগব, তাই জিনিসপত্র আনতাছে। জানো আপা, অনেক বড় বড় দুইটা ছাগল আনছে আব্বা!”
শিউলি আবারও সেই করুণ হাসি হাসল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, “বাব্বাহ! আমারে কোরবানি দেওয়ার লাইগা দেখি কত আয়োজন!”
শিউলি আবারও জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বসল। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল
‘আচ্ছা শিমুল ভাই এখন কী করছে? লোকটা কি এখনো আমার কথা ভাবছে?’ সে জানে, শিমুল ভাই তাকে ছাড়া বাঁচবে না। কিন্তু এই যে চারদিকে বিয়ের ধুমধাম, এই যে আলোর রোশনাই এসব কি শিমুল ভাইয়ের বুকে তীরের মতো বিঁধছে না?
পরদিন সকাল হতেই শিউলির গায়ে হলুদ। তার ঠিক পরের দিনই সেই অভিশপ্ত বিয়ে। গ্রামবাসীর কানাঘুষা থামাতে ইদ্রিস খন্দকার যেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি ভাবছেন, পেট পুরে খাবার খাইয়ে আর জাঁকজমক করে বিয়ে দিলে হয়তো মানুষের মুখ বন্ধ হবে। কিন্তু তিনি জানেন না, কাপড়ের দাগ সাবান দিয়ে মুছা যায়, কিন্তু কলঙ্কের দাগ কি এত সহজে মুছে?
★★★
মাটির অন্ধকার বারান্দায় একাকী হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে শিমুল। রাত বাড়ার সাথে সাথে মশার উপদ্রব বেড়েছে, কিন্তু শিমুলের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
আছিয়া বেগম ছেলের এই পাথর হয়ে যাওয়া অবস্থা দেখে আর সইতে পারলেন না। তিনি শিমুলের কাঁধে হাত রেখে মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
“বাপজান, আর কতক্ষণ এইখানে এইরকমে বইসা থাকবি, ক তো দেহি? রাত হইয়া গেছে অনেক। সেই বিকাল থাইকা তুই একভাবে বইসা আছোস। এহন ওঠ, ঘরে আয়।”
শিমুল মাথা তুলল না, শুধু ভাঙা গলায় বলল,
“আম্মা, তুমি ঘরে যাও। আমার ভালা লাগতাছে না।”
আছিয়া বেগম আবারও পিড়াপিড়ি করলেন,
“ওঠ না রে বাপ। সকাল থাইকা দানাপানি কিচ্ছু মুখে দিস নাই। দেখ, তোর মুখটা কেমন ছোট হইয়া শুকাইয়া গেছে। আয়, দুইটা খাইয়া ঘুমাইয়া যাবি।”
‘ঘুম’ শব্দটা শুনতেই শিমুলের ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। সে হঠাৎ ছোট বাচ্চাদের মতো তার মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শিমুলের দীর্ঘদেহী শরীরটা কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে আর্তনাদ করে বলল,
“আম্মা, আমি কেমনে ঘুমাই? কালকের দিন পার হইলেই শিউলির বিয়া! আমি জ্যান্ত থাহন অবস্থায় শিউলিরে অন্য কেউ নিয়া যাইব আমি কেমনে এটা মাইনা নিমু আম্মা? আমি কি পাথর যে এইটা সহ্য করমু? আম্মা, তুমি কি একবারও বুঝতাছ না আমি কেন এতটা অক্ষম হইলাম? কেন আমি আমার শিউলিরে হারাইয়া ফেলতাছি? আমার বিরাট কষ্ট হয় আম্মা, কলিজাটা পুইড়া ছাই হইয়া যাইতেছে! আমি শিউলিরে ভালোবাসি আম্মা, অনেক ভালোবাসি!”
এত বড় ছেলের এমন বুকফাটা কান্না দেখে আছিয়া বেগম আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গেলেন। তার কোল জুড়ে বড় হওয়া ছেলেটা আজ একটা মেয়ের জন্য এভাবে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছে, এটা সহ্য করা কোনো মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বুঝতে পারছেন, শিমুল কেবল শিউলিকে ভালোবাসে না, শিউলি তার অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।
কী বলে সান্ত্বনা দেবেন তিনি? কোনো শব্দই তো এই শোকের কাছে যথেষ্ট নয়। তবুও মন শক্ত করে আছিয়া বেগম শিমুলকে টেনে তুললেন। চোখ মুছে জোর গলায় ধমক দিয়ে বললেন,
“একদম না! অনেক হইছে এই কান্দন। হ হ বুঝছি সব। এখন লক্ষ্মী পোলার মতো ঘরে চল, হাত-মুখ ধুইয়া দুইটা ভাত মুখে দে। পোলার এই হাল দেখলে মা হইয়া আমি কেমনে সহ্য করি?”
শিমুল একই স্বরে নিষ্প্রাণ গলায় বলল,
“আম্মা, আমি খাইতে পারুম না। গলা দিয়া নামব না।”
আছিয়া বেগম ছেলের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে ধরা গলায় বললেন,
“তুই না খাইলে আমিও কিচ্ছু খাই না রে বাপ। তোর পেটে দানাপানি না গেলে আমার পেটেও সইব না।”
মায়ের এই আকুলতা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা শিমুলের নেই। সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরের মেঝেতে পাতা পুরনো মাদুরের ওপর নিঃসাড় হয়ে পা ভাঁজ করে বসল। আছিয়া বেগম ভাতের থালা নিয়ে পাশে বসলেন। পরম মমতায় ভাত মেখে এক নলা শিমুলের মুখে তুলে দিলেন।
শিমুল কোনো প্রতিবাদ করল না। সে শুধু কলের পুতুলের মতো মুখটা নেড়ে চিবিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একি! প্রতিটি ভাতের গ্রাস যেন তার কাছে একেকটি পাথরের টুকরো। চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে ভাতের গ্রাসগুলো ভিজে যাচ্ছে। এই অন্ন তার কাছে আজ বিষের চেয়েও ভয়ানক, প্রতিটি গ্রাস গিলতে গিয়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
শিমুল কোনো মতে কয়েক লোকমা ভাত গিলে নিয়ে এক ঢোক পানি খেল। তারপর আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা নিজের অন্ধকার ঘরে চলে গেল। আছিয়া বেগম ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আর আটকালেন না। তিনি জানেন, এই ক্ষত মলম দিয়ে সারানোর মতো নয়।
শিমুল নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের মেম্বার বাড়ির সেই আলোকসজ্জা। শিউলিদের বাড়ির ওই ফটফটানি আলো শিমুলের অন্ধকার বুকটাকে বিদ্রূপ করছে।
★★★
রাত তখন গভীর নিশি। নিস্তব্ধতায় মোড়া পুরো গ্রাম যেন কোনো এক মায়াবী ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে। মাঝে মাঝে গাছে বসে থাকা রাতজাগা পাখিরা অদ্ভুত গলায় ডেকে উঠছে। ঠিক এই নির্জন প্রহরে, সব বাধা আর ভয় উপেক্ষা করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল এক মানবী কন্যা।
ভালোবাসার টান কি এতটাই তীব্র হয়? প্রেম কি সত্যিই কোনো অদেখা চুম্বকের মতো হৃদয়কে আকর্ষণ করে, যার কারণে জীর্ণ খাঁচা ভেঙে শিউলি এই গভীর রাতে বেরিয়ে আসার সাহস পেল? শিউলির হাতে একটা টিমটিমে হারিকেন। ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে সে সাবধানে হেঁটে যাচ্ছে পুকুর ঘাটের দিকে।
ঘাটে পৌঁছাতেই দেখল, স্বচ্ছ পানির দিকে পিঠ দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল। শিমুল জানত না এই মুহূর্তে শিউলি এখানে আসতে পারবে কি না, তবুও অদৃশ্য এক সুতোর টানে সে দাঁড়িয়ে ছিল। মনের কোনো এক কোণে গভীর বিশ্বাস ছিল তার ‘ফুল’ আসবেই।
শিউলি পেছন থেকে অতি গভীর আবেশে ডাকল,
“শিমুল ভাই…”
সেই চেনা কণ্ঠস্বর শিমুলের কানে পৌঁছাতেই তার বিষাদগ্রস্ত মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে দ্রুত পায়ে শিউলির কাছে এগিয়ে এল। শিউলির হাতের হারিকেনের মৃদু আলোয় অন্ধকার চিড়ে দুটি মানব-মানবীর মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল। এই টিমটিমে আলোয় তারা একে অপরের চোখের ভাষায় জমে থাকা হাজারো না বলা কথা আর গভীর ভালোবাসা পড়তে পারছে।
শিমুল অপলক চেয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বলে উঠল,
“জানতাম… আমার বিশ্বাস আছিল আমার ফুল আইবো। আমারে ছাইড়া তুই থাকতে পারবি না শিউলি।”
শিউলি হারিকেনটা মাটিতে রেখে শিমুলের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল আর ঠোঁটে এক বুক দীর্ঘশ্বাস।শিউলির কথায় শিমুল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শিউলি জানত, এই পুরুষটা তাকে কতটা আগলে রাখে। শিউলি ফিসফিস করে বলল,
“আমিও জানতাম আমার শিমুল ভাই আমার সাথে দেখা না কইরা ঘুমাতে পারে না।”
বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় কাটল দুজনের। পুকুর পাড়ের শীতল বাতাস শিউলির ওড়না উড়িয়ে দিচ্ছে। শিউলি এবার সরাসরি শিমুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার গায়ে হলুদ সকাল হইতেই, তার পরের দিন বিয়া। কী করবো আমি শিমুল ভাই?”
শিমুল মাথা নিচু করল। অসহায় স্বরে বলল,
“তুই বল কী করমু? মেম্বার চাচার লোকজনের সাথে কি আমি পারুম?”
সহসা শিউলি দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
“যুদ্ধ করতে হবে শিমুল ভাই।”
শিমুল অবাক হয়ে শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল। শিউলির চোখে আজ ভিন্ন এক তেজ। শিমুল ম্লান হেসে বলল,
“যুদ্ধের প্রস্তুতি নিস না ফুল। তোর এই প্রেমিক ভালোবাসতে ছাড়া আর কিছুই জানে না।”
“ভালোবাসার চাইতে বড় অস্ত্র আর হতে পারে না শিমুল ভাই। এতটুকুই যথেষ্ট জীবন পার করার জন্য। পালিয়ে যেতে পারবে আমাকে নিয়ে?”
শিমুল চমকে উঠল। তার সাধারণ জীবনে ‘পালিয়ে যাওয়া’ শব্দটা অনেক বড় পাহাড়ের মতো শোনাল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“পালাবো? কই পালাবো?”
“এমন কোনো রাজ্যে যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না, জানবে না। আমাদের ভালোবাসায় বাঁধা দেওয়ার কেউ থাকবে না। সেখানে পালিয়ে যাব সারাজীবনের জন্য। যাবে তো?”
শিউলি ভীষণ করুণা ভরা মিনতি নিয়ে তাকাল।
শিমুল আর এক মুহূর্ত ভাবল না। শিউলির চোখের জল আর তার আকুতি শিমুলের ভেতরের দ্বিধা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“হ যামু। তুই যেইহানে যাবি, আমি সেইখানেই যামু।”
শিউলি হেসে উঠল। যেন এক মুহূর্তেই তার সমস্ত দুঃখ উবে গেছে। সে বলল,
“আইচ্ছা শিমুল ভাই। আগামীকাল রাইত ঠিক এই জায়গায় তুমি থাকবা। আমরা পালিয়ে যাব। আমাদের অনেক সুন্দর একটা সংসার হবে আমার স্বপ্নের সংসার।”
শিউলি আর দেরি করল না। সাবধানে পা ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুটা পথ গিয়ে সে অভ্যাসবশত পেছন ফিরতেই দেখল, শিমুল ভাই তখনো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে চাতক পাখির মতো তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
#চলবে…
