#আটপৌরে
পর্ব :০১
লেখিকা : লিলি
বড়ো ভাইয়াকে মা নিজের পছন্দেই বিয়ে করিয়ে ছিলেন।একদম গ্রামের গরীব ঘরের, রূপবতী, কমবয়সী মেয়ে ছিলো আমাদের ভাবী।
মা বলতেন,কম বয়সী মেয়েই ভালো, তেজ দেখাবে না।আর,বাপের বাড়ি ধনী হলে তো বড়াইয়ের চোটে টেকাই দায় হয়ে যাবে।এছাড়া,রূপবতী হওয়া তো একপ্রকার মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলকই।সেটি আর আলাদা করে বলবার দরকার নেই!
ভাবীর বয়স সম্ভবত সতেরো বছর ছিলো।কিংবা,আঠারোও হতে পারে। কাঁচা সোনার ন্যায় গায়ের বর্ণ, চোখ দুটো টানাটানা, কি মায়াবী-নিষ্পাপ তার মুখখানি!
আমার বয়স তখন সবে এগারো।নতুন বউ নিয়ে বরযাত্রীর সঙ্গে হৈ-হল্লা করে বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যাবেলায়।
গ্রামীণ নিয়ম ছিলো শ্বাশুড়ি ধান-দূর্বা দিয়ে বরন করলে তবে বউ ঘরে ঢুকবে। বলা বাহুল্য, মুসলিম সমাজেও তৎকালীন সময়ে এই নিয়ম প্রচলিত ছিলো।
ভাবী আর ভাইয়া তাই উঠানেই দাঁড়িয়ে রইলেন।কিন্তু,মা আর আসেন না কিছুতেই।
ভাইয়া তো তবুও পায়চারি করছিলেন উঠানে।কিন্তু,বেচারি ভাবী! নতুন বউ বলে ঠায় এক জায়গাতেই বিনা নড়াচড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি।আর,প্রমাণ সাইজের মশাগুলোর নতুন বউয়ের রক্তে জমপেশ একটা আহার হয়েছিলো সেদিন বলা যায়।
সে যাই হোক,আমি ভারী অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে মা বের কেন হচ্ছেন না? আশেপাশের চাচীরা কতো করে ডাকছে কিন্তু তিনি তবুও আসছেন না।ব্যাপারটা কি?
খোঁজ নিতে মায়ের ঘরে যেয়ে দেখি তিনি মনমরা হয়ে বসে আছেন।
আমি বললাম,কি হয়েছে মা? নতুন ভাবীকে বরন করবে না? কি যে সুন্দর লাগছে বউ সাজে ভাবীকে, তুমি তো এখনো দেখলেই না….
আমার উৎসাহী ভঙ্গীতে করা গল্প মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন মা।বললেন,ঐ ছোটলোককে দেখার শখ আমার নাই।
আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
মা বললেন,দেখলি ফকিরের বাচ্চারা একটা কিছু দিলো না আমার ছেলেকে…খালি হাতে পাঠিয়ে দিলো মেয়েকে।আমরা যৌতুক চাইনি,নেহায়েতই ভালো মানুষ বলে।তা বলে কি আমাদের এমন করে ঠকাবে?তোর অশিক্ষিত চাচাতো ভাই বিয়ে করলো গত বছর।সেও তো হোন্ডা পেলো,ক্যাশ টাকা পেলো, ভর ভর্তি আসবাব পেলো মেয়ের বাপের থেকে।তা তোর বড় ভাই কি ওর চেয়ে অযোগ্য? হায় খোদা! তোর বাপও কিছুই বললো না….
মা কান্নার মতো ভঙ্গী করতে লাগলেন।আমার মনে হলো,আসলেও তো কথা ঠিক।আমার এতো গুণী,ভালো ভাইটা তো মস্ত ঠকা ঠকলো।পরক্ষণেই আবার বললাম,কিন্তু আম্মা ভাবীরা তো গরীব…..
মা ধমকে উঠলেন।বললেন,চুপ কর গাধা।গরীব বলে কি মেয়ের বিয়েতে কিছু দিবেনা জামাইকে?
আমি মেনে নিলাম।মায়ের রাগের কারণ আছে বটে।
বরন করতে এরজন্যই তো যাচ্ছেন না মা।
তবে, মাকে শেষমেশ উঠতেই হলো।কেননা,বাবা এসে ধমকালেন।বললেন,এইসব কেমন ছোটলোকিপনা? নতুন বউয়ের আজ প্রথম দিন এবাড়িতে।সে কি ভাবছে?
জানিনা বড়ো ভাবী সেদিন কি ভেবেছিলো!
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করেছিলো শেষে।
এরপরও মা ছিলেন রাগ করে।বাবা অমন করে ধমকালেন ভরা বাড়িতে।তাছাড়া,ভাইয়া কিছুই পেলো না সেই শোক তো আছেই। যৌতুক যেহেতু চায়নি, পাত্রীপক্ষের তো উচিৎ ছিলো খুশি হয়ে আরো বেশি করে যৌতুক দেওয়া।তাই নয় কি?
তাইতো,অভিমানী হয়ে মা আমার নিজের ঘরে আলো নিভিয়ে বসে রইলেন।
আমাদের ৫ ভাইবোন এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মায়ের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো বড় ভাইয়ার।শুধু মা নয়,পুরো পরিবারের প্রতিই তার ছিলো অশেষ টান।মা বলতেন,,আমার বড়ো ছেলেটা হলো সোনার টুকরা।যে সে সোনা নয় একদম গিনী সোনা।
বাকি ভাইয়েরা যে মাকে ভালোবাসতো না কিংবা শ্রদ্ধা করতো না তা কিন্তু নয়।তবে,মেঝো ভাইয়া খানিকটা একরোখা ছিলো।নিজের মর্জি মতো চলতো।
আর,ছোট ভাইয়া মায়ের অতি আদরে বোধ করি কিছুটা বিগড়েছিলো।বাবা তাই বলতেন।
সে যাই হোক,বড়ো ভাইয়া যখন দেখলেন মা অমন করে রাতে না খেয়ে দুঃখী হয়ে একলা ঘরে বসে আছেন তখন তিনি ছুট্টে চলে গেলেন মায়ের কাছে।
কত ইনিয়েবিনিয়ে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে,মায়ের কান্নাকাটি, অভিযোগনামা শুনে শেষে নিজের হাতেই মা’কে খাইয়ে দিয়ে শান্ত করে তবে ভাইয়া এলো।
মায়ের অমন কান্নাকাটির জন্য চাইলেও বাবা কিছু বলতে পারছিলেন না।
আমার তো ভাবীর উপর ভারী রাগ হয়েছিলো তখন।সে এসেই কিনা আমার মা’কে কাঁদালো!
তবে, বিয়ের প্রথম রাত যা কিনা সব মেয়ের জীবনেই এক স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকে, সেই রাত ভাবীর জন্যও স্মরণীয় হলো,তবে একটু অন্যভাবে।একা একা বাসর ঘরে তিনি বসে রইলেন বহুক্ষণ। অনেক রাত হয়েছিলো ভাইয়ার আসতে।
তাতে অবশ্য উনার জন্য আমি কোনো সহানুভূতি অনুভব করিও নি।
পরদিন সকালে মা বড়োভাবীকে বললেন, বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা সমস্ত গয়না যেনো মায়ের কাছে জমা রাখে।
ভাবীরা গরীব হলেও তার নানি,পরনানির আমলের বেশ ভালো পরিমাণের গহনাই বিয়েতে তিনি পেয়েছিলেন।
সেসব বিনাবাক্যেই মায়ের হাতে তুলে দিলেন তিনি।
দেবে নাই বা কেনো? মা হলেন এই সংসারের কর্ত্রী। মা-ই তো সামলে সুমলে রাখতে পারবে তাইনা? আর,ভাবীর গয়না তো আর মা খেয়ে ফেলবে না বরং নিরাপদেই থাকবে।কাজেই,ভাবীর তো বাঁধা দেওয়ার কারণই নেই।
যদিও পরে,ওই গয়না থেকে একটা পদ্মহার মা আপাকে বিয়ের সময় দিয়েছিলেন।আমাকেও একজোড়া কানের দুল দিয়েছিলেন পরতে।আবার,ছোট ভাইয়ার কলেজে ভর্তির সময়ও একটা আংটি বিক্রি করেছিলেন। এরজন্য, ভাবীর কাছ থেকে অনুমতীও নেন নি তিনি।অনুমতীর কিইবা আছে? ভাবী এ বাড়ির বউ।এটাই তার পরিবার।পরিবারের পিছে কিছু গয়না খরচা করলে তার কি সমস্যা হবে কোনো? এমনিও তো মেয়েকে বিয়ে দিয়েই তার বাবা মা ঝাড়া হাত-পা হয়েছেন। কখনো তো জৈষ্ঠ্যমাসে আম-কাঁঠাল পাঠাননি।কিংবা,শীতকালে পিঠাপুলী।রোজার ঈদে ইফতারের সামগ্রী।অন্তত প্রথম কোরবানির ঈদে একটা খাসিই দিতো।অতোটুকু সামর্থও বুঝি ছিলো না? আচ্ছা সব বাদ।মেয়ের পরিবারের জন্য তো জামা-কাপড় কিনে পাঠাতে পারতো।তা সেসব কিছু কি করেছে কখনো?
মায়ের এসমস্ত যুক্তি আমি মন দিয়ে শুনতাম।ভাবতাম মা ঠিক কথাই তো বলছেন।মা কি কখনো ভুল বলতে পারেন?
ভাবীকে যদিও এরজন্য মা অনেক কথা শোনাতেন।মাঝেমাঝে আমার খারাপ লাগতো।বেচারি কেমন টলোমলো জল ভরা চোখে চাইতো অসহায়ের মতো।
কিন্তু,সেই খারাপ লাগা ছিলো ক্ষণস্থায়ী। মা বলতেন,ওর কর্মদোষেই তো ও গালি খায়।নইলে আমার তো ঠেকা নাই ওকে গালি দেবার।
কথাটা সত্যি।ভাবীরও দোষ আছে।নইলে,কি করে বংশের প্রথম সন্তান হিসেবে একটা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে বসলো?
আমরা তো উনার বাপের বাড়ি গেলাম মনমরা হয়েই।নবজাতক কন্যাকে দেখতে। হ্যাঁ উনার গরীব বাপের বাড়িতেই ডেলিভারি হয়েছিলো।যতো খরচাপাতি সব উনার বাপই করেছিলো।করবেই তো,নানা হয়ে নাতনির জন্য এতটুকু করবে না? যদিও সেই নাতনি মূলত বেড়ে উঠবে আমাদের বংশ পদবী নিয়েই।তাতে কি?
যাহোক,ভাবীকে ফিরিয়ে আনা হলো বাড়িতে।মা সেবার কতো কথা শোনালেন।বললেন,অভাগীর পাল্লায় পরেছে আমার ভাই। মেয়ে জন্ম দিয়েছে তার গায়ের রং-ও উজ্জ্বল না।যদিও ভাবী ফর্সা, তবে ভাতিজী হয়েছে আমার ভাইয়ার মতো।বাবার গায়ের রং-ই সে মূলত পেয়েছে।মাকে আমি তা বুঝাতে চাইলে মা ধমকে ওঠেন।বলেন,,তোর ভাবী সুন্দর সুন্দর জিনিশ পাতি দেখে নাই।এরজন্য এই হাল।বাচ্চা পেটে নিয়ে সুন্দর মানুষ দেখতে হয় বেশি করে।আরো কি কি যেনো খাবারের নাম বললেন যেগুলো খেলে বাচ্চা কালো হয়।আমার অতো শতো মনে নেই। ভাবী নিশ্চিত বাপের বাড়ি গিয়ে সব অনিয়ম করেছে।যদিও শুরুর দিকে আমাদের বাড়িতেই ছিলো ভাবী।আরকি,যদ্দিন বাচ্চা পেটে নিয়েও সমানতালে সংসারের সবার ফুট-ফরমায়েশ খাটা যায়,কাজ টাজ সব করা যায় তদ্দিন আমাদের বাড়িতেই ছিলেন।এরপর,যখন তার সেবাশুশ্রূষার প্রয়োজন হলো তখন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো বাপের বাড়িতে।এখন মেয়ের সেবা-যত্ম তো মা-বাবাই করবে সেটাই তো উচিৎ,নয়কি?
যদিও,বিয়ের পরে বাবা-মা মেয়েদের জন্য পর হয়ে যায়, আর আপন হয় শ্বশুর বাড়ি।তবুও,যত্ন আত্তি ঐ পরমানুষদেরই করা উচিৎ। হ্যাঁ,আমি এই বিষয়ে প্রশ্ন করায় মা ধমকে ছিলেন তা সত্যি। তবে,আমি একাই বুঝে নিয়েছি ব্যাপারটা।
ভাবীর আসলেই অনেক দোষত্রুটি। নইলে,মা নিজে থেকে পছন্দ করে তাকে আনলো, তবুও কেনো সে মায়ের মন রেখে চলতে পারলো না?
আমাদের মা কি খারাপ? তিনি কত্তো ভালো।কত্তো ভালোবাসেন আমাদের! যদিও মাঝেমাঝে মনে প্রশ্ন জাগতো,,মা হিসেবে তো সব নারীই সেরা।কিন্তু,তা বলে শ্বাশুড়ি হিসেবেও তিনি সেরা একথা কি এত নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা যায়? তবে,সেসব প্রশ্নকে ছোট্ট মস্তিষ্কে ঠাঁই দিতাম না।মা যদি আসলেই খারাপ হতো,তাহলে বড়ো ভাইয়া নিশ্চয়ই মায়ের পক্ষ নিয়ে ভাবীকে কথা শোনাতো না।অপমান করতো না।একবার তো বড়ো ভাইয়া কি ভীষণ রেগে গেলেন! কাজ থেকে ফিরেই দেখলেন, মা কাঁদছেন ভাবীর কি একটা কথার জের ধরে।ভাইয়া তো টেনে হিঁচড়ে ভাবীকে নিয়ে এলেন মায়ের সামনে।বললেন,ক্ষমা চাও।নয়তো,আজই হবে এবাড়িতে তোমার শেষ দিন।আমার মা’কে তুমি কাঁদাও কত্তো সাহস!
ভাবী মিনমিনিয়ে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন।ধমকের চোটে শেষে আর পারেননি।ক্ষমা চেয়ে ঝামেলা চুকিয়েছিলেন।
তা,ভাবী যদি এতোই ভালো হয় তাহলে ভাইয়া নিশ্চয়ই ভাবীকে ওভাবে ক্ষমা চাওয়াতো না….যার বউ তারই তো বেশি চিন্তা হবার কথা। আমার খামোখা উল্টা পাল্টা প্রশ্ন মাথায় এনে লাভ কি?
মা খুব গর্ব করে বলতেন,,এই হলো আমার ছেলে।মা ছাড়া কিছুই বুঝেনা। বউ হলো পরের মেয়ে। বউকে প্রশ্রয় দিতে হবে কেনো? বউ থাকবে পায়ের তলায়…তাইনা?
তাইতো…তাইতো… মাথা দুলিয়ে মেনে নিতাম আমি।তবে,মা মেনে নিতে পারলেন না যখন শুনলেন আমার দুলাভাই খালি নিজের মায়ের কথায় চলে।আপার কথা পাত্তা দেয়না।কি মস্ত খারাপ ছেলে সে….ছিঃ ছিঃ।
মায়ের সঙ্গে আমিও সমান তালে ছিঃ ছিঃ রব তুলতাম।
.
এমনিতেই বড়োভাবীর জ্বালায় সংসারে অশান্তির শেষ নেই।মা কেবল হা-হুতাশ করে দুঃখবিলাস করতেন পাশের বাড়ির চাচীদের নিকট।সেই দুঃখের মধ্যে আমাদের জীবনে নেমে এলো আরো ঘোর দুঃখ।
বাবা মারা গেলেন হঠাৎ করেই।
দুদিন কেঁদে কেটে ৩য় দিন মা বড়ো ভাইয়াকে বললেন,তোর ভাই বোন গুলো তো সব ছোট।তোর বাবাও নেই।তুই বড়ো ছেলে।তোকে এবার সব কিছুর হাল ধরতে হবে।তোর যে অনেক দায়িত্ব বাবা।
বড়ছেলেদেরই তো সব দায়িত্ব হয় তাইনা? মেঝো ভাইয়া যদিও কেবল বছর দুয়েক এরই ছোট বড়ো ভাইয়ার থেকে।তবে,মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী দায়িত্ব সব কেবলই বড়ো ভাইয়ার।
তাইতো,দেশ ছেড়ে কটা টাকা বেশি উপার্জনের উদ্দেশ্যে তাকে পাড়ি দিতে হলো মিডেল ইস্টে।
দেশের চাকরিতে কয়টাকাই বা বেতন? বিদেশে কামলা দিয়েও এরচেয়ে বেশি কামানো যায়। কষ্ট-মষ্ট হবে, তাতে কি? পুরুষ মানুষ এতোটুকু কষ্ট তো করতে হবেই।
যদিও,কষ্টটাকে আমার এতোটুকু মনে হতো না।
ভাইয়া করতেন রংমিস্ত্রির কাজ।উঁচু উঁচু সব ভবনে ঝুলে ঝুলে, আরবের কাঠফাটা প্রচন্ড গরমে, জীবন- ঝুঁকি নিয়ে রাঙিয়ে তুলতেন অন্যের বাসস্থান,অফিস।
গাদাগাদি করে থাকতেন একটা রুমে ৭/৮ জন। খাবার দাবারেও কষ্ট হতো।তবুও,মাকে বলতেন, আমি ভালো আছি মা।তুমি চিন্তা করোনা।
মা ভাইয়ার চিন্তা খুব একটা করতেনও না।তার তো দুশ্চিন্তার শেষ নেই।সংসারে কতো ঝামেলা…..
ছোটভাইয়া কোথাও চান্স পায়নি।তাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে হবে।কতো টাকার ব্যাপার!
বড় আপাকেও তো এটা সেটা কতো কি দিতে হয়। আমার পড়াশোনা তো আছেই।
এছাড়া,সংসারে কি কম খরচ? সেইসব তো বড়ো ভাইয়াকেই দেখতে হবে।মা সেসবই বলতেন ভাইয়াকে।
বড়ো ভাইয়া না করলে সেসব আর কেইবা করবে?
আচ্ছা, বড়ো ভাইয়ার গল্পই কেবল করে যাচ্ছি।এবার, ভাবীর গল্পে ফিরি খানিক।
আমাদের বড়ো ভাবীর নাম ছিলো,শান্তা।নামের মতোই শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিলেন তিনি। তবে,ফুলের মতো মিষ্টি যে মেয়েটিকে শুরুতে দেখেছিলাম তার সব রূপ-লাবণ্য কিভাবে যেনো এই সংসার গ্রাস করে নিলো অবলীলায়।
ভাবীও কেমন যেনো নির্জীব হয়ে পরেছিলেন।যেনো ইটে চাপা পরা সাদা রঙা ঘাস।যেনো কাঠের পুতুলের মতো প্রাণহীন একটা জড়বস্তু,যার চোখ মুখ তো আছে কিন্তু জীবন নেই।ভাবীকে আমি আর হাসতে কিংবা কাঁদত কিংবা কোনো ধরণের অনুভূতি প্রকাশ করতে দেখতাম না।সব কাজ করতেন কিন্তু নির্জীব ভাবে।
শেষবার ভাবী কেঁদেছিলেন ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার আগে।
খুব খুব কেঁদেছিলেন।বলেছিলেন,আপনার বিদেশে যেতে হবেনা।আপনি আমাদের সাথেই থাকুন।যা রেজাকার হয় তা দিয়ে আমরা কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নেবো।অতো দূরে থাকবেন আপনি? মেয়েটা যে বাবার আদর পাবেনা।আর,যে সন্তান এখনো পেটে সে তো আপনাকে দেখবেও না।আর আমি? দয়া করে যাবেন না আমাকে ফেলে।
কতো বউরাই তো অমন আছেন যাদের কাছে টাকা-পয়সাটাই প্রধান, তবে ভাবী কিন্তু মোটেও অমন ছিলেন না।
সেদিন,ভাবীর অমন আকুল আবেদনে ভাইয়ার মন গলেছিলো কিনা জানিনা তবে তার চোখেও আমি জল দেখেছিলাম।
ওদের দুজনের চোখের জলে আমার হৃদয়ও ভিজে উঠেছিলো।মা’কে গিয়ে বলেছিলামও,কি দরকার ভাইয়াকে অতো দূরে পাঠানোর।কতো কষ্ট করতে হয় ওখানে!
মা সবসময়ের মতোই আমাকে ধমকে ছিলেন।
বলেছিলেন,নির্বোধ কোথাকার।তোর ভাবীর মায়াকান্নায় গলে গেলি নাকি? সবই ওর ঢং। ওরে কোলে নিয়ে খালি বসে থাকলেই হবে। সংসার চালাতে হবেনা?তোর ভাই কি একাই বিদেশ যাচ্ছে কাজের জন্য? কতো হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ যাচ্ছে। এই যে তোর চাচারা ভিটায় টিনের ঘর ভেঙে দালান তুললো,তোর চাচাতো ভাইয়েরা বিদেশে গিয়েছে বলেই তো?তোর ভাবী হলো রাজ্যের খারাপ।সব বিষয়ে ব্যাগ্রা দিতে ওস্তাদ।আমার ছেলেটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়েছি, এখন সে নেকা কান্না কেঁদে সব পন্ড করতে চাইছে।
হয়তো,ভাবী আসলেই খারাপ ছিলো।হয়তো মা-ই সঠিক।
তবে,আসল খারাপ কাকে বলে তা আমরা বুঝলাম মেঝো ভাইয়ার বিয়ের পরে।
মেঝো ভাইয়া যে কিনা ছোট থেকেই একরোখা গোছের। হুট করে একদিন বললেন, তিনি বিয়ে করতে চান।
মা ক্ষেপে গিয়ে বললেন,তুই কি এমন ব্যাবসা করিস? কয়টাকাই বা আয় হয়? সংসারে যৎসামান্য যেটুকু দিস তাও বন্ধ করার তাল করেছিস?
মেঝো ভাইয়া জানালেন,সংসারে তিনি যেটুকু টাকা দেন তা দেওয়া বন্ধ হবেনা।মা যেনো নিশ্চিন্ত থাকেন।আর,তার বিয়েতেও বাড়তি চাপ নিতে হবেনা কারো।কিছু টাকা তার জমানো আছে,সেগুলো দিয়েই বিয়ের কাজ সারবে সে।
মা যেনো একথায় আকাশ থেকে পরলেন।আমার দিকে চেয়ে বললেন,দেখলি নিতু? তোর ভাই কি বললো?তা হ্যাঁ রে তোর জমানো টাকাও আছে আলাদা করে? অভাবের সংসারে কটা টাকা বেশি দিস না।কিন্তু,টাকা ঠিকই জমাতে পারিস।
মায়ের গলা ভর্তি অভিমান।মেঝো ভাইয়া বললেন,টাকা পয়সা কিছু তো জমাতে হবেই।আমার তো ভবিষ্যৎ আছে।সংসারে যদ্দুর সম্ভব দিচ্ছি তো।নিজের জান তো আর দিয়ে দিতে পারিনা তাইনা? আর,অভাবের সংসারই বা বলছো কেনো? আমাদের তো অভাব হবার কথা না।তোমার ছোট ছেলে সারাবছর আড্ডাবাজি করেছে,পড়াশোনা করেনি তাই চান্স পায়নি।এরজন্য, লাখ লাখ টাকা খরচ করে তাকে প্রাইভেটে পড়াতে হবে কেন? বাড়ির পাশে কি সরকারি কলেজ ছিলো না? তাছাড়া,তোমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাকেই বা তোমার এতো এতো জিনিশপত্র পাঠাতে হবে কেনো?এসব করেই তো খামোখা টাকা নষ্ট করো? সবাইকে তো বুঝে শুনে চলা উচিৎ। সবাই ইচ্ছা মতো ফূর্তি করবে আর একজন খালি জীবন দিয়ে খেটে মরবে তা তো হয়না।এখন,বড়ো ভাইয়া যেহেতু নিজের ইচ্ছাতেই খাটছেন আমি ওবিষয়ে কিইবা বলতে পারি।তবে,হ্যাঁ আমি ওভাবে পারবো না।
– তা পারবি কেন? তোর তো ওর নখের যোগ্যতাও নেই।তুই হলি স্বার্থপর।
মেঝোভাইয়া কোনো তর্কে আর জড়ালো না।
পরদিন মা কান্নাকাটি থামিয়ে শেষে পাত্রী খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তবে,মেঝো ভাইয়া জানালেন পাত্রী তার পছন্দ করাই আছে।মা’কে আর কষ্ট করতে হবেনা।
সে ছবি দেখালো।মা এবার আর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সইতে পারলেন না।খুব হৈচৈ করলেন।শেষে বিদেশে বড়ো ভাইয়াকে ফোন করে বিচারও দিলেন।
তিনি মায়ের মুখে এসব শুনে মেঝো ভাইয়াকে বোঝালেন খুব করে।যদিও সে ছেলে কারো কথা শোনবার মানুষই না।
নিজের পছন্দের মেয়েকে শেষ অবধি সে বিয়ে করেই ছাড়লো।মেঝো ভাবীর নাম জারিইয়াহ। আনকমন এ নামের অর্থ : প্রতিবাদী, সাহসী, নির্ভীক নারী।
কি অদ্ভুত একটা নাম তাইনা?
নাম যাই হোক মানা যায় কিন্তু,মেঝো ভাবীর বয়স যে ছিলো চব্বিশ! শুনে তো মা ভীড়মি খেলেন একপ্রকার।কুড়িতে যেখানে মেয়ে মানুষ বুড়ি হয়ে যায় সেখানে মেঝো ভাইয়া এ কাকে বিয়ে করলো? আবার নাকি এমএ পাশ করা মেয়ে।হায়রে পোড়া কপাল!
তার উপর,মেঝো ভাবীর গায়ের রংও কিছুটা চাপা। আরকি,বড়ো ভাবীর মতো অতো বেশি ফর্সা না।
অবশ্য, তাকে অসুন্দরও বলা যাবেনা।চোখ দুটোতে মায়ার চেয়েও বেশি বুদ্ধির ঝিলিক।নাক- মুখ,চেহারায় কেমন একটা ধারালো ভাব।এ সৌন্দর্য অন্যরকম।একে ঠিক চাঁদের মতো বলে উপমা দেওয়া যায়না।এ যে সূর্যের মতো তেজস্বী সৌন্দর্য!
মেঝো ভাবী যবে এবাড়িতে প্রথম এলো বাড়িতে তখনও সেই পূর্বের মতোই মাতম।
মা চেঁচামেচি করে বিলাপ করছেন।কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, এই ডাইনী নিশ্চিত যাদু টোনা করে আমার ভোলাভালা ছেলেটার মাথা খেয়েছে।নইলে,আমার ছেলে এই মেয়েকে কি বুঝে ভালোবাসবে?
মায়ের আহাজারিতে কালক্ষেপন দেখে মেঝো ভাবী আর দাঁড়ালেন না উঠানে।সোজা ঘরে ঢুকে গেলেন, কোনো বরন টরন ছাড়াই………
.
চলবে।
