#মুখ_এবং_মুখোশ (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
পুতুল আমাকে যা জানায় তা নিয়ে আমি আমার ভাবনায় সবটা সাজিয়ে ফেলি। অতঃপর পুতুলের ইচ্ছেতে বাচ্চাটি নষ্ট করা হয়। সেই ঘটনার এক মাস পর আমি বাসায় ফিরি। গত এক মাস মা এবং আপা পুতুলের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করে। তারা চেয়েও ভালো আচরণ করতে পারেনি। আমি তাদের বিষয়টা বুঝি। আমি বাসায় ফিরতে মা এবং আপা আমাকে নিয়ে বসলো। আমাদের শোবার ঘরের দরজার পাশে পুতুল মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলো। আপা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে,“তুই আমার একটামাত্র ভাই। তোকে আমি আমার সন্তানের মতো ভালোবাসি। আমার কাছে আমার দুই ছেলে যেমন তুইও তেমন। তোর বউ আমার জন্য অনেক আদরের। কিন্তু তাই বলে তুই ভালোবাসিস, তোর বউ তোর জান বলে আমি একজন চরিত্রহীন মেয়েকে সারাজীবনের জন্য তোর পাশে সহ্য করতে পারবো না। এটা অসম্ভব ভাই।”
“আমিও তাকে মেয়ের মতো ভেবেছিলাম। শেষে সে এভাবে প্রতারণা করলো। যাই হোক আমিও চাই তুই ঐ মেয়েটাকে ছেড়ে দে। তালাক দে।”
মা এবং আপার কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকলাম। অতঃপর বললাম,“আমি জানি না সত্যি মিথ্যা। তবে পুতুলের কথাগুলো কেন জানি অবিশ্বাস করতে পারি না। আর সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে আমার মনে হয় আমি মুখ এবং মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষটিকে চিনতে পেরেছি।”
“মানে?”
মা এবং আপা কিছুই বুঝতে পারে না। আমি ধীরে ধীরে সবটা খুলে বলি। আপা তৎক্ষনাৎ বলে উঠে,“না। এটা হতে পারে না। তুই নিজের বউয়ের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় এমন একটা কথা বলবি ভাই। তোর বউ তোর কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ও যা বলছে তাই মেনে নিচ্ছিস।”
“ও কিছুই বলছে না আপা।
ও তো বলছে ও জানে না এসব কিভাবে হলো? আমি ওর কাছে জানতে চেয়েছি কোনদিন ওর কাছে কিছু অস্বাভাবিক মনে হয়েছে কি-না তখন ও বললো তোমার বাড়িতে থাকার সময় বেশ কয়েদিন রাতে ঘুমানোর পর সকালে তার অন্যরকম লাগতো। স্পর্শকাতর স্থানে ব্যথা অনুভব হতো। পুতুল সম্ভাবত তোমাকে ওর এই সমস্যার কথা বলছিলো। তাই না?”
আমার প্রশ্ন শুনে আপা হতভম্ব হয়ে যায়। আপা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। সেই সঙ্গে সে নিজেও কল্পনায় চলে যায়। সেবার ভাইয়ের বউকে আদর করে বাসায় আটদিনের জন্য নিয়ে রেখেছিলো আপা। প্রথম দু’দিন ভালো গেলেও চতুর্থ দিন পুতুল তার কাছে বলে,“গতকাল আর আজকে দু’দিন ধরে আমার কেমন জানি লাগছে আপা? শরীর খুব ব্যথা। ওখানে খুব ব্যথা করছে। কেমন জানি লাগছে।”
“শরীর খুব খারাপ করছে বুঝি?
বেশি খারাপ হলে বলো, বিকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।”
আপার কথায় পুতুল মাথা নাড়িয়ে না জানায়। এতটা খারাপ না যে ডাক্তার দেখাতে হবে। হয়তো একটা ব্যথার ঔষধ খেলেই সেরে যাবে। আপা তাই এসব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। তবে সারাদিন বেশ যত্ন নিয়েছে। বিছানা থেকে নড়তে দেয়নি পুতুলকে। খাবারটা অব্দি নিজে হাতে করে খাইয়ে দিয়েছে। আপার এসব কথা মনে পড়তে সে অবাক হয়ে বলে,“না আমার স্বামী এমন নয়।”
“আমি জানি না কিছু আপা।
তবে তোমার বাড়িতে দুলাভাই ছাড়া কোন পুরুষ নেই। আর বাচ্চাদের দ্বারা নিশ্চয় সম্ভব নয়। ওরা ছেলে মানুষ হলেও বাচ্চা। আমি বুঝদার পুরুষ বুঝিয়েছি। সেক্ষেত্রে সেই সময়ে কিছু হলে হিসাব মতো আমি ভাইয়ার উপর আর বিশ্বাস রাখতে পারছি না। তাছাড়া ঐ তারিখ আর পুতুলের গর্ভকালীন সময় হিসাব করলেও কেমন খটকা লাগে।”
আমার কথা শুনে মা এবং আপা দুজনেই হতভম্ব হয়ে যায়। আমি তাদের আমার এক পরিকল্পনার কথা জানালাম। সেটা শুনে দুজনেই রাজি হলো। তবে আপা এখনো বিশ্বাস করতে পারে না। অতঃপর আমাদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে এই কথা বলে আপা আজ বাড়ি ফিরতে রাত হবে জানিয়ে দেয় ভাইয়াকে। তাই তাকে নিতে আসতে বলে সন্ধ্যার পর। ভাইয়া রাজি হয়ে যায়।
★
সন্ধ্যাবেলা ভাইয়া এসে বাসায় শুধু পুতুলকে দেখে হাসার চেষ্টা করে বলে,“ওরা এখনো ফেরেনি?”
“না।”
এটা বলে পুতুল মলিন চোখে তাকায়। ভাইয়া শান্ত গলায় বলে,“আপনি ডিভোর্সের ঝামেলায় না গিয়ে শালাবাবুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে শুধরে নিন ভাবী। আমি চাই না আপনাদের সংসারটা ভেঙে যাক। একটা সুযোগ সবারই পাওয়া উচিত।”
“সেটাই। নাকি নিজের অপরাধবোধ থেকে কথাটা বলছেন। আপনার অপরাধে একটা নিরীহ মেয়ের সংসার ভেঙে যাচ্ছে সেই অনুশোচনা থেকে কথাটা বলছেন না তো?”
পুতুলের মুখে এই কথা শুনে ভাইয়া হতভম্ব হয়ে যায়। সেই সঙ্গে তার চোখেমুখে একটা ভয় দেখা যায়। ভাইয়া কোনরকম বলে,“আপনি কি বলতে চাইছেন?”
“আমি আপনাকে দেখেছি সেদিন ভাইয়া।
আবছা হুঁশ হওয়া আমি আপনাকে ঘর থেকে বের হতে দেখেছি। আপনিই ছিলেন। হ্যাঁ আপনিই ছিলেন।”
ভাইয়া পুতুলকে এসব ভুলবাল কথা বলতে বারণ করে। পুতুল একই কথা বলে যায়।দুজনার কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে পুতুল বলে,“আমি আপা এবং সবাইকে সব বলে দিবো। আমি আর আপনাকে গোপন করবো না।”
“একদম না।
আমি কিছু করিনি ভাবী। আপনি আমাকে মিথ্যা দোষারোপ দিবেন না। আর হ্যাঁ আপনি এখন বললেই সবটা সত্যি হয়ে যাবে না তো। আমার স্ত্রী আপনি বললেই বিশ্বাস করবে নাকি যে আমি ঘুমের মধ্যে আপনার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছি।”
“আমি তো একবারও বলিনি ঘুমের মধ্যে আপনি এটা করেছেন। তারমানে আমার সন্দেহ সত্যি?”
পুতুলের মুখে এই কথা শুনে ভাইয়া পুরো ঘাবড়ে যায়। অতঃপর পুতুলের কাছে ধরা পড়ে গেছে বুঝে ভাইয়া ক্ষমা চায়৷ সে তাকে ক্ষমা করে দিতে বলে। এসব কথা কাউকে না জানাতে বলে। সেই সঙ্গে কথা দেয়, পুতুলের সংসারটা যাতে না ভাঙে সেটা সে দেখবে। এই সময়ে ভেতরের ঘরে অন্ধকারে থাকা আপা বের হয়ে বলে,“আর আমার সংসার ভাঙাটা কিভাবে আটকাবে?”
ভাইয়া আপাকে দেখে পুরো চমকে যায়। তখন আমি এবং মায়ও বেরিয়ে আসি। ভাইয়া বুঝতে পারে এটা তার মুখ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়ার একটা প্লান ছিলো। বুঝতে পেরে সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে।
____
পুতুলের সবসময় আপা এবং ভাইয়াকে খুব ভালো লাগতো। ভাইয়াকে সে সবসময় যত্নশীল একজন স্বামী, একজন দায়িত্ববান বাবা হিসাবে দেখেছে। একটি মেয়ে তার জীবনে যেমন সঙ্গী চায় ভাইয়া তেমন। তাই তো আপার বাসায় গিয়ে থাকতে পুতুলের ভালো লাগতো। সেই ভালো লাগাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। এই ভদ্র মানুষটির ভদ্র মুখের আড়ালে থাকা মুখোশটি পুতুল বা আপা কেউ দেখতে পায়নি। এই মানুষটি কত সুন্দর তার মায়ের, নিজের স্ত্রী এবং সন্তানদের খেয়াল রাখছিলো। এই তো পুতুল যখন বাড়িতে গেল তখন বউয়ের কষ্ট হবে বলে নিজ হাতে রান্না করলো। এই মানুষটির সবকিছু পুতুলকে মুগ্ধ করতো। তাকে বড় ভাইয়ের নজরে দেখতো। কিন্তু সেই মানুষটি তাকে ভিন্ন নজরে দেখতো। খুবই নোংরা নজরে। পুতুলের সঙ্গে কথা বলে ভাইয়া বুঝতে পারতো এই মেয়ে তেমন নয়। তাই তার সম্মতিতে তার সঙ্গে কিছুই করা যাবে না। এটা বুঝতে পেরে সেদিন নিজের মনের নোংরা বাসনা পূরণ করতে ভাইয়া নিজ হাতে সবার জন্য দুধ দিয়ে একটি আইটেম বানায়। যেটার মাঝে তার মায়ের ঘুমের ঔষধটা মিশিয়ে দেয়। ঠান্ডা মাথায় খুব সুন্দর পরিকল্পনা ছিলো তার। আর এটায় কাজও হয়। খাবার খেয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝে সবাই ঘুমাতে চলে যায়। সেই সুযোগে ভাইয়া তার নোংরা বাসনা নিজেরই বউয়ের ভাবীর সঙ্গে পূরণ করে। কাজ শেষে পুতুলকে নিজেই পরিস্কার করে কাপড় পড়িয়ে দিতো। ভাইয়া যেহেতু নিজে তার মায়ের জন্য ঔষধ সহ সব কিনতো তাই সে এটার কার্জকারীতা সম্পর্কে সব জানতো। কাকে কতটা দিতে হবে সব। সেভাবেই প্রথম দিন সফল হওয়ায় তার মনের নোংরা বাসনা আরও তীব্র হয়। অতঃপর পরপর চারদিন সে একই কাজ করে। শুধু সেবারই শেষ বার নয়। এই ঘটনা পুতুল যে শেষবার আটদিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছে তার আগেরবারের। যখন সে পাঁচদিনের জন্য ছিলো। অতঃপর সেই সাহসে আবার একই কাজ করে সে। যার ফলস্বরূপ পুতুল গর্ভবতী হয়ে যায়। পুতুলের কাছে ঐ সময়ে শরীর খারাপটা অস্বাভাবিক লাগেনি। কারণ সে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি সে যে মানুষটিকে এত ভালোভাবে সে এতবড় কান্ড ঘটাতে পারে। তাই তো ওসব ছোটখাটো বিষয় এড়িয়ে গিয়েছিলো।
____
এসব জানতে পেরে সবাই ভেঙে যায়। আপা তো হাউমাউ করে কান্না করে দেয়। সে ভাইয়ার কলার চেপে ধরে বলে,“এত বছরের ভালোবাসার প্রতিদান এটা দিলে। সংসার, সন্তান, কারো কথা ভাবলে না? কিছু না?”
ভাইয়া বারবার সবার কাছে ক্ষমা চায়। তবে কেউ কোন কথা বলে না। পুতুল তো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে এসে আমার পিছনে লুকিয়ে থাকে। আমি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম,“আপনাকে আমি অনেক সম্মান এবং বিশ্বাস করতাম ভাইয়া। আপনি এতবড় জঘন্য কাজটা না করলেও পারতেন। আপনার শাস্তি হোক বা না হোক, কিছু প্রমাণ করতে পারি বা না পারি আমি আমার আপাকে আর আপনার কাছে পাঠাচ্ছি না। আমার আপা আমার বাড়িতে তার সন্তানদের নিয়ে সম্মানের সঙ্গে থাকবে।”
“শুধু তাই নয়।
এই কুলাঙ্গারের শাস্তিও হবে। এতবড় অপরাধ করে এ পার পেয়ে গেলে, এরমতো যারা আছে তারা কখনো শুধরাবে না। তারা যুগের পর যুগ একই কাজ করে থাকবে।”
আপা কান্না থামিয়ে কঠিন গলায় কথাটি বলে। ভাইয়া যখন বুঝতে পারে এখানে ক্ষমা চেয়ে লাভ নাই তখন চলে যায়। আপা নিজেকে কঠিন দেখালেও সে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে৷ আমি পুতুল এবং মা তাকে সামলাই। অতঃপর ভাইয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। যদিও আমি করতে চাচ্ছিলাম না। কারণ ভাইয়া আপাকে ছেড়ে এবং বাচ্চাদের আপার দায়িত্ব দিতে রাজি হয়েছিলো শুধুমাত্র এই বিষয়ে মামলা যাতে না করি তাই। আমি এটাই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপা রাজি হয়নি। সে তার এক কথায় দাঁড়িয়ে ছিলো। তার কথা ভাইয়ার শাস্তি হতেই হবে। সে এমন মানুষকে জেলেই দেখতে চায়। অতঃপর প্রায় দুই বছর এই মামলা চলে। এটা নিয়ে অনেক দৌঁড়ঝাপ লড়াই হয়। যদিও লড়াইটা কঠিন ছিলো তবে মাঝপথে থেমে যাইনি। আপার জন্য যেতে পারিনি। যতবার আমি ভরসা হারিয়েছি ততবার আপা আমাদের ভরসা দিয়েছে। অতঃপর দুই বছর পর আদালত ভাইয়ার শাস্তি নিশ্চিত করে। তাকে কয়েক বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আপার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ এবং বাচ্চা দুটোকে আপার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরিশেষে, অপরাধী দেরিতে হলেও তার শাস্তি পেয়েছে। আমি এবং পুতুলও ভালো আছি। মা এবং আপা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করায় মাফ চেয়ে নেয়। যদিও পুতুল ভেবেছিলো এসবের পর আমরা তাকে সহজে গ্রহণ করবো না। কিন্তু না।যেহেতু পুতুলের কোন দোষ নেই সেহেতু তাকে গ্রহণ না করার প্রশ্নই উঠে না। দিনশেষে আমরা ভালোই আছি। আপাও ভালো আছে৷ সে তার শাশুড়ীকে নিজের সাথেই রেখেছে। এই মানুষটার সে ছাড়া কেউ নাই। তাই চেয়েও তার সন্তানের শাস্তি তাকে দিতে পারেনি আপা। আমার আপা যে কতটা মহত মানুষ তার এই বিষয়টা দেখলেই বোঝা যায়। সে এখনো তার শাশুড়ীর সেবা করাটাকে তার দায়িত্ব ভাবছে। আর সেটা পালণ করেও যাচ্ছে। তার এই গুনটা পুতুলকেও মুগ্ধ করে৷ পুতুল এখন আমাকে প্রায়ই বলে সে আপার মতোই ভালো বউ, ভালো বোন, ভালো মা, ভালো সন্তান হতে চায়। তার এসব কথা শুনে আমি শুধু হাসি। কোন জবাব দেই না। তবে মাঝে মাঝে আফসোস হয়, মুখ এবং মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে চিনতে না পারায়। তাদের চিনতে পারলে হয়তো জীবনটা এত জটিল হতো না৷ জীবনে কোন সমস্যা থাকতো না।
(সমাপ্ত)
