#মুখ_এবং_মুখোশ (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
বউ চার মাসের গর্ভবতী, খবরটি শুনে খুশি হতে পারলাম না। কারণ আমি দুই বছর ধরে বিদেশ। দুই বছর আগে তিন মাসের ছুটিতে বিয়ে করে বউ রেখে বিদেশ আসি। পারিবারিকভাবে বিয়ে হলেও বউয়ের প্রতি খুব অল্প সময়ে আমার হৃদয়ে গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়। সেই ভালোবাসার বর্ননা কোন ভাষা দ্বারা করা সম্ভব নয়। আপা যখন ফোন দিয়ে বললো,“তোর বউ চার মাসের গর্ভবতী।” তখন আমার বুকের ভেতর অসয্য এক যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। আমি প্রথমে আপার কথা বিশ্বাস করতে পারলাম না। এই তো ঘন্টা খানেক আগে বউয়ের সঙ্গে কথা হলো। সে আমাকে বললো,“তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসো।
আমি তোমাকে খুব মিস করছি।” সেই মানুষটি আমার সঙ্গে প্রতারণা করলো। না এটা আমার বিশ্বাস হলো না। আমি আপাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,“আপা তোমাদের হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। পুতুলকে একটা ভালো ডাক্তার দেখাও।”
“হ্যাঁ। তুমি এভাবেই বউয়ের প্রতি আলগা পিরিত দেখাও, আর সে তোমার অগোচরে কুকর্ম করে বেড়াক।”
আপা কিছুটা রাগ নিয়েই পুতুলের সম্পর্কে খুব বাজে কথা বলা শুরু করে। সে বলে,“আমি তো বলি প্রতি মাসে মাসে বাপের বাড়ি যাওয়া লাগে কেন? সেখানে নিজের লাঙ বানিয়ে রেখেছে, নয়তো এত ঘন ঘন বাপের বাড়ি যাওয়া লাগে। ঘটনা তো এটা।”
“আপা।”
আমি এখনো এসব বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাই কিছুটা মিনমিনে স্বরে কথাটি বললাম। আপা আমার মনের কথা বুঝলো। তাই তো কঠিন গলায় বলে,“তোর বউ সত্যি গর্ভবতী। ডাক্তার দেখিয়েছি এবং সেখান থেকে নিশ্চিত হয়েছি। তোর বউ চরিত্রহীনা। তুই না মানলে কিছু করার নাই। এখন বল তোর বউয়ের সঙ্গে আমরা কি করবো?”
এই পর্যায়ে আপার থেকে ফোন নিয়ে মা কান্না কাটি শুরু করে দেয়। সে মনে কষ্ট নিয়েই বলে,“এই মেয়েটাকে আমি কত ভালোবেসেছিলাম। একদম নিজের মেয়ের মতো ভেবেছি। আর সে কি-না এতবড় কান্ড ঘটালো।”
আমি আপা এবং মায়ের কথা শুনে চুপ করে রইলাম। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাই না। মা এক পর্যায়ে বলে,“এই চরিত্রহীন মেয়ের জায়গা আমার ঘরে হবে না। যে আমার সোনার টুকরো ছেলেটার ভালোবাসা বুঝলো না, পেটে পাপ নিয়ে ঘুরছে তার সঙ্গে আমি এক ঘরে আর থাকতে পারবো না। কিছুতেই না।”
আমি তাদের কথা শুনে ফোন কেটে দেই। আমার ভেতরে যে প্রলয় চলছে তা বলে বোঝাতে পারবো না। আমার এই অনুভূতি কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি কিছুটা ভেবে পুতুলের ফোনে ফোন দিলাম। ফোনটা বেজে কেটে গেল। কেউ ধরলো না। আমি কিছুটা হতাশ হলাম। মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজের অপরাধ প্রকাশ পেয়ে গেছে সেই ভয়েই কি সে ফোন তুললো না নাকি ঘটনা ভিন্ন। হঠাৎ আমার স্মৃতির পাতায় আমাদের পাকা দেখার ঘটনাটি মনে পড়ে গেল। আমাদের দু’জনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া হলো। সেই সময়ে আমি পুতুলকে স্পষ্ট ভাষায় বলি,“দেখুন আমি প্রবাসী। বিয়ের দুই মাসের মাথায় আমাকে বিদেশ যেতে হবে। অর্থাৎ আমাদের দুজনার একসঙ্গে থাকার দিনগুলোর চেয়ে দূরে থাকার দিন সংখ্যায় বেশি হয়ে যাবে। আপনি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। আপনি পারবেন তো একা থাকতে?”
পুতুল কথার জবাব না দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম,“আমি বলছি না আমি আপনার সঙ্গে থাকবো না। অবশ্যই থাকবো। তবে যেহেতু দূরে থাকবো সেহেতু আমি আপনাকে শুধুমাত্র মানসিক শান্তি দিতে পারবো। অন্যকিছু নয়।
দেখুন আমি খুব বিশ্বাস করি, মেয়েদের বিয়ের আগের জীবন এবং পরের জীবনের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া সমাজে অহরহ যা ঘটছে। প্রচলিত কথাও রয়েছে প্রবাসীর বউয়ের চরিত্রের সমস্যা। এখানে আমি সেই বউয়ের দোষটা বেশি দিতে পারি না কেন জানি? কারণ বিয়ের পর সবারই একটা চাহিদা থাকে। দূরে থাকলে সব চাহিদা পূরণ হয় না। তাই আমি স্পষ্টভাবেই সবটা আপনাকে বলছি। আমি চাই না পরবর্তীতে এটা নিয়ে সমস্যা হোক। আপনি বিয়ের আগেই একবার ভেবে নিন, আপনি সত্যি এই জীবনটা মেনে নিতে পারবেন তো? আমি চাইবো পরিবারের কথায় নয় আপনি নিজে এই সম্পর্ক নিয়ে একবার ভাববেন। আপনার মন সায় না দিলে এই সম্পর্কের জন্য হ্যাঁ বলবেন না দয়া করে। আপনি যদি পরিবারকে আপনার মতামত জানাতে না পারেন তবে আমাকে জানাবেন প্লীজ। আমি চেষ্টা করবো আপনার মতামতকে সম্মান জানানোর এবং সবটা সামলে নেওয়ার।”
পুতুল আমার সব কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি এক হাসি দেয়। অতঃপর বলে,“আমি রাজি।
আপনার আগে আমাকে পাঁচজন পাত্রপক্ষ দেখেছে। তাদের মাঝে কেউ এটা জানতে চাইনি আমি তাদের পছন্দ করেছি কি-না। কিংবা আমার মতামত। সেখানে আপনি আমার এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন, এটা আমার ভীষণ ভালো লাগলো। আশা করি এটাই আপনাকে পছন্দ করার জন্য যথেষ্ট। আর হ্যাঁ আমি পারবো। আমার স্বামী আমার পাশে থাকলে আমি সংসারটা খুব ভালোভাবে করতে পারবো।”
পুরনো এই কথাগুলো মনে পড়তে বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠলো। আমাদের বিবাহিত জীবনটা কত সুন্দর ছিলো। আর আজ আমি যা শুনলাম তাতে সবটা শেষ হয়ে যেতে চলেছে। আমি এসব ভাবনার মাঝে আবার পুতুলকে ফোন দিলাম। পুতুল এবার ফোনটা ধরলো। সে ফোন ধরতে আমি বললাম,“বউ?”
পুতুল কোন কথা বললো না। আমি আবার ডাক দিলাম। এবার পুতুল হাউমাউ করে কান্না করে দিলো। আমাকে বললো,“বিশ্বাস করো আমি জানি না এসব কিভাবে হলো? আমার গর্ভে সন্তান। আমি জানি না এসব কিভাবে হলো? বিশ্বাস করো জানি না।”
“তারমানে সত্যি তুমি গর্ভবতী?”
আমার প্রশ্নটি শুনে পুতুল আরও শব্দ করে কেঁদে দিলো। আমি মলিন গলায় বললাম,“কে সে?”
“কে?”
পুতুল বুঝতে না পেরে কান্নারত অবস্থায় বললো। আমি মনেমনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,“তোমার বাচ্চার বাবা।”
আমার মুখে এই কথা শুনতে পুতুল উচ্চশব্দে কান্না করে দিলো। কান্নার মাঝে কিছু বলছিলো৷ কিন্তু এবার আর তার কথা বোঝা যাচ্ছে না। আমি বললাম,“কেন ঠকালে আমায়?”
“আমি তোমায় ঠকাইনি।
বিশ্বাস করো তোমাকে ঠকাইনি। আমি জানি না আমি কিভাবে গর্ভবতী হলাম। আমি তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
পুতুলের কথা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। এটা কেমন কথা? কি বলছে সে? আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। পুতুল কান্নারত অবস্থায় বলে,“বিশ্বাস করো আমি খারাপ মেয়ে নই। আমি কারো সঙ্গে খারাপ কিছু করিনি। কখনো করিনি। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে কখনো সেভাবে ভালোবাসিনি। তুমিই আমার সব। আমার জীবন। আমার মরন। আমার সবকিছু। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমি কিছু করিনি।”
আমি পুরো হতবাক হয়ে গেলাম। পুতুল যত ভাবে সম্ভব সেভাবে আমাকে বোঝাচ্ছে, সে কারো সাথে কিছু করেনি। সে কোন সম্পর্কে নাই। আমি বেশ কিছুক্ষণ তার কথাগুলো ভেবে শান্ত গলায় বললাম,“তোমার সাথে মা বা আপা কেমন আচরণ করে? তারা তোমাকে পছন্দ করে না? তোমাকে কি তারা কোনভাবে কষ্ট দেয়?”
আমার কথাগুলো শুনে পুতুল কিছুটা থমকে যায়। সে নরম গলায় বলে,“না তো। তারা আমাকে খুব ভালোবাসে। আমি বিয়ের আগে শাশুড়ী এবং ননদ নিয়ে যা ভাবতাম তেমন তারা নয়। তারা খুব ভালো। তারা তোমাকে খুব ভালোবাসে। যার সুবাদে আমাকেও অনেক ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে। তারা তো আমাকে মেয়ে এবং বোনের মতো দেখে।”
এটা শুনে আমি কি বলবো ভেবে পাই না? তাদের মাঝে সম্পর্ক খারাপ হলে নাহয় ভাবতাম আপা বা মা কষ্ট থেকে হয়তো পুতুলকে তাড়াতে এটা করেছে। আমার একবার মনে হলো পুতুল হয়তো সাংসারিক সমস্যা লুকাচ্ছে। তাই অনেকভাবে তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম৷ না তেমন কিছুই নয়। আমার মা এবং আপা খুবই ভালো আচরণ করে তার সঙ্গে। এই ঘটনার পর একটু খারাপ আচরণ করেছে। তারা মানতে পারছে না তার ভাই, তার সন্তানকে ঠকিয়ে পুতুল এই কান্ড ঘটিয়েছে। কথাগুলো শুনে আমার নিজের প্রতি নিজেরই রাগ হলো। আমি আমার মা এবং আপাকে নিয়ে কি না সন্দেহ করেছে। এই সময়ে আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ যখন কোন বউ তার ননদ এবং শাশুড়ী সম্পর্কে গুনগান করে তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে ঐ বউকে তারা মাথায় করে রেখেছে। আজকাল অতিরিক্ত যত্ন না করলে কোন বউ এভাবে তাদের প্রশংসা করে না। তাই নিজের ভাবনা নিয়ে নিজেই লজ্জিত হলাম। সত্যি বলতে এই সময়ে মাথা কাজ করছে না। পুতুলের কথার সঙ্গে কর্ম মিলছে না৷ সে গর্ভবতী অথচ সে কিছু করেনি। আমি এখন কি করবো ভেবে পেলাম না?
পুতুলের সঙ্গে কথা বলা শেষে আপাকে ফোন দিয়ে বললাম,“আপা আর একবার টেস্ট করে দেখো।” আপা আমার উপর রাগ দেখাচ্ছিলো। তবে আমি অনুরোধ করায় রাজি হলো। সেদিন রাতেই একটি ক্লিনিকে গেল আবার টেস্ট করাতে।
আমি ভেবেছিলাম রিপোর্ট হয়তো ভুল। এবার অন্তত নেগেটিভ আসবে। কিন্তু না। আমাকে হতাশ করে দিয়ে এবারও একই রিপোর্ট আসলো। পুতুল সত্যি চার মাসের গর্ভবতী। এবার পুতুল যখন বলছিলো, সে সত্যি জানে না এই বাচ্চা কার। কিভাবে হয়েছে। তখন আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। রাগ নিয়ে তাকে কিছু কথা শুনিয়ে দেই। এটা আদৌ সম্ভব। সে গর্ভবতী সে জানে না তার বাচ্চার বাবা কে? আপা এবং মা পুতুলকে নিয়ে আমার মতামত জানতে চাইলো। আমি শুধু বললাম,“পুতুল যদি বাচ্চাটা না রাখতে চায় তবে নষ্ট করে ফেলো। আর ও বাড়িতেই থাক। আমি দেশে আসার চেষ্টা করছি। অতঃপর যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিবো।”
মা এবং আপা আমার কথায় খুশি হলো না। যে মেয়েটা আমাকে ঠকালো তার প্রতি আমার এত নমনীয় আচরণ তারা মেনে নিতে পারছে না। এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি কেন জানি না চেয়েও পুতুলকে অবিশ্বাস করতে পারছি না। এদিকে পুতুলও ফোন দিয়ে খুব কান্না কাটি করছে। সে বারবার বলছে,“আমি সত্যি কিছু করিনি। আমি জানি না এসব কিভাবে হলো? আমাকে ছেড়ে দিও না। আমি ম রে যাবো। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। একদম বাঁচবো না। আমার তুমি ছাড়া কে আছে বলো? বাবা, মা নাই। ভাইয়ের সঙ্গে মাসে দুটো দিন জায়গা হলেও সারাজীবন হবে না। তুমি আমাকে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিও না। আমি শেষ হয়ে যাবো।”
আমি পুতুলের কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তবুও নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বললাম,“তোমার এমন কোন দিনের কথা মনে আছে যেদিন তোমার মনে হয়েছে তোমার সঙ্গে অস্বাভাবিক কিছু হচ্ছে বা হয়েছে?
’
’
চলবে,
