#নিয়তির_পরিহাস [০১]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
নিজেদের বেডরুমে হাসবেন্ড ও বেস্টফ্রেন্ডকে অন্তরঙ্গ অবস্থা পেয়ে আটমাসের প্রেগন্যান্ট সিরাতের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আজ তাদের চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে হাসবেন্ডকে সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই এত বড় সারপ্রাইজ পেয়ে যাবে সে কল্পনাও করেনি। তার হাতের কাঁপা-কাঁপির জন্য ধরে রাখা কেকটাও নিচে পরে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। সে নিজেও পড়ে যেতে নিলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাহিয়ান তাকে ধরে ফেলে। সায়মন নিজেও মনকে আগলে নিয়ে নিজের সাথে। তারপর হুংকার দিয়ে ডেকে ওঠে–
—তাশফিনননননননন……
সায়মনের এমন হুংকার শুনে তাশফিন ও লিজা (সিরাতের বান্ধবী) দু’জনেরই ধ্যান ভঙ্গ হয়। তারা দু’জন এতক্ষণ নিজেদের মাঝে এতটাই মগ্ন ছিল যে, সিরাতদের আগমনে আভাসটুকুও পায়নি। তারা দু’জনও এই অসময়ে সিরাত, তার ছোট ভাই সায়মন ও ইন্সপেক্টর নাহিয়ান মাশরুককে (সিরাতদের প্রতিবেশী) দেখে হকচকিয়ে যায়। তাশফিন তাড়াতাড়ি করে লিজার উপর থেকে সরে এসে নিচ থেকে নিজের প্যান্ট পরতে পরতে বলে–
—”সিরাত, তুমি এখানে? এই অসময়ে? তুমি না ক’টা দিন ঐ বাসায় থাকবে বলেছিলে?”
সিরাত অশ্রুসিক্ত লোচন নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
—”কেনো? এসে সমস্যা করে দিলাম বুঝি? আচ্ছা চলে যাচ্ছি, তোমরা প্লিজ কন্টিনিউ করো তোমাদের কাজ।”
কথাটা শেষ করে সে নাহিয়ান ও সায়মনকে বলে–
—”সায়মন, নাহিয়ান ভাইয়া চলেন আপনারা। বড্ড সমস্যা করে দিয়েছি তাদের এই অসময়ে এসে। চলেন চলেন…”
ওদের দু’জনকে রেখেই সিরাত নিজের পেট চেপে ধরে টলমল পায়ে আগে হাঁটা শুরু করে। তাশফিন দৌড়ে এসে সিরাতের হাত ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে অস্থির গলায় বলে–
—”সিরাত, প্লিজ আমার কথাটা শুনো। একবার এক্সপ্লেইন করার সুযোগ দাও আমায়। আমি জানি, আমি অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো আই স্টিল লাভ ইউ”
সিরাত তাশফিনের হাত থেকে নিজের হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়। এর ফলে তার দূর্বল শরীর টাও একটা ধাক্কা খাওয়ায় কয়েক কদম পিছিয়ে পড়ে যেতে নিলে, নাহিয়ান দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলে পেছন থেকে। নাহিয়ান অস্থির হয়ে বলে–
—”ঠিক আছেন?”
সিরাত তার কথার উত্তর দেয় না। সে তাশফিনের দিকে তাকিয়ে বলে–
—”একটু কারেকশন করতে হবে যে তাশফিন। তুমি যেটাকে ভুল বলছো, সেটাকে পাপ বলে, অন্যায় বলে। ইসলামের দৃষ্টিতে একে যেনা ব্যভিচার বলে। সভ্য সমাজে একে পরকীয়া বলে। আর পরকীয়ার শাস্তি কি তুমি নিশ্চয়ই জানো?”
তাশফিন কিছু বলে না, সে ভীতু মুখে দাড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকে। সিরাত তার থেকে কোন জবাব না পেয়ে নিজেই হাপাতে হাপাতে আবারও বলতে শুরু করে–
—”আর কি বললে? ইউ স্টিল লাভ মি? রিয়েলি? এটা কি সত্যি ছিল নাকি তোমার পাপের উপর পর্দা দিয়ে একটা লেইম জোক্স ছিলো? আমার তো মনে হয় লেইম জোক্সই ছিলো। আমারে ভালোবাসলে তুই কিভাবে আমার বেস্টফ্রেন্ডের সাথে শুতে পারলি? এই কুকুরের বাচ্চা তোর এত ক্ষুধা শরীরের?
আচ্ছা তোদের কতদিনের সম্পর্ক বল তো? আমাদের বিয়ের আগের থেকেই কি? নাকি বিয়ের পর থেকে? তোরা পুরাতন প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলি? থাকলে আমায় আগেই বলে দিতি, আমি সরে যেতাম তোদের পথ থেকে। কেন আমাকে আর আমার বাচ্চাকে ঠকালি?”
তাশফিন হুরমুড়িয়ে বলে–
—”না না, আমাদের বিয়ের আগে আমি লিজাকে চিনতামও না। আমাদের এই সম্পর্ক মাত্র তিনমাসের। বিশ্বাস করো, আর একবার বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ঠকাতে চাই নি। কিন্তু কিভাবে কিভাবে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে…..”
—”তিনমাস না। ওহহ্ হো! তিনমাস ধরে তো তুই আমার শরীর পাচ্ছিস না, ডাক্তার নিষেধ করেছিল আমার সাথে তোকে শুতে। মাত্র তিনটা মাস আমার শরীর না পেয়ে আরেক মেয়ের সাথে শুয়ে পড়লি?
এই আমার শরীর কেন পাস নাই তুই? বল কেন পাস নাই? তোর বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়েই তো আমি এত অসুস্থ হয়ে গিয়েছি? তাও শুরুর দিকে তোরে দেই নাই আমার শরীর? এই চুপ করে আছিস কেন বল, দেই নাই তোরে আমার শরীর?””
সিরাত আস্তে আস্তে আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে পড়ছে। মুখে যা আসছে তাই চিৎকার চেচামেচি হয়ে বের হয়ে আসছে। এত রাতে তার চিৎকার শুনে আশেপাশের ফ্লাটের মানুষেরাও চলে আসে। চিৎকার চেচামেচির এক পর্যায়ে সিরাতের শ্বাসকষ্ট উঠে যায়। মুখ দিয়ে কোন কথাই আর বের করতে পারে না। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে ঢলে পড়তে নিলে নাহিয়ান পূর্বের ন্যায় তাকে আবারও আগলে নেয়।
সিরাতকে পাঁজাকোলে করে সোফায় শুয়ে দেয়। দরজা লক না থাকায় পাশের ফ্ল্যাটের মানুষরা তাদের বাসায় ঢুকে পড়েছিল এত চিৎকারে শব্দে। পাশের ফ্ল্যাটের একজন প্রতিবেশী নারী এসে তার হাত-পা ডলে দিতে থাকে, তাকে শান্ত হতে বলে। কিন্তু সিরাত কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না। সে হাউমাউ করে কাঁদছে নিজের পেট চেপে ধরে। তাশফিন দৌড়ে গিয়ে তাদের বেডরুম থেকে সিরাতের ইনহেলার এনে দিলে সায়মন তাড়াতাড়ি করে তা বোনের মুখে ধরে, এতে করে সিরাতের শ্বাসকষ্ট কিছুটা কম হয়। কিন্তু তার আহাজারি একটুও কমে না, বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরো বাড়তে থাকে। বাড়বে না-ই বা কেনো?
জীবনে প্রথম ভালো তো এই বেইমানকেই বেসেছিল। তার জীবনের প্রথম পুরুষ হওয়ার অধিকার, তাকে প্রথম স্পর্শ করার অধিকার তো এই বেশি চাহিদাওয়ালা পুরুষটাকেই দিয়েছিল। সেই পুরুষটা কি করলো? তাকে কি নির্মম, নিষ্ঠুর ও জঘন্যভাবেই না ঠকালো! তাও কার সাথে মিলে? তার বোনের মতো বেস্টফ্রেন্ডের সাথে।
কাকে বিশ্বাস করবেন আজকের এই দুনিয়ায়? নিজের স্বামীকে? সে তো আপনার শরীর একদিন না পেলে দ্বিতীয়দিন অন্য নারীর শরীর শুকবার জন্য পাগল হয়ে যাবে। হ্যাঁ, হাতের পাঁচ টা আঙুল যেমন সমান না, তেমনি পৃথিবীর সব পুরুষও এক না। কিন্তু আজকাল পত্রিকা, ফেসবুক এসবে ঢুকলে এখানকার পাঁচটা নিউজের মধ্যে তিনটা নিউজই হবে পরকীয়া সংক্রান্ত। আর যাকে এতদিন সিরাত নিজের বেস্টফ্রেন্ড কম বোন পরিচয় দিয়ে এসেছে, সেই কিনা তার বিশ্বাসকে গলা টিপে হত্যা করলো।
তাশফিন এতক্ষণ সিরাতের কাছে আসার চেষ্টা করেছে বহুবার কিন্তু বরাবরই হয় সায়মন, নাহয় নাহিয়ান তাকে বাঁধা দিয়েছে। এবার তাশফিন জোর করে তাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সিরাতের পায়ের কাছে এসে বসে পড়ে। সে সিরাতের পা চেপে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—” আই এম সরি সিরাত, আই এম রিয়েলি ভেরি সরি। আমি জানি আমি যা করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু তাও ক্ষমা চাইছি। তুমি আমায় যা ইচ্ছে শাস্তি দাও, আমায় মারো, বকো, কাটো যা ইচ্ছে করো। কিন্তু একটু শান্ত হও প্লিজ। তোমার বুকে ব্যথা উঠবে। একটু শান্ত হও প্লিজ।”
সিরাত তার পা’টা তাশফিনের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে, তারপর বলে–
—”বুকে ব্যথার কারণ দিয়ে এখন বলছিস শান্ত হতে। উঠুক বুকে ব্যথা, মরণ হোক এই ব্যথায় আমার। কিন্তু তোর সংস্পর্শে আসার ভুল যেনো আমি দ্বিতীয়বার না করি।”
সায়মন বোনের পাশে বসে বলে–
—”আপু চল বাসায় চল। এর সাথে যা কথা বলার একেবারে কোর্টে হবে। এই জোচ্চুর দু’টোকে আমি সায়মন জেলের ঘানি না টানিয়ে দম নিবো না।”
সায়মন সিরাতকে ধরে দাঁড় করাতেই সিরাতের দুই পা বেয়ে দরদরিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। পেটেও মোচর দিয়ে ব্যথা করে ওঠায় সিরাত “আহ্ মা গো!” বলে পেট চেপে ধরে বসে পড়ে পুনরায় সোফায়। সবাই তার এহেন আর্তনাদে হকচকিয়ে যায়। তাশফিন যেহেতু তার পাশেই দাঁড়ানো ছিল সেই প্রথমে দেখতে পায় সিরাতের রক্তক্ষরণের বিষয়টা। সে নিজেও বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে।
পাশের বাসার প্রতিবেশী মহিলাটি বলে–
—হায় আল্লাহ! রক্তপাত হওয়া তো ভালো লক্ষ্মণ না এই সময়ে, তাড়াতাড়ি ওকে হসপিটালে নিয়ে যান। নাহলে মিসক্যারেজসহ বাচ্চা ও মা দু’জনেরই জানের ঝুঁকি হবে।
মহিলাটির কথা শুনে তাশফিন সিরাতকে কোলে তুলতে নিলে সিরাত ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বলে–
—আপনার অপবিত্র শরীর নিয়ে আমায় স্পর্শ করবেন না। আমি অপবিত্র কারো স্পর্শ নিয়ে মরতে চাই না।
সিরাতের কথা শুনে তাশফিনের পা জোড়া সেখানেই থমকে যায়।
~চলবে?
