‘দরদিয়া পাখি’ [পর্ব-০৪]
-আফরোজা আঁখি
‘পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন। আসমানের বিয়ের আর মাত্র একদিন বাকি। কাল সকাল হলেই বাজবে আসমান আর স্নেহার বিয়ের সানাই। সিকদার বাড়িতে জমজমাট আয়োজন চলছে। সবকিছুর মধ্যে একটু হলেও থাকছে পুষ্পিতা!ওকে সেদিনই গিয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছেন সালেহা বেগম আর স্নেহা। উনি মনে মনে রেগে আছেন মেয়েটার উপর, তবে স্বামী-সন্তানের ভয়ে উপর উপর মায়া দেখাচ্ছেন। পুষ্পিতার প্রতি সকলের এমন ভালো ব্যবহারের আরেকটা কারণ আছে অবশ্য! তা হলো, এ বাড়ির বড় কর্তার স্ত্রী নাফিজা বেগম উপস্থিত আছেন বিয়ের আয়োজনে। মেয়ের সাথে কি ঘটেছে, এখনও উনার কানে যায়নি। তাই হয়তো শান্ত সবটা! সালেহা বেগম এখন আর কোনো ঝামেলা চাইছেন না, তাই উনাকে হাত করতেই উপর উপর এত মায়া দেখাচ্ছেন পুষ্পিতার প্রতি!
‘পুষ্পিতা তখন ফুলের মালা গাঁথছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে মেয়েটার। দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ সময় কান্না করেছে সে। নাফিজা বেগম লক্ষ্য করলেন বিষয়টা। আজলান সিকদারকে সবার পাশে বসিয়ে রেখে মেয়ের কাছে গেলেন উনি। মায়ের উপস্থিতি বুঝতে পেরে পুষ্পিতা স্বাভাবিক করল নিজেকে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কিছু বলবে আম্মু?”
নাফিজা বেগম হাসলেন মেয়ের হাসির উত্তরে, ওর হাত টেনে উঠালেন মাটি থেকে। মেয়েটাকে অবলোকন করলেন তিনি। হলুদ আর গোলাপি রঙের সুন্দর একটা লেহেঙ্গা পরেছে পুষ্পিতা। কোমর পর্যন্ত এসে পড়া চুলগুলো খুলে রেখেছে সে। মুখে কোনো প্রসাধনীর ছোঁয়া নেই, তবুও কত মিষ্টি দেখাচ্ছে। নাফিজা বেগম উনার চোখের কাজল লাগিয়ে দিলেন মেয়ের কপালে। বললেন বিড়বিড় করে,
“কারো নজর না লাগুক।”
মায়ের কথায় মুচকি হাসল পুষ্পিতা। ও কিছু বলতে যাবে, তখনই বলে উঠলো আহান,
“কিন্তু বড়মা, তোমার মেয়ের উপর যে আহান সিকদারের নজর লেগে গেছে। আমি তো সেই কবে থেকেই দেখে যাচ্ছি ওকে। নজর তো লাগিয়ে দিলাম,এবার কি হবে?”
আহানের কথায় মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে এল পুষ্পিতার। কেউ না জানলেও ও জানে আহান ছেলেটা ওর প্রতি দুর্বল। কিন্তু পুষ্পিতার মন জুড়ে যে অন্য কারোর বসবাস! তাকে আহান তীব্রভাবে চায়,জেনেও ভালোবাসতে পারে না পুষ্পিতা! নাফিজা বেগম অন্যভাবে নিলেন না কথাটা।উনি জানেন, আহান কেমন। সে হাসিমজা করে সারাক্ষণ। কোন কথা মজার ছলে বলে আর কোন কথা সিরিয়াসলি, বোঝা বড়ই মুশকিল! তাই মুচকি হেসে বললেন নাফিজা বেগম,
“তোকেও তো দারুণ লাগছে আহান। পুরো রাজপুত্রের মতো।এই যে আমি নজর লাগালাম,এবার কি হবে?”
আহান হাসল বড়মায়ের কথা শুনে। উনিও খানিকক্ষণ মজা করলেন আহানের সাথে। কারোর ডাক পড়ায় পুষ্পিতা আর আহানকে ওখানে রেখেই চলে গেলেন তিনি। নাফিজা বেগম যেতেই আহান এসে দাঁড়াল পুষ্পিতার সামনে, হাতে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে ডাকল মেয়েটাকে,
“ফুল।”
মাথা তুলে তাকাল পুষ্পিতা, আস্তে করে জবাব দিল,
“বলুন আহান ভাই।”
আহান মুচকি হাসল, হাতে থাকা ফুলটা গুজে দিল পুষ্পিতার কানের পাশে। পুষ্পিতা বড় বড় চোখ করে তাকালেই আহান বুঝে নিল ওর চাহনির মানে। যেতে যেতে বলল আহান,
“আমার ফুলকে ফুল দিলাম।”
পুষ্পিতা একবার হাত দিয়ে দেখে নিল ফুলটা। বেশি কিছু না ভেবে বিষয়টাকে ভালোভাবেই নিল সে। কানে থাকা ফুলটা রেখে দিল পুষ্পিতা। মেঝেতে থাকা ফুলের থালাটা হাতে নিয়ে নিজের কাজে চলে গেল সে।
পুরোটা সময় দূরে দাঁড়িয়ে থেকে রাগে ফুঁসছিল আসমান। পাশে রাখা কাঁচা ফুলগুলো সব মাটিতে ফেলে দিয়েছে সে। পায়ে পিষে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে পুষ্পিতার যাওয়ার পানে। আহান পুষ্পিতার কানে ফুল গুজে দিয়েছে,দৃশ্যটা বারবার ওর চোখের সামনে ভাসছে। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াল আসমান।
_________________
সিকদার বাড়ির বাগানে সুন্দর করে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে। সেখানে আয়োজন করা হয়েছে গায়ে হলুদের।স্নেহা আজ সুন্দর করে সেজেগুজে এসেছে, বাড়ির প্রত্যেকেই এখানে উপস্থিত নেই কেবল আসমান। স্টেজের থেকে কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে পুষ্পিতা, পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আহান। ছেলেটা সেই তখন থেকেই পর্যবেক্ষণ করছে পুষ্পিতাকে। পুষ্পিতার মুখটা কেমন হয়ে আছে,মাথাটাও কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বুকের ভেতরটায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে কান্না করতে।কেন এমন হচ্ছে, ও নিজেও জানে না। শুধু জানে, আসমান ভাইকে অন্য কারো সাথে সে দেখতে পারবে না। লোকটাকে যে পুষ্পিতা ভালোবাসে সেই ছোটবেলা থেকে।
‘যখনই ওর কোনো সমস্যা হতো,আসমান ভাই ঠিক বুঝে নিতেন। লোকটা গম্ভীর, কথাবার্তা বলে কম, কিন্তু ওর মনে হতো আসমানের মনে ওর জন্য একটা সফট কর্নার আছে!কেমন যেন অনুভূতি হতো,মানুষটা ওর আশেপাশে থাকলে। উনার সামান্য কষ্টে কষ্ট পেত পুষ্পিতা! ঝড়, তুফান আর আকাশ থেকে পড়া বাজ ভীষণ ভয় পায় পুষ্পিতা।একবার বাড়ির সকলেই একটা বিয়েতে গিয়েছিলেন,বাড়িতে ছিলো ছোট্ট পুষ্পিতা।ও যখন রুমের এক কোণে বসে ভয়ে মরছে,অজ্ঞান হয়ে যাবে এমন অবস্থা—’তখনই আগমন ঘটে আসমানের।লোকটা পরম যত্নে বুকে টেনে নেয় ওকে।ভরসার হাত বুলায় মাথায়।পুষ্পিতার নরম মনে একটু হলেও ভালোবাসা জেগেছিল আসমানের প্রতি।সেই ভালোবাসাটাই বুঝি এত কষ্ট দিচ্ছে ওকে!
‘কথাগুলো ভেবেই চলে যেতে চাইল পুষ্পিতা।দৌড়ে যাওয়ার সময় ওর ধাক্কা লাগল কারো শক্তপোক্ত বুকের সাথে।মেয়েটা পড়ে যাবে এমন সময় সামনের মানুষটি দু’হাত দিয়ে আগলে নিল ওকে।পুষ্পিতা ভেবেছিল,সে পড়ে গেছে; তাইতো ভয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিল।কিন্তু এ কী!ও যে পড়েনি মাটিতে।চোখ দুটো খুলে তাকাল পুষ্পিতা।নজরে এলো শ্যামবর্ণের সুদর্শন মানবটিকে।পুষ্পিতা পিছিয়ে গেল কিছুটা,মাথা নুইয়ে বলল,
“আ… আমি দেখিনি। ক্ষমা করবেন।”
‘কথাটা বলেই চলে যেতে চাইল পুষ্পিতা,কিন্তু পথ আটকাল আসমান।ওর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে,চোয়াল শক্ত করে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে।পুষ্পিতার মনে হলো, ওর গালে চড় পড়বে এক্ষুণি।আসমান ভাই হয়তো রেগে গেছে ওর কাজে কিন্তু ভুল হলো পুষ্পিতার ভাবনা।আসমান এগিয়ে এসে ওর কানের পাশে গুঁজে রাখা গোলাপ ফুলটা খুলে ছুড়ে ফেলল মাটিতে। পুষ্পিতা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে।আসমানের ভাবভঙ্গির তেমন পরিবর্তন হলো না,সে গটগট করে হেঁটে স্টেজের দিকে গেল।যেতে যেতেই বিড়বিড় করে আওড়াল,
“তুমি আমার।তুমি আগাগোড়া পুরোটাই আমার।তোমার এক ফোঁটা ভাগও আমি অন্য কাউকে দিতে রাজি নই,পুষ্প!তুমি আমার না হলে আমি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলব
সব!”
আসমানের বলা কথা কানে যায়নি পুষ্পিতার।তবে আহানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল সময়ই কথাটা বলছিল আসমান,যেকারণে কিছুটা হলেও শুনেছে সে।কিন্তু ভালোভাবে বুঝতে পারছে না কিছুই। আসমান যে পুষ্পিতার কানে থাকা ফুলটা ফেলে দিয়েছে,সেটাও দেখেনি আহান। নইলে হয়তো বুঝতো, ওর ভাইয়ের মনে কী চলছে!
‘আসমান গিয়ে হাসিমুখ করে স্টেজে দাঁড়াল।ওকে হলুদ মাখাতে আসলেই বলল,পুষ্পিতার থেকে আগে হলুদ মাখবে।সকলেই তখন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ওর দিকে। আসমানের হঠাৎ এমন আবদারের মানে বুঝলেন না কেউ-ই! তবে বাহিরের লোকজন আছেন, তাই কেউ তেমন ঘাটলেন না বিষয়টা নিয়ে। পুষ্পিতার ইচ্ছে না থাকলেও সবার সামনে এসে আসমান আর তার হবু স্ত্রীর গালে হলুদ ছোঁয়ালো সে। পুষ্পিতার মুখের দিকে তখন তাকানো যাচ্ছিল না।চোখ দুটো ছিল জলে টইটম্বুর! আসমানের যেন ভালো লাগছিল বিষয়টা। আজ পুষ্পিতাকে কষ্টে দেখতে ভালো লাগছে ওর। তখন আহানের থেকে ফুল নেওয়ার শাস্তি এটা!
__________________
‘পুষ্পিতা শুয়ে আছে বিছানায়। নিচে হৈ-হুল্লোড় হচ্ছে, গান বাজনা বাজছে,এইদিকে মেয়েটার মন কাঁদছে প্রিয় কিছু হারানোর বেদনায়।রাত যখন ১২টার কাছাকাছি,তখনই ওর রুমের দরজায় টোকা পড়ল।উঠে গিয়ে দরজা খুললেই দেখল আহানকে।কিছুটা অস্বস্তি হলো পুষ্পিতার মনে।এতো রাতে আহান কেন এখানে এসেছে?লোকজন দেখলেই বা কী ভাববে? পুষ্পিতা ভাবছিল কথাগুলোই,তখনই আহান বলল,
“ফুল।”
‘নিচু স্বরে উত্তর দিল মেয়েটা,
“বলুন আহান ভাই।”
“ফুপি খুবই অসুস্থ।আমাদের বিদেশের বিজনেসেরও খুব খারাপ অবস্থা!আমি আজ রাতের ফ্লাইটে আমেরিকায় যাচ্ছি।ঠিক তিন মাস পর আমি আবার ফিরে আসব।তুই অপেক্ষা করবি আমার জন্য?”
‘পুষ্পিতা বুঝল না,আহান কিসের জন্য ওকে অপেক্ষা করতে বলল। আহান ভাই কি ওকে প্রতিশ্রুতি দিতে বলছেন? কিন্তু পুষ্পিতা যে লোকটাকে কেবল সম্মানের চোখেই দেখে। কখনোই আহানের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়নি তার।তাহলে আজ কথা দেবে কী করে? পুষ্পিতা নুইয়ে নিল নিজের মাথাটা, তখনই নিচে থেকে আরিয়ানা আর বাকিরা ডেকে উঠল আহানকে। আহান দ্রুত হাত ধরল পুষ্পিতার। মন ভোলানো হাসি দিয়ে বলল,
“তোর চুপ থাকাকেই আমি ‘হ্যাঁ’ বলে ধরে নিলাম ফুল। তুই আমাকে একটু হলেও ভালোবাসিস,আমি জানি।সেই ভালোবাসার দাবী নিয়েই বলছি—’তুই অপেক্ষা করিস আমার জন্য।আমি আবারও ফিরে আসব। মতোকে লাল শাড়িতে জড়িয়ে আমার বুকে টেনে নেব।”
‘কথাটা বলেই পুষ্পিতার হাত ছেড়ে চলে গেল আহান। পুষ্পিতা কত করে ডাকল আহানকে, ভাঙাতে চাইল আহানের মনের ভুল কিন্তু আহান যে তার আগেই চলে গেল। এক বুক আশা নিয়ে চলে গেল ছেলেটা!
_________________
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে আসমান, তার পাশেই বসে আছে আহান। পিছনের সিটে আরিয়ানা আর তাদের অন্য দুটো কাজিন।আরিয়ানার মন খারাপ,ভাই চলে যাচ্ছে তাই। এদিকে সব সময়ের মতোই। আসমানের চোখ-মুখ গম্ভীর ওর চেহারা দেখে বোঝা মুশকিল,ভেতরে কী চলছে! আহানের তখন চোখ পড়ল ভাইয়ের দিকে, জিজ্ঞেস করল ওকে,
“সবটা কেমন তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?আমার কেমন খটকা লাগছে ভাইয়া!তুমি আমাকে সত্যিই বিজনেস আর ফুপির অসুস্থতার জন্যই আমেরিকা পাঠাচ্ছো তো?”
ড্রাইভিং করতে করতে উত্তর দিল আসমান,
“মানে? তুই কি বলতে চাইছিস,আহান! আমি মিথ্যা বলছি?আর আমি তোকে পাঠাচ্ছিনা। পাঠাচ্ছেন আব্বু!”
“উঁহু,তবে…”
“তবে কী?”
আহানের মনে হলো সে বেশি ভাবছে! আসমান মিথ্যে বললেও, ওর আব্বু নিশ্চয়ই মিথ্যে বলেননি। সত্যিই ওদের বিজনেসের অবস্থা খারাপ!এটা তো ওর চাচ্চু আর অফিসের স্টাফদের থেকেও শুনেছে আহান!এই ভেবেই কথা বাড়ালো না আহান। আস্তে করে উত্তর দিল,
“তেমন কিছু না। আমার খারাপ লাগছে,জানো? তোমার বিয়েটা খেয়ে যেতে পারলাম না।”
আসমান বাঁকা হেসে উত্তর দিল,
“ফিরে এসে একেবারে তোর ভাতিজা-ভাতিজির অন্নপ্রাশন খাবি।”
“বাহ!তুমি তো ঘোড়ার গতিতে দৌড়াচ্ছো! বিয়ে হলো না, তার আগেই বাচ্চার চিন্তা!”
“হু,ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আগেভাগেই করে রাখা ভালো!”
আহান হাসল কেবল। ততোক্ষণে ওরা পৌঁছে গেছে এয়ারপোর্টে। আহানসহ বাকিরা গাড়ি থেকে নামল। আহান যখন সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যাবে, তখনই ওর হাত টেনে ধরল আসমান। ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আমাকে ক্ষমা করিস আহান।আমার কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই।”
আহান না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বললে ভাইয়া?”
“হুম, মন দিয়ে কাজ করবি। নিজের খেয়াল রাখবি। আমি নিয়ম করে তোকে টাকা পাঠাবো।”
কথাটা বলেই আহানের দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে বলল আসমান,
“তিন মাস পর আবার দেখা হচ্ছে!”
আহান মুচকি হেসে আসমানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে বলল,
“আসছি।”
আহান চলে গেল নিজের গন্তব্যে। আরিয়ানা তখন আসমানের পাশে এসে দাঁড়াল, জিজ্ঞেস করল ওকে,
“তুমি ঠিক করলে তো ভাইয়া? কেউ না জানুক, তুমি তো জানো আহান পুষ্পিতাকে ভালোবাসে।”
“ভালোবাসা নয়,পুষ্পিতা কেবলই আহানের ভালোলাগা।”
“আর তোমার?”
আসমান চুপ করেই রইল। চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ফেলল সে। চোখের সামনে ভেসে উঠল পুষ্পিতার মায়াবী মুখ। আসমান যে মেয়েটাকে ভালোবাসে সেই প্রথম থেকে ভালোবাসে!
আসমানের তখন বয়স কম,কলেজ পড়ুয়া এক যুবক।পুষ্পিতাও তখন ওর কাছে বাচ্চা একটা মেয়ে।তবে বয়সের বাধা সত্ত্বেও আসমান কেমন এক অদ্ভুত টান অনুভব করত মেয়েটার প্রতি। মেয়েটাকে সর্বদাই লক্ষ্য করত সে, সর্বক্ষণ রাখত চোখে চোখে। খেয়াল রাখত ওর সব ভালো-মন্দে। মেয়েটার প্রতি আসমানের এমন অনুভূতির কারণ জানত না সে, তবে পুষ্পিতা ওর চোখের আড়াল হলেই দম বন্ধ হয়ে আসত। ওর কাজল কালো চোখের কোণে পানি জমলে বুকে ব্যথা হতো আসমানের! বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে পুষ্পিতার প্রতি ওর মায়া কাজ করত একটু বেশিই। আসমান জানত না কেন এতটা মায়া জন্মেছিল ঐ বাচ্চা মেয়েটির প্রতি!
দেখতে দেখতে বড় হলো পুষ্পিতা।আসমান তখন বিজনেসের হাল ধরেছে।বয়স আর শরীরের কাঠামোতে একজন পরিণত যুবকে পরিণত হয়েছে সে। আর পুষ্পিতা সে তো তখন ভুবনমোহিনী সুন্দরী!মেয়েটির বয়স কম হলেও সৌন্দর্য আর গায়ের গড়নে মনে হতো পরিণত এক যুবতী,যার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হবে যে কেউ!বাদ যায়নি আসমানও।মেয়েটার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল তার।অন্যায় করছে বুঝেও, কারণে-অকারণে মেয়েটার রুমে উঁকিঝুঁকি মারত আসমান। মাঝেমধ্যেই স্পর্শ করত ওর মায়াবী মুখশ্রী!অধিকারবোধ দেখাতো অকারণেই। আসমান যখন দেখল, ওর এই বিষয়গুলো পুষ্পিতা ভালোভাবেই নিচ্ছে, মেনে নিচ্ছে ওর সব পাগলামি তখন মনে হলো,কেবল আসমান নয়,পুষ্পিতাও মনে মনে পছন্দ করে তাকে!সেই থেকেই আসমানের অধিকারবোধ বেড়েছে। স্কুল-কলেজে পুষ্পিতা যেত ঠিকই,তবে সবসময় ওকে ফলো করত আসমানের লোকেরা।মেয়েটাকে কেউ সামান্য বিরক্ত করলেও আসমান জঘন্যতম শাস্তি দিত তাদেরকে।সেই ছোট্ট পুষ্পিতা যাকে আদরে যতনে একটু একটু করে বড় করে তুলেছে আসমান,যার জন্য ওর অনুভূতিহীন হৃদয়ে অনুভূতি জন্মেছে, ভালোবাসাতে শিখেছে—’সেই পুষ্পিতা,আসমানের হৃদপিন্ডে বসবাস করা হৃদয়হরণী,সে অন্য কারো হলে আসমান বাঁচবে কী করে?
#চলবে……
