‘দরদিয়া পাখি’ [পর্ব-০২]
-আফরোজা আঁখি।
‘পুষ্পিতার যখন জ্ঞান ফিরল,তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল একটা অচেনা অজানা জায়গায়। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝল এটা সিকদার বাড়ি বা তার রুম নয়। মাথায় চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ল পুষ্পিতার—’সে তো ছিল আরিয়ানা আপুর রুমে!এখানে এল কী করে?এই রুমটাই বা কার? চারিদিকটা পর্যবেক্ষণ করল পুষ্পিতা। রুমটা সুন্দর করে সাজানো-গোছানো। আলমারিটার কাছের জানালা হওয়ায় একপাশে থাকা আলমারির তাকে তাকে সাজানো সুন্দর শাড়িগুলো নজরে এলো ওর।দেখে মনে হচ্ছে কেউ অতি যত্নে সাজিয়ে রেখেছে শাড়ি গুলো! রুমের অন্য পাশে বইয়ের সেলফ রাখা,আর সাজানো বিভিন্ন ধরনের বই! চারিদিক থেকে কেমন মিষ্টি সুভাষ আসছে! মনে প্রশ্ন জাগলো মেয়েটার—’রুমটা কার? পুষ্পিতা কি করছে এখানে? কথাগুলো ভেবে যেই না উঠে দাঁড়াবে, গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হলো ওর। নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, ওর গায়ের জামাটা কেউ বদলে দিয়েছে! হয়তো আরিয়ানা!এই ভেবে নিশ্চিত হলো সে।
‘কিন্তু এ কী হলো!দরজার দিকে তাকাতেই ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে এলো।দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে এক ২৯-৩০ বছর বয়সী সুদর্শন যুবক! লোকটার পরনে ঢিলেঢালা কালো পাঞ্জাবি,যার হাতা গোটানো,মাথার চুলগুলো সব এলো মেলো হয়ে আছে।লোকটার উজ্জ্বল শ্যামলা মুখটা সুন্দর করে তুলেছে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তার চোখের সাথে চোখ মিলতেই পুষ্পিতা দৃষ্টি সরালো অন্যদিকে। লোকটা ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে এলো ওর কাছে। পুষ্পিতা তখন ওর গায়ে থাকা ওড়নাটা হাতে নিয়ে কচলাচ্ছে, চোখ মুখের এমন অবস্থা যেন চুরি করে ধরা পড়েছে।
পুষ্পিতা উঠতে যাবে, তখনই কানে এলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মানবটির নরম কণ্ঠস্বর,
“তোমার শরীরের ব্যথা কমেছে?”
‘অবাক হলো পুষ্পিতা। যে লোকটা ওকে পছন্দ করে না, নিজের মধ্যে থাকা গম্ভীর ভাব বজায় রেখে সবসময় চলাফেরা করে, ওকে এড়িয়ে চলে সর্বক্ষণ সে কিনা ওর ভালো-মন্দের খোঁজ নিচ্ছে? পুষ্পিতা কি স্বপ্নে আছে? ভাবনায় ছেদ পড়ল মেয়েটার, আবারও ভেসে এলো মানবটির গম্ভীর কণ্ঠ,
“কি বললাম, কানে যায়নি? যাই বলব ফটাফট উত্তর দেবে। আমার কাছে সময়ের মূল্য অনেক! সময় নষ্ট করা আসমান সিকদারের অপছন্দের কাজ। তুমি জানো না মেয়ে?”
পুষ্পিতাকেঁপে উঠল আসমানের চিৎকারে। উঠে দাঁড়ালো ফটাফট। দৃষ্টি তার মেঝের দিকেই নিবদ্ধ। উপর নিচ মাথা নেড়ে কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিল মেয়েটা,
“হ্যাঁ… জা… জানি।”
“তাহলে উত্তর দিতে এত সময় লাগছে কেন?”
ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই উত্তর দিল পুষ্পিতা,
“ভুল হয়েছে।আর এমন হবে না।”
‘আসমান খানিকটা এগিয়ে এলো। মেয়েটার ফর্সা মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করল সে। কতোটা স্নিগ্ধ লাগছে পুষ্পিতাকে!এই মেয়েটার স্নিগ্ধতা আর মোহনীয় রূপে বিভোর হবে যে-কেউ।নিজের মধ্যে থাকা সমস্ত ইগো ভুলে ভালোবাসতে চাইবে মেয়েটাকে!বেশি কিছু ভাবল না আসমান।নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ঠিক আছো তুমি?”
“হু।”
“তুমি আজ থেকে এখানেই থাকবে।ও বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই।আমি যাচ্ছি,বাড়িতে কাজের লোকেরা আছে,কোনো দরকার পড়লে তাদের ডেকে নিও।”
খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল আসমান,
“বুঝতে পেরেছ আমার কথা?”
পুষ্পিতা উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বোঝাল, সে বুঝতে পেরেছে আসমানের কথা। আসমান সময় ব্যয় করল না, রুম থেকে চলে যেতে চাইল। তখনই বলে উঠল পুষ্পিতা,
“আমি ও বাড়িতে থাকলে আপনার বিয়েতে সমস্যা হবে,তাই আমাকে এখানে রেখে যাচ্ছেন আসমান ভাই?”
‘আসমানের কপালে ভাঁজ পড়ল।সে চোখ মুখ কঠোর করে তাকাল পুষ্পিতার দিকে।ভয়ে পুষ্পিতা চোখ নামিয়ে নিল। আসমান ধীর পায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“ধরে নাও তাই! বিয়েতে কোনো বিঘ্ন চাইছি না আমি। তুমি থাকলে আমার হবু স্ত্রী বিরক্ত হয়! সে বিরক্ত হতে পারে এমন কোনো কারণ আমি তার আশেপাশেও রাখতে চাইছি না!”
পুষ্পিতার বুকে ব্যথা হলো বোধহয়।সে নিতে পারল না কথাটা। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কান্না করল সে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ থেকে বের হওয়া পানি মুছে নিল অন্য হাতের সাহায্যে। আসমান কি বুঝল, তার মুখ থেকে বের হওয়া সামান্য বাক্যটি কষ্ট দিল মেয়েটাকে?কেউ বুকে ছুরি চালালে যেমন অনুভূতি হয় ঠিক তেমনই অনুভূতি হলো মেয়েটির! হয়তো না, তাই তো পাষাণের মতো চলে গেল সে।
______________
আসমান গটগট করে হেঁটে নিজের রুমে ঢুকল। টেবিলে রাখা মদের বোতল হাতে নিয়ে বোতলে থাকা মদ ঢকঢক করে গিলল সে। মাথার চুলগুলো খামচে ধরে বন্ধ করল চোখের পাতা। সাথে সাথেই চোখের ভেসে উঠল পুষ্পিতার কান্নারত মুখ। এই ত্রিভুবনের সবকিছুই সহ্য হয় আসমানের, কিন্তু ঐ অষ্টাদশী মেয়েটার চোখের পানি সহ্য হয় না। ইচ্ছে করে সবকিছু ভেঙে চুরে শেষ করে দিতে। হাতে থাকা মদের বোতলটা ড্রেসিং টেবিলের দিকে ছুড়ে মারল আসমান। সাথে সাথেই ঝনঝন শব্দ তুলে ভেঙে পড়ল ড্রেসিং টেবিলের আয়না। কিছু ভাঙার বিকট শব্দ কানে যেতেই ড্রয়িংরুম থেকে ছুটে এলো আসমানের বেস্ট ফ্রেন্ড ফারহান।চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা,
“আসমান,কী হয়েছে? আর ইউ ওকে?”
‘আসমান নিশ্চুপ,কথা নেই ওর মুখে। কিছুসময় যেতেই রেগে গিয়ে ঘুষি বসালো ইট পাথরের তৈরি দেয়ালে।সাথে সাথেই হাত থেকে ঝড়ল তরতাজা রক্ত! ফারহান আটকালো আসমানকে। আবারও জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে?আসমান কেমন কাঁপছে,উন্মাদের মতো আচরণ করছে সে।ফারহানের চিন্তা হলো এ দেখে।কি হয়েছে বার বার জিজ্ঞেস করলে কাঁপা কন্ঠে বলল আসমান,
“ওকে আমি কাঁদিয়েছি,ফারহান।আমার জন্য কান্না করেছে মেয়েটা। আমার যে সহ্য হচ্ছে না ওর চোখের পানি।ঐ বোকা মেয়েটা এতো কাঁদে কেন বলতো?ওর কান্নায় যে আমার বুকে চিনচিন ব্যথা হয়!”
‘ফারহান বুঝে নিল আসমানের কথার মানে। আসমান যে এই মুহূর্তে পুষ্পিতা সম্পর্কেই কথা বলছে,স্পষ্ট বুঝতে পারছে ফারহান। একটা মেয়ের প্রতি এতটা অবসেসড মানুষ কখন হয়? যখন তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। কিন্তু এই আসমান মানতে নারাজ যে সে পুষ্পিতাকে ভালোবাসে। অথচ মেয়েটার কষ্টে সমানভাবে কষ্ট পায় সে! ফারহান শান্ত হতে বলল আসমানকে, ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুই ওকে ভালোবাসিস ভাই। বিয়ে করে নিচ্ছিস না কেন?”
সাথে সাথেই বলে উঠল আসমান,
“না না,আমি ওকে ভালোবাসি না!”
“তাহলে এমন করছিস কেন?”
“জানিনা।”
“কি জানিস?”
“ওকে আহানের সাথে দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল।জানে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছিল।তাই জেনে-বুঝে কাঁদালাম। কিন্তু ওকে কাঁদিয়ে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করছে,আমি শান্তি পাচ্ছি না কোনোভাবেই!”
‘ফারহান হেসে উঠল আসমানের বলা কথা শুনে। আসমান ভেঙে যাবে, তবুও মচকাবে না! পুষ্পিতাকে সে ভালোবাসে, প্রচণ্ড রকমের ভালোবাসে, অথচ তা স্বীকার করতে খুবই আপত্তি আসমানের! ফারহানের এই অকারণে হাসি ভালো লাগছে না আসমানের, রাগ দেখিয়ে সে তখনই চলে গেল ফ্ল্যাট ছেড়ে।
_________________
‘সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে জড়ো হয়েছেন সকলে। এত মানুষ থাকার পরেও পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে রুমে। এই নীরবতার কারণ,—’এখানে আসমান উপস্থিত আছে।এই বাড়িতে বোধহয় সবচেয়ে রাগী, গম্ভীর ছেলেটা আসমান।ও যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, বাড়িটা শান্তই থাকে। তবে আজ সবার চোখ-মুখে চিন্তার চাপ। কেন আসমান সবাইকে এখানে জড়ো করল কেউ-ই বুঝতে পারছেন না।
‘আহান আর আরিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। আহানের চোখ-মুখ কেমন কালো হয়ে আছে। পুষ্পিতাকে পুরো বাড়ি খুঁজেও পায়নি সে, তাই হয়তো এত চিন্তা!আসমানের চোখ গেল ভাইয়ের দিকে,ওর চিন্তার কারণ বেশ বুঝতে পারছে আসমান।কেমন রাগ হলো আসমানের।এই আহান কেন পুষ্পিতাকে নিয়ে এতো ভাবে বুঝে পায় না সে।আসমানের ভাবনার মধ্যেই আহান বিরক্ত হয়ে বলল,
“কিছু বলার হলে বলো,ব্রো। সবারই কাজ আছে।এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না!”
আসমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল ভাইয়ের দিকে।গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কি কাজ তোর?থাকিস তো সারাদিন বাইরে!টইটই করে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ আছে তোর?”
“অবশ্যই আছে!আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।গেলাম।”
আহান পা বাড়াল যাবে বলে৷কিন্তু আটকে গেলো আসমানের কথায়,
“তোর গুরুত্বপূর্ণ কাজটা কি পুষ্পিতাকে খোঁজা?বাড়ির বাকিরা জানে এটা?”
‘সাথে সাথেই রাগী চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল আহান।লোকটা যেন উঠেপড়ে লেগেছে ওর মেজাজ বিগড়াতে!রুমে উপস্থিত আসমানের আব্বু, আরহাম সিকদার, কথাটা শুনেই রেগে তাকালেন আহানের দিকে।মেজাজ দেখিয়ে বললেন উনি,
“এসব কি শুনছি,আহান?পুষ্পিতাকে নিয়ে তুমি আজকাল একটু বেশিই ভাবছো!ভুলে যাচ্ছো ওর পরিচয়!”
“এভাবে বলছো কেন আব্বু?ওকে বড় আব্বু নিজের মেয়ে বলেই মানেন!আর আমিও ওকে এ বাড়ির মেয়ে বলেই মানি।তাই একটু বেশিই ভাবি!”
আহানের কথার উত্তরে বললেন আরহাম সিকদার,
“আজকের পর থেকে আর ভাববে না।তুমি আপাতত পড়াশোনা নিয়েই ভাবো বাকিটা অন্যরা ভেবে নিবে!”
‘আহান শ্রদ্ধা করে নিজের বাবাকে,উনার মুখে মুখে কথা বলতে পারে না সে। তবুও আজ বলল! কিন্তু আর ঝামেলা চাইছে না আহান,তাই চুপ করেই রইল সে।ও চুপ থাকলেও বললেন সালেহা বেগম,
“ঐ মেয়েটা মাথা খেয়েছে এই ছেলের!তাড়াতাড়ি মেয়েটার একটা ব্যাবস্থা করুন! নাহলে দেখা যাবে বাড়ির সবগুলো ছেলেকে হাত করে নিয়েছে ঐ মেয়ে।”
স্ত্রীর কথায় রেগে তাকালেন আরহাম সিকদার।উনি ভালো করেই জানেন পুষ্পিতার কতোটা প্রয়োজন এ বাড়িতে!এছাড়া উনারই বড় ভাই আর ভাইয়ের স্ত্রী নিজের মেয়ের চোখে দেখেন পুষ্পিতাকে। খানিকক্ষণ আগে বলা নিজের কথাটার জন্য নিজেরই খারাপ লাগছে আরহাম সিকদারের।উনি বলেছেন বলছেন!তাই বলে অন্যরা একই কথা বলবে মানতে পারছেন না তিনি। তাই চোখ রাঙালেন স্ত্রীর দিকে সাথে সাথেই দৃষ্টি সরালেন সালেহা বেগম।
‘এদিকে আসমানের ঠোঁটের কোণে হাসি।ভাইকে জব্দ করতে পেরে আলাদাই মজা হচ্ছে তার।আরহাম সিকদার বললেন ছেলের উদ্দেশ্যে,
“বাড়ি শুদ্ধ মানুষকে কি বলতে ডেকেছ আসমান?”
নিজের মধ্যে থাকা গম্ভীর ভাব বজায় রেখেই উত্তর দিল আসমান,
“আমি এমনি এমনি কাউকেই ডেকে আনিনি,আব্বু।”
“কেন ডেকেছ সেটা বলো!”
“আরেকজনের আসার বাকি,সে আসুক,তবেই বলব!”
‘আরহাম সিকদার চুপ করে গেলেন। উনি জানেন, উনার ছেলে কেমন। এমনি এমনি সে কারোর সময় নষ্ট করবে না। সালেহা বেগমের ইশারায় গৃহকর্মী ভদ্রমহিলা গেলেন চা বানিয়ে আনতে। এরমধ্যেই বাড়ির সদর দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল স্নেহা। সালেহা বেগম দৌড়ে গেলেন ওর কাছে। কতকিছু বলে চুমু আঁকলেন স্নেহার কপালে। মেয়েটাকে উনার ভীষণ পছন্দ! উনারই ভাইয়ের মেয়ে স্নেহা, সেই ছোট থেকেই উনি বসে আছেন ছেলের সাথে ভাইঝির বিয়ে দেখবেন বলে। অবশেষে সত্যি হচ্ছে উনার চাওয়া।
‘বাড়ির সকলেই ব্যস্ত হলো স্নেহাকে নিয়ে।এ দেখে বিরক্ত হয়ে আরিয়ানা আর আহান চলে গেল অন্যদিকে।আসমান বাঁকা হাসল স্নেহার দিকে তাকিয়ে।মনে মনে ওর কী চলছে,কে জানে!
#চলবে….
