Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রণয় প্রহেলিকাপ্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-২৫+২৬

প্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-২৫+২৬

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#২৫তম_পর্ব

অনল একটু সময় নিয়ে বললো,
“আপনি যে মিথ্যে কথা বলে এখানে ঢুকেছেন কেউ না জানুক আমি জানি। ওই ছিনতাই এর কথাটা সম্পূর্ণ বানোয়াট ছিলো। একটা মুভির লাইন টু লাইন কপি। বাড়ির সবাই বিশ্বাস করলেও আমি কিন্তু করি নি। কারণ মিথ্যের লংকায় একটা সত্যের আগুন ই যথেষ্ট। আপনার সব চুরি হলো, দামি ঘড়িটা থেকে গেলো অদ্ভুত না? যাই হোক, আমি বাধা দেই নি কারণ আপনি দাদাজানের চিকিৎসা করেছিলেন। তবে আপনার মতলব যে খুব সুবিধার নয় সেটা আমি জানি। আজ লুকোচুরি ছেড়ে সরাসরি জানতে চাচ্ছি, কি মতলবে এসেছেন আপনি?”

অনলের প্রশ্নে ঈষৎ বিস্মিত হলেও ভড়কালো না দীপ্ত। বরং তার ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো বিচিত্র হাসি। বিনা সংকোচে সে মুখোমুখি হলো অনলের। নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো,
“যদি বলি আমার মতলব ধারাকে নিজের করে পাওয়া!”

কথাটি কর্ণকুহরে যেয়ে মস্তিষ্কে ঝংকার তুললো। অনলের মনে হলো কেউ তার হৃদয় খুবলে খাচ্ছে। হৃদয়ের অন্তস্থলে অসহনীয় তীব্র ব্যথার সাথে এক অসামান্য আক্রোশ, ক্রোধ তাকে ঘিরে ধরলো। শান্ত ঝিলের মতো চোখজোড়ায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারালো না অনল। নিজেকে সংযত রেখে বললো,
“স্বপ্ন দেখা ভালো, তবে অবাস্তব স্বপ্ন দেখা ক্ষতিকর। আমি তাজ্জব হচ্ছি আপনার সাহস দেখে, আমার সামনে আমার বউ এর দিকে কুনজর দিচ্ছেন। অদ্ভুত! আমি ভদ্র মানুষ বলে আমার ভদ্রতার সুযোগ নিবেন না।”
“কিসের বউ! একটা বিয়ে যার ভিত্তি নেই সেটার জোর দেখাচ্ছেন? ইভেন সেলিম আংকেল এই বিয়ে মানেন না! উপরন্তু ধারার বয়স কত! উনিশ হলেও আমার জানা মতে সার্টিফিকেটে তার বয়স আঠারো বছর হতে এখনো চার মাস বাকি। সুতরাং বাংলাদেশের আইনে ও এখনো নাবালিকা। তাহলে কিসের বিয়ে আর কিসের বউ”

অনল এবার কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দীপ্তের দিকে। গাল ফুলিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে এক হাত পকেটে পুড়ে শান্ত কন্ঠে বললো,
” আপনার ওই সেলিম আংকেলকে বলে দিবেন তার যা করার করে নিতে। আমার বউ আমার ই থাকবে। অস্ট্রেলিয়ায় বসে হুমড়ি তুমড়ি না করে দেশে এসে মুখোমুখি কথাটা বলতে। যখন আমার ফুপুকে রেখে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে ব্যাস্ত ছিলেন, তখন তার ভাবা উচিত ছিলো তার একটা মেয়ে আছে। সুতরাং আই হ্যাড নট ওর্ডারড হিজ গ্লাস অফ অপিনিয়ন। গো টেল হিম৷ আর একদিন সময় দিচ্ছি। আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। চাচু আর বাবা ঘাড় দিয়ে বের করুক তার পূর্বেই আপনি নিজ থেকে বেরিয়ে যান”

বলেই ভেতরে পা বাড়াতে নিলে দীপ্ত হিনহিনে কন্ঠে বলে উঠে,
“আর ইউ স্ক্যায়ারড অফ মি? ভয় পাচ্ছো সত্যি তোমার ধারাকে নিয়ে ছু মন্তর না হয়ে যাই। অবশ্য হতেই পারো। আফটার অল আমি যা চাই, তা আদায় করেই ছাড়ি”

কথাটা শেষ করতে পারলো না দীপ্ত তার আগেই তার চোয়ালে সজোরে একটা মুষ্টিবদ্ধ হাতের ঘু’ষি এসে পড়লো। আকস্মিক ঘটনায় টাল সামলাতে পারলো না দীপ্ত, ধপ করে মাটিতে বসে পড়লো। হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অনলের দিকে। তার কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। চোখ অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করছে। ঘটনায় ধাতস্থ হবার আগেই অনল একটু ঝুঁকে তার কলার চেপে ধরলো। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
“এর পর থেকে এই ঘু’ষি’টার কথা স্মরণে রাখবেন। লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আমার ভদ্রতার সুযোগ নিবেন না। আমি মানুষটা দুধে ধোওয়া তুলসি পাতা না”

বলেই ছেড়ে দিলো দীপ্তকে। দীপ্তের শুষ্ক ঠোঁটে ফে’টে তরল রক্ত গলগল করে পরছে। সে এখন অনলের কঠিন মুখখানার দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে আহত হবে অকল্পনীয় ছিলো। অনল ভেতরে চলে গেলেও দীপ্ত এখনো সেখানেই বসে রইলো। তার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। হাত দিয়ে র’ক্তটুকু মুছতে মুছতে বললো,
“ইন্টারেস্টিং, এবার খেলা জমবে”

********

বই খুলে হা করে শুন্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ধারা। পড়াতে মন বসছে না। তার সম্পূর্ণ ধ্যান ঘুরপাক খাচ্ছে অনল এবং দীপ্তের কথোপকথনের উপর। তাদের মাঝে কি কথোপকথন হচ্ছে ব্যাপারখানা ভেবেই কিঞ্চিত বুক কাঁপছে তার। প্রিন্স উইলিয়ামের রাগ তার জানা। তখন যেভাবে তাকিয়ে ছিলো ধারার মনে হচ্ছিলো যেনো অনলের চোখ থেকে আগুন ঝরছে। ধারার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো। তার বারণের স্বত্তেও ধারা শুধু দীপ্তের সাথে কথাই বলে নি তার সাথে বিকেলের সময়টুকু কাটিয়েছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও ব্যাপারটাকে এড়াতে পারে নি। কারণ এই দীপ্ত নামক ব্যাক্তিটি তাকে ভীষণ বাজে ভাবে ফাঁসিয়েছে। যথারীতি তাকে ব্লা’ক’মে’ই’ল করেছে। অনলকে জানাবার সুযোগটিও হয় নি তার। অনল কি তাকে ভুল বুঝবে! রাগ করবে তার উপর! অবশ্য রাগ করাটা অস্বাভাবিক হবে না। ব্যাপারটা ভাবতেই হতাশ ধারা মাথা নোয়ালো। বই এর উপর দু এক বার মাথা ঠোকালো। উদ্বিগ্নতা তাকে ঘিরে রেখেছে। মাথাটা চিন্তার ঘোরে ফেটে যাবার জোগাড়। ঠিক সেই সময় সজোরে দরজায় আঘাত করে অনল। হনহন করে ভেতরে প্রবেশ করে সে। তার কঠিন, রক্তিম মুখখানার দিকে তাকাতেই শুকনো ঢোক গিলে ধারা। অনল ধপ করে বসলো বিছানায়। জোরে জোরে বার কয়েক নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু ব্যর্থ হলো। ফলে হনহন করে হেটে ওয়াশরুমে চলে গেলো সে। ধারা তাকে কিছু প্রশ্ন করার সুযোগ পেলো না। নির্বাক দর্শকের মতো শুধু চেয়ে রইলো।

আধ ঘন্টা পর অনল বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে চুল মুছতে মুছতে। তার চুল বেয়ে জলকনা গড়িয়ে পড়ছে মুখশ্রীতে। কঠিন মুখশ্রী এখনো নির্বিকার। বোঝা যাচ্ছে সে গোসল সেরে এসেছে। শ্যাওলা রঙ্গের টি শার্টটি বুকের কাছে ভেজা। বলিষ্ট বাহুজোড়ার লোমও ভিজে লেপ্টে আছে বাহুর সাথে। ধারা কিছু সময় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অনলের দিকে। নির্লজ্জ চোখ জোড়া যেনো কিছুতেই দৃষ্টি সরাতে পারছে না। মাঝে মাঝে ধারার অবিশ্বাস্য লাগে, প্রিন্স উইলিয়ামটি তার বর! প্রতিদিন নতুন করে লোকটির প্রতি বিমোহিত হয় সে, প্রতিদিন নতুন করে তার মনকাননে প্রণয়ের সিন্ধুপুষ্প ফুটে। প্রতিদিন নতুন করে লোকটিকে ভালোবাসে। আয়নায় ধারা মুখ খোলা বিমোহিত চেহারাটি দৃষ্টি এড়ায় না অনলের। তখনের ক্রোধ ঠান্ডা পানির প্রভাবে একটু হলেও শান্ত হয়েছে। আয়নার তাকিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে,
“মুখ বন্ধ কর, মাছি ঢুকে যাবে”

অনলের উক্তি কানে আসতেই স্বম্বিত ফিরে ধারা। সাথে সাথে মুখ বন্ধ করে ফেলে সে। একটু সাহস করে রয়ে সরে বলে,
“তুমি কি রেগে আছো?”

প্রশ্নটি শুনতেই পেছনে তাকায় অনল। উত্তর দেবার পূর্বেই সজোরে চিৎকার শুনতে পায় সে। ধারা ধরফরিয়ে উঠে। অনল টাওয়াল বিছানায় ছুড়েই ছুটে বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। ধারাও বসে থাকে না। সেও পিছু নেয়। ঘর থেকে বের হতেই সুভাসিনীর দেখা পায়। তাকে চিন্তিত দেখায়। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধায়,
“চিৎকার শুনেছিস?”
“হ্যা, কিন্তু চেঁচালো কে!”
“দীপ্তের ঘর থেকে এলো না!”

হ্যা চিৎকারটি দীপ্তের ঘর থেকেই এসেছে। ইতোমধ্যে বাড়ির বাকিরাও এসে জড়ো হলো। ইলিয়াসের মেজাজ খারাপ। সে খিটখিটে গলায় বলে উঠলো,
“এই বিদেশী তো শান্তি দিচ্ছে না, রাত দুপুরে এভাবে চেঁচাচ্ছে কেনো?”
“পড়ে টরে গেছে কি না, ওর ঘর থেকে বিকট শব্দ এসেছে”

রুবির কথা শুনতেই আর দেরি করলো না অনল। ছুটে গেলো দীপ্তের ঘরে। ঘরের দরজাটি ভেজানো ছিলো। দরজা ঠেলতে তা খুলে গেলো। দরজা খোলার পর যে দৃশ্যের মুখোমুখি হলো তা কল্পনীয়। রীতিমতো বিস্মিত নজরে তাকিয়ে রইলো বাড়ির লোকেরা। দীপ্তের খাটটি বিধ্যস্তভাবে ভাঙ্গা ঠিক মাঝবরাবর। দীপ্তের মাজা আটকে আছে সেই কাঠের ফ্রেমে। চাইলেও মুক্ত হতে পারছে না। উপরন্তু সে পাগলের মতো নিজের গা চুলকোচ্ছে। তার শুভ্র শরীর চুলকাতে চুলকাতে লাল হয়ে গিয়েছে৷ তবুও তার চুলকোনো থামছে না। তাকে পাগলের মতো লাগছে। মাজার ব্যাথা এবং গায়ের অসহনীয় পরিস্থিতি তাকে পাগল প্রায় করে তুলেছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতেই সে আর্তনাদ করে যাচ্ছে। দীপ্তের পরিস্থিতি সেই ফাঁদে পড়া ঘুঘুটির মতো। যে আত্নচিৎকার করে নিজেকে মুক্ত করার অভিপ্রায় রাখে। এতো গুরুতর মূহুর্তেও অনলের কঠিন মুখে হাসি ফুটে উঠলো। অঘোষিত শত্রুর মন্দ দেখতে হয়তো কারোর ই খারাপ লাগে না। ধারা খেয়াল করলো অনল মিটিমিটি হাসছে। কিন্তু সুভাসিনী কন্ঠ শুনতেই হাসি থেমে গেলো। তিনি বলে উঠলেন,
“ওকে ওঠা, মাজা টাজা ভাঙ্গলো কি না দেখ”

অনল অপেক্ষা করলো না। টেনে তুললো দীপ্তকে। দীপ্ত পাগলের মতো নিজেকে চুলকে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমি এসে ফ্যান ছেড়ে বসতেই খাট ভেঙ্গে গেলো। আর আমি আটকে গেলাম। মিনিট দশেক বাদেই এই এলার্জি। গা চুলকে লাল হয়ে যাচ্ছে। দিস ইজ ইনটলারেবল। এতো কেনো চুলকাচ্ছে শরীর? আমি তো এলার্জির কিছু খাই নি”

তার স্বীকারোক্তি শেষ হতেই অনল বললো,
“ডাস্ট এলার্জি হতে পারে। আসলে সারাদিন বাহিরে ঘুরেছেন তো। এক কাজ করুন গোসল করে ফ্রেশ হন। আই থিংক সেরে যাবে। না সারলে চুলকানির মলম দিচ্ছি”

দীপ্ত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। মাজা না ভাঙ্গলেও বেশ ব্যাথা পেয়েছে সে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনো মতে ওয়াশরুম অবধি গেলো সে। দীপ্ত যেতেই অনল এবং ইলিয়াস সজোরে হেসে উঠলো৷ এতো সময় হাসি থামিয়ে রেখে পেট ফুলে গেছিলো তাদের। বিদেশী মানুষের এমন নাজেহাল অবস্থা তাদের বিনোদন ই দিলো। ইলিয়াস হাসতে হাসতে বললো,
“কিভাবে চুলকাচ্ছিলো, যেনো কেউ বিচুটি পাতা ডলে দিয়েছে। ওর অবস্থাটা দেখার মতো ছিলো। একেবারে বিদেশি পাগল”

কথাটি শুনতেই অনলের বুঝতে বাকি রইলো না এই কান্ডটি ঠিক কাদের। দীপ্ত যে খাটটিতে ঘুমায় তার অবস্থা হলেও একেবারে খারাপ হয়। তাই সেটা হুট করে ভেঙ্গে পড়াটা সন্দেহজনক। উপরন্তু কারোর এতোটা ডাস্ট এলার্জি হবে না যে নিজেকে চুলকে র’ক্ত বের করে ফেলার মত অবস্থা হবে। যেখানে দীপ্ত নিজেই বিস্মিত। তাই এটা যে তার প্রখ্যাত বোনেদের বোনদের কাজ অনল নিশ্চিত। তার আন্দাজটি একেবারে ঠিক। এই নিপুন কাজটি জমজের। দীপ্তকে বের হতে দেখেই তারা ফন্দি আটলো আজকের দিনটা কি করে দীপ্তের জন্য বিভীষিকাময় করে তোলা যায়। তারা পুরোনো খাটের ফ্রেমের ঠিক মাঝবরাবর যে কাঠটি থাকে সেটাকে হাতুড়ি দিয়ে অর্ধেক ভাঙ্গা অবস্থায় রেখে রেখে দিলো। ফলে দীপ্তের ভর পড়তেই কাঠটি ভেঙ্গে গেলো। যার ফল খাটের বিধ্যস্ত অবস্থা। উপরন্তু সারা চাঁদরে ছিটিয়ে দিলো ফর্মুলা নাম্বার ৪২০। অতি বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজটি করলো তারা। যেনো কেউ টের ও না পায়। দীপ্তের বিদেশী সিলমোহরের জন্য এবারটিতে ছাড় পেয়ে গেলো। অনল আড়চোখের তাকালো দরজার কাছে শিটিয়ে থাকা অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীদ্বয়ের দিকে। মুখটাকে অসহায়ের মতো করে রাখলেও তাদের চোখের উৎফুল্লতা এবং ঠোঁটের কোনে চেপে রাখা বিজয়ী হাসি নজর এড়ালো না অনলের। মনে মনে দীপ্তের ভবিষ্যতের জন্য সন্দেহ ই হলো। অপর দিকে নিজেদের বিশাল সফলতায় একে অপরের সাথে হ্যান্ডশেক করলো৷ আশা ফিসফিসিয়ে বলল,
“চেরাগআলীর জন্য কষ্টই হচ্ছে। এসেছিলো দেশ ভ্রমণে। এখন হাসপাতাল ভ্রমণ করতে হবে”
“বেঁচারা, সে তো জানতো না তার সাক্ষাত কাদের সাথে হবে। এসেছিলো মানুষ হয়ে, ফিরবে কি হয়ে সেটা আল্লাহ ই জানে”

বলেই দুজন হাসতে লাগলো। এশা আশার খপ্পরে পড়ে বেঁচারা সত্যি নাজেহাল। ওয়াশরুম থেকে গোসল করে এসে চুলকানি থামলো কিছু ব্যাথা না। সারা শরীর লাল হয়ে আছে তার। চুলকে চুলকে মুখটা ফুলে গিয়েছে। উপরন্তু খাটটাও ভাঙ্গা। অনল এবং ইলিয়াস মিলে খাট সরিয়ে যাজিম বিছিয়ে দিলো। বেচারাকে রাতটা মাটিতেই কাটাতে হবে। কিছুই করার নেই। মাজা ব্যাথা নিয়ে মাটিতে থাকলেও এ বাড়ি ছাড়বে না সে।

দীপ্তের ব্যবস্থা করে ঘরে ফিরলো অনল। ধারাও ফিরলো তার পিছু পিছু। মনে হাজারো প্রশ্ন দলা পেকে আছে তার। অনলের কাছে উত্তর পাওয়া বাকি। তাই দেরি না করেই বলে উঠলো,
“আমি ইচ্ছে করে যাই নি লোকটির সাথে। সে আমাকে ব্লা’ক’মে’ই’ল করেছিলো। আসলে বন্ধুদের সামনে আমার বিয়ের কথাটা এমন ভাবে তুললো আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। উপরন্তু তোমার নাম জানাজানি হলে ব্যাপারটা জলঘোলা হবে। তাই আমি উনার শর্তে রাজি হয়েছি। প্লিজ আমার উপর রাগ করো না”

এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে নতমস্তক দাঁড়িয়ে রইলো ধারা। অনলের রাগ উগরানোর অপেক্ষা করতে লাগলো সে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলো না। বরং অনল তার হাত টেনে বক্ষস্থলে মিশিয়ে নিলো। শক্ত বেষ্টনীতে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করে রাখলো। ললাটে উষ্ণ পরশ দিয়ে বললো,
“তোর কেনো মনে হলো আমি তোর উপর রাগ করবো যেখানে আমি সবটা জানি!”…………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#২৬তম_পর্ব

এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে নতমস্তক দাঁড়িয়ে রইলো ধারা। অনলের রাগ উগরানোর অপেক্ষা করতে লাগলো সে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলো না। বরং অনল তার হাত টেনে বক্ষস্থলে মিশিয়ে নিলো। শক্ত বেষ্টনীতে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করে রাখলো। ললাটে উষ্ণ পরশ দিয়ে বললো,
“তোর কেনো মনে হলো আমি তোর উপর রাগ করবো যেখানে আমি সবটা জানি!”

অনলের কথাটা বুঝতে সময় নিলো ধারার মস্তিষ্ক। মাথা উঁচিয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে চাইলো সে। অনলের শান্ত মুখশ্রীর স্নিগ্ধ মনোমুগ্ধকর হাসি কিছুটা হলেও অবাক করলো ধারাকে। ভেবেছিলো অনল আক্রোশ উগরাবে। সে প্রস্তুত ও ছিলো, দোষ করলে তো শাস্তি মাথা পেতে নিতেই হয়। কিন্তু অনলের মোলায়েম কন্ঠ এবং স্নিগ্ধ স্নেহ তাকে বিস্মিত করলো। অবাক কন্ঠে বললো,
“তুমি জানতে? তুমি রাগ করো নি?”
“না করি নি, না জানা থাকলে হয়তো রাগ করতাম। তুই যখন দীপ্তকে নিয়ে কলেজ থেকে বেড়িয়ে যাস, সেই ফাঁকে মাহি আমার রুমে আসে। দীপ্তের সম্পূর্ণ কথাটা বলে আমায়। তখন ই বুঝতে পারি ওর সাথে যাবার কোনো তো কারণ অবশ্যই আছে। কারণ, আমার ধারা না ভেবে কোনো কাজ করে না”
“এতোটা বিশ্বাস করো আমায়?”
“অবিশ্বাস করা উচিত বুঝি?”

অনল হাসলো; অমলিন, স্নিগ্ধ মোলায়েম হাসি। ধারা মাথা ঠেকালো অনলের বলিষ্ট বুকে। দু হাত ধরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। নিস্তব্ধ ঘর, পুরোনো ফ্যানের শব্দ ব্যাতীত কোনো শব্দ নেই। বাহিরেও নিস্তব্ধতা। যেনো সারা শহর ডুবে আছে কোনো ঘোরে। অনল ভাঙ্গলো নিস্তব্ধতা, নরম স্বরে বললো,
“আর কটা দিন, এর পর তোর সেমিস্টার শেষ আর আমার কোর্স ও। ইনশাআল্লাহ এর পর আর লুকোচুরি করতে হবে না। আমি আর তোদের কোর্সও নিবো না। তখন তুই নির্ভয়ে বলতে পারবি, আমি তোর; শুধু তোর”
“সেই দিনটির অপেক্ষা। আমি চাই না, আমার জন্য তোমাকে গায়ে কোনো কলঙ্ক লাগুক”

ধীর কন্ঠে কথাটা বললো ধারা। অনলের হাসি প্রাসারিত হলো। দুহাতে আলতো করে তুলে ধরলো তারা মুখশ্রী। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
“মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয়, কেনো এই ছোট মেয়েটির প্রেমে পড়লাম। কেনো এতো মায়ায় জড়ালাম। পরমূহুর্তে না চাইতেই উত্তর পেয়ে যাই। আজ তোর কাছে একটা আবদার করলে রাখবি?”
“বলেই দেখো”
“মনটা বেহায়া হয়ে উঠছে। অনুভূতিগুলো হাহাকার শুরু করেছে। অন্তস্থলে জমিয়ে রাখা এক বিন্দু শীতল প্রণয় এখন প্রহেলিকার রুপ নিয়েছে। অবাধ্য ইচ্ছেরা জোয়ার তুলেছে ধারা। আমার মন কাননের ভেজা প্রণয় গোলাপটি তোমায় দিলাম, তুমি কি ফিরিয়ে দিবে নাকি রেখে দিবে নিভৃত যতনে?”

অনলের ঘোরলাগা কন্ঠের “তুমি”টুকুর মাঝে এতো মাদকতা থাকবে জানা ছিলো না। যেনো সম্মোহনী ডাক। এই প্রথম অনলের কন্ঠে তুমি টুকু শুনলো সে। বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো অনলের মুখশ্রীর দিকে। তার নেশাগ্রস্থ চাহনী, অস্থির মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে থাকা গেলো না। গলা শুকিয়ে এলো, হৃদস্পন্দন হয়ে উঠলো লাগামহীন। ঠোঁট ভেজালো ধারা। বলতে ইচ্ছে হলো,
” রেখে নিবো যতনে”

কিন্তু মুখ থেকে কথা বের হলো না। শুধু মাথাটা উপর নিচ নামিয়েই মুখ লুকালো অনলের বক্ষস্থলে। অনল নিঃশব্দে হাসলো। বাহিরে আজ পূর্ণচন্দ্র, তবে নিকষকালো মেঘের আড়ালে রুপালী চাঁদটি যেনো ঘা ঢাকা দিয়েছে। তাই স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নাটি শুধু মেঘের মাঝেই আবদ্ধ। অনলের মনে হলো তার একান্ত চন্দ্রটি আজ নিজেকে অনলের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে। তাই সেই জ্যোৎস্নাটিও তার মাঝে আবদ্ধ। নিষিদ্ধ ইচ্ছের জোয়ারকে আজ বাঁধা দিলো না অনল। কোলে তুলে নিলো নিজের শশীকে। তারপর সে প্রস্থান করলো বিছানার দিকে।

নিগূঢ় রাত, নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে শীতল ঘরটি। ফ্যানটির ক্যাচর ক্যাচর শব্দ কিছুটা ক্ষীণ। মাঝে কিছু তপ্ত নিঃশ্বাস, কিছু নিষিদ্ধ বাসনা এবং এক বিন্ধু স্নিগ্ধ প্রণয়। একে অপরের মাঝে লেপ্টে আছে মানব মানবী। নিজের ছোট বউটিকে পরম স্নেহে বুকের সাথে মিশিয়ে রেখে অনল। ক্লান্ত ধারা ঘুমেমগ্ন। কিন্তু অনলের চোখে ঘুম নেই। সে চিন্তিত। চিন্তিত দুজন মানুষের জন্য, দীপ্ত এবং সেলিম সাহেব। এই দুজনের উদ্দেশ্য অজানা। ভোরের আলো ফুটতে বহু দেরি। কেবল রাতের শেষ প্রহর। অনল ও ক্লান্ত। ধারাকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরলো সে। শুভ্র কপালে উষ্ণ পরশ ছুঁয়ে বললো,
“তুই চিন্তা করিস না, যে যাই করুক আমি তোকে আমার থেকে দূরে যেতে দিবো না”

এরমাঝেই ঈষৎ কেঁপে উঠলো ধারা। অনল বুঝলো তার বউ এর ঠান্ডা লাগছে। কাঁথাটা টেনে দিলো সে৷ তারপর ঘুমে ক্লান্ত চোখজোঁড়া বুঝলো। সাথে সাথেই রাজ্যের ঘুম তাকে ঘিরে ধরলো।

*******

সকাল কো’টা বাজে জানা নেই। মোটা পর্দায় ঘেরা ঘরটিতে এখনো সূর্যালোক ঢুকে পারে নি। ফলে ঘরটি এখনো আঁধারে ঘিরে আছে। ধারার চোখ খুললো। পিটপিট করে চাইলো আশেপাশে। সর্বপ্রথম যা নজরে পড়লো তা হলো অনলের ঘুমন্ত মুখশ্রী। শান্ত, স্নিগ্ধ, শীতল মুখশ্রী। পরমূহুর্তেই গতরাতের কথা স্মরণ হলো। তীব্র লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠলো তার গাল। তবুও ঠোঁটের হাসি টুকু যেনো এখনো প্রাণবন্ত। সে উঠে ওয়াশরুমে গেলো। মিনিট পনেরো বাদে যখন বের হলো তখন অনল গভীর ঘুমে। হুট করেই মাথায় চাপলো দুষ্ট বুদ্ধি। ধীর পায়ে তার পাশে বসলো। গামছায় বাধা ভেজা চুলগুলো ঝাড়া দিলো ঠিক অনলের মুখের উপর। পানির ছিটা মুখে এসে পড়তেই ঘুমটা নড়বড়ে হলো অনলের। ভ্রু কুচকে বিরক্তি প্রকাশ করলো সে। কিন্তু চোখ খুললো না। ধারা মিটিমিটি হেসে পুনরায় একই কাজ করলো। এবার অনল চোখ খুলে তাকালো। ধারা উঠে যেতে নিলেই খপ করে হাতটা ধরে নিলো অনল। হ্যাচকা টানে ধারাকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। শান্ত কন্ঠে বললো,
“ঘুমন্ত আমাকে জ্বালিয়ে তো বিশাল এভারেস্ট জয় করেছিলি, তা থামলি কেনো?”
“ছাড়ো, লাগছে”
“ছাড়বো কেনো? আমিও দেখি আমার বউটির পেটে কত দুষ্টুবুদ্ধি”

বলেই ধারা কোমড়ের হালকা চাপ দিলো অনল। ধারা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো, তবে ব্যর্থ হলো। তখন অসহায়ের ন্যায় বললো,
“ভুল হয়েছে, আর করবো না”
“তা বললে তো হচ্ছে না শাস্তি তো পাওনা”
“কি শাস্তি?”
“বেশি কিছু না, শুধু একটা শীতল চুমু”

বলেই এগিয়ে আসতে নিলেই ধারা তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে। এক মূহুর্ত ঘরে থাকা ভয়ংকর তাই দেরি না করেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় সে। অনল মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলে,
“শোধ তো আমি নিবোই”

খাবার টেবিলে পৌছাতেই জম্পেস খবর পাওয়া গেলো। যা অনলকে বেশ অবাক করলো। দীপ্ত সকাল হতেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। লাগেজ তার এমনিতেও ছিলো না। ফলে সকাল হতেই নিজের সেই প্রথম দিনের শার্ট এবং প্যান্টটি পড়ে বেশ ফিটবাবুর মতো সে তৈরি হয়ে গেলো। অনল ধারা ব্যতীত সকলকেই বসার ঘরেই পেলো সে। তাদের কাছে বিদায় নিয়ে বললো,
“সকালে বাবাকে ফোন করেছিলাম, উনি আমার সব জিনিস পাঠিয়ে দিয়েছেন তার এসিস্ট্যান্টকে দিয়ে। সুতরাং এ বাড়িতে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। ভাগ্যে থাকলে আমাদের আবার দেখা হবে”

ছেলেটি নাকি খায় ও নি। ভদ্রতার খাতিরে সুভাসিনী বলেছিলো,
“তুমি একদিন থেকে যাও, কাল যা হলো। তোমার মাজার ব্যাথা তো সাড়ে নি”

প্রত্যুত্তরে হেসে বললো,
“আপনাদের আপ্প্যায়নে আমি সত্যি স্যাটিসফাইড, অজানা ছেলের প্রতি এতো ভালোবাসা কেউ দেখায় না। আর মাজার ব্যাথা এখন নেই। রাতে ঔষধ খেয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে ভাববেন না৷ আসি আমি”

বলেই দীপ্ত চলে গেলো। ছেলেটি ঝড়ের মতো এসেছিলো, আবার দক্ষিণা বাতাসের মতোই চলে গেলো। এতে অবশ্য জামাল সাহেব বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ছেলেটি সেলিমের পরিচিত না হলে তার সাথে ভালো খাতির ই হতো তার। কিন্তু আফসোস সে সেলিম সাহেবের পরিচিত। দীপ্তের যাওয়াতে সবচেয়ে বেশি দুঃখী মনে হলো জমজদের। সে দ’স্যিরা শান্ত থাকে না তাদের দেখা গেলো পা ছড়িয়ে বসার ঘরের কার্পেটের উপর বসে থাকতে।মুখজোড়া লম্বাটে হয়ে আছে। অনল তাদের মুখ দেখেই বললো,
“কি রে! এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ ঝুলিয়ে আছিস কেনো?”

উত্তরে এশা উদাস কন্ঠে বললো,
“দীপ্ত ভাইয়ের স্বাগতমে কতোকিছু ভেবেছিলাম, কিন্তু উনি বিনা নোটিসেই চলে গেলেন। কষ্ট লাগবে না?”
“তুমি বুঝবে না অনল ভাই, পাষাণরা বুঝে না। মানুষটাকে তো ভালো করে খাতির ই করা হলো না। ধ্যাত, এমন ভালো মানুষ কি পাওয়া যায়?”

এশার কথার সাথে তাল মিলিয়ে আশা বলে উঠে। বোনেদের এমন কথায় রীতিমতো অবাক অনল এবং ধারা। অনল ভ্রু কুচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো জমজদের দিকে। তাদের মুখ এখনো তেমন ই। তারা যেনো সত্যি মর্মাহত। তাদের দুঃখ যেনো অতুলনীয়। থেকে থেকে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। দীপ্তের পালিয়ে যাওয়ার হরেক কারণের মাঝে একটি যে জমজরা ছিলো সেটা বুঝতে ভুল হলো না অনলের। তারা যে বেচারার স্বাগতমে আর কতো কি রেখেছিলো শুধু উপর ওয়ালাই জানেন। ভাগ্যিস পালিয়ে গেছে সে। তবে দীপ্তের এমন ভাবে চলে যাওয়াটা বেশ অবাক ই করলো ধারা এবং অনলকে। অনলের হুমকিতে চলে গেছে এমনটা হবার সম্ভাবনা কম। তবে কি তার স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গিয়েছে! অনল বেশি মাথা ঘামালো না, লোকটি গিয়েছে সেটা স্বস্তির ব্যাপার। কারণ ধারাকে হারাবার ভয়টা এখন ক্ষীণ থেকে ক্ষীনতর হয়ে যাচ্ছে। অনলের মুখে একচিলতে হাসি দেখে ধারা শুধালো,
“কি হয়েছে? হাসো কেনো?”
“কিছু না, এমনি”

*****

অবশেষে এক এক করে শেষ হলো ধারার পরীক্ষা, বিশদিনের টানা পরিশ্রমের পর শেষ হলো পাঁচটি পরীক্ষা। আজ শেষ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার খ’ড়া’র থেকে মুক্তি পাবার আনন্দ ই আলাদা। এখন তারা আর ফার্স্ট ইয়ারে নেই। হয়ে গিয়েছে সিনিয়র। অবশ্য জুনিয়রদের ক্লাস শুরু হতে দেরি আছে। তবুও বেশ দাপটে ভাব চলে এসেছে। বন্ধুমহলে বেশ উৎসাহ। ভেবেছিলো অনল স্যার তাদের নাকানি চুবানি খাওয়াবে কিন্তু তেমন কিছু হয় নি। লেকচারের মধ্যেই তার প্রশ্ন হয়েছে। অন্য সকল কোর্স ও মন্দ যায় নি। নীরবের পাশাপাশি সবার পরীক্ষাই ভালো গিয়েছে। তবে বেশি ভালো গিয়েছে ধারার। প্রিন্স উইলিয়ামের কড়া শাসনের মাঝে ধারার পরীক্ষা খারাপ হবার কারণ নেই। ধারাও অনেক কষ্ট করেছিলো যেনো সিজিটা ৩.২৫ এর বেশি হয়। তাহলে প্রিন্স উইলিয়ামকে যেয়ে বলবে,
“চলো, এবার ঘুরতে নিয়ে চলো”

ব্যাপারটা ভাবতেই মন খুশি হয়ে উঠলো ধারার। অভীক তো পারলে নীরবকে মাথায় তুলে নেয়। আবেগী স্বরে বললো,
“দোস্ত তোর জন্য এ যাত্রায় আমি পার হয়ে যামু। তোরে তো একুশটা তোপের সালামি দিতে মন চাচ্ছে। বল দোস্ত কি চাই তোর?”
“কিছু না তুই এবার নিজের বাড়ি যায়ে আমাকে স্বাধীন কর”

হতাশ কন্ঠে বললো নীরব। বলবে নাই বা কেনো। এই পরীক্ষার উছিলায় গত বিশদিন যাবৎ অভীক তার মেসেই পড়ে রয়েছে। খাচ্ছে, দাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে। ছোট খাটে বিশাল দেহী মানুষটা হাত পা ছুড়ে যখন শোয়, তখন জীর্ণকায় নীরবকে বাধ্য হয়ে মাটিতে ঘুমাতে হয়। শুধু তাই নয়, রীতিমতো নীরবের পরিপাটি ঘরটিকে একটা গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছে নিজের ময়লা কাপড়ে। উপরন্তু রাত বিরাতে ভরপেট খেয়ে বায়ুদূষণের কথা নাই বা তুললো। এয়ার ফ্রেশনার কিনতে কিনতে নীরব ফকির প্রায়। বন্ধু বিধায় লা’থি মেরে বের করতে পারলো না নীরব। ফলে এই পরীক্ষা শেষ হওয়ার আনন্দের থেকে অভীকের অত্যাচারের ইতি হবার আনন্দটাই নীরবের মাঝে বেশি। বন্ধুমহলের সকলের মাঝে উৎসাহ দেখা গেলেও দিগন্তকে দেখালো শান্ত। কেউ ব্যাপারটা আমলে না তুললেও মাহি ঠিক ই তুললো। হুট করেই বলে উঠলো,
“কিরে বিবিসি, তোর মুখ শুকনো কেনো? কোনো নতুন খবর টবর নেই নাকি?”

মাহির হাসির ছলে বলা কথাটা দিগন্ত যে অন্যভাবে নিবে জানা ছিলো না কারোর ই। সে বিচিত্রভাবে হাসলো। তারপর নিস্প্রভ কন্ঠে বললো,
“খবর তো অনেক ই আছে। কিছু খবর তো এমন যা মাটি কাঁপিয়ে দিবে। কিন্তু তোরা সেই খবরটা শুনতে চাস কি না সেটা হচ্ছে ফ্যাক্ট”
“এভাবে বলছিস কেনো? তোর মন খারাপ বিধায় আমি কথাটা তুললাম”
“ওহ! তাই বুঝি”

টিটকারির স্বরে বললো দিগন্ত। ধারার বিয়ের খবরটি শুনবার পর থেকেই দিগন্তের মাঝে একটা অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষয় করা গেছে। সে তুলনামূলক শান্ত এবং মনমরা হয়ে গেছে। প্রাণঞ্জ্বল, চো’গ’ল’খো’র দিগন্তটি যেনো কোথাও মিলিয়ে গেছে। দীপ্ত কথাটি ফাঁস করার পরদিন ধারা সকলকে খুলে বললো ঘটনা। হুট করে বিয়েটা নিজের ই মানতে আপত্তি হচ্ছিলো তাই কাউকেই জানায় নি সে। ধারার স্বীকারোক্তিতে সকলে মেনেও নিলো। ধারাকে বরের নাম শুধাতেই সে বললো,
“সময় হলে ঠিক পরিচয় করিয়ে দিবো। একটু সময় দে”

অভীক বা নীরব ধারার সিদ্ধান্তে ভেটো দিলো না। কিন্তু এর মাঝে দিগন্তকে দেখা যায় মৌন। তার যেনো কোনো কিছুতেই কোনো গুরুত্ব নেই। ব্যাপারটা নীরব ঠিক ই বুঝতে পারে। কারণ দিগন্তের মনের ব্যাপারটা তার অজানা ছিলো না। দিগন্তকে বোঝাবার চেষ্টাও করে সে। দিগন্ত তখনও থাকে শান্ত। তবে আজ তার কথার সুর যেনো অন্যরকম। ফলে মাহির সাধারণ কথায় তার প্রতিক্রিয়া মারাত্মক। অভীক খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“আচ্ছা, গোলগোল না ঘুরিয়ে ঝেড়ে কাশ। তোর ঝামেলাটা কোথায় হচ্ছে?”
“আমার কি ঝামেলা হবে! আমি তো মাহির কথার উত্তর দিয়েছি। কি মাহি! আমি কি বলবো খবরটা? অবশ্য ধারার আপত্তি না থাকলে বলতেই পারি”

দিগন্তের কথার ভোল সন্দীহান ঠেকলো। ধারাকে ঠেস মেরে যখন কথাটা বললো, তখন ই বন্ধুমহলের উত্তেজনা বাড়লো। ধারার ভ্রু কুচকে এলো, শান্ত কন্ঠে বললো,
“দিগন্ত তোর এই কথাগুলো সত্যি আমরা বুঝছি না। যা বলার বলেই ফেল না, অহেতুক কথা প্যাচাচ্ছিস কেনো?”
“আমি প্যাচাচ্ছি নাকি তুই রীতিমতো ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস! তোর মিস্ট্রি বরটি যে অনল স্যার সেটা বলতে কিসের আপত্তি বলতো!…………….

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ