Friday, June 5, 2026







রূপার পালঙ্ক পর্ব-০৪

🔴রূপার পালঙ্ক(৪ পর্ব)🔴
– হুমায়ূন আহমেদ

আজ মোবারকের বসার জায়গা হয়েছে অন্য একটা ঘরে। প্রমোশন না ডিমোশন বোঝা যাচ্ছে না। এই ঘরটা আগেরটার চেয়ে বড়। তবে মেঝেতে কার্পেট নেই, দেয়ালে পেইনটিং নেই। সোফা আছে। সোফার কভার ময়লা। প্রথমবারের ঘরে মোবারক একা বসে ছিল। এই ঘরে আরো লোকজন আছে। সবার মধ্যে এক ধরনের ব্যস্ততা। মোবারক কিছুক্ষণ বসতেই বড় ট্রে ভর্তি চা নিয়ে একজন ঢুকল। সে সবাইকে চা দিচ্ছে। গণ-চা হয় খুব কুৎসিত হবে, আর নয়তো খুব ভাল হবে। এই চা-টা ভাল। শুধু চা না, দেখা গেল আরেকজন প্লেট ভর্তি কেক নিয়ে এসেছে। কেকের প্লেট রাখা হয়েছে সামনের টেবিলে। কেউ কেক নিচ্ছে না। মনে হচ্ছে দ্রতা করছে। মোবারক উঠে গিয়ে দুই পিস নিয়ে নিল। একটা আপাতত জমা থাকুক চায়ের কাপের পিরিচে।

কিছুক্ষণ পর পর ম্যানেজার সাহেব ঢুকছেন। একজন দুজন করে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন। ম্যানেজার সাহেব আজ স্যুট পরেছেন। ভদ্রলোককে স্যুটে একেবারেই মানাচ্ছে না। টাই-এ ইস্ত্রী নেই বলে টাই এর মাথা উঁচু হয়ে আছে। মনে হচ্ছে টাইটা মাথা উঁচু করে আশে পাশে কি হচ্ছে দেখার চেস্টা করছে। কোনো কারণে ম্যানেজার সাহেবের মনও মনে হয় খারাপ। তাঁকে মিয়ানো মুড়ির মত লাগছে।

ম্যানেজার সাহেব মোবারকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বোঝাই যাচ্ছে ডাক পড়েছে। এক পিস কেক এখনো রয়ে গেছে, খাওয়া হয় নি। থাক ফিরে এসে খাওয়া যাবে।

মোবারক সাহেব কেমন আছেন?

জ্বি ভাল।

আসুন আমার সঙ্গে।

কোথায় যাব? বড় সাহেবের কাছে?

আপাতত আমার ঘরে।

আপনি নিজে এলেন কেন? কাউকে দিয়ে ডেকে পাঠালেই হত।

ডেকে পাঠানোর লোক নেই। অফিস স্টাফের দুইজন আজ আসেই নি। একজন গেছে ছুটিতে।

স্যার, আপনাকে দেখেই বুঝতে পারছি— আপনার উপর চাপ বেশি পড়েছে। আপনার বিশ্রাম দরকার।

ম্যানেজার সাহেব এই গভীর আন্তরিকতায় অভিভূত হলেন না। বিষাদময় মুখ করে মোবারককে অফিসে নিয়ে গেলেন। মোবারককে তার সামনের চেয়ার বসতে বললেন।

মোবারক বলল, স্যার, ডাক্তারের রিপোর্ট কি এসেছে?

হ্যাঁ এসেছে। রিপোর্ট পজেটিভ।

আপনার এই ঘরে কি সিগারেট খাওয়া যায়?

হ্যাঁ যায়।

মোবারক সিগারেট ধরাল। ম্যানেজার সাহেব বললেন, ঝামেলা যখন ঘাড়ে এসে পড়ে একসঙ্গে আসে। আমার হয়েছ মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা। কোন হেল্পিং হ্যান্ড নাই— অথচ আজকের মধ্যে আপনার পাসপোর্ট করাতে হবে। ভিসার জন্যে কাল পাসপোর্ট জমা দেব। কোথায় যাওয়া হবে সেটা নিয়ে ফ্যাকড়া বেঁধেছে।

কী ফ্যাকড়া?

স্যারের বড় মেয়ের জামাই বলছে অপারেশনটা ইংল্যান্ডে করাতে–কুইনস হসপিটাল। তার নাকি চেনা জানা আছে। এদিকে মেজো মেয়ের জামাই থাকেন সুইজারল্যান্ডে; তিনি সেখানে সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

কোথায় যাওয়া হবে এখনো ঠিক হয় নি?

ঠিক হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে যাওয়া হবে। আসগর সাহেব এটা নিয়ে খুবই আপসেট। স্যারের সঙ্গে উনার যাবার কথা। উনি মনে হয় যাবেন না।

অজগর সাহেব কি উনার বড় মেয়ের জামাই?

জ্বি। অজগর না-আসগর। চলুন উনার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেই।

উনার সঙ্গে কথা বলে কী হবে?

আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলেন।

চলুন যাই।

বসুন এক কাপ চা খেয়ে যাই। সকালে বাসা থেকে যে বের হয়েছি এক কাপ চা পর্যন্ত খেতে পারি নি। আপনি খাবেন?

অবশ্যই খাব। আপনি একা একা চা খাবেন এটা হয় না। এক্সকিউজ মি স্যার আপনিও কি বড় সাহেবের সঙ্গে যাবেন?

এখনও বুঝতে পারছি না। একবার ঠিক হচ্ছে যাব। একবার ঠিক হচ্ছে যাব না। টোটেল কেওস।

আপনি গেলে খুব ভাল হয়।

কেন?

আমিতো আর কাউকে চিনি না। শুধু আপনাকেই চিনি। আপনাকে নিয়ে দেশটা ঘুরে ফিরে দেখতাম। শুনেছি সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোহর।

ম্যানেজার সাহেব কিছু বললেন না। দ্রুত চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন।

চলুন আসগর সাহবের কাছে নিয়ে যাই। ভদ্রলোক খুবই মুডি। উনি কী কথা বলেন, না বলেন শুধু শুনে যাবেন। কোনো আগুমেন্টে যাবেন না।

জ্বি আচ্ছা।

আপনার ছবি তুলতে হবে। পাসপোর্টের জন্যেও ছবি লাগবে। ভিসার জন্যে ছবি লাগবে। গাড়ি দিয়ে দেব, ছবি তুলে নিয়ে আসবেন। পাসপোর্ট ফরমে সই করে যাবেন।

জ্বি আচ্ছা।

আপনি বরং এক কাজ করুন স্যারের বাড়িতে আপনাকে একটা রুমের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। জিনিসপত্র নিয়ে উঠে আসুন। কখন কোন প্রয়োজন হয়। এ বাড়িতে থাকতে কোনো অসুবিধা আছে?

জ্বি না।

চলুন আসগর সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। কথাবার্তা সাবধানে বলবেন। উনার মেজাজ আজ অত্যন্ত খারাপ।

আসগর সাহেব বারান্দায় ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনের ছোট্ট টি টেবিল ভর্তি রাজ্যের পত্রিকা। মোবারককে দেখে ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। মোবারক ভদ্রলোককে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল। উনি সেই মানুষ যিনি প্রথম দিন অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে মোবারককে জিজ্ঞেস করেছেন আনিস সাহেব কি চলে গেছেন?

এই মুহূর্তে ভদ্রলোক যে খুব রেগে আছেন তা মনে হল না। রাগ থাকলেও খবরের কাগজে ধর্ষণ জাতীয় খবর পড়ে মনে হয় রাগ পড়ে গেছে। ম্যানজোর সাহেব তাঁর বিখ্যাত মিনমিনে গলায় বললেন, স্যার ইনিই মোবারক হোসেন।

মোবারক হোসেনটা কে?

কিডনি ডোনার।

ও আচ্ছা আচ্ছা। আপনি বসুন। ম্যানেজার সাহেব আপনি চলে যান। আপনার দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।

জ্বি আচ্ছা।

আসগর সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, ইদানীং লক্ষ করছি আপনি কুঁজো হয়ে হাটছেন? Why? আপনার বাথরুমে আয়না আছে না?

জ্বি আছে।

দয়া করে একটু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন— স্যুট পরা লোক যখন কুঁজো হয়ে থাকে তখন তাকে কেমন দেখায়। Please do that.

জ্বি আচ্ছা।

মোবারক লক্ষ করল ম্যানেজার সাহেব বারান্দা থেকে যাবার সময় সত্যি সত্যি কুঁজো হয়েই যাচ্ছেন। আগে কুঁজো হয়ে হাঁটছিলেন না। আসগর সাহেবের কথা শোনার পর থেকে কুঁজো হয়ে হাঁটছেন।

আসগর সাহেব হাত থেকে পত্রিকা নামিয়ে বললেন, আপনি হলেন কিডনি ডোনার!

জ্বি স্যার।

ভেরি গুড। হিউমেন বডির দুটা কিডনির কোনো প্রয়োজন নেই। একটাই মোর দ্যান সাফিসিয়েন্ট। একটা কিডনিতে বাকি জীবন আপনি হেসে খেলে পার করতে পারবেন। আপনি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না।

মোবারক তার মুখ হাসি হাসি করে দেখাবার চেষ্টা করল যে সে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত না। তবে মনে মনে বলল, একটা কিডনিই যদি মানুষের জন্যে যথেষ্ট হয় তাহলে তুই তোর দুটা থেকে একটা দিয়ে দিচ্ছিস না কেন? তুই জামাই মানুষ। শ্বশুরের জীবন রক্ষার জন্য তুই কিছু করবি না? তোর একটা দায়িত্ব আছে? শ্বশুরের সম্পত্তিতো তোরা জামাইরাই হাতাবি। এক কাজ কর— তুই একটা কিডনি দে আর সুইজারল্যান্ডের জামাই দিক একটা। শ্বশুর পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাক।

আসগর সাহেব বললেন, অপারেশন যেটা হবে সেটাও রুটিন অপারেশন। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট এত হচ্ছে যে ব্যাপারটা টনসিল তোলার মত সহজ হয়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগেও কোনো ফরেন বডি শরীর এক্সসেপ্ট করত না। শরীরের Immune systems allow করত না। নতুন একটা ড্রাগ এই প্রবলেম একশ ভাগ সলভ করেছে। ড্রাগটার নাম…।

জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করা মোবারকের পক্ষে সম্ভব না। হাসি হাসি মুখে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।

অপারেশনটা সুইজারল্যান্ডে হচ্ছে শুনেছেন বোধহয়?

জ্বি।

A very wrong decision. সুইসরা ঘড়ি বানানো ছাড়া আর কিছু পারে। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টতো আর ঘড়ি বানানো না। জটিল মেডিক্যাল প্রসিডিউর। ঠিক না?

অবশ্যই ঠিক।

অপারেশন এমন হসপিটালে হওয়া উচিত যেখানে সকাল বিকাল এই অপারেশন হচ্ছে। যেমন ধরেন ব্যাংককের আমেরিকান হসপিটাল। কিংবা ইন্ডিয়ার মাদ্রাজ। আমার ফার্স্ট চয়েস ছিল মাদ্রাজ। অবশ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে এ ধরনের অপারেশনের কিছু রিস্ক আছে। পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারটা হয় না। যে কারণে আমি ইংল্যান্ডের কুইনস হসপিটালের কথা বলেছিলাম।

স্যার আপনি খুব ভাল কথা বলেছেন। অতি ভাল সাজেশন।

আসগর সাহেব হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, এ বাড়ির সমস্যা হচ্ছে— এই বাড়ির লোকজন ভাল কথা, ভাল সাজেশন বলে কিছু বিশ্বাস করে না। কেউ একটা ভাল সাজেশন দিলে এরা ইমিডিয়েটলি সেটা কমোডে ফেলে ফ্ল্যাস করে দেবে। সেই আইডিয়া বর্জ্য পদার্থের সঙ্গে চলে যাবে সিউয়ারেজে।

মোবারক মুখ হাসি হাসি করে রাখলেও মনে মনে বলল, ব্যাটা শুধু তোর সাজেশনস না, তোকে শুদ্ধ কমোডে ফেলে ফ্ল্যাস করে দেয়া দরকার। আমি এখানে বসার পর থেকে তুই সমানে কথা বলে যাচ্ছিস। তুইতো কথা বলেই কুল পাস না। তুই সাজেশনস কখন দিবি?

আসগর সাহেব মোটামুটি হতাশ গলায় বললেন, আমার একটা সাজেশন ছিল— দুজন ডোনার নিয়ে যাওয়া। যাতে একজন ডোনারের ব্যাপারে শেষ মুহূর্তে কোনো কমপ্লিকেশন হলে অন্য একজন স্ট্যান্ডবাই থাকে। এমনতো না যে ডোনার পাওয়া যাচ্ছে না বা টাকার অভাব হয়েছে। আমি কি কিছু ভুল বলছি?

অবশ্যই না। স্যার আপনিও কি যাচ্ছেন?

আমাকেতো যেতেই হবে। রুমা যেতে পারবে না। কারণ রুমার ছেলে স্কলাসটিকায় পড়ে। স্কুল থেকে ওরা একটা ড্রামা করছে ছেলে সেখানে সুযোগ পেয়েছে। চার্লস ডিকেন্সের আলিভার টুইস্ট। আঠারো তারিখে স্টেজ হবে। চিফ গেস্ট হলো আমেরিকান এ্যাম্বেসেডর। এত বড় একটা অনুষ্ঠানে বাবা-মা কেউ থাকবে না— তাতো হয় না।

মোবারক বলল, অবশ্যই হয় না। এতে শিশুমনের উপর একটা চাপ পড়ে। চাপের কারণে পরবর্তি সময়ে এইসব ছেলেপুলে গাধা টাইপ হয়ে যায়। স্যার আমি উঠি? আমার আবার পাসপোর্টের জন্যে ছবি তুলতে হবে।

আসগর সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, এখনো পাসপোর্ট হয় নি? কুঁজো ম্যানেজারটা করছে কী? একেতো কানে ধরে উঠবোস করানো দরকার।

মোবারক অতিরিক্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, স্যার যাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে এত ভাল লেগেছে।

আসগর সাহেব জবাব না দিয়ে হাতে আরেকটা খবরের কাগজ তুলে নিলেন।

মোবারক পাসপোর্টের ফরমে সই করতে করতে বলল, সুইজারল্যান্ড জায়গাটিতে শীত কেমন পড়ে?

ম্যানজোর সাহেব বললেন, ভাল শীত। বরফ পড়ে। সারা ইউরোপ থেকে লোকজন স্কী করতে সুইজারল্যান্ডে আসে।

শীতের কাপড় চোপড়তো সঙ্গে নেয়া দরকার।

ম্যানেজার সাহেব বললেন, হুঁ।

মোবারক চিন্তায় পড়ে গেল। হুঁ বলে চুপ কলে গেলেতো হবে না। শীতের কাপড় কেনার টাকা পয়সা লাগবে না! গরম কাপড় ছাড়াওতো কিছু কাপড় দরকার। বিদেশ যাত্রা বলে কথা। মহাত্মা গান্ধী হলে নেংটি পরে প্লেনে উঠে পড়া যেত। সঙ্গে দড়ি বাঁধা দুর্বল ছাগী থাকলেও কেউ কিছু বলত না। ছাগীটাকে তার পাশের সীটে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করত। প্লেনের মধ্যেই ছাগলের দুধ দোয়ানোর ব্যবস্থা হত। এয়ার হোস্টেসরা হেল্প করতেন।

লজ্জা করে চুপ করে থাকা বিরাট বোকামি হবে। টাকা চেয়ে ফেলা দরকার। কাপড় চোপড়ের জন্যে আলাদা টাকা যদি না দেয় তাহলে বরং এই টাকাটা কিডনির দামের সঙ্গে এডজাস্ট করে দেবে। কিডনির দাম কখন দেবে সেটাও পরিষ্কার হওয়া দরকার। বড়লোকের কারবার— এরা জিনিস হাতে না পেয়ে দাম দেবে বলে মনে হয় না। খোদা না করুক অপারেশন টেবিলে সে যদি মারা যায় তাহলে কী হবে। টাকাটা পাবে কে?

মোবারক খুক খুক করে কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ম্যানেজার সাহেব, কাপড় চোপড় কেনার জন্যে আমার কিছু টাকা দরকার।

ম্যানেজার মুখ তুলে তাকাল। মনে হচ্ছে এমন অদ্ভুত কথা সে জীবনে শুনেনি।

মোবারক তেলতেলে মুখ করে বলল, হাতে তো সময় বেশি নেই। কাপড় চোপড় এখনি কেনা দরকার।

ম্যানেজার এখনো তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলছে না। মোবারক হাই তোলার ভঙ্গি করতে করতে বলল, বন্ধু বান্ধবের কাছে কিছু ধারদেনা আছে। যাওয়ার আগে শোধ করে যেতে চাই। কিছুতো বলা যায় না, ধরেন। উল্টা-পাল্টা কিছু যদি হয়।

উল্টা-পাল্টা মানে?

আপনার স্যার কিডনি নিয়ে বেঁচে উঠলেন— আমি গেলাম ফুটে।

আপনি ফুটে গেলেন মানে?

ফুটে গেলাম মানে মরে গেলাম। ফুল ফোঁটা আর মানুষ ফোঁটা আলাদা ব্যাপার।

এখন আপনার কত টাকা দরকার?

মোবারক বিপদে পড়ে গেল। এটা একটা ঝামেলার প্রশ্ন। কত টাকা এরা দেয়ার জন্যে প্রস্তুত তা না জেনে টাকা চাওয়াটা ঠিক হবে না। এরা কত টাকা দিতে পারে সেটা জানারও তো কোনো বুদ্ধি নেই।

মোবারক ক্ষীণ গলায় বলল, সেটা আপনার বিবেচনা। আর গরম কাপড় চোপড়ে কত লাগে তাও জানি না। কাপড় বানানো হয় না অনেক দিন।

ম্যানেজার সাহেব বললেন, আপনাকে একটা বুদ্ধি দিচ্ছি— নতুন গরম কাপড় কিনতে যাবেন না। বঙ্গবাজার চলে যান, সস্তায় প্রচুর ভাল কাপড় পাবেন। ফিটিং-এ সমস্যা হলে দরজি দিয়ে ফিটিং করিয়ে নেবেন। হাজার খানিক টাকায় সব কাপড় হয়ে যাবে।

জ্বি আচ্ছা। আর বন্ধু-বান্ধবের কাছে কিছু ঋণ ছিল। ঋণ রেখে মরতে চাই না।

মরবেন কেন?

মোবারক বলল, দুদিন থেকে মনের মধ্যে কুডাক শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে মারা যাব। এই জন্যে ঠিক করেছি আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে দেখাও করে যাব। আমার নিকট আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। দাদিজান বেঁচে আছেন। থাকেন নেত্রকোনায়। উনাকে দেখতে যেতে হবে। ভাবছি উনার জন্যে একটা শাড়ি, আর গরম চাদর নিয়ে যাব। বুড়ি খুশি হবে। ভাল একটা গরম চাদরের দাম কত হবে ম্যানেজার সাহেব জানেন?

জানি না।

সস্তায় পুরনো গরম চাদর অবশ্যই পাওয়া যাবে। পাওয়া গেলেও বুড়িকে নতুন চাদরই দিতে চাই। দাম যতই হোক। বুড়ির দিন শেষ। মরেইতো যাবে। নতুন গরম চাদর গায়ে দিয়ে মরুক। মৃত্যুর সময় ঠাণ্ডা কম লাগবে।

ম্যানেজার সাহেব বললেন, কিছু ক্যাশ আমি দিচ্ছি। কেনাকাটা যা করার করুন। যে কাজগুলি আপনাকে করতে হবে তা হল— প্রথমেই বার কপি ছবি তুলবেন। পোলারয়েড ক্যামেরায় ছবি সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেবে। আপনার সঙ্গে লোক দিয়ে দিচ্ছি, সে ছবি নিয়ে চলে যাবে। গাড়ি আপনার সঙ্গে থাকুক।

গাড়ি মানে?

আপনাকে একটা গাড়ি দিয়ে দিচ্ছি। ইচ্ছা করলে সারাদিন গাড়ি রাখতে পারেন। সন্ধ্যার দিকে গাড়ি এবং আপনার কাপড় চোপড় নিয়ে চলে আসবেন। এখানে আপনার জন্যে রুম রেডি করে রাখব। সুইজারল্যান্ড যাবার আগ পর্যন্ত আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

মোবারকের অস্বস্তি লাগছে। ব্যাপার বোঝা যাচ্ছেনা। এরা কি তাকে বন্দি করে ফেলছে? এদের চোখের নজর থেকে বাইরে যাওয়া যাবে না এই অবস্থা।

স্যার আমার তো একটু দাদির সঙ্গে দেখা করা দরকার।

দাদির সঙ্গে আপনি তো আর আজই দেখা করছেন না। ভিসা হয়ে যাক, তারপর স্যারকে বলে একদিনের ছুটি নিয়ে ঘুরে আসবেন।

মোবারক ইতস্তত করে বলল, আজ থেকেই এই বাড়িতে থাকার আমি প্রয়োজন দেখি না। শেষ কয়েকটা দিন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, গল্প করে কাটাতে পারলে ভাল হয়।

ম্যানেজার সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, মোটেই ভাল হয় না। আপনার জন্যে সব ব্যবস্থা করা থাকবে। সন্ধ্যার মধ্যে আপনি অবশ্যই এ বাড়িতে ফিরে আসবেন। আজ সন্ধ্যার পর স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

একবার তো কথা হয়েছে। আর কথা বলাবলির কী আছে?

ম্যানেজার সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, স্যার বলেছেন সন্ধ্যার পর আপনার সঙ্গে কথা বলবেন এই জন্যেই আপনাকে আসতে হবে। নিন এইখানে সই করুন।

মোবারকের বুক ধক করে উঠল, কোথায় সই করিয়ে নিচ্ছে কে জানে। আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়— এই জাতীয় কোনো লেখা নাতো?

মোবারক বিড়বিড় করে বলল, সই করব কেন?

টাকা নেবেন, সই করবেন না? অডিটের কাছে আমাকে হিসাব দিতে হবে না? গরিব মানুষের টাকা পয়সার হিসাব থাকে না, কিন্তু ধনী মানুষের প্রতিটি পয়সার হিসাব থাকে।

মোবারক সই করল। কত টাকা তাকে দেয়া হচ্ছে পাশে লেখা আছে। লেখা অংকটা বিশ্বাস হচ্ছে না। পঁচিশ হাজার টাকা। মোবারকের মনে হচ্ছে টাকা আসলে দুই হাজার পাঁচশ। একটা শূন্য বেশি লেখা হয়েছে। দশমিকের ফুটা বসাতে গণ্ডগোল হয়ে গেছে। এই টাকায় ম্যানেজার সাহেবের কোনো কমিশন আছে কি-না বোঝা যাচ্ছে না। কমিশন তো থাকবেই। টাকা পয়সার লেনদেন হবে, কমিশন থাকবে না। তা হয় না।

মোবারক গাড়িতে বসে আছে। গাড়ির মালিক যেভাবে বসে সে সেইভাবেই বসেছে। পেছনের সীটে বসেছে। একটা হাত ছড়িয়ে দিয়ে একটুখানি কাত হয়ে বসা। মোবারকের পকেটে সত্যি সত্যি পঁচিশ হাজার টাকা। একশ টাকার দুটো ব্যান্ডেল, পঞ্চাশ টাকার একটা বান্ডেল। প্যান্টের পকেট ফুলে আছে। গাড়ি থেকে নামার সময় ভাল করে চেক করতে হবে। একটা বান্ডেল পড়ে গেলে সর্বনাশ।

মোবারক বলল, ড্রাইভার সাহেব আপনার গাড়িতে তেল আছে তো?

ড্রাইভার বলল, জ্বি আছে।

মোবারক উদাস গলায় বলল, না থাকলেও সমস্যা নেই। তেল নিয়ে নেব। গাড়িতে গান শোনার ব্যবস্থা কি আছে?

জ্বি আছে।

দিন গান দিন।

ইংরেজি না বাংলা?

ইংরেজি বাংলা হিন্দি একটা দিলেই হয়। আর শুনুন গাড়ি একটু স্লো চালান। তাড়াহুড়ার কিছু নাই। প্রথমে একটা ফটোগ্রাফারের দোকানে যেতে হবে, ছবি তুলতে হবে।

গাড়ি চলছে। গান বাজছে। ইংরেজি গান— কী অদ্ভুত গানের কথা—

চলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ