#শিলার রূপান্তর : শেষ পর্ব
শিলা ওর নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে। সামিরের সাথে ডিভোর্স আর প্রতারণার মামলা আদালতে উঠেছে, একটা সেশনও হয়ে গেছে। সেদিন দুজন মুখোমুখি হয়।
~ শিলা প্লিজ তুমি একটু ভেবে দেখো, আমি আয়ান আর আলিশার বাবা। ওদের ইমেজটা কি হবে?
~ আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সাথে পরকীয়া করার সময় বাচ্চাদের ইমেজের কথা খেয়াল ছিল না? সেহেতু এখন আর খেয়াল করে লাভ কি। অনুতপ্ত হয়ে তুমি যদি নিজে থেকেই সবকিছু জানিয়ে ফিরে আসতে তখন হয়তো ভেবে দেখতাম।
শিলা কথা না বাড়িয়ে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে পড়ে। এদিকে সামির শিলার বড় বোনের বাসায় উপস্থিত। অনেক কান্নাকাটি করে।
~ আপা আপনি শীলাকে বোঝান প্লিজ। আমি আর কখনো এরকম কিছু করবো না।
~ দেখ সামির আমরা দুই বোন। আমাদের কোন ভাইও ছিলো না। বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই এমনভাবে বড় করেছে যে এইরকম অবস্থায় মাথা নত করার বা আগের মত সবকিছু হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আমার সাথে শিলার কথা হয়েছে। ওকে যে আঘাত দিয়েছো, সে এটা হজম করবে ভাবলে সেটা তোমার নির্বুদ্ধিতা। আমি জানি বাবা-মা বেঁচে থাকলে তারা আরো কঠিনভাবে তোমাকে বলতো। তোমার সাথে এটাই আমার শেষ কথা।
সামির ইভাকে কল দেয়।
~ হ্যালো ইভা তুমি কোথায়?
~ কেন?
~ একটু দেখা করো প্লিজ, কথা বলতাম।
~ আমার হাজব্যান্ড বাসায় দুই মাসের ছুটি নিয়ে এসেছে। আর তুমি আছো দেখা করার তালে।
~ অন্য কোন উদ্দেশ্যে না। তুমি শীলাকে একটু বোঝাও প্লিজ।
~ দেখো এসব ঝামেলায় জড়িয়ে আমি সময় নষ্ট করতে পারবো না।
ইভা ফোনটা কেটে দেয়। সামির বারবার কল দেয়, আর ধরে না। একটু পর ইভা নিজেই কল দেয়।
~ হ্যালো সামির মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমার স্বামীর যে স্ট্যাটাস আর যে লেভিস জীবন আমাকে দিয়েছে এসব ছেড়ে তোমার কথা চিন্তা করাটা বোকামি। শুধু শুধু আমাকে আর কল দিবে না।
~ আমি কি বলেছি তোমার স্বামীকে ছেড়ে আমাকে গ্রহণ করতে? আমি শুধু শীলাকে একটু বোঝাতে বলছি।
~ আমার পক্ষে সম্ভব না। আর কল দিবে না। বাই।
কয়েকদিন পর শিলা সামিরের অফিসে উপস্থিত। সামির আর ইভার ওকে দেখে ভূত দেখার মত অবস্থা। শিলা অফিসের প্রধান কর্মকর্তার রুমে ঢুকে প্রায় আধা ঘন্টা পর বের হয়। ইভা সামনে এগিয়ে আসে। সামিরও কথা বলতে চায় কিন্তু শিলা কারো সাথে কথা না বলে চুপচাপ অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।
শিলা চলে যাওয়ার পর প্রধান কর্মকর্তার রুম থেকে সামির আর ইভার ডাক আসে।
~ আপনারা সরকারি চাকরিবিধির নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। এত সুন্দর একটা সংসার ফেলে কিভাবে আপনি আপনার স্ত্রীর বান্ধবী প্লাস নিজ কলিগের সাথে সম্পর্কে জড়ালেন ছি:। আমাদের অফিসের রেপুটেশন নষ্ট করেছেন।
ইভা কিছু একটা বলতে যাবে। এমন সময় ওকে থামিয়ে দিয়ে তিনি আরো বলেন,
~ আর আপনি, আপনার কথা আর কি বলবো। আপনার স্বামী তো অনেক ভালো পজিশনে আছেন। কোন কিছুরই অভাব ছিল না। এবার বুঝবেন সম্মানের অভাবে মানুষের জীবনটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আপনারা দুজনই এখন আসতে পারেন।
সামির আর ইভার নোংরা সম্পর্কের সব তথ্য প্রমান শিলা প্রধান কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়ে গেছে। সবকিছু বিচার বিবেচনা করে ওদের সাসপেন্ড করা হবে এটাও ওদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সামির আর ইভার স্যার এর সামনে কথা বলার কোন মুখ নেই। সমস্ত অফিসে মুহূর্তের মধ্যে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। ওরা চাকরিটা তখনই বাঁচাতে পারবে যখন শিলার অভিযোগটা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে। কিন্তু যে অকাট্য প্রমাণ শিলা দিয়েছে এটাতে নির্দোষ প্রমাণ হওয়া প্রায় অসম্ভব। শিলা সামিরের বিরুদ্ধে আগেই ডিভোর্স আর প্রতারণার মামলা করেছে। পুলিশ ওদের দু বছরের যাবতীয় কল রেকর্ড ও চ্যাট জব্দ করেছে।
ইভা চোখে সরষে ফুল দেখছে। কয়েকদিন পর অফিস থেকে বাসায় ফিরে বড় একটা ধাক্কা খায়। ওর হাজবেন্ডের সাথে শিলা ড্রয়িং রুমে বসে কথা বলছে। এতদিন ইভা সবকিছু লুকিয়ে রেখেছিল স্বামীর কাছে।
~ ভাইয়া আমি আজ উঠি তাহলে। ভালো থাকবেন।
ইভার দিকে তাকিয়ে তির্যক একটা হাসি দিয়ে শিলা বেরিয়ে পড়ে।
~ ইভা সব তো শুনলাম। আরো কিছু বাকি আছে?
~ আমি তোমাকেই ভালোবাসি আসিফ।
~ আসিফ সাথে সাথেই ইভার গালে কষে একটা থাপ্পড় দেয়।
~ প্লিজ শোনো সামির এর প্রতি যেটা ছিল সেটা শুধু………..
~ সেটা শুধুই দৈহিক চাহিদা, তাই না? তো সেটাই পূরণ কর, আমি তো বাধা দিচ্ছি না। কিনা করেছি তোমার জন্য, বিদেশে ট্রিপ, শপিং, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যা চেয়েছো তাই। এই ফ্ল্যাটটা আমার নামে তাই ভদ্রভাবে বলছি তোমার সবকিছু গুছিয়ে এই মুহূর্তে বাসা থেকে বের হয়ে যাও। ছেলেকে আমি আমার কাছে নিয়ে যাব। তোমার মত মায়ের কাছ থেকে ও আর কি শিখবে।
ইভা কাঁদতে কাঁদতে ওর স্বামীর পা জড়িয়ে ধরে,
~ প্লিজ এমন করে তোমাদের কাছ থেকে আমাকে আলাদা করো না। আমার এমন দুঃসময়ে পাশে থাকো প্লিজ।
~দু:সময়! দু’বছর ধরে যখন চুটিয়ে রিসোর্টে রিসোর্টে ঘুরছিলে তখন একবারও মনে হয়নি আমাদের ছেলেটার কথা? আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। আর কোন কথা শুনতে চাই না ঝটপট বাসা থেকে বের হও। আর ঠিক সময় ডিভোর্সটাও পেয়ে যাবে।
পরদিন ইভা কিছু টাকা পয়সা ট্রাভেলব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ওর স্বামী অলরেডি সব আত্মীয়স্বজনদের জানিয়ে দিয়েছে। একবার ভাবে খুলনায় মায়ের কাছে চলে যাবে কিন্তু সেখানে ভাই ভাবিদের কি করে মুখ দেখাবে? আর অফিসের ঝামেলা মিটাতে গেলে ওকে এখানে থেকেই সেটার মোকাবেলা করতে হবে। সিঙ্গেল ওমেন তাই দুই রুমের একটা বাসা ঠিক করতে সারাদিন লেগে গেল ইভার।
শিলার বাসায় ইভা উপস্থিত। শিলা দরজা খুলে দেয়।
~ হ্যাঁ বলেন, কি বলবেন?
~ ভিতরে এসে কথা বলি।
~ জ্বি না, আপনার মত কারো সাথে ভিতরে কথা বলার আগ্রহ বা রুচি কোনটাই নেই।
~ প্লিজ আমাকে মাফ করে দে তোর দুটি পায়ে পড়ি। ও আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে আর ছেলেটাকেও ওর সাথে বিদেশে নিয়ে যাবে বলেছে।
~ এটাই তো হওয়া উচিত। আমি কি সামিরকে কোলে নিয়ে বসে আছি? তোমাদের মত বিশ্বাসঘাতকদের এমনই হওয়া উচিত।
শিলার বাসা থেকে বের হয়েই সামিরকে কল দেয় ইভা।
~ সামির তুমি কোথায়?
~ এতদিন পর আমার কথা মনে পড়ল?
~ এখন আমার কি হবে?
~ আমারতো চাকরি চলে যাবে নিশ্চিত। তোমার হতে পারে ডিমোশন। আমি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলাম আইন লঙ্ঘন করার শাস্তি তাই আমিই বেশি পাব।
~ এখন আমি কোথায় যাব?
~ সেটার আমি কি জানি। শিলার কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে শুধু মানসিক সাপোর্টটা চেয়েছিলাম। তোমাকে তো বিয়ে করতে চাইনি, শীলাকে একটু বুঝাতে বলেছিলাম। তুমি তো ভেবেছিলে পার পেয়ে যাবে। শিলা শুধু আমাকেই শাস্তি দিবে। এত ভালো আর সাপোর্টিভ স্ত্রী রেখে তোমার মত চিপ মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়ানোটা ছিল নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা। আর অফারটাও কিন্তু তুমিই আমাকে দিয়েছিলে। কেন যে জড়ালাম, সব নিজের হাতে শেষ করে দিলাম।
সামির ফোনটা কেটে দেয়।
সামিরের ব্যাংকে রাখা টাকা ভেঙ্গে ভেঙ্গে চলতে হচ্ছে। আর মামলা চালাতে গিয়ে টাকা পানির মত যাচ্ছে।
শিলা আর সামির এর ডিভোর্স হয়। প্রতারণার মামলাটা এখনো চলছে। ইতিমধ্যে সামীরের চাকরিও চলে যায়। আর ইভার হয় ডিমোশন, স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয় আর ছেলেটাও ওর বাবার কাছে বিদেশে চলে যায়।
আর চাকরিটা না গেলেও সামাজিকভাবে ইভার যে শাস্তিটা হয় তা কাধে নিয়ে বয়ে বেড়ানোটা এতটা সোজা নয়। অফিসে সারা জীবনই মাথা নিচু করে চলতে হবে যেখানেই থাকুক না কেন।
শিলা এখন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর কাজে জড়িত। আলিশা প্যারাডাইস নামে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানটি বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, আকদ সহ বিভিন্ন পার্টি অরগানাইজ করে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে।
পাঁচ বছর কেটে গেছে। শিলার ছেলে আয়ান এখন কলেজে পড়ে। মেয়েটা দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর থেকেই স্বাভাবিক স্কুলেই পড়ে। আগের চেয়ে আরো বেশি দৃঢ় আর বলিষ্ঠ হয়ে শিলা মাথা উঁচু করে চলে। এক অন্যরকম নতুন শিলা। স্বাগতম তাকে।
সমাপ্ত……
