#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#অন্তিম_পর্ব
মুহূর্ত অনেকক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিল।
আজ সে হাসছে না।
খুনসুটিও করছে না।
হঠাৎ থেমে গেল।
মমও থামল।
দুজনের মাঝখানে কয়েক হাত দূরত্ব।
বাতাসে গাছের পাতার মৃদু শব্দ।
মুহূর্ত ধীরে বলল,
— “আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
মম মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “তাহলে?”
চুপ।
— “কয়েকদিন ধরে তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ। আমি কাছে এলে দূরে সরে যাচ্ছ। কথা বলতে চাইলে অন্যদিকে চলে যাচ্ছ।”
সে মমের চোখের দিকে তাকাল।
— “কেন?”
মম উত্তর দিল না।
মুহূর্ত আবার বলল,
— “তুমি কি… আমাকে আর পছন্দ করো না?”
প্রশ্নটা এতটাই সরল ছিল, এতটাই নির্ভেজাল—যে মমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে তো এটাই চাইছিল।
মুহূর্ত যেন তাকে ভুলে যায়।
চেরির সঙ্গে সময় কাটাক।
নিজের জীবনে এগিয়ে যাক।
তাহলে কেন…
কেন এই প্রশ্ন শুনে তার বুকটা এত ভারী হয়ে উঠছে?
কেন মনে হচ্ছে, কেউ যেন নিঃশব্দে তার ভেতর থেকে কিছু ছিঁড়ে নিচ্ছে?
মুহূর্ত এক পা এগিয়ে এল।
কণ্ঠে অভিমান নেই।
রাগ নেই।
শুধু অসহায় একটা কৌতূহল।
— “আমি বুঝতে পারছি না, মোমো। আগে তো এমন ছিলে না। হঠাৎ কী বদলে গেল?”
মম চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার ভেতরে যেন দুই মানুষ যুদ্ধ করছে।
একজন বলছে—
“দূরে থাক। এটাই ঠিক।”
আরেকজন চিৎকার করে উঠছে—
“মিথ্যে বলছ! তুমি পারছ না। একদমই পারছ না।”
সে নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
চোখ জ্বালা করছে।
কেন?
কেন এত কষ্ট হচ্ছে?
হঠাৎ করেই উত্তরটা যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এল।
সে মুহূর্তকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে না…
সে নিজেকেই ঠেলে দিচ্ছে।
কারণ এই মানুষটার কাছে থাকলে সে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই মানুষটার হাসি দেখলে তার দিন ভালো হয়ে যায়।
এই মানুষটা কষ্ট পেলে তার বুকের ভেতর ব্যথা হয়।
এই মানুষটা অন্য কারও সঙ্গে থাকবে—এই কল্পনাতেই তার নিঃশ্বাস আটকে আসে।
এটা বন্ধুত্ব নয়।
মায়াও নয়।
নিজের অজান্তেই, অদৃশ্য কোনো এক সময়ে, সে এই মানুষটার প্রেমে পড়ে গেছে।
মম ধীরে চোখ তুলল।
মুহূর্ত তখনও অপেক্ষা করছে।
উত্তরের জন্য।
তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো।
ঠোঁট কাঁপছে।
মনে মনে ফিসফিস করে বলল—
“আমি তোমাকে দূরে ঠেলছি না, মুহূর্ত… আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কারণ আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
কিন্তু কথাগুলো ঠোঁট পেরিয়ে বেরোল না।
শুধু চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা জল নীরবে বলে দিল—কিছু কিছু সত্যি মানুষ মুখে স্বীকার করার আগেই হৃদয় স্বীকার করে ফেলে।
মম অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
বুকের ভেতরটা এমন জোরে ধুকপুক করছে, যেন নিজের হৃদস্পন্দন নিজেই শুনতে পাচ্ছে।
মুহূর্ত আরেকবার ডাকল,
— “মোমো…”
মম ধীরে মুখ তুলল।
চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।
সে হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসিটা মুহূর্তেই ভেঙে গেল।
— “তুমি জানো… আমি কেন তোমাকে চেরির কাছে ঠেলে দিচ্ছিলাম?”
মুহূর্ত ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়ল।
— “না।”
মম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
— “কারণ আমি ভেবেছিলাম… ও তোমার জন্য আমার চেয়ে অনেক বেশি উপযুক্ত।”
মুহূর্ত বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
মম বলতে লাগল,
— “আমি নিজেকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। বলেছি, তুমি শুধু আমার বন্ধু। বলেছি, তোমাকে নিয়ে এত ভাবার কোনো কারণ নেই। আমি চেয়েছি তুমি আমাকে ভুলে যাও… অন্য কাউকে নিয়ে সুখী হও…”
তার গলা কেঁপে উঠল।
— “কিন্তু যতবার তোমাকে দূরে সরাতে গেছি… ততবার বুঝেছি, কষ্টটা তোমার হচ্ছে না… আমার হচ্ছে।”
চোখ বেয়ে নেমে এল একফোঁটা অশ্রু।
সে আর সেটাকে মুছল না।
— “তুমি যখন চেরির সঙ্গে কথা বলতে, আমি নিজেকেই বোঝাতাম—এটাই তো চাইছিলে। অথচ বুকের ভেতরটা এমন মোচড় দিত… মনে হতো কেউ আমার কাছ থেকে আমার সবচেয়ে আপন জিনিসটা কেড়ে নিচ্ছে।”
মুহূর্ত নিঃশব্দে শুনছিল।
তার চোখেও ধীরে ধীরে নেমে এল কোমলতা।
মম মৃদু হেসে বলল,
— “আজ বুঝেছি… আমি তোমাকে দূরে ঠেলছিলাম না। নিজের অনুভূতিটাকে অস্বীকার করছিলাম।”
সে এক পা এগিয়ে এল।
কণ্ঠস্বর ফিসফিসে।
— “আমি হেরে গেছি, মুহূর্ত। নিজের কাছেই হেরে গেছি।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
শব্দগুলো বেরিয়ে আসতেই যেন বুকের ওপর থেকে বহুদিনের একটা ভার নেমে গেল।
চারপাশে বাতাস বইছে।
গাছের পাতাগুলো দুলছে।
দূরে একটা পাখি ডেকে উঠল।
মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মম উদ্বিগ্ন হয়ে তার দিকে তাকাল।
— “কিছু বলবে না?”
মুহূর্ত হঠাৎ হেসে ফেলল।
সেই চেনা, নির্ভেজাল হাসি।
— “আমি তো ভেবেছিলাম, এটা শুধু আমিই অনুভব করি।”
মম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মুহূর্ত ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
খুব আলতো করে তার দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিল।
— “আমি কখন তোমাকে ভালোবেসেছি, সেটা আমি নিজেও জানি না। শুধু এটুকু জানি… তুমি পাশে থাকলে সবকিছু ঠিকঠাক লাগে। আর তুমি দূরে সরে গেলে, পুরো পৃথিবীটাই কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।”
মমের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
চোখের জল আর ধরে রাখতে পারল না।
পরের মুহূর্তেই সে এগিয়ে এসে মুহূর্তের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
এবার আর কোনো দ্বিধা নেই।
কোনো লুকোচুরি নেই।
মুহূর্ত ধীরে ধীরে তাকে আগলে নিল।
এমনভাবে, যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে তাকে আড়াল করে রাখবে।
দুজনেই কিছু বলল না।
কারণ কিছু স্বীকারোক্তির পরে ভাষার আর কোনো কাজ থাকে না।
শুধু দুটি হৃদস্পন্দন, দীর্ঘদিনের সব ভুল বোঝাবুঝি পেরিয়ে, প্রথমবারের মতো একই ছন্দে বেজে উঠল।
সমাপ্ত
