#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_২৩
♦️♦️♦️
(কানাডা: মিলার রেসিডেন্স)
“মিটিং কেমন হলো?”
গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে এগিয়ে আসতেই বাগানের মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। নিয়মিত পরিচর্যায় সারি বেঁধে শৃংখলাবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো গাছগুলো দৃষ্টি কাড়ে আগন্তুকের। গাছগুলোর মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে পাতা আছে কালো রঙের চেয়ার টেবিল। পিতলের কারুকাজ মন্ডিত আসবাব বিকেলের পড়ন্ত রোদেও ধরে রেখেছে নিজেদের চাকচিক্য।
সেখানে বসে আছেন এক প্রবীণ ব্যক্তি। বয়স ষাটের দাড়গোড়ায় হবে হয়ত। চুলে পাক ধরেছে, ভাঁজ পরেছে চেহারায়। তবে তাতে তার আভা মলিন হয়ে যায়নি। শক্ত, রুক্ষ, গুরুগম্ভীর পুরুষটি তার দৃষ্টির এক পলকেই যেন সামনের ব্যক্তির ভেতরটা পর্যবেক্ষণ করে নিতে সক্ষম।
“তুমি যেমনটা হবে বলে জানিয়েছিলে, তেমনি হয়েছে।”
টেবিলের উপর নিজের হ্যান্ডব্যাগটা রেখে স্বামীর পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লেন জুলিয়া।
“বোর্ড মেম্বাররা কেউই কোরিয়ার সঙ্গে করা আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্টের সমর্থনে নেই। তাদের ভাষ্যমতে, এরকম একটা সিদ্ধান্তই কোম্পানিকে ডোবানোর জন্যে যথেষ্ট।”
স্ত্রীর কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না মিস্টার এরিক মিলার। কফির মগে চুমুক দিয়ে তাকালেন দূর গগনে, সূর্যাস্তের দিকে। উদাস গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কি বললে?”
“যেটা তোমাকে বলেছিলাম।”
স্মিত হেসে রমণীর ঠোঁটে লেগে আছে। সাবধান করেছিলেন তাকে তার স্বামী, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যেখানে চরমে, সেখানে এরকম একটা সিদ্ধান্ত, কোম্পানির ভবিষ্যতের জন্য কখনোই সুফল বয়ে আনবে না। কিন্তু জুলিয়া সেকথায় কর্ণপাত করেননি। তাই আজ ইচ্ছে করেই জুলিয়াকে পাঠিয়েছিলেন মিটিংয়ে। দেখুক সে, নিজেও বহন করুক তার আবেগী সিদ্ধান্তের ভার। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত মিস্টার মিলার। হয়ত এই ভার নিজের কাঁধে এসে পরলে বুঝবে জুলিয়া, এমনটাই আশা করেছিলেন।
“জুলিয়া….”
কিছু একটা বলতে চাইছিলেন মিস্টার মিলার। তবে তাকে সে সুযোগ না দিয়ে থামিয়ে দিলেন জুলিয়া। ব্যাগ থেকে একটা ছোট রঙিন প্যাকেট বের করে বললেন,
“চিপস খাবে? নতুন ফ্লেভার এসেছে মার্কেটে। দেখে বেশ ইন্টারেস্টিং কম্বো মনে হলো।”
মিস্টার মিলার তাকিয়ে রইলেন স্ত্রীর দিকে। এত বড় একটা ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে, তার পঞ্চাশোর্ধ স্ত্রী একটা সামান্য, সস্তা চিপসের প্যাকেট খুলে কথা এড়াবার চেষ্টা করছে।
“হুম্!” একটা টুকরো মুখে পুরে হালকা কুরমুড় শব্দে সেটা চিবিয়ে জুলিয়া বললেন,
“বেশ ভালো। সাইলাসের পছন্দ হবে।”
“জুলিয়া…”
“মনে আছে তোমার? চিপসের জন্যে কি জেদটাই না করতো ছেলেটা। চিপস দাও, চিপস দাও বলে চেঁচিয়ে কান্না জুড়ে দিত। কিন্তু আমরা ওকে অস্বাস্থ্যকর বলে খেতে দিতাম না।”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন জুলিয়া। থেমে রইলেন কিছুক্ষন। আগের মত আর কান্নায় ভেঙে পড়েননি, তবে গলাটা শুকিয়ে আসে এখনো।
“অস্বাস্থ্যকর! কি লাভ হলো এরিক? স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে চেয়েছিলাম, অথচ ছেলেটারই তো খেয়াল রাখতে পারলাম না। ঐ ছোট্ট ছেলেটাকে কষ্ট দিয়েছি শুধু শুধু।”
মিস্টার মিলার কিছু বললেন না। বরাবরের মতই নীরব রইলেন। তার এই নীরবতাই যেন হাহাকারের প্রতিধ্বনি।
“ওকে ফিরে আসতে দাও। আর কোন বাঁধা দেব না। ও যা খেতে চায়, সব খেতে দেব ওকে। আমি নিজের হাতে তুলে খাওয়াবো।”
“জুলিয়া…”
“আমার ছেলে ফিরে আসবে এরিক। আমি ফিরিয়ে আনবো ওকে! নিশ্চয়ই ফিরবে সাইলাস।”
ক্ষণিকের জন্য অস্থির হয়ে উঠলো তার দৃষ্টি। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন,
“আর যদি না ফেরে, তবে এই মিলার কর্পরেশনের দরকারটা কি? কি করবে এই অর্থ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা দিয়ে? সব ধুলোর সমান। ধুলোয় লুটিয়ে যাক সব!”
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল মিস্টার মিলারের। একমাত্র ছেলের হারিয়ে যাওয়ায় তিনি কি কম কষ্ট পেয়েছেন? নাহ, যতটা শোক জুলিয়া বহন করে চলেছেন, একই বোঝা এরিক মিলারের কাঁধেও ছিল। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন উনি। মেনে নিয়েছেন সাইলাসের হারিয়ে যাওয়া। যেটা জুলিয়া আজ অবধি করতে পারেননি।
“কি করে ফিরিয়ে আনবে তুমি সাইলাসকে? ও কি এখনো আগের মত আছে?”
তীক্ষ্ম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার মিলার।
“বিশ বছর আগে যে চার বছরের বাচ্চাটা নিখোঁজ হয়েছিল, সে কি আজও সেরকমই আছে? নেই জুলিয়া। সেই বাচ্চাটাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাবে না তুমি!”
নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জুলিয়া তার দিকে। কথাগুলো কান অবধি পৌঁছালেও, মন অবধি যেতে পারলো না। কি করেই বা যাবে? মায়ের মন বলে কথা। পৃথিবীর কোন মা কি তার সন্তানকে ভুলে যেতে পারে? পারে তার আশা ছাড়তে?
কিছু সময়ের জন্যে থামলেন মিস্টার মিলার। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবারো বললেন,
“তুমি HFT- র সদস্য হতে চেয়েছো, হাইব্রিডার্সদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছো, আমি তোমাকে বাঁধা দেইনি। কিন্তু নিজের ছেলের খোঁজে তুমি যেই ভয়ংকর খেলা শুরু করেছো, এর পরিণতি কি হবে, সেটা একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাও মিলার কর্পোরেশন?
ঠিকাছে, দাও। কিন্তু ঐ ছেলেগুলোর তো দোষ নেই। রক্ষক সেজে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করবে? নিজের স্বার্থে ওদের সবাইকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারোনা তুমি, জুলিয়া।”
কঠোর হয়ে উঠলো মিসেস মিলারের মুখভঙ্গি। চট করে উঠে দাঁড়ালেন উনি।
“আমি সব পারি। আমার শুধু সাইলাসকে ফেরত চাই। তার জন্যে আমি সব করতে পারি।”
কথাটা বলে আর দাঁড়ালেন না মিসেস মিলার। পা বাড়ালেন অন্দরমহলের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে রইলেন মিস্টার মিলার নিঃশব্দে। একটা চাপা শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললেন,
“যাদেরকে তুমি বিপদে ফেলছো, তাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে তোমার সাইলাস, সেটা ভুলে যাচ্ছো তুমি জুলিয়া।”
***
(স্বর্গভূমি: হাইব্রিডার্স জোন)
“ও এখানে কি করছে?”
ভ্রু জোড়া কুচকে অসন্তোষ প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলো মুহূর্ত। সামনে দাড়িয়ে আছে তার মোমোটা। তবে তার দৃষ্টি পেছনে দাঁড়ানো চেরীর উপর।
“আমাদের সাথে যাবে।”
“কেন?”
মুহূর্ত এমনভাবে জেরা করলো যেন চেরীর সাথে আসাটা কোন বড়সড় নিয়মের উলঙ্ঘন হয়ে যাবে।
কিছুটা বিব্রত হলো মম। আড়চোখে তাকালো চেরীর দিকে। নিশ্চয়ই মেয়েটা সব শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু চেরী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। চেহারায় ফুটে আছে উদাসীনতা। কি কথা হচ্ছে মম ও মুহূর্তের মধ্যে, তাতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
সেদিন মুহূর্ত শাসিয়ে যাবার পর বেশ ভয় পেয়েছিল মম। মন, মস্তিষ্ক দুটোই জর্জরিত ছিল এলোমেলো চিন্তায়। অল্প কদিনের মেহমান সে স্বর্গভূমিতে। তার জন্যে কোন ঝামেলা হোক মোটেই চাইছে না সেটা মম। তাই মুহূর্তকে আর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেনি। বরং নতুন বুদ্ধির উদয় হয়েছে তার মাথায়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজে থেকেই মুহূর্তকে ডেকেছে সে। আজ ঘুরতে যাবে তারা। সমুদ্রতীরে গঠিত রক ফরমেশন দেখতে যাবে। বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া পাথরের স্তরের বিশেষ আকৃতির প্রাকৃতিক গঠন এটি।
“আমি তো আর একা যেতে পারবো না। আর তোমার উপর আপু চটে আছে। সেজন্যে বলেছি, আমি চেরির সাথে যাচ্ছি।”
মমর কথা শুনে বিশেষ একটা পরিবর্তন এলো না মুহূর্তের ভাবভঙ্গিমায়। সে আশা করেছিল, তারা দুজন যাবে কেবল। সেখানে তৃতীয় কারো উপস্থিতি একদমই কাম্য নয়। তবে এ নিয়ে মুহূর্ত আর তর্কে গেল না। মোমোটা নিজে থেকে তাকে ডেকেছে, সেটাই অনেক।
এদিকে মুহূর্তের সাথে কথা বলে মম যখন চেরীর কাছে গেল, তখন সে-ও জিজ্ঞেস করে উঠলো,
“ওকে ডেকেছো কেন?”
“তাহলে আমরা যাবো কিভাবে? রাস্তা তো চিনি না আমরা। ওই তো আমাদের নিয়ে যাবে।”
চেরীর সাথে মমর সখ্যতা কমেনি। হামলার সে রাতের পর খবর পেয়ে চেরী ছুটে এসেছিল হাসপাতালে। আফসোস হচ্ছিল তার, কেন সে রাতে ফেরত দিয়ে আসতে গেল মমকে! মম হোস্টেলে থাকলে তো আর তাকে এরকম একটা পরিস্থিতিতে পরতে হতো না। খারাপ লাগছিল চেরীর। যদিও মম তাকে নিষেধ করে নিজেকে দোষারোপ করতে। কোন কিছুই তো আর সে জেনেশুনে করেনি।
এরপর দুই একবার কলোনীতে মমর সাথে দেখা করতে এসেছে সে। আজ আবার এসেছে মমর নিমন্ত্রণে। স্বর্গভূমিতে থাকলেও সমুদ্রতীরের রক ফরমেশন দেখা হয়নি তার এ পর্যন্ত। তাই মমর জোরাজুরিতে আর না করেনি সে।
“ওকে, তাহলে চলো, যাওয়া যাক। আমি পেছনে বসছি। চেরী? তুমি সামনে বসো।”
জিপের পেছনে ব্যাগ, সেলফি স্ট্যান্ডসহ আরো কিছু জিনিস এলোমেলো করে ফেলে রেখে দুই সাথীর উদ্দেশ্যে বললো মম। তার দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ কপাল কুঁচকে মুহূর্ত জিজ্ঞেস করে উঠলো,
“তুমি আমার পাশে বসবে না মোমো?”
“খোলা জিপে সামনে বসলে আমার ভয় লাগে। মনে হয়, এই বুঝি পড়ে যাবো! চেরী বসবে সামনে। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে যাবো।”
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো মুহূর্তের। খোলা জিপ তো তাকে মম নিজেই আনতে বলেছিল। সে গম্ভীর আওয়াজে বলে উঠলো,
“আমি চেরীকে পাশে বসাবো না। তুমি বসো।”
মুহূর্তের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো মম।
“আশ্চর্য! একটু পাশে বসলে কি হয়? চেরী আমার অনুরোধে এসেছে। ওর সাথে রুড ব্যবহার করবে না বলে দিলাম! তাহলে কিন্তু আমি আর তোমার সাথে কথাই বলবো না!”
মমর হুমকির মুখে আর কোন উচ্চবাচ্য করতে পারলো না মুহূর্ত। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে ফোস করে একটা শ্বাস ছাড়লো সে। মম সেদিকে পাত্তা না দিয়ে জিপের পেছনে উঠে বসলো। পেছন পেছন চেরীও এসে বসতে চাইছিল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে মম বললো,
“এই! এখানে কোথায়? সামনে গিয়ে বসো।”
চেরী চেহারায় ভাঁজ ফেলে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসা মুহূর্তের দিকে তাকালো একপলক। তারপর মাথা নেড়ে জানালো,
“আমি ওর পাশে বসবো না।”
“কেন? কি সমস্যা?”
“সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি পেছনে একা বসবে? যদি পড়ে যাও?”
“আর না! আমি ঠিকাছি, চিন্তা করো না। তাছাড়া পেছনে ব্যাগ ট্যাগ আছে। দুজন বসতে অসুবিধা হবে। তুমি সামনে বসো।”
অপ্রয়োজনীয় ব্যাগ ট্যাগগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলে কোন অসুবিধাই হবে না। তবে সেটা বলার সুযোগ পেল না চেরী। মম তাকে তাড়া দিয়ে সামনে পাঠিয়ে দিল। মুহূর্তের পাশে, প্যাসেঞ্জার সিটে।
মুহূর্ত একপলক ফিরেও তাকালো না সেদিকে। আর চেরীও তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে। তবে মম খুশি। কতক্ষন আর থাকবে না তাকিয়ে?
গাড়ি চলতে শুরু করলো। তিন যাত্রীর চেহারায় তিন ভিন্ন অভিব্যক্তি। ড্রাইভার রুক্ষ চেহারা ও তীক্ষ্ম মেজাজ নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। পাশে বসা চেরীর মুখটা শান্ত, নির্লিপ্ত, কোমল। আর পেছনে বসা মমর চেহারায় চাপা উত্তেজনার ছাপ। তার পরিকল্পনার প্রথম ভাগ শুরু হয়ে গেছে।
মানুষ সৃষ্টির আদি থেকেই সুন্দরের পূজারী। আর সৌন্দর্য্য জিনিসটা বরাবরই আপেক্ষিক। তুলনা দিতে অতুলনীয় মানব মন। আজ যা আমাদের চোখে সুন্দর, সেটাই কাল অন্য কোন নিখুঁত সৌন্দর্য্যের সামনে ম্লান হয়ে পড়ে।
মম ভেবে নিয়েছে, মন ঘুরাতে হবে মুহূর্তের। চোখের সামনে যখন চেরীর মত নিখুঁত সৌন্দর্য্যের পুতুলের মত একটা মেয়ে ঘুরঘুর করবে, তখন কোন না কোন এক সময় মন সেদিকে ঠিক ঝুঁকে পড়বে তার। হাজার হোক পুরুষ বলে কথা! তাছাড়া ওরা দুজন একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে। প্রায় একই বৈশিষ্ট্য, একই চিন্তাধারা তাদের। এত মিল যেখানে, সেখানে মনের মিল হওয়াটা কি আর এমন কঠিন!
“মোমো, ভালো করে ধরে বস। সামনে রাস্তা ভালো না।”
মুহূর্তের সতর্কবার্তা শুনে সামনের হ্যান্ডেলটা দুহাতে ভালো করে ধরে বসলো সে। স্বর্গভূমির মূল রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় নেমে এসেছে তারা। প্রথমে কিছুদূর ভালোয় ভালোয় চালিয়ে গেলেও, এরপর এবড়ো থেবড়ো পাথুরে মাটিতে ভীষণভাবে ঝাঁকি খেতে শুরু করলো গাড়িটা। দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে রাখার পরও পেন্ডুলিয়ামের মত দুলতে লাগলো মম। মাথায় একটা গোল সান হ্যাট পড়েছিল সে। সেটা স্থানচ্যুত হয়ে তার এক চোখ ঢেকে দিল। হাত বাড়িয়ে সেটা ঠিক করার মত পরিস্থিতিও নেই।
“ওরে বাবা রে! এটাকে রাস্তা বলে?”
চেঁচিয়ে উঠলো মম। সেটা শুনে এই প্রথম হাসি ফুটে উঠলো মুহূর্তের ঠোঁটের কোণে। সে জানালো,
“এই রাস্তা দিয়েই যেতে হয়।”
অন্যদিকে, মমর মত দোদুল্যমান না হলেও, চেরীও বিপাকে পড়েছে বটে! শক্ত হয়ে সিটে বসে আছে সে। সামনের হাতল ধরে রেখেছে এক হাতে। মুহূর্তের কথায় সে বিরক্তি ঝেড়ে বলে উঠলো,
“এই অবস্থা কেন? এভাবে যাওয়া যায় নাকি!”
জবাবে সামনের রাস্তায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মুহূর্ত জানালো,
“এদিকে কেউ তেমন একটা আসে না।”
“এরকম থাকলে আসবে কে? তুমি ঠিক পথে চালাচ্ছ তো? পথ ভুল হলে কিন্তু কামড়ে তোমার মাংস খুলে নেব আমি মুহূর্ত!”
“ঠিক পথেই যাচ্ছি। এইতো, আর পাঁচ কিলোমিটার।”
সেই পাঁচ কিলোমিটার পার হতে লাগলো প্রায় ঘন্টাখানেক। যতটা সম্ভব ধীর গতিতে, সাবধানে চালালো মুহূর্ত। রাস্তার দুপাশে কাঁটাঝোপ, বড় বড় নাম না জানা গাছগাছালি, আর মাঝে মাঝে নানা রঙের বাহারি বুনো ফুল দেখতে দেখতে সময় কাটলো মমর। আচমকা রাস্তার উপর দিয়ে একটা বড় গিরগিটি হেঁটে গেল নির্বিকারে। একটুর জন্য জিপের নীচে চাপা পড়েনি। সঠিক সময়ে ব্রেক কষে ফেললো মুহূর্ত। অচেনা প্রজাতির গিরগিটিটা দেখে চিৎকার করে উঠলো মম। সিটের উপর পা তুলে সিটিয়ে বসে রইলো ওটা সরে না যাওয়া পর্যন্ত। ভাবখানা এমন যেন এক্ষুনি লাফিয়ে মমর পিঠে চড়ে বসবে ওটা। ওর কান্ড দেখে সশব্দে হেসে উঠলো চেরী। হাসি ছড়িয়ে পরলো মুহূর্তের চেহারাতেও।
কিছুক্ষন পর জিপ এসে থামলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সমুদ্রের ভেজা, নোনা বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাদের। গলার ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল মম। আজ একটা আনারকলি স্যুট পড়েছে সে। গাঢ় নীলের মাঝে সাদা প্রিন্টের হিজিবিজি ডিজাইন। উজ্জ্বল শ্যামলা চামড়ায় দারুন মানিয়েছে তাকে। কোমড়ের কুচির আড়ালে দুপাশে দুটো পকেটও আছে জামাটায়। সেখানে টিস্যু আর ফোনটা ঢুকিয়ে রেখে, ব্যাগ থেকে একটা ক্যামেরা বের করে গলায় ঝুলিয়ে নিল মম।
চারপাশে নজর বুলালো মম। সামনে একটা সরু মাটির পথ নেমে গেছে পাথরের দিকে। পথের দুপাশে বড় বড় ঘাস গজিয়ে আছে। বাতাসের তোড়ে এলোমেলো অবস্থান তাদের। দূরে পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অভেদ্য প্রাচীরের মত।
তিনজন হাটা শুরু করলো সেদিকে। চেরী যাচ্ছে সবার আগে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে নেড়েচেড়ে এদিক ওদিক ফোকাস করছে থেমে থেমে। ছবি তোলার চেয়ে পিছিয়ে থেকে চেরী ও মুহূর্তকে পাশাপাশি এগিয়ে যেতে দেবার আগ্রহই বেশি মেয়েটার। কিন্তু তার এই পদ্ধতি তেমন একটা কাজে লাগলো না। মুহূর্ত আঠার মত লেগে আছে তার পেছনে। সে থামলে, মুহূর্তও দাঁড়িয়ে পরে। মেপে মেপে মমর সাথে পা মেলাচ্ছে সে। তাকে এগিয়ে যেতে বললেও, লাভ হয়নি। মমকে ছেড়ে এক চুলও নড়ছে না ছেলেটা।
সরু পথ বেয়ে নেমে এলো তারা। সামনে প্রায় ত্রিশ মিটার উঁচু পাথরের স্তম্ভ। মাথা উঁচু করে সেটা দেখতে দেখতে মুখটা হা হয়ে গেল মমর। সমুদ্রের গর্জন এখন আরো জোরালো শোনাচ্ছে। ওপর পাশ থেকে পাথরের স্তরে ক্ষণে ক্ষণে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। দূর থেকে পাথরটা মসৃণ মনে হলেও, কাছ থেকে চোখে পরে অসংখ্য ভাঁজ, ফাটলের চিহ্ন, খাঁজকাটা দাগ। ঠাণ্ডা, খসখসে পাথরের উপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে নেয় চেরী। যেন অনুভব করার চেষ্টা করছে কিছু।
“কি করছো?”
কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে মম। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে চেরী উত্তর দেয়,
“শুনছি।”
“কি শুনছো? পাথর কি কথা বলে নাকি?”
“বলে। কান পেতে শুনলে, অনুভব করতে পারবে।”
কথাটা ঠিক বিশ্বাস হলো না মমর। কান পেতে পাথরে আবার কি অনুভব করবে? তবে পরক্ষণেই তার মনে হলো, হয়ত হাইব্রিডার্সরা তাদের বিশেষ ইন্দ্রিয়শক্তির কারণে পাথরেও কিছু অনুভব করতে পারে। সে উৎসাহের সহিত ডেকে উঠলো মুহূর্তকে।
“এই মুহূর্ত! তুমিও শোনো না! দেখো, চেরী বলছে পাথর নাকি কথা বলে। দেখো তো, তুমি শুনতে পারো কিনা!”
মুহূর্তকে টেনে এনে চেরীর পাশে দাঁড় করিয়ে, পাথরের উপর তার হাত চেপে ধরলো মম পেছন থেকে। মুহূর্তের কপাল কুঁচকে এলো আবারো। সামনে চেরীকে দেখে বিরক্তি ফুটে উঠলো তার চেহারায়।
“ফালতু কথা। রক ফরমেশনে কোন ফ্রিকোয়েন্সি থাকে না। আশেপাশের শব্দ শোনা যাচ্ছে। পাথরে কোন শব্দ হয় না।”
বলেই হাতটা সরিয়ে নিয়ে পিছিয়ে গেল সে। দু রমণীর মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসে দাড়ালো। মুহূর্তের কথা বা আচরণ কোনটাই পছন্দ হলো না মমর। সে নাক কুচকে বললো,
“এমন কাঠখোট্টা কেন তুমি?”
“কাঠ… খোর….কি? আমি তো কাঠ খাইনা মোমো।”
“কিছুনা।”
ঠোঁট উল্টে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো সে। এদিকে চেরী এগিয়ে গিয়ে পাথরের খাঁজে পা রেখে উপরে উঠে যাচ্ছে।
“মুহূর্ত! ঐ দেখো, চেরী পাথর বেয়ে উপরে উঠছে। চলো, আমরাও উঠি।”
“ঠিকাছে, আমার পিঠে ওঠো, আমি তোমাকে নিয়ে যাই।”
“পিঠে ওঠার কথা বলবে না একদম! আমি কি চালের বস্তা যে তোমার পিঠে করে বয়ে নিতে হবে? চেরী উঠতে পারলে, আমি পারবো না কেন?”
তেজ দেখিয়ে বলে উঠলো মম। উত্তরে বিভ্রান্তি নিয়ে মুহূর্ত বললো,
“চেরী আর তুমি তো এক না, মোমো। তুমি এই শক্ত, রুক্ষ পাথর বেয়ে উঠতে পারবে? যদি ব্যথা পাও?”
মুহূর্তের চিন্তিত চেহারা দেখে রাগ হলো মমর।
“রাইট! চেরী আর আমি এক না। চেরী নিজের খেয়াল রাখতে পারে, আমার মত দূর্বল না, তাইতো? আমি দূর্বল, অকাজের, অসহায়, তাই বোঝাতে চাইছো?”
“আমি তো এত কিছু বলিনি, তুমি কি করে এত কিছু বুঝে ফেললে, মোমো?”
“বুঝেছি, কারণ তুমি সেটাই বুঝিয়েছো। তুমি আমাকে দূর্বল ভাবো, অবজ্ঞা করছো তুমি আমাকে!”
“একদম না।”
আগের চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে এখন মুহূর্তকে। সে তো এসব কিছুই বোঝাতে চায়নি। এমনকি এসব তার মাথায় আসেওনি। চেরী সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এরচেয়েও খাড়া এবং উঁচু ঢাল বেয়ে অনায়াসে উঠে যেতে পারবে সে। কিন্তু মোমোটা তো আর সেই প্রশিক্ষণ পায়নি। সে তো শুধু ওকে আগলে রাখতে চাইছে। এটা কি খারাপ কিছু?
“তাহলে আমি নিজে নিজেই উঠবো উপরে। তুমি সাহায্য করবে না। আর যদি করো, তাহলে কিন্তু আমি তোমার সাথে কথা বলবো না।”
“তোমরা কি নীচেই দাঁড়িয়ে থাকবে? আসবে না উপরে?”
“আসছি!”
বলে তো ফেললো মম। কিন্তু ওঠার জন্যে অগ্রসর হয়ে সে বুঝলো, এই কর্ম এত সহজ নয় যতটা চেরীকে দেখে মনে হয়েছে। পাথরে সৃষ্ট প্রাকৃতিক খাঁজগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে নেই। কোনদিক দিয়ে কিভাবে চেরী উঠেছে মাথায় আসলো না মমর। নির্ঘাত এবড়ো থেবড়ো জায়গায় হাত পা ছুলে ধপাস করে পড়বে সে নীচে। আড়চোখে সে তাকালো মুহূর্তের দিকে। পাথরে হেলান দিয়ে দুহাত বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে দেখছে সে মমকে। আগ্রহ নিয়ে দেখছে। সে দেখতে চায় এই খাড়া ঢাল বেয়ে মোমোটা কিভাবে উপরে ওঠে।
নাহ্! এটা এখন মান সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে তো মম হার মানবে না। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে পাথরের ধাপে হাত রেখে শরীরটাকে টেনে তুলতে চায় মম। কিন্তু শুরুতেই পা পিছলে যায় তার। তবুও কোনমতে নিজেকে টেনে দেড় ফুট উপরে ওঠে সে। এই দেড় ফুটের উচ্চতায় খুশি হতে না হতেই আবারো পা পিছলে যায় তার, সাথে হাতটাও ফসকে আসে।
মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ার আগেই তাকে ধরে ফেলে মুহূর্ত। সে হাসছে না। কিন্তু তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, বহু কষ্টে সে চেপে রেখেছে হাসিটা। লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারে না মম তার দিকে।
হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে মুহূর্ত তার সামনে। এবার আর টু শব্দটি করে না মম। চুপচাপ ভেজা বিড়ালের মত ঝুলে পড়ে তার কাঁধে।
উপরে উঠে আসতেই চোখে পড়ে মনোরম দৃশ্য। সামনে বিশাল সমুদ্র। সবুজাভ নীল স্বচ্ছ পানি। দূরে অস্থির উত্তাল ঢেউ জেগে উঠছে। তীরের দিকে ধেয়ে আসতে আসতে বিকট আকার ধারণ করছে তারা। তারপর সজোরে আছড়ে পড়ছে পাথরের প্রাচীরের উপর। সাদা ফেনা তুলে লুটিয়ে পড়ছে চারদিকে। বাম দিকে আরো পাথরের সারি। ছোট, বড় নানা আকৃতির পাথর। আর ডানদিকে বসেছে সবুজের মেলা। ঘন গাছগাছালী, ঝাউবন আর পাখিদের মেলা!
বুক ভরে শ্বাস নেয় মম। সমুদ্রের আদ্র বাতাসের নোনাধরা স্বাদ আবিষ্ট করে তাকে। পাশে তাকিয়ে দেখে মুহূর্ত মুচকি হেসে চেয়ে আছে তার দিকে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায় মম। কিন্তু অমসৃণ পাথরে আবারো পা পিছলে যায় তার। দূরে যাওয়ার বদলে সোজা গিয়ে মুহূর্তের বুকে আছড়ে পড়ে সে। মাথা তুলে তাকায় মম স্তম্ভিত নয়নে। দূরে সরে গিয়ে কিনা তার বুকেই ঠাঁই মিললো তার!
“সরি,”
মৃদু স্বরে বলে উঠলো মম। সোজা হয়ে সরে দাঁড়াতে চাইলো সে। কিন্তু মুহূর্ত ছাড়লো না। ধরে রাখলো তাকে আরো কিছুটা সময়। মিটিমিটি হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটের কোণে।
“সরি নট, মোমো। আমার বুকের জমিনে ঢেউ হয়ে এসে সুখের বার্তা দিয়ে যাও তুমি। অপেক্ষায় থাকা মন, তোমার ফিরে আসার প্রহর গোনে সারাটি ক্ষণ।”
শুকনো একটা ঢোক গিলে নেয় মম। চোখ ফিরাতে পারে না তার ঐ মধুরঙ্গা চোখজোড়া থেকে।
পেছনে প্রচন্ড তেজে আরেকটা ঢেউ এসে আছড়ে পরলো শিলাস্তম্ভের উপর। ঠিক যেন কোন প্রেমিকা পালাতে গিয়ে বাঁধা পড়েছে প্রেমিকের দৃঢ় নিশ্চয়ে।
***
চলবে….
