#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_২২
“আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“হুম? হ্যাঁ, বল।”
অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল পাখি। সামনে বড় সাইজের একটা গ্লাসে কোল্ড কফি হেলায় গরম হচ্ছে। পিৎজার আধ খাওয়া একটা টুকরো পরে আছে প্লেটে।
আজ সমস্ত দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছে পাখি। মম এখানে আসার পর থেকে ওকে তেমন একটা সময় দিতে পারেনি। ঘর থেকেও তেমন একটা বেরোতে পারেনি মম। অচেনা, অজানা জায়গায় অনেকটা বন্দী জীবন কাটছে মেয়েটার। তাই আজ সারাটা দিন মমর সাথে কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। সকাল সকালই বেরিয়ে পরেছিল দুজন। যদিও হাইব্রিডার্স জোনে মানুষদের ঘোরাঘুরির উপর নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু হিউম্যান জোন তো উন্মুক্ত।
সকালে সর্বপ্রথম স্টোরে নিয়ে গিয়েছিল পাখি মমকে। আট তলা বিশিষ্ট বিশাল ভবন এটি। স্টোর বলা হলেও ভবনটির সাজ সজ্জা, আর্কিটেকচার কোন উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শপিং মলের মত। পৃথিবীর যত ধরনের যত জিনিসপত্র আছে, সব পাওয়া যায় এখানে। ইলেকট্রনিক ডিভাইস, পোশাক আশাক, নিত্য ব্যবহার্য পণ্য, সবকিছুর মজুদ রাখা হয় এখানে।
বিশেষত চারতলায় রয়েছে পোশাক আশাকের বিশাল সমাহার। শোরুম স্ট্যাইলে বেশ অনেকগুলো বড় বড় স্তম্ভের মত ডিসপ্লে আছে পুরো ফ্লোর জুড়ে। ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠে স্টকে থাকা সব তৈরি পোশাকের হলোগ্রামিক ডিজাইন ও তথ্য। স্টাফরা স্টোরের সিস্টেমে সিলেক্ট করা পোশাকের কোড ও সাইজ এন্টার করলে, সয়ংক্রিয়ভাবে মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে নির্দিষ্ট পোশাকটি। মম হা করে তাকিয়ে দেখেছে সেই প্রযুক্তি। এর আগে এভাবে ভেন্ডিং মেশিন থেকে কোল্ড ড্রিংকস, চিপসের প্যাকেট বের হতে দেখলেও, জামা, জুতো বের হতে এই প্রথম দেখলো সে।
তৈরি পোশাক পছন্দ না হলেও সমস্যা নেই। বিকল্প ব্যবস্থা আছে। গরম, ঠান্ডা সব ঋতুর কাস্টম মেড পোশাকও তৈরি হয় এখানে। যেকোন ধরনের ফ্যাব্রিক আর ডিজাইন পছন্দ করে অর্ডার দিলেই ঘন্টাখানেকের মধ্যে হাজির হয়ে যায় সেটা। মমর জন্যে তিনটা ড্রেস বানাতে দিয়েছে পাখি। প্রস্তুত হয়ে গেলে, ডেলিভারি পাঠিয়ে দেওয়া হবে বাড়িতে। এছাড়াও দামী ব্র্যান্ডের দুজোড়া জুতোও পছন্দ করেছে পাখি মমর জন্যে।
জুতো শেষে সানগ্লাস পরেও কিছুক্ষন দু বোন মডেলিং করেছে আয়নার সামনে। স্টোর কিপাররা তাদের হাসাহাসি দেখে নিজেরাও অংশ নেয় মডেলিংয়ে। দু’জনকে বেস্ট শপিং এক্সপেরিয়েন্স দেবার চেষ্টায় অনেকটা হুড়োহুড়ি লেগে যায় তাদের মধ্যে। এখানে টাইমপাস করতে খুব একটা কেউ আসে না। ঘরে বসে অর্ডার দিলেই যেখানে সব পৌঁছে যায়, সেখানে এখানে এসে শুধু শুধু সময় নষ্ট করবে কে। স্টোরের স্টাফদের দিনগুলো কাটে নিরস নীরবতায়। কিন্তু আজ প্রথম সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে জায়গাটা প্রাণ পেয়েছে পাখি ও মমর হাসির শব্দে। তার উপর অনামিকা আহমেদ তাদের বস। তাকে ইমপ্রেস করার সুযোগ খুব একটা পায়না স্টাফরা। এই সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়!
শপিংয়েই সারাটা সকাল পার করে দিয়েছে দুজন। সেখান থেকে বেরিয়ে পাখি ও মম এসেছে ক্যাফেটেরিয়াতে। পাঁচতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল রেস্তোরার সামনের বড় বাগানে অবস্থান এই খোলা ক্যাফেটেরিয়ার। ছোট ছোট ছাউনির নিচে রয়েছে বসার ব্যবস্থা। দক্ষ এবং প্রসিদ্ধ বাইশ জন হেড শেফ নিয়ে গঠিত স্বর্গভূমির কিচেন। প্রায় শ’খানেক স্টাফ রোজ কাজ করে এখানে। দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে কিচেন। প্রতিদিন কয়েক হাজার লোকের রান্না হয় এই কিচেনে। হাইব্রিডার্সরা ক্যালোরি বার্ন করে খুব সহজেই। তাই তাদের জন্য অভিজ্ঞ শেফদের তত্ত্বাবধানে প্রোটিন, ফাইবার ও কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবারের ডায়েট প্ল্যান তৈরি ও মেন্যু নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও মেন্যু বহির্ভূত যেকোন খাবার যেকোন সময় প্রস্তুত করে দেয় তারা প্রয়োজন অনুযায়ী।
মানুষ এবং হাইব্রিডার্স সকলের জন্য উন্মুক্ত স্বর্গভূমির কিচেন। পার্থক্য শুধু একটাই। মানুষদের কিনে খেতে হয়, আর হাইব্রিডার্সদের এক কথাই যথেষ্ট।
বাইরে না বসে ভেতরে ঢুকলো পাখি মমকে নিয়ে। নিচ তলায় গোল গোল টেবিল দিয়ে ক্যান্টিনের মত সাজানো খোলামেলা স্পেস। লাঞ্চের সময় হওয়ায় ব্যস্ত পুরো কিচেন। ডেলিভারি ভ্যানগুলো খালি হয়ে ফিরছে, আবার খাবার ভর্তি করে ছুটছে গন্তব্যে। তবে ভেতরে খুব বেশি ভীড় নেই। কয়েকজন মানুষ ও হাইব্রিডার্স বসে আছে ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে বিচ্ছিন্নভাবে, নিরাপদ দূরত্বে। পাখি ও মম জানালার ধারের একটা খালি টেবিলে গিয়ে বসে পরলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় চার ফুট উচ্চতার একটা সার্ভিস রোবট ওদের স্বাগতম জানিয়ে অর্ডার নিতে এলো। মম আবারো হা করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। এখানে ওয়েটারের কাজ করে রোবটগুলো। আরো কয়েকটা রোবট দেখতে পেল মম। ট্রলিতে করে খাবার নিয়ে এসে সার্ভ করছে বিভিন্ন টেবিলে।
কি খাবে জিজ্ঞেস করতেই মম নাম নিয়েছে পিৎজার। পাখিও ভাবলো আজ শরীরের বদলে মনকে তুষ্ট করতে খাওয়া হোক। খেতে খেতে আশপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে সে। কিছুদিন আগে হওয়া হামলায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল রেস্টুরেন্টের। একপাশের দেয়াল ধ্বসে পড়েছিল। বাগানের গাছপালা, ছাউনী, চেয়ার টেবিল ভেঙেচুরে, আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। নিচ তলার স্টোরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সব আবার নতুন করে সাজানো হয়েছে। দেয়ালের রিপেয়ারিং করা শেষ। বাগান পরিষ্কার করে লাগানো হয়েছে নতুন গাছগাছালি।
“অংশী কি?”
মমর প্রশ্নে চমকে উঠলো পাখি। চকিত দৃষ্টিতে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিলো সে। অন্যদের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে, নিরিবিলিতে বসেছে তারা। তবে উঁচু স্বরে বললে কয়েক টেবিল দূরত্বে থাকা হাইব্রিডার্সদের কানে কথা যাবার সম্ভবনা আছে। সার্ভিস রোবটগুলোও প্রতি মুহূর্তে ডাটা স্ক্যান ও স্টোর করতে থাকে।
“তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস? কোথায় শুনেছিস এটা?”
গলার স্বর নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি। অংশীবন্ড নিয়ে বাইরের কারো সাথে বা মানুষদের সঙ্গে আলোচনার অনুমতি নেই। হাইব্রিডার্সদের সিল করা ডাটার মধ্যে এটি অন্যতম। হাইব্রিডার্সরা ছাড়া মানুষদের মধ্যে একমাত্র ডক্টর শ্রেয়া, ডক্টর মিলটন এবং পাখিই জানে অংশীবন্ডের ব্যাপারে। এমনকি স্বর্গভূমির ডিরেক্টর হওয়া সত্ত্বেও দেনিজকে পর্যন্ত অনভিজ্ঞ রাখা হয়েছে এ বিষয়ে।
“শুনেছি এমনি। লাইব্রেরীতে মেয়েরা কথা বলছিল। তুমি নাকি ভাইয়ার অংশী। আবার শ্রেয়া আপুও নাকি ঐ রগচটা ভাইয়াটার অংশী। মানে কি এটার?”
বোনকে কপাল কুঁচকে অসন্তোষের সাথে তাকাতে দেখে কাচুমাচু করে বললো মম। দু’দিন আগে সে যে এটা তুলি ও রঙ্গনের কাছ থেকে জেনেছে, সেটা চেপে গেল। পাখি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ঘাড় সামান্য নাড়িয়ে হেঁয়ালির সুরে জানালো,
“তেমন বিশেষ কিছু না। কাপলদের বলে আরকি। যারা রিলেশনশিপে থাকে তাদের।”
মমর ঠিক বিশ্বাস হলো না। কেন যেন মনে হলো, পাখি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ব্যাপারটা। সে দু আঙুলের সাহায্যে কানের লতিতে হাল্কা ম্যাসাজ করতে করতে আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“তাহলে কোন হাইব্রিডার্স যদি আমাকে পছন্দ করে, তবে কি আমিও তার অংশী হয়ে যাবো?”
“না। তুই কখনো কারো অংশী হবি না।”
পাখির দৃঢ় কণ্ঠের উত্তর আসতে দেরি হলো না। মম এবার নিশ্চিত হলো, পাখি তাকে সম্পূর্ণটা বলতে চাইছে না। নইলে এত জোরালো গলায় প্রতিরোধ করে উঠতো না সে।
“কেন?”
কৌতূহল শুধু কণ্ঠে নয়, মমর চেহারাতেও ফুটে উঠেছে। পাখি একটু ভাবলো। তারপর টেবিলের উপর দু হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে এগিয়ে এসে গলার স্বর নিচু রেখে জানালো,
“মম, হাইব্রিডার্সরা রিলেশনশিপকে অনেক বেশি সিরিয়াসলি নেয়। ওরা খুব সেনসিটিভ। রিজেকশন ওরা মানতে পারে না। ওদের জন্যে এটা জীবন মরণের প্রশ্ন। অতীতে আঁকড়ে ধরে বাঁচার মত কিছুই ছিল না ওদের। ভালোবাসার মত, নিজের বলতে কেউ কখনো ছিল না। তাই প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ এই অনুভূতিগুলো ওদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। একবার কারো জন্যে ওদের মনে এই অনুভূতি জন্মালে, আমরণ ওরা সেটা থেকে বেরোতে পারে না।”
গলাটা শুকিয়ে গেল মমর। একটা ঠান্ডা শীতল স্রোত নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। পাখি একটু থেমে পুনরায় বললো,
“মানুষরা যেমন চাইলেই, কারণে অকারণে আলাদা হয়ে যায়, সেসবের সুযোগ নেই এখানে। মন বদলে যাওয়া, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, ডিভোর্স, এসবের অস্তিত্ব নেই হাইব্রিডার্সদের মাঝে। তোদের জেনারেশন তো আরো এডভান্সড। এক রিলেশনশীপকে ভেঙে সেখান থেকে সিচুয়েশনশিপ, বেঞ্চি, ব্রেডক্রাম্বিং আরো কি কি বের করিস! হাইব্রিডার্সরা এত কিছু বোঝে না। ওরা শুধু বোঝে, একবার হৃদয়ে অনুভূতি তৈরি হওয়া মানে ঐ ব্যক্তিটি তার। শুধুই তার। আজীবনের জন্যে তার।”
মমর মনে ভয় উঁকি দিতে শুরু করেছে। তবে কি মুহূর্তও তাকে নিয়ে এমনটাই ভাবতে শুরু করেছে? জিভের ডগা দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো সামান্য ভিজিয়ে নিল মম।
“আর যদি সামনের ব্যক্তিটি একই অনুভূতিতে সিক্ত না হয় তবে? যদি সে সম্পর্ক গড়তে না চায়, তখন?”
মমর প্রশ্ন শুনে কিছু একটা মনে পরে গেল পাখির। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ধরা দিল।
“তখন তাকে ধরে বেঁধে নিজের কাছে রেখে দেবে। ততক্ষণ, যতক্ষণ না সে স্বেচ্ছায় ধরা দিচ্ছে। কিন্তু ছেড়ে পালাতে দেবে না।”
“এটা তো ফেয়ার না। একরকমের জোর জবরদস্তি।”
“লাইফ ওয়াস নেভার ফেয়ার টু দেম। সো হোয়াই শুড দে? (জীবন কখনোই ওদের জন্যে ফেয়ার ছিল না। তাহলে ওরা কেন হবে?)”
কাঁধ ঝাকিয়ে বললো পাখি। সোজা হয়ে বসলো চেয়ারে।
“ওদের শূন্যতার খাতাটা অনেক ভারী রে মম। আপন বলতে ওদের কেউ নেই। মায়ের মমতা, বাবার ভালোবাসা, ভাই বোনের স্নেহ, কিচ্ছু জোটেনি ওদের কপালে। হ্যাঁ, নিজেদের মধ্যে বাঁচার তাগিদে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংহতি গড়ে তুলেছে, কিন্তু সেটা সেই শূন্যতা পূরণে সক্ষম নয়। হাইব্রিডার্সদের সন্তানসন্ততি হবে না, সেটাও সবাই জানে। এত সব অপূর্ণতার মাঝে যদি একটা অনুভূতিকে আঁকড়ে জীবনে এক চিলতে সুখ খুঁজে নেয়, তবে ক্ষতি কি?”
চুপ করে রইলো মম। ক্ষতি নেই। কোন ক্ষতি নেই। অন্যদের বেলায় হয়ত নেই, কিন্তু নিজের বেলায়? মুহূর্ত যদি সত্যি সত্যিই তাকে নিয়ে এরকম কিছু ভেবে থাকে, তবে কি করবে সে?
“আপু?”
জড়ানো গলায় ডেকে উঠল মম। পাখি ভ্রু উঁচু করে ইশারায় কি হয়েছে জানতে চাইলে সংকোচে নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
“সৌবীর ভাইয়া…. মানে…. ভাইয়ারও কি কখনো সন্তান হবে না?”
মমর প্রশ্নের উত্তরে নিঃশব্দে মাথা নাড়ে পাখি। সামনে থাকা কোল্ড কফি স্ট্রর সাহায্যে টেনে শেষ করাতে মনোযোগ দেয় সে। মনের সাথে দ্বন্দ্ব করে মম আবারো জিজ্ঞেস করে বসে,
“তুমি…তুমি কি…তোমার সমস্যা নেই এতে? তুমি বাচ্চা কাচ্চা চাওনা?”
প্রশ্নটা শুনে মৃদু হাসে পাখি। স্ট্র দিয়ে খালি গ্লাসে জমে থাকা বরফকুচিগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে অযথা।
“একটা মজার ব্যাপার কি জানিস মম?”
একটু থেমে একপলক ছোটবোনের দিকে তাকিয়ে সে শুধায়,
“মানুষের জীবনের অপূর্ণতার গল্পগুলোই পূর্ণ হয়। সবার জীবনেই কিছু না কিছু অপূর্ণতা থাকে। কিন্তু আমরা সেটাকে মেনে নিতে পারিনা। মরীচিকারূপী সুখের পেছনে ছুটি আমরা। সুখ তো ধরা দেয়না তাদের। তবে খেয়াল করলে দেখবি, জীবনের অপূর্ণতাগুলোকে যারা মেনে নিতে পারে, সুখ তাদের কাছেই ধরা দেয়। অপূর্ণতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সম্পূর্ণতা।”
স্নিগ্ধ একটা হাসি ফুটে ওঠে পাখির চেহারায়।
“বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপারে কখনো যে ভাবিনি, তা না। ভেবেছি। কিছুটা মন খারাপও হয়েছিল। কিন্তু আমি আমার জীবনে সৌবীরের চেয়ে বেশি কখনো কিছু চাইনি, পাবার আশাও রাখিনি। ঘোস্টকে ফিরে পাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পূর্ণতা।
আমার সম্পূর্ণতা সে।”
বেশ কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মম তার বোনের দিকে। বছরের পর বছর বিষন্নতাকে সঙ্গী করে কাটিয়েছে পাখি। কিন্তু এখন? সত্যিই সম্পূর্ণা সে।
হঠাৎ করেই মুখের হাসিটা মলিন হয়ে যায় পাখির। কপাল কুঁচকে রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
“ও এখানে কি করছে?”
বিড়বিড় করে ওঠে সে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে মম দেখে, দরজা দিয়ে মাত্রই প্রবেশ করেছে মুহূর্ত। দ্রুত কুঁজো হয়ে বসে নিজেকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। কিন্তু মুহূর্তের এক সেকেন্ডও লাগেনি মমকে খুঁজে বের করতে। ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা এগিয়ে আসে সে তাদের দিকে। সামনাসামনি বসা পাখি ও মমর মাঝে এসে থামে সে।
“এখানে কি করছো?”
জিজ্ঞেস করে পাখি। মম সরাসরি তাকায় না তার দিকে। শক্ত হয়ে বসে থাকে।
“কেন? আসা মানা নাকি?”
মুহূর্তের কাছ থেকে এরকম রুক্ষ স্বরের উত্তর শোনার জন্যে প্রস্তুত ছিল না পাখি। ভ্রু জোড়া কপাল উঠে যায় তার।
“না, একদমই না।”
পাখির কথা শেষ হবার আগেই মাঝের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পরলো সে। সেটা দেখে আরেকদফা অবাক হলো পাখি।
“বসে পরলে যে?”
“কেন? বসা মানা নাকি?”
“না, একদমই না।”
“তোমার কাজ নেই? এত অকেজো তুমি?”
এবারে চটলো পাখি। চোখজোড়া সরু করে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার কাজের হিসেব কি তোমাকে দিতে হবে নাকি? কে তুমি ভাই?”
“আমি তোমার ভাই না! খবরদার ভাই বলবে না আমাকে!”
একহাতে সজোরে টেবিল চাপড়ে বলে উঠলো সে। ঈষৎ কেঁপে উঠলো মম। তবে এবারেও তাকালো না সে মুহূর্তের দিকে। মাথা নিচু করে রাখলো। অন্যদিকে, মেকি হেসে পাখি বলে উঠলো,
“মুহূর্ত ভাইয়া, তুমি এত রেগে যাচ্ছো কেন?”
“পাখি! বললাম না ভাই বলবে না!”
“ওকে, চিল! এত ক্ষেপে যাচ্ছো কেন? আমরা বাঙালিরা সবাইকেই গনহারে ভাই ডাকি। এত সিরিয়াস হবার কিছু নেই।”
“এটা তোমার সোনার বাংলা না। এটা স্বর্গভূমি।”
বেশ কর্কশ শোনালো তার কন্ঠ। এরপর আর চুপ থাকতে পারলো না মম। ভ্রু কুঁচকে মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলো সে।
“তুমি আমার আপুর সাথে এভাবে কথা বলছো কেন? আপু তোমার মুরব্বী না?”
মমর আওয়াজ পেয়ে ওর দিকে থমথমে মুখে চেয়ে রইলো মুহূর্ত। যাক! এতক্ষণে মুখ তুলে তো তাকিয়েছে!
আর এদিকে পাখির মুখটা হা হয়ে গেল।
“মুরব্বী? আমি?!”
নিজের দিকে নির্দেশ করে হতবিহ্বল হয়ে পাখি জিজ্ঞেস করলো,
“আমাকে দেখতে কি এত বয়স্ক মনে হয় মম?”
অপ্রতিভ হয়ে পরলো মম। কি বলতে কি বলেছে, নিজেই খেই হারিয়ে ফেলেছে সে। বারকয়েক মুহূর্ত ও পাখির দিকে ঘুরে ফিরে তাকালো সে। দুজনের কারোরই বয়স চোখে দেখে আন্দাজ করা মুশকিল।
“না…. মানে….”
“তোমার বয়স আমার চেয়ে বেশীই হবে।”
হাটে হাঁড়ি ভাঙার মত প্রতিধ্বনিত হলো কথাটা। চকিত দৃষ্টিতে তাকালো মম মুহূর্তের দিকে। এরকম করে কেউ বলে নাকি একটা মেয়েকে! কি স্পর্ধা!
পাখির চেহারাটা ক্রমশই লাল হয়ে উঠছে। রাগে গা জ্বলছে তার। মন চাইছে, টেবিলে থাকা সসের বোতলটা ওর মাথায় উল্টে দিতে। কিন্তু নিজেকে আটকালো সে। মুষ্টিবদ্ধ হাতজোড়া শিথিল করে, ফোস করে একটা শ্বাস ছাড়লো সে। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বললো,
“মম, চল তো! এখানে আর বসা যাবেনা।”
“মোমো যাবেনা।”
“এক্সকিউজ মি?”
“ওর সাথে আমার কথা আছে। ও কোথাও যাবে না। তুমি যাও।”
“আমার বোনের সাথে তোমার কিসের কথা?”
অবস্থা বেগতিক দেখে দুজনকে আটকালো মম।
“আপু!”
অনুরোধ করে মম বললো,
“তুমি প্লীজ যাও। আমি আসছি একটু পর।”
“মানে কি?”
সরু চোখে তাকালো পাখি মম ও মুহূর্তের দিকে। ঘাবড়ে গিয়ে টেবিলের নিচে দু হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে মমর। তবুও সে যথাসম্ভব নিজেকে স্থির রেখে বললো,
“আমি এসে পরবো কিছুক্ষণের মধ্যেই। তুমি যাও।”
পাখি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো মমর দিকে। বোঝার চেষ্টা করলো তাকে। তারপর চুপচাপ হাটা দিল বাইরের দিকে। সে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাবার পর, মম জড়ানো গলায় মুহূর্তকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলবে বলো, আপু অপেক্ষা করছে।”
“তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো কেন?”
“আমি কেন তোমাকে এড়িয়ে যাবো?”
মুহূর্তের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না মেয়েটা। এতক্ষণ ধরে রুক্ষ স্বরে কথা বললেও, এবারে দৃষ্টি নমনীয় হয়ে এলো মুহূর্তের। বিগলিত গলায় সে বলে উঠলো,
“তুমি আর আগের মত আমার সাথে কথা বলো না। রাতে জানালা বন্ধ করে রাখো। দিনেও একা বের হও না। আমি ফোন করলে ধরো না। কেন? কি করেছি আমি?”
মাথা তুলে তাকালো মম। কালো চুলগুলো উস্কো খুস্কো হয়ে কপালে ছড়িয়ে আছে। অস্থির হয়ে রয়েছে ঐ মধুরঙা চোখগুলো। দু দিনেই অগোছালো হয়ে পরেছে ছেলেটা। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো মমর। আকুল চোখজোড়ার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না সে। চোখ সরিয়ে নিয়ে জবাবে বললো,
“তুমি ভুল ভাবছো। সেরকম কিছুই না।”
“কিছু তো একটা নিশ্চয়ই আছে। তুমি নিজেকে গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করছো।”
“দুদিন আগেই তো কথা হয়েছিল আমাদের মুহূর্ত। মাঝখানে দুদিন কথা হয়নি, ব্যস্ত ছিলাম তাই। এতে এত রিয়াক্ট করার কি আছে?”
মমর চোরা দৃষ্টি ও উদাসীন ভঙ্গি ভালো লাগলো না মুহূর্তের। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার আবারো। গলার স্বর হয়ে গেল ঠান্ডা।
“কিসের ব্যস্ততা? কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলে তুমি?”
“আশ্চর্য! এখন কি তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে আমার?”
“হ্যাঁ, হবে।”
“কেন দেব? কে তুমি আমার যে কৈফিয়ত চাইছো? তুমি আমার বন্ধু ছাড়া কিছুই না। শুধুই বন্ধু, বুঝেছো?”
মমর ঝাঁঝালো কথার প্রেক্ষিতে কিছুক্ষন চুপ করে রইলো মুহূর্ত। তারপর পূর্বের চেয়েও শীতল কণ্ঠে সে জানালো,
“না। বোঝার প্রয়োজন তোমার। আমি তোমার শুধু বন্ধু কখনোই ছিলাম না। তুমি আমার মোমো। শুরু থেকেই ছিলে। ছিলে বলেই বাংলাদেশে ছুটে গিয়েছিলাম আমি।”
আঁতকে উঠলো মম। মুখের রং উড়ে গেল তার। চকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বললো,
“তুমি এসব কি বলছো মুহূর্ত? আমি তো তোমাকে ভালো বন্ধু ভেবেছি…”
চোখজোড়া সরু হয়ে এলো মুহূর্তের। মধুরঙা মণির চারপাশে সরু লাল রিংয়ের মত আবরণ ঝলকে উঠলো এক সেকেন্ডের জন্য।
“কেন ভেবেছিলে? আমি কি তোমাকে কখনো বলেছি, আমি তোমার বন্ধু হতে চাই? শুরু থেকেই আমি বলেছিলাম, আমি তোমাকে পটাতে চাই। সেখানে আমাকে শুধু বন্ধু কেন মনে হলো তোমার?”
“আমি…আমি ভেবেছিলাম…তুমি মজা করছো।”
“মজা করতে যাবো কেন মোমো? এটা কি মজার কোন বিষয়?”
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে গলার স্বর ভারী ও তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছে মুহূর্তের। গরগর আওয়াজ বের হচ্ছে প্রতিটি শব্দের সাথে। ভয় পাচ্ছে মম। কপালের পাশ বেয়ে সরু একফোঁটা ঘামের রেখা নেমে এসেছে। আশেপাশের বাতাসও যেন স্থির হয়ে গেছে।
মমর শরীরের মিষ্টি সুবাসের সাথে ভয়ের হালকা তেতো একটা স্বাদ মিশে এলো মুহূর্তের নাকে। নিজেকে সামলে নিল সে। একটা গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে সে কণ্ঠে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনে বললো,
“আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা এগুলো নিয়ে হয়ত মানুষদের মধ্যে মজা চলে, কিন্তু আমাদের মধ্যে না। আমি তো দুদিন আগেও তোমাকে বলেছি, আমি তোমাকে পছন্দ করি। তোমার পছন্দমত বাড়ি সাজিয়েছি, দুজনে একসাথে থাকবো বলে। এসব তোমার মজা মনে হয়েছে?”
মমর মনে হচ্ছে, গলায় কিছু একটা আটকে গেছে তার। হ্যাঁ, বলেছিল সে। কিন্তু মম তো এসব নিয়ে এত গভীরভাবে ভেবে দেখেনি। মমর পছন্দে বাড়িঘর সাজানোটাকেও নিছক সাধারণভাবে নিয়েছিল সে। মুহূর্তের মনে একসাথে থাকার কথা এলো কীকরে, সেটাই অবাক করছে মমকে।
“আমি…আমি সরি মুহূর্ত। আমি…সত্যিই বুঝতে পারিনি।”
আমতা আমতা করে মিনমিনে কণ্ঠে আওড়ালো মম।
“আমি তোমাকে নিয়ে সেরকম কিছু ভাবিনি।”
“মিথ্যে বলবে না একদম! তুমিও আমার প্রতি আকৃষ্ট, সেটা আমি জানি।”
আবারো মুহূর্তের চোখে সেই লাল রিংয়ের ঝিলিক দেখা দিল। গলার স্বর হয়ে উঠল তীক্ষ্ম।
“না…”
“অস্বীকার করার চেষ্টা করোনা মোমো। তোমার শরীরের পরিবর্তন আমি বুঝতে পারি। নাকে ঘ্রাণ পাই আমি।”
থ হয়ে গেল মম। তার গলা দিয়ে আর কোন আওয়াজ বের হলোনা। চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। ভীষন কান্না পাচ্ছে মেয়েটার। কেন পাচ্ছে, তার সঠিক উত্তরও জানা নেই। জানা নেই বলে আরো বেশি কান্না পাচ্ছে মমর। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো মুহূর্তের দিকে।
বিরক্ত হলো মুহূর্ত। কিছুটা মোমোটার উপর, কিছুটা নিজের উপর। এভাবে কাঁদো কাঁদো চেহারা করার কি আছে! সে তো সময় দিয়েছে মেয়েটাকে। বুঝতে না পারার কি ছিল এখানে? সে তো কোন রাখঢাক রাখেনি। আবেগ, অনুভূতি না থাকলে, পছন্দ না করলে, সে শুধু শুধু কেন একটা মানুষের মেয়ের পেছনে রাতদিন ঘুরঘুর করবে? বুঝতে না পারার মত এতটা বোকা বা ন্যাকা, কোনটাই না মম। তবে কেন সে সবটা মজা ভাববে? মজা করে কোন ছেলে একটা মেয়েকে প্রয়োজন ছাড়া নিজের ঘরে ঢুকতে দেয় বলে মুহূর্তের জানা ছিল না।
শব্দ করে নাক টানলো মম। আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে বোধহয় সত্যি সত্যিই কেঁদে দেবে সে। মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চাইলো না মুহূর্ত। ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ালো মুহূর্ত। টেবিলের উপর দুহাত রেখে ঝুঁকে সে বললো,
“বুঝতে না পারার বাহানা আর দিও না মোমো। তোমার উপর এ পর্যন্ত জোর করে কিছু চাপিয়ে দেইনি আমি। আমি চেয়েছি, তুমি নিজে থেকেই আমার কাছে এসো। তোমার সময় লাগলে, তুমি নাও। তবে আমাকে এড়িয়ে চলার ভুল করতে যেও না। সেটার ফল কারো জন্যেই ভালো হবে না, এটুকু অন্তত বুঝে নাও।”
কথাটা বলে আর দাড়ালো না মুহূর্ত। যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেই গতিতেই বেরিয়ে গেল সে। আর মম তার যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো,
কোথায় এসে ফেঁসে গেল সে!
***
চলবে…
