#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_২১
“ও.এম.জি!”
চোখভরা বিস্ময় নিয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে মম। মুখটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে আছে তার। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মুহূর্ত। তবে তার চোখ আটকে আছে শুধু মোমোটার দিকে। মিনিট খানেক হতভম্ভ হয়ে থাকার পর মম তার দিকে ফিরে তাকালো।
“তুমি সত্যি সত্যিই বাড়িটা পুরো পিংক কালারের করে ফেলেছো?!”
“তুমিই তো বলেছিলে।”
কিছুটা বিভ্রান্ত হলো মুহূর্ত। মোমোটাই তো সেদিন বলেছিল, বাড়িটার রঙ যেন তার টিশার্টের কালারের মত হয়। সে তো সেটাই করেছে। হাজারো গোলাপীর মাঝ থেকে ঠিক সেই রঙটাই বেছে নিয়েছে সে। ইন্টেরিয়রের লোকটা অবশ্য গাইগুই করছিল। কিন্তু মুহূর্তের গলা থেকে একটা চাপা হুংকার বেরোবার পর আর কিছু বলার সাহস করতে পারেনি।
“তুমি এই পিংক কালারের বাড়িতে থাকবে? তোমার পার্সোনালিটির সাথে যায়?”
“পার্সোনালিটির সাথে রঙের কি সম্পর্ক?”
মুহূর্তের প্রশ্নের উত্তর দিতে বেগ পেতে হলো মমর। কিভাবে বোঝানো যায়, ভাবতে ভাবতে সে বললো,
“একটা মানুষের… মানে ব্যক্তির.. রুচি, ব্যক্তিত্ব, পছন্দ ফুটে ওঠে তার ঘরবাড়ির ডেকরেশনে। স্বভাব, মনমানসিকতা…..জীবনযাপনের ধরন প্রকাশ পায়।”
কি করে প্রকাশ পায়, সেটা মুহূর্ত ঠিকঠাক বুঝলো না। তবুও মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ওহ্। তাহলে কি রঙটা বদলে ফেলবো? কি রঙ চাও তুমি?”
“আবার আমাকে জিজ্ঞেস করে! বাড়িটা আমার নাকি তোমার? তোমার বাড়ি তুমি তোমার পছন্দ মত সাজাবে।”
“আমার পছন্দ তো তুমি মোমো।”
থমকে গেল মম। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে মুহূর্তের নিষ্কলুষ চোখ দুটির দিকে। বুকের ভেতরে ভালোলাগার এক উষ্ণ শিহরণ খেলে গেল। অকারনেই গাল দুটোতে ছড়িয়ে পরলো লাল লালিমা।
“তোমার যেভাবে খুশি তুমি সাজাও। যে রং ইচ্ছে, সেই রঙেই রাঙিয়ে নাও। এসব আমি বুঝিনা। শুধু লাল রঙ ছাড়া যা ইচ্ছে করো। ওটা আমার পছন্দ না।”
“কেন?”
কৌতূহলবশত প্রশ্ন করলো মম। এবার মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালো। কিছুক্ষন নীরবে তাকিয়ে রইলো সে। একবার ভাবলো উত্তর দেবে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, মোমোটার জানার দরকার আছে। অতীত, বর্তমান সবটা মিলিয়েই সে। সে যা, সেটা থেকে ভিন্ন সে হতে পারবে না। আর না সে নিজের জীবনের কোন অংশকে আড়াল করে রাখতে চায়।
“শিনহোতে থাকাকালীন, আমাদের সেলের দেয়ালগুলো, র’ক্তের ছিটে জমে জমে লাল হয়ে থাকতো। তার উপর লাল রঙের নিয়ন বাতি জ্বালিয়ে রাখতো ওরা। লাল রঙ দেখলে আমার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়।”
শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক কন্ঠে জানালো সে। কিন্তু মমর মুখটা পাংশুটে বর্ণ ধারণ করলো। অস্বস্তিতে পরে গেল সে। এরকম উত্তর একদমই প্রত্যাশা করেনি মেয়েটা। চোখ সরিয়ে নিল সে, তাকিয়ে থাকতে পারলো না আর তার দিকে। একটু আগে যে হৃদয়ে ভালোলাগার সুখময় অনুভূতি দোলা দিয়ে গেছে, সেখানেই এখন তীক্ষ্ম একটা ব্যথার সঞ্চার হলো। মনে হচ্ছে যেন আচমকা একটা সূচ গেঁথে দেওয়া হয়েছে সেখানে। সামান্য নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। একটা কাঁপা কাঁপা শ্বাস টেনে নিয়ে চারপাশে তাকালো মম। জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে এনে মুহূর্তের একটা বাহু দুহাতে জড়িয়ে ধরে সে বললো,
“এটাও খারাপ লাগছে না। লাইটিং, ডেকোরেশন সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে। এটাই থাকুক আপাতত।”
আসলেই খারাপ লাগছে না। বরং খুব সুন্দর করেই সাজানো হয়েছে জায়গাটা। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার স্যালমন পিঙ্কের সাথে সাদা ও ক্রীম কালারের কম্বিনেশনে সাজিয়েছে পুরো বাড়িটা। সেই সাথে আছে বার্নিশ করা কাঠের ঝকঝকে তকতকে মেঝে। মর্ডান ফার্নিচার, কালার কম্বিনেশন, ব্রাইট লাইটেনিং সবটা মিলিয়ে আরামদায়ক, উষ্ণ একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর পুরোটাই একদম মমর মনমতো।
প্রথমদিনের পর আর মুহূর্তের বাড়িতে তেমন একটা আসেনি সে। সেই রাতে ওভাবে নিশ্চিন্তে মুহূর্তের পাশে ঘুমিয়ে গিয়ে কি লজ্জায় যে সে পরেছিল! যতই মুহূর্তের সাথে তার ভালো একটা বন্ডিং তৈরি হোক না কেন, একটা ছেলের পাশে কি করে এতটা সহজে, এতটা আরামে, এতটা নির্দ্বিধায় ঘুমিয়ে পরলো সে? নিজের অজান্তেই কতটা নিখাদ বিশ্বাস করে ফেলেছে সে ছেলেটাকে!
এসব চিন্তায় অস্বস্তি ঘিরে ধরেছিল মমকে। সত্যি বলতে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। স্কুল কলেজে ছেলে বন্ধু যে তার ছিল না, এমনটা নয়। কিন্তু কখনোই কারো সাথে সে এতটা সহজ হতে পারেনি, যতটা মুহূর্ত তার কাছে এসে গেছে।
এই যে! এখনো কি অবলীলায়, কোন সংকোচ ছাড়াই ওর হাত জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে! দূর থেকে দেখলে হয়ত ওদের বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু মনে হবে। কথাটা মাথায় আসতেই হাতটা ছেড়ে দিয়ে একটু সরে দাঁড়ালো মম। হচ্ছেটা কি তার? এরকম গায়ে পড়া স্বভাবের তো সে কখনোই ছিল না।
আড়চোখে একবার তাকালো সে মুহূর্তের দিকে। রোদের উজ্জ্বল আলোয় তার সোনালী চামড়া চকচক করছে। নিখুঁত গড়নের সুগঠিত পেশির উপর হাফ হাতার নীল টিশার্টটা টানটান হয়ে আছে। ফুলে ফেঁপে আছে হাতের মাংসপেশি। শার্টের উপর থেকেও পেটের মেদহীন পেশীরেখাগুলো একটু একটু বোঝা যাচ্ছে। কি যেন বলে ওগুলোকে? হ্যাঁ, অ্যাবস! এক সেকেন্ডের জন্যে সুতির ঐ পাতলা কাপড়টার উপর ভীষণ হিংসে হলো মমর। কি সৌভাগ্য! এত সুন্দর, নিখুঁতভাবে খোদাই করা মাংসপেশীর উপর লেপ্টে আছে! পরক্ষণেই বারকয়েক চোখের পলক ঝাপটে মাথা ঝাঁকালো মম। কি ভাবছে সে এসব!
“তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
মম একটা শুকনো ঢোক গিলে আবারো জোর করে একটা হাসি টেনে আনলো ঠোঁটে।
“কি?”
মুহূর্ত উত্তর দিল না। বরং মমর হাত ধরে ওকে দোতলায়, নিজের রুমটায় নিয়ে গেল। এখন আর রুমটা খালি নেই। রুমের ঠিক মাঝ বরাবর একটা বিশাল কিং সাইজের বেডের স্থান হয়েছে। তার দুপাশে দুটো স্ট্যান্ডিং ল্যাম্প সাজানো। বেডের একপাশে দেয়ালে ঝুলছে একটা বড় গোল আয়না। আয়নার সামনে চওড়া একটা ভ্যানিটি ডেস্ক। অন্যপাশে জায়গা হয়েছে একটা বড় তিন পার্টের আলমারির। বেডের সামনের দেয়ালে টিভি তো আগে থেকেই সেট করে রেখেছিল মুহূর্ত। সেটার নীচে এখন যোগ হয়েছে ক্যাবিনেট। তবে যে জিনিসটায় গিয়ে মমর চোখ আটকে গেল, সেটার দিকেই নির্দেশ করে মুহূর্ত বলে উঠলো,
“এটা তোমার গিফট।”
“আমার?”
মম হা করে তাকিয়ে রইলো জিনিসটার দিকে। মুহূর্তকে ফেলে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে গিয়ে সে ভালো করে দেখলো জিনিসটাকে। তারপর অবিশ্বাসের সুরে আওড়ালো,
“PS5!!!”
“তোমার ল্যাপটপ না গেম খেলতে গিয়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল? তাই এটা এনেছি। মানুষরা আমাকে বলেছে, এটা দিয়ে নাকি সবচেয়ে ভালো গেম খেলা যায়। নষ্ট হয়না সহজে।”
ঘাড়ের পেছনটা ম্যাসাজ করতে করতে জানালো মুহূর্ত। কিছুটা বিব্রত বোধ করছে সে। এই জিনিস মোমোটাকে উপহার দেবার ইচ্ছে তার খুব একটা ছিল না। কিন্তু দিয়েছে।
কারণ, বিগত কয়েক দিন যাবৎ মোমো তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। দেখা সাক্ষাৎ হলেও রাতে আর ঘোস্টের বাড়ি থেকে বের হয়নি সে। মুহূর্তও তাকে সময় দিয়েছে। কাছাকাছি থাকলেও সামনে যায়নি তেমন। বরং বুদ্ধি এঁটেছে, কি করলে মোমোটা নিজে থেকেই তার বাড়িতে আসবে। যেহেতু গেম খেলতে ভালোবাসে মেয়েটা, তাই প্রথমে ভেবেছিল গেম খেলার জন্য ভালো একটা নতুন ল্যাপটপ দেবে। কিন্তু ঘোস্টকে ভালো ল্যাপটপের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই, সে বলেছে, ল্যাপটপ নিয়ে সারাদিন তার বাড়িতেই পরে থাকবে পিচ্চিটা। তারচেয়ে ভালো হয় গেমিং কনসোল কিনে দিলে। গেমিং-এর জন্যে নাকি আলাদা সেট আপ পাওয়া যায়। সেই পরামর্শ মোতাবেকই এই PS5 সেট করেছে সে।
“মুহূর্ত!”
জোরে চিৎকার দিয়ে মাটি থেকে দুই ফুট উঁচুতে উঠে গেল মম। আঁতকে উঠলো মুহূর্ত। সেকেন্ডের মধ্যে কি হয়ে গেল বুঝলো না সে। মম লাফ দিয়ে সোজা এসে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো।
“ইউ আর দ্যা বেস্ট!”
কানের কাছে মোমোটার চিৎকারে চেহারা কুঁচকে গেল মুহূর্তের। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো তার ব্যাপারটা বুঝতে। লতার মত কোমল, নমনীয় দুটি হাত তার কাঁধে জড়িয়ে আছে। হালকা শরীরটা লেপ্টে আছে তার শরীরের সাথে। আনন্দে কাঁপতে থাকা সেই ভঙ্গুর শরীরটার উষ্ণ উপস্থিতি এত কাছ থেকে অনুভব করতে পেরে, স্থির হয়ে রইলো সে।
মোমোটা তাকে জড়িয়ে ধরেছে। একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কোন সংকোচ ছাড়া, কোন হিসেব ছাড়া, কোন দ্বন্দ্ব ছাড়া। মোমোটা শুধু খুশি হয়নি, খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে! অজান্তেই চেহারায় একটা প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠলো মুহূর্তের। কিন্তু হাসিটা খুব দ্রুতই অন্য একটা অনুভূতির কাছে হার মানতে শুরু করলো।
এত কাছ থেকে স্বজ্ঞানে মোমোকে সে কমই দেখেছে। মিষ্টি একটা সুবাস ভেসে আসছে মেয়েটার চুল থেকে। দ্রুত গতিতে চলছে তার শ্বাস প্রশ্বাস। উষ্ণ শরীরে আনন্দ উত্তেজনায় কাঁপন ধরেছে সামান্য। আলতো হাতে মোমোকে জড়িয়ে ধরে রাখলো সে। সময়টা যেন সেখানেই থমকে গেছে। তার পৃথিবীর সমস্তটা দখল করে নিয়েছে এই মেয়েটা। মুহূর্তের মনে হচ্ছে তার পুরো দুনিয়াটা এখন তার বাহুডোরে বন্দী।
অন্যদিকে মমরও হুশ ফিরলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। বুঝতে পারলো, খুশির অতিশয্যে আত্মহারা হয়ে কি করে ফেলেছে সে।
মোবাইলে গেম খেলার প্রতি ঝোঁক তার আগেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটা ঐ মোবাইল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। গেমিং কনসোলের কথা সে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি। তাই এরকম একটা অপ্রত্যাশিত উপহার পাবার আনন্দে বাঁধনহারা হয়ে পরেছে মেয়েটা।
খুশিটা তার এতটাই বেশি যে, কি করছে সেটা খেয়ালই করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে এলো সে। আর তখন হাত পা জমে বরফ হয়ে গেল তার। থমকে গেল মুখের হাসিটাও। খুব কাছাকাছি সে এখন মুহূর্তের। অস্বস্তিকর রকমের কাছাকাছি। এতটা কাছে যে মুহূর্তের হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন অনুভব করতে পারছে সে। লাবডাব শব্দ তুলে সেই স্পন্দনের উত্তর দিচ্ছে শরীরের বহিরাবরণ থেকে ইঞ্চি তিনেক গভীরে অবস্থিত তার হৃদপিন্ড। ক্ষণিকের জন্য আশেপাশের সবকিছু শূন্য হয়ে গেল। কোনকিছুর অস্তিত্ব টের পেল না মম। শুধু অনুভব করলো একই লয়ে, একই ছন্দ তুলে কম্পন সৃষ্টি করা দুটি হৃদয়ের আলাপন।
ঘোর থেকে নিজেকে এক ঝটকায় বের করে আনলো মম। হাতে পায়ে বল ফিরে পাবার পর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। আচমকা ছিটকে সরে এলো সে। যেন আগুনে হাত দিয়ে ফেলেছিল! গাল দুটোতে গোলাপী আভা ছড়িয়ে পরে তৎক্ষণাৎ। কান থেকে যেন গরম ধোঁয়া বের হবার উপক্রম। চোখ তুলে মুহূর্তের দিকে তাকাতে পারছে না সে।
“আমি… আম….”
কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারলো না মম। মনে হচ্ছে, গলায় কিছু একটা আটকে আছে। মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলো সে। দু হাত কচলাতে লাগলো অস্বস্তিতে। শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। এমন না যে এর আগে কখনো কাউকে জড়িয়ে ধরেনি সে। কিন্তু এই স্পর্শটা আলাদা। একদম আলাদা! এই কয়েক মিনিট সে শুধু একজন বন্ধুকে জড়িয়ে ধরেনি। অজান্তেই সে এমন একজনের কাছে চলে গেছে, যার উপস্থিতি ইদানীং তার দিনগুলোকে অন্যরকম করে দেয়। বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পরেছে। লজ্জা লাগছে, অস্বস্তিও হচ্ছে। তবে সেই লজ্জার আবরণে লুকিয়ে আছে এক অচেনা অনুভূতি। যাকে নাম দেওয়ার সাহস এখনো সে করতে পারেনি।
“আমার এখন যাওয়া উচিত।”
কোনমতে মিনমিনিয়ে বলে মুহূর্তকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো সে রুম থেকে। মুহূর্ত পিছু নিলো তার।
“এখনই চলে যাবে? এটা চালু করে দেখবে না?”
“পরে আরেকদিন দেখবো।”
পেছন ফিরে তার দিকে একবারের জন্যেও তাকালো না মম। একছুটে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে বাড়ির বাইরে চলে গেল সে। সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে রইলো মুহূর্ত। পিছু নিল না। যেতে দিল তাকে। ঠোঁটে একটা চওড়া হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে মুহূর্ত। মম যত দৌড়ে পালাচ্ছে, ততই প্রশস্ত হচ্ছে তার হাসিটা।
_______________________________________
“হেল্প!!!!!!”
আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো মমর গলা ফাটানো চিৎকার। মুহূর্তের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে বোনের বাড়ির উদ্দেশ্যে এগোতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে সে। বেখেয়ালে কখন যে রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছে, টেরই পায়নি। এলোমেলো পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে আচমকা তার পা আটকে যায় বন্য পশুদের জন্যে পাতা ছিটে ফাঁদে। সাথে সাথে তীব্র গতিতে উপরের দিকে উঠে গেছে দড়ির ফাঁস। আর তাতে ফেঁসে এখন গাছ থেকে উল্টো লটকে আছে মম। নিচের দিকে ঝুঁকে থাকা মাথাটা এলোমেলো চুলগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়েছে। সেগুলোর ফাঁক ফোকর দিয়ে পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করছে সে।
একটু পরই কাউকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো মম। কিছুটা স্বস্তি পেল সে। তবে এগিয়ে আসা হাইব্রিডার্স ছেলেটাকে চিনতে পারলো না। একটা শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে প্রার্থনা করলো মম, ছেলেটা যেন তাকে সাহায্য করে। পাখি পইপই করে বারণ করেছে তাকে, সে যেন হাইব্রিডার্স জোনে অযথা ঘোরাঘুরি না করে। মানুষদের প্রবেশাধিকার নেই এখানে। তার উপর বনে আছে পশু পাখি ও হিংস্র জন্তুদের বাস। হাঁটতে হাঁটতে বিষাক্ত সাপগোপও সামনে পরে যেতে পারে। যতটা সম্ভব বন সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে কলোনী। বাড়িঘরগুলোর আশেপাশে বিশেষ কেমিক্যাল ও ট্র্যাপ ব্যবহার করা হয় অবাঞ্ছিত অতিথিদের আগমন ঠেকাতে।
কিন্তু মম এতকিছু মনে রাখেনি। এখন বিপদে পরে স্মরণ হচ্ছে তার সব সতর্ক বাণী।
“হেল্প!!!”
এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা সরু চোখে তাকালো তার দিকে। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সে গর্জে উঠলো,
“মানুষ!”
ছেলেটার প্রতিক্রিয়া খুব একটা সুবিধার লাগলো না মমর। তবুও সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো,
“জ্বি, আমি মানুষ। তবে এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে ভাইয়া…না, মানে… ভূত হয়ে যাবো।”
মমর কথা শুনে কপাল কুঁচকে রাখলো ছেলেটা। মম দেখলো সে চুপ করে দাঁড়িয়েই আছে। আর এদিকে তার মাথাটা ভারী ভারী লাগছে। চোখ জ্বালা করছে। উল্টো হয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে মমর। সে অনুরোধ করে বললো,
“প্লীজ! আমাকে বাঁচান! আমি ভুলে এখানে এসে পরেছি।”
“ভুলে কি করে এলে? এখানে ভুলে কোন মানুষ ঢুকে পরতে পারে না। আর ঢুকলে, তার মাশুল দিতে হয়।”
“সরি! আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলাম, পথ হারিয়ে এদিকে এসে পরেছি।”
“মিথ্যে বলছো তুমি। এখানে কোন মানুষের বাড়ি নেই।”
ছেলেটা রেগে যাচ্ছে। ধারালো দাঁতগুলো দেখিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছে। সেটা দেখে ভয় পেল মম। এই পরিস্থিতিতে ছেলেটাকে রাগানো তার জন্যে মোটেও ভালো হবে না। কি বললে ছেলেটা তাকে ছেড়ে দেবে ভাবছিল মম, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কোমল মেয়েলি কণ্ঠের ডাক শুনতে পেল সে।
“রঙ্গন? কে আছে ওখানে?”
পেছনে ঘুরে তাকালো ছেলেটা। চেহারার কাঠিন্যতা হারিয়ে গেল। একটা মেয়েকে এগিয়ে এসে ছেলেটার পাশে দাঁড়াতে দেখলো মম। ফ্লোরাল ড্রেস ও বড় একটা সান হ্যাট পরে আছে মেয়েটা। চুলগুলো রোদের সোনালী আলোয় সত্যিকারের স্বর্ণের মত চিকচিক করছে। হাতে একটা বাঁশের তৈরি ঝুড়ি ধরে রেখেছে হাইব্রিডার্স মেয়েটা।
“এটা তো মানুষের মেয়ে!”
মমকে ভালো করে দেখে নিয়ে বিস্ময়ের সুরে বললো সে।
“প্লীজ! হেল্প! আমাকে নামান প্লীজ!”
“তুমি কে? এখানে কি করছো?”
“আগে নামান, তারপর বলছি।”
“মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে ওর কষ্ট হচ্ছে। ওকে নামিয়ে দাও, রঙ্গন।”
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে পাশের ছেলেটাকে বললো মেয়েটা। রঙ্গন একটা চাপা গর্জন ছাড়লো সেটা শুনে। কিন্তু মেয়েটার কথা সে ফেলতে পারলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মমর পায়ে জড়িয়ে থাকা দড়িটা ছুরির সাহায্যে কেটে ফেললো সে। ধপাস করে শক্ত মাটিতে লুটিয়ে পরলো মম। কপাল ভালো, ঘাড়টা মটকে যায়নি। দড়ি কেটে গজগজ করতে লাগলো রঙ্গন।
“ন্যায়ের খবর আছে আজ। সব মানুষের বাচ্চাগুলোকে এনে ঢুকাচ্ছে হাইব্রিডার্স জোনে!”
হাইব্রিডার্স মেয়েটা এগিয়ে এসে মমকে উঠে বসতে সাহায্য করলো। সেটা দেখে ধমকে উঠলো রঙ্গন,
“কাছে যেও না, তুলি!”
কিন্তু মেয়েটা সে কথা কানে তুললো না। মমকে সোজা করে বসিয়ে হাতের ঝুড়িটা থেকে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“পানি খাবে?”
মম ঘাড়টা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে মাথা নেড়ে বোতলটা হাতে নিল। ছিপি খুলে আধা বোতল পানি ঢকঢক করে গিলে মুখ মুছলো সে।
“ধন্যবাদ।”
“কে তুমি? এখানে কি করছো মেয়ে?”
পানির বোতলটা পুনরায় নিজের ফলের ঝুড়িতে রেখে জিজ্ঞেস করলো তুলি।
“আমি মম, পাখি আপুর ছোটবোন। ঐ যে ঘোস্ট ভাইয়া, উনি আমার ভাইয়া। আমি ওদের সাথেই থাকি।”
ভীত সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে দুজনকে দেখছে মম। ছেলেটা এখনো অসন্তোষ নিয়ে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেয়েটা মমর কথা শুনে কিছু একটা ভেবে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো,
“মম? মোমো? মুহূর্তের মোমো তুমি?”
“হ্যাঁ?”
মেয়েটার কথা শুনে বেকুব বনে গেল মম। নিজের এমন পরিচয় শুনে, নিজেই অবাক সে। তবে মেয়েটার মুখে ফুটে উঠেছে হাসি। সে খুশি হয়ে ছেলেটাকে বললো,
“আমি শুনেছি ওর কথা। মুহূর্তের অংশী ও।”
কথাটা শুনে মনে হলোনা ছেলেটা বেশি একটা আশ্বস্ত হতে পারলো। কিন্তু মম প্রচন্ড বিভ্রান্ত হলো। বিভ্রান্তিতে চেহারায় ভাঁজ পরলো তার। মুহূর্তের সাথে তার নাম কবে এমনভাবে জড়িয়ে গেল যে, অচেনা অজানা হাইব্রিডার্সরাও তাকে ওর বলে চেনে? হতবিহ্বল হয়ে সে জানতে চাইলো,
“আমি মুহূর্তের কি?”
***
চলবে…
