#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_২০
“তুমি এখানে কি করছো?”
কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে মমকে প্রশ্ন করলো ঘোস্ট।
সবে বাড়িতে ফিরেছে সে। পাখি এখনো ফেরেনি অফিস থেকে। বাড়িতে ঢোকার আগেই দূর থেকে বিদঘুটে গন্ধ পায় ঘোস্ট। ভেতরে অনাকাঙ্খিত কিছু হবার আশংকায় ছিল সে। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পেয়েছে শুধু মমকে। রান্নাঘরে কি যেন করছে সে। বিচ্ছিরি গন্ধটা এখান থেকেই আসছে।
ঘোস্টের প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে মম পাল্টা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“রান্নাঘরে মানুষ কি করে?”
“তোমাকে কে বলেছে রান্না করতে? বের হও।”
রুক্ষ স্বরে আদেশ দিল ঘোস্ট। তবে সেটা গায়ে মাখলো না মম। কড়াইয়ে তেল ঢেলে কিছু একটা ভাজতে ভাজতে সে বিরক্তির সহিত বলে উঠলো,
“বের হবো কেন? কাজ করছি চোখে দেখেন না!”
“আমার রান্নাঘরে তোমার কাজ করার অনুমতি নেই। বের হও।”
“আপনার একার রান্নাঘর নাকি, আমার বোনেরও। যাবো না আমি। আজকে রান্না আমিই করবো।”
গরম তেল জড়ানো স্লটেড চামচটা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে নেড়ে ঘোস্টের কথাকে উড়িয়ে দিল সে। কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে ঘোস্ট দেখলো কয়েক ফোঁটা তেল উড়ে এসে পরেছে কিচেনের চকচকে মেঝেতে। সে যখন সেদিকে তাকিয়ে আছে, তখন ঘুরে কিচেন কাউন্টারের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে মম আবারো বলে উঠলো,
“এন্ড বাই দ্যা ওয়ে, আপনার অনুমতি লাগবে নাকি আমার? কে আপনি যে অনুমতি নেব?”
“আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছো তুমি।”
বুকে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে বললো ঘোস্ট। এখনো সেই বিচ্ছিরি গন্ধটা প্রচণ্ড রেশে এসে অত্যাচার করছে তার নাকের উপর। রান্নার নামে কি করছে এই মেয়ে কে জানে!
“ওহ্! তাই বুঝি?” এক ভ্রু উঁচু করে বিদ্রুপ মেশানো কণ্ঠে মম বললো,
“দেখি দেখি আরেকবার বলেন তো! আপুকে জিজ্ঞেস করবো?”
উত্তরে কিছু বললো না ঘোস্ট। চোয়াল চেপে তাকিয়ে রইলো সে। এ কয়দিনে এই মেয়েকে ঠিক চিনে গেছে সে। এখন কিছু বললে, সত্যি সত্যিই গিয়ে মনমত বানিয়ে বানিয়ে পাখির কাছে বিচার দেবে।
ঘোস্টকে নিরুত্তর দেখে, মম স্টোভের দিকে ঘুরে গিয়ে ভাজাভাজি করতে করতে বিড়বিড় করলো,
“বাড়িতে পুরুষ মানুষ থাকে কতক্ষন? বাড়িঘর যত্নে আগলে রাখে মেয়েরা। তাই বাড়ি পুরুষদের না, মেয়েদের হয়। আপনারা সব ভাড়াটিয়া। মালকিন রেগে গেলে, সোফায় ঘুমাতে হয় যাদের, তারা আবার আসছে বাড়ির মালিক সাজতে!”
কথাগুলো কানে এসে ঠেকলেও আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলো না ঘোস্ট। দুর্গন্ধের কারণে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা দায়! সে সোজা হেঁটে চলে গেল নিজের রুমে।
মম সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে কুটিল হাসলো। এই চারদিনে সে এটা বুঝে গেছে যে, ভূত ভাইয়াটা দুনিয়াতে কোন কিছুতে পাত্তা না দিলেও, নিজের বউয়ের মন জুগিয়ে চলতে জানে। পাখির নাম নিলে সে একদম সোজা হয়ে যায়, বাঁকা হাঁটার কোন সুযোগই নেই!
“কিরে মম? কি করিস?”
অফিস থেকে ফিরে কিচেনে মমকে দেখে জিজ্ঞেস করলো পাখি। ঘোস্ট তখন একটা মাস্ক পরে বেরিয়ে এসেছে। বসার ঘরের দেয়ালে লাগানো সিক্রেট প্যানেল খুলে কিছু একটা করছে সে।
“ভাবলাম তুমি টায়ার্ড হয়ে ফিরে প্রতিদিন রান্না করো, আজকে তোমাকে একটু রেস্ট দেই। আমি তো আর অন্যদের মত স্বার্থপর নই, যে বউকে কষ্ট দিয়ে রান্না করিয়ে মনের সুখে বাড়িঘরের দেয়াল খুঁড়ে বেড়াবো!”
শেষ কথাটা ঘোস্টকে শুনানোর জন্য জোরে জোরে বললো সে। যদিও জোরে না বললেও, শুনতে পেত সে। কিন্তু ঘোস্টকে দেখে বোঝার উপায় নেই সে কিছু শুনেছে। যেন মম নামক কোনকিছুর অস্তিত্বই নেই এখানে। সে নিজের কাজ সেরে আবার ফিরে গেল নিজের রুমে।
ঘোস্টের যাবার পথে দু সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পাখি এগিয়ে এসে মমর কান মুচড়ে ধরলো।
“ওহ্! আপু কি করছো? লাগছে তো!”
“শুধু শুধু তোর ভাইয়ার পেছনে লাগিস কেন? আর ও কি আমাকে সাহায্য করে না? সকালেও তো ওর হাতে বানানো নাস্তা গিলেছিস, পাজী মেয়ে।”
ঝাঁঝ বিহীন গলায়, চোখ রাঙিয়ে বললো পাখি। মমর কান ছেড়ে দিতেই সে ফিক করে হেসে উঠলো।
“খোঁচাতে মজা লাগে। ছোটবেলায় তো নাগালে পাইনি। তার উপর বেচারা বসে থাকতো হুইলচেয়ারে। পঙ্গু মানুষ ভেবে কিছু বলতাম না। এখন উসুল করছি।”
“পাল্টা ধুয়ে দিলে কেঁদে কুল পাবি? ডিম খাওয়া বন্ধ হয়েছে না? কেমন লাগে?”
দাঁত কেলিয়ে একটা নির্লজ্জ হাসি দিল মম শুধু।
“কি রান্না করেছিস, দেখি! শুঁটকির গন্ধ পাচ্ছি।”
কিচেন কাউন্টারে উকি দিয়ে পাখি দেখলো, একটা বাটিতে শুঁটকি ভর্তা করে রাখা। পাশে কুকারে ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি, আর একটা হাফ প্লেটে বেগুন ভাজা দেখা যাচ্ছে। চুলায় চড়ানো হাড়ি থেকে কষা মাংসের সুবাস ভেসে আসছে। তার পাশেই ফ্রাই হচ্ছে ইলিশের বড় বড় টুকরো। মমর আয়োজন দেখে চোখ কপালে উঠলো পাখির। সে চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে বললো,
“শুঁটকির ভর্তা! কতদিন পর চোখে দেখলাম মম!”
“হুম! এবার চেখেও দেখো।”
বলেই কাউন্টারে রাখা ব্রেডের এক টুকরো ছিড়ে তাতে একটু ভর্তা মেখে পাখির মুখের সামনে ধরলো মম। পাখি টুপ করে বোনের হাত থেকে সেটা মুখে পুরে নিয়ে তৃপ্তির সহিত খেতে লাগলো। চোখ বন্ধ করে সময় নিয়ে সেটার স্বাদগ্রহণ শেষে সে জিজ্ঞেস করলো,
“শুঁটকি কোথায় পেলি?”
“তোমাদের স্টোরে ফোন করে বলেছিলাম। ওরা দিয়ে গেছে।”
মাথা নাড়লো পাখি। স্বর্গভূমিতে চাইলে বাঘের দুধও পাওয়া যায়। তাও আবার বিনে পয়সায়। তবে ফ্রি পায় শুধু হাইব্রিডার্সরা। ঘোস্টের সুবাদে পাখিও তার গৃহস্থলি ফ্রিতেই চালায়। বিলিয়নিয়ার হলে কি হবে, বাঙালি তো! যেখানে স্বামীর সুবাদে সব ফ্রিতে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে নিজের নামের খাতা খুলে রাখার মানে আছে!
“ভালো করেছিস। এবার তুই গিয়ে বস, আমি টেবিল গুছিয়ে ফেলি।”
“আরে না, তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। আর তোমার প্রাণনাথকেও ডেকে নিয়ে এসো। শুঁটকি দেখে যেভাবে নাক মুখ কুচকে গেছে, মনে হয়না নিজ থেকে এদিকে ভিড়বে।”
পাখিকে কিচেন থেকে ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বললো মম। সে কথায় হেসে উঠলো পাখি।
“প্রাণনাথ?!”
“ঐ আরকি!”
পাখিকে পাঠিয়ে টেবিলে সব একে একে সাজাতে লাগলো মম। গত চারদিন ধরে শুয়ে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে সে। তাই আজ শখের বসে এই ছোট্ট আয়োজন। টেবিলে সবকিছু গুছিয়ে রেখে একা হাতে কিচেনটাও পরিষ্কার করে ফেললো সে। শুধু শুধু আবার এই খাটুনি পাখিকে দেওয়ার মানে হয় না। কাজ শেষে নিজেও হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে গেল সে।
কিছুক্ষন পর বেরিয়ে এসে সে বসে পরলো পাখির পাশে। ঘোস্টকে দেখে মনে হচ্ছে সে যথাসম্ভব নাক বন্ধ রেখে শ্বাস নেবার চেষ্টা করছে। শুঁটকির বাটিটা ঠিক তার সামনে। ইচ্ছে করেই সেখানে রেখেছে মম। পাখি প্লেটে খিচুড়ি পরিবেশনের পর, মম মুচকি হেসে বললো,
“ভাইয়া, একটু শুঁটকি খেয়ে দেখেন না! সত্যি বলছি, খিচুড়ির সাথে ঝাল ঝাল, লাল লাল শুঁটকি ভর্তার মজাই আলাদা।”
ঘোস্ট পুরো পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো তার দিকে। বাঁ চোখের কোণটা সামান্য কেঁপে উঠলো তার। এ ছাড়া অন্য কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। পাখি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শুধু।
“শুঁটকি কিভাবে প্রসেস করে জানো?”
শান্ত শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো ঘোস্ট। তার মেমোরিতে ইতিমধ্যে ইনফর্মেশন ডাউনলোড শুরু হয়ে গেছে। তবে মম ঘাবড়ালো না। উল্টো বত্রিশ পাটি দাঁত দেখিয়ে প্রশস্ত হেসে জানালো,
“না। আপনি চাইলে জানাতেই পারেন। তবে তার আগে জেনে বুঝে নিন, এটা কিন্তু আমার চেয়ে বেশি আপনার ওয়াইফের প্রিয় একটা খাবার।”
আড়চোখে তাকালো ঘোস্ট পাখির দিকে। পাখি কাতর চোখে তার দিকে ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে। দু তিনবার অযথা চোখের পলকও ফেললো সে। সেই দৃষ্টি এড়িয়ে আর শুঁটকি প্রসেসের বর্ণনাটা মুখে আনতে পারলো না ঘোস্ট।
সবটাই পাশ থেকে লক্ষ্য করলো মম। চেহারায় একটা ভিলেনি সুখ খেলে গেল তার। বাংলা সিনেমায় নায়িকাকে বাগে পেয়ে ভিলেনের চেহারায় যে পৈশাচিক আনন্দ দেখা যায়, ঠিক সেরকম!
“দেই একটু শুঁটকি?”
বাটি থেকে আঙুলের থাবায় একদলা শুঁটকির ভর্তা তুলে নিয়ে ঘোস্টের প্লেটের সামনে ধরলো মম। তখনই ভেসে এলো পাখির হুশিয়ারি।
“মম!”
“হুম?”
“চুপচাপ খা।”
_____________________________________
“ইশ! কি উস্কো খুস্কো অবস্থা চুলের!”
রাতের খাবার শেষে মমকে নিয়ে ছাদে এসেছে পাখি। সাথে নিয়ে এসেছে নারিকেল তেল। বহুদিন পর আজ আবার মমর চুল তেল দিয়ে যত্ন করে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে সে। ঠিক যেমনটা করতো ছোটবেলায়। পুরোনো দিনের কথা মনে পরতেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে মমর। কি সহজ ছিল সেই দিনগুলো! দিন দুনিয়ার কোন কিছুর পরোয়া ছিল না। ছিল না বাস্তবতার করাঘাত। কিন্তু এখন, প্রতিটি দিন যেন টেনে টেনে চলছে। জীবনটা কেমন যেন অদ্ভূত হয়ে গেছে। মমর মনে হয়, সে যেন পানিতে ভেসে আছে। কোনো দিকে সাঁতরে কুল কিনারা করতে পারছে না।
“ফিউচার নিয়ে কিছু ভেবেছিস মম?”
পাখির প্রশ্নে ধ্যান ভাঙলো মমর। একমনে ভাবনার জগতে ডুবে ছিল সে এতক্ষণ।
“হুম?”
“কি করবি আগে, ভেবেছিস?”
“আমি?”
মমর কণ্ঠে বিভ্রান্তি স্পষ্ট। এই বিভ্রান্তি কি উত্তর নিয়ে নাকি প্রশ্নটাই তার কাছে বিভ্রান্তিকর, সেটা বোঝা গেল না। পাখি আলতো হাতে মমর মাথায় ম্যাসেজ করতে করতে বললো,
“পরীক্ষার রেজাল্ট তো খুব একটা ভালো করতে পারিসনি। কিন্তু একটা রেজাল্টের জন্যে তো জীবন থেমে থাকবেনা, তাই না?”
“আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, অংকে এত খারাপ করলাম কি করে। সত্যি বলছি আপু।”
মন খারাপ করে বললো মম। সে যে গণিতে ডাব্বা মেরেছে, সেই খবরটা তাকে দিয়েছে ঝিনুক। ফোন করে আচ্ছামত ঝেড়েছে তাকে গতকাল। এটাও বলেছে যে, বাড়ির পুরোনো কাজের খালার ছেলের সাথে নাকি তাকে বিয়ে দিয়ে দেবে। ছেলে নাকি বিরাট ফকির। জ্বীন পালে দুই তিনটা। কেউ তার অবাধ্য হলে নাকি জ্বীনেরা নারাজ হয়। সোজা জুতো খুলে পেটায়। ঝিনুক মমকে বলেছে, সে যেন এখন থেকেই নম্র ভদ্র থাকার প্র্যাকটিস চালু করে। নইলে গিয়ে শ্বশুরবাড়ি, খেতে হবে জুতোর ঝাড়ি!
ঝিনুক ফোনটা রাখার পর পাক্কা তিন মিনিট স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল মম। না, ঝিনুকের কথা সে বিশ্বাস করেনি। সে জানে, নিজের স্ট্যাটাসের কথা ভেবে হলেও, যার তার সাথে মমকে বিয়ে দেবে না ঝিনুক। তবে স্তব্ধ সে ঝিনুকের ক্রিয়েটিভিটি দেখে। পিয়ন, পানের দোকানদার, ঠেলাগাড়ি ওয়ালা পর্যন্ত মম ভেবে রেখেছিল, কিন্তু জ্বীন পালা ফকির!
কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা আপনাকে চরমভাবে অপদস্ত করার পর, আবার হাসি ঠাট্টার ছলে সব স্বাভাবিক করতে চায়। ঝিনুক তাদেরই একজন। খুব কড়া ভাষায় কথা বলে, তারপর সুর নরম করে নেয় সে। কিন্তু এটা বোঝে না, মুখ থেকে একবার যে কথা বেরিয়ে গেছে, সেটাকে হাসির শব্দে নিস্তব্ধ করে দেওয়া যায় না।
“যেটা গেছে, সেটা নিয়ে এত ভেবে লাভ নেই। একটা পরীক্ষাই সব কিছু না। ঝিনুক তো দেখছে ব্যাপারটা। হতে পারে মার্কিংয়ে ভুল হয়েছে। আর যদি না হয়, তবে আগামীবছর আবার এক সাবজেক্টের পরীক্ষা দিবি।”
ভালো করে গোড়া থেকে চুলগুলো টেনে দিতে দিতে জানালো পাখি। আরামে চোখ বুজে আসতে চাইছে মমর। কিন্তু এত সিরিয়াস টপিকের মাঝে আর সেটা সে করতে পারলো না।
“কিন্তু তুই নিজের লাইফে কি করতে চাস, সেটা তোকে এখন থেকেই ভাবতে হবে। আমি কি বললাম, বা ঝিনুক কি বললো, তাতে কিছু আসে যায় না। তুই কি করতে চাস আগামীতে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্দেশ্যহীন নৌকা কোন তীরে স্থির থাকতে পারে না। বাতাসের তোড়ে এদিক ওদিক দুলতে থাকে শুধু। নিজের জন্যে একটা লক্ষ্য স্থির কর। নিজেকে প্রশ্ন কর, আজ থেকে পাঁচ বা দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাস, কি রূপে দেখতে চাস।”
“আমি তো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখি না আপু। আমি কি ভবিষ্যতে কানা হয়ে যাবো?”
গম্ভীর কথার বিপরীতে মমর হেঁয়ালিপূর্ণ উত্তর শুনে ওর চুল জোরে টেনে দিল পাখি। ব্যথায় শব্দ করে উঠলো মম।
“সবসময় শুধু ফাজলামো! এক কাজ কর, কমেডিয়ান হয়ে যা তুই। জোকার সেজে ঘুরে বেড়াস তারপর।”
“আইডিয়া কিন্তু খারাপ না।”
নির্মল হেসে বলে উঠলো মম। সেই সংক্রামক হাসি ছুঁয়ে গেল পাখির হৃদয়। তার নিজের ঠোঁটের কোণেও জায়গা করে নিল সে হাসির রেশ।
“কথাটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবিস। এখনই উত্তর জানতে হবে না। সময় আছে হাতে।”
মাথা নেড়ে সায় জানালো মম। মাথা ম্যাসাজ করা শেষে চুল আঁচড়ে বেনুনি বেঁধে দিল পাখি।
“বাবাকে খুব মনে পড়ে আপু।”
মৃদু শব্দে বলে উঠলো মম। পাখির হাত এক সেকেন্ডের জন্যে থেমে গেলেও, পুনরায় কাজ চালু রেখে সে শুধালো,
“বাবা খুব শীঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবে, দেখিস। চিন্তার কোন কারন নেই। আমি আছি তো!”
“তুমি আছো বলেই তো কোন চিন্তা করিনা।” পাখির হাত দুটো দু কাঁধের পাশ থেকে ধরে বললো মম।
“আমার কি ইচ্ছে, জানো? সারাজীবন তুমি এভাবেই আমার পাশে থাকো। যেন কখনো আমাকে কোন চিন্তা করতে না হয়।”
“সেটা কিন্তু সম্ভব। তুই ঐ জ্বীনওয়ালা ছেলেটাকে বিয়ে করে নে। জ্বিনের পিঠে চড়ে যখন তখন ভূতের বাড়িতে এসে পরতে পারবি।”
গম্ভীর মুখাবয়ব নিয়ে বলা পাখির কথাটা বুঝতে একটু সময় লাগলো মমর। কিন্তু যখন বুঝতে পারলো, তখন চোখজোড়া সরু হয়ে এলো তার। এক অংকে কি ফেল করলো, বোনরা তার জীবনের গাণিতিক উপপাদ্য নিয়েই মজা শুরু করে দিয়েছে!
মমকে চোখ সরু করতে দেখে ফিক করে হেসে উঠলো পাখি। মম তাকে কিছু বলার আগেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটার দিকে চোখ গেল।
“তুমি থাকো তোমার ভূতের সাথে, আমি ঘুমাতে গেলাম।”
বলেই উঠে সোজা হাঁটা দিল সে।
মম চলে যাওয়ার পর পাখির পাশে এসে বসলো ঘোস্ট। মাটিতে মাদুর বিছিয়ে বসেছিল দুই বোন। ঘোস্ট এসে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দু পা ছড়িয়ে বসলো। চুলের কাটা খুলে সেগুলোকে স্বাধীনতা দিয়ে দিল পাখি। বাতাসের কোমল স্পর্শে উড়তে লাগলো তারা। এক গুচ্ছ চুল এসে পড়লো তার চোখের উপর। ঘোস্টের চোখে উষ্ণতা। সেই এক গুচ্ছ চুল, হাত বাড়িয়ে দু আঙুলের মাঝে বন্দী করে নিল সে। তারপর চিরচেনা নিপুণতার সাথে ঘুরিয়ে এনে পাখির কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার আঙুলজোড়া নামিয়ে আনার পথে ছুঁয়ে দিলো পাখির চোয়াল ও গলার অংশবিশেষ। ঈষৎ শিউরে উঠলো পাখি শিহরণে। চোখজোড়া খুঁজে নিল সুখানুভূতির উৎস। সচরাচর নিস্প্রভ থাকা দুই ভিন্ন রঙের চোখগুলো চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে।
“পিচ্চিটার এত যত্ন। আর আমি যে আছি, সেদিকে ঘুরেও তাকাওনি তুমি।”
অভিযোগের সুরে বললো ঘোস্ট। ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো পাখি। দুষ্টুমির ছলে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন? হিংসে হচ্ছিলো তোমার?”
“হ্যাঁ। মন চাইছিল ওকে তুলে ছাদ থেকে ফেলে দেই।”
ঘোস্টের এমন সোজা সাপটা উত্তর শুনে শুকনো কাশি শুরু হয়ে গেল পাখির। শান্ত না হওয়া অবধি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল ঘোস্ট। কাশি থামলে পাখি চোখজোড়া সরু করে তাকালো তার দিকে।
“এত হিংসুটে কেন তুমি? ছোটবোন হয় ও আমার। সেই সুবাদে তোমারও বোন। বোনকে নিয়ে হিংসে করতে নেই।”
পাখির বাম হাতটা টেনে এনে আলতো করে চেপে ধরলো সে নিজের প্রশস্ত বক্ষের বাম পাশে। নিজের হাতের নীচে অনুভব করতে পারল পাখি তার হৃদস্পন্দন। শার্টের উপর থেকেও উষ্ণ চামড়ার স্পর্শ ছুঁয়ে দিলো মেয়েটাকে। ধীরে ধীরে সেই উষ্ণতা ছড়িয়ে পরতে লাগলো তার সর্বাঙ্গে। পাখির দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে সে বললো,
“তুমি ছাড়া আর কি আছে আমার হিংসে করার মত?”
“ওহ্! থাকলে বুঝি আমাকে নিয়ে হিংসে করতে না আর?”
“থাকলেও করতাম। কারণ তোমার বিকল্প নেই। পৃথিবীর সবকিছুর ভাগ দেওয়া গেলেও, তোমার ভাগ আমি দিতে পারবো না, আর না তোমার ভাগেরটা দিতে পারবো, সুকন্যা।”
তার এই একটা স্বীকারক্তিতেই নিরস্ত্র হয়ে গেল পাখি। ঠোঁটের কোণে দেখা দিল সুখের আভাস। আরেকটু এগিয়ে এসে শেষ ইঞ্চিখানেক দূরত্বও মিটিয়ে দিল ঘোস্ট। দুজনার নিঃশ্বাস মিলেমিশে একাকার। যেখানে বোঝা দায় শুরুটা কোথায়, বা শেষটাই কোথায়। পাখির অবাধ্য হাতটা এলোমেলো বিচরণ করতে লাগলো তার বুকের জমিনে। ঘোস্ট এক হাতে সাহায্য করলো তাকে। শার্টের বোতামগুলো ছুটে এলো একে একে। অন্য হাতটা পাখির ঘাড়ের পেছনে ঠেকিয়ে, তাকে ধীরে ধীরে ছাদের শক্ত মেঝেতে নামিয়ে আনলো সে। অসাবধানতায় ধাক্কা লেগে নারকেল তেলের বোতলটা উল্টে পরে গড়াগড়ি খেতে লাগলো পাশে। মুখ তুলে সেটার দিকে একপলক তাকালো ঘোস্ট। ক্ষণিকের নিস্তার পেয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে পাখি।
“তুমি দেখি ব্যবস্থা নিয়েই এসেছো।”
ঘোরের মাঝে ঘোস্টের মৃদু স্বরের কথাটার মর্মার্থ ধরতে পারলো না পাখি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি নিয়ে ঘোস্ট বললো,
“এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট ওয়েল। শতভাগ পিওর এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল। ত্বকের শুষ্কতা কমায়, মসৃণতা দেয় এবং ত্বককে রাখে ময়েশ্চারাইজিং।”
ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে রক্তচলাচল সচল হলো পাখির। সেই সাথে নারকেল তেলের গুণাবলীও বুঝলো। গালদুটো তৎক্ষণাৎ আপেলের মত লাল হয়ে উঠলো তার। ঘোস্টের শার্ট দুহাতে খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকালো পাখি। উপর থেকে লোকটার হাসির শব্দ কানে এলো। সেই কম্পনে আন্দোলিত হলো পাখির হৃদয়। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখলেও, মনটা নেচে উঠলো তার সেই সুমধুর শব্দে।
কিন্তু তখনই নিচ থেকে ভেসে এলো বিকট এক আওয়াজ। সাথে সাথে ঘোস্টের বুক থেকে মুখ সরিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো পাখি।
“কিসের যেন শব্দ শুনলাম?”
শব্দটা ঘোস্টের কানেও ঢুকেছে। তবে মোটামুটি তার ধারণা আছে, কিসের শব্দ হতে পারে সেটা। সুযোগ পেয়ে যে খরগোশের বাচ্চার খোঁজে তার ঘরে আস্ত একটা জলহস্তী ঢুকেছে, সেটা সে বুঝতে পারলো। তবে সেটা প্রকাশ না করে, সে মাথা নুইয়ে পাখির গলায় নাক ঘষতে ঘষতে বললো,
“আমার হৃদস্পন্দনের শব্দ সুকন্যা। দেখ, কি জোরে জোরে কাপছে তোমার সান্নিধ্যের আশায়।”
পাখির কপাল তবুও কুচকে রইলো। দুহাতে ঘোস্টকে ঠেলে সরিয়ে সে বলে উঠলো,
“চোর ঢুকলো না তো আবার?”
“স্বর্গভূমিতে চোর আসবে কোথা থেকে সুকন্যা?”
“তাহলে? মম আবার পড়ে টরে গেল না তো? যা বেখেয়ালি মেয়ে!”
বলেই ঘোস্টের নিচ থেকে সুরুৎ করে বেরিয়ে ছুটলো সে সিঁড়ির দিকে। নারকেল তেল নিয়ে মাটিতে পরে রইলো ঘোস্ট। মাটিতে একবার মাথা ঠুকলো সে। বিরক্তির সহিত দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“পিচ্চিটাকে এবার সত্যি সত্যিই ছাদ থেকে ফেলে দেব আমি পাখি!”
***
চলবে…
