Saturday, June 27, 2026







শরতের কাশফুল পর্ব-১৯

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_১৯

শীষ বাজাতে বাজাতে কম্পাউন্ডে ঢুকলো মুহূর্ত। তাও আবার ঘোস্টের জিপে।

গতরাতে বড়জোর ঘন্টাখানেকের জন্যে ঘুমিয়েছে সে। তবে সেটাই ছিল তার এ যাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ ঘুম। না কোন দুঃস্বপ্ন, না কোন ক্লান্তি, না কোন মলিনতা। কিচ্ছু স্পর্শ করতে পারেনি তাকে। মোমোর মিষ্টি ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রাত পার করেছে সে। আগের রাতেও মমর হাসপাতালের বেডের পাশে নির্ঘুম রজনী কেটেছিল তার। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ তার কাঁধের কাছটায় মাথা রেখে, তাকে কোলবালিশের মত জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে মম। মেয়েটার প্রতিটি নিয়ন্ত্রিত নিঃশ্বাসের সাথে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেছে তার বুকে।

সকালে ঘুমন্ত মমকে সাবধানে কোলে তুলে ঘোস্টের বাড়ির দিকে পা বাড়ায় সে। তখনও আকাশে পুরোপুরি ভোরের আলো ছড়িয়ে পরেনি। একবার ঘুমিয়ে পরলে আর দিন দুনিয়ার খবর থাকে না মমর। নড়াচড়ায় সে শুধু একবার বিরক্তিসূচক ‘উম্’ শব্দ করে ওঠে। মুহূর্তের খুব ইচ্ছে করছিল তখন আহ্লাদে মোমোটার কপালে আলতো করে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে নেয় সে। মনকে বোঝায়, একসাথে এত লোভ করা ভালো না!

দরজা পর্যন্ত পৌঁছাবার আগেই ঘোস্ট সদর দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিল। তাকে দেখে দাঁত বের করে একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পরে মুহূর্ত। ঘোস্ট শুধু বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে দেখে। বিরক্তি কিংবা রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় না তার শূন্য শীতল যান্ত্রিক দৃষ্টিতে। মমকে ওর রুমে রেখে ঘোস্টের সাথেই বেরিয়ে আসে মুহূর্ত। দুজনে রওনা দেয় জীমের উদ্দেশ্যে। দিনের এই সময়টা সব হাইব্রিডার্সদের বরাদ্দ থাকে ট্রেনিংয়ের জন্যে। নিজেদের পশুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর পরিশ্রমের শুরুটা হয় এখানেই।

ট্রেনিং শেষে বলতে গেলে অনেকটা বগলদাবা করে ঘুরছে সে ঘোস্টকে নিয়ে। উদ্দেশ্য, তাকে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে দেবে না। অন্যান্য দিনে প্রায়শই জীমে ঘাম ঝরিয়ে বাড়ি ফিরে যায় ঘোস্ট। ততক্ষণে পাখিরও ঘুম ভেঙে যায়। কর্মস্থলে যাবার আগে, সকালের এই সময়টা দুজনের কাটে দুষ্ট মিষ্টি অভিসারে। তবে আজকের চিত্র ভিন্ন। আজ মুহূর্তের মোমোটা আছে সেখানে। ঘোস্ট নিজের ঘর্মাক্ত পেশীবহুল শরীরটা প্রদর্শন করবে তার মোমোটার সামনে! এ তো হতে দেওয়া যায় না। হতে দেবে না মুহূর্ত!

জিমের লাগোয়া ওয়াশরুমেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসেছে দুজন। ঘোস্টের জিপে চড়ে চলে এসেছে এরপর ন্যায়ের অফিসে। এই এরিয়াটায় নতুন সিকিউরিটি রুম, কনফারেন্স রুম, আক্রোশের অফিসসহ HCO- এর অফিসারদের জন্য আলাদা ট্রেনিং গ্রাউন্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই এটাকে এখন বলা হয় কম্পাউন্ড।

আটটা বাজতে চলেছে ঘড়িতে। দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে হাইব্রিডার্সদের মাঝে। স্বাধীন দাঁড়িয়ে আছে ন্যায়ের অফিসের সামনের খোলা বারান্দায়। হাতে একটা ফাইল। আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে সেটির দিকে। মুহূর্তের শীষ বাজানোর শব্দে কান খাড়া করে সেদিকে ফিরে তাকায় সে। ভ্রু জোড়া সামান্য কুচকে আসে তার। সংকেত হিসেবে মুখ থেকে বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ বের করার কৌশল জানা আছে হাইব্রিডার্সদের। তবে এরকম বিনা কারণে সুরেলা আওয়াজ বের করার কারণ বুঝতে পারল না সে। মুহূর্তের পিছু পিছু আসছে ঘোস্ট। থমথমে মুখে সে-ও তাকিয়ে আছে মুহূর্তের দিকে। দুই বন্ধুর গন্ধ নাকে এসে ঠেকার আগেই তাদের ভাবভঙ্গিতে স্বাধীন বুঝে গেল, একজনের খুশি তুঙ্গে, তো আরেকজনের বিরক্তি চাঙ্গে চড়ে আছে।

“মনে এত সুখ তোমার এলো কোথা থেকে?”

হাতের ফাইলটা বন্ধ করে মুহূর্তকে জিজ্ঞেস করলো স্বাধীন। উত্তরে চওড়া হেসে মুহূর্ত বললো,

“মনের মানুষ মনের কাছাকাছি থাকলে, খালি সুখ আর সুখ…..সেটা অবশ্য তুমি এখন বুঝবে না। ভবিষ্যতের একটা ছোট্ট ঝলক ধরতে পেরেছি, বুঝলে।”

এক ভ্রু উঁচু করে তাকালো স্বাধীন। এরপর ঘোস্টের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,

“আর তুমি? তোমার মনে এত দুঃখ এলো কোথা থেকে? তোমার মনের মানুষ তো তোমার মনের একেবারে যাকে বলে, ভেতরে ঢুকে থাকে। সুখ নেই কেন?”

প্রশ্ন শুনে প্রথমেই একটা চাপা গর্জন বের হলো ঘোস্টের গলা থেকে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে সে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

“কারণ আমার বাড়িতে একটা খরগোশের বাচ্চা ঘুরছে। আমার বউ ঐ বাচ্চাটাকে পারেনা কলিজার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে! আর এই হস্তিকায় ছেলেটা সেই বাচ্চাটাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে। পাখিটা আমার টের পেলে, কি হাল করবে ভাবতে পারছো?”

স্বাধীন কোন উত্তর দিল না। নাহ্! সে একদম ভাবতে পারছে না। একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ মানুষের চুল টেনে যেই মেয়ে মাথার ছাল অবধি তুলে আনতে পারে, যে কিনা জুতো মেরে নিজের চেয়ে তিনগুণ ওজনের এক হাইব্রিডার্সকে বেঁহুশ করে ফেলতে পারে, ঘোস্টের মত অনুভূতিহীন রোবটের সাথে যে অক্ষত অবস্থায় বাসরও সেরে ফেলতে সক্ষম, সে সুদূর ভবিষ্যতে মুহূর্তের কি হাল করতে পারে, একদমই ভাবতে পারছে না স্বাধীন।

স্বাধীন বারকয়েক অদলবদল করে তাকালো মুহূর্ত ও ঘোস্টের মাঝে। তারপর বিনা বাক্য ব্যয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করলো। পেছন পেছন এলো মুহূর্ত ও ঘোস্টও। করিডোরের মাঝামাঝি ন্যায়ের কেবিন। মিস সু বসেন বাইরের রিসেপশনে। এখন অবশ্য সেটা খালি পরে আছে। ছুটিতে আছেন উনি। নক করার বালাই নেই এখানে। দরজা ঠেলে সোজা ভেতরে ঢুকে গেল তিনজন। ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা টাইপ করছিল ন্যায়। ওদের দিকে ফিরে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করলো না সে। চোখে রিমলেস একটা চশমা পরে আছে ন্যায়। চোখের জ্যোতি তার অন্যান্য হাইব্রিডার্সদের মতই সুতীক্ষ্ণ। তবে ল্যাপটপের উজ্জ্বল আলো তার সেনসিটিভ চোখে চাপ সৃষ্টি করে। একটানা বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না সে স্ক্রিনের দিকে। সেজন্যে এই বিশেষ চশমা দিয়েছে তাকে ডক্টর মিলটন।

ল্যাপটপের পাশে একটা অর্ধেক খালি কফির মগ ও পত্রিকা রাখা। চুল থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পরছে ন্যায়ের। ভিজে গেছে সাদা শার্টের কাঁধের অংশবিশেষ। বোঝা যাচ্ছে, শাওয়ার সেরে সোজা এসে বসে গেছে সে ল্যাপটপের সামনে।

স্বাধীন ঢুকেই আগে ডেস্কের পাশের ক্যাবিনেট খুলে একটা চিপসের প্যাকেট বের করলো। সশব্দে প্যাকেট খুলে একদলা চিপস মুখে পুরে কড়মড় করে চিবুতে শুরু করলো সে। বিকট শোনালেও উপস্থিত বাকি তিনজন এই আওয়াজের সাথে বহুল পরিচিত। মানুষদের মধ্যে যেমন অনেকের বিড়ি, সিগারেট, পানের নেশা থাকে, স্বাধীনের তেমনি আছে চিপসের নেশা।

ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ার টেনে বসে পরেছে ঘোস্ট। আর অন্যটা ঠেলে দূরে সরিয়ে ডেস্কের কোণায় হেলান দিয়ে আধবসা হয়ে থামলো মুহূর্ত। ন্যায়ের সামনে থেকে পত্রিকাটা টেনে নিয়ে চোখ বুলালো সে সেটাতে। একটা তির্যক হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। পুরো স্বর্গভূমিতে এই একটাই চশমাওয়ালা পেপার পড়ুয়া হাইব্রিডার্স আছে। মুহূর্ত বুঝতে পারে না, মানুষদের দুনিয়াতে, কোন দেশ কার তেল নিয়ে টানাটানি করছে, নাকি কোন দেশের নেতা ম’রেছে, নাকি কার জমিতে পা’রমাণ’বিক শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, এসব জেনে তাদের লাভ কি?
এইযে! এই পেপারের একটা নিউজে বড় করে মার্কার দিয়ে গোল দাগ দিয়ে রেখেছে ন্যায়।

‘উত্তর কোরিয়ার সাথে পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট স্বাক্ষর করেছেন কানাডার মিলার কর্পরেশনের সিইও, মিস্টার এরিক মিলার।’

এই সংবাদ জেনে তাদের কি লাভ? এই প্রজেক্টের বিরোধিতা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংবাদ গুরুত্বপূর্ণ হলে তাদের জন্য হবে, হাইব্রিডার্সদের কি?

কাজ সমাপ্ত করে আড়মোড়া ভেঙে বসলো ন্যায়। ঘাড়টা এদিক ওদিক কাত করে গা ঝেড়ে কফিটা মুখে তুললো। চোখ সামনের দুই বন্ধুর দিকে পরতেই স্বাধীনের মত সে-ও আঁচ করতে পারলো তাদের ভিন্ন দুই মেজাজ। স্বাধীনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করতেই, সে উত্তরে জানালো,

“ঘরেলু সমস্যা। বাবুদের ঘর হয়েছে, তাই সেখানে সমস্যারও আনাগোনা দেখা দিচ্ছে। তোমার আমার মত এতিমদের এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর জো নেই।”

ঠোঁটের কোণে কৌতুকের রেখা ফুটে উঠলো ন্যায়ের। চোখ থেকে চশমাটা খুলে রেখে সে জিজ্ঞেস করলো,

“আক্রোশের কি খবর?”

“ডক্টর শ্রেয়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেছে ও একটু আগে।”

স্বাধীনের উত্তর শুনে একাধারে তিন জোড়া চোখের দৃষ্টি একসঙ্গে পতিত হলো তার উপর।

“আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম, লাভ হয়নি। ডক্টর শ্রেয়া এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ। এখন শুধু তার বিশ্রামের প্রয়োজন।”

কিছুটা বিরক্ত হলো ন্যায়। একে তো মেয়ে মানুষ, তার উপর ডাক্তার। তারও উপর একাধিকবার প্রকাশ্যে আক্রোশের আক্রোশের তোপে পরেছে মেয়েটা। মানা করা সত্ত্বেও ওর আশেপাশেই ঘুরতে হবে আক্রোশের? রাখবেও না, আবার ছাড়বেও না!

“আক্রোশের সমস্যাটা কি? ও আসলে কি চায়? প্রথমে মনে হয়েছিল, ও প্রতিশোধ নিতে চায়, মেরে ফেলতে চায় মেয়েটাকে। কিন্তু এখন….দিন দিন ওর আচরণ লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কি করবো ওকে নিয়ে আমি?”

“ওকে বিয়ে দিয়ে দাও।”

ঘুরে তাকালো ন্যায় মুহূর্তের দিকে। তার বিরক্তি নিয়ে বলা কথার বিপরীতে এরকম মন্তব্য একদমই আশা করেনি সে। স্বাধীন এবং ঘোস্টও তাকিয়ে আছে তার দিকে। তবে মুহূর্ত সে দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলো,

“আমাকেও বিয়ে দিয়ে দাও।”

এবারে হাসি পেল স্বাধীনের। তবে সেটা সে চেপে তাকালো ঘোস্টের দিকে। ঠিক! ঘোস্টের ভ্রু কুঁচকে এসেছে এখন।

“তুমিও একটা বিয়ে করে নাও। দেখবে চারদিকে সুখ আর সুখ!”

ভ্রূজোড়া কপালে উঠে গেল ন্যায়ের। বলে কী ছেলে! এখানে জান নিয়ে টানাটানি চলছে, আর সে এসেছে সুখের বার্তা নিয়ে। এত সুখ তার আসলো কোত্থেকে?

“ওকে নিষেধ করো ন্যায়। পাখি জানতে পারলে কান টেনে ছিঁড়ে নেবে। কান ছাড়া মুহূর্ত দেখতে একদম ভালো লাগবে না।”

যাও ন্যায়ের ভ্রু জোড়া কপাল ছেড়ে একটু নিচে নেমেছিল, ঘোস্টের থমথমে মুখের বুলি শুনে সেটা আরো এক ধাপ উঁচুতে উঠে গেল। পাখি মুহূর্তের কান টানবে কেন? ঘোস্টকে দেখে মনে হলোনা সে কৌতুকের মুডে আছে। তার গম্ভীর মুখ বলছে পাখি এমনটাই করবে। কিচ্ছুটি বুঝতে না পেরে, ন্যায় ঘুরে তাকালো স্বাধীনের দিকে।

“পাখির বোন মম, মুহূর্তের মোমো। মুহূর্তের দাবী মোমোটা তার অংশী। তবে টেস্ট করেনি এখনো।”

মুখটা এবার থমথমে হয়ে গেল ন্যায়েরও। সে ফিরে তাকালো মুহূর্তের দিকে। বেচারা পুরো দুনিয়াতে পাখির বোনকেই খুঁজে পেল শেষমেষ? আসন্ন ক্যাচালের আশংকায় জমে রইলো সে কিছুক্ষন। অতঃপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

“আগে টেস্ট করিয়ে এসো। পরে দেখা যাবে।”

মাথা নাড়লো মুহূর্ত। সম্মতি জ্ঞাপন করে জানালো,

“ডক্টর শ্রেয়া সুস্থ হয়ে নেক। ওনাকে দিয়েই করাবো। পাখির ভালো বন্ধু উনি। বোঝাতে সুবিধা হবে।”

ঘোস্টের সাথে একবার চোখাচোখি হয়ে গেল ন্যায়ের। মুহূর্তের কথা সত্যি হলে, এটা হবে স্বর্গভূমিতে অংশীবন্ড সিনড্রোমের তিন নম্বর কেস। সেক্ষেত্রে পাখির কিচিরমিচির কোন কাজে লাগবে না। স্বর্গভূমির নিয়ম অনুযায়ী কোন জুটি যদি অংশীবন্ডে আক্রান্ত হয়, তবে তাদের মাঝে তৃতীয় কারো কথা বলার সুযোগ নেই। ঘোস্ট নীরবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন মুহূর্তের দিকে। ছেলেটা এতটাও সরল নয়। ঘোস্ট খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে সে কি করতে চাইছে।

অংশীবন্ড একটা নিউরোলজিক্যাল রেসপন্স। মানব প্রেমের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও কিছু বিশেষ হরমোনের অতিমাত্রায় নিঃসরণের ফলে হাইব্রিডার্সরা কোন একজন নির্দিষ্ট পার্টনারের সাথে অংশীবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। তাদের মস্তিষ্ক ও কিছু বায়োকেমিক্যাল রিসেপ্টর স্থায়ীভাবে সংযুক্ত হয়ে যায় সেই পার্টনারের সাথে। গভীর এই সংযোগ স্থাপনে হাইব্রিডার্সরা খুব একটা সময় না নিলেও, মানুষদের শরীরে এটার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কিছুটা মন্থর গতিতে। অন্তত ঘোস্ট এবং পাখির ক্ষেত্রে সেটাই পরিলক্ষিত।
মুহূর্ত জানে, মমর ক্ষেত্রেও অংশীবন্ডের সিনড্রোম কাজ করতে সময় লাগবে। সেজন্যেই সে সময় নিচ্ছে। মমর কাছাকাছি থেকে বন্ডটাকে ভালোভাবে পাকাপোক্ত করছে। একবার মমর মাঝে বায়োলজিক্যাল রেসপন্স শুরু হয়ে গেলে, তাকে আর মুহূর্তের কাছ থেকে আলাদা করা যাবে না। ফেঁসে যাবে মম অনুভূতির জালে। তখন পাখি কেন, স্বয়ং মমরও সাধ্য হবেনা মুহূর্তের থেকে নিজেকে আলাদা রাখার। পৃথিবীর কোন বাধা, কোন দোহাই আর কাজে দেবে না তখন।

“বিয়ের কথায় মনে পরলো, লিওর অবস্থা ভালো না। ও হাওয়াইয়ের শোকে পাগল হবার পথে। চব্বিশ ঘন্টা পাহারায় রাখতে হচ্ছে ওকে।”

থমথমে মুখে জানালো স্বাধীন। সে রাতে বহু কষ্ট করে উদ্ধার করতে হয়েছিল হাওয়াইকে। লিও ওকে নিয়ে নিজের বাড়ির ভেতরে গেড়ে বসে ছিল। হাওয়াইকে দেখেও অবশ্য মনে হয়নি তার সেখান থেকে বেরোবার কোন তাড়া ছিল। কিন্তু তার মায়েরা তার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল।
হ্যাঁ, মা! হোস্টেলের মেয়েগুলোর আচরণে মনে হয়েছে তাদের ছোট্ট বাচ্চাকে কোন নরখাদক তুলে নিয়ে গেছে।

“হাওয়াই? মেয়েটা ঠিক আছে?”

শঙ্কা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো ন্যায়। উত্তরে কাঁধ ঝাকিয়ে স্বাধীন বললো,

“জানি না। ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আসার পর মেয়েরা আর আমাদের কিছু জানায়নি। লাভলীকে তো চেনোই। ধারে কাছে পেলে কামড়ে মাংস খুলে নেবে!”

লিওর জন্যে খারাপ লাগছে স্বাধীনের। শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে তাকে। নইলে কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে এখুনি পৌঁছে যাবে হাওয়াইয়ের কাছে। মেয়েটাকে মনে ধরেছে তার। একটু পরপর হুংকার ছেড়ে কেঁদে উঠছে সে হাওয়াইয়ের জন্যে। রেষ্ট্রিক্টেড জোনের অবস্থা জটিল। ওখানে থাকা হাইব্রিডার্সরা মানুষদের মত জটিল সম্পর্কের সমীকরণ বোঝে না। মেয়েটাকে লিও চায়, মানে মেয়েটা লিওর। সেক্ষেত্রে মেয়েটা যদি লিওকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে ভিন্ন কথা। কিন্তু লিওর অধিকার আছে মেয়েটাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার। রেস্ট্রিক্টেড জোনের অন্যান্য বাসিন্দারা লিওকে বেঁধে রাখার বিরুদ্ধে। ক্ষেপে উঠছে তারা। অবস্থা যেকোন সময় বিগড়ে যেতে পারে। স্বাধীন তাদের আশ্বস্ত করেছে, আজকের মধ্যে একটা সমাধান বের করবে।

সবটা শুনে কিছু একটা ভাবলো ন্যায়। এটা কি অংশীবন্ড? হতেও পারে। তবে সেটা প্রমাণ করার জন্যে আপাতত টেস্ট করানো সম্ভব নয়। লিও এবং হাওয়াই দুজনেই সেনসিটিভ। তাড়াহুড়ো করে কিছু করা যাবে না। ডেস্কে থাকা ওয়ারলেস ফোনটা তুলে একটা নম্বর ডায়াল করলো সে।

“আমার অফিসে এসো।”

ফোনটা আগের জায়গায় রেখে সে স্বাধীনকে কিছু পেপার ধরিয়ে দিয়ে বললো,

“সব কাউন্সিল মেম্বারদের নিয়ে একটা মিটিংয়ের ব্যবস্থা করো। এত সহজে যেখানে স্বর্গভূমিতে হামলা হতে পারে, সেখানে আমি আর হিউম্যান সিকিউরিটির উপর ভরসা রাখতে পারছি না।”

“তাহলে?”

পেপারগুলোতে নজর বোলায় স্বাধীন। চেক করে মুহূর্ত ও ঘোস্টের হাতে তুলে দিল সেখান থেকে কয়েকটা কাগজ। স্বর্গভূমির সিকিউরিটি এবং এরিয়া এক্সপেনশন নিয়ে কিছু প্ল্যান সাজাচ্ছে ন্যায়। এসব নিয়েই কিছুক্ষণ আলোচনা চললো তাদের মাঝে।

***

“ইউ লুক লাইক শিট!”

“আই ফিল ওর্স দেন দ্যাট।”

আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালেন স্বর্গভূমির ডিরেক্টর এবং HFT এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জনাব দেনিজ ইলকার। এককালে মার্কিন আর্মিতে থাকায় কঠোর অধ্যাবসায় জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। আর্মি থেকে অবসর নিয়েছেন এক যুগ পেরিয়েছে, তবে অভ্যাসগুলো বদলায়নি। বয়স পঞ্চাশ পেরোলেও এখনো ফুরফুরে শরীর তার। তবে দীর্ঘ ঘণ্টার পর ঘন্টা সময় চেয়ারে চিপকে থাকার দরুন এখন হাড়গোড় সব চেঁচামেচি শুরু করেছে।

“ওকে….”

সাবধানে টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা কাগজপত্রের স্তুপের মাঝখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা দখল করে পাখি ওয়ান টাইম কফির কাপটা রাখলো। কাগজে মোড়ানো একটা পরোটা সে এগিয়ে দিল দেনিজের দিকে। সকাল সকাল উঠে আজ পরোটা বানিয়েছে সে। মমকে নাস্তা করিয়ে বাড়িতে রেখে আসার সময় দেনিজের জন্যেও নিয়ে এসেছে। এত হট্টগোলের মাঝে দেনিজকে একা ফেলে পাক্কা পুরো একটা দিন গায়েব ছিল পাখি, সেটার উসুল তো করতে হয়।

“নো! ইটস অবসুলুটলি ইজ নট ওকে!”

পাখির হাত থেকে ছো মেরে পরোটাটা নিয়ে বলে উঠলেন দেনিজ।

“পুরো বাইশটা গোলাবা’রুদে ভর্তি ট্রাক! কমপক্ষে আশিজন আ’র্মড আত’তায়ী! দুইটা বড় আর্মি ট্যাংক! সবকিছু ত্রিশ মিনিটের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে!”

“তাহলে করো না বিশ্বাস।”

কাঁধ সামান্য ঝাকিয়ে হেঁয়ালি করে বললো পাখি। তবে তাতে আরো ক্ষেপে উঠলেন দেনিজ।

“এর পেছনে তোমার ঐ ভূতটার হাত আছে। আলবৎ আছে! পুরো ত্রিশ মিনিট সিগন্যাল জ্যাম করা ছিল স্বর্গভূমির। কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইস কাজ করছিল না। প্রতিটা ক্যামেরা অফ করে রেখেছিল। বিদ্যুৎ ছিলনা একটা ভবনেও! আমি সিকিউরিটি রুমে বসে বসে মশা মে’রেছি। অটোমেটিক ডোর আপনাআপনিই লক হয়ে গিয়েছিল। আর তুমি! তুমি ফোন বন্ধ করে বসেছিলে? এই সব একমাত্র তোমার স্বামীরই কাজ!”

দেনিজের অভিযোগ শুনে প্রথমে একটু মিইয়ে গেল পাখি। তবে পরক্ষণেই সে নিজেও তেজ দেখিয়ে বলে উঠলো,

“যত দোষ নন্দ ঘোষ, না?”

“নন্দ ঘোষ কে? আমি তো ঘোস্টের কথা বলছি।”

“আমিও সেটাই বলছি। মানলাম, ঘোস্ট পাওয়ার কাট করে, সিগন্যাল জ্যাম করে দিয়েছিল। কিন্তু ওকে কি তোমার হাল্ক মনে হয়? নাকি টলিউডের সুপারস্টার NTR, যে একা একা এতগুলো মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে, ইয়া বড় বড় অ’স্ত্রবাহী ট্রাক মাথায় তুলে আছাড় মেরে গায়েব করবে? শুধু শুধু আমার নিরীহ স্বামীটার পেছনে না লেগে, সাহস থাকলে ন্যায়ের পেট থেকে কথা বের করে দেখাও দেখি! সব নাটের গুরু ওটাই। ঘোস্ট যদি কিছু করেও থাকে, ন্যায়ের অর্ডার ছাড়া করেনি।”

“অনামিকা,”
নিজেকে কিছুটা শান্ত করে পাখির পাশের চেয়ারে ধপাস করে বসে পরলেন উনি।
“ব্যাপারটার মানে বুঝতে পারছো তুমি? হামলাকারীদের কি হলো, আই ডোন্ট কেয়ার! কিন্তু ঐ গোলাবা’রুদে ভর্তি ট্রাকগুলো? আর্মি ট্যাংক? এগুলো হাইব্রিডার্সদের কাছে মজুদ থাকাটা কতটা বিপজ্জনক, বুঝতে পারছো না?”

“রিলাক্স, দেনিজ। কি করবে ওরা সেগুলো দিয়ে? এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, স্বর্গভূমিকে আমরা সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। এক অন্ধকার রাতে আচমকা এত সহজে এত বড় স্কেলের হামলা! ভাবতে পারছো, যদি না নিউ ইয়ারের বন্ধ থাকতো, যদি আমাদের বেশিরভাগ এমপ্লয়ী ছুটি কাটাতে না গিয়ে এখানেই থাকতো, তাহলে কি ঘটতো?”

ব্যাপারটা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো পাখির। গ্রে’নেড হামলায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়নি। কিন্তু যা গেছে মালের উপর দিয়ে, জানের উপর আসেনি তেমন একটা। এটাই স্বস্তি।
একটু থেমে গম্ভীর মুখে পাখি বললো,

“আমি জানিনা রাতের অন্ধকারে ঐ ধোঁয়াশার ভেতরে কি হয়েছিল, কিন্তু আমি এটা জানি, যা হয়েছে, সেটা না হলে হয়ত আমি আমার বোন বা বেস্ট ফ্রেন্ডকে জীবিত দেখতে পেতাম না।”

চেহারার উপর হাত বুলিয়ে নিজের ক্লান্তি মুছে ফেলতে চাইলেন দেনিজ। এই হামলার পুরো দায়ভার এসে পরেছে তার কাঁধে। নিজেকে পুরোপুরি ব্যর্থ মনে হচ্ছে তার। ব্যর্থই তো! প্রথমে গুয়াংঝুতে হওয়া হামলা আর এখন স্বর্গভূমিতে। নিজের দায়িত্ব কোথাও পালন করতে পারেননি উনি।

“তোমার কথা ঠিক, আমি মানছি। কিন্তু অনামিকা, আমাদের কাজ শুধু হাইব্রিডার্সদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নয়, বরং মানবসমাজ ও হাইব্রিডার্সদের মধ্যে সমতা বজায় রাখাটাও আমাদের দায়িত্ব। ভেবে দেখো একবার, বেআইনীভাবে এত গোলাবা’রুদ মজুদ করে ওদের কি লাভ? কি প্রয়োজন? পৃথিবী এখনো হাইব্রিডার্সদের নিয়ে শঙ্কামুক্ত নয়। এমনিতেই ওদের নিয়ে গুজব আর আতঙ্কের শেষ নেই, সেখানে…”

“ন্যায়কে বোঝাও তাহলে। কথা বলো ওর সাথে, যেন অ’স্ত্রগুলো বাজেয়াপ্ত করতে দেয়।”

“বলেছিলাম। ও আমাকে বলেছে, ও এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। ওরা অল্প কয়েকজন নাকি হাইব্রিডার্স জোনের গেটের কাছে পাহারা দিচ্ছিলো শুধু। ডক্টর শ্রেয়া ও তোমার বোনকে সেখানে দেখে বাঁচিয়েছে, ব্যস! সেখানেই নাকি ছিল ওরা। হিউম্যান জোনে নাকি কেউ প্রবেশই করেনি! হামলাকারীরা কোথায়, ট্রাকগুলো কোথায় গেল, ও নাকি কিছুই জানে না।”

“সাউন্ডস লাইক হিম।”

মাথা নেড়ে বললো পাখি। চোখের দিকে তাকিয়ে পূর্ণ গাম্ভীর্যের সাথে সামনের জনকে গালগল্প গেলানো ন্যায়ের স্পেশালিটি।

“মাঝে মাঝে আমার ওকে খুব ভয় হয় অনামিকা।”

কথাটা ঠিক ধরতে পারলো না পাখি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন দেনিজ। কফির কাপটা হাতে নিয়ে লম্বা এক চুমুক বসালেন তাতে।

“ন্যায়!”

একটু থেমে গম্ভীর গলায় শুধলেন,

“ন্যায় আসলে কি? যাদের গোটা জীবনটা কেটেছে অন্ধকারময় পরীক্ষাগারে শেকলে বাঁধা আর্তনাদে, যারা মানুষ হয়ে জন্মানোর পরও নিজেদের মানুষ হিসেবে দাবী করার অধিকার পায়নি, যাদের ভেতরটাকে কেটেছিঁড়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে মানবকল্যাণের দোহাই দিয়ে, তাদেরকে ন্যায় ঠিক কিভাবে দেওয়া যায় বলতে পারো?”

চোখ নামিয়ে নিল পাখি। বুকটা ভার হয়ে আসে তার সে সময়টার কথা চিন্তা করলে। কি দুর্বিষহ, কি নির্মম নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে আছে ওরা!

“সবচেয়ে বড় কথা, ওদের কাছ থেকে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে তা কখনোই ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ? কয়দিনের সেটা? হাইব্রিডার্সদের কোন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আসবে না কখনো। তাহলে? বিভীষিকাময় অন্ধকার অতীত, ক্ষীণ সময়ের ভবিষ্যৎ, আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বর্তমান, এর মাঝে ন্যায় কোথায়?”

নীরবতা নেমে এলো পুরো কেবিন জুড়ে। এই প্রশ্নের আদো কি কোন ঠিকঠাক উত্তর আছে? আসলেই তো। ন্যায় কি? কোথায় পাওয়া যাবে ন্যায়?

“তুমি! তুমি কোন কাজের না দেনিজ ইলকার!”

কেবিনের দরজাটা বিকট শব্দে খুলে গেল। আর সেটা দিয়ে প্রবেশ করলো লাভলী। এখানে তার আগমন একদমই অপ্রত্যাশিত। দেনিজ এবং পাখি দুজনেই চমকে উঠলো তাকে দেখে। উপরন্তু লাভলীর ক্রদ্ধান্বিত বাণীর প্রেক্ষিতে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দেনিজ প্রশ্ন করলেন,

“এক্সকিউজ মি?”

“হ্যাঁ, ঐ এক এক্সকিউজই দিতে পারো তুমি! আর তোমার কাজ কি?”

“কাজ তো আমার অনেক আছে। কিন্তু তুমি বিশেষত কোন কাজটির দিকে ইঙ্গিত করছো লাভলী?”

“স্বর্গভূমির ডিরেক্টর না তুমি? স্বর্গভূমিতে কি হয় না হয় সে খবর রাখো? তোমাকে না এখানে রাখা হয়েছে আমাদের ভালো মন্দের খেয়াল রাখবার জন্যে? রেখেছো?”

ঘুরে এসে দেনিজের চেয়ারের হাতলে দুহাত রেখে তার দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো লাভলী। চেয়ারের পেছনে যতটা সম্ভব চেপে বসে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন ভদ্রলোক। অবস্থা বেগতিক দেখে এবার পাখি জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে লাভলী? এত রেগে আছো কেন?”

“তো কি করবো? ন্যায় ভাবে কি নিজেকে! প্রেসিডেন্ট হয়েছে বলে যা খুশি করে বেড়াবে, আর আমাদের সব মানতে হবে?”

“ন্যায়?”

সরু চোখে তাকালেন দেনিজ। লাভলীর আক্রমনাত্মক ভঙ্গি দেখে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছেন না উনি। পাশ থেকে পাখি আবারো জিজ্ঞেস করে উঠলো,

“কি করেছে ন্যায়?”

পাখির কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখমুখ খিচে লাভলী জানালো,

“হাওয়াইকে রেস্ট্রিক্টেড জোনে নিয়ে গেছে! ঐ লেজওয়ালা লিওটার কাছে! বলে কিনা লিওকে শান্ত করে ফেরত দিয়ে যাবে! ওর লিওকে শান্ত করার ঠেকা পরেছে আমাদের?! কেন যাবে হাওয়াই?!”

হা করে তাকিয়ে রইলেন দেনিজ। ঘটনার আগামাথা কিছুই বুঝলেন না উনি। পাখি যাও হাইব্রিডার্সদের সাথে মেশে, দেনিজ অফিসিয়াল কাজের বাইরে একদমই মেশেন না ওদের সাথে। ব্যাপারটা যে ইচ্ছাকৃত এমনটা নয়। হাইব্রিডার্সরা অহেতুক নিজেদের মাঝে মানুষদের নাক গলানো পছন্দ করে না। তাই তাদের সম্মানে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন উনি।
লাভলীর কথা বুঝতে না পেরে এবার পাখির দিকে তাকালেন দেনিজ। ইশারায় জানতে চাইলেন পাখি কিছু জানে কিনা। কিন্তু পাখিরও এবিষয়ে কোন ধারণা নেই। মাথা সামান্য নেড়ে সে বোঝালো সেটা।

“তোমরা কি একে অপরের দিকে তাকিয়ে ইশারা করছো? এই ডিরেক্টর! লজ্জা করে না আরেকজনের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ইশারা করো! চোখ গেলে দেব একদম!”

দেনিজের গলার টাই চেপে ধরে শাঁসালো লাভলী। আরেকদফা বেকুব বনে গেলেন দেনিজ। মেয়েটা কি চোখে দেখেনা? পাখির বাবার কাছাকাছি বয়স তার!

“এক্সকিউজ মি?”

“তোমার এক্সকিউজ পকেটে গুঁজে রাখো! আমার সামনে বের করবে না খবরদার! একে তো মানুষ, তার উপর আবার পুরুষ মানুষ! কামড়ে তোমার ছাল তুলে ফেলবো!”

“এক্স….” বলতে গিয়েও চুপ হয়ে গেলেন দেনিজ। এই মেয়ের বিশ্বাস নেই। সত্যি সত্যিই কামড়ে দিতে পারে।
“তুমি এখন আমার কাছে কি চাও লাভলী?”

“তুমি এক্ষুনি আমার সাথে যাবে রেস্ট্রিকটেড জোনে! ফিরিয়ে আনবে হাওয়াইকে। আর ন্যায়কে বলবে, আর কোনদিন যেন আমার মেয়েদের দিকে নজর না দেয়!”

“হ্যাঁ? আমি?”

“তো কে? চলো এখন!”

বলেই টাইসমেত টেনে তুললো লাভলী দেনিজকে। পাখি হা করে তাকিয়ে রইলো। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার দেনিজের সমান উচ্চতায় অবস্থান লাভলীর। তবুও শক্ত সামর্থ্য বিরাশি কেজি ওজনের এই পুরুষটিকে যে এত সহজে সে টেনে তুলতে পেরেছে, দেখে অবাকই হলো পাখি। বিব্রত দেনিজ নিজেও। লাভলীর হাতটা ধরতে গিয়েও নিজেকে থামিয়ে নিলেন দেনিজ। আজ অবধি তার গলা চেপে ধরার সাহস বা সুযোগ কোনটাই কাউকে দেননি উনি। লাভলী সে সাহসটা করতে পারলো শুধুমাত্র হাইব্রিডার্স বলে। বিরক্তি লুকিয়ে উনি লাভলীকে যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বললেন,

“একমিনিট, আসছি। টাইটা ছাড়ো আগে।”

“কেন ছাড়বো? এটা বাঁধাই তো হয়, যাতে প্রয়োজনে ইচ্ছেমত টেনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি দেখেছি টিভিতে, গরু ছাগল এভাবেই বেঁধে রাখে। সময় হলে দড়ি টেনে জায়গামত নিয়ে দাড় করায়।”

“আমি কি গরু?”

“আশ্চর্য! তুমি গরু হতে যাবে কেন? গরু তো হয় সহজ সরল, তোমার মত ত্যারামি করে না। তাছাড়া গরুর গায়ে চর্বি থাকে অনেক। তোমার তো মাংসপেশি বেশি, তুমি মহিষ।”

দুই সেকেন্ডের নীরবতার পর শব্দ করে হেসে উঠলো পাখি। দেনিজের চেহারাটা দেখার মত হয়েছে। ফর্সা মুখটা রাগে, ক্ষোভে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। বেচারা না পারছে কিছু বলতে, না পারছে সইতে!

“আসল মহিষ না, স্বভাবে এবং বুদ্ধিতে মহিষ। এটাকে উপমা দেওয়া বলে।”

পাখিকে হাসতে দেখে একটু সংকোচ নিয়ে ব্যাখ্যা দিল লাভলী। পাছে তাকে না আবার বোকা ভেবে বসে পাখি!

“আমি বুঝতে পারছি লাভলী। তুমি না বললেও, আমি দেনিজকে সত্যিকারের মহিষ ভাবতাম না।”

হাসি কোনমতে থামিয়ে উত্তর দিল পাখি। এদিকে দেনিজের সহ্য ক্ষমতা শেষ।

“হয়েছে!”

ধমকে উঠলেন উনি। তারপর গলা থেকে টাইটা খুলে লাভলীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

“চলো এবার!”

***

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ