#নীল_ধ্রুবতারা [৪]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
স্ত্রীকে নিয়ে একটা মানুষ কতটা চিন্তাশীল হলে এতো ব্যাকুল হতে পারে? ভদ্রলোকের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে চোখ পিটপিট করলাম কেবল। ভদ্রলোক আবারও অস্থির হলেন,
“এই নবনী, আর ইউ ওকে? এ্যাঁই, কথা বলছো না কেন?”
আমি ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললাম,
“ঠিক আছি।”
মনে হলো ভদ্রলোক আমার গলার স্বর শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ‘আমি ঠিক আছি’ এই কথাটায় স্বস্তিদায়ক কিছু কি আছে? তবে সে এমন করে নিশ্চিন্তের শ্বাস ত্যাগ করলেন কেন? সে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছিলে না কেন?”
“খেয়াল করিনি।”
“আজও নিশ্চয়ই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছো? একা একা বাসায় থাকো। ফোন সাইলেন্ট করে রাখার কি দরকার, নবনী? তুমি কল না ধরলে আমার দুশ্চিন্তা হয়, জানো না?”
“জানি।”
বলেই ছোট করে নিশ্বাস ফেললাম। আমি কল না ধরলে তার যে খুব দুশ্চিন্তা হয় তা আর জানব না? মানুষটা যে আমাকে নিয়ে কতটা ভাবে তা তার গলার স্বর শুনেই টের পাই। তবুও ফোন সাইলেন্ট করে রাখার বদভ্যাস ত্যাগ করতে পারি না। তবে আজ তো ফোন সাইলেন্ট করে রাখিনি। আজ আমি ভাবনায় এতোটাই বিভোর হয়ে মত্ত ছিলাম যে— কখন সে কল করেছে টেরই পাইনি।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“শোনো, আর কখনো ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে না, প্লিজ। অনুরোধ করছি তোমায়।”
আমি সত্যটা বললাম না। কোনোরূপ প্রতিবাদ বিহীন মেনে নিলাম তার কথা। ক্ষীণস্বরে বললাম,
“আচ্ছা আর রাখব না।”
“আমি জানি তুমি আবার ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে। আর আমাকে সারাদিন চিন্তায় অস্থির করবে।”
বলেই সে শব্দ করে একরাশ হতাশা মিশ্রিত শ্বাস ফেলল। বলল,
“এখন বলো কি করছো?”
“কিছু করছি না।”
“তোমার গলাটা এতো ভারী শোনাচ্ছে কেন, ঘুমাচ্ছিলে?”
“নাহ।”
“তাহলে?”
“এমনি, কিছুই ভালো লাগছে না। ভীষণ মন খারাপ করছে আমার।”
“কেন? ভালো লাগছে না কেন? আর মনই বা কেন খারাপ করছে?”
আমি এই প্রশ্নের জবাব দিলাম না। ভারী পল্লব আচ্ছাদিত চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে নামল নোনাপানির ধারা। না, শব্দ করে কাঁদা যাবে না। আমার সশব্দ কান্না শুনলে মানুষটা আরও চিন্তা করবে আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি— আমাকে নিয়ে এতো চিন্তার কি আছে? আমি কি বাচ্চা মেয়ে? আমার সামান্যতম অসুবিধায় সে এতো উদ্বেগ প্রকাশ কেন করে? এমনও নয় যে পরিস্থিতি সামান্য অনুকূল হলেই আমি কেঁদেকেটে বুক ভাসাই। তবে ওর কেন এতো চিন্তা আমাকে নিয়ে?
আমাকে নিশ্চুপ দেখে সে বলল,
“সকালে খেয়েছো?”
“নাহ।”
সে করুণ গলায় বলল,
“কেন খাওনি?”
“খিদে পায়নি।”
“নবনী, এখন সকাল এগারোটা বাজে। এখনো তোমার খিদে পায়নি? কাল রাতেও তো কিছু খাওনি তুমি। কেন এমন করছো? আমাকে কেন জ্বালাতন করছো, কি করেছি আমি। কিসের শাস্তি দিচ্ছো বলতো?”
আমি না খেয়ে তাকে কোনো উপায়ে জ্বালাতন করছি ভেবে পেলাম না। তাকে যে আমি একেবারেই জ্বালাতন করি না তা নয়। আমি তাকে খুব জ্বালাতন করি। যখন মাঝরাতে বাথরুমে যায় সে, আমি তখন বাথরুমের সুইচ বন্ধ করে এসে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকি। প্রথম প্রথম সে খুব আশ্চর্য হতো। এরপর বুঝতে পারল মাঝরাত হোক বা খুব গভীর ঘুমের সময়— সে যখন আমার পাশ থেকে উঠে চলে যায় আমার ঘুম তখুনি ছুটে যায়। এরপর থেকে সে নিজেও প্রায় সময় আমি বাথরুমে গেলে লাইট বন্ধ করে দেয়। আবার জ্বালায়। এ আমাদের এক মজার খেলা। ছাব্বিশ বছরের এক ভদ্রলোক পুরুষ এবং একুশ বছর বয়সী এক দুষ্টু নারীর এই রসায়নের কথা বহুদিন অবধি কেউ জানতো না।
কিন্তু এই গোপন খেলার কথা ফাঁস হয়ে গেল হঠাৎ। গতবার রোজার ঈদে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। সেখানে একটাই বাথরুম। গণহারে সেটা সকলে ব্যবহার করে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ভদ্রলোক হঠাৎ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হলো, উনি বোধহয় বাথরুমে গিয়েছেন। আমার বুদ্ধিমান মাথায় চমৎকার একটা আইডিয়া খেলে গেল। গতকাল মাঝরাতে তাকে ডেকে বললাম,
“এই আমি বাথরুমে যাব। একটু এসো না আমার সাথে।”
আমি ভীতু মেয়ে। অন্তত ভূত নামক এক বস্তুকে আমি ভয় পাই ভীষণ। সে জানে সে কথা। তাই সঙ্গে গিয়েছিল। তবে কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল নির্মমভাবে। আমি কাঁপা কণ্ঠে তখন “অ্যাঁ” করে মৃদু চিৎকার দিয়েছিলাম। সে লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বিশ্রী রকম শব্দ করে হেসেছিল তখন। এমনিতে তার হাসির শব্দ চমৎকার। মাঝরাতেই হঠাৎ খুব বিশ্রী লেগেছিল আমার কাছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর নিজের বাহুডোরে আগলে নিতে চেয়েছিল সে আমায়। আহ্লাদ করে বলেছিল,
“খুব ভয় পেয়েছো? আচ্ছা, এরপর থেকে আর ভয় পাবে না এমন একটা উপায় বলে দেই তোমাকে? তুমি বাথরুমে গেলে তোমার সাথে আমিও যাব। তুমি আরামে সুখ কর্ম করবে আর আমি দেখব।”
ছিঃ কি নোংরা মজা। আমি কটমট করে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার অগ্নিদৃষ্টি দেখে সে আবার হেসেছিল। হাত ধরতে চেয়েছিল শক্ত করে। তার বাঁধন গাঢ় হবার আগেই নিজের দন্তপাটি দিয়ে জোরছে এক কামড় বসিয়েছিলাম আমি। দাগটা এখনো জ্বলজ্বল করছিল বহুদিন। কিন্তু তাতেই বা কি? বাথরুমে যাওয়ার পর এখনো লাইট অফ করাটা তো বাকি। আমার মনটা হঠাৎ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল। দ্রুত ছুটে গেলাম বাথরুমের সামনে। আমি নিশ্চিত, রাতে খাওয়ার পরে সে বাথরুমেই গিয়েছে। বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে খিলখিল শব্দে হেসে উঠলাম আমি।
হাসতে হাসতে বললাম,
“কি খবর কালামের পুত? অন্ধকারে পায়খানা ঠিকঠাক ক্লিয়ার হচ্ছে তো? গতকাল রাতে তুমি লাইট বন্ধ করছিলা না, আজ আমি করে দিলাম। হু হা হা!”
এখানে উল্লেখ্য, আমার শ্বশুরের নাম আবুল কালাম। মজা করে মাঝে মাঝে তাকে কালামের পুত বা শাশুড়ীর পোলা সম্বোধন করি আমি। ভেতর থেকে একটা ভারী পুরুষ কণ্ঠ গলা খাঁকারি দিয়ে “উহুহু!” শব্দ করল কেবল। আমি বললাম,
“তুমি যতই উহুহু করো লাইট আমি জ্বালাব না। আজ অন্ধকারেই তোমার শিল্পকলা শেষ করো তুমি।”
এরপর সুর ধরে বিড়বিড় করলাম,
“তুমি থাকো গো কালামের পুত,
অন্ধকারে বইয়্যা…
আমি জ্বালাব না লাইট যতোই
তুমি থাকো চাইয়্যা।”
অশ্রুতপূর্ব এই গান শুনে ভেতরের মানুষটা আরেকবার গলা খাঁকারি দিল। আমি পাত্তাও দিলাম না সেসব। দাঁড়িয়ে রইলাম গাঁট হয়ে। রিনরিনে চাপা হাসিতে মুখরিত হতে লাগল রাতের বাতাস। বেশ অনেকক্ষণ পরে ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ আমাকে বলল,
“মা, লাইট জ্বালাও। আমি বাশারের পুত কালাম। কালামের পুত ভেতরে নাই। ভেতরে তার বাপ আছে।”
ভেতরে আমার শ্বশুরের পুত্র নয়, দাদাশ্বশুরের পুত্র আছে জেনে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে মন চাইল আমার। এ কি এক আকাম করে বসলাম? লজ্জায় লাইট না জ্বালিয়েই ফিরে এলাম ঘরে। ততক্ষণে শাশুড়ী এসে গিয়েছিলেন। ঘটনা জানাজানি হলে বাড়ি হাসিতে মুখরিত হলো।
শাশুড়ী মুখ ভার করে আমার ভদ্রলোক স্বামীকে বলল,
“তোর বউয়ের আর আক্কেল হবে না। ছি, কি লজ্জার কথা! শ্বশুর বাথরুমে গিয়েছে আর ছেলের বউ লাইট বন্ধ করে দিয়েছে, লোকে শুনলে কি বলবে? তুই বাথরুমে গেলেও তোর বউ এই কাজ করে?”
আমি কি করি কি না করি সেই ব্যাখ্যা শাশুড়ী মাকে সে দিল না। আমি কান পেতে শুনলাম, সে কেবল বলল,
“আরে সে কি জানত আব্বু ভেতরে? হয়েছে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। এতে এতো কাহিনীর কি আছে?”
কাহিনীর কিছু না থাকলেও সবাই বিস্তর ইতিহাস খুঁজে পেল সেই ঘটনায়। স্বামী ঘরে এসে হাসতে হাসতে আমায় বলল,
“তোমাকে কি এমনি এমনি গাধা বলি আমি? এখন তো মনে হচ্ছে এতোকাল তোমাকে গাধা বলে বেচারা ওই গাধা জাতটাকে অপমান করেছি আমি। তুমি হচ্ছো উন্নত জাতের লেজবিহীন ছাগল।”
সেদিন নীরবে অপমান সহ্য করে নিয়েছিলাম আমি। তবে সময়ে অসময়ে সেটা ফেরতও দিয়েছিলাম সুনিপুণভাবে। তবুও এই টম অ্যান্ড জেরির সম্পর্ক কখনো মন্দ লাগেনি। মনে হতো এই খুনসুটিতে আমরা বেশ আছি। সেবার ওই ঘটনার পর আমি লজ্জায় শ্বশুর মশাইয়ের সামনে গেলাম না আর। শুধু ফিরে আসার সময় মাথা নত করে বলেছিলাম,
“আব্বু যাই, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আসসালামু আলাইকুম।”
শ্বশুর মশাই সিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
“আচ্ছা, সাবধানে যেও।”
এসেছিলাম সাবধানেই। সংসারও করছিলাম ভীষণ গুছিয়ে। সে সংসার জীবনে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছিল এইসব হেঁয়ালি, দুষ্টুমি, ছেলেমানুষী কাণ্ড, মিষ্টি সব প্রেমের ঝগড়া। দিনকাল কাটছিল খুব চমৎকার। স্বামীকে জ্বালিয়ে যে শান্তি আমি পেতাম তা শান্তিনিকেতনেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাকে জ্বালাতন করার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই। ভঙ্গুর এই মন নিয়ে উচ্ছ্বলিত আবেগে কাউকে বিরক্ত বা জ্বালাতন করা যায় না। তাই অসহায়ের মতো বললাম,
“সরি।”
“সরি, সরি কিসের জন্য?”
“তোমাকে খুব জ্বালাচ্ছি যে! তুমি তো খুব বিরক্ত হচ্ছো। তার জন্য সরি।”
সে হতাশ কণ্ঠে বলল,
“আমি সরি চেয়েছি তোমার কাছে?”
“না, চাওনি।”
“তবে কেন সরি বলছো?”
“এমনি। মনে হলো সরি শুনলে তুমি খুশি হবে।”
আমার নিষ্প্রভ গলার স্বর শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর খুব ধীরে সময় নিয়ে বলল,
“নবনী, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“কি কথা?”
“আমার সাথে তুমি এমন করে কথা বলছো কেন? কি করেছি আমি?”
আমি ভারী বিস্মিত হলাম। তার সাথে আমি কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। রাগারাগি করিনি। কড়া, কঠিন স্বরেও ঝগড়াঝাটিও বাঁধাইনি। তবুও সে কেন এমন করে বলছে? ফোনটা শক্ত করে কানে চেপে ধরে অসহায়ের মতো জানতে চাইলাম,
“তোমার সাথে কেমন করে কথা বলছি আমি?”
“এমন পর পর করে৷ যেন আমি তোমার খুব অচেনা কেউ।”
লোকটার ছেলেমানুষী দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। কিন্তু বিষণ্ণ মনের তাড়নায় ওই হাসিটা ঠোঁটের কোণে চড়াও হলো না। মানুষটা আমাকে ভালোবাসে। তাই তো আমার একটু নির্লিপ্ততা তাকে বড্ড যাতনা দেয়। কিন্তু আমিই বা কি করব? জোরপূর্বক আগের নবনীকে ফিরিয়ে আনা আদৌ কি সম্ভব? চাইলেই কি মনের হতাশা দূর করে মানুষ খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে? কেউ কেউ হয়তো পারে। অধিকাংশ মানুষই পারে না। যারা পারে তারা খুব দক্ষ অভিনয়শিল্পী। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা কেবল সুখী থাকার অভিনয়, হাসি হাসি মুখ করে রাখার অভিনয় করে নিপুণভাবে। আমি তো দক্ষ অভিনেত্রী নই। সুতরাং মনের খেদ বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ পাওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই বর্তমানে, জীবনের এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে বিষণ্ণতার চাদরে আমার কণ্ঠ জড়িয়ে থাকবে এটাই অবধারিত নিয়ম। নিয়ম মেনেই আমি শুধালাম,
“তোমাকে পর ভাবার মতো কাজ আমি কখনোই করতে পারব না, মাহতাব। তুমি সেটা জানো তবুও কেন অযথা কথা বাড়াচ্ছো?”
মাহতাব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। আমিও কানে ফোন চেপে ধরে শুনে গেলাম তার নিশ্বাসের শব্দ। আমার বুকে ধাক্কা দিতে লাগল তার প্রতিবারের শ্বাস-প্রশ্বাসের আনাগোনা। একটা সময় পর আমার মনে হলো মাহতাবের বোধহয় খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাব বোধ করছে ভীষণ।
আমি ভীত হলাম। শুধালাম,
“কথা বলছো না কেন?”
“কি বলব বুঝতে পারছি না।”
“চুপ করেই থাকবে?”
“না। আসলে নবনী আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।”
আমি অপার বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
“কেন?”
“তোমার এতো বেশি মন খারাপের সময় তোমাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার মনটা ভালো করতে পারছি না। এই ব্যর্থতার পুরো দায়টাই তো আমার। আমার এতো খারাপ লাগছে কি বলব তোমায়।”
অপরাধবোধের প্রগাঢ়তায় তার স্বর ভারী হয়ে এল। আমি জানি আমার ভদ্রলোক এখন নিঃশব্দে কাঁদছে। মানুষটা যখন প্রচণ্ড অসহায় বোধ করে তখন সে খুব করে কাঁদে। একদম শব্দহীন কান্না। যেই কান্নায় ভারী হয় ঘরের গুমোট হাওয়া। মানুষটা ভরা মজলিসে কাঁদছে? কলিগরা কি ভাববে তাকে? আমি চিন্তিত হয়ে বললাম,
“তুমি শুধু শুধু নিজেকে দায়ী করছো। কোনো মানে হয় এসবের? আচ্ছা, ছাড়ো এসব। কোথায় আছো তুমি? এতোক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলছো কেউ দেখছে না?”
“না, আমি একটা কাজে অফিসের বাইরে বেরিয়েছি। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছিল। এরপর ভাবলাম তোমাকে কল করে একটু কথা বলি। মনটা হালকা লাগবে। চিন্তাটা কমবে।”
সে আবারও শব্দ করে নিশ্বাস ফেলল। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,
“চিন্তা কমেছে?”
“না।”
“কেন কমেনি কেন? কথা তো হলোই।”
“তবুও কমেনি। তুমি কেন খাওনি এখনো? ফোন রাখার সাথে সাথে নাস্তা করবে। ওষুধ খাবে। আর হ্যাঁ, গোসল করে জামাকাপড় সব ডিটারজেন্ট দিয়ে ভিজিয়ে রাখবে। আমি রাতে এসে ধুয়ে দেব।”
“আচ্ছা।”
“গুড গার্ল। আচ্ছা, এখন তাহলে রাখি?”
“হুঁ।”
আমি মেনে নিলাম তার কথা। মানুষটা এতো চমৎকার কেন যে! এতো ভালো যে কেন আমাকে বাসে! সে কল কাটার আগে বলল,
“শোনো বউ, ভালোবাসি তোমায়।”
আমি শুনলাম। অন্য সময় হলে আমিও নিজের ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতাম অবলীলায়। আজ নিজের ভালোবাসার উপর বিশ্বাস খুঁজে পেলাম না। কেন পেলাম না তা আমি জানি না। শুধু জানি, আমার ভয় লাগছে। এই মানুষটাকে হারানোর ভয়। এতো যত্নশীল পুরুষটিকে আমি হারাতে পারব না। অথচ সন্তানহীন একটা সংসার টিকিয়ে রাখার মন্ত্র যে আমার জানা নেই। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে। আমার মাথার এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে অবাধ্যতার সহিত। মনটাও বিক্ষিপ্ত হচ্ছে সমানতালে। গতকাল থেকে এতো কেন মন খারাপ হচ্ছে আমার? মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবো, এই কি তার কারণ?
—চলমান—
