নীল_ধ্রুবতারা
[সূচনা]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
“আমি কখনো মা হতে পারব না।”
ডাক্তারের চেম্বার থেকে থমথমে মুখ নিয়ে বের হয়ে, স্বামীর উদ্বেগপূর্ণ মুখখানার দিকে একবার করুণ দৃষ্টিতে তাকালাম। শান্ত, স্নিগ্ধ, বটবৃক্ষের ন্যায় মানুষটার আমাকে নিয়ে ব্যাকুলতার শেষ নেই। নেই বলেই হয়তো আমি বের হবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
“ডাক্তার কি বলল?”
উত্তরে আমি যান্ত্রিক কন্ঠে তাকে যেই সত্যটি জানালাম সেটি এখনো আমারই বিশ্বাস হচ্ছে না। কোনো মেয়ের কাছে পৃথিবীর নির্মম সত্যটা বোধহয় এটাই। নারী মাত্রই মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চায়। মা হওয়ার মাঝে কি যে অনাবিল সুখ সেটা যে কখনো মা হতে পারবে না, সে কি করে বুঝবে?
আমার স্বামী নিরেট ভদ্রলোক, সদা হাসোজ্জ্বল, আপনজনদের প্রতি অসম্ভব যত্নশীল একজন মানুষ। দুই বছরের সংসার জীবনে তাকে রাগ করতে কখনো দেখিনি আমি। আমাদের প্রবল ঝগড়ার মাঝেও তিনি সবসময় নির্বিকার, নির্বাক ভূমিকা পালন করেছেন। একা একা ঝগড়া করা যায় না। ফলস্বরূপ তেজী বুনো ঘোড়ার মতো তড়পাতে তড়পাতে এক সময় স্তিমিত হয়ে এসেছে আমার কন্ঠের তেজ। অটল হিমালয়ের ন্যায় মানুষটা তখন আমাকে ভালোবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছে,
“রাগ কমেছে তোমার?”
তার স্পর্শের শীতলতা, কন্ঠের মোলায়েম ভাব আমার পারদস্পর্শী রাগকে জল করে দিত সহসাই। মাঝে মাঝে আমার এটা ভেবে আবার রাগও হতো— কেন এই মানুষটা আমার কটু বাক্যবাণের বিপরীতে দুটো কড়া ধমক দেয় না? পুরুষ মানুষ এমন নিরুত্তাপ হয় নাকি? চিরকাল তাপ-উত্তাপহীন থাকা মানুষটা কঠিন সত্য শুনে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। আমার চোখে তখন ঘনঘোর বর্ষা নেমেছে। বহু কষ্টে চোখের জলে বাঁধ নির্মাণ করে টলতে টলতে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়েছি। বন্যার জলকে এ পর্যায়ে আর বাধা দেওয়া গেল না। হু হু করে বেয়ে নামতে লাগল কপোল বেয়ে। আকস্মিক আমার ক্লান্ত শরীরটা ভার ছেড়ে দিল। হাতের রিপোর্টগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল নিচে। হাসপাতালের ঝকঝকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার পূর্বেই ভদ্রলোক শক্ত করে চেপে ধরল আমার বাহু। জীবনের প্রথম সেদিন তার অস্থির কন্ঠ শুনলাম,
“এই নবনী, ঠিক আছো তুমি?”
আমি জবাব দিতে পারলাম না। দু’চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে এল। গলা শুকিয়ে কাঠ। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মমতম সত্য আমার শরীরের সবটুকু শক্তি করুণভাবে কেড়ে নিয়েছে। ভদ্রলোক হাসপাতালের সারি সারি চেয়ারের এক কোণায় আমাকে বসিয়ে দিলেন। পাশে বসে শক্ত করে চেপে ধরলেন আমার হাত। উনার এই চেপে ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাঝে বোধহয় আশ্বাসবাণী কিছু ছিল। যা অনুভব করেই আমার ফের কান্না পেল। আমি কাঁদতে লাগলাম অঝোর ধারায়।
জীবনের প্রথম আমাকে সেদিন ধমক দিলেন তিনি,
“আশ্চর্য! এমন গাধার মতো কাঁদছো কেন? চোখ মুছো, কান্না বন্ধ করো। আর একটুও কাঁদবে না।”
ভেজা ভারী নেত্রপল্লব তুলে আমি তাকে দেখলাম। মানুষটা গম্ভীর মুখে আমাকে ধমক দিয়েছে। অথচ এই ধমকের সুরে আমার কান্না থামল না। গাধার মতো কাঁদছি আমি? আমাকে গাধার মতো এমন নিম্নস্তরের প্রাণীর সাথে তুলনা দেওয়াতেও আমার একটুও রাগ হলো না। অথচ অন্য সময় যদি সে একথা বলতো, আমি তাকে আরও হাজারটা ইতর শ্রেণীর প্রাণীর সাথে তুলনা করতাম। এখন বহু চেষ্টা করেও সেই উদ্যম খুঁজে পেলাম না। জাগতিক কোনো মান-অপমান, সুখ-শান্তি বোধহয় আমাকে আর কখনোই অভিভূত করতে পারবে না। আমার বাকিটা জীবন বোধহয় কেঁদে কেটেই পার করতে হবে।
আমার স্বামী আমার হাত ছেড়ে দিয়ে রিপোর্টগুলো মেঝে থেকে তুলে আনল। গুছিয়ে ফাইলের ভেতরে রেখে দিয়ে বলল,
“চলো, বাসায় চলো।”
বাসা! এই ছোট্ট উপজেলা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অগণিত ছোট্ট ছোট্ট ঘর। আমি যেই তিনতলা বিল্ডিংয়ে বসে আছি— সেই বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে নিচে তাকালে বহুদূর অবধি সেই ঘরগুলোর টিনের চাল দেখা যায়। এখান থেকে দশ টাকা ভাড়ার দূরত্বে তেমনই ছোট্ট ঘরে আমাদের একটা সংসার পাতা আছে। সেই সংসারের প্রতিচ্ছবিটা সুখেরই বটে। স্বামীর অল্প মাইনের চাকরিতেও এক রুমের সেই বাসায় আমার দিন কাটে ভারী আনন্দে। আজকের পর থেকে সেই আনন্দ আদৌও তেমন থাকবে কিনা জানি না। আজ আমার জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে৷ নারীদের জীবনের এই পরিবর্তনের মতো করুণ বোধহয় আর কিছুই নেই। এমন আরও সাতপাঁচ ভাবনায় বিভোর হয়ে আমি দ্বিরুক্তি করলাম না। উঠে দাঁড়ালাম সেই ছোট্ট ঘরে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ভদ্রলোক চাইলেন আমাকে ধরে নিয়ে যেতে। কিন্তু কেন যেন আমার অসহ্য ঠেকল উনার অতি যত্ন। এই যত্নশীল পুরুষ যে সময়ের বিবর্তনে রঙ বদলাবে তা কি আর আমি জানি না?
হসপিটালের বিল্ডিংয়ে লিফট নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। এই ছোট্ট উপজেলা শহরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লিফট খোঁজা আশার বাহুল্য। তিন তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে আমার বেশ কষ্ট হলো। এমনিতে আমি দুর্বল চিত্তের নারী নই। একটা বড় সংসারের সকল কাজ একা হাতে করে আসার ক্ষমতা আমার আছে। তবে আজ আমি সেই ক্ষমতার সৎ ব্যবহার করতে পারলাম না। বহু কষ্টে রেলিং ধরে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে নিচে নেমে এলাম।
ভদ্রলোক একটা রিকশা ডেকে আমাকে উঠিয়ে দিলেন। বললেন,
“তুমি এখানে একটু বসো, আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”
আমি কোনো কথা বললাম না। কেবল অনিমেষনেত্রে চেয়ে রইলাম তার যাওয়ার পানে। চোখের জল তখনো ঝরছে। ভদ্রলোক পাশের ফার্মেসি থেকে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে এল। ওষুধের ব্যাগ দেখে মনে হলো ভদ্রলোক বোধহয় দোকানটাই আমার জন্য তুলে এনেছেন। এ পর্যায়ে আমি বললাম,
“এতো ওষুধ?”
“সম্পূর্ণ এক মাসের জন্য নিয়ে এসেছি।”
তার গলার স্বরে দায়িত্বশীলতার ছাপ স্পষ্ট হলো। আমি কিছু বললাম না। এক মাসের এই পথ্য কিনতে তার যে ভালো অঙ্কের একটা টাকা ব্যয় হয়েছে সেটা বুঝে গেলাম তখুনি। আমাকে সুস্থ করার এতো তাড়া উনার! আমি অবশ্য অসুস্থ নই। দুই মাস ধরে পিরিয়ড হচ্ছে না। সন্দেহ করেছিলাম, কনসিভ করেছি। কিন্তু বাড়িতে টেস্ট কিট এনেও যখন ফলাফল পজিটিভ কিছু পেলাম না— তখন এসেছি ডাক্তারের কাছে। এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মহিলা ডাক্তার আমাদের এলাকায় বেশ নামকরা। উনার সুখ্যাতি সকলের মুখে মুখে। আম্মার কাছে শুনেছি, আমি পেটে থাকতে নাকি মাত্র বিশ টাকা ভিজিটে আম্মাকে দেখেছিলেন তিনি। এখন নিচ্ছেন পাঁচশ টাকা। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। সুতরাং উনার অভিজ্ঞতার দিকে আঙুল তোলা যায় না। তাছাড়া আলট্রাসাউন্ড রিপোর্টেও নেগেটিভ এসেছে। আমি গর্ভবতী নই এটা সমস্যার কারণ নয়। যেহেতু বিয়ের মাত্র দুই বছর এখুনি এতো ক্ষুণ্ণ হবারও কিছু নেই। চিন্তার বিষয় হলো আমার ওভারিতে সিস্ট আছে। আর সিস্ট নামক বস্তুটির কারণেই আমার এই জটিলতা। যাদের ওভারিতে সিস্ট থাকে তারা নাকি জীবনে কখনো মা হতে পারে না। ভদ্রমহিলা নিজের এতো বছরের ডাক্তারি জীবনে কখনো তেমন দেখেননি। সুতরাং আমার মা হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ভদ্রমহিলা আমাকে পিরিয়ড হবার ঔষধ দিলেন। এবং পনেরো দিন পরে আবার দেখা করতে বললেন।
শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি নামবে যখন-তখন। এই বৃষ্টির জল কি ধুয়েমুছে দিতে পারবে আমার ভেতরের সমস্ত কষ্ট? না, পারবে না। আমার জীবনে যেই আঁধার ঘনিয়ে এসেছে সেই আঁধার সরানোর জন্য এই বৃষ্টির জল, বা হাজার বাল্বের আলোও যথেষ্ট নয়। প্রকৃতিও কেমন অন্ধকার করে রেখেছে মুখ। সন্ধ্যার আগেই মনে হচ্ছে ঘনঘোর সন্ধ্যা। এমনই কালো সাঁঝের বেলায় রিকশা করে নিজেদের সুখের নীড়ে ফিরছি দুজন। একটা সংসারকে সুখের বলার জন্য যে যে উপাদান থাকা প্রয়োজন সেই সবটাই আছে আমাদের সংসারে। বিবাহিত জীবনের এই দুটো বছরে আমাদের কখনো মনে হয়নি — আমরা অসুখী। আজ হঠাৎ নিদারুণ এক অসুখে আমার বুক ভেঙে যেতে লাগল। টনটন করতে লাগল বুকের পাঁজর। আমার সুখ, আমার প্রেম, আমার প্রিয় পুরুষ সব হয়তো অতিসত্বর আমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাবে। দূরে বহুদূরে। যতটা দূরত্বে গেলে আমি অতি পাওয়ারের চশমা পরেও তাদের দেখতে পাব না। এসব ভেবেই তার কাঁধে মাথা রেখে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম আমি। সে আমাকে আর সান্ত্বনা দিল না। বলল না, কান্না থামাও। কেবল একটা ভরসার হাত পুরোটা পথ আমার মাথায় রেখে দিল সে। বোঝাতে চাইল সে ছিল, সে আছে এবং সে থাকবে আমার চিরকালীন সঙ্গী হয়ে।
কিন্তু আমার মন? এই মন কি তা মানে? শুধুমাত্র একটা অদেখা প্রাণের জন্য কতশত সংসার ভেঙে যেতে দেখেছি আমি। যার কোনো অস্তিত্ব এই পৃথিবীর কোথাও নেই তার জন্য কোন্দল করে মরতে দেখেছি কত দম্পতিকে! কত ভালোবাসার মানুষ একবুক আশা নিয়ে সংসার পাতার পর হঠাৎ সন্তান না হবার সংবাদ শুনে দূরে সরে গেছে। তখন তাদের ভালোবাসার মানুষ হয়ে উঠেছে সেই অদেখা একটা ভ্রূণ। না, খুব দূরে কোথাও সেই ঘটনা ঘটেনি। আমাদের পাশের রুমের ভাড়াটিয়াদের বিয়ের আট বছর চলমান। অথচ সন্তান নেই। ভদ্রলোক ভালো চাকরি করে। মোটা মাইনে। সংসারে অভাব নেই একরত্তি। সেই সাথে নেই শান্তি। দু-জনে রাত-দিন ঝগড়া করে, এ বেলা স্বামী রেগে গিয়ে স্ত্রীকে গালাগালি করছে তো ওবেলা স্ত্রী রেগে গিয়ে স্বামীর গুষ্টির ষষ্ঠী উদ্ধার করছে। অথচ আমাদের ঘরে দারুণ সুখ। অনন্ত অনাবিল সেই সুখ বুঝি এবার কেড়ে নিলেন সৃষ্টিকর্তা। পাশাপাশি দুটো ঘর বুঝি এবার সত্যি সত্যি অশান্তির অনলে দ্রবীভূত হবে।
আমার সুখের উপর কোন শকুনের নজর পড়ল জানি না। তবে এটা জানি, আমার সুখের দাম্পত্যের ইতি ঘটবে এবার। সমাজের আর দশটা সংসার যেমন করে ভাঙে তেমনি করেই ভাঙবে আমার এক পৃথিবী ভালোবাসা দিয়ে সাজানো সংসার। আচ্ছা, আমি কেমন করে সইবো এই ভাঙন? আমার নিপাট ভদ্রলোক, দায়িত্বশীল স্বামীর বদলে যাওয়া মানব কেমন করে? আমার এই একুশ বছরের জীবনের সবটুকু ভালোবাসা যার পায়ে অর্পণ করেছি, এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীর বুকে যাকে সবচেয়ে আপন ভেবেছি তার থেকে দূরে গিয়ে আমি আদৌও বাঁচব তো? আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধড়ফড় করতে লাগল। মনের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা নীল ব্যথার মতো ছড়িয়ে যেন লাগল সর্বাঙ্গে। আমি বোধহয় বাঁচব না। আমার স্বামীর ভালোবাসাহীন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আমার জন্য অসম্ভব। ওই তো মৃত্যু, আমার দুয়ারে কড়া নাড়ছে। হাত বাড়ালেই হয়তো ছুঁয়ে দিতে পারব তাকে।
চলবে।
