হারানো ঠিকানা (প্রথম পর্ব)
পাড়ায় তপন বাবুর যথেষ্ট নামডাক ছিল।ভদ্র, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে সবাই তাঁকে সম্মান করত। বেসরকারি একটি নামী কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি করতেন তিনি।
মাসের শেষে মোটা মাইনে, অফিসের গাড়ি, শহরের ভালো এলাকায় নিজেদের দোতলা বাড়ি—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনটা যেন বাইরের মানুষের কাছে নিখুঁত ছিল।
সকালবেলা অফিসে বেরোনোর সময় তাঁকে দেখলে অনেকেই ঈর্ষা করত। ইস্ত্রি করা জামা, হাতে দামি ঘড়ি, চোখে আত্মবিশ্বাস।
পাড়ার দোকানদার থেকে শুরু করে ক্লাবের ছেলেরা পর্যন্ত তাঁকে আলাদা সম্মান দিত।
কারও চাকরির দরকার হলে তপন বাবুর কাছে পরামর্শ নিতে আসত। কেউ ব্যাংকের কাজ বুঝতে না পারলে তিনি সাহায্য করতেন।
দুর্গাপুজোর সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতেন। তাই পাড়ার মানুষের চোখে তিনি ছিলেন “আদর্শ মানুষ”।
তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবী ছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো স্বভাবের।
শান্ত, ঘরোয়া, অল্প কথার মহিলা। নিজের সংসার আর দুই ছেলেকে নিয়েই ছিল তাঁর পৃথিবী।
ভোরবেলা উঠে ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালানো, ছেলেদের টিফিন তৈরি করা, তপন বাবুর জামাকাপড় গুছিয়ে দেওয়া—এই নিয়মের বাইরে যেন তাঁর কোনো আলাদা জীবনই ছিল না।
গৌরী দেবী কখনও নিজের জন্য বড় কিছু চাননি। তাঁর সমস্ত সুখ ছিল পরিবারটাকে ঘিরে।নিজের
দুই ছেলে—তরুণ আর গৌরব—ছিল তাঁর গর্ব।
তরুণ বড় ছেলে,শান্ত, দায়িত্ববান। পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির নানা কাজেও মাকে সাহায্য করত।
আর ছোট ছেলে গৌরব ছিল একটু চঞ্চল স্বভাবের, কিন্তু পড়াশোনায় ভীষণ মেধাবী।
স্কুলে প্রায়ই প্রথম হতো তারা।
রেজাল্ট বেরোনোর দিন পাড়ার মানুষ যেন নিজেদের ছেলের মতো গর্ব করত।
চায়ের দোকানে বসে কেউ বলত, “তপনবাবুর ছেলেদের মতো ছেলে আজকাল কোথায় দেখা যায়!”
আবার কেউ বলত,“ভাগ্য লাগে এমন সংসার পেতে।”
এই কথাগুলো শুনে গৌরী দেবীর বুকটা আনন্দে ভরে উঠত।
সন্ধ্যাবেলা তপন বাবু অফিস থেকে ফিরলে চারজনে একসাথে বসে চা খেতো,খাবার খেতো। গৌরব সারাদিনের গল্প করত, তরুণ পড়াশোনার কথা বলত। মাঝে মাঝে তপন বাবু ছেলেদের নিয়ে বাইরে খেতেও যেতেন।
সব মিলিয়ে তাদের জীবনটা ছিল একেবারে সাধারণ অথচ সুন্দর, বাইরে থেকে তাই মনে হতো।
সেদিনও সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
গৌরী দেবী রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। তপন বাবুর জন্য লুচি আর আলুর দম বানাচ্ছিলেন। গৌরব স্কুল ড্রেস পরে ব্যাগ গোছাচ্ছিল। তরুণ ডাইনিং টেবিলে বসে বই দেখছিল।
তপন বাবু তাড়াহুড়ো করে অফিসে বেরোনোর সময় বলেছিলেন, “আজ ফিরতে একটু দেরি হবে। একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।”
গৌরী দেবী হেসে বলেছিলেন, “ঠিক আছে। রাতের খাবার গরম করে রাখব।”
কিন্তু সেইদিন রাত আর স্বাভাবিকভাবে নামেনি।
দুপুরের দিকে হঠাৎ ফোন আসে,অফিস থেকে একজন জানায়, তপন বাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে অফিসেই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে।
খবরটা শুনে গৌরী দেবীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।তরুণ দ্রুত একটা ট্যাক্সি ডাকে।
গৌরব ভয় পেয়ে বারবার জিজ্ঞেস করছিল,“বাবার কিছু হবে না তো?”কিন্তু গৌরী দেবী তখন নিজেই ভেঙে পড়ার অবস্থায়।
হাসপাতালের সামনে পৌঁছতেই একটা তীব্র ওষুধের গন্ধ নাকে এল। চারদিকে ব্যস্ততা, স্ট্রেচার, নার্সদের ছুটোছুটি—সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর পরিবেশ।
রিসেপশন থেকে কেবিন নম্বর জেনে তারা দ্রুত উপরে উঠে গেল।
কিন্তু কেবিনের সামনে পৌঁছে গৌরী দেবী হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন।
দরজার বাইরে এক মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল।
বয়স ত্রিশ -পঁয়ত্রিশের আশেপাশে। পরিপাটি শাড়ি, চোখে চশমা।
ডাক্তারদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিল যেন পরিবারের কেউ।মহিলার মুখে উদ্বেগ ছিল, কিন্তু সেই উদ্বেগের মধ্যে একটা অদ্ভুত অধিকারও ছিল।
গৌরী দেবী প্রথমে ভাবলেন, হয়তো অফিসের কোনো সহকর্মী।তপন বাবু যেহেতু উচ্চপদে চাকরি করেন, তাই অফিসের লোকজন আসতেই পারে।
কিন্তু ভিতরে ঢুকতেই তাঁর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
তপন বাবু তখন আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে ছিলেন। স্যালাইন চলছে। মুখটা ক্লান্ত।মহিলাটি খুব স্বাভাবিকভাবে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
একজন নার্স এসে কিছু ওষুধের কথা বলতেই মহিলা বলে উঠলেন, “ডাক্তার বলেছিলেন রাত ন’টার মধ্যে এটা দিতে হবে।”
কথাটা বলার ভঙ্গি এমন ছিল যেন সে বহুদিন ধরেই এই দায়িত্ব পালন করছে।
গৌরী দেবী চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন।তাঁর বুকের ভিতর অদ্ভুত একটা চাপা অস্বস্তি জমছিল।
গৌরব ধীরে মায়ের হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “মা, উনি কে?”
গৌরী দেবী উত্তর দিতে পারলেন না।
কারণ তাঁর নিজের মনেও তখন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
মহিলাটি এবার তাদের দিকে তাকাল,চোখেমুখে কোনো সংকোচ ছিল না। বরং এমন একটা স্বাভাবিক ভাব, যেন এই পরিচয় হওয়ার কথাই ছিল।
সে মৃদু হেসে বলল, “আমি তাপসী… তপনের অফিসে কাজ করি।”
কথাটা শুনতে একেবারে স্বাভাবিক লাগলেও গৌরী দেবীর বুকের ভিতরটা যেন ধক করে উঠল।
“তপন।”
এইভাবে নাম ধরে ডাকতে খুব কম লোককেই তিনি শুনেছেন।
তপন বাবুও অদ্ভুতভাবে চুপ করে ছিলেন। স্ত্রীকে দেখে সাধারণত যেমন স্বস্তি বা আবেগ দেখা যায়, সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না তাঁর।
বরং তাঁর মুখে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ছিল।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে কিছু কাগজে সই করতে বললেন। গৌরী দেবী এগিয়ে যাওয়ার আগেই তাপসী দ্রুত কাগজগুলো হাতে নিয়ে নিল।
তারপর ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল,“রিপোর্টগুলো কাল সকালেই পাওয়া যাবে তো?”
গৌরী দেবী এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন—এই মহিলার ভূমিকা শুধুই সহকর্মীর সীমার মধ্যে নেই।
তাঁর ভিতরে একটা অজানা ভয় ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল।
হাসপাতালের সেই সাদা আলোয় দাঁড়িয়ে হঠাৎ তাঁর মনে হলো—তিনি যেন নিজের স্বামীর জীবন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন না।
রাত বাড়তে থাকে।
তরুণ চুপচাপ বাবার বেডের পাশে বসেছিল। গৌরব ক্লান্ত হয়ে মায়ের কাঁধে মাথা রেখেছিল। আর তাপসী হাসপাতালের বাইরে করিডরে নার্সিংহোম এর ফোন থেকে কারও সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছিলো।
গৌরী দেবী দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন,কেন জানি না, তাঁর মনে হচ্ছিল—
তাঁর এতদিনের শান্ত, সুখী সংসারের ভিতরে কোথাও একটা অন্ধকার লুকিয়ে আছে—
আর সেই অন্ধকারের দরজা হয়তো আজ ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে।
ক্রমশ
