তৃষা
শেষ পার্ট
বাবুরাম_মন্ডল
হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখি তৃষা নেই। বাড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখি জঙ্গল ঘেরা সেই বাড়িটিতে পাগলের মত দৌড়ে ঢুকছে।
লোকটি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখল। চোখ দুটো বড় বড় করে একটু হাসার চেষ্টা করল।
আমার উদ্বেগ বাড়ছে। তৃষা দৌড়ে কোথায় গেল! জঙ্গল ভর্তি বাড়িটিতে সাপ-খোপ থাকতে পারে। গর্ত থাকতে পারে! হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে! উদ্ভ্রান্তের মতো মেয়েটি গেল কোথায়!
লোকটির হাতে ধারালো কাস্তে। সম্ভবত আলে ঘাস কাটছিলেন। কাস্তেটি ডান হাত থেকে বা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে বললেন, কুনঠে থিকে এইছেন? বাড়িতে কেউ থাকেনা কো! ভূতের বাড়ি! জানেন না! আশেপাশে বাড়ি লেই দেকছেন না। ভয়ে সব পেইলেচে। উঠে গিলছে!
লোকটির প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় আমার নেই। ইচ্ছেও নেই। তবু শুকনো হাসি উপহার দিয়ে আমিও এক দৌড়ে তৃষা যে পথে পোড়ো বাড়িটিতে ঢুকেছে সেই দিকে অতি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম।
একটু যেতেই দেখলাম তৃষার চটি। উল্টে পড়ে আছে ঘাসের ওপর। অনেকটা জায়গায় ছোট ছোট অচেনা ঘাস চাপ খাওয়া। বুঝতে দেরি হলো না মুখ থুবড়ে পড়ে গেছিল তৃষা।
আরো খানিক এগিয়েও তৃষার দেখা পেলাম না! উদ্বেগে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম একসময় বাড়িটির উঠোন ছিল এখানে।
এবার সত্যি সত্যি ভয় করতে লাগলো। হঠাৎ তৃষা গেল কোথায়! মুহূর্তে মিলিয়ে গেল! এইটুকু সময়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল!
অশরীরীরা শুনেছি এভাবেই মিলিয়ে যায়। সময় বুঝে লাফ দিয়ে ঘাড়ে এসে পড়ে। ঘাড় মটকে রক্ত খায়।
সত্যি সত্যিই কি তৃষা তাহলে ভূত! ছলনায় ভুলিয়ে এতটা এনেছে আমায়!
হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ পেলাম। চমকে উঠলাম। সর্বনাশ! এর মধ্যেই তৃষাকে সাপে কাটেনি তো! আবার মনে হল মায়া কান্না নয়তো! অশরীরীদের কান্না নয়তো!
সতর্ক হয়ে কান খাড়া ভালো করে শুনলাম। না মানুষের কান্নার মতই মনে হচ্ছে। তৃষারই কান্না! শুধু কান্না নয় কিছু একটা বলছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে।
জঙ্গল ভেদ করে দৌড়ে গিয়ে দেখি একটা ছোট্ট ঢিবির মত জায়গায় তৃষা উপুড় হয়ে শুয়ে। দু’হাত মাথার ওপর দিয়ে ছড়ানো। মাটি খামচে ধরেছে। অঝোরে কাঁদছে আর বলছে, মা গো দেখো আমি! আমি এসেছি। তোমার মেয়ে। আমার জন্য তুমি মরেছো। আত্মহত্যা করেছ। আমার জন্য।
তৃষার কথা শুনে চমকে উঠলাম। ওর মা আত্মহত্যা করেছে! এটা ওদের গ্রামের বাড়ি ছিল! তাহলে সেদিন ও কাকে মা বলে ডাকছিল! ও ঐ বাড়ির মেয়ে নয়! তৃষা অনাথ! পালিতা কন্যা!
ধীরে ধীরে ওর পাশে গিয়ে বসলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে ওকে দেখে। ওর কান্না দেখে।
ও আমায় দেখে উঠে বসলো না। শুধু কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, মা তুমি কষ্ট পেয়ো না মা। সব দোষ আমার। সব দোষ আমার। তোমার পেটে কেন আমি হয়েছি। বাবা তোমায় দেখতে আসেনি। আমায় দেখতে আসেনি। সব দোষ আমার। তোমার পেটে ছেলে হলে তোমায় মরতে হতো না মা। সব দোষ আমার। এই অভাগীর।
ছেলে হয়নি বলে ওর বাবা ওর মাকে দেখতে আসেনি! সেজন্য ওর মা আত্মহত্যা করেছিলেন! উফ ভগবান! কিন্তু আশ্চর্য! এতদিন ও জানতো না! গতকাল জেনেছে! কি ভয়ংকর! তাহলে যে বাড়িতে ওকে দেখতে গেছিলাম ওরা কারা! ভালো ভালো কথা বলছিল সেই লোক গুলো কারা! সব মুখোশধারী। বড়লোকের আড়ালে শয়তান!
এ সময় হঠাৎ তৃষা আমার ডান হাতটি চেপে ধরল। টেনে গলার কাছে নিয়ে গেল। হাতখানি কন্ঠনালীতে চেপে ধরে বলল, আমায় মেরে ফেলুন। গলা টিপে মেরে ফেলুন। মেয়ে জন্ম পাপের। মেরে ফেলুন আমায়।
ওর কষ্ট দেখে আমার দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা বইছে। বুক ফেটে যাচ্ছে তৃষার কথাগুলো শুনতে। ওকে নয়, যেন আমার বুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে কেউ।
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে ওর মাথাটা তুলে আমার কোলে স্থাপন করে বললাম, ওভাবে বলবেন না। আপনারা না থাকলে যে আমাদের জন্ম হতো না! পৃথিবীতে মানুষ বলে কারো জন্ম হতো না! আর মেয়ে সন্তান জন্মানোর জন্য তো বাবারা দায়ি। মায়েরা নয়!
ও আমার কোলে মাথা লুকিয়ে আবার কাঁদছে। কেঁদেই চলেছে। এই মুহূর্তে কি বললে ওর কষ্ট লাঘব হবে বুঝতে পারছি না। কোন বাবা এত নির্মম হতে পারে! কন্যা সন্তান হয়েছে বলে তাকে দেখতে আসবে না! এরা মানুষ! বাবুরাম_মন্ডল
অনেকক্ষণ পর নিজের চোখ নিজেই মুছে বললাম, আপনি কি আপনার মামার বাড়ি! মানে!
তৃষা প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। কাঁদতে কাঁদতে শুধু কোলের মধ্যে রাখা মাথাটা নেড়ে সম্মতি জানালো।
না! ওকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো ভাষা আমার নেই। শুধু কেন জানিনা ওর ব্যথায় ভেতরটা আমার ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগলো। টপ টপ করে জল পড়তে লাগলো চোখ থেকে।
অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ পর ভেজা চোখ নিয়ে উঠে বসলো তৃষা। চোখ দুটো ফুলে গেছে ওর। সেই চোখ দিয়ে এক পলক দেখলো আমায়। তারপর আবার কেঁদে ফেলল।
অজান্তেই নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিলাম। ও হঠাৎ আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলতে লাগলো, আমার পেটে মেয়ে হলে তুমি দেখতে আসবে তো? বলোনা, দেখতে আসবে তো? আমার পেটে মেয়ে—
আর বলতে পারল না তৃষা। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল আমার বুকে।
এক অজানা ব্যথায় আমার চোখে ছুটে আসছে বন্যার মত জল। দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আসবো তৃষা। আমি আসবো। আমি আসবো।
বাবুরামের গান গল্পের পাতা
চলবে।
