গল্প; তৃষা।
পার্ট ২
বাবুরাম_মন্ডল
আমাকে কাঁকসা গ্রামটায় নিয়ে যেতে পারেন? পোস্ট অফিস গুধিয়া। চ্যাটার্জি বাড়ি।
এই এতক্ষণ পর কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু ওই গ্রামটায় যাচ্ছে কেন! তবে কি ওর বয়ফ্রেন্ড ঐ গ্রাম থেকে আসার কথা ছিল! আসেনি! যদি তাই হয় তাহলে আমি নিয়ে যাব কেন!
এতগুলো প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলার আগেই চেয়ে দেখি তৃষা রীতিমতো হাঁটা দিয়েছে। অনেকটা দূর চলেও গেছে।
কোন কিছু না বুঝে একটু দৌড়ে ওর কাছাকাছি গিয়ে বললাম, ঠিক আছে নিয়ে যাচ্ছি। একটু ছায়ায় বসুন। জিজ্ঞেস করে আসি গ্রামটা কোন দিকে।
মেয়েটা তো ভারী টেটিয়া! হেভি তেজ! হুটহাট এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে!
দৌড়ে একজন দোকানদারের কাছে গিয়ে কাঁকসা গ্রামের কথা জিজ্ঞেস করলাম। লোকটি তর্জনীয় উঁচু করে পূর্ব দিক দেখিয়ে দিল। মুখে কিছু বলল না। আরেকটি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি জানালেন, এখান থেকে আট দশ কিলোমিটার। বাস ধরে যেতে হবে।
কি জ্বালা! সে তো অনেক দূর! এবার কি করি! একবার বলে ফেলেছি! না গেলেও হবে না!
মনে মনে বিরক্ত হলাম। বিরক্ত হলাম নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য। ডেকে বিপদ কোলে নিলাম।
তৃষা বসেনি। দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। কাছে যেতে বুঝলাম, চোখ থেকে এখনো জল ঝরছে। দেখে মায়া হল। মনে মনে কষ্ট পেলাম। বুঝে উঠতে পারছি না মেয়েটির হয়েছে কি। কেন এমন করছে।
দু’জন স্টেশনের বাইরে এলাম। যেখান থেকে টমটম ছাড়ে। প্রচুর টোটো চালক, টমটম চালক উৎসুক চোখে তাকিয়ে। একেবারে ঘিরে ধরল আমাদের। সবাই হাজারদুয়ারি দেখাতে নিয়ে যেতে চায়।
কাঁকসা যাবার কথা শুনে সবাই সরে গেল। শুধুমাত্র একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার এগিয়ে এলো। সে যেতে রাজী।
যখন চ্যাটার্জি বাড়ির কথা বললাম, তখন কেমন সন্দেহের চোখে তাকালো ড্রাইভার। যেন আমরা বাংলাদেশ বর্ডার টপকে এসেছি।
ড্রাইভার আমাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গেল। আপাদ মস্তক দেখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বলল, ওটাতো ভুতুড়ে বাড়ি! ও বাড়িতে কেউ থাকে না!
সর্বনাশ! ড্রাইভার আবার বলে কি! ভুতুড়ে বাড়ি! কেউ থাকেনা! মানে! ওটা কি তবে তৃষার বয়ফ্রেন্ডের বাড়ি নয়! ভারী ফ্যাসাদ তো দেখছি!
হঠাৎ মনে হল তৃষা একটা ভুতুড়ে বাড়ি যাবে কেন! যে বাড়িতে মানুষই থাকে না। ও নিজে ভূত নয় তো! মায়াবী মেয়ে নয়তো! এসব ভেবে গা টা কেমন ছমছম করে উঠলো।
কপাল ঠুকে শেষ পর্যন্ত কাঁকসা গ্রামটায় এলাম। পুরুষ মানুষ এত ভয় করলে হয় না। তার ওপর দিনের বেলা। পথে তৃষার সঙ্গে আর কথা হয়নি। সে শুধু কেঁদেই চলেছে।
রাস্তার ওপর দূর থেকে একটা ফাঁকা পরিতক্ত ভাঙ্গা একতলা বাড়ি দেখিয়ে ড্রাইভার সেখানেই গাড়ি ঘুরিয়ে আমাদের নামিয়ে হুশ করে চলে গেল।
ড্রাইভারের আচরণও কেমন সন্দেহজনক! বোঝা গেল বাড়িটা সত্যি সত্যি ভুতুড়ে।
ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা দু’জন। আশেপাশে বাড়িঘর নেই। মানুষজন নেই। তবে একটু দূরে জমিতে কাজ করছে কিছু কৃষক। তারা দূর থেকে আমাদের দেখছে।
রহস্য ঘেরা গৃহটি তাকিয়ে দেখলাম। আম কাঁঠাল আর ঘেটু গাছে বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। ছাদে পুরনো দিনের টিভি এন্টেনা ভেঙে একদিক ঝুলে আছে।
পথের দুদিকে সবুজ ক্ষেত। দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। গ্রামের মধ্যে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল টাওয়ার।
একটা লোক মাঠ থেকে উঠে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। উদোম গা। লুঙ্গি পরা। মাথায় বাঁশের টোকা। পায়ে এক হাঁটু কাদা। সম্ভবত তিনি নতুন আগন্তক দেখে সতর্ক করতে চান।
হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখি তৃষা নেই। বাড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখি তৃষা জঙ্গল ঘেরা সেই পরিতক্ত ভুতুড়ে বাড়িটিতে পাগলের মত দৌড়ে ঢুকছে।
চলবে,,
