#অনুপমা
#পর্ব_১
#মৃদুলা_রহমান
১.
আমার প্রথম স্বামীর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ডিভোর্সের সপ্তাহ খানেক আগে । কখনো আমার মুখ দেখতে না চাওয়া লোকটা হুট করে দেখা করার কথা বললে পরিবারের সবাই অবাকই হয়। পরিবার বলতে নানার বাড়ির সবাই। মামারা তো মহাখুশি। এই বুঝি আপদ বিদেয় হলো। আমি তখন নির্বিকার ।
বয়স আমার একুশ পেড়িয়ে বাইশে পড়লো। ইংরেজিতে অনার্স করার কথা থাকলেও তা হয়ে উঠলো না। দু চারটা টিউশন পড়িয়ে আম্মাকে নিয়ে কোনোরকম চলছি। সাথে ওই উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছি। এ বছরই শেষ হবে।
ছেলে পাবলিক ভার্সিটি থেকে অনার্স শেষ করেছে। দেখতে সুদর্শন। বাপের জমিজমার অভাব নেই। অমন ঘর থেকে সম্বন্ধ আসায় মামারা যেনো হাতের চাঁদ পেলো। খোঁজ নিয়ে আর কি হবে? ছেলে মানুষের অমন দুয়েকটা অতীত থাকে। ওসব কিছু না। মেয়ে মানিয়ে ঘর করতে পারলেই হলো।
কিন্তু সেই মানিয়ে ঘর করা পর্যন্ত আমি আর যেতে পারলাম না। আফসোস নেই আমার। উল্টো শান্তি লাগে। কষ্ট হয় আম্মার জন্য। বেচারী বড্ড কথা শুনে আমার জন্য। কিন্তু আমিই বা কি করবো? আব্বু মারা যাওয়ার পর থেকে শান্তির মাকে আমি আর খুঁজে পাই নি। এখন অব্দি খুঁজেই চলেছি।
মায়ের ডাকে আপনা চিন্তার জগত থেকে বাস্তবে আসলাম। মামাতো বোন আসমা আমাকে খয়েরী রঙের একটা শাড়ি জড়িয়ে দিয়েছে গাঁয়ে। তাদের ভাবনা হলো, হলদে শাড়িতে শ্যামবর্ণা অনুপমাকে খারাপ লাগলেও লাল শাড়িতে হয়তো ভালো লাগবে। কিন্তু আমিতো শুনেছি লাল রঙে কালোদের মানায় না। যদিও লোকের কথা কোনোকালেই আমার অত ভাবার ছিলো না। একবার কলেজে থাকতে বসন্ত উৎসবে কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পড়েছিলাম,স্যার ম্যাম সবার প্রশংসায় ভাসা আমি দেখতে আসার দিনও সেই শাড়ি পরলাম। অথচ ক’দিন বাদে, বিয়ের মাস খানেক পর, জামাইয়ের খোঁজ না পাওয়া নিয়ে যখন সবাই চিন্তিত তখন ভদ্রলোক বললো আমি দেখতে ভালো না। বোধবুদ্ধি ও নেই। নাহলে শ্যামলা গায়ে হলুদ রঙ পরে সং সাজে কে?
বিয়ের এতদিন পর এমন কথা শুনে মামারা তো বেশ হইচই করলেন। আশেপাশের মানুষের কাছে মামারা আমার জন্য সাক্ষাত দূত। কিন্তু ঘরের খবর কজন জানে?
সকালে মামিদের গঞ্জনা গিলে বের হয়ে সন্ধায় ফিরে ঘুমিয়ে যাওয়ার গল্প কতজন শুনেছে? সবার কথা শুনে একুশ বছরের আমাকে থাপ্পড় মেরে গাল ফাটিয়ে দিয়ে আম্মার জ্ঞান হারানোর কথা কেই বা জানে? সেদিন মনে হয়েছিলো, বাপ না থাকা মেয়েদের জন্য অভিশাপ।
আসমা আপা হাতে একটা পার্স দিয়ে যাওয়ার জন্য বলতেই মায়ের দিকে তাকালাম। আম্মা এগিয়ে এসে কপালে চুমু দিলেন। হয়তো আশির্বাদ! মেয়ের সংসারটা যেনো টিকে সেই কথাই হয়তো আল্লাহর কাছে বললেন। কিন্তু আমি যেনো আমার রবে করিমের সিদ্ধান্ত জানতাম তাই চুপচাপই ছিলাম।
আমার সাথে লোকটা দেখা করে একটা পাবলিক প্লেসে। ঠিক করা সময়ের পঁচিশ মিনিট পর এসে পৌঁছোয় সে। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে এখানে আসতে ঠিক কতটা ঝামেলা হলো,সে সবই বললো। কথার ফাঁকে আড়চোখে আমাকে লক্ষ্য করতে ভুললো না সে। তার সে দৃষ্টি আমাকে, নিজেকে তাচ্ছিল্য করতে শিখালো।
বিচ্ছেদের কথা উঠায় জানতে পারলাম মামারা ওনাকে জোর করেছেন কথা বলার জন্য। তাই আমার কাছে জিগ্যেস করলেন, আমার কোনো আপত্তি আছে কি না?
আমি হাসি মুখেই না বললাম। বারবার ফোন চেক করায় দেখলাম কারও সাথে কলে আছেন। হবে হয়তো কেউ একজন।
সপ্তাহ খানেক পরই ডিভোর্স পেপার আমার দুয়ারে আসলো। বুঝতে পারলাম প্রচেষ্টা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। এতদিন যতটা নীরব ছিলাম,, পেপারে সই করতে গিয়ে ততটাই তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। আমার না হওয়া সংসারটার জন্য হাঁসফাঁস লাগলো। একবার বোধহয় নিজেকে দোষী ভেবেই ফেললাম যে, মেয়ে তুই ,একটু ধৈর্য্য ধরে নাহয় পড়েই থাকতি। কি এমন হতো তাতে? কিন্তু ওই যে আত্মসম্মান! এরজন্যই পারলাম না।
এরপরের সময়টা ঝড়ের গতিতে চলে গেলো। মাঝে হয়ে গেলো কিছু নাটক,, যা পরিচালনা করেছে আমার দাদি এবং একমাত্র চাচা। বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের কখনও দেখিনি খোঁজ নিতে। একবার দাদি মায়ের গহনা নিতে এসে জানিয়ে গেলো যে, বাবার ওখানে আর কিছু নেই। এখন সব চাচার। তাই যেনো কোনো ঝামেলা করতে না যাই। সত্যিই আর যাই নি। তবে আমার ডিভোর্সের কথা শুনে চাচি আসলেন। আম্মাকে বোঝালেন যে, মেয়ের এখন আর কোনো দাম নেই। ওই হলো শ্রী! এরপর আবার স্বামী দিয়েছে ছেড়ে। বেঁচে যে আছে তাই তো লজ্জার। কথার সারাংশ হলো, তার মেয়েবাজ ছেলের সাথে আমার বিয়ে দেওয়া। আর? আর আব্বুর সম্পত্তি টুকু তাদের আয়ত্তে নেওয়া। আম্মা রাজী না হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন যেনো। তবে ক্ষোভ ঝেড়েই ফেললেন। ফেব্রুয়ারির বিশেষ দিনে মেয়ে নিয়ে ধরা পড়ার কথা অবলীলায় বলে দিলেন। তাই হলো কাল। এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো মা মেয়ে দুজনই চরিত্রহীন। এতদিন দয়া দেখানো মানুষগুলোও কথাগুলো বিলি করলো। আমার শরীর মনে হয় আর সহ্য করলো না। কলেজ থেকে ফেরার পথেই বটতলায় লুটিয়ে পড়লাম। আবছা চোখে দেখলাম অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা মানুষকে। তারা কি ব্যথিত আমার দুঃখে? নাকি তাচ্ছিল্য করছে আমার ভাগ্যকে ?
চলবে?
