‘দরদিয়া পাখি’ [০১]-(সূচনা পর্ব)
-আফরোজা আঁখি।
‘মেঝেতে পড়ে শরীরের ব্যথায় কাতরাচ্ছে এক অষ্টাদশী কন্যা। একের পর এক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত তার পুরো শরীর। কেউ তার মনের সবটুকু রাগ উগরে দিচ্ছে মেয়েটার উপর। পিনপিনে বেতের আঘাতে রক্ত ঝরছে তার পিঠ থেকে। এত মার খেয়েও জড়বস্তুর মতো মেঝেতে পড়ে আছে মেয়েটা। না করছে আর্তনাদ, আর না আটকাচ্ছে তাকে মারতে থাকা ভদ্রমহিলাটিকে। বাড়িভর্তি মানুষগুলো সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন এ দৃশ্য, কারোর মনে একফোঁটা মায়া হচ্ছে না মেয়েটির জন্য। তবে এ বাড়ির সব থেকে নগণ্য মানুষটি গৃহকর্মী রাজিয়া বেগমের বড্ড মায়া হচ্ছে মেয়েটির জন্য। শাড়ির আঁচল মুখে গুঁজে কান্না করে যাচ্ছেন ভদ্রমহিলা। মেয়েটা যখন মার খেতে খেতে অজ্ঞান প্রায়, তখনই সিকদার বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভার্সিটি পড়ুয়া এক ২৩-২৪ বছর বয়সী যুবক। সামনের দৃশ্য দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। মনে হলো কেউ খামচে ধরেছে তার হৃদপিণ্ড! দ্রুত পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিল যুবক। রক্তচক্ষু নিয়ে সকলের দিকে একবার তাকিয়ে তাকাল মেয়েটিকে নির্দয়ের মতো মারতে থাকা নিজের মায়ের দিকে। মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“এসবের মানে কি, আম্মু? কেন মারছো ওকে? কী করেছে আমার ফুল?”
‘ছেলের কথায় ভীষণ বিরক্ত হলেন সালেহা বেগম। রাগে গর্জে উঠে বললেন,
“তোমার ফুল মানে? ওকে এক্ষুণি ছেড়ে উঠে আসো আহান।”
সাথে সাথেই জবাব এল আহানের থেকে,
“আসব না।”
‘আহান উঠে দাঁড়ালো।মেঝেতে পড়ে থাকা অচেতন পুষ্পিতাকে কোলে তুলে নিল সে।হাঁটতে শুরু করল সামনের দিকে।বাড়ির মানুষগুলো সব স্তব্ধ নেত্রে তাকিয়ে রইলেন ওদের যাওয়ার পানে। সালেহা বেগম সবার দিকে তাকিয়ে রেগে বললেন,
“দেখলে তোমরা? এই অসভ্য দুশ্চরিত্রা মেয়েটা আমার ছেলেদের মাথা খেয়েছে বসে বসে!”
‘সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল আহান। পছন্দের মানুষটি সম্পর্কে মায়ের মুখে এমন কথা শুনে থেমে গেল তার পা দুটো। ভ্রু কুঁচকে রক্তচক্ষু নিয়ে আবারও তাকাল ড্রয়িংরুমের দিকে। সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“ভুলেও ওকে আজেবাজে কথা বলবে না,আম্মু। খোদার কসম মে’রে ফেলব সবাইকে!”
‘হুংকার ছেড়ে বলে উঠলেন সালেহা বেগম,
“আহান!”
একইভাবে উত্তর দিল আহান,
“চেঁচাবে না। তোমার চেঁচামেচিতে বাড়ির বাকিরা ভয় পেলেও আমি ভয় পাই না।”
‘কথাটা বলে এক মিনিটও ব্যয় করল না আহান। দ্রুত পায়ে হেঁটে নিজের বড় বোন আরিয়ানার রুমে গেল সে। কোলে থাকা মেয়েটিকে শুইয়ে দিল বিছানায়। মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করতেই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল পানি। মেয়েটা আহত চোখে তাকিয়ে আছে আহানের দিকে। আহান ওর পাশে বসে হাতটা ধরে নিজের গালে ঘষে বলল,
“ফুল… কষ্ট হচ্ছে,তাই না? কেন ভুলভাল কাজ করিস বল তো! কেন মাকে ছটাস বারবার!তোর কষ্ট দেখলে যে আমার বুক পুড়ে!”
‘রমনীর ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি। তার হাবভাব এমন যেন কিছুই হয়নি। মেয়েটা ছাড়িয়ে নিল নিজের হাত,আহত স্বরে বলল,
“কেন আমার কাছে আসেন আহান ভাই?আমি যে নর্দমার কিট। আমার কাছ ঘেঁষা বারণ আপনাদের।”
“কে বলেছে তুই নর্দমার কিট? তুই ফুলের মতো স্নিগ্ধ। আমার ফুল তুই। তোর মন মাতানো সুবাস না নিলে যে অন্ধকারে ডুবে যাই আমি।”
‘হাসি পেল মেয়েটার। সে যে অন্ধকারে ডুবে আছে পুরোপুরি, তার সুবাস না নিলে অন্য কেউ নাকি পতিত হবে অন্ধকারে! আহান তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। ও ঘুরতেই পিঠের ক্ষতগুলো চোখে পড়ল। জামাটা খানিকটা ছিঁড়ে গেছে আর ছেঁড়া অংশ দিয়েই দেখা যাচ্ছে ক্ষত! আহান স্পর্শ করতে চাইল সেই ক্ষতস্থান, কিন্তু থেমে গেল কারো কর্কশ কণ্ঠের শব্দে,
“আহান, কমন সেন্স নেই তোর? ও একটা মেয়ে, আর তুই কিনা অনুমতি ছাড়া ওর গায়ে হাত দিচ্ছিস?”
‘দরজার পানে তাকাল আহান, দেখল নিজের বড়বোন আরিয়ানাকে। মেয়েটা দ্রুত এসে রুমে ঢুকল।আহানকে বেরিয়ে যেতে বললেই বেরিয়ে গেল সে। এ বাড়িতে বোধহয় আহানের পর আরিয়ানাই একমাত্র যে খেয়াল করে পুষ্পিতার উপর।মন থেকে ভালোবাসে মেয়েটাকে, তাইতো বাড়ি ফিরেই সবটা শুনে ছুটে এল সে। আরিয়ানার হাতে মেডিসিন দেখে শান্ত হলো আহান। বেরিয়ে গেল রুম থেকে। আরিয়ানা গিয়ে পুষ্পিতার পাশে বসল। মেয়েটার গায়ের জামা খুলে মেডিসিন লাগিয়ে দিল পুরো পিঠে। ওর ফর্সা পিঠে রক্তজমাট বেঁধেছে, কেমন ছিঁলে গেছে চামড়া। মায়া হলো আরিয়ানার। বড় একটা শ্বাস ছেড়ে ডাকল,
“পুষ্পিতা!”
সাথেসাথেই জবাব এল মেয়েটার থেকে,
“শুনছি।”
“কি করেছিলি তুই?আম্মু এভাবে মারল কেন তোকে? জানিসই তো উনি কেমন! কেন এত ভুল করিস বল তো! তোকে কষ্ট পেতে দেখলে যে আমাদেরও কষ্ট হয়!”
“আমাদের! আর কার কষ্ট হয় আরিয়ানা আপু? আমি মরে গেলেই বা কি যায় আসে এ বাড়ির মানুষের!”
“যায় আসে,পুষ্পিতা! এ বাড়ির অনেকেরই যায় আসে তোর কষ্টে!”
‘বিড়বিড় করে কথাটা বলে মনে মনে ভাবল আরিয়ানা। পুষ্পিতার কষ্টে অন্য কারো কষ্ট না হলেও একজনের ভীষণ কষ্ট হয়।সে সকলের অগোছরে খেয়াল রাখে মেয়েটার।তার সামান্য ভালো খারাপে যায় আসে ঐ মানুষটার!সেই তো আরিয়ানাকে পাঠিয়েছে এখানে! নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আবারও মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল আরিয়ানা,
“কি হয়েছিল পুষ্পিতা?”
পুষ্পিতা চোখ দুটো বন্ধ করলেই গড়িয়ে পড়ল নোনাজল। ভাবতে লাগল কিছুক্ষণ আগের ঘটনা-
‘সিকদার বাড়িতে চলছে বিয়ের তোরজোর।সিকদার বাড়ির বড় ছেলে আসমান সিকদারের বিয়ে প্রায় সাপ্তাহখানেক পর। আজকে বাড়িতে শাড়ি-গহনা নিয়ে লোকজন এসেছিল, সাথে এসেছিল আসমান সিকদারের হবু বউ স্নেহা! আসমানের অফিসের কিছু স্টাফ আর ওর বন্ধুরাও এসেছিল। সকলেই পুষ্পিতাকে আসমানের হবু বউ ধরে নিয়েছে। কনের জন্য আনা সকল গিফট ওকেই দিয়েছে ওরা। পুষ্পিতা কেমন ফেসাদে পড়ে গিয়েছিল, কাউকে কিছুই বলার সুযোগ পাচ্ছিল না সে।এমন সময় ঘটে স্নেহার আগমন। সে ধরে নেয়, পুষ্পিতা ইচ্ছে করেই এগুলো করছে।পুষ্পিতা মেউএটা এমনিতেই স্নেহার অপছন্দেএ তালিকায়,তারমধ্যে এসব নিতে পারল না স্নেহা। সেই রাগেই স্নেহা পরবর্তীতে শাস্তি দিল মেয়েটাকে।
‘বাড়ির সকলে মিলে যখন গহনা-গাঁটি আর শাড়ি পছন্দ করছিলেন, তখনই ওখান থেকে স্নেহার পছন্দ করা দামী গহনাটা হারিয়ে গেল। খুঁজতে খুঁজতে ঐ হারটা পাওয়া গেল পুষ্পিতার রুমে! মেয়েটা নির্বাক চোখে দেখে গেল সবটা। কি হলো আর কিভাবে হলো, কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। কেবল হাতজোড় করে বারবার বলছিল, সে এমন কিছু করেনি। সালেহা বেগমের রাগ বাড়ল তরতর করে। কিছুক্ষণ আগে যে সকলে পুষ্পিতাকে উনার ছেলের বউ ভেবে মাথায় তুলেছেন, এও কানে এল উনার। ভদ্রমহিলার মাথায় রাগ চড়ে গেল। উনার পছন্দের পাত্রীকে অপমান করা মেনে নিতে পারলেন না। সাথে সাথেই চুলের মুঠি ধরে টেনে-হিঁচড়ে পুষ্পিতাকে নিয়ে এলেন ড্রয়িংরুমে সকলের সামনে। স্বীকার করতে বললেন সে চুরি করেছে। কিন্তু পুষ্পিতা যে এমন কিছুই করেনি, সে বারবার মাথা নাড়িয়ে বলছিল গহনাটা কোথা থেকে ওর রুমে গেল জানে না। সালেহা বেগমের বিশ্বাস হলো না পুষ্পিতার কথা। কাউকে পাঠিয়ে বাঁশঝাড় থেকে পিনপিনে বেত আনালেন তিনি, মেয়েটাকে মেঝেতে ফেলে মারতে শুরু করলেন সকলের সামনেই!পুরোটা সময় রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিল স্নেহা। নিজের কাজে সফল হয়েছে ভেবেই তার এত আনন্দ! পুষ্পিতা যখন ব্যথায় কাতরাচ্ছিল, অজ্ঞান হয়ে যাবে এমন অবস্থা, তখনই আগমন ঘটে আহানের!
_____________________
‘সবটা বলে থামলো পুষ্পিতা। আরিয়ানার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল তখন। ও জানে পুষ্পিতা মিথ্যা বলার মেয়ে নয় সে কখনোই মিথ্যা কথা বলতে পারেনা।ইশশ! নির্দোষ মেয়েটা এতো কষ্ট পেয়েছে অকারণে!ওর যে কষ্ট হচ্ছে।খুব কষ্ট হচ্ছে।মায়ের প্রতি প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। ও জানেনা কি কারণে পুষ্পিতা উনার দু চোখের বিষ কিন্তু কারণে অকারণে মেয়েটাকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা মোটেও ভালো লাগেনা ওর!
আরিয়ানা খেয়াল করল—’কথাগুলো বলেই চোখ বুজেছে পুষ্পিতা। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটাকে বিরক্ত করল না আরিয়ানা,উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কল দিলো পরিচিত কারো নাম্বারে। ওপর প্রান্তের মানুষটা কল রিসিভ করতেই বলল,
“চিন্তার কিছুই নেই।তুমি নিশ্চিতে থাকো,ও এখন ঠিকঠাক আছে।”
#চলবে…?
