Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"কাব্যের বিহঙ্গিনীকাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৩৫+৩৬

কাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৩৫+৩৬

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৩৫
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

রাইয়ের কথায় সবাই ভুত দেখার মতো মেহবিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কারন এতোদিন তো তারা অন্য কিছুই শুনেছিল। কেউ কিছু বলবে তার আগে মেহবিন বলল,,

“আমার পার্সোনাল বিষয়ে আপনারা না ঢুকলে খুশি হবো। আমি যেভাবেই আমার লাইফ লিড করি না কেন? তাতে আপনাদের কিছু যায় আসে না। আর আমি চাইও না আমাকে আমার জীবনের যাপনের ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন করুক। তাই দয়া করে প্রশ্ন করবেন না আর করলেও আমি উত্তর দিতে বাধ্য নই।”

একথা শুনে রাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মেহবিনের দিকে। তবে এই মুহূর্তে চুপ থাকাই ভালো তাই কোন কথা বললো না। বাকিরা আর কি বলবে মেহবিনের কথা শুনেই মুখ বন্ধ। তখন মেহবিন বলল,,

“কার কি হয়েছে এ বাড়িতে?”

তখন আরিফা জামান বললেন,,

“আসলে নুপুরের মায়ের একটা কিডনি অকেজো ধরা পরেছে সেটারই অপারেশন এর জন্য ওনাকে ডাকা।

“এটা তো ডক্টর নুপুরই করতে পারতেন ? তিনিও তো এই বিষয়ের ডক্টর।

তখন নুপুরের মা বলল,,

“আমার মেয়ে করবে কিভাবে শুনেই তো আমার মেয়েটা আধমরা হয়েছে একটু পর পর কাঁদছে। যদি আমার কিছু হয়ে যায় সেই জন্যই তো আরবাজের সাথে আমার মেয়েটার বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো হলো না।”

মেহবিন নুপুরের দিকে তাকালো দুঃখের কিছুর ছিটেফোঁটাও দেখতছ পেল না মেহবিন। ও বলল,,

“ওহ আচ্ছা। চিন্তা করবেন না রাই খুব ভালো ডক্টর ইনশাআল্লাহ আপনার অপারেশন সাকসেসফুল হবে।”

“ও যে বলল তুমি ওর থেকেও ভালো তাহলে তুমিই করো না।”

“আমি ভালো এর মানে এই নয় যে রাই খারাপ। ওকে সেই সুদূর ইন্ডিয়া থেকে এখানে এনেছেন। আর এখন ভালো পেয়ে গেলেন দেখে ওর কোন মুল্য নেই নাকি। ডেকে এনে অপমান করা বলে এটাকে।”

তখন রাই মেহবিনের হাত ধরে বলল,,

“ধুর আমি কিছুই মনে করিনি। উনারা করাক না তোকে দিয়ে এতে আমি খুশিই আছি।”

“তুই চুপ থাক।”

“যার যার প্রাপ্য মর্যাদা তার পাওয়া উচিৎ। পৃথিবীতে এতো ডাক্তার থাকতে তোকেই কেন সিলেক্ট করলো সেটাও তো ভালোর কথা শুনেছে বলে তাই। আর এখানে এসে তুই বললি আমি ভালো ওমনে আমার কাছে করাতে চাইছে। এটাতে তোর সম্মানহানি হচ্ছে না নাকি। মানুষ কে তার সঠিক মর্যাদা দিতে শিখুন মিসেস ( নুপুরের মা)।”

তখন নুপুরের মা বলল,,

“আমি সেটা মিন করে বলি নি। নিজেকে নিয়ে ভিশন টেনশনে আছি ভয় হচ্ছে তাই আমায় মাফ করে দিন। আমার অপারেশন রাই মালিকই করবেন।”

“হুম বুঝলাম। যাই হোক আসছি আমি।

তখন রাই বলল,,

“আরে দাঁড়া আমিও যাবো তো তোর সাথে!”

“তোর না ফ্লাইট আছে।”

“ক্যানসেল করে দিয়েছি তোর কাছে থাকবো দুদিন।”

“কি!”

“হ্যা এখন কথা না বলে চল তোর বাড়ি।”

“তুই এখন ইন্ডিয়া তোর বাড়ি যাবি আমি রাখবো না তোকে।”

“আমি থাকবো।”

“এখানে কিন্তু তোর ইলাহী রুম নেই সাথে এই আবহাওয়ার সাথে তুই কমফোর্টেবল হবি না। অসুস্থ হয়ে পরবি আমি চাই না দুদিন এখানে থাকতে গিয়ে দশদিন বিছানায় পরে থাকিস।”

“আরে কিছু হবে না তুই আছিস না আমার ডাক্তার বন্ধু।”

“রাখবো না তোকে তাছাড়া দাদান দিদান চিন্তা করবে না।”

“আরে কেউ কিছু করবে না দাড়া ফোন দিচ্ছি বুড়োবুড়িকে।”

“রাই!”

“সরি সরি দাদান দিদান কে।”

রাই ফোন দিল মেহবিনের কথা শুনেই তারা রাজি সাথে বলল ওর কাছে দিতে। মেহবিন ফোন ধরে সালাম দিল ওর রাইয়ের দাদা দাদি রাইয়ের থেকেও বেশি ড্রামাবাজ এখন বলছে তারাও নাকি আসবে। তা শুনে মেহবিন বলল,,

“তোমরা কি রাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাগল হলে নাকি। তোমাদের আসতে হবে না তোমার নাতজামাই পেয়ে গেলে আমিই চলে যাবো তোমাদের ওখানে।”

কিছুক্ষণ কথা বলে রেখে দিল মেহবিন তখন রাই ভ্রু নাচিয়ে বলল,,

“এবার এবার!

মেহবিন হেঁসে বলল,,

“হুম চলুন এখন!”

শেখ পরিবার বলবে কি ওদের দিকেই এতোক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। রাই আর মেহবিন বের হবে। তখন রাইফা বলল,,

“আপনারা দুজন কি বেস্ট ফ্রেন্ড?”

তখন রাই পেছনে ফিরে হেঁসে বলল,,

“না বেস্ট ফ্রেন্ড না কারন মেহবিন বেস্ট ফ্রেন্ড নামক শব্দটাকে সহ্য করতে পারে না। তবে আমাদের সম্পর্কের নাম দেওয়া যেতে বন্ধু কম বোন বেশি।”

মেহবিন পেছনে ঘুরলো না ঘুরলে হয়তো দেখতে পেত অন্য কিছু। মেহবিন যাচ্ছে দেখে রাই ও পেছনে দৌড় দিল। বাকিরা শুধু দেখেই গেল। তবে সবার মনেই প্রশ্ন রয়েছে কিন্তু করতে পারলো না। রাইফা শান্ত চোখে মেহবিন কে যেতে দেখল তারপর সে নিজেও আস্তে আস্তে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। নুপুরের বাবার এই অবস্থায় নুপুরের মা অসুস্থ তাই ওনাকে এখানে আনা হয়েছে। এখানেই থাকবে এখন থেকে কিছুদিন। থাকাটা যাতে পার্মানেন্ট হয় এই জন্য মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। অবশ্য মেয়েও দুই পায়ে রাজি।
______________

“ডাক্তার তুমি আবার এই আপদ টারে পাইলা কই?”

তাজেলের কথা শুনে মেহবিন ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকালো। তখন রাই বলল,,

“এই তুমি আমাকে আপদ বলছো কেন?”

“আপদ কওয়া ভুল হইছে তোমারে বিপদ কওয়া দরকার আছিল।”

“কি হয়েছে নেত্রী সে কি করেছে?”

“কি করে নাই আমি কুলসুম রাস্তায় হাঁটতে ছিলাম। হেয় গাড়ি থামাইয়া জিগাইলো চেয়ারম্যান বাড়ি কোন দিকে আমরা কইয়া দিলাম আর হেয় যাইয়া আমাগো রাস্তার ধারে রান্দার জন্যে বাদাইল বাইর করুম দেইখা কাটা কলা গাছ রাস্তায় উঠাইছিলাম উনি গাড়ি নিয়া যাওয়ার সময় ধাক্কা মাইরা আবার নিচে ফালাই দিছে আর হেইডা একদম ঝোড়ে গিয়া পরছে। আমি আর কুলসুম ঐডা নিচ থেইকা উডাইয়া দা আনবার গেছিলাম বাড়ি আর ঐডাই নেওয়ার জন্য আসতেছিলাম। হেয় আইসা আমাগো সব কষ্ট বিফলে দিছে।

তখন মেহবিন রাইয়ের দিকে তাকালো তখন রাই বলল,,

“আমার দিকে তাকাস কেন? আমি কি গাড়ি চালাইছি নাকি গাড়ি তো ড্রাইভার চালাইতে লাগছিল। আর কলা গাছের সময় আরেকটা গাড়ি যাচ্ছিল তাই সাইড দিয়ে যাওয়ার সময় লেগে গেছে হয়তো।”

“তুমি কোন কথা কইবা না তুমি গাড়িতে আছিলা মানে দোষ তোমার ।”

“আচ্ছা সরি।”

“তোমার সরিতে কি এহন কলা গাছ হাইটা আমার কোলে আসবো।”

তাজেলের কথায় মেহবিন হাসলো আর বলল,,

“বাদ দাও ও কিছু করে নি নেত্রী। কাল আমার বাড়ির পেছন থেকে তোমায় কলা গাছ কেটে বাধাল বের করে দেব।”

“কাল তো কাটা লাগবো আইজ কাটা আছিল ওই রাস্তার নিচে কাকা কাটছিল।”

“সমস্যা নেই কাল আমি কেটে দেব।”

“আইচ্ছা। দাদি কয়দিন ধইরা বাদাইল বাদাইল করতেছে। হের নাকি বাদাইল ভাজা খাইতে মন চাইছে।”

“এখন তো সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে নাহলে আজই কেটে দিতাম।”

“সমস্যা নাই।”

“হুম এখন গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নাও আর মাগরিবের নামাজ পড়ে পরতে বসো।”

“আইচ্ছা কিন্তু ইডা কিরা হেইডা তো কইলা না?”

“ওর নাম রাই আমার বন্ধু আমার সাথে দু’দিন থাকবে।”

কথাটা শুনে তাজেল এমন লুক দিল যেন ওর চোখ বলছে আমার ভালোবাসায় তুই ভাগ বসাইতে আইছোস তোরে আমি ছাড়ুম না। তাজেল মেহবিনের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আইচ্ছা। তাইলে আমি গেলাম।”

“হুম!”

তাজেল চলে গেল যেতে যেতে পেছনেও তাকালো দুই তিন বার। ও যেতেই রাই বলল,

“ও কে?”

“ওর নাম তাজেল আমি নেত্রী বলি।”

“কেন?”

“সে বিরাট কাহিনী ভেতরে চল।”

“বাধাল কি? মেয়েটা বার বার বলছিল।”

“কলা গাছের ভেতরে থাকে সাদা রঙের শক্ত কাল দেখাবো তোকে। অনেক খোসা ছাড়িয়ে তারপর ভেতরে পাওয়া যায়।”

“ওহ আচ্ছা!”

মেহবিন ওকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ওকে এক সেট থ্রিপিস দিয়ে বলল ফ্রেস হয়ে নিতে। রাই ফ্রেস হয়ে বের হতেই দেখলো মেহবিন কফি চকলেট আর নুডুলস এক ট্রে তে সাজিয়ে রেখেছে। দেখেই রাইয়ের মুখে হাঁসি ফুটে উঠল।কারন এই তিনটা জিনিসই ওর পছন্দের। ও গিয়ে বলল,,

‘এহসাব মেরে লিয়ে?’

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

‘নেহি পারোসি কি স্যাহিলি কে লিয়ে।”

‘ইটস্ মিনস মেরে লিয়ে।”

‘ঐ তোর হিন্দি বাদ দে আর চুপচাপ খেয়ে নে।”

“হুম দোস্ত খুব ক্ষুদা লাগছে।”

ও বিছানায় বাবু হয়ে বসে নুডুলসের বাটিটা হাতে নিয়ে আয়েস করে খেতে লাগল আর বলল,,

“এই জিনিসটাই বিগত দেড় বছর আমি খুব মিস করেছি ইয়ার।”

“আমিও মিস করেছি তোর এই ঢং।”

‘হ হইছে এখন জিজুকে কল দাও। এইবার জিজুরে না দেখে আমি দেশে যাইতেছি না।”

‘সে এখানেই আছে কল দিলেই চলে আসবে এতো চিন্তা করতে হবে না। কালকে বিকালে দেখা করিয়ে দেব ইনশাআল্লাহ।”

‘হুম এখন তুই খাবি নাকি নুডুলস?”

“না আমি কফি খাচ্ছি এই ঠিক আছে। এখন আর কিছু খাবো না।”

‘আইচ্ছা।”

তার কয়েকমিনিট মাগরিবের আজান দিল। মেহবিন ওযু করে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিল। ওরা এসে গল্প করতে লাগলো। মেহবিন আর রাই ক্লাসমেট সেই সাথে রাইদের দাদাদাদির বাসায় পেং গেস্ট থাকতো। রাইয়ের মা বাবা নেই দাদাদাদির কাছেই মানুষ। উনাদের বিদেশেও একটা বাড়ি আছে কিন্তু পৈত্রিক বাড়ি ইন্ডিয়ায়। রাইয়ের পড়াশোনার জন্য ওখানেই তিনজনে গিয়েছিল। ছেলে বউমার মৃত্যুর পর দাদাদাদির বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল রাই তাই ওকে কখনো কাছছাড়া করেন না তারা। মেহবিন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল যেদিন ও সবকিছু জানলো। যদিও প্রথমে মেহবিন রাইয়ের সাথে সম্পর্ক করতে চায় নি কারন ও বন্ধু বানাতে চায় না। মেহবিন পড়াশোনা ছাড়া রুম থেকেই বের হতো না। অবশ্য মাঝে মাঝে ওর দাদা দাদির সাথে গল্প করতো। কিন্তু রাইকে তেমন একটা সুযোগ দিতো না। রাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারপর বন্ধু হয়েছে। বন্ধু না হওয়ার আরেকটা কারন ওর নাম রাই। আর ও বেস্ট ফ্রেন্ড নামক শব্দটাকে পছন্দ করে না। অতঃপর আস্তে আস্তে রাই হয়ে উঠে মেহবিনের হাসির কারন। যতো ফালতু কাজ আছে সবগুলো করে মেহবিন কে হাসাতো। অতঃপর মেহবিন ওকে জানায় ওরা কিন্তু বেস্ট ফ্রেন্ড নামক শব্দটাকে ইউজ করতে পারবে না। অতঃপর মেহবিন কিছু ঘটনা বলে। রাই তারপর থেকে ঐ শব্দটার ব্যবহার করে না। দুই বান্ধবী অনেক গল্প করলো তারপর ঘুমিয়ে পড়লো। সকাল সকাল তাজেল হাজির হাতে বড় একটা দা নিয়ে। মেহবিন সকালে রাইকেও উঠিয়েছে যদিও রাইয়েই একটু অসুবিধা হচ্ছিলো এখানে খাপখায়িয়ে নিতে। তবুও সে সামলে নিয়েছে তাছাড়া মেহবিন তো আছে। তাজেলের হাতে দা দেখে রাই বলল,,

“তুমি দা হাতে কি করছো?”

তাজেল একটা দাঁত কেলানি দিয়ে বলল,,

‘তোমার ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করুম তো তাই নিয়া আইছি।”

তাজেলের কথা শুনে রাই মেহবিনের পেছনে গিয়ে ওর হাত ধরলো। তা দেখে তাজেল খিলখিল করে হাসলো আর মেহবিন মুচকি হাসলো। তাজেল হাঁসি থামিয়ে বলল,,

“ডাক্তার তোমার বন্ধু তো বুকদা। এই দাও দিয়া কি হেতির গলা কাটা যাইবো ঠিকমতো পোসই লাগবো না।বাদাইল বাইর করুম হের লাইগা এইডা আনছি।”

রাই পেছন থেকে বের হয়ে বলল,,

‘আগে বলবে না হুদাই আমাকে ভয় দেখাইলা।”

“তুমি এই বাচ্চা পুলাপাইন দেইখা ডরাইবা তা কি আমি জানি নাকি। ডাক্তার এহন নও আবার রানবো এহন।”

মেহবিন বাড়ির পেছনে গিয়ে একটা কলাগাছ কাটলো। ওপর থেকে কলা গাছের খোসা ছাড়ালো তখন তাজেল বলল বাকিটা সে ছাড়াবে। কিন্তু পারলো না অনেক শক্ত তাই মেহবিন ওকে খোসা ছাড়িয়ে বাধাল বের করে দিল। অতঃপর তাজেল বাড়ি চলে গেল। আজ শনিবার তাই মেহবিনের হাসপাতাল নেই। ও রাইকে নিয়ে পুরো গ্ৰাম ঘুরলো সাথে তাজেলকেও নিল। রাইয়ের অভ্যাস মেহবিনের সাথে বের হলে ওর হাত ধরে হাঁটবে। এদিকে তাজেলের ও সেইম। রাইকে হাত ধরতে দেখে তাজেলের মন চাইলো এখনি ওকে গিলে ফেলতে মেহবিন কে বলল,,

‘ডাক্তার আমার পাও বিষ করতেছে আমারে একটু কোলে নেও তো।”

তাজেলের কথায় মেহবিন ওর দিকে তাকালো। তাজেল অদ্ভুত ভাবে রাইয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে মেহবিন বুঝতে পারলো আমাদের নেত্রীর জেলাসি। মেহবিন ভেবে পায়না এই মেয়েটা এমন কেন সে মেহবিনের ভাগ কাউকে দিতে রাজি নয়। মেহবিন হেঁসে ফেললো তাজেল দুই হাত উঁচু করে বলল,,

“নিবা না নাকি? না নিলে কইয়া দেও আমি বাড়ি যাইগা আস্তে আস্তে।”

মেহবিন হেঁসে ওকে কোলে নিল। এদিকে বেচারা রাই কি হলো কিছু বুঝতে পারলো না। কিছুদূর যাওয়ার পর তাজেল বুঝলো মেহবিনের একটু কষ্ট হচ্ছে তাই ও বলল,,

‘ডাক্তারের বন্ধু এহন তুমি নেও ডাক্তারের কষ্ট হইতেছে।”

তা শুনে রাই বলল,,

“আমার নিজেরই হাঁটতে কষ্ট হয় তোমাকে কোলে নিয়ে কিভাবে হাটবো আমি?”

“হ তাও ঠিক। তুমি যে চিকনা আমারে নিলে তোমার হাড্ডি মরমর কইরা ভাইঙ্গা পরবো। ডাক্তার আমারে নামাই দেও পায়ে বিষ কইমা গেছে।”

মেহবিন হেঁসে ওকে নামিয়ে দিল। এদিকে রাই তাজেলের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। ওকে এত বড় একটা কথা বলল। ও কিছু বলবে তার আগে মুখর এলো মাস্ক পরে মেহবিন ওর সাথে রাইয়ের পরিচয় করিয়ে দিল। এক ফাকে মাস্ক খুলে চেহারাটাও দেখিয়ে দিল। কিছুক্ষণ কথা বলে মুখর চলে গেল। মেহবিনরাও বাড়ি ফিরে এলো। রাতে রাইকে মেহবিন তাজেলের ব্যাপারে জানালো তা শুনে রাই হাসলো আর খুশিও হলো এরকম মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। পরের দিন সকালে রাই চলে যাবে কারন এখানে ও মানিয়ে নিতে পারছে না। শহর হলেও একটা কথা ছিল এটা গ্ৰাম মেহবিনই পাঠাচ্ছে ওকে ও আরো তিন-চার দিন থাকতে চাইছিল একেবারে অপারেশন করে যেতে চাইছিল। যাওয়ার আগে তাজেলের গাল টেনে বললো মেহুর থেকেও তাজেলের কর্মকাণ্ড ও বেশি মিস করবে। সাথে এটাও বলল এভাবেই মেহবিন কে ভালোবেসো। রাই চলে গেল পাঁচ দিন বাদে আবার আসবে বাংলাদেশে নুপুরের মায়ের অপারেশন করতে। আরবাজদের হাসপাতালে।

_______________

আরবাজ বসে আছে পুরো শাহরিয়ার পরিবারের সামনে পাশে মুখর। একটু আগেই সে জানিয়েছে নাফিয়ার ব্যাপারে সবাই অবাক হলেও পরে আরবাজের পরিবার আর আরবাজ কে দেখে রাজি হয়েছে কারন সবাই আরবাজকে খুব ভালোভাবেই চেনে। মুখর মাহফুজ শাহরিয়ার কে আগেই বলেছে আরবাজ সব জেনেই এই প্রস্তাব দিয়েছে তাই তিনি কিছু বলেন নি। তবে ব্যাপারটা নাফিয়া জানে না। তখন হুট করে নাফিয়া বলল,,

“আমি ওনার সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চাই।”

আরবাজ নাফিয়ার সাথে ছাদে গেল। ওখানে গিয়ে নাফিয়া বলল,,,

‘দেখুন আপনি হয়তো আমার ব্যাপারে না জেনেই এই প্রস্তাব দিয়েছেন?”

তখন আরবাজ বলল,,

“আমি সবটা জানি মিস নাফিয়া।”

আরবাজের কথা শুনে নাফিয়া ওর দিকে তাকালো। আর বলল,,

‘তবুও আপনি প্রস্তাব দিলেন?’

আরবাজ হেঁসে বলল,,

“পৃথিবীতে বাচ্চাই সবকিছু নয়। সবথেকে বড় জিনিস টা কি জানেন মানসিক প্রশান্তি আর যদি থাকে পছন্দের মানুষটি তাহলে তো কথাই নেই।”

নাফিয়া সেদিনের ছেলেটার কথা ভাবলো সে কি বলেছিল আর আরবাজ কি বলছে। ও বলল,,

‘যদি একটা সময় মনে হয় বাচ্চাটাও একটা বড় ফ্যাক্ট।”

তুমি কিন্তু বাচ্চাটাকে বড় করে দেখছো কিন্তু আমি না। সবথেকে বড় কথা নাফিয়া একটা মানুষ সবদিক দিয়েই পারফেক্ট নয়। তবুও যদি বলো বাচ্চার কথা তাহলে বলবো এখানে ২% চান্স রয়েছে। অনেক সময় ০.৯৯% এও অনেক কিছু হয়ে যায় আর এখানে ২% আছে। তুমি জানো নাফিয়া বহু নবী নিঃসন্তান ছিলেন। হজরত জাকারিয়া (আ.) বার্ধক্য পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। তাছাড়া আল কুরআন এ সন্তান লাভের জন্য বিশেষ দোয়া রয়েছে। ইনশাআল্লাহ দুজন মিলে আমরা সেগুলো আমল করবো। হযরত মরিয়ম (আ) তিনি তার সময়ে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ আসে তার জন্য তখন তিনি এই বিশেষ দোয়া করেছিলেন,

‘রব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান ত্বইয়্যিবাতান, ইন্নাকা সামিউ’দ দুআ।

অর্থ : হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা কবুলকারী।’
(সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ৩৮)

হজরত ইবরাহিম (আ.) একসময় নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে এ মর্মে দোয়া করেছেন—

‘রব্বি হাবলি মিনাস সলেহিন।
অর্থ: হে আমার প্রভু! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১০০)।

উত্তম নেক জীবনসঙ্গী ও সন্তানের জন্য আল কুরআন এ দোয়া রয়েছে।

“রব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররতা আ’ইয়্যুন ওয়াজাআলনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমামা”। (সূরা ফুরকান:৭৪)

“অর্থ: ইয়া আল্লাহ আপনি আমাকে এমন স্বামী/স্ত্রী এবং সন্তান দান করুন যাদের দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।আর আপনি আমাকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন”

মহান আল্লাহ সময়ের মাধ্যমে তাঁর বহু নৈকট্যশীল বান্দাকে সন্তান নামক নিয়ামত না দিয়েও পরীক্ষা করেছেন, তাঁরা যথারীতি উত্তীর্ণও হয়েছেন। হজরত জাকারিয়া (আ) স্ত্রী বন্ধ্যা ছিলেন, অনেক ধৈর্য ও দোয়ার পর মহান আল্লাহ শেষ বয়সে একজন সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আইয়ুব (আ) অনেক সন্তান-সন্ততি দিয়ে আবার তাদের কেড়ে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ইবরাহিম (আ) এর জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁদেরও অনেক বছর নিঃসন্তান রাখা হয়েছিল। এমন অনেক উদাহরণ ইসলামে পাওয়া যাবে। তাই সন্তান না হলে হতাশ হওয়ার কারন নেই। (এখানে কিছু কথা সংগৃহীত)

সব শুনে নাফিয়া আরবাজের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। এই মানুষটা কতো করে ওকে চায় সেটা ওর কথার ধরনেই বুঝতে পারছে নাফিয়া। যেখানে কিনা ওকেই বিয়ে করার জন্য অন্যকে মানানো উচিত। সেখানে একজন ওর সমস্যার জন্যই ওকে মানাচ্ছে। ও অবাক হয়েই অস্ফুট স্বরে বলল,,

“ভালোবাসেন আমাকে?”

আরবাজ মুচকি হেঁসে বলল,,

‘ভালোবাসি কিনা জানিনা তবে তোমাকে আমার উত্তম জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই। হয়তো ভালোবাসি বলেই পেতে চাই। তাই তো অনুভূতি খারাপ দিকে যাওয়ার আগে হালালভাবে তোমায় পেতে চাইছি।”

‘আমাকে পেয়ে কখনো আফসোস করবেন না তো। ভাববেন না আমার থেকে অন্য কাউকে পেলে ভালো হতো একটা সন্তান প্রাপ্ত হতো।

আরবাজ মুচকি হেঁসে বলল,,

“লেখিকা আজরিনা জ্যামির ছোট্ট একটা লেখা আছে,,

“প্রাপ্তি আর তৃপ্তির মাঝে বিস্তর ফারাক। সব প্রাপ্তি তৃপ্তি দেয় না। আবার জীবনের সব ইচ্ছে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় না।”

এই কথাটার মানে হলো আমরা কিন্তু সব প্রাপ্তিতে তৃপ্তি হতে পারি না। যেখানে তুমি প্রাপ্তিতে নেই সেখানে তৃপ্তি পাবো কিভাবে। আর জীবনের সব ইচ্ছে কিন্তু সত্যিই আমাদের জীবনে প্রাপ্তির খাতায় হয়না । কিন্তু আমি আমার এই ইচ্ছেকে প্রাপ্তির খাতায় যোগ করতে চাই।”

সব শুনে নাফিয়ার মুখে হাঁসি ফুটে উঠল ও বলল,,

“আমি রাজি।”

“অতঃপর দুলহান তাহলে রাজি হলো আমার।”

আরবাজের কথায় নাফিয়ার হাঁসিটা যেন আরো প্রসারিত হলো। আরবাজ হেঁসে নিচে চলে গেল। নাফিয়াও গেল। নাফিয়া আসলে মাহফুজ শাহরিয়ার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন বিয়ের জন্য সে জানালো তারও আপত্তি নেই। আরবাজ আসলে মুখর বলল,,

‘কি বলল নাফি?”

‘যা বলার তাই বললো তোকে বলবো কেন? আমাদের পার্সোনাল কথা।”

‘এখন পার্সোনাল কথা হয়ে গেল।”

‘হুম!”

আরবাজ সবার উদ্দেশ্যে একটা কথা বলল,,

‘আংকেল আমি আপনাদের আরো একটা কথা বলতে চাই।”

মাহফুজ শাহরিয়ার বললেন,,

“হ্যা বলো বাবা।”

‘আংকেল আমি চাই নাফিয়ার সমস্যার কথা আমার বাড়ির কেউ না জানুক।”

‘এটা কি করে হয় পরে জানতে পারলে ওনারা কষ্ট পাবেন সেই সাথে আমাদের এবং নাফিয়ার প্রতি উনাদের বিরুপ ধারনা হতে পারে। তাছাড়া এটা একপ্রকার ধোঁকা দেওয়াও বলা যায়।

‘ধোঁকা তখন হতো যখন আমি জানতাম না। নাফিয়ার সাথে আমার জীবন জুড়তে যাচ্ছে তাই আমি জানাটাই যথেষ্ট নয় কি। আর বাকি সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দেন। তারা কখনো নাফিয়ার সমস্যার কথা জানবেন না। সবথেকে বড় কথা আমার ওপর বিশ্বাস করুন যাই হয়ে যাক না কেন আমি ওর হাত ছাড়ছি না।”

আরবাজের কথা শুনে সবার মুখে প্রশান্তি ছেয়ে গেল মাহফুজ শাহরিয়ার বললেন আরবাজ যা চায় তাই হবে। তিনি এটাও বলল মাহফুজ শাহরিয়ার অসুস্থ থাকার কারনে আলভির বিয়েটা এখনো হয় নি। এখন বাড়ির মেয়ে ছেলের বিয়েটা একসাথে ও দেওয়া উচিত হবে কি না। যদি আরবাজের পরিবার রাজি থাকে তাহলে বিয়ে বউভাত কোন রিসোর্ট এ গিয়ে করা যাবে। আরবাজ বলল এ বিষয়ে ওর পরিবারের সাথে কথা বলতে। আরবাজ কথা শেষ করে চলে গেল মুখর কে নিয়ে ও ও ফিরবে আরবাজের সাথে।
________________

নুপুরের মায়ের অপারেশন সাকসেসফুল হলো। সেই ফাকে সবাই নাফিয়াদের বাড়ি গিয়ে সব ফাইনাল করতে গেল। সবার নাফিয়াকে অনেক পছন্দ হলো সেই সাথে পরিবার ও। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে শেখ শাহেনশাহ এতে বেকে বসলেন বিয়েটা তার বাড়িতেই হবে কোন রিসোর্ট এ না কারন তার নাতির বিয়েতে পুরো মহুয়াপর খাবে। আর ধুমধাম করে দেবে নাতির বিয়ে দেবে। এ কথা শুনে আলভি বলল নাফিয়ার বিয়েটাই তাহলে আগে দিতে। ওদেরটা নয় পরে দেওয়া যাবে ও নিজেও নাফির বিয়েতে মজা করতে চায়। এ কথা শুনে মাহফুজ শাহরিয়ার বাঁধ সাধলো এমনিতেও দেরি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এক খরচেই দুই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আছলাম আর মাহফুজ শাহরিয়ার। আলভির বিয়েটা দেরি হচ্ছে তাই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটাও তারা জানালেন পরে সব শুনে শেখ শাহনাওয়াজ বললেন আলভির বিয়েটা সেরে ফেলতে আর আরবাজ আর নাফিয়ার এখন এঙ্গেজমেন্ট করে রাখুক পরে বিয়ের অনুষ্ঠান করা যাবে। কথাটা শুনে সবাই রাজি হলো। অতঃপর দশদিন পর আরবাজ আর নাফিয়ার এঙ্গেজমেন্ট। শেখ শাহেনশাহ চান তার বাড়িতেই হবে। তারমধ্যে তারাও ঘুরে আসুক মেয়ের কোথায় বিয়ে হচ্ছে। শাহরিয়ার পরিবার রাজি হলো এতে। অতঃপর দশ দিন পর আরবাজ আর নাফিয়ার এঙ্গেজমেন্ট ঠিক করা হলো। রাতে মেহরব চৌধুরী কে সব জানালে তিনি আছলাম আর মাহফুজ শাহরিয়ার মিলে বিশদিন পর আলভি আর মাইশার বিয়ের ডেট ফিক্সড করলেন।

_____________

রাতে বাড়ি ফিরে সবাইকে নিয়ে বসে শেখ শাহনাওয়াজ আরবাজকে বললেন,,

“আরবাজ তোমার নানাবাড়ি বলা উচিৎ নয় কি?”

তখন আরিফা জামান বললেন,,

‘আবার তাদের কেন?”

তখন আরবাজ বলল,,

‘বড়মা তাদের জানার অধিকার আছে তাদের বাড়ির মেয়ের ছেলের বিয়ে হচ্ছে এবং বিয়ে কোথায় আর কার সাথে হচ্ছে।”

অনেকদিন পর বড়মা শুনে আরিফা জামানের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। আরবাজ তাকে সহজে ডাকে না। তবে আজ কেন? ডেকে কি বুঝিয়ে দিল তার সাথে ওর সম্পর্ক কি। আরিফা জামান নিজেকে সামলিয়ে বললেন,,

“না আমি বলতে চাইছিলাম অনেক বছর ধরে তো তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই তাই বলছিলাম।”

তখন শেখ শাহনাওয়াজ বললেন,,

‘অনেক বছর নেই তো কি হয়েছে? এখন হবে হাজার হোক তারা আমাদের আত্মীয়। আর তাদের বাড়ির মেয়ের ছেলের বিয়ে সম্পর্কে তাদের মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে।”

তখন আরিফা জামান কষ্টমিশ্রিত হেঁসে বললেন,,

‘হুম বলুন তাদের সমস্যা নেই। তাদের বরঞ্চ দুদিন আগে আসতে বলুন।”

বলেই তিনি উঠে চলে গেলেন। তখন মিশু বলল,,

“আমাদের মামাবাড়ি আছে বাবা? কই কখনো নো তো বলোনি। আগে বললে আমিও মামাবাড়ি বেড়াতে যেতাম কতো কত মজা করতাম। আরিফ মামা তো আমাদের বাড়িতেই থাকে তাই আমি ভেবেছিলাম আমাদের মামাবাড়ি নেই।”

তখন আরবাজ বলল,,

‘আমাদের মামাবাড়ি আছে মিশু আর মামাও আছে আরেকজন।”

‘বাহ দুইটা মামা?”

‘হুম দুইটা মামা।”

‘আমাদের মায়েদের মতো কিন্তু এক মা তো নেই বাজপাখি। এক মা তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এখন শুধু মামনি আছে।

~চলবে,,

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৩৬
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

“আপনি কি এই দাওয়াতটাও রাখবেন না ডাক্তার?”

শেখ শাহনাওয়াজ এর কথায় মেহবিন মুচকি হাসলো আর বলল,,

“যদি না রাখি তো?’

‘এবার তো কোন অসুবিধা নেই।”

‘আমি যদি যাই তাহলে এবার আপনার অসুবিধা হবে না তো চেয়ারম্যান সাহেব?”

মেহবিনের হুট করে করা প্রশ্নটায় শেখ শাহনাওয়াজ থমকে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন মেহবিন কি ইঙ্গিত করেছে তাই উনি বললেন,,

“আপনি দাওয়াতটা গ্ৰহন করলে খুশি হব আমি। কিছু খান আর না খান আপনি উপস্থিত থাকুন এটাই চাইছি।”

“দাওয়াতে যদি যাই না খেয়ে বাড়ি আসতে বলেন নাকি। দাওয়াত রক্ষা করে মানুষ খাওয়ার জন্য আর আপনি আমাকে না খেয়েই আসতে বলছেন।”

একথায় শেখ শাহনাওয়াজ একটু লজ্জিত হলেন তবুও তিনি বললেন,,

‘না আপনি তো খান না যদি এই কারনে দাওয়াত না রাখেন তাই আর কি?”

‘এইবার যাবো।’

কথাটা শুনে শেখ শাহনাওয়াজ মেহবিনের দিকে তাকিয়ে আবার অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,,

‘শুকরিয়া দাওয়াতটা গ্ৰহন করার জন্য। এইবার আমি আসি।’

বলেই তিনি ঘুরে হাঁটবেন এমন সময় মেহবিন বলল,,

‘শেখ বাড়ির পুরোনো অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছি আমি চেয়ারম্যান সাহেব।”

হুট করে মেহবিনের এমন কথায় তার পা থেমে গেল‌। তিনি ঘুরে মেহবিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,,

‘মানে কি বুঝাতে চাইছেন?”

‘আপনার ছেলের ভবিষ্যত আমি আপনার মতো দেখতে পাচ্ছি।”

‘মানে ?”

‘কিছু না তবে এটা বলতে পারি আপনারা শেখ পরিবারের পুরুষ গুলো খুব স্বার্থপর। কে জানে ভবিষ্যতে আপনার স্বার্থপরতার জন্য আপনিই আপনার অতীত ছেলের মাধ্যমে আবার পুনরাবৃত্তি করলেন।”

“আপনি কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ডাক্তার।”

“কিছু না আপনি বাড়ি যান ছেলের এঙ্গেজমেন্ট এর প্রস্তুতি নিন। হাজার হোক সাবেক চেয়ারম্যান শেখ শাহেনশাহ এর একমাত্র নাতি এবং চেয়ারম্যান শেখ শাহনাওয়াজ এর একমাত্র ছেলের এঙ্গেজমেন্ট বলে কথা কিছু ধামাকা তো হতেই হবে। তাছাড়া আপনারা উচ্চ বংশীয় লোক আপনাদের মর্যাদা কতো ওপরে সবাইকে দেখাতে হবে না। আমার কথা ভাববেন না আমি ঠিক সময় পৌঁছে যাবো।”

বলেই মেহবিন ঘরের ভেতর ঢুকে পরলো। শেখ শাহনাওয়াজ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেলেন। আরবাজের এঙ্গেজমেন্ট এর সাতদিন বাকি আজ সকালে এসেছিলেন মেহবিন কে দাওয়াত দিতে। প্রতিবারের মতো এবার আর মেহবিন না করেনি সে রেখেছে তার দাওয়াত।

__________________

“আসসালামু আলাইকুম!’

‘ওয়ালাইকুমুস সালাম!”

‘তুমি কি যাবে আরবাজের এঙ্গেজমেন্ট এর অনুষ্ঠানে?”

‘না যাওয়ার তো কারন দেখছি না।”

‘আমাদের ফ্যামিলির সবাই কিন্তু থাকবে।”

‘তো আমি কি ভয় পাই নাকি কাউকে দেখে নাকি আপনাদের জন্য আমার আলাদা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। মাইশা আপুর পার্টিতে যেমন ছিলাম তেমনটাই যাবো। আমি শুধু ভাবছি আপনার দাদিজান কি রিয়াক্ট করবে?”

মেহবিনের কথায় মুখর হেঁসে উঠলো আর বলল,,

‘চেহারাটা এক্কেরে চাঁদের মতো উজ্জ্বল হইয়া যাইবো।”

‘ফাজলামি বন্ধ করেন কাব্য।”

“আমি আবার কি করলাম?”

‘কিছু না রাখছি।”

‘আরে দাঁড়াও রাখো কেন? সেদিন কিন্তু তুমি শুভ্র রঙের গাউন পরবে।”

“আমি আনিনি কোন গাউন এখানে।”

‘সমস্যা নেই আজকেই তোমার গাউন পৌঁছে যাবে।”

‘মানে আপনি অর্ডার করেছিলেন নাকি?”

‘না আমি নিজ হাতে কিনেছি তোমার জন্য শুভ্র গাউন সোনালী রঙের হিজাব আর শুভ্র রঙের নিকাব। আর আমার জন্য সাদা রঙের পাঞ্জাবি ওপরে সোনালী রঙের কোটি।”

মুখরের বাচ্চামো দেখে মেহবিন হাসলো এই লোকটাও না সবসময় ম্যাচিং করে জামাকাপড় পরতে চায়। মেহবিন মুচকি হেসে বলল,,

‘আপনি কি টিনেজার নাকি যে টিনেজারদের মতো ম্যাচিং ড্রেস পরতে চাইছেন।”

“উঁহু টিনেজার হতে যাবো কেন? এটাও অদ্ভুত একটা শখ বলতে পারো। শুধু আমার না বেশি সংখ্যক কাপলদের দেখবে এরা ম্যাচিং করে ড্রেস পরতে চায় কিন্তু অনেকে মুখ ফুটে বলে না। কিছু সংখ্যক বলে আমার মতো।”

“হুম বুঝলাম।”

‘কি?”

‘এই যে কাপলরা ম্যাচিং করে ড্রেস পরতে চায়। কিন্তু আমরা তো এখানে কাপল হয়ে যাচ্ছি না।”

‘তো কি হয়েছে আমরা কাপল তো সবার সামনে হই আর আড়ালে।”

“আচ্ছা বেশ পরবো হ্যাপি।”

‘আমি হ্যাপি না তো খুশি।”

“এতো ফাউ কথা পান কোথায়?”

‘তোমার কাছে আসলেই কেন যেন এইগুলো কোথা থেকে আসে।”

‘হয়েছে রাখছি এখন নেত্রীকে পড়াচ্ছি আমি।”

‘নেত্রীর কাছে দাও তো একটু।”

মেহবিন তাজেলের কাছে ফোন দিল। তাজেল সালাম দিল ,,

‘আসসালামু আলাইকুম পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালা।”

“ওয়ালাইকুমুস সালাম। তা নেত্রী তোমার দেশের কি অবস্থা সবকিছু ঠিক ঠাক আছে তো?”

‘আর অবস্থা ধুরু এই পড়াশোনারে কেরা বানাইছিল তারে সামনে পাইলে মনে হয় আমি কিছু করতাম।”

তাজেলের কথায় মেহবিন ওর দিকে তাকালো আর মুখর হাসলো। তখন মেহবিন বলল,,

“নেত্রী তার মানে সত্যিই তোমার পড়াশোনা ভালো লাগে না। আর তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলে পড়াশোনা শুরু করছো।”

তাজেল জ্বিভ কেটে দাঁত কেলিয়ে বলল,,

“আরে না আমি তো পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালার সাথে মজা করতে ছিলাম। আর পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালা তুমি আমার পড়ার সময় ফোন দিবা না। তোমার জন্য আমি ফ্যাসাদে পইরা যাই শান্তিতে মজাও করতে পারি না।”

এ কথা শুনে মুখর হাসলো মেহবিন ও বুঝতে পারল তার নেত্রী কথা কাটাচ্ছে। মুখর বলল,,

“তা হুট করে পড়াশোনা নেত্রীর এতো কঠিন কেন লাগছে?”

“আর কইয়ো না ছোট হাতের b লেখবার যাইয়া হয় d … আর d হইয়া যায় b আবার p খালি q হইয়া যায় আর q খালি p হইয়া যায়। এইডা ঠিক হইতেছেই না এই জন্য ডাক্তার আমারে এই গুলা বিশবার কইরা লেখবার দিছে।”

সব শুনে মুখর হাসলো মেহবিন ও হাসলো বেচারির দুঃখের কথা শুনে মেহবিন আর মুখরের হাঁসি পাচ্ছে। মুখর বলল,,

“আরে এই ব্যাপার ছোটবেলায় আমারও এরকম কতো হতো এটা ব্যাপার না। তুমি এক কথা শুনো যখন তোমাকে বি লিখতে বলবে তখন তুমি মনে মনে ডি ভাববা তারপর লিখে দিবা দেখবে বি হয়ে গেছে এই ভাবেই ঠিক হয়ে যাবে।”

“এই যে বিদ্যাধর মুখর শাহরিয়ার বাচ্চাকে ভালোভাবে না শেখাতে পারলে শেখাবেন না তবুও ফাউল শেখাবেন না। এখানে বি লিখতে বললে ডি ভাবতে বললেন এমনটা ভাবতে ভাবতে একদিন নেত্রী পরবেও বি কে ডি তখন কি করবেন। এতে আরো ঝামেলা হবে আসছে পড়াইতে।”

“আরে এটা তো আমি ভেবেই দেখিনি।”

“আপনি ভবিষ্যৎ ভাবেন কখন ? বর্তমান নিয়েই অলওয়েজ লাফালাফি করেন।”

“তুমি কি কোন ভাবে আমাকে খোঁচা মারছো?’

“না এখন ফোন রাখেন আমাদের ডিসটার্ভ হচ্ছে।”

“নেত্রীকে পড়াচ্ছো বলে কিছু বললাম না নাহলে,,

“নাহলেও কিছু করতে পারতেন না। আল্লাহ হাফেজ।”

বলেই মেহবিন ফোন কেটে দিল। এদিকে ওদের দুজনের ভাব দেখে তাজেল হাসলে। তাজেল বলল,,

‘পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালা তো ভালো বুদ্ধিই দিছিলো।”

“হ মেলা ভালো বুদ্ধি দিছিল যাতে তুমি ভুল পড়। হুম অনেক হইছে কথাবার্তা এখন লেখ।”

“এইবার ভুল হইলে আমার দোষ নাই কিন্তু কইয়া দিলাম।”

“আজ সবগুলো ঠিক না করে কোথাও যেতে পারবা না।”

“আমার স্কুল আছে তো তোমারও হাসপাতাল আছে। কাইলক্যা বাড়ি থেইকা আনমুনি এহন আসি।”

মেহবিন তাজেলের হাত ধরে বলল,,

“না নেত্রী আজ থেকেই সব শেষ করবে।’

“আমারে ছাইড়া দেও ডাক্তার আইজক্যা। আমি আর পরুম না আইজক্যা।”

“না আজ পরতেই হবে সবসময় ব্যাগ নিয়ে পালালে হবে।”

“আজকের মতো মাফ করো ডাক্তার আবার কাইল আসমুনি।”

“মাফ করলাম না।”

“আমার সোনা ডাক্তার ওমবা কইরো না আইজ আমি আর পরুম না। আমার ভাললাগতাছে না।”

কথাটা শুনে মেহবিনের কেন যেন খুব হাঁসি পেল। ও বুঝতে পারল তাজেল আজ বি ডি নিয়ে খুবই বিরক্ত। তাই ওর হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,,

“ওকে আজ ছেড়ে দিলাম কাল ঠিক না হলে স্কুলে যেতে দেব না।”

তাজেল দাঁত কেলিয়ে বলল,,

“তোমারে সোনা ডাক্তার কইলাম দেইহা ছাইড়া দিলা
কাইল আইসাই সোনা ডাক্তার কমু। তাইলে আর ধরবা না।

বলেই তাজেল এক দৌড়। তাজেলের কান্ডে মেহবিন হাসলো। এই মেয়েটাও না।

_______________

অতঃপর আজ শেখ আরবাজ শাহনাওয়াজ এবং নাফিয়া মাহফুজ শাহরিয়ার এর এঙ্গেজমেন্ট। রাত আটটায় তাদের আংটিবদল হবে। মেহবিন কে বিকেলেই মিশু গিয়ে নিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা গড়ালো একটু আগেই এখনো শাহরিয়ার পরিবার এসে পৌঁছায় নি। তবে জিনিয়ার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে পরেছে অর্থ্যাৎ আহমেদ পরিবার আজ শিলার হাজবেন্ড ও বাদ যায় নি‌। সবাই এসেছে হয়তো মেহবিন কে দেখতে। মেহবিন মিশুর হিজাব বেঁধে দিচ্ছে। মিশুও একটা হালকা গোলাপি রঙের গাউন পরেছে আর শুভ্র রঙের হিজাব। ওর সবকিছু শেষ হলে মিশু বলল,,

“এই ফুল আজ আমি তোকে হিজাব বেঁধে সাজিয়ে দিই।”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“ঠিক আছে।”

অতঃপর মিশু মেহবিন কে সুন্দর করে শুভ্র রঙের গাউনের সাথে সোনালী রঙের হিজাব বেঁধে দিল হালকা সাজিয়েও দিল। কিন্তু নিকাব দিল না তা দেখে মেহবিন বলল,,

“নিকাব কেন দিলে না?”

“এমনিই এখন নিচে চল সবাই এসে পরেছে।”

“ফুল এটা কিন্তু ঠিক না।”

“আর একটা কথা বললে আমি কিন্তু নিচে যাবো না।”

“এই তোমার অহেতুক অধিকার খাটানো কিন্তু আমার পছন্দ নয়।”

“অধিকার আর খাটাতে পারলাম কই তার আগেই তো।”

মেহবিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,

“হুম চলো এখন নিচে যাই।”

“এই এঙ্গেজমেন্ট এ কিন্তু আমার মামাবাড়ি থেকেও লোক আসবে।”

“জানি আমি।”

বলেই মেহবিন হাঁটা ধরলো তা দেখে মিশুও দৌড়ে মেহবিনের হাত ধরলো। মেহবিন আর মিশুকে একইরকম অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। দুজনে হেঁসে কথা বলতে বলতে আর সিঁড়ি দিয়ে নামছে সবার নজর যেন ওদের দিকেই‌। ওদের একসাথে দেখে দুই জন মানুষের চোখ ছলছল করে উঠলো‌। তারা মাশাআল্লাহ বলল। এদিকে মেহবিন কে এখানে এভাবে দেখে শাহরিয়ার পরিবার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই তারা এসেছে। মেহবিন তাদের দেখেও ইগনোর করে মিশুর হাত ধরে অন্য জায়গায় চলে গেল। মিশু সোজা গিয়ে মুখরের সামনে দাঁড়ালো। মুখর আগে থাকতেই হেঁসে বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেহবিনের চোখ পরতেই ও হাত দিয়ে মাথা উঁচু করলো তা দেখে মেহবিন হাসলো। মিশু বলল,,

‘পুরোনো বন্ধু নতুন অথিতি দেখো তো আমাদের কেমন লাগছে?”

মুখর হেঁসে বলল,,

“মাশাআল্লাহ দুইজনকেই অনেক সুন্দর লাগছে।”

“আমার থেকেও ফুলকে বেশি সুন্দর লাগছে তাই না।”

“সত্যি বলবো মিশু তোমার ফুলের থেকে তোমাকেই বেশি সুন্দর লাগছে।”

“আরে তুমি তো আমার দিকে তাকাচ্ছোই না তুমি দেখলে কিভাবে আমাকে বেশি সুন্দর লাগছে?”

এ কথা শুনে মুখর ভরকে গেল ও তাড়াতাড়ি করে মেহবিনের থেকে নজর সরালো তা দেখে মেহবিন হাসলো। মেহবিন বলল,,

“তোমার বাজপাখির বউয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে না।”

“হ্যা দেব তো।”

মিশু হেঁসে নাফিয়ার সামনে গিয়ে বলল,,

“এই যে ফুল ও হলো বাজপাখির বউ টুনিপাখি।”

মিশুর মুখে টুনি পাখি শুনে নাফিয়া ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। আর যারা শুনেছে মিশুর কথা শুনেছে সবাই অবাক হয়ে গেল। তখন আরবাজ এসে বলল,,

“এই মিশু তুই এটা কি বললি?”

“কি বললাম আমি তো বললাম ও বাজপাখির বউ টুনি পাখি। আরে তোমায় আমি বাজপাখি বলি এখন তোমার বউকেও তো কোন পাখি বলতে হবে। তোমার বউতো টুনি পাখির মতো এইটুকুনি আর কতো কিউট তাই আমি ওর নাম দিয়েছি টুনিপাখি। ফুল সুন্দর লাগছে না নামটা।”

মেহবিন হেঁসে বলল,,

“হুম অনেক সুন্দর লাগছে। দারুন জুটি বাজপাখি আর টুনিপাখি।”

মেহবিনের কথায় নাফিয়া লজ্জায় লাল হয়ে যায়। তা দেখে মেহবিন ফিস ফিস করে নাফিয়ার কানে কানে বলল,,

“হইছে আপু আর লজ্জা পেতে হবে না। তবে ফুলের নাম সিলেক্ট কিন্তু দারুন।”

তখন মুনিয়া মাইক নিয়ে বলল,,

“অ্যাটেনশন এভ্রিওয়ান। আরবাজ ভাইয়া ও নাফিয়া আপু সরি ভাবির আংটিবদল অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগতম। যাই হোক গান বাজনা হারাম এই জন্য এখানে কোন গানবাজনা হবে না তবে তাই বলে কি আমরা অনুষ্ঠানটা পানসে যেতে দেব নাকি। তাই আমরা ইয়াংস্টাররা অনুভুতি প্রকাশের জন্য ছোট্ট একটা ফাংশন রেখেছি। এখানে কিছু মানুষ কে ডাকা হবে তাদের সম্পর্কে বা তাদের কিছু অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করবে।”

সবাই স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল অনুষ্ঠানটি খুব বড়ও না আবার ছোটও না সব আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে। সবকিছু শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমেই করা হয়েছে। মুনিয়ার কথায় সবার আকর্ষণ ওর দিকেই । মুনিয়া প্রথমেই বলল,,

“তো এখন সবার আগে আমাদের সবার বড় দাদুভাই অরফে শেখ শাহেনশাহ কে দিয়েই শুরু করি। দাদুভাই এখানে চলে এসো‌।

শেখ শাহেনশাহ ওখানে গেল তখন মুনিয়া বলল,,

“তো দাদুভাই বলো তোমার কাছে সবথেকে প্রিয় কি ?”

শেখ শাহেনশাহ বললেন,,,

“আমার বংশের সম্মান ও তার গৌরব।”

কথাটা শুনে মেহবিনের হাঁসি পেল কেন যেন তবুও সে হাসলো না। তবে সে হাত তালি দিল সাথে মিশু ও দিল আর সবাই দিল তারপর তখন মেহবিন বলল,,

“মাশাআল্লাহ অনেক ভালো উত্তর সাবেক চেয়ারম্যান সাহেব। আপনার কথা শুনে মনে হলো আপনি আপনার বংশের সম্মান আর গৌরব ধরে রাখতে যে কোন কিছু পার করতে পারেন। কোন এক সময় আপনি তা করেছনও মনে হয়।”

মেহবিনের কথায় তিনি ওর দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না। উনি নেমে এলেন দেখে কেউ কিছু বললো না তবে সবাই অবাক হয়েছে এই মেয়েটার কথায়। মুনিয়া মাইক নিয়ে বলল,,

“এরপর আসি জিনিয়া আপু তোমার কাছে। তো তুমি বলো নতুন বিয়ে হলে সবার প্রথমে মেয়েদের কি বদলায়?”

জিনিয়া মুচকি হেসে বলল,,

“অনেক বছরের পুরোনো অভ্যাস।”

এই ছোট্ট কথাটায় কি ছিল জানা নেই তবে কিছু একটা তো ছিল। মুনিয়া ওকে আর কিছু বললো না। এরপর মুনিয়া বলল,,

“মুখর ভাইয়া এবার তুমি। একটু হলেও তোমায় চিনি তো তাই।”

মুখর হেঁসে মুনিয়ার কাছে গেল মুনিয়া বলল,,

“তোমার কাছে সবথেকে সুন্দর মুহুর্ত কি?”

মুখর মুচকি হেসে বলল,,

“একজনের সাথে হাসিখুশিভাবে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত।”

মুখরের কথা শুনে ইয়াংস্টাররা সবাই হইহই করে উঠলো। মেহবিন মুচকি হাসলো মুখর যে তাকেই বলেছে এটা ও বুঝতে পারলো। তখন মুনিয়া বলল,,

“আর পূর্নতা?”

“সে তো অপেক্ষা!”

আর,,

“হয়েছে অলরেডি দু’টো করেছো সবাইকে একটা করে করেছো। ”

বলেই মুখর সরে এলো। এবার ডাক পড়লো আরবাজের । আরবাজ গেল তখন মুনিয়া বলল,,

“তোমার কাছে প্রাপ্তি কি?”

আরবাজ মুচকি হেঁসে বলল,,

“আপাতত নাফিয়া মাহফুজ শাহরিয়ার।”

ব্যস আর লাগে কি চারদিকেই বেশ হই হই পরে গেল। আর নাফিয়া বেচারি পরে গেল লজ্জায়। মেহবিন খুশি হলো সেই সাথে অন্যকিছুও মাথায় হানা দিল। তখন মিশু বলল,,

“এখন বন্ধু যাবে মুনি ?”

“ঠিক আছে মিশু আপু। মেহবিন আপু এখানে আসো।”

মেহবিন প্রথমে না যেতে চাইলেও মিশুর জন্য গেল। মেহবিন যেতেই সবাই ওর দিকে তাকালো কারন ও সবার কাছে এ যাবৎ ধাঁধা। তখন মুনিয়া বলল,,

“তো মেহবিন আপু তুমি এমন একটা মানুষ যাকে জানার জন্য সবার মনেই একটা কৌতুহল আছে। এবার কি তুমি তোমার সম্পর্কে কিছু বলবে?”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“আমার সম্পর্কে তেমন কিছু বলার নেই।”

“তবেও বলো না আপু।”

মেহবিন আবার ও মুচকি হাসলো সবার দিকে তাকাতেই দেখলো সবাই উৎসুক জনতার মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে সে আছিয়া খাতুন এর দিকে তাকালো তারপর তার পরিবার। এরপর আরবাজ মিশু আর রাইফার দিকে। সবার শেষে শেখ শাহনাওয়াজ এর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,

‘আমার সম্পর্কে যদি কিছু বলি তাহলে বলবো ‘
আমি একা আমার কেউ নেই কোনদিন ছিলোও না। সবাই এটা বলে অনুভবে কিন্তু আমি বলছি অভিমানে। কারন আমি এমন একজন মানুষ যার সাথে সম্পর্ক তো অনেক মানুষের আছে কিন্তু হাত ধরে কেউ জনসম্মুখে বলতে পারবে না তার সাথে আমার কি সম্পর্ক। উঁহু তার মানে এই নয় হয়তো অবৈধ সম্পর্ক আছে দেখে।না কোন অবৈধ সম্পর্ক নেই সব বৈধ সম্পর্ক। তবুও আমার ওপরেই যতো বাধ্যবাধকতা। সবশেষে যদি বলি তাহলে আমার কেউ নেই কোনদিন ছিলোও না।

কথাটা শুনে অনেকের চোখ ছলছল করে উঠলো। সেখানে থাকা নতুন মানুষগুলোরও। মুখরের ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে সেই সাথে আরো কয়েকজনেরও। আছিয়া খাতুনের আজ বড় অনুশোচনা হচ্ছে। তিনি এগিয়ে যেতে নিলেন তখন শেখ শাহনাওয়াজ বললেন,,

“সত্যিই কি কেউ নেই আপনার?”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“আছে একজন আমার নেত্রী তার নাম শেখ তাজেল। সেই একমাত্র ব্যক্তি যার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমাকে সবসময় প্রশান্তিতে ভরিয়ে রাখে।”

“তাহলে একটু আগে যে বললেন?”

“এক মুহুর্তের জন্য এতো স্বার্থপর মানুষের মাঝে আমি তাকে ভুলে গিয়েছিলাম। ওগুলো কিছু স্বার্থপর মানুষের জন্য ছিল। কিন্তু দিনশেষে আমার নেত্রী আমার। আমার ভালোবাসা আমার হাসির অন্যতম প্রধান কারন।

বলেই মেহবিন ওখান থেকে নেমে দরজার দিকে গিয়ে দাঁড়ালো। মিশু ওর কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো। আর বলল,,

“টেনে মারবো এক থাপ্পড় তুই আমার ফুল ।”

মেহবিন ওকে ছাড়িয়ে বলল,,

“তাহলে চলো স্টেজ এ গিয়ে আমার হাত ধরে বলো আমি তোমার কে হই? পাগল হলে বলতে পারতে কিন্তু সুস্থ দেখে কোথাও গিয়ে বাঁধলো তাই না। এই জন্য মাঝে মাঝে পাগলরাই ভালো তাই না ফুল।

মিশু একবার মেহবিনের দিকে তাকালো। আজ তার পাগল নিয়ে কোন সমস্যা নেই। মিশু আবার মাথা নিচু করে রইল তখন মেহবিন মুচকি হেঁসে মিশুর কানে কানে ফিসফিস করে বলল,,

“সত্যি তো এটাই আমি মরহুম মেহেরুননিসা এর মেয়ে।আর মেহেরুননিসার মৃত্যুর সাথে সাথেই আমার সব সম্পর্কের ইতি ঘটেছে। কালের বিবর্তনে আবার কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগ হয়েছে তাই বলে এটা নয় পুরোনো সম্পর্ক একদম জুড়ে গেছে।’

মেহবিনের কথায় মিশুর চোখ ছল ছল করে উঠলো।ও বলে উঠলো,,

‘ফুল!”

“কি সত্যি বললাম তো।”

মিশু এবার কেঁদেই দিলো আর বলল,,

“তুই খুব খারাপ ফুল তুই খুব খারাপ।”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“এই জন্যই তো আমায় তার সাথে কেউ রাখে না। যেমন আমার বাবা সেই কিন্তু আমাকে প্রথমে ছেড়েছিল।”

মিশুকে কাঁদতে দেখে সবাই উৎসুক জনতার মতো ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। যেখানে মিশু কাঁদছে আর মেহবিন না থামিয়ে হাসছে। যেখানে কিনা ওর কাদা উচিত। অতঃপর মেহবিন এবার মিশুকে জড়িয়ে ধরে বলল,,

“তবে এর মাঝে সব থেকে সত্যি কথা কি জানো যে তোমার ফুল তোমাকে অনেক ভালোবাসে।”

কথাটা শুনে মিশুর আপনাআপনি কান্না থেমে হাঁসি ফুটে উঠল। ও হাঁসি মুখেই বলল,,

“আমিও তোকে খুব ভালোবাসি।”

‘হুম হুম এখন ভালোবাসা উতলে পরছে।”

মিশু এবার খিলখিল করে হাসতে লাগলো। এদিকে ওরা কি বলেছে দূরে দেখে কেউই শুনতে পায়নি। তবে যারা মেহবিন কে কাছ থেকে চেনে তারা সবাই ভাবছে মেয়েটা এমন কেন। মুহুর্তেই কাউকে কাঁদাতে পারে আবার মুহুর্তেই হাসি ফোটাতে পারে।

~চলবে,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ