Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"তুমি আমার ভালোবাসা পর্ব-০৯

তুমি আমার ভালোবাসা পর্ব-০৯

#তুমি_আমার_ভালোবাসা
#পর্ব_৯
#লেখিকা_Munni_Akter_Priya
.
.
প্রিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফাহাদ বললো,
“এতদিন অফিসে আসেননি কেন?”
“সমস্যা ছিল।”
“কি সমস্যা?”
প্রিয়া এবার উত্তর দিলো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ফাহাদ আবার বললো,
“আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি। কি সমস্যা ছিল যে এতদিন অফিসে আসলেন না? একটা ফোন করে তো জানায় মানুষ? ফোনটা পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছিলেন আপনি। কি সমস্যা আপনার বলেন? আমার অফিসে কাজ করতে ভালো লাগেনা? নাকি আমায় বিরক্ত লাগে? আপনার দিকে তাকাই বলে খুব সমস্যা?”
ধমক দিয়েই কথাগুলো বললো ফাহাদ। ফাহাদের কথায় অধিকার স্পষ্ট। কিন্তু কিসের অধিকার সেটা বুঝেনা প্রিয়া। ফাহাদের ধমকে প্রিয়া কেঁদেই দিলো। ফাহাদ ঝাড়ি দিয়ে বললো,
“কিছু বললেই শুধু ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদে। এছাড়া আর কিছু পারেন না? কি হয়েছে সেটা তো বলবেন!”
প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“স্যরি স্যার। আর এমন হবে না। আমি ইচ্ছে করে এতদিন অনুপস্থিত ছিলাম না। দয়া করে শেষবারের মত একটা সুযোগ দিন প্লিজ।”
ফাহাদ মনে মনে বললো,
“আমি বলি কি আর সে বুঝে কি! ওরে জ্বালা আমি কি একবারও বলেছি যে অফিস থেকে বের করে দিবো! আমার যে টেনশন হয় সেটা এই মেয়ে বুঝবেনা। এত অবুঝ কেন এই মেয়ে!”
ফাহাদ যথাসম্ভব রাগ দমিয়ে বললো,
“আচ্ছা আপনি এখন যান।”

প্রিয়া চলে যাওয়ার পর ফাহাদ মাকে ফোন দিলো।
“হ্যালো মা।”
“হ্যাঁ বল।”
“পেয়ে গেছি মা পেয়ে গেছি।”
“কি পেয়ে গিয়েছিস?”
“আমার সাদা পরীকে পেয়ে গেছি মা।”
“অফিসে এসেছে?”
“হ্যাঁ মা।”
“তাহলে তো আমার ছেলেটা আজ খুব খুশি।”
“অনেক খুশি মা। কিন্তু কিছু একটা গন্ডগোল আছে মা।”
“কিসের গন্ডগোল?”
“প্রিয়ার চোখমুখ কেমন জানি। কি জানি হয়েছে, কিন্তু সেটা বলছেনা।”
“হয়তো পারিবারিক কিছু তাই তোকে বলেনি। তাছাড়া তুই ওর বস, তোকে কি আর সব বলবে নাকি!”
“তাহলে কি করে জানবো?”
“ওর কোন ফ্রেন্ড যেন আছে ওকে দিয়ে জিজ্ঞেস করা।”
“এটা করা যেতে পারে। কিন্তু মা পৃথা বিষয়টা কিভাবে নিবে সেটাই তো বুঝতেছিনা। অফিসের বস অফিসেরই একজনকে পছন্দ করে, ভালোবাসে বিষয়টা কেমন জানিনা?”
“এখানে কেমন জানির কি আছে? কে কিভাবে নিবে সেটা তার বিষয়। তোর কাজ হচ্ছে তুই কিভাবে প্রিয়ার সব ইনরফরমেশন নিবি। এখন ওর ইনরফরমেশন তো আর ও নিজে এসেই দিবে না তাই না? এজন্য অবশ্যই ওর কাছের কারো সাহায্য দরকার তোর। আর ওর কাছের কেউ বলতে তুই শুধু পৃথাকেই চিনিস। সো তোকে সাহায্য করতে পারলে পৃথাই পারবে। প্রয়োজনে ওকে সব জানা। ও তোকে সাহায্য করতে পারবে। ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য যা করা লাগবে করবি। যেটা সবাই দুদিন পর এমনিতেই জানবে সেটা না হয় দুদিন আগেই কেউ জানুক।”
“ওহ মা! সত্যিই তুমি বেষ্ট। এজন্যই বোধ হয় আমার কোনো বেষ্টফ্রেন্ড নেই। যার বেষ্টফ্রেন্ডের মত মা আছে তার আবার কোনো বেষ্টফ্রেন্ডের দরকার হয় নাকি। লাভ ইউ সো মাচ মা।”
“পাগল ছেলে আমার। লাভ ইউ টু। এখন যা, কাজে লেগে পড়।”
“যথাআজ্ঞা মেরি আম্মিজান।”

রেষ্টুরেন্টে অপেক্ষা করছে পৃথা। কিছুক্ষণ পরই ফাহাদ আসে। ফাহাদকে দেখে পৃথা দাঁড়িয়ে পড়ে। ফাহাদ মুচকি হেসে বলে,
“আরে বসো বসো। রেষ্টুরেন্টে এত ফর্মালিটি দেখাতে হবেনা।”
“সমস্যা নেই স্যার।”
ফাহাদ বসতে বসতে বললো,
“এখানে আসার জন্য কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
“না স্যার।”
“আসলে যে কথাগুলো বলবো সেগুলো অফিসে বলার মত নয়। তাই এখানে ডেকেছি।”
“সমস্যা নেই স্যার। আপনি বলুন।”
“একচুয়ালি কথা বলার টপিক হচ্ছে প্রিয়া!”
পৃথা মুচকি হেসে বললো,
“এটাই আন্দাজ করেছিলাম।”
“মানে?”
“না মানে প্রায়ই দেখতাম আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে প্রিয়াকে দেখেন।”
ফাহাদ লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকালো।
“আসলে কি জানো পৃথা, কখনো ভাবতেই পারিনি এভাবে কাউকে ভালোবেসে ফেলবো। সেই বৃষ্টিতে সাদা ড্রেসে আধভেজা অবস্থায় দেখে কি যে হলো আমার। এখন ধ্যানেজ্ঞানে শুধুই প্রিয়া।”
“তাহলে ওকে বলছেন না কেন?”
“বলবো। আসলে আমি সেরকমভাবে প্রিপেইড নই তো, তাই চাচ্ছিলাম একটু সময় নিতে।”
“ওহ্!”
“আচ্ছা এই ক’দিন ও অফিসে আসেনি কেন জানো?”
“না স্যার। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি বলেনি। বলেছে পরে বলবে। তবে মুখ দেখে মনে হয়েছিল যাই হোক না কেন ভালো হয়নি।”
ফাহাদ চিন্তিতস্বরে বললো,
“হুম!! এক কাজ করবে কাল কি হয়েছে তা জানার জন্য ওকে ফোর্স করবে। যেভাবেই হোক ওর থেকে কথা আদায় করবে। আর যখন জিজ্ঞেস করবে তখন আমায় বলবে আমি কল দিবো। তুমি শুধু ফোনটা লাইনে রেখো।”
“আচ্ছা।”
“আর হ্যাঁ, প্লিজ এসব কিছু আগেই কাউকে জানিয়ো না। এমনকি প্রিয়াকেও না।”
“ওকে স্যার।”
“থ্যাঙ্কিউ।”
.
.
ফাহাদ বাড়িতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। ফাহাদের বাবা তখন পত্রিকা পড়ছিলেন। পত্রিকার পাতা উল্টে বললো,
“কি ব্যাপার? খুব খুশি মনে হচ্ছে?”
“হুম আব্বু খুব খুশি।”
“তো কি কারণ শুনি? আমরাও একটু খুশি হই তোমার সাথে।”
“স্যরি আব্বু। এখন তো বলা যাবেনা। তবে সময় হলে অবশ্যই অবশ্যই জানাবো।”
“সিরিয়াস কিছু মনে হচ্ছে?”
ফাহাদ কিছু বললো না। লাজুক হেসে উপরে চলে গেলো। মৃন্ময় তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে গান শুনছিল। ফাহাদকে দেখে মৃন্ময় বললো,
“একটু আগে বাড়িতে আসতে পারিস না?”
“কেন?”
“কেন আবার কি? আমার সাথে একটু সময় কাটাবি।”
“ধুর ব্যাটা! এতদিন পর আমার সাদা পরীটাকে পেয়েছি। ওকে না দেখে তোকে দেখবো?”
“কি সেলফিস রে! যাই হোক, অফিসে এসেছে?”
“হ্যাঁ রে। এজন্যই তো আজ এত খুশি আমি।”
“খুব লাকিরে তুই! তোর পরীকে তো তুই খুঁজে পেলি কিন্তু আমার প্রেয়সীকে যে আমি কবে পাবো কে জানে!”
“মন খারাপ করিস না। খুব শিঘ্রয়ই খুঁজে পাবি দেখিস।”
“তাই যেন হয়। তবে আমার ট্রিট চাই।”
“কিসের ট্রিট?”
“এই যে তোর পরীকে খুঁজে পেলি তাই।”
“ওহ আচ্ছা এই ব্যাপার। ওকে খাওয়াবো। যত খেতে পারিস খাওয়াবো কিন্তু আজ না ভাই। কাল খাওয়াবো। আজ খুব টায়ার্ড আমি। কাল অফিস পাঁচটায় ছুটি দিবো। তখন বাহিরে যাবো কেমন? অফিস থেকে ৪০ মিনিট লাগে যেতে একটা রেষ্টুরেন্ট আছে। দারুণ সব খাবার পাওয়া যায়।”
“ওকে ডান।”

পরেরদিনঃ
লাঞ্চ টাইমে খুব ফোর্স করছে পৃথা প্রিয়াকে। ফাহাদ তখন ফোনের লাইনেই আছে। সব শুনছে। প্রিয়া বলতে নারাজ। বারবার কথা ঘুরানোর চেষ্টা করছে। পৃথা এবার ইমোশোনাল ব্লাকমেল করে বললো,
“তুই কি আমায় একটুও বিশ্বাস করিস না প্রিয়ু? আমার সাথে কি শেয়ার করা যায় না?”
“উল্টাপাল্টা ভাবিস নারে পৃথা। এই নতুন জগতে আমার বন্ধু বলতে শুধু তুই’ই আছিস আমার আপন। যাকে আমি সব শেয়ার করি। কিন্তু এই বিষয়টা তুই সহ্য করতে পারবিনা তাই আমি বলতে চাচ্ছিনা।”
“যেটা তুই সহ্য করতে পেরেছিস সেটা আমি পারবো না? তোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা তুই সহ্য করতে পারলে আমিও পারবো। আফটারঅল তুই আমার ফ্রেন্ড। আমার বেষ্টফ্রেন্ড। প্লিজ বল কি হয়েছে?”
প্রিয়ার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। গলাটা ধরে আসছে। ধরা গলায় প্রিয়া বললো,
“সব শেষ গয়ে গিয়েছে রে পৃথা। নতুন জগতে নতুনভাবে বাঁচার সব আশা নিভে গিয়েছে সব। আমি সত্যিই একটা অলক্ষী।
ঐদিন অফিস শেষে বাড়িতে গিয়ে দেখি দুই ভাবীর বাবা-মা আর ভাই এসেছে। আমার দুই ভাবী সম্পর্কে আপন বোন। ছোট ভাইয়া আর ছোট ভাবীর রিলেশন ছিল। তখন প্রস্তাবের মাধ্যমেই বাড়ির দুই মেয়েকে আমার দুই ভাইয়ের বউ করে আনে। আমি তাদের সাথে কুশল বিনিময় করে আমার রুমে চলে যাই। ভাবীর ছোট ভাই আমায় আগে থেকেই পছন্দ করতো যেটা আমি জানতাম। তাই সবসময়ই এড়িয়ে চলতাম। আমার পিছু পিছু ভাবীর ছোট ভাই রামিম আমার রুমে আসে। খাটের উপর বসে বললো,

“কি খবর বিয়াইন সাহেবা! খবর কি তোমার?”
আমার খুব রাগ হয় তখন। সরাসরি একটা মেয়ের রুমে আসা আবার খাটে বসা বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর। কিন্তু ভাবীর ভাই বলে কিছু বলিনি। মুখে হাসির রেখা টেনে বলেছিলাম,
“জ্বী ভালো।”
“মন খারাপ নাকি?”
“না।”
“তাহলে কথা বলছো না কেন?”
“একটু টায়ার্ড তো তাই। মাথা ব্যথা করছে।”
“আসো মাথা টিপে দেই।”
“আশ্চর্য! নিজের সীমা অতিক্রম করবেন না প্লিজ।”
“আরে আরে রেগে যাচ্ছো কেন? আমি তো মজা করলাম।”
“আপনি এখন আসতে পারেন।”
“প্রিয়া!”
“হু।”
“আর কতবার বলবো তোমায় ভালোবাসি?”
“আমি কতবার বলবো যে, আমি আপনাকে ভালোবাসিনা।”
“প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!”
“আমি কিচ্ছু বুঝতে চাইনা। আমার এসব ভালোবাসার প্রতি কোনো ইনটেনশন নেই।”
“আমি তো তোমায় বিয়ে করতে চাই। দেখো তোমার অতীত নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
“আপনার সমস্যা থাকলেই বা আমার কি? আমার অতীতকে দূর্বলতা ভেবে আমায় বিয়ে করবেন এই আশা থাকলে প্লিজ সেটা ভুলে যান। আপনাকে আমি কোনো জন্মেই বিয়ে করবো না। তার কারণও আপনি খুব ভালো করেই জানেন।”
“দেখো আমি জানি আমি নেশা করি, মেয়েদের প্রতি উইক। কিন্তু প্রমিস তুমি আমার জীবনে আসলে সব ছেড়ে দিবো আমি।”
“হাসালেন রামিম। শুনেছিলাম, আপনি নাকি আপনার মাকে ছুঁয়েও কথা দিয়েছিলেন এসব আর করবেন না? কিন্তু আপনি কথা রাখতে পেরেছেন কি? পারেননি তো! যেই ছেলে গর্ভধারিণী কে দেওয়া কথা রাখতে পারেনা, সে আমায় দেওয়া কথা রাখবে?”
“তুমি শোনো….”
“আমি আর কিছু শুনতে চাইনা। আপনি এখনই আমার রুম থেকে বেড়িয়ে যাবেন প্লিজ। নয়তো আপনি থাকেন, আমিই চলে যাই।”
এরপর আর রামিম কিছু বলেনি। চলে যায়। কিন্তু দমে যায়নি তখনো। আমায় বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। আমার দুই ভাবীকেই বিষয়টা জানায়। ভাবীরা তাদের আদরের ভাইয়ের আবদার রাখতে গিয়ে আমার কথা ভাবা ভুলে যায়। ভাইয়াদের বিষয়টা বুঝায়। আমি রাজি ছিলাম না বিধায় ভাইয়ারাও কেউ রাজি হয়নি। কিন্তু ভাবীরা এমন কি বুঝিয়েছিল কে জানে! আর রামিমও এত ভালো মানুষ সাজার অভিনয় করলো যে ভাইয়ারাও রাজি হয়ে যায়। সবাই মিলে আমাকে বুঝাতে শুরু করে। আমার অফিসে আসা বন্ধ করে দেয়। আমি জেনেশুনে ওমন একটা লোককে কি করে বিয়ে করতাম বল? আমি রাজি হয়নি। একমাত্র মা’ই আমার পাশে ছিল। আমার সেই পরিচিত ভাই-ভাবীদের আবারও অচেনা মনে হতে শুরু করলো। একদিন ভাইয়ারা মাকে বললো,
“তুমি তোমার মেয়েকে বোঝাচ্ছো না কেন? আমরা কি ওর খারাপ চাই? যদি ওর খারাপ চাইতাম তাহলে কি ফিরে আসতাম আমরা? ওর প্রথম সেই ঘটনার পর বাবা মারা যায়। তখন কিন্তু আমরা দূরে সরে থাকতে পারিনি মা। সাপোর্ট হয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়েছি। আর আজ ওর কাছে আমাদের কথার কোনো মূল্যই নেই।”
“দেখ বাবা, সংসার তো ও করবে। তাহলে ও যখন রাজি না কেন বারবার এমন জোর করছিস?”
“বাহ্! তুমিও তো দেখছি এখন মেয়ের দলে।”
“এটা দলের কোনো বিষয় না রে বাবা। একটু ওর কথা ভাব।”
“ওর কথা ভেবেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে রামিমের সাথেই ওর বিয়ে দিবো। তুমি দেখো মা, আমাদের বোন অনেক সুখী হবে।”
আড়াল থেকে সেদিন সবটা শুনেছিলাম আমি। পরিস্থিতি যে আমার অনুকূলে ছিল না সেটা আমি ঢের বুঝতে পেরেছিলাম। শুধুমাত্র মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজিও হয়ে গিয়েছিলাম। ঘরোয়াভাবে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এরপর….”
এতটুকু বলে হুহু করে কেঁদে দিলো প্রিয়া। ওপাশ থেকে নিঃশব্দে সব শুনছিল ফাহাদ। প্রিয়ার কান্নাগুলো তীরের মত বিঁধছিল ফাহাদের বুকে। মনে তখন এক অজানা ভয়। তবে কি সত্যিই ফাহাদ প্রিয়াকে হারিয়ে ফেললো!
পৃথা প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কাঁদিস না প্লিজ। এরপর কি হলো?”
প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“এরপরই আমার পরিবারটা এলোমেলো হয়ে গেলো রে পৃথা। বিয়ের আগেরদিন রাতে রামিম ড্রিঙ্ক করে আমার রুমে আসে। রাত তখন এগারোটার মত বাজবে। আমি বসে বসে উপন্যাসের বই পড়ছিলাম। রামিম হুট করেই রুমে ঢুকে যায়। আমার পাশে বসে আমার হাত ধরে। আমি ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু ও অনেক বেশি জোড়াজুড়ি শুরু করে দেয়। ওকে দেখে আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম ও মদ খেয়েছে। আমি বারবার বলেছিলাম,
“রুম থেকে বেড়িয়ে যান। প্লিজ বেড়িয়ে যান।”
“সরিয়ে দিচ্ছো কেন? কাল তো আমাদের বিয়ে হচ্ছেই।”
“আমি রুম থেকে বের হতে বলেছি আপনাকে।”
রামিম কিছুতেই আমার কথা শুনছিল না। তখন আমি সজোরে একটা থাপ্পড় দেই রামিমকে। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চেঁচামেচি শুরু করি। তখন সবাই দৌঁড়ে আমার রুমে আসে। আমি কেঁদে কেঁদে সব বলি ওদের। কিন্তু জানিস পৃথা, আমার ভাইরা এর কোনো প্রতিবাদ করেনি। উল্টো বলেছে নেশা করেছে তো তাই এমন হয়ে গেছে। মাফ করে দে ওরে বোন। রামিমের ওমন ব্যবহারে যতটা না কষ্ট পেয়েছিলাম তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম ভাই-ভাবীর কথায়। তখন আর চুপ করে থাকতে পারিনি। রাগে বলেছিলাম,
“আমি এই বিয়ে করবো না। করবো না এমন চরিত্রহীন, নেশাখোর কোনো ছেলেকে বিয়ে। এতে যদি কখনো আমার বিয়ে না হয় তো না হোক। তবুও আমি এই বিয়ে করবো না। এখন যা খুশি করতে পারো তোমরা।”
তখন এক কথায়, দুই কথায় অনেক ঝামেলা হয়ে যায় বাড়িতে। এই বিয়ে না করলে ভাবীরা বাপের বাড়ি চলে যাবে সিদ্ধান্ত নেয়। ভাইয়ারাও চায় আমি এই বিয়েটা করি। মা শুধু মুখে আঁচল গুঁজে কাঁদতো। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে দৃঢ় ছিলাম। অন্যায়ের কাছে আমি মাথা নত কিছুতেই করবো না। ভাইয়া ঠান্ডা মাথায় বলেছিল,
“দেখ বোন, মানছি রামিম একটা ভুল করেই ফেলেছে। তাই বলে বিয়েটাই ভেঙ্গে দিবি? আগের কথাই ভাব? পরপর দুইটা অতীত তোর। তাছাড়া রামিম সব জেনেই তোকে বিয়ে করতে রাজি। আর তুই ওর একটা দোষ মাফ করতে পারবি না?”
“বাহ্ ভাইয়া বাহ্! কয়লা ধুলে যেমন ময়লা যায়না তেমনি খারাপ সময়ে পাশে দাঁড়ালেই ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করা যায় না। আমায় বিয়ে দিতে চাচ্ছো নাকি কুরবানি দিতে চাইছো তোমরা? আমি মেয়ে বলে সবসময় স্যাক্রিফাইজ আমাকেই করতে হবে? কেন? সবসময় আমিই কেন? প্রয়োজনে সারাজীবন এভাবেই থাকবো তবুও এমন চরিত্রহীন কাউকে আমি বিয়ে করবো না।”
“তুই কি চাস আমরা আবার আগের মত আলাদা হয়ে যাই?”
“ভয় দেখাচ্ছো? আমি আর ভয় পাইনা ভাইয়া। বিয়ের প্রায় এক বছরের মাথায় দুই ভাই মিলে কৌশলে আলাদা হয়ে গিয়েছিলে। বলেছিলে অফিস থেকে ট্রান্সফার করা হয়েছে। মাসেও একটা খবর নিতে না। আমি বুঝতাম না ভেবেছো? তখন কি তোমাদের ছাড়া থাকিনি? থেকেছি তো! এরপর আব্বু মৃত্যুর পর আবার ফিরে এলে। মনে হয়েছিল পৃথিবী ফিরে পেয়েছি আমি। কিন্তু আমি তো ভুল ছিলাম। তোমরা শোধরাওনি ভাইয়া তোমরা শোধরাওনি।”
ভাবী রাগে গজগজ করতে বলেছিল,
“এইটুকুন একটা মেয়ের কাছে আমাদের এত কথা শুনতে হচ্ছে? তোমাদের কথায় ফিরে আসছিলাম আর এখন তোমারই বোন এসব কথা শুনাচ্ছে। নিজের ছোটবোনের মত ভালোবেসেছিলাম আর তোমার বোন এর প্রতিদান দিচ্ছে এখন।”
“ভাবী, আমার আপু কিন্তু কখনোই এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতো না। এটা সত্যিই যে, যে কয়টা দিন একসাথে ছিলে সে কয়টা দিন শুধু আপুর মতই না মায়ের মতও ভালোবেসেছো। তাহলে এখন এমন চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছো কেন ভাবী?”
ভাবীর আর কোনো উত্তর পাইনি। তারা চলে যাওয়ার জন্য রেডি। ভাইয়াদের বলেছিলাম,
“তোমরাও নিঃসঙ্কোচে চলে যেতে পারো। আটকাবো না। ছোট ছোট বাচ্চা আছে তোমাদের। আমাদের জন্য নিজেদের পরিবার নষ্ট করো না। মাকে নিয়ে আমি ভালো থাকবো।”
জানিস পৃথা, তখন মুখে এটা বললেও মনে মনে বলেছিলাম ভাইয়া প্লিজ যেয়ো না প্লিজ যেয়ো না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সবাই চলে গেলো। তখন থেকেই মাকে নিয়ে আমার একলা জীবন।”
প্রিয়া এবার জোরে জোরে শব্দ করে কাঁদছে। প্রিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে পৃথা। পৃথাও কাঁদছে। কি করে একটা মানুষ এত কষ্ট সহ্য করতে পারে। ক্যান্টিনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। ফোনের ওপাশে ফাহাদও কাঁদছে। ভাবতেই পারছেনা মেয়েটার এত কষ্ট। ইচ্ছে করছে রামিম ছেলেটাকে খুন করে ফেলতে। ওপাশ থেকে মানুষের হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। সবার চোখেমুখে কৌতুহল কি হয়েছে! এই মুহুর্তে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। ফাহাদ ভালো করে চোখমুখ মুছে নিলো। এরপর ক্যান্টিনে গিয়ে বললো,
“কি হয়েছে কি এখানে? এত হৈচৈ কেন? আর ক্যান্টিনে কি সবার? লাঞ্চ টাইম যে পেড়িয়ে গেছে সে খেয়াল কি আছে আরো? যাও সবাই যে যার কাজে।”
ফাহাদের ধমকে সবাই চলে যায়। ক্যান্টিন এখন পুরোপুরি শান্ত। ফাহাদ ইশারায় পৃথাকে চলে যেতে বললো। পৃথা চোখ মুছতে মুছতে বেড়িয়ে গেলো। প্রিয়াও চোখ মুছতেছে। কিন্তু বারবার চোখে পানি এসে পড়ছে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে। ফাহাদ গিয়ে প্রিয়ার পাশে বসলো। প্রিয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললো,
” স স স্য রি স্যার! আ..মি কাজে যাচ্ছি।”
প্রিয়া চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ফাহাদ হাত টেনে ধরে। প্রিয়া দাঁড়িয়ে পড়ে। ফাহাদ প্রিয়ার সামনে গিয়ে চোখের পানি মুছে বললো,
“এই মিষ্টি চোখে পানি মানায় না। কারা কাঁদে জানেন? যারা হেরে যায়। আপনি কি এত সহজেই হেরে যাবেন?”
প্রিয়ার কি হলো, কে জানে! দুম করে কাঁদতে কাঁদতে ফাহাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
“কেন সবসময় আমার সাথেই এমন হতে হবে কেন!”
ফাহাদ প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“কাম ডাউন প্রিয়া।”
প্রিয়া ফাহাদকে ছেড়ে দিয়ে দৌঁড়ে চলে যায়।…

চলবে…

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ