বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 20



বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১৮+১৯

#বেলীফুলের_ইতিকথা(১৮)
#মীরাতুল_নিহা

দোকানের কিছুটা দূরে ছায়ায় এসে দাঁড়াল দুজন। আদনান শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও বেলীর ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। যে মানুষটাকে সারাক্ষণ এড়িয়ে গেছে, আজ নিজের চরম দুর্দিনে তাকেই ডেকে পাঠাতে হলো। বেলী অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে অস্ফুট স্বরে বলল,

“আদনান, তোমাকে হুট করে এভাবে ডাকার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি জানি, তোমার সাথে আমি আগে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। আমার ওপর রাগ করো না ভাই।”

আদনান বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল।

“ওসব কথা থাক। বিপদে কাছের মানুষ ছাড়া আর কার কাছে যাবেন? আচ্ছা ফারহান ভাইয়ের ডিভোর্সের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবছেন?”

বেলীর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে স্থির গলায় বলল,

“হ্যাঁ আদনান। সে কারণেই তো এসেছি। ফারহান আমাকে এভাবে পথে বসিয়ে নিজে সুখে থাকবে, তা হতে পারে না। আমি তাকে ক্ষমা করব না। সে আমাকে তালাক দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার দেনমোহরের টাকা আর ফিওনার ভরণপোষণ—একটা পয়সাও আমি ছাড়ব না। কিন্তু আদনান, আমার তো কোনো সামর্থ্য নেই। উকিল ধরব সেই টাকা কই? আমি তো কিছুই চিনি না।”

আদনান আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,

“আপনি নিজেকে একা ভাববেন না। আমি এই কয়েকদিন নিজে থেকে কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। আয়েশা বলার পর। আপনি কি জানেন, সরকারিভাবে ‘লিগ্যাল এইড’ নামে একটা ব্যবস্থা আছে? যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাদের সরকার থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগ করে দেওয়া হয়। এমনকি মামলার কাজ চালানোর খরচও আপনার এক পয়সা লাগবে না।”

বেলী অবাক হয়ে বলল,

“বলো কী? কিন্তু মামলা তো অনেক জটিল ব্যাপার। আইন-কানুন কি আমার পক্ষে থাকবে?”

আদনান বুঝিয়ে বলতে লাগল,

“দেখেন, আইনের মারপ্যাঁচ বলতে গেলে প্রথম ধাপ হলো পারিবারিক আদালতে মামলা করা। আপনি মূলত দুইটা দাবি করবেন—এক, আপনার পুরো দেনমোহর। আর দুই, ফিওনার ভরণপোষণ। আইন অনুযায়ী, ফারহান ভাই নোটিশ দেওয়ার পর তিন মাস আপনার থাকা-খাওয়ার খরচ দিতে বাধ্য। আর দেনমোহরের টাকা তো উনার ওপর ঋণের মতো, ওটা উনি শোধ না করলে আদালত উনার সম্পত্তি ক্রোক করতে পারে। এমনকি উনি যদি টালবাহানা করেন, তবে উনার জেল পর্যন্ত হতে পারে।”

বেলী গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু আমার কাছে তো কাবিননামার অরিজিনাল কপি নেই, ওটা ফারহানের কাছে।”

আদনান বুদ্ধিদীপ্ত হেসে বলল,

“অরিজিনাল কপি লাগবে না আপা। যে কাজীর অফিসে বিয়ে হয়েছে, সেখান থেকে আপনি একটা সার্টিফাইড কপি তুলে নিতে পারবেন। ওটাই কোর্টে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। আমি কালই খোঁজ নিয়ে কাজী অফিস থেকে ওটা বের করার ব্যবস্থা করব। আপনি শুধু ফিওনার জন্মের প্রমাণপত্র আর আপনার আইডি কার্ডটা জোগাড় রাখেন।”

আদনান আরও যোগ করল,

“আরেকটা কথা, তালাক কার্যকর হতে ৯০ দিন সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে ফারহান ভাই চাইলে তালাক প্রত্যাহার করতে পারে, কিন্তু আপনি যদি না চান তবে আইনত কেউ আপনাকে বাধ্য করতে পারবে না। আপনি কেবল আপনার পাওনা আদায়ের জন্য লড়বেন।”

আদনানের কথাগুলো শুনে বেলীর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে খানিকটা উত্তেজিত হয়েই বলল,

“কী বলছ আদনান? ফিরিয়ে নেওয়া মানে? ফারহান তো সাক্ষী রেখে আমাকে তিন তালাক দিয়েছে। আল্লাহ্র আরশে সেই খবর পৌঁছে গেছে। ইসলামি বিধানে তো তিন তালাক দিলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেস হয়ে যায়। সেখানে আবার ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ কোথায়? আমি কি অতই সস্তা যে সে যখন খুশি আমাকে ছুড়ে ফেলবে, আর যখন খুশি ফিরিয়ে নেবে?”
আদনান বেলীর মনের অস্থিরতা বুঝতে পারল। সে শান্ত গলায় বলল,

“ আপনি ধর্মীয় দিক থেকে একদম ঠিক বলছেন। তিন তালাকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমি বলছিলাম রাষ্ট্রীয় আইনের কথা। বাংলাদেশের আইন বলে, রাগের মাথায় বা সাক্ষী রেখে কেউ মুখে তালাক দিলেই সেটা চূড়ান্ত হয় না। আইনের উদ্দেশ্য হলো একটা সংসারকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করা। তাই ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়।”

বেলী তপ্ত স্বরে বলে উঠল, “আইন যা-ই বলুক আদনান, আমার কাছে আল্লাহ্র আইনই বড়। যে স্বামী সবার সামনে আমাকে ‘তিন তালাক’ দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে পারে, সে ফিরিয়ে নিলেও আমি আর ওই ঘরে যাব না। ওই সম্পর্ক আমার জন্য হারাম হয়ে গেছে। আমি কেবল আমার দেনমোহরের টাকা আর ফিওনার অধিকার বুঝে পেতে চাই। সে যদি ফিরিয়ে নিতেও আসে, আমি সরাসরি না করে দেব।”

আদনান মাথা নিচু করল। সে বুঝতে পারছে বেলীর আত্মসম্মানে কতটা আঘাত লেগেছে। সে বলল,

“আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি যখন মনস্থির করেছেন আর ফিরবেন না, তখন ওই ৯০ দিন সময়টা আপনার কেবল টাকা আদায়ের আইনি অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে। ফারহান ভাই যদি ফিরিয়ে নেওয়ার নাটকও করেন, আপনি কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন যে আপনি আর সংসার করতে ইচ্ছুক নন। এতে আপনার দেনমোহর পাওয়া আরও সহজ হবে।”

বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, সমাজ আর আইনের এই মারপ্যাঁচে মেয়েদের জীবনটাই যেন একটা দাবার ঘুঁটি। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে বের করে দেয়, কেউ আইনের দোহাই দিয়ে আটকে রাখতে চায়।
সে দৃঢ়স্বরে বলল,

“ফারহান আমাকে ফিরিয়ে নেবে কি না, সেই আশায় আমি বসে নেই। আমি শুধু চাই সে যেন তার কৃতকর্মের শাস্তি পায়। আমার দেনমোহরের এক একটা টাকা আদায় করে নেব।”

আদনান আর কথা বাড়াল না। আলোচনা শেষে বেলীর মনের ভার অনেকটাই হালকা হয়ে গেল।

“অনেক ধন্যবাদ ভাই। এত বুঝো তখন পড়াশোনাটা আর করলে না কেন?”

আদনান বিনিময়ে মুঁচকি হাসলো। সে বেলীর থেকে গুনে গুনে প্রায় তিন বছরের ছোটো! বর্তমান বয়স ২২।

“গরীবের আর পড়াশোনা! উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়ার পর অর্নাসে ভর্তি হলেও টাকার অভাবে আর চালিয়ে যেতে পারিনি।”

বেলী বড় করে একটা শ্বাস নিলো। এই টাকা যে কত মূল্যবান সে এখন ভালো করেই বুঝে।

“চাইলে আবার শুরু করতে পারো। বয়স তো তেমন হয়নি।”

আদনান ফিরতি কিছু বলল না। এই তেমন না বয়সেই তার মনের ভেতর কত উথাল পাথাল শুরু হয়েছে! সেটা দমাবে কি করে তা নিজেরও জানা নেই। সে আদনানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধীরপায়ে বস্তির ভেতর নিজের ঘরটার দিকে যায়। দেখতে দেখতে দেড়টা মাস পার হয়ে গেল। সময়ের এই চাকা যেন বেলীর জীবনে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। সেই ভ্যাপসা গরম, ছোট ঘরটা এখন আর শুধু অভাবের সাক্ষী নয়, বরং এক কর্মচঞ্চল কারখানায় রূপ নিয়েছে। বেলীর কোলের ছোট্ট ফিওনা এখন আর আগের মতো শুধু শুয়ে থাকে না। সে এখন ঘর জুড়ে হামাগুড়ি দেয়। তার সেই আধো আধো বুলিতে ‘মা মা’ ডাক যখন ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন বেলীর সব ক্লান্তি যেন জাদুমন্ত্রে উবে যায়। আট মাস পেরোনো ফিওনা এখন টলমল পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তার প্রতিটি খিলখিল হাসি বেলীর লড়াইয়ের জ্বালানি।
ব্যবসায়িক দিক থেকেও বেলী এখন আলোর মুখ দেখছে। চুড়ির পাশাপাশি সে হাতে বানানো গয়নাও তৈরি শুরু করেছে। এআই ব্যবহার করে চমৎকারভাবে ছবি তোলার সেই বুদ্ধিটা দারুণ কাজে লেগেছে। প্রথম মাসেই তার মোট লাভ হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকা! প্রথম অর্ডারের পর যেন আর পেছনে তাকাতে হয়নি। যদিও এই সাফল্যের পেছনে আছে বেলীর দিনরাত এক করা অজস্র পরিশ্রম—এক হাতে মেয়েকে সামলানো আর অন্য হাতে নিপুণ নকশা করা। চোখ দুটো লাল হয়ে যেত, কোমর ব্যথা করত, তবুও সে থামেনি।
টিউশনি থেকেও এবার চার হাজার টাকা হাতে এসেছে। রাইসা আর রিয়াদকে পড়ানোর সেই টাকাটা সে খুব যত্ন করে আলাদা করে রেখেছে সংসারের খরচের জন্য। আয়েশা এবার পদোন্নতি পেয়ে বেতন দশ হাজার টাকা পেয়েছে। আয়েশা বরাবরই দরিয়া দিল মানুষ, সে বলে,

“বেলী, তুই আর টাকা দিবি কী? আমরা তো একসাথেই আছি।” কিন্তু বেলী তা মানেনি। সে জানে আয়েশারও একটা ভবিষ্যৎ আছে, তাকেও টাকা জমাতে হবে। তাই সংসারের খরচে বেলী এখন নিজের ভাগের টাকাটা জোর করেই দেয়। সবচেয়ে বড় স্বস্তি মিলেছে আজ সকালে। মতিন মহাজনের সেই বিষাক্ত সুদের টাকা আর আসলের পুরোটা বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে বেলী। সেই কর্কশ লোকটা যখন পানের পিক ফেলে টাকাগুলো গুনছিল, বেলীর মনে হচ্ছিল তার ঘাড় থেকে যেন হিমালয় পাহাড়ের সমান একটা বোঝা নেমে গেল। সুদে টাকা নেওয়ার পর প্রতিটি রাত সে আশঙ্কায় কাটিয়েছিল, যদি শোধ করতে না পারে? আজ সে দায়মুক্ত।
মহাজনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বেলী আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে দেনা শোধ করার তৃপ্তিই আলাদা। সে মনে মনে ভাবল,
“এই মাসটা কেবল দেনা মেটাতেই গেল, পরের মাস থেকে ইনশাআল্লাহ লাভের মুখ দেখবে।”

বেলী দ্রুত পায়ে বস্তির দিকে হাঁটা ধরল। আজ বিকেলে তার নতুন কিছু অর্ডারের মাল ডেলিভারি দিতে হবে।
অর্ডার তো আসছে, কিন্তু এই মালগুলো মানুষের হাতে পৌঁছাবে কীভাবে? প্রথম কয়েকবার আদনান সাহায্য করেছিল, কিন্তু বারবার তো আর তাকে বলা যায় না। বেলী নিজেই খোঁজ নিয়ে জানল বস্তির অদূরেই একটা কুরিয়ার সার্ভিসের ছোট অফিস আছে। এখন নিয়ম করে দুদিন পরপর বেলী ফিওনাকে আয়েশার কাছে রেখে কিংবা সাথে নিয়ে সেখানে যায়। ছোট ছোট কার্ডবোর্ডের বাক্সে সযত্নে চুড়ি আর গয়নাগুলো প্যাক করে বেলী। ভেতরে একটা ছোট চিরকুটে লিখে দেয়—’আমাদের ওপর ভরসা রাখার জন্য ধন্যবাদ’। কুরিয়ার অফিসে গিয়ে যখন সে তার হাতের কাজগুলো জমা দেয়, তখন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় তার। এই গয়নাগুলো শহরের বড় বড় দালানের কোনো এক সুখী নারীর হাতে উঠবে, আর সেই আয়ে তার ফিওনার সুন্দর ভবিষ্যত তৈরী হবে একটু একটু করে।
কুরিয়ারের চার্জ নিয়ে প্রথম দিকে একটু হিসাব মেলাতে কষ্ট হচ্ছিল। ক্রেতারা কি ডেলিভারি চার্জ দিতে চাইবে? কিন্তু বেলী দেখল, কাজের মান ভালো হলে মানুষ ওই বাড়তি টাকা দিতে দ্বিধা করে না। কুরিয়ারের রসিদগুলো সে একটা ফাইলে জমিয়ে রাখছে। ওগুলো যেন তার সফলতার একেকটা দলিল। আজও তিনটে পার্সেল বুক করে যখন সে ফিরছিল, কুরিয়ারের লোকটা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
“আপা, আপনার তো মাশাআল্লাহ ভালোই অর্ডার আসে। প্রতিদিন দেখি আসেন।”

বেলী শুধু মৃদু হাসল। এই হাসির আড়ালে যে কত বিনিদ্র রাত আর কত চোখের জল লুকিয়ে আছে, তা কেবল সে’ই জানে।
ছোট্ট ঘরটা এখন আর শুধু তার থাকার জায়গা নয়, এটা এখন তার স্বপ্ন গড়ার কারখানা। ঘরে ফিরে ফোনটা হাতে নিতেই বেলীর চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। এ তো সেই রাইসার আম্মুর বড় বোন, যিনি গত মাসে প্রথমবার এক জোড়া চুড়ি নিয়েছিলেন! মেসেজটা খুলেই বেলীর মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। আপা লিখেছেন, “বেলী, তোমার পাঠানো গয়নাগুলো পরে আমি একটা দাওয়াতে গিয়েছিলাম। সবাই এত প্রশংসা করেছে যে কী বলব! বিশেষ করে ফিনিশিংটা দারুণ। আমি আমার আরও দুই বান্ধবীর জন্য একই রকম চার সেট চুড়ি আর একটা নেকলেস নিতে চাই। অর্ডারটা কনফার্ম করো প্লিজ।”
বেলীর খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছিল। শুধু নতুন কাস্টমার নয়, তার কাজের মান ভালো বলে ‘ফিরতি কাস্টমার’ বা রেগুলার ক্লায়েন্টও তৈরি হতে শুরু করেছে। একজন উদ্যোক্তার জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?
বেলী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, এখন আর তাকে শুধু বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করলেই হবে না; এখন তাকে নিজের ব্যবসাটা আরো বড় করার কথা ভাবতে হবে। অর্ডারের বহর বাড়ছে দেখে বেলী আজ আরও কিছু নতুন নকশার পুঁতি আর সুতা কেনার তালিকা তৈরি করল। ফিওনা তখন হামাগুড়ি দিয়ে এসে বেলীর আঁচল টেনে ধরল, যেন সেও মায়ের এই সাফল্যে ভাগ বসাতে চায়।

#চলবে

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৯)
#মীরাতুল_নিহা

হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের উৎকট গন্ধ থেকে মুক্তি পেলেও ফারহানের মুক্তি মেলেনি যন্ত্রণার হাত থেকে। আজ তিনদিন হলো সে বাড়িতে ফিরেছে, কিন্তু বিছানাই এখন তার একমাত্র জগত। ভয়াবহ এক্সিডেন্টে ফারহানের বাঁ পা-টা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী কয়েক মাস তাকে সম্পূর্ণ ‘বেড রেস্টে’ থাকতে হবে। সামান্য চলাফেরা করতে হলেও তাকে এখন বগলের নিচে গুঁজে নেওয়া সেই অ্যালুমিনিয়ামের ক্রাচ (Crutch) বা লাঠির ওপর ভর দিতে হয়। যাকে গ্রাম্য ভাষায় অনেকে ‘স্কেচ’ বলে থাকে। সেই ক্রাচে ভর দিয়ে সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে বাথরুম পর্যন্ত যায়।
​হাসপাতালের বিল বাবদ প্রায় পনেরো হাজার টাকা খরচ হয়েছে, আর ফেরার সময় আরও পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। এই পুরো টাকাটাই দিয়েছে সেই গাড়ির মালিক, যার সাথে ফারহানের ধাক্কা লেগেছিল। ফারহানের পকেটে তখন এক আনা পয়সাও ছিল না। অন্যের দয়ায় জীবন বাঁচিয়ে বাড়িতে আসার পর ফারহান ভেবেছিল একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেবে, কিন্তু দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ​বাড়িতে আসার পর ফারহান যেন আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শরীরের যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মনের যন্ত্রণা, যার মূলে রয়েছে তৃষ্ণা। তৃষ্ণার মধ্যে এখন এক আমূল পরিবর্তন। ফারহান বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে, অথচ তৃষ্ণার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
বিকেলের মরা রোদ জানলা দিয়ে ফারহানের উপর এসে আছড়ে পড়েছে। শরীরের ব্যথার চেয়েও পেটের ভেতরকার মোচড়টা এখন বেশি কষ্ট দিচ্ছে তাকে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা খুব যত্ন করে চোখে গাঢ় কাজল দিচ্ছে। ফারহান অনেকক্ষণ ধরে তার দিকে তাকিয়ে থেকে ধরা গলায় বলল,

“তৃষ্ণা, বড্ড খিদে লাগছে গো। পেটের ভেতরটা কেমন জানি করছে।”

তৃষ্ণা কাজল দেওয়া থামিয়ে আড়চোখে একবার ফারহানের দিকে তাকাল। কপালে বিরক্তির ভাঁজ তুলে বলল,
“দুপুরে তো এক থালা ভাত খাইলা, এর মধ্যেই আবার খিদা কিসের? সারাক্ষণ খালি তোমার ক্ষিদাই লাগে? মানুষের পেটে বাচ্চা থাকলেও তো এত ঘন ঘন খায় না!”
ফারহান বিনীত স্বরে বলল,

“ডাক্তার হাই ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দিছে তো, ওষুধগুলোর গরমে শরীর শুকিয়ে আসে আর খিদে পায়। একটু কিছু খাইতে দিলে ভালো হইতো।”

তৃষ্ণা এবার ঘুরে দাঁড়াল। কড়া গলায় বলল,

“এখন খেলে রাতে কী খাইবা শুনি? ঘরে তো আর চাল-ডালের পাহাড় নাই। আর এখন যদি খাইয়ে দিই, তবে রাতে আবার কে রাঁধবে? আমার তো আর ওসবের সময় নেই।”
ফারহান একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“সময় নেই কেন? কোথাও যাইবা নাকি?”

তৃষ্ণা উত্তর না দিয়ে আবার আয়নায় মন দিল। আজ সে শাড়ি পরেনি, তার বদলে পরেছে একটা আঁটোসাটো আধুনিক থ্রিপিস। চুলগুলো পিঠের ওপর ছাড়া, কপালে একটা বড় লাল টিপ। ওড়নাটা দায়সারাভাবে গলার একপাশে ঝোলানো। তাকে দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে সে বিবাহিত একজন নারী ফারহান তীক্ষ্ণ চোখে তার সাজগোজ দেখে বলল,

”এত সাজগোজ করে কোথায় যাচ্ছ তুমি? শরীরটা আমার ভালা না, এই অবস্থায় আমারে একা রাইখা কোথায় যাবে?”

“ঘুরতে যাচ্ছি। কেন, যাওয়া নিষেধ নাকি?”

তৃষ্ণা লিপস্টিকটা ঠোঁটে বুলিয়ে নিল। ফারহানের ভেতরে এবার সন্দেহের বিষবাষ্প দানা বাঁধল। সে ক্রাচে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতে বলল,

”কিসের ঘুরাঘুরি? আর কার সাথেই বা যাও? এই সন্ধ্যায় সাজুগুজু করে বাইরে যাওয়ার কী দরকার?”

তৃষ্ণা এবার অগ্নিশর্মা হয়ে ফিরে তাকাল। তার গলার স্বর সপ্তমে চড়ল,

“খবরদার ফারহান! আমাকে একদম জেরা করতে আসবা না। তোমার মতো এক পঙ্গু লোকের সাথে যে আমি এখনো ঘরে আছি, এটাই তো তোমার ভাগ্য! এই পচা ঘরে সারাদিন বসে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তুমি তো এখন অচল, তোমার সাথে বসে থাকলে কি আমার পেট ভরবে না মন ভরবে?”

তৃষ্ণার প্রতিটি শব্দ যেন ফারহানের বুকে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তৃষ্ণা থামল না। সে হাতব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কড়া স্বরে বলল,

“বেশি প্রশ্ন করবে না। মেজাজ খারাপ করলে কিন্তু একবারে চলে যাব, তখন এক গ্লাস পানি দেওয়ার মানুষও খুঁজে পাবে না। ঘরে বসে ওষুধ খাও আর ঘুমাও।”
তৃষ্ণা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দড়াম করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে গেল, যার শব্দে ফারহান কেঁপে উঠল। ফারহান ফ্যালফ্যাল করে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। এই তৃষ্ণার জন্যই সে এতকিছু করেছে? বিছানার পাশে পড়ে থাকা সেই অ্যালুমিনিয়ামের ক্রাচ দুটো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। ফারহান বুঝতে পারল, সে এক চরম ভুলের মাশুল দিচ্ছে, কিন্তু সেই মাশুল যে এত ভয়ানক হবে তা সে কল্পনাও করেনি। আজ সে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, অথচ এক গ্লাস পানি দেওয়ার মতো কেউ নেই।
​পায়ের প্লাস্টারে মোড়ানো অংশটা এখন টনটন করছে। ফারহান দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করার চেষ্টা করল। তার মনে হলো, বেলীর অভিশাপ বোধহয় তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। বিছানার পাশে রাখা সেই ক্রাচ দুটোর দিকে তাকিয়ে ফারহানের চোখে জল এল। শরীরের অক্ষমতা আর তৃষ্ণার এই চরম অবহেলা—ফারহানের সহ্যের সীমা আজ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, সে শুধু পঙ্গু হয়নি, সে আসলে এক বিশাল ভুল গর্তে পা দিয়েছে যেখান থেকে ফেরার পথ এখন অনেক ঝাপসা।

তৃষ্ণা চলে যাওয়ার আধঘণ্টা পরেই দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফারহান ভাবল তৃষ্ণা কি কিছু ফেলে গেল? কিন্তু না, দরজা খুলতেই দেখল এক ডাকপিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি হলদে খাম এবং সাথে একটি লাল রঙের কার্ড।
পিয়ন কর্কশ গলায় বলল,

“ফারহান সাহেব কে? আপনার একটা রেজিস্ট্রি করা চিঠি আছে। এই লাল কার্ডটায় একটা সই করে দেন।”

ফারহান অবাক হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে সই করে দিল। পিয়ন চলে যাওয়ার পর সে খামটা নিয়ে বিছানায় ফিরে এল। খামটা খুলতেই তার চোখের সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘লিগ্যাল নোটিশ’ মানে ‘আইনি নোটিশ নিচে একজন আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষর। ফারহানের বুকটা ধক করে উঠল। নোটিশের ভাষাগুল পড়তে লাগলো,

“আমার মক্কেল মোসাম্মৎ বেলী রহমানের পক্ষ হইতে আপনাকে জানানো যাইতেছে যে, আপনি তাহাকে বিনা কারণে এবং দেনমোহর পরিশোধ ব্যতিরেকেই লোকসমক্ষে তালাক প্রদান করিয়াছেন। অত্র নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে দেনমোহরের ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা এবংআপনার কন্যা ফিওনার মাসিক ভরণপোষণ বাবদ নির্দিষ্ট অংকের টাকা পরিশোধ করিতে হইবে। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করা হইবে, যাহার যাবতীয় খরচ ও দায়ভার আপনার ওপর বর্তাইবে।”

ফারহান ধপাস করে সোফায় বসে পড়ল। তার মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করছে। এই নোটিশের অর্থ হলো—বেলীর পেছনে এখন রাষ্ট্র এবং আইন দাঁড়িয়ে আছে। নোটিশের নিচে ছোট করে লেখা কিছু ধারা ফারহানকে আরও আতঙ্কিত করে তুলল। সেখানে বলা হয়েছে, দেনমোহর হলো স্ত্রীর একটি আইনি ঋণ। এই ঋণ শোধ না করলে আদালত কেবল তার স্থাবর সম্পত্তি (যেমন এই ঘর বা আসবাবপত্র) ক্রোকই করবে না, বরং পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হতে পারে।
ফারহান বিড়বিড় করে বলল,

”দুই লাখ টাকা! আমার পকেটে এখন ওষুধের পাঁচটক টাকাও নাই, আমি দুই লাখ টাকা কই পাব? আর জেল? আমি এই পঙ্গু শরীর নিয়ে জেল খাটব ও আল্লাহ্!”

তৃষ্ণা যখন ফিরে আসবে, তখন এই নোটিশ দেখলে কী লঙ্কাকাণ্ডটাই না বাঁধবে! ফারহান বুঝতে পারল, সে এখন আক্ষরিক অর্থেই এক চোরাবালিতে আটকে গেছে। একদিকে পঙ্গু শরীর, অন্যদিকে তৃষ্ণার অবহেলা, আর এখন এই আইনি খাঁড়া। বেলী তাকে ক্ষমা করেনি, সে তার অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু করে দিয়েছে।
ফারহানের মনে হলো, কাগজের টুকরোটি আসলে তার কৃতকর্মের এক মরণকামড়। সে ফ্যালফ্যাল করে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ রাতটা তার জন্য বড় দীর্ঘ হতে চলেছে।

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১৬+১৭

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৬)
#মীরাতুল_নিহা

তৃষ্ণা আজকাল বড্ড বদলে যাচ্ছে। সেই শুরুর দিকের মোহমাখা নমনীয়তা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। এখন তার কথায় কথায় মেজাজ, আকাশচুম্বী সব আবদার। ফারহান খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল কীভাবে সামলাবে সে এই সংসার?
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল তৃষ্ণা। ফারহান পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা সেজেছে চমৎকার করে। কপালে একটা বড় লাল টিপ, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, আর রেশমি চুলগুলো কাঁধের ওপর সুন্দর করে আঁচড়ানো। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় তৃষ্ণার ফর্সা মুখটা যেন জ্বলজ্বল করছে। ফারহানের সব রাগ, সব ক্লান্তি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। এই একটা রূপই তাকে বারবার গলে যেতে বাধ্য করে। সব কষ্ট ভুলে ফারহান বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
তৃষ্ণা এসে খাটের এক কোণে বসল। ফারহান উঠে গিয়ে ওর ঠিক পাশে ঘেঁষে বসল। তার মনটা তখন এক অদ্ভুত মমতায় ভরে আছে। সে চাইল তৃষ্ণাকে একটু নিবিড়ভাবে ছুঁতে, একটু আদর করতে। ফারহান যেই হাত বাড়িয়ে তৃষ্ণার কাঁধে আলতো করে স্পর্শ করল, অমনি তৃষ্ণা ঝটকা দিয়ে সরে বসল।
তৃষ্ণা মুখ ঝামটা দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,

“রাখো তো! এখন কি ওসবের সময় নাকি? যত্তসব! রাতের কাজ রাতেই ভালো হয়। এখন আমার মেজাজ ঠিক নাই।”
ফারহান কপাল কুঁচকে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তৃষ্ণা কী বোঝাতে চেয়েছে তা সে পরিষ্কার বুঝেছে। কিন্তু ফারহানের খারাপ লাগল অন্য জায়গায়। সে তো কেবল শরীরি কামনায় তাকে ছুঁতে চায়নি তার ভেতরের হাহাকার আর মানসিক অস্থিরতা একটু মমতাময় স্পর্শে প্রশমিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তৃষ্ণা সেখানে কেবল যৌনতাই খুঁজে পেল। মনের মিলের চেয়ে তৃষ্ণার কাছে শারীরিক চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটাই যেন মুখ্য।
ফারহান কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তৃষ্ণার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তৃষ্ণার চোখেমুখে এক লহমার জন্য ভয়ের আভা খেলে গেল, পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে ফারহানের দিকে একবার সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত খাট থেকে উঠে পড়ল।
“আইতাছি।”
তৃষ্ণা প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কথা বলতে।
ফারহান একা ঘরে বসে রইল। তার মনের ভেতর খচখচ করতে লাগল কার ফোন এল যে তাকে আড়াল করে কথা বলতে হবে?
প্রায় আধা ঘণ্টা পর তৃষ্ণা ঘরে ফিরল। তার চোখেমুখে একটা চাপা উত্তেজনা, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলোচনা সেরে এসেছে। ঘরে ঢুকেই সে কোনো কথা না বলে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ফারহান এতক্ষণ গুম মেরে বসে ছিল। তৃষ্ণার উপস্থিতি টের পেয়ে সে এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আলতো করে তৃষ্ণার ঘাড়ে আর মুখে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

“এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলে? কে কল দিছিল?”

তৃষ্ণা নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,

“আমার এক বন্ধু। কূান?”
ফারহানের বুকে খচ করে বিঁধল কথাটা। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“বন্ধুর কল ধরতে আমার সামনে থেকে উঠে বাইরে যেতে হয় নাকি? আমার সামনে কথা কইলে কী হতো?”
তৃষ্ণা এবার বিরক্তির সাথে পাশ ফিরল।

“আরে বাবা, মানুষের তো একটা ব্যক্তিগত বিষয় থাকে। সবারই তো প্রাইভেসি আছে, তাই না?”

ফারহান আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক হয়ে বলল,

“স্বামী-স্ত্রীর ভেতর আবার কিসের প্রাইভেসি তৃষ্ণা? আমরা তো এখন একজন আরেকজনের অংশ। আমাদের মধ্যে তো লুকোচুরির কিছু থাকার কথা না।”

তৃষ্ণা তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন রাগের ঝলকানি। কর্কশ গলায় বলল,

“থাকে! সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। আমাকে এই দমবন্ধ করা শাসনের মধ্যে রাখতে চাইও না।”

ফারহান বড় অসহায় বোধ করতে লাগল। সে কাতর গলায় বলল,

“তৃষ্ণা, তুমি দিন দিন বড্ড বদলে যাইতাছো। তুমি কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না?”

তৃষ্ণা এবার হাত নেড়ে রাগ দেখিয়ে বলল,

“ভালোবাসি না মানে? ভালোবাসি দেখেই তো তোমার মতো বিবাহিত আর এক বাচ্চার বাপকে আমার মতো সুন্দরী একটা মেয়ে এমনি এমনি এসে বিয়ে করছে?”

তৃষ্ণার এই কথাগুলো ফারহানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তাকে উদ্ধার করার বা তাকে গ্রহণ করার যে ‘অহংকার’ তৃষ্ণা দেখাল, তা ফারহানকে এক বিন্দু আনন্দ দিল না বরং নিজের আত্মসম্মানবোধে চরম আঘাত লাগল। সে
ফারহান যখন কড়া কোনো জবাব দিতে যাবে, ঠিক তখনই আবারও তৃষ্ণার ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। ঘরের নিস্তব্ধতায় রিংটোনের শব্দটা যেন ফারহানের সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। তৃষ্ণা আবারও অস্থির হয়ে ফোনের দিকে হাত বাড়াল।

আয়েশা তার হাড়ভাঙা খাটুনির জমানো টাকা থেকে আজ অনেকগুলো জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। বসার জন্য প্লাস্টিকের ছোট দুটো পিঁড়ি হতে সিলভরের কয়েকটা গামলা আর রান্নার কিছু মশলাপাতি। এসেই সে দেরি করেনি, নতুন কেনা মাটির চুলাটায় আগুন ধরিয়ে ঝটপট ভাত চড়িয়ে দিয়েছে।
বেলী তখন ঘরের এক কোণে বসে পরম মমতায় ফিওনাকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। তৃষ্ণার্ত শিশুটি পেট ভরে দুধ খেয়ে মায়ের কোলেই শান্তিতে চোখ বুজেছে। বেলী আলতো করে মেয়েকে চাদরে শুইয়ে দিয়ে আয়েশার পাশে এসে বসল। আয়েশা ভাতের হাঁড়ি থেকে এক থালা ধোঁয়া ওঠা ভাত আর দুটো বড় সাইজের আলু সেদ্ধ বেলীর সামনে এগিয়ে দিল।
মাছের ঝোল বা মাংসের বিলাসিতা তাদের জন্য এখন স্বপ্ন। বেলী এক চিমটি লবণ দিয়ে গরম আলু দুটোকে ভালো করে চটকে নিল। এখনো ভালো কোনো তরকারির ব্যবস্থা হয়ে ওঠেনি, তবুও এই পেট ভরে খাওয়াটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
খেতে খেতেই বেলীর নজর গেল জানালার বাইরের রোদের দিকে। রোদের তেজ কমে এসেছ। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল বেলা তিনটে বেজে গেছে। বেলী ভাবল, এখন আর আলসেমি করে শুয়ে থাকলে চলবে না। মাহিকে পড়াতে যেতে হবে, আবার সন্ধ্যায় ফিরে চুড়ির কাজে হাত দিতে হবে।
সে আঁচলে হাত মুছে ফিওনার কপালে একটা চুমু খেয়ে আয়েশাকে বলল,

“আয়েশা, মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখিস। আমি বেরোচ্ছি।”
আয়েশা খাবার চিবোতে চিবোতে বলল,

“সাবধানে যাস বেলী। ফিওনার চিন্তা করিস না, ও ঘুমাইতাছে।”

বেলী তার সাধারণ সুতির ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
বেলী যখন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল, দেখল উঠোনে বসে কুলসুম বেগম লাল টুকটুকে ঠোঁটে পান চিবুচ্ছেন। তার চারপাশ ঘিরে পাড়ার আরও কয়েকজন নারী বসে গল্পের আসর জমিয়েছেন। বেলীকে দেখেই কুলসুম বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেল, পানের পিচ ফেলে তিনি তেরছা নজরে তাকালেন।
বেলী বিনীতভাবে সালাম দিয়ে বলল,

“খালা, মাহিকে পড়াতে এলাম। আদনান বলেছিল ওকে পড়াতে হবে।”
কুলসুম বেগম পানের বাটাটা সজোরে বন্ধ করে কর্কশ গলায় বললেন,

“মাহিকে আর পড়ানো লাগত না। উটকো মাইয়্যালোক দিয়া পড়াইয়া আমার মাইয়ারে নষ্ট করার দরকার নাই।”
পাশ থেকে এক প্রতিবেশী নারী মুখ টিপে হেসে মশকরা করে উঠলেন,

“ঠিকই তো কইছেন বুবু। স্বামী-খেদানো মাইয়া ঘরে আইলে কুলক্ষণ লাগে। ওর নিজের কপালই পোড়া, ও আবার কারে জ্ঞান দিব?”

বেলী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা অপমানে ছিঁড়ে যাচ্ছে, চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে ভারাক্রান্ত মনে চলে যাওয়ার জন্য যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে এল আদনান। দুপুরে খাওয়ার পর সে সবে একটু ঘুমিয়েছিল, বাইরের চিৎকার তর্কাতর্কিতে তার ঘুমটা ভেঙে গেছে।
পরিস্থিতি বুঝতে আদনানের এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সে কড়া গলায় ডাক দিল,

“বেলী ভাবী! দাঁড়ান, কোথায় যাচ্ছেন?”

মায়ের দিকে তাকিয়ে আদনান বেশ রুক্ষ স্বরেই বলল,

“মা, তুমি কি শুরু করলা? মাহিকে কে পড়াবে না পড়াবে সেইটা আমি ঠিক করব। পড়াশোনার খরচ আমি দেই, সিদ্ধান্তও আমার। মাহিকে উনিই পড়াবে।”
কুলসুম বেগম ফেটে পড়লেন, “আদনান! তুই আমার মুখের ওপর কথা কস? এই বেলীর লাইগা?”

আদনান আর কোনো কথা বাড়াল না। সে কঠিন স্বরে বলল,

“টাকা আমি দেব, মা। কথা এখানেই শেষ।”

ছেলের মুখের ওপর আর কথা বলার সাহস পেলেন না কুলসুম বেগম। আদনান দমে যাওয়ার পাত্র নয় তা তিনি জানেন।
আদনান বেলীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“আপনি ভেতরে গিয়ে বসেন। মাহি! এই মাহি, বই খাতা নিয়ে আয়।”

বেলী মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকল। পেছনে তখনো প্রতিবেশীদের ফিসফাস আর ঠেস মারা কথা কানে আসছিল। একজন তো বলেই ফেলল,

“আয়েশাটা দো আদনানের গলায় ঝুলতে পারে নাই, এই বেলী দেখি ঝুলে যাইব যাইব ভাব!”

কথাগুলো বেলীর কানে তীরের মতো বিঁধলেও সে কোনো শব্দ করল না। জীবনের চরমতম অপমানগুলো সে এখন হজম করতে শিখে গেছে। তার এখন লক্ষ্য একটাই—যেকোনো মূল্যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সে মাহির পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। মাহি বই খুললেও সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।

#চলবে…

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৭)
#মীরাতুল_নিহা

আদনানদের বাসা থেকে ফেরার পর বেলী নিজেকে আরও বেশি কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। আয়েশার ফোনের ভাঙা স্ক্রিনে অনেকক্ষণ সময় ব্যয় করে সে শেষমেশ ‘বেলী’স ক্রিয়েশন’ নামে একটা ফেসবুক পেজ খুলল। ল্যাভেন্ডার আর নীল রঙের সেই ভেলভেট চুড়িগুলো, যা সে পরম যত্নে বানিয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটা ছবি জানালার আলোয় তুলে পোস্ট করল। সাথে লিখল মনের মাধুরী মেশানো কিছু কথা। কিন্তু সময় যেন কাটতেই চায় না। এক দিন গেল, দুই দিন গেল—পেজে লাইক বা কমেন্ট তো দূরের কথা, একটা মেসেজও এল না। বেলী বারবার ফোনটা হাতে নেয়, রিফ্রেশ করে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। তার সাজানো স্বপ্নগুলো যেন ওই নিস্প্রাণ স্ক্রিনের ভেতর আটকে গেছে। বেলী ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ল।
আয়েশা বেলীর মুখটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“বেলী, আমি আগেই কইছিলাম না? এইগুলা আমাগো মতন মানুষের কাজ না। অনলাইনে মানুষ বড় বড় পেজ দেইখা জিনিস কেনে। আমাদের এই সব কেউ দেখব না। থাক বাদ দে, কাল থেইকা আমার লগে অন্য কোনো কাজে চল। অন্তত দুবেলা ভাত জুটব।”

বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে ভাঙা ফোনটা হাতে নিয়ে ঝিম মেরে বসে রইল। হুট করেই স্ক্রল করতে করতে তার চোখে পড়ল একটা ভিডিও যেখানে দেখানো হচ্ছে কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI (এআই) ব্যবহার করে সাধারণ মানের জিনিসকেও অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। বেলীর ধধারে পড়া মস্তিস্কে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
সে দেখল, কিছু এআই টুল ব্যবহার করে ঝাপসা বা ঘোলাটে ছবিকেও ঝকঝকে করা সম্ভব এবং ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার স্টুডিও লাইটিং বা শৌখিন পরিবেশ যোগ করা যায়। বেলীর হাতে থাকা ছবিগুলো ছিল ঘোলা, অন্ধকার ঘরের পটভূমিতে তোলা, যা দেখে কেউ আকৃষ্ট হওয়ার কথা নয়।
বেলী সোজা হয়ে বসল। সে ভাবল,

“আমার হাতের কাজ তো খারাপ না বল? শুধু উপস্থাপনাই তো মানুষকে টানছে না! তবে কেন আমি শেষ চেষ্টা করব না?”

সে তৎক্ষণাৎ গুগলে সার্চ করতে শুরু করল। তার ওই সাধারণ ঘোলাটে ছবিটা একটা এআই এডিটর অ্যাপে আপলোড দিল। কয়েক মুহূর্ত প্রসেসিং হওয়ার পর স্ক্রিনে যা ফুটে উঠল, তা দেখে বেলীর চোখ ছানাবড়া! সেই মলিন প্লাস্টিকের ওপর সুতা মোড়ানো চুড়িগুলো এখন একটা মার্বেল পাথরের ওপর রাখা, চারপাশ দিয়ে বেলী ফুলের পাঁপড়ি ছড়ানো আর ওপর থেকে পড়ছে স্নিগ্ধ সোনালী আলো। এ যেন কোনো নামী ব্রান্ডের বিজ্ঞাপন! বেলী উত্তেজনায় আয়েশাকে ডেকে বলল, “আয়েশা, দেখ! এইটা কি সেই ছবি যেটা আমি তুলছিলাম?”
আয়েশা চোখ কচলে তাকিয়ে বলল,

“এইটা তো কি সুন্দর হইছে রে! যেন জাদু করেছে কেউ”

বেলী হাসল। তার হারানো আত্মবিশ্বাস এক নিমিষেই ফিরে এল। সে নতুন করে সেই এআই দিয়ে এডিট করা ছবিগুলো পেজে পোস্ট করল। মনে মনে বলল,
“বাঁচার জন্য মানুষ কত কিছু করে, আমিও না হয় আধুনিক যুগের এই জাদুটাই শিখলাম!”

এআই দিয়ে ছবিগুলো ঠিকঠাক করে পেজে আপলোড দেওয়ার পর বেলীর মনে এক চিলতে স্বস্তি ফিরল। তবে এখন আর বসে থাকার সময় নেই, রাইসাকে পড়ানোর সময় হয়ে গেছে। রাইসার বাসাটা একটু দূরে হলেও বেলী হেঁটেই যায়। কলিং বেল বাজাতেই রাইসা এসে দরজা খুলে দিল। আজ রাইসাকে পড়ানোর এক মাস পূর্ণ হলো। রাইসা মেয়েটা বড্ড শান্ত আর মনোযোগী। বেলী যা বোঝায়, ও খুব সহজেই সেটা ধরে নিতে পারে। রাইসাকে পড়াতে বেলীর একটুও কষ্ট হয় না, বরং মনের ভেতর একটা ভালো লাগা কাজ করে। পড়া শেষ করে বেলী যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন রাইসার মা হাসিমুখে ড্রয়িংরুমে এগিয়ে এলেন।
তিনি বললেন,

“বেলী, আজ তো মাস শেষ হলো। এই নাও তোমার বেতন।ও

বেলী নিচু হয়ে টাকাটা নিল। তাদের বেতন ঠিক হয়েছিল দেড় হাজার টাকা। কিন্তু টাকাটা হাতে নিয়ে গুনে দেখল সেখানে দুই হাজার টাকা আছে। বেলী কিছুটা অবাক হয়ে রাইসার মায়ের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলল,

“খালা, আমাদের তো দেড় হাজার কথা ছিল। এখানে দুই হাজার টাকা, ভুল করে হয়তো পাঁচশ টাকা বেশি চলে এসেছে।”

রাইসার মা মুচকি হাসলেন। তিনি পরম স্নেহে বেলীর মাথায় হাত রেখে বললেন,

“না বেলী, ভুল হয়নি। আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কিছু বলো কি না। তুমি না বললেও আমি নিজেই জানাতাম। ওই পাঁচশ টাকা তোমার বোনাস। রাইসা এবার পড়াশোনা ভালো করে করছে। আর ওর হাতের লেখাও অনেক সুন্দর হয়েছে। সব তোমার চেষ্টার ফল। এইটুকু উপহার তোমার প্রাপ্য।”

বেলীর বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। এই অভাবের দিনে বাড়তি পাঁচশ টাকা তার কাছে অনেক বড় পাওনা। সে যখন সালাম দিয়ে বিদায় নিতে যাবে, তখন রাইসার মা আবার বললেন,

“শোনো বেলী, আরেকটা কথা। আমার ছোট ছেলে রিয়াদ, ও এবার টুতে পড়ে। ওকেও কি তুমি পড়াতে পারবে? রিয়াদ একটু চঞ্চল, কিন্তু আমি চাই তুমিই ওকে সামলাও। দু ভাই বোন এক সাথেই থাকুক।”

খুশিতে বেলীর চোখ চিকচিক করে উঠলো। রিয়াদকেও পড়ানো মানে আয়ের নতুন একটা উৎস তৈরি হওয়া। সে একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। রাইসার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বেলী রাস্তায় বেরোল, তখন তার আকাশের মেঘগুলো যেন কাটতে শুরু করেছে। একদিকে এআই দিয়ে সাজানো তার অনলাইন ব্যবসার নতুন আশা, আর অন্যদিকে টিউশনির এই বাড়তি সুযোগ বেলী বুঝতে পারছে, মেধা আর পরিশ্রম বৃথা যায় না। সে দ্রুত পায়ে বস্তির দিকে হাঁটা ধরল, এখন তার মনে শুধু ফিওনার হাসিমুখটা ভাসছে। বেলীর জীবনটা এখন ফিওনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আয়েশা কাজে থাকলে ফিওনাকে কোলেই নিয়ে সে পড়াতে যায়। কখনো এক হাতে বই ধরে অন্য হাতে মেয়েকে সামলায়, আবার কখনো রাইসা বা মাহির পড়ার টেবিলের পাশে ফিওনাকে বসিয়ে রেখে পড়া বুঝিয়ে দেয়। আজ পড়ানো শেষ করে ফিওনাকে নিয়েই সে ঘরে ফিরল।
ঘরে ফিরে ফিওনাকে পেট ভরে দুধ খাইয়ে মেঝেতে একটা পুরনো চাদর বিছিয়ে কিছু খেলনা দিয়ে বসিয়ে দিল বেলী। ফিওনার বয়স এখন সাত মাসে পড়বে। শরীরটা বেশ ভারী হয়েছে, এখন সে উপুড় হয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার জোর চেষ্টা করছে। একটা রঙিন প্লাস্টিকের বল ধরতে গিয়ে ফিওনা টাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। বেলী ভয় পেয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, ব্যথা পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বাচ্চার খিলখিল হাসিতে ঘর ভরে উঠল।
বেলী অপলক চোখে সেই দৃশ্য দেখল। তার বুকটা এক পরম শান্তিতে জুড়িয়ে গেল। এই হাসির জন্যই তো সে আজ আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটছে। ফিওনা তখন তার কচি দু হাত বাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাল, যেন বলছে—‘আমাকে বুকে নাও’। বেলী আর দেরি করল না, পরম আদরে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল। ফিওনার শরীরের সেই মিষ্টি গন্ধে বেলীর সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। রান্নাবান্নার টুকটাক কাজ আর ঘর গোছানো শেষ করে বেলী আয়েশার ফোনটা হাতে নিল। আজ আয়েশা ভুল করে ফোনটা ঘরেই রেখে গেছে। বেলীর বুকটা ঢিপ ঢিপ করছিল সেই এআই দিয়ে বানানো ছবিগুলোর কী অবস্থা তা দেখার জন্য। কাঁপাকাঁপা আঙুলে ফেসবুক পেজটা খুলতেই বেলীর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!
ফোনের স্ক্রিন জুড়ে অজস্র নোটিফিকেশন। তার সেই ছবিগুলোতে অনেক রিয়েক্ট আর সুন্দর সুন্দর কমেন্ট এসেছে। কেউ লিখেছে ‘অসাধারণ কাজ’, কেউ বা জানতে চেয়েছে দাম। স্ক্রল করতে করতে বেলী দেখল ইনবক্সে একটা মেসেজ একজন আপু দুই জোড়া ল্যাভেন্ডার রঙের ভেলভেট চুড়ি অর্ডার করেছেন!
খুশিতে বেলী প্রায় চিৎকার করে উঠতে চাইল। তার প্রথম অর্ডার! তার নিজের হাতে তৈরি জিনিসের কদর কেউ বুঝেছে! আজ যেন সত্যিই আনন্দের দিন বেলীর। সব মিলিয়ে দিনটা যেন মেঘ কেটে যাওয়া রোদেলা দুপুরের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
বেলী ফিওনাকে জড়িয়ে ধরলো পরপর কটা চুমু খেল।

বস্তির মুখেই কয়েকটা ছোট ছোট টং দোকান। বেলী সেখানে গিয়ে কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে সন্ধানী দৃষ্টি, সে আদনানকে খুঁজছে। মনের ভেতর এক অপরাধবোধ কাজ করছে। কতবার এই ছেলেটা নিজ থেকে কথা বলতে চেয়েছে আর বেলী? সে প্রতিবারই অবহেলা করেছে, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এমনকি রুক্ষ ব্যবহার করতেও ছাড়েনি। অথচ এই দুঃসময়ে আদনানই তার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​দোকানের এক কোণে আদনানকে বন্ধুদের সাথে কথা বলতে দেখে বেলী একটু দূরে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। আদনান তাকে দেখামাত্রই বন্ধুদের থেকে সরে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে বরাবরের মতোই সেই উৎকণ্ঠা। যেন বেলী তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু।

#চলবে?

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১৪+১৫

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৪)
#মীরাতুল_নিহা

হোটেল থেকে দু’দিন কিনে খাবার পর আজ ফারহানের পকেট গড়ের মাঠ। পকেটে হাত দিয়ে দেখল গুটিকয়েক খুচরো পয়সা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে একটা ফোনের দোকানে টুকটাক কাজ করে, মাস শেষে যা বেতন পায় তার সিংহভাগই সে তৃষ্ণার শখ মেটাতে আর প্রসাধন কিনতে ব্যয় করেছে। আজ উপায় না পেয়ে নিরুপায় হয়ে ফারহানকে ঘরে চাল-ডাল আর রুই মাছ নিয়ে বসতে হয়েছে। রান্না করা ছাড়া উপায় নেই। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে, কিন্তু রাঁধুনি হিসেবে তৃষ্ণা যেন কোনো রাজ্যের মহারানী। সে নিজে খুন্তি নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ফারহানকে আষ্টেপৃষ্ঠে খাটিয়ে মারছে।

“ওগো, পেঁয়াজটা কুচি করে দাও তো! মাছের মশলাটা কই রাখছো? হলুদ দাও, মরিচ দাও!”

তৃষ্ণার প্রতিটি কথা যেন একেকটি হুকুম। রুই মাছের ঝোল রান্না করতে গিয়ে সে ফারহানকে এটা-ওটা এগিয়ে দিতে বলে এমনভাবে অর্ডার করছে, যেন ফারহান তার কেনা গোলাম। ফারহান কোনো প্রতিবাদ করছে না, মুখ বুজে সব করে দিচ্ছে। কারণ সে জানে, হোটেলে গিয়ে খাওয়ার মতো এক আনা পয়সাও এখন তার কাছে নেই। আর হোটেলের সেই পানসে স্বাদের চেয়ে ঘরের দুমুঠো গরম ভাত এখন তার কাছে অনেক দামী। মাছটা কড়াইতে দিয়ে তৃষ্ণা হঠাৎ কপাল কুঁচকে আলসেমি মাখা গলায় বলল,

“ভাতটা চড়িয়ে দিয়েছি, বলক আসলে একটু দেখে নামিয়ে নিও তো। আমি যাই, চুলটা বড্ড এলোমেলো হয়ে আছে, গরম লাগছে গোসলও করতে হবে। একটু আঁচড়ে আসি।”

তৃষ্ণা আয়নার সামনে গিয়ে বসল আয়েশ করে। ফারহান আগুনের আঁচের পাশে বসে রইল। তার মনটা আজ কু ডাকছে। ইদানীং সে লক্ষ্য করছে, একটা অচেনা লোক তাদের ঘরের অলিগলির দিকে মাঝেমধ্যেই উঁকিঝুঁকি মারে। লোকটার চাউনি আর ঘোরাঘুরি খুব একটা সুবিধের মনে হচ্ছে না ফারহানের কাছে। সন্দেহ দানা বাঁধলেও সে কিছু বলছে না, কারণ ঘরের ভেতরের অশান্তি সামলাতেই সে এখন হিমশিম খাচ্ছে। চুলায় ভাতের হাঁড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। ফারহানের মনে হচ্ছে তার জীবনটাও যেন ওই ধোঁয়ার মতোই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

ফারহান থালায় ভাত বেড়ে প্রথম লোকমা মুখে দিতেই মুখটা কুঁচকে গেল তার। রুই মাছের ঝোলটা দেখতে যতটা লোভনীয় হয়েছিল, খেতে ততটাই বিস্বাদ। লবণের আধিক্যে মুখে দেওয়া দায়। ফারহান ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“তৃষ্ণা, মাছের ঝোলটায় অনেক লবণ হইছে। মুখে দেওয়া যাচ্ছে না তো।”

কথাটা শোনামাত্রই তৃষ্ণা যেন বারুদে আগুন লেগে ফেটে পড়ল। সে তেড়েফুঁড়ে এল রান্নাঘরের দিকে। কোমরে হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“লবণ বেশি হইছে তো কী হইছে? ভাতে লবন না নিয়ে খাইলেই তো হয়।” আমি কি কোনোদিন রান্না করছি? বাবার বাড়িতে তো এক গ্লাস পানি ঢেলে খাইনাই। তোমার জন্য যে এই আগুনের পাশে বসে মাছ ভাজলাম, এই তো বেশি! খাইলে খাও, না খাইলে উইঠা যাও।”

ফারহান স্তব্ধ হয়ে তৃষ্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতে যে মেয়েটা সোহাগী গলায় তাকে পাগল করে দিচ্ছিল, আজ তার এই রুদ্রমূর্তি ফারহানের চেনা জগতের বাইরে। সে আর কোনো প্রতিবাদ করল না। চুপচাপ ভাতের সাথে লবণাক্ত ঝোল মেখেই মুখে তুলতে লাগল। খেতে খেতে ফারহানের অবচেতন মনটা হঠাৎ অতীতে ডুব দিল। আজ বড্ড বেশি বেলীর কথা মনে পড়ছে তার। বেলীও তো তার বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে ছিল। ভালো রেজাল্ট করা, মার্জিত স্বাভাবের মেয়েটা বিয়ের পর এই জরাজীর্ণ বস্তিতে এসেছিল। অথচ কোনোদিন একটা টু শব্দ করেনি সে। ফারহানের সামান্য আয়ের সংসারে নিজেকে এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছিল যেন এই অভাবই তার আজন্ম সঙ্গী। ফারহান যা এনে দিত, বেলী তা দিয়েই হাসিমুখে অমৃত রান্না করত। বেলীর হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ ডাল-ভাতও ফারহানের কাছে পরম তৃপ্তির মনে হতো। ফারহানের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল।
ফারহান নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল। লবণের তেতো স্বাদ ছাপিয়ে বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাসের নোনতা স্বাদ তাকে দহন করতে লাগল। সে বুঝতে পারছে, মোহ আর বাস্তবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তৃষ্ণার এই চাকচিক্যমাখা রূপের আড়ালে যে এক ভয়ংকর কঠোরতা লুকিয়ে ছিল, তা সে আগে বুঝতে পারেনি। খাওয়া শেষ করে ফারহান হাত ধুতে ধুতে আবার সেই জানালার দিকে তাকাল। সেই রহস্যময় লোকটা কি এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে?

বাপের বাড়ির গলিটার মুখে আসতেই চেনা রাস্তা, চেনা দোকানদার—সবই এক আছে, শুধু বেলীর জগৎটা বদলে গেছে। গেটের কাছে পৌঁছাতেই বেলীর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। লোহার গেটটা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। শুধু গেট নয়, ভেতরের কাঠের দরজাটাতেও বিশাল এক তালা ঝুলছে। জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ, যেন এক তপ্ত দুপুরে বাড়িটা প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে। বেলী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শৈশব-কৈশোরের এই বাড়িটা এমন নিস্তব্ধ কেন? ঠিক তখনই পাশের বাড়ির সালেহা খালা কলতলার কাজ সেরে ঘরে ফিরছিলেন। বেলীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি ওড়নার আড়ালে মুখ টিপে হাসলেন। তারপর এগিয়ে এসে গলার স্বর নিচু করে বললেন,
“আরে বেলী যে! তা বাপের বাড়ি আইলা বুঝি? কিন্তু আইসা তো লাভ হইলো না।”

বেলী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“খালা, আমার বাবা-মা কোথায়? ঘর তালা মারা কেন?”
সালেহা খালা এবার বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করলেন,

“পাড়ায় তো কানাকানি আছিলই। সেই শোকে আর লজ্জায় তোমার বাবা তো কারো সামনে মুখ দেখাইতে পারতাছিল না। এই অপমানে কার্তিক মাসে রাতারাতি উনারা বাসা বদলাইয়া চইলা গেছে। কই গেছে তা কাউরে বইলা যায় নাই।”

বেলী যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বাবা-মা তাকে কোনো আশ্রয় দেওয়া তো দূরে থাক, উল্টো ‘সমাজ আর লজ্জা’র ভয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন?

বেলীর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। বাপের বাড়ির যে শেষ আশ্রয়টুকু সে ভেবেছিল, তা আজ এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
বেলী গেটের সামনে থেকে ধীর পায়ে সরে এল। তার ভেতরে এক তীব্র হাহাকার জেগে উঠল। না আছে স্বামীর ঘর, না আছে বাবার ঘর। এই বিশাল শহরে আজ তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।
বাপের বাড়ির সেই বন্ধ গেট আর তালাবদ্ধ দরজার স্মৃতি নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বেলী বাসায় ফিরল। তার প্রতিটি কদম যেন পাথরের চেয়েও ভারী।
রুমে ঢুকতেই বেলী দেখল, আয়েশা মেঝেতে বসে রঙিন কিছু জিনিসপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ফিওনা তার পাশে বসে ছোট ছোট হাতে সেই জিনিসগুলো নিয়ে আপনমনে খেলছে। বেলী ব্যাগটা একপাশে রেখে ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“এগুলো কী আয়েশা? কোত্থেকে আনলি?”

আয়েশা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক অন্যরকম বিস্ময়। সে বলল,

“ ফিওনা কান্নাকাটি করতাছিল তো, তাই ওরে নিয়া একটু মোড়ের দিকে গেছিলাম। ওখানে কলির সাথে দেখা। মেয়েটা মোবাইল টিপতেছিল। কথা বলতে বলতে দেখলাম ও অনলাইন থেকে নাকি হাতে বানানো কিছু কসমেটিক অর্ডার করব।”

বেলী কৌতূহল নিয়ে শুনতে লাগলো,

আয়েশা আবার বলতে শুরু করল,

“জানিস বেলী, এই এক জোড়া চুড়ির দাম নাকি চারশো টাকা! আমি তো শুনে অবাক। এই সামান্য চুড়ি এত দাম দিয়ে মানুষ কেনে? কলি বলল অনলাইনে নাকি এগুলোর খুব কদর। মেয়েরা নাকি শখ করে এইগুলা পরে।”

আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“জিনিসগুলা দেখতে বড্ড সুন্দর, আমারও পছন্দ হইছে। কিন্তু আমাগো মতো মানুষের এই চারশো টাকা দিয়া এক জোড়া চুড়ি কেনা তো অসম্ভব। এই টাকায় কয়বেলার চাল হয়, সেই চিন্তা আগে করতে হয়।”

আয়েশা উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বেলীকে বলতে লাগল,

“জানিস বেলী, আমার খুব শখ হইতাছিল ওই চুড়িগুলা পরতে। কলিরে জিগাইলাম, এইগুলা কি খুব দামি জিনিসের? কলি হাসল। ও কইল নাহ্ আপা, জিনিসপাতির দাম খুব বেশি না, অল্পই দাম কিন্তু এইগুলা নিখুঁত কইরা বানাইতে অনেক পরিশ্রম আর অনেক সময় লাগে। সেই কারিগরিরই দাম এত।”

আয়েশার চোখ দুটো তখন জ্বলজ্বল করছিল। সে বেলীর হাত ধরে বলতে থাতলো,

“আমি ওরে জিগাইলাম, আমি যদি জিনিসপাতি কিনি তবে কি নিজে বানাইতে পারুম? কলি আমারে সাহস দিল। আজই ও আমারে কিছু জিনিস কিন্না দিছে। পাঁচশো টাকার সুতা, পুঁতি আর আঠা নিয়া আইছি। এমবিও কিনছি কদ্দুর! আপাতত মোবাইলের ভিডিও দেইখা দেইখা বানানোর চেষ্টা করতাছি।”

বেলী অবাক হয়ে আয়েশার দিকে তাকালো। তার মাথায় এমন বুদ্ধি এল কোত্থেকে? আয়েশা তখন হিসেব মিলাতে ব্যস্ত। সে আঙুল গুনে বলল,

“হিসেব কইরা দেখ বেলী, এক জোড়া চুড়ির দাম যদি চারশো টাকা হয়, তবে এই পাঁচশো টাকার জিনিস দিয়া কত জোড়া চুড়ি আরামসে বানানো যাবে। পাঁচ জোড়া চুড়িও যদি বানাইতে পারি কত লাভ! একবার ভাব তো, কত ভালো ব্যবসা এইটা! যারা করতাছে ভালোই করতাছে ক?”

বেলী খুব মনোযোগ দিয়ে আয়েশার কথাগুলো শুনছিল। তার শিক্ষিত মস্তিষ্ক দ্রুত লাভ-ক্ষতির অংকটা কষে নিল। সত্যিই তো! যে সার্টিফিকেটের জন্য সে হন্যে হয়ে ঘুরছে, সেই সার্টিফিকেট ছাড়াও তো বাঁচার পথ তৈরি করা সম্ভব। আয়েশা পাশে বসে ভিডিও দেখে একটা চুড়িতে রঙিন সুতা প্যাঁচানোর চেষ্টা করছে। ফিওনা ওর কোলের কাছে বসে অবাক হয়ে সেই রঙিন কাণ্ডকারখানা দেখছে।

সে আয়েশার হাত থেকে একটা রঙিন সুতার বান্ডিল আর একটা চুড়ি তুলে নিল। আয়েশা মোবাইলের ভিডিওটা আবার চালু করে বেলীকে দেখাল কীভাবে পুঁতিগুলো বসাতে হয়।

#চলবে?

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৫)
#মীরাতুল_নিহা

আয়েশা আর বেলী গোল হয়ে বসেছে। বেলী অত্যন্ত নিপুণ হাতে একটা প্লাস্টিকের চুড়ির গায়ে সামান্য আঠা লাগিয়ে নিল। তারপর সিল্কের চকচকে সুতার এক প্রান্ত সেখানে চেপে ধরে খুব সাবধানে পেঁচাতে শুরু করল। প্রতিটি প্যাঁচ হতে হচ্ছে একদম গা ঘেঁষে, যেন ভেতরে প্লাস্টিকের কোনো অংশ দেখা না যায়। সুতাটা বেশি টাইট হলে ছিঁড়ে যাবে, আবার আলগা হলে ফিনিশিং নষ্ট হবে। বেলী তার মস্তিস্ক আর ধৈর্যকে এক করে পরম মমতায় কাজটা করছিল।
পুরো চুড়িটা সুতায় মোড়ানো শেষ হলে বেলী সেখান সোনালী রঙের সরু জরি আর ছোট ছোট পাথর দিয়ে নকশা করতে শুরু করল। আয়েশা একপাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল। বেলী যখন শেষ পাথরটা বসিয়ে চুড়িটা আলোর সামনে ধরল, আয়েশা বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,

“আরে! আমি কলির হাতে যে চুড়ি দেখছিলাম, তোর বানানো এইটা তো তার চাইতেও হাজার গুণ সুন্দর হইছে!”

বেলী ম্লান হাসল। উত্তর না দিয়ে সে ফোনের ভিডিওটা আবার চালু করল। ইউটিউবে একটা নকশা দেখে তার চোখ আটকে গেছে। সে এবার আরেকটা চুড়িতে ভিন্ন রঙের সুতা আর কুন্দনের কাজ শুরু করল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে বসে থেকে কাজ করতে করতে বেলীর ঘাড় আর শিরদাঁড়ায় একটা তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে আসছে।সে এক পর্যায়ে হাতের কাজটা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল। ঘাড়টা দুই দিকে ঘুরিয়ে মটমট শব্দ করতেই সে বলে উঠল,

“উফ! সত্যিই অনেক পরিশ্রমের কাজ রে আয়েশা। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় শুধু সুতা পেঁচানো, কিন্তু এই মনোযোগ আর ধৈর্য ধরে বসে থাকাটা যে কতটা কষ্টের, তা নিজে না করলে বোঝা যায় না।”

আয়েশা বেলীর কাঁধে হাত রেখে আলতো করে টিপে দিতে দিতে বলল,

“কষ্ট তো হইবই। এত সুন্দর জিনিস কি আর অমনি হয়? আমি তো ভাইবা পাইতাছি না, তুই ফোনে ভিডিও দেইখা একবারেই এত সুন্দর কেমনে বানালি!”

বেলী মুচকি হাসল। এই অপমানের দিনে আয়েশার এই সামান্য প্রশংসা তার কাছে অনেক বড় পাওনা। আয়েশা চুড়িগুলো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,

“কালই এইগুলা নিয়া কলির কাছে যামু। ওরে দেখামু । এইগুলা যদি বাজারে একবার নিতে পারি, দেখবি মানুষ কাড়াকাড়ি কইরা কিনব।”

বেলী মাথা নেড়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,

“না আয়েশা, এগুলো ফুটপাতে বা সাধারণ বাজারে বিক্রি করে লাভ হবে না। ওখানে মানুষ জিনিসের কদর বুঝবে না, উল্টো দামাদামি করে পানির দরে কিনতে চাইবে। এত পরিশ্রমের দাম সেখানে পাওয়া যাবে না।”
আয়েশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে কী করবি? ঘরে সাজায়া রাখবি নাকি?”

বেলী আয়েশার পুরনো ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনটা ফাটা, চার্জও থাকে না বেশিক্ষণ। সে অনেক কষ্টে ইন্টারনেট ঘেঁটে ফেসবুকের বিভিন্ন গয়নার গ্রুপ আর পেজগুলো আয়েশাকে দেখাতে লাগল। বেলী বলল,

“দেখ আয়েশা, অনলাইনে এই হাতে বানানো গয়নার কত চাহিদা! হাজার হাজার মানুষ ঘরে বসে এগুলো কিনছে। আমাদেরও অনলাইনেই সেল করতে হবে। তবেই পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাব।”

আয়েশা ফোনটার দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে ফেলল। সে করুণ স্বরে বলল,
“কিন্তু বেলী, আমার এই ভাঙাচোরা ফোনের ক্যামেরা তো ঘোলা। এইটা দিয়ে ছবি তুললে কি আর সুন্দর হবে? মানুষ কি ঝাপসা ছবি দেখে এসব কিনবে?”

বেলী ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার আলোর কাছে গিয়ে কয়েকবার ছবি তোলার চেষ্টা করল। আসলেও ছবিগুলো খুব একটা পরিষ্কার আসছে না। চুড়ির আসল রূপ আর উজ্জ্বলতা যেন ওই লেন্সের ভেতর মরে যাচ্ছে। বেলী এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা হতাশ হলো। একটা ভালো ফোন বা ক্যামেরার অভাবে কি তবে তার এই চেষ্টাও বিফলে যাবে?
তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করল। আয়েশার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল,

“ছবি ঘোলা আসছে ঠিকই, তাও আমি চেষ্টা করে দেখব। দেখি একটু আলোতে নিয়ে বা অন্য কোনোভাবে তোলা যায় কি না। হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না আয়েশা। বাঁচার জন্য মানুষকে কত কিছুই না করতে হয়! আজ ছবি ভালো আসছে না, কাল হয়তো আসবে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা থামানো যাবে না।”
বেলী আবার একটা চুড়ি হাতে তুলে নিল। অন্ধকার এই ঘরে যেখানে একটা ভালো আয়না পর্যন্ত নেই, সেখানে সে তার স্বপ্নের রঙিন ছবি তোলার জন্য এক চিলতে আলোর খোঁজ করতে লাগল।

বস্তির এক কোণে নোনা ধরা দেয়াল আর স্যাঁতস্যাঁতে গলিটার শেষ মাথায় লোকটার ঘর। ঘরের সামনে আসতেই বেলীর বুকটা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। আয়েশা ফিসফিস করে বলল,

“বেলী, একবার ভাইবা দেখ। মহাজন মতিন লোকটা কিন্তু সুবিধার না। সময়মতো টাকা না পাইলে মানুষরে বেইজ্জত করতে ওরে বাপেও আটকাইতে পারে না।”

বেলী শক্ত গলায় জবাব দিল,

“উপায় নাই রে আয়েশা। সুদে টাকা নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে আমার সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।”

তারা ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখল মতিন মহাজন একটা জরাজীর্ণ তক্তপোশের ওপর আয়েশ করে বসে আছে। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, গায়ের রঙ তামাটে আর চোখ দুটো সারাক্ষণ লাল হয়ে থাকে। কুচকুচে কালো দাঁত বের করে সে অনবরত পান চিবোচ্ছে, আর পানের পিক ফেলার জন্য পাশে রাখা পিতলের পিকদানিটা বারবার ব্যবহার করছে। লোকটা পানের সাথে প্রচুর জর্দা খায় বলে তার মেজাজ সবসময় চড়া থাকে। পুরো বস্তির মানুষ তাকে যমের মতো ভয় পায়। কারণ বিপদে পড়লে সে টাকা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার ওপর যে হাড়কাঁপানো সুদ আদায় করে, তাতে অনেক মানুষের ঘরবাড়ি পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে।

মতিন মহাজন আড়চোখে বেলী আর আয়েশার দিকে তাকাল। তার হাতে একটা পুরনো খাতা, সেখানে কার কাছে কত পাওনা সব লেখা আছে। সে পানের পিক ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,

“কী ব্যাপার? আয়েশা যে হুট কইরা লগে এই মাইয়া নিয়া আমার দরবারে আসলি?”

আয়েশা কাঁপা গলায় বলল,

“মহাজন ভাই, ওর কিছু টাকা লাগত।”

মতিন মহাজন এক দলা পান চিবোতে চিবোতে বেলীর আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখল। রাগী গলায় বলল,

“শোনো মাইয়া, আমার টাকার সুদ কিন্তু প্রতিদিন বাড়ে। সময়মতো সুদ না দিলে কিন্তু আমার রূপ অন্যরকম হইয়া যায়। তুমি শোধ কেমনে করবা? না আয়েশায় করব?”

বেলী এবার সামনে এগিয়ে এল। মতিন মহাজনের সামনে পাতা একটা নড়বড়ে টুলে বসে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আয়েশাকে দিয়ে আমার বিচার করবেন না মহাজন সাহেব। আমি টাকা নিচ্ছি আমার নিজের দায়িত্বে। সময়মতো আপনার টাকা আর সুদ—দুইই আপনি ফেরত পাবেন। আমি শুধু কাজের জন্য শুরুতে কিছু টাকা চাই।”

মতিন মহাজন বেলীর এই তেজ দেখে কিছুটা থমকে গেল। সে আবারও পানের ডিব্বাটা হাতে নিয়ে জর্দা মাখাতে মাখাতে এক কুৎসিত হাসি দিল।
মতিন মহাজনের সেই জবরদস্ত ঘরের গুমোট পরিবেশে বেলীর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মহাজন একবার কুটিল চোখে তাকিয়ে বলেছিল,

“নিবা যখন একবারে দশ পনেরো হাজারই নাও, কাজে লাগবো।”

বেলীর মনেও একবার দ্বিধা জেগেছিল, পুঁজি বেশি হলে হয়তো কাজ দ্রুত বাড়বে। টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে পারবে কিন্তু পরক্ষণেই তার বিবেক বাধা দিল। আয়েশা পাশে দাঁড়িয়ে ইশারায় বলছিল যেন বেশি না নেয়। বেলী মনে মনে ভাবল, যদি ব্যবসা কোনোভাবে কাজ না করে, তবে এই পাহাড়সম সুদের বোঝা সে বইবে কী করে? আয়েশার নয় হাজার টাকা বেতন থেকে টেনেটুনে হয়তো পাঁচ হাজার টাকা শোধ করার সামর্থ্য থাকবে, কিন্তু পনেরো হাজার হলে তারা দুজনেই পথে বসবে।
সব ভেবে বেলী নরম গলায় বলল,

“না মহাজন সাহেব, আপাতত পাঁচ হাজারই দেন। এইটুকু দিয়েই শুরু করতে চাই।”

টাকাটা আঁচলে গিঁট দিয়ে বেলী আর আয়েশা প্রায় ছুটতে শুরু করল। ঘরে ফিওনাকে একা ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে তারা। বস্তির এই পরিবেশে ছোট একটা বাচ্চাকে বেশিক্ষণ একা রাখা নিরাপদ নয়। গলির মোড় ঘুরতেই হন্তদন্ত হয়ে আসা আদনানের সাথে তাদের প্রায় ধাক্কা লাগার অবস্থা। আদনান তাদের এমন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে কৌতূহল। সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী ব্যাপার আয়েশা? আপনারা এমন হন্তদন্ত হয়ে কই থেকে আসলেন? বস্তিতে আবার নতুন কোনো ঝামেলা হইছে নাকি?”
বেলী চুপ করে থাকলেও আয়েশা আর চেপে রাখতে পারল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“আরে আদনান ভাই পেটের দায়ে বাঘের খাঁচায় ঢুকছিলাম। মতিন মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়া ফিরতাছি। বেলীর ব্যবসার পুঁজি লাগবে যে!”

আদনানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মতিন মহাজনের নাম শুনেই তার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। সে বেলীর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল,

“আপনারা মতিন মহাজনের কাছে গেলেন কেন? আমায় কেন একবার বললেন না?”

বেলী শান্ত দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকাল। সে শুধু বলল,

“সবসময় তোমাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকা যায় না আদনান। নিজের লড়াইটা এবার নিজেকেই শুরু করতে হবে, তা সে পথ যতই কঠিন হোক।”

আদনান কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বেলীর সেই দৃঢ় চাহনির সামনে তার কথাগুলো আটকে গেল।
আদনান কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মতিন মহাজনের সুদের হার সে জানে। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“পাঁচ হাজার টাকায় মাসে চারশো টাকা সুদ দিতে হইব? আপনারা কি বুঝেশুনে এই কাজ করছেন?”

আদনান ব্যাকুল হয়ে বলল,

“আমার কাছে কিছু জমানো টাকা আছে। আপনারা ওই মহাজনের টাকা এখনই ফেরত দিয়ে আসেন। আমার কাছ থেকে নেন, কোনো সুদ দিতে হবে না। যখন সুবিধা হয় তখন দিয়েন।”

বেলী এক মুহূর্তের জন্য থামল। আদনানের সরলতা আর তার প্রতি এই নিঃস্বার্থ টান তাকে স্পর্শ করল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। বেলী আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,
“আদনান, তুমি আমাদের জন্য যা করেছো, তার কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু মানুষেরও তো আত্মসম্মান বলে কিছু থাকে। বারবার তোমার সাহায্য নিলে আমি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব। আমার লড়াইটা আমাকেই লড়তে দাও।”

আদনান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে আবারও জেদ ধরল,

“আচ্ছা, যদি সাহায্য হিসেবে নিতে না চান, তবে ধার হিসেবে নেন। অন্তত ওই জঘন্য লোকটার হাত থেকে তো বাঁচবেন।”

বেলী এবার একটা শুকনো হাসি দিল। সে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“ধারই যখন নিব, তখন নিয়েছিই তো! এখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী? একবার যখন পা বাড়িয়েছি তখন পেছনের দিকে তাকালে আর সামনে আগানো যাবে না। মহাজনের টাকা শোধ করার জেদটাই হয়তো আমাকে দিয়ে বেশি কাজ করাবে।”

আদনান আর কিছু বলল না। সে একদৃষ্টে বেলীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার আর ভালো লাগা কাজ করছে। মেয়েটার এই আত্মসম্মানবোধই তাকে বারবার বেলীর প্রতি দুর্বল করে তোলে। সে মনে মনে ঠিক করল, বেলী যেমনই করুক, সে ছায়ার মতো আড়ালে থেকে সবসময় তাকে আগলে রাখবে। বেলী আর আয়েশা যখন ঘরের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন তারা শুনতে পেল ভেতর থেকে ফিওনার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। দুজনে প্রায় দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।

#চলবে…

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১২+১৩

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১২)
#মীরাতুল_নিহা

ফারহানের মুখ থেকে সজোরে উচ্চারিত ‘তিন তালাক’ শব্দটা যেন তপ্ত সীসার মতো প্রতিটি মানুষের কানে গিয়ে বিঁধল। বস্তির ধুলোবালি ওড়া সেই জরাজীর্ণ উঠোনে মুহূর্তেই এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ইসলামি শরীয়তের অমোঘ আর রূঢ় বিধানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কয়েক বছরের একটা সাজানো সংসার ধুলোয় মিশে গেল।
শরীরের কম্পন থেমে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত কাঠিন্য ভর করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল আদনান। আজ সন্ধ্যাবেলা মাহিকে পড়ার জন্য বেলীর কাছে নিয়ে আসার কথা ছিল তার। কিন্তু বিকেলের এই হট্টগোল শুনে সে একটু আগেই খোঁজ নিতে চলে এসেছে। ভিড় ঠেলে সামনে আসতেই সে শুনতে পেল ফারহানের সেই শেষ কথাগুলো। আদনান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফারহানের দিকে, তারপর দেখল বেলীর সেই ফ্যাকাশে, ধীরস্থির মুখচ্ছবি।

“ফারহান ভাই! এইটা আপনি কী করলেন? রাগের মাথায় এত বড় সর্বনাশ…”

ফারহান দ্রুত আসার জন্য তখনো রাগে হাঁপাচ্ছে। ফারহান চিৎকার করে বলল,

“সর্বনাশ আমি করি নাই আদনান, ও করছে! ওরে আমি আজাদী দিয়া দিলাম। এখন ও কই যায় কি করে, সেইটা দেখার বিষয় আমার না!”

তৃষ্ণা মেঝেতে বসে মনে মনে এক পৈশাচিক বিজয়োল্লাস করছিল। সে জানত ফারহানকে উসকে দিলে সে হিতাহিত জ্ঞান হারাবে, কিন্তু এত দ্রুত কাজ হাসিল হবে তা সে কল্পনাও করেনি। সে তার রক্তাক্ত পায়ের ক্ষতটা আবার আঁচল দিয়ে ঢেকে ন্যাকামি করে বলল,

“ওগো, রাগ থামাও। এখন তো যা হওয়ার হইয়াই গেছে। কপালে যা ছিল তাই হইলো।”

আখতার রহমান হাতের তসবিহটা মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“ফারহান, রাগের মাথায় এক বসায় তিন তালাক দিয়া তুমি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলে। শিক্ষিত সুন্দর, বুঝদার বউ! এই দুধের বাচ্চা সবই শেষ কইরা দিলে। এর ফল কিন্তু ভালো হইবো না।”

বেলী তখন ফিওনাকে বুকের সাথে এমনভাবে চেপে ধরেছে, যেন এই পৃথিবীতে তার একমাত্র অবলম্বন ওই একরত্তি প্রাণ। সে আদনানের দিকে একবার তাকালো। আদনানের চোখে তখন গভীর সমবেদনা।
বেলী এবার ফারহানের দিকে ফিরল। তার কণ্ঠে কোনো করুণা নেই, বরং এক ধারালো শীতলতা। সে সবার সামনে স্পষ্ট গলায় বলল,

“তালাক তো দিলে ফারহান। এবার নিজের পুরুষত্বের প্রমাণ দাও। মনে আছে বিয়ের সময় দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য হয়েছিল? এক টাকাও তো উসুল দাওনি। এই যে আজ আমাকে আর আমার বাচ্চাকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছ, তার আগে আমার সেই পাওনা দুই লাখ টাকা বুঝিয়ে দাও।”

দুই লাখ টাকার নাম শুনে ফারহানের চেহারা মুহূর্তেই নীল হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল,

“কীসের টাকা? এই কয় বছর খাওয়াইছি-পরাইছি ওইগুলা কি টাকা না?”

আখতার রহমান ধমক দিয়ে বললেন,

“থামো ফারহান! দেনমোহর হলো স্ত্রীর হক। তুমি তালাক দিছো যখন, তখন কড়ায়-গণ্ডায় ওই টাকা তোমারে শোধ করতে হইবো। আর ইদ্দত চলাকালীন তিন মাসের খরচও দিবা। এইটা আল্লাহর আইন, এইখানে কোনো মাফ নাই।”

আখতার রহমান যখন দেনমোহরের টাকার কথা তুললেন, ফারহান তখন দিশেহারা। বস্তির উৎসুক মানুষগুলোর সামনে তার পৌরুষ তখন ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। কিন্তু বেলী দমল না। সে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল কণ্ঠে বলল,

​“তুমি ভেবেছো তালাক দিয়ে দিলেই সব চুকে গেল? ইসলামি আইন আর এদেশের আইন—দুটোতেই আমার দেনমোহরের দুই লাখ টাকা তোমার কাছে ঋণ। এই টাকা শোধ না করা পর্যন্ত তোমার নিস্তার নেই।”
​ফারহান রাগে তোতলামি করে বলল,

“তোর এত তেজ কিসের? আমার ঘরে থাকবি আর আমারেই আইনের ভয় দেখাবি?”

বেলী ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,

“আমি তোমার দ্বিতীয় বউর মতন আত্মসম্মানহীন নই যে, তোমার ঘরে গিয়ে আবার থাকব! আমি চলে যাবো। তবে ভেবেছো তালাক দিলেই সব চুকে গেল? মুক্তি পেয়ে গেলে? আমি খুব শীঘ্রই উকিল নিয়ে আসব। আইনসম্মতভাবে ডিভোর্স পেপার তৈরি হবে এবং সেখানে আমার দেনমোহর আর ইদ্দতকালীন খোরপোষের প্রতিটি পয়সা তোমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর মনে রেখো, আমার মেয়ের যাবতীয় খরচও তোমাকে আজীবন টানতে হবে। টাকা রেডি করে রেখো ফারহান।”

তৃষ্ণা এবার ফারহানের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “ওগো, ওরে যেতে দাও। ও গেলে আমরা শান্তিতে থাকব।”

​বেলী তৃষ্ণার দিকে ফিরেও তাকাল না। সে ঘরের এক কোণ থেকে নিজের আর ফিওনার যৎসামান্য কাপড়চোপড় একটি ব্যাগে ভরে নিল।
আদনান স্তম্ভিত হয়ে দেখল, বেলী এক হাতে তার সন্তান আর অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে সেই পরিচিত ঘর থেকে বের হয়ে আসছে। ভিড় চিরে যখন সে রাজপথের দিকে পা বাড়াল, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে আঁধার নেমেছে।

অন্ধকার গলিটা দিয়ে বেলী যখন দ্রুতপায়ে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এল। আয়েশা কাজ থেকে ফিরে সবটা শুনেছে। দৌড়ে এসে বেলীর হাত জাপটে ধরল সে। আয়েশার চোখের জল বাঁধ মানছে না। তার নিজেরও মাথায় আজ ছাঁদ নেই, বেলীর অবস্থাও আজ হুবহু তার মতোই। দুই ভাগ্যহতা নারী নিস্তব্ধ রাতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান পেছন পেছন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। বেলীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অপরাধীর গলায় বলল,
“এই রাইতে বাচ্চা নিয়া কই যাইবেন? অন্তত আজকের রাতটা আমার বাড়িতে চলেন। আপনার কোনো অসুবিধা হইবো না।”

বেলী ব্যাগটা শক্ত করে ধরে মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঠিন্য,

“না আদনান। আজ থেকে আমার আর কোনো বাড়ি নেই। কারোর দয়া বা আশ্রয়ে থাকার শক্তি আমার আর অবশিষ্ট নেই। তুমি অনেক করেছো। এখন আমায় যেতে দাও।”

আয়েশা তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আদনান ভাই, আমাগো লাইগা এই খোলা আকাশই যথেষ্ট। অভাবী মানুষের রাত কাডানোর লাইগা রাস্তার ধারই অনেক।”

আদনান এবার একটু ধমকের সুরে বলল,

“আরে কী পাগলামি করতাছেন আপনারা? নিজের কথা ভাবেন ঠিক আছে, কিন্তু এই ছোট বাচ্চাটার কথা তো ভাবেন! ওর অসুখ হলে কী করবেন? ফিওনার দিকে তাকান অন্তত!”

বাচ্চার কথা শুনে বেলী একটু থমকে দাঁড়াল। ফিওনা তখন খিদে আর গরমে ছটফট করে কাঁদছে। আদনান সুযোগ বুঝে আবার বলল,

“আমি আপনাদের দয়া করছি না। আমার এক পরিচিত মানুষের বস্তির শুরুর মাথায় ছোট ছোট কিছু এক রুমের ভাড়া ঘর আছে। আমি ওখানেই নিয়ে য্চ্ছি।”

বেলী আর আয়েশা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। বেলী নিচু স্বরে বলল,

“কিন্তু আদনান, আমাদের কাছে তো এখন ঘর ভাড়া নেওয়ার মতো কোনো টাকা নেই। আয়েশার জমানো সামান্য কিছু ছাড়া আমার হাত একদম খালি।”

আদনান আশ্বস্ত করে বলল,

“টাকা তো এখনই দিতে হবে না। মাস শেষ হইতে তো অনেক দেরি। আপাতত একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তো হোক! চলেন আমার সাথে।”

বেলী আর আয়েশা এবার আর না করতে পারল না। কোলের বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে তারা আদনানের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। বস্তির সেই চাকচিক্যহীন সরু গলিগুলো পেরিয়ে একদম শুরুর পথে ছোট ছোট টিনের চালের ঘরগুলোর দিকে তাদের কাফেলা চলল। ফারহানের সেই বিষাক্ত ঘর থেকে মুক্তি পেলেও, সামনে যে এক অনিশ্চিত জীবন অপেক্ষা করছে তা তারা দুজনেই টের পাচ্ছিল। আদনান যখন ঘরটার তালা খুলল, তখন এক ভ্যাপসা গুমোট গন্ধ নাকে এল। টিনসেডের এই একচিলতে ঘর। ভেতরে টিমটিমে একটা হলুদ বাল্ব জ্বলছে। দেয়ালগুলো নোনা ধরা, আর নিচে কাল কুচকুচে সিমেন্টের ফ্লোর। ঘরটা এতটাই ছোট যে একটা খাট রাখলে আর তেমন জায়গা থাকে না। আসবাবপত্রের নামগন্ধ নেই, কেবল শূন্যতার এক হাহাকার দেয়ালের কোণে কোণে জমে আছে।
আদনান অপরাধীর গলায় বলল,

“আপাতত এইটাই জোগাড় করতে পারছি। কাল সকালে আমি টুকটাক কিছু এনে দেব। আজ রাতটা কষ্ট করে একটু মানিয়ে নেন।”

বেলী কথা বলল না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে ওই কাল ফ্লোরটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সাজানো ঘর,সবই তো আজ এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল। আয়েশা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত তার কাপড়ের পুটলিটা খুলল। সেখান থেকে একটা পুরনো ধোয়া চাদর বের করে ফ্লোরের এক কোণে বিছিয়ে দিল।
বেলী যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে এল। নিজের ব্যাগ থেকে কয়েকটা কাঁথা বের করে চাদরের ওপর বিছিয়ে সে ফিওনাকে আলতো করে শুইয়ে দিল। ফিওনা সম্ভবত ক্লান্তিতেই অবশ হয়ে গিয়েছিল, শোয়ানোর সাথে সাথেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
কতক্ষণ ওভাবে কেটে গেল কেউ জানে না। বেলী পাথরের মূর্তির মতো ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে একধ্যানে বসে আছে। তার চোখ দুটো শুকনো, কিন্তু ভেতরে যেন প্রলয় বয়ে যাচ্ছে। আয়েশা এক কোণে বসে বেলীর দিকে তাকাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে বেলীকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ এই কথাটা এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা মনে হচ্ছে আয়েশার কাছে।

আদনান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরের এই নিস্তব্ধতা তাকেও কষ্ট দিচ্ছে। সে নিচু স্বরে ডাকল, “আয়েশা, একটু বাইরে আসো তো!”

আয়েশা বাইরে গেলে আদনান তার হাতে এক প্যাকেট পাউরুটি ও কলা গুঁজে দিয়ে বলল,

“এইটা রাখো। আমি এখন যাই, বেশি রাত করলে আম্মা চিন্তা করবে। কাল ভোরেই আসব।”

আদনান চলে যাওয়ার পর আয়েশা ঘরে ঢুকে দেখল বেলী ঠিক আগের মতোই বসে আছে। আয়েশা ধীরে ধীরে বেলীর কাঁধে হাত রাখল।

“বেলী… কিছু খাবি? আদনান ভাই এইগুলা দিয়া গেল।”

বেলী এবার মুখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনো প্রাণ নেই। সে ফিসফিস করে বলল,

“আয়েশা, মানুষের জীবন কি এক দিনের মধ্যে এতখানি পাল্টে যেতে পারে?”

আয়েশা উত্তর দিতে পারল না। শুধু আশাহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

#চলবে?

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৩)
#মীরাতুল_নিহা

ভোরের আলো তখনো বস্তির টিনের চালে ঠিকঠাক আছড়ে পড়েনি। আদনান নিজের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। কাল রাতভর বেলী আর আয়েশার জন্য ঘর জোগাড় করা, দৌড়ঝাঁপ আর মানসিক উত্তেজনায় শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল। তার সেই গভীর ঘুম বেশিক্ষণ টিকল না। ঘরের চিৎকারে ধড়ফড় করে জেগে উঠল সে। কণ্ঠস্বরটা অতি পরিচিত তার মা কুলসুম বেগম! কুলসুম বেগম ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলছেন। আদনান চোখ ডলতে ডলতে বাইরে আসতেই তিনি ছেলের ওপর বাঘিনীর মতো তেড়ে এলেন।

“আদনান! তোর কি আক্কেল-জ্ঞান সব লোপ পাইছে? সারা বস্তিতে ছি ছি পইড়া গেছে যে তুই ওই স্বামী-খেদানো বেলীর লাইগা ঘর ভাড়া নিয়া দিছস!
নিজের খাইয়া বনের মোষ তাড়ানো কি তোর কাম?”

আদনান বিরক্ত হয়ে বলল,

“আরে মা, সকাল সকাল কী শুরু করলা? মানুষটা বিপদে পড়ছে, বাচ্চা নিয়া রাস্তায় দাঁড়াইছে। সাহায্য করছি বইলা কি খুব অপরাধ হইয়া গেছে?”
কুলসুম বেগম ফোঁস করে উঠলেন,

“অপরাধ না তো কী? পরের ঘরের ঝগড়াঝাঁটি নিয়া মাতবরি করতে গিয়া নিজের নাম খারাপ করতাছস। একটু আগে পারুলের মা কত কথা কইলো ইনিয়ে বিনিয়ে! শোন আদনান, সাফ কথা কইয়া দিলাম, ওই বেলীর ছায়াও যেন তুই না মাড়াস।”

আদনান মা’কে আপ্রাণ বোঝানোর প্রচেষ্টায় বলতে লাগল,

“মা! বাচ্চাটার জন্য মায়া লাগে। তাছাড়া মানুষই তো মানুষের উপকারে লাগে।”

“উপকারীরে বাঘে খায়, এইটা ভুইলা যাস না। ওই মেয়ের লগে মেলামেশা করলে তোর বিয়া-শাদি নিয়াও কথা উঠব।”

আদনান এবার রেগে গেল।

“মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো কি এখন নজর দেওয়া হইয়া গেল? মা, একটু সম্মান রাইখা কথা কও।”
“সম্মান আমার কপাল! তুই আজ থেইকা ওগো কোনো খবর নিবি না। এডাই শেষ কথা!”

কুলসুম বেগমের চরম আল্টিমেটাম। মা আর ছেলের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ তেতো বাকবিতণ্ডা চলল। কুলসুম বেগমের অনড় জেদ আর কুৎসিত সব সন্দেহের কথা শুনে আদনানের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক পর্যায়ে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রাস্তায় পা রাখতেই গলি দিয়ে হনহনিয়ে হাঁটার সময় তার চোখেমুখে বিরক্তি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদনানের গতি কমে এল। সামনেই ফারহানের সেই ঘরটা। ফারহানের ঘরের দরজার কাছে আসতেই আদনান দেখল দরজাটা আধখোলা হয়ে আছে।
আদনান মনে মনে নিজেকে শাসন করল। তার উঁকি দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু অবুঝ কৌতূহল তাকে বাধ্য করল একবার ভেতরের দিকে তাকাতে। না চাইতেও তার চোখজোড়া চলে গেল ঘরের ভেতরের দিকে।
ঘরের ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে একলা শুয়ে আছে ফারহান। ভোরের আলোয় তার মুখটা কালচে আর বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ঘরের ভেতরটা একদম এলোমেলো। আদনান চারদিকে ভালো করে খুঁজল, কিন্তু কোথাও ফারহানের নতুন বউ তৃষ্ণাকে দেখতে পেল না।
আদনানের মনে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
তৃষ্ণাকে না দেখে আদনান আর সময় নষ্ট করল না। ফারহানের এই বিধ্বস্ত দশা দেখার কোনো আগ্রহ তার নেই। তার সমস্ত চিন্তা এখন ওই টিনসেডের এক রুমের ঘরটার দিকে। কেন যেন আজ সকালে বেলীকে না দেখে সে থাকতে পারছে না। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা আর অস্থিরতা তাকে তাড়া করে ফিরছে।
টিনের চালার ছিদ্র দিয়ে আসা ভোরের এক চিলতে আলো যখন বেলীর মুখে পড়তেই বেলীর ঘুম ভেঙে গোল। সারারাত শক্ত মেঝের ওপর শুয়ে তার মেরুদণ্ড থেকে শুরু করে সারা শরীর যেন জমে পাথর হয়ে আছে। পাশের বিছানায় আয়েশা এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাতের এই মানসিক ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো ওরও ফুরিয়ে এসেছে। বেলী ধীরে ধীরে উঠে বসল। পা বাড়াতেই হাড়ের ভেতর এক তীক্ষ্ণ ব্যথার ঢেউ খেলে গেল। ফিওনা তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন, তার নিষ্পাপ মুখটা দেখে বেলীর বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আয়েশা ধড়ফড় করে জেগে উঠল। চোখ কচলাতে কচলাতে সে হাই তুলে বলল,

“উফ! শরীরটা জুইত ঠেকতাছে না রে বেলী। মনে হইতাছে কেউ ডলা দিছে। আজ মনে হয় কাজে যাইতে পারুম না।”

বেলী ম্লান হেসে বলল,

“যাবি কি করে? সারারাত এই শক্ত মেঝেতে শুয়ে থাকলে কি আর শরীর ভালো থাকে? বরং বিশ্রাম নে।”
আয়েশা কোনোমতে উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল,

“তুই কি আজ পড়াইতে যাবি না? শরীর তো তোরও ভালো না।”

বেলী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে দৃঢ় স্বরে বলল,

“যাব। আজ যদি না যাই, তবে কাল হয়তো আমার ফিওনাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমার বিশ্রাম নেওয়ার বিলাসিতা সাজে না রে আয়েশা।”

কথাগুলো বলতে বলতেই জরাজীর্ণ কাঠের দরজায় টোকা পড়ল। বেলী অবাক হয়ে আয়েশার দিকে তাকাল। এই সাতসকালে কে আসতে পারে? আয়েশা দরজা খুলতেই দেখল আদনান দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখেমুখে তখনো সকালের অশান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বেলী বলল,

“আদনান? এই সকালে? ভেতরে আসো।”

আদনান ভেতরে পা বাড়াল না। দরজার চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সে অপরাধীর চোখে ঘরের ভেতরটা দেখল। গতরাতের দেওয়া সেই পাউরুটি আর কলার প্যাকেটটা তখনো এক কোণে অবহেলিতভাবে পড়ে আছে। কেউ ছোঁয়ওনি ওটা। আদনানের বুকটা হু হু করে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,

“ভেতরে আসব না। কাল রাতের খাবারগুলা দেখি সব পড়ো আছে। আপনারা কি কিছুই খান নাই? এইগুলা দিয়ে অন্তত নাস্তাটা করে নেন। শরীর টিকবে না তো এমন করলে।”

বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে ঘরের ভেতর গিয়ে ফিওনাকে ভালো করে কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিল। আয়েশাকে ইশারায় ফিওনার খেয়াল রাখতে বলে সে মাথার ওড়নাটা টেনে নিল। আদনানের কথা যেন তার কানে পৌঁছালই না। তার এখন একটাই লক্ষ্য—কাজে যেতে হবে। টাকা ইনকাম করতে হবে। বাঁচতো হবে ভালোভাবে। আদনানকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বেলী শুধু বলল,

“আমি রাইসাকে পড়াতে যাচ্ছি। আয়েশা ফিওনাকে একটু দেখিস।”

আদনান একদৃষ্টে বেলীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রিক্ত হাতে, শূন্য পেটে এবং শরীরভর্তি ব্যথা নিয়ে একটা মেয়ে কীভাবে এত তেজ নিয়ে পথ চলতে পারে, তা তার ধারণার বাইরে।
পিচঢালা তপ্ত রোডের ওপর দিয়ে বেলী যখন হাঁটছিল, তখন মাথার ওপরের সূর্যটা যেন তার ভাগ্য নিয়ে উপহাস করছিল। ফিওনাকেআয়েশার কাছে রেখে তো এসেছে, কিন্তু মন টিকছে না। গন্তব্যহীনভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে মোড়ের মাথায় এসে থমকে দাঁড়াল। আজ তার মন বারবার বাপের বাড়ির দিকে টানছে। কয়েকটা গাড়ি পেরোলেই পরিচিত পুরনো বাড়িটা, যেখানে তার শৈশব কেটেছিল। কিন্তু আজ সেই বাড়ির দিকে পা বাড়াতে তার কলিজা কাঁপছে। বেলী জানে, সে এখন আর সেই আদরের মেয়েটি নেই। সে এখন এক ‘তালাকপ্রাপ্তা’ নারী, যার কোলে আবার একটি সন্তান। এই সমাজে মেয়েদের বাপের বাড়ি তখনো স্বর্গ থাকে যতক্ষণ তারা স্বামীর ঘরে সুখে থাকে। যেই মুহূর্তে সম্পর্কটা চুকে যায়, সেই স্বর্গটা মুহূর্তেই বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বেলী মনে মনে ভাবল,
“মা-বাবা কি আমাকে ঘরে তুলবেন? নাকি ভাববেন আমি তাদের গলায় নতুন করে পাথরের মতো জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসতে আসছি?”

প্রতিবেশীদের কটু কথা, আত্মীয়দের কানাঘুষা আর নিজের ভাই-বোনদের অবজ্ঞার কথা ভেবে বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। পা দুটো যেন আঠা দিয়ে রোডের সাথে লেগে আছে। সামনে আগানোর শক্তি সে পাচ্ছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই এক চিলতে জেদ তার ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। এভাবে আর কতদিন অন্যের দয়ায় চলবে সে? আদনানের সাহায্য নিয়ে আর আয়েশার সাথে এক রুমের এই কাল ফ্লোরে কি সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে? লোকেই বা তাকে কতকাল দেখবে?
না, তা হয় না। বেলীর আলমারিতে এখনো তার সযত্নে রাখা সার্টিফিকেট গুলো আছে। পড়ালেখায় সে কোনোদিন ফাঁকি দেয়নি। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল আজ বাপের বাড়িতে যাবে শুধু নিজের সার্টিফিকেটগুলো উদ্ধার করতে। যেটুকুই আছে ওতে বেলীর রেজাল্ট নজরকাঁড়া! অত ভালো না হলেও চলার মতন একটা চাকরি সে খুঁজে তো নিতে পারবে! নিজের যোগ্যতায় নিজের আর ফিওনার ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে হবে তাকে। বেলী আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। ভয়ের মেঘটা সরিয়ে সে নিজের ভেতরের তেজটাকে আবারও জাগিয়ে তুলল।
বেলী ধীর পায়ে বাপের বাড়ির গলির দিকে পা বাড়াল।

#চলবে?

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১০+১১

#বেলীফুলের_ইতিকথা(১০)
#মীরাতুল_নিহা

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে বস্তির এই ছোট ঘরটাতে অস্থিরতা যেন দেয়াল চুইয়ে পড়ছে। আয়েশা এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার কপালে ব্যান্ডেজটা এখনো সাদা হয়ে ফুটে আছে অন্ধকারের মাঝে। বেলী ফিওনাকে ঘুম পাড়িয়ে আয়েশার পাশে এসে বসল। আয়েশার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি দেখে বেলীর বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই ঘরের অন্য পাশ থেকে ফারহানের কর্কশ গলা ভেসে এল। ফারহান আর তৃষ্ণা তখনো ঘুমায়নি। ফারহান একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,
“আমি কিন্তু, বাপু সোয়াব কামাতে এখানে আসি নাই। ফ্রিতে থাকা-খাওয়ার হোটেল এইটা না।”

তৃষ্ণা আয়না দেখে নিজের চুল ঠিক করতে করতে যোগ করল,

“তা তো বটেই! নিজে তো অন্ন ধ্বংস করতাছে, আবার সাথে জুটিয়ে আনছে এক আপদ। আমাগো পকেটে কি টাকা ওড়ে নাকি?”

আয়েশা অপমানে আর থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে বেলীকে বলল,

“আমি আর থাকব না রে। আমি চলে যাই। ফুটপাতে পড়ে থাকলেও শান্তি, কিন্তু তোর সংসারে অশান্তি আমি সইতে পারতাছি না।”

বেলী আয়েশার হাত টেনে আবার বসিয়ে দিল। তার দুচোখে তখন আগুনের হলকা।

“আমার সংসার বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সুতরাং সে সংসারে অশান্তির ভয় আমি করছি না আয়েশা!”

সে ফারহানের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,

“ফারহান, মনে রাখবে আইনত এখনো আমি তোমার বউ। এই ঘরটা যতটা তোমার, ততটা আমারও। আমার ঘরের এক কোণে আমার বোন থাকবে, তাতে তোমার অনুমতির প্রয়োজন আমি দেখি না।”

ফারহান খেঁপে গিয়ে উঠে দাঁড়াল।

“বড় বড় কথা বলিস না বেলী!”

তৃষ্ণা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “আইচ্ছা দেখমু কতদিন এই দরদ টিকে! চাল ফুরাইলে বুঝবা কত জ্বালা।”

আয়েশা বেলীর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। সে বুঝতে পারছে, বেলী তাকে আগলে রাখার জন্য নিজের জীবনের শেষ শান্তিটুকুও বিসর্জন দিচ্ছে। বেলী আয়েশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবল—কাল তাকে টিউশনিতে যেতে হবে। কাজ খুজতে হবে। তাকে এখন আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।ওদিকে ফারহান আর তৃষ্ণা ফিসফিস করে নতুন কোনো ফন্দি আঁটছে।

সকাল হতেই বেলী রান্নায় হাত দিল। তার শরীর ক্লান্ত থাকলেও মনটা ছিল পাথরের মতো শক্ত। হাঁড়িতে চাল চাপিয়ে দিয়ে পাশের চুলায় পাতলা করে ডাল আর আলু-পেঁপে দিয়ে একটা সবজি চড়াল। অভাবের সংসার, এর বেশি কিছু জোটানোর সামর্থ্য আপাতত নেই। রান্না শেষ হতেই বেলী আয়েশাকে ডাক দিল।

“আয়েশা, আয়। গরম গরম দুটো ভাত খেয়ে নে। সারাদিন তোকে আবার ফ্যাক্টরিতে খাটতে হবে।”

আয়েশা ইতস্তত করে বেলীর পাশে এসে বসল। তার চোখেমুখে কুণ্ঠা। সে জানে, এই ভাতের প্রতিটি দানা কতটা কষ্টের। ঠিক যখন বেলী আয়েশার থালায় এক হাতা ডাল তুলে দিতে যাবে, তখনই ফারহান ঘর থেকে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এল। ফারহান আড়চোখে থালার দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,

“বাহ! রান্নাবান্না তো রাজকীয় হয়েছে দেখছি। কিন্তু বড় বউ, চাউল কি আসমান থেকে পড়ে? তোগো পেট চালাতেই আমার নাভিশ্বাস উঠছে, তার ওপর আবার এই মেহমানের পাত ভরে দিতাছোস?”

আয়েশা ভাতের গ্রাস হাতে নিয়েও থেমে গেল। ফারহান আবার বলল,

“আয়েশারে বলি—ফ্রিতে থাকা-খাওয়ার দিন শেষ। কাইল রাত হয়ে গেছিল। তাই বেশি কিছু কইনাই।”

“আমি টাকা দিয়ে দিমু।”

আয়েশা বস্তির কাছের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা পায়, তার সবটুকুই রাহেলা বেগম কেড়ে নেন। আজ আয়েশার মাথার ওপর ছাদ নেই, টাকা নেই। বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

“তুই টাকার কথা কেন তুলছিস আয়েশা? আমি কি তোর কাছে টাকা চেয়েছি?”

ফারহান মাঝখান দিয়ে ফের বলল,
“তাইলে এখনি দেও টাকা!”

“এখন কই পামু? বেতন পাইলে দিয়ে দিমু ফারহান ভাই।”

“গার্মেন্টসে তো কাজ করো, সবে মাস শুরু হইছে জানি, কিন্তু মাস শেষে বেতন না পাওয়া পর্যন্ত কি আমি আমার ঘরের অন্ন দান সতর করব না-কি? বেতন পাইলে টাকা দিবা সেই আশায় আমি কি নিজের পেটে গামছা বাঁধমু?”

তৃষ্ণা ততক্ষণে দরজায় এসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে বাঁকা হেসে যোগ করল,

“তা তো বটেই! নিজেরই ঠাঁই নাই, আবার আরেকজনের অন্ন জোগায়! বড় বউ তোমার তো টিউশনি আছে, আজ টাকা নিয়ে আসো। নইলে এই উপরি মানুষের খরচ তো আর ফারহান একা টানতে পারব না।”

আয়েশা থালা সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল। চোখে জল টলমল করছে তার।

“আমি আর ভাত খামু না। আমি চইলা গেলেই তো হয়।”

বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর ফারহানের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“চাল আমি বেশি করে ফুটিয়েছি ফারহান। আমার ভাগের অর্ধেক আমি আয়েশাকে দিচ্ছি। এতে তোমার পকেটে টান পড়ার কথা না। আর শোনো, ও মাস শেষে বেতন পেলে ওর থাকা-খাওয়ার হিসেব কড়ায়-গণ্ডায় চুকিয়ে দেবে। তার আগে যদি আমার বোনের ভাতের থালা নিয়ে আর একটা কথা বলো, তবে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”

ফারহান কিছু একটা বলতে গিয়েও বেলীর চোখের জেদ দেখে দমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“আইচ্ছা দেখুমু, কতদিন এমন দরদ উথলে পড়ে!”

বেলী ফারহানের কথা উপেক্ষা করে আয়েশার পাতে আরেকটু সবজি তুলে দিয়ে বলল,

“খা আয়েশা। কারো কথায় কান দিস না। তোর শরীর ঠিক না থাকলে কাজ করবি কী করে? তুই শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা কর, বাকিটা আমি দেখে নেব।”

আয়েশা অশ্রুসজল চোখে ভাতের গ্রাস মুখে তুলল। বেলী বুঝতে পারল, এই লড়াইটা কেবল শুরু। সামনে আরও বড় ঝড় আসছে। বেলীর কড়া কথা শুনে ফারহান আর বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে আর রাগে গজগজ করতে করতে সে শার্টটা কাঁধে ফেলে তেজ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজায় একটা লাথি মেরে বলে গেল,

“খাও তোমরা দুই সতী মিলে! দেখি ফুরাইলে কার কাছে হাত পাতো!”

ফারহান চলে যেতেই তৃষ্ণা আয়েশ করে পিঁড়িতে বসল। সে কোনোদিনও রান্নাঘরে হাত দেয় না, কিন্তু খাওয়ার সময় তার নবাবী মেজাজ ষোলো আনা।

“খানা দাও বড় বউ!”

বেলী উত্তর দিল,

“হাত দুইটা কি সাথে নেই? না-কি কেটে ফেলেছো!”

তৃষ্ণা আঁতকে উঠে বলে,

“আমার হাত তো লগেই আছে।”

“হাত যেহেতু আছে তাহলে খাবার বেড়ে খেতে পারছো না? নাকি আমি খাইয়ে দিব?”

তৃষ্ণা বিদঘুটে হাসি দিয়ে বলে,

“খাওয়ায় দিলে তো ভালোই হয়।”

“বিষ খাওয়াব, খাবে?”

মুখ বেঁকিয়ে নিজেই খাবার প্লেটে তুলে নিলো।
তৃষ্ণা প্রথম গ্রাস মুখে দিয়েই নাক ছিটকাল।

“উফ! ডালটা তো একদম পানসে হয়েছে! আর এই সবজিতে কি তেল-মশলা দাও নাই? মুখে দেওয়া দায়! আমার তো এসব গলায় আটকায়।”

বেলী তৃষ্ণার কথায় কান দিল না। সে তখন পরম মমতায় ফিওনাকে খাওয়ানো দেখছিল। আয়েশা একপাশে বসে বাটি থেকে আলু সেদ্ধ হাত দিয়ে একদম মিহি করে চটকাচ্ছে। ফিওনা ছয় মাসে পা দিয়েছে। মাতৃদুগ্ধ এখন আর ওর ছোট পেটের জন্য যথেষ্ট নয়, তাই আজ থেকে উপরি খানা শুরু হয়েছে। আয়েশা খুব যত্ন করে আলু সেদ্ধটুকু নরম করে ফিওনার মুখে তুলে দিচ্ছে। ফিওনা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে তার কচি মুখে সেই খাবারটুকু নিয়ে চিবোনোর চেষ্টা করছে। তৃষ্ণা থালা থেকে একটা আলু আলাদা করে ফেলে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,

“শোনো বড় বউ! আমার কিন্তু এসব খেয়ে দিন কাটবে না। ফারহান আমাকে বলেছে মাছ-মাংস খাওয়াতে। ঘরে মাছ আছে না? যাও, চটপট আমাকে একটা মাছ ভেজে দাও তো। তৃষ্ণা কি আর ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার মেয়ে?”

বেলী শান্তভাবে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ঘরে যা ছিল সবই রান্না হয়েছে। বাড়তি মাছ বা মাংস কেনার টাকা আপাতত আমার কাছে নেই। ফারহান যদি বাজার করে আনে তবেই রান্না হবে, তার আগে এই ডাল-ভাতই সই।”

তৃষ্ণা এবার আয়েশার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপ করে বলল,

“ওহ! বুঝেছি। মেহমান খাওয়াতে গিয়ে আমাদের পেটে এখন পাথর বাঁধতে হবে? পরের বোঝা টানতে গিয়ে নিজের ঘরটাই এখন শ্মশান বানাইতাছে!”

আয়েশা ফিওনাকে খাওয়াতে খাওয়াতে থমকে গেল। তার চোখে আবার জল টলমল করতে শুরু করল। কিন্তু বেলী দমল না। সে আয়েশাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল ফিওনাকে খাওয়ানো জারি রাখতে। তারপর তৃষ্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“খাওয়ার ইচ্ছা থাকলে খাও, আর না থাকলে উঠে যাও। তবে মনে রেখো তৃষ্ণা, এই ঘরে আমি কাজ করি বলেই এখনো চুলা জ্বলে। যেদিন আমি হাত গুটিয়ে নেব, সেদিন তোমার ওই পালিশ করা নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে খেতে হবে।”

তৃষ্ণা রাগে গিজগিজ করতে করতে কোনোমতে কয়েক লোকমা ভাত মুখে পুরল। বেলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিওনার দিকে তাকালো। এই এক চিলতে হাসিমুখের জন্য সে হাজারটা তৃষ্ণা আর ফারহানের বিষ হজম করতে রাজি। আজ থেকে ফিওনার মুখে অন্ন উঠেছে, এই খুশিতেই বেলীর পেট ভরে গেছে।

তৃষ্ণা থামলো না। থালা ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে তখন বিষাক্ত হাসির রেখা। বেলীর মুখে হাসি থাকাটা সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিল না। সে এবার কর্কশ গলায় বলতে শুরু করল,

“রান্না আরো ভালো করে কইরো।”

“অত ভালো করতে হলে নিজে করে খাও!”

“এত বড় বড় কথা কিসের? কাম করতে না পারলে কেমনে হইব?”

বেলী চোখ উঁচিয়ে উত্তর দিল,

“তোমার মতন অন্যের স্বামীকে বিয়ে করে খেতে হবে না। আমি কাজ করেই খাই।¡

“স্বামী ধরে রাখার মুরোদ তো নেই! এই যে ফারহান আমার কাছে কেন আইছে জানো? তোমার মতো কাঠখোট্টা মেয়ের সাথে আর যাই হোক, ঘর করন যায় না। বিয়া করাটাই বোধহয় তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ফারহান তো বলে, তোমার কাছে নাকি কোনো সুখ নাই। নাকি তোমার শারীরিক কোনো অক্ষমতা আছে যে বরকে খুশি করতে পারো না? ”

তৃষ্ণার প্রতিটি শব্দ তীরের মতো বেলীর বুকে বিঁধছিল। এতদিন সে সব মুখ বুজে সহ্য করেছে—অনাহার, অপমান, সতীনের ঘর সবই সয়েছে সে। কিন্তু আজ নিজের আত্মসম্মানে এমন কুরুচিপূর্ণ আঘাত সে আর সইতে পারল না। বেলীর চোখের মণি দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরনো শক্ত শলার ঝাড়ুটা এক হ্যাঁচকায় তুলে নিল।
তৃষ্ণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেলী বাঘিনীর মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“অনেক বলেছিস! এবার তোর নোংরা মুখটা বন্ধ করার সময় হয়েছে!”

বেলী হাত চালিয়ে ঝাড়ু দিয়ে তৃষ্ণাকে মারতে শুরু করল। ঠাস ঠাস করে ঝাড়ুর বাড়িগুলো তৃষ্ণার পিঠে আর পায়ে গিয়ে পড়ছে। তৃষ্ণা চমকে গিয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল,

“ওরে বাবারে! মরে গেলাম রে! কে আছিস বাঁচা!”

আয়েশা ফিওনাকে নিয়ে এক কোণে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। সে বেলীকে থামানোর চেষ্টা করল,

“বেলী! থাম!”

কিন্তু বেলী তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তার মনে হচ্ছিল, সে তৃষ্ণাকে নয়, বরং তার জীবনের ওপর চেপে বসা সমস্ত অন্ধকারকে ঝেটিয়ে বিদায় করছে। যতক্ষণ না ঝাড়ুটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গুড়ো হলো, ততক্ষণ বেলী মেরেই চলল। তৃষ্ণা মেঝেতে পড়ে আর্তনাদ করছে। তার ফর্সা পায়ের দিক থেকে কালচে রক্ত বের হতে শুরু করেছে শলার আঘাতে। বেলী হাঁপাচ্ছিল। সে ভাঙা ঝাড়ুর অবশিষ্টাংশটুকু তৃষ্ণার দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হিংস্র গলায় বলল,

“ আজ তো কেবল ঝাড়ু দিয়েছি, এরপর যদি আমার চরিত্র বা আমার নারীত্ব নিয়ে একটাও নোংরা কথা বলিস—তবে তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। বললি না? আমি শারীরিক ভাবে অক্ষম? এবার বুঝেছিস তো আমার শরীর অক্ষম না সক্ষম?”

তৃষ্ণা ভয়ে আর ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে ঘরের কোণে পড়ে রইল। তার সেই দর্প চূর্ণ হয়ে গেছে। বেলী আয়েশার কোল থেকে ফিওনাকে নিজের বুকে টেনে নিল। তার হাত দুটো এখনো কাঁপছে, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত শান্তি। সে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে চোখের পানি মুছে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আয়েশা, তুই সাবধানে যাস। বক্সে দুপুরের খাবার দিয়ে দিয়েছি। আমি রাইসাকে পড়াতে যাচ্ছি। ফিওনাকে সাথে নিয়ে গেলাম।”

বেলী আর পেছন ফিরে তাকাল না। রুগ্ন বস্তির সেই গলি পেরিয়ে সে শহরের বড় রাস্তার দিকে পা বাড়াল। আজ তার চলার গতিতে এক অন্যরকম তেজ।

#চলবে

#বেলীফুলের_ইতিকথা (১১)
#মীরাতুল_নিহা

বেলী বেরিয়ে যেতেই ঘরের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। তৃষ্ণা মেঝের ওপর বসে ডুকরে কাঁদছিল না, বরং তার চোখে ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের ঝিলিক। সে ধীরে ধীরে বসে নিজের ফর্সা পা দুটোর দিকে তাকাল। ঝাড়ুর বাড়ির দাগগুলো লাল হয়ে ফুটে উঠেছে, কিছু জায়গায় চামড়া ছিলে গেছে। তৃষ্ণা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের নখ দিয়ে ছিলে যাওয়া চামড়াটা সজোরে এক টান দিল। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়ে এল। যন্ত্রণায় তার মুখটা কুঁচকে গেলেও সে থামল না। সে এটাই চাইছিল। রক্তাক্ত ক্ষতটা যখন বেশ বীভৎস রূপ নিল, তখন সে আলুথালু বেশে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল।
খানিক পরেই ফারহান ঘরে ফিরল। হাতে করে তৃষ্ণার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তৃষ্ণার ওই অবস্থা দেখে তার হাত থেকে প্যাকেটটা পড়ে গেল।

“তৃষ্ণা! এ কী অবস্থা তোমার? কী হইছে?”

ফারহান চিৎকার করে দৌড়ে এল।
তৃষ্ণা এবার শুরু করল তার অভিনয়। ন্যাকামি ভরা গলায় ফুঁপিয়ে কেঁদে সে ফারহানের পা জড়িয়ে ধরল।

“ওগো, তুমি থাকতে আমার এই দশা ক্যান হইলো? তোমার বড় বউ আমাকে অমানুষের মতো পিটিয়েছে। আমি শুধু কইছিলাম তোমার জন্য মাছ রাঁনতে, আর অমনি সে ঝাড়ু নিয়ে আমার ওপর চড়াও হইছে। দেখো আমার পা’টার কী হাল করছে!”

ফারহান তৃষ্ণার রক্তাক্ত পা দেখে যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তার চোখের মণি রাগে লাল হয়ে উঠল।

“বেলীর এত বড় সাহস! আমার ঘরে থেকে আমার বউয়ের গায়ে সে হাত তোলে? ও কি নিজেকে এই ঘরের মালিক ভাবতে শুরু করছে?”

তৃষ্ণা কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বলল,

“সে তো কইয়া ইদিল, এই ঘর নাকি তার। আমি পরগাছা। সে আমাকে মারতে মারতে কইছে তোমাকে নাকি সে গুনেও না। আমি এর বিচার চাই ফারহান। যদি তুমি আজ বিচার না করো, তবে আমি বিষ খেয়ে মরব, তবুও এই অপমান সইব না!”

ফারহান সজোরে দেয়ালে একটা ঘুষি মারল। তার ভেতরের পশুটা যেন জেগে উঠেছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“বিচার হউব তৃষ্ণা! এমন বিচার হবে যে বেলী সারা জীবন মনে রাখব। সে ভাবছে সে অনেক বড় হয়ে গেছে? আজ আসুক ও ঘরে, ওর সব তেজ আমি দেখে ছাড়ব!”

তৃষ্ণা ফারহানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। সে জানে, ফারহানকে উস্কে দেওয়ার কাজটা সে সফলভাবে করতে পেরেছে। ওদিকে বেলী তখন রাইসাকে পড়াতে ব্যস্ত, সে কল্পনাও করতে পারছে না যে ঘরের ভেতর তার জন্য কী ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়েছে।

বস্তির মাঝখানটায় আজ যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। গোল হয়ে বসেছে বিচার সভা। এই বস্তির সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ আখতার রহমান বিচারক হয়ে বসেছেন। বাজারের বড় মুদি দোকানদার তিনি, বস্তির সবাই তাকে তেমনি সমীহ করে চলে। ফারহান বিচারের দাবিতে ফেটে পড়ছে। পাশেই তৃষ্ণা বসে আছে, তার চোখেমুখে শয়তানি কান্না। সে মাঝেমধ্যেই কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকছে আর একটু পরপর পায়ের কাপড় উঁচিয়ে সবাইকে সেই রক্তাক্ত ক্ষত দেখাচ্ছে। তৃষ্ণা ফুঁপিয়ে বলছে,

“দেখেন আখতার ভাই, দেখেন সবাই! আমি তো মানুষ, কোনো জানোয়ার না। সামান্য তর্কের জেরে ও আমাকে এমন করে মারল? আমি কি এই সংসারে মার খাওয়ার জন্য আইছি?”

আখতার রহমান হাতের তসবিহ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“হুম, দেখলাম। কিন্তু একপক্ষের কথা শুনে তো আর রায় দেওন যায় না। বেলী আসুক, তারপরই চূড়ান্ত কথা হইব।”

সকাল গড়িয়ে দুপুে হতে চলেছে। ফিওনাকে কোলে নিয়ে বেলী বস্তিতে ঢুকল। রোদে পুড়ে ক্লান্ত মুখটা তার ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সকালে তৃষ্ণাকে মারার পর তার মনে এক ধরণের অনুতাপ হচ্ছিল। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি আসতেই এত জটলা দেখে সে থমকে গেল। ফারহানের ঘরের অদূরেই মানুষের এই ভিড় দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। বেলী প্রথমে ভেবেছিল হয়তো বস্তিতে কোনো অঘটন ঘটেছে। কিন্তু ভিড়ের মাঝখান থেকে ফারহানের তেজালো গলা শুনে সে সব বুঝতে পারল। ফারহান চেঁচিয়ে বলছে,

“ওই তো আসতাছে আমার বড় বউ! পন্ডিতি কইরা এখন ঘরে ফিরছে!”

বেলী ধীর পায়ে জটলার দিকে এগিয়ে গেল। মানুষের উৎসুক দৃষ্টিগুলো তার ওপর বিষের মতো বিঁধছে। ফিওনা তখন রোদে গরমে একটু কান্নাকাটি করছে। বেলী ভিড় ঠেলে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। বেলী যখন ভিড় ঠেলে নিজের ঘরের দিকে এগোতে চাইল, তখনই ফারহান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পশুর মতো তেড়ে এল। বিচারসভার মর্যাদা কিংবা আখতার রহমানের উপস্থিতি—কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সে এক ঝটকায় বেলীর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল।

“তোর কত বড় সাহস! সবাই বইসা আছে আর তুই তেজ দেখায়া চইলা যাস? আমার তৃষ্ণারে মারছস না? আজ তোরে আমি মেরেই ফেলব!”

চুলের গোড়ায় প্রচণ্ড টানে বেলী যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। তার চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে তা আটকে রাখল। ফারহানের এই অতর্কিত হামলায় তার কোলে থাকা ফিওনা ছিটকে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। বেলী শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরল। পাশেই একজন দাঁড়িয়ে ছিল, বেলী টাল সামলে দ্রুত ফিওনাকে তার কোলে বাড়িয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল,

“ চুলের মুঠি ধরলে কেন? কিসের বিচার!”

ফারহান রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বলল,

“কী হইছে মানে? তুই তৃষ্ণার গায়ের চামড়া তুইল্লা দিছস, আর এখন সতী সাজছ? আখতার ভাই, দেহেন এই মেয়ের কত বড় আস্পর্ধা! ওরে আজ আমি এইখানে আস্ত রাখুম না।”

আখতার রহমান ধমক দিয়ে ফারহানকে থামালেন। “ফারহান! হাত ছাড়ো ওর। বিচার সভায় হাত তোলা মানে আমারে অপমান করা। ছাড়ো কইতাছি!”

ফারহান অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেলীর চুল ছেড়ে দিল। বেলী মাথা সোজা করে দাঁড়াল। তার এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো ঠিক করতে করতে সে আখতার রহমানের চোখের দিকে তাকাল।

“বেলী, ফারহান বিচার চাইছে। তুমি নাকি বিনা দোষে তৃষ্ণাকে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছো? কথা কি সত্যি?”

বেলী একটুও দমল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ আখতার ভাই, মেরেছি। তবে শখের বশে মারিনি। এই মেয়েটি আমার ঘর ভাঙার পর এখন আমার নারীত্ব আর চরিত্র নিয়ে জঘন্য কথা বলছে। আমি যদি আজ প্রতিবাদ না করতাম, তবে ও কাল আরো আশকারা পেতো।”

তৃষ্ণা এবার আরও জোরে কান্না শুরু করল,

“শুনলেন তো! ও নিজেই স্বীকার করছে। এখন আপনারা বিচার করেন। আমি এই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত নিরাপদ না! কবে জানি জান নিয়ে নেয় মাবুদ!”

ফারহান তেড়ে এল বেলীর দিকে,

“তোর এত সাহস হয় কেমনে? তুই আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলবি আর আমি বসে থাকব?”

বেলী তাচ্ছিল্য করে বলল,

“আমিও তো তোমার বউ ফারহান। আমার গায়ে যখন মনে আর মুখে আঘাত লাগে, তখন তুমি কোথায় থাকো?”

আখতার রহমান এবার হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। তিনি বেলীর ক্লান্ত মুখ আর কোলের বাচ্চাটার দিকে একবার তাকালেন। বিকেল হয়ে আসছে, আজই মাহিকে পড়ানোর প্রথম দিন হওয়ার কথা ছিল। বেলী ভেবেছিল একটু বিশ্রাম নিয়ে পড়তে বসবে, কিন্তু তার ভাগ্যে আজ অন্য কিছু লেখা আছে।
বিচার সভা এখন এক চরম উত্তেজনার মোড়ে দাঁড়িয়ে। বস্তিবাসী মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।
আখতার রহমান গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,

“বেলী, তুমি কি সত্যিই অনুতপ্ত নও?”
বেলী তপ্ত গলায় উত্তর দিল,

“আখতার ভাই, আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। যে অন্যায় দিনের পর দিন আমার ওপর হয়ে আসছে, আজ তার বাঁধ ভেঙে গেছে। আমি যা করেছি, তার জন্য এক বিন্দুও অনুতপ্ত নই। আত্মসম্মান বাঁচাতে যদি হাতে ঝাড়ু বা কোনো অস্ত্র তুলে নিতে হয়, তবে আমি বারবার তাই করব।”

“কাজটা ঠিক হইলো বেলী?”

আখতার রহমানের গম্ভীর প্রশ্নের মুখে বেলী এক মুহূর্তের জন্যও কুঁকড়ে গেল না। বরং ফিওনাকে প্রতিবেশির কোলে দিয়ে সে যখন ভিড় ঠেলে মাঝখানে এসে দাঁড়াল, তখন তার অবয়বে এক অদ্ভুত তেজ। রোদে পোড়া তামাটে মুখে ঘামের বিন্দুগুলো যেন একেকটা স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলছে।

বেলী সোজা আখতার রহমানের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল—

“হ্যাঁ, তবে কাজটা খুব একটা রুচিসম্মত হয়নি ঠিকই, কিন্তু যে ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়, সেখানে হাত নোংরা করে লাভ নেই।”

উপস্থিত প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে দুই-তিনজন মহিলা এবার ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল। মাঝবয়েসী জমিলা বেগম একটু গলা উঁচিয়েই বললেন,

“আসলে কথা তো মিছা না আখতার ভাই। জলজ্যান্ত বউ থাকতে আবার বউ ঘরে আনছে ফারহান, সেই জ্বালা বেলী কতদিন সইব? ও তো রক্তমাংসের মানুষ! জ্বালা মেটাইছে, ঠিকই করছে।”

আরেকজন তাল মিলিয়ে বলল,

“সতীন আনলে এমন ঘটা কইরা মারামারি হইবোই। ফারহানেরই দোষ, ও ঢং দেখায়া আরেক মাইয়া ঘরে আনছে কেন?”

পুরো জটলার হাওয়া যেন ধীরে ধীরে বেলীর দিকে ঘুরতে শুরু করল। তৃষ্ণা এতক্ষণ ন্যাকামি করে কাঁদছিল, এখন প্রতিবেশীদের কথা শুনে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিকেলের মরা আলোয় বেলীর ছায়াটা আজ অনেক দীর্ঘ দেখাচ্ছে। বেলী আন্দাজ করছে , আজ থেকে ফারহানের সাথে তার সম্পর্কের শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে যাবে।

ফারহান চিৎকার করে উঠল,

“আখতার ভাই, এর বিচার না হইলে আমি আজ খারাপ কিছু করুম! আজ ঝাড়ু দিয়ে মারছে পরশু দা দিয়ে কিছু করব না গ্যারান্টি কি? আমার বিচার চাই!”

বেলী এবার ফারহানের দিকে ফিরল। তার চোখের চাউনিতে এমন ঘৃণা ছিল যে ফারহান অবচেতনেই এক পা পিছিয়ে গেল। বেলী তপ্ত গলায় বলল—

“ফারহান, বিচার চাইছো? যে স্বামী নিজের ঘরে পরনারী তুলে এনে নিজের স্ত্রীর মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, যে বাবা বাচ্চার কথা চিন্তা করে না! ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেয় তার মুখে বিচারের কথা মানায় না। আখতার ভাই, এই মেয়েটি আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে বিচার চাইছে, অথচ কয়েক ঘণ্টা আগে ঘরের ভেতরে সে আমার নারীত্ব আর আমার চরিত্রের ওপর যে নোংরা অপবাদ দিয়েছে, তা উচ্চারণ করার ক্ষমতাও আমার নেই। সে আমার বিছানা, শরীরের খবর নিতে এসেছিল আমি শুধু বুঝিয়ে দিয়েছি, আমি যেমন ঘর সংসার সামলাতে জানি, তেমন নিজের সম্মান রক্ষা করতেও জানি।”

আখতার রহমান থমকে গেলেন। বেলীর কথার ওজন আর ওর মার্জিত ভঙ্গি তাকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি ফারহানের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন,

“থামো ফারহান! বেলী তো কোনো মিছা কথা কইতেছে বইলা আমার মনে হয় না। ও শিক্ষিত মেয়ে, ওরে আমরা চিনি। তৃষ্ণা, তুমি কি ওর চরিত্র নিয়া কিছু কইছিলা? খালি তর্কের জেরে এতকিছু?”

তৃষ্ণা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে ভেবেছিল ন্যাকামি করে সবাইকে নিজের দিকে টেনে নেবে, কিন্তু বেলীর এই সাহসের সামনে তার সব চাল উল্টে যাচ্ছে। সে তোতলামি করে বলল,

“আমি… আমি তো শুধু…”

বেলী কোল থেকে ফিওনাকে আবার নিজের বুকে টেনে নিল। তারপর আখতার রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল
“আখতার ভাই, বিকেলের আলো পড়ে আসছে। আমার এখন জরুরি কাজ আছে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে কুৎসিত তর্কে সময় নষ্ট করতে চাই না। বিচার যদি করতেই হয়, তবে আমার চরিত্র আর ওর পায়ের চামড়া নিয়ে নয় বিচার করুন ফারহান কেন ঘরে বউ থাকা সত্বে বিয়ে করেছে! নিজের বাচ্চার খাবারেে টাকা না দিয়ে আমোদ-প্রমোদ করছে। আর হ্যাঁ, আমি এই ঘরেই থাকব। দেখার ইচ্ছা আছে কার কত ক্ষমতা আমাকে বের করার!”

আজ বিকেলে মাহিকে পড়ানোর প্রথম দিন। এই নোংরা পরিবেশের রেশ যেন সেসবের ওপর না পড়ে, সেদিকেই তার এখন একমাত্র লক্ষ্য। ওদিকে বিচার সভায় এক পিনপতন নীরবতা।

ফারহানকে পাশ থেকে খোঁচাচ্ছে তৃষ্ণা।

“কেমন পুরুষ তুমি? বউর সুবিচার আনতে পারো না!”

তৃষ্ণার উস্কে দেওয়া কথায় ফারহান তখন রাগে কাঁপছে। আখতার রহমানের দিকে তাকিয়ে সে আবারও চিৎকার করে উঠল,

“আখতার ভাই, আমি বিচার চাই! আমি নিজের টাকা দিয়া খাওয়ায় পড়ায় এসব মানতে পারমু না।”

বেলী এবার অবজ্ঞার হাসি হাসলো। ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—

“খাওয়া-পরার খরচ দিচ্ছ বলে তুমি অনেক বড় উদ্ধার করছ ফারহান? কিন্তু তুমি যে আমার অনুমতি না নিয়ে পরকীয়া করলে, ঘর থাকতে বাইরে নতুন করে বিয়ে করলে সেটা কি অপরাধ না? আমার এই দুধের বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে একবারও কি তোমার মায়া হয়েছিল? তুমি আমাকে ঠকিয়েছ, আমার সংসার তছনছ করেছ। তোমার এই এত এত অন্যায়ের কী শাস্তি হবে, তার বিচার কি আখতার ভাই করবেন?”

ফারহান বেলীর এই সরাসরি আক্রমণে সে যেন কথা হারিয়ে ফেলল। ভিড়ের মধ্য থেকে দুই-একজন প্রবীণ নারী তখন ঠেস মেরে বলে উঠলেন,
“আরে বেলী, স্বামীর সংসার করতে গেলে কত কী সইতে হয়! কত মানুষের ঘরেই তো সতীন আছে। একটু সবুর করলে কি হইতো না? অহন ঝগড়াঝাঁটি কইরা কী লাভ?”

বেলী তপ্ত গলায় উত্তর দিল,

“না খালাম্মা, আমি আর সইতে পারব না। সওয়ার একটা সীমা থাকে। যে স্বামী নিজের স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, তার কাছে অন্ন নেওয়া মানে বিষ পান করা।”

ফারহানের পৌরুষে যেন বেলীর এই কথাগুলো চাবুকের মতো লাগল। সে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠল,

“এতই যখন তেজ তোর, তবে আমার সংসারে আছিস কেন? সইতে না পারলে যা এখান থেকে!
বআইচ্ছা! তোর তো অনেক দেমাগ! তবে শোন, তোর মতো অহংকারী মা°গিরে আমার দরকার নাই। যে স্বামীর কথা শোনে না। কয়ডা দিন ধইরা যা করতাছোস তুই আর সহ্য করতে পারব না! শোনেন সবাই। আজ এই মুহুর্তে সবাইকে সাক্ষী কইরা তোরে আমি আজই আজাদী দিয়া দিলাম। **এক তালাক… দুই তালাক… তিন তালাক! যা, আজ থেকে তুই আমার জন্য হারাম।”

পুরো বস্তিতে যেন একটা বজ্রপাত হলো। মুহূর্তেই চারদিক নিস্তব্ধ। আখতার রহমান তসবিহ ধরা হাতটা থামিয়ে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বেলী এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। তার দীর্ঘদিনের সংসার, তার ভালোবাসা, তার তিল তিল করে গড়া স্বামী নিয়ে গড়া স্বপ্নগুলো চোখের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চোখ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই আলগোছে মুছে নিল।

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-৮+৯

#বেলীফুলের_ইতিকথা (৮)
#মীরাতুল_নিহা

টিউশনিটা পেয়ে বেলীর মনে যে সামান্য আনন্দের আলো ফুটেছিল, বস্তিতে পা রাখতেই তা এক নিমিষেই নিভে গেল। বস্তির চারদিকের পরিবেশ আজ কেমন যেন থমথমে। আয়েশাদের ঘরের সামনে জটলা পাকিয়ে আছে বেশ কিছু মানুষ। বেলী দ্রুতপায়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, আয়েশার সৎ মা রাহেলা বেগম কোমরে হাত দিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিল চিৎকার করছেন। দাওয়ায় বসে আছে অপরিচিত তিন-চারজন লোক, যাদের চোখমুখের চাউনি মোটেও সুবিধার নয়। বেলী ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল রাহেলা বেগমের কর্কশ গলা—

“হারামজাদী! ঘরের দরজা খোল কইতাছি! মেহমানরা কতক্ষণ ধরে বইয়া আছে দেখতাছস না? আজ তোর বিয়ে ঠিক হবেই, তোর বাপে অচল হইছে দেইখা কি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবি?”

আয়েশা তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করে মেঝের ওপর কুঁকড়ে বসে আছে। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে রেখেছে। সে জানে, তার সৎ মা যে পাত্র ঠিক করেছে, সেই লোকটা বয়সে যেমন বড়, চরিত্রেও তেমনি জঘন্য। মদ্যপ আর দুশ্চরিত্র বলে এলাকায় লোকটার কুখ্যাতি আছে। রাহেল বেগম টাকার লোভে নিজের পালিত মেয়েকে এই নরকে ঠেলে দিতে চাইছেন। আয়েশা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে—আজ সে ঘর থেকে বের হবে না। আজীবন কপালে যদি কষ্ট থাকে, সই; কিন্তু জেনে শুনে সে এই আগুনে ঝাঁপ দেবে না।বেলী দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ডাকল,

“আয়েশা? আয়েশা দরজা খোল, আমি বেলী।”
ভেতর থেকে আয়েশার কাঁপাকাঁপা আওয়াজ ভেসে এল,

“বেলী উনারে চলে যেতে বল। আমি বিয়া করমু না। আমারে যদি মেরেও দেয়, তাও আমি এই ঘর থেকে বাইর হমু না।”

রাহেলা বেগম এবার বেলীর ওপর চড়াও হলেন।

“এই ছুঁড়ি! তুই কোত্থেকে আসলি নাক গলাতে? নিজের ঘর রক্ষা করতে পারে না আবার আরেকজনের ঘর নষ্ট করতে আইছে! সটান নিজের ঘরে যা কইতাছি!”
অপমানে বেলীর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেল। কিন্তু সে দমল না। আদনানও ততক্ষণে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। সে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,

“আপনারা এখান থেকে যান তো। জোর কইরা বিয়া করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, বুঝেন না?”

লোকগুলোর মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বেলীর দিকে এক কুৎসিত দৃষ্টি দিয়ে বলল,

“আইন আমাদের শিখাতে আইসো না খোকা। যার মেয়ে সে দিতাছে, তোমাদের কী?”

বেলী আয়েশার ঘরের জানালার কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“আয়েশা, দরজা খুলিস না। আমরা আছি। দেখি কে তোকে জোর করে!”

ওদিকে ফারহান তার ঘরের দাওয়ায় বসে তৃষ্ণার জন্য অপেক্ষা করছিল। আয়েশাদের ঘরের এই নাটক দেখে সে হাসল। বেলীর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,

“নিজের ঘর সামলাও বড় বউ। পরের ঘরের চিন্তা করতে গিয়ে আবার নিজের ঘর না হারায় ফেলো!”

বেলী ফারহানের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে বুঝল, এই বস্তির ঘিঞ্জি ঘরগুলো শুধু দারিদ্র্যে ভরা নয়, এখানে মানুষের মনগুলোও পচে নর্দমা হয়ে গেছে। ফারহান যেমন তাকে তিলে তিলে মারছে, রাহেলা বেগমও তেমনি আয়েশাকে শেষ করতে চাচ্ছেন।
হঠাৎ আয়েশার ঘরের ভেতরে একটা বড় কোনো শব্দ হলো। সবাই চমকে উঠল। আয়েশা কি তবে কোনো চরম পথ বেছে নিল? বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। সে চিৎকার করে আদনানকে ডাকল দরজা ভাঙার জন্য।
আদনান আর দেরি করল না। আয়েশার ঘরের ভেতরে ওই বিকট শব্দটা হওয়া মাত্রই সে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। বেলী চিৎকার করে ডাকছে,

“আয়েশা! আয়েশা কথা বল! কী হয়েছে তোর?

আয়েশার সৎ মা রাহেলা তখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করছেন,

“মরুক! মরে গেলেই আপদ চুকাবে। আপদ বিদেয় হইলে আমি অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারমু!”

মানুষের মনের ভেতরটা যে কতটা অন্ধকার হতে পারে, রাহেলাকে না দেখলে আজ বেলী বুঝতে পারত না। আদনানের তিন-চারটে জোরালো ধাক্কায় পুরোনো কাঠের নড়বড়ে দরজাটা কঁকিয়ে উঠে ভেঙে গেল। বেলী সবার আগে ভেতরে ঢুকল। দেখল, আয়েশা মেঝেতে পড়ে আছে, তার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। সে আসলে জানালার ভাঙা কাঠ দিয়ে নিজের কপালে আঘাত করেছিল—জীবন দেওয়ার জন্য নয়, বরং এই অনাচার ঠেকানোর এক চরম প্রতিবাদ হিসেবে। তার চোখদুটো তখনো খোলা, সেই চোখে আগুনের মতো তেজ। বেলী দ্রুত আয়েশাকে জড়িয়ে ধরল। আয়েশা বেলীর গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,

“আমি মইরা যামু কইছি দেখ সত্যি সত্যিই! আমি ওই বুড়ো জানোয়ারের কাছে যামু না বেলী, তুই আমারে মেরে ফেল তাও ভালো!”

বেলী আয়েশার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,

“কারো বাপের সাধ্য নাই তোকে নিয়ে যাওয়ার। আমি বেঁচে থাকতে তো অন্তত না।”

বাইরে থেকে সেই পাত্রপক্ষের লোকটা পানের পিক ফেলে ঘরে উঁকি দিল।

“কী গো রাহেলা বেগম? মেয়ে তো দেখি ঢং শুরু করছে। রক্ত দেইখা আমার আবার মাথা ঘোরে। বিয়া কি আজ হইবে না?”

আদনান এবার রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। সে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কলার চেপে ধরল।

“তোর মাথা ঘোরানি আমি আজ জন্মের মতো ঘুচায় দিমু। এখন যদি এই বস্তি থেকে না বের হস, তবে তোরে এই নর্দমায় পুঁতে ফেলব। পুলিশ আসুক, তারপর বুঝবি! এক্ষুনি কল করছি।”

পুলিশের নাম শুনে লোকগুলোর চেহারার রঙ বদলে গেল। তারা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, রাহেলাকে তোয়াক্কা না করেই চম্পট দিল। রাহেলা তখন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আদনানের দিকে তেড়ে এলেন,

“তোর এত বড় সাহস! আমার মেহমানদের তাড়িয়ে দিলি? এই মেয়ের খাওয়া বিয়া শাদীর খরচ কি তোর বাপ দিবে?”
আদনান ভয়ংকর গলায় বলল,

“খাওয়ার খরচ যে দিবে সে দিবে, কিন্তু আপনি যদি আয়েশার গায়ে আর হাত দেন—তবে মনে রাইখেন আপনার নামে আগে মামলা হবে।”

“যে দিব মানে কি? তুই দিবি? ক তুই দিবি?
আমি আজীবন এই মাইয়ার বোঝা নিয়ে ঘুরতে পারমু না। খুব তো পন্ডিতি কইরা পুলিশের ভয় দেহাইয়া বিয়া ভাঙলি, এখন কি তুই আমার আয়েশারে বিয়া করবি? বল, করবি বিয়া?”

“খালাম্মা, মুখ সামলে কথা কন। আয়েশারে ঘরে রাখতে হইব ওই চিন্তা না কইরা, মামলা হইলে আমনেরে জেলে থাকতে হইব, এটা মাথায় রাইখেন।”

​রাহেলা বেগম তবুও গজগজ করতে বললেন।

“আমার মাইয়ার বিয়া তুই ভাঙলি! এহন এই মাইয়ার দায়িত্ব তোরই নিতে হইব। আমি কিছু জানি না। তোরে বিয়া করতে হইব মানে তোরেই! সবাই কন কথা ঠিক কি-না?”

রাহেলার কথায় তাল মেলাতে লাগলো পুরো বস্তিবাসী। আদনান আশাহত দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে রইলো।

#চলবে

#বেলীফুলের_ইতিকথা (৯)
#মীরাতুল_নিহা

মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা বড় দায়। যারা একটু আগেও আয়েশার ওপর রাহেলার অবিচার দেখে টু শব্দ করেনি, তারাই এখন রাহেলার কথায় তাল মিলিয়ে আদনানের ওপর চড়াও হচ্ছে। আদনান থমকে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারদিকে রাহেলা বেগম এক বিষাক্ত জাল বুনে ফেলেছেন। রাহেলা চিৎকার করে পাড়া মাথায় করছেন,

“এই যে শোনেন সবাই এতই যখন দরদ আয়েশার লাইগা, তবে বিয়া কইরা ঘরে নিয়া যাক। পরপুরুষ হইয়া, আমার মাইয়ার বিয়া ভাঙবা আর আমাগো সমাজে বিচার হইব না, তা তো হয় না!”

ভিড়ের মাঝখান থেকে ফজু মিয়া ফোড়ন কাটল,

“কথা তো মিছা না আদনান! তুই তো এই বস্তির পোলা। ঘরের কথা ঘরে রাখতি, পুলিশ-টুলিশ ডাকার কথা কইয়া বিয়া ভাঙার কী দরকার ছিল? এহন রাহেলার মাইয়ার কুখ্যাতি ছড়াইয়া গেল, ওরে কে বিয়া করব? তুইই কর!”

আদনান একবার বেলীর দিকে তাকালো, তারপর সেই রক্তাক্ত আয়েশার দিকে। আয়েশা তখন বেলীর কোলে মাথা রেখে পাথর হয়ে আছে। অপমানে মেয়েটা যেন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আদনান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“চুপ করেন আপনারা!”

বেলী উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে আগুনের হলকা। সে ভিড় ঠেলে সামনে এসে বলল,

“লজ্জা আপনাদের হওয়া উচিত! আদনান আয়েশার জীবন বাঁচিয়েছে, আর আপনারা সেই সুযোগে ওরে জোর করে দায় চাপাতে চাচ্ছেন?”

ফারহান ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে বিশ্রী একটা হাসি দিল।

“আরে বউ, তুমি তো এখন অনেক বড় লেকচার দিচ্ছ! ডানা গজাইছে না? আদনানরে তো তুমিই উস্কানি দিছো। এখন আদনানরে বিয়া করতে দাও, তাইলে শান্তি ফিরব!”

আদনানের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে চিৎকার করে বলল,

“বন্ধ করেন এই তামাশা! আয়েশা আমার বোনের মতো। আমি তারে বিয়া করতে পারুম না!”

রাহেলা বেগম এবার মাটির ওপর বসে পড়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে শুরু করলেন,

“ওরে বাবা রে! আমার মান-ইজ্জত সব গেল রে! এখন এই মাইয়ারে কে খাওয়াইবো? কে বিয়া করব?”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আদনান টুপ রইলো। সে বুঝতে পারছে, এখানে যুক্তির চেয়ে গলার জোর আর কুসংস্কারের শক্তি বেশি।
রাহেলার কথায় যখন পুরো বস্তিবাসী তাল মেলাচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলেন আদনানের মা কুলসুম বেগম। নিজের ছেলের নামে এমন অপবাদ আর বিয়ের জবরদস্তি শুনে তিনি আর বসে থাকতে পারেননি। রাহেলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে তপ্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন—

“খবরদার রাহেলা! মুখ সামলে কথা ক। তোর ঢঙি মেয়ের দায় কেন আমার সোনার টুকরা ছেলে নিবে? আমার ছেলে রাজপুত্রের মতন, ভালো ছেলে। তোর ওই কপালপোড়া মেয়ের যোগ্য সে কোনোদিনও না! বিয়া তো দূরের কথা, আমার ছেলের ছায়াও যেন তোর মেয়ে না মাড়ায়।”

রাহেলা বেগমও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। তিনি পাল্টা তেড়ে এলেন,

“ক্যান নিবো না? তোর পোলা পন্ডিতি করতে আসছিল কেন? পুলিশের ভয় দেহাইয়া বিয়া ভাঙছে যখন, তখন এর দায়িত্ব তারেই নিতে হইবো। মেহমানরা তো বিদায় হইছে, এখন এই মাইয়ারে খাওয়াইবো কে? তোর পোলা বিয়া না করলে আমি এই মাইয়ারে আজই ঘাড় ধরে বস্তি থেকে বের করে দিমু! আমি পারতাম না ঝামেলা নিতে!”

দুই মায়ের এই জঘন্য ঝগড়া, আয়েশাকে নিয়ে টানাটানি দেখে বেলীর গা ঘিনঘিন করে উঠল। সে আয়েশার হাত ধরে ভিড়ের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। চোখে মুখে এক কঠিন সংকল্প। চিৎকার করে বলল—

“থামেন আপনারা! আয়েশা কি কোনো বাজারের পণ্য যে আপনারা তাকে নিয়ে এভাবে হাটে বসেছেন? রাহেলা খালাম্মা, আপনি বলছেন ওর দায়িত্ব কে নিবে? আমি বলছি—আয়েশার দায়িত্ব আয়েশা নিজে নিবে! কারো দয়া বা কারো বিয়ের কোনো দরকার নেই ওর।”
কুলসুম বেগম এবার বেলীর কথায় তাল মেলালেন। তিনি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,

“ঠিকই তো! বেলী তো ঠিক কথাই বলছে। আমার ছেলে কেন এই আপদ ঘাড়ে নিবে? ও নিজেরে যদি সামলাইতে পারে সামলাক, কিন্তু আমার পোলার সাথে জড়াইলে আমি কিন্তু ভালো হবো না কইলাম!”

রাহেলা বেগম বিদ্রূপের হাসি হাসলেন,

“নিজে তো বাপের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে বস্তিতে পচতাছোস, সতীন লইয়া সংসার করোস! তোর তো নিজেরই ঘরের ঠিক নাই আবার বড় বড় কথা!”

বেলী মাথা উঁচু করে বলল, “আমার দায়িত্ব আমি খুব দ্রুতই নিতে পারবো। আজ থেকে আয়েশাও আমার সাথে তৈরি হবে। ও যদি কাজ করতে পারে, তবে কারো কটু কথা ওকে সইতে হবে না। আদনান যা করেছেন তা উপকারের জন্য করেছেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে।”

আদনান কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে বেলীর দিকে তাকালো। এই মুহূর্তে বেলী পাশে না দাঁড়ালে হয়তো তাকে এক বড় বিপদে পড়তে হতো। রাহেলা বেগম গজগজ করতে করতে বললেন,

“আইচ্ছা দেখুমু কত বড় মাস্টারনি হইছোস তোরা! ঘরে চাউল না থাকলে তখন বুঝবি দায়িত্ব কারে কয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শখ ভাইঙ্গা যাইব তহন!”

বস্তিবাসী ধীরে ধীরে পাতলা হতে লাগল। কুলসুম বেগম আদনানকে এক প্রকার কান ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বেলী আয়েশাকে আগলে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে এল। আয়েশা তখনো থরথর করে কাঁপছে। বেলী তাকে আশ্বস্ত করে বলল,

“ভয় পাস না আয়েশা। আমরা প্রমাণ করে দেব যে একটা মেয়ে চাইলে একাই লড়তে পারে।”

ঘরে ঢুকে বেলী দেখল ফারহান আর তৃষ্ণা বিছানায় বসে মিটিমিটি হাসছে। তৃষ্ণা নখ কাটতে কাটতে বলল,

“বড় বউর তো তেজ অনেক! তা পোলাপান পড়ায় কয় টাকা কামাই করো যে নিজের সাথে আরেকটা মাইয়ার দায়িত্ব নিলা?”

বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, এই বিষাক্ত সাপেদের সাথে কথা বলা মানে নিজের সময় নষ্ট করা। তার দুচোখে তখন রাজ্যের ঘৃণা। আদনান তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ফারহানের কথা শুনে একটু বিরক্ত হলেও বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“বেলী ভাবী? আর একটা কথা বলার ছিল। আমার ছোট বোন মাহি তো এবার মাধ্যমিকে। ও অংকে আর ইংরেজিতে খুব কাঁচা। আপনি যদি ওকে একটু পড়াতেন, তবে আমাদের খুব উপকার হতো। অন্য কাউকে না খুঁজে আপনার মতো মানুষকেই আমি ভরসা করতে চাই।”

বেলী অবাক হয়ে আদনানের দিকে তাকালো। এই কঠিন সময়ে আদনান যেভাবে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে, তা যেন এক মরুভূমিতে পানির মতো। টিউশনির এই সুযোগ মানেই আরও কিছু আয়, যা দিয়ে সে নিজের ও ফিওনার ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে পারবে।বেলী কৃতজ্ঞতায় মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,

“তুমি আমার জন্য যা করছো আদনান, তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তুমি মাহির কথা চিন্তা করো না, আমি ওকে নিজের বোনের মতো করেই পড়াবো।”

আদনান মৃদু হেসে চলে গেল। বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের বিছানার এক কোণে বসল। ফারহান আর তৃষ্ণা তখনো ঘরে বসে ফিসফিস করছে, কিন্তু বেলী তাদের অস্তিত্বকে আজ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করল। তার মনে মনে তখন একটাই শপথ—লড়াইটা সে জিতবেই। মুক্তির পথটা সে নিজেই খোদাই করে নেবে।

**#চলবে.

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-৬+৭

#বেলীফুলের_ইতিকথা (৬)
#মীরাতুল_নিহা

রাত গভীর হচ্ছে। বস্তির ঘুপচি ঘরগুলোতে একে একে বাতি নিভে যাচ্ছে, কিন্তু বেলীর চোখের পাতা আজ এক মুহূর্তের জন্যও এক হলো না। সে চৌকির এক কোণে ফিওনাকে নিয়ে বসে আছে। ফিওনার ছোট ছোট হাত দুটো বারবার নিজের হাতের মুঠোয় নিচ্ছে বেলী। বাচ্চাটার কবজি দুটো আজ বড্ড বেশি খালি লাগছে। রুপার সেই মোটা চুড়ি দুটো কি সত্যিই হাত থেকে পড়ে গেল? না-কি ফারহান নিয়ে গেল?,
ফারহান এতটা নিচে নামতে পারবে না! নিজের মেয়ের গায়ের গয়না কি কেউ চুরি করে? পরক্ষণেই বেলীর মনে হলো, যে লোকটা একটা বাচ্চাকে ঘরে রেখে আরেকটা বিয়ে করে আনতে পারে, তার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বেলীর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ঘৃণা! এক তীব্র, জঘন্য ঘৃণা তার শিরায় শিরায় বইতে শুরু করল। এক সময় ফারহানের জন্য তার যে মায়া ছিল, যে টান ছিল আজ তা কর্পূরের মতো উবে গেছে। ফারহান আর তার নতুন বউ তৃষ্ণা সেই যে দুপুরে সেজেগুজে বেরিয়েছে, এখনো ফেরার নাম নেই। রাত এগারোটা বাজে। আগে হলে বেলী হয়তো দরজায় খিল না দিয়ে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত। কিন্তু আজ সে নিজেই দরজায় শক্ত করে খিল তুলে দিল। সে ফিওনাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে একবার ককিয়ে উঠল। বেলী আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।

ওদিকে শহরের এক সস্তা হোটেলের রুমে ফারহান আর তৃষ্ণা তখন নিজেদের মধ্যে বিভোর। তৃষ্ণার হাতে নতুন এক জোড়া সস্তার ইমিটেশন চুড়ি। ফারহান তৃপ্তির হাসি হাসছে। ফিওনার রুপার চুড়ি জোড়া বেঁচে ভালোই আমোদে আছে। ঠিক করেছে বউ নিয়ে এখানেই থাকবে আজকের রাত। তৃষ্ণার আদুরে আবদার মেটাতে আজ তার পকেটে টাকা আছে, মনে আছে ফুর্তি। ফারহান তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখলা তো তিশু? তোমার জন্য আমি কী না করতে পারি!”

তৃষ্ণা আদুরে গলায় বলল,
“তোমার বড় বউ যেই! চুড়ি নিয়া চিল্লাচিল্লি করলে?”

ফারহান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।

“আরে রাখো তোমার বড় বউ! ওরে আমি ডরাই না-কি? চুড়ি বেঁচছি তো কী হইছে? আমার মেয়ের চুড়ি আমি যা ইচ্ছা করুম!”

“এরকম সাহস যেন বউর সামনে গেলে থাকে। মনে রাইখো কিন্তু!”

ফারহান বিনিময়ে কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে প্রতি উত্তর করল,

“সাহস পরে দেইখো। এখন তো অন্য কিছু দেখার সময়।”

নতুন বউতে মগ্ন হয়ে গেল ফারহান। ভুলে গেল সে কাউকে ভালোবেসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বউ করেছে। ভুলে গেল তার নিষ্পাপ বাচ্চার কথা!

রাত দুটোর দিকে বেলী হঠাৎ দেখল জানালার বাইরে একটা ছায়া। সে চমকে উঠল। না, ছায়াটা সরে গেল। আয়েশাদের ঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা বেলীকে গ্রাস করল। এই একাকীত্ব তাকে দুর্বল করল না, বরং আরও পাথরের মতো শক্ত করে দিল।
ঘরটা যেন এখন একটা জ্যান্ত কবরের মতো খা খাঁ করছে। ফারহান সেই যে তৃষ্ণাকে নিয়ে বেরোল, আজ দুদিন পার হয়ে গেল—একবারও ছায়ার দেখা মিলল না। প্রথম দিন বেলী ভেবেছিল হয়তো রাগ করে কোথাও রাত কাটাচ্ছে, কিন্তু দ্বিতীয় দিন গড়িয়ে যখন রাত নামল, তখন বেলীর বুকের ভেতরটা ভয়ে নয়, বরং আসন্ন সংকটে কুঁকড়ে গেল। ঘরে এক দানা চাল নেই। উপায় না দেখে আজ সকালে বেলী ফিওনাকে পাতলা একটা কাঁথায় জড়িয়ে কোলে তুলে নিল। রোদে পোড়া তপ্ত দুপুরে সে বস্তির সেই দুর্গন্ধময় গলি থেকে বেরিয়ে শহরের পাকা রাস্তায় পা রাখল। এই শহরটা তার কাছে খুব বেশি অচেনা নয়। মাত্র এক দেড় ঘণ্টা দূরত্বেই তার বাপের বাড়ি। এই শহরেরই নামি এক কলেজে সে পড়ত। কত স্বপ্ন ছিল! কত রঙিন দিন ছিল! সেই কলেজের সামনে দিয়েই যাওয়ার সময় বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। ঠিক এই গেটটার সামনেই ফারহানের সাথে তার প্রথম দেখা। ফারহানের সেই মায়া লাগানো কথা, ভরসা দেওয়ার ভঙ্গি—সবই ছিল নিছক এক মরীচিকা। সেই মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়েই আজ সে রাস্তার ভিখারি।

বেলী হাঁটতে থাকল। তার চোখ রাস্তার ধারের দেয়ালগুলোতে। যদি কোথাও একটা ‘টিউশনি’ বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে! সে তো শিক্ষিত, অনার্স তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েছে। কিন্তু দেয়ালের বিজ্ঞাপনগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। কোথাও চটকদার বিজ্ঞাপনের ভিড়ে তার প্রয়োজনীয় কোনো খোঁজ নেই। ক্ষুধার্ত ফিওনা কোলের ভেতর নড়াচড়া করছে। রোদের তাপে বাচ্চাটার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে।
ঘণ্টা দুয়েক পাগলের মতো এ গলি ও গলি ঘুরেও যখন কোনো কূল-কিনারা পেল না, তখন শরীর আর সায় দিল না। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। হার মেনে সে আবার সেই বস্তির পথেই পা বাড়াল। নিজের হারানো দিনের স্মৃতিগুলো তাকে যেন আরও বেশি করে দংশন করছিল।
বস্তির মুখে আসতেই বেলীর চোখে পড়ল সেই কোঁকড়ানো চুল আর বলিষ্ঠ গঠনের অপরিচিত লোকটা। সে আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বেলীর ওপর পড়তেই বেলী অস্বস্তি বোধ করল। দ্রুত পায়ে সে নিজের ঘরের দরজায় এসে পৌঁছাল।
দরজা ঠেলতেই দেখল অবাক কাণ্ড! ঘরের ভেতর ফারহান বসে আছে। বিছানায় আয়েশ করে আধশোয়া হয়ে কিছু একটা চিবোচ্ছে সে। পাশে তৃষ্ণা নেই। বেলীকে দেখেই ফারহান বাঁকা হাসি দিল।

“ বাচ্চা কোলে নিয়ে কোথায় যাওয়া হয়েছিল? খুব তো তেজ দেখিয়েছিলে, এখন বুঝি ক্ষিদে পেয়েছে?”

বেলী কোনো কথা বলল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন খাটের কোণে রাখা একটা বাজারের ব্যাগের দিকে। ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে সব্জি আর কিছু চাল। ফারহান মুচকি হেসে বলল,

“ দুদিন ভালোই ফুর্তি করলাম তিশুরে নিয়ে। এই যে, তোমাদের জন্য কিছু সওদা নিয়ে আসলাম। এখন যাও, রাঁধো। আমার আবার ক্ষিদা লাগছে খুব!

বেলীর ইচ্ছা হলো ওই চালের ব্যাগটা ফারহানের মুখে ছুঁড়ে মারতে। কটা কটু কথা শোনাতে। কিন্তু ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে সে পাথর হয়ে গেল। নিজের আত্মসম্মান আর মাতৃত্বের লড়াইয়ে আজ যেন মাতৃত্বই তাকে নতজানু করে দিল। নিঃশব্দে ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল, পেছন থেকে ফারহানের পৈশাচিক হাসির শব্দ তার কানে তীরের মতো বিঁধতে লাগল।

রান্নাঘরের অন্ধকার কোণে চালের ব্যাগটা নিয়ে বেলী যখন অঝোরে নিশব্দে কাঁদছিল, ঠিক তখুনি বাইরের দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফারহান বিরক্তি নিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই সামনে আদনানকে দেখে ফারহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। আদনানের চোখেমুখে এক ধরণের অস্থিরতা। ফারহান রুক্ষ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,

“কী রে? অসময়ে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করস কেন?”

আদনান ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত বলল,

“বেলীকে চাই!”

ফারহানের রাগত দৃষ্টি এবার আরও চওড়া হলো। নিজের ঘরের দরজায় অন্য এক যুবক এসে তার বউকে ডাকছে, এটা তার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে সজোরে ধাক্কা দিল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“তোর সাহস তো কম না! আমার ঘরে আইসা আমার বউরে ডাকস? দরকার থাকলে আমারে ক!”

আদনান একটুও দমল না। সে পকেটে হাত দিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“দরকারটা ওনার সাথেই। আপনি ডাকবেন না-কি আমি ভেতরে আসব?”

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বেলী আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। তার লাল হওয়া চোখ দুটো লুকানোর চেষ্টা করে সে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে আদনান? এত চেঁচামেচি কিসের?”

ফারহান বেলীর দিকে ফিরে গর্জে উঠল,

“এই ছোকরা তোরে ডাকে কেন? কীসের এত দরকার তোদের?”

“তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না!”

ফারহান এবার আরো রেগে উঠল!

“কারে বলবি তাইলে? কয়টা বেডা মানুষ তোর?”

বেলী ফারহানের কথার উত্তর না দিয়ে আদনানের দিকে তাকাল। আদনান বেলীর মলিন মুখের দিকে তাকালো। সে ফারহানকে অগ্রাহ্য করে বেলীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনি টিউশনি খুঁজছিলেন না? আমাদের বস্তির পাশেই যে নতুন আবাসনটা হয়েছে, ওখানে একটা ফ্যামিলি টিচার খুঁজছে। ক্লাস সিক্সের মেয়ে। আমি কথা বলে এসেছি, ওরা আপনাকে কাল যেতে বলেছে।”

বেলীর বুকের ভেতর যেন এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া লাগল। এই অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আলোর রেখা! সে কিছু বলার আগেই ফারহান বাঁকা হেসে উঠল,

“টিউশনি? আমার বউ পরের বাড়ি গিয়া মাস্টারি করবে? লোকে হাসাবে না-কি?”

আদনান এবার ফারহানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“বউ বাচ্চা থাকা সত্বেও আপনি যখন বিয়া করে দিব্যি আছেন লোকজন কিছু বলে নাই তাইলে ভাবীরেও বলব না! ভাবী যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, তবে বাধা দেওয়ার অধিকার আপনার নেই।”

ফারহান কিছু একটা বলতে গিয়েও আদনানের চাহনি দেখে থেমে গেল। আদনান বেলীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“কাল সকাল দশটায় তৈরি থাইকেন। আমি এসে নিয়ে যাব।”

আদনান চলে যাওয়ার পর ফারহান রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় গিয়ে বসল। বেলী তখনো দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, পচা গন্ধের মাঝেও আজ একটু বেলী ফুলের সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। সে মনে মনে ঠিক করে নিল,কাল সে যাবেই। এই মুক্তি তাকে পেতেই হবে।

#চলবে

#বেলীফুলের_ইতিকথা(৭)
#মীরাতুল_নিহা

বেলী আর অপেক্ষা করলো না। সে ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
​“ফারহান, একটা কথা জিগ্যেস করব। সত্যি করে উত্তর দিবে?”

বেলীর কণ্ঠস্বর শান্ত হলেও চোখে রাগ স্পষ্ট। নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কী কথা? কিসের জেরা শুরু করলা?”

​“ফিওনার হাতের রুপার চুড়ি জোড়া কোথায়? কাল রাত থেকে দেখছি না। তুমি ওগুলো নিয়েছ?”

​ফারহান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা শক্ত করে ফেলল। হাতে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে সে কর্কশ গলায় বলল,

“কী বললা? আমি চুড়ি নিছি? নিজের মেয়ের গায়ের গয়না আমি চুরি করব? তোমার কি মাথা খারাপ হইছে বেলী?”

​“চুরি শব্দটা আমি বলিনি ফারহান। কিন্তু দুদিন ধরে তুমি ঘরে ছিলে না, চুড়িগুলোও নেই। এটা কি কাকতালীয়?”

​ফারহান এবার রাগে ফেটে পড়ার ভান করল।

“আরে রাখো তোমার কাকতালীয়! হয়তো কোথাও খুলে রাখছো আর হারায় ফেলছো। ঘরদোর ঠিকমতো গোছাও না, এখন আমারে দোষ দিচ্ছ? আমার নামে এমন অপবাদ দেওয়ার সাহস তুমি পাইলা কই?”

​বেলী একদৃষ্টিতে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিথ্যে বললে মানুষের চোখ কাঁপে, ফারহানের চোখও কাঁপছে। কিন্তু সে এতই নির্লজ্জ যে গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ করছে। বেলী বুঝতে পারল, ফারহান কোনোভাবেই এটা স্বীকার করবে না। তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, কেউ দেখেনি ফারহানকে চুড়ি খুলতে। বস্তির এই ঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই যে সে দেখিয়ে দেবে। ​বেলী এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে আর তর্কে গেল না। কারণ সে জানে, এই পাপিষ্ঠের সাথে তর্কের মানে হলো নিজের সম্মান হারানো। ফারহান পেছল হাসি দিয়ে বলল,

“চুপ হয়ে গেলা যে? প্রমান ছাড়া মানুষের নামে দোষ দিতে আসবা না। যাও, খাবার বানাও গে!”

রাত গভীর হয়েছে। বস্তির ঘুপচি ঘরে ভ্যাপসা গরম আর মশার উপদ্রব। বেলী চৌকির এক কোণে ফিওনাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না তার। মনের ভেতর কেবল অপমানের স্মৃতিগুলো কুণ্ডলী পাকাচ্ছে। হঠাৎ করেই এক জোড়া শক্ত হাত পেছন থেকে বেলীকে জড়িয়ে ধরল। পরিচিত সেই স্পর্শ, ফারহানের গায়ের সেই ঘামের মিশ্রিত গন্ধ। এক সময় এই মানুষটার বুকেই বেলী পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেত, কিন্তু আজ এই স্পর্শ তার কাছে বিষের মতো নীল ঠেকছে।
ফারহান বেলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বেলীর ঘাড় থেকে অবিন্যস্ত চুলগুলো সরাতে লাগল। তার স্পর্শে যেন অধিকার আর লালসা মিলেমিশে একাকার। বেলী কুঁকড়ে গেল। যখনই ফারহানের ঠোঁট তার ঘাড়ে স্পর্শ করতে চাইল, ঠিক তখনই বেলী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
বিছানা থেকে নেমে দূরে দাঁড়িয়ে বেলী তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“গায়ে হাত দিবা না ফারহান! একদম না।”

ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বসল। চোখে একরাশ বিরক্তি আর কামনার আগুন। সে গলা উঁচিয়ে বলল,

“কী শুরু করলো বেলী? স্বামী আদর সোহাগ করতে আসছে, আর তুমি না করছো? স্বামী হই আমি তোমার, মনে থাকে যেন!”

বেলী হাসল। সেই হাসিতে কোনো সুখ নেই, আছে বুকফাটা হাহাকার।

“কিসের স্বামী? স্বামী? বুঝো তো!”

ফারহান বুক উঁচিয়ে বল,

“ধর্ম অনুসারে তিন কবুল কইয়া তোমায় বিয়া করছি! তোমার স্বামী হইছি!”

বেলী তাচ্ছিল্য করে বলল,

“তিন কবুলের সাথে সাথে নিয়ম মতন বিয়ের সময় যে তিন লাখ টাকা মোহরানা ধার্য হয়েছিল, তার এক পয়সাও কি তুমি পরিশোধ করেছ? ধর্মের নিয়ম অনুসারে তুমি আমার মোহরানা দাওনি, ধর্মের কথা বলে, স্বামী বলে, কিসের স্বামীর বাহানায় আমার শরীর ছুঁতে আসো?”

ফারহান তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল।

“আরে রাখো তোমার মোহরানা! তিন লাখ টাকা কি চাট্টিখানি কথা? মুখের কথা বললেই হয়ে গেল? আর শোনো, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী একটু আপস করে নিলেই মোহরানা মাফ হয়ে যায়। মাফ করে দিলেই তো হয়! তুমি তো তাই করেছো। আজ আবার নাটক শুরু হয়েছে!”

বেলী এবার গর্জে উঠল।

“তখন হয়তো ভালোবেসে মাফ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আর করব না। আমার মোহরানা পরিশোধ করো, তারপর অধিকার খাটানোর কথা ভেবো।”

“টাকা পরিশোধ করতে হইলে আর তোরে দিয়ে কি করব? এসব বাদ দিয়া সংসারে মন দে তো।”

“আসলে তোমার মতো অমানুষের সাথে সংসার করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। তুমি শুধরাবার নও, ফারহান। তুমি একটা জানোয়ার! স্বামী হওয়ার যোগ্য না, আর বাচ্চার বাবা হওয়া তো আরো দূরের থাক!”

ফারহান এবার রাগে বিছানায় থাপ্পড় মারল।

“অমানুষ! জানোয়ার! এই জন্যই তো আরেকটা বিয়া করছি। তোর এইসব কথা আর ভালো লাগে না। শান্তি নাই তোর কাছে!”

বেলীর মনে হঠাৎ একটা খটকা লাগল। সে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল,

“তা তোমার সেই নতুন আদরের বউ কই? তোমায় শান্তিতে রাখবে?”

ফারহান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গজগজ করে বলল,

“তোরে কি কওন লাগব?”

“সে নেই, তার শরীর নেই! সেজন্যই বুঝি আমার শরীরের কথা মনে পড়েছে?”

“সে তার এক বান্ধবীর সাথে ঘুরতে গেছে। আসবনে।”

বেলী এবার মুখ ভেঙিয়ে বাঁকা হেসে উঠল।

“বান্ধবী? না-কি বন্ধু? একটু পরখ করে দেখো ফারহান। যে মেয়ে জেনেও অন্যের স্বামীকে নিয়ে টানাটানি করে, তাদের এক পুরুষে পেট ভরে না। আজ বন্ধুর সাথে গেছে, কাল কার সাথে যাবে তার ঠিক নেই।”

ফারহান কোনো কথা বলতে পারল না। বেলীর প্রতিটি কথা তীরের মতো তার গায়ে বিঁধছে। সে অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বালিশে মাথা গুঁজল। বেলী আর সেই ঘরে থাকল না। ফিওনাকে কোলে নিয়ে সে দাওয়ায় গিয়ে বসল। আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, রাতের এই অন্ধকারটা হয়তো কাটবে, কিন্তু ফারহানের সাথে তার সম্পর্কের যে চিরস্থায়ী অন্ধকার শুরু হয়েছে, তা আর কোনোদিনও কাটবে না
সকাল দশটা বাজতে তখনো দশ মিনিট বাকি। বেলী তার পুরোনো পরিষ্কার একটি সুতি শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নিল। ফিওনাকে একা রেখে যাওয়ার সাহস বেলীর নেই, আর ফারহানের হাতে মেয়েকে দিয়ে যাওয়া মানেই যমদূতের হাতে কলিজা সঁপে দেওয়া। তাই অগত্যা ফিওনাকে কোলে নিয়েই সে আদনানের সাথে বেরিয়ে পড়ল।বস্তির সেই কাদা-জল মাড়ানো পথ পেরিয়ে তারা যখন শহরের অভিজাত আবাসনটির সামনে এসে দাঁড়াল, বেলীর বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট, ঝকঝকে রাস্তা—সবই যেন বেলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সে এখন এক অন্য জগতের মানুষ। লিফটে উঠে চারতলার একটি ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে আদনান বেল টিপল।
দরজা খুললেন এক পরিপাটি ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কোঠায়, চোখেমুখে আভিজাত্যের কড়া ছাপ। বেলীর কোলে পাঁচ মাসের বাচ্চাকে দেখেই ভদ্রমহিলার কপাল কুঁচকে গেল। তিনি আদনানের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া সুরেই বললেন,

“আদনান, এ কী! তুমি তো বলেছিলে মেয়েটা পড়াতে পারবে। কিন্তু এই দুধের বাচ্চা কোলে নিয়ে সে পড়াবে কীভাবে? আমার মেয়ের পড়ার ব্যাঘাত হবে না?”

বেলীর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,

“খালাম্মা, বিশ্বাস করেন ও একদম ডিস্টার্ব করবে না। ও খুব শান্ত। আমি সব সামলে নেব।”

ভদ্রমহিলা যেন আশ্বস্ত হতে পারলেন না। তিনি মাথা নেড়ে বললেন

, “না বাপু, রাইসা এবার ক্লাস সিক্সর। ওর মনোযোগ নষ্ট হলে ক্ষতি আমার। বাচ্চার কান্না আর পড়া—একসাথে চলে না।”

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আদনান এবার একটু এগিয়ে এল। গলার স্বর কিছুটা নরম করে সে বলল,

“ বিশ্বাস করেন বেলী অনেক মেধাবী। ওনার কপালটা খারাপ। ওনার স্বামী এখন আরেকটা বিয়া করে উনার জীবনটা জঘন্য করে তুলেছে। এখন এই বাচ্চা নিয়ে ওনার কাজটা খুব দরকার। একটু দয়া করেন।”

আদনানের মুখে বেলীর জীবনের এই করুণ কাহিনী শুনে মহিলার চোখে কিছুটা মায়া খেলে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেলীর দিকে তাকালেন। তারপর একটু ভেবে বললেন,

“দেখো বাপু, করুণা করে তো আর পড়াশোনা হয় না। সামনের মাসেই রাইসার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। যদি তোমার পড়ানোর পর ওর রেজাল্ট ভালো হয়, তবেই আমি তোমাকে স্থায়ী করব। রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু আর আসতে পারবে না। পারবে তো?”

বেলীর চোখে তখন আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক। সে শক্ত গলায় বলল,

“পারব । আপনি শুধু একবার সুযোগ দিয়ে দেখেন।”

রাইসা নামের মেয়েটি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। বেলী ফিওনাকে নিজের কোলের একপাশে রেখে রাইসাকে পড়াতে শুরু করল। ইংরেজী গ্রামার আর অংকের সূত্রগুলো বেলী যখন সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তখন রাইসার চোখেমুখেও এক ধরণের স্বস্তি দেখা গেল। পড়াতে পড়াতে বেলী একবার আড়চোখে ড্রয়িংরুমের কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকাল। বাইরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখা যাচ্ছে। ফিওনা তখন বেলীর কোল থেকে ড্যাবড্যাব করে রাইসার বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সেও বুঝতে পারছে তার মায়ের এই কঠোর সংগ্রামের কথা। পড়াশোনা শেষে বেরোনোর সময় ভদ্রমহিলা বেলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কাল ঠিক সময়ে এসো। দেখি রাইসার উন্নতি কতটুকু হয়।”

ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে লিফটে উঠতেই বেলী এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল। আদনান পাশ থেকে বলল,

“বলছিলাম না, চেষ্টা করলে সব সম্ভব। আপনি শুধু হাল ছাড়বেন না। আমি আছি আপনার পাশে।”

বেলী রিকশায় বসে আদনানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-৪+৫

#বেলীফুলের_ইতিকথা (৪)
#মীরাতুল_নিহা

বেলী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী প্রতিবেশীদের শান্ত করে দিয়ে যখন বস্তির সরু গলিপথে পা রাখল, রাত তখন তার সমস্ত রহস্য আর নৈঃশব্দ্য নিয়ে নেমে এসেছে। আকাশ জুড়ে কালচে মেঘের ভেলা, যার ফাঁকে দু-একটি তারা টিমটিম করে জ্বলছে। এখানকার রাত তার নিজস্ব এক ছন্দ নিয়ে আসে। চারিদিকে টিনের চাল আর কাঁচা দেয়ালের ঘরগুলো একে অপরের গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। আবর্জনার স্তূপের পাশ দিয়ে সে হেঁটে চলল। রাতের এই প্রহরে বস্তির জীবন অন্যরকম। কোথাও হ্যারিকেনের হলদেটে আলোয় কোনো খাবারের দোকান সবেমাত্র বন্ধ হচ্ছে, তো কোথাও চলছে চাপা হাসির শব্দ। একটু দূরে, বেলী থমকে দাঁড়াল। সিমেন্টের একটি গোড়ায় হেলান দিয়ে মদ খেয়ে মাতাল হওয়া এক লোক অর্ধ-শুয়ে আছে। তার পরনের মলিন শার্টে সম্ভবত বমির দাগ, মুখ থেকে আসছে তীব্র মদের গন্ধ। লোকটির চোখে কোনো পলক নেই, সে যেন জীবনের সমস্ত ভার নেশার উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে পড়ে আছে। এই দৃশ্য বস্তির রাতের এক চিরন্তন অংশ। বেলী এসব দেখল, কিন্তু তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই। বেলী নিঃশব্দে এগিয়ে চলল আয়েশার ঘরের দিকে। দরজায় মৃদু টোকা দিতেই আয়েশা দরজা খুলল। বেলীকে দেখে সে কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু নীরবে তাকে এবং তার শিশুকন্যাকে ভেতরে টেনে নিল। উষ্ণ, মানবিক আশ্রয়ে সেদিন রাতের বাকিটা সময় বেলী এক গভীর, শীতল শান্তি খুঁজে পেল।
পরের দিন সকাল হতেই আয়েশা তার স্বভাবসুলভ আন্তরিকতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে জোর করে বেলীকে নাস্তা খাওয়াল। বেলী মেয়েকে কোলে নিয়ে, নাস্তা সেরে ঘরের দিকে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলো। তার মনে এখন এক নতুন দৃঢ়তা। ঠিক যখন সে আয়েশার ঘর থেকে বেরিয়ে সরু গলি পেরিয়ে একটু খোলা রাস্তায় এসে পৌঁছেছে, তখনই তার চোখ পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিচিত চেহারার উপর।রাস্তায় আদনানের সাথে তার দেখা হলো। আদনান বেলীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, প্রথমে তার কোল থেকে ফিওনাকে আলতো করে কোলে তুলে নিল।
ফিওনাকে আদর করতে করতে তার গালে একটি চুমু দিল আদনান। ফিওনাও যেন এই অচেনা পুরুষের স্নেহে শান্ত হয়ে তার কাঁধে মাথা রাখল।

“হয়েছে হয়েছে! এত আদর করতে হবে না! দাও দেখি। ঘরে যাব, দেরী হয়ে যাচ্ছে!”

“ওই ঘর আদৌ আপনার আছে তো!”

আদনানের কথা শুনে বেলীর মুখটা বিষন্নতায় গ্রাস করলেও পরক্ষণেই মনে পড়ল, আদনানের বলা কথাগুলো সত্যি! একদম তিক্ত সত্যি যাকে বলে। মুখে মুঁচকি হাঁসি রেখেই বলল,

“ঘর, বর সবই অনেক আগে গেছে ভাই। এখন থাকার জন্য শুধু একটু জায়গা আছে বলতে পারো!”

প্রসঙ্গ এড়ানো নাকি রাগ কোনোটাই পুরোপুরি প্রকাশ না করে আদনান ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আমি কোন দিক দিয়ে আপনার ভাই লাগি?”

“কেন? তুমি তো আমার ছোটো বয়সে। আমার ছোটো ভাইয়েরই মতন।”

“উহু! ছোটো ভাইয়ের মতন আর ছোটো ভাই আলাদা বুঝছেন?”

বেলী সন্দিহান দৃষ্টিতে আদনানের পানে তাকিয়ে শুধোয়,

“কি বুঝব?”

বেলীর দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে আদনান দৃষ্টি নত করে ফেলল তৎক্ষনাৎ! মাথা নুইয়েই প্রতি উত্তর করল,

“আপনার মতন রাগী মেয়ে মানুষের ভাই হবার দরকার নেই বাপু।”

বেলী এবার হেঁসে ফেলল। আদনান ছেলেটার সামনে সে সবসময়ই বলা যায় রাগ টাগ দেখিয়ে রাখে। এটা কেনো, সে নিজেও জানে না। তবে ছেলেটা কথা বলতে শুরু করলে থামে না আর! বাঁচাল যাকে বলে বেলীর কাছে! হয়ত সেজন্যই।

“বেশ বেশ! তা পড়াশোনা কীরকম চলছে?”

“পড়াশোনা চলছে পড়াশোনার মতন। আমি চলছি আমার মতন!”

“কেন, আর পড়বে না?”

আদনান মাথায় হাত দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে মৃদুস্বরে বলল,

“বোধহয় না!”

বেলীর তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন,

“কেন?”

“মন বসছে না আর!”

“পড়াশোনা না করলে কি করবে ভবিষ্যতে?”

“বিয়ে!”

আদনানের চটপট উত্তর শুনে বেলী ফের ভ্রু কুঁচকাল! এই বুঝি শুরু হলো, তার বিরক্তির পালা!

“কোনো মেয়েই আসবে না, এভাবে চললে!”

আদনানের মুখটা কিছুটা চুপসে যাওয়ার মতন হয়। বেলী ফের বলে,

“তাহলে কিভাবে চলব?”

“পড়াশোনা করবে মানুষের মতন মানুষ হবে! ভালো চাকরি বাকরি করবে। সুন্দর মতন জীবন যাপন করবে।”

আদনান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“হুম বুঝলাম!”

“বুঝলে যাও বাড়ি যাও!”

ফিওনাকে আদর করার পর আদনান সরাসরি বেলীর দিকে তাকাল। তার পকেট থেকে ভাঁজ করা একটি এক হাজার টাকার নোট ফিওনার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। ফিওনার ছোট্ট হাতজোড় দিয়ে টাকাটা আঁকড়ে ধরল।

বেলী প্রথমে দ্রুত মাথা নেড়ে মানা করল,

“না।”

“রাখেন তো, এখন তর্ক কইরেন না।”

বেলী ইতস্তত করতে লাগল। তার আত্মসম্মান তাকে বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু মুহূর্তেই তার বর্তমানের নিদারুণ আর্থিক সঙ্কটের কথা মনে পড়ল। সে তিক্ত হাসি হেসে ভাবল, এক হাজার কেন, এই মুহূর্তে এক টাকাও তার জন্য অনেক! বেলীর চোখে কৃতজ্ঞতা থাকলেও, মুখে ছিল না কোনো শব্দ।
আদনান শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“সাবধানে থাকবেন। কিছু লাগলে আমাকে বলবেন। আমি সবসময়ই আছি।”

এরপর আদনাণ ফিওনাকে আবার বেলীর কোলে ফিরিয়ে দিয়ে, আর কোনো কথা না বলে, দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। বেলা তখন গড়িয়ে চলেছে, নরম রোদ বস্তির টিনের চালে প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। আদনান চলে যাওয়ার পর বেলী ধীর পায়ে ফিরছিল তার ঘরের দিকে।
ঠিক সেই সময়, বস্তির ভেতরের দিকে একটু নিরাপদ আবাসনের মোড়, যেখানে ঘন ঝোপঝাড় একটি ভাঙা টিউবওয়েল দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এসে দাঁড়ালো এক অচেনা পুরুষ। তার গঠন ছিল বলিষ্ঠ—চওড়া কাঁধ, গায়ের রঙ ছিল কালো, মাথাভর্তি কোকড়ানো, ঝাঁকড়া চুল যা তার ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখে এক ধরণের চিন্তার রেখা ফুটে ছিল। দেখলেই বোঝা যায়, সে হয়তো দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে, আর তার মনে কোনো গভীর অনুসন্ধান চলছে। পুরুষটি আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। সে কয়েকটি দরজায় কড়া নাড়ল, কিছু জানতে চাইল কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। বেলীর মতন কেউ কেউ কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারল না। এক ঘর থেকে আরেক ঘর, এক গলি থেকে আরেক গলি—পুরুষটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেই ঘন জনবসতির মধ্যে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটির খোঁজ করল। কিন্তু প্রতিটি দরজা থেকেই ফিরে এল নিরাশ হয়ে। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল।
একসময়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বুঝতে পারল, তার অনুসন্ধান এখানে ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো ভুল ঠিকানায় এসেছে। আশাহত হয়ে সেই বলিষ্ঠ, কোঁকড়ানো চুলের পুরুষটি শেষমেশ নিরাপদ আবাসনের সেই মোড় থেকে ধীর পায়ে ফিরে চলল, বস্তির কোলাহল ভেদ করে সে মিশে গেল দূরের পথের ভিড়ে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ফারহানকে এক নোংরা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। গত রাতে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের কারণে ঘরে তখনো তীব্র দুর্গন্ধ। নিরুপায় হয়ে ফারহান নিজেই কোমর বেঁধে লেগে পড়ল। সে ঘরের মেঝেতে ছড়ানো সেই অসহনীয় তরল পদার্থ পরিষ্কার করল, ফ্লোর মুছল, এবং যতটা সম্ভব গন্ধ দূর করার চেষ্টা করল। পাশে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা তখন নিজের শাড়ির আঁচল বা ওড়না দিয়ে নাক টিপে রেখেছিল। তার চোখে ছিল চরম বিতৃষ্ণা এবং ফারহানের প্রতি নীরব অভিযোগ। তাদের দু’জনের মধ্যে তখন কোনো কথা হচ্ছিল না—পরিষ্কার করার এই কাজটি যেন তাদের মধ্যে এক কঠিন নীরবতা তৈরি করেছিল।
ঘরদোর কোনোমতে পরিষ্কার হতেই, বেলী দরজায় এসে দাঁড়াল। সে তার মেয়েকে কোলে নিয়েই ভেতরে পা রাখল। বেলীকে দেখামাত্র ফারহানের জমা হয়ে থাকা সমস্ত রাগ, অপমান আর রাতের বঞ্চনা যেন একযোগে ফেটে পড়ল। তার চোখ লাল হয়ে গেল, শিরা ফুলে উঠল।

“তুই… তুই এত সাহস কিভাবে পেলি! আমাকে আঁটকে রাখা!”

ফারহান বিন্দুমাত্র দেরি না করে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ফারহান বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে তার মাথার চুলের মুঠি সজোরে চেপে ধরল। তীব্র, অপ্রত্যাশিত ব্যথায় বেলীর মুখ থেকে এক ঝলক “আহ্!” শব্দ বেরিয়ে এল। তার কোলের শিশুটিও মায়ের এই আকস্মিক যন্ত্রণা আর উত্তেজনায় ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল। ফারহান তখন বেলীর চুল ধরে তাকে নির্মমভাবে ঝাঁকাতে শুরু করেছে, বেলী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে!
পরের মুহূর্তেই, বেলী ফারহানের দেহের নিচের অংশ লক্ষ্য করে, বিশেষ করে তার দু’রানের মাঝখান বরাবর, সজোরে তার পা দিয়ে আঘাত করল।
এই অপ্রত্যাশিত এবং মারাত্মক আঘাতটি ফারহানের সমস্ত শক্তি মুহূর্তে কেড়ে নিল। তার হাত থেকে বেলীর চুল ছাড়িয়ে গেল। ফারহান যন্ত্রণায় একটা বিকট, প্রায় দম আটকানো চিৎকার করে উঠল—যে চিৎকারটি গত রাতের ক্রোধ বা ক্ষোভের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। তার বলিষ্ঠ দেহটি সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল, দু’হাতে আঘাতের স্থান চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল।
ফারহানের এই অসহায় পতন দেখে বেলীর মুখের ভাব পরিবর্তন হলো না। সে ধীরে ধীরে তার মেয়ের কান্না থামাতে থামাতে ফারহানের ঠিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো ভয় নেই, আছে কেবল কঠিন সতর্কতা।কণ্ঠে এক তীক্ষ্ণ, শীতল ধার নিয়ে বেলী বলল,

“শোনো। আমার গায়ে ভুলেও যেন আর কখনও হাত না উঠে। আমার গায়ে একটা আঁচড়ও যদি পড়েছে, তাহলে এর পরে পুলিশের স্পর্শ কোথায় কোথায় পড়বে তোমার তুমি বুঝবেও না! এটা তোমার শেষ সতর্কবার্তা। মনে থাকে যেন।”

বেলী তার কোলে থাকা মেয়ের পিঠে আলতো করে চাপড় দিতে দিতে তাকে নিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, ফারহান তখনো যন্ত্রণায় মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। তৃষ্ণা ফারহানের কাছে গিয়ে শুধাল,

“খুব বেশী লেগেছে?”

ফারহান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

“খুব মানে! উঠে দাঁড়াতে অব্দি পারছি না। মনে হচ্ছে আমার জান প্রাণ, শক্তি, সব গেলোগা রে…!”

ফারহানের কথা শুনে শাহনাজ আৎকে উঠে বলল,

“তাইলে তো আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হইয়া গেল! এবার, আলোকিত হইব কেমনে?”

#চলবে?

#বেলীফুলের_ইতিকথা (৫)
#মীরাতুল_নিহা

সকাল সকাল একটি ঘর থেকে তীব্র আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটি কুলসুম বেগমের। বস্তির পরিচিত এক রাগী মুখ। চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এল থালাবাসন ছুঁড়ে মারার ভয়ঙ্কর শব্দ। স্টীলের বাসনের ঝনঝন আওয়াজ এত তীব্র যে, মনে হলো ঘরটাই বুঝি কেঁপে উঠবে। ধাতব বস্তুর সেই তীব্র আঘাত আর পতনের শব্দে কুলসুম বেগমের ক্রোধের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে উঠল। বস্তির সেই সরু, স্যাঁতসেঁতে গলি ধরে সবেমাত্র একটি কালো বিড়াল পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। বাসনের সেই আকস্মিক ঝনঝন আওয়াজ শুনে বিড়ালটি ভয়ে যেন কেঁপে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার চলার গতি পরিবর্তন করে, দ্রুত পায়ে পাশের একটি টিনের ঘরের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল।

কুলসুম বেগমের ঘর থেকে থালাবাসন ছোঁড়ার আওয়াজ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই আদনান বস্তির সেই গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আদনানের মনে তখনো ফারহানের ঘরে ঘটে যাওয়া ঘটনার রেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। সে সবেমাত্র ঘরের দরজার কাছাকাছি পৌঁছেছে, ঠিক তখনই ঝনঝন শব্দে একটি ষ্টীলের প্লেট এসে পড়ল তার পায়ের ঠিক কাছে। সৌভাগ্যবশত, প্লেটটি তাকে আঘাত করেনি।
বিরক্তি এবং কিছুটা রাগ নিয়েই আদনান উপরে তাকাতেই দেখল, তার মা কুলসুম বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কুলসুম বেগম এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে, আদনানকে দেখে যেন কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,

“আরে! দেখতে পাই নাই রে।”

প্লেটটা যে অসতর্কতাবশত পড়েনি, বরং ইচ্ছে করেই ছুঁড়ে মারা হয়েছে, তা বুঝতে আদনানের বাকি ছিল না। সে কিছুটা রেগেই বলল,

“মা, মনে তো হইতাছে ইচ্ছে করেই করছো! সকাল সকাল এগুলা কি?”

কুলসুম বেগম সঙ্গে সঙ্গে তেলেবেতালে হলেন। তাঁর কণ্ঠে হতাশা আর রাগ মিশে ছিল,

“আজ অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিছে? তোর আদরের ছোটো বোন ফেল করছে! এত কষ্ট কইরা পড়াইতাছি, রাতদিন পরিশ্রম করতাছি, আর সে ফেল করে বইয়া রইছে?”

ভেতরে দরজার এক কোনে ভয়ে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস তার ক্ষুদ্র মনের ভেতর নেই। চুপিচুপি কেবল মনোযোগ সহকারে মা আর ভাইয়ের কথোপকথন শুনতে লাগল।

“আম্মা, ফেল করছে তো কি হইছে?”

“পড়ালেখা করাইতাছি আর তুই কস ফেল করছে তো কি হইছে?”

আদনান একটু এগিয়ে গিয়ে মা’কে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল,

“কিছুই হইব না! ভালো মতন পড়লে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালোভাবে উর্ত্তীন হইতে পারবো।”

কুলসুম বেগম ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“কি হইব?”

“উর্ত্তীন! মানে পাশ করতে পারবো বলছি। মাহিকে ভালোভাবে পড়ালেই হইব।”

কথা বলতে বলতে এক পর্যায় মুখ থেকে পানের পিক ফেলে ভদ্রমহিলা ফের বলল,

“মানে প্রাইভেট পড়ানোর কথা কইতাছস?”

“হ, আম্মা। নাইনের পড়া কঠিন আছে কিন্তু।”

“এটারে আর লেখাপড়া করাইয়া লাভ কী? বিয়া-দিয়া দিয়া বিদায় করুম!”

কুলসুম বেগমের যুক্তি দেখে আদনান ভ্যাবাচ্যাকা খেল। সে হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ওর এখনো বিয়ের বয়স হয় নাই আম্মা। মাহি ছোটো এখনো।”

“তুই থাম তো! তোর বাপে মাইয়ার পিছে বেশি টেকা খরচ করব? হেয় তো সংসারেই টেকা দেয় না! এসব ছাড়। ভালা পোলা দেখ। বয়স কম আছে, ভালা ভালা পোলারা আইব!”

“আম্মা! আমি পড়াব আমার বোনকে। আমি টাকা দিব। হইছে এবার?”

কুলসুম বেগম তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না। ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে শুধালো,

“তুই দিবি? তুই অবশ্য পড়ালেখায় ভালা আছিলি! বিয়ে পাশ করতে পারতি।”

আদনান বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ বোধক শব্দ উচ্চারণ করে প্রতি উত্তর দিলো,

“এতকিছু তোমার ভাবতে হইব না। তুমি মাহির পড়ালেখার দায়িত্ব আমার উপর ছাইড়া দাও! আর মাথা থেকে ওর বিয়ার ভূত নামাও।”

কুলসুম নিশ্চুপ। আদনান ফের শুধাল,

“এবার বলো, মাহির ফেলের সাথে বাসন ফেলার সম্পর্ক কী? বাসনগুলো কেন ভাঙছো?”

কুলসুম বেগম নাক সিঁটকিয়ে বললেন,

“ঐ হতচ্ছাড়িরে সকালে থালাবাসন মাজতে দিছিলাম। সবগুলিতে বালু লেগে রইছে। ভালোভাবে মাজে নাই! এমন নোংরা বাসন কি মুখে দেওয়া যায়? তাই রাগ করে আছাড় মাইরা ফেলে দিছি!”

আদনান তার মায়ের এমন কাণ্ড দেখে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই বস্তি এবং তার চারপাশের জীবন যেন সবসময়ই এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। মাঝেমধ্যে তার ইচ্ছে হয় এখান থেকে সে উড়াল দিবে পাখির মতন। একটা সুস্থ সুন্দর পরিবেশে ভালোভাবে জীবনযাপন করবে।
~~~~~~~~~

ফারহান আর তৃষ্ণার বিয়ের প্রায় পাঁচদিন পেরিয়ে গেছে। অথচ এই অল্প সময়েই তৃষ্ণা হাঁপিয়ে উঠেছে। আজ সকালে ঘর পরিষ্কারের পরেও তার মেজাজ ভালো হয়নি। সে ফারহানের দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল,

“পাঁচটা দিন হয় বিয়ে হইলো, অথচ তোমার লগে আমার পাঁচ মিনিটও শান্তি করে কাটানো হইলো না! এমন ঘরবন্দী হয়ে থাকলে চলে? চলো, আজ ঘুরতে যাই?”
তৃষ্ণার আবদার স্বাভাবিক হলেও, ফারহানের মাথার শিরায় যেন বিদ্যুতের মতো চমক খেল। তার পকেটে তখন খাঁ খাঁ শূন্যতা। সব মিলিয়ে সে তখন দিশাহারা। নতুন বউয়ের এই আবদার সে কীভাবে পূরণ করবে? কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে সে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎ করেই তার চোখ গেল বিছানার দিকে। সেখানে ফিওনা, বেলীর পাঁচ মাস বয়সী নিষ্পাপ বাচ্চাটি শুয়ে শুয়ে একা একা খেলা করছে। শিশুটি তার ছোট ছোট পা দুটো তুলে তুলে বাতাসে লাথি দিচ্ছে, আর মুখ দিয়ে অনবরত ‘ববব’ জাতীয় শব্দ করে আপন মনে হাসছে। এই দৃশ্য মুহূর্তের জন্য ফারহানের মনকে আর্দ্র করে তুলল।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফিওনাকে কোলে তুলে নিল। ফারহানের দিকে তাকিয়ে ফিওনা তার ফিরতি একগাল হাসি উপহার দিল, যে হাসি দেখলে পাষাণ হৃদয়েও স্নেহ জাগে। ফারহানও যেন নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। কিন্তু তার সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হুট করেই তার নজর পড়ল ফিওনার দু’হাতে। শিশুটির হাতে শোভা পাচ্ছে রূপার মোটা দুটি চুড়ি। মুহূর্তেই ফারহানের মনে পড়ল এই চুড়িগুলোর পেছনের কাহিনি। বেলীর খুব শখ ছিল মেয়েকে রূপার চুড়ি পরানোর। ফারহানের কাছে চেয়েও না পেয়ে, সে তার নিজের শখের রূপার নুপুরগুলো ভেঙে এই চুড়িগুলো বানিয়েছিল। চুড়িগুলো বেশ মোটাসোটা, চোখ বন্ধ করে অনুমান করা যায়, দু’ভরি তো হবেই! টাকার চিন্তা, তৃষ্ণার আবদার এবং এই অলংকার—সবকিছু মিলেমিশে ফারহানের মস্তিষ্কে এক দ্রুত সিদ্ধান্ত তৈরি হলো। ফিওনার নিষ্পাপ মুখ থেকে চোখ সরিয়ে সে দ্রুত হাতে, প্রায় অনুভূতিহীনভাবে, শিশুটির হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে নিল। এরপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, ফারহান ফিওনাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, চুড়িগুলো পকেটে পুরে নিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণাকে ইশারা করতেই, সেও চলল। ফারহান তার মুখে এক ধরনের বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তৃষ্ঞাকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। পেছনের বিছানায় ফিওনা তখনও পা তুলে তুলে খেলার চেষ্টা করছে। বাইরের উঠোনে বেলী তখন নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। সে ফিওনার নোংরা কাঁথাগুলো পরিষ্কার করে সাবধানে রোদ লাগার জায়গায় শুকাতে দিচ্ছিল। কাজ সেরে ঘরে ফিরতেই সে দ্রুত ফিওনাকে কোলে তুলে নিল। মায়ের স্পর্শ পেয়ে শিশুটিও যেন শান্তি পেল।
এরপর বেলী তার মূল ঘরটির দিকে এগিয়ে গেল—যে ঘরটিতে ফারহান তৃষ্ণাকে নিয়ে ছিল। দরজা ভেজানো ছিল। বেলী নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করল।
এই ঘরটি ছিল বেলীর স্বপ্নের মতো সাজানো, সামান্য সম্পদ দিয়েই সে একে গুছিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এখন এই ঘরে এক অন্য নারীর দখল। বেলীর যত্নের সব চিহ্ন যেন মুছে গেছে। টেবিলের উপর নতুন বউর রুচি অনুযায়ী নতুন কিছু প্রসাধনীর বোতল, বিছানার চাদর পাল্টে দেওয়া হয়েছে, বাতাসে বেলীর পরিচিত গন্ধের বদলে ভাসছে অন্য কোনো সস্তা আতরের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। ফারহানের দ্বিতীয় বিয়ে বেলীর জীবনে শুধু একটি নতুন মানুষকেই আনেনি, তার ব্যক্তিগত পরিসর এবং অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছে—এই যে, তোমার জীবনের উপর আর তোমার নিয়ন্ত্রণ নেই। বেলীর মনটা বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। সে শুধু দ্রুত চোখ বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই।

ঘর থেকে বেরিয়ে বেলী আবার উঠোনে এসে দাঁড়াল। তখনি তার চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
প্রায় দেড় বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলে কোনোমতে টলমল পায়ে হেঁটে হেঁটে বেলীর দিকে এগিয়ে আসছে। বাচ্চাটির অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে ভয়ানক অযত্নে আছে। তার সর্দিতে নাক-গাল ময়লা লেগে আছে, শুকিয়ে যাওয়া সর্দি আর ধূলোয় তার মুখটা বিবর্ণ। তার ছোট চেহারায় স্পষ্ট অযত্নের ছাপ। শীতকাল হওয়ায় শিশুটির গাল ফেটে গেছে, লালচে হয়ে আছে ত্বক। বেলীর বুকে তীব্র মায়া হলো। এই দৃশ্য তার নিজের ভেতরের যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিল। এই বস্তিতে, এই ধরনের কষ্ট আর বঞ্চনা নিত্যদিনের ব্যাপার। এই সময়েই তার মনে এলো, ফারহানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সেও তো মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা করে। কিন্তু প্রতিবারই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিওনার মুখ। যদি সে চলে যায়, তবে তার এই নিষ্পাপ মেয়েটির কী হবে? ফিওনার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সে প্রতিবার নিজেকে দমিয়ে রাখে। এদিকে, সেই শিশুটিকে বেলী ভালোভাবেই চেনে—সে পাশের ঘরের রুনার সন্তান। হঠাৎ করেই, একটি মহিলা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। মহিলাটি কিছু না জিজ্ঞেস করেই অতটুকু বাচ্চার গায়ে ‘ধরাম’ করে এক কিল বসিয়ে দিলেন। যন্ত্রণায় শিশুটি কেঁদে উঠতেই মহিলাটি তার হাত ধরে টানতে টানতে সেখান থেকে নিয়ে গেলেন। বেলীর খুব খারাপ লাগল। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না। বস্তিতে এসব হরহামেশা ব্যাপার। এখানে মারধর, চিৎকার, এসবই স্বাভাবিক। বেলী জানে, সে যদি এখন কিছু বলতে যায়, ওই মহিলা তাকেই দু’চারটে কটু কথা শুনিয়ে দেবে, বলবে “নিজের চরকায় তেল দাও।” তাই নীরবে সবকিছু হজম করে বেলী ফিওনাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। তখনি চোখে পড়ল আদনান এদিকে আসছে! তাকে দেখেই বিরক্তিতে বেলীর চোখমুখ কুঁচকে এলো। ছেলেটাকে দেখলেই যেন, তার ভালো মুডও বিগড়ে যায় এক সেকেন্ডেই।

#চলবে?

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-১+২+৩

#মীরাতুল_নিহা
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১)

“বেলী! তোর জামাই আরেকটা বিয়া করছে! তোর সতীনরে লইয়া দাঁড়াইয়া আছে—দেইখা যা জলদি!“

কথাটা কানে যেতেই বেলী থমকে দাঁড়াল। প্রতিবেশী আয়েশার হাঁপানো মুখ দেখে মনে হলো না এটা কোনো মশকরা। তবুও বেলীর মাথায় প্রথমেই এল, হয়তো ভিত্তিহীন কিছু! কিন্তু এমন কথা নিয়েও কি কেউ ঠাট্টা করে? তবু দোনা-মোনা ভাব মাথা থেকে ঝেড়ে সে তড়িঘড়ি দরজার দিকে গেল। দরজা ফাঁক করতেই চোখে পড়ল—আয়েশার কথার হুবহু সত্য চিত্র। তার স্বামী ফারহান বরবেশে দাঁড়িয়ে, আর পাশে নতুন বধূ সাজা এক মেয়ে। ফারহানের কণ্ঠে সেই পরিচিত বাঁজখাই সুর,

“বেলী! আরে বউ… থুরি—বড় বউ! আমার নতুন বউরে বরণ করে ঘরে তুল!”

বেলীর নিঃশ্বাস যেন এক লহমায় বন্ধ হয়ে গেল। শরীরটা পাথরের মতো অনড়। সে সামনে এগিয়ে দাঁড়াতেই ফারহান আবার চেঁচিয়ে উঠল,

“আরে নতুন বউ আইছে! চোখে কী হইছে তোর? দেখতেছিস না নাকি?”

“তুমি সত্যিই বিয়ে করেছো?”

“হ, এই যে বউ!”

উত্তর শুনে, বেলী কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো,

“কিন্তু, কেন ফারহান!”

ফারহান বিরক্তি নিয়ে, কিছুটা খাপছাড়া ভাবেই উত্তর করল,

“স্পষ্ট কথা! আমার তোরে ভাল্লাগছে নাহ্! তাই বিয়ে করেছি।”

“আর আমাদের বাচ্চা! ফিওনা! ও?”

“বাচ্চার বাপ তো আমি, সবাইই জানে। এইটা আর কি?”

“বাচ্চা থাকতেও আরেকটা বিয়ে কিভাবে করতে পারলে ফারহান! বুক কাঁপল না তোমার?”

বেলীর একের পর এক প্রশ্নে ফারহানের বিরক্তির সাথে সাথে এবার রাগ চওড়া হলো! হাত ঝাড়া দিয়ে বলল,

“সর তো! বউ দাঁড়িয়ে আছে কতক্ষণ ধরে, দেখছিস না? কানা না-কি তুই?”

ফারহানের জবাব শুনে বেলীর চোখের কোনে পানি টলমল করছে। কোনো নারীই মেনে নিতে পারবে না তার স্বামীর আরেকটি বিয়ে! বেলীর ভেতরও ঠিক একই রকমের তিক্ত জঘন্য অনুভুতি হচ্ছে! তবুও শক্ত কন্ঠে ফের শুধোয়,

“তাহলে আমি কে?”

বেলীর প্রশ্ন শুনে ফারহান বাঁকা হেঁসে জবাব দিল,

“তুমিও বউ! তবে বড় বউ আর কি! এটা নিয়ে মন খারাপ করিও না! সমস্যা নাই, সবকিছু সমানে সমানে হবে।”

এক মুহূর্তও দেরি করল না বেলী। সপাটে এক চড় ফারহানের গালে গিয়ে পড়ল। তারপর দোলনায় ঘুমিয়ে থাকা নিজের পাঁচ মাসের দুধের বাচ্চাটাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে দরজা ধপ করে বন্ধ করল। ফারহান থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল—দু’চোখ বড় বড় করে। তারপর নতুন বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বলতে আরম্ভ করল,

“দরজা ক্যান বন্ধ করলি! আমি আমার বউরে নিয়ে বাসর কোথায় করব?”

ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই। বেলী চুপচাপ। দু’টো রুম বিশিষ্ট ঘরটাতে আর থাকার মতন জায়গা নেই। প্রথম রুমে একটি চৌকির উপর মাদুর পাতা আছে। আর কিছু টুকটাক জিনিসপত্র। যেমন সিন্দুক হতে বিভিন্ন ড্রাম, আলনা। দ্বিতীয় রুমে রয়েছে খাট সমেত সুন্দর বিছানা। যেই বিছানায় এতদিন বেলীর সাথে ফারহান ছিল। বেলী ছিল, মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত, লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু সেই শান্ত মেয়েটাই একদিন বাবা-মা’র সমস্ত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালো। কারণ— ফারহান। দু’জনের সম্পর্কটা প্রায় দেড় বছরের। সেই দেড় বছরের প্রত্যেকটি দিন ছিল স্বপ্ন দিয়ে বোনা, ভরসা দিয়ে গড়া। ফারহান তার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। বাবা মা’র যুক্তি, নিষেধ শুনেনি!
বিয়ে করেছিল তারা। বিয়ের পর মাসখানেক দারুণ চলছিল সব। ফারহানের যত্ন, তার ভালোবাসা— সব কিছুতেই একটা নতুন জীবন খুঁজে পাচ্ছিল বেলী। কিন্তু সেই সুখের মেঘে ঘুটঘুটে অন্ধকার জমতে শুরু করলো খুব দ্রুত। আস্তে আস্তে বেলী ফারহানের ভেতরের আরেকটা মানুষকে জানতে পারলো। সেই মানুষটা, যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। দেড় বছরের ভালোবাসার মানুষটা কেমন যেন অচেনা এক রাক্ষসে পরিণত হলো। বেলী কান্না করে উঠলো। অঝোরে, বাঁধনহারা কান্না। এই কান্না শুধু দুঃখের নয়, এই কান্না তার ভুল সিদ্ধান্তের, তার হারানো স্বপ্নের। ফারহানকে বিয়ে করার জন্য যে মূল্য সে দিচ্ছে, সেটা যেন এই এক এক ফোঁটা চোখের জলেই লেখা আছে।
বাচ্চা মেয়েটা বমি করে দিয়েছে! বেলী দ্রুত চাদর সরিয়ে দেখলো, কাপড়ে আর বিছানায় বমি লেগে আছে। এই মুহূর্তে পরিষ্কার না করলে বিছানায় শোয়া দায়। অথচ দরজা খুললেই মুখোমুখি হতে হবে সেই ভয়ংকর বাস্তবতার। কিন্তু বাচ্চাটার জন্য তাকে বেরোতেই হলো। ঘৃণা আর যন্ত্রণায় দাঁতমুখ শক্ত করে বেলী দরজা খুললো। প্রথমেই চোখ গেল ঘরের ভেতরের দৃশ্যটার দিকে। বিছানায় দুজন অর্ধ নগ্ন মানুষ। ফারহান এবং সেই নতুন বউ।

“কি ব্যাপার? এখানে কি? কোনো প্রাইভেসি না-ই না-কি!”

ফারহানের প্রশ্নে বেলী সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নতুন বউ তখন, বুকের আঁচল সামলাতে ব্যস্ত। ফারহানর পড়নে শুধু একটা লুঙ্গী! বেলীর বুঝতে বাকি রইল না, এ কীসের আয়োজন! ভেতরে থাকা রাগটা পুনরায় প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসলো,

“আঁচল সামলানোর কি দরকার! তোদের মতন মহিলারা বুকের আঁচল ফেলেই অন্য পুরুষ মানুষদের আকৃষ্ট করে!”

উত্তর পছন্দ হলো না ফারহানের! উঠে গিয়ে বেলীর সামনে দাঁড়াল। চোখ দু’টো রাগে বড়বড় করল। যেন বেলীকে এখনি গিলে খাবে! সর্তক করে দিচ্ছে খুব সাবধানে!

“বেলী! সাবধানে কথা বল।”

“যা করেছে, তাই বলেছি। গায়ে লাগার কি হলো?”

ফারহান বেলীর হাত ধরে একটু দূরে দাড় করাল। বেলী সহসাই ফারহানের হাত ছেড়ে দিল! ফারহান তড়িৎগতিতে রুমে গেল। গিয়েই মনের আনন্দে দ্বিতীয় বউকে ডাক দিতে নিচ্ছিল তখনি দেখে বিছানা ভর্তি বমি এবং প্রস্রাব! সাথে সাথে খুশি মুখটা মলিন হয়ে গেল। বেরিয়ে এসে আগের মতন চিল্লিয়েই বলতে লাগল,

“বাচ্চা এসব করেছে পরিষ্কার করিস নি এখনো?”

ফারহানের প্রশ্নে বেলী কোনো উত্তর করল না! সোজা দরজা খুলে বাহিরে গেল। ফারহানের দ্বিতীয় বউ তখন প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই ফারহান হেঁসে উঠে! যেন এই বাজে পরিস্থিতি তার কাছে কিছুই না। তাদের বাসর রাত খুবই মধুর হবে। সে আশ্বাসই দিচ্ছে ঠোঁটের কুটিল হাসি দ্বারা।

“মনে হয় গেছে! কাছে আসো তো ময়না পাখি!”

ফারহানের ঠোঁটে বিশ্রী হাসি দেখা দিল। যে হাসির মানে কামনার! যৌনাকাঙ্ক্ষার!

“বাসর রাতে বাসর না করলে হয়? জলদি আসো!”

সে পুনরায় তার নতুন বউর বুক থেকে শাড়ির আঁচল টান মেরে খুলে দিল। উন্মুক্ত গলা বুকে উম্মাদের মতন তার স্পর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছিল! মেয়েটিও আঁকড়ে ধরেছে সুঠাম দেহের পুরুষটিকে। অদ্ভুত জগৎে চলে গেছে দু’জনে ইতিমধ্যে! চারিদিকে কি হচ্ছে তার যেন কোনো হুঁশ নেই! ওদিকে বেলী কল থেকে এক বালতি পানি ভরে নিয়ে দ্রুত ফিরে এলো ঘরে। চরম ক্রোধ আর প্রতিহিংসার বশে বেলী সেই পানির সাথে একমুঠো শুকনো মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে এনেছে! ঘরে ঢুকেই সে কোনো কথা না বলে, সেই এক বালতি পানি ছুড়ে মারলো দুজনের দেহের ওপর।
ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় দুজনই চমকে ভরকে উঠলো। ফারহান আর নতুন বউ— দুজনেই তীব্র জ্বালা অনুভব করলো। মরিচের গুঁড়ো, আর বিছুটি পাতা মেশানো সেই পানি তাদের চোখে মুখে কোমল ত্বকে লাগতেই শুরু হলো জ্বলন আর অসহ্য চুলকানি! নতুন বউটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। তার বাসর রাতের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। বেলী এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। চোখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে দ্রুত সেই দরজা বন্ধ করে দিলো। নিজের পাঁচ মাসের মেয়েকে কোলে চেপে সে ঘরের এক কোণে গিয়ে বসলো। ফারহান এবার কুকুরের মতন চিল্লাতে লাগলো!

“বেলীরে বেলী! দরজা খুইলা দে! পানি দে! জ্বলে গেল চোখমুখ!”

বেলী নিশ্চুপ। ফারহান সহ্য করতে না পেরে এবার অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে লাগল,

“বেলী, কু°ত্তা*** তোরে যদি আমি একবার পাই। আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না!”

বেলী ভেতর থেকে সবই শুনলো। উত্তর করল না। চুপচাপ বাচ্চাকে বুকে নিয়ে বসে আছে। না চাইতেও চোখ বেয়ে নেমেছে অঝোর ধারায় শ্রাবণ!

ওদিকে নতুন বউর চোখে বেশ ভালো করে মরিচ ঢুকেছে। চোখে হাত দিয়ে রুমের এদিক থেকে ওদিক হাঁটছে, একটু পানির আশায়! বেলী ঘরের ভেতর থেকেও তালা বন্ধ করে দিয়েছে যাতে পানির জন্য বের হতে না পারে। জ্বালায় যেন বেশ ভালো করেই ছটফট করে দু’জন! বেশ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ফারহানের চিল্লাচিল্লি শুনে বেলীও প্রতি উত্তর করে,

“তোমার নতুন বউর শরীরে, অনেক জ্বলুনি আর চুলকানি, তাই না? এত চুলকানি যে বিবাহিত তারউপর এক বাচ্চার বাপকে বিয়ে করেছে! ভাবো একবার কি পরিমাণে চুলকানি তার সর্বাঙ্গে! আজ তো হিসেব মতন বাসর রাত? তোমার এবং তোমার নতুন বউর চুলকানি মিটিয়ে দিলাম। এবার দু’জন দুজনের জ্বলুনি, চুলকানি ইচ্ছেমতন কমাও! সারারাত পড়ে আছে। আমি বিরক্তও করব না!”

#চলবে!

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২ + ৩)
#মীরাতুল_নিহা

ক্লান্ত হয়ে পড়া পৃথিবীটাকে যেন জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছিল ভোরের প্রথম আলোকরেখা। পূর্ব আকাশে সূক্ষ্ম একটা সোনালি দীপ্তি জমে উঠেছে। ঘরের মাটিতে অল্প আলো পড়তেই দেখা গেল বেলীর মুখ। শুকনো কান্নার দাগে তার গাল আরও সরু, আরও কেমন যেন একরাশ নিঃসঙ্গতার রেখায় ভরতি।
ফিওনা তখনো শান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন—বাচ্চাদের ঘুমের আলাদা এক ভাষা থাকে, যেন অস্থির পৃথিবীর মাঝে তারাই একমাত্র প্রশান্তির দলিল। বেলী কিছুক্ষণ মেয়ের মুখে তাকিয়ে রইল। সেই ছোট্ট ঠোঁটদুটো, নরম নিঃশ্বাস, মোলায়েম গাল—সবকিছুই তার ক্লান্ত বুকের ওপর এক টুকরো আশ্বাসের বাতাস বইয়ে দিল। যেন পৃথিবীর সব যন্ত্রণা এই ছোট্ট দেহটার স্পর্শে খানিকটা দূরে সরে যায়। দিন মানেই দায়িত্ব। দায়িত্ব মানেই বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দরজার ছিটকিনি উঠাতেই টিক করে শব্দ হলো, আর সাথে সাথেই চোখে পড়ল, ফারহান দরজার পাশে মেঝেতে কুঁকড়ে শুয়ে আছে। শরীরজুড়ে লাল ফোলা দাগ। জ্বলন্ত কয়লা ছিটিয়ে দিলে যেমন দাগ হয়, ঠিক তেমন। চোখ-মুখ ঘোলাটে। চুল এলোমেলো হয়ে কপালে আটকে আছে। নতুন বউটার অবস্থা তার চেয়েও বেশি বিষণ্ণ—চোখ লাল, গায়ের আঁচল কাঁধ থেকে নামতে নামতে কোথায় থেমে আছে বলা মুশকিল। বেলীর ঠোঁটে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। খুব ক্ষীণ, খুব ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু সেই হাসির পিছনেই ছিল একরাশ নরম যন্ত্রণা, যেটা খুব কম মানুষই বোঝে। যতই হোক, মানুষটা তার স্বামী। তাকে কষ্টে কুঁকড়ে থাকতে দেখে বেলীর মনে অজান্তেই একটা বিরহের রেখা আঁচড় কাটল।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে কঠিন করে ফেলল সে।
সহানুভূতি দুর্বলতার আরেক নাম। দুর্বল হলে চলবে না। চোখ না মিলিয়েই পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। হাওয়া তখনো একটু ঠাণ্ডা। রাতে ভালো করে খাওয়া হয়নি বলে সকাল সকালই বেলীর ক্ষিদে পেয়েছে! রান্নার জন্য কলসি নিয়ে পুকুরঘাটে পৌঁছতেই শোনা গেল মেয়েমানুষদের চাপা হাসাহাসি।
এই পাড়ায় কোনো ঘটনার খবর কখনো যেন, পুরনো হয় না। আয়েশা, রহিমা, সালমা—সবাই বসে আছে পুকুরের পাড়ে। কারও হাতে কাঁসার থালা, কারও হাতে বালতি। নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য আসলেও এদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যকে নিয়ে আলোচনা করা।বেলীকে দেখতেই তাদের মুখের হাসি থেমে গেল।
এক ধরনের কৌতূহলী নীরবতা ছড়িয়ে গেল চারদিকে। বেলী কারো দিকে না তাকিয়ে পুকুরের ধারে হাঁটু গেড়ে বসল। কলসি দু’হাতে ধরে পানিতে নামাল। ঠিক তখনই সালমা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল—

”কি’গো বেলী? হুনলাম ফারহান কাইলকে নতুন বিয়া কইরা ঘরে আনছে! তুমি কই আছিলে?”

“বাহিরে দেখতে পেয়েছো আমাকে কালকে?”

বেলীর উত্তর শুনে সালমা ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করল,

“না, তো। তা দেখিনি !”

বেলী এক পলক তাকাল সালমার দিকে। এই প্রতিবেশী নামক মহিলাগুলোই কালকে একপ্রকার চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিল, কি হয় দেখার জন্য! অথচ কেউ একটু ভরসা দিতে এগিয়ে আসেনি! সেজন্যই বেলী ত্যড়াভাবেই উত্তর দিল,

“দেখতে যখন পাওনি, তখন তো বোঝার কথা আমি ঘরেই ছিলাম!”

বেলীর উত্তর পছন্দ হলো না সালমার! চোখমুখ কুঁচকে ফেলল সাথে সাথে।

“সতীন নিয়ে ঘরে আছিলে বুঝি?”

বেলী উত্তর দেবার আগেই পাশ থেকে আয়েশা প্রতি উত্তর করল,

“এসব বাদ দে! মেয়েটার কপাল পুড়লো। ওর এখন আমাদের দরকার।”

বেলী এবার স্মিত হাঁসলো। চোখে চোখ রেখে বলল,

“কপাল আবার পুড়ে না-কি? আল্লাহ যা লিখেছে তাই হবে। আমি নিশ্চিত, আল্লাহ সবটুকু খারাপ আমার ভাগ্যে লিখেনি।”

সে আজ আর কাঁদতে রাজি নয়। চোখ তুলে তাকালে হয়তো দেখবে করুণার ঢল, আর মাথা নিচু করলে দেখবে টিটকারি। সে কোনো দিকেই তাকাল না। এক মূর্ত কঠিন নীরবতা নিয়ে সে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করল। হুট করেই তীব্র ক্ষুধা অনুভব করল সে। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল! কলসি নামিয়ে সে দ্রুত রান্নাঘরের কোণে গেল। গ্যাস শেষ হয়ে আছে প্রায় মাসখানেক হলো। ফারহানকে বারবার বলার পরও সে কানে তোলেনি। বেলী শুকনো লাকড়ি হাতে নিল। চুলা জ্বালাতে গিয়ে ধোঁয়া আর ছাইয়ে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। তবুও সে ধৈর্য ধরল। কয়েকটি দেশলাই কাঠি নষ্ট হওয়ার পর, অবশেষে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার বুক চিরে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের লালচে আভা তার চোখের তিক্ততাকে কিছুটা ঢাকল। পরিষ্কার জলে চাল ধুয়ে সে হাঁড়িতে ভাত বসাল। ভাতের ফেনা উঠে এসেছে হাঁড়ির গা বেয়ে। বেলী এক মনে ফেনা ফেলে দিতে ব্যস্ত। লাকড়ির ধোঁয়ায় তার চোখ দুটো লাল, সেই লালিমা যেন তার ভেতরের ক্রোধকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। ঠিক সেই সময়, ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া ফারহানের ঘুম ভাঙল। চোখ রগড়াতে রগড়াতে সে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। সারা গায়ে বিছুটির পাতার জ্বালা তখনও বিদ্যমান, চামড়া জায়গা-জায়গায় ফুলে লাল হয়ে আছে। গত রাতের চরম অপমান আর যন্ত্রণার স্মৃতি মনে পড়তেই তার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় রান্নাঘরের দিকে তেড়ে গেল।

“বেলী! কু***, তুই আমার সাথে…

ক্রোধে ফারহানের কথা শেষ হলো না। সে দেখল, বেলীর হাতে একটি লম্বা খুন্তি। খুন্তিটির ফলা সে এখন চুলার ভেতরে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে দিয়ে রেখেছে। ইস্পাতটা ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠছে। ফারহান যখন একেবারে কাছে চলে এসেছে, বেলী তখন আচমকা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক শীতল, ভয়ানক স্থিরতা। সে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত খুন্তিটি ফারহানের মুখের সামনে তুলে ধরল। খুন্তির আগুনের হলকা ফারহানের মুখে এসে লাগল।

“কী বলছিলে? শেষ করো?”

বেলীর কণ্ঠস্বর শান্ত, তীক্ষ্ণ শাণিত।

“গতকাল রাতে তোমার বাসর পূর্ণ করে দিয়েছিলাম। আজ ভোরেও যদি সেই একই কথা বলতে আসো, তবে এই খুন্তি দিয়ে আরেকবার তোমার সব জ্বালা মিটিয়ে দেব—চিরতরে। বুঝেছো তো, তারপর কি হবে?”

উত্তপ্ত খুন্তি আর বেলীর চোখের সেই হিংস্র ভাব দেখে ফারহানের তেড়ে আসা পা দুটো সেখানেই থেমে গেল। এক রাতের ব্যবধানেই যেন সে বুঝে গেল, এই বেলী তার চেনা লক্ষ্মী মেয়ে নয়। মুহূর্তে তার সমস্ত আস্ফালন চুপসে গেল। ক্রোধের বদলে তার চোখে এখন এক মিশ্রিত। সে যেভাবে লোভাবেই জানে।

মেয়েটার রাগ একটু বেশিই। কিন্তু সুন্দরী মেয়েদের রাগ হয়তো সৃষ্টিকর্তাও আলাদা করে সাজিয়ে দেন। তাই সেটা নাকি মন্দ লাগে না। তেমনটাই হয়েছে ফারহানের ক্ষেত্রে। তার চোখে বেলীর চেয়ে হাজার গুণ বেশি মনোহর তৃষ্ণা । লালচে চুল, চিকন ভ্রুর সরু ছায়া, গোলাপি মোটা ঠোঁট ভাবতেই মনে হয়, এখনই গিয়ে চেপে ধরে চুমু খাবে। তাছাড়া মেয়েটি যে অবিবাহিত! একজন বিবাহিত, এক সন্তানের পিতা হয়েও সে এমন অতিব সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছে, এই ভাবনা সবসময় তাকে অদ্ভুত এক গর্ব ও উত্তেজনায় ভরিয়ে রাখে। সব মিলিয়ে তার খুশির সীমা থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই খুশির দুই দিন আজ। অথচ ফারহান কিচ্ছুটাই করতে পারছে না। বউয়ের গায়ের গন্ধটুকু পর্যন্ত ঠিকমতো ছুঁয়ে দেখেনি। এই অপার্থিব আনন্দটাও যেন তার ভাগ্যে বেমানান হয়ে আছে। রাগে-দুঃখে এক সময় বাইরে বেরিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই সর্বপ্রথম চোখে পড়ল তৃষ্ণাকে। চৌকির ধারে বসে আয়নার সামনে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক বুলিয়ে চলেছে। বেলীর বুকের ভেতরটা হঠাৎই ধক করে উঠল। এমন দৃশ্য দেখে যে কারও হাত উঠে যেতে পারে, সে-ও চাইল, ঠাস করে দু’টো চড় বসিয়ে দিতে। পরক্ষণেই সে ইচ্ছেটাকে গিলে ফেলল। দোষ যখন নিজের মানুষটির, তখন পর মানুষকে দোষারোপ করেই বা কী লাভ! তবুও সে আলগোছে গিয়ে চৌকির এক কোণে বসল।
গলা খাঁকড়ি দিয়ে জানান দিল উপস্থিতি। কিন্তু তৃষ্ণা যেন নিজের জগতে নিমগ্ন। আয়নায় নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে থাকা রঙের উপরেই তার সমস্ত মনোযোগ। কেউ এসেছে কি-না সে বহুদূরের বিষয়।
অবশেষে বেলী ঠাণ্ডা স্বরে বলল—

“আপনি কি বয়রা নাকি? এভাবে লিপস্টিক লাগিয়ে যাচ্ছেন!”

মেয়েটি বিরক্ত হলো। খুব বিরক্ত যাকে বলে। ভ্রু দু’টো কুঁচকে বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে প্রতি উত্তর করল,

“হায় আল্লাহ! এইডি কি কথা! তোর মুখে তালা পড়ুক!”

মেয়েটির সম্মোধনে অবাক হলো বেলী! যেখানে সে আপনি করে বলছে, আর বিনিময়ে মেয়েটি তাকে তুইই! ব্যবহারই ব্যক্তিত্বের পরিচয়। মেয়েটির ব্যক্তিত্ব যে কিরকম তা জানতে কিংবা বুঝতে বেলীর আর বাকি রইল না।

“শিক্ষা দিক্ষা থাকলে কেউ এভাবে কথা বলে না!”

বলেই বেলী গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কপালে টিপ আঁকায় ব্যস্ত তৃষ্ণা যেন নিজের সাজগোজ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দায় দায়িত্ব তার ওপর নেই। বাইরে বেরুতেই বেলীর চোখে পড়ে আয়েশাকে। পাতলা গড়নের, সফেদ ওড়না কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটছে মেয়েটি হাতভর্তি বাজারের থলি। আয়েশা এখন অর্নাসের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনায় আরও অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এক বছরের গ্যাপ তার জীবনটাকে খানিকটা পিছিয়ে দিয়েছে। বেলীর সঙ্গে তার বয়সও প্রায় সমান—তাই একধরনের অদৃশ্য বন্ধুত্বও জেগে থাকে দুজনের মধ্যে।

“আয়েশা, শোন?”

হাঁটতে হাঁটতে থলি সামলে আয়েশা বলল,

“একটু পর শুনতেছি। আগে এই বাজারডা রাইখা আসি।”

মিনিট দুয়েক পরই সে ফিরে এলো। নিঃশ্বাস সামান্য হাঁপানো, কপালে ঘাম চিকচিক করছে।

বেলী তাকাতেই প্রথম প্রশ্ন করে ফেলল,

“ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছিস দেখছি!”

আয়েশা মুচকি হেসে উত্তর দিল,

“বাজারে এত্ত ভিড়! পুরুষ মানুষের ভিড়ে তো পা ফেলার জায়গাই নাই। তার ভিতর আমি একটা মাইয়া মানুষ… বুঝোসই তো কত হ্যাপা পোহাতে হয়!”

আয়েশার কথায় বেলীর মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত মায়া জাগল ।তবুও ভাবনাটা অন্যদিকে ছিল। একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে বলল—

“একটু হেল্প করতে পারবি রে?”

আয়েশা চোখ তুলে তাকাল, কপালের ঘাম আঙুলের পিঠে মুছে নিয়ে বলল,

“কী হইছে? ক তো।”

বেলী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে যেন দ্বিধার ছায়া। তারপর নরম গলায় বলল—

“আমাকে একটা ছোটোখাটো কাজ বা যে কোনো চাকরির সন্ধান দিতে পারবি? আমার এদিক থেকে বের হওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!”

আয়েশা কিছুটা চিন্তিত মুখ করে উত্তর দিল,

“চাকরি! কিন্তু আমার তো তেমন চেনাশোনা নাই নে বেলী। আর চাকরির জন্য তো অনেক সার্টিফিকেট লাগে। তোর আছে নি কিছু?”

আয়েশার কথায় ভাবনায় পড়ে গেল বেলী! সত্যিই তো, তার কাছে তো একটা সার্টিফিকেটও নেই। আর যাও আছে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ অব্দিই। তারপরে পড়াশোনা ও হয়নি আর!

“ভুলেই গেছিলাম আমার কাছে কিছু নেই! বাড়ি থেকে আসার সময় বুঝিইনি এতকিছু লাগবে। ভেবেছিলাম জীবনটা অন্যরকম হবে। কিন্তু এত অন্যরকম হবে টেরও পাইনি!”

বেলীর কথায় আক্ষেপের সুর স্পষ্ট! আয়েশা সেটা বুঝে নীরবে এড়িয়ে গেল প্রসঙ্গ।

“তুই তো টিউশনি পড়াতে পারিস বেলী। অর্নাস তৃতীয় বর্ষ অব্দি পড়ছস না?”

“হ্যাঁ, তবে তৃতীয় বর্ষের ক্লাস তেমন করার সুযোগ পাইনি। এতগুলো বছর বাপের টাকা নষ্ট করে পড়েইছি যা! তার সার্টিফিকেটটুকু অর্জন করতে আর পারলাম না!”

“মন খারাপ করিস না। তুই পড়াশোনায় উজ্জ্বল। আমারে অনেক সাহায্য করছস তুই। দেখি, টিউশনি পাওয়া যায় কি না। যদিও এই বস্তিবাসীতে শিক্ষার মর্যাদা কেউ দেয় না।”

বেলী আক্ষেপের সুরে বলল,

“দেখি কি আছে এই কপালে! কিছু একটা করতেই হবে, এখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে।”

“শোন বেলী, একদম নরম হবি না। ওই মহিলাকে আর ফারহান ভাইকে টাইটে রাখবি! যতদিন আছস। নইলে পেয়ে বসবে!”

“তা আর আমায় বলে দিতে হবে না রে। কাল মরিচের গুঁড়ো দিয়েছি। সকালে খাবার বন্ধ করেছি। বাকিটুকুও শায়েস্তা করে ফেলব। তবে আর যাই হউক, আমিও এই নরকের সংসার থেকে মুক্ত হব আর ওদেরও শাস্তি দিব। কষ্ট শুধু আমি একা পাব কেন!”

আয়েশা মুঁচকি হাসল বেলীর কথা শুনে। বেলী পড়াশোনায় ও যেমন মেধাবী তেমনি সাহসও বেশি। যার কোনোটাই আয়েশার মধ্যে নেই! এমনকি রূপটুকুও সৃষ্টিকর্তা তাকে কম দিয়েছে বলে তার ভীষণ আক্ষেপ!

আয়েশার সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে বেলী কলপাড়ের দিকে এগোল। চোখ-মুখে পানি মাখা, রুমে ঢুকতেই নজরে পড়ল ফারহান আর তার নতুন বউ আরাম করে বসে বিরিয়ানি খাচ্ছে। বিস্ময়ে বেলী চারপাশে খুঁজল ফিওনাকে, কিন্তু পেল না।

“ফিওনা কোথায়, ফারহান?”

ফারহান তখন কেবল খাবারের একটি পিস মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বেলীর ডাক শুনে অদ্ভুতভাবে বিষম লেগে অস্থির হয়ে গেল। অমনি তৃষ্ণা আদুরে ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে পানি খাইয়ে দিল। বেলী বাঁজখাই কণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এখানে কেন?”

ফারহান আরামসে চিকেনের পিসে কামড় দিয়ে বলল,

“আমার বিছানায় আমি ক্যান! এটা কি কোনো প্রশ্ন হইলো বউ?”

উত্তর শুনে বেলীর গা একপ্রকার রিঁরি করে উঠল। রাগে সে ফারহানের শার্টের কলার চেপে ধরল। ফারহান চোখ বড় বড় করে তাকাল। বেলী তার দিকে তোয়াক্কা না করে রক্তিম অক্ষিযুগল দিয়ে জিজ্ঞেস করল
“গলা টিপে দেবার আগে, গলা দিয়ে শব্দ কর!”

“তোর মেয়েকে চৌকিতে শুইয়ে রেখেছি। আসার সময় দেখতে পাসনি নাকি?”

বেলী ফারহানকে ছেড়ে মেয়ের কাছে ছুটে গেল। তাড়াহুড়োর কারণে আগে চোখে পড়েনি। মেয়েটিকে বুকে নিয়ে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর আবার ফারহানের দিকে ফিরে দাঁড়াল।

“আমি আমার মেয়েকে নিয়ে এখানে শোবো।”

বেলীর কথায় তৃষ্ণা চোখ-মুখ কুঁচকে আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,

“আমি চৌকিতে ঘুমাইতে পারুম না! আবার কালকের মতন কাহিনি হইব!”

“ঘুমাইতে না পারলে, আরেক মহিলার স্বামীকে বিয়ে কেন করেছিস! চৌকিতে ঘুমাতে পারবে না কিন্তু অন্য মহিলার স্বামীর সাথে ঠিকই শুতে পারবা, তাই না? লজ্জা নেই?”

বেলীর তেজী কণ্ঠে তৃষ্ণা খানিক ভড়কে উঠল। সে ফারহানের কাছে এগিয়ে বসল। ফারহান এবার উঠে দাঁড়াল।

“তিশু, আমার নতুন বউ। তোর জন্য কালকে চৌকিতে রাখছি। আজ বিছানায় ঘুমাবো।”

“আমার মেয়ে চৌকিতে শুবে?”

“কি হইছে তাতে?”

“ও ব্যাথা পেতে পারে। ঘুম হবে না ভালো।”

“ যা বলছি তাই। চৌকিতে শুলে তোর ওই নরম বাচ্চা শক্তপোক্ত হয়ে যাবে! বেশি বাড় বাড়িস না! ভালো হবে না। ফুট এখান থেকে!”

ফারহানের তাচ্ছিল্যময় কথা শুনে বেলীর রাগে শরীর কেঁপে উঠল। কিছু না বলে সে চুপচাপ রুমে ঢুকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস তুলল। রুম থেকে বের হতেই ফারহান দরজাটি ধরে জোরে বন্ধ করে দিল। বেলী তা লক্ষ্য না করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। এই শহরে একটি বাচ্চা নিয়ে চলা, চারটে কথা না। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই, নিরাপদ আশ্রয়… এত কিছুর জন্যই সহ্য করতে হচ্ছে এই ভার। ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজায় কড়া নারা ওঠল। আওয়াজ শোনা মাত্রই বেলী মেয়েকে বুকে চেপে ধরে ঘরের কোণে দাঁড়ালো। চোখ খুলে দেখল বাহিরে দাঁড়িয়ে আদনান। তার প্রতিবেশীই বলা যায়। আদনান বেলীকে দেখে প্রথমে হালকা কণ্ঠে সালাম দিল। বেলীও ছোট্ট মাথা নুয়ে হালকা আদব জানাল।

“ফারহান আছে কি?” আদনান জিজ্ঞেস করল।

“না।” বেলী স্বল্পস্বরেই বলল।

উত্তর না শুনেই বেলী ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল‌ আদনান কিছুক্ষণ থমথমে তাকিয়ে রইল। এভাবে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া! কেমন জানি লাগল। বেলী মেয়েকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরেছে।
ওদিকে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন টিকটিক করে দশটা বাজছে।

হঠাৎ আবার দরজায় আওয়াজ হলো। ফারহান জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। বেলী চৌকিতে শুয়ে রয়েছে, মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। ফারহানের জোরে দরজা চেপে দেওয়া শোরে যেন পুরো কক্ষে কম্পন ছড়িয়ে গেল। দরজার বাইরে থেকে ফারহানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তীক্ষ্ণ এবং অধৈর্য।

“দরজা খোল, বেলী!”

কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেলী তার শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে খাটের এক কোণে পাথরের মতো নিশ্চল। তার নীরবতা যেন দরজার বাইরের হট্টগোলকে আরও প্রকট করে তুলল।
ফারহান আবার হাঁক দিল,

“কথা বলছিস না কেন? আমার বাথরুম পেয়েছে, খোল বলছি!”

বেলী তখনও নিরুত্তর, যেন ঘরের মধ্যে কেবল একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। তার এই অদ্ভুত নীরবতা দরজার ওপাশের পুরুষটিকে আরও অস্থির করে তুলল। দশ মিনিটের মতো সময় পার হয়েছে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। হঠাৎ বেলীর নাকে একটা বোটকা, অসহ্য গন্ধ ভেসে এল। মুহূর্তেই তার মুখাবয়বে একটি সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল, সে বুঝে গেল যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাইরে থেকে আসা দুর্গন্ধটি যেন তার অনুমানকে নিশ্চিত করল। ঠিক তখনই, পাশে দাঁড়ানো তৃষ্ণার বিকট আওয়াজ শুনতে পেল সে।

“ছিহ্! ছিহ্! এ কী করলে তুমি? এত বড় পুরুষ, আর প্যান্টের মধ্যে এসব!”

ফারহানের কণ্ঠে এবার তীব্র অসহায়তা।

“কতক্ষণ আঁটকে রাখা যায়? আজ সকালে বাথরুমে যাই নাই। সন্ধ্যায় পেট পুরে খাওয়াতে এখন জোরে ধরছে! বেলীরে বেলী! তুই কেন দরজা খুললি না? নির্ঘাত মরছিস! তোর জন্য আজ এই…”

এরপর শুরু হলো অকথ্য গালাগালি। ফারহানের কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপছিল। ঘরের ভেতর শুয়ে থাকা বেলী এই সব গালিগালাজকে উপেক্ষা করে গেল। বরং তার মনে এক শীতল তৃপ্তি, এক নীরব মজা অনুভব হচ্ছিল। দরজার ওপারে তাদের অসহায়ত্ব যেন তার প্রতি হওয়া দীর্ঘদিনের অবিচারের সামান্য প্রতিদান। এর কিছুক্ষণ পর, তৃষ্ণার মধ্যেও একই রকম অস্থিরতা দেখা দিল। তার চাপা গোঙানি আর এপাশ-ওপাশ করা জানান দিচ্ছিল, তারও প্রস্রাবের বেগ এসেছে। আধা ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই তৃষ্ণার দুর্বল প্রতিরোধও ভেঙে গেল। প্রথমে তার দু’পা ভিজে উঠল, তারপর সেই ঘোলাটে তরল গড়িয়ে দরজার সামনের মেঝেটিকেও সিক্ত করে দিল।
ঐ বিশ্রী, তীব্র বোটকা গন্ধটা বেশিক্ষণ চাপা থাকল না। ঘরের দরজার নিচ দিয়ে তরল পদার্থ গড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই গন্ধটা বেলীর রুমেও ছড়িয়ে পড়ছিল। পাশের রুমের মানুষজন এই দরজা ধাক্কাধাক্কির আওয়াজে সজাগ হয়ে উঠেছিল। চাপা গুঞ্জন আর ফিসফিসানি শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন প্রৌঢ়া মহিলা দরজার কাছে এসে কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলেন,

“কী হইছে? এত আওয়াজ কিসের?”

ঠিক এই মুহূর্তে, বেলী তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্তভাবে ঘর থেকে বের হলো। সে সাবধানে দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখল। দরজার বাইরে তখনো ফারহান আর তৃষ্ণার রাগ মেশানো ফোঁসফোঁসানি শোনা যাচ্ছে। পাশের ঘরের মহিলা বেলীকে দেখতে পেয়েই উদ্বিগ্নভাবে এগিয়ে এলেন,

“ দরজা খুলতে এত চিল্লানি কেন?”

বেলী একটি শীতল, শান্ত হাসি হেসে বলল,

”আহা, আপনারা কেন এত চিন্তা করছেন? কিছু হয়নি তো।”
মহিলাটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন। বেলী শান্ত কণ্ঠে তার প্রশ্নের উত্তর দিল,

“আসলে, আমার বর আর তার ছোটো বউ (শাহনাজ) দু’জনে মিলে একটু নির্জনে সময় কাটাতে চেয়েছিল। আমাকে নিজেই বলে দিয়েছে, কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে। তাই আমি দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসেছি।”
বেলী অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,

“দয়া করে আপনারাও বিরক্ত করবেন না আর। ওদের এখন সুন্দর সময় কাটছে। এইটুকু ব্যক্তিগত সময় তো তাদের, তাই না? আপনারা বরং নিজ নিজ ঘরে যান। ওদের আনন্দ উপভোগ করতে দিন!”
বেলীর এই শান্ত, দৃঢ় কথা এবং তার মুখের হাসি দেখে আশেপাশের লোকজনের কৌতূহল কিছুটা স্তিমিত হলো। তারা বেলীর কথা বিশ্বাস করল অথবা বিশ্বাস করার ভান করল এবং আস্তে আস্তে সরে গেল। বেলী তখন পা বাড়াল আয়েশার কাছে রাত্রিযাপনের আশায়। আজকে এ ঘরে থাকলে বমি করেই অজ্ঞান হতে হবে!

#চলবে?

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-০৯ এবং শেষ পর্ব

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||অন্তিম পর্ব||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

আচ্ছা আব্বু, তারপর তুমি আর মা নানু বাড়িতে যাওনি?” ছোট্ট সাত বছরের ছেলে তৌহিদের মুখে এই কথা শুনে অতীত থেকে বর্তমান চোখে ভাসমান হলো তৌকিরের। তৌকির তাঁর ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
– “আর যাওয়া হয়নি। তবে একদিন তোমার মেজো মামা কাফেলের সঙ্গে রাস্তায় আমার দেখা হয়েছিল।”
“আর হ্যাঁ, আমার ভালো করেই ঠিক মনে আছে।”

যানবাহন চলিতো রাস্তার একপাশে আমি বসে লোহা পেটাচ্ছিলাম। তোমার আম্মুকে যখন তার বাবার বাড়ি থেকে এনেছিলাম, তখনই আমার রেস্টুরেন্টের কাজটা চলে যায়। তোমার সজিব চাচু তার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আমাদের থাকতে দিয়েছিল। তারপর কামারের কাজটাকেই বেছে নিতে হয়েছিল আমায়। কয়েকশো মানুষের ভিড়ে লোহা পিটিয়ে লোহাকে যন্ত্রে রূপান্তরিত করাই আমার কাজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেই সময়।

তোমার মামা সেই দিন আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে ছুটে এসেই বলেছিল,
– “আমার বোন কেমন আছে?”

কথাটা শুনে আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আগের মতো তার চোখে-মুখে কোনো ইগো বা তাচ্ছিল্যের কিছুই আমার চোখে পড়েনি।

আমার তখন কপাল ও চুল থেকে চুয়ে চুয়ে ঘাম পড়ছিল। আমি পেছনে পাইকোর গাছের নিচে থেকে ছোট একটা টুল টেনে তোমার মামাকে বসতে দিয়েছিলাম। সে কোনো কিছু না বলেই নির্দ্বিধায় সেখানে বসে পড়েছিল। তার হাতে ছিল চকচকে জরির কাজ করা একটা বিয়ে বা রিসেপশনের কার্ড। সেটা হাতে না পাওয়া অবধি বোঝার উপায় ছিল না এটা কিসের।

আমার পাশাপাশি বসেই আমার দিকে তাকিয়ে তোমার মামি আর সে মৃদু হেসে দিল আমার দিকে তাকিয়ে। সেই সময় দোকানে কাজ করত তোমার বয়সের এক বাচ্চা, নাম তার বাবলু। আমি বাবলুকে চিৎকার করে ডেকে দিয়ে বললাম,
-“দুই কাপ চা নিয়ে আয়।”

ছেলেটার পরনে খয়েরি গেঞ্জি ও শর্ট প্যান্ট ছিল। ভাবনার বিষয় হলো, প্যান্টের তলা প্রায় সময় দেখতাম ছেঁড় থাকতো। ভালো একটা প্যান্ট পড়তে বললে বলতো,
– “কি যে কন ভাই! কামের সময়ে নাকি নয়া কাপড় পইড়া ঘুরুম? ধুর!” বলেই পাগলাটে হাঁসি মুখে তার থাকতো।

সেই দিনও ব্যতিক্রম ছিল না। বাবলুকে চা নিয়ে আসতে বলেই আমি তোমার মামার দিকে তাকিয়ে বললাম,
– “আচ্চা! রাস্তার খোলা চা কি চলবে?”

কাফেল তখন বললো,
-“কি যে বলেন! আমি কখন বললাম যে ফাইভ স্টার হোটেলের চা লাগবে!”

তারপর আবারও বললো,
– “কই, আমার বোনের কথা তো কিছু জানালেন না?”

আমি সেই দিন সে সময়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
-“সকালে ঘুম থেকে উঠে আসার সময় ভালো দেখে রেখে এসেছি। এখন তো আর আমি বাড়িতে নেই, তাই বলতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, আর একটু অপেক্ষা করলে তোমার বোন আমার জন্য ভাত সাজিয়ে নিয়ে আসবে। যদিও প্রতিদিন আসে না। বাবলু গিয়ে বাড়ি থেকে আনে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে প্রতিদিন।
কিন্তু আজকে বাবলুর তাঁর নানীকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে যাবে।”

সেই সময় কথা শেষ করেই তোমার মামার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছু বলতে চেয়েও যেন বলতে পারছিল না সে।
একটু সময় নিয়ে আমার সামনে নিজের হাতে ধরে থাকা সেই কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– “আর এক সপ্তাহ পর আমার বিয়ে। মাইজার সঙ্গে। আপনার কথা অনুযায়ী সেই দিন তার সামনে ভিডিও কলে আমি সবকিছু বলেছি। এই যে, সে যদি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে আমাকে বিয়ে করে যেন আমার সঙ্গেই, আমার বাড়িতেই থাকে। আমি ছেলে হয়ে কখনোই বাবা আর মাকে ছেড়ে যেতে পারবো না বাকি সব ভাইদের মতো করে। সত্যি ভালোবাসলে সে যেন চলে আসে আমার কাছে। আমরা বিয়ে করে একটা সংসার গড়বো। সে মেনে নিয়েছে। সে সবকিছু মেনে নিয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়েছে, ভাই। আমার খুব ইচ্ছা, আপনি আর বোন আমাদের বাড়িতে আর একবারের জন্য ফিরে চলুন।”
খুব সম্মান ও প্রতিহত দিয়ে কথাগুলো বলেছিল সেই দিন কাফেল। তবে আমার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। আমি তখন বললাম,
– “এই কার্ড আমাকে না দিয়ে যেন দৌরুতিকে দেওয়া হয়। সে যা বলবে, তাই হবে।”

তারপর দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন হয়। কেউ কারো সঙ্গে কোনো একটা কারনে কথা বলতে পারছে না যেনো। কাফেল বসে থাকে তখনও। এর কারণ, বোনের সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরবে সে। তৌকির একটু পর আবার লোহা পেটাতে শুরু করলো। খানিক সময় পরেই তৌকির তাঁর দিকে তাকিয়ে আগের চিন্তায় ডুব মারলো। এই তো সেই দিনের কথা, যখন তৌকির আর দৌরুতি একে-অপরের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হতেই দরোজায় তার সামনে পড়ে যায় তাঁরা দুইজন।
“তার বোনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?” ‘সে এই প্রশ্ন করায় তৌকির বলেছিল,
– “যেটা আগে করার দরকার ছিল, আজকে করছে সে। তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আলাদা একটা সংসার গড়তে যাচ্ছে।”

যাওয়ার পথে তৌকির কাফেলের দিকে তাকিয়ে ফিরে বললো,
– “আর হ্যাঁ, আপনারও কিন্তু উচিত সঠিক ভালোবাসা খুঁজে নেওয়া। আপনি যদি মনে করে থাকেন, আপনার ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসার কাছে যেতে হবে, তাহলে ভুল ভাবছেন। ভালোবাসা নিজ ইচ্ছায় আপনার কাছে এসে ধরা দেবে। তাই বলছি, অন্যের জন্য জন্মদাতা মা-বাবাকে ছাড়ার কথা কল্পনাও করা ভুল। মেয়েটা সত্যি যদি আপনাকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে নিজ ইচ্ছায় আপনার কাছে ছুটে আসবে। এত বাহানা কখনো সে করবে না। আমি আসি।”

কথাগুলো বলার মাধ্যমে বুঝতে পারলো, সেই দিন দুই ভাই-বোন কথা বলার সময় তৌকির আগে সব শুনে ফেলেছিল। তবে কেন জানি তার কথা কাফেলের খুব মনে ধরে গিয়েছিল। তৌকিরের কথা অনুযায়ী কাফেল নিজেই সে মেয়েটাকে আসতে বলে। সে যেতে পারবে না তার কাছে। নিজের সবকিছু ছেড়ে ,এটা তার কাজ নয়।

এরপর কাফেল বাড়িতে প্রবেশ করতেই সব ঘটনা জানতে পারে। তবে তার মধ্যে রাগ কাজ করে না। কেন জানি খুশিও হতে পারলো ন সে। তবে তার মনে হতে লাগলো, সবকিছুই ঠিক আছে কাফেল।
বাড়িতে ঢুকেই আলফা খানমকে অসুস্থ অবস্থায় পায় সে।

অনেক সময় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো কাফেল।
একটু পর খেয়াল করলো রাস্তার অপর প্রান্তে একটা কালো বোরখা পরিহিত মেয়ে হাতে খাবারের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা ও শরীরের কোনো চিহ্ন বোঝার উপায় নেই মেয়েটার। পরনের বোরখা যে বেশ দামি টাকার হবে, তা-ও নয় কিন্তু।

খাবারের বাটি নিয়ে এসে সামনে রেখে ইশারায়ই কাফেলকে কিছু বললো দৌরুতি। কাফেল তা দেখে আহ্ করে তাকিয়ে রইল। প্রায় আট মাস পর নিজের বোনকে এমন দেখে সে সত্যিই অবাক হয়েছে। সে অনেক সুখে আছে, তা বোঝার উপায় যথেষ্ট বুঝতে পারছে ও দেখছে সে।

তার মধ্যে হঠাৎ করে তৌকির বললো,
– “আপনার বোন আপনাকে সালাম করেছেন।”

কাফেল চোখ নামিয়ে সালামের উত্তর দিল। একইভাবে তাকেও কার্ড দিল, কিন্তু দৌরুতি ইশারায় না করে দিল। সে আর কখনো ওই বাড়িতে যাবে না, যে বাড়িতে তার স্বামীকে খুব তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করা হয়।
কাফেল সব বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে শেষ বারের মতো সেই দিন দৌরুতিকে বলেছিল সে,
– “আচ্ছা, তোকে আমার বিয়েতে আসতে হবে না। শেষ একবারের জন্য মাকে দেখতে আসিস। মা এখন প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মা তোমাদের কথা প্রায় বলে। যদি আসো, তো খুব ভালো লাগবে।”

এই কথা শুনে সেই দিন দৌরুতি তৌকির এর দিকে তাকিয়ে রইল। তৌকির একটা প্রশ্ন করলাম, যেমন,
-“কি করে এমন হলো?”

কাফেল তখন বললো,
– “তোমরা বাড়ি ছাড়ার পরেই এমন হয়েছে।”
তবে এটা মায়ের আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল। সেটাকে তাঁর কাজের জন্য এতট সে নিজেই ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি।”

সেই দিন আমরা তোমার নানীর সঙ্গে দেখা করতে যাই। দেখা করার কিছু দিন পর শুনতে পেলাম, তিনি মারা গেছেন।
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
“দুই বাপ-ছেলে একসঙ্গে বলে উঠলো।”

তৌহিদ বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
-“এরপর আর কখনো যাওয়া হয়নি নানী বাড়িতে?”

তৌকির বললো,
-“না, আর যাওয়া হয়নি। জানাজার সময়ে একবার।”

তৌকির তাঁর ছেলেকে সব কথা বলে তার ছেলে তৌহিদ এর কপালে চুমু দিয়ে আবার কিছু কথা বললো,
“শোন বাবা, একটা কথা বলি। তোমার জীবনে এমন অনেক মানুষ আসবে। তবে তুমি শক্ত হয়ে সামনে দাঁড়াবে। কোনো কিছুতেই থেমে যাবে না তুমি। দুনিয়া ও জীবন পরীক্ষাশালা, এখান থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। এই যেমন তোমার জীবনে অনেক মানুষের আগমন হবে। কেউ ঠকাবে, কেউ শেখাবে, কেউ বা মায়ায় ফেলে চলে যাবে। কেউ তোমার বিশ্বাস অর্জন করবে আর সব সময়ের জন্য তোমার মায়ের মতো পাশে থাকবে।”

কথাগুলো শেষ হতেই পেছন থেকে দৌরুতি ছোট্ট বাচ্চা ছেলে তৌহিদের কান চেপে ধরে ইশারায় বললো,
-“পড়ার টেবিল ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।”

তৌহিদ মায়ের কাছ থেকে নিজের কান ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে ঘরে চলে গেল। তারপর দৌরুতি তৌকিরের কাছে বসে ইশারায় বললো,
-“সে আজকে কি খাবে?”
দৌরুতির হাত শক্ত করে ধরে তার কাছে টেনে নিল তৌকির বললো,
-“যা তুমি খাওয়াবে আজকে। আর শোন কিছু কথা বলি আমার এই জীবনে আবার শুরু হলে তুমিই কিন্তু শেষ ও তুমিই বাকুমবতী। তোমার কি মনে হয় না, ইতিকে ছেড়ে দেওয়া উচিত?”

দৌরুতি তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বাহিরের বারান্দায় দৌড়ে গিয়ে পাখির খাঁচা নিয়ে আসলো তার কাছে। এরপর আগের সবকিছু মনে করে জানালার পাশে গিয়ে ছেড়ে দিল ইতিকে। উড়াল দিল পাখি খোলা আকাশে আপন তরে।

তৌকির তাঁর কাছে গিয়ে দৌরুতির কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,
– “তুমি কথা বলতে পারো না, দৌরুতি? কিন্তু তুমি তো চোখে হাজার খানিক শব্দ বুনন করো। তুমি মনে মনে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করো। তুমি আমার বাকুমবতী, তা কি জানো?শোন দৌরুতি, দ্বিতীয় বার যদি নতুনভাবে জীবন শুরু করে নিতে পারতাম, সেই জীবনেও তুমিই হতে আমার প্রথম স্ত্রী।”

“আমার ভেঙে পড়া ভরসাহীন জীবনে তুমি ছিলে শিশিরকণা। আমার সব নেগেটিভ চিন্তাকে তুমি শেষ করে আমার অন্তরে জায়গা করে ফেলেছ। আমি হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর তোমার হাতটা ছাড়তে পারবো না।

তুমি ছিলে আমার প্রতিটি কাজে। কখনো এটা বলোনি যে, এই কাজের জন্য তোমাকে লজ্জায় পড়তে হতে পারে। আজ আমি অনেক বড় বুটিকসের দোকানের মালিক, শুধু তোমার আর আমাদের সন্তানের জন্য।
তুমি আমার বেরঙিন ঘরকে যখন প্রথমবার এসেই পাকা গিন্নির মতো গুছিয়ে দিয়েছিলে, আর আমি কাজ হারিয়ে ক্ষুধার্ত পেটে ঘরে ঢুকেছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল এই দুনিয়ায় মধুর সম্পর্ক ছিল পবিত্র স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। নিজ হাতে যখন তুমি পানি এগিয়ে দাও, তখন নিজের কষ্টকে কিছুই মনে হয় না আমার।
আমি বুঝেছি, ভুল মানুষ আসে। তারা আসে মানুষ চেনাতে। আর কিছু মানুষ আসে সঠিক হয়ে, ভুল থেকে ফুলকে চেনাতে।”

—— সমাপ্তি ——

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-৭+৮

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৭ + ৮||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

দৌরুতি বাড়ি থেকে আসার পথে তৌকিরকে ইশারায় একবার বলেছিল যে, সে যেন প্রাইভেট কারে করে যায় বাড়ির গাড়িতে। কিন্তু তৌকির দৌরুতিকে মুখের উপর মানা করে দেয় আর বলে, সে যদি তার সঙ্গে যায়, তো তার সাথে সে যেখানে করে নিয়ে যাবে ঠিক সেখানেই চড়ে যেতে হবে তাকে। দৌরুতি আর কিছু বলে না। দৌরুতি তারপর থেকে পুরো রাস্তায় একদমই চুপ হয়ে যায়। এবং চুপচাপ কোনো কথা ছাড়াই চলে সে।

তারপর একটা রিকশা করে সোজা হাসপাতাল চলে যায় তারা। জেসমিন যে কেবিনে ভর্তি আছে সেই রুমে চলে যায় দুইজনেই। দৌরুতি তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে।

কেবিনে গিয়ে যা দেখে তা দেখার জন্য দুইজনেই প্রস্তুত ছিল না। জেসমিনের মুখে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পাশেই সজিব দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। সজিবের চোখ লাল হয়ে গেছে। তৌকিরের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল যেন। সে আস্তে আস্তে জেসমিনের কাছে গিয়ে তার মুখ থেকে সাদা কাপড় সরিয়ে দিল। সজিব তৌকিরকে তার পেছন থেকে বলল,
– “আজকে দুপুর এগারোটা থেকে ধরে বারোটা পর্যন্ত তোকে অনেক ফোন করছি। ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল বারবার। জেসমিন দুপুর বারোটার দিকে ইন্তেকাল করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। নিজের দুই হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে নেয় সে। মেয়েটাকে যে বোনের মতো ভালোবেসেছিল সে, সে ভাবতেই পারছে না এতো অল্প বয়সে দুনিয়া ছাড়বে সে।

তৌকিরের চোখ নোনা পানিতে ভরে গেছে। সজিব যে তাকে এত কথা বলল, সেই কথা গুলো যেনো তার কান অব্দি গেল না। সবকিছু থমকে দাঁড়িয়ে গেছে যেন তার কাছে। দরজায় দৌরুতি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি হঠাৎ করেই এত খারাপ সময়ের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। দৌরুতির কণ্ঠ থেকে আওয়াজ না আসলেও চোখ দিয়ে অনবরত টুপটুপ করে পানি পড়ছে।

একটু পর কিছু ডাক্তার এসে সজিবকে কী যেন বলল, সেই দিকে দৌরুতি ও তৌকিরের মধ্যে কারোরই খেয়াল নেই।

তৌকিরের কানে কোনো প্রকার আওয়াজ যাচ্ছে না। একটা কথাই বারবার বাজতে শুরু করে, জেসমিন ইন্তেকাল করেছে। ছোট বোনের হাত শক্ত করে ধরতেই গুটিকয়েক লোক এসে তাকে নিয়ে গেল। মনে হলো এই বুঝি পাখি উড়াল দিল আপন ঘরে। ধপাস করে নিচে বসে পড়ল তৌকির। শরীরের সব শক্তি যেন হারিয়ে গেছে তার। তা দেখে দৌরুতি ছুটে গেল তৌকিরের কাছে। সেও তার সঙ্গে নিচে বসে পড়ল তৌকিরের পাশে, তৌকিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। তৌকির দৌরুতিকে আর সরিয়ে দিল না। দৌরুতিকে ধরেই সে গলা ছেড়ে কান্না করতে করতে বলল,
-“আমি আমার বোনকে শত চেষ্টা করেও ধরে রাখতে পারলাম না। আমার বোনের ভাগ্য খুব খারাপ, সে সবার কাছে বোঝা হয়ে থেকেই গেল। আমি তার শেষ কথাটুকুও রাখতে পারলাম না।”

দৌরুতিও নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে থাকল। তৌকিরকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।

ওই দিকে সজিব জেসমিনের মৃত লাশের সঙ্গেই বেরিয়ে গেল। তাকে তো দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মধ্যে কেউ এটা আশা করেনি যে জেসমিন তাদের রেখে এত তাড়াতাড়ি পরপারে পাড়ি জমাবে।

————–

দুপুর শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামতেই জানাজার ব্যবস্থা করা হলো। অনেক সময়ের পরেও যখন কেউ বাড়িতে ফিরছিল না, ঠিক তখনই জয়নাল শেখ তৌকিরকে ফোন করে। আর সেই ফোন সজিব কানে ধরে সবকিছু খুলে বলাতেই কাফেলসহ জয়নাল শেখ চলে আসে এবং কাটিয়া ধরে। সজিব ও তৌকির সামনের কাটিয়া ধরে নিয়ে যায়, পেছনে দুই বাপ-ছেলে ছিলো।

কবর দেওয়ার পরে তারা বাড়িতে কোনো মতে ফিরে আসে। আল্লাহ কখন কাকে ডেকে নেবে এটার সঠিক সময় হয়তো কেউ জানে না। একদিন সবাইকে দুনিয়া ছাড়তে হবে, তাও আবার একা একা।

বাড়িতে ফিরেই তৌকির দৌরুতিকে বলে দেয়, -“একদিনের জন্য যেন সে তাকে একা ছেড়ে দেয়।”

তারপর তৌকির ঘরে ঢুকেই নিজের কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তা সবকিছু দৌরুতি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিল না। তৌকির বাইরে যেতেই দেখল, সজিব রিকশা নিয়ে বসে আছে। রিকশায় দুইজন চেপে কোথাও চলে যায়।

জানালার মুখ থেকে ফিরতেই আলফা খানমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। দৌরুতি ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কেন সে এইখানে হঠাৎ করে?
কখনো তো তিনি ভাবতেনই না যে উপরের ঘরে তার একটা বোবা মেয়ে বসবাস করে।
আলফা খানম মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
-“এমন করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছো যেন মা তোমার শত্রু। ব্যাপার কী বলো তো?”

দৌরুতি কিছু ইশারায় বলল না। পাখির খাঁচার কাছে গিয়ে ইতিকে কিছু দানা খেতে দিল।

তা দেখে আলফা খানম নিজ থেকেই বলল শুরু করলো,
-“তোমার গরিব স্বামী তো ঘর ছেড়ে চলে গেল। আমার ভয় করছে এই ভেবে যে তোমাকে বস্তুর মতো ব্যবহার করে না ফেলে রেখে চলে যায়। মা হয়তো একটু বেশিই চিন্তা করি তোমার জন্য।”

দৌরুতি এবার খুব বিরক্ত অনুভব করল তার মায়ের কথা শুনে। আজ পর্যন্ত যে মা কখনো এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেনি, “তুমি ঠিক আছো?” আর আজ নাকি তার জন্য চিন্তা করছে! খুব হাস্যকর লাগল কথাটি তার কাছে।

মায়ের কাছে গিয়ে ইশারায়ই বলল,
– “সে যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়, এই দৌরুতি কখনো তার হাত ছাড়বে না। খুব শক্ত করে ধরবে তার হাত। আর কখনো কেউ তাদের আলাদা করবে না। কেবল তো শুরু হয়েছে। এটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হবার নয়। পাঁচ-দশটা নাতি-নাতনি দিয়ে তাকে অবাক করে দেবে তারা।”

আলফা খানম মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসি হেসে চলে গেল। যাওয়ার পথে অবশ্য বলে গেল,
– “এই রাস্তার ছেলে গুলো আবার রাস্তায় ফিরে যাবে। তাদের কাছে টাকা সব। ওরা টাকার পেছনে ছুটে চলা মেশিন, তোমার মায়ের মতো। দেখবে, তোমাকেও একদিন ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে, এটা তোমার মায়ের গ্যারান্টি দেয়া কথা।”

“আর হ্যাঁ, সব সময় যে বাবার কথা শুনেই চলতে হবে এমন কিন্তু না। মাঝে মধ্যে মায়ের কথাও তোমার শোনা উচিত। মা কিন্তু তোমার খারাপ চায় না, দৌরুতি।”

দৌরুতি মায়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। সে মন থেকে বিশ্বাস করে তৌকির তার বিবাহিত স্বামী। এই কয়দিনে তার প্রতি বিন্দু পরিমাণ হলেও মায়া জন্মেছে। সে আরো বিশ্বাস করে, একদিন দৌরুতি তৌকিরকে তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে নিজের করে নেবে।
একটু পর কাফেল ঘরে চলে আসে আর দৌরুতিকে বলে,
– “তৌকির কি যেনো ওই ছেলেট, তোর স্বামী যাই হোক ওর বন্ধুর বাড়িতে আছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে চলে আসবে। আর হ্যাঁ, ছেলেটা তোকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে বলেছে। সে আমাকে বলল, সে শুকনা বউ একদমই পছন্দ করে না।”

কথাগুলো বলেই দৌরুতির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো কাফেল। দেখল বোনের চোখ লাল হয়ে আছে। চোখভর্তি পানি জমে গেছে। তা দেখে কাফেল নিজের মতো করে বলল,
-“আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবি দৌরু? আমার বুকে ব্যথা করছে, একটু ধর।”

দৌরুতি বুঝতে পারল কাফেল তার মনের কথা নকল করেই বলছে। তাই সে ভাইকে ঝাঁপটে ধরে কেঁদে দিল। কাফেল জানে, মায়ের সঙ্গে কথা বললেই তার মন খারাপ হয়ে ওঠে। মা তার সঙ্গে মন খারাপ করে দেওয়ার মতোই কথা বলে চলে যায়। তাঁর শক্ত বোন শুধু তার মায়ের কথা শুনে ভেঙ্গে পড়ে।

একটু পর কাফেলের বুক থেকে মাথা তুলে দৌরুতি ইশারা করে বলল,
-“একটু আগে যে কথাগুলো সে বলল, ওইগুলো কি আসলে সত্যি? তৌকির এমনটা বলেছে তাকে?”

কাফেল শুধু হ্যাঁ বলল।

চলবে…….
#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৮||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

এই দুই তিন দিনের মধ্যে কাফেল জয়নাল শেখকে অনেক বার বুঝিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেছে। তাঁকে যেন যেতে দেওয়া হয় কানাডায়। জয়নাল শেখ উল্টো তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। আর এইও বলে দিয়েছে, ফালতু সবের জন্য তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই।

কাফেলে তার বাবা জয়নাল শেখের উপর বেশ বিরক্ত হয়। কিন্তু মুখের উপর কিছুই বলতে পারে না সে। হয়তো বললে ছোট ভাইয়ের মতো একেবারের মতো ঘরছাড়া হতে হবে। দৌরুতিকেও কিছু বলতে পারে না সে। মেয়েটা মনমরা হয়ে ঘরের মধ্যে থাকে সবসময়। বাইরে কম বের হয়। কারো সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না।

তাই আর কাফেল এই সব নিয়ে বোনকে কিছু বলতে পারে না। যদিও কাফেলের খুব বিশ্বাস যে দৌরুতি পারবে বাবাকে রাজি করাতে, কিন্তু মেয়েটা নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখে দিয়েছে।

বাড়ির কাজের লোক প্রতিদিন তিন বেলা ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসে দৌরুতিকে। কিন্তু কোনো সময়ই খাবার প্লেটে পড়ে থাকে, যেমন দেয় ঠিক তেমনই। মন চাইলে খাই নয়তো না। শরীর এর দেখভাল করতেও সে যেনো ভুলে গেছে।
——–
জানালা খোলা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। সকালের মিষ্টি আলো সোজা এসে দৌরুতির চোখে পড়লো। আজ দিয়ে চার দিন হয়ে গেছে তৌকির আসেনি বাড়িতে। প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টা মিনিটের মতো দরজা তাঁর জন্য খুলে রেখে দিয়ে তাকিয়ে থাকে কখন আসবে সে। এখন তো আশাও ছেড়ে দিয়েছে।

মনে মনে অনেক কথা বুনে ফেলেছে সে। এই যেমন, সে ভাবে ও মনে মনে বলে,
-“তৌকির সাহেব, হয়তো আপনি জানেন না।
এই ঘরের চারটা দেয়াল আমার ছোটকালের সঙ্গী। আপনি চলে গেলে ভয় পাবো না। ভয় পাওয়া শব্দটা আমার জন্য মৃত। তবে নিজেকে খুব কঠিন করে একা করে ফেলবো। আবার ফিরে যাবো বন্দি স্তরে।”

আপনাকে হারানোর ভয় আমি পাই না, তবে নিজেকে খুব একা আর দুর্বল মনে হয়। আমি সবার কাছে মনে হয় তামাশার পাত্রী হয়ে যাচ্ছি।”

এই সব ভাবতে চোখের কোণে জল জমতে শুরু করলো তার।

নিজের মনে মনে এমন হাজারো কথা বলতে থাকে সে। আজও জানালার পাশে চেয়ারে বসে বাইরে বকুল ফুলের গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল। আর তার চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লো সে। কিন্তু হঠাৎ করে বাইরে থেকে প্রচুর চেঁচামেচির আওয়াজ আসতেই দৌরুতি সেই দিকে ছুটলো।

উপরের ঘর থেকে নিচে নেমে আসতেই দেখলো, আলফা খানম ও তৌকির একে অপরের সঙ্গে রাগারাগি করছে। ভীষণ রকমের ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বাবা জয়নাল শেখ। সবে সকাল সাতটা বাজে তখন।

আলফা খানম বেশ লজ্জাজনক কথা বলছে তৌকিরকে। এই যেমন,
-“এটা কি বাপ-দাদার হোটেল রুম পেয়েছো? যখন ইচ্ছা আসবে, আবার দুই তিন দিনের জন্য হারিয়ে থাকবে! এই সব যত চোরদের তো কোনো গ্যারান্টি নেই। কখন কী আবার চুরি করে নিয়ে বাড়ি থেকে ভাগবে! প্রথমে তো বোনের নাম দিয়ে প্রচুর পরিমাণে অর্থ খরচ করিয়েছে। এখন আবার নাটকীয় কথা শুনাচ্ছে। রোজগার করে সব টাকা পরিশোধ করবে! তোমাদের মতো ছেলেদের খুব ভালো করে জানা আছে আমার। বাপ-দাদার আমলেও তো মনে হয় এত টাকা দেখেনি চোখ দিয়ে। আবার লাফ দিয়ে করলো কী, বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করে ফেললো। কত চালাক এই ছেলেটা! মনে মনে যে তোমাদের মতো ছেলেরা কত ফন্দি আঁটে, তা আমি খুব ভালো করে জানি।”

কথাগুলো শুনে তৌকিরের মাথা নিচু হয়ে গেল। সে বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এই মহিলা তাঁকে একের পর এক অপমান করছে। কিন্তু তাঁর কাছে এই কথাগুলো শোনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সত্যি তো, সে কি বেইমানি করে ফেললো না? নিজের বোনকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আরো একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিল সে। আর সে কখনো ভেবেই দেখলো না, আদৌ মেয়েটাকে কি তার অন্তরে স্থান দিতে পেরেছে কি না।

এগুলো ভাবতেই তার মুখের শব্দগুলো হারাতে শুরু করলো। শান্ত কণ্ঠে মাথা নিচু করে বললো,
-“আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু আমার এসবের কিছুর লোভ নেই। আমি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। আর রইলো টাকা, হয়তো সব টাকা একবারে দেওয়া আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তবে আস্তে আস্তে দিয়ে দিবো। আমাকে একটু সময় দিবেন।”

দৌরুতি মায়ের সামনে দাঁড়াতেই আলফা খানম চুপ হয়ে গেলেন। দৌরুতি তৌকিরের মাথা উঁচু করে তুলে তাঁর মায়ের হাত খামচে ধরে ইশারায় বললো,
-“এই বাড়িটা আমারও। এখানে আমার সমান অধিকার আছে। তবুও আমিও আমার স্বামীর সঙ্গে এই বাড়ি ছাড়তে চাই।”

রাস্তায় বাস করা মানুষদের সঙ্গে থাকা যায়, কিন্তু কোনো অহংকারী মানুষের মধ্যে এবং তাদের সঙ্গে নয়, তা দৌরুতির নখের আঁচড়ের ভাষাই বলে দিচ্ছিল।

ওই দিকে জয়নাল শেখ বারবার তাদের ঝগড়ার মধ্যে সতর্ক করার পরেও যখন আলফা খানম একের পর এক অপমান করছে তৌকিরকে, ঠিক তখনই কান বরাবর একটা থাপ্পড় মেরে বসলো তিনি। থাপ্পড় গালে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে রইল।

জয়নাল শেখ খুব বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর চেহারা দেখলেই খুব ভালো করে বোঝা যায়, তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ছাড়াছাড়ি, ফিরে আসা, আলাদা হওয়ার ভিড়ে অনেক কিছুই সহ্য করলেও আজ কিছুই সহ্য করতে পারলেন না তিনি।

তৌকিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“দেখো ছেলে, নিজে এবং বউকে সুখে রাখতে চাইলে তোমাকে এই বাড়ি ছাড়তে হবে। বাড়িতে অর্থের সুখ থাকলেও মনের সুখ কখনো খুঁজে পাবে না তুমি। তাই বলছি, চলে যাও। আর হ্যাঁ, অবশ্যই নিজের বউকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। সে কিন্তু এই বাড়ির মেয়ে আর নয়। যেই দিন তাকে কবুল বলেছো, সেই দিন থেকে ও তোমার হয়ে গেছে। তাই আমি বাবা হিসেবে তার কাছে পর। আমার সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তা হলো –দৌরুতি শেখ থেকে দৌরুতি মেহেত হয়ে গেছে। তৌকির আহমেদের বিবাহিত স্ত্রী, দৌরুতি মেহেত।”

“বাকি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে আমি নেই, বাবা। খুব ভালো হবে এখনই যদি কিছু চিন্তা করো তুমি।”

তৌকির বেশ কিছুক্ষণ দম নিয়ে দৌরুতির দিকে তাকালো। দৌরুতি তার পাশে গিয়ে শক্ত করে তার হাত ধরে নিল। তা দেখে আলফা খানম বুঝে গেলেন, তার মেয়ে এই ছেলেটার সঙ্গে বাড়ি ছাড়তে চাইছে।
নিজের রাগকে সামলাতে না পেরে জোর করে তৌকিরের হাতের মুঠো থেকে দৌরুতির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে জয়নাল শেখ আবারও পথ আটকালেন আর বললেন,
-“মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আলফা? দৌরুতিকে ছেড়ে দাও। সে ওই ছেলেটার সঙ্গেই যাবে বাড়ি থেকে। তুমিই তো চাইতে না যে ছেলেটা থাকুক।”

ঠিক তখনই আলফা খানমের চোখেমুখে কিছু একটা হারানোর ভয় জেঁকে বসলো যেন। তৌকিরের কাছে গিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে বললো,
-“দেখো ছেলে, যত ইচ্ছা এই বাড়ির টাকা-পয়সা শেষ করো। আর কখনো কোনো দিন কিছু বলবো না আমি। কিন্তু আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে দূরে সরানোর কথা মাথায়ও এনো না, ঠিক আছে?”

কথা শেষ করেই একটা পাগলাটে হাসি দিয়ে বসলো। তারপর দৌরুতির কাছে গিয়ে তাঁর চোখমুখে হাত দিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে বললো,
– “আমি এবার থেকে আর তোমাকে ঘরে বন্দি করে রাখবো না, মা। কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবো না।”

তৌকির আর দৌরুতি একে অপরের মুখোমুখি তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আরো কী বললো আলফা খানম, তা তাদের কান পর্যন্ত গেল না। তৌকির আলফা খানমের চোখের সামনে দৌরুতির হাত শক্ত করে ধরে নিয়ে গেল রজারের দিকে।

পেছন থেকে আলফা খানম ছুটতেই যাবে তাদের ধরতে, কিন্তু জয়নাল শেখের হাতের মুঠোয় তাঁর হাত বেঁধে পড়েছে।

চলবে…..

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-০৬

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৬||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

আলফা খানম অনেক রাত করে বাড়ি ফিরছেন,এটা নতুন না। নিজের ঘরে চেয়ারে বসে জয়নাল শেখ চা খাচ্ছেন আর বই পড়ছেন। আলফা খানম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে বসে নিজেকে পরিপাটি করে নিচ্ছে। তা অবশ্য জয়নাল শেখ বেশ খেয়াল করছেন। বয়স বাড়লেও নিজেকে বয়স্কদের থেকে বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখেন তিনি। নিজের একটা আলাদা ফ্যাশন আছে বলা যায়। হাতে-পায়ে লোশন মেখে মাথায় চিরুনি করতে করতে বলল,
-“বাহ্ জয়নাল, তুমি দেখি টাকা দিয়ে মেয়ের জামাই কিনে এসেছো! আজকাল ভালোই টাকা দিয়ে মেয়েকে সুখ কিনে দেওয়া হচ্ছে। বাবা হয়ে এমন কী করে পারলে তুমি? আমি মেয়েটাকে দেখভাল করিনি বলে দিনে কত কথাই না শুনিয়েছো, আর আজ মেয়ের মন নিয়ে খেলা করছো! দৌরুতি কিন্তু আর ছোট বাচ্চা নয় যে তুমি তাঁকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখবে।”

জয়নাল শেখ চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“এই সব বিষয়ে তুমি জানলে কী করে? কে বলছে তোমাকে? বাজে কথা বলবে না, বুঝলে! আর ওরা একে অপরকে ভালোবাসে বলেই আমি নিজ দায়িত্বে কাজি অফিসে ওদের নিয়ে গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে এনেছি।”

আলফা খানম তাচ্ছিল্য হাঁসি হেসে বলল,
-“কি পাগল তুমি! ছেলে-মেয়ে সবার কাছে মিথ্যা বলা যায়, কিন্তু ঘরের বউয়ের কাছে যে মিথ্যা বললে একদিন ধরা পড়তেই হবে,এটা তোমাকে কেউ বলেনি? শোন জয়নাল, ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছো। ব্যাংকের লোকদের বলে আসতে তো পারতে! এতগুলো টাকার ব্যাপার লুকাতে তো আর পারলে না তুমি।”

জয়নাল শেখ ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“ওই টাকাগুলো আমার, তাই আমার প্রয়োজন পড়েনি আমি কাকে বলে খরচ করব। আর আমি আমার মেয়ের জন্য সব করতে পারি, আলফা। আর তুমিও তো ছোট ওই টাকার পেছনে পেছনে। মনে রাখো একদিন ক্লান্ত হয়ে আমাদের কাছেই তোমাকে ফিরতেই হবে, আরো মনে রেখো, টাকা সব না কিন্তু!”

আলফা খানম জয়নাল শেখের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমি টাকা ঘরে তুলে আনছি আর তুমি টাকা দিয়ে মেয়ের জন্য মিথ্যা সম্পর্ক গড়ে তুলছো। মা হয়ে তার কখনো খারাপ চাইনি, কিন্তু! হ্যাঁ, তার থেকে সব সময় দূরে থেকেছি। কখনো এমন কিছু হয়তো করিনি যাতে তাকে কষ্ট পেতে হয়। কষ্ট পাবে কেন? আমি তো কখনো তার কাছেই বসিনি। আর তুমি কী করলে, মেয়েটার সব থেকে আপন মানুষ হয়ে তাকে ডুবিয়ে দিলে! কখনো ভেবে দেখেছো, দৌরুতি ভালোবাসার মানুষ পেলেও মানুষটা তাকে ভালোবাসল কি না? এই ধরনের সম্পর্ক পাওয়ার থেকে না পাওয়াই ভালো আমার কাছে মনে হয় ।যাই হোক, আর এই ছেলেটাই বা কেমন? ছেলেটার বোন যখন বাঁচবেই না, কেন এত টাকা খরচ করে সে বোকার মতো হাসপাতালে ফেলে রেখেছে? বিরক্তিকর, বোকা সব!”

জয়নাল শেখ এই কথা শুনে রাগি মুখে তাচ্ছিল্য হাসি হেসে বলল,
-“তুমি সম্পর্কে রেখেছো নামে। তুমি নিজের স্বার্থে আমাকে বিয়ে করেছো, আলফা। তুমি রক্তের টান মানে বুঝবে না। ও হ্যাঁ, তুমি বুঝবে কী করে,তোমার তো আপন কেউ হারায়নি আজ পর্যন্ত! তুমি কি বলতে চাইছো, তৌকির জানে ওর বোন মারা যাবে, এর পরেও বেঁচে থাকা মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলবে? আমি বললাম না, তুমি ভালোবাসা, মায়া, টান—এগুলো কখনো ফিল করতে চাওনি। তবে আমারও ভরসা একটা জায়গায়, যে ছেলেটা তার বোনকে এত ভালোবাসতে পারে, না জানি আমার মেয়েটাকে কতোই না ভালোবাসলে কী কী করবে! আমি বিশ্বাস করি, একটা সময়ে আমার মেয়ে অনেক সুখী হবে। তাই বলছি, এসব নিয়ে আর কথা বলবে না। আর রইল আমার টাকার কথা, ওগুলো আমার টাকা। মানে আমার মেয়ে-জামাইয়ের টাকা। ওরা ইচ্ছে মতো খরচ করতে পারে। এতে আমার বিন্দু পরিমাণ আফসোস হবে না।”

আলফা খানম আর কিছু বলতে পারলেন না। দুজন দুজনকে কিছুক্ষণ দেখে নিল।

—————-

সকালে ঘুম ভাঙার পরপর তৌকির আর দৌরুতি একসঙ্গে নাস্তা করে নিলো। যাওয়ার পথে তৌকির দৌরুতিকে বলে যায়, রেডি হয়ে থাকতে। বিকেলের দিকে তারা বেরিয়ে পড়বে জেসমিনকে দেখতে যেতে।

বরাবরের মতোই আজও যে যার মতো ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু কাফেল দৌরুতির খাবার টেবিলে সামনাসামনি বসে একে অপরকে চোখে চোখে ইশারা করছে কিছু বলার জন্য। দৌরুতি তো তার বাবার উপর আগে থেকেই অভিমান জমে রেখেছে। তাই সে কাফেলকে বারবার ইশারা করে বলছে,
-“সে এই সব কথা বলতে পারবে না।”

কাফেল তবুও তার পিছু ছাড়ছে না। জয়নাল শেখ তাদের এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে একবার বলেছিলেন,
-“কিছু বলবে তোমরা?”

কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। সারাদিন এই করেই কেটে গেছে। কাফেল বেশ বিরক্ত হয় এবার দৌরুতির উপর। শেষমেশ হার মেনে ঘরে ফিরে, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে বাইক রেসে বেরিয়ে পড়ে। তার খেয়ে-দেয়ে কাজকাম নেই বললেই চলে। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাতে ঘরে ফিরে। অডগুটে কাজের জন্য বাবা জয়নাল শেখ কিছুটা অপছন্দের তালিকায় রেখেছে তাকে। ভালোবাসো ও খুব আদরের মেয়ে দৌরুতি, নয়তো সব ছেলের মধ্যেই কিছু না কিছু ঘাপলা আছে বা ছিল। এই তো ছোট ছেলের জন্য একবার পুলিশ স্টেশনে যেতে হয়েছিল। আর বড় ছেলে অন্যের মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। আর কাফেল তো মাঝে মাঝে মদ-মাদকে আসক্ত বলা চলে। রাতে ক্লাবেও কাটায় মাঝে মাঝে, অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে সে।

এত কিছু করেও কাফেলের লাভ হয় না। বাবার আর মেয়ের মন গলাতে পারে না, তার কাজও হাসিল হয় না।

————–

বিকেলে দৌরুতি গোলাপের রঙের আচলে সিলভার কাজ করা শাড়ি পরে, হাতে চুড়ি, কপালে টিপ পরে বেশ সেজেগুজে রেডি হয়ে গেছে। আর এটাও ভাবছে’ -এতে কি তাকে খারাপ দেখাচ্ছে? সে কি বেশি সেজে ফেলেছে নাকি? কী আজব! সে কারো বিয়ে খেতে যাচ্ছে নাকি? ঘুরতেও তো যাচ্ছে না সে! এই সব ভেবে অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। পায়চারি ও করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। তবুও বুকের একপাশে ধুকধুক বেড়েই চলেছে তার। আবার ভাবছে, পোশাক কি পরিবর্তন করা উচিত তার? তৌকির কি ভাববে,তার অসুস্থ বোনের জন্য তো তাকে নিয়ে যাচ্ছে!
এই সব ভাবতে ভাবতেই তৌকির চলে আসে। আর ঘরে এসেই কোনো কথা না বলে দৌরুতিকে দ্রুত বলে ফেলে,
-“কই, হয়েছে তোমার? এবার আমরা যেতে পারি। বেশি সময় থাকা যাবে না। এই তিন ঘণ্টার ছুটিতে আসলাম, আবার যেতে হবে রেস্টুরেন্টে।”

এই বলার সময় একবারও তৌকির দৌরুতির দিকে তাকিয়ে দেখল না বা খেয়াল করল না। তা দেখে দৌরুতি নিজেই তৌকিরের কাছে গিয়ে তার শার্ট খামচে ধরে ইশারা করে বলল, তাকে এই পোশাকে একদম মানাচ্ছে না। আর একটু সময় কি সে দেরি করবে? তাহলে পোশাক চেঞ্জ করত।

তৌকির এবার দৌরুতির দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নিল, আর বলল,
-“এই সাজ ঘরে মানায়, বাইরে না। এমন সাজ নিজের স্বামীর জন্য তুলে রাখা উচিত । তোমাদের বাড়ির কেউ হয়তো জানে না, মেয়েদের বাইরে বের হলে পর্দা করে বেরোতে হয়। যাই হোক, বোরখা আছে?”

এমন প্রশ্নে দৌরুতি তৌকিরকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আলমারিতে রাখা অনেক রঙিন সব গুলো টপ আর বোরখা দেখাল, যেগুলোতে চকচকে জরির কাজ করা। তৌকিরের এই সব ভালো লাগল না।

দৌরুতি তার চোখমুখ দেখেই বুঝতে পারল। তাই সে সাধারণ একটা টপ আর ওড়না দিয়ে হিজাব বেঁধে রেডি হলো।
সে ইশারা করে তৌকিরকে বলল,
-“আমার জামাকাপড়ের মূল্য বেশি হলেও দেখতে মোটেও ভালো নয়। তুমি কি তোমার কম রুজগারে একটা সস্তা বোরখা কিনে দেবে আমায়? আমি যত্ন করে রেখে দেব।”

তৌকির তার ইশারা না বোঝার ভান করে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।

চলবে…

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-০৫

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৫||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

পুরো ড্রইং রুম অন্ধকার রেখে দুই ভাই-বোন মিলে মুভি দেখা শুরু করেছে। দুইজনের চোখ টিভির পর্দায়। এই তো শুরুর দিকে মাত্র মুভিটি। কাফেল সোফার উপরে বসে আছে, আর দৌরুতি নিচে। কাজের মেয়ে জামিয়া এসে এক বাটি পপকর্ন দিয়ে চলে গেল, আর তার সাথে ফলের জুস। জামিয়া খালা ঘর থেকে যাওয়ার পথে অবশ্য বিরবির করে বলেও গেলেন,
-“মাগো মা, এমনে করে কেউ ঘর অন্ধকার কইরা ভূতের সিনেমা দেখে? আমার তো ঘরে অন্ধকার দেখেই ভয় করতাছে।”

অনেক সময় পার হয়েছে দেখে দৌরুতি কাফেলের প্যান্ট ধরে একটা টান মারে।
কাফেল দাঁত কেলিয়ে দৌরুতির দিকে তাকিয়ে বলে,
-“দেখ দেখ, এইবার বেশ মজা পাবি মুভি দেখে।”

দৌরুতি আরো একবার টান মারলো। তা দেখে কাফেল আবার বললো,
-“টানাহেঁচড়া করিস কেনো?”

দৌরুতি ইশারা করে বলতে লাগলো যে,
-“মেয়েটা কে? যার জন্য সে এত খুশি?”

কাফেল দৌরুতির কাছে সুরুত করে নেমে তার পাশে বসে তার হাত ধরে বললো,
-“আমার একটা সাহায্য কর। বাবাকে বলে আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দে। আমি বাইরে যেতে চাই এবং ওইখানে গিয়ে তাকে বিয়ে করে সেটেল হবো। আসলে মেয়েটা ওর ফ্যামিলির সঙ্গে কানাডায় থাকে, আর তুই তো জানিস বাবা আমাকে কখনো সেখানে যেতে দিবে না। হাজার খানেক কথা শুনাবে, বলবে আমার মাথা গরম, আমি ছোট, আমার রক্ত গরম, আমি এসবের যোগ্য না। আসলে তুই বুঝতে পারছিস দৌরুতি, আমি কি বলতে চাইছি? আমি চাই তুই বাবাকে বলবি আমি কাজের জন্য যাবো, দেশের বাইরে, নইলে সে যেতে দিবে না।”

কথাগুলো বলেই কাফেল টিভির দিকে আবার ঘুরে তাকিয়ে রইল। দৌরুতি কাফেলের দিকে ইশারা করে বললো,
-“তুই বলছিস আমি বাবাকে মিথ্যা কথা বলবো?”

আবার কি যেনো ভেবে দৌরুতি কাফেলের কাঁধে মাথা রেখে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো,
-“বাড়ি থেকে সে-ও বাকি ভাইদের মতো তাকে একা করে চলে যাবে? অন্ততপক্ষে এটা বলুক যে মেয়েটা কে ছিল?”
বেশ মনমরা হয়ে কথা গুলো বললো সে।

কাফেল তখন বললো,
-“এসবের মধ্যে সে আর যেতে চায় না। আর বিয়ে করলেই তো জানতে পারবি। তবে দৌরুতি যেন নিজেকে একা না মনে করে। তার সঙ্গে তার তিন ভাই আছে, তার দেখভাল করার জন্য। সে কিন্তু এই বাড়ির রাজকন্যা। কেউ যদি তাকে ধোঁকা দেয়, তাহলে কিন্তু তাঁরা তিন ভাই তাকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দেবে। এটা যেন সে মাথায় রাখে। আর হ্যাঁ, তুই একটু বাবাকে বলিস, বাবা তোর কথা খুব মানে।”

দৌরুতি খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো কাকে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে।

দুই ভাই-বোন আর কিছু না বলেই টিভির দিকে চোখ রাখলো।

একটু পর দরজা খোলার আওয়াজ পেতেই দুজন মিলে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ একজন আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে। তা দেখে দৌরুতি কাফেলের শার্ট খামচে ধরলো। কাফেলেরও ভয়ে কপালে ঘাম জমে গেছে। টিভিতে ভূতের মুভি, আর দরজায় জলজ্যান্ত ভূত, বাপরে, ভয় করবে না!
একটু পর কেউ বললো,
-“আমি কি ভিতরে আসতে পারি?”

পরক্ষণেই গলার স্বর শুনে চিনে ফেললো দৌরুতি, এটা আর কেউ নয়, তৌকির আহমেদ। তার বিবাহিত ভূত।

ঘরের লাইট জ্বালানো হলো সাথে সাথে। তৌকির দৌরুতি ও কাফেলের কাছে আসলো। আর তাদের অবাক করে দিয়ে নাক চুকিয়ে বললো,
-“আমিও কি তোমাদের সঙ্গে বসে মুভি দেখতে পারি?”

দৌরুতি কাফেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাফেল দৌরুতির দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাতে যাবো। তোমরা দেখো, আমি আসি।”

কাফেল কিছুটা ইগোর সঙ্গে চোখ বেঁকিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো সে।

তা অবশ্য তৌকির এর চোখ এড়াতে পারলো না।

দৌরুতির হাত কাঁপছে, ভিতরে একটা আনন্দও খুশি সব কাজ করছে। দৌরুতি ইশারা করে কাঁপা হাতে বললো,
-“সে দূর থেকে এসেছে, পোশাক পরিবর্তন করে আসুক।”

তৌকির তার কথা বুঝতে পেরে সেখানেই নিজের পরনের শার্ট খুলে রেখে দিল সোফায়। আর দৌরুতিকে বউয়ের মতো করেই হুকুম দিয়ে বললো,
-“শার্টটা ঘরে যেন রেখে দেই।”

দৌরুতি লক্ষ্মী বউয়ের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তৌকিরের পরনে শুধু সাদা একটা গেঞ্জি আর প্যান্ট ছিল।

দৌরুতি তৌকিরকে সোফায় বসতে ইশারা করলো। তারপর নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসলো। জামিয়া খালা চা বানানোর সময় তার দিকে আহ্ মুখে তাকিয়ে ছিল। বেশ লজ্জায় লাল মুখ হয়ে আছে, এটাও চোখে পড়লো। দৌরুতির যাওয়ার পথে তাকিয়ে ছিল সে।

চা এনে তৌকিরের সামনে রাখলো। তারপর এমন করে দাঁড়িয়ে থাকলো যেন এটা তার বাপের বাড়ি না, শ্বশুরবাড়ি, স্বামী অনুমতি দিলে সে বসবে।
তৌকির তাকে চোখের ইশারা করে পাশে বসতে বললো।দৌরুতি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তৌকিরের পাশে বসলো। তৌকির মুভির দিকে তাকিয়ে বললো,
-“এই মুভিগুলো দেখে এত ভয় পাওয়ার কি আছে বুঝলাম না। গাঢ় মেকআপ, চোখে-মুখে রং, তার সঙ্গে ভিন্ন রঙের কন্টাক্ট লেন্স। পোশাক কালো, দেখতে আজরাই ভাব লাগলেও ভয়ের কিছু না।”

দৌরুতি তৌকিরের দিকে থতমতিয়ে তাকিয়ে রইল।
ইমোট হাতে তুলে নিয়ে মুভি বদলিয়ে দিল তৌকির।
তৌকিরের চোখ টিভির দিকে থাকলেও হাত দিয়ে দৌরুতিকে নিজের কাছে টেনে নিল। দৌরুতির চোখ মার্বেলের মতো বড় হয়ে গেল। গলায় ধুকপুক করছে কিছু একটা।

তা অবশ্য তৌকিরের চোখ এড়ায়নি। তৌকির সামনে টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে দৌরুতিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
-“খেয়ে নিয়ে রুমে এসো, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার।”

একের পর এক অবাক করে দেওয়া ব্যাপার স্যাপার ঘটছে তার সঙ্গে। ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’, অপ্রত্যাশিতভাবে কাছে টেনে নেওয়া, স্বামী কি তার পাগল হয়ে গেল নাকি?

তৌকির আর দেরি না করে ঘরের দিকে চলে গেল। দৌরুতিও তার পেছন পেছন যেতে শুরু করলো।
ঘরে প্রবেশ করেই দেখলো,
তৌকির ওয়াশরুমে চলে গেছে। তা দেখে দৌরুতি খাটের পাশে আলগোছে বসলো। নিজের ঘরের সবকিছু যেন তার হজম হচ্ছে না আজ। যা পাবে বলে কল্পনা করেনি, তাই হয়তো হতে চলছে তার সঙ্গে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই তৌকির ওয়াশরুম থেকে মাথার কোঁকড়ানো চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসলো। আর বললো,
-“আমার জন্য কি রান্না করা হয়েছে? সকালে ব্যস্ত থাকায় কিছু খেয়ে যেতে পারিনি। কিছু রান্না করেছো?”

দৌরুতি তো কিছুই আর রান্না করেনি তা মনে হতেই ঘর থেকে ছুটে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই তৌকির তার হাত ধরে টেনে এনে খাটের পাশে বসিয়ে বললো,
-“আচ্ছা, এত ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। আমার কিছু কথা ছিল তোমাকে বলার।”

দৌরুতি কৌতূহলী হয়ে তৌকিরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তৌকির আর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। সে বলতে শুরু করল ,
-“আমার বোন জেসমিন তোমাকে দেখতে চায়। যদিও আমি মনে করি, তোমার মতো বড় ঘরের মেয়ে ওই সস্তা হাসপাতালে নাও যেতে পারো। তবে আমার খুব করে অনুরোধ থাকবে, একবার যেন কাল আমার সঙ্গে যাও, আমার বোনকে দেখতে।”

দৌরুতি ইশারা করে বললো,
-“সে এমন করে কেন বলছে? তার বোন মানে তো দৌরুতির বোন। সে অবশ্যই দেখতে যাবে।”

তৌকির আর কিছু বললো না। আবার আগের মতো মাথা নিচু করে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লো।
দৌরুতি তাকে একবার ইশারা করে বললো,
-“সে খাবার খাবে না?”

তৌকির দৌরুতির মতো করেই হাতের ইশারায়ই বুঝে তাকেও ইশারা করে পাশে শুতে বললো।

দৌরুতি গিয়ে তার পাশে শুয়ে পড়লো। এর মধ্যে কোলবালিশ রাখা ছিল। তৌকির কোলবালিশ সরিয়ে রেখে দৌরুতিকে আরো একবার কাছে টেনে নিল।
আর মনে মনে তৌকির বললো,
সবকিছুর একটা সমাপ্তি দরকার আছে। এখন নয় অভিনয়, কাল নয়, সত্যি। এছাড়া উপায় নেই আমি দেখছি না।

চলবে……

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-০৪

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৪||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

এটা কি ধরনের ভাষা জয়নাল? বস্তিদের বাড়িতে তুলে এনে দেখি তোমার ভাষাও বস্তিদের মতো হয়ে গেছে। আর মেয়েটাকে কী করে এই অভদ্র ছেলেটার সঙ্গেই ডুবিয়ে দিলে তুমি? ভুলে যাবে না তুমি, দৌরুতি কিন্তু আমারও মেয়ে।

আলফা খানম যখন “আমার মেয়ে” বললো,
তখন যেন আরও রাগ উঠে গেল জয়নাল শেখের মাথায়। কী করে সে বলতে পারলো যে দৌরুতি তার মেয়ে! আজ পর্যন্ত তো তার ভালো-মন্দের দেখভাল সে কখনোই করেনি। শুধু দৌরুতি না, বাকি আরও তিন ছেলে সন্তানের ও তার এমন অবহেলার শিকার হতে হয়েছে।

জয়নাল শেখ এক সময় আলফা বেগমকে খুব ভালোবাসতেন। তখন তার এমন আচরণ চোখে পড়তো না। নিজের কাছেও বাস্ত মনে হতো তাকে। সে সব দেখে জয়নাল শেখ, পুরুষ মানুষ হয়েও, মহিলাদের মতো করে বাচ্চাদের আগলে রাখতেন। আস্তে আস্তে যেন এই ধরনের আচরণ বাড়তে শুরু করলো। টাকা-পয়সা, সুখ পেলেও বাড়িতে যেন শান্তি নামক সুখ উঠে গেছে। এখন নামের স্বামী-স্ত্রী তারা বলা যায়। সমাজের চোখে টিকে থাকা এক মিথ্যা সম্পর্ক তাদের। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা এই সম্পর্ক রাখছে।
নয়তো কবেই সব শেষ হয়ে যেত।

জয়নাল শেখ রক্তিম চোখে আলফা খানমের দিকে তাকিয়ে রইল।

তা দেখে আলফা খানম আর কিছু না বলে উঠে নিজের কাজের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।

বাড়ির কাজের মেয়েটা জয়নাল শেখের কাছে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“বাবু মশাই, পাতিলে পান্তা ভাত রাখছি, খাইবেন?
আনবো? দৌরুতি মুনির রান্না দেখে রান্না করতে ভুলে গেছি গা, আনুম ভাত?”

জয়নাল শেখ আরও রেগে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
-“জামিয়া, সরে যা বলছি!”

জামিয়া খালা বলল,
-“বাপুরে বাপুরে, খারাপ কী কয়লাম!”

মনে মনে বিড়বিড় করে আরও বললো,
-“ঘরের বউয়ের উপর কথা কয়তে পারে না, আমার লগে চেঁচামেচি করে! মাইয়াডার বিয়ে দেয় খালি। এই বাসায় আমি আর কাম করতে কখনো আমুনা, পা ধরলেও আমুনা!”

———————

পিক পিক আওয়াজ হচ্ছে। বেডে মেয়েটা, তার শরীরে স্যালাইন চলছে, হাতে ক্যানোলা লাগানো। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে মেয়েটার।
পাশেই তসবিহ হাতে এক যুবক নামাজ পড়ছেন, জায়নামাজ সরিয়ে রেখে মেয়েটার কপালে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে বললো,
-“এই যে ছোট বোন জেসমিন, তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে তোমার নতুন ভাবিকে দেখতে যেতে পারবে। মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি ভালো করে দিবেন।”

কথা বলা শেষ হতেই কেউ দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বললো,
-“সজিব, মাফ কর, আজ একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে। কী আর বলবো বল, আজ রেস্টুরেন্টে অনেক কাজ ছিল। ওরা তাড়াতাড়ি আসতে দিল না আমায়।”

ঠিক তখনই কথায় আওয়াজ শুনে পিছন ফিরে সজিব তৌকিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আল্লাহ আল্লাহ! এসব কী বলছিস? আমরা না বন্ধু! আর জেসমিন তো আমারও বোন হয়, তাই না? যদিও আমারও কাজ আছে, তাই বলে এমন বলবি? তা তোরা আগে, না আমার কাজ আগে, বল তো?”

তৌকির সজিবের কাছে গেলো আর জেসমিনের দিকে একটু তাকালো। জেসমিন তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে দিলো।

সজিব ও তখন কাছে গিয়ে দোয়া পড়ে তৌকিরের মাথায় ফুঁ দিল।

তৌকির তখন বললো,
-“আজ একটু বেশিই জেসমিনের চেহারা ফ্যাকাশে লাগছে। ডাক্তার কি এসেছিল?”

সজিব তৌকিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“হ্যাঁ, দেখে গেছে। আর তুই জানিসই তো,আর নতুন কিছু ডাক্তারদের মুখে শোনতে পারবি না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তুই ওর সাথে কথা বলে আয়। তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।”

বলেই সজিব বাইরে চলে গেল।

তৌকির জেসমিনের পাশে গিয়ে বসলো, তারপর তার হাত ধরে কপালে আরেক হাত দিয়ে বুলিয়ে দিল।
জেসমিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললো,
-“ভাই, তুমি বলেছিলে আমি ভালো হয়ে ভাবিকে দেখতে যাবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি যেতে পারবো না। আমি চাই ভাবিকে দেখতে। তাকে আমার কাছে আসতে বলো। আমি দেখা করবো। রাতে আমার অনেক শরীর যন্ত্রণা করে ভাই, মাথা ব্যথা করে। কিছু একটা আমাকে ডাকতে আসে বারবার। আমি তাকে ফিরিয়ে দেই। স্বপ্নে দেখি আমি সাদা রঙের একটা জামা পরে প্রচণ্ড হাওয়ার মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছি। তুমি কাঁদছো, তোমার চোখে পানি। আমি হাত দিয়ে তোমার গাল স্পর্শ করতেই মা-বাবা এসে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না ভাই। মা-বাবার সাথে গেলে তুমি একা হয়ে যাবে।”

তৌকির জেসমিনের কথার কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। কণ্ঠনালিতে কথারা ব্যথা দিচ্ছে। প্রতিটি শব্দ গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে।

তৌকির তখন চোখ নিচু করে বললো,
-“কাল তোমার ভাবি আসবে তোমাকে দেখতে। আর হ্যাঁ, কখনো এমন কথা বলবে না। এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা মানায় না। কিছু হবে না তোমার।”

বলেই আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে, বেরিয়ে গেল।
বাইরে সজিব দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তারা একসাথে হাঁটতে শুরু করলো।
সজিব সময় নিয়ে বললো,
-“কিরে, মন খারাপ করে আছিস কেন? আজকে কি আবার ভাবিকে দেখতে চেয়েছিল জেসমিন?”

তৌকির শুধু “হুম” বললো।

সজিব আবার বললো,
-“তাহলে নিয়ে আসছিস না কেনো একবার দেখা করাতে? শুন, বিয়ে যখন করেছিস, তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দে। দূরে সরে রাখিস না।”

তৌকির তারপর বললো,
-“তুই সব জানার পরেও বলছিস! তুই তো জানিস আমার সাথে কী কী ঘটেছে। এত বড় ঘরের মেয়ে কি আমার মতো ছেলের সঙ্গে মিশতে পারবে? আমি তো তার নখেরও যোগ্য না। আমি তাকে হয়তো আমার জীবনে স্থান দিতে পারবো না।

আবার আমি ভয় করছি,এই স্ত্রীই না আবার অস্ত্র হয়ে আমার শরীর ভেদ করে দেয়! আমি আর বউ, অর্ধাঙ্গিনী,এই সবকিছুতে বিশ্বাস করতে পারি না।”

সজিব বললো,
-“আচ্ছা, তুই মেয়েটাকে কতদিন ধরে চিনিস? হতে তো পারে, মেয়েটা যেমন ভাবছিস তেমন না। আর বিয়ের পর তুই তাকে কতটা সময় দিয়েছিস? দেখ, সব মেয়ে একরকম না। যদি সব মেয়ে খারাপ হতো, তাহলে আমরা কখনো ভালো মা বোন পেতাম না, ভালো স্ত্রীও না। তুই ভাব, তোর ভাবি কেমন? মানে আমার স্ত্রী সে তো কখনো এমন করেনি।

কখনো কারো নফসে সমস্যা থাকে। সবাই খারাপ না, আবার সবাই ভালোও না। তুই কখনো কারো কাছে সমান হতে পারবি না। তাই বলছি, মেয়েটাকে একটু সময় দিয়ে দেখ।”

তৌকির আর কিছু না বলে দু’জনে মিলে বাইরে চলে গেল।

———–

কাফেল হাসিমুখে দৌরুতির ঘরে ঢুকে দেখলো, দৌরুতি ইতিকে খাঁচার মধ্যে খাবার দিচ্ছে। খাবার দিয়ে পিছন ফিরতেই সে কাফেলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললো,
-“সে এখানে কেন এসেছে?”

কাফেল হেসে বললো,
-“চল, আজ দুইজন মিলে মুভি দেখি।”

দৌরুতি ইশারায় বললো,
-“রাত অনেক হয়েছে, এই সময়ে না।”

কাফেল আবার হেসে দিয়ে বললো,
-“এই সময়েই তো বেশি মজা! মনে আছে ছোটবেলার কথা? চার ভাইবোন মিলে ভুতের মুভি দেখতাম। তুই কত ভয় পেতি! চোখ বন্ধ করে আবার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সব দেখতিস! শেষ পর্যন্ত কি হয় তার অপেক্ষায়।”

দৌরুতি মৃদু হেসে ইশারায় বললো,
-“হঠাৎ এই সখ জাগলো কেন? কারো প্রেমে পড়লি নাকি? আগে তো বোনের কথা এতো মনে পড়তো না।”

দৌরুতি কাফেল এর এমন আচরণ এর মানে বুঝতো।
সে খুব খুশি হলে টুপ করে দৌরুতির কাছে এসে এই আবদার টুকু করতো সে। আজো ব্যাতিক্রম নয়।

কাফেল দৌরুতির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
-“ধরে নে তেমন কিছু। এখন নিচে চল।”
বলেই দৌরুতির হাত টেনে নিচে নিয়ে গেল।

চলবে……..

মনে মনে ব্যাকুলতা পর্ব-০৩

#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৩||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা

ওয়াশরুম থেকে ফিরেই দেখল দৌরুতি প্যাকেট খুলে ফেলেছে, তাকে না বলে। প্লেটে ঢেলে প্যাকেটে রাখা সাদা ভাত ও মাছের ঝোল ঢেলে খাচ্ছে সে। এই ব্যাপারটা দেখে তৌকির একটু অবাকই হলো
“এ কেমন মেয়ে!” না বলেই তার খাবারের প্যাকেট খুলে খাবার খাচ্ছে। সারাদিন রেস্টুরেন্টে কাজ করে ছোট বোনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করে খাওয়ার সময় পায়নি, দেখে নিজের জন্য খাবারটুকু নিয়ে এসেছিল সে। খুদাই পেটের মধ্যে কী যেন গুতো মারছে তাকে। না খেয়ে সে একদম থাকতে পারে না, আজ কী করে জানি সারাদিন না খেয়েই ছিল।

ভেবেছিল, গোসল করে এসেই খাবারটুকু খাবে সে।
তার উপর একটু ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক দেখলও না মেয়েটা, যে পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা?
ভারি অদ্ভুত! একবার তাকে শুধাতে পারত, খাবারটা কার জন্য আনা হয়েছে?

তৌকির এক হাতের আঙুল দিয়ে নাকের ডগা চুলকাতে চুলকাতে দৌরুতির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

-“এটা আমার খাবার। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি আমার। আমি খাওয়ার জন্য এনেছিলাম। আপনি কি এখনো খাবার খাননি?”

দৌরুতি কথাটি শুনে একটু লজ্জা পেল। পাওয়ারই তো কথা—না বলেই কারো জিনিস নিয়ে ফেলেছে, আবার গ্রাসে গ্রাসে খাচ্ছেও সে। প্লেটে আর মাত্র দুই লোকমার মতো ভাত অবশিষ্ট রয়েছে। কী বলা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না সে।

ইশারায় সে বলল,
-“হুম, সে খাবার খাইনি। তবে কাল রাতে তুমি, আর এখন আপনি করে কেন বলছ?”

তৌকির দৌরুতির থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
-“অতিরিক্ত কিছুই আমার পছন্দ না। না পছন্দ অতিরিক্ত কথা বলা মানুষ।”

দৌরুতি তখনই ইশারায় বুঝিয়ে দিল,
কিন্তু! সে তো কথাই বলতে পারে না।

দুজনের মধ্যে আবার একটু চোখাচোখি হলো। দৌরুতি আবারও ইশারায় বুঝাল, সে কি এই বাকি টুকু খাবার খাবে? বাবার সঙ্গে রাগ করে সে আজ পুরো দিন কিছু খায়নি। তার খাবারটুকু খেয়ে ফেলেছে। সে ভেবেছিল তার জন্য হয়তো খাবার আনা হয়েছে।
সে ভুল ছিল, একটু বেশিই আশা করে ফেলেছে সে।

তৌকির আর কিছু বলল না। হাত ধুয়ে প্লেটে রাখা বাকি দুই লোকমা ভাত খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল তৌকির তার নিজের জায়গায় বিছানায় একপাশে গিয়া ঘুমিয়ে পড়লো।

দৌরুতি তখনও কিন্তু নিজের হাত ধোয়নি। এঁটো হাতে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল সে। একবার তৌকিরকে দেখেও নিল। আগের তৌকির আর এখনকার তৌকিরের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয়ে গেছে। সে যেন নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে ফেলেছে। সেই জগতে তাদের মতো মেয়েদের কোনো জায়গা হয়তো নেই। তবে দৌরুতি হালকা করে একটা হাসি দেয় তার দিকে তাকিয়ে। সে হয়তো তার জায়গা খুঁজে নেবেই ওই জগতেই, যা তৌকির তার মনে কল্পনা করে রেখেছে।

একটা সময়ে তৌকির খুব হাসিখুশি মানুষ ছিল। তৌকিরের সঙ্গে তার প্রথম দেখা ওই রেস্টুরেন্টে, যেখানে সে খাবার সার্ভ করে। এবং একদিন গিয়ে দৌরুতি দেখে একটা মেয়ের সঙ্গে মৃদু হেসে কথা বলছিল। সেটাই ছিল প্রথম দেখা। তৌকিরকে দেখার জন্য দৌরুতি তারপর থেকে প্রতিদিন ওই একই রেস্টুরেন্টে কফি খেতে যেত। আর দৌরুতি তা বইয়ের মধ্যে চোখ রেখে তাকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এই বিষয়টা বাবা জয়নাল শেখের চোখে পড়তে শুরু করল। তার পর থেকেই যেন দৌরুতির মনে একটু করে হাসির খরা জন্ম নিল।

অনেক দিন ধরেই রেস্টুরেন্টে যাওয়া-আসা চলত তার, তবে কখনো তাদের মধ্যে তেমন কথা হয়নি। একদিন দৌরুতি জানতে পারে, তৌকির বিবাহিত। তা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আরো একবার বন্দি করে ফেলে চার দেয়ালের মধ্যে। বাইরে যাওয়া-আসা কমিয়ে দেয় সে। বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই দৌরুতি আবার জানতে পারে নতুন খবর—এই যে তৌকির তার বিবাহিত স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছে। এবং তার ছোট একটা বোন আছে, আর সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে।
লুকিয়ে কিছু টাকা সে পাঠিয়েছিল তৌকিরের কাছে, নিজের পরিচয় গোপন করে। তবে তৌকির তা ফিরিয়ে দেয়। কেন দেয়, তা তার জানা ছিল না। এর পর বাকি সবকিছু তার কাছে ঘোলাটে।
হুট করেই একদিন বাবা জয়নাল শেখ দৌরুতিকে ঢেকে পাশে বসিয়ে বলল,
-“তুমি কি ওই রেস্টুরেন্টের ছেলেটাকে ভালোবাসো?”

সেদিন দৌরুতি বেশ লজ্জার সঙ্গে হ্যাঁ বলে, আবার বাবাকে ইশারায় বলেছিল, কিন্তু ছেলেটি তাকে ভালোবাসে না। তার বিষয়ে সে কিছুই হয়তো জানে না।
জয়নাল শেখ মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,

-“ছেলেটা তোমাকে বিয়ে করতে চায়, দৌরুতি। ছেলেটা তোমাকে পছন্দ করে।”

বাবার মিথ্যা সে এখন সহ্য করতে পারছে না। সব মনে হতেই ভেতরটা অশান্তি লাগছে তার।
হাত ধুয়ে আগের সব ভাবনা থেকে বেরিয়ে তৌকিরের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দৌরুতি।বাবা মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব খুব ভালো ছিলো কিন্তু হয়তোবা বস শেষ এখন।
দৌরুতির চোখ বন্ধ হতেই পেছন থেকে চোখ মেলে তাকাল তৌকির। আজকে সারাদিন তাকে রোদের মধ্যে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। আগের থেকে ছোট বোনটার অসুস্থতা বেশি হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে, হাতে আর বেশি সময় নেই তার। আজকে ছোট বোন জেসমিনের বলা একটা কথা তার বারবার মনে হচ্ছিল।

সে বলল,
-“ভাইয়া, নতুন ভাবি আমাকে দেখতে আসল না? আমি সুস্থ হয়ে তার কাছে গিয়ে তাকে চমকে দেবো।”

সে হয়তো জানেই না, এই দুনিয়ার আলো তার জন্য বেশি দিনের নয়। তৌকির ছোট বোনকে কিছুই বলতে পারেনি।

বড় ঘরের মেয়ে কি আর তাকে দেখতে যাবে? এটা ভাবাই নেহাতই বোকামি তার। সে জানে, বউরা স্বামীর বোনকে কী নজরে দেখে। ছোট একটা বাচ্চা যদি জানতে পারত—তার জন্য তার আগের ভাবি তার ভাইকে ছেড়ে চলে গেছে! মানতে পারত? তার জন্য প্রচুর টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে, রোদের মধ্যে টয়টয় করে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়।

এসব ভেবেই বা কী হবে? সব যে তার বৃথা চেষ্টা হয়ে গেছে। তার বোন তো বাঁচবে না। আল্লাহ কি পারতেন না তার হায়াত আর একটু বেশি করে দিতে?
চোখের কোণে জমে থাকা নোনতা পানি গড়িয়ে পড়ল নিচে। সে কখনো কোনো কিছু সহজ করে নিতে পারবে না হয়তো। তার সবকিছুই যে এলোমেলো। গোছানো জীবনটা তার জন্য নয়।

————–

সকালে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠেছে আজকে দৌরুতি। মুখে তার বেশ হাসি জন্মেছে আজ। নিজের হাতে রান্নাঘরে ঢুকে নাস্তা বানিয়ে ফেলেছে সে। সেই নাস্তাগুলো খাবার টেবিলে একে একে এনে সাজিয়ে রাখছে সে। আলফা বেগমও নিচে চলে আসে নাস্তা করতে, জয়নাল শেখের সঙ্গে কাফেল। সবাই আজকে একসঙ্গে বেরোচ্ছে যার যার মনে। কাফেল বোনকে আজকে আবার মন খুলে হাসতে দেখছে। কিন্তু বিষয়টি কি নিয়ে? কোতুহলী হয়ে কাছে গেলো সে আর
কাফেল বলল,

-“কি রান্না হচ্ছে, ম্যাডাম?”

দৌরুতি কিছু না বলে কাফেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। হাসি দেওয়ার সঙ্গে তার দুই গালে টোল পড়ল। সে ইশারায় বলল,

-“যাই রান্না করি না কেন, তা কিন্তু এই বাড়ির কারো জন্য না।”

পাশেই দাঁড়িয়ে বাড়ির কাজের মেয়ে জামিয়া খালা বলল,
“আপা কী জানি রান্না করছে! এগুলো আপনারা খাবেন না, স্যার। সকালের নাস্তা আমরা যা আমাদের বাড়িতে খাই, ডিম ভাজি, সাদা চালের খিচুড়ি, সবার খাওন। আপনারা খাইলে তো মোটা হয়ে যাবেন, তাই অল্প করে রানছে। আমি শিখাইয়া দিতাছি।”

কাফেল চোখ-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

-“আমাদের জন্য নয়, তো কার জন্য রান্না করা হয়েছে?”

দৌরুতি হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল তৌকিরকে। সেই সময় তৌকির ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল।
কাফেল বিরক্ত মুখে আর কিছু না বলে না খেয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

দৌরুতি দৌড়ে গিয়ে তৌকিরের হাত ধরে ইশারায় তাকে তার রান্না করা খাবার খেতে বলল।
তৌকির জবাব না দিয়ে নিরবে দৌরুতির হাত নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেই সময় দৌরুতির চোখে পানি ছলছল করে উঠল। আরো একবার মন ভেঙে দিলো সে। কিছু একটা তো বলতে পারত সে! এমন কেন করল?

জয়নাল শেখ মেয়ের চোখেমুখের দিকে তাকিয়ে খাবার টেবিলে বসে খাবার দেখে লোভ সামলাতে না পেরে বলল,

-“দৌরুতি, জামাই বাবাজি যখন খায়নি, আমাকে দাও মা, আমি একটু খাই। অনেক মজা হয়েছে মনে হয় রান্না।”

দৌরুতি নিজের রাগ তৌকিরকে দেখাতে না পেরে বাবার মুখের সামনে থেকে সব খাবার উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রেখে দিল।
আর ইশারায় বলল,
-“নিজের বউকে বলো, রান্না করে খাওয়াবে।”

আলফা খানম দৌরুতির এমন আচরণ দেখে বলল,
“এই মেয়ে কি বাহিরের ছেলের জন্য পাগল হয়ে গেছে নাকি? বুঝলাম না, এটা কেমন আচরণ বাবার সঙ্গে তার?”

জয়নাল শেখ আলফা খানমের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
“আমার মেয়ে পাগল না, তোর চৌদ্দগুষ্টি পাগল! সে স্বামীর সেবা করছে। আর তুই কী করছিস? স্বামীর সঙ্গে সুযোগ পেলেই ঝগড়া করিস!”

আলফা খানম জয়নাল শেখের দিকে তাকিয়ে রইল আর তেরে গেলো বলতে..

চলবে…