বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 19



প্রেমচিত্র পর্ব-১০ এবং শেষ পর্ব

#প্রেমচিত্র[শেষ পর্ব]
লেখিকা:ইশা আহমেদ

সন্ধ্যের কিছুক্ষণ আগে তুশির ঘুম ভাঙলো। নিজেকে আবিষ্কার করলো অপরিচিত জায়গায়। কিছুক্ষণ বাদেই মনে পরলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হয়ে নিলো। তেহজিব তখন রুমে নেই। তেহজিব রুমে আসলো কিছুক্ষণ পরই। তুশিকে দেখে হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

-“তুশি এটা একটু পরে নাও”

-“কি আছে এর ভেতরে?”

-“খুলে দেখো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। পরে আসো প্লিজ”

তেহজিব অনুনয় করে বললো। তুশি কিছু বলল না। তেহজিব বের হয়ে গেলো। শপিং ব্যাগটা খুলতেই মেরুন রঙের সুন্দর একটা শাড়ি বের হলো, সাথে মেচিং অর্নামেন্টস। তুশি পরলো। তবে সাজলো না। পার্থকে খুব মনে পরছে, পদে পদে মনে পরছে। তেহজিব দরজা নক করে বলল,

-“হয়েছে?”

-“হু”

-“বাইরে আসো”

তুশি বের হলো। তেহজিব পেছন থেকে চোখ বেঁধে দিলো। তুশি বিরক্ত হলো। তেহজিব তুশিকে নিয়ে সমুদ্রের পারে আসলো। তুশির চোখের কাপর সরালো। তুশি কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দৃশ্যটা অপার্থিব সুন্দর। এক দেখায় যে কেউ মুগ্ধ হবে। সমুদ্রের পার জু্ড়ে ফেইরি লাইটগুলো ঝলমল করছে। বালুর উপর শামুক দিয়ে বাকানো পথ তৈরি করা হয়েছে। পথের দু’পাশে রঙিন মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। তেহজিব তুশির হাতটা শক্ত করে এগোতে লাগলো। সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ালো। তেহজিব তুশিকে একদম সামনে এনে দাঁড় করালো। চোখে চোখ রাখলো।

-“বোকাফুল”

-“হু?”

তুশি চমকালো। বোকাফুল! ‘বোকাফুল’—নামে তো একজনই তাকে সম্মোধন করে। পার্থ! বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকালো তেহজিবের পানে। তেহজিবের চোখ দুটো অবিকল পার্থর মতো লাগছে। মনির রঙটা পরিবর্তন হলো কীভাবে? এক দেখায় মনে হচ্ছে বন মানুষটা চুল দাঁড়ি কাটলে ঠিক এমনই লাগবে। তেহজিব তুশির হাত জোড়া মুঠোবন্দি করলো। তুশি চমকালো তেহজিব স্পর্শ পেয়ে।

-“বোকাফুল, আমি…..আমি…পার্থ”

তুশির মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা সুদর্শন পুরুষের মুখ পানে। পুরুষটা অপরাধীর ন্যায় মাথা নুইয়ে আছে। তুশি ঠোঁট ভেঙে কান্না পেলো। যেই মানুষটার অপেক্ষায় একটা বছর ছটফট করে কাটিয়েছে সেই মানুষটা না কি তার আশেপাশে ছিলো? তুশি মেনে নেওয়া সম্ভব হলো না। প্রিয় পুরুষের প্রতরনা সইতে পারলো না মেয়েটা। হাত ছাড়িয়ে নিলো। তুশি এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। তেহজিবকে থাপ্পড় মেরে বসলো। মেয়েটার চোখ মুখ জ্বলছে। গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে অশ্রুগুলো। তেহজিব তাকালো না, সাহস নেই তার।

-“কেনো করলেন পার্থ? ওহ্ না না পার্থ নয়, মিস্টার তেহজিব সারোয়ার কেনো করলেন? আমার অনুভূতি নিয়ে কেনো খেললেন?”

-“বোকাফুল একটু শান্ত হও বু্ঝিয়ে বলি আমি?”

-“কি বোঝাবেন আমায়? দিনের পর দিন কষ্ট পেয়েছি। আমার পার্থ কোথায় আছে, কি করছে, ঠিক আছে কি না এসব চিন্তা করেই আমার দিন কাটতো। এই আপনার কষ্ট হয়নি? চোখের সামনে নিজের ভালোবাসাকে কষ্ট পেতে দেখে?”

তুশি প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে পরেছে। তেহজিব সামলাতে চাইলো। ঝাপটে ধরলো তুশিকে। তুশি পাগলের মতো চড়, থাপ্পড় মারছে তেহজিবকে। তেহজিবের সহ্য হচ্ছে না তুশির ঘৃণা। কেনো করলো? তুশিকে তখনই বিয়ে করা উচিত ছিলো। তুশিকে অনেক চেষ্টা করেও বোঝাতে পারলো না। তুশি ছুটে কটেজে চলে গেলো। তেহজিব হাঁটু ভেঙে বসে পরলো। তেহজিব কটেজে ফিরলো আধা ঘন্টা পরে। তুশি তখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে।

-“বোকাফুল!”

তেহজিবের আকুলতা মেশানো কন্ঠস্বরও তুশির মন গলাতে পারেনি। তুশি পাথরের মতো চুপ করে বসে রইলো। তেহজিব অনেক বার ক্ষমা চাইলো তুশির মন তবুও গললো না। এতো সহজে গলবে বলেও মনে হয় না। তেহজিব তুশির পায়ের কাছে বসে পরলো। লোকটাকে উদভ্রান্তের ন্যায় লাগছে। তুশি ফিরেও তাকালো না। তাকানোর ইচ্ছে নেই। এই মানুষটার জন্য তুশি একটা বছর গুমড়ে মরেছে অথচ এই লোক?

সেদিন রাতেই তুশি কড়া ভাষায় জানালো পরদিনই ফিরে যাবে। তেহজিব চাইলেও আটকাতে পারলো না। পরদিন সকাল সকাল তুশিকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলো তেহজিব। তুশি ঢাকাতে এসেই এয়ারপোর্ট থেকে একাই সিএনজি করে নিজের বাড়িতে আসলো। তেহজিবের শত বাঁধাও তাকে আটকাতে পারেনি। তুশি বাড়িতে এসে সোজা নিজের রুমে ঢুকেছে। চাঁদনী আপাও এ বাড়িতে রয়েছে।

তুশি বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পরই তেহজিব এসেছে ওকে ফিরিয়ে নিতে। তিশি সোজাসাপ্টা বলেছে ও ফিরবে না। তেহজিব ঘন্টা খানেক বসে থাকলেও তুশি ঘর থেকে বের হয়নি। এরপর না পেরে চলে গিয়েছে। তুশির মা তো সেই থেকে বকে চলেছে। জামাইয়ের সাথে কেউ এমন ব্যবহার করে আরো কত কি! দুপুরে খাবার টেবিলে বসে তুশি সোজাসাপ্টা শামসুল সাহেবকে প্রশ্ন করে বসলো,

-“তুমি কি জানতে তেহজিবই পার্থ?”

শামসুল সাহেব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন,“না জানার কি আছে?”

তুশির রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“তুমি আমায় বলোনি কেনো? আর কেনোই বা প্রথমে না মেনে পরে বিয়ে দিয়েছো?”

-“ছেলেটা নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে পেরেছে এ জন্য”

-“তোমার আমাকে জানানো উচিত ছিলো”

কথাটা বলেই তুশি না খেয়ে হনহন করে চলে গেলো। তাহেরা খাতিন নিজেও জানতেন না তেহজিবই পার্থ। তুশিকে অনেকবার ডাকলেও তুশি আর ফিরে এলো না।

-“তুমি ওকে কেনো জানাওনি? আমার মেয়েটা একটা বছর কত কষ্ট করেছে নিজের চোখে দেখেছি আমি”

-“তেহজিব ভালো ছেলে”

স্বামীর নির্লিপ্ততায় বিরক্ত হয়ে তাহেরা খাতুনও উঠে পরলেন। তুশি রুমে এসেই বিছানায় হাত পা মেলে শুয়ে পরেছে। তুশি কোনো মতেই তেহজিবের করা কাজটা মেনে নিতে পারছে না। তেহজিবকে দেখতেও পারছে না। এতোক্ষণে হাজারটা কল করা হয়ে গিয়েছে। তুশি কল রিসিভ করেনি। করবেও না। ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিয়েছে।

একমাস তেহজিব তুশির দেখা পেলো না। তুশি ফোনও রিসিভ করেনি। বহুবার তেহজিব শ্বশুর বাড়ির দোরগোড়ায় এসেছে বউকে এক পলক দেখতে, অথচ তুশি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তুশির আজ একটু মন ভালো। এ জন্যই রুমের দরজা খুলে ছাদের দিকে পা বাড়ালো। ছাদে আসতেই দেখলো তার গাছ গুলোর অবস্থা শোচনীয়। পানি দিলো গাছগুলো। অতঃপর ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। বাড়ির কিছুটা দূরে তেহজিবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুশি চমকালো। তেহজিব এই সময়ে দাঁড়িয়ে আছে কেনো এখানে। তুশি মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তেহজিবের অবস্থা করুন। আগের ন্যায় বড়বড় চুল, মুখ ভর্তি দাঁড়িতে বন মানুষ লাগছে।

তুশি দাঁড়ালো না। নিচে নেমে গেলো। তেহজিব তা দেখে হতাশ হলো। তবুও সেখানে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তুশি নিজের রুমে এসে জানালা দিয়ে লুকিয়ে দেখছিলো তেহজিবকে। তেহজিব যেতেই বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরলো। বেটাকে জব্দ না করা অব্দি ধরা দিচ্ছে না এই তুশি।

আরো একমাস ঘরে বন্দি হয়েই কাটালো তুশি। তুশি একাই বের হলো কিছু কেনাকাটার জন্য। মাঝে কিন্তু শামসুল সাহেব তুশিকে ফিরে যেতে বলেছেন, তুশি সোজা নিষেধ করেছে।
তুশি যখনই এলাকা থেকে বের হলো রিকশা নিয়ে ঠিক তখনই একটা গাড়ি এসে রিকশা আটকে ধরলো। তেহজিব বেরোতেই তুশি বিরক্ত মুখে তাকালো।

-“তুশি নেমে এলো”

-“কি সমস্যা আপনার বলুন তো। বিরক্ত করছেন কেনো?”

-“তুশি প্লিজ একটা বার চলো”

তেহজিবের অনুরোধেও তুশির মন গললো না। তুশি বারবার ফিরিয়ে দিলো। তেহজিব আগে ভাগেই রিকশার ভাড়া মিটিয়ে নিলো। এরপর হুট করে তুশিকে কোলে তুলে নিলো। তুশি হতভম্ব হয়ে স্থির হয়ে তেহজিবের বুকেই পরে রইলো। রিয়াক্ট করতে ভুলে গিয়েছে মেয়েটা।
তেহজিব গাড়িতে বসিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো। তুশির স্তম্ভিত ফিরতেই চেঁচিয়ে বলল,,,

-“আপনি আমায় তুলে আনলেন কেনো?”

-“নিজের বউকেই তো এনেছি তাতেও দোষ?”

তুশি উত্তর দিলো না। তুশিকে নিয়ে তেহজিব শহর থেকে কিছুটা দূরে এসেছে। তুশি চুপ করে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। হাইওয়ের পাশে গাড়ি থামিয়ে তুশিকে জোর করে বের করলো।

-“কি চাইছেন কি আপনি?”

-“আমি তোমাকে চাইছি“

-“এতোদিন মনে ছিলো না?”

-“ছিলোতো। তাই তো পরীক্ষা হতে না হতেই নিজের করে নিলাম।”

-“আপনার ঢং এর কথা রাখুন। বাড়ি ফিরবো দিয়ে আসুন”

তেহজিব অনেক বার বোঝানোর চেষ্টা করলেও তুশি বুঝলো না। তেহজিব শেষে হার মেনে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে গেলো। তুশির মনটা এখন নরম হয়েছে। আগে তো তেহজিব কল করলেও ফোন তুলতো না। এখন তোলে,কিন্তু কথা বলে না। সাড়ে দশটার দিকে তেহজিব ফোন করে বলল জানালায় আসতে। তুশি না চাইতেও গেলো।

তেহজিবকে দেখে থমকে গেলো। মাথায় হাতে ব্যান্ডেজ। ওভাবেই যতদ্রুত পারে নিচে নামলো। তুশিকে ছুটে আসতে দেখে তেহজিব একটু অনাকই হলো। তুশি তেহজিবের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“কি অবস্থা করেছেন নিজের। কীভাবে হলো এই অবস্থা? ”

-“সকালে ছোটখাটো এক্সিডেন্ট হয়েছে। তুশি চিন্তা করো না। বেশি কিছু হয়নি”

তুশি মাঝ রাস্তাতেই স্বামীর বুকে ঝাপিয়ে পরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। সেদিন রাতেই তুশি তেহজিবের কাছে ফিরে গেলো। মা জেনে খুশিই হলো। মা কি চায় তার মেয়ের সংসার ভাঙুক?
তুশির দিন ভালো ভাবেই চলছিলো। তেহজিবের সেবা, দুষ্টুমি সব মিলিয়ে তুশির দিন দারুন কাটছে। তেহজিবের ছুটি শেষ হতেই তেহজিব অফিসে যাওয়া শুরু করলো। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ।

একদিন অফিস থেকে তেহজিব তাড়াতাড়িই ফিরলো। তুশিকে তাড়াহুড়ো করে শাড়ি পরতে বললো। তুশি হালকা আকাশী রঙের শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করলো। আর চুল? একদমই ছাড়া যাবে নাহ্। হিজাবই বাঁধতে হলো। তেহজিব পরলো অফ হোয়াইট একটা শার্ট।
দু’জন বেরোলো ঘুরতে। আজ বাইকে বের হয়েছে। তেহজিব তুশিকে শহরের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে আনলো। মেয়েটা ভীষণ খুশি। তুশি আনন্দে তেহজিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো।
তুশির রঙিন প্রেমচিত্রের সমাপ্তি বুঝি এখানেই? হয়তো!

#সমাপ্ত

প্রেমচিত্র পর্ব-০৯

#প্রেমচিত্র [৯]
লেখিকা:ইশা আহমেদ

-“কাকে আশা করেছিলে?”

-“আপনি, আপনি কেনো আমাকে বিয়ে করলেন?”

-“তোমাকে আমার খুব পছন্দ তাই”

-“এই ক্যাবলাকান্ত আপনার সাহস কোথা থেকে এলো, আমায় বিয়ে করার?

তেহজিব হাসলো। ঝড়ের গতিতে এসে তুশিকে ঝাপটে ধরলো। তুশি টাল সামলাতে না পেরে তেহজিবের কলার খামচে ধরলো। তুশির চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তেহজিবের খুব ভালো লাগলো। তুশি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালালো। অথচ তৃষ্ণার্ত প্রেমিক প্রেমিকাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে চললো। মিনিট পেরেলো, কত মিনিট? খেয়াল নেই হয়তো দু’জনার কারো। তুশি একটা সময় ক্লান্ত হয়ে মাথা এলিয়ে দিলো তেহজিবের প্রশ্বস্ত বুকে। তেহজিব তুশিকে কোলে তুলে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো। নববধূ রূপি প্রেমিকার এই রূপ অকল্পনীয় সুন্দর।

-“পার্থ, পার্থ কোথায় আপনি। আপনাকে আমার খুব প্রয়োজন”

তেহজিব হাসলো তুশির বিরবির করে আওড়ানো শব্দগুলো শুনে। মেয়েটা অসম্ভব ভালোবাসে তাকে। এটুকুই যথেষ্ট। বুকের সাথে আঁটসাঁট করে চেপে ধরলো আদুরে বিড়াল ছানাটাকে। তুশি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পরেছে। তেহজিব আদুরে ছানাটাকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। মুখের উপর পরে থাকা চুলগুলো সযত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিলো। আলতো হাতে গহনা গুলো খুলে দিলো। কোলবালিশ দুটো দুই পাশে রেখে ফ্রেশ হতে গেলো তেহজিব।

সূর্যের তেজবহ আলো চোখে পরতেই ঘুম ভাঙলো তুশির। চোখ খুলতেই নিজের একদম কাছে আবিষ্কার করলো ক্যাবলাকান্ত লোকটাকে। তেহজিব তুশিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তুশি নিজেকে ছাড়াতে চাইলো। তুশির ছটফটানিতে তেহজিবের ঘুম ভেঙে গেলো। তেহজিব বেচারা গত রাতে বউকে দেখে দেখেই সময় পার করেছে। তেহজিবের বাঁধন হালকা হতেই তুশি তেজ দেখিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।

-“আপনি আমায় জড়িয়ে ধরেছেন কেনো?”

-“তুমি তো আমার বউ, তাই ধরেছি”

-“এই ক্যাবলাক্যান্ত আমাকে একদম ছুঁবেন না, মেরে ফেলবো”

তেহজিব মাথা নাড়ালো। তুশিকে আর ঘাটতে চাইলো না। নিজে উঠেই তার আদুরে বউটার জন্য নাস্তা তৈরি করলো। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে সাত দিনের। বউকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। তুশি হাঁটু মাথা রেখে পার্থর সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো কল্পনা করছে। মেয়েটার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছেও নিলো। প্রায় এক বছর পার্থকে সে দেখা না ছুঁতেও পারে না। মাত্র কয়েক দিনের প্রেম, অথচ অনুভূতি গুলো গভীরতা অনেক। তুশি নিজেকে বোঝাতে চাইলো। পার্থ নামক পুরুষটা তার কাছে এখন পর পুরুষ। তেহজিব নামক লোকটা তুশির স্বামী। এটা ভাবতেই বিরক্ত হলো মেয়েটা।

তেহজিবের ওই ক্যাবলাকান্ত মুখ আর ভীতু ভীতু চাহুনি দেখলেই তুশির বিরক্ত লাগে। এই আধ বলদের সাথে তুশি সংসার করবে কীভাবে? তুশি ফ্রেশ হয়ে সেলোয়ার-কামিজ পরলো। আলমারিতেই তুলে রাখা ছিলো। তেহজিব কে খুঁজতে তুশি বের হয় রুম থেকে। গত রাতে শোকাহত থাকায় কিছুই লক্ষ করা হয়নি তুশির। এখন একটু ঘুরে দেখা যাক। বিশাল বড় ফ্ল্যাট। তিনটা বড় বেড রুম, ড্রয়িং ডাইনিং দিয়ে বড় স্পেস। তার থেকেও বড় কথা ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর করে সাজানো।

-“তুমি উঠেছো, এসো খেয়ে নাও”

সামনে তাকাতেই তুশি তেহজিবকে দেখলো। ঘামে জুবুথুবু লোকটা এক কথায় সুদর্শন। তবুও তুশির বিরক্ত হলো। নির্বাক চোখে এক পলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। লোকটাকে মাঝে মাঝে বড্ড চেনা মনে হয়। কাছে গেলে মনে হয় পার্থ তার আশে পাশে আছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে টেবিলে গিয়ে বসলো।

তুশি খেতে খেতে বললো,
-“মেয়ে ছিলো না আর দুনিয়ায়?”

-“হ্যাঁ?”

তেহজিবের চেহারা দেখে তুশির হাসি পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এবার তুশি বিরক্ত হলো। মাথা মোটা বলদ কোথাকার। এ নাকি রাজনীতিবিদের ছেলে। দেখে ক্যাবলাকান্ত ছাড়া আর কিছুই লাগে না।

-“আপনি এতো মাথামোটা কেনো?”

-“তুশি তুমি কি রাগ করেছো আমার উপর?”

-“নাহ্, রাগ কেনো করবো। আপনাকে তো মন চাইছে গলা টিপে মেরে ফেলি”

ভীতু তেহজিবের হাত সত্যি সত্যি গলায় চলে গেলো। তুশি বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকালো। এতোটা বলদ?

-“আপনার সাথে সিরিয়াস কথা আছে”

তুশির শীতল কন্ঠ শুনে তেহজিবের মেরুদণ্ড সোজা হলো। চশমাটা ঠিক করে তুশির দিকে তাকালো। দু’জনের চোখে চোখ পরলো। তুশি চমকালো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

-“আমি একজনকে ভালোবাসি আপনি জানতেন?”

-”হু”

-“তাহলে বিয়ে করলেন কেনো?”

-“তোমার প্রেমে পরেছি, এই এক মাস তোমাকে ছাড়া শূন্য শূন্য লাগছিলো তাই”

-“আমি পার্থকে এখনো ভালোবাসি তেহজিব”

বর্তমান স্বামীর সামনে বসে প্রাক্তনের কথা বলতে অস্বস্তি হলেও তুশির হলো না। তুশির গলা কাঁপলো। চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো। তেহজিব আড়ালে হাসলো। তুশি মাথা নিচু করে আছে। মাথা তুললেই দেখতে পেতো তেহজিবের হাসিটা।

-“আমাকে একটু ভালেবাসা যায় না?”

-“আপনি ঠিক করেননি তেহজিব। আপনার উচিত ছিলো আমার মত আছে কি না জানা। আপনাকে আমার বিরক্ত লাগছে। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে সংসার করতে হবে, ভাবলেই আমার বুকে ব্যাথা উঠছে। কেনো করলেন তেহজিব, কেনো?আমার পার্থ ফিরে এলে আমি কি জবাব দিবো?”

তুশি কাঁদছে। ওর হাত পা কাঁপছে। নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ তুশি। তেহজিব ছুটে আসলো। জড়িয়ে নিলো তুশিকে। তুশি তেহজিবের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রুমে চলে গেলো। তেহজিবের ইচ্ছে হলো তুশিকে গিয়ে সত্য বলে দিতে কিন্তু পারলো কোথায়?
তুশি খাবার খাইনি। তেহজিব প্লেটে খাবার তুলে রুমে আসলো। তুশি তখন আনমনা হয়ে কিছু ভাবছে।

-“তুশি?”

তুশি উত্তর দিলো না। তেহজিব তুশির পাশে গিয়ে বসলো।
-“খেয়ে নাও তুশি”

-“খিদে নেই”

-“প্লিজ খেয়ে নাও”

-“আপনার উপর আমার খুব রাগ করা উচিত তাই না? কিন্তু আমি রাগ করতে পারছি না। না নিজের ভাগ্যকে পারছি। পার্থ হয়তো আমার ভাগ্য ছিলো না, তাহলে কেনো আমার জীবনে এলো? ওই বাউণ্ডুলে, বখাটে ছেলেটা আমার প্রথম প্রেম। আমি জানি এগুলো বলা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি পারছি না। একদমই পারছি না। অসহ্য ঠেকছে সব কিছু”

-“তুশি আগামীকাল কক্সবাজারে যাচ্ছি”

-“আমি যাবো না”

-“প্লিজ চলো, একটা বার চলো”

তুশি মুখ ফিরিয়ে নিলো। তেহজিব ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। সত্যটা জানলে বোকাফুল তাকে কেমন শাস্তি দিবে? কথা বলবে না? না কি মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে। তুশির মুখ ফুলানো ফেস কল্পনা করে তেহজিব হেসে ফেললো।

পরদিন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো দু’জন। তুশিকে এক প্রকার জোর করেই নিয়ে যাচ্ছে তেহজিব। মেয়েটা একদম ঘরকুনো হয়ে গিয়েছে। তেহজিব প্লেনের টিকিট কেটেছে। অল্প সময়ে যাওয়ার জন্য। তুশি এই প্রথম প্লেনে উঠেছে। ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে তেহজিবের হাত খামচে ধরলো। ছেলেটা টু শব্দ করলো না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বোকাফুলকে দেখে গেলো। কক্সবাজার এসে পৌঁছালো দুপুর নাগাদ। আজকের দিনটা কোথাও ঘুরবে না ওরা তেহজিব রিসোর্টের সব থেকে সুন্দর কটেজটা বুক করেছে।
তুশি মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবটা দেখছিল।

সমুদ্র এই প্রথম দেখলো মেয়েটা। স্বচোখে বিশাল সমুদ্র, ঢেউয়ের গর্জন, আঁচড়ে পরার শব্দ, সমুদ্রের হালকা নীলাভ জলরাশি তুশিকে মুগ্ধ করলো। এক মুহুর্তের জন্য দুনিয়াবি সব কিছু ভুলো বসলো মেয়েটা। তেহজিব মুগ্ধ চোখে বোকাফুলকে দেখছে।

-”তুশি চলো?”

-“হু”

তুশি কটেজে এসেও ভীষণ মুগ্ধ হলো। কি মনোরম দৃশ্য। তেহজিব সমুদ্র ভিউয়ের কটেজটা বুক করেছে। তুশি বারান্দায় গিয়ে বসলো। তেহজিব তখনো ঘরে আসেনি। ছেলেটা কাজ করতে ব্যস্ত। তুশি সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে পার্থকে কল্পনা করছে।
তেহজিব রুমে এসে তুশিকে পেলো বারান্দায় ঘুমন্ত অবস্থায়।
তুশিকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়।

চলবে.

প্রেমচিত্র পর্ব-০৮

#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৮

ভদ্রলোক আমতা আমতা করতে লাগলো। তুশি ধমক দিয়ে বললো,
-“এই পুরো কাহিনী বলুন আব্বু আপনায় পেলো কোথায়?”

ভদ্রলোক ধমক খেয়ে গড়গড় করে সব বললো। শামসুল সাহেবের সাথে তেহজিবের দেখা হয়েছিলো গতকাল সন্ধ্যায়। শামসুল সাহেব সাধারণত ছাদে উঠেন না। গতকাল সিগারেট খেতে উঠেছিলেন। বাড়িতে বউ-ছেলে মেয়ে থাকলেও সিগারেট খান না তিনি। গতকাল কাজ থাকায় একটাও খেতে পারেননি। এজন্যই ছাদে উঠেছিলেন। তেহজিব জামা কাপড় তুলতে ছাদে আসলে শামসুল সাহেব তাকে ডেকে নিলেন। টুকটাক কথা বলে তুশিকে পড়াতে বললেন, যদিও বা তেহজিব রাজি ছিলো না। অনেক অনুরোধ করার পর রাজি হয়েছে। তুশি সব শুনে কিছু বলল না। তেহজিব চলে গেলো। তুশি মায়ের কাছে গেলো।

-“আমি টিউটর রাখতে বলেছি?”

তাহেরা খাতুন বসে সিরিয়াল দেখছিলেন ছোট জায়ের সাথে। মেয়ের রূক্ষ কন্ঠ শুনলেও পাত্তা দিলেন না। তুশি বিরক্ত হলো। তার মা কখনোই কোনো কথা ঠিক মতো শুনতে চায় না।
তুশি কিয়ৎ চিৎকার করে বলল,“মা?”

“কি হয়েছে কি? জ্বালাস কেনো?”

-“টিচার রেখেছো কেনো?”

-“পড়াশোনা ঠিক মতো করানোর জন্য। সামনে এইচএসসি ভালো রেজাল্ট লাগবে তাই। যা এখান থেকে।”

তুশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকিয়ে, তুক্ষর মেজাজ নিয়ে চলে আসলো নিজের রুমে। অসহ্য রকম বিরক্ত হচ্ছে সে। চাঁদনী আপার সাথে সময় কাটাতে আসলো তুশি, সেখানেও হতাশ হয়ে ফিরতে হলো! চাঁদনী আপা ঘুমিয়ে আছেন। তুশি ক্ষীপ্র মেজাজে ছাদে উঠলো। রাগ কমানো দরকার! গাছ গুলোয় অনেক দিন পানি দেওয়া হয় না, ছাদেও ওঠা হয় না। গাছগুলোতে পানি দিয়ে, দোলনাতে বসলো তুশি।

তেহজিব সদ্য গোসল করে বের হয়েছে বোধ হয়। পরনে ট্রাউজার শুধু। তুশিকে খেয়াল করেনি। তুশি চোখ তুলে তাকালো না। তেহজিব তুশিকে দেখে, এক প্রকার দৌড়ে চলে গেলো। আজকে তুশির কোনো রিয়াকশন না দেখে তেহজিব একটু চিন্তিত হলো। তুশি অন্যমনস্ক হয়ে কি যেনো ভেবে যাচ্ছে। তেহজিব গায়ে শার্ট জড়িয়ে বাইরে আসলো।

-“আপনি এখানে, এই সময়?”
-“এমনি”
-“মন ভালো নেই?”

তুশি জবাব দিলো না। অদ্ভুত চোখে তাকালো শুধু। তেহজিব পাশ কাটিয়ে চলে আসলো নিজের রুমে। জানালার ফাঁক দিয়ে তুশিকে নজরে রাখছে। তুশি পনেরো, বিশ মিনিট একা বসে চলে গেলো। তেহজিব ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখলো। মেয়েটার উদাসীনতা আর মানা যাচ্ছে না। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। পার্থ শেখ, যেটা তেহজিবের আসল পরিচয় না। পার্থ নামটা রেখেছিলো তেহজিবের নানা ভাই। তেহজিব হওয়ার বছর দুই পরেই তিনি মারা যান। পরে নামটা সবাই ভুলে গেলেও তেহজিবের এই এলাকাতে নামটা কাজে লেগেছিলো।

তেহজিব সারোয়ার, দেশের নামকরা রাজনীতিবিদ তুরাগ সারোয়ারের ছোট ছেলে। বাবা, মায়ের অবাধ্য, উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। ছোট বেলা থেকেই আদরে আদরে একরোখা হয়ে গিয়েছিলো। মা নীলিমা শেখ ছেলেকে শত চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারছিলেন না। চার বছর আগের ঘটনা, সদ্য মাস্টার্স শেষ করা তেহজিব একা কাটাতো, দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে। সেদিন রাত প্রায় একটার সময় তেহজিব বাড়িতে ফিরতেই তুরাগ সারোয়ার ঝামেলা করলেন, বললেন বাড়ি থেকেও বের হয়ে যাও। তেহজিবও রেগে বাড়িতে থেকে বের হয়ে গেলো। চলে আসলো ঢাকার এক ছোট্ট এলাকায়, যেখানে কেউ তাকে চিনে না, জানেও না।

তেহজিব নিজের নাম পরিবর্তন করে, পার্থ শেখ রাখলো। পাড়ার সবাই তেহজিবকে পার্থ নামেই চিনতে শুরু করলো। তেহজিবের নিজের পরিচয়টা ক্রমেই হারিয়ে গেলো। কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি তেহজিব। নিজেকে এক নতুন পরিচয় দিয়ে এখানেই থেকে গেলো।
বছর খানিক যেতেই তেহজিব প্রেমে পরলো, তাও কি না একজন দশম শ্রেনী পড়ুয়া কিশোরীর? তেহজিব নিজেকে সময় দিলো, বুঝানোর চেষ্টা করলেও মন আটকে পরে রইলো কিশোরীর দারপ্রান্তে।
বছর দুই পরে তুরাগ সারোয়ার ফোন করলেন। তেহজিব তখন পাড়ার দোকানে আড্ডায় মশগুল। তেহজিব নতুন সিম ব্যবহার করে। অপরিচিত নাম্বার দেখেও তুললো।

-“কোথায় আছো?”
-“ফোন করেছো কেনো?”
-“তুমি কি ভাবো, আমি জানি না তুমি কোথায়?”
-“জানো?”
-“শুরু থেকেই জানি”

তেহজিব অতিরিক্ত কথা বলা পছন্দ করে না বিধায় ছোট করে বলল,“ওহ্”
-“সেসব কথা বাদ দাও, যা বলতে ফোন করেছি। টাকা লাগছে না? টাকা কোথা থেকে পাচ্ছো?”
-“ব্যবসা থেকে আসছে”
-“তোমার ক্রেডিট কার্ড নিয়ে যাও?”
-“নাহ প্রয়োজন নেই”

এটুকু কথাই হয়েছিলো। এরপর থেকে আর তুরাগ সারোয়ার ফোন করেননি। তেহজিবও কখনো চেষ্টা করেনি। যখন তুশি ধরা পরলো, তখন ওর বিবেকে কাজ করলো। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পরে লাগলো। বন মানুষের রূপ ঝেড়ে নিজেকে ভার্সিটি লাইফের তেহজিবে পরিনত করলো। চাকরির ইন্টারভিউ দিলো কয়েকটা। বাবার পরিচয় নিয়ে নয়, নিজ পরিচয়ে। এক্সপেরিয়েন্স না থাকায় অনেকগুলো চাকরি থেকে রিজেক্ট হলো। এরপর স্বল্প বেতনে এক কোম্পানিতে চাকরি করে, এখন মোটা অংকের সেলারিতে ভালো কোম্পানিতে চাকরি করছে।

ছয়টা মাস তেহজিব কীভাবে কাটিয়েছে, তা শুধু ওই জানে। তুশিকে এক নজর দেখার আশায় কত সন্ধ্যে যে এলাকায় এসেছে। তবুও তুশির খোঁজ মেলেনি। মাঝে মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে যদি দেখা পেতো ওই আরকি। মাঝে বাড়িতেও ফিরেছিলো। নীলিমা শেখ তো আসতেই দিবেন না ছেলেকে। তেহজিব জোর করেই এখানে বাসা নিয়েছে।

তেহজিব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। এতো পেশার। এখন একটু বোকাফুলকে জড়িয়ে ধরতে পারলে মন্দ হতো নাহ্। মেয়েটা আদুরে বিড়াল ছানা একদম।

তুশির জন্য বড় বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করতে না করতেই রাজনীতিবিদ তুরাগ সারোয়ারের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে। রাজনীতিবিদ শুনেই তুশির মা এক কথায় না করেছেন। কিন্তু শামসুল সাহেব রাজি হলেন। তুশি বিয়ের ব্যাপারে জানার পর দু’দিন ঘর বন্দি হয়ে ছিলো। শামসুল
সাহেব তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তুশিকে দেখতে আসলো এক শুক্রবারে। তুশি তখন পাথরের ন্যায় নির্বাক হয়ে পুতুলের মতো বসে রইলো। চাঁদনী আপা নিজ দায়িত্বে তুশিকে সুন্দর করে সাজালো। তুশি কাঁদলো না, একদম পাথর হয়ে রইলো।

তুশিকে দেখতে এলো দু’জন মানুষ। তুরাগ সারোয়ার এবং তার স্ত্রী নীলিমা শেখ। শামসুল সাহেব এ নিয়ে প্রশ্ন করলেন না। তুরাগ সারোয়ার আগেই তাদের জানিয়েছিলেন। তার ছেলে ব্যক্তিগত জীবন শো করতে চায় না মিডিয়ার সামনে। নিজেকেও এ জন্য সব সময় আলাদা রাখে। ঠিক করা হলো শুক্রবারেই বিয়ে হবে। তেহজিব সারোয়ার চায় ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা করতে। শামসুল সাহেবও রাজি। এলাকার মসজিদে বিয়ে হবে। ছেলে পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকবেন শুধু তুরাগ সারোয়ার, নীলিমা শেখ আর তাদের বড় ছেলে।

তুশির মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না কেউ। শুক্রবার ঘরোয়া ভাবেই তুশিকে সাজানো হলো। সাদা শাড়িতে আবৃত্ত তুশিকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো। তেহজিব সারোয়ারের যেনো দুনিয়া থমকে গেলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার বঁধুর দিকে তাকিয়ে রইলো। তার বঁধু। তেহজিব বাড়ি ছেড়েছে এক মাস আগে। সামনের আবাসিক এলাকায় বড় ফ্ল্যাট কিনেছে। সেখানেই থাকছে। নববধূকে নিয়ে সেখানেই উঠবে। বিয়ের সময় তুশি বরের নাম অব্দি শুনলো না। নির্জীব হয়ে কবুল বলল।
তুশির সাথে ওর বরের দেখা হলো বাসর রাতে। তুশি তখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার মাথায় হিজাব নেই, থাকার কথাও না। তুশির খুব কাঁদতে মন চাইলো।

-“আপনি কেনো আসলেন না পার্থ? আজ তো আমার সুখের দিন হওয়া উচিত ছিলো। আমার প্রেমচিত্রটা আপনি থাকলে একদম সুখী সুখী হতো। অথচ আপনি নেই, আপনার অস্তিত্ব ও নেই। যা আছে, সেগুলো শুধুই স্মৃতি। আমি এখন অন্য জনের অর্ধাঙ্গীনি, অথচ কথা ছিলো আপনার বঁধু হয়ে আপনার রঙে রাঙাবো নিজেকে”

-“কাঁদছো?”

তুশি পরিচিত কন্ঠ পেয়ে চোখ তুলে তাকালো। সামনে ক্যাবলাকান্ত তেহজিবকে দেখে কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে বরে রইলো। হতবাক হওয়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

-“আপনি?”

#চলবে

প্রেমচিত্র পর্ব-০৭

#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৭

ভাড়াটিয়া ভদ্রলোকের সাথে তুশির প্রায়শই দেখা হয়। ভদ্রলোক কিছুটা ক্যাবলাকান্ত। সব সময় কেমন ভয়ে ভয়ে থাকে। তুশির প্রচুর হাসি পায় লোকটাকে দেখলে। এই তো গত দিনের কথা। তুশি কাপড় উঠাতে ছাদে গিয়েছে। লোকটা তখন খালি গায়ে কাপড় নাড়তে ছাদে এসেছে। তুশিকে খেয়াল করেনি। তুশি ও প্রথমে খেয়াল করেনি। পরমুহূর্তে খেয়ালে আসতেই ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। ভদ্রলোক তুশিকে দেখে চিৎকার করে রুমে ঢুকে শব্দ করে দরজা দিলো। তুশি তো হাসতে হাসতে শেষ।
তুশি মনে হয় পার্থ হারানোর পর এই প্রথম মন খুলে হাসলো। এই হাসিতে কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই। ভদ্রলোকের নাম তেহজিব সারোয়ার। ভদ্রলোকের সাথে তুশির পর দিন বিকালেও আবার দেখা হলো।

ভদ্রলোক একঝাঁক অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
-“আপনি গতকাল ওভাবে হাসলেন কেনো?

ভদ্রলোকের কন্ঠে সংশয়, কিছুটা ভীতি। তুশি ঠোঁট টিপে হাসলো।বলল,“আমার মুখ আমি হেসেছি সমস্যা?”

তেহজিব লোকটা নেতিয়ে গেলো। তুশি তখনো মুখ চেপে হাসছে। ভদ্রলোক এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে আবারও তুশির দিকে তাকিয়ে উৎকন্ঠা হয়ে বলল,“আমি যাই”

কথাটা বলেই দাঁড়ালো না এক মুহুর্ত। ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি মারিয়ে উপরে উঠে গেলো। তুশি একা একাই হাসলো কতক্ষণ। তুশি হাসতে হাসতে বাড়িতে প্রবেশ করলো। চাঁদনী আপা বাড়িতেই আছে এখনো। হুট করে চাঁদনী আপা তুশিকে ডেকে পাঠালো! তুশি দশ মিনিট পরে চাঁদনী আপার রুমে গেলো। চাঁদনী আপা তখন সবে অনয় ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করেছে। চাঁদনী আপা হুট করে তুশিকে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত কথা বলল। তুশি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো চাঁদনী আপা মুখের দিকে! চাঁদনী আপা লাজুক হেসে মাথা নাড়ালো।

-“আপা অয়ন ভাইকে জানিয়েছিস?”

-“মাত্রই জানালাম। ও আসতে পারবে না এখনই, কিছুদিন পর ছুটির চেষ্টা করবে”

চাঁদনী আপার চোখ মুখে জেনো খুশি উপচে পরছে! তুশি চাঁদনী আপাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে, এরপর পেটের কাছে কান নিয়ে নিজে নিজেই কিছু কথা বলল। চাঁদনী আপা হাসতে হাসতে শেষ।

তুশি প্রি টেস্টের আগে কলেজে গেলো এডমিট কার্ড আনতে। রিক্তার সাথে টুকটাক কথা বলছে তুশি। যদিও রিক্তাই বেশি কথা বলছে। এডমিট কার্ড নিয়ে তুশি রিক্তাকে নিয়ে ক্যান্টিনে বসে গল্প করলো কিছুক্ষণ। ক্যাম্পাসে আসতেই সায়ন ডেকে এক পাশে নিলো তুশিকে। তুশি বিরক্ত হলেও গেলো।

-“কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো, তাড়া আছে আমার”
সায়ন ইতস্তত করে বলল,“তুশি আমি তোমায় ভীষণ পছন্দ করি। তুমি কি আমার প্রেমিকা হবে?”
তুশি সোজাসাপটা বলল,
“আমার ব্যাপারে এলাকার সবাই জানে তুমি জানো না?”

-“তুশি আমি সব জানি। আমার কোনো সমস্যা নেই। তোমায় আমি কলেজের প্রথম দিন থেকে ভীষণ পছন্দ করি। তোমার অতীত নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, আর পার্থ ভাই আসবে কি না সন্দেহ। আসলে এতো দিনে তো চলেই আসতো। আদেও বেঁচে আছি কি না কে জানে”

তুশি প্রচন্ড রেগে থাপ্পড় বসালো সায়নের গালে। সায়ন অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। তুশি রাগে কাঁপছে। রিক্তা ছুটে এসেছে। তুশি সায়নের কলার চেপে বলল,
-“পার্থকে নিয়ে আমি একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড শুনতে চাই না। আমি পার্থর প্রেমিকা ছিলাম, আছি। পার্থ ফিরবে, অবশ্যই ফিরবে। তোমাকে যেনো আমার আশেপাশে আর না দেখি”

তুশি কলার ছেড়ে হনহন করে বের হয়ে গেলো কলেজ ক্যাম্পাস থেকে, রিক্তাও ছুটলো পিছনে। তুশি রাস্তায় এসেও রাগে কাঁপছে। রিক্তা বললো,
-“এই তুশি শান্ত হ! মাথা ঠান্ডা কর। কিছু হয়নি”

-“কিছু হয়নি? সায়ন ছেলেটাকে মন চাচ্ছে থাপ্পর মেরে বাজে কথা বলা ছুটিয়ে দেই। আমার পার্থকে নিয়ে কথা বলে? আমার পার্থ? ওর সাহস কতো!”

তুশি বেশ সময় নিয়ে শান্ত হলো। বাড়ি ফিরে প্রথমে গোসল সারলো। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ! হুটহাট বৃষ্টি নামে। তুশি সারাটা দুপুর শুয়ে কাটালো। তুশির মা তাহেরা খাতুন মেয়েকে বলে কয়ে খাওয়াতে পারলেন না। মহিলা মেয়ের এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেন না। তুশি গাছ পাগল মেয়ে! প্রচুর গাছ পছন্দ করে। ছাঁদে তার লাগানো কত রকমের গাছ আছে। তিশি মন ভালো করতে বিকালের রোদ পরতেই বের হলো। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে নার্সারিতে আসলো। তুশিদের বাড়ি থেকে নার্সারিতে আসতে মিনিট দশেক লাগে। তুশি নার্সারি থেকে কতগুলো গোলাপ, বেলি, নয়নতারা সহ কয়েক রকম ফুল নিলো। রিকশা ঠিক করে সেগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলো তখন প্রায় সন্ধ্যে। আসার পথেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আবির্ভাব হয়েছে, এখন তা ঝুম বৃষ্টিতে পরিনত হয়েছে। রিকশা থেকে নামতে গেলেও তুশি ভিজে একাকার হবে।

তেহজিব নামক ভদ্রলোক তখনই রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে গেইটের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভদ্রলোকের পরনে অফিসের পোশাক, আয়রন করা শার্ট, প্যান্ট, কাঁধে অফিস ব্যাগ। তুশির বুঝতে বাকি রইলো না অফিস থেকে আসছে পরশ। তুশি তাকে ডাক দিয়ে বলল,
-“এই যে ক্যাবলাকান্ত আমায় সাহায্য করুন। গাছগুলো নিয়ে একটু সিঁড়ি ঘরে রাখুন।”

তেহজিব ছোট ছোট চোখে কিছুক্ষণ তুশিকে পর্যবেক্ষণ করে চশমা খুলে পেকেটে রেখে, গাছগুলো নিয়ে সিঁড়ি ঘরে রাখলো। তুশি ভাড়া মিটিয়ে সিঁড়ি ঘরে আসলো। তেহজিব বোকাবোকা চোখে তাকিয়ে আছে। অর্ধভেজা হয়ে গিয়েছে লোকটা। তুশি চোখ তুলে তাকিয়ে চমকালো, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো অপলক! এই চোখজোড়া তার ভীষণ চেনা। তুশি ঘোরে এগিয়ে গেলো দু’পা। আনমনে হাত উঠিয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইলো ভদ্রলোকের চোখ জোড়া।
ভদ্রলোক ছিটকে সরে এসে ভীতু গলায় বলল,
-“কি করছেন আপনি?”

তুশির চেতনা ফিরতেই থমকালো। এই লোকটাকে সে পার্থর সাথে গুলাচ্ছে? মোটেও এই ক্যাবলাকান্ত পার্থ হতে পারে না। আচরণ, চলা ফেরা, কথা বার্তা সব কিছু আলাদা এমনকি চোখের মনির রঙও! কীভাবে পার্থ হয় এই লোক? পার্থর চোখের মনিটা হালকা ধূসর রঙের কিন্তু এই লোকের ব্রাউন। একদমই মিল নেই। তুশি নিজেকে খুব বকলো।

নিজেকে স্বাভাবিক করে শুধালো,“গাছ গুলো উপরে নিতে সাহায্য করতে পারবেন?”

তেহজিব মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। তুশি নিজে দুটো নিয়ে হাঁটা ধরলো। ভদ্রলোক পেছনে পেছনে আসছে। বৃষ্টি ততক্ষণে কিছুটা কমেছে। ছাদের সিঁড়ি ঘরে গাছগুলো রেখে তুশি নামতে নামতে বলল,
-“মিস্টার ক্যাবলাকান্ত গাছগুলো দেখে রাখবেন।”

ভদ্রলোক মাথা নাড়ালো। তুশি বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে না খেয়েই শুয়ে পরলো। বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে ঝড়ো হাওয়া। তুশি লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে। নির্বিকার ভঙ্গিতে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। পার্থর স্মৃতিচারণ করছে মেয়েটা।

-“কতটা অপেক্ষা করলে আপনায় পাবো পার্থ? আমায় আর কত অপেক্ষা করাবেন?”

মাস দুই পরের কথা। তুশির টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। চাঁদনী আপা এ বাড়িতেই থাকছেন। তুশি আগের ন্যায় শান্ত। ছাদে বেশ কয়েকটা গাছ লাগিয়েছে। কিছু গাছে ফুলও হয়েছে। তুশি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সারাটা দিন এই ওই করে। চাঁদনী আপার দেখাশোনাও সেই করে। তুশি তুমুল ব্যস্ত, মাস চার পরেই এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার আগেই সিলেবাস কম্পিলিট করতে হবে। অথচ তার ঢের বাকি! হঠাৎই শামসুল মির্জা টিউটর ঠিক করলেন তুশির জন্য, অথচ তুশি বলেওনি। তুশিকে পড়াতে আসলো পরদিন রাত আটটায়। তুশি নতুন স্যারকে দেখে থতমত খেলো কিছুটা। যেই লোককে সে হেয় করতো সেই কি এখন থেকে তার স্যার?

তুশি তবুও বই খুলে বসলো। তেহজিব আইসিটি বই বের করে লজিক গেটের কতগুলো অংক দেখিয়ে দিলো। তুশিও মন দিয়ে বুঝলো। পড়াশোনায় তুশির মোটেও গ্যাপ দিতে চাইছে না। তুশি পড়া শেষে বলল,
-“এই ক্যাবলাকান্ত স্যার আপনি আমায় পড়াতে রাজি হলেন কেনো?”

চলবে

প্রেমচিত্র পর্ব-০৬

#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৬

পার্থ তুশিকে আশ্বাস দিলেও কাজের বেলায় লবডঙ্কা। আগের ন্যায় ঘুরছে ফিরছে আর সিগারেট গিলছে। যদিও বা আগের তুলনায় পার্থ সিগারেট কম খায়। তুশির দিন কাল কাটছে তুমুল ব্যস্ততায় আর সাথে পার্থের প্রেমময় যত্ন তো আছেই। কলেজ ফাঁকি দিয়ে দু’জন হুটহাট ঘুরতে চলে যায়। এ যেনো তুশির স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তুশি যথা সম্ভব চেষ্টা করছে বখাটে লোকটাকে সভ্য করতে। তুশি এটুকু বুঝেছে পার্থকে শুধরানো এতোটা সহজ হবে না। আজও কলেজের নাম করে পার্থর সাথে ঘুরে এসেছে তুশি। মনটা বড্ড ফুরফুরে। এই তুশি কি জানতো বাড়িতে তার জন্য ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে?

বাড়িতে পা রাখতেই কেমন গুমোট ভাব ঠেকলো তুশির নিকট। তুশি পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা করলো। দরজা খুলেছে ইরফান। তুশি নিজের ঘরের দিকেই যাচ্ছিলো মা তাকে থামিয়ে দিলেন। তুশিকে ড্রয়িং রুমে ডাকা হলো। তুশি এবার কিছুটা চিন্তিত হলো। শামসুল মির্জাও উপস্থিত, বড় চাচি, ছোট চাচি, দাদি সবাই আছে। শামসুল সাহেব এগিয়ে এসে মেয়েকে চড় মারলেন। তুশি ছিটকে ফ্লোরে পরলো। এক দফা মার খেলো তুশি মায়ের হাতে। সাথে আছে ছোটচাচির কটুক্তি, কটুকথা। বাড়িতে সবাই জানলো তুশি বখাটে পার্থর সাথে প্রেমে জড়িয়েছে। বড় আপাও তুশিকে ফোন করে কথা শুনালো। ব্যাথাময় শরীর টেনে তুশি নিজের ঘরে দরজা আটকালো। ফোনটা তুশির কাছেই আছে। বোধ হয় নিতে ভুলে গিয়েছে। তুশি কোনো মতে পার্থকে মেসেজ করলো। পার্থ তখন লাইনে নেই। ফোনটা লুকাতে চাইলো তুশি। তার আগেই তুশির মা মেয়েকে থাপ্পড় মেরে নিয়ে গেলেন ফোনটা। তুশি দরজা আটকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

রাত তখন গভীর! তুশি নিষ্প্রান, নির্বিকার হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। চোখ জোড়া ফ্যানের দিকে নিবদ্ধ। হঠাৎই বেলকনি থেকে শব্দ পেলো। তুশি কান দিলো না। তখনও সে নির্বিকার। শব্দ জোরালো হলো। তুশি ধীর পায়ে এগিয়ে থাই খুললো। চোখের সামনে প্রিয় পুরুষকে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। পার্থ অস্থির কন্ঠে গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো। তুশি নিজের অনুভূতির খেই হারালো। ঝাপটে ধরলো মানুষটাকে। পার্থ কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না। আশপাশ দেখে তুশিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

পার্থ সে রাত তুশির কাছে ছিলো বোধ হয় ঘন্টাখানেক। যাওয়ার আগে তুশিকে কথা দিয়ে গিয়েছে পার্থ তার কাছে আবারও খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। তুশির মন মানতে চাইনি। যেতে দিতে চাইনি পার্থকে। তুশি এও বলেছিলো পার্থ যেনো নিয়ে যায় তুশিকে। পার্থ রাজি হয়নি। বলেছিলে,
‘আমি যখন তোমার যোগ্য হবো তখন নিজেই নিয়ে যাবো, তোমার তখন বলার প্রয়োজন হবে না বোকাফুল। আমার জন্য অপেক্ষা করো’

তুশি করুন চোখে তাকিয়ে বলেছিলো,“নিয়ে যান না আমায়”

-“আমি সময় মতো ঠিক তোমায় নিয়ে যাবো বোকাফুল”

সেদিনের পর এক মাস পেরিয়েছে। তুশির কাছে ফোন নেই। পার্থরও কোনো খোঁজ নেই। পার্থ এই এলাকার ছেলে না। যতটুকু ব্যবহার আর কাজ কারবারে মনে হয় বখাটে। তিন, চার বছর ধরে এই এলাকাতেই তার বসবাস। তুশি বাড়ি থেকে বের হয় না, হয় না বলতে তাকে হতে দেওয়া হয় না। কলেজের পরীক্ষা গুলো মা সাথে করে নিয়ে গেছেন। তুশি এখন চুপচাপ থাকে। ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। চাঁদনী আপা অবশ্য মাঝে এসেছিলেন। অনেক কথা বলেও গেলেন।

ছয় মাস পরের কথা। তুশিকে এখন কেউ মানা করে না বাড়ি থেকে বের হতে বা কিছু করতে। তুশি এখন আগের ন্যায় স্বাধীন ভাবে চলতে পারে। কিন্তু কেনো? সেই কথা কেউ কি জানে? হ্যাঁ জানে বোধ হয়। পার্থ এলাকা ছেড়েছে মাস ছয় আগে। কেউ জানে না ছেলেটা কোথায়? কীভাবে আছে! তুশি অনেক বার গিয়েছিলো পার্থর সাঙ্গপাঙ্গের কাছে। তারাও কিছু বলতে পারে না। হুট করে নাকি গায়েব। মুনসি কাজীও খবর জানেন না। তুশির হৃদয় পুড়ে। কখনো কখনো ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দূর দূরান্তে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তায়। নির্বিকার সেই দৃষ্টি। চাঁদনী এ বাড়িতে খুব বেশি আসে না। বোনের নিরবতা তাকে কষ্ট দেয়।

আজ তুশির কলেজ নেই। সরকারি ছুটি। তুশির আজ সকাল সকাল ঘুম ভেঙেছে। উঠেই মেয়েটা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সকাল থেকে। মাইশা এসে টেনে নিয়ে ছাদে আসলো। ছোট চাচী চিলেকোঠার রুমটা পরিষ্কার করছেন। তিনি নাকি ভাড়াটিয়া পেয়েছেন। ছোট চাচী তুশিকে বললেন,

-“অ্যাই্ তুশি আয় তো একটু সাহায্য কর। বিকালে নতুন ভাড়াটিয়া আসবে। তারে তো এমন নোংরা ঘর দেওয়া যায় না।”

-“চাচী এখানে বাচ্চারা এসে খেলতো, ভাড়া না দিলে হতো না?”

ছোট চাচী তুশির কথায় পাত্তা না দিশে বললেন,
-“একটু সাহায্য কর দেখছিস না, খেটে মরছি”

তুশি অল্প একটু সাহায্য করলো। তার মাঝেই ইরফান এসে ডেকে নিয়ে গেলো। ছোট চাচী অবশ্য ইরফানকেও মনে মনে দু’কথা শোনালেন। তুশিদের ছাদের চিলেকোঠা নয় অবশ্য বড় একটি রুম আর সাথে বিশাল বারান্দা, ওয়াশরুম, রান্নাঘর সবই আছে। এতোদিন এটা চিলেকোঠা হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। এখন থেকে ভাড়াটে থাকবে। তুশি নিচে এসে জানলো আজ চাঁদনী আপা আসবে সাথে অয়ন ভাই ও। অয়ন ভাই এসেছে ছুটিতে। তুশি তবুও বের হলো না। সেই যে রুমে ঢুকলো আর বের হওয়ার নাম নেই। তুশি বারান্দার মেঝেতে বসে রইলো এক ধ্যানে। তখন বিকাল প্রায়। দুপুরে খায়ওনি মেয়েটা। বাড়ির উঠোনে দেখা মিললো এক অপরিচিত পুরুষের। হাতে একটা জামাকাপড়ের ব্যাগ। তুশি তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। ঘরে এসে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলো।

বিকালে চাঁদনী আপা সবাইকে ডেকে ছাদে আনলো। তুশিকে জোরজবরদস্তি করে এনেছে চাঁদনী আপা। তুশিকে একা রেখে চাঁদনী বাকি সবাইকে ডাকতে যায়। তুশি ছাঁদের কোণা ঘেঁষে আজও দাঁড়িয়ে পরে। হঠাৎ পুরুষালি কন্ঠস্বর কানে আসতেই চমকে উঠলো তুশি। পিছু ফিরতেই অপরিচিত পুরুষকে দেখে থমকালো মেয়েটা। ভদ্রলোকের গলাটা কেমন পরিচিত লাগছিলো। ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছেন। ছাদের রুম থেকে বের হলেন। তুশি ধারণা করলো লোকটা নতুন ভাড়াটিয়া। তুশির লোকটাকে কিছুটা চেনা মনে হলেও বুঝে উঠতে পারলো না কোথায় দেখেছে। ভদ্রলোক একবার তাকালেন তুশির দিকে। ক্লিন শেভ করা, চোখে চশমা, বোকাবোকা চাহুনির লোকটার দিকে তুশি দ্বিতীয় বার তাকালো না।

চাঁদনী ছাদে এসে অপরিচিত লোক দেখে জিজ্ঞেস করলো,“আপনি কে? কার বাসায় এসেছেন?”

ভদ্রলোক ইতস্তত করে জবাব দিলেন,“আমি ওই রুমে ভাড়ায় এসেছি। আজই উঠেছি”

চাঁদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালেও ভদ্রলোককে দেখে কিছু বলল না। কথা বলার মাঝেও কেমন কেঁপে উঠছিলো। চাঁদনী পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে আসলো। তুশি দূর থেকেই শুনছিলো সবটা। তুশির খুব হাসি পেলো লোকটার কাজ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে। ফোনে হয়তো কাউকে কিছু বলছে আর মিনিটে মিনিটে কেঁপে উঠছে। সে বিকালে তুশির উদাসীন মনটা কিছুটা হলেও ভালো হলো। তবে মনের এক কোণে বিষাদ থেকেই যায়।

সন্ধ্যে হওয়ায় যখন সবাই নিচে নামছিলো জাওয়াদ তুশিকে ডেকে বললেন,“তুশি তুই এমন চুপচাপ থাকিস কেনো? আগের মতো কিছু করিস না কেনো?”

তুশি নিঃশব্দে হেসে বলল,
“জাওয়াদ ভাই মন মরে গেলে কি কারো কিছু করতে ইচ্ছে হয়?”

জাওয়াদ ভাই মাথা নাড়ালেন। তুশি গম্ভীর কন্ঠে বলল,,“আমারও মন মরে গিয়েছে, পার্থর সাথে সাথে হারিয়ে গিয়েছে আমার চঞ্চলতা”

তুশি দাঁড়ালো না। নিচে নেমে গেলো। নামার আগে দেখলো। নতুন ভাড়াটিয়ার রুমে কি সব জিনিস পত্র উঠাচ্ছে কারা যেনো। তুশি সেদিকে খেয়াল দিলো না সোজা বাড়িতে আসলো।

চলবে…

প্রেমচিত্র পর্ব-০৫

#প্রেমচিত্র-[৫]
লেকনীতে-ইশা আহমেদ

তুশি থেমে থেমে বলল,“একা কই রিক্তা আছে তোহ!”
পার্থ এবার নিজের রাগ আয়ত্তে আনতে পারলো না। তুশির বাহু চেপে রূক্ষ কন্ঠে শুধাল,
“এই মেয়েটা তোমাকে বাঁচাতো? ও নিজেই তো তোমার সাথে ভোগের বস্তুতে পরিনত হত। আমি না আসলে আজ কি হতো, বলো?

তুশি উত্তর দিতে পারলো না। আসলেই তো আজ পার্থ তাদের না বাঁচালে তারা কি কাল মুখ দেখাতে পারতো কাউকে? তুশি কেঁদে ফেললো। পার্থ বোধ হয় কিছুটা নরম হলো। রিকশা ডেকে দু’জনকে উঠিয়ে দিলো রিকশায়। তুশি সারাটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গেলো।
বাড়িতে ফিরেও তুশি স্বাভাবিক হতে পারছিলো না। সেই জঘন্য সময়টার কথা মনে পরছিলো। যখন কিছুটা স্বাভাবিক হলো তখন মাথায় আসলো পার্থর কথা। বখাটে লোকটার ছোঁয়া পেয়েছে আজ। হোক তা থাপ্পড়। পেয়েছে তো। এটাই অনেক। পার্থের অস্থিরতা কি প্রমাণ করে? পার্থ কি তাকে পছন্দ করে? তুশি নিজেই নিজের মাথায় মেরে মনে মনে বললো,
-“ইশশ্ তুশি তুই ও না। একটু বেশিই ভেবে ফেলিস। তোকে কি না ওই বখাটে বাউণ্ডুলে লোকটা ভালোবাসবে! আদেও সম্ভব?”

সে ঘটনার পর তুশি বাড়ি থেকে বের হলো গুনে গুনে চার দিন পর। কলেজ, কোচিং কোনটাতেই তাকে দেখা যায়নি। তুশির কিছু কথা কানে এসেছিলো। পার্থ নাকি আরেক দফা পিটিয়েছে ছেলে তিনটাকে। চাঁদনী আপা প্রায়শই এ বাড়িতে আসে। অয়ন ভাই গিয়েছে অনেক দিন। চাঁদনী আপা খুব সুখে আছে। তুশি আজ বের হয়েছে চাঁদনী আপার শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মা জোর করে পাঠিয়েছে। চাঁদনী আপা হাঁসের মাংস খুব ভালোবাসে। এই বিকালে তুশিকে ঘুম থেকে তুলে পাঠালেন। তুশি অনিচ্ছা শর্তেও এসেছে। এ পথেই কোচিং এ যাবে তুশি। তুশি চাঁদনী আপাকে দেখে বিস্তর হাসলো। চাঁদনী আপার মুখে একটা আলাদা গ্লো চলে এসেছে। তুশির বড্ড সুখ সুখ অনুভূত হয় চাঁদনী আপার জন্য। তুশি মিনিট বিশেক কাটিয়ে কোচিং-এ চলে আসে। রিক্তা তুশিকে চার দিন পর সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেও হাজারটা প্রশ্ন করে।

তুশি জবাব দিতে দিতে অতিষ্ঠ। কোচিং শেষ হয় সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। তুশি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় চোখ আশেপাশে দিয়ে হাঁটছে। পার্থকেই খুঁজছে তুশি। পার্থকে পেলো ফাঁকা গলির সামনে। এই রাস্তাটা কিছুটা নির্জন। তুশি চটপট পায়ে এগিয়ে আসে পার্থর কাছে। পার্থ তখন সিগারেটে সুখ টান দিতে ব্যস্ত।

-“শুনুন!”

পার্থ তাকালো। তুশি উত্তরের অপেক্ষা না করে বলল,“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সেদিনের জন্য”

পার্থ তবুও জবাব দিলো না। তুশি যাওয়ার আগে এক বুক সাহস নিয়ে বলল,
“আমি আপনায় খুব পছন্দ করি বেপরোয়া লোক”

তুশি দাঁড়ায়নি এক মুহুর্তও! দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করেছে। তুশি পেছনে ফিরলে দেখতে পেতো এক জোড়া উচ্ছ্বসিত চোখকে। যে চোখ সহজে হাসে না। বোকাফুল সামনে এলেই হাসে, তবুও লুকিয়েই হাসে! তুশি কিছু দূর গিয়েই বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। মেয়েটা বড্ড সাহস নিয়ে বলে এসেছে পছন্দ করার কথা। তুশি জানে না আদেও পার্থ তাকে পছন্দ করে কি না। তবুও বলেছে নিজের মনের কথা, এটাই অনেক। বাড়িতে ফিরে তুশি চরম বিষ্মিত হলো। মা ডেকে তুশিকে বললেন ছেলের কথা। ছোট চাচির কোন আত্নীয়ের ছেলের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছে তুশির জন্য। সবাই না কি রাজি! কেউ কি তুশির মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না? তুশির মন ভাঙলো! ওই মানুষটার মনের খবর জানার আগেই কি তুশি অন্য কারো হয়ে যাবে? না না জীবনেও না! তুশি যে করেই হোক পার্থর সামনে গিয়ে তার মনের কথা জানতে চাইবে।

তুশি বিধ্বস্ত মন নিয়ে রুমে ফিরলো। সে রাত তুশির কাঁদতে কাঁদতেই পার হলো। কিছুক্ষণ পর পর তুশি হেচকি তুলে কেঁদেছে। পরদিন খুব সকালে তুশি উঠে কলেজের জন্য তৈরি হলো। সকালের নাস্তাও করলো না। কলেজ পথেই পার্থর সাথে দেখা। বাইকে হেলান দিয়ে প্রতিদিনের ন্যায় সিগারেটে সুখ টান দিতে ব্যস্ত। তুশি হনহন পায়ে এগিয়ে গেলো। ছোঁ মেরে পার্থর হাতের সিগারেট টেনে দূরে ছুঁড়ে মারলো। পার্থ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেয়েটা করছে কি ভেবে পেলো না। তুশির বিধ্বস্ত চেহারা দেখে পার্থ বোধ হয় কিছুটা চমকালো। তুশির পরনে অফ হোয়াইট আর নীলের মিশ্রনের সেলোয়ার-কামিজ। মাথায় নীল হিজাব, কাঁধে ব্যাগ। হিজাব কেমন এলোমেলো হয়ে আছে।

তুশি পার্থকে ভাঙা গলায় বলল,“আমায় দূরে কোথাও নিয়ে চলুন। কিছু কথা আছে”

পার্থ প্রশ্ন ছাড়াই বাইকে উঠে স্টার্ট দিলো। তুশিও পেছনে চড়ে বসলো। তুশিকে পার্থ হেলমেট পরিয়ে দিয়েছে। তুশিকে চেনার উপায় নেই। এলাকা ছেড়ে কিছুদূর যেতেই তুশি হেলমেট খুললো। পার্থর কাঁধে মাথা ঠেকালো। পার্থ শহর ছেড়ে কিছুটা দূরে এসে বাইক থামালো। তুশি বাইক থেকে নেমে রাস্তার পাশে ঢালু ঘাসে বসে পরে। পার্থ আরেকটা সিগারেট জ্বালায়। তুশি কেশে উঠে। পার্থ দূরে ছুঁড়ে মারে জ্বলন্ত সিগারেট। এই প্রথম বোধ হয় পার্থ কারো জন্য সিগারেট ফেলেছে। পার্থ এবার বিরক্ত হলো। মেয়েটা এমন কেনো করছে বুঝে উঠতে পারছে না।

-“তুশি আমার এতো অযথা সময় নেই। কি বলবে বলো!”
-“আপনি আমার কথায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এখানে কেনো আনলেন পার্থ? আপনি কি আমায় পছন্দ করেন?”
তুশির এমন প্রশ্নে চমকালো পার্থ। পার্থ আগের ন্যায় গম্ভীর কন্ঠে শুধাল,“তুমি কি বলবে তাই বলো।”
-“আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না কেনো পার্থ? আচ্ছা থাক সমস্যা নেই বলতে হবে না।”

তুশি থামলো। তাকালো পার্থের চোখের দিকে। পার্থর কেমন অস্বস্তি বোধ হলো। মেয়েটাকে আজ হুট করে বড় লাগছে, ম্যাচিউর লাগছে! তুশি আবারও বলল,
-“আমার জন্য বাড়ি থেকে ছেলে দেখেছে। ছেলে না কি খুব ভালো চাকরি করে। আপনি কি আমায় পছন্দ করেন পার্থ?”

পার্থর কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত? পার্থ বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থাকে তুশির দিকে। তুশি নির্বিকার। চোখ মুখ ফুলে উঠেছে। মেয়েটা সারা রাত কেঁদেছে এটুকু পার্থ খুব ভালো করেই বুঝে ফেলেছে।

-“প্রেমিকা হবে?”

পার্থর দুই শব্দে উচ্চারণ করা প্রশ্ন! তুশির হৃৎস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি করেছে। পার্থর চোখ মুখ তখনও গম্ভীর। তুশির চাহুনি এলোমেলো। আধ ভাঙা গলায় বললো,
-“মজা করছেন?”

-“না। আজ থেকে তুমি আমার প্রেমিকা তুশি। এখন স্বাভাবিক হও। বিয়ে পরে করবো। তোমাকে এখন আমি নামিয়ে দিয়ে আসবো কলেজ থেকে কিছুটা দূরে। সেখান থেকে সোজা বাড়িতে যাবে। যদি বিয়ের জন্য বেশি প্রেশার দেয় আমায় জানাবে। তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবো।”

-“আপনি আমায় ভালোবাসেন?”

-“তুমি বড্ড বেশি প্রশ্ন করো। তোমাকে যা বলেছি করো। নাম্বার দিচ্ছি নিয়ে যাও”

তুশি এটুকু বুঝলো বেপরোয়া বখাটে লোকটার তার প্রতি কিছুটা হলেও দুর্বলতা আছে। তুশি পার্থর চোখে নিজের জন্য অস্থিরতা, আকুলতা দেখেছে। তুশির বিষাদে পরিপূর্ণ মনটা সহজেই ফুরফুরে হয়ে গেলো। বখাটে লোকটা আজ থেকে তার প্রেমিক? ভাবা যায়! পার্থ তুশিকে সাবধানে নামিয়ে আসলো। আসার আগে বলে এসেছে সমস্যা হলেই যেনো তাকে জানায় তুশি। তুশিও সম্মতি জানিয়েছে।

পার্থ আর তুশির প্রেমটা হুট করে হলেও তাদের কাছাকাছি আসতে, জানতে সময় লাগছিলো। তুশির বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে। ছেলের বিয়ে ছিলো আগে। কলেজ লাইফে পালিয়ে বিয়ে করেছিলো। এখবর জানতেই তাহেরা খাতুন বেশ চিল্লাপাল্লা করেছিলো। তুশির ছোট চাচিকে কথা শুনিয়েছে। তখন তুশি আর পার্থর ফোনে প্রেমালাপ চলছে বেশ ভালোই। যদিও তাদের কথা খুব একটা হতো না। কিন্তু ফোন কানে থাকতো। পার্থ স্বভাবতই কথা কম বলে আর তুশি? সে তো লজ্জায় দু’টো কথাও ঠিক মতো বলতে পারে না। তুশির সপ্তাহ খানেক পর পরীক্ষা শুরু। পার্থকে আজ দেখা করতে বলেছে তুশি। কলেজ থেকে দশ মিনিট হেঁটে সামনে এগিয়ে আসতেই তুশি বখাটে লোকটার দেখা পায়। তুশিকে বাইকে উঠিয়ে নিয়ে আসে দূরে।

-“ কিছু কথা বলবো রাগ না করলে?”

-“যেকোনো কিছু বলতে পারো”
তুশি তবুও ইতস্তত করে বলল, “আপনি তো পড়াশোনা জানা শিক্ষিত ছেলে। বলছি কি এবার এসব ছেড়ে কি চাকরি বা কিছুতে ঢোকা যায়?”
পার্থ মুখ খানা গম্ভীর হলো। তুশি ভয় পেলো। এবার বোধ হয় পার্থ তাকে বকাঝকা করবে। তাদের প্রেমের বয়স মাত্র পনেরো দিন। তুশির উচিত হয়নি এতো তাড়াতাড়ি এসব বলা। তুশিকে অবাক করে দিয়ে পার্থ বলল,“আমি চেষ্টা করবো।”

পার্থ পড়াশোনা নিয়ে খুবই সিরিয়াস। তুশিকে ঠিক টাইমে পড়তে বসানো যেনো তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। তুশিকে সেদিন পার্থ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে দিয়ে আসে। বাড়িতে ফিরে তুশি সেই খুশি। পার্থ এরপর থেকে ভালো হয়ে চলবে। ভাবতেই তুশির কি যে আনন্দ হচ্ছে।

চলবে

প্রেমচিত্র পর্ব-০৪

#প্রেমচিত্র-[৪]
লেখনীতে:ইশা আহমেদ

চাঁদনী আপাও উপায় অন্তর না পেয়ে তুশিকে নিয়ে সাবধানে বাড়ির পেছন দিকটায় আসলো। অয়ন ভাই তখন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। তুশি বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। অয়ন ভাই চাঁদনীকে আপাকে জড়িয়ে ধরেছিলো এটা তুশি চুপিচুপি দেখে নিয়েছে। চাঁদনী আপা পাঁচ মিনিটে বিদায় দিয়ে আবারও তুশিকে নিয়ে ফিরে আসলেন বাড়িতে। বাড়ির মানুষ সবাই ব্যস্ত। তুশির ও টুকটাক ডাক পরছে। ছোট চাচি তুশিকে ডেকে বললেন,

-“ বাইরে যা তো তুশি। জাওয়াদ ফুল আর মেহেদী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর আবার কি কাজ আছে। যেতে হবে ওকে।”

তুশি কোনো রকম হাত খোঁপা করে আঁচল টেনে ছুটে বাইরে আসে। জাওয়াদ ভাই বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুশি জাওয়াদ ভাইয়ের কাছ থেকে ফুল নিয়ে দেখছিলো সব কিছু ঠিক আছে কি না। সামনের চায়ের দোকানে চোখ পরতেই পার্থকে দেখলো তুশি। চমকালো, ফুলের ডালাটা হাত ফসকে গিয়েছিলো তুশির কোনো মতে নিজেকে সামলে ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। তুশির খেয়ালে আসলো চুলের কথা। আঁচল পরে, খোঁপা খুলে তার প্রায় হাঁটু অব্দি চুলগুলো দেখা গিয়েছে। পার্থ বুঝি এ জন্য তাকিয়ে ছিলো? ছিহ্! কি লজ্জার বিষয়। তুশির মনটা খারাপ হলো। তার লম্বা চুল সে কখনো কাউকে দেখায়নি। আজ অযাচিত ভাবে পার্থ দেখে নিলো। আশেপাশের লোকও দেখছে ভাবতেই খুব খারাপ লাগলো তুশির।

রিক্তা তুশিকে ডেকে রুমে আসে। মেহেদী আর্টিস্ট ততক্ষণে চাঁদনী আপাকে মেহেদী পরানো শুরু করে দিয়েছে। রিক্তা ফুলের ডালা থেকে একটা বেলী ফুলের মালা তুলে তুশির লম্বা বিনুনিতে একেঁ বেঁকে গেঁথে দিয়েছে। তুশির সৌন্দর্য যেনো আজ উপচে পরছে। মিমি টিনটিন সবাই সেজেছে। সে সন্ধ্যা কাটলো সবার ভীষণ আনন্দ উল্লাসে। রিক্তা বেচারি মেহেদী দিয়ে ক্লান্ত। অনুষ্ঠান শেষ করে তুশি এক প্রকার বাধ্য করেছে সবাইকে তার রুম গুছিয়ে দিতে। সব কিছু গোছগাছ করে শুতে শুতে তুশির রাত বারোটা বাজলো। তুশির রুমে শুয়েছে তুশি আর রিক্তা। তুশির বান্ধবী বলতে রিক্তাই।

বিয়ের দিন চাঁদনী আপা খুব ব্যস্ত। তুশির অনেক কান্না পাচ্ছে। চাঁদনী আপা চলে যাবে। বাড়িতে এই একটা মানুষ ছিলো যাকে তুশি ভীষণ ভালোবাসতো, যার সাথে তুশির প্রতিটা সময় কাটানো হতো। এরপর তুশি খুব একা হবে খুব। তুশি আজ অফ হোয়াইট শাড়ি পরেছে, সাথে ম্যাচিং হিজাব,চুড়ি, গহনা। রিক্তা তুশির সাথে সাথে ই আছে। অয়ন ভাই আসলে তুশিরা গেট ধরে, জুতা চুরি করে আরো কত কি! মজা করে বাকিটা সময় কাটলেও, বিয়ের সময় বেঁধে যায় এক কান্ড। কাবিন নিয়ে ঝামেলা লেগে যায় দুপক্ষের ভেতর। বর পক্ষ বলে এক অঙ্ক, কনে পক্ষ বলে আরেক।এই নিয়ে ঝামেলা শুরু!

অনেক কথা কাটাকাটির পর অয়ন ভাই নিজেই সবাইকে থামতে বলেন। অয়ন ভাই নিজে গিয়ে চাঁদনী আপাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন প্রথমে ঠিক করা কাবিনে সে বিয়ে করবে কি না? চাঁদনী আপা সরাসরি উত্তর দিলেন তার সমস্যা নেই। এরপর সুষ্ঠু ভাবেই বিয়েটা শেষ হয়। বিদায়ের আগে সে কি কান্না চাঁদনীর। তুশিও কম কিসে? আপাকে জড়িয়ে একাধারে কেঁদে যাচ্ছিল। কেউ একজন গম্ভীর চোখে তুশির আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো, যা তুশি কল্পনাও করতে পারে না।
নাকের পানি চোখের পানি এক করে তুশি যখন কান্নায় ব্যস্ত তখন পার্থ ব্যাস্ত সিগারেট ফুঁকতে। তার চোখ আবদ্ধ তুশি নামক বোকাফুলের দিকে।

পার্থ মনে মনে আওড়ালো, “সময় এসেছে বোকাফুল”

তুশির পার্থর সাথে দেখা হলো গুনে গুনে চাঁদনী আপার বিয়ের পাঁচদিন পর। তুশি তখন সন্ধ্যে বেলা কোচিং শেষে বাড়িতে ফিরছে। তুশি আশপাশ ভালো করে দেখে নিলো কেউ আছে কি না চেনা পরিচিত! কাউকে না দেখে ভীরু মেয়েটা এগিয়ে গেলো পার্থ নামক বখাটে লোকটার পাশে। তুশি মনোযোগ পেতে কেশে উঠলো। পার্থ ফিরে তাকালো। বললো,
-“কি চাই?”

তুশি ইতস্তত করে বলল,“ধন্যবাদ!”
-“কেনো?”
তুশি নিচু স্বরে শুধাল,
“সেদিন ওই লোকটাকে আমার হয়ে মারার জন্য”
-“তোমার জন্য মারিনি”
তুশি হতভম্ব হলো। রিক্তা যে বলল পার্থ ভাই নাকি কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে, নাক বরাবর নাকি ঘুষিও মেরেছে। তাহলে কি রিক্তা ভুল বললো? প্রশ্নবোধক চাহুনিতে জিজ্ঞেস করলো,
-“তাহলে কেনো মেরে ছিলেন?”
পার্থ বিরক্ত হলো। ধমকে বলল,“এই মেয়ে আমাকে ভয় করছে না? তুমি প্রশ্ন করার সাহস পেলে কোথায়?”

তুশির বোধ ফিরলো। দুঃখিত বলে চলে যেতে চাইলো। দু’পা এগোতেই ভেসে আসলো পার্থর গম্ভীর কন্ঠস্বর।
-“এই মেয়ে চুল ছেড়ে বের হবা না আর!”

তুশি তাকালো না। তাকানোর সাহস নেই। লজ্জায় বেচারির অবস্থা খারাপ। পেছন থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ছুটে চলে গেলো। পার্থ মৃদু হাসলো। তুশি বাড়ি এসে চমকে গিয়েছে। চাঁদনী আপা, অয়ন ভাই অপেক্ষা করছে তার জন্য। মিমি, মাইশা জাওয়াদ ভাই সবাই রেডি। তার জন্যই বসে থাকা। তুশিকে মিনিট দশেকের মাঝে তৈরি হয়ে আসলো।
অয়ন ভাই আজ সবাইকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে অয়ন ভাই দু’দিন বাদেই ফিরে যাবেন। শালা-শালিদের আজ দারুন ভাবে ঘুরাবে। সবাই অটোতে করে ঘুরলো শহরের আনাচে কানাচে। তুশির সাথে বখাটে ছেলেটার আবারও দেখা হলো মোড়ের ফুসকার দোকানের সামনে। তুশি আড় চোখে দেখছিলো।
সেই সন্ধ্যে তুশির আসলেই দারুন কাটলো। রাতে বাড়ি ফিরে তুশি চিন্তায় পরলো। পার্থ কেনো তাকে ওই কথা বললো? পার্থ কি ভালোবাসে তুশিকে? বা পছন্দ করে?

এক মাস পরের কথা। বিকালের সময়টাতে তুশির একা লাগছিলো। রিক্তাকে কল করে আসতে বলল। দু’জন ঠিক করলো নদীর পারে যাবে। দুই বান্ধবী রিকশায় চড়ে আসলো নদীর পাড়ে। নদীর পাড় জুড়ে অনেকগুলো চায়ের দোকান। তুশি রিক্তাকে নিয়ে বসলো সেখানে। দু’কাপ চায়ে সেই বিকাল আড্ডায় মেতে উঠলো। তুশিরা উঠলো আজানের কিছুক্ষণ আগে। রিক্তা বিল দিয়ে এসে দেখে তুশিকে ঘিরে আছে তিন জন ছেলে। একজনের সাথে তুশি কথা বলছে। রিক্তা কিছুটা এগিয়ে আসতেই বুঝলো ছেলেটা তুশিকে বিরক্ত করছে। রিক্তা নিজেও খুব ভিতু। তবুও বুকে সাহস নিয়ে রিক্তা তুশিকে নিয়ে সেখান থেকে আসার চেষ্টা করে। রাস্তায় উঠতেই ছেলে তিনজন আবারও হাজির হয় তাদের সামনে।

তুশি না পেরে অনুরোধ করে যেতে দেওয়ার জন্য। ছেলে তিনজন শব্দ করে হাসতে থাকে। তুশির জঘন্য অনুভূত হয়। অনেক অনুরোধের পরও যখন পিছু ছাড়ছিলো না তুশি ভয়ংকর সাহস দেখিয়ে ফেলে। তুশি চড় মেরে বসেছে ওদের মাঝের একজনকে। তিনজনই খেপে গিয়েছে। তুশি ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড ভয় পেলেও মুখ মন্ডলে তা প্রকাশ করলো না। তুশি যাকে থাপ্পড় মেরেছে ছেলেটা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।

তুশি রিক্তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। পেছন থেকে তুশির হিজাবে টান মারে ছেলেটা। হিজাব খুলে তুশির অধাংশ চুল বেরিয়ে যায়। তুশির পরনে ছিলো সুতির সেলোয়ার-কামিজ। এক সাইডে ওড়না ভাজ করে দেওয়া ছিলো। তুশি দুহাতে নিজেকে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে। ছেলেটার হাতে তুশির হিজাবের এক পাশ। তুশি ফুপিয়ে উঠে। আশেপাশের সবাই তাকিয়ে নাটক দেখছে। হঠাৎই তুশি নিজেকে কারো বাহুডোরে আবিষ্কার করলো। কেউ একজন খুব যত্নে তার হিজাব খানা মাথায় তুলে দিলো। পার্থ! পার্থ শেখের বাহুডোরে আবদ্ধ তুশি। মেয়েটা বিষ্ময়কর চাহুনিতে তাকিয়ে আছে। পার্থ এক পলক তাকিয়ে তুশিকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলো। এরপর! এরপর বখাটে ছেলেটা তুশির জন্য মারামারি করলো।
তুশি রিক্তার সাথে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় পেরোতেই তুশি নিজের বাম গালে ব্যাথা অনুভব করলো। মেয়েটা দু’পা পিছিয়ে গিয়েছে। রিক্তা না ধরলে বোধ হয় টাল সামলাতে না পেরে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পরতো! পার্থ তুশির হাত শক্ত করে ধরে টান মেরে কাছে আনলো। ব্যাথায় তুশির চোখে পানি চলে এসেছে।

-“এই মেয়ে, একা আসার সাহস পেলে কীভাবে?”

চলবে

প্রেমচিত্র পর্ব-০৩

#প্রেমচিত্র-[৩]
লেখনীতে:ইশা আহমেদ

সাতদিন পর তুশি কলেজ এসেছে। জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখ মুখ শুকিয়েছে মেয়েটার। বৃষ্টিতে তুশি ভেজে না ব্যাপারটা এমন না, প্রায়শই ভিজে থাকে। তবে সেদিন একটু বেশিই ভেজা হয়েছিল। সেজন্যই জ্বর, কাশি সব এক সাথে বাঁধিয়ে বসেছিলো। সাত দিন পর কলেজে এসে শুকনো মুখে কলেজ করলো তুশি। রিক্তা অবশ্য মাঝে একদিন দেখে এসেছে বাড়িতে গিয়ে। আজ অবশ্য রিক্তা আসেনি। তুশি চারটা ক্লাস করে দুপুর বারোটায় বের হলো কলেজ থেকে। টানা কদিন বৃষ্টির পর আজ সূর্য তার তেজ সম্পূর্ণ রূপে ঢালছে! তুশি ঘেমে জুবুথুবু। হিজাব কিছু অংশ ভিজেছে। কলেজে চত্তর পার হওয়ার আগেই তুশি নিজের নাম শুনতে পেলো পুরুষালী কন্ঠে। তুশি পিছু ফিরে চাইলো।

ভিড়ের মাঝে খুঁজল নামে ধরে ডাকা ব্যক্তিকে। চোখ বাঁধলো ক্লাসমেট সায়নকে। সায়ন ছুটে তুশির কাছে আসলো। সায়ন ক্লাসের টপার বয়। দেখতে শুনতে খারাপ না। ছেলেটা তুশির সাথে বন্ধুত্ব করার অনেক চেষ্টা করেছে তবে তুশি পাত্তা দেয়নি। আর না কখনো দিবে। তুশিকে বিষ্মিত করে দিয়ে সায়ন একটা লাল গোলাপ বের করে, সামনে ধরলো তুশির। তুশি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো। তুশি মনে মনে ভেবে বসলো ছেলেটা তাকে প্রপোজ করবে। তুশিকে অবাক করে দিয়ে সায়ন ফুল এগিয়ে দিয়ে বলল,

-“তুশি বন্ধু হবে আমার?”

তুশি বিরক্ত হলো। ফুল দিয়ে কেউ বন্ধু হতে বলে? আজব ব্যাপার। বলল,“তোমাকে আমি আগেই আমার উত্তর জানিয়েছি। এখন পাবলিক প্লেসে সিনক্রিয়েট করছো কেনো?”

সায়নের বোধ হয় মন খারাপ হলো। তুশি বিরক্ত হয়ে পা বাড়ালো বাড়ির উদ্দেশ্যে। তুশির বিরক্তি ভাব কাটলো বাড়ির মোড়ের চার দোকানে বসে থাকা পার্থকে দেখে। হাতে বরাবরের ন্যায় সিগারেট। তুশি আড়চোখে দেখে গেলো। তুশি পার্থর সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। পার্থ এ পাড়াতেই মুনসি কাজীর বাড়িতে ভাড়া থাকে। ছেলেটার ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। তুশি যতটুকু শুনেছে পার্থ কোনো প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। পার্থ যাই হোক না কেনো তা নিয়ে তুশির অভিযোগ নেই। পার্থকে পেলেই হবে তার। ওই বখাটে, অসভ্য ছেলেটাকে সভ্য করে তুলতে চায় তুশি।

দিন পনেরো পরের কথা। চাঁদনী আপার জন্য অয়ন ভাই প্রস্তাব পাঠালেন। চাঁদনী আপার সে কি লজ্জা! তুশি হাসতে হাসতে শেষ। শামসুল মির্জা এক কথায় রাজি হলেন। ছেলের সরকারি চাকরি, কেই বা রাজি না হয়ে পারে? চাঁদনী আপাকে দেখতে আসলো যেদিন অয়ন ভাই, সেদিন আপা নীল রঙের জামদানি পরেছিলো। আপাকে যেনো চাঁদের টুকরো লাগছিলো। আলোচনা সাপেক্ষে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো সামনের মাসের দুই তারিখে। বিয়ের মাত্র আছে দশ দিন। এর মাঝেই সব ম্যানেজ করতে হবে। অয়ন ভাইয়ের ছুটি বেশি দিন নেই তাই এই সিদ্ধান্ত। চাঁদনী আপার বিয়ের কেনাকাটা হচ্ছে ধুমধাম করে। তুশির মোটেও আজ কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না। সামনে ইয়ার ফাইনাল আজ যেতেই হবে। তুশি কলেজে আজ ক্লাস করবে দুটো। রিক্তার বাড়ির সামনে থেকে রিক্তাকে নিয়ে কলেজে গিয়ে ক্লাস করলো দুইটা।

তুশিদের কলেজে রাজনীতি হয়, যেনো তেনো রাজনীতি নয় কিন্তু। যদিও তুশির এসবে কোনো আগ্রহ নেই। আজ কি একটা সম্মেলন থাকায় ক্লাস হবে না। দুটো ক্লাস শেষেই ছুটি। তুশি আর রিক্তা ক্লাস করলো। ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে মাঠে আসতেই দেখা মিললো বখাটে ছেলেটার। ওহ! বলা হয়নি পার্থ রাজনীতি করে। বেশ ভালোই নাম ডাক। তুশি আড় চোখে দেখলো। রিক্তাকে অনুরোধ করলো কিছুক্ষণ থাকতে। রিক্তা রাজি হচ্ছিলো না তবুও বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়েছে। তুশি দাঁড়িয়ে দেখছিলো সবটা। এর মাঝেই তুশির দু ক্লাস সিনিয়র মিরাজ তুশিকে ডেকে সাইডে ডাকে। তুশি বিরক্ত হলেও চুপচাপ থাকে।

-“তুশি আই লাভ ইউ”
-“দুঃখিত আমি আগ্রহি নই”
-“তোহ কি হয়েছে, আমার প্রেমিকা হয়ে যাও তুশি”
-“আমি না বললাম তো”

তুশি চলেই যাচ্ছিলো, মিরাজের কথায় থমকে দাঁড়ালো। মিরাজ রেগে অশ্লীল কিছু কথা বলে তুশিকে। তুশি লজ্জায়, অপমানে নিচু চোখে আশপাশ দেখে কাঁদতে কাঁদতে কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।

পার্থ দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখছিলো। তুশি কলেজ ছাড়তেই সে হনহন পায়ে এসে মিরাজের সামনে দাঁড়িয়ে কষিয়ে থাপ্পড় মারে। মিরাজ থাপ্পড় খেয়ে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পরে। উপস্থিত সবাই বিষ্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। পার্থ তখন ভীষণ রেগে! কই আগে তো পার্থ কোনো মেয়ের জন্য এমন করেনি। তবে কি কিছু চলছে পার্থ আর তুশি নামক কিশোরীর মাঝে? পার্থ আশেপাশে ভীড় জমতে দেখে ধমক দিয়ে বলে,

“যার যার কাজে যাও”

জায়গা সুরসুর করে ফাঁকা হলো মিনিট দুয়েকের মাঝে। পার্থ নিচু হয়ে মিরাজের নাক বরাবর ঘুষি দিলো। কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“ওর থেকে একশো হাত দূরে থাকবি।”

পার্থকে দলের ছেলে-পেলেরা কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না। পাবেই বা কীভাবে? পার্থর সামনে এই নিয়ে টু-শব্দ করলে শক্ত হাতের সপাটে থাপ্পড় খাওয়া লাগবে। কেইবা চাইবে ওই লম্বাচওড়া, শক্ত পোক্ত মানুষের হাতের থাপ্পড় খেতে? পার্থ সেদিন স্বাভাবিক ভাবে সম্মেলনে যোগ দিলো।

তুশির কানে এই খবর আসলো চাঁদনী আপার বিয়ের তিন দিন আগে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। রিক্তার ও দাওয়াত। রিক্তাই জানিয়েছে পুরোটা। তুশি সেদিনের পর কলেজের রাস্তাও মাড়ায়নি। কি অশ্লীল বাক্য; ছিহ্! তুশির মনে পরলে এখনো গা গুলিয়ে উঠে। তবে এটুকু শুনে বেশ ভালো লেগেছে তুশির, পার্থ তার জন্য ওই জঘন্য লোকটাকে মেরেছে এটুকুই অনেক। রিক্তা বিয়ের তিন দিন থাকবে। আজ মেহেদী। বোনেরা মিলে ছোটখাটো মেহেদীর আয়োজন করেছে। রিক্তা আবার খুব ভালো মেহেদী দিতে পারে। চাঁদনী আপাকে দিবে মেহেদী আর্টিস্ট। আর বাকিগুলোকে রিক্তা যতটুকু পারে দিয়ে দিবে।

তুশি আজ গাঢ় সবুজের উপর ডিজাইন করা শাড়ি পরেছে, সাথে চুলগুলো বিনুনি করে ফুল গাঁথা! মুখে হালকা মেকাপের আস্তরণ। দেখতে বেশ মিষ্টি লাগছে। তুশি কখনোই হিজাব খুলে না কোনো পুরুষের সামনে। আজ বাইরের কোনো ছেলে আসবে না। এমনকি জাওয়াদ ভাইও না। এজন্যই চুলগুলো বিনুনি করেছে তুশি। চাঁদনী আপা আজ একা একাই সেজেছে। চাঁদনী আপার সাজার হাত খুব ভালো। বোনেরা মিলে তুশির রুমের এক পাশের দেওয়াল সাজিয়েছে। তুশিদের ভালো ক্যামেরা আছে। তুশি জাওয়াদ ভাইয়ের থেকে ছবি তোলা শিখেছিলো। আজ খুব ভালো কাজে দিবে। তুশি রিক্তাকে সাজতে বলে চাঁদনী আপার রুমে এসে নক করলো।

“দরজা খোলা আছে ভেতরে আয়!”

তুশি ভেতরে ঢুকে চাঁদনী আপাকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইলো। তুশিদের দুই বোনের মধ্যে সব থেকে ফর্সা হচ্ছে চাঁদনী আপা, এরপর তুশি। তুশিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে দেখে চাঁদনী আপা হেসেই ফেললো। বলল,

“কি রে তুশি এমন হা করে তাকিয়ে আছিস কেনো? আমায় কি আগে দেখিস নি?”
-“আপা তোমাকে আজ চাঁদের টুকরো না পুরো চাঁদ লাগছে। চাঁদের ও কলঙ্ক আছে তবে আমার আপার কোনো কলঙ্ক নেই“

চাঁদনী শব্দ করে হাসলো। হাসতে হাসতে ফিসফিস করে বলল,“তুশি রে আমারও কলঙ্ক আছে। তোর অয়ন ভাই আমার কলঙ্ক। অয়ন নামক কলঙ্ক আমি সারা জীবন বয়ে বেরাতে প্রস্তুত তুশি”
-“আপা তোমাকে এই শাড়িটায় একদম রানী লাগছে সত্যি বলছি”
চাঁদনী কানের দুলটা পরতে পরতে বলল,“তোকেও আজ খুব সুন্দর লাগছে তুশি”

তুশি লজ্জা পেলো। চাঁদনী আপা থেমে আবার বলে,“তুশি অয়ন পাগলামি করছে সামনা সামনি দেখার। বলছে মিনিট পাঁচেক পর পেছনে এসে অপেক্ষা করছে। কি করবো বল তো?”

তুশি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলল,“চলো আপা। তুমি দেখা করে এসো আমি পাহারা দিবো কেমন?”
চাঁদনী তুশির কান মলে দিয়ে বলল,
“ইদানিং বড্ড পেকেছিস রে তুশি। কি করা যায় তোকে বল তো?”

-“আপা ছাড়ো এসব। ওই দেখো অয়ন ভাই কল করেছে। চলো লুকিয়ে যাই আমরা”

চলবে…..

প্রেমচিত্র পর্ব-০২

#প্রেমচিত্র-[২]
লেখনীতে:#ইশা_আহমেদ

তুশি সবে ব্যাগটা রেখেছিলো সোফাতে। এর মাঝেই কিছুক্ষণ আগের ভালো লাগা সব উবে গিয়ে রাগ উঠে গেলো। তুশি তুক্ষর মেজাজে বলল,“ছোট চাচি ওপর মাঝে মাঝে প্রচন্ড রাগ হয়। দু’জনে ঝগড়া করে কেনো বিচার দেওয়া লাগবে?”
চাঁদনী তুশিকে থামতে বললো, ছোট চাচ্চু চাচিকে ভীষণ ভালোবাসে, সে জানলে ব্যাপারটা ভালো হবে না। তুশিকে টেনে নিজের রুমে আনলো। তুশি তখনো রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। চাঁদনী তুশিকে বিছানায় বসিয়ে বলল,
-“তোকে নিষেধ করেছি না? চাচিকে চাচ্চু কত ভালোবাসে জানিস না? চাচ্চু এসব কথা শুনতে পেলে বাড়ি ছাড়বে, জানিসই তো”

তুশি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো। বলল,“আপা কি করবো? রাগটা যে মাথা চড়া দিয়ে উঠেছিলো। ছোট চাচি বেশি বেশি করে সব সময়”
-“তুশি আমারদের সহ্য করতেই হবে। না হয় দাদি মাকে একশটা কথা শোনাবে”

শেষের কথাটুকু বলতে চাঁদনীর গলা কাঁপলো। মেয়েটা কেমন নিষ্প্রাণ কন্ঠে জবাব দিলো। তুশির বাবা শামসুল মির্জা সংসার নিয়ে উদাসীন! মাকে দাদি হাজারটা কথা শোনালেও তাদের বাবা কোনো দিন টু শব্দ করেনি। তুশি অর্ধভেজা অবস্থাতেই শুয়ে পরলো চাঁদনী আপার বিছানায়। চাঁদনী কিছু বলল না। তুশির হুট করেই ছাতাটার কথা মনে পরলো। তড়িৎ গতিতে উঠে বসলো। ব্যস্ত পায়ে উঠে আসলো বসার ঘরে ব্যাগ আর ছাতা নিয়ে ছুটলো নিজের রুমে। দরজা বন্ধ করে ভেজা ছাতাটাই বুকে জড়িয়ে নিলো তুশি। তুশি বেশ যত্ন করে উঠিয়ে রাখলো ছাতাটা। ছাতা ফেরতের বাহানায় তুশি আরেকবার পার্থর কাছাকাছি যেতে পারবে। এটুকু ভেবেই তার খুব আনন্দ হচ্ছে।

দু’দিন পরের ঘটনা। আকাশ তখন মেঘলা। কালো মেঘে ঢাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ। যখন তখন ঝুম বৃষ্টি নামবে। কলেজে ক্লাস শেষে তুশি বের হলো বান্ধবী রিক্তার সাথে। আধভেজা ফুতপাত দিয়ে হেঁটে আসছে মেয়েে দুটো। তুশির ব্যাগে দুটো ছাতা। একটা পার্থর আর একটা তার নিজের। রিক্তার বাড়ি কলেজ থেকে দু গলি সামনে। এরপরের পথটুকু তুশির একাই হেঁটে আসতে হয়। মেঘলা দিন তুশির এমনিতেই ভীষণ পছন্দের। আজ সাথে মৃদু হাওয়া ও বইছে। তুশি কিছুদূর যেতেই পার্থ নামক বখাটে ছেলেটাকে দেখলো। তুশির চলন্ত পা থেমেছে। ঘাড় কাত করে নিচু চোখে আশপাশ দেখলো কেউ আছে কি না! ঝড়ো হাওয়া ছেড়েছে তার জন্য বোধ হয় কেউ নেই। তুশি মিশ্র অনুভূতি নিয়ে কম্পিত পায়ে এগিয়ে গেলো পার্থের কাছে। পার্থ তখন সিগারেট টানতে ব্যস্ত। বরাবরের ন্যায় চোখে রোদচশমা, হাতে ব্যান্ডেড ওয়াচ্!

তুশি সিগারেটের বাজে গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। নাকে আসতেই কেশে উঠলো মেয়েটা। পার্থ ফিরে তাকালো। তুশি তখনও কাশছে। পার্থ তবুও সিগারেট ফেললো না। এমন ভাব করলো তুশিকে সে দেখেইনি। কাশতে কাশতে তুশির চোখ মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে, তুশি বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। পার্থ তখন সিগারেট খেতে ব্যাস্ত। তুশি অস্বস্তিবোধ করলো। ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কম্পিত কণ্ঠে শুধাল,
-“আপনার ছাতা!”

পার্থ এক পলক তাকালো মাত্র। যেনো তাকালে খুব পাপ হবে! তুশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। তুশির সাহস নেই চোখে চোখ রেখে কথা বলার। পার্থ সিগারেটে আরেকটান দিয়ে বলল,
-“রেখে দাও”

-“কিন্তু এটা তো আপনার জিনিস, আমি কেনো রাখব?”

পার্থ তৎক্ষনাৎ তাকালো। তুশি হকচকালো। মাথা নুইয়ে দাঁড়ালো। পার্থ বলল,
-“এই মেয়ে যাও এখান থেকে। লোকে আমার সাথে দেখলে খারাপ বলবে”

তুশি বাধ্য মেয়ের মতো হাঁটা ধরলো। পিছু ফিরে তাকালো না। সে সাহস নেই তুশির। তুশি ছাতা দিতে না পেরে অখুশি নয় বরং খুব বেশি খুশি ছাতাটা রাখতে পেরে। ছাতাটা সে খুব যত্নে রাখবে, যতটা যত্ন মানুষকে করে। তুশির বাড়ি ফিরতে ফিরতেই ঝুম বৃষ্টি নামে মাঝ রাস্তায়। তুশি ভিজে জুবুথুবু! বাড়ি এসে চাঁদনী আপা, মিমি সবাই মিলে ওই বৃষ্টির মাঝে ভিজেছে।

ঠিক পাঁচ দিন ধরে তুশি জ্বরে বিছানায় পরে আছে। আজ একটু শরীরটা ভালো। জ্বর সামান্য আছে, তবে কাশিটা কমেনি। তুশি দুর্বল পায়ে চাঁদনী আপার রুমে আসলো। আপা তখন ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। তুশি জানে ফোনের অপাশে কে! চাঁদনী আপা এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। তুশির বড় চাচির মেয়ে শান্তা আপার বিয়ে হয়েছে ছয় মাস আগে। সে বর সহ চট্টগ্রামে থাকে। তুশির আবার শান্তা আপার থেকে চাঁদনী আপার সাথে বেশি ভাব। তুশি ধপাস করে শুয়ে পরেছে চাঁদনী আপার বিছানার মাঝ বরাবর। তুশি খেয়াল করলো চাঁদনী আপা ভুলে ও তাকালো না, সে তো প্রেমিকের সাথে কথায় মগ্ন। তুশি জানে চাঁদনী আপার প্রেমিক কে? কোথায় থাকে! চাঁদনী আপার প্রেমিক অয়ন ভাই। চাঁদনীর আপার সাথে এডমিশন কোচিং করেছিলেন! সেখান থেকেই প্রেমের সূত্রপাত। অয়ন ভাই থাকেন এগলির শেষ বাড়িটায়। অয়ন ভাই মানুষটা বেশ দারুন মানুষ। তুশিকে দেখলেই মিষ্টি হেসে সালাম দিয়ে কথা বলে। তুশির বেশ লাগে। তুশি খুব করে চায় অয়ন ভাই যেনো তুশির দুলাভাই হয়।

অয়ন ভাই এখন আর্মিতে আছেন। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট,সরকারি চাকরি। তুশির মনে হয় চাঁদনী আপা পেয়েই যাবে অয়ন ভাইকে। অয়ন ভাই বাড়িতে আসেন অনেক মাস পরপর একদিন। চাঁদনী আপা সেদিন লালটুক টুকে শাড়ি পরে বসে থাকেন। কোনো দিন আবার ভার্সিটির বাহানায় বের হয়ে পরে প্রেমিকের সাথে ঘোরার উদ্দেশ্যে। চাঁদনী কল কাটলো আরো আধা ঘন্টা পর।

তুশিকে উদ্দেশ্য করে বলল,“কি রে কখন আসলি?”
তুশি শোয়া ছেড়ে উঠে বসল।বলল,
-“এসেছি তো অনেকক্ষণ। তুমিই তো পাত্তা দিলে না। অয়ন ভাই কেমন আছে আপা?”
-“ ভালো আছে”
তুশি বলল,“আসবে কবে অয়ন ভাই?”
-“সামনের মাসে আসতে পারে। তুশি অয়ন বলছিলো এবার এসেই বিয়ের প্রস্তাব দিবে”
তুশি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। একপ্রকার লাফিয়ে চাঁদনী আপার পাশ ঘেঁষে বসলো। বলল,“সত্যি বলছো আপা? আমার যে কি ভালো লাগছে শুনে।”

-“বেশি উত্তেজিত হোস না। আব্বু রাজি হবে কি না কে জানে? আমার ভয় হচ্ছে?”

তুশির মেজাজ কিছুটা খারাপ হলেও নিজেকে শান্ত রেখে বলল,“উফফ্ আপা চিন্তা করো না কিছু হবে না। আপা চলো না আম মেখে খাই। মিমি, মাইশা, টিনটিন ইফরান, জাওয়াদ ভাইকেও ডাকি?”

চাঁদনী মানলো, বলল সবাইকে ছাদে ডেকে আনতে। তুশিদের ছাদটা বিশাল বড়ো। তুশিদের ছাদে প্রতিদিন বিকাল হলেই মহিলাদের আড্ডা বসে। তুশির মা, চাচি সহ ভাড়াটিয়ারাও এসে যোগ দেয়। এক সাইডে বসে বড়দের মেলা আরেকট পাশে ছোটরা। যদিও তুশির থাকা হয় না, অসুস্থতার জন্য আজ থাকতে পেরেছে। তুশি মিমি মাইশাকে দিয়ে জাওয়াদ ভাইকেও ডাকিয়েছে। জাওয়াদ তুশির বড় চাচার ছেলে। চাঁদনী আপার থেকে ছোট হলেও তুশির থেকে বছর দেড়েকের বড়। জাওয়াদ ভাইকে ডাকা মূলত আম পরার জন্য। তুশিরা সবাই ছাদে একজোট হলো। চাঁদনী এক প্রকার জোড় করেই জাওয়াদকে গাছে উঠিয়েছে।

জাওয়াদ আম পেরে দিয়ে বলল,
-“চাঁদনী আপা কাজটা একদম ঠিক করলে না। আগে জানলে আমি আসতামই না”

চাঁদনী আম ছিলতে ছিলতে জাওয়াদকে ধমক দিয়ে বলল,
-“চুপ বেয়াদব। বড় বোন বলেছে যখন করবি। এতো কথা কীসের? চুপ করে এখানে বোস। আমি আম মেখে দিচ্ছি খেয়ে উদ্ধার কর”

তুশি হাসলো জাওয়াদ ভাইয়ের কান্ড দেখে। এই জাওয়াদ ভাইকেও নাকি তার প্রেমিকা নাকানিচুবানি খাওয়ায়, ভাবা যায়? জাওয়াদ ভাইয়ের প্রেমিকা তুশির সাথেই একই কলেজে, একই ক্লাসে পড়ছে। শুনেছে জাওয়াদ ভাই নাকি একদিন পাও ধরেছে সেই প্রেমিকার। এ খবর শুনে তুশি কতই না টিটকারি মেরেছে জাওয়াদ ভাইকে। সেই ভেবে হেসে উঠলো তুশি। জাওয়াদ ভাইয়ের ভ্রু কুঁচকে গেলো, বলল,

-“কি রে তুশি পাগলের মতো একা একা হাসিস কেনো? জ্বীন ভুতে ধরলো নাকি?”

তুশি বিরক্ত হলো। নাক মুখ কুঁচকে বলল,“জাওয়াদ ভাই তুমি এতো বেশি প্যাক প্যাক করো কেনো হাঁসের মতো? আমি হাসি নি তোমার আসলে চোখে সমস্যা, ডাক্তার দেখাও।”

চাঁদনী আপা মাখ মেখে সবাইকে দিলেন। চাঁদনী আপার আম মাখা যে একবার খাবে সে জীবনেও ভুলবে না, জিভে লেগে থাকার মতো। সেদিনের মতো তুশিরা দারুন সময় কাটালো।

#চলবে

প্রেমচিত্র পর্ব-০১

#প্রেমচিত্র[১]
লেখিকা:ইশা আহমেদ

তুশি যখন প্রথম প্রেমে পরলো, তখন তার বয়স সবে মাত্র সতেরো! এক বখাটে, বাউণ্ডুলে, বেপরোয়া স্বভাবের পুরুষের প্রেমে পরলো তুশি। লোকটা তুশির থেকে সর্বোচ্চ গেলে বছর দশেকের বড়। গাল ভর্তি দাঁড়ি, বড় বড় এলোমেলো চুল, চোখে রোদচশমা; ব্যাস! এটুকুতেই তুশি কুপোকাত। এমন অগোছালো, বেপরোয়া লোকের প্রেমে পড়েছে জানলে, লোকে তুশিকে পাগল বলবে। এতে অবশ্য তুশির কোনো সমস্যা নেই। তুশির সমস্যা অন্য জায়গাতে। লোকটা তুশিকে অকারণেই ইগনোর করে। এখন অব্দি তুশি সে কারণ উদ্ধার করতে পারি নি, ভবিষ্যৎেও পারবে কি না তা নিয়ে তুশির বেশ সন্দেহ। তুশি যখন কলেজ পথে যায় তখন মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডায় মশগুল থাকে বখাটে ছেলেটা। তুশি আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে। ছেলেটা ফিরে তাকায় না কখনো।

তুশির বড্ড ইচ্ছে করে চোখে চোখ রেখে, কলার চেপে বলতে—‘এই যে মিস্টার পার্থ শেখ, আপনার সমস্যাটা কি? আমার দিকে একটু তাকালে কি আপনার খুব বেশি ক্ষতি হয়?’

তুশি জানে এটুকু বলার সাহস তার নেই। বলতেও পারবে না। মনে মনে কত কিছু বলি আমরা সব কি আর মুখে প্রকাশ করতে পারি?

তুশি আর ভাবে না। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কলেজ ব্যাগ কাঁধে চেপে কলেজ থেকে ফিরছে তুশি। সূর্য তখন মাথার উপর, কপট তেজ দেখিয়ে চলেছে! ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসছে, সাদা হিজাবটা ঘামে ভিজে জুবুথুবু। চিৎকার,চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো তুশি, চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো। ঘাড় কাত করে তাকাতেই হতভম্ব হলো পার্থকে দেখে। ছেলেটা প্রচন্ড রেগে আছে, যা তার মুখের আদলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। পার্থ তার সম্মুখে দাঁড়ানো ছেলেটাকে ধমকাচ্ছে। হঠাৎই পাশ ফিরলো, চোখে চোখ পরলো। তুশি হকচকিয়ে উঠলো। চোখ ঘুরিয়ে সোজা হাঁটা ধরেছে মেয়েটা। পেছন থেকে চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজ পেলো না আর। দ্রুত পায়ে বাড়ির সামনে এসে হাঁপ ছাড়ে বাঁচলো মেয়েটা। পার্থ নামক লোকটাকে দেখলেই তুশির হার্টবিট মিস হয়!

-“তুশিপু এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো এভাবে স্টাচুর মতো?”

তুশি বেমালুম ভুলতে বসেছিলো সে বাড়ি নয় রাস্তাতে। টিনটিনের কথায় স্তম্ভির ফিরলো মেয়েটার। বখাটে ছেলেটা ইদানীং তুশিকে বড্ড জ্বালাচ্ছে, দূরে থেকেও কীভাবে জ্বালিয়ে মারছে। তুশি আপাতত বখাটে ছেলেটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো। টিনটিন মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তুশি টিনটিনের গাল টেনে দিয়ে বলল,

-“কলেজ থেকে হেঁটে এসেছি রে টিনটিন, খুব কষ্ট হয়ে গিয়েছে রে। এই রোদ্দুরে হেঁটে আসা দুষ্কর”

তুশি টিনটিনকে কোলে তুলল। টিনটিনের বয়স মাত্র পাঁচ, তবুও ভীষণ পাকা। টিনটিনের মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-“কাকি আমি টিনটিনকে নিয়ে গেলাম। তুমি পরে নিয়ে এসো”

‘নীলাচল’—তিনতলা বাড়িটির নাম! এমন অদ্ভুত নাম রাখার কারণ তুশির দাদি। তিনি বয়সকালে স্বামীর সাথে বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিলেন। নীলাচল জায়গাটা তার খুবই পছন্দ হয়েছিলো, সেখান থেকে বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘নীলাচল’। বাড়িটা বেশ পুরোনো আমলের হলেও তুশির বাপ-চাচা বাড়িটির এতোটাই যত্ন করেন, প্রথম দেখাতে কেউ বুঝতেই পারবে না বাড়িটা পুরোনো আমলের। তুশির অবশ্য নীলাচল নামটা পছন্দ নয়। তার মতে, বাড়িটার নাম নীলাচল না দিয়ে অশান্তির কারখানা দেওয়া উচিত ছিলো। চিৎকার, চেঁচামেচি নিত্যদিনের সঙ্গী। বাড়িতে মুরব্বি বলতে তুশির দাদি। তার দাপট আছে বাড়িতে।

বাড়িতে প্রবেশ করতেই তুশির কানে ভেসে এলো মায়ের কর্কশ গলায় আওয়াজ। তুশি পাত্তা দিলো না, এসব নিত্য দিনের কাজ। প্রতিদিন এমন চলে তাদের নীলাচল নামক অশান্তির কারখানায়! তুশি টিনটিন মেয়েটাকে নিয়ে নিজের রুমে আসলো। কাঁধের ব্যাগটা এক হাতে রেখে টিনটিনকে বিছানায় বসালো। টিনটিনকে বসিয়ে হিজাবের পিন খুললো। ঢিলেঢালা জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হতে। মিনিট দশেক পর তুশি বের হলো। ততক্ষণে টিনটিন হাওয়া, রুমে নেই। তুশি ব্যস্ত পায়ে বারান্দায় ছুটলো। খালি বারান্দা দেখে, সোজা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

মেঝো আপার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় টিনটিনের গলার আওয়াজ পেলো। পা থেমে গেলো। দরজায় নক করলো, চাঁদনী ভেতর থেকে বলল—‘দরজা খোলা’। তুশি ভেতরে প্রবেশ করে দেখলো এক আশ্চর্য ঘটনা। টিনটিন মিমির সাথে বসে খেলছে। মিমি, মেয়েটা ছোট চাচার বড় মেয়ে। এবার ক্লাস সিক্সে পড়ে। টিনটিনের সাথে তার মিল হয় না কখনোই। আর আজ মেয়েটা টিনটিনকে নিয়ে খেলছে! এ ও ভাবা যায়? চাঁদনী আপা তুশিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলেন,

-“কি রে তুশি, এভাবে ওদের হা করে গিলছিস কেনো?”

তুশি বিছানায় বসতে বসতে বলল,

-“মেঝো আপা তুমিই বলো? সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে! মিমি সাহেবা আজ টিনটিনের সাথে খেলছে। এই দৃশ্য ও দেখা যায়?”

চাঁদনী আপা শব্দ করে হাসলো, তুশি হাসলো নিঃশব্দে। মিমি চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো। টিনটিন তখনও খেলছে। তুশিদের কথার মাঝে ভাঁটা পরলো, বসার ঘর থেকে ভেসে আসছে তুমুল ঝগড়ার শব্দ। চাঁদনী আপা হন্তদন্ত হয়ে ছুট লাগালো সেদিকে। তুশির বুঝে উঠতে বেশ সময় লাগলো। তুশিও মিনিট দুই পেরোতে ছুটলো বসার ঘরে। আজও ছোট চাচির সাথে ঝগড়া হইছে তুশির মায়ের। বড় চাচি রান্নায় ব্যস্ত, এদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। এগুলো নৃত্য দিনের রুটিন বলা চলে। তুশির বাবা শামসুল মির্জা, সালাউদ্দিন মির্জা আর সৈয়দ মির্জা তিন ভাই মিলে দোতলার পুরোটা জুড়ে থাকছে।

ছোট চাচির আবার ভীষণ রাগ, মায়ের ও কম না। বড় চাচি রাহেলা খানম ভীষণ শান্ত ধাঁচের মানুষ। তিনি অবশ্য এসবে নেই।

তিনি রান্না বান্না করেন, অবসর সময়টুকু কুরআন শরীফ পরে কাটান। তুশির মা তাহেরা খাতুন মোটামুটি মেজাজের মানুষ। তিনি আর ছোট চাচি সাবিনা মিলে বাকি কাজ গুলো করেন। এই নিয়েই নিত্য দিনের ঝগড়া। যদিও দিন শেষে মায়ের আর ছোট চাচির খুব ভাব। সব ঝগড়া মিটমাট হয় ছাদের ছোট চৌকিতে। তুশিদের ছাদে ছোট্ট একটা চৌকি আছে। বিকাল হলে সেখানে বসে মাছের বাজার তুশির মতে।

আজ ঝামেলাটা হয়েছে ছোট চাচিকে নিয়ে। ছোট চাচি ঘর মুছতে গিয়ে পানি ফেলে রেখেছে। সেখানেই আরেকটু হলে তাহেরা পা পিছলে পরে যেতেন। এই নিয়েই চেঁচামেচি শুরু করেছেন তিনি। ছোট চাচিও কম কিসে তিনিও পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়ায় মেতে উঠেছেন। চাঁদনী আপা বহু কষ্টে ঝগড়া থামালো। দু’জনকে নিজেদের রুমে পাঠিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাচলো।

সেদিন সন্ধ্যায় তুশি যখন কোচিং থেকে ফিরছিলো, মাঝরাস্তায় বৃষ্টি নামে। তুশি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে টং দোকানের ছাউনিতে আশ্রয় নেই। সেখানেই উপস্থিত ছিলো পার্থ। তুশি অবশ্য ভেতরে তাকিয়ে দেখেনি, এক কোণায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। অস্বস্তিতে মেয়েটা গুটিয়ে আছে। তুশি পার্থকে না দেখলেও পার্থ ঠিকই তুশিকে খেয়াল করেছিলো। আধঘন্টা কাটতেও বৃষ্টি থামেনি। তার মাঝে কারেন্ট চলে গিয়েছে। এর ভেতর তুশির মাঝে আতঙ্ক আরো বাড়ে। তুশি ঠিক করে বসলো এই বৃষ্টির মাঝেই হাঁটা ধরবে। ছাউনি থেকে বের হবে তখনই পেছন থেকে চেনা পরিচিত সেই গুরু গম্ভীর গলা কানে আসতেই চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো। থমকানো চোখে তাকিয়ে রইলো।

-“এই মেয়ে এই ছাতাটা নিয়ে যাও।”

ছয় শব্দে উচ্চারণ করা কথাটা বোধ হয় তুশির কানে না বুকে লেগেছে। বুকে ধিমধিম শব্দ এই বুঝি পার্থ শুনে ফেলল। অন্ধকারের মাঝে মোমবাতির আলোতে ঝাপসা চোখে তুশি দেখতে পেলো একজোড়া শীতল গম্ভীর চোখ! তুশিকে এমন অদ্ভুত আচরণ খেয়াল করলো পার্থ। আবারও আগের ন্যায় শুধাল,

-“নাও?”

তুশি কাঁপা কাঁপা হাতে ছাতাটা নিলো। ঢুলুমুলু পায়ে ওই বর্ষায় বের হলো মেয়েটা। চোখে মুখে তখনও বিষ্ময়! নিজের সাথে কি হলো এই মাত্র এটুকু বোধগম্য হতে তার বেশ কিছুটা সময় লাগলো। তুশি ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। আলগা হাতে মাথার ছাতাটা ধরা! মাঝে মাঝে মৃদু হাওয়ায় দুলে উঠছে। বৃষ্টির ঝাপটা তুশির হিজাবের কণা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনিট দশ পেরোতেই তুশি বাড়ি পৌঁছালো। তুশি মেয়েটা জানতেও পারলো না, বৃষ্টিতে ভিজে তার পিছু পিছু কেউ একজন বাড়ি অব্দি আসলো। চাঁদনী আপা দরজা খুলে তুশিকে দেখে বলে,

-“আর বলিস না বাড়িতে ঝগড়া লেগেছে। ছোট চাচি দাদির কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছে, কেঁদে কেঁদে।”

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-২৭ এবং শেষ পর্ব

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৭)
#মীরাতুল_নিহা

সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে যায়। হাসপাতালের করিডোরের সেই ঠান্ডা মেঝেতেই বেলীর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ আর ভয়ঙ্কর রাতটা পার হলো। চোখের একটা পলকও সে ফেলতে পারেনি প্রতিটা সেকেন্ড কেটেছে বুকের ভেতর এক তীব্র ছটফটানি আর কান্নায়। পরের দিন দুপুরে ওটি (OT) থেকে নার্স এসে অবশেষে একটা স্বস্তির খবর দিলেন, ফিওনা চোখ মেলে তাকিয়েছে। খবরটা শোনামাত্রই বেলী কেবিনের দিকে দৌড়ে যেতে চাইল, কিন্তু কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে বাধা দিয়ে নরম গলায় বললেন,

“ব্যস্ত হবেন না। বাচ্চা মাত্র চোখ খুলেছে, তবে এখনো প্রচন্ড ট্রমার মধ্যে আছে। আমরা এই মুহূর্তে কাউকে ওর সাথে দেখা করতে দিতে পারছি না। ওকে যখন কেবিনে শিফট করা হবে, তখন দেখা করতে পারবেন। শরীরটা অনেক দুর্বল, তবে চিকিৎসা খুব ভালোভাবে চলছে। আশা করছি খুব দ্রুতই ও সুস্থ হয়ে উঠবে।”

ডাক্তারের আশ্বাসবাণীতে বেলীর বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরের মতো ভারটা কিছুটা হলেও কমল। সে আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া জানাল। ততক্ষণে আরিফ আবার হাসপাতালে চলে এসেছে। তার হাতে একটা বড় টিফিন বক্স। সে সোজা আয়েশা আর বেলীর সামনে এসে বক্সটা খুলে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর তরকারি বের করল। তাই দেখে আয়েশা একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “খাবার আবার হোটেল থেকে কিনে আনলা ক্যা? কতগুলো টাকা খরচ হইলো বলো তো!”
আরিফ এক গাল হেসে বলল,

“ধুর পাগলী! হোটেল থেকে কিনতে যাব কেন? তুমি এই অবস্থায় হাসপাতালে কষ্ট করছ, আর আমি হোটেলের খাবার এনে তোমাদের খাওয়াব? সকালে বাসায় গিয়ে নিজ হাতে এই রান্না করে নিয়ে এসেছি।”

স্বামীর মুখের কথা শুনে আয়েশার মলিন মুখেও একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এমন একটা কঠিন বিপদের দিনে এত যত্নবান আর দায়িত্বশীল একজন স্বামী পেয়েছে ভেবে তার মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। আরিফ এবার বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“বেলী আপা, আপনিও আর না করবেন না। হাতটা ধুয়ে একটু মুখে দিন।”
বেলী শেষবার ভাত খেয়েছিল গতকাল দুপুরে। তারপর সন্ধ্যার সেই অভিশপ্ত গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এই বিকেল পর্যন্ত একটা দানাও তার পেটে পড়েনি। তীব্র মানসিক চাপ আর ক্ষুধার কারণে শরীরটা তার বড্ড দুর্বল লাগছিল, মাথাটাও কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। তবে ভাত খাওয়ার মতো রুচি তার ছিল না। সে আরিফের আনা খাবার না নিয়ে, কাল রাতে আরিফেরই কিনে আনা ব্যাগ থেকে একটা পাউরুটি বের করে আলতো করে মুখে দিল। আয়েশা বেলীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে আর ভাত খাওয়ার জন্য জোরাজোরি করল না। বিগত দিনের প্রতিটা ছোট-বড় বিপদে-আপদে আদনান যেভাবে সবসময় ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আজ এই সংকটের মুহূর্তেও বেলীর অবচেতন মন বারবার সেই আদনানকেই আশা করছিল। চোখ দুটো বারবার হাসপাতালের সদর দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল। বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য গলায় আয়েশাকে জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছা আয়েশা, এতক্ষণে তো মাহির বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, তাই না? আদনান এখনো একবারের জন্যও এলো না খোঁজ নিতে।”

আয়েশা বেলীর মনের ব্যাকুলতা বুঝতে পেরে একটু সামলে নিয়ে বলল,

“বিয়ে বাড়ি কি এতই সোজা? কত রকমের ঝামেলা থাকে! মেহমান বিদায় করা, হিসাব-নিকাশ মেলানো—আরও কত কাজ আছে। দেখিস, সব কাম সাইরাই ও হসপিটালে ছুটে আসব।”

ঠিক তখনই করিডোরের নীরবতা ভেঙে ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। বেলী আর আরিফ তাকিয়ে দেখল, দুজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে থানার সাব-ইন্সপেক্টর এসআই হন্তদন্ত হয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন। পুলিশকে আসতে দেখে বেলীর বুকের ভেতরটা আবার নতুন কোনো আশঙ্কায় ধক করে উঠল।
সাব-ইন্সপেক্টর (SI) শফিক সাহেব বেলীর দিকে তাকিয়ে বেশ নরম গলায় বললেন,

“ যাওয়ার আগে ভাবলাম বাচ্চাটার একটু খোঁজ নিয়ে যাই। কেমন আছে ও? সাথে একটা খবরও আছে।”

বেলী ডাক্তারের বলা আশ্বাসের কথাটুকু বলতে গিয়েও মাঝপথে থমকে গেল। তার চোখের মণি দুটো যেন কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। পুলিশের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাতেই বেলীর পুরো দুনিয়াটা ওলটপালট হয়ে গেল। আদনান দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু এ কোন আদনান? তার চেনা, সুবোধ, ছায়ার মতো পাশে থাকা সেই আদনান তো এটা নয়। এই আদনানের দুই হাত আজ লোহার শক্ত হাতকড়ায় বন্দি! পরনের বিয়ের পাঞ্জাবিটা ধুলোবালিতে মাখামাখি, মাথাটা নিচু।
বেলী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে এক লাফে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,

“আদনান! তোমার হাতে এসব কী? ওনাদের হাতে হাতকড়া কেন আদনান? অফিসার আপনারা ওকে এভাবে বেঁধেছেন কেন? ও তো আমার ভাইয়ের মতো, ও তো আমার মেয়েকে খুঁজতে সাহায্য করেছে! কোনো ভুল হচ্ছে আপনাদের!”

সাব-ইন্সপেক্টর শফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠোর গলায় বললেন,

“কোনো ভুল হয়নি আপা। দুনিয়াটা কত বড় জঘন্য জায়গা, তা আপনি এখনো জানেন না। কাল রাতে অন্ধকার জঙ্গলে এই পাশবিক কাজটা করে অপরাধী পালিয়ে গেলেও, তাড়াহুড়ো করে দৌড়াতে গিয়ে নিজের পাপের চিহ্ন ওখানেই ফেলে গিয়েছিল। ঝোপের একটু দূরেই আমরা একটা মানিব্যাগ পাই। আর সেই মানিব্যাগের ভেতরের ন্যাশনাল আইডি কার্ড, ছবি আর টাকা—সব এই আদনানের!”

পুলিশের কথা শুনে আয়েশা নিজের পেটে হাত দিয়ে সোফায় ধপাস করে বসে পড়ল। পুরো করিডোরে যেন নীরবতা নেমে এলো। পুলিশ অফিসার বলতে লাগলেন,
“সকালে বিয়ের মণ্ডপ থেকে যখন আমরা একে তুলে আনি, প্রথমে খুব নাটক করছিল। কিন্তু গাড়িতে একটু ‘আপ্যায়ন’ করতেই নিজের মুখে সব স্বীকার করেছে। এই জঘন্য লোকটাই কাল রাতে আপনার চার বছরের নিষ্পাপ বাচ্চাটার সাথে ওই পাশবিক কাজটা করেছে!”

“না! এটা হতে পারে না! আপনারা মিথ্যা বলছেন!”

বেলী দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল, বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসছে। যে আদনান তাকে বিপদের দিনে আশ্রয় দিল, যে আদনানকে সে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করে, সে এমন একটা পিশাচ? এমন একটা জানোয়ার? বেলী উন্মাদের মতো আদনানের সামনে গিয়ে তার কলার চেপে ধরল। চোখের জল আর গলার চিৎকার এক করে বলল,

“কথা বলছিস না কেন রে কুলাঙ্গার? মুখ খোল! বল যে পুলিশ মিথ্যা বলছে! তুই আমার ফিওনার মামা না? ও তো তোকে মামা ডাকে। তোর গলা জড়িয়ে ধরে না আদর করে? তুই কী করে এই কাজ করলি? বল এগুলো মিথ্যা!”

আদনান এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে বেলীর দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো অপরাধবোধ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত, শীতল হিংস্রতা। সে অবহেলায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপানো কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল,

“পুলিশ কোনো মিথ্যা বলছে না বেলী। যা শুনেছ, সব সত্যি। আমি… আমি প্রতিশোধ নিয়েছি!”
‘প্রতিশোধ’ শব্দটা শোনামাত্রই বেলীর হাত দুটো আদনানের কলার থেকে আলগা হয়ে গেল। সে দুই পা পিছিয়ে গেল। অবিশ্বাস আর তীব্র যন্ত্রণায় চোখ বড় বড় করে বলল,

“প্রতিশোধ? কিসের প্রতিশোধ আদনান? একটা চার বছরের অবুজ বাচ্চার ওপর তুই কিসের প্রতিশোধ নিলি?”
আদনান এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। লোহার হাতকড়া পরা হাত দুটো দিয়ে নিজের চোখের জল মোছার চেষ্টা করে ভাঙা, রক্তাক্ত গলায় বলল,

“প্রতিশোধ তোমার ওপর! তোমার ওই অহংকারের ওপর! তালাকের পর যখন এক কাপড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলে, এই আদনান তোমাকে আগলে রেখেছিল। তোমার প্রতিটা প্রয়োজনে নিজের সব কাজ ফেলে দোকান হতে শুরু করে ঘরের বাজার পর্যন্ত এনে দিয়েছি। কোনোদিন নিজের কোনো স্বার্থ খুঁজিনি। আর তার বিনিময়ে? তার বিনিময়ে কাল তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? আমাকে সপাটে চড় মারলে? শুধু এই কারণে যে, আমি তোমাকে এত বছর ধরে মনে মনে ভালোবেসেছি? তোমাকে নিজের করতে চেয়েছি। এটাই কি আমার অপরাধ ছিল?”

আদনানের গলাটা এবার আরও বেশি কেঁপে উঠল, সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,

“তোমার ওই চড় আর অপমান আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না । আমার পুরুষত্বে লেগেছিল। কাল যখন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সবাই হাসছিল, নাচছিল, আমার মাথার ভেতর তখন বিষাক্ত আগুন জ্বলছিল। হুট করে দেখলাম ফিওনা বাইরে একা খেলছে। ও যখন আমাকে ‘মামা’ বলে ডাকল, আমার চোখের সামনে বারবার তোমার সেই চড় মারার দৃশ্য আর অপমানের কথাগুলো ভেসে উঠল। মনে হলো ও তোমার মেয়ে৷ ওর মাধ্যমেই তোমাকে যন্ত্রণা দিতে পারব প্রতিশোধ নিতে পারব। আমার মাথাটা পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছিল বেলী আপা! প্রতিশোধের নেশায় আমি এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে ও একটা চার বছরের বাচ্চা… আমি ভুলে গিয়েছিলাম ও আমার কতটা আদরের ছিল… আমি… আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম… মাফ শব্দও মুখে আনতে পারছি না। ফিওনার সাথে আমি হায় খোদা!

শেষের কথাটা বলতে বলতে আদনানের কণ্ঠস্বর বুজে এলো। সে আর বেলীর চোখের দিকে তাকাতে পারল না, আবার মাথা নিচু করে ডুকরে কেঁদে উঠল।
বেলী আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। তার চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে ধুলোয় মিশে গেল। যে বিশ্বাসের ওপর ভর করে সে বেঁচে ছিল, সেই বিশ্বাসটাই আজ তাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিল। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, আর তার চোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগল নোনা জল। পুলিশ আদনানকে ধরে নিয়ে যায়। বেলী শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। দুনিয়াটা যত-না কঠিন দুনিয়ার মানুষগুলো আরো কঠিন! জীবন তাকে আরো একবার শিক্ষা দিলো।
____________________
মায়ের নরম হাতটা শক্ত করে ধরে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফিওনা। পরনে তার নীল-সাদা স্কুল ড্রেস, পিঠে ছোট্ট একটা লাল রঙের ব্যাগ। স্কুলের প্রথম দিন কী কী হলো, কোন ম্যাডাম তাকে আদর করল, আর কোন বন্ধুর সাথে সে টিফিন ভাগ করে খেল—সব গল্প একনাগাড়ে করে যাচ্ছে সে। বেলী পরম মমতায় মেয়ের সেই আধো-আধো কথার গল্প শুনছে। যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে তার মেয়েটা। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ তিনটি মাস। হাসপাতালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো আর ডাক্তারের আপ্রাণ চেষ্টার পর ফিওনা এখন অনেকটাই সুস্থ। সেই ভয়ঙ্কর ট্রমা কাটিয়ে ওঠার পর বেলী আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি, মেয়েকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। যেন বাচ্চাদের সাথে থেকে বিষাক্ত স্মৃতি মনে না পড়ে।
তবে বেলী এখন আর আগের মতো নিজের কাজে তেমন মন দিতে পারে না। বাহিরে ছোটাছুটি কমিয়েছে। তবে অনলাইনের বিজনেসটা সে ছাড়েনি! ঘরে বসেই বসে করে ফিওনাও সামনেই থাকে। টিউশনিগুলো কমিয়ে দিয়ে দু’টো করেছে। তাও বাচ্চারা ঘরে আসছে বিধায় পড়াচ্ছে না হলে সেটাও ছেড়ে দিতো। দোকানে আয়েশা’র স্বামীকে রেখেছে কর্মচারী হিসেবে৷ সে হিসেবে আশ্বস্ত থাকলেও এখন সে পুরোপুরি কাউকেই বিশ্বাস করে না। সময় পেলেই ফিওনা যখন স্কুলে থাকে সে সময় তদারকি করে।
ফিওনাকে স্কুলে নিয়ে আসা, দিয়ে আসা সর্বক্ষণ, সারাদিন সে ছায়ার মতো মেয়ের সাথে লেগে থাকে। একটা মুহূর্তের জন্যও তাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না।
এই তিন মাসে বেলী নিজের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়েছে। সে এখন প্রতিদিন নিয়ম করে ফিওনাকে ‘গুড টাচ’ আর ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করছে। কোন স্পর্শটা আদরের আর কোনটা বিপদের, তা খুব সহজ করে মেয়েকে বোঝাচ্ছে। এবং ব্যাড টাচের আভাস পেলে কি করতে হবে, অপরিচিত থেকে চেনা মানুষদের ব্যবহার সব শিখাচ্ছে। বেলীর বুকের ভেতর তখন একটা সুপ্ত হাহাকার মোচড় দিয়ে ওঠে—এই শিক্ষাটা যদি সে আরও আগে তার পুতুলটাকে দিতে পারত, তবে হয়তো চার বছরের এই নিষ্পাপ বাচ্চার ওপর দিয়ে এত বড় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেত না! চিৎকার করে হলেও হযত সেদিন বেঁচে যেত!

স্কুল থেকে তাদের বাসায় ফিরতে বড়জোর দশ মিনিট সময় লাগে। মা-মেয়ে দুজনে গল্প করতে করতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। হুট করেই ফিওনা বেলীর আঁচল টেনে ধরে বলল,

“জানো আম্মু, এই ইস্কুলের তামনে না একটা ভিখারী আঙ্কেল বছে তাকে। আমাকে রোজ চকলেট খেতে ডাকে। কিন্তু আমি তো গুড গার্ল, আমি খাই না।”

মেয়ের মুখে চকলেটের কথা শুনেই বেলীর ভেতরের চেনা আতঙ্কটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। সে ফিওনার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে সতর্ক গলায় বলল,

“একদম ঠিক করেছ মামণি। চেনা হোক বা অচেনা, রাস্তার কোনো আঙ্কেলের কাছ থেকে কখনো কোনো খাবার বা চকলেট নেবে না, আম্মু সামনে না থাকলে কেমন?”
ফিওনা মাথা নেড়ে সায় দিল।

“ক্লাস কেমন হয়েছে আজকে? ম্যাম কি পড়িয়েছে।”

“মা, বাবা পরিবার এছব নিয়ে গল্প করেছে আজকে। বই পড়ায়নি। আমায় জিগ্যেস করচিল জানো আম্মু? আমার বাবা তো হারিয়ে গেছে আমি বলতে পারিনি। আমার খুব খারাপ লেগেছে।”

বেলী নিশ্চুপ! কি বলবে ভাষা নেই মুখে। কথা বলা শেখা থেকেই ফিওনা তার বাবাকে খুঁজে। অন্য বাচ্চাদের বাবার সাথে খেলতে দেখে মেয়েটা মা’কে এসে জ্বালায়। বেলী বলেছে বাবা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষ ফেরত আসে না৷ অবুঝ মেয়েটাকে এসব বলে দমিয়ে রেখেছে৷ কিন্তু যখন বুঝের হবে তখন কি সে কি বলে বুঝ দিবে? সত্যিটা জানার পর মেয়ের নিশ্চয়ই বাবার জন্য ঘৃনা ব্যতীত কিছুই আসবে না। তার চেয়ে ফিওনার অজানাই থাক তার বাবা!

“আম্মু আজ চিকেন কাবো।”

বেলী মুচকি হেঁসে মেয়েকে আশ্বস্ত করে,

“চিকেন তোমার এত ফেভারিট সোনা? ঠিকআছে আম্মু বানিয়ে দিব। তবে একটা শর্ত আছে।”

ফিওনার ভ্রু দু’টো কুঁচকে আসলো। ঠোঁট উল্টিয়ে মা’কে শুধোয়,

“কি ছরত আম্মু?”

“তোমাকে আজকে হোমওয়ার্ক দ্রুত শেষ করতে হবে। পারবে?”

“পারবো আম্মু।”

“ওলে বাবালে। আমার লক্ষী মেয়েটা।”

ঠিক তার পরের মুহূর্তেই সে রাস্তার এক কোণের দিকে ফিওনা আঙুল উঁচিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ওই যে আম্মু! ওই যে দেখো, ওই ভিখারী আঙ্কেলটা!”

বেলী মেয়ের আঙুলের ইশারা ধরে রাস্তার ওপারে তাকাল। এক পাশে ধুলোবালির মধ্যে মাথা নুইয়ে বসে আছে এক জীর্ণ-শীর্ণ ভিখারি। বড় বড় উসকোখুসকো চুল আর জট পাকানো দাড়ি-গোঁফে মুখটা প্রায় ঢাকা। কিন্তু সেই অবয়বটা বেলীর বড্ড চেনা ঠেকল! বুকের ভেতর এক তীব্র কৌতুহল অনুভব করে বেলী ধীরপায়ে রাস্তা পার হয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেলীর ছায়া সামনে পড়তেই লোকটা ধীরে ধীরে তার নুয়ে থাকা মুখটা উঁচিয়ে ধরল। চোখের পলকে চার জোড়া চোখ স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো কথা নেই, চারপাশটা যেন আচমকা নিঝুম হয়ে গেল। জীর্ণ পোশাকে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বসে থাকা এই মানুষটা আর কেউ নয়—ফারহান!
ফিওনা তখনো অবুঝের মতো ফারহানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আঙ্কেল, তেমন আছো?”
ফারহান কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন, করুণ হাসি ফুটে উঠল। সে তৃষ্ণার্ত চোখে প্রথমে ফিওনার ফুটফুটে মুখের দিকে তাকাল, তারপর চোখ তুলে চাইল বেলীর দিকে। ভাঙা, ধরা গলায় ফারহান বলল,

“এ… এ তোমারই মেয়ে, তাই না বেলী? সেজন্যই… সেজন্যই হয়তো চেনা রাস্তা দিয়ে যখনই ও হেঁটে যেত, আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠত! এত চেনা লাগত ওকে! হাজার হোক… আমারই তো রক্ত ও, আমারই তো অংশ…”

ফারহানের মুখে এই কথা শুনে বেলী কী বলবে, কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে—সব যেন এক নিমেষে ভুলে গেল। তার চোখের সামনে অতীত আর বর্তমানের দুটো ভিন্ন ছবি ভেসে উঠল। আজ যদি সবকিছু ঠিক থাকত, ফারহান যদি সেদিন পরনারীর মোহে অন্ধ হয়ে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল না মারত, তবে আজ এই পড়ন্ত দুপুরে ফিওনার হাত ধরে ফারহানও তাদের পাশাপাশি হাঁটত। বাবা-মায়ের যৌথ আদরে মেয়েটা কত ভালো থাকত! কত সুন্দর, গোছানো একটা সোনার সংসার হতো তাদের! আর সবচেয়ে বড় কথা ফারহানের ছায়া থাকলে হয়তো ফিওনাকে জীবনের ওই জঘন্য, নরকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না! কিন্তু আজ তার কিছুই হয়নি। শুধু এই একটা মানুষের ভুলের জন্য আজ তাদের পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই বেলীর চোখ ফেটে জল চলে এলো। সে আলগোছে চোখের জলটা সামলে নিয়ে এক অদ্ভুত, অস্ফুট সুরে বলল,

“ও আমার এবং তোমার মেয়ে হতে পারতো ফারহান। কিন্তু ওটা আজ আর সত্যি নয়। ও এখন হয়েছে শুধু আমার মেয়ে… কেবলই আমার মেয়ে!”

ফারহান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আমারই দোষ! যাক মেয়েটা ভালো থাকুক। জীবনে কাউকে নিয়ে এগিয়ে গেছো তাই না?”

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে ফারহানের গলা কাঁপলো। বেলী চোখে চোখ রেখেই উত্তর করলো,

“চার বছর যখন একাই এগোতে পেরেছি নিজের পায়ে। বাকি জীবনও পারব। সঙ্গীহীন জীবন আরো সুন্দর কোনো কষ্ট কিংবা কিছুই নেই। অতীত থেকে তো শিক্ষা নিলাম! বাঁচার জন্য আমার সন্তান আছে। বেঁচে থাকার জন্য কর্ম আছে। আর কি চাই? ব্যস আমার জীবন এতেই সুন্দর! তবে কোনোদিন ভাবিনি, এই জীবনে আবার কোনোদিন তোমায় এভাবে দেখব।”

ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাড়িওয়ালা ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল, তারপর ওই বস্তি থেকেও আমাকে ভাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু এই শহরটা আর ছাড়তে পারিনি বেলী। ফুটপাতে পড়ে থাকতে থাকতেই… চার বছর পর আজ এভাবেই একই শহড়ে আবার দেখা হয়ে গেল!”

মা আর আঙ্কেলের ভেতরের কথপোকথন মন দিয়ে শুনছিল ছোট ফিওনা। বাচ্চাদের মন খুবসংবেদনশীল হয়। সে কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বেলীর হাত ধরে টান দিয়ে বলল,
“আম্মু, এই আঙ্কেলটা ওছব কী বলতে? আমার বাবা কই আম্মু?”
মেয়ের এই আচমকা প্রশ্নে বেলীর বুকটা কেঁপে উঠল। সে এক পলক ফারহানের সেই আশাবাদি, তৃষ্ণার্ত চোখের দিকে তাকাল। যে চোখে একজন অপরাধী বাবা তার সন্তানের স্বীকৃতি খোঁজার শেষ চেষ্টা করছে। কিন্তু বেলী আর দুর্বল হলো না। সে শক্ত মুখে ফিওনার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,

“তোমার মা-ও আমি, বাবা-ও আমি মামণি। তোমার বাবা অনেক আগে আমাদের ছেড়ে বহুদূরে হারিয়ে গেছে। যে হারিয়ে যায় নিজ ইচ্ছেয় সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তোমার বাবাও আর আসবে না ফিওনা৷ মা’ই তোমার সবকিছু।”

ফারহান পাথরের মতো বসে থেকে সব শুনল। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে দাড়ি বেয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। নিজের সন্তানকে সামনে পেয়েও চিৎকার করে বলতে পারল না—‘আমিই তোর সেই অভাগা পিতা!’ সেই অধিকার সে নিজের হাতে বহু আগেই পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। বেলী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। সে ফিওনার হাত ধরে তাড়া দিয়ে বলল,
“চলো মামণি, দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাসায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে।”
তারা যখন হাঁটা শুরু করল, ফিওনা যেতে যেতে বারবার পেছন ফিরে সেই আঙ্কেলটার দিকে তাকাচ্ছিল। বাচ্চা মেয়েটার কোমল মনে কেন জানি ওই ছন্নছাড়া ভিক্ষুকটার জন্য এক অদ্ভুত মায়া জেগে উঠছিল। ফারহানও পলকহীন চোখে, এক বুক হাহাকার নিয়ে তার চলে যাওয়া সন্তানের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল—যতক্ষণ না তারা চোখের আড়াল হয়। বেলী মেয়ের এই পেছন ফিরে তাকানোটা লক্ষ্য করল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝট করে ফিওনাকে রাস্তার মাঝখানেই দুই বাহুতে জড়িয়ে একদম কোলের ওপর তুলে নিল। মেয়ের চুলে নিজের মুখটা লুকিয়ে, ফারহানের অলক্ষ্যে সে নিজের চোখের শেষ নোনা জলটুকু মুছে নিল।
এই জীবন, এই বিগত কয়েক বছরের ঝড় তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মানুষ চিনিয়েছে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। কাছের মানুষ কিভাবে দূরের হয়ে যায়, আর দূরের কেউ কিভাবে আপন হয়ে বুকের ভেতর থেকে যায়—তা শিখিয়েছে। ভালোবাসার নামে কত মিথ্যে থাকে, কত প্রতিশ্রুতি মাঝপথে ভেঙে ধুলো হয়ে যায় তা শিখিয়েছে। এখন আর বেলীর কোনো অভিযোগ নেই। কারোর জন্য অপেক্ষা নেই। কোনো পুরুষ মানুষের প্রয়োজনও নেই। কারণ দিনের শেষে, পৃথিবীটা তার কাছে ছোট হয়ে এসে থেমেছে শুধু একটা মানুষের মাঝেই—তার মেয়ে।
এই ছোট্ট হাতটাই এখন তার বাঁচার কারণ, তার ঘরে ফেরার তাড়া, তার নতুন সকাল। হয়তো বেলীর জীবনটা গল্পের মতো সুন্দর না। এখানে প্রেমিক নেই, রঙিন সমাপ্তি নেই, নেই কারও হাত ধরে বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি। তবুও তার জীবন সুন্দর।
জীবনের বাকি পথটুকু না হয় সে নিজের এই মেয়েটাকে নিয়েই পাড়ি দিয়ে দেবে। বেলী শক্ত পায়ে সামনে হাঁটতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল বহু পুরোনো এক জীবন, বহু না বলা কান্না। আর সামনে—একটা ছোট্ট হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলা এক লড়াকু মায়ের নতুন পৃথিবী। বেলীফুল বড্ড নিভৃতে, নিঃশব্দে ফোটে, অথচ তার তীব্র সুবাস চারপাশের বাতাসকে আকুল করে তোলে—বেলীদের জীবনটাও ঠিক তেমন। হাজারো ঝড়ের রাতে পাপড়ি ছিঁড়ে গেলেও, তার ভেতরের সুবাসটুকু কেউ কেড়ে নিতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মিথ্যে সম্পর্কের মায়া ঝেড়ে ফেলে বেলী আজ এক মুক্ত বিহঙ্গ। তার এই জীবনের ইতিকথা লেখা হয়েছে, হবে এবং হয়ে থাকবে—কেবলই এক লড়াকু মা ও তার সন্তানের অস্তিত্বের লড়াইয়ে। ​আমাদের চারপাশের চেনা ভিড়েও হয়তো এমন কত শত ‘বেলী’ প্রতিদিন একলা লড়ে যাচ্ছে নিজের সন্তানের জন্য। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব লড়াকু মায়েরা, যারা একাই এক একটা গোটা সংসার, আস্ত একটা আকাশ।

“অতীতের সব কান্না ধুয়ে, মুছে গেছে সব গ্লানি,
মায়ের বুকেই রইল জমা মেয়ের হাসির খনি।
ঝড়ের পরে নীরব সকাল, রোদ্দুর এসে হাসে,
মা-মেয়ের এই ছোট্ট পৃথিবী ভালোবাসায় ভাসে।”

মায়ের বুকেই গড়ে উঠুক মেয়ের নিরাপদ পৃথিবী,
কারণ নিজের জন্য নয়—শুধু মেয়ের জন্যই বাঁচে নিরবধি। 💙

(সমাপ্ত)

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-২৬

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৬)
#মীরাতুল_নিহা

বেলীর বুকফাটা আর্তনাদ আর গগনবিদারী চিৎকারে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সে ফিওনার রক্তাক্ত, নিথর শরীরটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে পাগলের মতো হাসপাতালের দিকে ছুটল। জরুরি বিভাগের ডাক্তাররা ফিওনার অবস্থা দেখেই শিউরে উঠলেন। বাচ্চার এমন ভয়াবহ ক্ষত আর রক্তপাত দেখে তারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানায়, পুলিশে খবর দিলেন। হাসপাতালের সাদা ঠান্ডা করিডোরের মেঝেতে বসে বেলী তখনো উন্মাদের মতো কাঁদছে। তার গায়ের শাড়িতে মেয়ের তাজা রক্ত লেগে শুকিয়ে আসছে। আয়েশা নিজের সাত মাসের ভারী শরীর নিয়েও বেলীর পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু বেলীর কানের ভেতর তখন কোনো কথাই ঢুকছে না।
কিছুক্ষণ পর আয়েশার স্বামী আরিফ হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছাল। সে বাইরে থেকে কিছু খাবার আর পানির বোতল কিনে এনেছিল। আরিফ অত্যন্ত যত্ন করে খাবারগুলো প্রথমে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশার দিকে এগিয়ে দিল, তারপর বড় বোন সমতুল্য বেলীর সামনেও ধরল। বেলী শূন্য দৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো খাবার স্পর্শ করার মতো মানসিকতা তার ছিল না। ঠিক তখনই আদনান ধীরপায়ে করিডোরে এসে দাঁড়াল। সে এতক্ষণ দূর থেকে নির্বাক হয়ে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখেও ছিল এক অদ্ভুত থমথমে ভাব। সে বেলীর একদম কাছাকাছি এসে বসল এবং অত্যন্ত নরম ও সান্ত্বনা জড়ানো গলায় বলল,

“ মন শক্ত করো। ভেঙে পড়ো না। আমাদের ফিওনা অনেক শক্ত মেয়ে, ও ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে! তোমরা না আসলে হয়ত এসব হতো না। আমাকে ক্ষমা করো, আমার জন্যই এতকিছু!”

কথাটা বলেই আদনান আর সেখানে দাঁড়াল না। কারো কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে দ্রুত পায়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেল। তার এভাবে হুট করে চলে যাওয়া দেখে আয়েশা বেলীর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

“আজ তো নিজের বোনের বিয়ে। বাড়িতে কত মেহমান! মনে হয় সেই তাগিদেই চলে গেছে। তুই কিছু খেয়ে নে।”

এরই মধ্যে জরুরি বিভাগের ওটি (OT) থেকে ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এলেন। বেলী এক লাফে উঠে গিয়ে ডাক্তারের হাত দুটো চেপে ধরল। ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত দুঃখিত গলায় বললেন

, “বাচ্চার ওপর প্রচন্ড রকমের পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। গলায় মুখে নখের আঁচড়ের দাগ। বাচ্চাটা হয়ত ছুটে পালানোর চেষ্টা করছিল। গলায় বেশ লাল দাগ! ওকে ধর্ষনের চেষ্টা করা হয়েছিল। সফল না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্লিডিং হওয়ার কারণে সে শকে চলে গেছে। আমাদের ধারণা, যন্ত্রণার তীব্রতায় একপর্যায়ে ফিওনা যখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, তখন হয়তো ধর্ষক ভয় পেয়ে মাঝপথে তাকে ওই জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। বর্তমানে আমরা রক্তপাত বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। চিকিৎসা চলছে।”

ডাক্তারের মুখ থেকে ‘ধর্ষণ’ ‘অতিরিক্ত ব্লিডিং’ কথাগুলো শোনামাত্রই বেলীর মাথার ভেতর সব ওলটপালট হয়ে গেল। সে আবারও করিডোরের মেঝেতে আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।এই পৃথিবীর মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর? এত পৈশাচিক হত পারে একটা রক্তমাংসের মানুষ? মাত্র চার বছরের একটা নিষ্পাপ, অবুঝ বাচ্চা—তাকেও একটু দয়া করল না পাষণ্ডরা! তাকেও ধর্ষণ করতে ছাড়েনি! তার চার বছরের পুতুলটার সাথে এই দুনিয়ার মানুষ এমন নরকীয় কাণ্ড করতে পারল, এই সত্যিটা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। কান্না যেন থামছেই না এটা ভেবে ফিওনা কত যন্ত্রণা সহ্য করেছে!
________________________________
ফারহান চাইলে পারতো বেলীকে ডিভোর্সের পর টাকাগুলো না দিয়ে ফাঁকি দিতে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে। কিন্তু তার ভেতরের সুপ্ত বিবেক আর অতীতে করা পাপের তীব্র অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সে চেয়েছে যেকোনো মূল্যেই হোক বেলীর এই দেনমোহরের পাওনা টাকা শোধ করে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। সেই মরিয়া ভাব থেকেই ফারহান দ্রুত তার নিজের গ্রামে ফিরে যায়। বাপদাদার আমলের যেটুকু মাথা গোঁজার শেষ ভিটেমাটি অবশিষ্ট ছিল, নিজের কোনো ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই সেটুকু একরকম পানির দরে, তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করে দেয়। সব মিলিয়ে মাত্র তিন লাখ টাকা হাতে পায় সে। গ্রামে থাকার মতো শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফারহান ঢাকায় ফিরে আসে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেলীর দেনমোহরের সেই দু লাখ টাকা সে শোধ করে দেয়। কিন্তু দেনমোহরের টাকার বাইরেও তার ঘাড়ে আরও ত্রিশ হাজার টাকার একটা দেনা ছিল। সেই অবশিষ্ট টাকাটা শোধ করার জন্য সে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, এদিক-ওদিক হন্যে হয়ে ঘুরছিল। কিন্তু নিয়তির মার বোধহয় একেই বলে! ফারহান আর এক কদমও সামনে এগোতে পারল না, তার চলার সব পথ যেন একসাথে বন্ধ হয়ে গেল।
টাকার অভাবে ঢাকার সেই জীর্ণ ছোট ঘরটার বাড়ি ভাড়াও সে সময়মতো দিতে পারেনি। কয়েক মাসের ভাড়া বাকি পড়ায় বাড়িওয়ালা একদিন চরম অপমান করে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। রাস্তায় এসে দাঁড়ায় ফারহান। একটা সাধারণ কাজের জন্য সে চেনা-পরিচিত সবার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরল, কিন্তু তার অতীত রেকর্ড আর এই বর্তমান দুর্দশা দেখে কেউ তাকে বিশ্বাস করল না, কোনো কাজেও নিল না।
চরম নিরাশ আর নিঃস্ব হয়ে একদিন ফারহান রাস্তার এক মোড়ে এসে ধপাস করে বসে পড়ল। ক্ষিদে আর অপমানে তার শরীর তখন কাঁপছিল। গত কয়েক মাসের মানসিক ঝড় আর অনাহারে তার পরনের পোশাকটা হয়ে গিয়েছিল জীর্ণ, ময়লা আর ছেঁড়া। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো, মুখের দাড়ি-গোঁফ বড় হয়ে জট পাকিয়ে গিয়েছিল।
ফারহান যখন শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষছিল, ঠিক তখনই এক পথচারী তার সেই মলিন দশা, ছেঁড়া পোশাক আর বড় চুল-দাড়ি দেখে তাকে একজন সাধারণ ভিখারি ভেবে বসল। লোকটা দয়া করে ফারহানের ওপর একটা টাকার নোট ছুড়ে দিয়ে চলে গেল। কোলের ওপর পড়া সেই টাকাটার দিকে ফারহান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ফেটে জল চলে এল। আজ পরিস্থিতি তাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! টাকাটার দিকে তাকিয়ে সে চরম এক সত্য আবিষ্কার করল—দুনিয়ার মানুষ তাকে এখন ভিক্ষুক ছাড়া আর কিছু ভাবছে না। ভেতরের সব আত্মসম্মান আর অহংকার বিসর্জন দিয়ে সেই দিন থেকেই ফারহান পুরোদস্তুর ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিল। ওই রাস্তার মোড়টাই হলো তার নতুন ঠিকানা। এভাবেই ভিক্ষা করে তার একেকটা দিন কাটতে লাগল। মানুষের কাছে হাত পেতে যে কয়টা টাকা জোটে, তা দিয়ে কোনোদিন কিছু কিনে পেটের ক্ষুধা মেটায়, আর যেদিন টাকা জোটে না, সেদিন ক্ষুধার্ত পেটে রাস্তার ফুটপাতে, চটের ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়ে। ঘুমানোর জন্য ছাঁদটুকুও নেই তার মাথায়। ফারহান বড় রাস্তার ধারের এক কোণেই আস্তানা গেড়েছিল। হঠাৎ করেই তার কানের কাছে মানুষের শোরগোল আর একটা তীব্র জটলার আওয়াজ এলো। চারপাশ থেকে লোকজন চিৎকার করতে করতে ছুটে যাচ্ছে। পিচঢালা মেইন রোডের মাঝখানে ততক্ষণে বেশ বড় একটা মানুষের ভিড় জমে গেছে। কেউ একজন বলাবলি করল,

“আহারে! এক্কেবারে বাসের তলায় পইড়া শ্যাষ!”

ফারহান সহজে হাঁটতে পারে না। তার সেই পুরনো, ভাঙা ক্র্যাচটার ওপর ভর দিয়ে সে অনেক কসরত করে কোনোমতে শরীরটাকে টেনে তুলল। কৌতূহল আর অবশ পা দুটো নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে জটলার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড় ঠেলে উঁকি দিতেই দেখল, রাস্তার মাঝখানে রক্তাক্ত অবস্থায় একটা মেয়ে পড়ে আছে। চারপাশের লোকজন আফসোস করতে করতে বলাবলি করছে,

“মাথায় বড্ড বেশি চোট লাগছে ভাই। মেয়েটা আর বেঁচে নেই, অন স্পট ডেড!”

রক্তে ভেজা সেই নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ফারহানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল—এমন একটা এক্সিডেন্ট যদি তারও হতো! যদি একটা বাস এসে তাকেও পিষে দিয়ে চলে যেত, তবে সে এই নরকযন্ত্রণা আর দুর্দশার জীবন থেকে চিরতরে মুক্তি পেত। প্রতিদিন হাত পেতে ভিক্ষা করার চেয়ে এই মরণও যে অনেক ভালো ছিল! এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফারহান একটু ভালো করে লক্ষ্য করল মেয়েটার দিকে। মাথার চুলগুলো জট পাকিয়ে ধুলোবালিতে একাকার হয়ে আছে, হাতের আর পায়ের নখগুলো অযত্নে কত বড় বড় হয়ে গেছে! পরনে নোংরা, ছেঁড়াফাটা তালি দেওয়া এক টুকরো কাপড়। চারপাশের মানুষজন বলাবলি করতে লাগল, এটা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, নির্ঘাত কোনো পথের পাগল!
কফারহান যখন লোকজনের কথা শুনছিল তখন তার চোখ গিয়ে পড়ল মেয়েটার মুখের ওপর। রক্তের ছোপ ছোপ দাগ মাখা সেই ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিতেই ফারহানের পুরো শরীর যেন এক নিমেষে জমে পাথর হয়ে গেল!
আর অন্য কেউ নয়! এ যে সেই অতি পরিচিত মুখ… এ যে তৃষ্ণা! লোকেরা তখনো আফসোস করে বলছে,

“আহারে! খেয়াল না কইরা রাস্তা পার হইতে গেছিল, এক্সিডেন্টেই মরে গেল।”

ফারহান ধীরপায়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। কিন্তু সে তৃষ্ণার সেই রক্তাক্ত দেহটা আর স্পর্শ করল না। হাত দুটো তার কাঁপছিল। এক তীব্র শূন্যতা আর বিষাদ এসে তাকে গ্রাস করল। এই একটা নারীর চক্করে পড়েই তো আজ তার জীবনের এই চরম অধঃপতন! তার এই ভিখারি হওয়ার পেছনে তৃষ্ণার ভূমিকাও তো কম ছিল না। আজ এই দৃশ্য দেখে সে হাসবে নাকি কাঁদবে, তা নিজের মনকেও জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারল না। যে তৃষ্ণার রূপের মোহে অন্ধ হয়ে সে নিজের সাজানো সংসার, লক্ষ্মী একটা বউ, ফুটফুটে কন্যাসন্তানকে এক নিমেষে ছেড়ে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণাই তাকে চরম অবহেলায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর আজ? আজ অবশেষে সেই তৃষ্ণাকেই এই নিষ্ঠুর দুনিয়া ছেড়ে একেবারে শূন্য হাতে চলে যেতে হলো।
পরক্ষণেই ফারহানের মনে হলো, এখন তৃষ্ণার ঘাড়ে দোষ চাপিয়েই বা তার কী লাভ? সে নিজে কি ধোয়া তুলসী পাতা? সে নিজেও তো এক চরম পাপী! বেলীর মতো একটা মেয়ের জীবন ধ্বংস করার মূল কারিগর তো সে নিজেই। প্রথমে প্রেম করে পালিয়ে এনে বিয়ে করলো। মেয়েটাকে পরিবার থেকে আলাদা করে নিলো। সংসার পাতলো, সন্তান হলো শেষমেশ সে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে আরেকটা বিয়ে অব্দি করেছে! যে মেয়েটা তার জন্য সব ছেড়েছিল সে মেয়েটাকেই সে ছেড়ে দিয়েছে!
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল—ভালোই হয়েছে, তৃষ্ণা অন্তত এই দুনিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সে নিজে কবে মুক্তি পাবে? আত্মহত্যা করা মহাপাপ, আর জীবনে সে এমনিতেও কম পাপ করেনি যে নতুন করে আরেকটা পাপের বোঝা মাথায় নেবে! সেই ভয়ে সে নিজের জীবনটা নিজ হাতে শেষ করতেও পারছে না।
ফারহান ঝাপসা চোখে তৃষ্ণার লাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ সে নিজের চোখ ভরে প্রকৃতির সেই নিষ্ঠুর বিচার দেখল। প্রকৃতি কাউকেই ছাড়ে না! প্রকৃতি তৃষ্ণাকেও ছাড়েনি, আবার ফারহানকেও মাফ করেনি। তৃষ্ণা তো এক নিমেষেই সব কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে চলে গেল, কিন্তু ফারহানের জন্য প্রকৃতি যে আরও বড় শাস্তি তুলে রেখেছে—সে মরতেও পারছে না, বাঁচতেও পারছে না; প্রতিটা মুহূর্তে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-২৪+২৫

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৪)
#মীরাতুল_নিহা

আদনানের কথার ধাঁচ, চোখের গভীর চাউনি দেখে বেলীর মনের ভেতর আচমকা একটা খটকা লাগল। কেমন যেন একটা অজানা অস্বস্তি আর শঙ্কা বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। সে হাতের পানির গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর ভ্রু কুঁচকে সরাসরি আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কাকে চিনি আদনান? কার কথা বলছ তুমি এতক্ষণ ধরে? তোমার এই অদ্ভুত ধাঁধাময় কথার মানে কী, পরিষ্কার করে খুলে বলো তো?”

বেলীর এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে আদনান আর চোখ ফিরিয়ে নিল না। এতগুলো বছর ধরে বুকের গহীনে চেপে রাখা জমানো পাথরটাকে আজ সে চিরতরে নামিয়ে দিতে চায়। সে নিজের মনকে শক্ত করল, ভেতরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বকে একপাশে সরিয়ে দিল। তারপর বেলীর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অত্যন্ত আকুল গলায় বলতে শুরু করল,

“আমি অন্য কারও কথা বলছি না , আমি তোমার কথাই বলছি। বিয়ের পর তুমি যখন প্রথম ওই বস্তির ঘরে পা রাখলে, তোমাকে দেখেই আমার মনে মনে ভীষণ ভালো লেগেছিল। প্রথম দেখাতেই আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, পছন্দ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তুমি তখন পরস্ত্রী ছিলে, অন্যের ঘরের বউ ছিলে। তাই একটা পরস্ত্রী দেখে আমি আমার সমস্ত অনুভূতিকে জোর করে সামলে নিয়েছিলাম। নিজের বিবেক আর নীতিকে হারতে দিইনি। বুকের ভেতরের সেই ভালোবাসাকে জোর করে ওখানেই সমাপ্ত করে দিয়েছিলাম, কোনোদিন একটা প্রকাশ্য দীর্ঘশ্বাসও ফেলিনি তোমার সামনে।”

আদনান আরেকটু দম নিয়ে নিজের ভেতরের সব কথা একনাগাড়ে উগরে দিয়ে বলতে লাগল,

“কিন্তু তোমার এই ডিভোর্সের পর আমি আর নিজেকে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারিনি বেলী। এতদিন ধরে মনের যে অনুভূতিগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছিল, দমিত ছিল, তোমার এই একা হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো যেন বাঁধ ভেঙে উথলে উঠেছে। আমি আর পারছি না। এখন আমি আর চাইলেও, হাজার চেষ্টা করেও এই অনুভূতিগুলো নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না বেলী। আমি কোনোদিন, কোনো একটা মুহূর্তের জন্যও তোমাকে বড় বোনের নজরে দেখিনি। একটা পুরুষ একটা নারীকে যেভাবে ভালোবাসে, আমি ঠিক সেভাবেই তোমাকে মন থেকে তীব্রভাবে ভালোবাসি আর তোমাকে নিজের করে পেতে চাই।”

আদনানের মুখ থেকে শেষ বাক্যটা বের হওয়া মাত্রই বেলীর মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এত বড় একটা বিশ্বাসভঙ্গ, এত বড় একটা ধাক্কা সে সহ্য করতে পারল না। যে আদনানকে সে নিজের ভাইয়ের মতো পরম নিশ্চিন্তে আশ্রয় মনে করেছিল, সে-ই কিনা তার দিকে এই নজরে তাকিয়েছে? বেলীর ভেতরের সমস্ত রাগ, ঘৃণা, অপমান আর ক্ষোভ যেন এক নিমেষে মাথায় চড়ে বসল। সে সোফা থেকে সটান উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু না ভেবেই সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল আদনানের গালে!
‘ আদনান চরম স্তব্ধ, হতভম্ব, বাকরুদ্ধ হয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ফেটে জল চলে এল। সে ভাবতেও পারেনি বেলী তাকে এভাবে আঘাত করবে। বেলী রাগে আর অপমানে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীব্র চিৎকার করে বলল,

“ তোমাকে আমি নিজের ছোট ভাইয়ের মতন দেখি, সারাক্ষণ ‘ভাই’ বলে ডাকি—আর তুমি এসব নোংরামি পুষে রেখেছ আমায় নিয়ে? ছিহ্ আদনান, ছিহ্! তোমার মুখে এসব কথা শুনতে হবে আমি মরলেও স্বপ্নে ভাবিনি। আমার ঘেন্না লাগছে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। তুমু আর কোনোদিন আমার সামনে আসার দুঃসাহস দেখাবে না!”

আদনান আর একটা কথাও বলল না। মাথা নিচু করে, এক বুক ভাঙা কষ্ট, কান্না আর চরম অপমান নিয়ে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত আর ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখেছোট্ট ফিওনা ভয়ে আঁতকে উঠল। মায়ের এমন রুদ্রমূর্তি আর আদনান মামার গালে চড়ের শব্দে সে চরম আতঙ্কিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সোফা থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরল সে। বেলী এক ঝটকায় ফিওনাকে কোলে তুলে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। ফিওনা মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল,

“মামণি, তুমি মামাকে কেন মেলেছ? মামা কান্নু করতে করতে চলে গেল কেন?”

বেলী নিজের ভেতরের ক্ষোভ চেপে ফিওনার চোখের জল মুছে দিল। তারপর শক্ত গলায় বলল,

“আর কখনো আদনান মামার নাম মুখে নেবে না ফিওনা। ও আর তোমার মামা নেই। আদনান পঁচা হয়ে গেছে। খুব পঁচা! আর পঁচা লোকেদের কাছে কখনো যেতে হয় না, তাদের সাথে কথাও বলতে হয় না। বুঝছ?”

ফিওনা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে মাথা দোলাল। আর কোনো কথা বাড়ানোর সাহস পেল না।
দেখতে দেখতে ঘরের ভেতর সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম আর থমথমে লাগছে। বেলী জোর করেই নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ফিওনাকে হাত-মুখ ধুইয়ে পড়ার টেবিলে এনে বসাল। সামনে বইটা খুলে ধরে সে নিজেই পড়াতে লাগল, কিন্তু বেলীর মন তখন বইয়ের পাতায় ছিল না। তার চোখের সামনে বারবার আদনানের সেই চড় খাওয়ার পর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মুখটা ভেসে উঠছিল।

এই ঘটনার পর দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা দিন। চারপাশের সবকিছু কেমন যেন বড্ড শান্ত আর একা হয়ে গেল। সব ঠিক থাকলে এতদিনে আদনান অনেকবারই এই ঘরে আসতো, ফিওনার সাথে মেঝেমধ্যে বসে খেলা করত, ঘরটা হাসির শব্দে মুখর হয়ে থাকত। বেলীর ছোটখাটো কত কাজেই না আদনান সাহায্য করত! পেজের কাপড়ের পার্সেলগুলো কুরিয়ারে দিয়ে আসা, কিংবা সংসারের হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি এনে দেওয়া—বেলী একটা ফোন করলেই আদনান সব কাজ ফেলে ছুটে আসতো।
বেলী কখনোই চায়নি আদনানকে এভাবে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে। প্রথম থেকেই আদনানের এত কাছাকাছি আসায় বেলীর মনে এক অদ্ভুত জড়তা আর দ্বিধাবোধ ছিল। মেয়েদের মন সবকিছুতেই আগে টের টায়। তার ওপর আদনানের মায়ের সেই কটু কথা, সন্দেহের কথা বেলী কোনোদিন ভোলেনি। ওই তীক্ষ্ণ চাউনি আর খোঁটা দেওয়া কথার ভয়ে সে সবসময় আদনান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে। তবুও আদনানের অবুঝ মায়া আর বারবার নিজে থেকে এগিয়ে আসাকে বেলী শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করতে পারেনি। একটা অসহায় সময়ে আদনানের এই নিঃস্বার্থ সাহায্যকে সে ভাইয়ের পরম আশ্রয় বলে মেনে নিয়েছিল।

পরক্ষণেই বেলীর মনের এক কোণে তীব্র অপরাধবোধ মোচড় দিয়ে উঠল। আচমকা তার মনে হলো—চড়টা মেরে সে কি আসলেই বড্ড বেশি করে ফেলেছে? রাগ আর অপমানের মাথায় সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হাজার হোক, তার জীবনের সেই চরম বিপদের দিনগুলোয় এই আদনানই তো তাকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছিল। তখন আদনান যদি নিজের কাঁধে দায়িত্ব না নিত, তবে ফিওনাকে নিয়ে সে আজ কোথায় যেত? এত বড় একটা উপকারের ঋণ সে এক নিমেষে ভুলে গেল?
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের কলিং বেলটা একনাগাড়ে বেজে উঠল। বেলী নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে নিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল সামনে আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে। সাত মাসের উঁচু পেটটা নিয়ে আয়েশা বেশ সাবধানে হেঁটে ঘরের ভেতর এসে সোফায় বসল। হাঁপাতে হাঁপাতে বেলীর দিকে তাকিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বলল,

“কী রে বেলী, তোর কী অবস্থা? শরীর-টোরীর ঠিক আছে তো?”
বেলী কোনোমতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। আয়েশা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু ব্যস্ত গলায় বলল,

“একদম চুপচাপ বসে আছিস যে? তাড়াতাড়ি রেডি হইযা নে। আজ মাহির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, তুই কি একবারে ভুইলা গেছিস? নাকি আদনান তোকে দাওয়াতই দেয়নি?”

বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ম্লান গলায় বলল,

“দাওয়াত দিয়েছে আয়েশা। কিন্তু আমি যাব না।”
আয়েশার মনে খটকা লাগল। সে ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,

“যাবি না মানে? আদনানের নিজের বোনের বিয়ে, আর তুই যাবি না? এটা কেমন কথা! চল, কোনো আপত্তি শুনব না, তাড়াতাড়ি রেডি হ!”

আয়েশা যখন এভাবে যাওয়ার জন্য বারবার জোরাজোরি করতে লাগল, তখন বেলী আর নিজের ভেতরের ঝড়টা চেপে রাখতে পারল না। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। আয়েশার হাত দুটো ধরে সে সেদিন আদনানের বলা প্রতিটা কথা, তার মনের ভেতরের অনুভূতি আর জবাবে নিজের মারা সেই চড়ের কথা—সবকিছু একনাগাড়ে খুলে বলল।
সব শুনে আয়েশা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চুপ করে রইল। ঘরের ভেতর একটা থমথমে নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আয়েশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলল,

“চড়টা দিয়ে তুই আসলেই বেশি করে ফেলেছিস বেলী। তুই রাজি না থাকলে ওকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতিস, ফিরিয়ে দিতে পারতিস। কিন্তু এভাবে গায়ে হাত তোলাটা তোর একদম ঠিক হয়নাই।”

আয়েশার মুখে কথাগুলো শুনে বেলী এবার সত্যিই থমকে গেল। তার ভেতরের রাগের পর্দাটা পুরোপুরি সরে গিয়ে সেখানে একরাশ অনুশোচনা এসে ভিড় করল। আয়েশা ঠিকই বলেছে, আদনান তো তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, কোনো পাপ তো করেনি। বেলী নিচু গলায় বলল,

“আমি সত্যিই তখন মাথা ঠিক রাখতে পারিনি রে। এখন আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে। আমার বোধহয় আদনানকে একটা ‘স্যরি’ বলা উচিত।”

আয়েশা বেলীর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,

“তুই এক কাজ কর, এখন আর ঘরে বসে মন খারাপ না করে আমাদের সাথে বিয়েতে আয়। ওখানে গিয়ে আদনানকে একটা ‘স্যরি’ বলে নিবি, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাইব। ছেলেটার মনটা অনেক নরম, তুই বুঝিয়ে বললে ও আর কষ্ট ধরে রাখব না।”

আয়েশা ঠিকই বলেছে, এভাবে ঘরে লুকিয়ে থেকে অপরাধবোধে ভোগার চেয়ে সরাসরি ভুল স্বীকার করা অনেক ভালো। বেলী আয়েশার দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলাল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—আজই সে মাহির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাবে। যতই জড়তা আর কটু কথার ভয় থাকুক না কেন, আজ সব উপেক্ষা করে সে আদনানের মুখোমুখি হবে। নিজের করা ভুলটার জন্য হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নেবে।
আলমারি খুলে একটা সুতি জামদানি শাড়ি বের করে পরে নিল। খুব একটা জমকালো সাজগোজ করার মানসিকতা তার ছিল না, তাই হালকা কাজল আর একটা ছোট্ট টিপেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখল। তবে ছোট্ট ফিওনাকে সে খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিল। একটা মিষ্টি ফ্রক পরিয়ে, চুলে দুটো ক্লিপ আটকে দিতেই ফিওনাকে যেন পরীর মতো লাগছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফিওনা তার মামণির গাল ছুঁয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, কিন্তু বেলীর মনের ভেতরের মেঘটা যেন কিছুতেই কাটছিল না।
তৈরি হওয়া শেষ হলে তারা ঘর থেকে বের হলো। আয়েশার সাত মাসের ভারী শরীর, তাই সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বেলী এক হাতে আয়েশাকে শক্ত করে ধরে রাখল আর অন্য হাতে ফিওনার আঙুল চেপে ধরল। সাবধানে পা ফেলে ফেলে তারা তিনজনে যখন রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই বেলীর চোখ গেল ফুটপাতের এক কোণে। সেখানে একটা ছেঁড়া চটের ওপর বসে ছিল এক ভিক্ষুক। লোকটার পরনের কাপড়টা যেমন জীর্ণ, তেমনি তার মুখের চামড়াগুলো কুঁচকে একাকার হয়ে গেছে। বেলী যখন আয়েশাকে ধরে সাবধানে রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই সেই ভিক্ষুকটার সাথে তার চোখাচোখি হলো। এক অদ্ভুত মলিন আর করুণ দৃষ্টিতে বেলী সেই লোকটার দিকে তাকাল। বেলী থমকে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে চেয়ে রইল, আর আশ্চর্যের বিষয়—সেই মলিন চেহারার ভিক্ষুকটাও পলকহীন চোখে বেলীর দিকেই তাকিয়ে ছিল। তার সেই ঘোলাটে চোখ দুটোর গভীরে যেন এক বুক হাহাকার লুকিয়ে আছে

#চলবে?

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৫)
#মীরাতুল_নিহা

মেয়েটির হাত থেকে প্রায় একরকম ছোঁ মেরে কাগজের ফাইলটা কেড়ে নিলেন হাফসা খাতুন। ভেতরের প্রেসক্রিপশন আর ডাক্তারি রিপোর্টটা চোখের সামনে ধরতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। ইংরেজি লেখাগুলো ভালো করে পড়তে পারলেন না, মেয়ের ফ্যাকাশে মুখ আর কান্নায় ভেজা চোখ দেখে উনার বুকের ভেতর সন্দেহের তিলটা তাল হয়ে উঠল। তিনি রাগী দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,

“কী হইছে তোর? এই রিপোর্টে কী লেখা আছে, পরিষ্কার করে বল আমায়!”

মায়ের এই রুদ্রমূর্তি দেখে তৃষ্ণা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এই মুহূর্তে সত্যি কথাটা বললে যদি মাথার ওপর থেকে এই শেষ আশ্রয়টুকুও চলে যায়? এই ভয়ে তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। এমনিতেই তো পাপের শাস্তি সে কম পাচ্ছে না, প্রতিটা মুহূর্ত নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে। তৃষ্ণাকে চুপ করে থাকতে দেখে হাফসা খাতুন এবার আরও জোরে ধমক দিয়ে হুমকি দিলেন,

“কী রে, কথা কছ না ক্যা? সত্যি কথা কবি, নাকি আমি নিজেই এই কাগজ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যামু? তখন কিন্তু আরও ভালো কইরা জানতে পারমু!”

আর কোনো উপায় না পেয়ে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া তৃষ্ণা এবার ভাঙা গলায়, অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল

, “মা… আমার… আমার এইডস হইছে!”

কথাটা বলেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তারপর কান্নার বেগ সামলে নিলো
মেয়ের মুখে এই মরণব্যাধির নাম শুনতেই হাফসা খাতুন যেন আকাশ থেকে পড়লেন। নিজের দুই হাত মাথায় দিয়ে তিনি ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন। তার সমস্ত শরীর যেন কাঁপতে লাগল। তীব্র ক্ষোভ আর আফসোস করতে করতে তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন,

“কত কইছিলাম তোরে! কত বুঝাইছিলাম যে এইসবে যাস না, এসব পাপ কাজ করিস না! নিজের ভালো চাস তো স্বামীর ঘরে ফেরত যা। কিন্তু না! তুই তো লাঙ নিয়া নাচলি! সেই লাঙ তোরে খাইয়া দাইয়া লাথি মাইরা ভাগায় দিল এক বছর পর। তারপর আবার আরেকটারে ধরলি, সেটাও শেষ হইলো। তারপর আবার কারে ধরছিলি আল্লাহ জানে! এইজন্যই তো তোর এই অলক্ষুণে রোগ হইছে! যা, আরও বেডাদের সাথে শুইতে যা!”

হাফসা খাতুনের মুখ থেকে ক্ষোভের আগুনে যেন বিষাক্ত সব তীর বেরিয়ে আসতে লাগল। তিনি দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন,

“আমার ঘরে আর তোর কোনো জায়গা নাই! তোর মতো এমন কলঙ্কিনী মেয়ে আমার চাই না। তুই এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে দূর হ!”

মায়ের প্রতিটা কথা তৃষ্ণার বুকে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। তৃষ্ণা তখন ঘরের এক কোণে বসে অঝোরে কাঁদছে। নিজের অবাধ্যতা আর ভুলের জন্য আজ সে সমাজের কাছে, মায়ের কাছে এক ঘৃণিত অপরাধী। চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে সে মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবছে তার করা পাপের শাস্তি যে এতটা ভয়াবহ আর নির্মম হবে, তা সে কোনোদিন স্বপ্নেও বোঝেনি।
তৃষ্ণা দুই হাতে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় আকুতি করে বলল,

“মাগো, আমায় তাড়িয়ে দিও না। আমার যাওনের কোনো জায়গা নাই মা। এই রোগ নিয়া আমি কার দুয়ারে যামু? আমায় একটুখানি আশ্রয় দাও মা, আমি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকমু।”

হাফসা খাতুন এক ঝটকায় পা সরিয়ে নিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন,

“তোর জন্য আমি এলাকায় মুখ দেখাইতে পারি না! মানুষের নানা কথায় কান পাতা যায় না। প্রথমে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে আমার মাথাটা হেট করলি, বংশের সম্মান ধুলোয় মিশাইলি। তারপর যা একটু সম্মান বাকি আছিল, তাও তুই শেষ করলি! শোন তৃষ্ণা, না খেয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু সম্মান ছাড়া সমাজে বাঁচা যায় না। তোর এই কলঙ্কের বোঝা আমি আর টানতে পারব না।”

তৃষ্ণা আবারও হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ে পড়তে গেল, কিন্তু হাফসা খাতুন এবার সপাটে এক লাথি মেরে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন। লাথি খেয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়তেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে কেঁপে উঠল। চোখের পলকে তার স্মৃতির পাতায় একটা পুরনো দৃশ্য ভেসে উঠল। ঠিক এভাবেই… ঠিক এভাবেই একদিন একজন অসহায় মানুষ তার পা জড়িয়ে ধরেছিল, আর সেও ঠিক এই নিষ্ঠুরভাবেই তাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছিল। আজ প্রকৃতি যেন সেই নির্মম অন্যায় আর পাপের বিচারটাই সুদে-আসলে তার কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে! এমন নয় যে ফারহান তৃষ্ণার জীবনে প্রথম পুরুষ ছিলো। এর আগেও দুটো প্রেমে জড়িয়েছিল সে। শারীরিক সম্পর্ক হয়েও সে সম্পর্কও টেকেনি। বলেছিল কেউ তাকে খুশি করতে পারেনি৷ জীবনে মজাটাই তার কাছে মুখ্য ছিল। শেষমেশ চেয়েছিল বিয়ে করে থিতু হতে৷ কিন্তু তার অসৎ চরিত্র আর লোভী মানসিকতা তাকে ঠিক থাকতে দেয়নি। ফারহানকে ছেড়ে যার সাথে গেছিল বিয়ের ভরসা দিয়ে দিয়ে একটা বছর তার সাথে সম্পর্কে ছিলো তৃষ্ণা। কত হোটেলে কত জায়গায় দেখা করেছ। বিয়ের চাপ দিতেই ছেলো পালালো! তারপর নিজেে সৌন্দর্যকে হাত করে আবারো সম্পর্কে জড়িয়েছিল এক বিবাহিত পুরুষের সাথে টাকা দেখে! সেটাও শেষ হয সে পুরুষের স্ত্রী’র সূত্র ধরে। এতেও থামেনি সে! জীবন আর যৌবনকে টেনে নিতে আরো একবার এক পুরুষের পাল্লায় পড়লো! যার যাতায়াত ছিল নিষিদ্ধ পল্লী অব্দি। হয়ত তার থেকেই ছড়িয়েছে এই রোগ! কতই না পাপ করেছে। পাপের শাস্তি পাচ্ছে সে। অনুশোচনায় যখন ঘিরে ধরলো ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে! জীবন তাকে মৃত্যুর দুয়ারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এমন এক রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে ফেরার পথ আর নেই। চেয়ে চেয়ে নিজের ধ্বংস দেখা ছাড়া! চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেল তৃষ্ণার। এই ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে সে এখন কোথায় যাবে? কে তাকে এই সমাজে একটু ঠাঁই দেবে? কি হবে তার?মায়ের কথা শুনে উন্মাদের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তৃষ্ণা। মাথার চুল এলোমেলো, পরনের কাপড় অগোছালো। সে রাস্তার ওপর দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগল। চারপাশের কোনো হিতাহিত জ্ঞান তার ছিল না। ঠিক তখনই তীব্র গতিতে আসা একটা দূরপাল্লার বাস সজোরে ধাক্কা দিল তৃষ্ণাকে।
বড় একটা শব্দ করে তৃষ্ণা ছিটকে পড়ল রাস্তার ধারে। রক্তে ভেসে গেল পিচঢালা পথ। আশেপাশের লোকজন চিৎকার করে ছুটে এসে ধরাধরি করে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করে তার প্রাণটা বাঁচাল ঠিকই, কিন্তু মাথায় অতিরিক্ত আঘাত পাওয়ার কারণে তৃষ্ণার ব্রেণের ভেতরের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। সে নিজের অতীত, নিজের নাম, নিজের রোগ—সবকিছু এক নিমেষে ভুলে গেল। তার স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি লোপ পেল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে একদম পাগলের মতো আচরণ করতে লাগল। নোংরা কাপড় পরে, এলোমেলো চুলে সে এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। হাফসা খাতুন কিন্তু মন থেকে মেয়েকে চিরতরে তাড়িয়ে দিতে চাননি। মা তো! রাগের মাথায়, অপমানে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিলেও উনার মাতৃত্বের টান শেষ হয়ে যায়নি। তিনি চেয়েছিলেন মেয়েটার রাগ একটু কমলে, তাকে আবার নিজের ঘরেই লুকিয়ে রাখবেন, সেবা-শুশ্রূষা করবেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তৃষ্ণা ততদিনে পুরোপুরি পাগল হয়ে চিরকালের জন্য সেই এলাকা ছেড়ে, মায়ের কোল ছেড়ে বহু দূরে হারিয়ে গেছে।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি সাধারণ এক বস্তি ঘরে হলেও বেশ চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। চারপাশের দেয়ালে সস্তা রঙিন কাগজ, গাঁদা ফুলের মালা মরিচ বাতির আলোয় পুরো পরিবেশটাতেই একটা উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেলী আর আয়েশা ছোট্ট ফিওনাকে সাথে নিয়ে সাবধানে হেঁটে কুলসুম বেগমের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আজ মেয়ের বিয়ে বলে কুলসুম বেগম নিজেও বেশ জমকালো একটা শাড়ি পরে সেজেগুজে বসে আছেন। বেলী কিছুটা দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে উনাকে সালাম দিল। কুলসুম বেগম বেলীর দিকে তাকিয়ে মুখের গম্ভীর ভাবটা কিছুটা নরম করে বললেন, “আইও, ভেতরে বও।”
কুলসুম বেগমের কথার টোন দেখে বেলী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। উনি কি আসলেই তাদের আসাতে খুশি হয়েছেন, নাকি মনে মনে বেজার হয়েছেন। খালাম্মার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা না করে বেলী সোজা মাহির কাছে চলে গেল। ভেতরের ঘরে মাহিকে হলুদ শাড়ি আর গয়নায় সাজিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সাজানো মাহিকে দেখে বেলীর মুখ থেকে আচমকা বেরিয়ে গেল,

“কী সুন্দর লাগছে মাহি তোকে!”

মাহিও বেলীকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। বেলী চারদিকে চোখ বুলিয়ে আদনানকে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু পুরো ঘরের কোথাও আদনান নেই। বেলীর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে আয়েশা কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“আদনান নাকি কী একটা কাজে বাইরে গেছে। বিয়ে বাড়ি, কত রকম কাজ থাকে ক! একটু পরেই চইলা আসব।”
আদনানের না থাকার খবর শুনে বেলীর বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠাটা একটু কমল। সে তখন চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, ফিওনা কই রে?”
আয়েশা হেসে ঘরের বাইরের দিকে ইশারা করে বলল,

“আরে, ও তো ওই যে বাইরের বাচ্চাদের সাথে খেলায় মেতে উঠেছে। দেখছিস না কত বাচ্চা এখানে এসেছে! তুই চিন্তা করিস না, ওখানেই আছে।”

ফিওনা অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে জেনে বেলীও নিশ্চিন্ত হলো। একপর্যায়ে বেলী আর আয়েশা মাহিকে ঘিরে ধরে গল্প করতে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিয়ের নানা খুনসুটি আর পুরনো দিনের কথায় মাহিকে হাসাতে হাসাতে তার ভেতরের গুমোট ভাবটা একদম ভুলে গেল। একটু পরেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। সাউন্ড বক্সে উচ্চস্বরে বাজতে শুরু করল গান। সেই সাথে বস্তির তরুণ-তরুণীদের নাচ আর চ্যাঁচামেচিতে পুরো বাড়ি গমগম করে উঠল। চারদিকের প্রচুর আওয়াজ আর হুলস্থুলের ভেতর বেলী আয়েশার দিকে ঝুঁকে মুখ নাড়িয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কানের কাছে মিউজিকের তীব্র শব্দের কারণে আয়েশা ঠিক কী বলছে, তার একটা বর্ণও বেলী বুঝতে পারল না। বেলী শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। তার মনের এক কোণে অবচেতনভাবেই এই ধারণাটা কাজ করছিল যে, ফিওনা নিশ্চয়ই আশেপাশেই কোথাও আছে বা আয়েশার কাছেই আছে। এই অতি আত্মবিশ্বাসের ঘোরটাই যে তার জীবনে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে, তা বেলী তখনো টের পায়নি।

দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁয়ে গেল। সাউন্ড বক্সের তীব্র আওয়াজ আর মানুষের নাচ-গানের আনন্দ উৎসব তখনো পুরোদমে চলছে, কিন্তু বেলীর মনের ভেতরের শান্তি ততক্ষণে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে সে ফিওনাকে খুঁজে পাচ্ছে না! পুরো বিয়ে বাড়ি, বস্তির আনাচ-কানাচ হন্যে হয়ে খুঁজেও তার কলিজার টুকরোটার কোনো হদিস মিলল না। বেলী পাগলের মতো ছুটে গিয়ে বাইরে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোকে বারবার চেপে ধরল, কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করল,

“তোমাদের সাথে আমার ফিওনা খেলছিল না? ও কোথায় গেছে বলো না ? আমার ফিওনা কোথায়?”

বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে মাথা নাড়ল। তাদের মধ্যে একজন শুধু আমতা আমতা করে বলল,

“ফিওনা তো অনেক আগেই আমাদের ওখান থেকে চলে গেছে। কার সাথে গেছে আমরা দেখিনি।”

কথাটা শোনামাত্রই বেলী মাঠের মাঝখানে অসহায় হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল, বুকফাটা কান্নায় সে চারপাশ ভারী করে তুলল। একটা মায়ের জীবনের একমাত্র সম্বল, বেঁচে থাকার একমাত্র আলো তার সন্তান! সে এভাবে কোথায় হারিয়ে যাবে? ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে আদনান এসে বেলীর সামনে দাঁড়াল। বেলীর এই অবস্থা দেখে আদনানের নিজের চোখও ভিজে উঠল। সে আর নিজের রাগ বা অভিমান ধরে রাখতে পারল না। বেলীর পাশে বসে অত্যন্ত দৃঢ় আর আশ্বস্ত করা গলায় বলল,

“তুমি একদম কেঁদো না। শান্ত হও। ঠিক ফিওনাকে খুঁজে পাব দেখো।”

আদনানের কথায় বেলী যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো একটু সাহস পেল। এরপর আদনান, বেলী আর বস্তির কয়েকজন মিলে চারপাশের অন্ধকার গলিগুলোয় খোঁজাখুঁজি শুরু করল। শেষমেশ খুঁজতে খুঁজতে তারা বস্তির একদম শেষ মাথায়, যেখানে এক নিঝুম আর পরিত্যক্ত জঙ্গল মতো আছে, সেই দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার আর থমথমে। বেলী হাতের টর্চটা জ্বেলে চারপাশের ঝোপঝাড়ে আলো ফেলতে লাগল। আচমকা টর্চের তীব্র আলোটা গিয়ে পড়ল ঝোপের আড়ালে মাটির ওপর। আর সেই আলোয় চোখের সামনে যা ভেসে উঠল, তা দেখে বেলীর কলিজা যেন ছিঁড়ে বের হয়ে এলো। সাদা ফ্রক পরা একটা ছোট বাচ্চা উপুড় হয়ে মাটির ওপর পড়ে আছে। নিজের মেয়ের সেই আদরের সাদা ফ্রকটা চিনতে বেলীর এক মুহূর্তও ভুল হলো না! কিন্তু পরক্ষণেই এক চরম ও ভয়ঙ্কর দৃশ্যে বেলীর পুরো বুকটা কেঁপে উঠল, তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। টর্চের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে—অসহায় নিথর ফিওনার দু পায়ের মাঝখানের ফাঁক দিয়ে তাজা লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর সেই রক্তে সাদা ফ্রকটার নিচের অংশ ভিজে একাকার হয়ে গেছে!

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-২২+২৩

#বেলীফুলের_ইতিকথা(২২)
#মীরাতুল_নিহা

ফারহানের হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্যটা বেলীর মনে কোনো করুণার উদ্রেক করল না। সে ফারহানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে অত্যন্ তীব্র অপমান মেশানো গলায় বলল,

“হাত জোড় করছেন কেন ফারহান সাহেব? এই হাত দিয়ে তো সেদিন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করেছিলেন। আপনি ফিরিয়ে নিতে এসেছেন কোন সাহসে? ধর্মমতে আমাদের বিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আপনি সবাইকে সাক্ষী রেখে তিন তালাক দিয়েছেন। আমার কাছে ধর্মের চেয়ে বড় আর কিছু নেই, আপনার ওই আইনি মারপ্যাঁচও না।”

ফারহান অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেলী থামল না, সে সোজা ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ধর্মের বিধানে আপনি আমার পরপুরুষ। আপনার ছায়া মাড়ানোও আমার জন্য গুনাহ। আইনের চোখে ৯০ দিন সময় আছে ঠিকই, কিন্তু সেই আইন এখন আপনাকে আমার স্বামী বানানোর জন্য নয়, বরং আইনমতে আপনার কাছ থেকে আমার দেনমোহরের এক একটি টাকা কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করার জন্য।”

ফারহান এবার কাঁপাকাঁপা গলায় আকুতি করল,

“বেলী, দোহাই তোমার, এভাবে বলো না। আমি খুব বিপদে পড়ছি। তুমি তো দেখছ আমি অসুস্থ, আমার একটা পা অচল হইয়া গেছে। আমা কাজও এখন নাই। আমি এখন এত টাকা কোথায় পাব বলো? আমাকে একটু মাফ কইরে দাও।”

বেলী ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। বলল,

“আপনার কর্মের ফল। আর অসুস্থতার কথা বলছেন? আমি তো অনেক আগেই শুনেছি যে আপনি এক্সিডেন্ট করেছেন। রাস্তায় ল্যাংড়া হয়ে ঘুরছেন। তাতে আমার কি?”

বেলীর মুখে এই কথাটি শুনে ফারহান স্তব্ধ হয়ে বেলীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মানে বেলী জানত! সে যে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ছিল, পা ভেঙে ঘরে পড়ে ছিল, এই সব খবর বেলী আগে থেকেই জানত। অথচ… অথচ সে একবারের জন্যও তাকে দেখতে আসেনি! একটাবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি সে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে! ফারহানের মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। সামান্য একটু জ্বর হলে, কিংবা কাজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হলে বেলী অস্থির হয়ে যেত। ফারহান একটু অসুস্থ হয়ে পড়লে বেলী মাথায় পানি ঢালত, রাত জেগে সেবা করত। যে মেয়েটা তাকে এতটা ভালোবাসত, যার পৃথিবী জুড়ে শুধু ফারহান ছিল—আজ সে কতটা নিষ্ঠুর, কতটা পাথর হয়ে গেছে! ফারহানের এত বড় বিপদেও সে একটু দেখতে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ফারহান বুঝলো, সে আসলে বেলীর ভেতরের সেই নরম মনের মানুষটাকে নিজের হাতে খুন করেছে।
বেলী আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ঘরের দরজার দিকে ইশারা করে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল,

“আর একটা কথাও নয়। সম্মানে ঘাড় ধাক্কা খাইতে না চাইলে এখনই এখান থেকে চলে যান। আপনার মুখ দেখার রুচিও আমার নেই।”

ফারহান নড়ল না। সে মাথা নিচু করে, দেওয়ালের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত অপরাধী এবং লজ্জিত স্বরে বলল,

“বেলী… দু’টো ভাত হইব? খুব ক্ষিদে পেয়েছে গো। গতকাল রাত থেকে পেটে এক দানা দানাপানিও পড়ে নাই।”

বেলীকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফারহান পুনরায় বলল,

“ তৃষ্ণা… তৃষ্ণা আমাকে ফেলে চলে গেছে। আমার এই ভাঙা পা নিয়ে রান্না করার কোনো উপায় নেই।”

ফারহানের মুখে তৃষ্ণার চলে যাওয়ার কথা শুনে বেলী কিংবা আয়েশা—কারো চোখেই বিস্ময় বা সহানুভূতির লেশমাত্র ফুটল না। দুজনেই একদম শীতল হয়ে রইল। ফারহান যখন বুঝল এখানে তার ঠাঁই হবে না, সে অত্যন্ত ক্লান্ত পায়ে ক্রাচে ভর দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই পেছন থেকে বেলী ডেকে উঠল,
“ভেতরে আসেন।”
ফারহান চমকে ফিরে তাকাল। বেলীর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার হলো না, সে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকল। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসার পর সে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখল। ফারহানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। বেলী তার পুরোনো সংসারে যেমন একটু একটু করে নিজ হাতে সবকিছু গুছিয়ে সাজাত, এই নতুন ঘরটাকেও সে ঠিক তেমনি পরিপাটি করে সাজিয়েছে। ঘরের কোণে একটা ফুলদানিতে কটা বেলীফুল গোঁজা, যার সুঘ্রাণ সারা ঘরে ম ম করছে।
খানিক বাদে বেলী রান্নাঘর থেকে ভাতের থালা বেড়ে নিয়ে এল। থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, সাথে টকটকে ঝোলের রুই মাছের তরকারি আর মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা কচুর শাক। ফারহান থালাটা টেনে নিয়ে তৃপ্তি ভরে খেতে লাগল। সে এমনভাবে গিলছিল, যেন কত যুগ সে অন্নহীন, কতদিন পর সে ভাতের স্বাদ পাচ্ছে! তৃষ্ণা মাঝেসাঝে রাঁধলেও সেই খাবারে কোনো স্বাদ ছিল না, ছিল না কোনো আন্তরিকতা। এক প্লেট ভাত নিমেষের মধ্যে শেষ করে ফারহান বেলীর দিকে না তাকিয়ে অপরাধীর মতো থালাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

“আরেকটু ভাত হবে বেলী? বড্ড খিদে লেগেছে।”

বেলী কোনো কথা বলল না। মুখ ফুটো করে একটা প্রশ্নও করল না। সে নিঃশব্দে থালাটা নিয়ে রান্নাঘরে গেল এবং আবার ভাত বেড়ে এনে ফারহানের সামনে রাখল। ফারহান পরম শান্তিতে খেতে লাগল, বেলী দূর থেকে দাঁড়িয়ে তার জীবনের এই চরম ধ্বংস আর পতনের দৃশ্যটা অবলোকন করতে লাগল।
এতক্ষণ ঘর জুড়ে হামাগুড়ি দিতে থাকা ছোট্ট ফিওনা হঠাৎ একটা কাঠের টুলের ওপর ভর দিয়ে নিজের ছোট্ট দুটি পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে ঘরের দেয়াল ধরে ধরে, এক পা দু পা করে টলমল পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল ঠিক ফারহানের দিকে। ফারহানের আর একটুখানি দূরত্ব থাকতেই তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল, সে ধপাস করে পড়ে যেতে নিচ্ছিল ঠিক তখনই ফারহান নিজের খাওয়া ভুলে ক্রাচ ফেলে হাত বাড়িয়ে ফিওনাকে আগলে নিল। আলতো করে মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল সে। ফিওনাকে বুকে নিতেই ফারহানের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। এক অবর্ণনীয়, তীব্র এক অনুভূতি! এমন অনুভূতি তার জীবনে আগে কখনো হয়নি। অতীতে যখন বেলী বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল, তখন ফারহান নিজের ভুলের অন্ধকারে এতটাই অন্ধ ছিল যে এই পবিত্র অনুভূতির মর্ম সে বোঝেনি। আজ এই চরম বিপদের দিনে, নিজের সর্বস্ব হারানোর পর মেয়ের শরীরের ওমে তার ভেতরটা হু হু করে কেঁপে উঠল। ফারহান পরম মমতায় মেয়ের মাথায় কাঁপা কাঁপা হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
কিন্তু সেই সুখ সইল না মাত্র কয়েক সেকেন্ড। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশা চিলের মতো ছোঁ মেরে ফিওনাকে ফারহানের বুক থেকে ছিনিয়ে নিল। ফারহান বুকটা খালি হয়ে যেতেই আর্তনাদ করে বলে উঠল,
“আয়েশা, দাও না একটু! ফিওনা তো আমারও মেয়ে, আমার নিজের রক্ত।”

আয়েশা ফিওনাকে নিজের আড়ালে নিয়ে তপ্ত গলায় বলল,
“রাখেন আপনার মেয়ের বাহানা! আপনে এই বাপের যোগ্য না। যে লোক নিজের বউ-বাচ্চারে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারে, সে কখন নিজের বাচ্চার কী ক্ষতি কইরা বসে তার কোনো ঠিক নাই। আপনারে বিশ্বাস নাই।”
আয়েশার কোল থেকে ফিওনা কিন্তু চোখ সরাল না। সে বড় বড় নিষ্পাপ চোখ দুটো মেলে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফারহানের দিকে। সে যেন তার এই ছোট্ট মাথায় চেনার চেষ্টা করছে—কে এই লোকটা? কেন তার চোখে এত জল? অবুঝ শিশুটি জানেই না যে এই লোকটাই তার জন্মদাতা পিতা, অথচ আজ তাদের মাঝে কোনো বাবা মেয়ের সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই।
মেয়ের সেই চাউনি দেখে ফারহান এক লহমায় অতীতে ঘুরে এল। ফিওনা যখন জন্মাল, সে তখন তৃষ্ণার সাথে পরকীয়ায় বুঁদ হয়ে ছিল। সারারাত বেলী যখন এই বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে একা একা জেগে থাকত, কাঁদত, ফারহান তখন ফোনের ওপাশে অন্য নারীর রূপের সাগরে ভাসত। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো কোলে নিলেও ফিওনাকে তখন এত আদুরে, এত আপন লাগেনি তার। আজ কেন তবে বুকটা এভাবে ফেটে যাচ্ছে? এই মেয়েটা যে তারই অংশ, তারই রক্ত! এই মেয়েটাই একদিন তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকত।

ফারহান আর কোনো জোর করল না, কোনো অধিকার খাটাতে গেল না। সে শুধু এক বুক মায়া আর অনন্ত আফসোস নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বড্ড ইচ্ছে করছিল ফিওনাকে আবার বুকে টেনে নিয়ে একটু প্রাণভরে আদর করতে, কিন্তু সেই ইচ্ছে প্রকাশ করার মতো মুখ বা অধিকার আজ কোনোটিই তার নেই। সে কেবল এক অপরাধী পিতার মতো নিঃশব্দে চোখের জল মুছল।

তৃপ্তি ভরে দুই প্লেট ভাত খাওয়ার পর ফারহানের শরীরে যেন সামান্য শক্তি ফিরে এল। সে এঁটো হাতটা ধুয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছল। তারপর অত্যন্ত করুণ আর যাচনামূলক দৃষ্টিতে বেলীর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“বেলী… একটা কথা বলি? ওই আইনি নোটিশের দেনমোহরের দুই লাখ টাকাটা… ওটা কি কোনোভাবেই মাফ করা যায় না? আমার এখন কোনো আয়-রোজগার নাই, শরীরটাও অচল।”

বেলী ফারহানের দিকে একপলক তাকাল। তার চোখে কোনো দয়া বা নমনীয়তা ফুটল না। সে ভাতের খালি থালাটা তুলে নিতে নিতে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,

”খেতে চেয়েছেন তাই খেতে দিয়েছি। তার মানে এই না যে আপনি যখন যা চাইবেন, আমি হাত বাড়িয়ে সব দিয়ে দেব।”

বেলীর এই সোজাসাপ্টা জবাবে ফারহান তীব্র অপমানিত বোধ করল। মনে হলো, বেলী যেন তাকে কোনো মানুষই ভাবছে না, ঘরের দুয়ারে আসা কোনো অবলা কুকুর-বেড়ালকে মানুষ যেভাবে করুণা করে দুটো ভাত ফেলে দেয়, বেলীও ঠিক তা-ই করল।
ফারহান বুকে হাত দিয়ে কষ্ট চেপে বলল,

”আমার সাথে এমন ব্যবহার বাজে করছো বেলী?”

বেলী এবার ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“ব্যবহারের কথা বলছেন ফারহান সাহেব? আপনি আমার ঘরে সতীন এনেছেন, আপনার সেই নতুন ভালোবাসার জন্য আমাকে আর আমার দুধের বাচ্চাটারে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তালাক দিয়েছেন, সম্পর্ক শেষ করেছেন অথচ আপনার জন্য আমি সব ছেড়েছিলাম! আমি আপনার সাথে আজকে যা করছি, আপনি আমার সাথে যা যা করেছেন—তার চেয়ে অনেক কম, অনেক ভদ্র ব্যবহার করছি!”
ফারহান লজ্জায় আর অপরাধবোধে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। সে কেবল মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। বেলী থালা-বাসনগুলো রান্নাঘরে রেখে এসে দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,

“খাওয়া তো শেষ, এবার দয়া করে আমার ঘর থেকে বিদায় হন। আর কোনোদিন যেন এই মুখ আমি না দেখি। মনে রাখবেন, আপনি এখন আমার কাছে পরপুরুষ। একজন পরপুরুষ যদি আমার ঘরে এভাবে বারবার আসে, তবে এবার আমি নিজেই পাড়ার লোক ডেকে আপনাকে চোর বা লম্পট সাজিয়ে গণপিটুনি খাওয়াব। তখন এই ভাঙা পা-টাও আস্ত থাকবে না।”
ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পলক পড়ছে না। এ কোন বেলী?
ফারহান নিজের ক্রাচ দুটো টেনে নিয়ে অতি কষ্টে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“ঠিকই তো… আমি যা করেছি, এটা আমার সেই কৃতকর্মেরই ফল। পাপের কলসি যেদিন ভরে, সেদিন এভাবেই সব এক নিমেষে ছারখার হয়ে যায়। আজ আমি নিজের চোখে আমার ধ্বংস দেখে গেলাম বেলী। আমার আর কোনো ক্ষোভ নাই।”

ফারহান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। উশকোখুশকো চুল আর অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে বেলীর বুকের ভেতরটা হুট করেই কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরের পুরোনো আবেগটা নড়েচড়ে বসল। এই লোকটাকেই তো সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছিল। এতটাই ভালোবেসেছিল যে তার জন্য নিজের বাবা-মা, পরিবার—সবকিছু এক লহমায় ছেড়ে চলে এসেছিল। আর সেই ভালোবাসার মানুষটাই তাকে জীবনের মাঝপথে, বাচ্চাসমেত এক বুক অন্ধকার নদীর পাড়ে একা ফেলে চলে গিয়েছিল।
বেলীর চোখ দুটো টলমল করে উঠল। কিন্তু সে চট করে নিজের চোখের জল আড়াল করে ফেলল। নিজের মনকে শক্ত করে সে ভাবল—না! এই লোকটার জন্য এক ফোঁটা সহানুভূতি দেখানোও এখন আমার পাপ। যে আমার আর আমার মেয়ের জীবনটা ধ্বংস করতে দ্বিধা করেনি, তার এই পরিণতি প্রকৃতির বিচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
ফারহান চৌকাঠ পার হয়ে গলির অন্ধকারে পা বাড়াতেই বেলী আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে দুই হাত দিয়ে ‘দড়াম’ করে ঘরের মূল দরজাটা বন্ধ করে দিল।
**#চলবে…**

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৩)
#মীরাতুল_নিহা

বিকেলে বস্তির সামনের খোলা জায়গাটাতে কতগুলো বাচ্চা মেতে উঠেছে নানারকম খেলনা নিয়ে। সেখানে প্লাস্টিকের ভাঙা গাড়ি, পুতুল আর হাড়ি-পাতিলের মেলা বসেছে। চার বছরের ছোট্ট বাচ্চাটাও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। লোভ সামলাতে না পেরে সেও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেখানে। বাচ্চারাও সানন্দে তাকে নিজেদের দলে টেনে নিল। নতুন বন্ধুদের সাথে খেলনা বাটি খেলতে খেলতে কখন যে চারপাশটা আবছা হয়ে এল, সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নেমে গেল, বাচ্চাটি তা টেরও পায়নি। সে তখন পুতুলের সংসার সাজাতে বড্ড ব্যস্ত! ঠিক তখনই হঠাৎ তার পিঠে ‘টাস টাস’ করে দুটো চড় পড়ল! আচমকা এই মার খেয়ে মেয়েটি পিঠ হাতড়ে কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকাল। সামনে মায়ের চিবুক শক্ত করা রাগী মুখটা দেখেই অবুঝ মেয়েটার বুকটা কেঁপে উঠল, সে এবার হাপুস নয়নে কেঁপেই কেঁদে দেবে এমন অবস্থা।
বেলী দুই হাত কোমরে রেখে কড়া গলায় বলল,

“এতক্ষণেও তোমার খেলা শেষ হয়নি ফিওনা? দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেল, তোমার কোনো হুঁশ আছে?”

ফিওনা চোখ মুছে মায়ের ফ্রকটা টেনে ধরে ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,

“সবাই খেলা করচে আম্মু… টাই আমিও…”

তুতলিয়ে কথাগুলো বলল ফিওনা। এখনো স্পষ্ট করে কথা বলা শিখেনি৷ কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। বেলী মেয়ের হাত ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল,

“সবাই খেলছে কারণ এদের বাড়ি এইখানেই। এরা বস্তির ভেতরেই থাকে। কিন্তু তোমার বাড়ি তো এখান থেকে দূরে! তোমাকে আম্মু কতবার বলেছি না, খেলার সময় শেষ হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সোজা বাড়ি চলে আসবে? ঘরের দরজায় তালা দিয়ে আমি সারা বস্তি খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমাকে। আমার কতটা চিন্তা হচ্ছিল, সেই খেয়াল আছে?”

মায়ের বকুনি শুনে ফিওনা আর কোনো অজুহাত দিল না। সে নিজের দুটো ছোট্ট হাত দিয়ে কান ধরে টলমল চোখে বলল,

“আর হবে না আম্মু, স্যরি… আর ককনো দেরি কলব না।”
চার বছরের একটা ফুটফুটে বাচ্চার ওই কাঁদো কাঁদো মুখ, দুই হাত দিয়ে কান ধরে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ‘স্যরি’ বলা দেখে বেলীর ভেতরের সব রাগ এক পলকে জল হয়ে গেল। শত হলেও মায়ের মন তো! সন্তানের ওপর কি বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখা যায়?
বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিওনাকে টেনে এক ঝটকায় নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“দুষ্টু মেয়ে একটা! আর কখনো না বলে এত দূরে আসবে না, কেমন?”

তারপর ফিওনাকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতায় চুমু খেয়ে সে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।
দেখতে দেখতে সময়ের খাতা থেকে পেরিয়ে গেছে তিন-তিনটি বছরেরও অধিক সময়। এই দীর্ঘ তিন বছরে ফিওনা যেমন একটু একটু করে বড় হয়ে চার বছরে নূপ নিয়েছে, তেমনি বেলীর জীবনের চাকাটাও বদলে গেছে আমূল। তিন বছর আগের সেই অসহায়, এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া মেয়েটি আজ আর কারোর করুণার পাত্রী নয়। তার সততা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের জোরে বেলীর অনলাইনের কাপড়ের ব্যবসা এখন ছাড়িয়ে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শহরের একটা নামী মার্কেটেই সে এখন একটা ছোটখাটো নিজস্ব দোকান দিয়েছে। অনলাইন আর অফলাইন—দুই দিক সামলাতে বেলীকে হিমশিম খেতে হয় ঠিকই, কিন্তু মাস শেষে এখন সে বেশ ভালো অংকের টাকাই ইনকাম করে। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে মা আর মেয়ের দিনকাল এখন বেশ রাজকীয়ভাবেই কেটে যায়। কারও কাছে হাত পাতার বা মাথা নোয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
এদিকে গত বছর আয়েশার জীবনেও একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। যে গার্মেন্টসে আয়েশা কাজ করত, ওখানকারই এক শান্ত-শিষ্ট, দায়িত্ববান ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়ে করে আয়েশা এখন নিজের নতুন সংসারে চলে গেছে। অবশ্য এই বিয়েটা বেলীই জোর করে ধুমধাম করে দিয়েছে। নয়তো আয়েশা কিছুতেই বেলী আর ফিওনাকে ছেড়ে যেতে রাজি হচ্ছিল না। আয়েশার মনে হতো, সে চলে গেলে বেলী একা হয়ে যাবে। কিন্তু বেলী তাকে বুঝিয়েছিল, প্রত্যেকেরই নিজের একটা সংসার থাকা দরকার। বিয়ের পর আয়েশা তার স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছে।
আসলে পৃথিবীর নিয়মটাই এমন, কারো জন্য কোনো কিছু থেমে থাকে না। সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং মানুষকেও তার সাথে মানিয়ে নিতে হয়। প্রত্যেকেই যার যার মতো করে নিজেদের জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছে।
বেলীও আর সেই পুরোনো অতীত আঁকড়ে ধরে রাখেনি। সেই পরিবেশ ছেড়ে সে এখন অনেক দূরে, একটা নিরিবিলি ও ভালো এলাকায় সুন্দর একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। নতুন এই বাড়িতে বেলীর পুরোটা পৃথিবী জুড়েই আছে তার মেয়ে ফিওনা। ব্যবসায়ের শত ব্যস্ততার মাঝেও বেলী ফিওনাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে, তাকে এটা-ওটা শিষ্টাচার ও পড়ালেখা শেখাতে থাকে। এই তো আর কিছুদিন পরেই ফিওনাকে একটা ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে সে।

দরজায় ঝনঝন করে কলিং বেলের আওয়াজ পেতেই বেলী হাতের কাজ রেখে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই তার মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদনান—সেই কঠিন দিনগুলোতে যে নিঃস্বার্থভাবে বেলীর পাশে ছায়ার মতো ছিল।
বেলী হাসিমুখে বলল,

“আরে আদনান! কেমন আছো ভাই? কতদিন পর আসলে!”
আদনান ভেতরে পা বাড়াতে বাড়াতে মুখটা একটু গোমড়া করল। কৃত্রিম অভিমানী সুরে বলল,

“তোমার মুখে এই ‘ভাই’ ডাকটা শুনতে একটুও ভাল্লাগে না।”
বেলী স্বভাবসুলভ মিষ্টি হেসে জবাব দিল,

“কেন লাগবে না? তুমি তো আমার নিজের ভাইয়ের মতোই।”
“নিজের ভাই তো আর না!”

আদনান একটু থমকে দাঁড়িয়ে সরাসরি বেলীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“নাম ধরে ডাকলেই বোধহয় বেশি খুশি হতাম।”

বেলী আর কথা বাড়াল না, শুধু একটু হেসে তাকে ভেতরে আসার তাগিদ দিল,

“আচ্ছা আচ্ছা, অনেক হয়েছে। আগে ভেতরে এসে বসো তো।”
আদনান ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই চার বছরের চঞ্চল ফিওনা এক দৌড়ে এসে ‘মামা!’ বলে আদনানের গলা জড়িয়ে ধরল। আদনান ফিওনাকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে একটা চুমু খেল। তারপর ফিওনার গাল টেনে দিয়ে বলল,

“তুই আমাকে ‘কাকু’ বা আংকেল বললেও তো পারিস রে ফিওনা? তোর এই মা-ই তোকে জোর করে ‘মামা’ বলা শিখিয়েছে, তাই না?”

ফিওনা আদনানের কোল ঘেঁষে খিলখিল করে হেসে উঠল। বেলী রান্নাঘর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে আসতে আসতে বলল,

“তোমাকে আমি যদি ‘ভাই’ বলে ডাকি, তবে সম্পর্কে ও তো তোমাকে ‘মামা’ই বলবে। নাকি অন্য কিছু বলবে?”

আদনান পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে হেসে বলল,

“তোমার যুক্তির সাথে কি আর কেউ কোনোদিন পেরেছে? তোমার সাথে কথায় জেতা অসম্ভব।”

একটু গম্ভীর হয়ে আদনান আসল কথায় এল,

“আসলে একটা বিশেষ দরকারি খবর নিয়ে এসেছি। মাহির বিয়ে! এই নাও বিয়ের কার্ড। মাহি জোর করে বলে দিয়েছে, তুমি যেন কোনোভাবেই মিস না করো। যেতে হবে কিন্তু।”

বেলী বেশ অবাক হয়ে কার্ডটা হাতে নিল। মাহি তো সেদিনও ছোট ছিল! সে পড়াতে যেতো মেয়েটাকে। যদিও ছয় মাসের বেশি পড়ায়নি৷ কুলসুম বেগমের কটু কথা শুনে আর ইচ্ছে হয়নি বেলীর। সে বিস্ময় ভরা গলায় বলল,
”এত দ্রুত মাহির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে? ও তো ছোটো!”

আদনান সোফায় হেলান দিয়ে বলল,

“আর দ্রুত কই? এবার উচ্চ মাধ্যমিকে উঠেছে, বয়স আঠারো পার হয়ে গেছে। তাই আর দেরি করতে চাইলাম না। তুমি তো জানোই বস্তির পরিবেশ কেমন! রোজ রোজ যেভাবে সম্বন্ধ আসছিল, কত আর না করা যায়? তাই ভালো একটা ঘর পেয়ে মা আর হাতছাড়া করেনি, রাজি হয়ে গেছে।”

বেলী কার্ডটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,

“তা পাত্রের খোঁজখবর কেমন? ছেলে কী করে?”

আদনান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“ছেলে খুবই ভালো। একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।”

বেলীর মুখেও একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
“বাহ্! তাহলে তো বেশ শিক্ষিত মানুষ। মাহির জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!”

আদনান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,

“হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই মা আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। বোনটা আমার সুখে থাকবে।”

মাহির বিয়ের কার্ডটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বেলী একটু রহস্যময় হাসি হাসল। আদনানের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,

“তা বোনের বিয়ে তো দিয়ে দিচ্ছ। দেখতে দেখতে তো সবারই বিয়েশাদি হয়ে যাচ্ছে, আয়েশাও পার হয়ে গেল। এবার নিজের কথা কিছু ভাবো। তুমি কবে বিয়ে করছ আদনান?”

বেলীর এই আচমকা প্রশ্নে আদনান যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। হাতের পানির গ্লাসটা সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রেখে সে চুপ করে রইল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক গভীর নীরবতা নেমে এল, যেন বুকের ভেতরের কোনো সুপ্ত কথা সে ঠোঁটের ডগায় এনেও আটকে রাখলো। আদনানকে এভাবে নীরব থাকতে দেখে বেলী সোফায় একটু এগিয়ে বসল। বড় আপার মতো স্নেহের সুরে বলল,

“কী হলো, চুপ করে আছো কেন? মনে মনে কাউকে পছন্দ করেছ নাকি? যদি কাউকে ভালোবেসে থাকো, তবে নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারো। আমি নিজে গিয়ে খালাম্মার সাথে কথা বলব।”

আদনান এবার সোজা হয়ে বসল। বেলীর চোখের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো—সেই দৃষ্টিতে কোনো লুকোচুরি ছিল না। একটু গভীর শ্বাস নিয়ে আদনান বলল,

“হ্যাঁ মনে মনে একজনকেই চেয়ে এসেছি। এতদিন পরিস্থিতির কারণে, সময়ের অভাবে কিছু বলতে পারিনি। তবে তুমি ঠিকই বলেছ, এখন বোধহয় সময় এসেছে সবকিছু বলে দেওয়ার। খুব শীঘ্রই তাকে মনের কথাটা বলে দেব।”

আদনানের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বেলী কতটা বুঝতে পারল তা জানা গেল না, তবে সে বেশ খুশি হয়ে বলল,

“বাহ্! এটা তো খুব ভালো খবর। তা মেয়েটি কে? আমি কি তাকে চিনি?”

আদনান একটু ম্লান হেসে ফিওনার দিকে তাকাল, যে তখনো আদনানের ঘড়ির চেইনটা নিয়ে খেলছিল। আদনান অস্ফুট স্বরে বলল,

“নিজেকে নিজের চেয়ে ভালো আর কে চিনতে পারে?”

#চলবে

বেলীফুলের ইতিকথা পর্ব-২০+২১

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২০)
#মীরাতুল_নিহা

আইনি নোটিশটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই ফারহানের মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কিছু তাকে পিষে ফেলছে। বুকের ভেতরটা এমনভাবে চেপে ধরছিল যে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। খোলা হাওয়ায় একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য সে ক্রাচে ভর দিয়ে অতি কষ্টে ঘরের বাইরে বের হলো। কিন্তু বাইরে বের হয়ে সে যা দেখল, তাতে তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বস্তির সেই চিপা গলির মোড়ে একটা ছায়ামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দুজন। একটি মেয়ে একটি ছেলেকে বেশ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে। ছেলেটির মুখ দেখা না গেলেও মেয়েটিকে চিনতে ফারহানের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এ যে তার বর্তমান স্ত্রী তৃষ্ণা! দিনে-দুপুরে সবার চোখের আড়ালে এ কী লীলা শুরু করেছে সে?
ফারহানের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। যে তৃষ্ণার জন্য সে তার দুধের শিশু আর সতী সাধ্বী স্ত্রীকে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণা আজ অন্য পুরুষের বুকে! রাগে-ঘৃণায় কাঁপতে কাঁপতে ফারহান সেখানে গিয়ে হাজির হলো। ফারহানকে হঠাৎ সামনে দেখে তৃষ্ণা ভড়কে গিয়ে ছিটকে সরে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আমতা আমতা করে সে বলল,

“তু… তুমি? তুমি তো বাথরুমেও একা যাইতে পারো না, বাইরে কেমনে আসলা?”

ফারহান দাঁতে দাঁত চিপে বলল,

“এসেছি বলেই তো নিজের চোখে তোমার এই নোংরামি দেখতে পারলাম! কে এই লোক? জবাব দাও!”

তৃষ্ণা নিজেকে সামলে নিয়ে ফারহানকে ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি ঘরে যাও তো! এখানে সিনক্রিয়েট করবা না।”

তখনি ওই অচেনা লোকটা তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“তৃষ্ণা, এই ল্যাংড়া লোকটা আবার কে?”

তৃষ্ণা এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে নির্লজ্জের মতো লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আরে না না, এইটা আমার এক দূর সম্পর্কের ভাই। গ্রাম থেকে আসছে চিকিৎসা করাইতে। তুমি এখন যাও তো, পরে কথা কমুনে।”

ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের কানে যা শুনল তা যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বৈধ স্বামীকে সে আজ এক নিমেষে পরকীয়া প্রেমিকের কাছে ‘ভাই’ বানিয়ে দিল? ছিঃ! মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে!
তৃষ্ণা দ্রুত ছেলেটিকে বিদায় করে দিয়ে দিলো
আশপাশে লোকজন উঁকিঝুঁকি মারছে দেখে সে আর সেখানে দাঁড়াল না। ফুঁসতে ফুঁসতে ভেতরে ঢুকলো।
ফারহানও টলতে টলতে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তার সারা শরীর ঘামছে। ঘরে ঢুকতেই ফারহান চিৎকার করে উঠল,

”তৃষ্ণা! তুমি আমাকে তোমার প্রেমিকের কাছে ভাই পরিচয় দিলা? বিছানায় যার সাথে শোও তাকে বলো ভাই? তোমার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নাই?”

তৃষ্ণা তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের ওড়না ঠিক করছিল। গালে তখন ফারহানের দেওয়া চড়ের লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে! টেবিলের ওপর পড়ে থাকা হলদে খামটা ছোঁ মেরে তুলে নিল। ভেতরে থাকা আইনি নোটিশটা দ্রুত পড়ে তার মুখটা বাঁকা হয়ে গেল।
তৃষ্ণা বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,

“নোটিশ আইছে তোমার নামে? তোমার সেই ‘সতী’ বউ তো দেখি চাল চালছে।”

ফারহান অবসন্ন গলায় বলল,

“হ্যাঁ, বেলী পাঠাইছে। দুই লাখ টাকা দেনমোহর দাবি করছে ফিওনার ভরনপোষণ সহ। সময় দিছে পনেরো দিন। টাকা না দিলে জেল-জরিমানা সব হইব, কাগজে তো তাই লেখা।”
তৃষ্ণা শব্দ করে হেসে উঠল,

“দুই লাখ টাকা! পকেটে দুই পয়সা নাই আর দেনমোহর দিবা দুই লাখ? জেলে যাওয়াই তোমার কপালে আছে ফারহান।”

ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল।

“ভাগ্যে যা আছে তা-ই হইব। এর চেয়ে বেশি আর কী হইতে পারে?”
তৃষ্ণা তার সাজগোজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিতে নিতে কর্কশ গলায় বলল,
“তোমার ভাগ্যে যা আছে হউক, আমার ভাগ্য আমি তোমার লগে নষ্ট করুম না।”

ফারহান এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।

“ভাগ্য আর নষ্ট করবা কী? দিব্যি স্বামী থাকতে পরকীয়া চালাইয়া যাইতেছ, মানুষের কাছে স্বামী পরিচয় দিতে লজ্জা পাও—ভাগ্য তো তুমি অনেক আগেই নষ্ট করছ।”
তৃষ্ণা এবার বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল।

“মুখ সামলাইয়া কথা কও ফারহান! পরকীয়া করি তো তোমার কী? তুমি যখন দুধের বাচ্চা আর বউ থাকতে আমার লগে প্রেম করছো, বিয়া করছো—তখন তোমার চরিত্র কই আছিল? নিজেরে অনেক বড় সতী মনে হইতাছে নাকি? আমারে ছিঃ দাও কোন মুখে?”
ফারহানের মুখে আর কোনো কথা সরল না। তবে ফারহান সে জায়গায় দাঁড়িয়েই সজোরে তৃষ্ণার গালে চড় বসালো! তৃষ্ণা গালে হাত দিয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে।

“শালার ল্যংড়া! তুই আমার গায়ে তুললি? দেখ এর ফল কি হয়! তোর সাথে যে আছি এডাই তো তোর সাত কপালের ভাগ্য! কদর না কইরা উল্টা মারলি তো? লাথি মারি তোর মতন ল্যাংড়ারে!”

তৃষ্ণা গটগট করে আলমারি খুলে নিজের কাপড়চোপড় বের করতে লাগল। ফারহান বলল,

“কাপড় কেন বের করতাছো? কোথায় যাও তুমি?”

তৃষ্ণা ব্যাগে কাপড় ঠাসতে ঠাসতে বলল,

“যাইতাছি মানে চইলাই যাইতাছি। তোমার এই পচা ঘরে পইড়া থাকার শখ আমার নাই।”

ফারহান স্তব্ধ হয়ে বলল,

“সুখের সময় পাশে থাকতে পারলা, আর আজ আমার এই দুঃখের দিনে পাশে থাকবা না? তোমার কথা শুইনাই তো আমি বেলীরে তালাক দিছি। আমার সব শেষ করছি তোমার জন্য।”

তৃষ্ণা এবার আঙুল উঁচিয়ে নির্লজ্জের মতো বলল,

“তালাক দিছো তো আমার কী? তুমি আমারে সুখের আশা দিছিলা। এখন না পারো বিছানায় সুখ দিতে, না পারো টাকা-পয়সার সুখ দিতে। শরীরটাও গেছে, পকেটও খালি—উপরে আবার পুলিশের ভয়। জেলেও যাইবা। তোমার লগে থাকলে আমিও না ফেঁসে যাই! আবার আজকে আমার গায়ে হাতও তোলা হিছেঁ কোন দুঃখে তোমার লগে থাকুম? আমি চললাম আমার পথে।”
ফারহানের দুচোখ বেয়ে তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তৃষ্ণা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার আগে থমকে দাঁড়াল। তাচ্ছিল্য ভরে বলল,

“ভাগ্যিস কবুল পইড়া বিয়া করছিলাম শুধু, কোনো কাবিন করি নাই। শোন, তুই এখনই আমারে ‘তালাক’ দিয়া মুক্ত কর। আমি আমার প্রেমিকের কাছে চইলা যাইতাছি।”
ফারহান যেন জীবন্ত লাশে পরিণত হলো। তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল। এই তৃষ্ণার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল ফোনের মাধ্যমে। দিনগুলোতে যখন ফিওনা রাতে কাঁদত, বেলী বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত ফারহানের তখন ঘুম ভেঙে মেজাজ খারাপ হতো। সেই বিরক্তির মাঝেই সে মোবাইল হাতে নিত। এক রাতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তৃষ্ণার সাথে কথা শুরু। ধীরে ধীরে সেই মায়াবী কণ্ঠ আর ফোনের স্ক্রিনে দেখা তৃষ্ণার সৌন্দর্যে সে এমনভাবে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে নিজের সাজানো সংসারটাকে তুচ্ছ মনে হয়েছিল। তৃষ্ণা বলেছিল তার মা ছাড়া দুনিয়ায় কেউ নেই, সে খুব অসহায়। ফারহান ভেবেছিল তাকে বিয়ে করে সে উদ্ধার করছে, তাকে খুব ভালোবাসে। অথচ আজ সব স্পষ্ট। তৃষ্ণা তাকে ভালোবেসেনি, ভালোবেসেছিল তার সক্ষমতা আর টাকাকে। আজ ফারহান যখন সব হারিয়ে নিঃস্ব, তখন সেই ‘অসহায়’ তৃষ্ণা তাকে পঙ্গু অবস্থায় মাঝপথে ফেলে চলে যাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, বেলীর সাথে সংসার চলাকালীনই ফারহান তৃষ্ণার সাথে ফোনে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। গভীর রাতে যখন শ্রান্ত বেলী ফিওনাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, ফারহান তখন ফোনের ওপাশে তৃষ্ণার মায়াবী জালে বন্দি হতো। সেই ফোন থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক গড়ায় সামনাসামনি দেখায়, আর তারপর শরীরি লেনাদেনায়। তৃষ্ণা মূলত সেই বিছানার সুখেই ধরা দিয়েছিল। ফারহানের সক্ষমতা আর পকেটের টাকা তখন তাকে অন্ধ করে রেখেছিল।
কিন্তু আজ ভাগ্য বিড়ম্বনায় ফারহান পঙ্গু। শরীরে সেই তেজ নেই, পকেটে সেই জোর নেই। না শারীরিক, না মানসিক—কোনোভাবেই তৃষ্ণাকে সুখী করার ক্ষমতা এখন আর তার নেই। ডাক্তার বলেছে এই পা স্বাভাবিক হতে বহু সময় লাগবে, আদৌ হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। তৃষ্ণা যে আগাগোড়াই স্বার্থপর ছিল, আজ বিপদের মুখে তা নগ্নভাবে প্রকাশ পেল।
তৃষ্ণা খাটে বসে শেষবারের মতো নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিচ্ছিল। ফারহান ক্রাচ সরিয়ে কোনোমতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে তৃষ্ণার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তৃষ্ণার পা জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলল,

“তৃষ্ণা, যেও না! এই অবস্থায় আমাকে ফেলে যেও না। রাগে একটা চড় না হয় দিছি। আমার বউ বাইরে পরকীয়া করছে আমার অসুস্থতার সুযোগে এটা আমি কেমনে মানব বলো? একটু বুঝার চেষ্টা করো। সব বাদ দিয়ে সংসারে মনোযোগ দাও। আমি তো তোমাকে খুব ভালোবাসি তাই না বলো?”

“আর আমি যে তোর বউরে মাইনা নিছি? সতীন নিয়ে সংসার করছি ওইডা কই যাইব? সব বাদ। তোর সাথে থাইকা আমি আমার ভবিষ্যৎ জীবন যৌবন নষ্ট করতে পারমু না। আমি বুঝে গেছি তুই আমারে টাকা না শারীরিক সুখ কোনোটাই দিতে পারবি না আর। সুখ না পাইলে কেন থাকমু ক? আমার দাম আছে। আমি তোর মতন ল্যাংড়া বা অক্ষম না!”

ফারহান এবার আকুতিভরা কন্ঠে বলল,

“তুমি তো জানো, এই দুনিয়ায় এখন আমার আর কেউ নেই। আমি কার কাছে থাকব?”

তৃষ্ণা এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হলো না। সে পা ঝামটা মেরে ফারহানের হাত সরিয়ে দিল, যেন কোনো নোংরা আবর্জনা তাকে স্পর্শ করেছে। ব্যাগটা শক্ত করে হাতে তুলে নিয়ে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

“শোন ফারহান, পরিষ্কার কথা—বিছানায়ও সুখ নেই, টাকা-পয়সার সুখও দিতে পারছো না। তোমার কাছে থাকা মানে জীবন্ত মরে থাকা। এমনিতেই টাকার জন্য জেলে যাইবা, তখন তো আমি এমনিতেও একা হয়ে যামু। যামুই যখন, তবে আগেভাগেই যাই। না হয় সুদীপ্ত হাতছাড়া হয়ে যাবে। ও আমার জন্য মোড়ে অপেক্ষা করছে। ভাবছিলাম তোর লগে থাকমু একসময় তো অনেক সুখ দিছো। সুস্থ হইলে তো হইছেই। মাঝখানে দুই চারটা প্রেম করলেও করতাম! কিন্তু এখন যা দেখলাম তুই তো যাবি পুলিশে! সব অন্ধকার! ভালোই হইছে এতদিন লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলাম। এখন সবটা জানলি তো? গেলাম আমি। আমার আশা আর করবি না। যা সর ল্যাঙড়া কোনখানের!”

ফারহানের মুখে আর কোনো শব্দ সরল না। ফারহানের বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে তৃষ্ণার জন্য সে তার ফুটফুটে মেয়েটার ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণা আজ তাকে ভয় দেখিয়ে অন্য পুরুষের হাত ধরতে দ্বিধা করল না।
তৃষ্ণা আর পেছন ফিরে তাকাল না। দামি পারফিউমের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে সে ফারহানের সামনে দিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারহান মেঝের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। সে ঝাপসা চোখে দেখল তার সাজানো স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ। তার চোখের সামনে নিজের পরিণতি আজ স্পষ্ট। যে মিথ্যে আনন্দের মোহে সে নিজের ঘর ভেঙেছিল, সেই মোহ আজ তাকে পথের ভিখারি বানিয়ে দিয়ে গেল। একেই কি তবে বলে প্রকৃতির বিচার?

#চলবে

#বেলীফুলের_ইতিকথা (২১)
#মীরাতুল_নিহা

সকাল সকাল তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে বেলী টিউশনি শেষ করে ফিরল। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, কিন্তু বসার জো নেই। তাড়াহুড়ো করে দুমুঠো খেয়ে ফিওনাকে দেখেই সে ছুটল কুরিয়ার অফিসের দিকে। আজ বেশ কয়েকটা পার্সেল রিটার্ন এসেছে। অনলাইনে কাজ করা দেখতে সহজ মনে হলেও ঝামেলা কম নয় কেউ ঠিকানা ভুল লেখে, কেউ আবার পার্সেল রিসিভ করে না। ডেলিভারি ম্যানের ফোন তুলে না! এই রোদের মধ্যে বারবার কুরিয়ার অফিসে দৌড়ানো বেলীর জন্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।এদিকে আয়েশার আজ ছুটি। সে ঘরে ফিওনাকে নিয়ে মেতে আছে। একটা ছোট প্লাস্টিকের বল নিয়ে দুজনে খেলছিল। হঠাৎ বলটা ফিওনার গায়ে একটু জোরে লাগতেই মেয়েটা ‘উউ’ করে শব্দ করে উঠল। ফিওনার মাড়িতে নতুন একটা ছোট দাঁত গজিয়েছে। সেই ছোট্ট সাদা দাঁতটুকু দেখিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে সে এমনভাবে কান্না শুরু করল যে আয়েশার দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আয়েশা খুব আবেগী হয়ে সেই দৃশ্যটা কিছুক্ষণ দেখল। ফিওনা কাঁদলে ওকে একদম বেলীর মতো লাগে। কি আদুরে মিষ্টি বাচ্চা! বেলী কড়া করে বলে দিয়েছে, ফিওনার সামনে যেন আয়েশা আঞ্চলিক বা অশুদ্ধ ভাষায় কথা না বলে। সে চায় তার মেয়ে বড় হয়ে সুন্দর এবং শুদ্ধ ভাষায় কথা বলুক। আয়েশা তাই খুব যত্ন করে শুদ্ধ ভাষায় ফিওনাকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল,

“ও আমার সোনা মা, একদম কাঁদে না। এই দেখো বলটা পচা, বলটাকে আমি বকে দিয়েছি। আর কাঁদবে না কিন্তু!”

আয়েশার সোহাগে ফিওনা চোখের জল মুছে আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। একই সময়ে বস্তির মোড়ে ভাঙা পায়ে ক্রাচে ভর দিয়ে অতি কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ফারহান। শরীরের ভারসাম্য রাখা তার জন্য দায় হয়ে পড়েছে, তবুও সে আজ বেরিয়েছে একটা বিশেষ খোঁজে। আদনানদের ঘরের কাছে আসতেই দেখল একদল মহিলার জটলা। আদনানের মা কুলসুম বেগম পানের পিক ফেলে তীক্ষ্ণ নজরে ফারহানকে দেখলেন। কুলসুম বেগম কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কী গো ফারহান? এই ভাঙা পা নিয়া রোদের মধ্যে কই যাইতে লাফালাফি করতাছো?”

ফারহান কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“চাচি, আদনান কি ঘরে আছে? ওর সাথে খুব দরকার আছিল।”
কুলসুম বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,

“না, আদনান ঘরে নাই। কামে গেছে। তা তোমার বউ আমার পোলারে খাটায় মারে। কিছু হইলেই পোলা আমার বেলীর কাছে ছুট লাগায়। এটা দেয় ওটা দেয় বাপরে! আবার তোমার কি দরকার শুনি?”

ফারহান ইতস্তত করে বলল,
“চাচি, আদনান তো জানবে বেলী কোথায় বাসা নিয়েছে। ওর সাথে আমার একটু কথা আছিল। আমি তো কিছুই জানি না ও কই থাকে।”

কুলসুম বেগম একটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললেন,

“হায়রে কপাল! নিজের বউ-বাচ্চা কই থাকে সেই খবর রাখারও মুরোদ নাই? বস্তি থেইকা মাত্র দশ মিনিটের পথ দূরে বেলী থাকে, অথচ তুমি এই পা নিয়া সারা দুনিয়া খুঁজতাছো। কেন গো, এখন মাথা কি ঠিক নাই?”
ফারহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এতটা কাছেই থাকে বেলী? এই রোদে ক্রাচে ভর দিয়ে পরগাছার মতো অন্যদের দ্বারে দ্বারে বেলীর ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে। অথচ সে জানতও না, তার খুব কাছেই বেলী তার নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলেছে।

কুলসুম বেগম পানের বাটাটা গুছিয়ে ফারহানের দিকে বাঁকা চোখে তাকালেন। বিদ্রূপের স্বরে বললেন,

“ক্যান গো ফারহান? বেলীরে তো তালাক দিয়া বিদায় করছিলা, এখন আবার তারে খুঁইজা কী হইব?”

ফারহান মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল,

“চাচি, আমি ভুল বুঝতে পারছি। মানুষের তো ভুল হয়, আমারও হইছে। আমি বড় অন্যায় করছি বেলীর সাথে।”
ফারহানের মুখে অনুশোচনা দেখে কুলসুম বেগমের সুর হঠাৎ বদলে গেল। তিনি বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললেন,

“এই তো বুদ্ধিমানের মতো কথা কইলা! যাও, বউ-বাচ্চারে ফিরাইয়া আনো। বেলী হইলো একটা লক্ষ্মী সংসারী মাইয়া। তার মতো মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ঘরের লক্ষ্মী তাড়াইছো বইলাই তো আজ তোমার এই দশা, পঙ্গু হইয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাছো। যাও ঘরের লক্ষী ঘরে ফিরায় আনো।”

অথচ এই কুলসুম বেগমই আড়ালে আদনানকে বকাবকি করেন যেন সে বেলীর ছায়া মাড়াতে না যায়। তখন বেলী তার চোখে ‘অপয়া অলক্ষ্মী’, কিন্তু ফারহানের সামনে এখন তিনি বড় নীতিবান হয়ে উঠলেন। তিনি আরও যোগ করলেন,

“আইন-কানুন দিয়া তো আর ডিভোর্স হয় নাই। রাগের মাথায় ত্যাজ্য করছো তো কী হইছে? এখন ফিরাইয়া আনলেই সব ঠিক হইয়া যাইব।”

ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, মুখে যত সহজেই বলা যাক, বেলী তাকে ক্ষমা করবে না। এটুকু অন্তত চিনে। সেদিন সবাইকে সাক্ষী রেখে সে যেভাবে চিৎকার করে তালাক বলেছিল, সবাই জানে এখন বেলী আর তার বউ নেই। ঠিকানা জোগাড় করে ফারহান অতি কষ্টে ক্রাচে ভর দিয়ে সেই ছোট বাসাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিতরে তখন আয়েশা ব্যস্ত। সে চুলায় ফিওনার জন্য সুজি বসিয়ে নাড়ছে। আর ছোট্ট ফিওনা খেলতে খেলতে হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে দরজার সামনে চলে এসেছে। ফারহানের আর বাসা খুঁজতে হয়নি, গলির কাছে এসেই মেয়েকে দেখেই সে চিনে ফেলেছে। একটা ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটা দরজার চৌকাঠে হাত রেখে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে বাইরের লোকটার দিকে। ফিওনা তার বড় বড় চোখ জোড়া উঁচিয়ে দেখতে লাগল সামনে দাঁড়ানো আগন্তুককে। এই লোকটা যে তার নিজের বাবা, তা বোঝার মতো বয়স বা স্মৃতি কোনোটাই তার নেই। বাবার আদর সে কবেই বা পেয়েছে? অথচ কী আশ্চর্য! অচেনা লোকটাকে দেখেও ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, ফিওনা হুট করেই খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল। তার সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে ফারহান থমকে গেল। মেয়েটা হাসলে ঠিক বেলীর মতো লাগে। ফারহান অবাক হয়ে দেখল, বেলীর আদল যেন মেয়েটার সারা মুখে লেপটে আছে। তার মনে পড়ে গেল, ফিওনা জন্মের সময় বেলী কত আহ্লাদ করে

বলত— “দেখো তো ফারহান, মেয়ের চোখটা ঠিক তোমার মতো আর মুখটা আমার মতো হয়েছে না?”

ফারহান তখন শুনেও শোনেনি, বেলীর সেই খুশিতে সায় দেওয়ার মতো সময়ও তার ছিল না।
আজ সেই দৃশ্যগুলো লহমায় ফারহানের চোখের সামনে ভেসে উঠল। নিজের রক্তের সন্তান সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে, অথচ ফারহান আজ এতটাই অসহায় যে ক্রাচে ভর দিয়ে থাকা এই শরীরে মেয়েটাকে কোলে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। একটু আদর করার সাধ্য তার নেই! অপরাধবোধ আর হাহাকার মিলে ফারহানের ভেতরটা যেন দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তার নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে রইল, সে তার জন্মদাতা পিতা হলেও যার কাছে সে আজ এক জনম অচেনা মানুষ।

সুজির বাটি হাতে নিয়ে আয়েশা দরজার কাছে আসতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখল ফারহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিওনার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। আয়েশা এক মুহূর্ত দেরি না করে ছোঁ মেরে ফিওনাকে কোল তুলে নিল, যেন কোনো শিকারি চিলের হাত থেকে নিজের ছানাকে রক্ষা করল।
আয়েশা ফারহানের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। এ কোন ফারহান? সেই ফিটফাট, অহংকারী মানুষটার আজ কী হাল! মাথার চুল আর দাড়ি উশকোখুশকো হয়ে মুখটা ঢেকে ফেলেছে, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা হলো তার পা—ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পঙ্গু মানুষটাকে দেখে চেনা দায়।
আয়েশা ঘৃণা মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী চাই এখানে? ক্যান আইছেন?”

ফারহান ম্লান চোখে কোল থেকে নামতে চাওয়া ফিওনার দিকে তাকিয়ে থেকে ধরা গলায় বলল,

“আমি বেলীকে চাই। বেলী কোথায়?”

আয়েশার মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে চিৎকার করে বলল,

“ক্যান? নোটিশ পাইয়া এখন বেলীর কথা মনে পড়ছে? যখন ওই তৃষ্ণার কথায় বেলীরে আর দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাডারে এক কাপড়ে লাথি মাইরা ঘর থেকে বের কইরা দিছিলেন, তখন মন কই আছিল আপনার?”
ফারহান লজ্জায় আর অপমানে মাথা নিচু করে রইল। তার হাত কাঁপছে, ক্রাচটা বারবার পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,

“আমি বেলীর জন্য অপেক্ষা করব। ও কই গেছে?”

আয়েশা গর্জে উঠল,

“তা জানার কোনো অধিকার আপনের নাই। মুখ কালা কইরা এখন বিদায় হন, নাইলে চিল্লাইয়া লোক জড়ো করমু।”
ফারহান এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে দম্ভের ভাঙা দেয়াল আঁকড়ে ধরে বলল,

“আইনি মতে কিন্তু বেলী এখনো আমার বউ। ভুইলা যাইস না। তালাক এখনো কার্যকর হয় নাই। আমি আমার বউকে নিয়ে যেতে পারি।”

“আপনার বউ তৃষ্ণাকে এইমাত্র মোড়ের মাথায় অন্য এক লোকের সাথে রিকশায় চড়তে দেখে এসেছি। সেখানে যান। ভুল রাস্তায় এসেছেন কেন?”

পেছন থেকে আসা বেলীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে ফারহান আর আয়েশা দুজনেই চমকে উঠল। বেলী কুরিয়ার অফিস থেকে ফিরে এসেছে। তার হাতে কয়েকটা খাম। চোখেমুখে বিরক্তির রেখা।
ফারহান কাঁপাকাঁপা হাত দুটো ক্রাচ থেকে কোনোমতে আলগা করে জোর করে এক করার চেষ্টা করল। সে আর্তনাদ করে বলল,

“বেলী, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল করেছি। আমি এখন পঙ্গু, আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বেলী। আমি তোমাদের নিতে এসেছি। তুমি আমার মেয়ে তোমরাই এখন আমার শেষ ভরসা।”

#চলবে?