বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 21



গোলকধাঁধা পর্ব-০৩

#গোলকধাঁধা
#পর্ব৩
#রাউফুন
ডাইনিং টেবিলের সেই মুহূর্তের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক শতাব্দীর ভারী হয়ে নেমে এল। ইফশির সেই অকস্মাৎ স্বীকারোক্তি আর লামিয়ার দিকে তাকানো শীতল দৃষ্টিতে পুরো ঘর কাঁপছে। লিলি বেগম এবং রুকন শিকদার যেন কী শুনলেন তা বুঝে ওঠার আগেই ইফশি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বরে এবার আর কোনো দ্বিধা নেই, আছে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। ইফশি সরাসরি লামিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল,”প্রেগন্যান্ট তুমি তার দায় আমি কেন নেবো? পাপ করেছো তুমি, পাপের ফল তোমার, আমি তার দায়ভার নেবো ভাবলে ক্যামন করে? একটা বাস্টার্ড চাইল্ড আমার পরিচয়ে বড়ো হতে পারে না। কখনোই না।”

লামিয়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল ইফশি তার পাতা ছকে পা দেবে, কিন্তু ইফশি উল্টো মোড় ঘুরিয়ে দিল। রুকন শিকদার টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে উঠলেন, “এসব কী নাটক হচ্ছে? ইফশি, তুমি কী বলছ এসব? এই লামিয়া কি হচ্ছে এসব?”

ইফশি এবার নিজের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে স্পিকারে দিয়ে রিং দিল। ওপাশ থেকে কিয়ারার কন্ঠ ভেসে এল। ইফশি শান্ত গলায় বলল, “কিয়ারা, নিয়ে আয়।”

ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ইফশির বান্ধবী কিয়ারা। তার এক হাতে ফোন, আর অন্য হাতে সে টানতে টানতে নিয়ে এল এক টগবগে যুবককে। ছেলেটার চুল উস্কোখুস্কো, পরনের শার্টে ধুলোবালি, মনে হচ্ছে তাকে মেরে, টেনেহিঁচড়ে এনেছে এখানে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু কিয়ারার দৃঢ় মুষ্ঠি থেকে তার নিস্তার নেই। ছেলেটাকে দেখে লামিয়া রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। লিলি বেগম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “এই ছেলেটা কে? লামিয়া, এই ছেলে কে?”

কিয়ারা ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়ে রুকন শিকদারের পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে বলল, “এই সেই নবাবজাদা, যে আপনাদের আদরের মেয়ের ‘প্রেগন্যান্সির’ আসল কারিগর!”

রুকন শিকদারের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “লামিয়া! তুই কি এই বিষয়ে কোনো কিছু বলতে চাস?”

লামিয়া ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ল। ইফশি এগোতে এগোতে বলল, “মা, আপনি বলছিলেন না আমি কালো জাদু করেছি? দেখুন, এই হলো আপনার মেয়েকে কালো জাদুর ফল, আপনার মেয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। আর আপনার ছেলে, আমার স্বামী রঞ্জন, সে কিন্তু এসব জানত না। আর আজকে সে আমাকে মা’রেনি, সে আমাকে মা’রার নাটক করছিল কেবল আপনাদের সন্তুষ্ট করতে! কথাটা এখন বললাম, কারণ আপনার মনটা আরও একটু ভেঙে দিতে মন চাইলো।”

রঞ্জন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে এবার রাগে ফেটে পড়ে লামিয়ার দিকে এগিয়ে এল। রঞ্জন গর্জে উঠল, “নিজের কৃতকর্মের দায়ভার ভাইয়ের বউয়ের ওপর? এত বড় সাহস তুই পেলি কোথায়?”

ইফশি পকেট থেকে একটা ছোট্ট ফাইল বের করল। তাতে সেই বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লামিয়ার গোপন কথোপকথনের স্ক্রিনশট এবং হাসপাতালের ফেইক রিপোর্টের কপি। ইফশি তা সবার সামনে ছুড়ে দিয়ে বলল, “আজ আর কোনো মিথ্যে নয়। আপনার মেয়েকে আজই এই ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে, নইলে এই খবর পাড়ার মানুষের মুখে পৌঁছাতে সময় লাগবে না।”

লিলি বেগম যেন পাথর হয়ে গেছেন। তিনি নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, “একি করলি তুই লামিয়া!”

ইফশি কিয়ারাকে ইশারা করতেই সে একটি কাজী অফিসের পরিচিত লোককে ঘরে ঢুকিয়ে দিল। কাজী সাহেব সব শুনে নিয়ে রুকন শিকদারের দিকে তাকালেন। রুকন শিকদার পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে কাঁপা গলায় বললেন, “বিয়ে… বিয়ে এখনই হবে।”

লামিয়া মেঝেতে বসে অঝোরে কাঁদছে। তার প্রেমিকের চোখেমুখে তখন পরাজয়ের গ্লানি। ইফশি দাঁড়িয়ে দেখল, যে মিথ্যে পাহাড় তাকে দমবন্ধ করে মারতে চেয়েছিল, তা আজ নিজের ভারেই ভেঙে পড়ছে। সে রঞ্জনের হাতটা শক্ত করে ধরল। রঞ্জন তখনো ঘোরে।
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর যখন সবাই স্থির হয়ে বসল, রুকন সাহেব কুঁকড়ে যাওয়া কণ্ঠে বললেন, “আজ থেকে এই বাড়িতে এরা থাকবে না। লামিয়া আর ওর বর কালই বিদায় হবে।”

ইফশি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। সে মুচকি হেসে রঞ্জনের দিকে তাকাল। রঞ্জন ফিসফিস করে বলল, “তুমি অসাধারণ ইফশি। কীভাবে করলে?”

ইফশি রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “যে মিথ্যে দিয়ে মানুষ ঘর বানাতে চায়, সেই মিথ্যের ভিত্তি বালুর চেয়েও দুর্বল হয়।”

পুরো বাড়িতে এখন এক বিষাদময় পরিবেশ। লিলি বেগম স্তব্ধ হয়ে সোফায় বসে আছেন। লামিয়া কাঁদছে নিজের কপালে হাত রেখে। ইফশি জানে, এই ঘটনার পর তাকে আর শাশুড়ির অপবাদ সহ্য করতে হবে না। কিন্তু সামনে নতুন এক লড়াই অপেক্ষা করছে। ইফশি কি এখন রঞ্জনকে নিয়ে আমেরিকা পাড়ি জমাতে পারবে? নাকি এই পরিবারের কলঙ্ক এখনো তাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে?

নিঝুম রাত। রুকন শিকদারের ড্রয়িং রুমে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। কিন্তু ড্রয়িং রুমের পাশের ছোট ঘরটিতে লিমনের কণ্ঠস্বর যেন আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো ফেটে পড়ছে। লামিয়া মেঝেতে বসে অঝোরে কাঁদছে, তার চোখের জল যেন ফুরোবার নয়। এই বিয়েটা লামিয়ার জন্য কোনো মতেই প্রত্যাশিত ছিল না। সে তো চেয়েছিল ইফশির কাঁধে বন্দুক রেখে নিজের ভবিষ্যৎ গোছাতে। অথচ আজ সেই ইফশির বুদ্ধির কাছেই সে পুরোপুরি ধরাশায়ী। লিমনের দিকে তাকিয়ে লামিয়ার মনে হচ্ছে, এ যেন কোনো এক দুঃস্বপ্ন। লিমনের দরিদ্র পরিচয় আর তার কঠোর রূপ লামিয়াকে ভেতর থেকে চুরমার করে দিচ্ছে।
লামিয়া রাগে আর অভিমানে ফুঁসে উঠে লিমনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,”আমি তোকে কখনোই বিয়ে করতে চাইনি, তোকে আমি বলেছিলাম না এলাকা ছাড়বি, এই কুত্তা, তোর এতো লোভ কেন?”

লিমন এক পা এগিয়ে এসে লামিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখে এখন আর আগের মতো প্রেম নেই, আছে কেবল এক গভীর ঘৃণার ছাপ। লিমন ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে পাল্টা জবাব দিল,
“আমার লোভ? যখন জানতে আমি কোটিপতির ছেলে, তখন তো আমার বিছানায় যেতে একবারও ভাবোনি। ভেবেছিলে টাকার বিছানায় ঘুমাবে, টাকার লোভ তোমার এতোটাই যে এক কথায় রুমডেটে যেতে রাজি হয়ে গেলে৷ আমি তো তোমাকে জাষ্ট পরীক্ষা করতেই রুমডেটের অফার দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি এমনই নিকৃষ্ট লোভী মেয়ে যে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে নিজেকে বিলিয়ে দিলে। তো আমি সবে যুবক হয়েছি, আমার উপর কোনো মেয়ে ঝাপিয়ে পড়লে আমি নিজেকে সামলাবো কিভাবে? তবুও আমি বাঁধা দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমিই শোনো নি। এসেছে আমাকে জ্ঞান দিতে।”

লামিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে যেন। সে কি জানত না লিমন এমন কথা বলবে? লিমন তার টাকার গরম, তার ধুরন্ধর বুদ্ধির প্রয়োগ আজ এমনভাবে করেছে যে লামিয়া নিজের অস্তিত্বের ওপরই প্রশ্ন তুলে ফেলেছে। লামিয়া কান্নার দমক চেপে অস্ফুট স্বরে বলল,”তো তুই যে আমাকে ঠকিয়েছিস, বলেছিস তুই বড়োলোক তার বেলায়?”

লিমন এক মুহূর্তের জন্য জানালার দিকে তাকাল। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”ভুল বলিনি, এটাও একটা পরীক্ষা ছিলো যে, আমি গরীব জানার পর তুমি কি করো। আসলে তুমি আমায় কখনোই ভালোইবাসো নি। বেসেছো আমার টাকাকে। তোমার ধারণা ওসব দামী দামী গিফট হাওয়া থেকে উড়ে আসতো?”

লামিয়া লিমনের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার সমস্ত জেদ যেন মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল, “তুমি আমার সঙ্গে এমন কেন করলে?”

লিমন ঘরজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। তার মনের ভেতর বয়ে যাচ্ছে এক তুমুল অস্থিরতা। সে তার জীবনের প্রথম ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসার বিসর্জন নিয়ে আজ বড়ই তিক্ত। লিমন নিগূঢ় শ্বাস ফেলে বলল,”আমার বন্ধুরা সবাই আমাকে বলেছিলো, তুমি ভালো মেয়ে নও। এর আগেও তুমি আরও সম্পর্ক করেছো। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি, আমার প্রথম ভালোবাসা ছিলে তুমি। তোমার ফাঁদে পা দেওয়াই সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো আমার। তুমি শুনে রাখো আমার কথা, বাচ্চাটা হলেই আমি তাকে নিয়ে চলে যাবো। এই বাচ্চাটাকে আমি আমার পরিচয়ে বড়ো করবো, তুমি তার ছাঁয়াও দেখতে পাবে না। আমি জানি আমি ভুল করেছি, এই ভুলের মাসুল হিসেবেই তোমাকে আমি বিয়ে করেছি। তোমাকে আমি ডিভোর্স ও দেবো না, অন্য কাউকে বিয়েও করতে দেবো না আর না তুমি আমাকে পাবে।”

কথাগুলো বলেই লিমন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে লিমনের এই কঠোর রূপ, তার কণ্ঠের শীতলতা লামিয়াকে যেন পাথরের মতো জমে যেতে বাধ্য করল। লিমন হনহনিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
দরজার বাইরে ইফশি দাঁড়িয়েছিল। সে সব শুনছিল। ইফশি মনে মনে ভাবল, লিমনের এই রুক্ষ স্বভাবের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর ক্ষত আছে। আর লামিয়া? লামিয়া আজ নিজের জালেই নিজে আটকে গেল। ইফশি বুঝতে পারছে, লামিয়ার জীবনের গোলকধাঁধাটা এখন আর কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপের রূপ নিয়েছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ইফশি ড্রয়িং রুমে রঞ্জনের কাছে গিয়ে বসল। রঞ্জন চুপচাপ বসে আছে। পুরো বাড়িটা যেন এক অদ্ভুত আতঙ্কের মাঝে নিমজ্জিত। রঞ্জন নিচু গলায় ইফশিকে বলল, “তুমি কি মনে করো লামিয়া এই শাস্তির যোগ্য?”

ইফশি রঞ্জনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। সে কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, এই বাড়িতে শান্তি ফেরার কোনো পথ আর খোলা নেই। লিলি বেগম কিচেনে বসে কাঁদছেন, রুকন সাহেব নিজের ঘরে দরজা আটকে বসে আছেন। আর ইফশি? সে তো কেবল নিজের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে আজ এই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে।
ইফশি ভাবছে সেই কদিন আগের কথা। লামিয়া যখন তাকে প্রথম বলেছিল সে প্রেগন্যান্ট, ইফশি তাকে সন্দেহ করেছিল ঠিকই, কিন্তু সে বুঝতে পারেনি লামিয়া এতটা নিচে নামবে। আজ সব ফাঁস হওয়ার পর ইফশির মনে হচ্ছে, সে যেন এক বিশাল যুদ্ধ জয় করেছে। কিন্তু এই জয় কি তাকে শান্তি দেবে?
রাত গভীর হচ্ছে। ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। লিমন কি ভেতরে কাঁদছে? নাকি সে নিজের ভাগ্যের ওপর হাসছে? লামিয়া মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের ওড়নাটা টেনে নিয়ে মুখে চাপা দিল। তার চিৎকার যেন দেয়াল ভেদ করতে পারছে না। ইফশি জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। দূরে কোনো এক অশুভ বাতাসের সংকেত।
ইফশি জানে, এই গোলকধাঁধার প্রতিটি মোড় এখন বড়ই বিপজ্জনক। লিমন যখন বলেছে সে ডিভোর্স দেবে না, তখন লামিয়ার ভবিষ্যৎ কি শুধুই এক অন্ধকার কক্ষে কাটবে? ইফশি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। সে লিমনের চোখের সেই ঘৃণার ছাপটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। যে ঘৃণা কেবল ভালোবাসার বিসর্জন থেকেই আসতে পারে।
ইফশি উঠে দাঁড়াল। সে রান্নাঘরের দিকে গেল একটু পানি খাওয়ার জন্য। লিলি বেগম তখনো সেখানে বসে আছেন, অন্ধকারে। তিনি ইফশিকে দেখে থমকে গেলেন। ইফশি নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
লিলি বেগম কোনো কথা বললেন না। তার গাল বেয়ে টপ টপ করে চোখের জল পড়ছে। তিনি বুঝতে পারছেন না, তার আদরের মেয়েটার জীবনটা কেন এমন ধ্বংসের মুখে। ইফশি নিঃশব্দে এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে এল।
বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। গাছপালা কাঁপছে। ইফশি বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে রঞ্জনের বুকের সাথে লেগে থাকল। রঞ্জন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারা দুজনই জানে, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল এখন আর শুধু ইট-পাথরের নয়, বরং মিথ্যের এক বিশাল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লামিয়ার জীবনের এই গোলকধাঁধা আর কতদূর যাবে? লিমন কি পারবে সেই অনাগত সন্তানকে নিয়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে? নাকি এই বাড়ির বিষাক্ত বাতাস তাদেরকেও গ্রাস করবে?
ইফশি চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার ঘরে তার মনে হলো, সে যেন এক গোলকধাঁধার গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। সব সত্য তো সামনে এসেছে, কিন্তু শান্তি কোথায়?

#চলবে….

গোলকধাঁধা পর্ব-০২

#গোলকধাঁধা
#পর্ব২
#রাউফুন
রাতের খাবারের টেবিলে তখন এক থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।চামচের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। রঞ্জন খাবার সরিয়ে রেখে ধীর গলায় বলল,
“তোমরা আমার বউকে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কত নালিশ, দোষ নিয়ে আমার কাছে চলে আসো। আমার বউ কিন্তু কখনোই তোমাদের নিয়ে কিছু বলে না।”

রঞ্জনের কথায় লিলি বেগমের হাতের নলাটা প্লেটে রেখে অগ্নিদৃষ্টিতে রঞ্জনের দিকে তাকালেন। ঠোঁট বেঁকিয়ে এক চরম তাচ্ছিল্যের সাথে তিনি বলে উঠলেন,
“আমাদের নিয়ে কি বলবে? আমরা কি তোর বউয়ের মতো নাকি? দাইয়্যুজ বউ তোর এটা যত তারাতাড়ি মানতে পারবি ততোই ভালো!”

মায়ের মুখ থেকে এমন কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে রঞ্জনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুখ খুলল লামিয়া। যে লামিয়া সবসময় মায়ের ডান হাত হয়ে ইফশিকে হেনস্তা করার ফন্দি আঁটে, সেই আজ মায়ের মুখের ওপর বলে বসল,
“মা, ভাবিকে নিয়ে তোমার এতো সমস্যা কেন? ভাইয়া তো ঠিকই বলেছে। ভাবি আমাদের সঙ্গে কি এমন করেছে যে তাকে দাইয়্যুজ বলছো?”

রঞ্জনের বাবা রুকন শিকদার খাবারের গ্রাস মুখে নিতে গিয়েও থেমে গেলেন। লিলি বেগম যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তার নিজের গর্ভের সন্তান তার বিপক্ষে কথা বলছে। রাগে অন্ধ হয়ে তিনি লামিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝপ করে ওর কান টেনে ধরলেন। দাঁতে দাঁত চেপে লিলি বেগম বললেন,
“এই কাল সাপ। তুই আমার মেয়ে হয়ে ঐ মেয়ের হয়ে কথা বলছিস? লজ্জা করে না?”

লামিয়া যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। কানের লতিটা লাল হয়ে গেছে তার। সে মায়ের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে করতে মৃদু আর্তনাদ করে বললো,
“আঃ মা ছাড়ো তো। ব্যথা পাচ্ছি।”

লিলি বেগম যেন আজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। তার মনে হচ্ছে ইফশি কোনো জাদুমন্ত্র দিয়ে তার সাজানো সংসার আর সন্তানদের নিজের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও জোরে কান মুচড়ে দিয়ে বললেন,
“নাহ ছাড়বো না। এই মেয়ে কি এমন জাদু জানে যে তোরা সবাই ওর দলে নাম লেখাচ্ছিস?”

লামিয়া এবার মায়ের হাতটা একরকম ঝটকানি দিয়ে সরিয়ে দিল। ওর চোখেমুখেও এখন বিদ্রোহের ছাপ। সে নিজের কান ডলতে ডলতে ক্ষোভের সাথে বলল,
“মা, এতো দিন আমি বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি তুমি যা করো সেসব অন্যায়। ভাবিকে অযথা কথা শোনাও। তাকে কথা শোনানো তোমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে তোমার জন্য ভাইয়া ভাবিকে মেরেছে। তবু তোমার শান্তি হয়নি?”

লামিয়ার এই অভাবনীয় আচরণে ইফশি আর রঞ্জন যেনো খানিক টা বিস্মিত হলো। ইফশি ডালের বাটিটা রঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল, সেই অবস্থাতেই সে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। দুজন দুজনার দিকে তাকালো। রঞ্জনের চোখের চাউনিতে হাজারটা প্রশ্ন, আর ইফশির চোখে গভীর সংশয়। তারা নিঃশব্দে চোখাচোখি করে কথা বললো। রঞ্জন যেন ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “বোঝালো আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে? এমনি সময় তো লামিয়া মায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে কথা শোনায়!”

ইফশি পাল্টা ইশারায় বোঝাল সে নিজেও অন্ধকারে আছে। তবে লামিয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় রহস্য আছে। ইফশি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। সে বোধহয় কিছুটা আচ্‌ করতে পারছে, এটা সম্ভবত সেই ‘ফেইক প্রেগন্যান্সি’র নাটকেরই প্রথম অংক। লামিয়া এখন ইফশিকে নিজের কব্জায় রাখার জন্য তাকে খুশি করতে চাইছে। ইফশি শান্ত গলায় রঞ্জনকে থামানোর চেষ্টা করে বললো,
“থাক খাওয়ার সময় কিছু বলো না রঞ্জন। বাবাকে শান্তিতে খেতে দাও!”

ইফশির এই ভালো মানুষি যেন রুকন শিকদারের বিরক্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি এতক্ষণ গোগ্রাসে খাচ্ছিলেন, এবার বিরক্ত হয়ে হাত ঝাড়া দিয়ে বললেন,
“তোমার জ্বালায় শান্তিতে খেতে পারি কই? বজ্জাত মেয়ে কোথাকার। মানুষ দেখেছি তোমার মতো এমন ধানি লংকা এক পিসও দেখিনি!”

বাবার এমন অপমানজনক কথা রঞ্জন আর সহ্য করতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ে বলল,
“বাবা! তুমি আমার বউকে এভাবে বলতে পারো না!”

রুকন শিকদার এবার ফেটে পড়লেন। তিনি ছেলেকে শাসনের সুরে বললেন,”লজ্জা করে না তোর? বাপ মায়ের সামনেই বার বার বউ বউ করে মুখে ফ্যানা তুলছিস!”

রঞ্জন যেন আজ জেদ ধরেছে। সে কোনো লুকোচুরি না করে সরাসরি সবার চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“নাহ লজ্জা কেন করবে? আমার বউকে আমি বউ বলবো না তো অন্য কেউ বলবে? তোমরাই তো বিয়ে করিয়ে আনিয়েছো। ভুলে গেলে?”

রুকন সাহেব তাচ্ছিল্য করে ঠোঁট বাকিয়ে বললেন,”সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো এই মেয়েকে তোর বউ করে আনা!”

রঞ্জনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। সে ঘর কাঁপিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়েই বলল,
“আমি তা মনে করি না। আমার জন্য তো সে সেরাই! তোমরাই বলতে, তোমরা আমার জন্য যায় ই করবে সেটাই সেরা। বাকি সব সেরা হলে আমার বউ কেন নয়?”

ছেলের মুখে মুখে তর্ক শুনে রুকন শিকদার তাকে গালি দিয়ে উঠলেন,”বেহায়া! বিয়ে করে লাজ লজ্জা সব বিসর্জন দিয়েছ?।”

রঞ্জন এক মুহূর্ত দেরি না করে পাল্টা জবাব দিল,
“একটু না অনেকটা বেহায়া হতেও রাজি আমি আমার বউয়ের জন্য!”

রুকন শিকদার পরিস্থিতি আর বাড়াতে চাইলেন না। তিনি মুখ গুঁজে খাওয়াই মনোযোগ দিলেন। রঞ্জন এক মুহূর্ত স্থির থেকে নিজের পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলে রাখল। তারপর বেশ গর্বের সাথে এবারে বললো,
“ইউএস এ আমার চাকরিটা হয়ে গেছে বাবা!”
এক নিমেষে ডাইনিং রুমের আবহাওয়া বদলে গেল। কলহ-বিবাদ সব যেন উধাও হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। রুকন শিকদারের মুখ চকচক করে উঠলো। তার চোখে এখন টাকার ঝিলিক। তিনি খুশি মনে বললেন, “বাহ, বেশ তো। কবে যাবি? স্যালারি কত হবে রে?”

লিলি আর লামিয়ারও সেইম অবস্থা। দুজনের মুখে যেনো বিদ্যুৎ খেলানো চমক। বিদেশ যাওয়া মানেই কাড়ি কাড়ি টাকা, মান-সম্মান বাড়বে, সবার নজর তাদের দিকে আলাদা ভাবেই পড়বে। সবাই আলাদায় দাম দেবে। লিলি বেগম মনে মনে ভাবলেন, যাক এবার আপদটাকে তিনি নিজের মতো পরিচালনা করবে, চাইলে তার চোখের সামনে থেকে সরাতেও পারবে ছেলে বিদেশ গেলে। ছেলেটা দু হাতে কামাবে, ওকে বিগড়ানো ঠিক হবে না। কিন্তু তাদের এই আনন্দ বিষাদে পরিণত হতে তিন সেকেন্ডও লাগল না।! রঞ্জন শান্ত গলায় বোমাটা ফাটালো,
“ইফশির ভিসা প্রসেসিং শেষ, আমাদের সামনের সপ্তাহে ফ্লাইট!”

পুরো ঘরজুড়ে যেন এক ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সমস্বরে বলে উঠলো, “কিহ?”

এবারে যেনো লামিয়া, সহ বাকি দুজনের মুখেও আধার নেমে গেলো। রুকন সাহেব হুংকার দিয়ে বললেন,”তোর বউ কেন যাবে বিদেশ? তুই আমাদের অনুমতি নিয়েছিস?”

রঞ্জন নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে কঠিন স্বরে বলল,
“অনুমতি নেওয়ার কি আছে বাবা? আমি সব দিক থেকেই আমার বউয়ের সব সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। আমিই একমাত্র গার্ডিয়ান তার। তাহলে তার বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যাবো কোন দুঃখে?”

লিলি বেগমের মাথায় যেন বাজ পড়ল। ইফশি বিদেশ চলে গেলে তার ফয়-ফরমায়েশ কে খাটবে? আর ছেলেটা তো পুরোপুরি তার হাতের বাইরে চলে যাবে। তিনি চিৎকার করে বললেন,
“তোর বউ কোথাও যাবে না। শেষ কথা আমার! যদি যায় তাহলে আমি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো আজীবনের জন্য!”

লিলি বেগম যেন কথাটা বলে ক্ষান্ত হলেন। তিনি তার তুরুপের তাসটা খেললেন। কিন্তু এর মধ্যেই লামিয়া অদ্ভুতভাবে চমকে উঠে বললো,
“নাহ ভাবি গেলে আমার কি হবে?”

লিলি বেগম নিজের মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। তার মনে হচ্ছে মেয়েটা বুঝি পাগল হয়ে গেছে। তিনি বিরক্তির সাথে বললেন,
“এই তুই আবার ঐ মেয়ের হয়ে কথা বলিস? দেখছিস না কি করছে এই মেয়ে? নির্ঘাত আমার ছেলেটাকে কালো জাদু করেছে। নাহলে আমার সোনার টুকরা ছেলের এই হাল কেন?”

লামিয়া দেখল পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ইফশি যদি বিদেশ চলে যায়, তবে তার গর্ভের বাচ্চার জন্য নাটক আর লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচার রাস্তা সব বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে যেকোনো মূল্যে ইফশিকে এই বাড়িতে আটকাতে হবে। সে মরিয়া হয়ে বললো,
“আহ থামো তো তোমরা।”

খানিক থেমে ফের পরিবারের বড়দের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বললো,”তোমাদের একটা খুশির খবর দেওয়ার আছ! ভাবি লজ্জা পাচ্ছিলো তাই আমিই বলছি!”

লিলি বেগম ঝারি দিয়ে বললেন,
“এই তুই ছোটো মানুষ তুই কেন বড়ো দের মাঝে কথা বলছিস?”

লামিয়া অনুনয় করে বলল,”আহা শোনোই না।”

রুকন সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,”বল!”

লামিয়া এক মুহূর্ত নাটকীয় নীরবতা বজায় রেখে বিস্ফোরক তথ্যটি দিল,”ভাবি, ভাবি তো প্রেগন্যান্ট!”

ইফশি যেন আকাশ থেকে পড়লো মুহুর্তের মধ্যে। ওর হার্টবিট যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে পানির গ্লাসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে হতভম্ব হয়ে রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,”আমি প্রেগন্যান্ট? কখন থেকে? কিভাবে? আমি কেন জানি না?”

রঞ্জন নিজেও থতমত খেয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না এটা কোনো নতুন চাল কি না। সে চাপা স্বরে ইফশির কানে ফিসফিস করে বললো,
“আমি কিভাবে জানবো? তুমি বলবে না আমাকে? আমাকে না বলে লামিয়াকে কেন বলেছো?”

ইফশি দিশেহারা হয়ে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে বললো,”আমিই তো জানতাম না আমি প্রেগন্যান্ট!”

লামিয়া দূর থেকে ইফশিকে চোখ টিপে ইশারায় বোঝালো। সেই ইশারার মানে পরিষ্কার, “চুপ থাকো ভাবি, আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাও।”

ইফশি বুঝতে পারল, এখন সত্যিটা বললে সব শেষ হয়ে যাবে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আমতাআমতা করে বললো,
“হেহে হ্যাঁ আমি, আমি তো প্রেগন্যান্ট!”

পুরো টেবিলের সবাই কেমন করে তাকিয়ে রইলো ইফশির দিকে। লিলি বেগমের মুখটা তেতো হয়ে গেল, কিন্তু রুকন শিকদারের চেহারা মুহূর্তেই পালটে গেল। খুশিতে ডগমগ হয়ে তিনি প্রথমবার ভালো ভাবে কথা বললেন ইফশির সঙ্গে,
“আরেএ আগে বলবে তো। আমি দাদু হবো এর চাইতে খুশির খবর আর হয় নাকি? শোনো মা, এখন থেকে তোমার যখন যা লাগবে আমাকে সব বলবে আমি এনে দেবো!”

রুকন সাহেবের এই পক্ষপাতিত্ব লিলি বেগমের সহ্য হলো না। তিনি রুকন সাহেব কে খোচা দিয়ে হিংসে মাখা স্বরে বললেন,
“তোমার আবার কি হলো? আমিও মা হয়েছি, আমার বেলায় তো এতো খুশি হওনি! এর বেলায় কেন?”

রুকন শিকদার একগাল হেসে ইফশির দিকে পরম মমতায় তাকালেন। লিলি বেগমের ঈর্ষাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন
“আরে তুমি বুঝবে না। দাদু হওয়ার আনন্দ বাবা হওয়ার চাইতেও অনেক বেশি!”

খাবার টেবিলে এক অদ্ভুত শান্তি ফিরলেও ইফশির ভেতরে অশান্তির আগুন জ্বলছে। সে জানে, এই মিথ্যের জাল তাকে কোথায় নিয়ে যাবে তাই এই মিথ্যাটাকে সে বাড়তে দিতে পারে না। সে আর রঞ্জন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের সেই দৃষ্টিতে হাজারো অনাগত ঝড়ের সংকেত। সে দম নিয়ে বললো,”আমি প্রেগন্যান্ট এই কথাটা আমাকে স্বীকার করতে বলেছে লামিয়া নিজেই। মূলত আমি প্রেগন্যান্ট নয়! কি তাই না লামিয়া?”

#চলবে….

গোলকধাঁধা পর্ব-০১

#গোলকধাঁধা
#পর্ব১
#রাউফুন

“আমার ক্লাস নাইনে পড়া ননদ প্রেগন্যান্ট এই কথা পাড়াপ্রতিবেশি জানলে কি হবে ভাবতে পারছিস?”
কথাটা শুনেই কিয়ারা বিষম খেলো। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘ মনে হলো। কিয়ারা স্তব্ধ গলায় প্রশ্ন করল,”হায় আল্লাহ কি বলিস? এতো বড়ো কান্ড ঘটে গেছে? তোর শাশুড়ী তো কড়া ধাচের মানুষ। তবুও এতো কড়াকড়ির মাঝে এমন কিছু করলো? বড়ো শেয়ানা মেয়ে তো। অন্যের মেয়েকে যা নয় তা বলে এদিকে নিজের মেয়ের ই ঠিক নেই? ছিঃ তোর ননদ?”

রেস্টুরেন্টের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল হাওয়া থাকা সত্ত্বেও ইফশির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উল্টোদিকে বসে থাকা কিয়ারা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে ইফশির দিকে। ক্যাফেটেরিয়ার আবছা আলো আর কফিশপের মৃদু গুঞ্জন ছাপিয়ে ইফশির কন্ঠস্বর যেন এক অশুভ মেঘের মতো মূর্ত হয়ে উঠল। ইফশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধরা গলায় বলল, “শেয়ানাই বটে। ভাবি হিসেবে আমার তো দায়িত্ব থেকেই যায়?”

“তো এখানে তোর কি করার আছে ইফশি? বাসায় বলে দে। পরে আবার এর দায় কিন্তু তোকে নিতে হবে। বলবে তুই সব জেনে শুনেও কেন বলিস নি! তুই হিংসে করেছিস, ইচ্ছে করে তোর ননদের ক্ষতি করেছিস!”

ইফশি অসহায়ের মতো মাথা নিচু করল। টেবিলের ওপর রাখা ন্যাপকিনটা সে বারবার মুচড়ে চলেছে। বিমর্ষ মনে ইফশি বলতে শুরু করল,

“আমার কিছুই করার নেই। বাচ্চার বয়স তিন মাস। এখন এবোর্ট করানো যাবে না। আবার নিজেকে শেষ করে দেবে এমন হুমকিও দিয়েছে। দেখ, আমার ননদের বয়স কম, এখন লোক জানাজানি হওয়া মানে বুঝিস? তাই ফেইক প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট বানিয়েছে আমার ননদ তার বয়ফ্রেন্ড এর সঙ্গে মিলে। ওটাকে আমার বাচ্চা বানাবে৷ বাড়িতে বলবে আমি প্রেগন্যান্ট! যখন ওর বাচ্চা হবে সেটা আমাকে দেবে। বাড়িতে জানবে ওটা আমার ই বাচ্চা।”

কিয়ারা যেন এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই টুকু মেয়ের পেটে পেটে এতো বুদ্ধি? শেয়ানা না হলে কি আর এই বয়সে এসব করে? সে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,”তো বাসায় যদি টের পায়? তারপর? কি হবে?”

ইফশি শুন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে যান্ত্রিক গলায় বলল,”সে-সব মেয়ের ভাবা। ও বাসায় বলবে, ও হোস্টেলে থাকবে। ওর আলাদা কোচিং আর প্রাইভেট পড়তে হলে হোস্টেলে থেকে পড়া শেষ করতে হবে। নাহলে ও ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না।”

কিয়ারা এবার সত্যিই চিন্তিত হয়ে উঠল। একটা মিথ্যে ঢাকতে গিয়ে কত বড় একটা বিপদের পথে পা বাড়াতে যাচ্ছে ইফশি, তা ভেবে সে আতঙ্কিত। সে কপালে হাত দিয়ে বলল,

“কিন্তু এরপর কি হবে ভাবছিস? তোর যখন পেট না দেখা যাবে? তুই তো আর সত্যিই প্রেগন্যান্ট না!”

ইফশি ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে শুধু একরাশ তিক্ততা। সে উত্তর দিল,

“আমাকে ফেইক বেইবি বাম্প কিনে দিবে ননদ।”

কিয়ারা সোজা হয়ে বসল। ওর চোখেমুখে বিস্ময় আর ঘৃণা দানা বাঁধছে। নবম শ্রেণিতে পড়া একটা কিশোরী এত ভয়ংকর পরিকল্পনা কী করে সাজাতে পারে, তা ভেবে ও শিহরিত। সে বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে বলল,

“আল্লাহ বলিস কি? এইটুকু মেয়ে এমন ধুরন্ধর? এতো চিকন বুদ্ধি রাখে ক্যামনে? আমি নিশ্চিত এর পেছনে এই মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের হাত আছে। ঐ ছেলেই সব করাচ্ছে।”

ইফশি মাথা চেপে ধরল। ওর ভেতরে এক তীব্র যন্ত্রণা দানা বাঁধছে। যেন সারা জগতের ভার ওর একার কাঁধের ওপর চেপে বসেছে। সে বিমর্ষচিত্তে বলল,”জানি না। এখন আমার মাথা ব্যথা করছে কিয়ারা!”

কিয়ারা রাগ আর সহমর্মিতা মেশানো গলায় বলল,

“তুই কেন এসবে রাজি হলি? ঐ মেয়ের তো মরে যাওয়াই উচিত। মান সম্মান খুইয়েছে এই মেয়ে।”

ইফশি সামাজিক মর্যাদা আর একটা জীবনের অপমৃত্যুর ভয়ে সে আজ খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করছে। বলল,

“রাজি না হয়ে উপায় আছে? মেয়ে তো মরতে গেছিলো! এখন আমি রাজি না হলে মরে যাবে। আমি ঐ অনাগত বাচ্চার কথা চিন্তা করেই আরও এমন বেকায়দায় পড়েছি।”

কিয়ারা দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকল। সে জানে ইফশি বড় বেশি আবেগী, বড় বেশি মায়াবতী। কিন্তু এই সর্বনাশা মায়ার পরিণাম কী হতে পারে, তা ভেবে সে গভীর উদ্বেগে ডুবে গেল। সে বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বলল,

“আচ্ছা, বাসায় যা। এটা নিয়ে আর কথা না বলায় ভালো। কিভাবে কি ম্যানেজ করবি ভেবে চিনতে আগাস। আমি তিন টে পার্সেলেরও দাম দিয়ে দিয়েছি।”

“এটার কিন্তু দরকার ছিলো না। আমার কাছে টাকা ছিলো।”

“তো? থাকলেই তোকে দিতে দেবো আমি? বেশি কথা বলিস না। বাসায় যা।”

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা মাত্রই রোদের তপ্ত তাপ ইফশির চোখেমুখে বিঁধতে লাগল। মাথার ওপর গনগনে সূর্য যেন ওর জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে উপহাস করছে। ইফশি রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে রিকশা নিলো। রিকশার চাকায় ঘুরতে থাকা ধুলিকণাগুলোর মতো ওর চিন্তাগুলোও বিশৃঙ্খল।

বাসার সদর দরজায় চাবি ঘুরাতেই একরাশ ভ্যাপসা গরম আর গুমোট পরিবেশ ওকে অভ্যর্থনা জানালো। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই শাশুড়ী লিলি বেগমের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর তীরের মতো ওর দিকে ধেয়ে এলো। লিলি বেগম সোফায় বসে হাতপাখা নাড়ছিলেন, ইফশিকে দেখেই তিনি চোখমুখ কুঁচকে বললেন,

“এখন তোমার আসার সময় হলো? আমরা দুপুরে খাবো না? সবাই না খেয়ে আছি। তোমার শ্বশুর, তোমার ননদ। তুমি নিজে তো রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে এসেছো মনে হয়। আমাদের কথা একবারও ভাবলে না?”

ইফশির পা যেন আর চলছে না। শরীর আর মনের ক্লান্তিতে সে ভেঙে পড়ছে। লিলি বেগমের এই নিত্যনৈমিত্তিক অপবাদ এখন ওর সয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে ব্যাগ থেকে তিন প্যাকেট খাবার বের করে টিপয়ের ওপর রাখল। খাবারের প্যাকেটের সুঘ্রাণে ঘরটা ভরে উঠলেও ইফশির মনটা তখন বিষাদে আচ্ছন্ন। সে মরা গলায় বললো,

“আমি খুব টায়ার্ড মা। আপনারা খেয়ে নিন। এখন আমার রান্না করতে ইচ্ছে করছে না!”

নিজের রুমে ঢুকেই ইফশি ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। ফ্যানটা ফুল স্পিডে ছেড়ে দিয়েও ওর শরীরের অস্থিরতা কমছে না। ওর মাথায় কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ইফশি এখনো বুঝতে পারছে না৷ ননদ বাসায় কিছু বলেছে কি না। হইতো তার স্বামী এলে বলবে।

জানালার কার্নিশে একটা চড়াই পাখি ডাকাডাকি করছে। বিকেলের ম্লান আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। ইফশি ভাবল, এক কিশোরীর ভুল আর জেদের জন্য তাকে এভাবে মিথ্যের বোঝা বইতে হবে?

সন্ধ্যায় রঞ্জন যখন বাড়ি ফিরলো তখন ইফশি শুয়ে আছে। সারা বিকেলের বিষণ্নতা আর রাতের রান্নার ঝামেলা চুকিয়ে সে যখন বিছানায় গা এলিয়েছে, তখন তার শরীর যেন পাথরের মতো ভারী মনে হচ্ছে। রাতের রান্না সেরে ক্লান্তিতে সবেই শুয়েছে সে। রঞ্জন ঘরে ঢুকেই গুমোট ভাব অনুভব করল। সে গলার টাই ঢিলে করতে করতে বিরক্ত গলায় বললো,

“ভোর সন্ধ্যায় এমন শুয়ে আছো কেন? ওদিকে মাকে দেখলাম রান্না ঘরে বকবক করছেন। গরমে কাহিল তিনি। কাজ না করো, মাকে একটু সাহায্য করে দাও অন্তত।”

ইফশি তড়াক করে উঠে বসল। এই লোকটা কি কখনোই ওর ক্লান্তি দেখবে না? সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মা কি করছে রান্না ঘরে?”

রঞ্জন ঝোলা ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে শুরু করল। রঞ্জনের গলার স্বর ক্রমশ চড়ছে। সে উত্তর দিল,

“আমি জানি না। অফিস থেকে এসেই তো দেখি মা রান্না ঘরে। কখনো কিছু বলি তোমাকে? রোজ রোজ তোমার নামে এতো এতো নালিশ করে, তোমার সব ভুলের কথা বলে তুমি তবু শুধরাও না কেন? মায়ের সব কথা মেনে চললেই হয়!”

ইফশি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। শাশুড়ির এই মিথ্যাচারের কোনো সীমা নেই। সে নিজের হাত দুটো রঞ্জনের সামনে মেলে ধরে আক্ষেপের স্বরে বললো,

“আমি সবেই রান্না শেষ করেছি। দেখো এখনো গায়ের ঘাম শুকাইনি।”

রঞ্জন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর চোখে যেন অবিশ্বাসের ছায়া। সে নির্দয়ভাবে বলল,

“মিথ্যা বলো না ইফশি। আমি জানি আমার মা ই রান্না করে। তুমি বসে বসে শুধুই শরীর বাড়াচ্ছো।”

ইফশির বুকটা ধক করে উঠল। যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভরসা করে, তার কাছ থেকে এমন কথা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। চোখের জল কোনোমতে আটকে রেখে সে বলল,

“রঞ্জন তুমি এভাবে বলতে পারলে?”

“এতো সাহস আমার সঙ্গে তর্ক করছিস? বেয়াদব মেয়ে!”

রঞ্জন হঠাৎই দরজার দিকে তাকাল। ইফশির মন খারাপ দেখে কানে ধরে সরি বললো। চোখ কোণা করে ইশারায় দরজার দিকে দেখালো। ইফশি দেখল দরজার ওপাশে একটা ছায়া । লিলি বেগম আড়ি পেতে শুনছেন সব। রঞ্জন পরিস্থিতি সামাল দিতে এক অদ্ভুত কৌশল নিল। সে নিজের হাতের তালু দিয়ে নিজের গাল আর ওপরের ঠোঁটে জোরালো শব্দে একটা চড় বসাল। এমন এক শব্দ হলো যেন মনে হলো সে ইফশিকেই মেরেছে। তারপর কৃত্রিম রাগে চিৎকার করে বললো,

“একদম মিথ্যা বলবে না ইফশি। তুমি কি বলতে চাইছো মা মিথ্যা বলছে? আমার মায়ের বয়স হয়েছে, এই বয়সে কি কেউ মিথ্যা বলে?”

ইফশি প্রথমে চমকে গিয়েছিল, কিন্তু রঞ্জনের চোখের ইশারা দেখে সে বুঝে ফেলল পুরো ব্যাপারটাই একটা অভিনয়। দরজার ওপাশের দর্শককে সন্তুষ্ট করার জন্য এই নিষ্ঠুর নাটকের অবতারণা। ইফশি ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে বললো,

“তুমি আমাকে মারলে?”

রঞ্জন আরও গম্ভীর হয়ে বলল,”তর্ক করবে না। তর্ক করলে আরও মার খাবে।”

ইফশিও যেন এই নাটকের দক্ষ এক অভিনেত্রী হয়ে উঠল। সে বুকফাটা কান্নার সুর নকল করে বলল,”মারো, মেরে ফেলো আমাকে। সারা জীবন তো শুধু ওদের কথায় বিশ্বাস করলে আমাকে বিশ্বাস করেছো কখনো?”

দরজার ওপাশের ছায়াটা এবার সরে গেল। সম্ভবত লিলি বেগম তার কাঙ্ক্ষিত বিজয় নিয়ে প্রস্থান করেছেন। রঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে ইফশির পাশে এসে বসল। তার গম্ভীর মুখটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। রঞ্জন বিস্মিত হয়ে ফিসফিস করে বললো,”এই আমি কি তোমাকে বিশ্বাস করিনা?”

ইফশি হেসে রঞ্জনের চোখের দিকে তাকাল। সংসারের শান্তি বজায় রাখতে এই অদ্ভুত লুকোচুরি আর কতদিন চলবে? সে মৃদু গলায় পালটা প্রশ্ন করল,

“আপনার অভিনয়ের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছি বুঝেন না?”

রঞ্জন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। তারপর বাচ্চাদের মতো আবেগঘন চোখে ইফশির দিকে চেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“হোল্ড মি জান!”

ইফশি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সমস্ত সংশয়, ক্লান্তি আর গোপন সত্যের ভার রঞ্জনের বুকের মাঝে সঁপে দিল। ইফশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রঞ্জনের শরীরের ঘ্রাণ নিলো। এই ঘ্রাণটা যেন পৃথিবীর সব ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর। সারাদিনের ঝড়ঝাপটার পর এই আশ্রয়ে এসে সে যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল। ইফশি মনে মনে ভাবল, এই বুকটাই কেন এতো শান্তি?

বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়েছে। রাতের অন্ধকার আরও ঘন হচ্ছে। একটা মিথ্যে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে সামনে, কিন্তু এই আলিঙ্গনের উষ্ণতায় ইফশি যেন সব ভুলে থাকতে চাইল। সব মিথ্যার মাঝে এই মানুষটাই যে তার একমাত্র ধ্রুবক। কিন্তু সামনে যে আরও বড় ঝড় আসছে, সে কিভাবে সামলাবে সবকিছু?

#চলবে…

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-০৮ এবং শেষ পর্ব

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৮

থানার সেই সেঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরটায় বসে আছেন ইরার বাবা, মোতাহার সাহেব। তাঁর চোখেমুখে আজ এক ধরণের নিঃস্বতা। যে জামাইয়ের পদমর্যাদা নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, আজ সেই জামাইয়ের ইশারাতেই তাঁকে হাজতে বসে থাকতে হচ্ছে। বনি সামনে দাঁড়িয়ে চুরুট ফুঁকছে। ধোঁয়ার কুন্ডলী মোতাহার সাহেবের মুখে ছেড়ে দিয়ে বনি কর্কশ গলায় বলল, “চিনতে পারছেন তো আমাকে? আপনার সেই আদর্শ জামাই। আপনার মেয়ে তো আমার ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে পালিয়েছে। এখন আপনি যদি জেলের ভাত খেতে না চান, তবে ইরাকে ফোন করে বলুন ও যেন এই মুহূর্তে আমার কাছে ফিরে আসে।”

মোতাহার সাহেব মাথা নিচু করে রইলেন। তাঁর কানে তখন বাজছিল বিয়ের রাতে ইরার সেই কথাগুলো “বাবা, আমি আরিফকে ছাড়া বাঁচব না।” সেদিন তিনি শোনেননি, আজ নিজের ভুলটা হাড়ের মজ্জায় টের পাচ্ছেন। তিনি ধরা গলায় বললেন, “বনি, ও আর ফিরবে না। আর আমি ফিরতে বলবও না। তুমি আমাকে মে-রে ফেললেও না।”

বনি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তবে পচুন এই নরকে।”

আরিফ জানত বনি মোতাহার সাহেবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। তাই সে বসে থাকেনি। সে তার বন্ধু মহলে থাকা সংবাদকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করল। বনির অফিসের ভেতরেই এমন কিছু লোক ছিল যারা বনির অত্যাচার আর দুর্নীতির শিকার। তারা আরিফকে কিছু গোপন ফাইল আর ভিডিও সরবরাহ করল। শুধু প্রেম দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। এখানে দরকার কৌশল। সে সোশাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তা রিলিজ করল। সেখানে ইরা নিজে এসে কথা বলল।

ইরা ভিডিওতে নিজের গালের সেই কালশিটে দাগ আর কব্জির জখম দেখিয়ে বলল

“আপনারা আমাকে ‘ঘর পালানো মেয়ে’ বলছেন, কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছেন কোন নরক থেকে আমি পালিয়েছি? আমি দামী শাড়ি চেয়েছিলাম না, আমি চেয়েছিলাম একটু নিরাপত্তা। বনি আমিন সাহেবের কাছে স্ত্রী মানে হলো মা-র খাওয়ার বস্তু। আজ আমার বৃদ্ধ বাবাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। আমি কি বিচার পাব না?”

মুহূর্তের মধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেল। বাস্তবতা হলো, এই যুগে সোশাল মিডিয়ার শক্তি অনেক সময় আদালতের চেয়েও দ্রুত কাজ করে। সাধারণ মানুষ যারা এতক্ষণ ইরাকে গালি দিচ্ছিল, তারা এবার বনির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল।

তানিয়া যখন দেখল আরিফ এভাবে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে, সে আরও মরিয়া হয়ে উঠল। সে আরিফের ডিপার্টমেন্টের বড় কর্মকর্তাদের কান ভাঙাতে শুরু করল। কিন্তু আরিফ আগেই তার পদত্যাগপত্র (Resignation letter) তৈরি করে রেখেছিল। সে জানে, এই চাকরিতে থেকে সে হয়তো নিরপেক্ষভাবে লড়তে পারবে না।

আরিফ তানিয়াকে ফোন করে বলল, “তানিয়া, তুমি যত পারো ষড়যন্ত্র করো। কিন্তু মনে রেখো, তোমার বাবার অবৈধ ব্যবসার যে ফাইলগুলো আমার হাতে আছে, সেগুলো যদি আমি ওপেন করি তবে তোমাদের আভিজাত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাই বলছি, সম্মান থাকতে সরে দাঁড়াও।”

তানিয়া প্রথমবারের মতো আরিফের কন্ঠে এক ধরণের শীতল আতঙ্ক অনুভব করল। আরিফ এখন আর সেই নরম মনের প্রেমিক ছেলেটি নেই; সে এখন এক আহত বাঘ।

ইরা আর আরিফ এখন এক ছোট শহরে একটা সাধারণ ভাড়াবাড়িতে আছে। রাতে যখন লোডশেডিং হয়, তখন মোমবাতির আলোয় তারা একে অপরের দিকে তাকায়। বনির সেই এসি রুমের চেয়ে এই ঘামঝরা ঘরটা ইরার কাছে অনেক বেশি আপন।

ইরা একদিন আরিফকে জিজ্ঞেস করল, “আরিফ, আপনার এত বড় ক্যারিয়ার, এত সম্মান সব তো আমার জন্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনার কি আফসোস হয় না?”

আরিফ হাসল। সেই মায়াবী হাসি যা দেখে ইরা এক সময় সব ভুলত। আরিফ বলল, “ইরা, ক্যাডার অফিসার হওয়াটা একটা পেশা মাত্র, ওটা আমার পরিচয় নয়। আমার পরিচয় আমি একজন মানুষ। আর মানুষের প্রধান ধর্ম হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আমি যদি তোমাকে ওই নরকে ফেলে রেখে নিজের এসিরুমে বসে থাকতাম, তবে নিজেকে সারাজীবন ঘৃণা করতাম। এই অভাবের সংসারে যদি তুমি আমার পাশে থাকো, তবেই আমি সার্থক।”

ভাইরাল ভিডিও আর জনরোষের চাপে বনির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। মোতাহার সাহেবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো পুলিশ। বনিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। কিন্তু বনি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে তার কালো টাকার জোরে গুণ্ডা লেলিয়ে দিল আরিফ আর ইরাকে খুঁজে বের করার জন্য।

শয়তান যখন কোণঠাসা হয়, তখন সে আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বনি এখন ঠিক করেছে, সে কাউকে বাঁচতে দেবে না।

সেদিন রাতে আরিফের বাসার সামনে কয়েকটা অপরিচিত লোক ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। অন্ধকার গলিতে কারো পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইরা জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল ছায়ামূর্তিগুলো ক্রমশ কাছে আসছে।

রাত একটা। জানালার পর্দা সরিয়ে ইরা যখন দেখল চার-পাঁচজন লোক চাদর মুড়ি দিয়ে তাদের বাড়ির সামনে পায়চারি করছে, তখন তার গায়ের র-ক্ত হিম হয়ে এল। বনি যে এত দ্রুত তাদের খুঁজে বের করবে, সেটা সে ভাবেনি। বনির ক্ষমতা কেবল তার পদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, তার টাকার জোরে কেনা এক বিশাল অপরাধী চক্রও তার হাতের মুঠোয়।

ইরা ফিসফিস করে আরিফকে ডাকল, “আরিফ! ওরা এসে গেছে। বনির লোকরা আমাদের চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলেছে।”

আরিফ দ্রুত ড্রয়ার থেকে তার লাইসেন্স করা পিস্তলটা বের করল। সে জানত এমন একটা দিন আসবে। ক্যাডার সার্ভিসে থাকার সময় সে অনেক বিপদ দেখেছে, কিন্তু আজ লড়াইটা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার। আরিফ শান্ত গলায় বলল, “ইরা, তুমি পেছনের রুমে যাও। দরজা ভেতর থেকে লক করে দাও। পরিস্থিতি যাই হোক, আমি না ডাকা পর্যন্ত বের হবে না।”

বাইরে থেকে দরজায় প্রচণ্ড আঘাত এল। ওরা কোনো কথা বলছে না, শুধু লোহার রড দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। আরিফ জানালার কাছে গিয়ে একটা সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, কিন্তু লোকগুলো পিছু হটল না। তারা জানে বনি আমিন তাদের বড় অংকের টাকা দিয়েছে হয় আরিফকে শেষ করতে হবে, না হয় ইরাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ঠিক সেই মুহূর্তে আরিফের ফোনে একটা কল এল। বনির নাম্বার। আরিফ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে বনির পৈশাচিক হাসি শোনা গেল
“আরিফ সাহেব, ক্যাডারগিরি তো অনেক দেখালেন। এবার একটু মাটির স্বাদ নিন। আমার জিনিস চুরি করার সাহস দেখিয়েছেন, এখন তার মাশুল দিন। আমার লোকরা আপনাদের ওখানে পৌঁছে গেছে। যদি বেঁচে থাকতে চান, তবে মেহেরিনকে গেটের বাইরে পাঠিয়ে দিন।”

আরিফ চোয়াল শক্ত করে বলল, “বনি, তুমি একটা কাপুরুষ। নিজের বউকে মা-রধর করে যে পুরুষত্বের বড়াই করো, আজ সেই দম্ভ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। তোমার পতন শুরু হয়ে গেছে, তুমি শুধু সময়টা গুনে যাও।”

অন্যদিকে, তানিয়া তখন বনির সাথে লাউডস্পিকারে সব শুনছিল। সে ভাবছিল আরিফ আর ইরা শেষ হয়ে গেলে তার সব কাটা দূর হবে। কিন্তু তানিয়া জানত না, আরিফ আগেই তার বাবার দুর্নীতির সব প্রমাণ একটি বিদেশি নিউজ পোর্টালে পাঠিয়ে দিয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তানিয়ার বাবার ফোন এল। তিনি ওপার থেকে চিৎকার করে বললেন, “তানিয়া! সর্বনাশ হয়ে গেছে। আরিফ আমাদের সব ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। র‍্যাব আমাদের বাসায় হানা দিয়েছে। তুই এই মুহূর্তে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা কর!”

তানিয়ার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। যে টাকার অহংকারে সে আরিফকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, সেই টাকাই আজ তার গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরিফের বাসার সামনে এখন হাতাহাতি শুরু হয়ে গেছে। আরিফ তার সামরিক প্রশিক্ষণের সবটুকু দিয়ে লড়াই করছে। কিন্তু চার-পাঁচজনের সাথে একা পেরে ওঠা কঠিন। ঠিক যখন একজন আরিফের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ পাড়ার লোকজন জেগে উঠল।

আসলে আরিফ গত কয়েকদিন ধরেই পাড়ার
যুবকদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তাদের বিপদ দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়ে এল। তারা দেখল এক ক্যাডার অফিসার আর তাঁর স্ত্রীকে গুন্ডারা আক্রমণ করছে। সাধারণ মানুষের শক্তির সামনে বনির ভাড়াটে গুন্ডারা টিকতে পারল না। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে গেল।

পরদিন সকালে খবরের কাগজের শিরোনাম হলো “সাবেক সরকারি কর্মকর্তার ভাড়াটে বাহিনী নিয়ে তান্ডব: ধরা পড়ল অপরাধীরা।” বনি আমিনের দুর্নীতির পাহাড় একে একে ধসে পড়তে শুরু করল। ক্ষমতার দম্ভে সে এতটাই অন্ধ ছিল যে বুঝতে পারেনি আইন সবার উপরে।

বনিকে যখন হাতকড়া পরানো হলো, তখন তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল কেবল ঘৃণা। সে যখন প্রিজন ভ্যানে উঠল, তখন দেখল দূর থেকে ইরা আর আরিফ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইরার চোখে আজ পানি নেই, আছে এক পরম প্রশান্তি।

বনি জেল খেটে একদিন বের হবে ঠিকই, কিন্তু ইরার ওপর সে আর কোনোদিন অধিকার খাটাতে পারবে না। তানিয়া তার বাবার সাথে পালিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। লোভ আর হিংসার যে প্রাসাদ তারা গড়েছিল, তা আজ শ্মশান।

আরিফ আর ইরা এখন এক মফস্বল শহরের ছোট একটা বাড়িতে থাকে। আরিফ বিসিএস ছেড়ে দিয়ে একটা এনজিওতে কাজ করছে। বেতন আগের চেয়ে অনেক কম, কিন্তু সম্মান আর মায়া অনেক বেশি।

রাতে ইরা যখন আরিফের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসে, তখন আরিফ জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, “ইরা, এই পাথরের রাজপ্রাসাদগুলো আমাদের মতো মানুষদের জন্য নয়। আমাদের জন্য এই মাটির ঘরটাই স্বর্গ।”

ইরা মৃদু হেসে আরিফের কাঁধে মাথা রাখল। সে আজ বুঝেছে, সুখ দামী গয়নায় থাকে না, থাকে মনের শান্তিতে। মধ্যবিত্তের সেই মরা মরা জীবনটাই আজ তাদের কাছে সবচেয়ে রঙিন।

(সমাপ্ত)

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-০৭

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৭

রাত তখন আনুমানিক সাড়ে বারোটা। পুরো শহরটা যেন এক গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন, কিন্তু বনি আমিনের ফ্ল্যাটটার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে। বনি আজও অতিরিক্ত মদ্যপান করে বিছানায় পড়ে আছে, তার নাক ডাকার শব্দ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। ইরার কাছে এই শব্দটা আজ ভয়ের নয়, বরং সুযোগের।

ইরা আলমারি থেকে তার দামী গয়নার বাক্সটা বের করল না। সে ওগুলো স্পর্শও করতে চায় না; কারণ ওই প্রতিটি গয়নার গায়ে লেগে আছে বনির লালসা আর নির্যাতনের ঘাম। সে শুধু একটা সাধারণ কালো বোরখা আর তার সেই পুরনো নীল রুমালটা সাথে নিল। আয়নায় নিজের ফোলা গাল আর কালশিটে পড়া চোখের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। এই মুখটা সে আর কোনোদিন এই আয়নায় দেখতে চায় না।

ইরা ধীরপায়ে রান্নাঘরের পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার শ্বশুর আফজাল সাহেব যে চাবিটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা হাতে নিতেই ইরার হাত কেঁপে উঠল। সে জানত, এই চাবিটা কেবল একটা দরজার নয়, এটা তার জীবনের নতুন এক দিগন্তের।

পেছনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় সে দেখল আফজাল সাহেব বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কোনো কথা বললেন না, শুধু অন্ধকারের ভেতর থেকেই নিজের ডান হাতটা একটু তুললেন। যেন এক নীরব আর্শীবাদ।

রাস্তায় বেরোতেই এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস ইরার মুখে লাগল। অনেকদিন পর তার মনে হলো সে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু ভয় তাকে ছেড়ে যায়নি। প্রতিটা গলির মোড়ে মনে হচ্ছিল বনির পুলিশ বাহিনী বুঝি তাকে ঘিরে ধরবে।

ঠিক মোড়ের মাথায় একটা কালো গ্লাসওয়ালা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ইরা কাছে যেতেই গাড়ির হেডলাইটটা দুবার জ্বলে উঠল। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এল আরিফ।

আরিফকে দেখে ইরার সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেল। সে আরিফের সামনে গিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল। আরিফ কোনো কথা না বলে শুধু ইরার কাঁধে হাত রাখল। সেই স্পর্শে কোনো পশুত্ব ছিল না, ছিল এক পাহাড় সমান নিরাপত্তা।

আরিফ শান্ত গলায় বলল, “ইরা, গাড়িতে ওঠো। আমাদের হাতে সময় খুব কম।”

তানিয়ার প্রতিক্রিয়া ও আরিফের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
গাড়ি চলতে শুরু করলে আরিফ একসময় পকেট থেকে তার ফোনটা বের করল। তানিয়া গত এক ঘণ্টায় তাকে পঞ্চাশবার ফোন করেছে। আরিফ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে তানিয়ার কর্কশ গলা ভেসে এল “আরিফ! তুমি এই মাঝরাতে কোথায়? আমি জানি তুমি ওই মেহেরিনের কাছে গেছ। তুমি যদি এই মুহূর্তে ফিরে না আসো, তবে আমি বাবার ক্ষমতা ব্যবহার করে তোমার চাকরি খেয়ে দেব!”

আরিফ একটা শীতল হাসি হাসল। সে ধীরস্থিরভাবে বলল, “তানিয়া, তোমার বাবার ক্ষমতা আর তোমার লোভ দুটোকেই আমি আজ থেকে মুক্তি দিলাম। আমি জানি আমি কী করছি। কাল সকালে আমার ডিভোর্স লেটার তোমার হাতে পৌঁছে যাবে। চাকরি যদি যায় যাক, কিন্তু অন্তত একজন মানুষ হিসেবে আমি বাঁচতে চাই।”

আরিফ ফোনটা কেটে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল। তানিয়ার মতো লোভী নারীদের দাপট তার কাছে আজ তুচ্ছ।

গাড়ি হাইওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে। ইরা জানালার বাইরে অন্ধকার দেখছে। সে জানে, এই পালানোই শেষ নয়। কাল সকালে যখন বনি জানবে ইরা পালিয়েছে, তখন সে তার পুরো পুলিশ ফোর্স নামিয়ে দেবে। বনির ইজ্জতে আঘাত মানে সে পাগ-লা কু-ত্তার মতো আচরণ করবে।

ইরা ফিসফিস করে বলল, “আরিফ, আপনি বিপদে পড়বেন। ও আপনাকে ছেড়ে দেবে না।”

আরিফ স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে হাত রেখে বলল, “ইরা, আমি বিসিএস দিয়েছি মানুষের সেবা করার জন্য, বনি আমিনের মতো পশুদের ভয়ে কুঁকড়ে থাকার জন্য নয়। আমার কাছে ওর সব অপকর্মের ফাইল আছে। ও যদি ক্ষমতার জোর দেখায়, তবে আমি দেখাব আইনের জোর। আর সমাজ? সমাজ আমাদের নিয়ে যা খুশি বলুক, তাতে আমার আর কিছু যায় আসে না।”

বাস্তবতা হলো, সমাজ কোনোদিন এই বিচ্ছেদকে ভালো চোখে দেখবে না। লোকে বলবে “অফিসারের বউ হয়েও কেন পালাল? নিশ্চয়ই চরিত্র খারাপ!” কেউ বলবে “আরিফ নিজের ঘর ভেঙে অন্যের বউ উদ্ধার করতে গেছে, কী জঘন্য!”

কিন্তু সেই সমাজের কেউ কি আজ রাতে ইরার কব্জির ব্যথাটা মালিশ করে দেবে? কেউ কি তানিয়ার মানসিকভাবে করা আরিফের ক্ষতগুলো সারিয়ে দেবে? কেউ দেবে না।

আরিফ আর ইরা আজ ঠিক করেছে, তারা কোনো রাজপ্রাসাদে থাকবে না। তারা থাকবে একটা ছোট ঘরে, যেখানে হয়তো এসি থাকবে না, দামী ফার্নিচার থাকবে না; কিন্তু থাকবে একে অপরের প্রতি সম্মান।

ভোরের আলোটা ফুটতে শুরু করেছে। দূরে দিগন্তে দেখা যাচ্ছে এক নতুন সূর্য। ইরা তার সেই নীল রুমালটা দিয়ে চোখের পানি মুছল। সে আর মিসেস বনি আমিন নয়, সে এখন কেবলই মেহেরিন ইরা যে দীর্ঘ ন*রকবাস শেষে একটুখানি আকাশের মুখ দেখেছে।

বনি আমিনের পাথরের রাজপ্রাসাদটা পেছনে পড়ে রইল। সেখানে এখন কেবল আভিজাত্যের কঙ্কাল পড়ে আছে, কোনো প্রাণ নেই।

সকাল আটটা। বনি আমিনের ফ্ল্যাটে তখন লঙ্কাকাণ্ড চলছে। নেশার ঘোর কেটে যাওয়ার পর বনি যখন দেখল বিছানা খালি এবং পেছনের দরজা খোলা, তখন তার ভেতরের পশুটা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল। সে ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলটা এক লাথিতে গুঁড়িয়ে দিল।

রেখা বেগম থরথর করে কাঁপছেন। বনি তার মায়ের দিকে র-ক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল, “তোমার আদরের পুত্রবধূ পালিয়েছে মা! আর পালিয়েছে কার সাথে জানো? ওই ভিখারি আরিফের সাথে। আমি ওকে ছাড়ব না। ওর বিসিএস ক্যাডার গিরি আমি ঘুচিয়ে দেব।”

বনি তৎক্ষণাৎ তার অফিসের কনস্টেবল আর সোর্সদের ফোন করল। তার কন্ঠে তখন খু-নের নেশা। সে শুধু স্বামী হিসেবে নয়, একজন ক্ষমতাধর অফিসার হিসেবে ইজ্জত হারানোর অপমানে জ্বলছে। তার কাছে ইরা কোনো মানুষ নয়, বরং তার ইগো বা অহংকারের প্রতীক।

অন্যদিকে, আরিফ আর ইরা এখন আরিফের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আরিফ জানে, বনি চুপ করে বসে থাকবে না।

ঠিক তাই হলো। দুপুর নাগাদ আরিফের ফোনে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কল এল।
“আরিফ, তোমার বিরুদ্ধে বনি আমিন সাহেব অপহরণের মামলা করেছেন। তোমার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করার চাপ আসছে। তুমি কি পা-গল হয়ে গেছ? একটা মেয়ের জন্য নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করছ কেন?”

আরিফ শান্ত গলায় উত্তর দিল, “স্যার, মেয়েটি আমার স্ত্রী নয় ঠিকই, কিন্তু ও একজন নি-র্যাতিতা। আমি ওকে অপহরণ করিনি, উদ্ধার করেছি। আমার কাছে ওর শরীরের জখমের মেডিকেল রিপোর্ট আর বনির ম-ারধরের ভিডিও ফুটেজ আছে। আমি আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।”

তানিয়া দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বনির সাথে যোগাযোগ করল। দুই স্বার্থান্বেষী মানুষ এক হয়ে গেল। তানিয়া বনিকে ফোনে বলল, “বনি ভাই, আরিফকে এমন শিক্ষা দিন যেন ও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। আমি ডিভোর্স ফাইল করছি ঠিকই, কিন্তু ওর সবটুকু কেড়ে নিয়ে তবেই শান্ত হব।”

বাস্তবতা হলো, যখন ক্ষমতা আর লোভ হাত মেলায়, তখন ন্যায়বিচার পাওয়া পাহাড় টপকানোর মতো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইরার বাবাকে থানায় তুলে নিয়ে গেল।

ইরা যখন ফোনে খবর পেল যে তার বৃদ্ধ বাবাকে থানায় আটকে রাখা হয়েছে, সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে আরিফকে বলল, “আরিফ, আমি ফিরে যাই। আমার বাবার কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ও আমাকে মে-রে ফেলুক, তাও ভালো।”

আরিফ ইরার হাত শক্ত করে ধরল। “না ইরা, এবার ফিরে যাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃ-ত্যু। বনি তোমাকে জ্যান্ত কবর দেবে। তুমি ধৈর্য ধরো। আমাদের হাতেও তুরুপের তাস আছে।”

ইতোমধ্যে সোশাল মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়েছে “ক্যাডার অফিসারের প্রেমিকা উদ্ধার, অন্য অফিসারের ঘর ভাঙার গল্প।” লোকে কমেন্ট বক্সে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলছে। কেউ ইরার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কেউ আরিফকে ঘর ভাঙানি বলছে। বাস্তব সমাজ এমনই; তারা কারণ খোঁজে না, তারা শুধু রসালো গল্প খোঁজে।

ইরার মা ফোনে হাহাকার করছেন, “ইরা, তুই আমাদের মুখ পুড়িয়েছিস। পাড়ার লোকে ছি ছি করছে। তুই কেন ম-রতে গেলি না? ম-রে গেলেই তো আমাদের মান থাকতো!”

মায়ের এই কথাগুলো ইরার বুকে বনির লাথির চেয়েও বেশি বাজল। নিজের মা-ও যখন জীবনের চেয়ে মান কে বড় করে দেখেন, তখন একাকীত্বটা পাহাড়ের মতো ভারি মনে হয়।

আরিফ বসে নেই। সে বনির বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এবং ক্ষমতার অপব্যবহার-এর একটি পাল্টা মামলা ফাইল করার প্রস্তুতি নিল। সে জানে, বনি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করবে, তাকে সামাজিকভাবে হেয় করবে। কিন্তু আরিফ আজ সেই বেকার যুবকটি নয় যে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।

সে ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ইরা, এই সমাজ আমাদের দিকে পাথর ছুড়বে। বনি আমাদের র-ক্ত চাইবে। কিন্তু তুমি যদি আমার পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াও, তবে এই পাথরের রাজপ্রাসাদ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। তুমি কি লড়বে আমার সাথে?”

ইরা চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

চলবে…

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-০৬

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৬

ভোর চারটে। আকাশটা এখনো গাঢ় ধূসর রঙের চাদরে ঢাকা। শহরের ব্যস্ততা শুরু হতে আরও কিছুটা দেরি। কিন্তু বনি আমিনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ভেতরে সময় যেন থমকে গেছে। ড্রয়িংরুমের সেই দামী ঝাড়লণ্ঠনটা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও ইরার শরীরের নীলচে দাগগুলো যেন জ্বলজ্বল করছে। বনি এখন পাশের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে অত্যাচার করার পর তার এক ধরণের পৈশাচিক ক্লান্তি আসে, যা তাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

ইরা মেঝেতে বসে আছে। তার কপালে একটা ক্ষত, যেখান থেকে র-ক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। সে ভাবছে, মানুষের সহ্যক্ষমতার একটা সীমা থাকে। সেই সীমাটা বোধহয় আজ সে অতিক্রম করে ফেলেছে। তার মনে পড়ছে তার ছোটবেলার কথা, যখন সামান্য হাত কেটে গেলে তার বাবা পুরো পাড়া মাথায় তুলতেন। সেই বাবা আজ কোথায়? তিনি কি জানেন তার আদরের মেয়েটি আজ একটা সরকারি অফিসারের ঘরে ‘মানুষ’ থেকে ‘বস্তু’তে পরিণত হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে মেয়েদের বড় করা হয় ত্যাগের মন্ত্র শিখিয়ে। ইরাকেও শেখানো হয়েছিল “শ্বশুরবাড়ি হলো আসল ঘর, সেখানে ম-রে গেলেও মুখ খোলা যাবে না।” এই তথাকথিত ‘সম্মান’ রক্ষার নেশায় ইরা এতদিন চুপ ছিল। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে না, সম্মানটা কার? বনির? নাকি তার বাবার? তার নিজের সম্মান তো অনেক আগেই ধুলোয় মিশে গেছে।

ইরা যখন বিয়ের আগে আরিফের হাত ধরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, তখন তার মা বলেছিল, “তোর ছোট বোনটার কথা ভাব ইরা। তুই এমন করলে ওর বিয়ে হবে না। সমাজ আমাদের একঘরে করে দেবে।”

সমাজ! এই সেই সমাজ যারা আজ ডিনার টেবিলে বসে ইরার হীরা জহরতের প্রশংসা করে, কিন্তু কেউ তার চোখের কোণের আতঙ্কটা পড়ে দেখে না। এই সমাজ আসলে এক দল অন্ধ মানুষের ভিড়, যারা শুধু জৌলুস চেনে, যন্ত্রণা নয়।

অন্যদিকে, আরিফ তার ডায়েরিটা নিয়ে বসে আছে। সে এখন বিসিএস ক্যাডার, বড় অফিসার। লোকে তাকে দেখে সালাম দেয়, সম্মান করে। কিন্তু আরিফ জানে, এই সম্মানের আড়ালে সে কতটা নিঃস্ব। তানিয়া যখন তাকে টাকার খোঁটা দেয়, তখন তার মনে হয় সেই বেকার জীবনটাই ভালো ছিল। তখন অন্তত তার পকেটে টাকা না থাকলেও বুকে একটা পবিত্র প্রেম ছিল।

আরিফ ভাবছে “আমি কেন বিসিএস দিলাম? কেন এই পদমর্যাদার পেছনে ছুটলাম? যদি শেষ পর্যন্ত প্রিয় মানুষটাকেই বাঁচাতে না পারলাম, তবে এই পদের মূল্য কী?”

আরিফ কাল ডিনার টেবিলে বনির চোখে যে হিংস্রতা দেখেছে, তা তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। সে একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে অনেক টক্সিক কেস হ্যান্ডেল করেছে, সে জানে বনির মতো মানুষরা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। এরা বাইরে ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকে, আর ঘরের ভেতরে পশুর চেয়েও অধম হয়ে ওঠে।

সকাল হতেই তানিয়া আবার শুরু করল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে ব্রাশ করতে করতে বলল, “আরিফ, কাল বনি ভাইয়ার বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইনটা দেখেছ? আমাদের এই ফ্ল্যাটটা কত সেকেলে লাগে না? আমি ভাবছি আব্বুর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ঘরটা ডেকোরেট করব। তোমার ওই সামান্য বেতন দিয়ে তো আর ডেকোরেশন হবে না!”

আরিফ আজ আর চুপ থাকল না। সে শান্ত গলায় বলল, “তানিয়া, তুমি কি জানো বনি তার স্ত্রীকে প্রতিদিন মা-রে? তুমি কি জানো ওই দামী পর্দার আড়ালে মারজিনা মেহেরিন ইরা প্রতিদিন কান্নাকাটি করে?”

তানিয়া বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল, “আরে ধুর! বড় মানুষের ঘরে ওসব একটু-আধটু হয়ই। কিন্তু দেখো, মেয়েটা কত দামী শাড়ি-গয়না পরে আছে! আমার বাবা বলে ‘মা-র খেয়েও যদি সুখে থাকা যায়, তবে সেটাই ভাগ্য’।”

আরিফ স্তব্ধ হয়ে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝল, তানিয়ার মতো নারীদের কাছে মানসিক শান্তি বা আত্মসম্মান বলে কিছু নেই। তাদের কাছে জীবন মানে হলো টাকার অংক আর প্রদর্শনী। তানিয়া আর বনি আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ একজন শারীরিক নির্যাতনকারী, অন্যজন মানসিক।

ইরা ধীরপায়ে বাথরুমে গেল। আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটার দিকে তাকাল সে। আজ তার মনে এক ধরণের অদ্ভুত জেদ কাজ করছে। সে আলমারি থেকে তার ফোনটা বের করল। বনি গত রাতে নেশার ঘোরে ফোনটা আলমারিতে রাখতে ভুলে গিয়েছিল।

ইরা জানত তার প্রতিটি কদম এখন ম-রণফাঁদ। সে কাঁপাকাঁপা হাতে আরিফের নাম্বারটা বের করল। গত রাতে ডিনারের সময় আরিফ কৌশলে তার ভিজিটিং কার্ডটা ইরার পানির গ্লাসের নিচে রেখে গিয়েছিল। বনি সেটা দেখেনি।

ইরা মেসেজ টাইপ করল “আরিফ, আমি আর পারছি না। ও আমাকে মে-রে ফেলবে। আপনি কি আমাকে একবারের জন্য এই রাজপ্রাসাদ থেকে বের করতে পারবেন? আমি আর রানী হতে চাই না, আমি শুধু বাঁচতে চাই।”

মেসেজটা পাঠিয়েই ইরা দ্রুত ফোনটা আবার লুকিয়ে ফেলল। তার বুকটা ধকধক করছে। সে জানে, এই মেসেজটা যদি বনি দেখে ফেলে, তবে আজই হবে তার জীবনের শেষ দিন।

রান্নাঘরে চা বানাতে গিয়ে ইরা দেখল তার শ্বশুর সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আজও ইরার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “বউমা, গত রাতে যা হয়েছে আমি সব শুনেছি। আমি কাপুরুষ বাবা, ছেলেকে শাসন করতে পারিনি। কিন্তু তুমি যদি পালাতে চাও, আমি তোমাকে বাধা দেব না। বরং পেছনের গেটের চাবিটা আমি এখানে রেখে দিচ্ছি।”

ইরা অবাক হয়ে শ্বশুরের দিকে তাকাল। এই প্রথম এই পাথরের প্রাসাদে সে একজন মানুষের ছায়া দেখতে পেল। সে ধরা গলায় বললেন, “আমি চাই না তুমিও আমার মতো তিলে তিলে শেষ হয়ে যাও। বনি মানুষ নয়, ও একটা ক্ষমতা অন্ধ পশু।”

আমাদের সমাজে যখন একটা মেয়ে সংসার ভাঙার কথা ভাবে, তখন চারপাশ থেকে হাজারটা বাধা আসে। খালা, ফুফু, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই মনে করিয়ে দেয়, “বিচ্ছেদ হওয়া মেয়ের সমাজে কোনো স্থান নেই।” কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না, “মৃ-ত আত্মার সমাজে স্থান দিয়ে কী হবে?”

ইরা এখন সেই সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে জানে, এই বাড়ি থেকে বের হওয়া মানেই তার বাবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়া। কিন্তু সে আজ ঠিক করেছে, অন্যের সম্মানের জন্য সে নিজের জীবন আর বিলিয়ে দেবে না।

আরিফ মেসেজটা পাওয়ার পর তার অফিসের চেয়ারে স্থির হয়ে বসতে পারল না। তার ভেতরে থাকা সেই পুরনো আরিফ জেগে উঠল, যে আরিফ এক সময় ইরার চোখের পানি সহ্য করতে পারত না। সে তার বিশ্বস্ত এক কলিগকে কল করল। আরিফ জানে, বনির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো কঠিন, কারণ বনি নিজেও সরকারি প্রভাবশালী অফিসার। কিন্তু আরিফের কাছে এখন ক্ষমতা আছে, আর সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার সে আজ করতে চায়।

বাস্তবতা হলো, বনি বা তানিয়ারা আমাদের আশেপাশে অসংখ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা মনে করে টাকাই জীবনের সব। যারা মনে করে জীবনসঙ্গী মানে হলো কেনা গোলাম। কিন্তু তারা জানে না, মানুষের মনের জেদ যখন একবার জেগে ওঠে, তখন পাথরের রাজপ্রাসাদও বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে।

ইরা তার সেই ছোট্ট নীল রুমালটা বেনারসি শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে নিল। ওটাই তার সাহস। সে আজ রাতে বের হবে। কোনো গয়না নেবে না, কোনো দামী শাড়ি নেবে না। সে শুধু তার নিজেকে নিয়ে বের হবে।

আরিফ তার গাড়ির চাবিটা হাতে নিল। তার চোখে আজ আর কোনো দ্বিধা নেই। সে জানে, এই পথটা পিচ্ছিল। সমাজ তাকেও ছেড়ে কথা বলবে না। লোকে বলবে “পরের বউ ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।” কিন্তু আরিফ জানে, সে কোনো বউ ভাগাচ্ছে না, সে একটা মুমূর্ষু প্রাণকে উদ্ধার করতে যাচ্ছে।

চলবে,,,,

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-০৫

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#পর্ব_৫
#আরিবা_নাওশীন

সকাল থেকেই বনির মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বনি যখন খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রাখছিল, তখন তার চোখেমুখে এক ধরণের ক্রুর আনন্দ খেলা করছিল। আজ সকালে সে ইরাকে কোনো গালাগাল দেয়নি, এমনকি মা-রধরও করেনি আর এই অস্বাভাবিক নীরবতা ইরাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলছে।

বনি কফি শেষ করে ইরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার গা থেকে আসা দামী আফটারশেভের কড়া গন্ধে ইরার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বনি তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, “আজ একটা সারপ্রাইজ আছে মেহেরিন। তোমার ওই পুরনো বন্ধু, যে এখন বিসিএস ক্যাডার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরিফ সাহেব তাকে আজ ইনভাইট করেছি আমার ব্যক্তিগত এক কাজে। আমি চাই আমার স্ত্রীকে দেখে যেন তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ভালো করে সাজো আজ।”

ইরার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। বনি কেন আরিফকে ডাকবে? সে কি তবে সব জেনে গেছে? নাকি এটা নতুন কোনো নির্যাতনের নীল নকশা?

একই সময় আরিফ তার অফিসে বসে ফাইলের পর ফাইল সই করছিল। তার মাথার ভেতর তানিয়ার সকালের সেই কথাগুলো তীরের মতো বিঁধছে। তানিয়া তাকে আজ বলেছে “আরিফ, আমার বাবার ব্যবসায় নাকি একটু লস হচ্ছে। তুমি কি তোমার ক্ষমতার জোরে সেই ফাইলটা একটু পাশ করিয়ে দিতে পারো না? তোমার ওই সততা দিয়ে তো আমার দামী শাড়ি আসবে না!”

আরিফ ফাইলটা সরিয়ে দিয়ে নিজের কপালে হাত রাখল। তানিয়ার লোভ এখন পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে দুর্নীতির দিকে মোড় নিচ্ছে। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। বনি আমিনের মেসেজ। বনি তাকে আজ রাতে তার বাসায় ডিনারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছে।

আরিফ জানত এটা একটা ম-রণফাঁদ। কিন্তু ইরার সেই বিধ্বস্ত মুখটা দেখার পর থেকে সে স্থির থাকতে পারছে না। তাকে যেতেই হবে। হয়তো এটাই সুযোগ ইরাকে এক নজর দেখার।

রাত ন’টা। বনির ড্রয়িংরুমটা সুগন্ধি মোমবাতির আলোয় সাজানো। ইরা পরনে ভারি নীল সিল্কের শাড়ি, গলায় হীরা আর মুক্তার সেট। বনি তাকে রাজকুমারীর মতো সাজিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইরার মনে হচ্ছে সে যেন কোরবানি দেওয়ার জন্য সাজানো কোনো পশু।

আরিফ যখন বেল বাজিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন বনি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। বনি আরিফের পিঠে হাত রেখে অট্টহাসি দিয়ে বলল, “আরে আরিফ সাহেব! আসুন আসুন। আপনার কথা তো আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই বলে। আপনি নাকি ওর কলেজের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন?”

আরিফের চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল ইরার ওপর। সেই একই চোখ, সেই মায়া কিন্তু সেখানে আজ আত্মবিশ্বাসের বদলে জমাটবদ্ধ আতঙ্ক। ইরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে আরিফের দিকে তাকাতে পারছে না।

তানিয়াও সাথে এসেছে। সে ড্রয়িংরুমের আসবাবপত্র আর ইরার গয়নার দাম মনে মনে হিসাব করতে ব্যস্ত। তানিয়া ইরার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “মেহেরিন আপু, আপনার কপালটা তো বেশ ভালো! ভাইয়া আপনাকে এত দামী গয়নায় সাজিয়ে রেখেছেন। আমাদের আরিফ তো কেবল ফাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকে।”

খাবার টেবিলে বনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইরার ওপর তার মালিকানা জাহির করতে লাগল। সে বারবার ইরার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল আর বলত “আমার বউটা একদম খেতে চায় না আরিফ সাহেব। আমি ছাড়া ওকে সামলানোর মতো কেউ নেই। আপনি তো জানেনই, অবলা নারীদের একটু শাসনে আর আদরে রাখতে হয়।”

আরিফের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছিল। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ইরার কব্জিতে মেকআপের নিচ দিয়ে উঁকি দেওয়া সেই কালশিটে দাগ। বনি যে ইচ্ছে করেই আরিফকে ডেকে এই দৃশ্য দেখাচ্ছে, তা বুঝতে আর বাকি নেই।

ডিনার শেষে ড্রয়িংরুমে যখন পুরুষেরা আলাদা হলো, তখন তানিয়া বাথরুমে যাওয়ার বাহানায় সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরা আর আরিফ একা হয়ে পড়ল।

আরিফ নিচু স্বরে দ্রুত বলল, “ইরা, তুমি কি ঠিক আছো? তোমার কব্জিতে ওটা কিসের দাগ?”

ইরা আঁতকে উঠে নিজের আঁচল দিয়ে হাতটা ঢাকল। চোখভর্তি পানি নিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কেন এসেছেন আরিফ? প্লিজ চলে যান। ও আপনাকেও শেষ করে দেবে। আমরা এখন দুই মেরুর মানুষ। আমাদের মাঝে এই পাথরের রাজপ্রাসাদ কোনোদিন ভাঙবে না।”

আরিফ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই বনি ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটা ক্যামেরা। বনি মৃদু হেসে বলল, “আরিফ সাহেব, একটা গ্রুপ ছবি হয়ে যাক? স্মৃতি হিসেবে থাকবে।”

বনি যখন ইরার কাঁধে তার শক্ত হাতটা রাখল, ইরা শিউরে উঠল। সে বুঝল, এই রাতের শেষে তার জন্য নতুন কোনো নরক অপেক্ষা করছে। আর আরিফ বুঝল, ভালোবাসা রক্ষা করার জন্য শুধু চাকরি আর টাকাই যথেষ্ট নয়, দরকার ছিল সেই সময়টার যা সে হারিয়ে ফেলেছে।

আরিফ আর তানিয়া বিদায় নেওয়ার পর বাড়িটা যেন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা নয়, বরং এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। বনি ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ধীরেসুস্থে তার গায়ের টাইটা খুলল। তার চোয়াল শক্ত, চোখে এক ধরণের আদিম হিংস্রতা।

সে ইরার দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল, “মেহেরিন, তোমার পুরনো প্রেমিকের সামনে খুব তো সতী সাজলে। ভাবলে আমি কিচ্ছু বুঝিনি? ওর চোখের দিকে যখন তাকিয়েছিলে, তখন মনে হচ্ছিল সব ভুলে ওর বুকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাই না?”

ইরা সোফার এক কোণে গুটিসুটি মে-রে বসে থরথর করে কাঁপছিল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, “বিশ্বাস করো বনি, আমি একটা কথা ছাড়া আর কিছুই বলিনি। উনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন আমি কেমন আছি…”

“থাম!”বনির প্রচণ্ড একটা চিৎকার দেয়ালের প্রতিটি ইটে যেন প্রতিধ্বনিত হলো। সে এক ঝটকায় ইরার চুল মুঠো করে ধরল। “কেমন আছিস তা ও জানতে চায়? তোর শরীরের প্রতিটি দাগ বলে দিচ্ছে তুই কেমন আছিস। আর এটাই তোর কপাল মেহেরিন। তুই রাজপ্রাসাদে আছিস, কিন্তু আমার কেনা বান্দী হয়ে থাকবি।”

অন্যদিকে, ফেরার পথে গাড়িতে তানিয়া আরিফকে বিঁধতে ছাড়ল না। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আরিফ, তোমার ওই বান্ধবীর গয়নাগুলো দেখেছো? আর ওর স্বামী বনি ভাই কত স্মার্ট! আর তুমি? ডিনারে পুরো সময়টা এমন মুখ করে ছিলে যেন কেউ তোমাকে জোড় করে বিষ খাইয়েছে। তোমার ওই পুরনো প্রেমটা এখনো ভেতরে গজগজ করছে না তো?”

আরিফ স্টিয়ারিং হুইলটা এত জোরে চেপে ধরল যে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠল। সে তানিয়ার দিকে না তাকিয়েই শান্ত অথচ কঠোর গলায় বলল, “তানিয়া, আজ রাতটা অন্তত চুপ থাকো। টাকা আর স্মার্টনেস দিয়ে যে পশুত্ব ঢাকা যায় না, সেটা তোমার মতো লোভী নারী কোনোদিন বুঝবে না।”

তানিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। আরিফ তাকে সচরাচর এভাবে উত্তর দেয় না। আরিফের ভেতরের শান্ত সমুদ্রটা আজ উত্তাল হতে শুরু করেছে।

বাসায় ফিরে আরিফ আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে ভাসছে ইরার সেই আর্তনাদভরা চাহনি। সে ভাবছে, সে কি আসলেই কিছু করতে পারবে না? একজন ক্যাডার অফিসার হয়েও সে কি সমাজের তথাকথিত ‘সংসার’ নামক এই কারাগার ভাঙার ক্ষমতা রাখে না?

আরিফ আজ বুঝতে পেরেছে, সে চাকরি পেয়েছে, টাকা পেয়েছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তানিয়া তাকে কেবল একটা দামী শোপিস হিসেবে ব্যবহার করছে, ঠিক যেভাবে বনি ইরাকে করছে। তফাৎ শুধু এটাই আরিফকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয় না, কিন্তু মানসিকভাবে প্রতিদিন তার আত্মাকে ছিঁড়ে খাওয়া হয়।

বনির ঘরে তখন অত্যা-চারের উৎসব চলছে। বনি ইরার হাতটা মুচড়ে ধরে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। ইরার নীল সিল্কের দামী শাড়িটা আজ তার কাছে কাফনের কাপড়ের মতো মনে হচ্ছে।

বনি তার কানে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরিফ সাহেব তো বড় সরকারি অফিসার হয়েছেন। দেখা যাক, ও কি পারে ওর সেই পুরনো রানীকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে। কাল সকালে তোর বাপের বাড়ি যাওয়ার সব রাস্তা আমি বন্ধ করে দেব। তুই এই ঘরেই পচে ম-রবি।”

ইরা আর কাঁদছে না। সে শুধু সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মানুষের দেওয়া এই পাথরের রাজপ্রাসাদ আসলে কত বড় একটা মিথ্যা। বাইরে থেকে সবাই যাকে সাফল্য ভাবে, ভেতরে তা আসলে এক একটা জীবন্ত সমাধি।

আরিফ আর ইরা দুজনই আজ হার মেনে যাওয়া দুই সৈনিক। একজনের কাছে ক্ষমতার চাবিকাঠি আছে কিন্তু মায়া নেই, আর অন্যজনের কাছে মায়া আছে কিন্তু মুক্তি নেই।

চলবে,,,,

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-৩+৪

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#তৃতীয়_পর্ব

রাত দশটা। ডিআইজি সাহেবের ড্রয়িংরুমটা দামী ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে। চারদিকে আভিজাত্যের গন্ধ। বনি সাহেব গ্লাস হাতে তার কলিগদের সাথে অট্টহাসিতে মেতে আছে। আলোচনার বিষয় কার প্রমোশন আগে হবে, কে নতুন পাজেরো কিনল আর কার কত প্রতিপত্তি।

ইরা এক কোণে সোফায় বসে আছে। তার ঠোঁটে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি, যা দেখলে মনে হবে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী। পাশে বসে থাকা অন্য এক অফিসারের স্ত্রী সুয়া ভাবি ইরার হীরা বসানো নেকলেসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইরা ভাবি, তোমার নেকলেসটা তো দারুণ! বনি ভাই তো তোমাকে একদম রানীর মতো রাখে, তাই না? আমরা তো এমন গিফট বছরের একদিনও পাই না।”

ইরা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। সে মনে মনে ভাবল, “ভাবি, আপনি শুধু হীরার চমকটাই দেখলেন? এই নেকলেসটা গলায় পরানোর সময় বনি আমার ঘাড়ে যে নখের আঁচড়টা দিয়েছিল, সেটা তো দামী মেকআপে ঢাকা পড়ে আছে।”

এই সমাজের মানুষ চকমক করা পাথর চেনে, কিন্তু পাথরের চাপে পিষ্ট হওয়া মনটা কারোর নজরে আসে না।

ডিনার টেবিলে বসে বনি তার দাপট দেখানোর সুযোগ ছাড়ল না। মেনু নিয়ে আলোচনা করার সময় সে হঠাৎ ইরার দিকে তাকিয়ে সবার সামনে বলে উঠল, “মেহেরিন তো আবার একটু সেকেলে। গ্রামের দিককার মেয়ে তো, এখনো ঠিকঠাক কাঁটাচামচ দিয়ে পাস্তা খেতে শিখল না। তাই না মেহেরিন?”

টেবিলের সবাই হাহা করে হেসে উঠল। ইরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। বনি তাকে ছোট করে আনন্দ পায়। সবার সামনে তার আত্মসম্মান নিয়ে খেলা করাটা বনির জন্য একটা বিনোদন। অথচ এই বনিই বিয়ের আগে বলেছিল, “মেহেরিনের সারল্যই আমার পছন্দ।”

সেই সারল্য এখন বনির কাছে ‘ক্ষ্যাত’ আর ‘সেকেলে’ বলে মনে হয়। বনি যখন অন্য নারীদের সাথে ফ্লার্ট করে হাসাহাসি করে, ইরার তখন বুকটা ফেটে যায়। কিন্তু প্রতিবাদের কোনো অধিকার তার নেই। বনি তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “আমি বড় চাকরি করি, আমার স্ট্রেস রিলিফ করার জন্য আমি যা খুশি করব। তুমি শুধু আমার ঘর আর সম্মান সামলাবে।”

রাত বারোটার পর বাড়ি ফিরে বনি সরাসরি নিজের ঘরে চলে গেল। ইরা যখন রান্নাঘরে গ্লাস রাখতে যাচ্ছিল, দেখল তার শ্বশুর আফজাল সাহেব বারান্দায় অন্ধকারে একা বসে আছেন।

ইরা কাছে যেতেই তিনি নিচু স্বরে বললেন, “বউমা, আজও কি বনি তোমার গায়ে হাত তুলেছে?”

ইরা চমকে উঠল। সে ভাবেনি এই বাড়ির কেউ তার নীরব চিৎকার শুনতে পায়। আফজাল সাহেব একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি জানি মা, তুমি খুব কষ্টে আছো। বনিটা ছোটবেলা থেকেই জেদী আর অহংকারী। ওর মা ওকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে দানব বানিয়েছে। আমি তো অপদার্থ বাবা, তোমার জন্য কিছুই করতে পারি না। শুধু দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোমাকে সহ্য করার শক্তি দেন।”

ইরা কিছু বলল না। শ্বশুরের এই অসহায়ত্বের কাছে সে কি বিচার দেবে? এই বাড়িতে মায়া আছে, কিন্তু সেই মায়ার কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে শুধু বনির টাকার আর তার পদের।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ইরা ড্রয়ারের একদম নিচে লুকানো আরিফের সেই শেষ চিঠিটা বের করল। চিঠিটা ভাঁজ হতে হতে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। সেখানে আরিফ লিখেছিল

“ইরা, আমি জানি আজ আমার পকেটে তোমার বাবার চাহিদামতো টাকা নেই। কিন্তু আমি সারাজীবন তোমাকে আমার বুকের বাম পাশে আগলে রাখতাম। কোনোদিন তোমার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল আসতে দিতাম না। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় আমি তোমায় পেলাম না। তোমার কোনো দোষ নেই, হয়তো আমিই কোনো পাপ করছিলাম যার কারণে এই অপূর্ণতা নিয়ে বেচে থাকার শাস্তি হলো আমার।”

ইরা চিঠিটা বুকে চেপে ধরল। তার মনে হলো, আরিফ হয়তো তাকে এসি রুম দিতে পারত না, কিন্তু তাকে ‘মানুষ’ হিসেবে সম্মান দিত। আরিফ তাকে শুধু ভোগ করার বস্তু মনে করত না, মনে করত তার অস্তিত্বের অংশ।

বনির দামী বিছানায় শুয়েও ইরার মনে হয় সে কোনো এক নোংরা বস্তিতে পড়ে আছে। যেখানে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বনি যখন ঘুমের ঘোরেও তার হাতটা জড়িয়ে ধরে, ইরার মনে হয় কোনো এক অজগর তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরছে।

হঠাৎ বনি ঘুমের ঘোরেই কর্কশ গলায় বলল, “কাল সকালে আমার নীল শার্টটা যেন আয়রন করা থাকে। আর মেহেরিন, তোমার ওই বাপের বাড়ির সাথে যোগাযোগ একটু কমাও। ওসব ছোটলোকদের সাথে মেলামেশা করলে তোমার আভিজাত্য নষ্ট হয়।”

ইরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলল। তার নিজের বাবা-মাও এখন তার কাছে পর হয়ে গেছে। কারণ তারা মনে করে, মেয়ে তো রাজপ্রাসাদে আছে, তার আবার দুঃখ কিসের?

বাস্তবতা হলো, এই রাজপ্রাসাদ আসলে একটা কবরস্থান। যেখানে প্রতিদিন একটা মেয়ের স্বপ্ন, ইচ্ছা আর হাসিগুলোকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়। ইরা ভাবছে, সে কি এভাবেই সারাজীবন অভিনয় করে যাবে? নাকি এই পাথরের রাজপ্রাসাদ ভেঙে বেরিয়ে আসবে কোনো একদিন?

ভোরের আলোটা ঠিকমতো ফোটেনি এখনো। রান্নাঘরে চায়ের কেতলি বসিয়ে দিয়ে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি সে। গতকাল ডিনার থেকে ফেরার পর বনি আবারও ক্ষেপে গিয়েছিল। কারণ? ডিআইজি সাহেবের স্ত্রী ইরার রান্নার খুব প্রশংসা করেছিলেন। বনির অহংকারে লেগেছে তার স্ত্রীর হাতের স্বাদ কেন অন্য কেউ জানবে? তার কাছে স্ত্রী মানে হলো অন্দরমহলের দাসী, যার গুণের প্রচার বাইরের জগতে হওয়া নিষিদ্ধ।

বনি রাগের মাথায় ইরার চুল মুঠি করে ধরে বলেছিল, “বেশি ঢং দেখানোর দরকার নেই। রান্নাবান্না পারো সেটা ঘরেই সীমাবদ্ধ রাখো। বাইরে গিয়ে অত নমনীয় সাজার চেষ্টা করবে না।”

ইরার মাথার তালুটা এখনো চিনচিন করছে। আয়নায় সে দেখেছে, চুলের গোড়াগুলো লাল হয়ে ফুলে আছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, এখন আর তার কান্না পায় না। তার কান্নাগুলো বোধহয় শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে ঠিক এই বাড়িটার মতো।

সকালে মা ফোন করেছিলেন। ইরা ভেবেছিল মাকে সব বলবে। কিন্তু মায়ের প্রথম কথাটাই ছিল

“কীরে ইরা, ভালো আছিস তো? জামাই কেমন আছে? তোর বাবা তো সারাদিন পাড়ায় গল্প করে বেড়ায়, তার জামাই নাকি এ মাসেও বড় ইনক্রিমেন্ট পেয়েছে। আমাদের মুখটা তো তুই-ই উজ্জ্বল করলি মা। শত হলেও সরকারি অফিসারের বউ, কত মানুষের খাতির পাস!”

ইরা বলতে চেয়েছিল “মা, এই খাতিরের বদলে আমি যদি শুধু একটু শান্তি পেতাম?”

কিন্তু সে বলতে পারল না। সে জানে, তার এই কষ্টের কথা শুনলে বাবার প্রেশার বেড়ে যাবে, মা দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হবেন। আর সমাজ? সমাজ বলবে “নিশ্চয়ই মেয়েরই কোনো দোষ আছে, নইলে এমন জামাই কি আর সাধে ম-ারে? সমাজ তো আগে মেয়েদের দোষই দেখে।”

ইরা কেবল গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটা গিলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ মা, ভালো আছি। বনিও ভালো।”

নাস্তার টেবিলে বনি যথারীতি গম্ভীর। সে ইরার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। রেখা বেগম প্লেটে ডিম সেদ্ধ নিতে নিতে বললেন, “বৌমা, বনির শার্টগুলো কি ড্রাই ওয়াশ থেকে এসেছে? ওর তো আজ একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। আর শোনো, বিকেলে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে। তোমার ওই ভারী গয়নাগুলো পরে নিও। আমার বান্ধবীদের দেখাবো বনি তার বউকে কত দামী জিনিস দেয়।”

ইরা মনে মনে হাসল। এই পরিবারে সে কোনো মানুষ নয়, বরং তাদের আভিজাত্য প্রদর্শনের একটা মাধ্যম। তারা তাকে গয়না দেয়, দামী শাড়ি দেয় কিন্তু একবারও জিজ্ঞেস করে না সে রাতে ঘুমাতে পেরেছে কি না।

দুপুরের দিকে বনির কিছু ফাইল অফিসে পৌঁছে দেওয়ার দরকার পড়ল। বনি নিজেই ফোন করে হুমকি দিল, “আধা ঘণ্টার মধ্যে ড্রাইভারের সাথে ফাইল পাঠিয়ে দাও। দেরি হলে কিন্তু খবর আছে।”

ইরা ফাইলগুলো নিয়ে নিজেই বের হলো, একটু বাইরের বাতাস নেওয়ার লোভে। অফিসের গেটে ফাইলটা ড্রাইভারের হাতে দিয়ে সে যখন গাড়িতে উঠতে যাবে, তখনই তার নজর গেল রাস্তার ওপারে।

একটা ট্যাক্সি থেকে নামছে একজন সুদর্শন যুবক। হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ, চোখে চশমা। ইরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল তার। এ কি সেই আরিফ?

হ্যাঁ, সেই চিবুক, সেই চোখের চাহনি। কিন্তু আগের সেই মলিনতা আর নেই। আরিফ এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। সে বোধহয় এখন বিসিএস ক্যাডার বা বড় কোনো পজিশনে আছে। আরিফ ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়ল ইরার ওপর।

দুজনের মাঝখানে পিচঢালা রাস্তার ব্যবধান, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থমকে গেল। আরিফের চোখে সেই পুরনো মায়াটা এখনো আছে, যা দেখে ইরার মনে হলো সে এই মুহূর্তেই সব আভিজাত্য ফেলে দিয়ে ওই রাস্তার ওপারে দৌড়ে চলে যায়।

আরিফ শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই বনির অফিসের পিয়ন এসে ডাকল “ম্যাডাম, স্যার আপনাকে ভেতরে ডাকছেন।”

ইরার ঘোর কাটল। সে দেখল আরিফ ধীরপায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। ইরার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। বনি যদি দেখে ফেলে আরিফের সাথে সে কথা বলছে, তবে আজ রাতে তার কপালে কী জুটবে সেটা ভেবেই সে শিউরে উঠল।

বনি অফিসের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে ছিল। সে দেখল তার স্ত্রী এক অপরিচিত যুবকের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বনির চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার ভেতরে থাকা সেই টক্সিক দানবটা আবার জেগে উঠল।

ইরা গাড়িতে উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু তার কানে বাজছে আরিফের সেই পুরনো কথাগুলো “ইরা, পরিস্থিতি বদলে যাবে একদিন।”

বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতি বদলেছে ঠিকই। আরিফ আজ প্রতিষ্ঠিত, আর ইরা আজ এক সরকারি গেজেটেড অফিসারের ঘরে ‘রানী’ হয়ে বন্দি। কিন্তু এই রানীর শরীরের নীল দাগগুলো কেউ দেখতে পায় না।

(চলবে…)

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪

রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফের অবয়বটা ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে। গাড়ির কালো কাঁচের আড়ালে ইরা তার চোখ দুটো লুকানোর বৃথা চেষ্টা করল। তার মনে হলো, আরিফ শুধু রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে নেই, সে দাঁড়িয়ে আছে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের ওপারে যে দেয়ালটা ইরা নিজের হাতে গেঁথেছে তার বাবার মান সম্মানের কথা ভেবে।

কিন্তু ইরা জানত না, এই চকমক করা সাফল্যের আড়ালে আরিফও একটা ভাঙা হৃদয়ের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

আরিফ এখন বিসিএস ক্যাডার। তারও বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর দেড়েক আগে। স্ত্রী তানিয়া এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মেয়ে। আরিফ যখন বেকার ছিল, তখন সে চেয়েছিল শুধু মায়া। আর আজ যখন তার পদমর্যাদা আছে, তখন সে যার সাথে ঘর করছে, সেই তানিয়া চেনে শুধু টাকা আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস।

অফিস শেষে আরিফ যখন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে, তানিয়া একবারও জিজ্ঞেস করে না “এক কাপ চা খাবে?” বরং তানিয়ার প্রথম প্রশ্ন থাকে “শোনো, আমার ওই বিদেশি হ্যান্ডব্যাগটা কবে আসবে? আমার বান্ধবীর স্বামী তাকে হীরা জহরত দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে, আর তুমি একটা ব্যাগের জন্য মাস পার করে দিচ্ছ?”

তানিয়ার কাছে আরিফ একজন ‘ক্যাডার অফিসার’ ছাড়া আর কিছু নয়। তানিয়া ভালোবাসে আরিফের ক্ষমতাকে, আরিফের নীল বাতিওয়ালা গাড়িকে। আরিফের মনের কোণে জমে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার করার সময় তার নেই।

আরিফ মাঝে মাঝে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানে আর ভাবে “ইরা থাকলে কি এমন হতো? ইরা তো আমার এক কাপ চায়েই খুশি ছিল।” আজ তার রাজকীয় ডাইনিং টেবিলে পদের অভাব নেই, শুধু অভাব সেই মানুষটার যে পরম মমতায় ভাতের থালাটা সামনে এগিয়ে দেবে।

গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই বনি ইরার ওপর বাজপাখির মতো নজর রাখছিল। বাসায় ঢুকেই সে সজোরে দরজাটা লাথি মে-রে বন্ধ করল। ইরার বুকটা ভয়ে দুরুদুরু করছে।

বনি ইরার ঘাড়ের ওপর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে হিসহিসিয়ে বলল, “অফিসের সামনে ওই ছেলেটা কে ছিল মেহেরিন? তোমার পুরনো কোনো মক্কেল নাকি? আমি তো দেখলাম তুমি ওর দিকে তাকিয়ে একদম হা হয়ে ছিলে। ভুলে যেও না তুমি কার স্ত্রী। আমার ইজ্জতে যদি সামান্যতম আঁচ লাগে, তবে ওই মুখ আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব।”

ইরা ফিসফিস করে বলল, “উনি কেউ না। চিনতে পারিনি তাই তাকিয়ে ছিলাম।”

“মিথ্যা কথা বলবে না!” বলেই বনি ইরার চিবুকটা এমনভাবে চেপে ধরল যে ইরার মনে হলো হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে যাবে। “বাপের বাড়ি থেকে তো কিছুই আনোনি, এখন কি পরপুরুষের সাথে আদিখ্যেতা করে আমার মাথা নিচু করতে চাও? মনে রেখো, তুমি আমার কেনা গোলাম। আমি তোমাকে পেটাই আর আদরে রাখি, সেটা আমার ব্যাপার। অন্য কারো দিকে যদি চোখ যায়, তবে সেই চোখ আমি উপড়ে ফেলব।”

সেদিন রাতে আরিফও ঘুমাতে পারেনি। পাশে তানিয়া দামী নাইট ক্রিম মেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যে তার স্বামী কেন বারবার এপাশ-ওপাশ করছে। আরিফের মাথায় ঘুরছে ইরার সেই ফ্যাকাশে মুখটা।

আরিফ স্পষ্ট দেখেছে ইরার গলার নিচে একটা কালচে দাগ। সে বুঝতে পারছে, ইরা সুখী নেই। তার ইরার চোখ বলে দিচ্ছিল সে এক দমবন্ধ করা খাঁচায় বন্দি। আরিফ ভাবল “আমি তো প্রতিষ্ঠিত হলাম, টাকা কামালাম। কিন্তু কী লাভ হলো? যার জন্য এই যুদ্ধ ছিল, তাকেই তো বাঁচাতে পারলাম না।”

অন্যদিকে ইরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে। আরিফকে দেখে তার ভেতরে এক ধরণের অপরাধবোধ জেগেছে।

রাত গভীর হচ্ছে। বনি ঘুমানোর আগে বেশ খানিকটা মদ্যপান করেছে এটা তার নতুন অভ্যাস নয়, তবে ইদানীং বেড়েছে। সে এখন বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে, আর ইরা বারান্দার এক কোণে গুটিসুটি মে-রে বসে আছে। তার শরীরটা ব্যথায় নীল হয়ে আছে, সারা শরীরে বনির অধিকারের প্রমাণ কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষতটা আরও গভীর।

বনি আজ মা-রতে মা-রতে বলেছিল, “তোর ওই পুরনো প্রেমিকের কথা আমি ভুলিনি মেহেরিন। ওই ছেলেকে আজ অফিসের সামনে দেখে তোর চোখমুখ যেভাবে উজ্জ্বল হয়েছিল, আমি সব বুঝেছি। মনে রাখিস, আমি বনি আমিন। তোকে জ্যান্ত কবর দিলেও কেউ বিচার করার সাহস পাবে না।”

ইরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই কি সেই জীবন যার জন্য সে নিজের সবটুকু বিসর্জন দিয়েছিল? সে কি শুধুই বনির লালসা আর ক্রোধ মেটানোর একটা বস্তু?

অন্যদিকে, আরিফের আলীশান ড্রয়িংরুমে চলছে অন্যরকম এক লড়াই। তানিয়া তার দামী আইফোনটা আরিফের সামনে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলছে, “আরিফ, এটা কী? তুমি এই মাসেও আমাকে দুবাই ট্যুরে নিয়ে যাচ্ছ না? তোমার ক্যাডার সার্ভিসের এই সামান্য বেতনে আমার শখ মিটছে না। আব্বুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে তোমার লজ্জা লাগে?”

আরিফ ফাইল থেকে মুখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল, “তানিয়া, সরকারি চাকরির একটা লিমিট আছে। আমি তো অবৈধ টাকা কামাতে পারব না। আর তোমার বাবার টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

তানিয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “তবে কেন বিয়ে করেছিলে আমাকে? ওই যে তোমার পুরনো প্রেমিকা কী যেন নাম, ইরা? তার মতো কোনো গরিবের মেয়েকে বিয়ে করলেই তো পারতে! সারাদিন তোমার পায়ে পড়ে থাকত। আমি তো আর তেমন না!”

‘ইরা’ নামটা শুনতেই আরিফের কলিজায় যেন একটা টান পড়ল। সে ধীরপায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। তানিয়া পেছনে দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছে, কিন্তু আরিফের কানে সেসব পৌঁছাচ্ছে না। সে শুধু ভাবছে আজ অফিসের সামনে দেখা হওয়া সেই বিধ্বস্ত মুখটার কথা। ইরার চোখের কোণে যে আতঙ্কের ছাপ সে দেখেছে, তা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না।

মাঝে মাঝে মধ্যবিত্ত সমাজ মেয়েদের শেখায় “স্বামী যেমনই হোক, সহ্য করে থাকাই সতীত্ব।” কিন্তু সমাজ শেখায় না যে, সম্মান ছাড়া বেঁচে থাকাটা পলে পলে ম-রে যাওয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর।

ইরা বুঝতে পারছে, বনি আর আগের মতো নেই। তার সন্দেহ এখন চরম পর্যায়ে। সে ইরার ফোনের সিম কার্ডটা খুলে নিয়ে গেছে। এমনকি বারান্দার দরজায় তালা ম-ারার পরিকল্পনা করছে। বনির কাছে ভালোবাসা মানে হলো শেকল পরানো।

আর আরিফ? আরিফ বুঝতে পারছে টাকা আর পদমর্যাদা তাকে সমাজ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তানিয়ার মতো লোভী এক নারীর সাথে জীবন কাটানো মানে হলো প্রতিদিন নিজের আত্মসম্মানকে বলি দেওয়া। তানিয়া তাকে মানুষ নয়, বরং একটা ‘টাকা ছাপানোর মেশিন’ আর ‘সোশ্যাল স্ট্যাটাস’ হিসেবে দেখে।

রাত তিনটে। ইরা আর আরিফ দুজনেই এক শহরের দুই প্রান্তে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মাঝখানে মাইলের পর মাইল দূরত্ব, কিন্তু দুজনের দীর্ঘশ্বাসের সুর একই।

ইরা মনে মনে বলছে, “আরিফ, তুমি কি এখনো কালো রঙের শার্ট পরো? তুমি কি জানো, তোমার দেওয়া সেই সস্তা রুমালটাই আমার বেঁচে থাকার শেষ সম্বল?”

আর আরিফ ভাবছে, “ইরা, আমি তো আজ প্রতিষ্ঠিত। আমার হাতে আজ ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমি কি পারব তোমাকে ওই নরক থেকে টেনে বের করতে? নাকি সমাজের এই ‘পাথরের রাজপ্রাসাদ’ আমাদের কাউকেই মুক্তি দেবে না?”

বাস্তবতা হলো, বনির মতো পুরুষেরা কোনোদিন বদলায় না, আর তানিয়ার মতো নারীদের চাহিদা কোনোদিন ফুরায় না।

চলবে,,,,

পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-১+২

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#সূর্চনা_পর্ব

“বউটাকে প্রতিদিন না মা-রলে হয় না তোর,তাই না? প্রতিদিনের এই অত্যাচার সহ্য করতে করতে মেয়েটার চেহারার অবস্থা কী করে ফেলছিস বনি?”

সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে টিভি দেখছিলেন রেখা বেগম। বনি তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দামি ইতালিয়ান সুটটা গায়ে চাপাচ্ছিল। মায়ের কথায় সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না, বরং টাইয়ের নটটা শক্ত করতে করতে আয়নাতেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে একটা তৃপ্তির হাসি দিল। বনির এই হাসিটা ইরার কাছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য।

বনি নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “মা, তুমি তো জানো, ও কেমন। সারাদিন মুখ গোমড়া করে থাকে। আমি অফিস থেকে ফিরে একটু হাসি-খুশি মুখ দেখতে চাইব, না? তার ওপর আজকে সকালে ফাইলটা ব্যাগে গুছিয়ে রাখতে বলেছি, সেটাও ভুল করেছে। সরকারি গেজেটেড অফিসার আমি, আমার কাজের গুরুত্ব ও বুঝবে না তো কে বুঝবে? একটু আধটু শাসন না করলে স্ত্রীরা মাথায় ওঠে মা।”

রেখা বেগম আর কিছু বললেন না। তার কাছে শাসনের সংজ্ঞাটা কেবল মুখের সৌন্দর্য রক্ষা পর্যন্তই সীমিত। মেয়েটার মনে কী চলছে, সেই নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি বরং টিভির ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে নিজের সিরিয়ালে মন দিলেন।

“মেহেরিন! চা দিয়ে যাও!” বনির হাঁকডাকে ইরার স্মৃতির জগত তছনছ হয়ে গেল।

ইরা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তার পায়ের শব্দে বনি ফিরে তাকাল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং একটা বিজয়ের তৃপ্তি। বনি বিশ্বাস করে, ভয় দেখিয়েই নারীকে বশ করতে হয়। সে ইশারায় ইরাকে কাছে ডাকল। ইরা ভয়ে ভয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়ালে বনি তার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল।

“কান্নাকাটি করে মুখটা একদম বিশ্রী করে ফেলেছ। আজ রাতে ডিআইজি সাহেবের বাসায় ডিনার আছে। ভালো করে মেকআপ করে নিও যাতে দাগগুলো বোঝা না যায়। আমার ইজ্জতের প্রশ্ন, বুঝলে?”

ইরা কোনো কথা বলল না। শুধু চোখের জলটুকু গিলে নিল। বনির কাছে সে কেবল তার পদমর্যাদার একটা অলংকার, যার কাজ হলো সুন্দর সেজে বনির আভিজাত্য জাহির করা। তার ডান হাতের কব্জিতে কালকের সেই ধাক্কার কালশিটেটা এখন কালচে হয়ে উঠেছে। বনি যখন রাগের মাথায় তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরেছিল, তখন একবারের জন্যও মনে হয়নি সে তার জীবনসঙ্গী। মনে হয়েছিল বনি যেন কোনো অপরাধীকে জেরা করছে।

ইরা যখন প্লেটে নাস্তা সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল, তখন বনি তার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। সেই চাহনিতে কোনো ভালোবাসা নেই, আছে কেবল মালিকানাবোধ। বনি চেয়ার টেনে বসতে বসতে কড়া গলায় বলল, “নাস্তা দিতে এত দেরি কেন মেহেরিন? কাল রাত থেকে দেখছি মেজাজটা চড়া তোমার। নিজেকে কী ভাবো তুমি? তোমার বাপের তো মুরোদ ছিল না একটা ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়ার, আমি দয়া করে ঘরে তুলেছি বলেই আজ এই এসি রুমে বসে আছো।”

ইরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। সে জানে, একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই বনির টাকার অহংকার আর পদের গরম আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়বে।

খাবার টেবিলের অন্য প্রান্তে বনির বাবা, ইরার শ্বশুর আফজাল সাহেব বসে ছিলেন। তিনি লোকটা সজ্জন, কিন্তু মেরুদণ্ডহীন। নিজের স্ত্রী আর ছেলের দাপটের সামনে তিনি তাসের ঘরের মতো অসহায়। তিনি একবার ইরার ফোলা চোখের দিকে তাকালেন, তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নিলেন।

তিনি নিচু স্বরে বললেন, “বনি, সকাল সকাল বউমা’র সাথে ওভাবে কথা বলিস না তো। ও তো একা হাতে সব সামলায়।”

বনি তৎক্ষণাৎ তার বাবার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “বাবা, তুমি নিজের ওষুধ খেয়ে নিজের ঘরে যাও তো। সংসারের ব্যাপারে তুমি কথা না বললেই ভালো হয়। মেহেরিনকে আমি আমার মতো করে চালাব।”

আফজাল সাহেব আর একটি কথাও বললেন না। নিঃশব্দে উঠে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। যাওয়ার সময় তার দীর্ঘশ্বাসটা ইরার কানে এসে বিঁধল। এই বাড়িতে এটাই নিয়ম অন্যায় দেখেও সবাই অন্ধ হয়ে থাকার ভান করে।

দুপুরের দিকে শাশুড়ি ঘরে ঢুকে কড়া গলায় বললেন, “বৌমা, বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবলে হবে না। রাতে বনির কলিগরা আসবে। দশ পদের রান্না করতে হবে। আর শোনো, ওই ছেঁড়া সুতির শাড়িটা পাল্টে লাল সিল্কটা পরো। বনি চায় না তার বন্ধুরা ভাবুক সে তার বউকে ঠিকমতো দেখাশোনা করে না।”

ইরা মনে মনে হাসল। বাইরের মানুষের কাছে সুখী দম্পতি সাজার এই অভিনয়টা করতে করতে সে ক্লান্ত। বনি তাকে মারে, গালি দেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কিন্তু সবার সামনে তাকে দামী গয়নায় সাজিয়ে প্রদর্শনী করতে ভোলে না।

আলমারি খুলতেই ইরার চোখে পড়ল আরিফের দেওয়া সেই সস্তা নীল রুমালটা। যেটা সে অনেক কষ্টে লুকিয়ে রেখেছে। রুমালটা হাতে নিতেই তার মনে হলো, সে যেন এক জীবন্ত লা-শে পরিণত হয়েছে। বনি তাকে সব দিয়েছে, শুধু তার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে।

ইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালের কালশিটেটা ভালো করে মেকআপ দিয়ে ঢাকতে শুরু করল। কারণ সে জানে, আজ রাতেও তাকে হাসিমুখে বনির পাশে দাঁড়িয়ে সুখী স্ত্রীর অভিনয়টা করে যেতে হবে।

চলবে????

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২

আয়নার সামনে বসে মেকআপের ভারি প্রলেপ লাগাতে লাগাতে ইরা ভাবছিল, মানুষের জীবনটা বোধহয় একটা বড় রঙ্গমঞ্চ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের জন্য। যেখানে চোখের পানি আড়াল করে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয় শুধু ‘সংসার’ নামক তাসের ঘরটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

বিকেলের ম-রা আলোটা জানালার গ্রিল গলে ইরার মুখে এসে পড়েছে। বনি অফিস থেকে ফেরেনি, কিন্তু তার হুকুম জারি হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজ রাতে ডিআইজি সাহেবের বাসায় ডিনার। ইরার গালের কালশিটেটা কনসিলার দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করতে করতে তার মনে হলো, সে আসলে ক্ষতটা ঢাকছে না, বরং নিজের সত্তাটাকে গুম করে ফেলছে।

দরজায় কোনো শব্দ না করেই রেখা বেগম ঘরে ঢুকলেন। ইরার সাজগোজের দিকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে বললেন, “হাতের ওই চোটের দাগটা যেন দেখা না যায় বৌমা। বনির বন্ধুদের সামনে সাবধানে থেকো। আর হ্যাঁ, রান্নাবান্নাগুলো শেষ করে তারপর তৈরি হও। কাজের মেয়েটা তো কেবল পেঁয়াজ কাটতেই পারদর্শী, আসল স্বাদ তো তোমার হাতেই আসতে হবে। বনি চায় সব পারফেক্ট হোক।”

ইরা আয়না থেকেই শাশুড়ির দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, এই নারীও কি কোনোদিন ভালোবেসে আগলে রাখার শিক্ষা পাননি? নাকি নিজের অতৃপ্ত জীবনের ঝাল তিনি পরের বাড়ির মেয়ের ওপর মিটিয়ে শান্তি পান?

ইরা মৃদু স্বরে বলল, “রান্না প্রায় শেষ মা। শুধু পোলাওটা দমে বসানো বাকি।”

“তাড়াতাড়ি করো। দেরি হলে বনি আবার চিল্লাইলে আমার শান্তি নষ্ট হবে।”বলেই তিনি নিজের ড্রয়িংরুমের সিংহাসনে গিয়ে বসলেন।

রান্নাঘরে আগুনের তাপে ইরার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। ঘাম আর বাষ্পের সাথে মিশে যাচ্ছে তার অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস। এটাই কি জীবনের পাওনা ছিল?

বনির সাথে বিয়ের সময় মেহেন্দির রঙ যখন টকটকে লাল হয়েছিল, পাড়ার ভাবিরা বলেছিল “মেয়ের ভাগ্য বটে! জামাই সরকারি অফিসার, রাজকপাল তোমার ইরা!”

ইরা এখন সেই রাজকপালের দিকে তাকিয়ে হাসে। বনি তাকে শপিং করতে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু নিজের পছন্দ চাপিয়ে দেয়। সে কী রঙের শাড়ি পরবে, কার সাথে কথা বলবে, এমনকি নিজের মার সাথে কতক্ষণ ফোনে কথা বলবে সবই বনির ইশারায় হতে হয়।

একদিন মাত্র দশ মিনিট বেশি মায়ের সাথে কথা বলায় বনি ফোনটা কেড়ে নিয়ে আছাড় মে-রে ভেঙে ফেলেছিল। চিৎকার করে বলেছিল, “বাপের বাড়ির মায়া কাটাতে না পারলে আমার ঘরে থাকার দরকার নেই।”

সেই থেকে ইরা মাকেও সব সত্যি বলা বন্ধ করে দিয়েছে। বলবেই বা কী? বাবা তো খুশি হয়েই আছেন যে মেয়ে দামী গাড়িতে চড়ছে। অভাবের সংসারের মেয়েদের কি এর বেশি কিছু চাওয়ার অধিকার আছে?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আরিফের কথা। সেই যেবার ইরার খুব জ্বর হয়েছিল। আরিফের পকেটে তখন বড়জোড় একশ টাকা। সে সেই টাকা দিয়ে কোনোমতে কয়েকটা কমলা আর নাপা কিনে ইরার হলের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল।

ইরা যখন নিচে নেমে এল, আরিফ ব্যাকুল হয়ে বলেছিল “ইরা, তুমি আমার ওপর রাগ করো না। আমি ঠিকমতো ফলও কিনে আনতে পারি না তোমার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার কলিজার সবটুকু দিয়ে তোমাকে সুস্থ করে তুলব।”

আরিফ সেদিন ইরার কপালে হাত দিয়ে ছটফট করছিল। সেই স্পর্শে কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল না কোনো ‘অফিসার’ হওয়ার দাপট। ছিল শুধু এক পবিত্র ভালোবাসা। আর আজ বনি যখন ইরার গায়ে হাত তোলে, তখন ইরার মনে হয় এই আভিজাত্যের চেয়ে আরিফের সেই নুন-ভাতের সংসারটাও জান্নাতের মতো সুন্দর হতো।

রাত আটটা। বনি ঘরে ঢুকেই ধমকের সুরে বলল, “রেডি হওনি এখনো? তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হয় না মেহেরিন। একটা গাড়ি পাঠিয়েছিলাম পার্লারে যাওয়ার জন্য, গেছলে?”

“না, বাসায় অনেক রান্না ছিল তো, তাই…” ইরা বলতে চাইল।

বনি তার গায়ের সিল্কের চাদরটা সোফায় ছুড়ে ফেলে বলল, “থামাও তোমার রান্না। সব সময় কি ঘরকুনো হয়ে থাকবে? আমি চাই তোমাকে দেখে সবাই জ্বলুক। আমার স্ত্রী হিসেবে তোমার একটা প্রেজেন্টেবল লুক দরকার। যাও, এখনই তৈরি হও। আর শোনো, ওই নেকলেসটা পরবে যেটা গত মাসে হীরা থেকে কিনে দিয়েছি।”

বনি যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম মাখছিল, তখন আয়নায় সে আর ইরার চোখাচোখি হলো। বনির চোখের সেই শীতল চাহনি ইরাকে মনে করিয়ে দেয় সে কেবলই এক দামী পুতুল।

ইরা তার আলমারির সেই লুকানো নীল রুমালটা একবার ছুঁয়ে দেখল। ওটাই তার একমাত্র অক্সিজেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাল সিল্কের শাড়িটা হাতে নিল। আজ রাতেও তাকে ‘পারফেক্ট ওয়াইফ’ হয়ে ডিআইজি সাহেবের ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে হবে, যেখানে লোকে বলবে “বনির বউটা কী সুখে আছে!”
কেউ জানবে না, এই দামি মেকআপের আড়ালে একটা প্রাণ প্রতিদিন তিলে তিলে মা-রা যাচ্ছে।

চলবে…

পরিবার পর্ব-০৫ এবং শেষ পর্ব

পরিবার
পর্ব ০৫ (শেষ পর্ব)
লেখক The Story Haven

​টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সোনার চেইনটার দিকে ঘরের সবাই কেমন যেন অসাড় হয়ে তাকিয়ে রইল। শাশুড়ি মা সোফা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। ওনার যে ‘অজ্ঞান’ হওয়ার নাটকটা এতক্ষণ চলছিল, সেটা রেখা ভাবি আর বড় ভাইয়ার টাকার লোভের মুখে পড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ওনার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল, কিন্তু সেই পানিতে আজ কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক তীব্র আত্মগ্লানি আর লজ্জার ছাপ।
​তিনি কাঁপতে কাঁপতে সোফা থেকে নেমে সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। রেখা ভাবি চড়া গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শাশুড়ি মা হাত তুলে ওনাকে থামিয়ে দিলেন। তারপর আমার হাত দুটো টেনে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
​“আমাকে ক্ষমা করে দে মা! আমাকে তুই ক্ষমা করে দে।”
​আটটা বছর এই বাড়িতে আছি, কখনো ওনার মুখে নিজের জন্য এতখানি আকুলতা শুনিনি। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “আম্মা, একী করছেন! আপনি মুরুব্বি মানুষ।”
​“না রে মায়া, আমি মুরুব্বি নামের কলঙ্ক!” শাশুড়ি মা নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম বড় ছেলে আর বড় বউকে অনেক টাকা-পয়সা দিয়েছি, ওরাই আমার আসল আপন। আর তুই তো বাইরের মেয়ে! অথচ আজ আমার এই নকল বিপদের দিনে ওরা নিজের জমানো টাকার লস হিসেব করছে, আর তুই তোর শেষ সম্বলটা আমার পায়ের কাছে এনে দিলি? এই অহংকারই কি আমি এতকাল দেখিয়েছি?”
​মারিয়া এতক্ষণ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের কান্না আর আমার এই ত্যাগ দেখে ওর ভেতরের জেদটাও যেন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমা*র হয়ে গেল। ও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। ওর চোখে তখন অনুশোচনার অশ্রু।
​“ভাবি… আমাকে মাফ করে দাও। আমি সত্যিই খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আয়রা ছোট মানুষ, ও তো বুঝেইনি। আসলে অহংকারে আমার চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তুমি আমাকে বড় বোনের মতো একটা শাস্তি দিয়েছ, আমার পাওনা ছিল ওটা।”
​মারিয়া নিচু হয়ে সোফায় বসে থাকা ছোট্ট আয়রার দুই হাত ধরল, “মামণি, ফুপিকে মাফ করে দিবি? ফুপি আর কোনোদিন তোর গায়ে হা’ত তুলবে না।”
​আয়রা প্রথমে ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়তেই ও ওর ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ফুপির চোখের পানি মুছে দিল। বাচ্চার ওই সরল স্পর্শে পুরো ঘরের গুমোট ভাবটা যেন এক নিমেষেই কেটে গেল।
​রেখা ভাবি আর ভাসুর সাহেব তখন নিজেদের ঘরের কোণে এমনভাবে গুটিয়ে গেছেন, যেন তাদের লুকানোর কোনো জায়গা নেই। যাদের জোরে তারা এতক্ষণ তড়পাচ্ছিলেন, সেই শাশুড়ি আর মারিয়াই এখন আমার পাশে। ভাসুর সাহেব কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, আর রেখা ভাবিও ব্যাগ হাতে ওনার পিছু পিছু কটমট করতে করতে চলে গেলেন। ওনাদের পরাজয়টা কোনো চিৎকারে হয়নি, হয়েছে ওনাদের নিজেদের স্বার্থপরতার আয়নায়।
​রাফি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। ও এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। ওর চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুটা রোদের আলোর মতো চকচক করে উঠল। ও মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আম্মা, রাগ-অভিমান তো পরিবারেরই অংশ। এখন চলো, সবাই মিলে একসাথে দুপুরের নাস্তাটা করি।”
​শাশুড়ি মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মায়া, ওই ছোট চুলাটা আজই ওপরে তুলে রাখবি। এই ঘরের হাড়ি একটাই থাকবে, আর সেই হাড়ির চাবি আজ থেকে তোর কোমর বেঁধে রাখবি। তুই-ই এই বাড়ির আসল লক্ষ্মী।”
​আমি হেসে চেইনটা কুড়িয়ে নিয়ে ওনার গলায় পরিয়ে দিলাম।
​আজ দুপুরের ডাইনিং টেবিলটায় আবার সবাই একসাথে বসলাম। টেবিলে তরকারির বাটি এগিয়ে দিতে দিতে আমি জানালার বাইরে নীল আকাশটার দিকে তাকালাম। একটা থাপ্প*ড়ের শব্দে যে ঝড় উঠেছিল, তা এই পরিবারকে ভেঙে টুকরো করেনি, বরং ভেতরের সব ময়লা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়ে গেছে।
​কিছু কিছু ভাঙন আসলে নতুন করে গড়ার জন্য প্রয়োজন হয়। আজ থেকে আমাদের এই পরিবার শুধু রাফির রোজগারে নয়, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসার শক্তিতে চলবে।

​(সমাপ্ত)

পরিবার পর্ব-০৪

পরিবার
পর্ব ০৪
লেখক The Story Haven

​সবার উৎসুক চোখগুলো তখন আমার ওপর এসে থমকে গেছে। রেখা ভাবির ঠোঁটে বিজয়ের ক্রূর হাসি, আর শাশুড়ি মা মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে এমন এক ভাব করছেন যেন এখনই আমার ফাঁ*সির রায় হবে। রাফির চোখের সেই অসহায় চাউনি আমার বুকটা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই যখন আমার শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে থাকা আয়রার ছোট্ট কাঁপা কাঁপা হাতটার দিকে তাকালাম, আমার ভেতরের দ্বিধা কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
​আজ যদি আমি মাথা নত করি, তবে মারিয়া আর রেখা ভাবি শুধু আমাকে নয়, আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকেও সারাজীবন পায়ের নিচে পিষে রাখবে।
​আমি সোজা ভাসুর সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গলার স্বর যতটা সম্ভব শান্ত আর দৃঢ় রেখে বললাম, “আমি মাফ চাইব না, ভাইয়া।”
​আমার কথা শেষ হতেই ড্রয়িং রুমের নীরবতা ভেঙে যেন একটা বো*মা ফাটল।
​“কী! এত বড় স্পর্ধা!” ভাসুর সাহেব রাগে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন।

​রেখা ভাবি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, “দেখলেন তো মা? দেখলেন তো ওনার তেজ? বড় ভাসুরের মুখের ওপর কীভাবে না বলে দিল! ছোট জাতের মেয়েরা এমনই অবাধ্য হয়।”
​আমি ভাবির কথার পিঠে কোনো কথা না বাড়িয়ে ভাসুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাইয়া, আপনি এই বাড়ির অভিভাবক। মারিয়া যখন একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার গায়ে হা’ত তুলল, তখন কি আপনার মনে হয়নি বড় ভাই হিসেবে ওকে একটু শাসন করা দরকার ছিল? অন্যায়টা আগে ও করেছে। নিজের মেয়ের আ*ত্মসম্মান রক্ষা করা যদি অপরা*ধ হয়, তবে আমি সেই অপ*রাধ বারবার করব। কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে আমি আমার মেয়েকে কাপুরুষ হওয়া শেখাতে পারব না।”
​রাফি আমার দিকে তাকাল। ওর চোখের সেই করুণ ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে এক চিলতে গর্বের আলো ফুটে উঠল। সে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, মায়া কোনো ভুল কথা বলেনি। ও মাফ চাইবে না।”
​ভাসুর সাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “ঠিক আছে! তবে আজ থেকে তোদের রান্না আলাদা। এই বাড়িতে তোরা থাকবি নিজেদের মতো, আমাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। রাফি, তুই যদি তোর বউয়ের এই অহংকার নিয়ে থাকতে চাস, তবে আজ থেকে তুই আমার ভাই নোস।”
​রাফি আর কোনো কথা বলল না। সে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল, আর অন্য হাতে আয়রাকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। পেছন থেকে শাশুড়ি আর রেখা ভাবির অভিশাপ আর চিল-চিৎকার তখন বাতাসে ভাসছে।
​এই ঘটনার পর কেটে গেল চারটে দিন।
​আমাদের রান্না আসলেই আলাদা হয়ে গেল। ঘরের এক কোণে একটা ছোট ইলেকট্রিক চুলা বসিয়ে আমি আর রাফি আমাদের সংসারটুকু টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এই চার দিনে কেউ আমাদের সাথে একটা কথাও বলেনি। মারিয়া আর রেখা ভাবি যখনই আমাদের সামনে দিয়ে যায়, মুখ বাঁকিয়ে বিষাক্ত কোনো মন্তব্য ছুড়ে দেয়। রাফি অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। ভাই আর মায়ের এই দূরত্বের কষ্টটা ওকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, আমি সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু ও মুখে কিছু বলে না।
​পঞ্চম দিনের দিন সকালবেলা হঠাৎ করেই নিচতলা থেকে একটা হট্টগোল শোনা গেল। মারিয়ার গগনবিদারী চিৎকার আর রেখা ভাবির কান্নার আওয়াজ।
​“ও আল্লাহ গো! মা একী হলো তোমার! চোখ খোলো মা!”
​আমি আর রাফি ধড়ফড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখি শাশুড়ি মা সোফায় শুয়ে আছেন, চোখ দুটো বন্ধ। উনি হাত-পা শক্ত করে কাঁপছেন।
​রেখা ভাবি মাথায় হাত দিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, “ছোট বউয়ের ওই অভিশপ্ত রান্না আলাদার পর থেকেই মায়ের বুকটা ধরফর করছিল। আজ সকালে নাস্তা খেতে গিয়েই মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ওনার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে ওই ছোট বউই দায়ী!”
​ভাসুর সাহেব হন্যে হয়ে ডাক্তারকে ফোন করছেন। মারিয়া আমার দিকে তেড়ে এসে বলল, “তোর জন্য আজ আমার আম্মার এই অবস্থা! তুই ডা*ইনি! এই বাড়ি থেকে দূর হ!”
​রাফি আর থাকতে না পেরে শাশুড়ির কাছে গিয়ে বসল, “আম্মা! আম্মা চোখ খোলো! কী হয়েছে তোমার?”
​কিন্তু শাশুড়ি মা চোখ খুলছেন না, শুধু মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ করছেন।
​ডাক্তার আসার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, “উনার প্রেশার অনেক হাই। স্ট্রো*কের মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ওনাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। অনেক টাকার প্রয়োজন হতে পারে।”
​হাসপাতালের নাম শুনতেই রেখা ভাবির কান্না যেন অলৌকিকভাবে একটু কমে গেল। তিনি ভাসুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “হ্যাঁ গো, হাসপাতালে নিলে তো লাখ খানেক টাকা শেষ হয়ে যাবে। আমাদের জমানো টাকাটা তো ফিক্সড ডিপোজিট করা, ওটা ভাঙলে তো লস হবে।”
​ভাসুর সাহেবও আমতা আমতা করে বললেন, “আমার ব্যবসার টাকাটাও তো আটকে আছে। রাফি, তুই কিছু কর।”
​ঠিক তখনই আমি লক্ষ করলাম, শাশুড়ি মায়ের বন্ধ চোখের কোণটা সামান্য একটু কাঁপল। উনি রেখা ভাবি আর বড় ছেলের এই টাকা নিয়ে দ্বিধাবোধের কথাগুলো খুব ভালো করেই শুনছেন। নাটকটা উনি করেছিলেন আমাদের দুজনকে অপ*রাধী বানিয়ে পায়ে ধরাতে, কিন্তু নিজের বড় ছেলে আর বড় বউয়ের আসল রূপটা যে ওনার সামনে এভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে, সেটা বোধহয় উনিও ভাবেননি।
​আমি রাফির দিকে তাকালাম। রাফি ওর মানিব্যাগ হাতড়াচ্ছে। আমি আর কিছু না ভেবে নিজের ঘরে গেলাম। আলমারি খুলে আমার বিয়ের শেষ সম্বল, মায়ের দেওয়া সোনার চেইনটা হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালাম।
​রেখা ভাবি আর ভাসুর সাহেবের সামনে চেইনটা টেবিলে রেখে শান্ত গলায় বললাম, “ভাইয়া, মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকার অভাব হবে না। এই চেইনটা বিক্রি করে ওনাকে ভালো হাসপাতালে নিয়ে যান। টাকার জন্য মায়ের চিকিৎসা আটকে থাকবে, এই শিক্ষা আমার মা আমাকে দেননি।”
​আমার কথা শুনে সোফায় শুয়ে থাকা শাশুড়ি মা হঠাৎ করেই চোখ মেলে তাকালেন। ওনার চোখে তখন আর রাগের আগুন নেই, আছে এক তীব্র লজ্জার আভাস

চলবে…

পরিবার পর্ব-০৩

পরিবার
পর্ব ০৩
লেখক The Story Haven

​বড় জা রেখা ভাবির ওই বাঁকা হাসি আর গলার স্বরে যেন পুরো বাড়ির বাতাস মুহূর্তেই বিষিয়ে উঠল। তিনি ব্যাগগুলো সোফায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। ভাসুর সাহেব (বড় ভাই) গম্ভীর মুখে রাফির ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। আমি তখনও দরজার পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে, কালকের ওই ঝড়টা থামেনি, বরং আরও বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় ডাকার প্রস্তুতি চলছে।
​শাশুড়ি মা রেখা ভাবিকে দেখেই যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “দেখরে রেখা, তুই আসছিস বড় ভালো করছিস! এই বাড়িতে আমার আর কোনো মান-সম্মান নেই। তোর ছোট জা আজ এই বাড়ির আদরের মেয়ের গায়ে হা’ত তুলেছে, আবার আমাকে মুখে মুখে তড়পিয়ে কথা শুনিয়ে দিচ্ছে!”
​রেখা ভাবি আমার দিকে একপলক তাকিয়ে শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরলেন। সান্ত্বনা দেওয়ার স্বরে বললেন, “কেঁদো না মা। আমরা থাকতে এই বাড়িতে কারো এত সাহস হবে না যে আপনার ওপর কথা বলে। আসলে দিনকাল বেশি ভালো না তো, নিচু বংশের মেয়েরা একটু প্রশ্রয় পেলেই মাথায় চড়ে বসে।”
​কথার বি’ষটা সোজা আমার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। আটটা বছর এই রেখা ভাবিও আমাকে কম জ্বালাননি। তিনি এই বাড়ির বড় বউ, বাপের বাড়ি থেকে অনেক কিছু নিয়ে এসেছেন বলে নিজেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন।

​আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম না। রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য নাস্তা তৈরির তোড়জোড় শুরু করলাম। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। একটু পর রেখা ভাবি রান্নাঘরে ঢুকলেন।
​“কী গো ছোট বউ? খুব তো তেজ দেখাচ্ছো কাল থেকে। বলি, ভাই তোকে ভাত-কাপড় দেয় বলে কি বাড়ির মালিক হয়ে গেছিস? মনে রেখো, আমার স্বামী এই বাড়ির বড় ছেলে। সম্পত্তির হিসেব হলে কিন্তু তোমাদের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।”

​আমি রুটি বেলতে বেলতে শান্ত গলায় বললাম, “ভাবি, সম্পত্তির হিসেব করতে আসিনি। আমি শুধু আমার মেয়ের অপমা*নের বিচার করেছি। মা হিসেবে আপনি হলে কী করতেন জানি না, তবে আমি আমার বাচ্চার গায়ে হাত তোলা সহ্য করব না।”

​রেখা ভাবি মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “আহা! কী সতী সাধ্বী মা রে! শোনো মায়া, রাফিকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখছো তা ভেঙে চুরমা*র হতে সময় লাগবে না। আজ রাফির বড় ভাই তাকে বোঝাতে গেছে। দেখি কতক্ষণ সে তোমার আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকে।”
​আমার হাতটা একটু থমকে গেল। রাফি কি পারবে তার বড় ভাইয়ের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে? এই বাড়িতে ভাসুর সাহেবকে সবাই য’মের মতো ভ’য় পায়।

​ড্রয়িং রুম থেকে হঠাৎ উঁচু গলার শব্দ ভেসে এল। ভাসুর সাহেব রাফিকে ধমকাচ্ছেন, “তোর লজ্জা করে না রাফি? একটা মেয়ের জন্য তুই মা আর বোনের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছিস? তোর বউকে বল মারিয়ার পায়ে ধরে মাফ চাইতে, নাহলে এই বাড়িতে তোদের জায়গা হবে না।”
​আমি পর্দা সরিয়ে দেখলাম, রাফি সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ওর মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে। একদিকে তার আদর্শ, অন্যদিকে তার বড় ভাই আর মায়ের চাপ।
​শাশুড়ি মা টিপ্পনী কেটে বললেন, “মাফ না চাইলে আজ থেকে ওর রান্না আলাদা। এই চুলায় ও আর হাড়ি চড়াতে পারবে না।”
​রাফি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখের দৃষ্টিতে গতকালের সেই দৃঢ়তা আজ কিছুটা মলিন। সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, মায়া কেন মাফ চাইবে? মারিয়া যদি আগে আয়রাকে না মা*রত, তবে মায়া কোনোদিন ওর গায়ে হাত তুলত না। দোষ তো মারিয়ারও আছে।”

​ভাসুর সাহেব টেবিল চাপড়ে বললেন, “একদম তর্ক করবি না! বড়দের মুখে মুখ দেওয়া তুই কবে থেকে শিখলি? আজ যদি তোর বউ মাফ না চায়, তবে আমার আর তোর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তুই কি চাস আমাদের ভাইয়ে-ভাইয়ে বিচ্ছেদ হোক?”
​রাফি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের নখ কামড়াচ্ছি। আমি জানি, রাফি তার ভাইকে কতটা সম্মান করে। এই ব্ল্যাক’মেইল ও সইতে পারবে না।
​রেখা ভাবি আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বললেন, “কী ছোট বউ? দেখলে তো? বাড়ির ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। এবার বলো, মাফ চাইবে নাকি ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দেবে?”

​আমি আয়রার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ভ*য়ে আমার শাড়ির কোণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে কি আমাকে আজ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে হবে? নাকি রাফির হাত ধরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াতে হবে?
​ঘরের ভেতর তখন থমথমে নীরবতা। সবাই আমার উত্তরের অপেক্ষায়। রাফিও আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে, যেন সে মনে মনে বলছে—’মায়া, এবার একটু মানিয়ে নাও, নাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।’
​আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

​চলবে…

পরিবার পর্ব-১+২

পরিবার
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven

আমার ননদ আমার ৫ বছরের মেয়ের গা’য়ে হা’ত তুলেছে শুনে আমিও সবার সামনে তাকে দুইবার থা*প্পড় দিয়ে বললাম আমার স্বামীর রোজগারের টাকায় এই পরিবার চলে আর আমার মেয়েকেই থা*প্পড় মা*রার অধিকার তোমায় কে দিলো?
এটা দেখে আমার শ্বাশুড়ি রেগে আমাকে বলতাছে তোমার মেয়েকে থা**প্পড় দিয়েছে বলে তোমার কষ্ট লেগেছে তাই তুমি মারিয়াকে থা*প্পড় মা*রলা। সেই একি কষ্ট এখন আমারো লাগতেছে। আমারো মন চাচ্ছে তোমাকে থা*প্পড় মা*রতে

আমি তখন বারান্দায় কাপড় তুলছিলাম। হঠাৎ ভেতর থেকে তীক্ষ্ণ একটা কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
“আম্মু!”
আমি দৌড়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি আয়রা গাল চেপে ধরে কাঁদছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার ননদ মারিয়া। চোখেমুখে বিরক্তি।
“কি হয়েছে?” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম।
আয়রা কিছু বলতে পারছিল না, শুধু কাঁদছিল। পাশ থেকে ছোট দেবর বলল, “ভাবি, আয়রা নাকি মারিয়ার ফোন পানিতে ফেলে দিছে। তাই মারিয়া আপু একটা থাপ্প*ড় মা*রছে।”
আমি মেয়ের গালটা হাতে নিয়ে দেখলাম লাল হয়ে আছে। ছোট্ট মুখটা কাঁপছে। সেই মুহূর্তে মাথার ভেতর যেন কিছু ছিঁড়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
“তুমি আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলছো?”
মারিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “বাচ্চা মানুষ করতে জানো না আবার কথা বলতে আসছো? ফোনটা নষ্ট হলে কি তুমি টাকা দিবা?”
আমি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আয়রার ভেজা চোখ বারবার সামনে আসছিল।
“তুমি আমাকে বলতে পারতে। ওকে মা*রার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”
“অধিকার?” মারিয়া এবার হেসে উঠল। “এই বাড়িতে সবাই ওকে মানুষ করে। শুধু তুমি একা ওর মা না আমিও ওর ফুফু।”

কথাটা শুনেই যেন শরীরের র*ক্ত গরম হয়ে উঠল। আমি আর কিছু না ভেবে সবার সামনে মারিয়াকে দুইটা থা*প্পড় দিলাম।
ঘরটা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
টিভির শব্দ পর্যন্ত যেন থেমে গেছে।
মারিয়া অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে পানি চলে এসেছে। গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আমার স্বামীর রোজগারের টাকায় এই পরিবার চলে আর আমার মেয়েকেই থা*প্পড় মা*রার অধিকার তোমায় কে দিলো?”
আমার কথা শেষ হতেই রান্নাঘর থেকে শাশুড়ি বের হয়ে এলেন। মুখ রাগে শক্ত।
“কি হয়েছে এখানে?”
মারিয়া কেঁদে উঠে বলল, “আম্মু, ভাবি আমাকে মা*রছে!”
শাশুড়ি একবার মেয়ের দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে।
“তুমি মারিয়াকে থাপ্প*ড় মা*রছো?”
আমি সরাসরি বললাম, “জি মা*রছি। কারণ ও আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে।”

শাশুড়ি ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“তোমার মেয়েকে থা*প্পড় দিয়েছে বলে তোমার কষ্ট লেগেছে, তাই তুমি মারিয়াকে থা*প্পড় মা*রলা। সেই একই কষ্ট এখন আমারও লাগতেছে। আমারও মন চাচ্ছে তোমাকে থা*প্পড় মা*রতে।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই বাড়িতে বিয়ের পর আট বছর ধরে আছি। কখনো উঁচু গলায় কথা বলিনি। কখনো নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিইনি। কিন্তু আজ আমার মেয়ের মুখটা দেখে সব ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আপনার মন চাইতেই পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার আগে কেউ একবারও ভাবেনি ও কতো ছোট।”
“ছোট?” শাশুড়ি কড়া গলায় বললেন। “ছোট মানুষ ভুল করলে শাসন করতেই হয়।”
আমি এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না।
“শাসন আর থা*প্পড় এক জিনিস না আম্মা।”
মারিয়া তখনও কাঁদছে। কিন্তু তার চোখে কান্নার চেয়ে রাগ বেশি। সে দাঁত চেপে বলল, “এই বাড়িতে আসার পর থেকেই ভাবি নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবে।”
আমি উত্তর দিলাম না।
কারণ আমি জানতাম, এখন একটা কথাও বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
ঠিক তখন দরজার বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। আমার স্বামী রাফি অফিস থেকে ফিরেছে।
ঘরের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
রাফি ভেতরে ঢুকেই বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে। সে একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর মারিয়ার কান্নাভেজা মুখের দিকে।
“কি হয়েছে?”
কেউ প্রথমে কিছু বলল না।
তারপর শাশুড়ি ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার বউ আজ তোমার বোনের গায়ে হাত তুলছে।”
রাফির মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে আমার দিকে তাকাল।
আমি আয়রাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মেয়েটা তখনও ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
রাফি ধীরে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
আমি মাথা তুললাম।
“হ্যাঁ। কারণ তোমার বোন আগে আমার মেয়েকে মে*রেছে।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঘরের সবাই তার উত্তরের অপেক্ষা করছে।
আর আমি বুঝতে পারছিলাম, আজকের এই থাপ্প*ড়ের শব্দ শুধু একটা ঝগড়া না।
এটা হয়তো এই পরিবারের বহুদিনের চাপা আগুনে প্রথম বি*স্ফোরণ।

চলবে…

পরিবার
পর্ব ০২
লেখক The Story Haven

রাফির শান্ত চাউনি আর ঘরের ওই ভারী নীরবতা যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। শাশুড়ি মা তখনও মারিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আগলে রেখেছেন তাকে, যেন আমি কোনো বড় অপরা*ধী। মারিয়া ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “ভাইয়া, দেখ ভাবি কত বড় লোক দেখায়! বলে কি না তোমার টাকায় এই সংসার চলে তাই সে যা খুশি করতে পারে!”
​রাফি ব্যাগটা সোফায় রেখে ধীরপায়ে আয়রার কাছে এল। ওর গালের লাল দাগটা দেখে রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আয়রা বাবাকে দেখে আরও জোরে কেঁদে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। রাফি ওকে কোলে তুলে নিল, কিন্তু আমার দিকে একবারও তাকাল না।
​শাশুড়ি এবার চড়া গলায় বললেন, “রাফি, তুই কি কিছুই বলবি না? তোর সামনে দাঁড়িয়ে তোর বউ আমার মেয়েকে অপমা*ন করল! তুই থাকতে এই বাড়িতে বাইরের একটা মেয়ে এসে আমার কলিজার টুকরার গায়ে হাত তুলবে?”
​রাফি মেয়ের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে খুব নিচু স্বরে বলল, “আম্মা, মারিয়া কি আয়রাকে মে*রেছে?”
​শাশুড়ি থতমত খেয়ে গেলেন, তবে সামলে নিয়ে বললেন, “মে*রেছে তো শাসনের জন্য! অত দামি ফোনটা পানিতে ফেলল, হাত তো একটু উঠবেই। বড়রা শাসন না করলে তো মাথায় উঠবে।”
​রাফি এবার মাথা তুলে মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া ভাবল ভাইয়া বোধহয় এবার আমার ওপর চড়াও হবে। সে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিল। কিন্তু রাফি শান্ত গলায় বলল, “মারিয়া, ফোনটার দাম কত ছিল?”
​মারিয়া অবাক হয়ে বলল, “পঁচিশ হাজার টাকা। কেন?”
​“আগামীকাল তোমাকে আমি নতুন একটা ফোন কিনে দেব। আর এই মাসের সংসার খরচ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা আমি কেটে রাখব। কারণ, তোমার যদি মনে হয় টাকার জন্য একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার গায়ে হাত তোলা জায়েজ, তাহলে সেই টাকা শোধ করার দায়িত্বও তোমার হওয়া উচিত।” আয়রার বয়স মাত্র পাচ বছর ওর ভালো মন্দ বুঝার বয়স এখনো হয়নি এটা মনে রেখ।

​রাফির কথায় পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। শাশুড়ি চিৎকার করে উঠলেন, “একী বলছিস রাফি? তুই নিজের বোনের চেয়ে একটা ফোনকে বড় করে দেখছিস?”
​রাফি এবার আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে একটা অদ্ভুত আক্ষেপ। সে বলল, “আমি ফোনের কথা বলছি না আম্মা। আমি সম্মানের কথা বলছি। এই বাড়িতে আট বছর ধরে মায়া (আমার নাম) মুখ বুজে সব সহ্য করে আসছে। তোমরা ওকে ‘বাইরের মেয়ে’ বলো, কথা কথায় খোঁটা দাও—ও কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু আজ ও মা হিসেবে প্রতিবাদ করেছে। মেয়ের গালের ওই দাগটা আমার কলিজায় লেগেছে আম্মা। মারিয়া যদি শাসনের অধিকার রাখে, তবে মায়ারও অধিকার আছে নিজের সন্তানকে রক্ষা করার।”
​আমি অবাক হয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে রইলাম। যে মানুষটা সবসময় ঝগড়া এড়িয়ে চলত, আজ সে আমার পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছে।
​শাশুড়ি রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে চলে গেলেন। মারিয়া অপমা*নে গজগজ করতে করতে সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। বসার ঘরে তখন শুধু আমি, রাফি আর আমাদের ছোট মেয়েটা।
​রাফি আয়রাকে নিচে নামিয়ে দিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি ঠিক কাজটাই করেছ মায়া। তবে একটা কথা ভুল বলেছ।”
​আমি ভয়ার্ত চোখে তাকালাম। রাফি আমার হাত দুটো ধরে বলল, “আমার টাকায় এই সংসার চলে না মায়া, আমাদের ত্যাগে এই সংসার চলে। তুমি যদি আজ প্রতিবাদ না করতে, তবে আয়রা সারাজীবন মাথা নিচু করে থাকতে শিখত। কিন্তু মনে রেখো, আজকের পর এই বাড়িতে তোমার পথ চলা আরও কঠিন হয়ে যাবে।”
​আমি জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকালাম। আমি জানি, কাল সকালটা অন্যরকম হবে। শাশুড়ির অবহেলা আর ননদের বিষাক্ত কথা আরও বাড়বে। কিন্তু আমার কোনো আফসোস নেই। আজ আয়রা যখন শান্ত হয়ে আমার বুকে মাথা রাখল, আমি বুঝলাম একজন মায়ের কাছে নিজের আত্মসম্মানের চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তা অনেক বড়।
​পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। শাশুড়ি রান্নাঘরে হাড়ি-পাতিল সজোরে শব্দ করছেন। আমি চা নিয়ে টেবিলে বসতেই তিনি এসে সামনে দাঁড়ালেন।
​“তোর অহংকার তো অনেক বেড়ে গেছে রাফির আশকারা পেয়ে। মনে রাখিস, এই বাড়ির শিকড় আমি। ডালপালা কাটলেও গাছ উপড়ে ফেলা অত সহজ না।”
​আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বললাম, “গাছ উপড়ানোর ইচ্ছা আমার নেই আম্মা। আমি শুধু ডালপালাগুলোকে একটু ছেঁটে দিতে চাইছি, যাতে আগাছা হয়ে সেগুলো আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে।”
​শাশুড়ির মুখ রাগে নীল হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখি সামনে আমার বড় জা আর ভাসুর দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে ব্যাগ-পত্তর।
​বড় জা বাঁকা হেসে বললেন, “শুনলাম ছোট জা তো এই বাড়িতে তুলকালাম ঘটিয়ে দিয়েছে? খবর পেয়েই চলে আসলাম। দেখি কার জোর কত!”
​আমি এই কথা শুনে শুধু হেবলার মতো তাকিয়েই ছিলাম ।

​চলবে…

বৃষ্টি ভেজা মৌসুমে তুমি এলে পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

#বৃষ্টি_ভেজা_মৌসুমে_তুমি_এলে
#পর্ব২(শেষ)
#রাউফুন
​আকাশের মুখ ভার। সকাল থেকেই ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা, যেন শ্রাবণের ধারা নামবে বলে পণ করেছে। মিরা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখছিল। আজ তিন দিন হলো সে গৃহবন্দী। বাবা তার ফোন কেড়ে নিয়েছেন, বাইকের চাবি এখন আসাফ সাহেবের ড্রয়ারে তালাবদ্ধ। তবে শরীরের কালশিটে দাগগুলো কমলেও মনের ভেতরের অস্থিরতা কমছে না। সেই রাতের সেই রক্তমাখা মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। লোকটা কি বেঁচে আছে? নাকি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে?
​হঠাৎ নিচ থেকে অনেকগুলো গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। মিরা উঁকি দিয়ে দেখল, কালো কাঁচ ঢাকা কয়েকটা দামি এসইউভি তাদের পোর্টিকোতে এসে দাঁড়িয়েছে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানদের বাধা দেওয়ার সাহসও হলো না কারো। গাড়ি থেকে সুটেড-বুটেড কয়েকজন লোক নামল, যাদের একজনের হাতে একটি বড় ফুলের তোড়া এবং অন্যজনের হাতে একটি দামী স্যুটকেস।
​মিরা কৌতূহলী হয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে তখন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি। জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দার রাগে কাঁপছেন। তার সামনে সোফায় পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে একজন যুবক। পরনে সাদা লিনেন শার্ট, গলার কাছে কয়েকটা বোতাম খোলা, যেখানে ব্যান্ডেজের সাদা অংশ উঁকি দিচ্ছে। কপালে সেই গভীর কাটা দাগটা এখন অনেকটা শুকিয়ে এলেও তার চোখের সেই ‘মৃত্যুঞ্জয়ী তেজ’ এক বিন্দু কমেনি।
​সে আর কেউ নয়, শাহরিয়ার আর্যান।
​”আপনি কি জানেন আপনি কার বাড়িতে ঢুকেছেন? আমি চাইলে এখনই পুলিশ ডেকে আপনাকে অ্যারেস্ট করাতে পারি!” আসাফ সাহেবের কণ্ঠস্বরে বজ্রপাত।
​আর্যান ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে ধীরস্থিরে পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে জ্বালাল, সিগারেট ধরিয়ে তারপর সেটা আবার নিভিয়ে দিয়ে বলল, “পুলিশ? আসাফ সাহেব, আপনি তো আইনের লোক, আপনি ভালো করেই জানেন শেরিফকে ধরার মতো হাত এই শহরের পুলিশের নেই। আর আমি এখানে কোনো ক্রাইম করতে আসিনি, আমি এসেছি আমার ঋণ শোধ করতে।”
​মিরা সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। আর্যান মাথা ঘুরিয়ে মিরার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অন্যরকম দ্যুতি। সে উঠে দাঁড়াল এবং আসাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার মেয়ে ওই রাতে আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আমি আমার জীবনের দেনা কারো কাছে রাখি না। এই স্যুটকেসে যা আছে, তা আপনার আগামী পাঁচ বছরের আয়ের চেয়েও বেশি। আর ওই তোড়াটা,ওটা মিরার জন্য।”

​মিরা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো ভয় নেই, বরং এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। সে আর্যানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, “আমি টাকা বা উপহারের জন্য আপনাকে বাঁচাইনি। ওটা আমার জেদ ছিল। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও বাঁচাতাম।”

​আর্যান মিরার খুব কাছে এগিয়ে এল। এতো কাছে যে মিরা তার নিশ্বাসের তপ্ত ছোঁয়া অনুভব করতে পারছিল। আর্যান নিচু স্বরে বলল, “তোমার জেদ আমাকে মরতে দেয়নি মিরা। কিন্তু এখন আমার জেদ তোমাকে নিয়ে। তুমি আমার জন্য যা করেছ, তার বিনিময় তো হবেই, তবে সেটা টাকায় নয়, অধিকার দিয়ে।”
​বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আসাফ সাহেব গর্জে উঠলেন, “বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে! মিরা, তুমি ভেতরে যাও!”

​আর্যান আসাফ সাহেবের দিকে ফিরে বলল, “আজ যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখবেন, শেরিফ যা একবার হাত বাড়িয়ে ধরে, তা সে আর ছাড়ে না। আপনার আইন আর আমার ক্ষমতার লড়াইয়ে মিরা যেন মাঝখানে পিষ্ট না হয়, সেটা খেয়াল রাখবেন।”

​আর্যান চলে যাওয়ার সময় মিরার দিকে এক নজর তাকাল। সেই চাহনিতে কী ছিল? ভালোবাসা নাকি অধিকারের নেশা? মিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, এই বর্ষা তার জীবনে কেবল বৃষ্টি নয়, এক কালবৈশাখী নিয়ে আসছে।
​পরের দুদিন মিরা লক্ষ্য করল তাদের বাড়ির চারপাশে সারাক্ষণ কয়েকটা অচেনা গাড়ি টহল দিচ্ছে। তার বাবা তাকে কড়া পাহারায় রেখেছেন, এমনকি ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ারও অনুমতি নেই। কিন্তু আর্যান কি এত সহজে হার মানার পাত্র?
​সেদিন বিকেলে বৃষ্টির তোড় আরও বাড়ল। মিরার ঘরের কাঁচের জানালায় কেউ যেন ছোট পাথর ছুড়ে মারল। মিরা জানলা খুলতেই দেখল নিচে রেইনকোট পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে ইশারায় দেখাল পাশের বাগানের দেয়াল। মিরা কোনো কিছু না ভেবেই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে পেছনের দেয়ালের কাছে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর্যান। তার জখম হওয়া শরীরটা বৃষ্টির ঝাপটায় কিছুটা কুঁকড়ে গেলেও সে অবিচল।
​”তুমি এখানে কেন?” মিরা ফিসফিস করে বলল।

​”তোমাকে নিতে এসেছি। ওই চার দেয়ালের জেলখানায় তোমাকে মানায় না। তুমি রাজপথের মেয়ে, বাতাসের সাথে তোমার মিতালি। চলো যায়!” আর্যান হাত বাড়িয়ে দিল।

​”আমার বাবা তোমাকে ছেড়ে দেবে না আর্যান। তুমি জানো না সে কতটা প্রভাবশালী। আর আমি যাবো কেন তোমার সঙ্গে?” মিরা দ্বিধায় ভুগছিল।

​”তোমার বাবা আইনের বিচার করেন, আর আমি করি ভাগ্যের। এসো আমার সাথে। আজ থেকে তোমার কোনো ভয় নেই। তোমাকে ছোঁয়ার শক্তি এই দুনিয়ায় কারো নেই।” আর্যানের কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়া আর নির্ভরতা ছিল।

​মিরা সেই হাত ধরল। সে জানত না সে কোন অতল গহ্বরে পা রাখছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকার জগতের রাজপুত্রের সাথেই হয়তো তার মুক্তি। এই প্রথম সে অনুভব করলো সে এইবার একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজের জীবনের জন্য। ভালোবাসা এখন নেই পরে হতেও পারে। আর তার কেন যেন মনে হচ্ছে তার স্বাধীনতায় এই লোকটা তার বাবার মতো বাধা হবে না। তাকে আগলে রাখবে। তার মতো একজন শক্তিশালী মানুষ তার ব্যাক আপ হিসেবে থাকলে কাত সাধ্যি তার ক্ষতি করবে? বৃষ্টির ধারায় ধুয়ে যাচ্ছিল সব পিছুটান। আর্যান তাকে মিরার বাইকেই তুলল, সেই কালো কাওয়াসাকি নিঞ্জা, যা ওই রাতে দুজনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। মিরার চুল ভিজে একাকার, আর্যানের জ্যাকেট আঁকড়ে ধরে সে ঝড়ের বেগে অজানার পথে পাড়ি দিল।
​পেছনে পড়ে রইল আভিজাত্যের বন্দিশালা আর বাবার শাসন। সামনে কেবল বৃষ্টির অঝোর ধারা আর এক অনিশ্চিত কিন্তু রোমাঞ্চকর ভবিষ্যৎ।

​আর্যান তার ব্যক্তিগত ডুপ্লেক্স বাংলোয় মিরাকে নিয়ে এল। শহর থেকে দূরে, ঢাকার উপকণ্ঠে এক নির্জন জায়গায় এই বাড়ি। চারপাশে ঘন বন আর মাঝখানে আধুনিক স্থাপত্যের এই ঘর। মিরা ভিজে একাকার হয়ে কাঁপছিল। আর্যান তাকে একটা তোয়ালে আর নিজের একটা বড় শার্ট দিল পরার জন্য।
​”এখানে তুমি নিরাপদ। জ্যাক বাইরে পাহারা দিচ্ছে।” আর্যান শান্ত গলায় বলল।
​মিরা শার্টটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। বড় শার্টে তাকে আরও বেশি মায়াবী লাগছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল আর্যান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। তার পিঠের পেশিগুলো শার্টের ওপর দিয়েও বোঝা যাচ্ছে। মিরা ধীর পায়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
​”এরপর কী হবে আর্যান? পুলিশ আমাদের খুঁজবে। বাবা শান্তি পাবে না। আমাকেও শান্তিতে থাকতে দেবে না।।” মিরা চিন্তিত স্বরে বলল।

​আর্যান সিগারেটটা নিভিয়ে মিরার দিকে ফিরল। তার দুই হাত মিরার কাঁধে রাখল, “আমি সব ব্যবস্থা করেছি মিরা। কাল সকালেই আমরা সীমান্ত পার হয়ে যাব। তবে তার আগে, আমি তোমাকে আমার করে নিতে চাই। কোনো জোর নয়, কোনো অধিকার নয়, স্রেফ ভালোবাসায়।”

​মিরা আর্যানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো দাপট নেই, আছে এক বুক তৃষ্ণা। মিরা বুঝতে পারল, এই কঠোর হৃদয়ের মানুষটার ভেতরেও একটা নিঃসঙ্গ শিশু লুকিয়ে আছে, যে কেবল একটু আশ্রয় চায়। মিরা তার ছোট হাত দুটো দিয়ে আর্যানকে জড়িয়ে ধরল, “আমি তোমার সাথেই থাকব আর্যান। যেখানেই তুমি নিয়ে যাও।”

​সেই রাতেই কাজী ডেকে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। রাখ ঢাক করে বিয়ে করলে পাছে তার শত্রুরা তার বউয়ের ক্ষতি করতে পারে। তাই তার দূর্বলতা কে সে লুকিয়েই রাখবে। বিয়ের সাক্ষী হিসেবে রইল আর্যানের অনুগত দেহরক্ষীরা আর বাইরের অবিরাম বর্ষণ। কাজী চলে যাওয়ার পর সারা বাড়িতে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে এল।
​বাসর ঘরটা আর্যান নিজের হাতে সাজিয়েছে। তবে ফুলে নয়, নীল আলোর মৃদু আভা আর কিছু সুগন্ধি মোমবাতি দিয়ে। বাইরে তখনো বৃষ্টির ছন্দ চলছে। ঘরের ভেতরে রজনীগন্ধার তীব্র ঘ্রাণ আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করেছে।
​মিরা বিছানায় বসে ছিল। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের সিল্কের শাড়ি, যা আর্যান তার জন্য এনে রেখেছিল। আর্যান ঘরে ঢুকে দরজাটা ধীরে বন্ধ করে দিল। সে যখন মিরার সামনে এসে দাঁড়াল, মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করল। আজ সে কোনো বিদ্রোহী রেসার নয়, আজ সে কেবল আর্যানের নববিবাহিত স্ত্রী।
​আর্যান মিরার চিবুক ধরে মুখটা তুলল,”ওই রাতে যখন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম কোনো অপ্সরা নেমে এসেছে। স্পিড আর আগুনের মিশেলে তৈরি তুমি এক অনন্য নারী।”

​মিরা ফিসফিস করে বলল, “আর আমি ভেবেছিলাম তুমি এক উদ্ধত অহংকারী লোক, যাকে বাঁচানোই আমার ভুল ছিল।”

​”সেই ভুলের মাসুল এখন সারা জীবন দিতে হবে মিরা। পারবে তো এই শেরিফের সাথে নরকের পথে হাঁটতে?” আর্যান মিরার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল।

​”তোমার সাথে থাকলে নরকও আমার কাছে স্বর্গ মনে হবে।” মিরা চোখ বন্ধ করে বলল।

​আর্যান মিরার শাড়ির আঁচলটা একটু সরিয়ে তার কাঁধের ছিলে যাওয়া দাগটার ওপর হাত রাখল। যে দাগটা ওই রাতের দুর্ঘটনার স্মৃতি বহন করছে। সে সেখানে অত্যন্ত কোমলভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। মিরার সারা শরীরে এক শিহরণ খেলে গেল। বৃষ্টির শব্দ তখন আরও তীব্র হয়েছে, যেন প্রকৃতির এই উদ্দামতা তাদের মিলনকে স্বাগত জানাচ্ছে।
​আর্যান মিরাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। মোমবাতির আলোয় দুজনের ছায়া দেয়ালে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আর্যান মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ থেকে তুমি শুধু আমার। পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”
​মিরা তার হাত দুটো আর্যানের গলায় জড়িয়ে ধরল। উষ্ণতার এক গভীর স্রোত বয়ে গেল দুজনের মাঝে। বাইরের বর্ষা আর ভেতরের দহন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হলো। সব ঘৃণা, সব আভিজাত্য আর অপরাধের জগত পেছনে ফেলে তারা দুজনে ডুব দিল এক আদিম অকৃত্রিম ভালোবাসার সমুদ্রে।
​ভোর হওয়ার আগেই তাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে। এক নতুন দেশ, নতুন নাম আর নতুন জীবন। কিন্তু এই বৃষ্টিভেজা রাতের স্মৃতি তাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। যেখানে এক বিদ্রোহী মেয়ে আর এক আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্রাট তাদের সব পার্থক্য মুছে দিয়ে এক হয়ে গিয়েছিল।
​বৃষ্টি থামল শেষ রাতে। তবে মিরা আর আর্যানের জীবনের নতুন বসন্ত কেবল শুরু হলো।

​#সমাপ্ত

বৃষ্টি ভেজা মৌসুমে তুমি এলে পর্ব-০১

#বৃষ্টি_ভেজা_মৌসুমে_তুমি_এলে
#পর্ব১
#রাউফুন

রাত তখন গভীর। ঢাকার রাজপথ এখন কোনো তিলোত্তমা নগরী নয়, বরং এক নির্জন অরণ্যের মতো নিস্তব্ধ। তবে সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিচ্ছে একটি বিশেষ শব্দ, একটি শক্তিশালী সুপারবাইকের ইঞ্জিনের গর্জন। কুচকুচে কালো রঙে ঢাকা একটি কাওয়াসাকি নিঞ্জা এইচ-টু নিয়ে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যেন উড়ছে মিরা হায়দার। বাতাসের ঝাপটা তার হেলমেটের ভাইজর ঘষে বেরিয়ে যাচ্ছে। স্পিডোমিটারে কাঁটা ১৭০ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। এই হাই-স্পিড রেসিং তার কাছে কেবল শখ নয়, বরং তার দমবন্ধ করা আভিজাত্য থেকে পালানোর একমাত্র রাস্তা।
মিরার পরিচয় এই শহরের উচ্চবিত্ত সমাজের কাছে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। সে জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দারের একমাত্র মেয়ে। যে আসাফ হায়দারের কলমের এক খোঁচায় বড় বড় অপরাধীর ফাঁসি হয়, তার মেয়ে কেন এভাবে বখে গেল, সেই উত্তর কারো জানা নেই। কিন্তু মিরার কাছে এই গতিই স্বাধীনতা।
হঠাৎ হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় সামনে কিছু একটা নড়ে উঠল। মিরার চোখ কুঁচকে এল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে একজন মানুষ টলতে টলতে এগিয়ে আসছে। পরনে সাদা শার্ট, কিন্তু সেই সাদার বুক চিরে রক্তের স্রোত নেমে এসেছে কালচে লাল হয়ে। লোকটার এক হাতে একটা পিস্তল, অন্য হাত পেটে চেপে ধরা।
“শিট!” মিরা দাঁতে দাঁত চেপে হার্ড ব্রেক কষল।
১৭০ কিমি বেগে চলা বাইক হঠাৎ থামতে চাইলে যা হয়, তাই হলো। টায়ার ঘষার বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, নীল ধোঁয়ায় ভরে গেল রাস্তা। বাইকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপাশে হেলে গিয়ে স্কিড করল প্রায় বিশ ফিট। মিরা ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশে ডিভাইডারের কাছে। তার হাতের গ্লাভস ছিঁড়ে গিয়ে তালু ছিলে গেছে, কনুইতে প্রচণ্ড আঘাত। কিন্তু হেলমেট পরা থাকায় মাথাটা বেঁচে গেল।
সে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার শরীর জ্বলছে। কার জন্য আজ তার এই অবস্থা? সে সামনে তাকাতেই দেখল সেই লোকটা এখন রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। তার শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। মিরা রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে গেল, ইচ্ছা ছিল লোকটাকে আচ্ছা করে শুনিয়ে দেবে। কিন্তু কাছে যেতেই তার কথা আটকে গেল।
ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দেখল লোকটার মুখ। তীক্ষ্ণ নাক, চাপ দাড়ি, আর কপালে একটা গভীর কাটা দাগ যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে চোখে পড়ছে। লোকটা মুখ তুলে মিরার দিকে তাকাল। সেই চোখে ভয় নেই, আছে এক অমোঘ মৃত্যুঞ্জয়ী তেজ।
ছেলেটার নাম শাহরিয়ার আর্যান। আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট, যাকে মানুষ ‘শেরিফ’ বলে চেনে। আজ নিজেরই বিশ্বস্ত মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় সে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বুলেটে। কিন্তু তার এই অসহায় অবস্থাতেও তার ব্যক্তিত্বে এমন এক দাপট আছে যা মিরাকে থমকে দিল।
আর্যান কোনোমতে ফিসফিস করে বলল, “সরে যাও… ওরা পিছু নিয়েছে… নিজের ভালো চাইলে চলে যাও মেয়ে। ”

মিরা জেদি হাসল। সে বখে যাওয়া হতে পারে, কিন্তু সে ভিতু নয়। সে দেখল আর্যানের শার্টের নিচে ক্ষতটা বেশ গভীর। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মিরা জানে, এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই একটা প্রাইভেট ক্লিনিক আছে যেখানে পরিচয় গোপন রাখা যায়। সে বাইকটা কোনোমতে টেনে তুলল। আয়রন লেডিখ্যাত এই বাইকের পেছনের সিটে চাপড় দিয়ে সে আর্যানকে কমান্ড করল।
“মরার শখ থাকলে এই রাস্তায় পড়ে থাকুন। আর যদি বাঁচতে চান, তবে চেপে বসুন। আপনাকে বাঁচানো এখন আমার জেদ। কারণ আমার রেস কেউ কোনোদিন থামাতে পারেনি, আপনিও পারবেন না।”

আর্যান অবাক চোখে মেয়েটির দিকে তাকাল। মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও সে এক অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করল এই মেয়েটার প্রতি। তআর কারণ হইতো এটাই, এই জীবনে সবাই শুধু তাকে মা’রতেই চেয়েছে, পথের কাটার মতো ভেবে উপড়াতে চেয়েছে কিন্তু এই মেয়েটাই প্রথম যে কিনা তাকে বাঁচানোর জন্য তৎপর হচ্ছে। তার গলার স্বর, তার চোখের আগুন, আর্যান তার সারা জীবনেও এমন কিছু দেখেনি। সে তার শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে বাইকের পেছনে উঠে বসল। মিরার কাঁধ শক্ত করে ধরল সে। মিরার জ্যাকেটে গরম রক্তের ছোঁয়া লাগতেই সে শিউরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই থ্রটল ঘুরিয়ে বাইক ছোটাল ঝড়ের গতিতে।
পেছনের রিয়ার-ভিউ মিররে আর্যান দেখল মেয়েটার উড়ন্ত চুল হেলমেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। সে কি মানুষ নাকি কোনো অপ্সরা? জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে আর্যানের মনে কেবল একটা কথাই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল,”একে আমার চাই। যে আমাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকেও খুঁজে বের করব।”

হসপিটালের ইমার্জেন্সি গেটে আর্যানকে এক প্রকার ঠেলে নামিয়ে দিয়ে মিরা এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। স্ট্রেচারে করে তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় আর্যান একবার হাত বাড়িয়ে মিরাকে ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু মিরা তখন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছে রাতের আঁধারে। না গেলে সে এই বাইক রেসে হেরে যাবে। হার শব্দটা তার অভিধানে নেই। রেস সেই জিতবে।

রাত চারটে বেজে পনেরো মিনিট। ধানমণ্ডির অভিজাত ‘হায়দার ভিলা’র বিশাল লোহার গেটটা খুলে গেল। মিরা বাইকটা গ্যারেজে পার্ক করে টলতে টলতে মেইন দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার জ্যাকেটে রক্তের কালচে দাগ, হাতে পটি বাঁধা। সে আশা করেছিল সবাই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। রেস জেতার আনন্দ টা নিমিষেই তলিয়ে গেলো অতলে।
পুরো ঘরের ঝাড়বাতি জ্বলছে। বিশাল রাজকীয় সোফায় বসে আছেন জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দার। তার সামনে রাখা টি-টেবিলে সাজানো কিছু ফাইল। পাশে তার মা মেহজাবিন বেগম, আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। এই নীরবতা শ্মশানের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
আসাফ সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর পাথরের মতো ভারী শোনাল, “মিরা হায়দার, তুমি কি জানো এখন কটা বাজে?”

মিরা কোনো উত্তর দিল না। সে দেয়াল ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। আসাফ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার পরনে সিল্কের নাইট গাউন, চোখে একরাশ ঘৃণা আর হতাশা।
“আমি কাল সুপ্রিম কোর্টে এক বড় স্মাগলারের সাজা ঘোষণা করতে যাচ্ছি। আর আমার নিজের মেয়ে রাতভর রাজপথে কুলাঙ্গারদের মতো বাইক চালিয়ে রক্ত মেখে ঘরে ফিরছে! ছিঃ মিরা! লোকে বলে আমি অন্যের বিচার করি, কিন্তু নিজের ঘরই ঠিক করতে পারিনি। তোমার জন্য আর কি কি শুনতে হবে আমাকে? বলো?”

মেহজাবিন বেগম ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, “কেন করিস এমন মিরা? কিসের অভাব তোর? কবে তুই একটা ভদ্র মেয়ের মতো জীবন কাটাবি? আমাদের সম্মানটা কি ধুলোয় মিশিয়ে না দিলে তোর শান্তি হবে না?”

মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে কোনো কথা বলে লাভ নেই। তার বাবা তাকে কেবল একজন জাজের মেয়ে হিসেবে দেখে, নিজের সন্তান হিসেবে নয়। তাকে ভালোবেসে কখনো শাসন করেছে? কখনো ভালোবাসা প্রকাশ করে, আদুরে স্নেহময় কন্ঠে বলেছে, মা তুমি এমন বিপথে যেও না? বরং সে শুধু ভেবেছে নিজের সম্মান, নিজের পদমর্যাদা, এখানে যেনো কোনো ধুলো না আসে সেই চিন্তায় সে করেছে, কেবল নিজের জোশ, খ্যাতি ধরে রাখতে লোকটা এমন মরিয়া হয়ে তাকে শাসন করে। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পেছন থেকে বাবার গর্জন শোনা গেল,
“কাল থেকে তোমার বাইকের চাবি আমার কাছে থাকবে। কোনো হাতখরচ পাবে না তুমি। এই ছন্নছাড়া জীবন আমি বন্ধ করেই ছাড়ব!”

মিরা তার নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। সে অন্ধকারের মধ্যে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, কিন্তু তার মন পড়ে আছে সেই হসপিটালের বেডে। কে ছিল সেই ছেলেটা? যার চোখের দৃষ্টিতে একাধারে হাহাকার আর রাজকীয়তা ছিল?
মিরা জানত না, এই এক রাতের ঘটনা তার পুরো জীবনটাকে পাল্টে দিতে যাচ্ছে। সে যখন নিজের রক্তাক্ত জ্যাকেটটা খুলছিল, তখন সে লক্ষ্য করল আর্যানের শার্টের একটা বোতাম তার চেইনে আটকে আছে। সেই ছোট রুপালি বোতামটা হাতে নিয়ে মিরা ভাবল, এ কি শুধুই কোনো অ্যাক্সিডেন্ট, নাকি কোনো বড় ধ্বংসের শুরু?
ওদিকে হসপিটালের বেডে জ্ঞান ফেরার পর আর্যান প্রথম যে নামটি তার বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ‘জ্যাক’-কে বলল, তা হলো, “সেই মেয়েটা। যার বাইকের পেছনে আমি চড়েছিলাম। কাল সূর্যাস্তের আগে তার পরিচয় আমার হাতে চাই। সে এখন থেকে কেবল শাহরিয়ার আর্যানের।”

#চলবে