বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 15



What Makes Modern Online Casinos So Popular

What Makes Modern Online Casinos So Popular

Online casino sites have become one of the most vibrant corners of the digital home entertainment globe. Their appeal lies in the blend of excitement, convenience and constant technology. Gamers no longer need to visit physical venues to experience real-money video gaming. Rather, they can open a mobile application or web browser and access hundreds of video games within mins. This comfort has actually created a brand-new generation of gamers who value adaptability and rapid access over standard online casino routines.

The development of secure payment techniques and reliable systems has also strengthened trust. Accredited operators comply with stringent regulations, while modern encryption technologies protect every transaction. Therefore, players really feel safer depositing and taking out funds on-line than ever.

The Selection of Games Available Today

One of the strongest benefits of on-line gambling enterprises is the sheer deepness of their video game libraries. Digital platforms supply everything from timeless pokies and modern-day video clip slots to table video games like blackjack, roulette and baccarat. Online dealership areas add an additional layer of realistic look by streaming human croupiers directly to the gamer’& rsquo; s display. These workshops integrate real online casino ambience with the comfort of playing at home.

The consistent release of new titles keeps the experience fresh. Game service providers frequently introduce upgraded mechanics, enhanced graphics and appealing bonus offer rounds. With numerous choices readily available, players can switch over in between motifs and gameplay styles without feeling limited.

Rewards and Promotions That Forming Player Experience

On-line gambling establishments typically stand out via their marketing systems. Rewards can enhance very early sessions, expand gameplay time and supply a chance to discover new games. Although every offer has specific problems, the structure of bonuses plays a significant function in bring in new gamers. Operators create unique incentives for different sorts of users, making certain novices and seasoned gamers alike can locate something that matches their style.

Promotions also construct lasting interaction. Routine incentives, special occasions and exclusive campaigns assist preserve rate of interest even after the initial deposit. This recurring value is just one of the reasons why many gamers stay loyal to details gambling enterprise brand names.

The Value of Mobile-First Platforms

Mobile video gaming has changed the entire online casino site market. Most players currently access their preferred video games through smartphones instead of desktops. This shift has actually encouraged operators to optimise every attribute for smaller screens, making mobile experiences smoother, quicker and extra user-friendly.

Touch-based user interfaces allow all-natural interaction with games, while light-weight application variations use instantaneous access without jeopardizing on high quality. Mobile-friendly style also makes certain players can take pleasure in quick sessions during breaks or commutes. Because of this, mobile casino sites have actually come to be the key entrance to on-line gaming for several customers worldwide.

Safety and security, Licensing and Responsible Video Gaming

Depend on is the structure of on-line casino success. Reliable operators obtain permits from recognised authorities and comply with stringent regulative regulations. These permits verify that games make use https://testtest-test.com/perevirka/ of audited arbitrary number generators which payouts adhere to clear regulations. Financial systems additionally play a important role, as encrypted transactions and modern safety devices secure sensitive information.

At the same time, responsible gaming devices assist make sure that players remain in control. Functions such as deposit limits, cooldowns and self-exclusion choices produce a safer and a lot more encouraging atmosphere. The industry remains to progress with new policies made to protect gamers from risky behaviours.

The Future of Online Gambling Establishment Enjoyment

The future of on the internet gaming points towards also better technology. Virtual reality experiences, boosted live-dealer communications and ultra-fast settlement systems are ending up being extra common. Game programmers explore motion picture graphics and advanced technicians that make electronic play extra immersive.

As innovation continues to advance, on the internet casino sites will likely deliver a lot more customised experiences. Tailored suggestions, adaptive rewards and interactive features will certainly shape the next stage of electronic gaming. The market reveals no signs of decreasing, and gamers can anticipate an progressively abundant and appealing atmosphere in the years ahead.

সোনার কানের দুল পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

#সোনার_কানের_দুল
#শেষ_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
কলমে অনিন্দিতা

পরের দিন সকাল থেকেই মুখটা গোমড়া করে ঘুরছিল দিয়া। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিকঠাক আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

একটাই চিন্তা বারবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল—মাকে কীভাবে একটা দুল দেওয়া যায়! এটা এখন খানিকটা জেদে পরিণত হয়েছে যেন! সবটাই কি জেদ?

দিয়া ছোটবেলা থেকেই দেখেছে, জামাইষষ্ঠীতে দিদিরা নিজেদের সামর্থ্য মতো মায়ের জন্য কত কী নিয়ে আসে। কেউ শাড়ি, কেউ গয়না, কেউ আবার দামি কোনো জিনিস। দিদিরা তো ওর কেউ চাকরি করে না! জামাইবাবুরা তো নিজেরাই সব চাহিদা মিটিয়েছে দিদিদের। আর শুভ? শুভ হয়তো ওর কোনো অভাব রাখেনি! না চাইতেই সব দিয়েছে, কিন্তু মা! মায়ের জন্য কিছু চাইতে ইচ্ছে করছে না দিয়ার! আর এই বাড়িটাও এমন জায়গায় বেরিয়েছে যে কিছু নিয়ে আসবে! তার আগেই হাজার উত্তর দিতে হবে! আগে বুঝলে ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করত!

নিজেকে কেমন যেন হেরে যাওয়া মানুষ মনে হচ্ছিল।
ওর মা পেল, আমার মা পেল না—এই ভাবনাটাই বারবার হারিয়ে দিচ্ছে দিয়াকে। অথচ মা কতবার বলেছে, “এত ইগো নিয়ে সংসার করতে নেই রে।”

দুপুরে খাওয়া শেষ করে টেবিলেই শুষ্ক হাতে বসেছিল দিয়া। এমন সময় শুভ্রা দেবী একটা ডিজাইনার ব্লাউজ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
—”দেখ তো কেমন হয়েছে? কাল যে শাড়িটা কিনেছিলাম, তার সঙ্গে মানাবে তো?”
দিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সুন্দর, কিন্তু খুব জমকালো একটা ব্লাউজ! এই বয়সে এসব কি সত্যিই মানাবে ওনাকে? দিয়া ব্লাউজটার দিকে তাকিয়ে ভাবলেও মুখে কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, বুঝিয়ে দিল ব্লাউজটা খুব সুন্দর। দিয়ার সম্মতি পেয়ে বোধহয় খুশি হলেন শুভ্রা দেবী।

দিয়াও খাওয়ার পরের কাজগুলো সেরে নিজের ঘরে চলে এল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই আবার অবাক। খাটের ওপর সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা সেই শাড়িগুলো, যেগুলো গতকাল শাড়ি বৌদির থেকে নিয়েছিলেন শুভ্রা দেবী। একটা নিজের জন্য, একটা দিয়ার মায়ের জন্য। দিয়ার মায়েরটা দিয়ে গেছে ঠিক আছে, কিন্তু ওনারটা এই ঘরে কেন! শাড়িটার ওপর হাত বোলাচ্ছে। জরিগুলো কি ঠান্ডা! বেশ সুন্দর শাড়িটা। কিন্তু এটা কি ওনাকে মানাবে?

—”কী রে, ব্লাউজটা নিচে ফেলে এলি?”
শুভ্রা দেবী দিয়ার ঘরে ঢুকে এলেন। হাতে সেই ব্লাউজটা!
দিয়া নিচু গলায় বলল,
—”ওটা তো তোমার।”
গলায় জমে থাকা অভিমান কখনও কখনও এতটাই নরম হয়ে যায় যে রাগ করতেও ইচ্ছে করে না। দিয়ার গলায় তখন ঠিক সেইরকমই একটা সুর।
শুভ্রা দেবী হেসে বললেন,
—”ওই শাড়ি আর এই ব্লাউজ আমাকে মানাবে? খেপেছিস নাকি? প্রথমবার জামাইষষ্ঠী যাচ্ছিস, তুইই পরবি এগুলো।”
শুভ্রা দেবীর বলা কথায় কেমন যেন রাগ গলতে শুরু করল দিয়ার। আর সেরকমই শীতল স্বরে দিয়া বলল,
—”আমার তো অনেক শাড়ি আছে।”
—”তাতে কী হয়েছে? কাল দোকানে তুই এই শাড়িটা বারবার দেখছিলি। তাই নিয়ে নিলাম। তখন বলিনি, তুই আবার না করবি! আজ ব্লাউজের দিদিকে শাড়ির ছবি দিয়ে পাঠালাম! উনি এটা পাঠিয়ে দিলেন। ব্লাউজটা পরে দেখ তো ঠিকঠাক হয়েছে কিনা।”

একটু থেমে আবার বললেন,
—”বাড়িটা এত ভেতরে যে কিছুই হাতের কাছে নেই। সল্টলেকে না করেছিলাম বাড়ি কিনতে! নাও বোঝো! এই শাড়ি বৌদি! ব্লাউজ দিদি! এরাই ভরসা!”
হাসতে হাসতে বললেন শুভ্রা দেবী।
—”আমি যাই, একটু শুয়ে নিই। বিকেল হয়ে যাচ্ছে।”
কথাগুলো বলে চলে গেলেন।
দিয়া বিছানার ধারে বসে রইল। কেমন যেন মনটা ভারী লাগছে। মায়ের কানের দুলটার কথা কেমন যেন থিতিয়ে গেল। এখনও বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে, খারাপ লাগছে। সেটার কারণ অবশ্য মা নয়! শাশুড়ি। শাশুড়ি মানুষটা হয়তো ততটাও খারাপ নন, যতটা সে ভেবেছিল।
তবু মন খারাপ কাটল না। তাই মোবাইলটা হাতে নিয়ে শাড়ির ছবি তুলে শিল্পাকে পাঠিয়ে দিল।
গতকাল কতক্ষণ ধরে দুজনে মেসেজে শাশুড়িদের নিন্দে করেছে! শিল্পা নিজের শাশুড়ির নামে বলেছে, আর তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে সেও বলেছে কত কী।
মাঝে মাঝে শাশুড়ির নিন্দেটা সত্যিই ভাইরাসের মতো। একজন শুরু করলে আরেকজন অজান্তেই তাতে আক্রান্ত হয়ে যায়। এখন দুটো ভালো কথা বললে যদি প্রায়শ্চিত্ত হয়!
পরের দিন ভোর হতেই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল শুভ আর দিয়া।

পিছনে গাড়ি ভর্তি করে তুলে দিয়েছে আম, লিচু, কাঁঠাল, মিষ্টির ট্রে। কী সুন্দর করে সাজানো সব। দিয়া এই কদিনে বুঝে গেছে, এই বাড়িতে দেখানো ব্যাপারটা বেশ আছে। ট্রে করে করে এমন তত্ত্ব সাজিয়েছে যেন বিয়ের তত্ত্ব। একটায় শুধু আম, একটায় শুধু লিচু, একটা ট্রে জুড়ে কাঁঠাল, তারপর আছে তিন রকমের মিষ্টি। মায়ের আলতা, সিঁদুর! কিন্তু শাড়িটা! ওটা দেখতে পাচ্ছে না দিয়া!

ওটা আর কোথায় যাবে! শুভর ব্যাগেই হবে! গাড়িতে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে এই আড়ম্বরের কথাই ভাবছিল দিয়া।শাশুড়ির ওপর আর তেমন রাগ নেই। কিন্তু শুভকে দেখলেই আবার মায়ের দুলটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটাও সত্যি, যা আয়োজন করে পাঠিয়েছে ওরা, দিয়ার কাছে ওই ছোট্ট দুলটা চোখেই পড়ত না কারও!
তবু নিজেকে বুঝিয়েছে—একদিন টাকা জমিয়ে নিজেই কিনে দেবে দিয়া। ফিরে এসে এখানেই চাকরি খুঁজবে! সল্টলেকের বুকে অ্যাকাউন্টসের একটা চাকরি ঠিক পাবে দিয়া।
এই ভাবনাটাই আপাতত সান্ত্বনা। আর এটাই মানুষ। উপায় না থাকলে অন্য উপায়ের পথ ঠিক বের করে। নাহলে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না!

শুভর গাড়ি দিয়ার বাড়ি পৌঁছতেই হইহই পড়ে গেল যেন। সব দিদিরা, জেম্মা, বম্মা সবাই ছুটে এল। সবাই দিয়াকে ভালোবাসে অবশ্যই, কিন্তু কিছু আবার দেখতেও এসেছে! বুঝতে এসেছে দিয়ার সুখটা।
দিয়াদের বিশাল যৌথ পরিবার। পাঁচ ভাই, তাদের পরিবার, ছেলে-মেয়ে—সব মিলিয়ে যেন একটা ছোটখাটো উৎসব হচ্ছে। জেঠুদের পাঁচ মেয়ের মধ্যে দিয়া সবচেয়ে ছোট। সেই কারণেই সবার আদরের।
বাড়ি এসেই দিয়া এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

জেঠুদের ঘরে ঢোকার একমাত্র কারণ, একবার দেখে আসা দিদিরা, জেম্মা, বম্মাদের জন্য কী উপহার এনেছে! আনন্দটা যেন কেমন প্রতিযোগিতার মোড়কে আটকে পড়েছে।
কেউ দামি শাড়ি, কেউ সোনার চুড়ি, কেউ আবার নতুন কোনো ইলেকট্রনিক জিনিস।
মা সবাইকে কী বলবে? দিয়া কী দিল?

ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
আর ওদিকে শুভ দিব্যি নিশ্চিন্তে বসে আম খাচ্ছে!
এখানে আসার পর একবারও “মা” বলে ডাকেনি।
অসহ্য!

দুপুরে খেতে বসেছে সবাই। দিয়া, শুভ আর দিয়ার বাবা একসঙ্গে। দিয়া গুনে গুনে দেখল, শুভর সামনে ঠিক বারোটা বাটি। শুভর মুখের হাসি আর ধরে না। খেতে খেতে বলল,
—”মা, আরেকটু মুড়িঘণ্ট দাও তো!”
দিয়ার খেতে খেতে থেমে গেল। মনে মনে বলল,
“বাহ! কী সুবিধাবাদী ছেলে! খাওয়ার সময় মা ডাকতে একটুও বাধে না!”

খাওয়া শেষে সুযোগ পেয়ে শুভর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—”যাকে রোজ ‘তোমার মা’ বলো, আজ তাকে কী সুন্দর মা বলে ডাকলে।”
শুভ হেসে ফেলে বলল,
—”রোজ যদি জামাইষষ্ঠীর খাওয়া হতো, তাহলে রোজই ডাকতাম!”

দিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেজো জেঠিমার ঘরে চলে গেল। খবর পেয়েছে ন-দি এসেছে। ওরা একটু দেরি করেই ঢুকেছে। খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলছিল বলে দিয়া যায়নি এতক্ষণ। ন-দির অবস্থাও বেশ ভালো! ওর গিফটটাই দেখতে হবে!
ঘরে গিয়ে কত রকম গল্প করছে দিয়া, কিন্তু কী উপহার দিয়েছে ন-দি, সেটাই জানতে পারছে না।
—”মা, এসিটা চালিয়ে দাও না! খুব গরম! খেয়ে উঠে যেন আরও লাগছে!”

ন-দি বলতেই দিয়া দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখল এসি।
—”জেঠিমা, এসি কবে কিনলে?”
দিয়া বোকার মতো প্রশ্নটা করেই ফেলল।
মনিকা দেবী হেসে বললেন,
—”গত মাসে। ন-দি জামাইষষ্ঠীতে দিয়েছে।”
শুনেই দিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কান্না পাচ্ছে। খুব রাগ হচ্ছে শুভর ওপরে। কিছুতেই যাবে না ঘরে। গেলেই বাবা-মায়ের সামনে ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে, আর সেটা কিছুতেই চায় না দিয়া।
তাই ন-দির পাশেই শুয়ে পড়ল। মনে মনে অনেক রকম পরিকল্পনা! চাকরি করবে! স্যালারি পাবে! গয়নার দোকানে যাবে! না না, ইলেকট্রনিক্সের দোকানে যাবে! একটা এসি কিনে দেবে! এতে আরাম বেশি।
ভাবতে ভাবতে মনটা একটু ঠিক হলো যেন দিয়ার। উঠেই নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখল, বাবা-মা আর শুভ বসে গল্প করতে করতে চা খাচ্ছে।
দিয়া ঢুকেই বলল,
—”চলো, বাড়ি যাব।”
শুভ অবাক।
—”সে কী! রাতের খাওয়া খেয়ে যাব না?”
রীনা দেবীও অবাক হয়ে বললেন,
—”কী হয়েছে তোর? এসে থেকে তো ঠিকমতো বসলিও না।”
বাবা পাশে বসতে ডাকলেন।
ঠিক তখনই শুভ বলল,
—”মা, বাবাকে গিফটটা দেবে না?”
আবার সেই গিফট!
দিয়ার মাথা গরম হয়ে উঠল।

শুভ কী বুঝবে এইসব লোকলৌকিকতা! থাকে তো ধ্যাদ্ধারে গোবিন্দপুরে। তাও একা একা। যৌথ পরিবারের প্রতিযোগিতা, তুলনা, হিসাব—এসব তো সে কখনও দেখেনি।
মা আজ হেরে গেল—ভাবতে ভাবতেই চোখ দুটো ভিজে গেল দিয়ার। তাড়াতাড়ি চোখ নাচিয়ে জলটা ঢুকিয়ে নিল।

এরই মধ্যে শুভ একটা প্যাকেট এনে দিয়ার বাবার হাতে দিল। প্রণাম করে বলল,
—”এটা আপনার জন্য।”
প্যাকেট খুলে দিয়ার বাবা অবাক।
ভেতরে সুন্দর বাঁধানো একটা গীতা।
একদিন কথার ছলে বলেছিলেন, বাড়িতে সব বই থাকলেও গীতা নেই।
সেই কথাটা মনে রেখেছিল শুভ।
দিয়ার বাবা খুশিতে বারবার প্রশংসা করতে লাগলেন একমাত্র জামাইয়ের। আর তাতে দিয়ার রাগ আরও বাড়তে লাগল।
এরপর শুভ আরেকটা প্যাকেট নিয়ে রীনা দেবীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—”এটা আপনার জন্য।”
রীনা দেবী বললেন,
—”পরে দেখব।”
দিয়া বিদ্রুপ করে বলল,
—”খুলেই দেখো। নিশ্চয়ই সব জামাইদের মধ্যে সেরা গিফট।”
—”ছি! এসব কী কথা?”—ধমক দিলেন রীনা দেবী।
শুভ মৃদু হেসে বলল,
—”খুলেই দেখো না।”

প্যাকেট খুলে বেরোল একটা সুন্দর শাড়ি।
আর নিচে একটা ছোট বাক্স।
বাক্সটা খুলতেই দিয়া থমকে গেল।
ভেতরে একজোড়া সোনার দুল।
ঠিক সেই ডিজাইন।
দিয়া তাকিয়ে রইল।
—”এ তো শাশুড়ি মায়ের দুলটা!”
দিয়া বলতেই শুভ হেসে বলল,

—”মায়ের জন্মদিনের দিনই নিয়েছিলাম দুটো। দুই মায়ের। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে কাউকে কিছু বলিনি।”
শুভ হাসতে হাসতে বলল।
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
রীনা দেবীর চোখ ভিজে উঠল। কানের দুলের জন্য নয়! ‘দুই মা’ কথাটা শুনে।
কিন্তু মুখের হাসিটা লুকোতে পারলেন না।
দিয়া শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

দিয়া ধীরে ধীরে শুভর দিকে তাকাল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে অভিমান, রাগ আর অপূর্ণতার পাহাড় জমে ছিল, মুহূর্তের মধ্যে যেন তার অনেকটাই গলে গেল।
শুভ মুচকি হেসে বলল, —”মায়েরা তুলনা করার জন্য নয় দিয়া, ভালোবাসার জন্য। একজনকে দিয়ে আরেকজনকে বঞ্চিত করার কথা আমি ভাবতেই পারি না।”
দিয়ার চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল। তবে এবার সেই জল কষ্টের নয়, স্বস্তির।

রীনা দেবী দুল দুটো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর শুভর মাথায় হাত রেখে বললেন, —”সুখে থাকো বাবা।”
ঘরের ভেতর যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিযোগিতা, হিসাব, কে কত দিল—এসবের ওপরে উঠে সেই মুহূর্তে শুধু একটা সম্পর্কই বড় হয়ে উঠল—ভালোবাসার সম্পর্ক।

দিয়া মনে মনে হাসল। সত্যিই, উপহারের দাম নয়, তার পেছনের ভাবনাটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
বাইরে তখন জামাইষষ্ঠীর কোলাহল, হাসি আর গল্পে ভরে উঠেছে বাড়ি। আর দিয়ার মনেও যেন দীর্ঘদিনের একটা অস্বস্তির অবসান হলো।

হয়তো এই কারণেই সংসার টিকে থাকে—কিছু অপ্রত্যাশিত যত্ন, কিছু না-বলা ভালোবাসা আর সময়মতো দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট চমকে।

সমাপ্ত।

সোনার কানের দুল পর্ব-০১

#সোনার_কানের_দুল
#প্রথম_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জি_সাহা

কলমে অনিন্দিতা

“শুভ, তোমার দেরি আছে? মা ফোন করেছে।”
বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল দিয়া।
“এই তো বেরোচ্ছি।”বলতে বলতেই স্নান সেরে বেরোল শুভ।এই সময় খুব তাড়াহুড়োতে থাকে শুভ।অফিসে যাওয়ার সময় এটা । তাড়াহুড়োর মধ্যেই তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কে গো, তোমার মা না আমার মা?”

প্রশ্নটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে গেল দিয়ার।বোকার মতো সব প্রশ্ন- “তোমার মা নিচতলা থেকে ফোন করবে?”
রাগী গলায় কথাটা বলেই হাতের মোবাইলটা শুভর হাতে ধরিয়ে দিল সে।

শুভ ফোনটা কানে তুলে বলল,- “বলো, ভালো তো সবাই?”ওপাশ থেকে রীনা দেবীর গলা ভেসে এল।
“হুমম আছি,তোমরা ভালো তো?”শুভ লাউড স্পিকারে রেখে জামা কাপড় পরতে পরতেই বললো – “হুম, ভালো আছি। এই তো অফিস বেরোবো বলে তৈরী হচ্ছি।”

“পরশু কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো। তোমার মাকে বলে দিয়েছি তোমাদের তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিতে।”রিনা দেবী শুভর তাড়া দেখে আর কথা না বাড়িয়ে আসল কথাটা বললো।

“পরশু?” – একটু অবাক হতেই ইশারা করে দিয়া করে বললো জামাইষষ্ঠী। শুভ এমন করে হাসলো যেন লজ্জা পেল! বিয়ের প্রথম বছরের জামাইষষ্ঠী নিয়ে উত্তেজনা কম নাকী ওর। কলিগদের, দাদাদের মুখে এই দিনটার সম্পর্কে অনেক শুনেছে এবার সাধ নেওয়ার পালা শুভর।

রীনাদেবী বললেন ” ওই দিন তো জামাইষষ্ঠী ”
শুভ উদার হয়ে বললো -” আসব, আসব।”
রীনাদেবী জামাইয়ের উদারতায় মুগ্ধ বেশ গেল। গলায় দরদ এনে বললেন – “বেশি দেরি কোরো না কিন্তু।”শুভ হেসে বললো “না না সকাল সকালই বেরিয়ে পড়ব। দশটার মধ্যে ঢুকবো!”

শুভর কথায় খুব খুশী রীনাদেবী। বললেন ” রাখি এখন?সাবধানে অফিস যাও ” শুভও হেসে বললো
“ভালো থেকো তোমরা ” বলেই ফোন রেখে দিলো।

দিয়া চোখ সরু করে শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরো কথোপকথন টা শুনলো। ওখানে একবারও “মা” বলে ডাকল না ছেলেটা!
কলেজে পড়ার সময় অন্তত “কাকিমা” বলত। এখন সেটুকুও বলে না। যেন সম্বোধন করাটাই ওর কাছে অপ্রয়োজনীয়।

“কী গো, অমন করে কী দেখছ?”
দিয়ার দৃষ্টি টের পেয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল শুভ।
“না, ভাবছিলাম মা কী এত বলছিল?”
“কী আবার! জামাইষষ্ঠীতে যেতে বলল।”
শুভর মুখে হাসি ফুটে উঠতেই দিয়ার ভেতরে আবার খচখচ করে উঠল।
হুমম! হাসিটা দেখ! যেই খাওয়ার নিমন্ত্রণ, অমনি সব দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। পেটুক একটা! ওদিকে ‘মা’ ডাকতে যত আপত্তি!

তবে মুখে কিছু বললো না। ওর মা কে শুভ মা না ডাকলেও কিছু যায় আসে না। আর সেটা শেখাতে ইচ্ছেও করেনা দিয়ার। মনে হয় এইসব ডাক মন থেকে আসতে হয়! মন না চাইলে ডাকাও উচিত না।দিয়া যে এই যে ঘটা করে মা ডাকে সেটা কি আদৌ মন থেকে? ও যদি মা না ডাকতো শুভর ভালো লাগতো! ধুর এই টপিকটা নিয়ে আলোচনা করতেই ভাল লাগে না!তাই এড়িয়ে গিয়ে বললো
“শোনো, মা-বাবাকে ষষ্ঠীতে কী দেব?”

টাই বাঁধতে বাঁধতে শুভ বলল,”সে কাল দেখা যাবে।”

“কাল দেখা যাবে মানে? প্রথম জামাইষষ্ঠী। ভুলভাল কিছু দিলে হবে না কিন্তু। দিদিভাইরা প্রত্যেকবার নিজের মায়েদের কত সুন্দর সুন্দর গিফট দেয়।”শুভর এড়িয়ে যাওয়া উত্তর দেখে বেশ বিরক্ত দিয়া।

“আচ্ছা হবে, হবে।”কথাটা বলে নিচে নেমে গেল শুভ।
দিয়ার বিয়ে হয়েছে মাত্র দশ মাস।এই দশ মাসেই সে বুঝে গেছে, প্রেমের সময়ের মানুষ আর বিয়ের পরের মানুষ একই শরীরে থেকেও কত আলাদা হতে পারে।
প্রেমের সময় শুভর সবকিছুই যেন দিয়াকে ঘিরে ছিল। এখনো ভালোবাসে, যত্ন করে, খেয়াল রাখে— কিন্তু তার পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব এসে গেছে। আর সেই দায়িত্বগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় জায়গাটা জুড়ে আছে শুভর পরিবার।

তিন মাস আগে শুভর মায়ের জন্মদিন ছিল।
সেদিন কী সুন্দর করে নিজের মাকে নিয়ে গিয়ে সোনার কানের দুল কিনে এনে দিয়েছিল শুভ!
অফিসে যাওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়েছিল দুজনে, এরকমই সকাল ছিল, অর্ডার দিয়ে অফিস গেছিলো শুভ আর শুভ্রাদেবী মানে শুভর মা বাড়ি চলে এসেছিলো।দিয়াকেও বলেছিল যাওয়ার জন্য , কিন্তু সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকে বেরোনোর প্ল্যান থাকায় যেতে পারেনি ও ।

সন্ধেবেলা যখন ছেলে এসে মায়ের হাতে প্যাকেট টা দিল, শুভ্রা দেবী যখন প্যাকেট খুলে দুলটা দেখালেন, তখন মুখের সেই উজ্জ্বল হাসিটা এখনও চোখে ভাসে দিয়ার।বেশ ভালো লেগেছিলো দিয়ার। ডিজাইন টা ও বেশ সুন্দর।

সেদিন থেকেই হয়তো মনের কোথাও একটা ছোট্ট ইচ্ছে জন্মেছিল।আমিও যদি মাকে এমন কিছু দিতে পারতাম!খুব দূর হওয়ার জন্য চাকরিটা তো বিয়ের পর ছেড়ে দিতে হয়েছে।নিজের কোনো উপার্জন নেই।
এই একটা কথাই বারবার এসে খোঁচা মারে দিয়ার বুকে ।

কিছু টাকা জমানো আছে অবশ্য। দোকানটায় যাবে কি একবার! ওরা তো ডেলিভারিও তাড়াতাড়ি দেয়।কিন্তু কেন যাবে ও! জামাইষষ্ঠীর দায়িত্ব তো জামাইয়ের। এইটুকু সেন্স কি থাকবে না এই বাড়ির লোকেদের।

“দিয়া, খাওয়া হয়ে গেছে। বেরোলাম।”
নিচ থেকে শুভর ডাক শুনে চমকাল।
“আসছি, দাঁড়াও!”
হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল দিয়া।
শুভ আর মোহন বাবু মানে দিয়ার শ্বশুর মশাই একসাথেই অফিস যায়। ওরা বেরিয়ে যেতেই বাড়িটা আবার নিরিবিলি হয়ে গেল।

আজ সকালের জন্য আলুর পরোটা বানিয়েছে দিয়া।রান্নাঘরে ওর কাজ বলতে মূলত সকালের জলখাবার। দুপুর-রাতের রান্না এখনও শুভ্রা দেবীই করেন।প্লেটে সস ঢালতে ঢালতে দিয়া ডাকল,
“মা, আগে এসে খেয়ে যাও।”

ডাকটা নিজের কানে যেতেই কেমন যেন লাগল।
কী সহজে সে অন্যের মাকে “মা” বলে ডাকে ও !
আর শুভ?ভুল করেছে প্রথমেই এই আদিখ্যেতা টা না করলেই পারতো! শুরু যখন করে দিয়েছে আর কিছু করার নেই।

সামনের চেয়ার টেনে বসতে বসতে শুভ্রা দেবী জিজ্ঞেস করলেন,”কী ভাবছিস এত?”
দিয়া একটু ইতস্তত করে বলল,
“ভাবছিলাম, ষষ্ঠীতে মা-বাবাকে কী দেব?”

“কী আর দিবি! একটা শাড়ি দিবি। বাবুকে বলেছি শাড়ির বৌদিকে ডেকে পাঠাতে। সামনের মোড়ে ওর বরের দোকান। যাওয়ার সময় বলে দিলেই বৌদি চলে আসবে শাড়ি নিয়ে।ওর কাছ থেকেই নিয়ে নেব।”

মুহূর্তের মধ্যে দিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
নিজের মায়ের জন্য সোনার দুল।আর দিয়ার মায়ের জন্য শাড়ি।তুলনাটা না চাইলেও বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

শুভ্রা দেবী যেন তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন।
“আরও ভালো কিছু দেওয়া যেত। কিন্তু এ বছর অনেক খরচ হয়ে গেছে রে। তোদের বিয়ে, গোয়া হানিমুন, আবার সামনে বিবাহবার্ষিকী। বাবুর ওপর একসঙ্গে এত চাপ দেওয়া ঠিক হবে না।”
দিয়া কিছু বলল না।খেয়ে প্লেট গুলো ধুয়ে নিজের ঘরে দোতালায় চলে এসেছে।

সবসময় শুধু খরচ, খরচ আর খরচ!এটা যে এই ক মাসে কত বার শুনেছে! অসহ্য লাগছে দিয়ার।
সারাদিন সেই কথাটাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল।
আজ শুভ ফিরলেই বলবে— সে আবার চাকরি করতে চায়।
যদিও কারণটা নিজেই পরিষ্কার বুঝতে পারছে না।
শুভ কখনও তাকে কোনো কিছুর জন্য বঞ্চিত করেনি।বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি দিয়েছে।
শুভ অফিস ট্যুরে গেলে শুভ্রা দেবী পর্যন্ত হাতে টাকা গুঁজে দেন।তাহলে এই অস্থিরতা কেন?
হয়তো কারণটা টাকার নয়।
হয়তো কারণটা নিজের মানুষকে নিজের উপার্জনে কিছু দেওয়ার আনন্দ।আজ ওর টাকা থাকলে দিদিভাই দের সামনে মায়ের মুখটা উঁচু থাকত।

এমন সময় নিচ থেকে ডাক এল শুভ্রা দেবীর —
“দিয়া, নিচে আয়। শাড়ির কাকিমা এসেছে।”
ইচ্ছে করছে না তাও দিয়া নিচে নেমে দেখল সত্যিই যেন ছোট্ট একটা দোকান বসে গেছে।
একের পর এক শাড়ি খুলে দেখানো হচ্ছে।
কিন্তু আজ কোনো কিছুই ভালো লাগছে না তার।
সবকিছুতেই যেন খুঁত চোখে পড়ছে।

শেষ পর্যন্ত শুভ্রা দেবী দুটো শাড়ি বেছে নিলেন।
একটা নিজের জন্য আর একটা রীনা দেবীর জন্য।
দিয়াকেও একটা নিতে বললেন।
কিন্তু রাগের মাথায় ও না করে দিল।
তবে নিজের জন্য যে শাড়িটা শুভ্রা দেবী বেছে নিলেন, সেটা কিন্তু দিয়ার খুব পছন্দ হয়েছিল।

গাঢ় রঙের ওপর মার্জিত কাজ, সঙ্গে অসাধারণ রুচিশীল নকশা।একবার বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তার আগেই শুভ্রা দেবী শাড়িটা আলাদা করে ভাঁজ করে রাখলেন।দিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মনের ভেতরে তখনও একটা কথাই cholche- সোনার কানের দুল।

শেষ পর্ব

What Makes Modern Online Casinos So Popular

What Makes Modern Online Casinos So Popular

Online casino sites have become one of the most vibrant corners of the digital home entertainment globe. Their appeal lies in the blend of excitement, convenience and constant technology. Gamers no longer need to visit physical venues to experience real-money video gaming. Rather, they can open a mobile application or web browser and access hundreds of video games within mins. This comfort has actually created a brand-new generation of gamers who value adaptability and rapid access over standard online casino routines.

The development of secure payment techniques and reliable systems has also strengthened trust. Accredited operators comply with stringent regulations, while modern encryption technologies protect every transaction. Therefore, players really feel safer depositing and taking out funds on-line than ever.

The Selection of Games Available Today

One of the strongest benefits of on-line gambling enterprises is the sheer deepness of their video game libraries. Digital platforms supply everything from timeless pokies and modern-day video clip slots to table video games like blackjack, roulette and baccarat. Online dealership areas add an additional layer of realistic look by streaming human croupiers directly to the gamer’& rsquo; s display. These workshops integrate real online casino ambience with the comfort of playing at home.

The consistent release of new titles keeps the experience fresh. Game service providers frequently introduce upgraded mechanics, enhanced graphics and appealing bonus offer rounds. With numerous choices readily available, players can switch over in between motifs and gameplay styles without feeling limited.

Rewards and Promotions That Forming Player Experience

On-line gambling establishments typically stand out via their marketing systems. Rewards can enhance very early sessions, expand gameplay time and supply a chance to discover new games. Although every offer has specific problems, the structure of bonuses plays a significant function in bring in new gamers. Operators create unique incentives for different sorts of users, making certain novices and seasoned gamers alike can locate something that matches their style.

Promotions also construct lasting interaction. Routine incentives, special occasions and exclusive campaigns assist preserve rate of interest even after the initial deposit. This recurring value is just one of the reasons why many gamers stay loyal to details gambling enterprise brand names.

The Value of Mobile-First Platforms

Mobile video gaming has changed the entire online casino site market. Most players currently access their preferred video games through smartphones instead of desktops. This shift has actually encouraged operators to optimise every attribute for smaller screens, making mobile experiences smoother, quicker and extra user-friendly.

Touch-based user interfaces allow all-natural interaction with games, while light-weight application variations use instantaneous access without jeopardizing on high quality. Mobile-friendly style also makes certain players can take pleasure in quick sessions during breaks or commutes. Because of this, mobile casino sites have actually come to be the key entrance to on-line gaming for several customers worldwide.

Safety and security, Licensing and Responsible Video Gaming

Depend on is the structure of on-line casino success. Reliable operators obtain permits from recognised authorities and comply with stringent regulative regulations. These permits verify that games make use https://testtest-test.com/perevirka/ of audited arbitrary number generators which payouts adhere to clear regulations. Financial systems additionally play a important role, as encrypted transactions and modern safety devices secure sensitive information.

At the same time, responsible gaming devices assist make sure that players remain in control. Functions such as deposit limits, cooldowns and self-exclusion choices produce a safer and a lot more encouraging atmosphere. The industry remains to progress with new policies made to protect gamers from risky behaviours.

The Future of Online Gambling Establishment Enjoyment

The future of on the internet gaming points towards also better technology. Virtual reality experiences, boosted live-dealer communications and ultra-fast settlement systems are ending up being extra common. Game programmers explore motion picture graphics and advanced technicians that make electronic play extra immersive.

As innovation continues to advance, on the internet casino sites will likely deliver a lot more customised experiences. Tailored suggestions, adaptive rewards and interactive features will certainly shape the next stage of electronic gaming. The market reveals no signs of decreasing, and gamers can anticipate an progressively abundant and appealing atmosphere in the years ahead.

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৮ এবং শেষ পর্ব

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
অন্তিম পাতা.

বর্তমান প্রেক্ষাপট,
৬ এপ্রিল, ২০২৪

মাসুদের উপর প্রচন্ড রেগে আছে দ্বীপ। যদিও মাসুদের কোনো দোষ নেই। উপর থেকে চেক করে এসে দেখে রিদির বাসায় তালা ঝুলছে। এতটা রাস্তা জার্নি করে এসে যদি দেখে বাসায় তালা ঝুলছে সেই মুহুর্ত কতটা বেদনাদায়ক এই মেয়ে কি কখনো বুঝবে! এই মেয়ের হেয়ালীপনার জন্য সবসময় ঝামেলায় পড়তে হয়েছে দ্বীপকে।

দ্বীপ ক্রোধে অন্ধ হয়ে রাহাকে ফোন দিল। রাহা জানাল রিদি তার বাসায়। রাহার বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো দ্বীপ।

রায়হান দ্রুত অফিস থেকে চলে এসেছে। বহুবার রিদি এবং দ্বীপ উভয়কে বুঝানো হয়েছে সম্পর্কে বিচ্ছেদ যেন না টানে । এরা কেউই মানতে বা বুঝতে রাজি হয় নি। রিদির একটাই কথা তার বিচ্ছেদ চাই। কারণ টা কাউকে খুলে বলে নি। দ্বীপের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতেও রাজি নয় এই মেয়ে।

ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। কলিং বেল বেজে উঠেছে। নুভা ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দ্বীপকে সালাম দিতেই দ্বীপ হেসে প্রশ্ন করল, ‘ কেমন আছ মা?’

নুভাকে সবসময় মা সম্বোধন করে এসেছে দ্বীপ। দ্বীপ মামুকে নুভা এবং নুহাশ দুজনই অনেক ভালোবাসে।কিন্তু গত এক বছরে একবারও মামু তাদের বাসায় আসেনি। ফোনে অনুরোধ করলেও আসেনি। আজ আসাতে দুজনই অনেক খুশি। নুভা হেসে হেসে বলল, ‘ মামু তুমি কিন্তু আজ থাকবে? আমি রান্না শিখেছি।’

‘ আচ্ছা, ঠিক আছে আমি খেয়ে যাব আজ নুভা মায়ের হাতের রান্না।’

বাচ্চারা চলে যেতেই রায়হান এবং রাহা দুজনকে নিয়ে আলোচনায় বসল। রায়হান প্রশ্ন করল, ‘ তোমরা আরেকটু সময় নাও। ‘

দ্বীপ ভারী গলায় বলল, ‘ না ভাইয়া। আর সময়ের প্রয়োজন নেই। সময় নিলে তিনমাস একসাথে থাকতে বলবে, আরও আরও অনেক কাহিনি হবে। আপনার বোন যেখানে আমাকে সহ্যই করতে পারছেনা সেখানে সময় নেয়াটাও সময়ের অপচয়। আপনি ওকে ডাকুন। ‘

হাল ছেড়ে দিয়ে রাহা রিদিকে ডেকে নিয়ে আসল। রিদি ধীর পায়ে এসে ড্রইং রুমের সোফায় বসল। দ্বীপকে সালাম দিল। দ্বীপ রিদির দিকে না তাকিয়ে ফাইল খুলতে ব্যস্ত। মাথা নিচু করে কলম এবং ফাইল এগিয়ে দিল রিদির দিকে। রিদি নিজেকে যথেষ্ট শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। রাহা এবং রায়হান উঠে চলে গেল। দ্বীপের আঙুল দিয়ে দেখানো জায়গা গুলোতে সই দেয়া শেষ রিদির। দ্বীপ উঠে দাঁড়াল।

রিদির দিকে এবার তাকিয়ে বলল, ‘ ধন্যবাদ মিস রিধিমা, আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে আসার জন্য। অসংখ্য ধন্যবাদ আমার একাকিত্বের দিন গুলোতে পাশে না থাকার জন্য। এবং কৃতজ্ঞতা আমার জীবনের সুন্দর একটা বছর নষ্ট করার জন্য। কারণ সেই বছর আমি আপনাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর ঘুরে আসার পরিকল্পনা করেছিলাম। আপনি তাতে জল ঢেলে দিয়েছেন। প্রতিবার আমাকে আপনার দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। জানিনা কি অপরাধে এত বড় শাস্তি দিলেন। আপনি আমার ভালবাসা নিয়ে কতদিন একা থাকতে পারবেন জানিনা, আমি আপনার দেয়া বিষাদ নিয়ে এক জীবন পার করে দিব। ‘

রিদি চুপ করে আছে। দ্বীপ রিদির একেবারে কাছে এসে আলতো করে গাল ছুঁলো। কেঁপে উঠল রিদি। ধাক্কা দিয়ে দ্বীপকে সরাতে চাইলেও ব্যর্থ হল। প্রথমবারের মত জোর করে রিদির অধরদ্বয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নিল । এত যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে আদর সম্ভবত এত বছর সংসার জীবনের কোনোদিন পায় নি।

যাওয়ার আগে বলল, ‘ এই আদরের রেশ আমার মরণ পর্যন্ত থাকুক। আসি। ভালো থাকবেন। ‘

দ্বীপ বেরিয়ে গেল। রিদির শ্বাস আটকে এলো। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। রাহা এবং রায়হান ছুটে এলো। রিদিকে সামলানো যাচ্ছে না। দ্বীপের গাড়ি রাহাদের গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। রিদির চিৎকারে রায়হান দ্বীপকে ফোন দিলো। এদিকে রিদি আজ মুখ খুলেছে,

‘ আমাকে ধন্যবাদ কেন দিয়েছে বেঈমানটা। কেন ভালবেসে গেল এখন? কেন আমি থাকা অবস্থায় অন্য নারীতে মেতে উঠেছিল? কেন ফারহিনের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছে? আমাকে কেন বলেনি সে ফারহিন নামে অন্য কারো সাথে সম্পর্কে আছে। আমি তো নিজেও তাকে বহুবার বলেছিলাম বিয়ে করো। কিন্তু সে আমাকে কেন ঠকাল? কি অন্যায় ছিল আমার? ডাক্তার তো আমাকে এ কথা বলেনি যে আমি মা হতে পারব না? শুধু বলেছিল ট্রিটমেন্ট করলে সম্ভাবনা আছে। কেন সে অপেক্ষা করেনি আমার জন্য। পুরুষ মানুষ এত্ত বেঈমান কেন হয়? আমি ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলাম অথচ মুখের উপর অপমান করে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে কেন? আমাকে অযোগ্য প্রমান করতে এত মরিয়া হয়ে উঠল কেন?’

রায়হান আর রাহার দম আটকে আসল। এদিকে রায়হান দ্বীপকে কলে করেছিল যে সেই ফোন রিসিভ করে দ্বীপ লাইনে ছিল এতক্ষণ । হুঁশ আসলে সাথে সাথে কল কেটে দিল রায়হান। কি শুনল এতক্ষণ! দ্বীপ পরকীয়া করেছে? নুভা আর নুহাশ পর্দার আড়াল থেকে খাম্মার কান্না দেখছে। রায়হানের ফোনে দ্বীপের কল আসল। রায়হান রিসিভ করতেই বলল,

‘ ভাই স্পিকার দিয়ে রিদিকে শোনান আমি যা যা বলি।’

রায়হান স্পিকারে রাখল। দ্বীপ বলা শুরু করল, ‘ তুমি ভাবলে কি করে তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে অপমান করবে আর আমি মুখ বুজে সহ্য করব? তোমাকে আমি ডিভোর্স দিয়েছি এই কথাই বা কে বলেছে ? সারাজীবন তো দুই লাইন বেশি বুঝেছ রিধিমা জাবেদ। আমি বেঈমান? পরকীয়া করেছি? কার সাথে? ফারহিনের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছি সেটা তুমি কি করে জানতে? আমার ফোন চেক করেছ তুমি? এত সন্দেহ করতে আমাকে? সন্দেহ করতেই পারো। যখন করলে জিজ্ঞেস করলে না কেন ফারহিন সম্বন্ধে? ফারহিন কে জানো তুমি? যে কাগজটাতে সাইন করেছো সেটা কিসের কাগজ দেখেছ? রায়হান ভাই আপনি একবার ওকে দেখান।’

রায়হান কাগজ উলটে স্তব্ধ। রাহা প্রশ্ন করতেই বলল, ‘ এটা তো একটা বাড়ির দলিল।’

দ্বীপ ও পাশ থেকেই বলল,

‘ জি ভাই, বাড়ির দলিল। ম্যাডাম তো কোনটা ডিভোর্স পেপার আর কোনটা বাড়ির দলিল পরোখ না করেই সাইন করে হাউমাউ করছে। আর যে ফারহিনের নাম নিয়েছে ওই ফারহিন আমার ফ্রেন্ডের ছোট বোন। এই বাড়ির আর্কিটেক্ট। বাড়ির কাজ চলছে আজ প্রায় দেড় বছর ধরে। ম্যাডামের মনের মত বাড়ি বানাতে একটা মেয়ের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছি ভিডিও কলে এবং ফোনে । এক টানা দেশে থাকা হত না তখন ভিডিও কলে স্ট্রাকচার, ডিজাইন দেখাতো। আপনার সময় হলে রিদিকে নিয়ে বাড়িটা ঘুরে আসবেন। আমার জীবনের সব টুকু সঞ্চয় দিয়ে আমি তার নামে বাড়িটা করে দিয়েছি। কারণ সে আমাকে একদিন ঝগড়ার পর বলেছিল, ‘ আজ আমার নিজের বাড়ি থাকলে সেখানে চলে যেতাম। মেয়েদের কেন কোনো বাড়ি হয় না?’ সেদিন কথাটা মাথায় চেপে বসেছিল। আমি চাই নি আমার স্ত্রী আফসোস করুক তার বাড়ি নেই বলে। আমি কত বোকা! আমি ভেবেছি রিদির বোধ হয় আমাকে আর ভালো লাগছে না। তাই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। হয়ত একটু ব্রেক চাইছে, আগের মত সময় দিতে পারিনা বলে। ভাবলাম বাড়ির কাজ টা শেষ হলে সারপ্রাইজ দিব। এই সুযোগে বিসিএস এর পড়াশোনাটাও আগাবে। কিন্তু ওর মনে যে এসব ছিল তা তো ঘুনাক্ষরে ও টের পাইনি। কিসব জঘন্য কারণ খুঁজে বের করল বিচ্ছেদের জন্য । তাকে বলে দিবেন প্রয়োজন হলে ঘোষণা দিয়ে আরেকটা বিয়ে করতাম, পরকীয়া করার কি প্রয়োজন? দুই বউ পালার ক্ষমতা দ্বীপের আছে। এতবড় অপবাদ মেনে নিতে পারছি না আমি। এরচেয়ে মরণ ই তো ভালো ছিল। কি করিনি আমি তার জন্য? তাকে বলে দিন দ্বীপ আর কোনোদিনও কাছে টানবে না তাকে । সে আমার স্ত্রী হয়েই বিচ্ছেদ গ্রহন করুক। তার সাথে আমার আর দেখা না হোক । আল্লাহ হাফেজ।’

রাহা রিদির গালে কষে একটা থাপ্পড় দিল। রিদি নিশ্চুপ। রায়হান বাধা দিল। রিদির চোখের সামনে ভেসে উঠল ফারহিনের সেই মেসেজ,

‘ আপনি চাইলেও ভুলতে পারবেন না আমাকে । আমি নিজের সেরাটা দিব। ভালোবাসার জায়গায় নো কম্প্রোমাইজ। ‘

এই মেসেজ টা এমন ছিল যে কেউ সন্দেহ করবে। এর মানে কী দাঁড়ায়? রিদি কি করে জানবে এই মেসজের অর্থ ভিন্ন ছিল। তখন রায়হান রিদিকে প্রশ্ন করল, ‘ ফারহিনের পুরা নাম কি?’

রিদি ভেজা গলায় বলল, ‘ ফারহিন আহমেদ’

রায়হান দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, ‘ আসলেই তুই ছাগল। ফারহিন আহমেদের কাছে কাজ করানোর জন্য সিরিয়াল লাগে। উনি কত বড় আর্কিটেক্ট তুই জানিস? জিহান সেলিব্রিটি বলেই বাড়ির কাজটা করাতে পেরেছে। কিসের সাথে কি মিলাস তুই? ফারহিন ম্যারিড। ওর হাসবেন্ড ও অনেক বড় মাপের আর্কিটেক্ট। দুজনের একটা ফার্ম আছে। ওদের বেবিও আছে। বোকার মত কাজ করেছিস রিদি।’

রিদি চুপ করে আছে। রাহা চিল্লাতে চিল্লাতে ঘর মাথায় তুলে ফেলেছে। বেশি আহ্লাদ দিয়ে রিদিকে সবাই মাথায় তুলেছে বলে বকে যাচ্ছে বাবা মাকে ফোন দিয়ে। রিদিকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে। রিদিও বের হয়ে গেল জেদ করে। রায়হান পড়েছে চিপায়। তবে শান্তি এই ভেবে যে ডিভোর্স হয় নি।

বাসার নিচে নেমে রিদির মনে সব পুরনো স্মৃতি ভাসছে। এই ফারহিনের সাথেই নিয়াজ ছবি তুলে রিদিকে পাঠিয়েছিল। রিদি না হয় এসব আর্কিটেক্ট চিনলো না, নিয়াজ কি চিনে নি? নাকি কাজটা ইচ্ছাকৃত ছিল? সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ কতটা জঘন্য আজ রিদি বুঝতে পারছে।

পুরো পরিস্থিতি এভাবে ঘেটে গেল কেন? চুলগুলোতে হাত খোঁপা করল রিদি। ওড়না তুলে ঘোমটা দিল মাথায়। রাস্তায় নেমে দ্বীপের নাম্বার টা ব্লক খুলে দিল। কল করল। বার বার কেটে যাচ্ছে। এবার মনে হলো দ্বীপ রিদিকে ব্লক করে দিয়েছে। একটা রিকশাও নেই রাস্তায়। বৃষ্টি হচ্ছে। সবসময় বৃষ্টিই কেন তার সব পরিস্থিতিতে হাজির হয়। নেমে পড়ল পানিতে। অন্য আরেকটা সিম থেকে দ্বীপকে কল দিতেই রিসিভ করল দ্বীপ। রিদি ও পাশ থেকে চিৎকার দিয়ে বলল,

‘ খবরদার কল কাটবেনা। আগে আমার কথা শোনো?’

দ্বীপ ফোন কেটে দিল। রিদি বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় পৌঁছাল। রিদি হাঁচি দিতে দিতে ব্যাগ গুছাতে লাগল। রাতের ট্রেন ধরে রওয়ানা হলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। রিদি আর দ্বীপের সেপারেশনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশে বাসা ভাড়া নিয়েছিল এক বান্ধবীর সাথে। এই বাসাটাও যে দ্বীপ পছন্দ করে নিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে তার বান্ধবী জানাল।

বাসা নেয়ার পর স্নাতকোত্তরে ভর্তি হল। গত এক বছর দ্বীপ বহুবার চেষ্টা করেছে রিদির সাথে যোগাযোগ করতে। দেখাও করতে চেয়েছে। রিদির আকস্মিক পরিবর্তন দ্বীপকে ভাবিয়েছে। বহুবার প্রশ্ন করেছে। উত্তর মেলে নি। দেখতে দেখতে সময় পেরিয়ে গিয়েছে। দ্বীপের উপর খেলা, বাড়ির কাজ সব মিলিয়ে মানসিক চাপ এসেছিল। ভেবেছিল রিদির জন্মদিনে এই বাড়ি উপহার দিবে। কিন্তু গত মাসে রিদি ডিভোর্স ফাইল করার পর দ্বীপের দুনিয়া হেলে গেল। ঠান্ডা মাথায় ভেবে চিনতে আজকের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। ডিভোর্স না দিয়েই সম্পর্কে বিচ্ছেদ টানবে যা ডিভোর্স এর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

___

সকাল আটটা। ট্রেন চট্টগ্রাম এসে থামল । একটা সি এন জি নিয়ে নিজের শ্বশুর বাড়ি গিয়ে উঠল। রাহেলা খানম খুশিতে ছেলের বউকে জড়িয়ে ধরলেন। সাজিনা ভাইয়ের বউ পেয়ে মহাখুশি। রিদনের স্ত্রী প্রমি বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। রিদি আসার খবর পেয়ে খুশিতে চলে এসেছে।

মিজান সাহেব বললেন, ‘ অথর্ব টা তাহলে ডিভোর্স দেয় নি। যাক আমার ছেলে তো বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। কিন্তু বৌমা তুমিও কিছু কাজ বোকার মত করলে। ওর সাথে ঝগড়া হয়েছে তো কি হয়েছে এই বাড়ি আসা বন্ধ করলে কেন?’

রাহেলা ইশারা দিল স্বামীকে যেন এটা নিয়ে আর কথা না বাড়ায়। মিজান সাহেব কথা না বাড়িয়ে নিজের কামরায় চলে গেলেন। রিদি জামা পালটে কোমড়ে ওড়না গুঁজে আগের মত কাজে নেমে পড়ল ননদ এবং শাশুড়ির সাথে। সেই মুহুর্তে কলিং বেল বেজে উঠল। তফুরা এসেছে তার কন্যা অঞ্জনাকে নিয়ে। অঞ্জনা রিদিকে দেখে চমকে গেল। রাহেলা বিরক্ত হয়ে রিদিকে বলল,
‘ সংসারের চাবি তোমার হাতে তুলে দিলাম। যদি পারো এই মা মেয়েকে দমিয়ে সংসারে সুখ আনো। আমি ক্লান্ত মা। এদের সাথে আর পারব না। আমার দোয়া রইল।’

অঞ্জনা ভেতরে ঢুকে রিদনকে প্রশ্ন করল, ‘ এই মেয়ে এখানে কী করছে? ওর না জিহান ভাইয়ের সাথে সেপারেশন হয়েছে?’

রিদন ভ্রু কুচকে বলল, ‘ যার যেখানে জায়গা সে সেখানে এসেছে। আর ভাবী বলবি, ‘ এই মেয়ে ‘ কি কথা? তুই কেন এসেছিস? ফাঁকা মাঠে গোল দিতে? প্রয়োজনে আরো অনেক গুলো প্লেয়ার ভাড়া করব তোকে পেটানোর জন্য তবুও ভাইকে তোর হাত থেকে বাঁচাব। কসম।’

প্রমিও পেছন থেকে দরজায় গোড়ায় এসে দাঁড়াল। রিদিকে জড়িয়ে ধরল। তফুরা রিদিকে আগাগোড়া পরোখ করে বলল, ‘ ওই ভাতার বুঝি দাম দেয় না যে ভাতারের জন্য আমার ভাইপুত রে ছাইড়া গেছিলা। ‘

রিদি ঠোঁট বেঁকে বলল, ‘ আমার জন্য তো রাস্তায় লাইন পড়ে যায় ছেলেদের। কিন্তু কি করব আপনার ভাইপুত তো আমাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা। একটা বাড়িও বানিয়ে দিয়েছে। এছাড়া কত শাকচুন্নির নজর আছে আমার দ্বীপের দিকে। তাকে বাঁচাতে এলাম।’

‘ তাহলে গেছ কেন ছাইড়া? অন্য বেডাগো বিছানায় যাইয়া চাখা শেষ তাই এখন এখানে আসছ । হাছা কতা কও।’

প্রমি দাঁত খিচিয়ে বলল, ‘ হ সব তো আপনার মেয়ের মতো।’

অঞ্জনা চেতে প্রমির দিকে এগিয়ে আসবে রিদি প্রমির সামনে দাঁড়াল। রিদন তো পারলে মারামারি বাঁধিয়ে দিবে। রিদি সব সামলে বলল,

‘ চাখার জন্য কি বিছানা লাগে, চোখ দিয়েও চাখা যায়। এই যেমন অঞ্জনার সংসার না টেকার পেছনে কারণ আপনি। অথচ রাজ্যের সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন ওর প্রাক্তন স্বামী খারাপ ছিল। ‘

তফুরা চোখ ক্ষীণ করে বলল, ‘ মুখ সামলে কথা বলবা। আর তুমি তো ওর জামাই রে ভালোই বলবা । রতনে রতন চিনে। যেমন তুমি তেমন ওর আগের স্বামী।’

রিদি একপেশে হাসি দিয়ে বলল, ‘ আর অর্ধেক বলেন, শূয়রে চিনে কচু। কচু হচ্ছে আপনাদের ছেলে। আর আপনি কি সেটা তো বলতে হবে না নিশ্চয়ই। আপনাদের করোনার সময়ে চেনা শেষ আমার। কোথায় ছিল আপনার মেয়ের ভালবাসা তখন। কই করোনায় তার ভালবাসার জিহান ভাই যখন আধমরা হয়ে গিয়েছিল তখন কেউ একবারও তো আসলেন না। এখন দরদ উতলে পড়ছে।’

রিদন সবার সামনে ফোন ধরল। কলের ওপাশে দ্বীপ ছিল। স্পিকারে দেয়া ফোন, ‘ আমার রিদিকে নিয়ে কেউ একটা বাজে কথা বললে তার জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলব। বড়, ছোট কোনো লেহাজ করব না। ‘

ফোন কেটে গেল। রিদির থেমে গেল । দ্বীপের বলা বাক্য গুলো তার ভেতর টা পুড়িয়ে দিচ্ছে। এখনও রিদিকে সব ঝামেলা থেকে আগলে নিচ্ছে। রিদি কি করে পারল দ্বীপকে অবিশ্বাস করতে? সবার সামনে থেকে নিজের রুমে চলে আসল। দরজা আটকে দিল। তফুরার সাথে আর গলা মেলাতে ইচ্ছে করছে না। নিয়াজের ফোন এসেছে। রিদি রিসিভ করে বলল,

‘ ফারহিনকে চিনিস না?’

‘ চিনি তো তোর হাসবেন্ড এর সাথে দেখেছিলাম।’
‘ বললিনা কেন তবে?’

‘ বলেছি তো দুজনকে খুব কাছাকাছি দেখেছি একই টেবিলে খাচ্ছে। ‘

‘ কারো সংসার ভাঙা যে অপরাধ জানিস? সংসার আল্লাহর রহমত। পরিচিত মুখ আমার স্বামী। তাই বলে ওর নামে এমন একটা কথা বলা তোর ঠিক হয় নি।সত্যিটা তুই আমার মুখ থেকে শোন। ফারহিন আর আমার স্বামী দুজনই কাজের ব্যাপারে কথা বলেছিল। তাদের মধ্যে কোনো অঅভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নেই। আমি ফারহিন আপুর সাথে কথা বলেছি। দুই লাইন বাড়িয়ে বলা তোর ঠিক হয়নি। আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করবিনা।’

দ্বীপকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েও পেল না। দীর্ঘ শ্বাস রিদির। কাঁদল সময় নিয়ে। এবার দ্বীপ সত্যি বিচ্ছেদ ঘটাল। মনের বিচ্ছেদ। একটা বছর যে ভুল ধারণা নিয়ে বিচ্ছেদ ছিল সেটিই তো ভালো ছিল। এখন তাদের সম্পর্ক থেকেও নেই। দ্বীপ আর কাছে আসবে না হয়ত। শাশুড়ির মুখে শুনেছিল, দ্বীপের রাগ উঠলে সেই রাগ সহজে কেউ ভাঙাতে পারে না। সহজে রাগে না এমন ধারার মানুষ গুলোর রাগ ভাঙানো জটিল।

__

সাজিনা বাবা মায়ের কাছে বসে আছে। এই মুহুর্তে রুমে থমথমে পরিবেশ। মিজান সাহেব বলল,
‘ কাকে যে দোষ দিব আর কার প্রতি যে সহানুভূতি দেখাব বুঝতে পারছিনা। ভুল তো ভেঙে গেল দুজনের মধ্যে। এখন উচিত কাছাকাছি থাকা।’

সাজিনা বলল, ‘ ভাবী কেঁদেই যাচ্ছে রুমের দরজা আটকে।’

প্রমি এবং রিদন ও এলো। বাবা মায়ের পায়ের কাছে বসল দুজন। রিদন বাবাকে বলল, ‘ আব্বু আমাদের সব কি আগের মত ঠিক হবে না?’

ভেতর থেকে ফোস করে শ্বাস ফেলল মিজান সাহেব। রাহেলা হা হুতাশ করে বললেন,

‘ সুখের সংসারে নজর লেগেছে। তোমার তিনবোনের নজর ই যথেষ্ট সব ধ্বংস করার জন্য। না হলে তোমার এত বুঝদার ছেলে মেয়েটাকে কেন বুঝল না? তোমরা ছেলেরা কি করে বুঝবে মা না হওয়ার কষ্ট। রিদির বুকের ভেতর কী চলছে আমরা বুঝি। রিদি ছোট মানুষ হাজার ভুল করবে কিন্তু জিহানের উচিত ওকে আগলে নেয়া। ও কেন সব ছেড়ে ছুড়ে দূরে সরে যাবে। আমি এই ব্যাপারে কোনো সহযোগীতাই করব না জিহানকে। অবশ্য তোমার ছেলে এর চেয়ে আর কি ভাল হবে। তোমরা তো বিপদে পালিয়ে যাও। এখন তুমি ভদ্রলোক হয়েছ, আগে তুমিও এমন ছিলা। ‘

মিজান সাহেব ভ্রু কুচকে বললেন, ‘ মাঝখান থেকে আমাকে টানবে না। দোষ করেছে তোমার ছেলে। আমাকে কেন টানছ?’

সাজিনা দুজনকে থামিয়ে বলল, ‘ কি শুরু করেছেন আব্বু আম্মু । থামুন আপনারা। ভাবী যদি ভাইয়ার সাথে সরাসরি কথা বলত এত ঝামেলা হত ই না।’

রাহেলা বললেন, ‘ বলে নি তো, কি করার আছে? খুন করবি নাকি মেয়েটাকে সবাই মিলে? এই কথা বলে আর কোনো লাভ আছে? ভুল তো মানুষ ই করে, জন্তু জানোয়ার তো নয়। ‘

প্রমি বলল, ‘ এখন দেখার বিষয় কবে ভাইয়া-ভাবীর সংসার জোড়া লাগে? আমাদের পারফেক্ট কাপল আলাদা হয়ে গেল এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। ‘
___

পরিশিষ্টঃ

সাল ২০২৫

রিদির সিস্টের আকার ছোট হয়ে এসেছে। ডাক্তার বলেছে যত দ্রুত সম্ভব বেবির জন্য চেষ্টা করতে। দেরি করলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। রিদি ইষৎ হাসে। সংসারটাই তো তার হারিয়েই গেল নিজের ভুলের জন্য। বেবির আশা করা মানে আকাশ কুসুম চিন্তা।

বিসিএস এর ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। রিদি পেরেছে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। এই আনন্দ পরিবারের সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়লেও গোমড়া মুখ রিদির। আজ দ্বীপ পাশে থাকার কথা ছিল। যে বিচ্ছেদের সূচনা রিদি করেছিল প্রায় দু বছর আগে তা এখনও শেষ হয় নি। রাহেলা প্রায় নিরবে কাঁদেন ছেলের জন্য। ছেলে বাড়ি ফিরে না। বাড়ির সবার সাথে মাঝে মাঝে কথা হলেও রিদির সাথে হয় না। রিদিও জোর করে না। শুরু টা তো রিদি করেছিল, কোন মুখে শেষের কথা বলবে?

রিদিকে উপহার দেয়া বাড়ি থেকে রিদি ঘুরে এসেছে। তবে এই বাড়িতে দ্বীপকে ছাড়া কখনোই থাকতে পারবেনা। বাড়ির দিকে তাকিয়ে সেই মেসেজের প্রতিটি শব্দ মিলিয়ে দেখল সত্যি ফারহিনের ভালোবাসা দিয়ে তৈরি এই বাড়ি। নিজের দিক থেকে সেরা টাই দিয়েছে ফারহিন। বাড়ির নাম ‘ হৃদিতে রিদি’। এমন একটা কাজের জন্য ফারহিনকে প্রকৃতপক্ষে চাইলেও ভুলা যাবে না। তার সবটুকু ভালবাসা দিয়ে এই বাড়ির ডিজাইন সে করেছে।

বাড়ির নিচ তলায় দ্বীপের নির্দেশে রিদির জন্য লাইব্রেরি করা হয়েছে। লাইব্রেরির একটা নাম দিয়েছে, ‘ হৃদয় সখার শাখা ‘। আসলেই তো! বই তো হৃদয়েরই সখা। দ্বীপের প্রতি হয়ত রিদি একজীবন কৃতজ্ঞতা আদায় করেও শেষ করতে পারবেনা। কারণ দ্বীপ মানুষটাই এমন, যার মেজাজ রিদির ক্ষেত্রে বরফের মত শীতল , যার মন তুলোর মত কোমল। তবে সেই কোমল মনের বরফ শীতল দ্বীপ এখন অনল। তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। অজানাতে হারিয়েছে মানুষটা। ফিরে আসার প্রত্যাশায় দিন কাটে রিদির।

___

এক বসন্ত পেরিয়ে আরেক বসন্ত চলে এলো। কিন্তু দ্বীপ এলো না। বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে রিদি। একা একা শাড়ি, দু হাত ভর্তি কাচের চুড়ি পরে কলেজে ঘুরতে এসেছে। মাঠের গ্যালারিতে কত জুটি দেখা যাচ্ছে। বিকেলে মিষ্টি রোদ গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। রিদি হাঁটছে কলেজ মাঠের রাস্তা ধরে। আচমকা একটা ফুটবল সামনে চলে এলো। রিদি ছিটকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। বিস্মিত হল। এ যেন ভ্রম! খুশিতে নেচে উঠল মন। ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে। নিচ থেকে ফুটবলটা নিয়ে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দেখল সেখানে দ্বীপ নয় অন্য একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের সেই উজ্জ্বল হাসিটা মুহুর্তেই নিভে গেল। ছেলেটাকে বল টা দিয়ে সামনে পা বাড়ালো।

ইদানীং দ্বীপকে হ্যালুসিনেট করে। প্রায় সময় রাতে মনে হয় দ্বীপ পাশে আছে। রিদির রাগ, অভিমান ভাঙাচ্ছে। আগে রিদি যখন রাগ করত, দু গাল ধরে ঠেসে চুমু খেত আর রিদি বার বার গাল মুছত। দ্বীপ হেসে প্রতিবার চুমু দিয়ে বলত,

‘ আমি তো দিব-ই। তুমি কতবার মুছতে পারো দেখি।’

এখন আর রিদি রাগ করে না, কারণ ভাঙানোর মানুষ টাই নিরুদ্দেশ। ফোন নাম্বার ব্লক করলেও মেসেজ দেয়া যায়। রিদি একটা মেসেজ লিখল দ্বীপকে ,

‘ আট বছর পর কলেজে এসেছি । একা হাঁটছি। পাশে হাত ধরার মানুষ টা নেই। আমি তাকে ভীষণ মিস করছি।’

কোনো প্রতুত্তর এলো না। বেশ কিচ্ছুক্ষন পর জবাব এলো,

‘ এক বছর পূর্ণ হতে আরও একদিন বাকি।’

বাহ, কি বিষাদময় প্রতিশোধ! সুদে-আসলে বদলা নেয়া হচ্ছে । রিদির এখন উপলব্ধি হয় দ্বীপের কষ্ট টা। সে কিভাবে দ্বীপকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল সেই এক বছর? কমলা রঙের সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। রিদি সেদিকে তাকিয়ে দেখছে দ্বীপকে ছাড়া আরও একটা দিনের সমাপ্তি। ফুটবলটা পুনরায় রিদির সামনে এলো তবে এবার সামান্য কোমড়ে লেগেছে। রিদি তেঁতে উঠে পেছন ফিরে বলল,

‘ খেলতে যখন পারেন না খেলতে আসেন কেন?’

লোকটা সামনে এগিয়ে এসে ফুটবলটা তুলল ৷ রিদি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে বার বার একই ভুল করছে কেন? ঘুরে গেল রিদি। পেছন থেকে পরিচিত স্বরে বলল,

‘ একা খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে নতুন ভাবে খেলা শিখতে এসেছি আপনার কাছে। ‘

রিদি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সত্যি দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। এবার আর হ্যালুসিনেশন হচ্ছে না রিদির। অঝোর ধারায় ঝরছে অনিমন্ত্রিত চোখের জল। নাকের পাটাতন ফুলে উঠেছে। উচ্চশব্দে কেঁদে কেঁদে বলছে,

‘ কেন ছেড়ে গিয়েছিলে আমায়? না হয় একটা বড় ভুল করে-ই ছিলাম। তাই বলে এমন সমুদ্রসম শাস্তি দিবে যে শাস্তির কোনো কূল কিনারা নেই। ‘

দ্বীপ হেসে বলল,’ তরী ভিড়াতে জানতে হয় মিসেস রিধিমা জাবেদ।’

‘ আমার তরীটাই যে ভাঙা। সাঁতার পারিনা, উদ্ধার করার মানুষ টাও নেই। ডুবে ডুবে জল খাচ্ছি। সে কি জানে না যে তার চেয়ে বেশি কেউ বোঝে না তার রিদিকে , বেশি কেউ ভালবাসে না। ভালবাসা টা কি কমে গেল তবে?’

‘ তাকে এতটাই ভালবাসলাম যে নিজেকে ভালবাসতে ভুলে গেলাম। অথচ সে ভালবাসাকে পায়ে ঠেলে দিয়ে বিচ্ছেদ চাইল। আমি কি তবে বিচ্ছেদেরই যোগ্য?’

রিদি কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ বলেছি তো ভুল করেছি। মা না হওয়ার যন্ত্রণা নিতে পারিনি আমি। যে মানুষটা আগলে রাখত তার ব্যস্ততার দূরত্ব মেনে নিতে পারিনি। স্বামীর ফোনে পরনারীর মেসেজ দেখে আমার জায়গায় অন্য যেকোনো নারী রিয়েক্ট করত। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বাসা ছেড়েছি। ভুলের পর ভুল করেছি। প্রশ্ন করা উচিত ছিল করিনি। আমি না হয় ভুল করেছি কিন্তু সে কেন পাষাণ হলো? সে কেন উঁচু গলায় সবাইকে বলল যে আমাকে ভালবেসে ভুল করেছে।’

‘ মাঝে মাঝে নিজের গুরুত্ব বোঝাতে পাষাণ হতে হয়। ভুল তো অবুঝকে ভালোবেসে অবশ্যই করেছি তাই দূরত্ব টেনেছি। কিন্তু পারলাম কই, সেই তো আকাশসম অভিযোগের ভার কাঁধে নিয়ে ফিরে এলাম।’

রিদি কেঁদে কেঁদে প্রশ্ন করল , ‘ আরেকবার কি নতুন করে শুরু করা যায় না?’

খানিকটা এগিয়ে এলো দ্বীপ, রিদির কপালে কপাল ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ কোথায় থেকে, একদম প্রথম থেকে?’

রিদি নাক টেনে মাথা নাড়ল। দ্বীপ হেসে খানিকটা পেছালো। পকেট থেকে একটা লাল গোলাপ বের করে রিদির দিকে এগিয়ে দিল। হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেক করার জন্য,

‘ আসসালামু আলাইকুম , আমি শাহদ্বীপ জিহান। বাংলাদেশ ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। আর আপনি? ‘

গোলাপ টা নিয়ে দ্বীপের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রিদি মুচকি হাসল। নাক টেনে হাত এগিয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল,

‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম , আমি রিধিমা জাবেদ। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, চুয়াল্লিশ তম বিসিএস। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। বন্ধু হবেন?’

‘ উঁহু, সংসার করব। আবার ভালোবাসার মতো ভুল কাজ করব। বার বার করব, বুক ফুলিয়ে করব। ভুল করে বলব আমি এই ভুল হাজার বার করতে চাই। রিদিকে হৃদিতে রাখতে চাই। ‘

সমাপ্ত।

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৭

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১৭.
( কপি করা নিষেধ)
চারপাশ টা ঘুরে ঘুরে দেখছে রিদি। দ্বীপ নারকেল পাতার শলা দিয়ে বিছানা, সোফা সব ঝাড়ছে, ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। রিদি হাতে একটা ম্যাংগো বার নিয়ে খাচ্ছে, দেখছে আর দ্বীপের পেছনে ঘুরছে। দ্বীপের উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠেছে ওরা আজ। জার্নি করে এসে দুজনই ক্লান্ত। বাইরে থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছে৷ ঘরদোর পরিষ্কার করে দ্বীপ মেঝেতেই শুয়ে পড়েছে ক্লান্ত হয়ে। রিদি ম্যাংগো বার টা খেয়ে দ্বীপের হাতের উপর শুয়ে পড়েছে। দ্বীপ চোখ বুজে মুচকি হেসে বলে,

‘ এতক্ষন সব কাজ একা করলাম, কিছুই ধরতে দিলাম না তোমাকে যাতে গায়ে নোংরা না লাগে। এখন আমার গায়ের উপর শুয়ে সেই তো নোংরা করলে নিজেকে। লাভ টা কি হলো?’

রিদি খিলখিলিয়ে হেসে বলে, ‘ তোমার গায়ে কি সুন্দর স্মেল! আমি লোভ সামলাতে পারিনি।’

দ্বীপ নাক কুচকে বলে, ‘ ছিহ! ঘামের গন্ধ।’

‘ আমার এটাই ভাল্লাগে।’
‘ আমাকে হঠাৎ এত ভালো লাগার কারণ?’
‘ তোমাকে তো সবসময়ই ভালো লাগে।’
‘ কোনো উদ্দেশ্য নেই বলছ?’
‘ আছে তবে অল্প।’
‘ কি উদ্দেশ্য? ‘
‘ আকাশ দেখেছ? একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতে চাই?’
‘ তোমার গলার ব্যাথা যে ভুলে গিয়েছ?’
‘ শুধু আজই’

দ্বীপ রিদির কপালে আলতো অধর ছুঁয়ে বলল, ‘ আচ্ছা। মনে থাকে যেন। কিন্তু আজ বৃষ্টির হওয়ার সম্ভাবনা কম। যত গর্জে, তত বর্ষে না। খেলতে খেলতে আকাশ নিয়ে এতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। যাই হোক আসল কথা শোনো, আমাদের কিছু ব্যক্তিগত পছন্দ – অপছন্দ শেয়ার করি। এতে দুজনেরই সুবিধা। আমি টান টান বিছানা পছন্দ করি, এক সপ্তাহের বেশি চাদর বিছানায় থাকা পছন্দ করিনা। সব কাপড় ইস্ত্রী করে পরি। বাসায় পরার কাপড়ও। এলোমেলো থাকাতে আমার শুচিবায়ু আছে। ডাল ছাড়া ভাত খেতে পারিনা। ‘

রিদি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ঢোক গিলল। এ কেমন অভ্যাস। দ্বীপ চোখ খুলে বলল, ‘ কি হলো?’

রিদি মুখ টা ফ্যাকাসে করে বলল, ‘ আমি বিছানার চাদর ধুতে পারব কিন্তু ওটার পানি নিংড়াতে পারব না একা। তুমি কি একটু সাহায্য করবে? আর ইস্ত্রী আব্বু কোনোদিন ও করতে দেয় নি। তুমি কি একটু শিখিয়ে দিবে? আমার কারেন্টে ফোবিয়া আছে। ডাল রান্না করতে পারি। ওটা নিয়ে সমস্যা নেই। ‘

দ্বীপ উঠে বসল। রিদির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলে,

‘ রিধিমা… তুমি কেন এসব করবে?’
‘ তো কে করবে?’
‘ তোমার বরের বুয়া রাখার সামর্থ্য আছে রিদি। আমি এমনি তোমাকে জানিয়ে রাখলাম। তোমার পছন্দ অপছন্দ ও জেনে নেব। শুধু আমার টা বলে দিচ্ছি তার মানে এই নয় যে টিপিকাল হাসবেন্ড এর মতো হুকুম দিচ্ছি। বোকা মেয়ে। বিছানার চাদর জীবনে ধুয়েছ তুমি? ওটা ভেজালে তোমার চেয়ে ওজন বেশি হবে।’

রিদির মুখে বালব জ্বলে উঠল। সে নিজের পছন্দ জাহির করতে করতে বলল,

‘ আমি ভেলপুরি ভালবাসি, আমি বিরিয়ানি ভালবাসি, একটা করে ফুল নিয়ে আসবে প্রতিদিন, আর মাঝে মাঝে ঘুরতে নেবে। এই টুকুই।’

‘ বিনিময়ে কী পাব?’

‘ ঘরদোর গোছানো। ‘

দুজনই হেসে উঠল। দ্বীপ তাকিয়ে রিদিকে দেখছে। ওভারসাইজ একটা টিশার্ট পরনে, পায়জামা টা এমন যে আরও দুজন ঢুকতে পারবে। দু হাত ভর্তি মেহেদী আর লাল লাল কাচের চুড়ি। টি শার্ট আর পায়জামার সাথে কাচের চুড়ি পরে ঘুরতে জীবনে প্রথম কাউকে দেখছে দ্বীপ। প্রশ্ন করল রিদিকে,

‘ এই সাজে চুড়ি পরার লজিক টা কী মিসেস দ্বীপ?’

রিদি সব কটা দাঁত দেখিয়ে বলল, ‘ আমার ইচ্ছে বিয়ের পর আমি প্রতিদিন কাঁচের চুড়ি পরব যতদিন শখ থাকে।’

দ্বীপ হেসে বলল,’ কপাল গুনে একটা বউ পেয়েছি যার সবকিছুই স্পেশাল। শখ ও স্পেশাল ।’

___

দুপুরের খাবার খেয়ে রিদি বিছানায় মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ল। আজ সত্যি বৃষ্টি হয় নি। কিন্তু শীতল বাতাস চারদিকে। সেই বাতাসেই ঘুম এসে গিয়েছিল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন দেখতে পেল পাশে দ্বীপ নেই। চোখ ডলতে ডলতে দ্বীপকে খুঁজতে থাকল। খুঁজে পেল রান্নাঘরে৷ সসেজ ভাজা করছে। রিদি সিংকের পাশে টাইলসের উপর বসে পড়ল। দ্বীপ মৃদু হেসে রিদিকে স্বাগত জানাল। রিদির ফোন বেজে উঠল। হাসিখুশি মেয়েটা আকস্মাৎ বিবর্ণ করল মুখটা। দ্বীপ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল,

‘ কে ফোন দিচ্ছে?’

রিদি চিন্তিত। দ্বীপের কথাও তার কানে ঢুকছে না । দ্বীপ একটু জোরে ডাকতেই ধ্যান ফিরে পেয়ে বলল,

‘ তোমাকে একটা কথা জানানো ভীষণ প্রয়োজন। ‘

শেষ সসেজটা ফ্রাই প্যান থেকে তুলে প্লেটে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং এ আসল। রিদিকে ইশারা করল আসার জন্য। চেয়ার টেনে রিদিকে বসতে বলে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘ খেতে খেতে বলো কী সমস্যা?’

রিদি দম ফেলে বলল, ‘ আমার এক ক্লাসফেলো আছে, নাম নিয়াজ। আমাকে সম্ভবত পছন্দ করে। কিন্তু আমি ওকে পছন্দ করিনা। বাড়ি যাওয়ার পর থেকে অস্থির হয়ে গিয়েছে। বন্ধু হিসেবে ঠিক আছে। সবাইকে যেমন চোখে দেখি তাকেও একই চোখে দেখি। অন্যদের মতো পড়ায়, কুইজে, প্রেজেন্টেশনে সাহায্য করে, ইদানীং লক্ষ্য করলাম ও নিজেকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে শুরু করেছে, রাগ হচ্ছে আমার। ক্লাসের সবাই আমাকে ফোন দিচ্ছে ওর ফোন কেন রিসিভ করছিনা তাই। ব্যাপারটা বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে রীতিমতো। ওর আকার ইঙ্গিতে আমি সঠিক বুঝি ও আমাকে পছন্দ করে। ‘

দ্বীপ খেতে খেতে মাথা নেড়ে প্রশ্ন করল, ‘ ও কি তোমার একজনের সাথে সম্পর্ক আছে এটা জানে?’

‘ জানে। কিন্তু সে ভাবে আমি হাওয়ার সাথে সম্পর্ক করি। বিশ্বাস করে না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে যোগাযোগ রাখো নি তুমি তাই ও বিশ্বাস করতে পারে না যে আমি কোনো ছেলেকে পাত্তা দিই। ওর কাছে ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমি একমাত্র ওকে আর পিয়াস কে বন্ধু ভাবি। পিয়াসের তো গার্লফ্রেন্ড আছে। সুতরাং ও নিজেকে সেইফ অপশন ভাবে। এছাড়া আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে তোমার কথা তো আমি নিজ থেকেই লুকিয়েছি।’

দ্বীপ ভাবুক গলায় বলল, ‘ আর অল্প কিছুমাস লুকিয়ে রাখো, এখন জানালে ও যদি হাইপার হয়ে যায় বিপদ। আমার নেক্সট উইক ম্যাচ আছে। দেশে থাকব না। কোনো ঝামেলা হলে আমি তোমাকে প্রোটেক্ট করতে পারব না। তাই কৌশলে এড়িয়ে যাও। ঘুরে এসেই ব্যবস্থা করছি। ‘

রিদি মাথা নাড়ল। দ্বীপ হঠাৎ বলল, ‘ ম্যাচ ক্যান্সেল করে দিই কি বলো? আগে তোমার সমস্যা টা সমাধান করি?’

‘ না না প্লিজ এটা করো না। এতে আমি অপরাধবোধে ভুগব। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। কেন যে ওর সাথে কথা বলতে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে গেলে কত ফ্রেন্ড হয়। এখন এরা যদি নিজেদের কে বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবে তখন দোষটা কার? পুরুষ মানুষের চরিত্রে দোষ আছে। সব পুরুষ না কিছু পুরুষ। ‘

দ্বীপ হাসছে। দুজনের খাওয়া শেষ। দ্বীপ বলল, ‘ বাদ দাও। প্রয়োজন আমি আসা পর্যন্ত রাহা বা রায়হান ভাইকে নিয়ে যেও ইউনিভার্সিটি।’

‘ আচ্ছা।’

‘ ঘুরতে যাবে?’

‘ কোথায়?’

‘ দিয়া বাড়ি চলো। ভালো লাগবে।’

রিদি লাফাতে লাফাতে তৈরি হতে চলে গেল। দ্বীপ চিন্তা থেকে ধ্যান সরিয়ে এনে সময়টা উপভোগ করতে চাইল।

শপিং, ঘুরাঘুরি আর আনন্দে সপ্তাহ কেটে গেল দুজনের। দ্বীপের চলে যাওয়ার সময় হল। এয়ারপোর্ট থেকে দ্বীপকে বিদায় দিয়ে রাহার বাসায় থেকে গেল। মন খারাপ হল খুব। গত এক সপ্তাহে রিদি স্বাধীন ভাবে অনেক ঘুরেছে। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যেত, রাতে বাসায় ঢুকত। মাঝে মাঝে দ্বীপ বাসায় এসে বলত,

‘ মাস্ক পরে ঘোরা যে কি যন্ত্রণার উফ। আগেই ভালো ছিলাম। কেউ চিনত না।’

___

ঈদের ছুটি, বিয়ে, ঘোরাঘুরি থেকে ফিরে আজই প্রথম দিন, ক্যাম্পাসে এসেছে রিদি। ক্যাম্পাসে পৌঁছেই রিদি অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হল। মুক্তমঞ্চের সামনে গোলাপ দিয়ে সাজিয়ে তার নাম লেখা । চারদিকে বেলুন৷ বন্ধুরা সব তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এর কারণটা রিদি এখনও জানে না। হাতে একটা ফুলের বুকে নিয়ে নিয়াজ সামনে এসে দাঁড়াল। রিদি ভাবছে আজ তো তার জন্মদিন নয় বা কোনো পরীক্ষা ও হয় নি যে সে সর্বোচ্চ নম্বর পাবে। তবে কিসের শুভেচ্ছা? নিয়াজ হাঁটু গেড়ে তাকে প্রেম নিবেদন করল সকলের সামনে। এহেন মূহুর্তে রিদি রাগ সংযত করার চেষ্টা করছে। চোখ বুজে পাশ কাটিয়ে মুক্ত মঞ্চ থেকে সোজা রাস্তায় পা বাড়াল। পেছনে বান্ধবীরা ডাকছে। নুসরাত রিদিকে আটকে দিয়ে বলল,

‘ রিদি নিয়াজ গত এক সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনা করছে । তোকে ফোন দিলে তো তুই ফোনই ধরিস না। ‘

‘ আমি বাড়ি গেলে খুব একটা ফোন কাছে রাখিনা। আব্বু অপছন্দ করেন।’

‘ আচ্ছা বাদ দে, এখন গিয়ে ওর সাথে কথা বল। এভাবে সবার সামনে অপমান করেছিস কাজ টা তো ঠিক হয়নি। গিয়ে সরি বল। ‘

রিদি রেগে বলল, ‘ কি কারণে? আমি কি একবারও বলেছি আমি ওকে পছন্দ করি? ওর এপ্রোচ আমার ভালো লাগে নি।’

রিদি প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে নুসরাতকে উপেক্ষা করে চলে আসল। রাগ হচ্ছে দ্বীপের উপর। দ্বীপ কেন বারণ করল বিয়ের কথা সবাইকে না জানাতে?

হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপকে ফোন দেয়ার চেষ্টা করল। যতবার ফোন দিচ্ছে নট রিচেবল পাচ্ছে। পাওয়া টা স্বাভাবিক। রাগ সামলে রিদি সেদিন কোনো রকম ক্লাস করে বেরিয়ে গেল। হলেও গেল না। সোজা ক্যাম্পাস ছেড়ে রাহার বাসায় চলে আসল। এসেই রাহার উপর চড়াও হল। রাহা তো প্রথমে বুঝতে পারেনি। পরে যখন রাহাকে খুলে বলল রাহা চিন্তায় পড়ে গেল। বোনকে বুঝিয়ে বলল, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব সবসময় সুন্দর হয় না। কখনো কখনো স্বার্থ লুকায়িত থাকে।

দ্বীপ খেলার মাঝে অবসর পেতেই রিদিকে কল দিল। রিদি দ্বীপের উপর রাগ ঝেড়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। কাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সবাইকে বলে দিবে সে বিবাহিত। দ্বীপ বাঁধা দিয়ে বলল,

‘ রাগ বোকারা করে। তোমার বয়সটাই এখন সুন্দর সুন্দর প্রপোজ পাওয়ার। ভাগ্যের দোষে আমার কবলে পড়ে বিয়ে হয়ে গেল। কি করার আছে বল। এত দিন যেহেতু চেপে রেখেছ ব্যাপারটা, এখনও কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তুমি স্টুডেন্ট ভালো। ফলাফল ভালো করছ। এখন যদি সবাই জেনে যায় তুমি আমার স্ত্রী তখন একটা ইফেক্ট পড়বে। অনেকে এক্সট্রা সুযোগ নিতে চাইবে। কিছু ক্ষেত্রে স্যারদের কাছে প্রাধান্য পাবে। তখন বন্ধুরা ভাববে পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে। অনেক ঝামেলা হবে, বুঝতে পেরেছ? ‘

দ্বীপের কথায় রিদি শান্ত হলো। রিদির মনে হলো সে একটু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে যা উচিত হয় নি। দ্বীপ বরাবর বুঝিয়ে বলল,

‘ শান্ত থাকা জ্ঞানীর লক্ষন। তোমার রাগ উঠলে আমার উপর ঝাড়বে। বাইরের মানুষ যেন টের না পায়। আমি চাইনা কেউ আমার রিদিকে বদমেজাজি বলুক।’

সেদিনের পর থেকে রিদিকে খুব শান্ত পেয়েছে সবাই। সহজে রাগ করত না। রাগ উঠলে সামলে নিত। নিয়াজকে উপেক্ষা করত। নিয়াজ ও দূরত্ব নিয়ে থাকত। রিদি রাগ উঠলে দ্বীপকে ফোন দিয়ে রাগ ঝাড়ত। প্রায় একমাস পর দ্বীপ ফিরল। রিদি বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যোগে যাতায়াত করে। বছরের যে সময়টা দ্বীপ ঢাকার বাইরে কিংবা দেশের বাইরে থাকে তখন রিদি রাহার বাসায় থাকে।

দ্বীপ যখন দেশে থাকে তখন বিভিন্ন ধরনের নতুন রেসিপি করে দ্বীপকে খাওয়ায় আর দ্বীপ হেসে রিভিউ দেয়,

‘ খুব দারুন।’

বাস্তবে খেতে জঘন্য। ধীরে ধীরে দ্বীপ রিদিকে রান্না শেখানো শুরু করে। রাহেলা তার তিন সন্তানকে রান্না শেখাতে কার্পন্য বোধ করেনি।

২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হয় করোনা মহামারী। সারাদেশ লকডাউনের মুখোমুখি হল। আটকে পড়ে মানুষজন যে যার যার জায়গায়। মৃত্যুহার বাড়তে থাকে। আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যায় সবার। ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত, শপিংমল সব বন্ধ হতে শুরু করে। আর খেলা তো সেখানে বিলাসিতা। এই প্রথমবারের মত দ্বীপ ধাক্কা খেল ব্যাংক এমাউন্ট নিয়ে। রিদির অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। দ্বীপ ঘরে বসে থাকে। টিভি, ল্যাপটপ আর কত ভালো লাগবে? দুজন মিলে দিন কাটাচ্ছে আর অপেক্ষার প্রহর গুনছে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

আশপাশে বন্ধুদের মাঝে অনেকের করোনা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। কেউ কাউকে ছুঁতেও রাজি নয়। মা, সন্তান চেনে না। সন্তান পিতা চেনে না। ভাই-বোন মরে গেলে লাশ নিতে আসে না পরিবারের কেউ। এ কেমন আজাব নাজিল হল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে! নোয়াখালী থেকে খবর এলো সখিনা বানু ভীষণ অসুস্থ। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছে। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়া হচ্ছে। এদিকে দ্বীপ যেতে চেয়েছে মিজান সাহেব স্পষ্ট বারণ করেছেন যেন বাসা থেকে বের না হয়। রাহা এবং রায়হান নোয়াখালী গিয়ে আটকে গিয়েছে। রিদি আর দ্বীপ ঢাকাতে একা। রিদন ফোনে জানাল সে দাদীকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছে।

দ্বীপ মন মরা হয়ে বসে আছে বারান্দায়। রিদি কফি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ আমার আর ভাল লাগছে না। এই ক্রান্তি কবে কাটিয়ে উঠব? ‘

দ্বীপ মেকি হাসি টেনে বলল, ‘ ইনশাআল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি। ‘

রিদি জানে দ্বীপ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সখিনা বানু নাতি বলতে অজ্ঞান ছিলেন। আজ সেই নাতি তার দূর্দিনে কাছে নেই এর থেকে কষ্টের আর কি হতে পারে?

পরদিন সকালে রিদি বলল, ‘ চলো দ্বীপ আমরা যাই। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। হয়ত প্রথমে সবাই রাগ করবে পরে আর কিছু বলবেনা। পি পি ই তো বাসায় আছেই। ‘

কারণ জানা নেই তবে দ্বীপ এই প্রথম বার রিদির এমন কথায় সাড়া দিয়ে বলল, ‘ ব্যাগ গোছাও। বের হব। স্যানিটাইজার নিও সাথে।’

দুজনই বাসা থেকে বের হবে ঠিক সেই মুহুর্তে রিদনের কল আসল। দ্বীপ রিসিভ করতেই রিদনের সিক্ত গলা, ‘ ভাই দাদী আর নেই?’

দ্বীপ থমকে গেল। রিদি দ্বীপের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল দ্বীপের চোখ জোড়া চিক চিক করছে জলে। দ্বীপের কান থেকে ফোন নিয়ে যা শোনার তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। রিদি যেতে চাইলেও আর দ্বীপ রাজি হল না। রিদন জানিয়েছে এখন নোয়াখালী যাওয়া মানেই বিপদ। ঢাকা থেকেও ভাইরাস বহন করে নিয়ে যেতে পারে। মিজান সাহেব অসুস্থ। সন্দেহ করা হচ্ছে সখিনা বানু করোনা ইফেক্টেড ছিলেন। সখিনা বানুর দাফনকাজ সম্পন্ন হল দ্বীপের অনুপস্থিতে। ব্যাংকের এমাউন্ট ধীরে ধীরে কমছে। দ্বীপ গাড়িটা কিছুদিন আগে বিক্রি করেছিল নতুন গাড়ি কিনবে ভেবে। সেই টাকাটা ব্যাংকে আছে। এখন মনে হচ্ছে বিক্রি করে ভালোই করেছে। কবে পৃথিবী স্বাভাবিক হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

এপ্রিল, ২০২১

এক বছর অতিক্রান্ত হল। গত বছর অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল, একুশ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে পুনরায় শুরু হলো মহামারি। দুই দুইটা ঈদ কাটিয়েছে বন্দি অবস্থায়।

দ্বীপ বাজার থেকে এসেই ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলো। জিনিস গুলো স্যানিটাইজ করে নিলো। দুজন মিলে রান্না করে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। রিদি ঘুমাচ্ছে। আচমকা দ্বীপের মনে হলো তার জ্বর এসেছে। শরীরে দাঁড়ানোর কোনো শক্তি নেই। রিদিকে না জাগিয়ে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখল। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। টিস্যু দিয়ে নাক চেপে ফোন হাতে নিল। মাথা ব্যাথা বাড়ছে। আশ্চর্য! এত তাড়াতাড়ি কিভাবে রোগ ছড়ালো! লক্ষন গুলো সার্চ দিয়ে দেখে বুঝতে পারল প্রতিটি লক্ষনই করোনার। খবরে দেখাচ্ছে প্রতিদিনই করোনা পজিটিভ রোগী ভর্তি হচ্ছে এবং ২০/৩০ জন মারা যাচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। সাধারণ ভাইরাসের জ্বর, কাশি হলে যেসব ঔষধ সাজেস্ট করে সেগুলো দিয়েই আপাতত টেস্টিং চলছে হাসপাতাল গুলোতে। ভ্যাক্সিন দেয়া হচ্ছে অল্প স্বল্প। এবারের উপসর্গের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে শ্বাসকষ্ট। ফুসফুসে আক্রমন করছে ভাইরাস। নিশ্চিত প্রতিকার কারো জানা নেই।

দ্বীপ নিজেকে শক্ত রেখে রিদির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ডাকল। রিদি হকচকিয়ে উঠে গেল। উঠে হাসিমুখে প্রশ্ন করল,

‘ কী হয়েছে? কখন উঠলে?’

রিদি কাছে আসতে চাইলেই হাত দিয়ে থামিয়ে বলল, ‘ ওখানে দাঁড়াও, আগাবে না। ‘

রিদি চমকে উঠল, ‘ কেন?’

‘ তুমি আজ থেকে আলাদা থাকো। আর যদি পসিবল হয় মামার বাসায় চলে যাও।’

‘ কেন?’

‘ যা বলছি তাই করো। এত প্রশ্ন করো না।’

রিদি এগিয়ে এসে দ্বীপকে ধরবে তার আগেই দ্বীপ চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ রিদি কীপ ডিস্টেন্স। নিষেধ করেছি। আগাবে না।’

রিদি চমকে গেল। ভয়ে কেঁপে উঠল। বিয়ের প্রায় দেড় বছর অতিক্রম হলো দ্বীপ এমন ব্যবহার কখনও করে নি। অথচ আজ করছে। রিদির চোখ দিয়ে তরতরিয়ে পানি পড়ছে। প্রশ্ন করল, ‘ এমন করছ কেন? কী করেছি আমি?’

দ্বীপ রিদির দিকে তাকিয়ে অসহায় চোখে বলল,
‘ রিদি আমি মনে হয় করোনা ইফেক্টেড । প্লিজ দূরে থাকো। চলে যাও তুমি। ‘

রিদি নিষ্প্রাণ চাহনী তাকিয়ে আছে। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দ্বীপ আগের জায়গায় স্থির। ওর মনে হচ্ছে নড়লেই বুঝি করোনা ছড়াবে? হুশ ফিরতেই রিদি উঠে দাঁড়ায়। ছুটে গিয়ে দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে। দ্বীপ চিৎকার দিচ্ছে। রিদি দ্বীপের মুখ চেপে ধরল। দ্বীপের গায়ের জ্বরের তাপে রিদি যা বুঝার বুঝে গিয়েছে।

কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ আস্তে, মানুষ শুনবে। আশেপাশের লোকজন শুনলে নিস্তার নেই।তুমি এখনও টেস্ট করোনি। আন্দাজে অনেক কিছুই বলা যায়। যদি হয়েও যায় তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবুও চেঁচিয়ো না।’

রিদির হাত মুখ থেকে সরিয়ে দ্বীপ বলল, ‘ আমার সমস্যা আছে। আমি চাই না তোমার কিছু হোক। পুরো জীবনটা বাকি তোমার ।’

‘ কারো কিছুই হবে না। আগামীকাল ফোন দিব বাসায় এসে টেস্ট করার জন্য। দেখা যাক কী হয়।’

পরদিন বাসায় এসে টেস্ট করে দেখে দ্বীপের পজিটিভ, রিদির নেগেটিভ। দ্বীপ কিছুতেই রিদিকে নিজের কাছে রাখবেনা। বাসায় জানিয়ে দিয়েছে সব। জাবেদ সাহেবকে জানানোর পর জাবেদ সাহেব বললেন,

‘ রিদি যদি বাঁচে তোমার সাথে বাঁচবে, মরলে তোমার সাথেই মরবে। এখানে ওর আসার প্রয়োজন নেই।’

জাবেদ সাহেবের এই এক কথায় রিদি মনে সাহস বেড়ে গেল। মিজান সাহেব বললেন তফুরাকে ফোন দিয়ে বলতে যেন প্রতিদিন ডেলিভারি ম্যান দিয়ে রান্না করে পাঠায়। দ্বীপ রাজি হয় নি। এরপর মাহফুজ সাহেবকে মিজান সাহেব নিজেই ফোন দিয়ে বললেন, ‘ একটু দেখে আসতে। ওদের কিছু প্রয়োজন কিনা?’

মাহফুজ নাকোচ করে দিল। দ্বীপ হেসে বাবাকে বলল,

‘ আব্বু দুশ্চিন্তা বাদ দেন। হায়াৎ থাকলে এমনিতেই বাঁচব। কেউ রেধে খাওয়ালে এমন কিছু মেডিসিন পাব না যে শোয়া থেকে উঠে বসে যাব। আমি আর রিদি মিলেমিশে কিছু একটা করে নেব। দিন চলে যাবে। ‘

বোনের অসুস্থতার কথা শুনে রাহা এবং রায়হান নোয়াখালী থেকে এম্বুল্যান্স ভাড়া করে চলে এসেছে। প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসে দুজন। বাচ্চাদের নোয়াখালী রেখে এসেছে। একুশ দিন পর দ্বীপ সুস্থ হলেও রিদি অসুস্থ হয়ে গেল। রিদিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। বাঁচা মরার সংগ্রামে বেয়াল্লিশ দিন যুদ্ধ করে যখন দুজন বাসায় ফিরল দ্বীপ তখন রিদিকে বলেছিল, ‘ আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ফিরে এসেছি ঠিকই কিন্তু আমি মানুষ চিনেছি অনেক।’

রিদি জানে দ্বীপ কার কথা বলছে। দ্বীপের তফুরা ফুফু ঢাকাতে শিফট হয়েছে গত এক বছর আগে। করোনা হওয়ার আগে তার স্বামীর অপারেশন হয়। দ্বীপ ছুটে গিয়েছিল মা বাবার অনুরোধে। একদিনে অঞ্জনার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে,অন্যদিকে তফুরার স্বামী হাসপাতালে। মানসিকভাবে ওদের পরিবার ভেঙে পড়েছিল৷মিজান সাহেব আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান নি। দ্বীপের ফুফার এই বিপদে তার ভাইয়েরাও পাশে ছিল না। অথচ দ্বীপ খেলা বাদ দিয়ে ফুফুর পাশে হাসপাতালে পড়ে ছিল। রিদি প্রতিদিন খাবার নিয়ে যেত। সেই ফুফু একদিনও দ্বীপের অসুস্থতায় খবর নেয় নি যদি ওদের দেখতে আসতে হয়। চাচা মাহফুজ তো এমন ভান করল চেনেই না দ্বীপকে। বিপদে মানুষ চেনা যায়।

__

২০২২, মার্চ মাস।

স্নাতক শেষ বর্ষে রিদি। ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়েছে। দ্বীপ নতুন বিজনেস শুরু করেছে। রিদন বিজনেস দেখে। বিজনেস অফিস চট্টগ্রাম। রিদির পরীক্ষা শেষ হলে রিদিকে নিয়ে চট্টগ্রাম শিফট হবে। খেলা আবার শুরু হয়েছে। দ্বীপ প্র্যাকটিস থেকে ফিরে ভাত খেতে বসেছে। এমন সময় রাহেলা ফোন দিল৷ দুজনের সাথেই কথা হল। কথা শেষে দ্বীপ লক্ষ্য করল রিদির মন খারাপ।

দ্বীপ প্রশ্ন করতেই বলল, ‘ কাল ডাক্তার কাছে নিয়ে যাবে আমাকে?’

দ্বীপ প্রশ্ন করল ভ্রু কুচকে, ‘ কি কারণে?’

‘ আমার সমস্যা কোথায় জানতে চাই?

‘ কি নিয়ে সমস্যা?’

‘ আম্মু আজকেও বলেছে বেবির কথা। যদিও জোর দেন নি। এমনি বলেছে যে শরীর স্বাস্থ্য থাকতে বেবি হয়ে গেলে পরে আর কষ্ট নেই। কিন্তু আমার তো…’

দ্বীপ রিদিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ আপসেট হওয়ার প্রয়োজন নেই। সমস্যা আমার। আমি হয়ত তোমাকে ঠিকভাবে আদর যত্ন করিনা। এছাড়া আম্মুরা অনেক কিছু বলে কানে নিও না। তুমি আরেকটু বড় হও। অনেক সময় আছে হাতে।’

দ্বীপের কথায় কিঞ্চিৎ হাসলেও মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। যেভাবে হোক একবার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন। বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে যাচ্ছে এখনও বেবি না হওয়ার কারণ অস্পষ্ট। যতবার ডাক্তারের কথা বলে দ্বীপ এড়িয়ে যায়। নাকি দ্বীপের বেবির প্রতি অনীহা? রিদির মনে হাজারো প্রশ্নের ভাবনা।

__

ডিসেম্বরের শীতের তীব্রতা এই আছে, আবার এই নেই। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ রিদির। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে বন্ধুরা ঘাসের উপর বসে আড্ডা দিচ্ছে। নিয়াজ কোথা থেকে এসে রিদির পাশে বসল৷ রিদি উঠে যেতে চাইলে খপ করে হাত ধরে ফেলল। রিদি রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

‘ হাত ধরলি কেন? তোর কি আমাকে বাজে মেয়ে মনে হয় যে যখন তখন অনুমতি ছাড়া হাত ধরলে আমি খুশিতে গদগদ হয়ে যাব?’

সবাই চমকে উঠল রিদির আচরনে। নিয়াজ লজ্জা পেয়ে সরি বলল। রিদিকে অনুরোধ করল বসতে। রাগ সংযত করে রিদি বসল। নিয়াজ শান্ত স্বরে বলল,

‘ আমি যে তোকে ঠিক কতটা পছন্দ করি তুই জানিস। ভালবাসা জোর করে হয় না আমি জানি। তোকে জোর করব না। তবে আমার একটা প্রশ্ন মনে থেকে যাবে, আমাকে তুই এক্সেপ্ট না করার কারণ কি আমার গায়ের রঙ নাকি আমি গরীব ঘরের ছেলে তাই?’

রিদি কিছু বলবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফোন দিয়েছে দ্বীপ। পরীক্ষা কেমন হয়েছে? কোথায় আছে এসব জিজ্ঞেস করছে? স্বল্প পরিসরে উত্তর দিয়ে চুপ করে বসে আছে। ফোন রেখে নিয়াজের মুখোমুখি হয়ে বসল। বলল,

‘ তোর বাবা মা, গায়ের রঙ কোনো কিছুতেই আমার সমস্যা নেই। কিন্তু আমি তোকে কখনও বন্ধু ব্যতীত অন্য কিছু ভাবিনি।’

‘ ভাব, ভাবতে তো সমস্যা নেই।’

হঠাৎ অপরিচিত পুরুষালি গলা শোনা গেল, ‘ অবশ্যই সমস্যা আছে। এমন কিছু হলে সেটা কবীরা গুনাহ হবে। ‘

সবাই ঘাড় ঘুরাতেই দেখল অপরিচিত গলার পুরুষটি মাথার ক্যাপ আর মুখের মাস্ক খুলে রিদির পাশে বসে এক পাশ থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,

‘ আমার স্ত্রী রিধিমা । আমাদের বিয়ের বয়স তিন বছর।’

আশপাশের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে ছুটে এসেছে। রিদির ফ্রেন্ডরা একসাথে কতগুলো বিস্ময় নিবে বুঝতে পারছে না। একে তো বান্ধবী বিবাহিত তারা জানে না। অন্যদিকে রিদির বর বাংলাদেশ ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন শাহদ্বীপ জিহান। নিয়াজ রিদির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সরি বলে উঠে চলে গেল। রিদি বন্ধুদের সাথে বেশ কিছুক্ষন বসে বটতলা গিয়ে ভাত ভর্তা খেয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওয়ানা হল। রিদি আজ ভীষণ খুশি। দ্বীপের সারপ্রাইজ ওর পছন্দ হয়েছে।

ইশ জীবন কত সুন্দর। প্রতিটি মানুষ এমন জীবনই চায়। রিদির ফলাফল বের হয়েছে। চুয়াল্লিশ তম বিসিএস এর প্রিলিতে হয়ে গিয়েছে। কিছুমাস পর রিটেনেও হয়েছে৷ এত সুখের মাঝে হঠাৎ হানা দিল দুঃখ পাখি। রিদি ডাক্তারের কাছে গিয়ে শুনল ওর সমস্যা আছে। চকলেট সিস্ট ধরা পড়েছে৷ সিস্টের আকার বেশ বড়৷ সেদিন রাতে বাসায় এসে অনেক কাঁদল। আগে যদি বাচ্চা থাকত জরায়ু ফেলে দেয়া যেত অপারেশন করে। কিন্তু এখন ডাক্তার এই রিস্ক নিতে চাচ্ছেন না। অন্তত একটা বাচ্চা হওয়া তো ভীষণ জরুরি।

দ্বীপ রিদিকে আশ্বস্ত করল ইতালি থেকে এসে এই ব্যাপারে কথা বলবে। এর মাঝে রিদি ঔষধ সেবন করুক।

পরদিন দ্বীপ ইতালির পথে পাড়ি দিবে। রিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে রাহার কাছে রেখে গেল। ইতালি যাওয়ার পর দুজনের যোগাযোগ কমে গেল দ্বীপের ব্যস্ততায়। রিদি উদাস থাকতে শুরু করল৷ দ্বীপ দু মাস পর ফিরে এলো। ফিরে আসার পর দ্বীপ লক্ষ্য করল রিদির আচরনে পরিবর্তন। কেমন যেন গোমড়া ভাব। দ্বীপ কাছে গেলেই দূরে সরে যায়। হয়ত বেবি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। দ্বীপ নিজ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। নিজেও ভীষণ একাকিত্বে ভুগছে।

অন্যদিকে রিদির মনে হচ্ছে তাদের দুজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। দ্বীপ রিদিকে আগের মত সময় দিচ্ছে না। কার সাথে যেন ফোনে কথা বলে বেশ সময় ধরে। বাসা থেকে বের হয়ে যায় ফোন আসলেই। রাতে দ্বীপ ঘুমানোর পর ওর আঙুলের ছাপ দিয়ে ফোন লক খুলে কল লিস্ট চেক করতে গিয়ে দেখল, ‘ ফারহিন ‘ নামে এক মেয়ের সাথে অনেক কথা হয়। ভিডিও কলেও কথা হয় ৷ চ্যাট লিস্টে একটা মেসেজ আছে,

‘ আপনি চাইলেও ভুলতে পারবেন না আমাকে । আমি নিজের সেরাটা দিব। ভালোবাসার জায়গায় নো কম্প্রোমাইজ।’

‘ ভরসা করতে পারি তোমাকে?’

‘ হান্ড্রেড পারসেন্ট।’

ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিল রিদি। শরীরের কম্পন টের পাচ্ছে। বুকের ভেতর তোলপাড়। নিজেকে সামলাতে পারছে না। দ্বীপ আর অন্য মেয়ে? কি করে সম্ভব! তাই বুঝি দ্বীপের আচরণে এত পরিবর্তন। মেঝেতে শুয়ে ছিল সারা রাত। দ্বীপ সকালে ঘুম থেকে উঠে রিদিকে মেঝেতে দেখে অবাক হল। নিজেও রিদির পাশে শুয়ে পড়ল। রিদির কোমড় জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখল। ঘুম ঘুম গলায় বলল, ‘ নিচে কেন?’

রিদি নিশ্চুপ। দ্বীপ পুনরায় বলল, ‘ আমার এই মুহুর্তে তোমাকে লাগবে রিদি। প্লিজ ‘না’ করো না আজ।’

রিদির ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। ঘরের বউ ও ঠিক রাখবে, বাইরের প্রেমিকাকেও ভরসা করবে। কি পেশাদার প্রেমিক তার দ্বীপ! ইচ্ছে করল প্রশ্ন করতে ফারহিনের ব্যাপারে, কিন্তু নিজেকে দমিয়ে ফেলে বলল,

‘ বেশ তো, আমি তো তোমার জন্যই আছি।’

রিদি কাঁদছে। দ্বীপের আজ সেই খেয়াল নেই ৷ রিদিতে মত্ত আজ। এই দ্বীপের সাথে আগের দ্বীপের কোনো মিল নেই৷ দ্বীপের আজকের আদরে রিদি যত্ন খুঁজে পায় নি। কেমন যেন উগ্র আচরণ। এই প্রথম রিদি অনিচ্ছা প্রকাশ করল নিজেদের সুখের মিলনে। দ্বীপ যখন রিদিকে ছেড়ে উঠে গেল রিদি তখন অন্য চিন্তায় মগ্ন।
দ্বীপ ওয়াশরুম থেকে উঠে দেখল রিদি উবু হয়ে মেঝেতে বসে আছে। ভ্রু কুচকে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কি হলো, বসে আছ কেন? ফ্রেশ হয়ে নাও। নাকি আমি সাহায্য করব? ‘

রিদি কথা না বলে বাধ্য বাচ্চার মত উঠে পা বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। নিরবে কাঁদল ঝর্ণার পানির নিচে দাঁড়িয়ে। এরচেয়ে তিক্ত অনুভূতি বোধ হয় আর একটি ও নেই পৃথিবীতে? ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখতে পেল দ্বীপ নাস্তা রেডি করে টেবিল সাজিয়েছে। দুজনই খেল ৷ দশটার দিকে দ্বীপের কল এসেছে। ফারহিন কল করেছেন। দ্বীপ বেরিয়ে গেল তড়িঘড়ি করে। রিদি ডাইনিং টেবিলে বসে আছে আর ভাবছে, ‘ কেন এত এত অসুখেও মরলাম না?’

ব্যাগ গুছিয়ে এই অবস্থায় বেরিয়ে গিয়েছিল সেদিন। দ্বীপকে ফোনে জানিয়েছিল, নোয়াখালী যাচ্ছে৷ ব্রেক প্রয়োজন। আর ফিরে নি।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৬

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#দ্বীপ_রিদির_বিয়ে
১৬.

রিদির ফোনে একটার পর একটা মেসেজ আসা শুরু হয়েছে। পার্লার থেকে বের হয়ে কমিউনিটি সেন্টার অবধি আসতে আসতে মেসেজ গুলো চেক করল৷ দুজন মানুষের মেসেজ এসেছে। একজনের টা ইগ্নোর করে অন্যজনের টা পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসছে।

দ্বীপ দুই পরিবারের সাথে একসাথে মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করেছে। অস্থির হয়ে বার বার প্রশ্ন করছে মেসেজে , ‘ কত দূর হলো, কখন আসবে, আর কতক্ষন অপেক্ষা করতে হবে এসব।’
সেন্টারে ঢোকার আগেও দ্বীপ মাস্ক পরে ঢুকেছে শুনে রিদি হেসে ফেলল। প্রমা এবং মিরাও এসেছে। ওদের খুশি ধরে কে? বান্ধবীর এতদিনের সম্পর্কের পরিণতি স্বচক্ষে দেখছে, এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

দ্বীপের মুখ বেশ গম্ভীর। কেউ কেউ বলছে বিয়ের দিন বরকে সুন্দর লাগা উচিত নয়, নজর লাগে। আর কেউ কেউ বলছে বর বিখ্যাত ব্যক্তি, চাইলে আরও সুন্দরী বিয়ে করতে পারত, অনেকের মন্তব্য খাবার ভালো হয় নি আবার অনেকের ধারণা এই বিয়েটা সম্পর্কের বিয়ে। সব মিলিয়ে বিয়ে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা অপ্রয়োজনীয় কথার ঝুলি নিয়ে বসেছে।

প্রথমে রিদিকে বিয়ে পড়ালেন কাজী সাহেব। রিদির মামা পাশে ছিলেন। তিনি সাহস দিতেই রিদি অবলীলায় আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেলল। সে বুঝতেও পারে নি তার দিক থেকে কবুল বলা হয়ে গিয়েছে। কাজী সাহেব চলে যাওয়ার পর রাহাকে বলল,

‘ আপু আমি কবুল বলিনি তো?’
‘ আলহামদুলিল্লাহ বলেছিস তো?’
‘ দুটো এক না, কাজী সাহেবকে ডাকো, কবুল বলব। কান্না করব। আমি তো বুঝিও নি বিয়ে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।’

আমিনা মেয়েকে ধমকে বলল, ‘ কি বেহায়া দেখছো। আস্তে কথা বল। আত্মীয় স্বজনরা শুনলে কি বলবে?’

মায়ের ধমক খেয়ে রিদি চুপসে গেল৷ এখনও কি বকবে? এখন তার বিয়ে হয়েছে না?

__

কাজী সাহেব দ্বীপকে যা যা বললেন দ্বীপ মুখে মুখে সবই বলল। এখন সকলের অপেক্ষা দ্বীপের মুখ থেকে কবুল শোনার। দ্বীপ চুপ করে আছে। জাবেদ সাহেব এবং মিজান সাহেব দ্বীপের পাশে বসলেন। দুজনই টের পাচ্ছেন দ্বীপের বিচলিত অবস্থা। নিজেকে ধাতস্থ করে দ্বীপ কবুল বলে ফেলল। সবাই কোলাকুলি করছে। শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। দ্বীপ চুপ করে বসে আছে এক পাশে। খাবারের আগে রিদিকে আনা হল।

দ্বীপের পাশে বসানো হল। রিদির মাথা ঘোমটায় ঢাকা। ভাই বোনেরা সবাই অনুরোধ করল ঘোমটা তুলতে৷ সংকোচ নিয়ে দ্বীপ ঘোমটা তুলল। রিদির মুখ দেখে মাশা আল্লাহ উচ্চারণ করল। আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করল যা রিদি ছাড়া কেউ শোনেনি। ‘ আমার বউ’। তা শুনেই রিদি চোখ তুলে দ্বীপের দিকে তড়াক করে তাকাল। শুভদৃষ্টি হল ঠিকই কিন্তু দ্বীপ আবেগ ধরে রাখতে পারে নি আজ। কিছুক্ষন রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে, ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। আচমকা সেন্টার জুড়ে থাকা কোলাহল থেমে গেল। বর স্টেজ ছেড়ে উঠে গিয়েছে। বড়রা বুঝতে না পেরে সামনে এগিয়ে এল। রায়হান ইশারা দিল শান্ত থাকতে। রিদন এবং রায়হান দুজনই ওয়াশরুমের দিকে গিয়ে দেখে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দ্বীপ। কাঁদছে। রিদনকে আটকে দিল রায়হান,

‘ যেয়ো না, কাঁদতে দাও৷ ওদের এই প্রাপ্তির পেছনে দুজনের কষ্ট গুলো আড়াল করা। কেঁদে হালকা হোক।’

রায়হান আর রিদন দ্বীপকে একা ছেড়ে দিয়ে হলে এসে সবাইকে বলল যে দ্বীপের শরীর খারাপ লাগাতে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। গত কয়েক রাত ঘুম হয়নি তাই। এদিকে রিদি স্টেজে বসে দুশ্চিন্তা করছে। প্রায় মিনিট দশেকের মাথায় দ্বীপ ফ্রেশ হয়ে এসে রিদির পাশে বসল। মেকি হেসে ভাইবোনদের বলল, ‘ সরি আমার শরীর টা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।’

রায়হান সবাইকে ছবি তুলতে ব্যস্ত করে দিল। সখিনা বানু, আম্বিয়া বেগম বান্ধবী হয়েছে। দ্বীপ সরাসরি রিদির দিকে আর একটি বারও তাকায় নি। হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। রিদি একটু কাত হয়ে বলল, ‘ তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন? আমাকে দেখতে কি বাজে লাগছে? ‘

দ্বীপ ফোনের দিকে তাকিয়েই বলল,’ দেখছি তো।’

রিদি খানিকটা অভিমান নিয়েই বলল, ‘ হ্যাঁ দেখছেন তো, কিন্তু আপনার ফোন। ভাল, ফোনের দিকেই তাকিয়ে থাকুন, বিয়ে তো ফোনের সাথেই হয়েছে।’

দ্বীপ ফোনটা রিদির সামনে এগিয়ে দিল। রিদি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে তারই ছবি দেখছে দ্বীপ। কিছুক্ষণ আগে তোলা। লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। দ্বীপ হেসে বলল, ‘ সরাসরি তোমার চোখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা আপাতত নেই । আমি সম্ভবত নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হব । ‘

প্রমা এবং মিরা সামনে আসতেই দ্বীপ দুজনকে বলল, ‘ আমি তোমাদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমরা না থাকলে রিদি কখনো আমার হত না।’

রিদির ফোনে ক্রমাগত কল আসছে। রিদিকে বার বার কাটতে দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কোনো সমস্যা?’

রিদি ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নেড়ে জানাল কোনো সমস্যা নেই।

___

যাওয়ার সময় জাবেদ সাহেব যখন রিদিকে দ্বীপের হাতে তুলে দিচ্ছেন তখন সামান্য কিছু কথা বললেন, ‘ তোমার উপর ভরসা করলাম, নিরাশ করো না। ‘

রিদিকে বুকে জড়িয়ে বললেন, ‘ তোমাকে শেষ অবধি আমি পড়াব যতদিন বেঁচে আছি। নিজের জন্য একটা স্থান করে নিবে এই আমার অনুরোধ। বাবার সাহায্য প্রয়োজন হলে বাবাকেও বলার প্রয়োজন নেই। একাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেবে। নিজের উপর কারো অত্যাচার সহ্য করবে না। প্রতিবাদ তোমার অস্ত্র। ভালো থাকো, সুখী হও। ‘

জাবেদ সাহেব দুজনকে বুকে জড়িয়ে দোয়া করে সামনে থেকে সরে গেলেন। মেয়ের বিদায় মেনে নিতে পারবেন না তিনি।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে দ্বীপদের বাসায় আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। দ্বীপ গাড়িতে রিদির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে অন্য হাতে ফোনে কথা বলছিল। এই গাড়িতে রাহেলা এবং রিদিকেই প্রথম বসিয়েছে। রিদন সামনে বসেছে ড্রাইভারের সাথে। ঘাড় ঘুরিয়ে এমন দৃশ্য দেখে মনে মনে ভাবল, ‘ আহ! ভাইয়া- ভাবী দুজনকে কত মানিয়েছে। কি শান্ত প্রেম। আর আমার টা হলে এতক্ষনে গাড়িতে ধুম মাচালে গানের সাথে নাচ লাগিয়ে দিত। ‘ পরক্ষনেই ভাবল নাচ গানের জন্য হলেও এবার বিয়েটা করে নিতে হবে। কটা দিন গেলে বাসায় এই কথা উঠানো জরুরি। আর কত কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমাবে? আজ বিয়েতে আসতে পারেনি বলে প্রমি মন খারাপ করেছে। দ্বীপ বলেছিল প্রমিকে আসতে বলার কথা রিদন নিজ থেকেই বারণ করছে। কখন বেফাঁস কিছু মুখ দিয়ে বের করে ফেলবে তখন বিপদ হবে।

বাসায় ফিরে সবার মাঝে জম্পেশ আড্ডা জমে উঠেছে। দ্বীপের কোনো ফুফুই এই বিয়েতে উপস্থিত ছিল না। রাহেলা ফোন দিয়ে বলার পরও তারা আসে নি। অন্যদিকে মিজান সাহেব জেদ ধরেছে এদের সাথে সম্পর্কই আর রাখবেনা। সারাজীবন খেটেছে এদের জন্য অথচ তার আনন্দের সময়ও এরা নিজেদের স্বার্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

রিদিকে ড্রইং রুমে বসানো হলো। ভেতরে রিদন অন্য ভাইবোনদের নিয়ে কামরা সাজাতে ব্যস্ত। রাহেলা রিদিকে মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। রিদির পাশে এসে সখিনা বানু বসলেন। এখনও চোখে ঝাপসা দেখেন। কানে হিয়ারিং এইড থাকে সবসময়। রিদিকে বললেন, ‘ তুমি কি আমার নাত বউ?’

রিদি উপর নিচ মাথা নাড়ল। সখিনা বানু সবাইকে বলল, ‘ এই বউডা সুন্দর আছে। আগের বউ ডা ভালা না দেখতে। ‘

ড্রইং রুমে বাজ পড়ল। আগের বউ মানে? এই মহিলা কি বলে? সাজিনা দাদীকে বলল, ‘ এই দাদী কি বলো এসব। আগের বউ মানে?’

সখিনা বানু কি আর সাজিনার কথা কানে তোলে? রিদিকে আপন মনে বলা শুরু করেছে, ‘বিষ খাইয়া মইরা গেছে আগের বউডা।’

সেই সময় রিদন ড্রইং রুমে এসে দাদীর কথা শুনল। প্রথমে বিচলিত হলেও পরে পুরোটা শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘ ভাবী কিছু মনে কইরেন না। আমার ফুফাতো বোন ভাইয়ার প্রেমে মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছে তবে এখনও বিষ খায় নি। খেলে তো আমরা বেঁচে যেতাম। দাদী তাকেই বউ বলছে। ‘

রিদির হাসি পেলেও নিজেকে সামনে নিলো। তবে রিদি অবাক হল এই মেয়ের কথা সে আজ পর্যন্ত কখনো দ্বীপের মুখে শুনে নি , কিন্তু কেন?

সখিনা বানু রিদনকে ধমক দিলেন তার কথার মাঝে বাম হাত ঢোকানোর জন্য। তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন,
‘ আমার জিহান ভাই ওই বউরে সোহাগ করত না। হের লাইগা ওই বউ ভাইগগা গেছে। তুমি কইলাম জামাইয়ের কোল থেইকা নামবা না। বউ হইল সোহাগ করনের জিনিস। বউ ভাইগগা যাইব ক্যা? আর হুনো নাত বউ, আমার নাতী যেমনে খাইতে চায় অমনে খাইতে দিবা। আমারে তোমার দাদা শ্বশুর কইতো যে জামাই বউরে বেশি আদর করে সে কামড়াইয়া …’

মিজান সাহেব এবং মাহফুজ সাহেব বাইরে থেকে মাত্র এই রুমে এসেছিলেন, মায়ের কথা শুনে না বসেই চলে গেলেন। রিদন দাদীকে এক চোট বকে বলল, ‘ এই বুড়ি তোমার জামাই তোমারে কামড়াইছে না খামছাইছে ওইটা ঢাক ঢোল পিডাইয়া কওন লাগব? শরমের মাথা খাইছ নি পাগল বুড়ি?’

দ্বীপ এতক্ষন চুপ করে সব শুনছিল। তবে ফোনে মনোযোগ থাকাতে লক্ষ্য করে নি৷ আপাতত অশালীন কথা কানে আসাতে সাজিনাকে বলল, ‘ দাদীকে রুমে নিয়ে যা। ‘

সখিনা বানুর থামার নাম নেই। দ্বীপকে বলল, ‘ ভাই আগে দুই রাকাত নামাজ পইড়া নিও। রহমত পাইবা। এরপর বউরে ধরবা।’

দ্বীপ শান্ত স্বরে দাদীকে বলল, ‘ দাদী তুমি চুপ থাকতে পারো না।’

রিদন রান্নাঘর থেকে রাহেলাকে ধরে নিয়ে এসেছে । রান্নাঘরে কাজ করছিল রাহেলা এবং ওর জা। দুজনই ছুটে আসল। তখন সখিনা বানু ছেলের বউদের বলল, ‘ ও বউরা জামাই বউয়ের রুমে দুধ আর মিষ্টি দিও। জিহান বউয়ের মুখে মিষ্টি খাওয়ায় এরপর বউরে…’

দ্বীপ চিৎকার দিয়ে রিদনকে ডেকে বলল, ‘ রিদন দাদীকে তুলে নিয়ে রুমে রেখে আয়। যা মুখে আসছে তাই শুরু করেছে।’

এই প্রথম দ্বীপকে কেউ লজ্জায় চিৎকার দিতে দেখল। রিদন সখিনা বানুকে কোলে তুলে নিল। সখিনা বানু চিল্লাচিল্লি করে বলে, ‘ আরেহ হতচ্ছাড়া আমারে কোলে নিতাছোস ক্যা। বাসর তো ওগো দুজনের। তোর শরম নাই রিদইন্না। নামা আমারে। আমারে কেউ বাঁচাও। আমারে তুইলা নিয়া যায়! বেশরম কোনহানকার, বুড়ি বেডিরে কোলে নিছোস ।’

রিদন রুমে রেখে আসল সখিনা বানুকে। মা, চাচীকে বলল তাকে ব্যস্ত রাখতে। মাহফুজ সাহেবের স্ত্রী তাকে ভুলিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত করলেন। রিদন আসার আগে দাদীকে বলল, ‘ পুরা আটার বস্তা, কেমনে যে দাদা এইডারে সামলাইছে আল্লাহ জানে।’

__

মাহফুজ সাহেব এবং মিজান সাহেব দুই ভাইয়ের মাঝে তর্কযুদ্ধ চলছে, হাসপাতালে যাওয়া নিয়ে। অঞ্জনা সুইসাইড এটেম্প করেছে দ্বীপের বিয়ে হয়ে গিয়েছে শুনে। মিজান সাহেব ছোট ভাইয়ের উপর রাগ করে বললেন,

‘ ছোট বেলা থেকেই এক কথা এই মেয়ের মাথায় ঢুকানোর জন্য তোরা দায়ী। আমার পরিবারের পক্ষ থেকে কিংবা জিহান কখনোই কোনো প্রশ্রয় দেয় নি। আর আমি তফুরার সাহসের তারিফ করি। কত বড় নেমকহারাম হলে বলে আমার নামে কেইস করবে? করুক কেইস। আমি কিছুতেই যাব না। ‘

আজ মিজান সাহেবকে এভাবে কথা বলতে দেখে পরিবারের বাকিরা ভীতসন্ত্রস্ত । এবার মাহফুজ রাহেলাকে অনুরোধ করে বলল, ‘ ভাবী আপনি চলেন, ভাইয়া না গেলে নাই। আমাদের তো একটা সমাজ আছে বলেন।’

রাহেলা রাজি হয়ে যাবে কিন্তু তার আগেই মিজান সাহেব ধমকে বললেন, ‘ কিসের সমাজ! ওরে যখন তোর বোনেরা অত্যাচার করত তখন সমাজ কি প্রতিবাদ করছে? তোর বউরে অত্যাচার করলে বুঝতে পারি কেমন মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম আমি। আম্মাকে দিন রাত কানের মধ্যে হাবিজাবি কথা দিত। ফলশ্রুতিতে আমার ঘরে অশান্তি। আমার পরিবার থেকে কেউ যাবে না। ‘

দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কিছু কি খেয়েছে নাকি গলায় দড়ি দিয়েছে?’

আচানক রিদন অট্টহাসি দিয়ে ফেলল। আর ওকে থামানোর সাধ্য ও কারো নেই। বলল, ‘ ভাই, খবিশটা বাথরুম ক্লিনজার মানে হারপিক খাইছে। দাদীর কথা ফলে গেছে। কষ্ট কইরা বাথরুম ক্লিনজার না খাইয়া এক চামচ বর্জ্য কমোড থেকে তুইলা নিয়াই খাইত। অথবা আমারে ফোন দিয়ে বললে আমি আমাদের শান এর মুত এক বোতল নিয়া খাওয়ায় দিতাম।’

মিজান সাহেব আর মাহফুজ চোখ পাকিয়ে রিদনের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে দ্বীপ ধমকে বলল, ‘ ফাইযলামি সব জায়গায় মানায় না। ‘

মিজান সাহেব বেশ কিছুক্ষন পর রাজি হলেন তবে রাহেলাকে নেবেন না। দ্বীপকে ও যেতে বারণ করেছেন। দ্বীপের মন টানছে না বাবাকে এই পরিস্থিতিতে একা ছাড়তে। তফুরা ফুফু যদি সত্যি ঝামেলা করে। রিদির কাছে অনুমতি চাইতে গেলে রিদি সায় দিল। রিদন নিজ থেকেই বলল সে যাবে।

যাওয়ার সময় দ্বীপ মুখে মাস্ক পরে নিল। গাড়িতে রিদন বলল, ‘ ভাই আমার মনে হচ্ছে তফুরা বেগম ঝামেলা করবে। যদি কেইস খেয়ে যাও…? মনে রেখো ভাবী তোমার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছে। এই খবিশ মেয়েটার জন্য তোমার আসা উচিত হয়নি। ‘

দ্বীপ চিন্তিত স্বরে বলল, ‘ আব্বুকে একা ছাড়লে ফুফু যে কী করত আমাকে বের করে আনার জন্য সেটা ভেবেই আমি অসুস্থ বোধ করছি। আমি না গেলে ঝামেলা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। এনিওয়ে, তুই আগে উপরে যেয়ে দেখবি সব ঠিক কিনা এরপর আমি যাব। ‘

হঠাৎ রিদন খেয়াল করল তাদের গাড়ির পেছনে বেশ কিছু বাইক। এই বাইক গুলো হাসপাতাল পর্যন্ত এসেছে। কিছুক্ষণ পর বুঝল এগুলো ওদের নিরাপত্তার জন্য এসেছে। রিদন প্রথমে উপরে গিয়ে দেখে পুলিশ কেবিনের সামনে। তফুরা রিদনকে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠল। রিদন সিঁড়ি দিয়ে ভৌ দৌঁড় দিয়ে নিচে নামল। এদিকে ওর পেছনে পুলিশ ছুটছে। নিচে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ ডাইনী টা পুলিশ নিয়ে এসেছে সত্যি সত্যি। ‘

মিজান সাহেব কিড়মিড়িয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। মাহফুজ ঢোক গিলে বলল, ‘ আমি কি আর জানতাম?’
দ্বীপ একটু আড়ালে এসে এমপি সাহেবকে ফোন দিল। সব খুলে বলতেই এমপি সাহেব শর্তের বিনিময়ে উপকার করবেন জানালেন। দ্বীপ খানিকটা ঘাবড়ে গেল। আবার রাজনীতি করতে বলবে নাতো? দ্বীপকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ নেক্সট ম্যাচে কে জিতবে, কে হারবে জানি না। তবে তুই দুইটা গোল করবি কথা দে।’

দ্বীপ হেসে ফেলল। মানুষটা যেমনই হোক দ্বীপের প্রতি তার স্নেহ দ্বীপকে বরাবর মুগ্ধ করে। তফুরা বাড়াবাড়ি করার সুযোগ তেমন পায় নি। এই মহিলা এত খারাপ যে নিজের ভাইয়ের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পিছ পা হত না যদি না এমপি পুরো ব্যাপারটা সামলে নিতেন। পুলিশ ও ঝামেলা করে নি।

অঞ্জনা দ্বীপের সাথে দেখা করতে চাইলে রিদন বাঁধা দিল। নার্স বলল, ‘ পেশেন্ট শুধু জিহান নামে কারো সাথে দেখা করতে চাইছেন। ‘

দ্বীপের মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। যার কারণে এখন পর্যন্ত কেউ জানেনা এর আড়ালে কে আছে? রিদন নার্সের সাথে রেগে গিয়ে বললেন,

‘ আপনার পেশেন্ট কে মরতে বলেন। এরম নষ্ট মাইন্ডের মেয়ের মরে যাওয়া উচিত। আমার ভাই একা যাবে না ওই হতচ্ছাড়ির রুমে। গেলে আমিও যাব। এনিওয়ে আপনাদের হাসপাতালে দেখি পরকিয়া সাপোর্ট করছেন? এই মেয়ে পাগল হয়ে আমার ভাইয়ের জন্য মরতে বসলে দোষ কি আমার ভাইয়ের? উলটা ওর সাত জন্মের ভাগ্য আমার ভাবী ঝাটা হাতে আসে নাই ওরে মারতে। এই হাসপাতালের নামে পুলিশ কেইস করব আমি।’

তফুরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। এদিকে দ্বীপ এবং রিদন কেবিনে আসল অঞ্জনার সাথে দেখা করতে। অঞ্জনা জেগেই ছিল। দ্বীপকে প্রশ্ন করল, ‘ তোমার ওয়াইফ কোথায় জিহান ভাই? ‘

রিদন আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল,’ বাসায়, বাসর ঘরে। ভাই এর জন্য দুধ মিষ্টি নিয়ে বসে আছে। তুই মরতে গেলি কেন? নতুবা এতক্ষণে ভাই মিষ্টি খেয়েও ফেলত। বেদ্দপ মাইয়া, আমার ভাবীটা একা বসে আছে। ভালো কথা কোন কোম্পানির হারপিক খাইছিস যে মরলিনা? আমি ওগো বিরুদ্ধে কেইস করমু দুই নাম্বার জিনিস কেন বিক্রি এর জন্য।’

দ্বীপ দাঁত খিঁচে ভাইকে বলল, ‘ তুই সুস্থ আছিস? পাগলের প্রলাপ বকছিস কেন?’

রিদন ঢোক গিলে বলল, ‘ সরি ভাই।’

অঞ্জনার মাঝে কোনো অপরাধ বোধ নেই। জিহানকে ফের বলল, ‘ জিহান ভাই আজ তোমার ঘরে আমি বউ হয়ে থাকতাম, কিন্তু এমনটা কেন হলো না?’

জিহান মাস্কটা খুলে উত্তর দিল, ‘ এমনটা কখনও সম্ভব হত না। আর কেউ জোর করলে আমাকে খুঁজে পেত না। রিদি ছাড়া আমি কাউকেই গ্রহন করব না। তুমি এত বুদ্ধিমান একটা মেয়ে হয়ে এমন বাজে কাজ করেছ যে তোমার বাবা মায়ের মুখ দেখানোর জায়গা রাখো নি। একদম ঠিক করো নি। এখনো সময় আছে। জীবনটাকে গুছিয়ে নাও।’

‘ আমার জীবন তো তুমি ছিলে।’

রিদন খেঁকিয়ে উঠে বলল, ‘ হ কেউ শাহরুখ খানকে বিয়ে করব বলে চিল্লায় মরতে বসলে শাহরুখ খান তো ছুইটা আইসা তারে বিয়া করব গৌরিরে রাইখা তাই না? সেলিব্রিটিদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা ভাল কিন্তু বাড়াবাড়ি অন্যায়।’

অঞ্জনা হেসে বলল, ‘ জিহান ভাই সেলিব্রিটি হওয়ার আগে থেকেই আমি তাকে চাইতাম।’

‘ ভাই সেলিব্রিটি হইছে ভাবীর জন্য, তোর কোনো ক্রেডিট নাই। এ্যই তুই এরম ফর ফর কইরা কেমনে কথা কইতাছোস, নাকি মা মেয়ে মিলে নাটক করছোস যাতে আমাদেরকে ফাঁসাতে পারোস। তোরা চৌদ্দগুষ্টি নাটক বাজ। ভাই চলো।’

দ্বীপ রিদনকে পুনরায় ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলল। অঞ্জনাকে অনুরোধের গলায় বলল, ‘ অঞ্জনা, যা করেছো তা যেন শেষবার হয় । নতুন কিছু করো না। জীবন সুন্দর। সাজিয়ে নাও। আসছি। আল্লাহ হাফেজ।’
__

সবাই বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা। দ্বীপ ভীষন ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিলো সোফায়। সাজিনা এক গ্লাস শরবত করে আনল। দ্বীপকে বলল, ‘ ভাইয়া ভাবী তো অপেক্ষা করছে। ‘

দ্বীপ শরবত টুকু গিলে প্রশ্ন করল, ‘ তোরা খেয়েছিস?’

‘ ভাবী তোমাকে ছাড়া খেতে চায় নি, আম্মু জোর করে খাইয়ে দিয়েছে।’

এর মাঝে রাহেলা ছেলেকে ডেকে নিয়ে বললেন অঞ্জনার ব্যাপারে রিদিকে জানাতে। সম্পর্কে কোনো রাখঢাক না রাখতে। মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। মনে মনে ভাবল, পৃথিবীর সব মায়েরা যদি এমন হত!

নিজেদের কামরায় প্রবেশ করল দ্বীপ । বাড়ির বাকিরা শুয়ে পড়েছে। চারদিকে ফুলের মিষ্টি সুবাস। এই বিয়েতে নিজেদের পরিবারের লোকজন ছাড়া কাউকেই দাওয়াত দেন নি মিজান সাহেব । বাসায় সবাইকে খুব শক্তপোক্ত ভাবে বলেছে এই ছবি যেন কোথাও না দেয়া হয়। অন্যদিকে রিদিকে গায়ে হলুদের রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের জানাতে নিষেধ করেছে দ্বীপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে খ্যাতির বিড়ম্বনা স্বীকার হবে তা রিদি সামলাতে পারবে না, পড়াশোনায় প্রভাব পড়বে।

কামরায় ঢুকে দেখল রিদি শানের সাথে গল্প করছে খাটের এক কোণায় বসে ৷ সাজিনা এসে শানকে নিয়ে গেল। রিদি দ্বীপকে দেখে উঠে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে এক রাশ সংকোচ। রিদিকে বসতে বলে দ্বীপ নিজেও বসল বেতের সোফায় । টুকটাক প্রশ্ন করছে শরীর কেমন, কি দিয়ে খেয়েছে এসব; রিদি মাথা ঝেঁকে উত্তর দিচ্ছে। রিদির সংকোচ দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ তুমি ঠিক আছ?’

রিদি মাথা নেড়ে জানায় ঠিক আছে। দুজনই বিব্রতবোধ করছে। কোথায় থেকে শুরু করবে, কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। গত পাঁচ বছরে অসংখ্য বার দেখা হলেও একই কামরায় এই প্রথম। দ্বীপ উঠে দাঁড়াতে রিদিও উঠে দাঁড়াল। দ্বীপ এক পা আগাতেই রিদি এক পা পিছিয়ে গেল। দ্বীপ লজ্জা পেয়ে বলল,

‘ আশ্চর্য! রিধিমা , এমন যদি সংকোচ করো আমি স্বাভাবিক হব কি করে? তোমার আচরণে আমি বিচলিত বোধ করছি। পেছালে কেন? ‘

রিদি লজ্জা পেয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আমি নার্ভাস।’
‘ কেন?’
‘ দাদী সন্ধ্যায় যা যা বলল?’

দ্বীপের হাসি পেয়ে গেল। সেই কথাগুলো মনে রেখে রিদি এই আচরণ করছে? দ্বীপ আরও কিছুটা আগাল। রিদি ঘেমে গিয়েছে। পেছাতে পেছাতে জানালার সাথে লেগে গেল। দ্বীপ থেমে গিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘ আজ ২০১৯ এর আগস্টের আট তারিখ, আমাদের শুরু হয়েছিল ২০১৫ এর জানুয়ারির বিশ তারিখ। পাঁচ বছর সংগ্রাম করেছি আজকের দিনটার জন্য। এখনও দূরে থাকবে?’

রিদি মাথা নুয়ে রেখেছে। দ্বীপ শান্ত স্বরে বলল, ‘ কিচ্ছু করব না, শুধু একবার তোমাকে জড়িয়ে বুকে চেপে ধরব। বিশ্বাস করতে দাও যে তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ আমার হয়ে।’

রিদি ভীত চাহনীতে তাকাল। দ্বীপ হেসে বলল, ‘ সত্যি।’

আশ্বস্ত হয়ে রিদি খানিকটা আগাতেই দ্বীপ নিজ থেকে টেনে বুকে নিলো। রিদির কানে স্পষ্ট দ্বীপের হৃদস্পন্দন বাজছে।

দ্বীপ ধীর গলায় বলল, ‘ তোমাকে অঞ্জনা সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর কাল দিই? আজ রাতটা পৃথিবীর অন্য কিছু নিয়ে আমি ভাবতে চাই না। ‘

​দ্বীপের বুকের ভেতর কাল বৈশাখী ঝড় উঠেছে, ছটফট করছে রিদির অন্তকলন ও। রিদির কান যখন দ্বীপের হৃদস্পন্দন গুণতে ব্যস্ত, দ্বীপের মাঝে তখন নিজেকে সংযত রাখার লড়াই চলছে। এই প্রথমবার নিজের প্রিয় রমনীকে হালাল উপায়ে আলিঙ্গন করার যে অনুভূতি তা কথায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। পাঁচ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াইয়ের পর আজকের এই মুহূর্ত দুজনের জন্য সুখকর প্রাপ্তি। সময়কে কি থামিয়ে দেয়া যায় না? যদি সাধ্য থাকতো তবে সোনার কাঠি , রূপোর কাঠি ছুঁয়ে দ্বীপ সময় থামিয়ে দিত। আটকে রাখত জাদু পিঞ্জরায়।

​দ্বীপ রিদির মাথায় আলতো করে নিজের চিবুক ঠেকাল। রিদির চুল থেকে ভেসে আসা মেয়েলি সুবাসটা ওকে এক লহমায় মাতাল করে দিল। রিদির পিঠে রাখা নিজের হাতটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে রিদিকে নিজের সাথে মেশালো, ফিসফিসিয়ে বলল,

​’ কত রাত এই একটা মুহূর্তের কথা ভেবে পার করেছি সেই কথা কি মিসেস দ্বীপ জানে ?’

​রিদি নিঃশব্দ। মাথা আনত। দ্বীপের শার্টের সামনের অংশ নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ওর নীরবতাই দ্বীপের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। মুখ লুকাল দ্বীপের শার্টের দুটো বোতাম খোলা উন্মুক্ত বুকে। ধীরে ধীরে লজ্জার সেই আড়ষ্টতা কেটে গিয়ে এখন দুজনের মাঝে এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়েছে ।

​দ্বীপ রিদিকে আলতো করে নিজের বুক থেকে একটু সরিয়ে আনল। জড়িয়ে ধরল রিদির কোমড়। রিদি বাধ্য হয়ে চোখ তুলে তাকাল। দ্বীপের চোখের গভীর, তীব্র চাহনি রিদির ভেতরটা ওলটপালট করে দিচ্ছে।

রিদির লজ্জা, সংকোচ দ্বীপ স্পষ্ট টের পাচ্ছে। ​দ্বীপ নিজের এক হাত বাড়িয়ে রিদির কপালে জমে থাকা ঘাম আলতো করে মুছে দিল। দ্বীপের আঙুলের উষ্ণ ছোঁয়া রিদির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কাঁপন ধরিয়ে দিল। দ্বীপ হাসল, সেই পরিচিত মনকাড়া হাসি। দ্বীপের তপ্ত নিঃশ্বাস রিদির ঘাড়ে ছুঁয়ে যেতেই রিদি চোখ দুটো বুজে ফেলল। ঠোঁট জোড়া রিদির কানের কাছে নামিয়ে এনে ক্ষীণ স্বরে গভীর অনুরাগে দ্বীপ বলল,

​’আজকের এই রাতটা শুধু আমাদের, রিদি। কোনো অতীত নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু তুমি আর আমি।’

​জানালার বাইরে রাতের আকাশটা তখন হয়তো লজ্জা পেয়ে আরও কিছুটা গাঢ় হয়েছিল রিদির সাথে।

___

ভোরের রোদের তেজ আজ কম। ফযরের নামাজ পড়ে শুয়েছে দুজন। রিদির মাথা দ্বীপের ডান হাতের উপর। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এই মেয়ে। রিদির ঘুম দেখে মনে হচ্ছে কত শত রাত নির্ঘুম ছিল এই মেয়ে! আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আঙুল দিয়ে কপাল স্পর্শ করল রিদির। যাচাই করে দেখল রিদির চেতনা আছে কিনা? যখন বুঝতে পারল ঘুমাচ্ছে তখনই রিদির ললাটে গুণে গুণে দশবার অধর ছোঁয়াল। জানালা গলিয়ে ভোরের আলোর প্রবেশ ঘটছে। সেই আলোতে রিদির মুখটা স্পষ্ট। ভারী পর্দা সরানো হয় নি এখনো। তাতে কি দ্বীপ বুঝতে পারছে রিদির হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়ব। ঘুমন্ত রিদির অধরে অধর মিলানোর লোভ সামলাতে পারল না। রাতে মেক আপ তুলে মুখটা সুন্দর ভাবে পরিষ্কার করেছে। লিপস্টিক তুলে ঠোঁট লিপ ওয়েল দিয়েছিল। এই পুষ্ট অধর তাকে টানছে। অধর ছোঁয়াবে ঠিক সেই মুহুর্তে রিদি বলে উঠল,

‘ এভাবে ঘুমের মাঝে আদর করলে আদরের মর্ম কি বুঝা যায়?’

দ্বীপ মাথা সরিয়ে লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল। রিদি চোখ খুলে বলল, ‘ ঘুম গাঢ় হলেও আপনার শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ আমি চিনি বাবু মশাই। আপনি আমায় ছুঁবেন আর আমি টের পাব না এ হতেই পারে না।’

দ্বীপ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল, ‘ সরি। ঘুম আসছিল না। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না তাই…।’

‘ তাই কী?’

‘ আমলকী টেস্ট করছি।’

‘ আমলকী কী?’

‘ দাদী বলেছে বউ হচ্ছে আমলকী, প্রথমে তিতা পরে মিডা। ‘

রিদি লাজে রাঙা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ কী করতে চাচ্ছেন আপনি?’

‘ না খেলে বুঝব কি করে, তিতা না মিডা?’

রিদি দ্বীপের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ মনে মনে এই চলে আপনার?’
দ্বীপ হেসে বলল, ‘ কিছুই চলে না। তুমি ঘুমাও তো, আমি তোমাকে দেখি।’

‘ আপনি ঘুমাবেন না?’

‘ ঈদের নামাজ মিস হবে এখন ঘুমালে।’

রিদি চোখ বুজে দ্বীপকে বলল, ‘ এই নিন চোখ বুজলাম, যা করতে চেয়েছিলেন তা করে নিন। আমি কিছুই মনে করব না।’

দ্বীপের কোনো সাড়া না পেয়ে রিদি চোখ মেলে তাকাল। প্রশ্ন করল, ‘ কি হলো?’

দ্বীপ হেসে বলল, ‘ এখন না। এখন দিলে ওটার রেশ কেটে যাবে। এমন সময় কাজটা করতে হবে যার রেশ অনেক দিন থাকে।’

__

ঈদের সালাত পড়ে এসে সবাই গরু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। রিদির বাবার বাসায় আজ দ্বীপের পরিবারের সবার দাওয়াত। জাবেদ সাহেব এর মনে উচ্ছ্বাস। দুই জামাইকে একসাথে দেখে তার ভালো লাগছে। সমাজে তার সম্মান বেড়েছে। আমিনা বেগমকে পাড়ার সবাই জিজ্ঞেস করে মেয়ের জামাইদের খবর৷
খাওয়ার টেবিলে দুই পরিবার বসেছে। দ্বীপ রিদিকে নিয়ে দুদিন পর ঢাকা ফিরতে চাচ্ছে। জাবেদ সাহেব এর কাছ থেকে অনুমতি চেয়ে বলল,

‘ আংকেল রিদি আপনি অনুমতি দিলে এখন আমার ফ্ল্যাট টাতেই উঠুক। পরে দুজন দেখে একটা বড় বাসা নিব।’

জাবেদ সাহেব হেসে বললেন, ‘ তোমাদের যেভাবে খুশি সংসার সাজাও৷ ভালো থাকো দুজন। এই চাওয়া আমাদের। তবে আমি বেশ অখুশি হলাম তুমি আমাকে আংকেল ডাকাতে। বাবা ডাকবে নতুবা আব্বু। শুনতে ভালো লাগে।’

দ্বীপ লজ্জা পেয়ে মাথা ঝাঁকাল। রাতটা রিদি বাবার বাসায় থাকতে চেয়েছে। দ্বীপ ও আর বারণ করে নি।
যাওয়ার আগে দ্বীপ আর রিদি রুমে কথা বলছিল। রিদির চাচাতো বোন আমের আচার এনে দিল দ্বীপকে। দেখতে বেশ লোভনীয় লাগছিল। দ্বীপ আচার টা মুখে দিয়েই রিদির সাথে কথা বলছিল। কথা বলতে বলতে দ্বীপের চোখ বড় হয়ে গেল। রিদি প্রশ্ন করল,

‘ কি হয়েছে? ‘

মুহূর্তেই দ্বীপের চোখ গুলো লাল লাল হয়ে গিয়েছে। বসা থেকে উঠে টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে মুখ থেকে আচার বের করে ফেলল। ঠোঁট গোল করে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে রিদিকে প্রশ্ন করল,

‘ তোমাদের বাসায় আচারে কি কাঁচা বম্বে মরিচ দেয়? ‘

রিদি চামচ দিয়ে পিরিচের আচার ঘেটে বুঝতে পারল কাজিনদের কাজ এটা। দ্বীপ এক গ্লাস পানি গিলে বলল,

‘ নতুন বউ রাতে কাছে থাকবে না ভেবে বুক জ্বলছিল দুঃখে। আর এখন মুখ জ্বালিয়ে দিল তোমার বোনেরা। অদ্ভুত কষ্ট। ‘

রিদি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘ সরি, আমি ওদের দেখে নিব।’

দ্বীপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কোনো রকম সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। রিদি জানালার দিকে তাকিয়ে দ্বীপের চলে যাওয়া দেখছিল। রাগ হচ্ছে কাজিনদের উপর। এগুলো কোন ধরনের দুষ্টুমি। দ্বীপের গাড়িটা চলে গেল সাঁই সাঁই করে। রিদি রুম থেকে বের হয়ে আচমকা চিৎকার দিয়ে উঠল,

‘ কোন ধরনের অসভ্যতামী এগুলো। তোরা ওর আচারে মরিচ দিয়েছিস কেন? রাগ করে কথা শেষ না হতেই চলে গেল।’

বড়রা রেগে গেল মেয়েগুলোর উপর। রিদি রুমের দরজা খুব জোরে লাগিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। বাইরে থেকে রায়হান দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকছে। দরজা খোলার নাম ই নেই। বেশ কিছুক্ষন পর পুনরায় ধাক্কা দিলে রিদি শরীর ঝেড়ে শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বলল,

‘ কি সমস্যা তোমাদের…?’

দ্বীপ দু কানে আঙুল দিয়ে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে রিদির দিকে। রিদি গলে শান্ত হয়ে গেল।

রায়হান হেসে বলে, ‘ আরো জোরে চিল্লা। তোর বরের কান ফাটিয়ে দে।’

দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ তুমি বাসায় এভাবে চিৎকার দাও?’

রিদি আমতা আমতা করে বলল, ‘ না মানে দি না তো, আজই দিলাম।’

দ্বীপ গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ কথা আছে তোমার সাথে আমার। ভেতরে আসো।’

রিদি দ্বীপকে নিয়ে রুমে ঢুকতেই দ্বীপ ঝাপটে ধরে অধরে আক্রমন করল। আচমকা এমন একটা ঝড়ের মতো মুহূর্ত আসবে, রিদি তা ভাবতেই পারেনি। ওর পুরো শরীর কেঁপে উঠল, চোখের পাতা বুজে এলো।
​ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই দ্বীপ আলতো করে ওকে ছেড়ে দিল। রিদির ঠোঁটে তখনো সেই উষ্ণতার ছোঁয়া লেগে আছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। দ্বীপ ওর খুব কাছে ঝুঁকে, চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,

‘ একদম অভদ্রের মতো চিৎকার দিবে না, দ্বীপকে কাছে ডেকে ভালবেসে বলবে ইউ নিড এফেকশন। ‘

দ্বীপ চলে গেল রিদিকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে। ফোনে মেসেজ আসল রিদির,

‘ বলেছিলাম না এমন সময় চমকে দেব যাতে রেশ না কাটে।’

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৫

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#শুভ_বিবাহ
১৫.

রিদনকে বাসায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সকাল থেকে। আগামীকাল দ্বীপ এবং রিদির বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ গায়ে হলুদ, কত কাজ। কমিউনিটি সেন্টার বুক দিয়ে এসেছেন মিজান সাহেব এবং জাবেদ সাহেব। বিয়ে এবং ওয়ালিমা একসাথেই হয়ে যাবে। পরশু ঈদ বলে কথা। দুই পরিবার ই চায় আত্মীয়তার সম্পর্ক ঈদের আগেই হোক।

দ্বীপ বাইরে থেকে এসেছে কেবল। বাসার পরিস্থিতি উত্তাল দেখে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ আম্মু কি হয়েছে? আপনার হাতে ঝাড়ু কেন?’

রাহেলা রেগে দ্বীপকে বললেন, ‘ ওই হতচ্ছাড়া ছেলেটাকে ধরে আন। এত বেয়াদব হলো কেমন করে জিজ্ঞেস করব। সকাল বেলাই অশান্তি টা লাগিয়ে দিয়েছে বাসায়। ‘

মায়ের হাত থেকে ঝাড়ু নিয়ে সরিয়ে রাখল। বাসায় কান্নার গুন গুন রব পেয়ে সাজিনার দিকে তাকাল দ্বীপ। সাজিনা হাতের ইশারায় দেখালো মায়ের মেজাজ গরম হওয়ার কারণ। আঙুলের ইশারায় বুঝাল কাহিনি ওই রুমে। সাজিনার ইশারা ওয়ালা কামরায় তফুরা ফুফু ঘুমাচ্ছে। দ্বীপ এগিয়ে এসে দেখে তফুরা রেগে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপকে বলল, ‘ আমার বাপের ভিটা থেকে আমাকে যে তোরা উচ্ছেদ করে দিচ্ছিস, আল্লাহ তোদের বিচার করবে।’

সাজিনা আগুনে ঘি ঢেলে বলল, ‘ এটা আমারই বাপের ভিটা না, তোমার বাপের ভিটা কেমনে হল? এটা ভাইয়ার ছেলে মেয়ের বাপের ভিটা। ‘

দ্বীপ বোনের দিকে তাকাতেই সাজিনা শান্ত হয়ে গেল। অধৈর্য্য হয়ে মিজান সাহেব হুংকার ছাড়লেন, ‘ সমস্যাটা কোথায় খুলে বলবি তো! মরা কান্না কানছিস ক্যান?’

মাহফুজ সাহেবের স্ত্রী রিতা বলে উঠল, ‘ ভাইজান আম্মা ছোট আপার চুল সব কেটে ফেলছে।’

থতমত খেয়ে গেল মিজান সাহেব, মাহফুজ সাহেব এবং দ্বীপ। ততক্ষনে তফুরা বাসা থেকে বের হয়ে গেল। রাহেলা গজগজ করে বলে, ‘ সব তোমার ওই বান্দরের কাজ। নিশ্চয়ই আম্মারে এমন কিছু বলছে যে আম্মা ওর চুল কেটে দিছে।’

সাজিনা মুখে ওড়না গুজে হাসছে। এদিকে রিতাও সরে গিয়েছে হাসির ধকল সামলাতে না পেরে। এখানে হাসলে অন্যায় হবে। দ্বীপ রিদনকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েও পেল না। শেষমেষ দাদীর কাছে এসে দেখল দাদী সাজিনার ছেলে শান এর সাথে ফোনে ওগি এন্ড ককরোচ কার্টুন দেখছে আর চকলেট খাচ্ছে। সাজিনা এগিয়ে এসে ভাইকে গতকাল রাতের কাহিনি শোনাচ্ছে,

” গতকাল রাতে রিদন ড্রইং রুমে শুয়ে শুয়ে চকলেট খাচ্ছিল। দাদী রাতে পানি খেতে উঠেছেন। আমি পাশে ছিলাম। রিদনকে চকলেট খেতে দেখে ওর কাছে চাইল। রিদন দেয় নি। দাদী অনুরোধ করে বলল, ‘ এক টুকরা দে, তুই যা কইবি তাই হুনমু।’

তখন রিদন আফসোস নিয়ে বলল, ‘ কচু শুনবা। পারলে যে ডাইনীটার পাশে রাতে শুইবা ওইডার চুল কাইটা দিও তো।’

দাদী মন খারাপ করায় চকলেট শেষে দিয়েছিল। এরপর ওর আর দোষ নেই। সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠে দেখি ফুফুর চুল সব মেঝেতে। দাদী ফুফুর চুল কেটে রিদনের কাছে এসে চকলেট চাচ্ছে। আম্মু সব শুনে আগুন হয়ে আছে। আর রিদন পরনের কাপড় চোপড় সমেয় বাসা থেকে পলাতক। ”

দ্বীপ ক্রোধ সংযত করে বলল, ‘ আমি আর পারলাম না ওকে নিয়ে। তোদের কেন মাথায় থাকে না যে দাদী শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ। আজকে ফুফুর চুল কেটেছে, আগামী কাল যদি কাউকে খুন করতে বলে দাদী তাতেও রাজি হয়ে যাবে। ফাইযলামির লিমিট আছে। আম্মু লাগবে না। আজকে আমিই ওর পা ভেঙে দিব। বেশি লাফাচ্ছে৷ ফাজিল কোথাকার। ‘

সাজিনা বলল, ‘ ভাই ও তো মজা… ‘

সাজিনাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে দ্বীপ আঙুল তুলে বোনকে বলল, ‘ মজা সুস্থ মানুষের সাথে করতে হয় সাজিনা, অসুস্থ মানুষ মজাকে অপরাধে পরিণত করে। ‘

__

শপিং মলের সামনে পুরোনো ট্রাউজার এবং ছেড়া টি শার্ট পরে উসকোখুসকো চুলে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের জুতার দিকে তাকালে মনে হচ্ছে খুবই নিম্ন-বংশের ভিক্ষুক।

ভিক্ষুকের আবার কয়েক ধরনের ক্যাটেগরি আছে। এই ধরুন উচ্চ-বংশীয় ভিক্ষুক। এরা একটা কাগজের বাক্স নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এই রোগ, ওই রোগ অথবা ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে, মানি ব্যাগ চুরি হয়েছে, হাত ভাঙ্গা, পা ভাঙ্গা সাহায্য চাই বলে ভিক্ষা চাইবে। এদের আপনি পঞ্চাশ টাকা দিলে আপনারই লজ্জা লাগবে এই ভেবে যে আহারে আমি এত কৃপন! কিন্তু এরা আদতেও কোনো রোগ বালাই কিংবা দূর্ঘটনার স্বীকার হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। এদের কারণে প্রকৃত বিপদে পড়া মানুষজন সাহায্য পায় না।

এরপর আসুন মধ্যম-বংশীয় ভিক্ষুক। এরা আপনার পেছনে সুপার গ্লু এর মতো লেগে থাকবে। টাকা আদায় না করে এরা শান্তি পায় না। এদের কম হলেও বিশ টাকা দিতে হয়। দেখবেন পথে ঘাটে এমন অনেক বাচ্চাদের, তাদের মায়েরা ভিক্ষা করতে ছেড়ে দেয়।

সর্বশেষ হচ্ছে নিম্ন-বংশীয় ভিক্ষুক। এদের দেখতে অনেক টা চোরের মত। গাঞ্জা খেয়ে বেড়ায়। এদের কাপড় চোপড় দেখলে মনে হয় জীবনেও গোসল করে না। ইচ্ছাকৃত নোংরা থাকে।

আপাতত শপিং মলের সামনে দাঁড়ানো নিম্ন-বংশীয় ভিক্ষুক তার দানকারীর জন্য অপেক্ষায় আছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে সিঁড়িতে বসে মাথা নামিয়ে রাখল। ঠিক তখন পাশ থেকে একজন বলল,

‘ মামা আপনার থালা কই। টাকা কোথায় দিব?’

তথা কথিত ভিক্ষুক মাথা তুলতেই মেয়েটি চমকে বলল, ‘ হে আল্লাহ! এই বেশভূষাই দেখার বাকি ছিল। তুমি কি শোধরাবে না রিদন?’

রিদন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ আমাকে তোমার কোন এঙ্গেল থেকে ভিক্ষুক মনে হয়েছে? ‘

‘ এসব কি পরে আছ? ভিক্ষুক মনে হয়েছে এই অনেক। চোর মনে হলে তো কাছেই আসতাম না।’

‘ এখন যে গরম কাল মাথায় নেই? গরম কালে মানুষ কি রাতে ঘুমানোর সময় লাক্সারি স্যুট প্যান্ট আর টাই পরে ঘুমায়? ছেঁড়া ত্যানা পরে ঘুমায়। আর এই যে আমার গায়ের জামা পায়জামার গুলোর বয়স দুই বছর। আম্মু কালকে ঘর মুছতে দিতে চেয়েছিল। আমি দি নাই। এটা পরতে আরাম বেশি। আর ছেঁড়া কাপড় এখন স্টাইল। ব্যাগে সান গ্লাস থাকলে দাও। পরি। এতে লোকে ভাববে বলিউড বাদশাহ এসেছে।’

প্রমি কপাল চাপড়ে বলে, ‘ আয়নায় একবার নিজের চেহারা দেখেছ? ‘

‘ হ্যাঁ দেখেছি এবং জানি আমি দেখতে মাশা আল্লাহ টম ক্রুজের মত।’

‘ ইছ! জেনে শুনে টম ক্রুজকে অপমান করবে না। ‘

‘ মেজাজ খারাপ করবানা। এমনিতে আব্বু আর ভাইয়ার ভয়ে বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। আম্মু ঝাড়ু নিয়ে দৌঁড়েছে। একটু তো রহম করো। নাস্তা করিনি সকালে।’

‘ তোমাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গেলে ওরা ভাববে আমি কোনো এক গাঞ্জুটি নিয়ে যাচ্ছি। ‘

রিদন মন খারাপ করে উঠে দাঁড়াল। প্রমি চলে যাওয়ার জন্য রিকশা ডাকল। এতদিন পরে দেখা করতে এসেছে অথচ সে চোরের বেশে এসেছে। এই সম্পর্কটাকে একদম সিরিয়াসলি নেয় না রিদন। পরিচিত কেউ যদি এই অবস্থায় তাকে দেখে কি হবে?

রিদন পেছন থেকে ডাকতেই প্রমি রাগ উগড়ে বলল,

‘ এ্যই তোমার সমস্যা কি, হ্যাঁ? তোমাকে একটা কথা স্পষ্ট বলি মনে রাখবে। তোমার সাথে আমি আর এই মুহুর্ত থেকে কোনো সম্পর্ক রাখবো না। কেন রাখব না জানো? আসলে তোমার সাথে কোনো মানুষের সম্পর্ক রাখা উচিত না। তুমি আসলে একটা তেলাপোকা বুঝছো। তেলাপোকা যেমন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়, তুমিও আমার জীবনটা এমন বানিয়ে রেখেছো। তেলাপোকা ডানা থাকলেও শুধু হেঁটে হেঁটে ঘুরে সারাঘরে আর উড়লে তিড়িংতিড়িং করে দিকবিদিকশুন্য হয়ে উড়ে। তুমিও তাই, নিজেকে হিরো মনে কর অথচ নিজের কোনো পারফেক্ট ডেস্টিনেশন নাই লাইফ নিয়ে। জিরো তুমি।মোদ্দা কথা, তেলাপোকা যেমন বিরক্তিকর তুমিও তাই। ‘

রিদন প্রমির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,’ আমি যদি তেলাপোকা হই, তুমি টিকটিকি। দেয়ালে যেমন চিপকায় থাকে, তুমিও এমন চিপকায় থাকো তোমার লজিকে। নিজেরে টিকটিকির মতো সর্বজ্ঞানী ভাব। টিকটিকি যেমন সারাক্ষণ ঠিক ঠিক করে সবাইকে বুঝায় আমি জ্ঞানী, তুমিও তাই। আসলে কচু। খালি কলসি বাজে বেশি। প্রবাদ বাক্যটা যদি এভাবে হত, ‘ চিকনা টিকটিকি টিকটিক করে বেশি। তবে বেশি ভাল হত।’

প্রমি রাগ করে রিকশায় উঠে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ তুই একটা গুড ফর নাথিং। আর যদি ফোন দেস তোর কানের ডিগডিগি ফাটায় দিব।’
প্রমির রিকশা চলে যাচ্ছে। রিদন মাথা চুলকে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘ ডিগডিগি কী? কানের ভেতর তো পর্দা থাকে জানতাম। ডিগডিগি থাকে তো জানতাম না। ‘

দুই মিনিটের মাথায় প্রমির রিকশা আবার ঘুরে এলো। রিদনকে রিকশায় উঠিয়ে হাতে নিজের সানগ্লাসটা দিল। এরপর বলল, ‘ এটা পরো। পরলে বলিউড বাদশাহ না লাগলেও আমি সবাইকে বলব প্রমির বাদশাহ লাগছে। ‘

রিদন সব কটা দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল, ‘ দোস্তো আমি তোমাকে এজন্য ভালোবাসি। তুমিই আমাকে একমাত্র বুঝলা। তেলাপোকা আর টিকটিকি দুই বন্ধু মিলে আমাদের বাড়ির সব পোকা মাকড় খেয়ে ফেলব কেমন?’

প্রমি রিদনকে পাত্তা না দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ ভাবী আর ভাইয়ার শাড়ির কালার কি বলো তো? আমি ম্যাচ করতে চাচ্ছি।’

রিদন প্রশ্ন করল, ‘ তোমারে দাওয়াত দিল কে?’

প্রমি ভ্রু কুচকে বলল, ‘ আমাকে আবার কে দাওয়াত দিবে? আমি এমনিই যাব। হবু ভাসুরের বিয়ে বলে কথা। ভবিষ্যতে বাচ্চা কাচ্চা জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব ওদের জেঠুর বিয়ে খেয়েছি।’

রিদন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘ লে, বেগানা সাদি মে আবদুল্লাহ দিবানা।’
__

রিদিদের বাসায় হলুদের ঘরোয়া আয়োজন করা হয়েছে ড্রইং রুমে। মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে, দেয়ালে কিছু আম পাতা, আর কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। রিদি আমিনার শাড়ি পরতে চাওয়াতে আমিনা তার গায়ে হলুদের শাড়িটা মেয়েকে দিলেন। পাত্রপক্ষের পাঠানো শাড়ি রিদি পরতে চায় নি। মায়ের শাড়ির সাথে স্মৃতি জড়িয়ে গায়ে হলুদ সম্পন্ন করতে চাইল।

দাদী আর ফুফু মিলে রিদিকে এক প্যাচের শাড়ি পরিয়ে দিল। রাহা সাজিয়ে দিল। দাদীর হাতের বালা জোড়া নাতনীকে পরিয়ে দিয়ে কপালে চুমু দিলেন। আমিনা ভীষন অবাক হলেন শাশুড়ীর এই রূপ দেখে। রিদির ফুফুও কম চমকায় নি। তিনি তো প্রশ্নই করে বসলেন, ‘ আম্মা বালা কি আজ পরতে দিলেন নাকি একেবারে…?’

আম্বিয়া বেগম মেয়েকে থামিয়ে বললেন, ‘ বয়স হইছে আমার। নাতী নাতকুর গো কিছুই দিবার পারিনাই। কিন্তু রিদি আমার কইলজা। ওরে কোনো দিন কইতে পারি নাই। থাউক ওর কাছে আমার বালা জোড়া। তোরা সবে তো সম্পদ নিবি। এই বালা জোড়ার দাবী ছাইড়া দে।’

একথা বলেই তিনি আঁচলে চোখ মুছলেন। রিদির চাচী বললেন, ‘ আম্মা এতে তো আপনার বাকি নাতনীরা রাগ করবে।’

আম্বিয়া বেগম দু হাত নেড়ে নাক টেনে বললেন, ‘ হে গো বাপেরে মায়েরে কম দি নাই। বরং বড় বউ এর গহনা সব বেইচ্চা হেগো রে বিদেশ পাডাইছি। দাদীর দোয়াও নেয়া জানতে অয় নাতী গো। কাইল আমারে নয়া নাত জামাই সালাম দিয়া সবার আগে জিগাইছে, দাদী আপনের শরীর কেমন আছে? পায়ের ব্যাথা কি এহনো আছে? এলার্জি গেছে?’ এসব কতা কি তোমাগো ঝি জামাই রা জিগাইছে?’

আমিনার আজ খুব কান্না পেল। কেন পেল সে জানে না। এই শাশুড়ী কত রূঢ় আচরণ করেছে তার সাথে অথচ আজ নাতনীর বেলায় এমন নমনীয় আচরণ আমিনার অন্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

খুব সাধারণ ভাবে রিদির হলুদ সম্পন্ন হয়েছে। তখন ঘড়িতে রাত বারোটা। আচমকা কলিংবেলের আওয়াজ হল। সীমা দরজা খুলে দেখে দ্বীপ। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। সীমাকে সালাম দিতেই সীমা লজ্জা পেয়ে রাহাকে ডাকল, দ্বীপকে দরজায় দাঁড় করিয়ে। ড্রইং রুমে বিছানা করে সবাই শুয়ে পড়েছে। মা চাচীরা রান্না ঘরে ব্যস্ত নিজেদের কাজে। রায়হান দ্বীপকে ড্রইং রুমে ঢুকাল। রিদি দু হাত ভর্তি মেহেদী নিয়েই সোফার উপর ঘুমাচ্ছে। পরনে শাড়ি নেই তার। স্কার্ট আর ফতুয়া। মুখের উপর চুল গুলো উড়ছে। গায়ে ওড়না জড়ানো। রায়হান দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ কিছু করার নেই, আমাদের রিদি একটু ঘুম কাতুরে। কলিংবেলের আওয়াজেও তার ঘুম ভাঙে না। ‘

দ্বীপ চমকে উঠল। রিদি ঘুম কাতুরে! এই মেয়ে ফযরের সময় পর্যন্ত ফোনে কথা বলত। ঘুম কাতুরে হলো কখন? দ্বীপ এসেছে শুনে মা চাচীরা সবাই খাবারের ব্যবস্থা করতে চাইল। দ্বীপ খেয়ে এসেছে বললেও শুনে নি। রিদিকে রাহা উঠিয়ে দিলো ঘুম থেকে। রিদি ঘুম ঘুম চোখে দ্বীপকে দেখে ঘুমন্ত গলায় বলল,
‘ কি ভাই কেনো এসেছেন এত রাতে? এসেছেন যখন থেকে যান। কাল আমার বিয়ে, দাওয়াত খেয়ে যাবেন। একটু ঘুমাতে দেন। বিরক্ত করবেন না। ‘

কাজিনরা সব মুখে হাত দিল। শেষমেশ জামাইকে ভাই বলে ডাকছে এই মেয়ে?

দ্বীপ লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ একটু কথা ছিল। ‘

রিদি পুনরায় ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতে বলল, ‘ আচ্ছা, গুড নাইট। আগামীকাল দেখা হবে। আমি ফুটবল খেলব আমার বরের সাথে, এরপর বিয়ে খেতে যাব।’

উপস্থিত সবাই মুখ চেপে হাসছে রিদির আবোল তাবোল বকা দেখে। দ্বীপ লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়াল। আমিনা বকতে বকতে রিদিকে উঠিয়ে দিয়ে বলল, ‘ এ্যই রিদি উঠো ,জামাই আসছে। কথা বলো যাও।’

রিদি বলল, ‘ কার জামাই? এই যে গোলটা মিস হয়ে গেল আম্মু।’

রাহাকে ইশারা দিতেই পানির জগ নিয়ে এলো। আমিনা রিদিকে পানি মারার আগেই দ্বীপ বাধা দিয়ে বলল, ‘ আন্টি থাক, ঘুমাক। এত ইম্পর্ট্যান্ট কিছু না। কাল বলব।’

আমিনা দ্বীপের কথা না শুনেই রিদির চোখে মুখে পানি মারল। রিদি হকচকিয়ে সেন্সে এসে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ চোর চোর, এই কে কোথায় আছিস ধর। আমার ফুটবল নিয়ে গেল।’

রায়হান হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে গিয়েছে। পুরো রুম জুড়ে অট্টহাসি । রায়হান বলল,’ হ্যাঁ চোরই তো, তোর মন চুরি করতে মস্ত বড় এক চোর এসেছে। ইশ রে ফুটবল ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না মেয়েটা। জিহান ফুটবল আছে তো বাসায়, নাকি কাল কিনে দিতে হবে একটা?’

রিদি সামনে তাকিয়ে দ্বীপকে দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল। লজ্জা পেয়ে ওড়নায় মুখ ডাকল। দ্বীপ নিজেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে নিজেকে বকতে লাগল। সারপ্রাইজ দিতে এসেছিল রিদিকে। অথচ কি থেকে কি হয়ে গেল?

রিদি ধীরে ধীরে ওড়নার আড়াল থেকে মুখ বের করল। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে গেছে। চোখ তুলতে পারছে না ঠিকমতো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ছোট করে বলল, ‘আপনি… কবে এসেছেন?’

বাহ! এত সম্মান। তুমি থেকে একেবারে আপনি! দ্বীপ মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘অনেকক্ষণ হলো। তবে তোমার ফুটবল ম্যাচটা দেখে মনে হচ্ছে আমি ভুল সময়েই এসেছি।’
আবারও সবাই হেসে উঠল। রিদি এবার আরও লজ্জা পেয়ে আমিনার পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ লুকাল। আমিনা মেয়ের মাথায় আলতো চাপড় দিয়ে বললেন, ‘এই মেয়েরে নিয়ে আমি আর পারি না।’

সবাই ভেতরের কামরায় চলে গেল ওদের কথা বলতে দিয়ে৷ রিদি আর দ্বীপ একা ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে। রিদির হাতের মেহেদীর সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। সে এখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটছে, যেন মাটির নিচে কোনো গুপ্তধন লুকানো আছে।

​দ্বীপ এক পা এগিয়ে রিদির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা ছোট্ট, মখমলের লাল বাক্স বের করল। তবে সেটা কোনো আংটি বা গহনার বাক্স নয়, আকৃতিটা একটু লম্বাটে।

​রিদি কৌতুহল সামলাতে না পেরে আড়চোখে তাকাল। দ্বীপ বাক্সটা খুলে রিদির সামনে ধরল। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে রুপালি রঙের একটা চাবির রিং, আর তার সাথে ঝুলছে ছোট্ট,একটা রুপার ফুটবল। ফুটবলটার গায়ে খুব সুক্ষ্মভাবে খোদাই করে লেখা ‘মাই পার্মানেন্ট স্ট্রাইকার’।

​রিদি হাঁ করে তাকিয়ে রইল। দ্বীপ মৃদু হেসে বলল, ‘ বিয়েতে সবাই তো গহনাগাটি দেয়। আমি ভাবলাম, ভিন্ন কিছু দিই। কিন্তু মাথায় এলো যেহেতু কোমড় ভেঙ্গেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। তাই পরিণয়েও না হয় ফুটবল থাকুক। এখন তো এসে দেখি ম্যাডাম ঘুমের ঘোরে আমাকে ছাড়া ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত। ম্যাচের প্রথমার্ধ তো একাই খেললেন , আগামীকাল থেকে দ্বিতীয়ার্ধটা নাহয় একসাথেই শুরু করা যাবে, কি বলেন?’

​দ্বীপের এমন কথা, অদ্ভুত সারপ্রাইজ দেখে রিদির লজ্জারা আরও ভিড় করল। দু হাত ভর্তি মেহেদী থাকায় চাবিটা ধরতে পারছিল না, তাই দ্বীপ নিজেই আলতো করে চাবির রিংটা রিদির ফতুয়ার পকেটে গুঁজে দিল।

​রিদি মাথা উঁচু করে দ্বীপের চোখের দিকে তাকিয়ে মিনমিনিয়ে বলল, ‘ চোর তো তাহলে সত্যিই এসেছে। কালকের ম্যাচের ট্রফিটা নিতে ।’

দ্বীপ ঠোঁট চেপে হাসল। সামান্য এগিয়ে রিদির কানে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ ইয়েস, আর ট্রফির নাম রিধিমা জাবেদ। ‘

​চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৪

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#সারপ্রাইজ_পর্ব
১৪.
(কপি করা নিষেধ)

৫ই আগস্ট, ২০১৯

ইদুল আযহার ছুটিতে রিদি বাড়িতে এসেছে। রাহা এবার বাবার বাড়িতে ঈদ করবে৷ রিদিদের একটা লাল গরু কিনেছে। গরু কেনার আগে জাবেদ সাহেব মেয়েদের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কোন গরুটা ভাল লেগেছে? দুই মেয়ে সম্মতি দিল লাল গরুটার জন্য । তিনি বড় লাল গরুটাই কিনলেন। আজ জাবেদ সাহেবের মনে খুশি জোয়ার আটকানোর সাধ্য কার? বহু বছর পর দুই মেয়ে, নাতী নাতনিকে নিয়ে একসাথে ঈদ করবেন। গরু নিয়ে বাসায় আসার পর সবাইকে হাটের গল্প শোনাচ্ছিলেন। রায়হান গরুর লাথি খেয়ে গোবরে মাখামাখি করে এসেছে।

রায়হান এবং জাবেদ সাহেব হাত মুখ ধুয়ে গোসল সেরে আসলে সবাই মিলে গ্যারেজে গরু দেখতে গেল। নুহাশ গরুর পিঠে চড়ে বসল। এই গরুটা ভীষণ শান্ত। শিং ও তেমন নেই। রিদির গরুর জন্য মায়া হল।

রাতে বাসায় আসার পর রায়হান এবং জাবেদ সাহেব দুজনই আলোচনায় বসেছে। আগামীকাল রিদিকে দেখতে আসবে। রায়হানের মন মত একজন পাত্র আছে তা শ্বশুরকে জানাচ্ছে। জাবেদ সাহেব শুধু মাথা নাড়লেন।

রিদি দূর থেকে দেখতে পেল বাবার সম্মতি। আর বিয়েটা আটকানো যাবে না মনে হয়। পাত্রের বাবার সাথে নাকি জাবেদ সাহেবের দেখা হয়েছে আজ হাটে যাবার আগে। জাবেদ সাহেব এর বেশ পরিচিত এবং বন্ধুসম মানুষ। আমিনাকে ডেকে বললেন আগামী কালকের জন্য তৈরি থাকতে।

রিদির মনে হলো সব চাপা কান্না উগড়ে বের হয়ে আসছে। আটকাতে না পেরে নিশব্দে কেঁদে দিল। কাঁদতে কাঁদতে দ্বীপকে ফোন দিল। শেষ কথা হয়েছিল রোজার ঈদে। দ্বীপ নিজ থেকে ফোন দিয়েছিল। এরপর গত দুই মাস আর কথা হয় নি। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরও রিসিভ হলো না। কিছুক্ষণ পর দ্বীপ কল করতেই রিদি সালাম- দোয়া না দিয়েই বলে উঠল , ‘ কাল পাত্র পক্ষ আসবে আমাকে দেখতে। ‘

দ্বীপ রিদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। অভিনন্দন। ‘

রিদি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ তুমি কখন আসবে?’

দ্বীপের গলায় বিদ্রুপের সুর,’ আমি আসব কথা ছিল কি? যদি আসি কী হিসেবে পরিচিত করাবে?’

‘ তোমার বাসা থেকে প্রস্তাব পাঠাও। এখন তো তুমি স্যাটেল। ‘

‘ আমি সরকারি চাকরিজীবী নই। ফুটবলার। তোমার বাসার লোক মেনে নেবে না। আমার মনে হয় কি রিদি এসব বাদ দাও। আগামীকাল পাত্র পক্ষ আসবে, মন ভালো করে একটা ঘুম দাও। সকালে দেখতে ফ্রেশ লাগবে। ‘

রিদির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে। দ্বীপ এসব কি বলে? এতদিন তার মনে এই ছিল ? ভেতরটা হু হু করে উঠল। হয়ত রিদি থেকে বেটার অপশন আছে দ্বীপের কাছে। ওড়নায় চোখের পানি মুছে দ্বীপকে শক্ত স্বরে বলল, ‘ আমার জন্য দোয়া করবে যেন স্বামীর ঘরে সুখের কমতি না হয়। তুমিও ভাল থেকো। তোমাকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হয়। রাখি। ‘

___

রিদিদের বাড়ি ভর্তি অতিথি। অতিথিদের ভিড় দেখে মনে হচ্ছে আজই রিদির বিয়ে। রিদিকে রাহা এবং সীমা মিলে সাজিয়ে দিল । ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা হাসির আওয়াজ আর চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ রিদির কানে বিষের মতো বাজছিল। কাঁচের আয়নায় তাকিয়ে নিজের অপছন্দের সাজ দেখল আজ । এই রিদি বড্ড অচেনা। তাকে বেশ অপূর্ব দেখাচ্ছে এই কথা যেমন সত্যি আবার সেই রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জ্যান্ত লাশটাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। চোখ দুটো যাতে ফোলা না দেখায়, সেজন্য রাহা অনেকক্ষণ বরফ ঘষে দিয়েছে। কাঁদার জন্য বার বার বারণ করছে। আয়নায় ভেসে উঠেছে রিদির ভালবাসা এবং ইচ্ছের মরণ, কত সুন্দর সাজগোছ অপরিচিত কারো অপেক্ষায়। ভেতরের কান্নাটা জমে এখন পাথর হয়ে গেছে।

জাবেদ সাহেবের নির্দেশ দিলেন রিদিকে ড্রইং রুমে নিয়ে আসতে । ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াতেই রিদির মনে হলো, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে এক অনন্ত অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপের শেষ কথাগুলো তিরের মতো বুকে বিঁধছে। যে মানুষটার জন্য এত এত অপেক্ষা , সে এত সহজে তাকে পর করে দিল? জাবেদ সাহেব নিজের পাশে বসালেন মেয়েকে। তিনি লক্ষ্য করলেন মেয়ের হাত দুটো কাঁপছে। মেয়েকে আগলে নিলেন।

​সবার চোখ গিয়ে পড়ল রিদির ওপর। পাত্রের মা অত্যন্ত স্নেহমাখা চোখে রিদির দিকে চাইলেন। রিদিকে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে থুতনী তুলে বললেন, ​’ মা শা আল্লাহ! ভাই সাহেব মেয়ে তো মাটির পুতুল।’

জাবেদ সাহেব গর্বিত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। রায়হানকে বললেন, ‘ রায়হান, পাত্র কোথায়? ওকে ভেতরে আসতে বলো।’

​রায়হান মুচকি হেসে বলল, ‘জি আব্বু, ওর গাড়িতে একটু সমস্যা হয়েছিল। … এই তো এসে গেছে।’

​ঠিক তখনই দরজার পর্দা ঠেলে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল একজন সুঠামদেহী তরুণ। পরনে সাদা রঙের একটা চমৎকার পাঞ্জাবি, চুলগুলো চেনা কায়দায় আঁচড়ানো।

​তার পায়ের আওয়াজে রিদি এক পলকের জন্য মাথা তুলে তাকাল, আর পরক্ষণেই তার পুরো পৃথিবী থমকে গেল। রিদির বুকের ভেতরটা এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল চেনা অবয়ব দেখে । সালাম দিয়ে পাত্র এগিয়ে যেতেই জাবেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। কোলাকুলি করলেন। রিদি মাথা নামিয়ে ফেলল। এখন কি তার অভিমান করা অনুচিত হবে?

বসার ঘরে একটা মৃদু চমক ঘটে গেল পাত্র আসার পর পর। সবার মাঝেই উৎকন্ঠা। এখানে রিদির মামা, চাচা, খালুরা উপস্থিত আছেন। তারা কেউই পাত্র হিসেবে জিহানকে আশা করেনি। রিদির চাচা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। পাত্রের কপালে আঘাত দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘ আপনার কপাল কাটল কীভাবে?’

দ্বীপ মুচকি হেসে বলল, ‘ রাস্তায় আসার সময় সামান্য একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে।’

সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলেন। রায়হান এবং জাবেদ সাহেব প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স এনে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল। দ্বীপ জাবেদ সাহেবের যত্ন দেখে বিস্মিত। মানুষটাকে বেশ রূঢ় ভাবত অথচ উনি খুবই অমায়িক। মিজান সাহেব ছেলের পাশে বসে এটা সেটা প্রশ্ন করছেন।

সকলের উদ্বিগ্নতা দেখে দ্বীপ বলল, ‘ দুশ্চিন্তা করবেন না কেউ, আমি এখন ঠিক আছি।’

দ্বীপের দিকে রায়হান শরবত এগিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে ধীর আওয়াজে বলল, ‘ শুভকাজে পা দেয়ার আগেই মারামারি করে এলে?’

দ্বীপ ফিসফিস করে বলল, ‘ না করে উপায় কি? কাজটা আপনার চাচা শ্বশুরের। রানা অবধি খবর গেলো কী করে আমি আজ এই বাসায় পাত্রী দেখতে আসছি? ‘

‘ উনি তো তোমাকে দেখে এমন অবাক হওয়ার ভান করল যেন কিছুই জানেনা।’

‘ বেঁচে ফিরলাম কিভাবে তাই ভাবছে। ‘

‘ আসলে ফিরলে কী করে?’

রায়হান সব প্রশ্ন এখনই করে ফেলছে। মনে হয় জীবনে আর সুযোগ পাবে না। দু চোখের পলক ঝাপটে দ্বীপ ইশারা দিল পরে সব জানাবে৷ দ্বীপ শান্ত হয়ে বসে আছে। টুকটাক এটা সেটার উত্তর দিচ্ছে সবার। সেই মুহুর্তে দ্বীপের ফোনে কল এলো। দ্বীপ বারান্দা থেকে কথা বলে সোফায় বসতেই মিজান সাহেব প্রশ্ন করলেন কার সাথে এত সিরিয়াস হয়ে কথা বলছিল? দ্বীপ উত্তরে শুধু জানাল, ‘ আব্বু এমপি সাহেব ফোন দিয়েছেন। শহরে এসেছি জানতে পেরে দেখা করতে বললেন।’

জাবেদ সাহেব প্রশ্ন করে বসলেন, ‘ রাজনীতিতে নাম লেখালে নাকি?’

দ্বীপ হেসে রিদির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,’ না আংকেল, আব্বু চায় না আমি রাজনীতি করি।এছাড়া একজনকে কথা দিয়েছি দূরে থাকব রাজনীতি থেকে।’

রিদি এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। জাবেদ সাহেবের ঠোঁটের হাসিই বলে দিচ্ছে দ্বীপের উত্তরে তার মন প্রসন্ন হলো। এখনো বোবা হয়ে বসে আছে রিদি। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে শুধু মাথা কাত করে ধীর আওয়াজে উত্তর দিচ্ছে। মনে হলো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে।

গত রাতে দ্বীপের বিদ্রুপ ভরা কণ্ঠ, ‘ কী হিসেবে পরিচয় করাবে?’ রিদির মনে তীব্র অভিমান এর জন্ম দিয়েছে। সব যে একটা নিখুঁত অভিনয় ছিল, তা এখন পরিষ্কার। রায়হান, রাহা ঠিক আছে কিন্তু বাবাও এই সারপ্রাইজের অংশীদার! সবার মুখের চওড়া হাসিই বলে দিচ্ছে, দ্বীপ রিদির হাত চাওয়ার জন্য কত বড় আয়োজন করে তারপর এসেছে। তবে কী এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলল!

​দ্বীপ জাবেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনীত স্বরে বলল, ‘ আঙ্কেল, আমি কি রিদির সাথে আলাদা করে দুটো কথা বলতে পারি? আপনি যদি অনুমতি দেন।’

​জাবেদ সাহেব সানন্দে মাথা নাড়লেন, ‘ হ্যাঁ অবশ্যই যাও । ‘

​রিদির বারান্দায় ওদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিদি নিজের আবেগ ধরে রেখেছে। দ্বীপের দিকে না তাকিয়ে গ্রিলের বাইরে তাকিয়ে আছে। হয়ত ভেতরে ভেতরে তীব্র অভিমানে গুমড়ে যাচ্ছে। দ্বীপ দুবার ডাকল, ‘ রিদি।’

তাকালো না রিদি। পুনরায় ডাকল, ‘ এ্যই রিধিমা।’

আটকে রাখা চোখের জল এক ফোঁটা, দু ফোঁটা করে বেরিয়ে আসছে। ​দ্বীপ দুপা এগিয়ে এসে পকেট থেকে টিস্যু বের করে রিদির চোখের জল মুছে দিতে চাইলে রিদি ঝামটা মেরে সরিয়ে দিল। দ্বীপ আহত গলায় বলল, ‘ কাল রাতে কে যেন খুব বড় বড় কথা বলছিল, স্বামীর ঘরে যেন সুখের কমতি না হয় তাই তার জন্য দোয়া করতে । এখন স্বামীর ঘরের সুখ দিতে তো নিজেই চলে এলাম, তবুও চোখে পানি কেন?’

রিদি কথা বলছে না। মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। ​দ্বীপ বলেই যাচ্ছে , ‘ তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম রিদি। তোমার বাবার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন না করে আসতে চাইনি। আমি সম্পর্কে দূরত্ব এনেছি শুধু এই একটা কারণে। খেলায় ফোকাস করতে পারছিলাম না তোমার চিন্তায় । মেডিকেল, ইউনিভার্সিটি কোথাও যখন তোমার হলো না আমি নিজেই মানসিক ভাবে দূর্বল হতে শুরু করলাম। ওই সময়টাতে দুজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দিয়েছে। আম্মু আর রায়হান ভাই। তোমার উপর আসা ঝড় রায়হান ভাই সামলে নেবেন কথা দিয়েছিলেন। আমি জানিনা আল্লাহর কী রহমত, তুমি কোনো পাগলামি করো নি। অন্য কোনো মেয়ে হলে সম্পর্কের এই দূরত্বে হয়ত সুইসাইড বা কান্নাকাটির মত পাগলামি করত। আমি তোমাকে নতুন ভাবে চিনলাম। আমার সেই ছোট্ট রিদি কিভাবে নিজের আবেগ সামলে নেয় তা দেখলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যেভাবেই হোক আমাকে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হবে। হয়ত সরকারি চাকরি হবে না কিন্তু যা পারি তাও তো একেবারে ফেলনা নয় তাই না? চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু পেরেছি।’

দ্বীপ থেমে গেল। নিজের ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করছে। আজকের দিনটায় পৌঁছাতে গত পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। ​ইমোশনটুকু গিলে নিয়ে দ্বীপ বলল,

‘ রাগ ধরে রেখো না, আমি নিতে পারি না। আপনজনের অভিমান, শত্রুর দেয়া জখমের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ।’

রিদির অভিমান পাহাড়সম। দ্বীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,’ আচ্ছা জোর করব না, তবে একটা কথা না বলে থাকতে পারছিনা।’

রিদি তাকাল। দ্বীপ প্রত্যুত্তরে বলল, ‘ মারামারি করে আজ জীবনের সেরা ম্যাচ খেলে এসেছি রানার সাথে ।’

রিদি ক্রোধান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে। দ্বীপ নিজ থেকেই মারামারির কথা টা স্বীকার করেছে, নতুবা পরে শুনলে দ্বীপের উপর চড়াও হবে।

দ্বীপ অধৈর্য্য হয়ে বলল, ‘ মিস রিধিমা ক্ষমা মহৎ গুণ।এভাবে তাকাবেন না ভয় লাগে। মানুষকে ক্ষমা করতে শিখুন। দেখছেন না ক্ষমার অভাবে একজন ফুটবল প্লেয়ার মুখ গোমড়া করে অসহায়ের মতো আপনার দরবারে হাত পেতেছে। আরও কিছুক্ষণ সময় এভাবে কাটালে সে হাত পা ছড়িয়ে নিচে কাঁদতে বসে যাবে। ‘

রিদি দাঁত খিঁচে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দ্বীপ নিজের দু কান ধরে বোকার মত হেসে বলল, ‘ আর এমন করব না। দুঃখিত।’

রিদি হেসে ঠোঁট চেপে হেসে বারান্দা থেকে শোবার ঘরে চলে এলো। দ্বীপ পিছু নিতে নিতে বলল, ‘ কী হলো কথা বলা শেষ হয় নি তো। আরেকটু থাকি…।

রিদি শোবার ঘর থেকে ডাইনিং এর উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে । আর দ্বীপ পেছনে আসতে আসতে রিদিকে বলছে,

‘ মানুষ নাকি প্রেমিকাকে সারপ্রাইজ দেয়। সেই সারপ্রাইজ পেয়ে প্রেমিকা খুশিতে জড়িয়ে ধরে। আর আমার বেলায় ঘেটে সব ‘ ঘ’ হয়ে গিয়েছে। সারপ্রাইজ সর্বনাশ হয়েছে। গণ্ডমূর্খ আসলে আমি। আব্বু মাঝে মাঝে অথর্ব এই কারণে বলে। ‘

রিদি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দ্বীপের দিকে তাকাল। দ্বীপ ঠোঁট উলটে মিনতির চোখে তাকাল। রিদি আমলেই নিলো না দ্বীপকে। পরবর্তীতে দ্বীপ নিজেকে সামলে ড্রইং রুমে চলে এলো। যতক্ষন রিদিদের বাসায় ছিল ততক্ষন উঁকি দিয়ে রিদিকে খুঁজেছে দ্বীপের দুচোখ। রিদি ডাইনিং এ কথা বলছিল সবার সাথে দ্বীপ পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখছিল। সীমা রাহাকে প্রশ্ন করল, ‘ আপু এই ফুটবলার দেখি রিদি থেকে চোখই ফেরাচ্ছে না। উঁকি দিয়ে দেখছে। ‘

রাহা হেসে বলল, ‘ বাংলাদেশের মানুষ এই ফুটবলারের ভক্ত আর এই ফুটবলার রিদির অন্ধভক্ত। ‘

সীমা পরবর্তী প্রশ্ন করার আগেই রাহা হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে শব্দহীন ঠোঁট আওড়াল যাতে কেউ না শুনে , ‘ পাঁচ বছর ধরে। ‘

সীমার গালে হাত। পাঁচ বছর আগে রিদির বয়সই বা কত ছিল!

রাহেলা রিদিকে চেইন পরিয়ে দিল। দ্বীপ হিরার আংটি পরিয়ে দিল। জাবেদ সাহেব হবু মেয়ের জামাইকে ঘড়ি উপহার দিলেন। বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য করা হলো আগামী পরশুদিন। কারণ এরপর দিন ঈদ। জাবেদ সাহেবের ইচ্ছে এবারের ঈদ টা মেয়ের জামাইদের সাথে করবেন। মিজান সাহেব আর নিষেধ করতে পারলেন না। কারণ এই সময়টাতে আত্মীয় স্বজনরা গ্রামেত বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে বেড়াতে আসবেন। সোনায় সোহাগা। একটা সুন্দর গেট টুগেদারও হয়ে যাবে। ঈদের পর দ্বীপের ম্যাচ আছে সে ব্যস্ত হয়ে যাবে।

__

জাবেদ সাহেব রাতে খাবারের টেবিলে বললেন, ‘ আমি আজ দ্বীপের ব্যবহারে সন্তুষ্ট। ‘ দ্বীপ আজ অবলীলায় একটি স্বীকারোক্তি দিল যা জাবেদ সাহেবকে মুগ্ধ করেছে। তিনি সবাইকে খুলে বললেন ঘটনা,

দ্বীপ যখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাসায় চলে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে পিছিয়ে এসে বলল, ‘ আংকেল একটা স্বীকারোক্তি ছিল। আপনি অভয় দিলে বলতে পারি।’

জাবেদ সাহেব সম্মতি দিতেই বলল, ‘ পাঁচ বছর আগে একবার আপনার সাথে বেয়াদবি করে ছিলাম। ‘

জাবেদ সাহেব হেসে ফেললেন। তিনি জানেন দ্বীপ কি বলবে তাই নিজ থেকেই বললেন, ‘সেদিন রাস্তায় বাইক থেকে নেমে তর্ক করা ছেলেটা তুমি, তাই তো? ‘

দ্বীপ মাথা নাড়ল। জাবেদ সাহেব দ্বীপের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ তুমি তোমার জায়গায় একদম ঠিক ছিলে। আমি ভুল ছিলাম।’

রিদি বাবার মুখে দ্বীপের প্রশংসা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসিটা চওড়া করল।

জাবেদ সাহেব খেতে খেতে ছোট ভাইকে বললেন, ‘ শোন টুটুল, রানার সাথে মেলামেশা কম করিস। নতুন জামাই সুবিধার না যতদূর জানি। কিছুক্ষন আগে এমপি সাহেব আমাকে ফোন দিয়েছিলেন ব্যবসার ব্যাপারে কথা বলতে। আমাদের নতুন শো রুম ওপেনিং এ দাওয়াত দিয়েছিলাম। তখন উনিই জামাইয়ের ব্যাপারে যা বলার বলল। উনি শুনেছেন আমার মেয়ের সাথে বিয়ে। অভিনন্দন জানিয়েছেন। আরও কিছু খবর কানে এসেছে রানাকে নাকি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাবধানে থাকিস। ‘

টুটুল চুপ করে আছে। রানার উপর রাগ হচ্ছে। শুধু মুখে বড় বড় কথা কাজের বেলায় জিরো। ভাইয়ের কথায় শুধু মাথা নাড়ল।

__

সখিনা বানুকে মেয়েদের বাড়িতে নেয়া হয় নি এই নিয়ে তিনি ভীষণ অভিমান করেছেন।। নেয়া হয় নি বললে ভুল হবে নিতে চেয়েছিলেন রাহেলা, মিজান সাহেব রাজি হন নি। একে তো বয়স হয়েছে, তার উপর যেসব উল্টাপাল্টা কথা বলে কোন সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয় বলা যায় না। এই যেমন এখন রিদনের পেছনে লেগেছে। রিদন ফোনে কথা বলছিল প্রমির সাথে। ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে বাসার সবাই জানে। দ্বীপের বিয়ের পরই রিদনের বিয়েটা সেরে ফেলবেন মিজান সাহেব। এরপর তার ইচ্ছে মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে আল্লাহর ঘর দেখে আসবেন।

সাজিনা দাদীকে সামলাতে পারছেনা। দ্বীপ বাইরে। এমনি বুড়ি দুই পা আগাতে পারে না লাঠি নিয়ে কিন্তু এখন সে রীতিমতো দৌঁড়াচ্ছে রিদনকে। এর কারণ হল, কিছুক্ষন আগে রিদন এবং প্রমির আলাপচারিতা শুনেছে। রিদন ভেবেছে বুড়ি কানে কম শুনে সব বলা যাবে। সেই হিসেবে প্রমিকে বলেছে, ‘ এই বজ্জাত বুড়িটার জন্য আমাদের বাসায় আমার কোনো রুম নাই। তুমি আসলে একে জল্লাদ তফুরার বাড়ি পাঠিয়ে দিব। সারাদিন আম্মুকে জ্বালায়।’

প্রমি উত্তরে বলল, ‘ তুমি এভাবে দাদীকে বলছ যে, তিনি যদি বুঝতে পারেন তোমার পিঠের ছাল তুলবে।’

রিদন ঠোঁট মোচড় দিয়ে বলল, ‘ ভাগ্যিস আম্মু এরে মাফ করে দিছে। নতুবা ঘুমের মধ্যে এর মোটা চুলের গোছা কেটে দিতাম। জানো আম্মুর চুল গুলো অনেক সুন্দর ছিল। এর জল্লাদ মেয়ে তফুরা ছোট থাকতে আম্মুর চুলে কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে দিয়েছিল। এরপর বাধ্য হয়ে সেই চুল কেটে ফেলতে হয়েছিল। এই বুড়ি তখন মেয়েরে শাসন করে নাই।’

আরো অনেক কথাই প্রমির সাথে হচ্ছিল। কথা শেষে ফোন রাখতেই সখিনা বানু লাঠি দিয়ে দুই বাড়ি দিলেন। রিদন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ বুড়ি জাতে মাতাল তালে ঠিক। খবরদার আমারে মারলে আমি তোমার তোমার চুল কাইট্টা দিমু ঘুমের মধ্যে। ‘

সারাঘরে নাতির পিছে ছুটে ক্লান্ত হয়ে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। তফুরার কথা মনে পড়ে এই কথা বলে কেঁদেই যাচ্ছে । দ্বীপের বিয়ের কথা শুনে তফুরা এমনিতে রেগে ছিল। তবে রাগের বাহানায় আসেনি। মায়ের অবস্থা করুন দেখে মিজান সাহেব ফোন দিতেই তফুরা ছুটে এলো। এই সুযোগ, এই বিয়েতে অশান্তি করার। অঞ্জু এবং তফুরার স্বামী এখন অবধি এই খবর জানে না। জানলে হয়ত এই বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক চুকে যাবে।

তফুরা আসতে আসতে রাত হলো। এসেই মাকে শান্ত করে খাইয়ে দিলো। ভাইয়ের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথা হলো না। শুধু ভাইকে বলল যে, ‘ যেহেতু জিহানের সাথে অঞ্জুর বিয়ে হচ্ছে না আমি চাই জিহানের নামে যে দিঘী আব্বা লিখে দিছে ওখানের কিছু অংশ অঞ্জুর নামে লিখে দিক জিহান ৷ আমি এত বছর সেই আশায় ছিলাম। আব্বা তো আমাকে মারা যাওয়ার সময় কথা দিয়েছিল জিহান আর অঞ্জুর বিয়ে দিবে। এ কথা আম্মাও জানে। আপনি আব্বার সাথে বেঈমানী করছেন বড় ভাইজান। ‘

মিজান সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, ‘ আব্বা এরকম কথা কোনোদিনও বলে নাই। আর আম্মার কি সেন্স আছে যে এখন ওসব কথা মনে রাখবে? আমার ছেলে আমি যেখানে খুশি বিয়ে করাব। এছাড়া আমিও এমন কথা আব্বাকে দিই নাই। ভুল কথা বলে এখন বিপদে ফেলতে চাচ্ছিস কেন?’

‘ আপনি আমাকে ঠকাইছেন । আমি মাফ করমু না আপনারে।’

মিজান সাহেবের রাগ উঠে যাওয়ার উপক্রম। ঠিক তখনই দ্বীপ বাসায় ঢুকল। ফুফুকে দেখে সালাম দিল। দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে গুনগুনিয়ে নাটুকে কান্না শুরু করল তফুরা। সাজিনা এবং রিদনের দিকে তাকাতেই ওরা বুঝাল পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। ফুফুকে এটা সেটা বুঝ দিয়ে শান্ত করল দ্বীপ। এগুলো নিয়ে আগামীকাল কথা বলবে জানাল।

ফ্রেশ হয়ে নিজের কামরায় এসে ফোন দিল অন্তরতমাকে। ফোন রিসিভ হলো ঠিকই ওপাশ থেকে কথা আসছে না। তালতলা রোডের বাড়িটা অনেক আগেই মিজান সাহেব ছেড়ে দিয়েছেন। এখন যে ফ্ল্যাট টাতে থাকে ওটা সাহাবুদ্দিন রোডে। দ্বীপের টাকায় কেনা। গাড়ি কিনেছে গতমাসে। শোরুম থেকে গতকাল রাতে আনা হয়েছে । নিজেও চড়ে নি এখন পর্যন্ত। একটা গোপন ইচ্ছে আছে। ওটা পূর্ণ করতে চায়। বারান্দায় বিন ব্যাগটাতে বসে বিল্ডিংয়ের পাশে অবস্থিত পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকের আলোর ছটা পুকুরে পড়েছে। ফোনের অপর পাশে থাকা রমনীকে প্রশ্ন করল, ‘ এখনও অভিমান পুষে রাখবে? আমি তো নিজের অপারগতা স্বীকার করলাম। ‘

রিদি ও পাশ থেকে উত্তরে বলল, ‘ আমি হারিয়ে গেলেই কেউ আমার মর্ম বুঝতে পারত। এতগুলো দিন আমার মনের মাঝে কী চলেছে সেটা সে জানতেও চাইল না। এখন এসে সরি বলে আমার কষ্ট গুলোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। সরি বললেই কি সব অপরাধ শেষ? ‘
‘ সরি বলা ছাড়া আর কি কিছু বলা যায়?’
‘ আমার কিছুই লাগবে না। না সরি লাগবে আর না কারো সাথে যোগাযোগ। আমি কাউকে বেঁধেও রাখিনি। চলে যাক সে।’

সচরাচর অভিমান করে না এই মেয়ে। এতগুলো মাসের জমে থাকা অভিমানের মেঘ আজ তার শব্দে উপছে পড়ছে। রিদির মৌনতা ভাঙতে না পেরে দ্বীপের মনের সবটুকু আলো এক নিমিষেই নিভে গেল। এক বুক হাহাকার চেপে করুণ স্বরে বলে উঠল,

‘ রিদি… আমার তুমি ছাড়া যাওয়ার জায়গা নেই।’

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১৩

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১৩.
( কপি করা নিষেধ)

বর্তমান প্রেক্ষাপট,

দেশের কোনো এক প্রান্তে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ঢাকার আকাশ মেঘলা। কেমন সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব। ঝড় হবে। বারান্দার কাপড় গুলো দড়ি থেকে টেনে ভেতরে ঢুকাচ্ছে রিদি। ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম টা পরিচিত। রিসিভ করতে ও পাশ থেকে প্রশ্ন করল, ‘ এমন কিছু করো না যার জন্য আল্লাহ নারাজ হবেন। তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দিই নি। ‘

বাকি কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করে নি রিদি। ফোন কেটে দিল। রিদির মনের অবস্থা তো কেউ জানতে চায় নি। সবাই জ্ঞান দিবে। বর্ষাকাল রিদির বেশ অপছন্দ। মানুষ বর্ষায় রোমান্টিক হয়, আর রিদির মনে হয় আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে বিষাদ ঝরে পড়ছে। অথচ একটা সময় এই বর্ষাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু।

এই বর্ষায় ঢাকার অলিগলিতে হাত ধরে হেঁটেছে দুজন। এই বর্ষায় ব্যস্ততম রাস্তায় মুখে মাস্ক পরে বুকের বাম পাশে আগলে রাখত রিদিকে। কিছুদিন আগেই রাহা রিদিকে প্রশ্ন করল, ‘ সম্পর্কে ভাঙতে সময় লাগে না, গড়তে সময় লাগে। ‘

চুয়াল্লিশ তম বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা দিয়ে বাসায় এসে দেখতে পেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু নিয়াজ একটা ছবি পাঠিয়েছে ফোনে । ছবিটা দেখে সন্দেহ হলেও মনকে রিদি বুঝিয়েছে শত বার, সহস্র বার বুঝিয়েছে, ‘ আমি যাকে জানি সে আমার, ওরা যাকে দেখেছে সে অন্য কারো।’

সেদিন ও বৃষ্টি হয়েছিল। রিদির ভাইভার মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় না গিয়ে রেস্টুরেন্টে কেন? দেশে এসেছে এই সংবাদ ও কি রিদির কাছ থেকে গোপন রাখতে হলো। সময় এভাবে ছুটে যায় কি করে?
___

২০ জানুয়ারি, ২০১৭

ঋতু বদলে গেল, এক বর্ষা পেরিয়ে আরেক বর্ষা এলো। রিদি মাকে বলে আজ ছাদে এসেছে ভিজতে৷ আমিনাও বারণ করেনি। বাসায় রিদির ফুফু বেড়াতে এসেছে। সেই ফুফুর একটাই মেয়ে আছে। মেয়েটার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। স্বভাব চরিত্র ভাল কিন্তু বিয়ে টিকল না। বয়সে রিদির বড়। নাম সীমা। দুজন মিলে বৃষ্টিতে ভিজছে। কিছুক্ষন ভিজে দুজন সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসল।

সীমা নিজ থেকেই বলল, ‘ রিদি এখন বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে রাজি হোস না। আমাদের পরিবারে ট্রেডিশন মেয়েদের বিয়ে দেয়া নয়, নিজেদের বংশীয় রীতি বজায় রাখা। এই যে আজ আম্মা আর নানী এসেছে তোদের বাসায়। কারণ কি জানিস? তোর বিয়ের ব্যবস্থা করা। দেখবি রাতের মধ্যে দুটো বায়োডাটা বের করবে। নানীর ইন্ধনে আমার জীবন টা ছারখার হয়ে গেল। তুই একই ভুল করিস না। মেয়েদের নিজের অবস্থান শক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। আমার পড়াশোনা টা ও বন্ধ। এসবের জন্য কে দায়ী বল? আমার কপাল? না আম্মা এসবের দায়ভার নিবে, না নানী। উলটা আমাকে বলে আমার পোড়া কপাল। নিজেদের ভুল চোখে দেখেনা।’

রিদি দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বলল, ‘ লাভ ম্যারেজ করলে ভাল থাকতে সীমাপু।’

সীমা মৃদু হেসে বলল, ‘ পাগলী। রাহা আপু ভাল আছে বলে কি সবাই ভাল থাকবে নাকি? রাহা আপু কেন ভাল আছে জানিস? কারণ আপুর নিজে অবস্থান অনেক শক্ত। চাইলেই একটা চাকরি পাবে, ভাইয়ার উপর নির্ভরশীল না। উনাদের দুজনের নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধা আছে। আমার প্রাক্তনের অনেক টাকা ছিল ঠিকই আমার প্রতি সম্মান ছিল না। তবুও আমি সংসারটা করতে চেয়েছিলাম আম্মু দিল না। কাবিনের টাকা গুলো নিয়ে কী করেছে তাও জানিনা। এখন আর এসবে মাথা ঘামাই নারে। তোর ভাল চাই বলে তোকে সামান্য জ্ঞান দিলাম।’

রিদি বোনকে জড়িয়ে ধরল। সীমা আপু পড়াশোনা কম করলেও তার কথা শুনতে রিদির বেশ লাগে।

রাতে বাসায় রিদির বিয়ের কথা উঠছে। পাত্র দেখা শুরু হয়েছে। রিদির দাদী ও ফুফু বেশ কিছু বায়োডাটা দেখাচ্ছে। জাবেদ সাহেব বললেন নেক্সট টাইম আরেকবার মেডিকেল পরীক্ষা দিতে। এখনই মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছেন না। এতে যে রিদির মন কতটা প্রসন্ন হল তা কেবল রিদিই জানে। কিন্তু পরের বার নাম্বার কাটা যাবে মেডিকেল এক্সামে। এসব জেনেও বিয়ে আটকানোর জন্য রিদি পুনরায় পড়া শুরু করেছে। মাঝে মাঝে ফোন হাতে ফেলে দ্বীপকে মেসেজ দেয়। আমিনা চোখে চোখে রাখেন মেয়েকে। খাওয়া,নামাজ এবং ঘুম এই তিন কাজের জন্য বিরতি পায় রিদি। এছাড়া দিনের বাকি সময়টা পড়ার জন্য ব্যয় করে৷ রিদির ভাবতে অবাক লাগে গত একবছরে সে একবারও দ্বীপের গলা শোনে নি। প্রমা এবং মিরার সাথেও যোগাযোগ নেই। দুজনেরই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। ঢাকাতে থাকে স্বামী সহ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মিরা। প্রমা নোয়াখালীতেই পড়ে। কত পরিবর্তন এলো গত এক বছরে!

__

৬ অক্টোবর, ২০১৭

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও খেলছে দ্বীপ। কখনো খেলা ভালো হচ্ছে তো কখনও খারাপ। মাঝে মাঝে প্র্যাকটিসে গেলে ক্লান্ত লাগে। চোখ বুজলে মনে পড়ে প্রিয় নারীর কান্নাভেজা চোখ। এবার দেশে ফিরে কারোর কথা শুনবে না। বিয়ে না দিলে তুলে নিয়ে আসবে৷ চারদিকে কত কত ফ্যানডম, এরপরও কি রিদির বাবা রাজি হবে না?

স্পেনের আকাশ সুন্দর। এই সুন্দর আকাশ দেখতে রাস্তায় বেরিয়েছে দ্বীপ। মনে হল, তার কি কখনো সাধ্য হবে রিদিকে নিয়ে স্পেনের আকাশ দেখার! বাসায় ফোন দিয়ে সবার সাথে কথা বলেছে। সাজিনার ছেলে হয়েছে। কি মায়া লাগে দেখতে। দ্বীপ এখনও আদর করার সুযোগ পায় নি বাচ্চাটাকে। মিজান সাহেব জানালেন সখিনা বানু ভীষণ অসুস্থ। জিহানের নাম জপ করে সবচেয়ে বেশি। জিহানের বউ দেখতে চান।

রিদি ঢাকা এসেছে দ্বিতীয় বার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিতে। এবারের পরীক্ষা গতবারের তুলনায় ভালো হয়েছে। কিন্তু আশা নেই রিদির। হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছিল গত বছর। রাহার সাথে আজ হোস্টেলে এসেছে আবার। হোস্টেলে এক বান্ধবী থাকে নাম সাবিহা। সাবিহা জাহাঙ্গীরনগর এর শিক্ষার্থী। ওর কাছ থেকে সাজেশন নেয়ার জন্য এসেছে আবার। সাজেশন নিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাহা প্রশ্ন করল, ‘ দ্বীপ ভাইয়ার সাথে কথা হয় তোর?’

রিদি দু পাশে মাথা নাড়ে। রাহা পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘ মেসেজে হয়?’

রিদি ক্ষীণস্বরে বলল, ‘ মাঝে মাঝে দেশে থাকলে।’

রাহা ভ্রু কুচকে ফেলল, ‘ দেশে থাকলে মানে? উনি বিদেশ যায় নাকি?’

রিদি শুকনো ঢোক গিলল। রাহা চেপে ধরল। উপায়ন্তর না দেখে বলেই দিল ফুটবল খেলার কথা। রাহা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ক্যারিয়ার দিয়ে দ্বীপ রিদিকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে? এ তো অবিশ্বাস্য কথাবার্তা! রিদিকে বলল, ‘ আব্বু জীবনেও মানবে না রে রিদি। এসব খেলা কয়দিনের? এটা কোনো প্রফেশন হলো?’

রিদি ইষৎ হেসে বলল, ‘ আপু আব্বু এমনিতেও মানবে না আম্মু বলেছে। কারণ দ্বীপ পড়াশোনায় ভাল না। সরকারি চাকরি সে কোনো দিন ও পেত না। এরচেয়ে উত্তম নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। আমি তার জীবনে না থাকলেও স্বপ্ন থাকবে। ‘

রাহা ছোট্ট বোনটার মাঝে আসা পরিপক্কতা দেখছে। ঢাকা এসে দ্বীপকে মেসেজ দেয়ার সুযোগ পেয়েছে। মেসেজ চালাচালি হয় কিন্তু দুজনের মাঝেই অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সময় মিলে না। দ্বীপ দেশে থাকলে রাহা দুজনের দেখা করিয়ে দিত। সেই সুযোগটাও মিস হয়ে গেল। দুদিন পর রিদি জাহাঙ্গীরনগর এর পরীক্ষাও দিয়েছে। সেকেন্ড টাইমারের কপাল আসলেও খারাপ। এই যে দ্বিতীয় বার ও রিদির মেডিকেলে হলো না।

৮ নভেম্বর, ২০১৭

রিদির জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গিয়েছে। সি ইউনিটে হয়েছে । আমিনা জাহাঙ্গীরনগর ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করেন না। কত মানুষের কাছে কত কথা শুনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে। রায়হান এবং রাহা ভর্তি করিয়ে দিতে চাইলো। জাবেদ সাহেব মেয়েকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াতে চাইলে রিদি নিষেধ করে দেয়। সে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে বাবার এত টাকা নষ্ট করে পড়তে চায় না। সবশেষে জাবেদ সাহেবের অনুমতি পেয়ে ভর্তি হয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবারের লড়াইটা রিদির একার লড়াই৷ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেমন যাচ্ছে রিদির এই প্রশ্ন মনে জাগে না আপনাদের?

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন কিছু বন্ধু হয়েছে। প্রথম বর্ষে যেমন পুরো একটা গরুর পাল একসাথে ঘুরে তেমন। এরপর আস্তে আস্তে কোথায় ছুটে যায় এসব গরু ঘোড়ার পাল। মানুষ নিঃস্ব। বরাবরই একা। একাকিত্বের মাঝে আনন্দ খুঁজে বের করে। দ্বীপের সাথে রিদির যোগাযোগ হয়। আগের মত হয় না। রিদির মনে হয় দ্বীপের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। আসাটাই স্বাভাবিক চারদিকে ফুটবল প্লেয়ার জিহানের নাম ডাক। বাংলাদেশ এক দূর্দান্ত খেলোয়াড় পেয়েছে যার পায়ে জাদু আছে। খেলার মাঠে নামলে বলকে সে বল না ভেবে ডিফেন্ডারের মাথা ভেবে লাথি দেয় সম্ভবত। রিদি দেখে দ্বীপের খেলা, যদিও ফুটবলের আগা মাথা বুঝে না তবুও দেখে। আনন্দ পায়। দ্বীপ দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে খেলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কথা হয় তখন দ্বীপ প্র্যাক্টিসে থাকে নতুবা ক্লাবে অথবা দিন রাতের তফাৎ। রিদি ভীষণ অবাক হয় দ্বীপ দেশে এসেছে এই খবর সে দ্বীপের কাছ থেকে পায় না। ফেসবুক, টিভি চ্যানেল বা বন্ধুদের কাছে পায়। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রায় চার মাস পার হয়েছে দ্বীপ একটি বারও উচ্চারণ করেনি রিদির সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা। গত সপ্তাহে রিদি নিজ থেকে বলেছিল দেখা করবে। দ্বীপ বলেছে তার ইন্টারভিউ আছে। সময় নেই। সেদিন প্রীতিলতা হলের ছাদে বৃষ্টিতে ভিজে কেঁদে কেঁদে বলেছিল আল্লাহকে, ‘ কেন আমার দ্বীপের মাঝে এত পরিবর্তন এলো! আমাকে এভাবে ভুলে না গেলেও তো পারত? আমাদের একটা ছোট্ট ঘর হয়েও কেন হলো না দ্বীপ।’

__

১০ মার্চ, ২০১৮

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছু মাস পর রিদিকে আমিনা নোয়াখালী আসতে বলল। নোয়াখালী পৌঁছেই জানতে পারল পাত্র পক্ষ আসবে কাল তাকে দেখতে। আজ রিদির এই কথা শুনে কোনো কষ্ট হয় নি। হাসি বের হল নিজের অজান্তে। রাত যখন গভীর তখন দ্বীপের নাম্বারটা ডায়াল করল। রিং হল। রিসিভ হতেই ও পাশ থেকে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ বলো , হঠাৎ এত রাতে?’

রিদি হেসে বলল, ‘ এমনি তোমার খোঁজ নিতে ফোন দিলাম।’

‘ ভালো আছি। রিদি মাত্র স্টেডিয়াম থেকে এসেছি একটু ঘুমাই। আগামীকাল কথা বলব।’

‘ আমাকে কাল দেখতে আসবে।’

‘ দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হবে না। আসুক।’

রিদির আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না। ফোন রেখে দিলো। ফোনের ঘড়ি আর ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখল আজ মার্চ এর দশ তারিখ। মনে হল এইতো সেদিন ২০১৮ সাল শুরু হল। আর আজ তিনটি মাস অতিক্রম হলো এই সালের। সম্পর্কের তিনবছর শেষ হয়ে চার বছর চলছে। কত পরিবর্তন দ্বীপের মাঝে!

পরদিন পাত্রপক্ষ আসে নি। পাত্রের পরিবারের কোনো সমস্যা ছিল। অন্যদিন আসতে চাইলে জাবেদ সাহেব বারণ করে দেন। যাদের সময় জ্ঞান নেই তাদের কাছে মেয়ে দিতে রাজি নন তিনি। রিদিও রাহার সাথে ঢাকা ফিরে এসেছে। ক্যাম্পাসে ফিরে রিদি দ্বীপকে পুনরায় কল করল পাত্র পক্ষ না আসার খবর জানাতে। কিন্তু ব্যস্ত পেল। রিদির অধর কোণে নিজের উপর করুণার হাসি ফুটল।

খ্যাত নামা ব্যক্তিত্ব শাহদ্বীপ জিহানের রিদিকে আর মনে ধরে না। রিদিও নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে ফোন দেয় না। কেন দিবে? কার জন্য দিবে? এই মানুষ টা এতটা স্বার্থপর হয়ে গেল কি করে? মানুষ বুঝি এভাবে পালটায়? কই রিদি তো পালটায় নি? সারাজীবন দু চোখে মেডিকেল নিয়ে স্বপ্ন দেখা মেয়ে মেডিকেল এর স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছে। প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হয় নি যদি বাবা দ্বীপের সাথে নিজের ডাক্তার মেয়ের বিয়ে দিতে না চায় এই কারণে। এত সুন্দর যত্নে গড়া ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে কি পেল রিদি? আর কাঁদবে না। আজই শেষ কান্না। জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে ঠকিয়ে দেয়। রিদিকে যেভাবে ঠকালো সেই ভাবে। দ্বীপের উপেক্ষা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে সে আর সম্পর্কে থাকতে চায় না হয়তো।

একের পর এক পাত্র দেখা চলছে। রিদি প্রায় ভাবে দ্বীপ হয়ত হঠাৎ করে এসে চমকে দিবে। হয়ত ফোনে কল দিয়ে আগের মত বলবে, ‘ রিদি আমার তুমি ছাড়া যাওয়ার জায়গা নেই।’

না, এই কথাটা বলার মতো মানুষটার ফোনকল আর সেভাবে আসে না। ফোন করে কিছু স্পেশাল দিনে। দুই ঈদ, জন্মদিন কিংবা ফ্রি থাকলে। রিদিও বিরক্ত করে না। রিদির মাঝে মাঝে মনে হয় দ্বীপ একদিন হঠাৎ ফোন দিয়ে বলবে রিদি আমার পক্ষে এই সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। রিদি মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হয় দ্বীপকে সে কেন এত বিশ্বাস করে? দ্বীপ যখন ফোনে কথা বলে রিদি সব ভুলে যায়। এমন না যে দ্বীপের মাঝে মেয়ে পটানোর মতো দক্ষ জ্ঞান আছে। কিন্তু দ্বীপের সহজ সরল স্বভাবটাই রিদির বিশ্বাস আটকে রাখে। মাস পার হলো রকেটের গতিতে।

মানুষ বলে, ” যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। ” আসলেই খারাপ। কত বান্ধবীর নতুন সম্পর্ক গড়তে দেখে, ব্রেক আপ হতে দেখে। অভিনব কায়দায় প্রপোজ দেখে। মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে কত প্রেমিক জাহাঙ্গীর নগর কে সাক্ষী রেখে ভালবাসাময় জীবনে প্রবেশ করে। আচ্ছা! এদের সম্পর্ক কদিন টিকে? এরা কি নিজেদের জীবনসঙ্গী হতে পারে? পারে বোধ হয়। ওইতো গত মাসে সুরভি আপু আর নাঈম ভাইয়ার বিয়ে হল। কি সুন্দর সম্পর্ক তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে। এখন বিয়ে করেছে। দুজনেরই বিসিএস হয়েছে। দেখতে বেশ ভালো লাগে। সফল জুটি। হয়ত দ্বীপ এবং রিদির সম্পর্ক আগের মত থাকলে তাদের লোকে সফল জুটি বলত। গত ছয় মাস দ্বীপের সাথে যোগাযোগ নেই। দ্বীপ এখন কেমন আছে? ওর কি রিদিকে দেখতে ইচ্ছে হয় না? রিদির কেন ইচ্ছে হয়?
___

২৫ নভেম্বর, ২০১৮

রিদির প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে সব চাচাতো, ফুফাতো ভাই বোনেরা ওদের বাসায় এসেছে। আমিনা ফোন দিয়ে আসতে বলাতে রিদি না করতে পারে নি। একটা সময় মায়ের আঁচল ছেড়ে কোথাও না যাওয়া মেয়েটা এখন ঢাকা থেকে নোয়াখালি একা একা আসা যাওয়া করে। পৃথিবীর সব কিছুই নিজেই নিয়মে চলছে। পরিবর্তন শুধু রিদির জীবনে এসেছে। সীমা আপুর আবার বিয়ে হয়েছে। জাবেদ সাহেব এর এক বন্ধুর ছেলে, ডিভোর্সি তার সাথেই হয়েছে। বর্তমান স্বামী খুব ভাল। আপু এবার আর গতবারের মতো ভুল করেন নি। সংসারের ঝুট-ঝামেলা, সুখ-শান্তিতে মা এবং নানীর স্থান রাখেন নি। নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে। সীমা আপু ও আজ এসেছে। অনেক দিন পর হৈ হুল্লোড় রিদিদের বাসায়। রাহার দুই বাচ্চা ঘুরে ঘুরে মামা খালাদের আগে পিছে ছুটছে। দুপুরে খাওয়ার পর ছেলেরা সব খেলা দেখতে বসেছে। আজ বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার ম্যাচ আছে। টিভির স্ক্রিনে একে একে প্লেয়ারদের দেখাচ্ছে। রিদির চোখ আটকে গেল পরিচিত মানুষ টার উপর। আজ সে খেলা দেখবেই। টিভির স্ক্রিনে রিদি এখন আর তাকায় না । হলে টিভি আছে। অনেকেই দ্বীপের জন্য খেলা দেখে। ন্যাশনাল ক্রাশে পরিণত হয়েছে। অবশ্য এটা নতুন সব খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেই হয়। তখনই মনে পড়ল, কই বাকি রা তো এমন বদলে যায় না। দেশে বিদেশে যেদিকেই তাকানো যায় খেলোয়াড়দের তো বউ প্রতারণা বা ভালোবাসার মানুষকে ঠকানোর গল্প কম। তাহলে রিদির সাথেই কেনো এমনটা হলো!

আজ রিদি নব্বই মিনিটের সম্পূর্ণ খেলা পূর্ণ মনোযোগে দেখেছে। ডিফেন্ডারদের ঠেকিয়ে কিভাবে গোল করতে হয় তা দেখেছে। গো হেরে যাওয়া খেলায় প্রান ফিরিয়ে আনা দেখেছে। সেই সাথে দেখেছে চিরপরিচিত মানুষটাকে। খেলা ড্র হয়েছে। ওই যে টিভি স্ক্রিনে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে। শেষ সময়ে তার গোলেই ড্র হলো। দলের অন্যরা তাকে মাথায় তুলে নিলো। কত আনন্দ তার।

এক সময় এই ছেলেটা প্রাইভেটে, কলেজে, হোস্টেলের সামনে রিদির জন্য দাঁড়িয়ে থাকত। অথচ এখন এই ছেলেটাই রিদিকে ভুলেই গিয়েছে। যেন তার অস্তিত্বই নেই। টিভিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে তাকে দেখা যায়। কিছুক্ষণ আগে রিদির বাবা এবং চাচা উপস্থিত হয়েছে সবার মাঝে। খেলার আপডেট নিচ্ছে বাকিদের থেকে । তখন রিদির কাজিন বলল, ‘ জেঠু গত দুই ম্যাচ ভাল খেলেনি কিন্তু আজকে দূর্দান্ত খেলেছে জিহান। ‘

রিদির বাবা বলল, ‘ এই ছেলেটা দূর্দান্ত খেলে। আমি প্রায় দেখি।’

রিদির চাচা বলল, ‘ এই ছেলেটা রানাদের পার্টি করত। এনামুল করিমের দলের। দেখেন রেফারেন্সে জাতীয় দলে চান্স পাইছে হয়ত। এরম পাইলে রানা আরও ভালো কিছু করত।’

জাবেদ সাহেব ভ্রু কুচকে ফেললেন। স্বাভাবিক স্বরেই বললেন, ‘ তা তো জানি। রেফারেন্স তো থাকবেই । তবে খেলে দারুন। কিন্তু রাজনীতি করে ব্যাপারটাই ভাল লাগে না। আমি বুঝিনা এদের রাজনীতিতে আসার কি প্রয়োজন। খেলোয়াড়দের রাজনীতিতে আসা খুব বাজে একটা ব্যাপার। এরা গাছের ও খাবে, তলার ও কুড়াবে। খেলে এত টাকা ইনকাম করে তবুও রাজনীতি লাগবে। সব জায়গায় দূর্নীতি।’

বাবা চাচার কথা শুনে রিদি নিজের রুমে চলে আসল। একবার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘ আমার দ্বীপ এমন না। ও রাজনীতি করে না। অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। ভদ্র ছেলে।’

পরক্ষনে মনে হলো, ‘ আমি জানি না জিহান কেমন, আমি যাকে চিনতাম সে এমন না। এখন যাকে দেখছি সে আমার না।’

রিদির মনে প্রশ্ন জাগল, দ্বীপ কি রাজনীতিতে ফিরেছে? কিন্তু তাকে যে কথা দিয়েছিল ফিরবেনা।সত্যি মানুষের স্বভাব, চরিত্র এবং আচরণ পরিবর্তনশীল। একসময় দ্বীপই বলত সে কখনও রাজনীতিতে ফিরবে না অথচ সে নাকি রাজনীতিতে ফিরেছে রিদি জানেই না। জিহানের জীবনে রিদির অপছন্দের রাজনীতি আছে ঠিকই কিন্তু রিদি নেই।

___

রায়হানকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। পায়চারি করছে ঘর জুড়ে। রাহা নোয়াখালী গিয়েছে। ঢাকার বাসায় সে একা। বার বার ফোন করেও কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে লাইনে পাচ্ছেনা। রাগ হওয়াও স্বাভাবিক, থাকে দেশের বাইরে। অনেক সময় তাকে পাওয়া যায় না। আজকে যেমন পাওয়া যাচ্ছে না।

শেষমেষ ফোন আছাড় দিবে ঠিক তখনই ফোন আসলো। রায়হান ধমকে বলল, ‘ তোমাকে ফোন দিলে ফোনে পাওয়া যায় না কেন মিয়া? সারাটা দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি আর আটকাতে পারব না। ছোট চাচা বার বার গ্যাঞ্জাম লাগাচ্ছে। সম্ভবত এবার আব্বুকে রাজি করিয়েই ফেলবে। ‘

ও পাশের উত্তর শুনে মন প্রসন্ন হলো রায়হানের। কি ছিল সেই উত্তর! রাহা এবং রিদির ছোট চাচাকে রায়হানের একেবারেই পছন্দ নয়। এই লোক স্বার্থের জন্য সব করতে পারে।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১১+১২

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১১.
( কপি করা নিষেধ)
রিদির পরীক্ষা শেষ হয়েছে গতমাসে। কোচিং এর জন্য ঢাকা এসেছে। একটা লেডিস হোস্টেলে থাকবে। হোস্টেল মনিপুরী পাড়ায়, আর কোচিং ফার্মগেট রেটিনাতে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে রেখে যাওয়ার সময় মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। রাহা এবং রায়হান চাইল নিজেদের বাসায় রাখতে। কিন্তু জাবেদ সাহেব রাজি হলেন না। রায়হানের বাসায় রাহার শাশুড়ি এবং ননদ থাকে। যদি রিদির কোনো কাজে তাদের মনে আঘাত লাগে সেটা তিনি মেনে নিতে পারবেন না। এরচেয়ে হোস্টেল ভাল অপশন। রায়হান দুই তিনদিন পর পর এসে দেখে যাবে রিদিকে । বাবা যাওয়ার সময় রিদি অনেক কাঁদল।

ঢাকা থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হল জাবেদ সাহেবের। ফিরে এসে তিনি ভেঙে পড়লেন। আমিনা ওড়নায় বার বার চোখ মুছছে স্বামীর এমন অবস্থা দেখে । প্রস্তর কঠিন জাবেদ সাহেবও এভাবে শোকে কাতর হবেন কখনও বুঝতে পারেন নি৷ জাবেদ সাহেব বললেন, ‘ আমার মনে হল মেয়েটাকে আমি মাঝ সমুদ্রে একা ছেড়ে দিয়ে এসেছি। আমার ছোট্ট রিদি। আমার হাত ধরে হাঁটা শিখেছে। এখনও রাস্তা পার হতে পারে না। একা একা কিভাবে কোচিং এ যাবে? ওর হোস্টেল থেকে কোচিং পর্যন্ত কোনো রিকশা চলে না। ভি আই পি এরিয়া। বিশ মিনিটের রাস্তা হেঁটে যেতে হবে৷ ‘

এসব ভেবে আজ কেঁদে দিলেন জাবেদ সাহেব। রাহার বিয়ের দিন বিদায়েও এভাবে কাঁদেন নি, আজ রিদিকে হোস্টেলে রেখে এসে যেভাবে কাঁদলেন। অন্যদিকে বাবা যাওয়ার পর থেকে রিদি কেঁদেই যাচ্ছে। ভাগ্যিস মিরা রিদির রুমমেট। প্রমাকে ঢাকা পড়তে দিবে না ওর বাবা মা। নোয়াখালী কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে। মেয়েকে ফোনে বুঝ দিলেন আমিনা এবং জাবেদ সাহেব, ‘ কিছু পেতে হলে, কিছু ছাড়তে হয়।’

বাবা মায়ের সাথে কথা বলে দ্বীপকে ফোন দিল। দ্বীপ সান্তনা দিল কিছুক্ষন। পরদিন থেকে কোচিং৷ হোস্টেলের বাকি মেয়েদের সাথে একসাথে যায়। পড়াশোনা ভালোই চলছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দিবে। মিরা বলল , ‘ যা মজা করার করে নিই, রেজাল্ট যদি খারাপ হয় আমাদের ঘরে জায়গা দিবে না।’

রিদি বলল,’ তোর তো জামাই আছে, আমার কি হবে?’

মিরা বলল, ‘ রিকশাওয়ালা র সাথে বিয়ে দিবে তোকে?’

‘ তাহলে দ্বীপকে রিকশা চালাতে বলি?’

দুই বান্ধবী হাসতে লাগল নিজেদের আলোচনার বিষয়বস্তুর কথা ভেবে।

__

দ্বীপ জব ছেড়ে দিয়েছে রিদির জোরাজোরিতে। যে মেয়ে ফুটবলের বিপক্ষে ছিল সেই মেয়ে রাত দিন জপ করে ফুটবলকে ক্যারিয়ার বানাতে। ভাবা যায়! গত দু মাসে বেশ কিছু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। সাজিনা মা হতে চলেছে । বিগত ম্যাচ গুলোর দূর্দান্ত পারফরম্যান্স দ্বীপের জীবনে আমূল-পরিবর্তন এনেছে। বাছাই পর্বে জাতীয় দলে সুযোগ করে নিয়েছে । রিদিকে ফোন দিয়ে জানাতেই রিদি মত দিল খেলার জন্য। দ্বীপ কিছুতেই রাজি হয়নি, কিন্তু রিদি জেদ ধরল। রিদির মনে হল প্রথমবার সে দ্বীপের খুশির দিকে খেয়াল করেছে। ফুটবল দ্বীপের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে রিদি কখনই বাঁধা হতে চায় না।

দ্বীপ ঢাকা এসেছে কিছুদিন আগে। প্র্যাকটিস চলছে তার। আজ রিদির সাথে দেখা করতে এসেছে ওর হোস্টেলের সামনে। দ্বীপকে দেখে রিদির চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। হাসিমুখে এগিয়ে গেল। দ্বীপকে আগের চেয়ে বেশ সুদর্শন লাগছে সাদা পোলো শার্টে। দ্বীপের পায়ের কালো লেদার বুট গুলো রিদির সবসময়ের পছন্দ। রিদির দিকে তাকিয়ে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ ম্যাডাম আজ কোথায় যেতে চায়?’

রিদি হেসে বলল, ‘ নিয়ে যান যেখানে মন চায়। কদিন পর তো ফ্যামাস হয়ে যাবেন। তখন কি আর রিদিকে ভালো লাগবে? ভক্তরা অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ চাইবে।আশপাশে কত মানুষ ভিড় করবে? ‘

দ্বীপ হেসে ফেলল । বলল, ‘ বাংলাদেশে ফুটবলারদের কেউ চেনে না। ক্রিকেটার হলে না হয় একটা কথা ছিল। ‘

‘ ভাগ্যিস ফুটবলার আপনি , ক্রিকেটার হলে তো আপনার আশপাশে সব সুন্দরী মেয়েরা ঘুরঘুর করত, রিদি কোনো চান্সই পেত না ।’

‘ রিদির জন্য দুনিয়া এসপার উসপার করে দিব।’

রিদি মাছি তাড়ানোর মত হাত নেড়ে বলল, ‘ নাহ, তোমাকে দিয়ে ফ্লার্ট হবে না আর যাই হোক।’

দ্বীপ অপরাধী স্বরে বলল, ‘ কি করব বলো , এই জিনিসটা আমি একদম পারিনা।’

‘ পারো না বলেই তো সারাজীবন একসাথে থাকার জন্য হাত ধরেছি। ‘

‘ কই ধরলে?’

‘ আহ হা! কথার কথা বললাম। সময় হলে ধরব। যখন আমার হাত টা তোমার প্রয়োজন হবে তখন।’

দ্বীপ ইষৎ হাসল। আজ প্রায় দেড় বছরের অধিক সময় রিদির সাথে নাম হীন সম্পর্কে জড়িয়েছে। রিদির হাত ধরার অনুমতি পায় নি আজো। নিজেও ধরতে চায়নি। সব কিছু সঠিক সময়ে পাওয়ার আনন্দই অন্যরকম।

রিদি রিকশা দিয়ে আজ প্রথম ঘুরছে হুড ফেলে। সীমাহীন আনন্দের মাঝে ডুব দিয়েছেন জাবেদ কন্যা। সারাদিন অনেক ঘুরল। দ্বীপ রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে চাইলে রিদি রাজি হল না। ঝালমুড়ি, ফুচকা এবং টং দোকানের চা খেল। নীলক্ষেত থেকে মেডিকেলের কিছু বই নিল। দ্বীপ টাকা দিতে চাইলে রিদি নিষেধ করে বলল, ‘ এখন না, বিয়ে হলে দায়িত্ব নিও। উপহার এক জিনিস আর দায়িত্ব অন্য জিনিস।’

মেডিকেলের বই কিনে দেয়ার দায়িত্ব শুধুই বাবার রিদির মনে হল। রিদি বই কেনার সময় দ্বীপের চোখ গেল শরৎসমগ্রের দিকে। রিদিকে উপহার দিতে ইচ্ছে হল। বইয়ের দামটা দেখে রিদিকে বলল, ‘ উপহার দিতে চাই, নিবে?’

রিদির মনে হল এখন যদি নিষেধ করে হয়ত মনে কষ্ট পাবে। মাথা কাত করতেই দ্বীপ খুশি মনে শরৎ সমগ্র উপহার দিল। এরপর ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে গেল।
চাকরির প্রথম বেতন থেকে রিদির জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিল। সেই টাকা দিয়ে আজ দ্বীপ রিদিকে একটা শাড়ি কিনে দিল। কমলা রঙের খয়েরী পাড়ের কাতান। দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা। রিদির জীবনে উপহার পাওয়া প্রথম শাড়ি। শাড়িটা জড়িয়ে ধরে রিদির সে কি আনন্দ। দ্বীপ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।

হোস্টেলে ফেরার পথে মন খারাপ হল রিদির। গতকাল রাতে মায়ের বলা কথা গুলো মনে পড়েছে। আমিনা গতকাল বলেছেন, ‘ ওই ছেলেকে বলবে তুমি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার আগেই যেন সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে। না হলে তোমার বাবা রাজি হবে না। ‘

রিদি এ কথা দ্বীপকে একদম শোনাবেনা। ছেলেটা মাত্র নিজের স্বপ্ন পূরনে নেমেছে। কেন শোনাবে এসব কথা? রিদির আগে ফুটবল দ্বীপের জীবনে এসেছে। রিদির যেমন মেডিকেল স্বপ্ন, তেমনি দ্বীপের ও ফুটবল। ফুলবলকে এত ছোট করে কেন দেখবে?

পেছন থেকে একটা রিকশা ধাক্কা দিল। রিদি পড়ে যেতে লাগলে দ্বীপ অবচেতন মনে রিদির হাত ধরে ফেলল। তৎক্ষনাৎ সরিও বলল। রিদি হেসে ফেলল।

দ্বীপের হাতের পাঁচ আঙুলে নিজের কোমল হাত গলিয়ে বলল , ‘ জানো দ্বীপ তুমি আমাকে পছন্দ করার আগেই আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম।’

দ্বীপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ কখন?’

‘ পরে বলব কোনো একদিন। তবে এ কথা জেনে রাখো, মেয়েদের চোখ একবার যে জিনিসে আটকে যায়, সে জিনিস তার চাই ই চাই একটা অবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু ছেলেরা সহজেই অনেক কিছু ভুলে যায় নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন পূরণের পথে আমাকে ভুলে যেও না। ‘

দ্বীপের মনে হল রিদি তাকে অন্যকিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। হয়ত বিশ্বাস করতে পারছে না। আবেগের বসে বলল, ‘ ধুর, আমি খেলাই ছেড়ে দিব। খেলোয়াড়দের নিয়ে এত এত স্ক্যান্ডাল এই সব কারণে হয়। আমার কিছুই লাগবে না তুমি ছাড়া। ‘

রিদি দ্বীপের কাঁধে মাথা রেখে বলে, ‘ খেলবে, আমার জন্য। জীবন তো আমাদের শুরু হল। আগে অল্প পানিতে ছিলাম, দুনিয়াটা ছোট ছিল। এখন সমুদ্রে এসেছি, অনেক কিছু দেখার আছে, অনেকটা পথ পাড়ি দেয়া বাকি। ‘

রিদি দ্বীপের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। দ্বীপ মুগ্ধ হয়ে দেখছে। এই মেয়েটা এই বয়সেই এত এত ভারী কথা শিখে গেল? ছোট মামা প্রায় বলতেন, ‘বুঝলি দ্বীপ, তোর মামী হল আমার জন্য গণিতের অনকগুলোর জটিল সমাধান। আমার জীবনের সমাধানের অন্য নাম ইলোরা।’ আজ দ্বীপের ও বলতে ইচ্ছে হল, ‘ মামা আমি বোধ হয় আমার জীবনের সমাধান পেয়ে গিয়েছি। যার নাম রিধিমা।’

__

১৮ ই আগস্ট, ২০১৬,

সকাল থেকে রুমে হাঁটাহাঁটি করছে দুই বান্ধবী। রেজাল্ট দিবে আজ। ঘড়িতে সকাল নয়টা। আজ কোচিং বন্ধ। মিরা চা বানিয়ে চা খেলেও রিদি কিছু খাচ্ছে না৷ দ্বীপের আজ খেলা আছে। খেলার দিন গুলোতে দ্বীপ ফোন বন্ধ রাখে। ফোন হাতে থাকলে মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটে।

দুপুর বারোটা নাগাদ ফলাফল বের হয়ে গিয়েছে। সার্ভারে সমস্যা করছে। সবাই একসাথে ফলাফল দেখতে চাইলে যা হয় আর কি? রিদি কাঁদছে। মিরাও কাঁদছে। দুজনেরই ধারনা তারা ফেল করেছে। সার্ভার এরর দেখাচ্ছে। অনেক বান্ধবী ফোন দিয়ে বলছে রেজাল্ট বাজে হয়েছে। অনেকে ফেল করেছে। আবার অনেকে এ প্লাস মিস করেছে। রিদি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দ্বীপকে মেসেজ দিল, ‘ দ্বীপ আমি মনে হয় ফেল করেছি।’

দ্বীপের খেলা শুরু হবে আর কিছুক্ষনের মধ্যে। স্টেডিয়ামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। ড্রেসিং রুমের সবাই বলাবলি করছে টিভিতে দেখে আজ এইচএসসির ফলাফল দিবে। কারো বোন, কারো ভাগ্নী অথবা কারো স্ত্রী পরীক্ষা দিয়েছে। সবাই খোঁজ নিচ্ছে। দ্বীপ ব্যাগ থেকে ফোন বের করল রিদিকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে। ফোন অন করতেই রিদির মেসেজ দেখে মাথা ঘুরে গেল। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। রিদিকে এখন ফোন দিলে মেয়েটা কী করবে তা ভেবেই ফোন দিচ্ছে না, অন্যদিকে আজকের ম্যাচ ক্যারিয়ারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ। তবুও মনকে বুঝাতে না পেরে রিদিকে ফোন দিল, ফোন বন্ধ পেল। মাঠে চলে গেল খেলতে।

___

রিদিদের রুমে দরজা ধাক্কানো হচ্ছে। রিদি কাঁথা মুড়িয়ে কাঁদছে। অহেতুক কান্না যাকে বলে। মিরা দরজা খুলতেই দেখতে পেল তাদের দুজনেরই পরিবার এর লোকজন এসেছে রাহা এবং মিরার বোন মিশু চিৎকার দিকে বলল, ‘ কংগ্রাচুলেশনস তোমরা দুজনই এ প্লাস পেয়েছ। ‘

রিদি কাঁথার ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে দেখার চেষ্টা করছে কী ঘটছে। পরিবারের সবাইকে দেখে এবং রাহা-মিশুর কথা শুনে স্তব্ধ। চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল দুজন। মিরা আর রিদি একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে লাফাচ্ছে। একবার বাবা মাকে জড়িয়ে ধরছে তো আরেকবার হোস্টেলের বাকিদের লাফিয়ে লাফিয়ে জানাচ্ছে।

__

দ্বীপ আজ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে খেলাটা খেলেছে। হেরে গিয়েছে। কোনো গোলই হয় নি দলের। কোচ অবশ্য কাউকেই বকাঝকা করেন নি। পরবর্তী বারের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। ড্রেসিং রুমে এসে ফোন বের করে রিদিকে কল করল দ্বীপ। বার বার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। অতিরিক্ত চিন্তায় মাথা ব্যাথা উঠে গেল। স্টেডিয়াম থেকে বের হতে হতে রাত আটটা।

মেসে এসে রিদিকে ফোন দিতেই ফোন রিসিভ হল। রিদি সালাম দিয়ে জানাল সে এ প্লাস পেয়েছে। দ্বীপ কোনো উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে বলল, ‘ এভাবে তো তুমি আমাকে ঠান্ডা মাথায় খুন ও করতে পারবে রিদি।’

চমকে উঠল রিদি। দ্বীপ শান্ত না থেকে বলেই যাচ্ছে,’ মাঠে নামার আগে মেসেজ দিলে ফেল করেছ। ওই মুহুর্তে আমার অবস্থা কেমন হবে তোমার ধারণা আছে? ফোন দিলে ফোন বন্ধ তোমার। এগুলা কি বোকামো নয়? আমি লাইফে সবচেয়ে বাজে খেলেছি আজ। মনে হয়েছে কার জন্য খেলব? আগে নিজের জন্য খেলতাম। এখন তোমার জন্য খেলি। ফেল করা মানে সমস্ত আশায় পানি ঢেলে দেয়া। আমার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই মুহুর্তে। ছুটে পালাতে মন চাইল মাঠ থেকে। হেরে গেলাম আমরা। আমি দুইটা গোল মিস করেছি। কোচ কিছু বলেন নি আমার ভাগ্য। হেরেছি আমার আফসোস নেই। হারজিৎ জীবনের অংশ। কিন্তু দুশ্চিন্তা ধরিয়ে দিলে কেন? যতবার ফোন দিয়েছি তোমার ফোন বন্ধ। একটা মেসেজ কি দেয়া যেত না?’

রিদি সিক্ত গলায় বলল, ‘ আম্মু আব্বু ঢাকা এসেছেন । আমি এখন মামার বাসায়। ফোনে চার্জ ছিল না। এই বাসায় এসে চার্জে দিয়েছি। তোমাকে যে দুশ্চিন্তায় ফেল করেছি বলে মেসেজ দিয়েছি, সেটা ভুলেই গিয়েছি। ইচ্ছাকৃত করিনি। মাফ করে দিও। ‘

দ্বীপ নিজেকে সামলে বলল, ‘ আচ্ছা সরি। মন খারাপ করো না। আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই নি।’

রিদির প্রানহীন স্বর, ‘ ঠিক আছে, রাখছি। আম্মু ডাকছে।’

রিদি ফোন রেখে দিল। দ্বীপ সারা রাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেয়ে কাটাল৷ মেয়েটাকে এত কথা শোনানো উচিত হয় নি। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। দুশ্চিন্তায় না হয় উল্টাপাল্টা মেসেজ দিয়ে ফেলেছে। তাই বলে এতটা প্রতিক্রিয়া দেখানো কি উচিৎ হয়েছে? পূর্বের রাগ টা যথেষ্ট সংযত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে যায়। আকাশে আজ মেঘ। চাঁদ টা ঢাকা পড়েছে। আজকের রাত টা দুজনের জন্য সুখের হওয়ার কথা ছিল অথচ হল বিষাদের রাত্রি।

__

একের পর এক ফাইল সাইন করতে ব্যস্ত। সাইন করতে করতে কলমের কালি ফুরিয়ে গেল। নতুন কলম ক্যাপ খুলে সামনে ধরল রানা। চোখের চশমাটা ঠিকঠাক ঠেসে রানার দিকে না তাকিয়ে ফাইলে সাইন করতে করতে প্রশ্ন করল, ‘ জিহান নাকি জাতীয় দলে চান্স পেয়েছে?’

রানার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। দল ছাড়ার পর ও এমপি সাহেবের মুখ থেকে এই শালার নাম টা যায় না। জবাব না দিলে বেয়াদবি হবে৷ তাই রানা বাধ্য হয়ে বলল, ‘ জি এমপি সাব, আমিও শুনছি। কয়দিন আর এসব খেলবে। ধাপাধাপি শেষ হলে দেখবেন কোথাও কোনো কাজ ও পাবে না। ‘

এমপি এনামুল করিম বললেন , ‘ ওরে খবর দিও আমার সাথে দেখা করার জন্য। ছেলেটা অনেক শাইন করত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে। কেন যে ছেড়ে দিল। ‘

বাকি চ্যালাদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ একটু যোগাযোগ রাখিস ওর সাথে। খেলা দেখতে যাবি। যদি পারিস সাহায্য করিস। দলে আসার দাওয়াত দিস। কিন্তু খবরদার জোরাজোরি করবিনা। ওকে আমি অনেক স্নেহ করি। কোনো দিন ও বেয়াদবি করে নাই।’

রানার গা জ্বলে উঠল। সারাদিন এমপি সাব বলে বলে মুখের ফেনা তুলে রানা। আর সে মায়া দেখাচ্ছে কিনা ওই জিহানের প্রতি! ক্ষমতা এনামের হাতে বলে কিছু করতে পারছেনা। যেদিন রানা এই চেয়ারে বসবে সেদিন দেখে নিবে এসব জিহান রে। কত জিহান তার পায়ের কাছে বসে থাকবে।

এনাম সাহেব একজনকে ইশারা দিয়ে ডেকে বললেন, ‘ সেলীম, আমাকে একটু বাফুফের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলিয়ে দিস রাতে। উনাকে বলব জিহানের এক্সট্রা খেয়াল নিতে। যত হোক এক সময় আমার কাজে লাগত।’

রানা কাজের বাহানা দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর কিছুক্ষন সেখানে অবস্থান করলে এমপি সাবকে মেরে ফেলতে মন চাইবে তার। রানা বের হতেই এনাম সাহেবের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। চুল তো আর এমনি এমনি পাকে নি? কে ধোঁকা দিচ্ছে আর কে খাঁটি মানুষ এসব বুঝতে তার রকেট সায়েন্স এর প্রয়োজন হয় না।

চলবে…

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ

১২.

রিদনের সাথে প্রমির তুমুল ঝগড়া চলছে। ঝগড়ার কারণ হল রিদন বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে ট্যুরে যেতে পারবে না ৷ সেটা যেমন ট্যুরই হোক। ভার্সিটি ট্যুর কিংবা ফ্রেন্ডস ট্যুর যেমনই হোক। রিদনের মনে হচ্ছে এসব বাচ্চা মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর অসুবিধা হল এরা বুঝে কম, হাউ কাউ করে বেশি। ঝগড়ার এক পর্যায়ে প্রমি ফোন রেখে দিয়েছে। বাবার একমাত্র মেয়ে প্রমি । কিছু চাওয়ার আগেই হাজির হয়ে যায়। পড়াশোনাটাও কোনো রকম চালিয়ে যাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য স্বামীর সাথে ফরেন ট্যুর দেয়া। রিদনকে ভেবেছিল সাদাসিধা কিন্তু তার ভাবনায় এক বালতি কাদা ঢেলে দিয়ে রিদন হয়ে গেল ব্যাকা ত্যাড়া। সম্পর্কের আজ ছয়মাস। এই ছয়মাসে তাদের মধ্যে প্রেমের আলাপের চেয়ে ঝগড়াটাই বেশি হয়েছে। দুজন দুজনের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে। এই যে গতমাসে প্রমি মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিল। শাড়িতে তাকে বেশ লাগছিল। গায়ে হলুদের ছবি তুলে রিদনকে পাঠাতেই রিদন প্রমির প্রশংসা না করে পেছনের ছেলেটা তার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন সেটা নিয়ে পড়ল। প্রমি রেগে গিয়ে দুইদিন রিদনের সাথে কথা বলেনি। না না রিদনকে ডমিনেটিং ফিগার ভাববেন না। প্রমিও কম নয়। গত সপ্তাহে ক্যাম্পাসের গাছ তলায় রিদন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। এরমাঝে প্রমি ফোন দিয়েছে। ফোনে কথা বলার সময় রিদনের এক বান্ধবী কথিকা রিদনকে বলল, ‘ তোর সব সময় গার্লফ্রেন্ড এর জন্য। আমরা কি দোষ করেছি? এই মেয়েটা তোর জীবনে আসছে কয়দিন হয়েছে?’
কথাটা কথিকা আস্তে বললেও প্রমির কান অবধি পৌঁছে গিয়েছে। এরপর শুরু হয়ে গিয়েছে রেডিও বাজানো, ‘ যাও যাও ওইসব মেয়ের কোলে উঠে বসে থাক। আমি তো ভালো না। জীবনে তাদের পরে আসছি। ‘

এমন আরো অনেক কিছু। এত এত ঝগড়ার পর ও যখন সম্পর্ক বিচ্ছেদের কথা আসে দুজনই প্রতিজ্ঞা করে আর ঝগড়া করবে না। এইতো এভাবেই তাদের দুষ্টু মিষ্টি প্রেম টিকে আছে। দুজনের কারোরই আপাতত পরিবার থেকে বিয়ের তাড়া নেই। তবে প্রমি চায় বুড়ি হওয়ার আগেই জীবনটাকে উপভোগ করতে। দেশ বিদেশ স্বামীর হাত ধরে ঘুরতে। রিদন প্রমির এসব কথা শুনলে অট্টহাসি দিয়ে বলে, ‘ ওই সব সুযোগ হয়ত পাবা না প্রমি বেগম। ঘরে যদি বউ হিসেবে অঞ্জু ডাইনি আসে। তোমাকে কাজের বুয়া বানাবে। ‘

প্রমিও তিরিক্ষি মেজাজে বলে, ‘ অঞ্জু ডাইনী হলে আমি ডাইনী তাড়ানোর কবিরাজ। ওর ডাইনী গিরি ছুটিয়ে দেব। মরিচ বেটে নাকে চোখে লাগিয়ে দেব।’

রিদন বলে, ‘ অঞ্জুরে দেয়ার আগে একটু ফুফুরে দিও। ফুফুই মূল কান্ডারি। আমি তোমাকে বম্বে মরিচ এনে দেব। হাতে গ্লাভস লাগিয়ে বাটবে। নাহলে রাতে আমি তোমার হাতে আদর করলে তো আমার মুখ জ্বলবে।’

ওরেহ প্রেম! প্রমি তো আদরের কথা শুনেই লজ্জায় কুটি কুটি হচ্ছে। ইশ কি ভাল লাগে যখন এভাবে প্রেমিক পুরুষ আদর করবে বলে। রিদনটাও এত লজ্জা দিতে পারে? প্রমি ও পাশ থেকে লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ যাহ! আমি রাখছি। আমার লজ্জা লাগে।’

রিদন আরো লজ্জা দিয়ে বলে, ‘ ও আমার তুলতুলি, আমার লজ্জাবতী। আমার কাছে আসলে সব লজ্জা গায়েব করে দেব।’

আহা! কি সুন্দর প্রেম। অথচ এসব প্রেমের মাঝেই শুরু হয়ে যায় ঝগড়া। কথার মাঝে খুঁত বের করে চতুর্থ, পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার উপক্রম হয়। অবুঝ প্রমি দুদিন খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে তিনদিনের দিন অপরিচিত মডেলদের ছবি পাঠিয়ে রিদনকে ভয় লাগায় এর সাথে, ওর সাথে সম্পর্কে জড়াবে। এই ছিল তাদের গল্প। তবে যেদিন দ্বীপের সাথে প্রমির দেখা হয়েছিল সেদিনের কথা রিদনের সাথে শেয়ার করেছিল। রিদন প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল প্রমির উপর, বড় ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলার জন্য। দ্বীপ এসব পছন্দ করে না সোজাসাপটা জানিয়েছে প্রমিকে। ভবিষ্যতে যেন এসব না করে। প্রমিও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।

__

অক্টোবর মাস চলে এসেছে। মেডিকেলের ডেট দিয়েছে। দুদিন পর এক্সাম। দ্বীপের সাথে সেদিনের পর থেকে রিদির মন কষাকষি চলছে। দুজনেরই কথা হয় তবে দেখা হয় না। কথা হলেও খুব সামান্য। রিদি পড়ার ব্যস্ততা দেখায়। দ্বীপ বিরক্ত করে না। এত কাছে থেকেও দুজনের মাঝে পাহাড়সম অভিমান। যেসব মানুষ বেশি আদর যত্ন করে তাদের কাছ থেকে কষ্ট পেলে আমাদের মন মেনে নিতে পারে না। দ্বীপ বেশ কয়েকবার সরি বলার পর ও রিদি কেমন দমে গিয়েছে। এই বিষয়ে কথা বললেই রিদি প্রতিউত্তরে বলে,

‘ এসব কথা বাদ দাও। খেলায় মন দাও। আমার পরীক্ষা শেষ হলেই আম্মু দেখা করতে চাইবে। একটা ভালো পজিশনে না গেলে আম্মুকে মানানো কষ্ট হয়ে যাবে। আম্মু না মানলে আব্বুকে মানানো আরো কঠিন। ‘

দ্বীপ ও কথা বাড়ায় না। ভেতরে ভেতরে কষ্ট জমিয়ে শান্ত থাকে। এই যে কিছুদিন আগেও বেশ কয়েকবার দেখা করতে চেয়েছিল। রিদি রাজিই হল না। হোস্টেলের সামনে এসে এক পলক দেখে যাবে বলল, এতেও রিদি রাগ করল। আজ অক্টোবরের তিন তারিখ । পরশু রিদি রাহার বাসায় চলে যাবে। সেখান থেকে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র কাছে। আগামীকাল দ্বীপের ম্যাচ আছে। পরীক্ষার আগে আর দেখা হবে না ওদের। পরীক্ষা যদি ভালো না দেয় আমিনা বলেছেন রিদিকে নোয়াখালী নিয়ে যাবে। ওখানের সরকারি কলেজে ভর্তি করিয়ে, বিয়ে দিয়ে দিবে।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই রিদিকে খুব মনে পড়ছে। বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছে একা। ঢাকার রাস্তা নিরিবিলি পাওয়া কল্পনাতেও অসম্ভব। এখানে দিন রাত বলে কোনো কথা নেই। হ্যাঁ মধ্য রাতে গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কমে যায়, তবে একেবারে শান্ত কখনও হয় না। বাসার পাশে হাতিরঝিল। লেকের পানিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ। মেসে খাবার আজ ভাল না। চিচিঙ্গার তরকারি। ম্যাচ খেলে যে সম্মানি পায় ওটা এখনও খুব একটা বেশি না। বাবার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে। সেদিন বাবা বললেন,

‘ না পারলে খেলা বাদ দিয়ে দাও। চাকরি করো বা ব্যবসা ধরো। বাংলাদেশে ফুটবলের দাম নাই।’

পকেটের ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখে রিদির ফোন। রিসিভ করতেই প্রশ্ন করল, ‘ কোথায় আছ?’

‘ লেকের পাশে বসে আছি।’

‘ ওখান থেকে ফার্মগেট আসতে কতক্ষন লাগবে?

‘ ঘন্টা খানেক।’

‘ চলে আসো হোস্টেলের নিচে।’

দ্বীপের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ফোন পকেটে রেখে বাসে উঠল। পকেট হাতিয়ে দেখল পাঁচশো টাকার দুটো নোট আছে। শেষ সম্বল এই মাসের। রিদি যেমন মেয়ে এই টাকা দুপুরে দুজনের খাবার হয়ে আরও থাকবে। যদি না হয় বন্ধুদের ফোন দিয়ে ধার নিবে।

মনিপুরী পাড়ায় হোস্টেলের সামনে এসে কল দিতেই রিদি নেমে এল। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। পরনে দ্বীপের দেয়া কমলা কাতান শাড়িটা। আজ হিজাব পরেনি। চুল খোলা। কানে এক জোড়া সোনালী রঙের ঝুমকা। হাতে কাচের চূড়ি। দ্বীপ আজ প্রথম বার চুল খোলা রিদিকে দেখল। রিদি এগিয়ে আসছে, দ্বীপের বুকের ভেতর কম্পন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুকনো ঢোক গিলল। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল, জীবনের সবচেয়ে জঘন্য ফকিরের বেশ আজকে লাগছে। সাদা পুরোনো টি শার্ট এর উপর একটা কালো শার্ট চাপানো। পুরনো ডেনিম প্যান্ট। পায়ে এপেক্স এর দুই বেল্টের স্যান্ডেল। সে কি আর জানত আজ রিদি এই বেশে তার সামনে হাজির হবে? ভেবেছিল হোস্টেলের নিচে দেখা করতে আসবে। অথচ এই মেয়ে রীতিমতো বউ সেজে চলে এসেছে। মাথায় ঘোমটা তুললেই চলবে।

রিদি দ্বীপের দিকে শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে বলল, ‘ এটা ধরো, আমি শাড়ি সামলে হাঁটতে পারছিনা।’

দ্বীপ অভিমান গলায় বলল, ‘ আজ এমন হুরপরী না সাজলে কি হত? আমার দিকে তাকিয়ে দেখেছ কেমন লাগছে? তোমার বডিগার্ড ও নিয়োগ দিবে না কেউ?’

রিদি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ বাজে কথা বন্ধ কর। তোমার সাজার কি প্রয়োজন? যেভাবে আছ আমার তাতেই চলবে ৷ সিনেমায় অডিশন দিতে তো আর যাচ্ছ না। একটা সি এন জি ডাকো। লেকে নিয়ে চলো। ‘

দ্বীপ বিষন্ন মনে সি এন জি ডাকল। দুজনই উঠে বসল। দ্বীপ আঁড়চোখে বার বার রিদিকে দেখছে। চোখ ফেরাতে পারছে না। এই যে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে রিদি চুলে হাত খোঁপা করল। ঠোঁটে উপর স্বেদজল দেখা যাচ্ছে। টিস্যু দিয়ে চেপে চেপে মুচছে। দেখতে কি অপূর্ব লাগছে! ধানমন্ডি বত্রিশে এসে একটা চাপ রেস্টুরেন্টে বসল। সেখানে রিদি খাবার অর্ডার দিল। দ্বীপ কে জানাল আজ সে খাওয়াবে। ওই যে শপিং ব্যাগ, সেটা থেকে একটা টিফিন ক্যারিয়ার নামাল। টিফিন ক্যারিয়ার খুলতেই তিন পদের খাবার সামনে রাখল। হলুদ পোলাও, ছোট ছোট রোস্ট, আর দুটো ডিম ৷ আরেকটা বক্স খুলতেই কয়েক পিস কেক। কাটা চামচ বের করে কেক নিয়ে দ্বীপের মুখের সামনে ধরে বলল, ‘ শুভ জন্মদিন মাই ম্যাজিশিয়ান। ভুলিনি আপনার জন্মদিন। সারপ্রাইজ দিব বলে কাল থেকে এসব আয়োজন করছি। ইচ্ছে করে ফোনে উইশ করিনি।’

দ্বীপ নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। হয়ত অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। রিদি নিজে নিজে বলেই যাচ্ছে, ‘ ছোট খালামনি বলেছিল উনি যখন আংকেলের সাথে প্রেম করতেন তখন এভাবে টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে খাবার নিয়ে যেতেন। আংকেল তখন কলেজ হোস্টেলে থাকত। বুয়ার রান্না খেয়ে বাথরুম তার প্রিয় জায়গা হয়ে যেত। খালামনির রান্না তৃপ্তি নিয়ে খেতেন। আমার ও মনে হল, আমি কেন আমার দ্বীপকে এখন পর্যন্ত রান্না করে খাওয়ালাম না? পরে মনে পড়ল আমি তো একটা আমড়া কাঠের ঢেঁকি। রান্নাই পারিনা। গতকাল বাজার করেছি সন্ধ্যা আপুকে সাথে নিয়ে৷ পোলাও চাল কিনেছি, মুরগী কিনেছি, ডিম কিনেছি। রাতে হোস্টেলের খালাকে ডেকে এনে মুরগীটা কেটে রান্না করেছি। ডিম রান্না করেছি। আর আসার সময় পোলাও রান্না করেছি। সব সন্ধ্যা আপু,খালা আর ইউটিউব এর সাহায্য নিয়ে। পোলাও তে লবন কম হয়েছে তাই সাথে আলাদা করে লবন এনেছি। রোস্টটা মনে হয় একটু মিষ্টি, দুধের পরিমান বেশি হয়ে গিয়েছে। তবে ডিম টা ভালো হয়েছে খেয়ে দেখো? একটা ভুল করেছি। পোলাও তে ভুলে অল্প হলুদ দিয়ে ফেলেছি। আজকের জন্য ম্যানেজ করে নাও, যদিও জানি তুমি কখনোই রান্না নিয়ে মন্তব্য করবে না। আর কেক টা হোস্টেলে এনে তোমার নাম করে কেটে সবাইকে খাইয়েছি। তোমার জন্য দুই পিস ফ্রিজে রেখেছি। মিরাটাকে মিস করেছি। ও তো ওর খালার বাসা থেকে পরীক্ষা দিবে।’

রিদি থামলো এক টানা বক বক করে। দ্বীপ মাথা নত করে কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে চোখের কোণা মুছল। রিদির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘ এত কষ্ট করে যখন এত কিছু করেছ, নিজের হাতেই এক চামচ খাইয়ে দাও।’

রিদি হেসে পানির বোতল খুলে হাত ধুয়ে বলল, ‘ চামচ দিয়ে কেন? আমার হাত দিয়েই দুই লোকমা খাইয়ে দিই।’

দ্বীপ সাথে সাথে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘ আর মেরো না আমাকে। এমনিতেই যা যা করেছ ওগুলোই নিতে পারছিনা। এখন খাইয়ে দিয়ে পুরোপুরি মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করছ? পরীক্ষা টা ঠিকঠাক দাও। যদি মিস হয়, আমি কোথায় যাব রিদি? তোমাকে তো জোর করে নিয়ে যাবে। প্রতিবাদ করতে পারবে না কোনোভাবে। আমার মন বলছে এটাই আমাদের হয়ত শেষ দেখা। কেন জানিনা মনে হচ্ছে তুমিও জানো এটা আমাদের শেষ দেখা তাই না?’

রিদি টিস্যুতে হাত মুছে হাসছে। এই হাসিতে প্রাণ নেই। দ্বীপকে তাড়া দিল খেতে। দ্বীপ নিজেই হাত ধুয়ে খাচ্ছে। পেট ভরে খেয়েছে। রিদি চাপ হাউজ থেকে অর্ডার দেয়া খাবার টা খাচ্ছে। খাওয়া শেষে দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কেন মনে হলো তোমার যে এটাই আমাদের শেষ দেখা?’

রিদি কিঞ্চিৎ হেসে বলল, ‘ চাচ্চু একটা পাত্র এনেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক। আব্বু রাজি।’

দ্বীপ একপেশে হাসি দিয়ে বলল, ‘ তোমার জন্য সুযোগ্য পাত্র। তোমাদের দুজনকে মানাবে দারুণ। ‘

হঠাৎ দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ আচ্ছা রিদি তুমি মেডিকেলে টিকে গেলে কি বিয়েটা ভাঙতে পারবে?’

রিদি হেসে বলল, ‘ পারব।’

‘ কিভাবে?’

‘ বিয়ে দিলে মেডিকেলে পড়ব না বলে বায়না ধরব।’

‘ তাহলে প্লিজ টিকে যাও। আমার হয়ে থাকো।’

‘ ইনশাআল্লাহ, শেষ চেষ্টা দেখি কি হয়? আচ্ছা ভালো কথা, তোমার জন্য উপহার নিতে পারিনি। শপিং মল চিনি না। সেজান পয়েন্ট বা ফার্মগেটের ভ্যান প্লাজায় আমার পছন্দের কিছু নেই। ‘

দ্বীপ ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘ আর কী উপহার দিতে চাও বলো তো? তুমি আমাকে আজকে যা দিয়েছ তা আমার জীবনের সেরা উপহার গুলোর একটি। এত কেয়ার আম্মু আর সাজিনা ছাড়া কেউ কখনও করে নি। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। শুধু অনুরোধ করব…

দ্বীপ থামলো। রিদি কথা শেষ করতে বলাতে দ্বীপ বলল, ‘ আমার যত্ন করার জন্য জীবনে থেকে যাও।’

রিদি মাথা নুইয়ে হাসে। দ্বীপ পুনরায় বলে, ‘ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। বউ বউ লাগছে।’

__

দ্বীপ বাসায় ফিরে এসে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আজ প্র্যাক্টিসে যায় নি। পেট ভরা একটু ঘুমাবে। এমন সময় ফোন এলো। রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে বলল, ‘ জিহান তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে ক্লাবে?’

পরিচিত স্বর শুনে চমকে উঠল। জবাবে বলল, ‘ না ভাই। সব ঠিক আছে। আপনি কেমন আছেন?’

‘ আমি ভালো আছি। আমারে তো তুই ভুলেই গেছিস। খোঁজ ও নেস না।’

‘ আসলে ভাই এত ব্যস্ত থাকি, সারাদিন মাঠে না হয় টার্ফে থাকি। সুযোগই হয় না।’

‘ আচ্ছা ভালো খেলিস। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করিস। যদি মনে হয় খেলায় পারবিনা। দলে ফিরে আসিস। তোর জন্য আমি অপেক্ষা করব। পরবর্তী নির্বাচনে আমি মন্ত্রীত্ব পাব হয়ত। তুই তখন এমপির ইলেকশন করিস। ‘

‘ আচ্ছা ভাই, আগে দেখি খেলায় কী হয়।’

এনামুল করিম দ্বীপকে আরো অনেক কিছু বুঝিয়ে ফোন রাখল। দ্বীপ মুখ গোমড়া করে শুয়ে ভাবল, যে সমস্যায় আছি, প্রধানমন্ত্রী হলেও সলভ হবে না। আর আপনি বলছেন এমপি হওয়ার কথা।’

___

৭ই অক্টোবর, ২০১৬

ফযরের আযানের ধ্বনি কানে আসছে। ঘুম ঘুম চোখে উঠে বাথরুম গেল। একেবারে ওযূ করে বের হল। ফযরের সালাত আদায় করে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্রষ্টার কাছে ফরিয়াদ করল রিদির পরীক্ষা টা যাতে ভাল হয়। অথচ আজ তার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে সেই কথা ভুলে বসে আছে।বিছানার পাশে বিস্কুটের কন্টেইনার থেকে দুই পিছ বিস্কুট নিয়ে খেল। লাল সূর্য পৃথিবীতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর দ্বীপ দেখতে পাচ্ছে তার জীবনের প্রথম বিষন্ন সূর্যোদয়।

ইডেন কলেজে সিট পড়েছে রিদির । কিছুক্ষন আগে পরীক্ষা শেষ হয়েছে । আকাশে মেঘ করেছে। অক্টোবরের বৃষ্টি। আচ্ছা অক্টোবর রেইন তো সুন্দর, স্নিগ্ধ এবং কোমল হওয়ার কথা কিন্তু এত বিষন্ন কেন? এই যে ঝপাঝপ বৃষ্টি হচ্ছে, ইডেনের প্রতিটি গাছের ধুলো বালি সাফ করে ফেলেছে, প্রকৃতিকে চকচকে, তকতকে বানিয়ে ফেলেছে অথচ রিদির মনের কোণে বসা ধুলো বালি গুলো গেল না । এক সময় সেগুলো প্রকান্ড হবে, তখন ঝড় আসবে। অক্টোবর রেইন আর জীবনে আসবে না। ইডেনের গেটের সামনে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায় । বাবা আর দুলাভাই। তাদের প্রত্যাশা রিদি আজ ভাল পরীক্ষা দেবে। আরেকজন আছে যে আজ এই মুহূর্তে স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলতে ব্যস্ত। এদের প্রত্যেকের আশা ভরসায় পানি ঢেলে দিয়ে রিদি আজ অত্যন্ত বাজে পরীক্ষা দিয়েছে। এত কনফিউজিং প্রশ্ন এর আগে কখনো এসেছে কিনা জানেনা? সব নেগেটিভ মার্ক হবে । চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে রিদির। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও মনের সাথে জোর খাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তুমুল বৃষ্টি, পরীক্ষার্থীরা ভিজে একাকার। রিদি কাঁদছে, বৃষ্টির পানিতে মিশে যাচ্ছে সেই জল। ভিজে গিয়েছে রিদি। বাইরে এসে বাবা এবং দুলাভাইয়ের হাত ধরে সি এন জি তে উঠল। জাবেদ সাহেব মেয়ের মুখ দেখে কি বুঝলেন কে জানে? একটি বারও প্রশ্ন করলেন না। রাহার বাসায় সবাই আছে। রায়হান ও চুপচাপ। বাসায় পৌঁছানোর পর আমিনা প্রশ্ন করল পরীক্ষা কেমন দিয়েছে? রিদি জবাবে বলল, ‘ যা পেরেছি দিয়েছি, হবে না মনে হয়।’

আমিনা শান্ত স্বরে বলল, ‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাও শেষ। জাহাঙ্গীরনগর বাকি আছে। দিয়ে দেখো, হলে তো হল না হলে আমাদের সাথে নোয়াখালী নিয়ে যাব। এত টাকা আর তোমার পিছনে ঢালতে পারব না। এসব প্রেমে টেম করে পড়াশোনার জলাঞ্জলি দিয়েছ। ওই ছেলের সাথে যেন কথা বলতে না দেখি।’

দুপুরের ভাত খেতে বসেছিল রিদি। ভাতের প্লেটে টুপটুপ করে পানি পড়ছিল। আমিনা আশপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। রাহার ননদ ও এবার পরীক্ষা দিয়েছে। এতক্ষন গোসলে ছিল। বের হয়ে রিদিকে দেখে প্রশ্ন করল, ‘ রিদি তোমার পরীক্ষা কেমন হলো? কত থাকবে?’

নাকের পাটাতন ফুলে এলো রিদির। রায়হান বোনকে বলল, ‘ খেয়ে নে। এসব নিয়ে পরে আলোচনা করিস।’

বিথী মাথা কাত করে ভাইয়ের কথা মতো খেতে বসল। আমিনা বেগমের চোখে মুখে হতাশা। জাবেদ সাহেব দুপুরে খেলেন না। রাহা রান্নাঘরে কাজ করছে। তার চোখ মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কেঁদেছে। এত সাধনা করেছে বোনটা অথচ আজ পরীক্ষাটা খারাপ দিল। ছেলে মেয়ে দুটো ছুটোছুটি করছে। বকে ধমকে রায়হানকে বলল ওদের খাওয়াতে। বিকেল হতে না হতেই জাবেদ সাহেব রিদিকে নিয়ে নোয়াখালী চলে আসার প্রস্তুতি নিলেন । মেয়ের বাসায় থাকতে উনার ভালো লাগছিল না। নোয়াখালী পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত দেড়টা। বাসায় ঢুকে রিদি নিজের কামরায় প্রবেশ করল। ফোন হাতে নেওয়ার সাহস টুকু হচ্ছেনা। আমিনা সারাক্ষণ নজরে নজরে রেখেছে। শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চলন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা। রিদি আপাতত সব ভুলে যেতে চায়। যদি এমন হত যে বিগত কয়েক বছরের স্মৃতি রিদি ভুলে যেত! যদি এমন হত যে রিদি কাউকে চিনতে পারছে না! তবে কি রেহাই পেত এমন পরিস্থিতির হাত থেকে। কেমন গুমড়ে যাওয়া পরিস্থিতির সম্মুখীন করল স্রষ্টা!

__

মেসেজ টার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দ্বীপ। আজ ভাল খেলেছে। জিতে ফিরেছে। গোল করেছে। কিন্তু সেই জয় এ আজ আনন্দ নেই। মেসেজে লেখা, ‘ পরীক্ষা বাজে দিয়েছি। আব্বু নোয়াখালী নিয়ে এসেছে।’

ডায়াল চেপে মাকে ফোন দিল। ওই পাশ থেকে রাহেলা ফোন রিসিভ করতেই দ্বীপ নিজ থেকে বলল, ‘ আম্মু রিদি পরীক্ষা খারাপ দিয়েছে, ওকে নোয়াখালী নিয়ে গিয়েছে।’

রাহেলাও চুপ করে আছে। ছেলের মনের অবস্থা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, ‘ আচ্ছা ধৈর্য্য ধরো। কি হয় দেখি। তুমি তো এখনও সেই অবস্থানে যাও নি যে আমরা প্রস্তাব নিয়ে যাব। ‘

‘ প্রস্তাব দিতে হবে না। আমি ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি আম্মু। মন খারাপ ছিল তাই আপনাকে কল দিলাম। আপনার সাথে কথা বলে শান্তি পাই।’

রাহেলা মৃদু হেসে বললেন, ‘ একটা গল্প শুনবে?’

‘ কী গল্প?’

‘ আমার যখন বিয়ে হল তখন আমি কেবল অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমার আব্বার হয়ত অনেক টাকা ছিল না তবে সুখ ছিল। তোমার আব্বু কলেজ যাওয়ার পথে আমাকে দেখে পছন্দ করলেন। এরপর তোমার দাদাকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠালেন। আব্বা রাজি হলেন না। কি কারণে জানো? ‘

‘ কি কারণ?’

‘ কারণ আব্বার মনে হয়েছে আমি অশান্তিতে থাকব। এত আদরের মেয়ে কষ্ট পাবে আব্বা এই কথা মেনে নিতেই পারবে না। প্রথমবার প্রপোজাল ক্যান্সেল হলেও তোমার আব্বু নাছোড়বান্দা। সে আমাকে কলেজে যেতে, প্রাইভেটে যেতে ঠিকই ফলো করত। একদিন আব্বা দেখে ফেললেন। তোমার আব্বু অনুরোধ করলেন। এর মাঝে আমারও তোমার আব্বুর প্রতি সফট কর্ণার তৈরি হলো। আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করাতে বললাম আমি রাজি। বিয়েটা সুন্দর করে হলো ঠিকই কিন্তু সুখের দেখা পেলাম না বিয়ের প্রথম কয়েক বছর। বিয়ের পর তোমার আব্বু তার মা- বোনদের কথায় চলত আর আমাকে আমার আব্বা বলত ধৈর্য্য ধরো। সেই ধৈর্য্য ধরতে ধরতে আজ এত বছর। এখন আমি আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। এখন তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতেই পারো আম্মু আগা নাই, মাথা নাই এই গল্প কেন বললেন? এই গল্প বলার কারণ হলো, তুমি রিদির জন্য যেই ভালোবাসা দেখাচ্ছ তোমার আব্বুও আমার জন্য দেখিয়েছিল। বিয়ের পর সে দূরত্ব টেনে এনেছিল। আমি দিন রাত কেঁদেছি। কষ্ট পেয়েছি। আমি চাই না রিদি সেই কষ্ট পাক। তোমরা ছেলেরা বিয়ের আগে উজাড় করে ভালবাস। বিয়ের পর সেই টান হারিয়ে যায়। যদি রিদির জন্য সিরিয়াস হও তবে আমার অনুরোধ স্যাটেল হও। আমার বাবা যে আফসোস করেছে, রিদির বাবা না করুক। তোমার কাছে যতদূর শুনেছি রিদি তার বাবার প্রাণ। তুমি রিদিকে কষ্ট দিলে আমি কষ্ট পাব। তোমার বাবা যদি আমাদের বিয়ের পর শক্ত থাকতেন আমি কষ্ট পেতাম না। শাশুড়ী হিসেবে আমি কেমন হব জানিনা, তবে তুমি স্বামী হিসেবে কেমন হতে চাও ভেবে দেখো। তোমার হাতে সময় অল্প। আমি রিদির বিয়ে এক বছরের জন্য আটকানোর ব্যবস্থা করছি। আমাকে রিদির নাম্বার দাও।’

দ্বীপের নিজেকে নিঃস্ব লাগছে। মায়ের উপর বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছে করছে। মাকে রিদির নাম্বার দিয়ে ব্লক হেডেড হয়ে শুয়ে পড়ল। এরপর বাকি এক সপ্তাহ কেটেছে দুঃস্বপ্নের মত। দ্বীপ স্পেন যাবে খেলতে। খবরে শিরোনামে দ্বীপের নাম উঠছে। রিদি ফোন ধরে না। আমিনা ফোন নিয়ে গিয়েছে। বাবা যখন টিভিতে খেলা দেখে তখন দ্বীপকে দেখতে পায়। টুকটাক প্রশংসা করে বাংলাদেশ টিমের। এরা খেলায় উন্নতি করছে, এভাবে খেললে বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ফুটবলে নাম কামাবে আরও অনেক কিছু। মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

কিন্তু বাবা একটা কথা প্রায় বলে, ‘ এই ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছি। ‘ রিদি এই কথার মানে হদিস করতে পারে না।

এরপর যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিল একটিতেও নাম আসেনি রিদির। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ফেল এসেছে। অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে। বার বার মনে হতে লাগল এইচএসসির ফলাফল টা দিয়ে কি কাজ? বাবা আজ তার জন্য মুখ দেখাতে পারছে না বন্ধু সমাজে।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-১০

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
১০.
( কপি করা নিষেধ)
খেলায় গো হারা হেরেছে আজ। হেরেও খারাপ লাগছে না যতটা খারাপ লাগছে দুপুরের কথা ভেবে। রিদির বাবা সেদিনের ভদ্রলোক, ব্যাপার টা মেনে নিতে পারছে না। দ্বীপকে দেখা মাত্রই উনি না করে দিবেন। আবার মনে হল, হয়ত উনি ভুলে গেছেন পুরোনো কথা। কোন তিন/চার মাস আগের কথা। মনে থাকে নাকি? তবে রিদিকে এই কথা জানাতে চায় না, এতে ওর মনের উপর চাপ পড়বে, পরীক্ষা খারাপ দিবে।

কিছুক্ষণ আগে ঠান্ডা মাথার মিজান সাহেব ছেলেকে কামরায় ডাকলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চেয়ে বললেন, ‘ চাকরি টা যেন কন্টিনিউ করে, ফুটবলে ক্যারিয়ার নেই। তফুরা খুব দ্রুত বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে। ‘

দ্বীপ কিছু বলার আগেই রাহেলা বললেন,’ আমি তাহলে আজকে থেকে কিছু আয়া আর খানসামা নিয়োগ দিই? বেতন কত দিবা জিহানের বাবা?’

বাবা এবং ছেলে রাহেলার দিকে চেয়ে রইল বিস্ময় নিয়ে। রাহেলা পুনরায় বলল, ‘ না মানে আমার তো ইদানীং কোমড়ের ব্যাথাটা বেড়েছে, ফযরের সময় শুইলে আর উঠতে পারিনা। অঞ্জু নাকি কঠিন ফুড চার্ট মেইনটেইন করে। সব সেদ্ধ খায়। ওর যত্ন করতে না পারলে তো ওর মা আমাকে উড়ানোর জন্য কামান বসাবে। ‘

দ্বীপের মেজাজ চটে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আম্মু আপনি কি অঞ্জুর কাজের লোক?’
রাহেলা হেসে বললেন,’ অঞ্জুর মায়ের তো ছিলাম। এছাড়া আমি ধরেই নিয়েছি অঞ্জু বউ হলে আমি ওকে আমার যত্ন,আদর টুকু দিতে পারব না ওর মায়ের জন্য। ‘

দ্বীপ উঠে গেল বসা থেকে। বলল, ‘আমি অঞ্জুকে বিয়ে করছি না। আপনার নতুন কাজের লোক রাখার প্রয়োজন হলে নিজের জন্য রাখুন, অঞ্জুর জন্য না । ‘

মিজান সাহেব দ্বীপের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘ তোমার মা কি ছোট জিহান? কি সব অবান্তর কথা বলে?’

রাহেলা ঠোঁটে মোচড় দিয়ে বললেন,’ ছোট বলেই তো ভুলবাল বুঝিয়ে আমার বাপের কাছ থেকে আমাকে তুলে নিয়ে আসছ। তোমাকে এই অপরাধের দায়ে জেলে দেয়া উচিত। কালকে লিমার মা বলেছিল, সামনের মাসে লিমার বিয়ে। ওর হবু শ্বশুর দেখতে নাকি তোমার মত। মনে হয় যেন জমজ ভাই তোমরা দুজন। কিন্তু ওই লোকের কয়েক ডজন বউ আছে, আর গাঞ্জার ব্যবসা করে। তাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে ধরার জন্য। সে পালিয়ে আছে এখন। জিহান, আমি ভাবছি ওই লোকের পরিবর্তে তোমার বাবাকে ঢুকিয়ে দিব।’

মিজান সাহেব চোখ রাঙিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। দ্বীপ মুখ টিপে মাথা নত করে হাসছে। গজ গজ করতে করতে মিজান সাহেব বললেন, ‘ ওই লোকের তো কয়েক ডজন বউ আছে, আমিও আগে কয়েক ডজন বানাই, এরপর জেলে দাও ।’

রাহেলা ভ্রু কুচকে বললেন, ‘ আনতে পারেন, এতে আপনাকে জেলে ঢুকাতে আমার সুবিধা হবে। সরাসরি নারী নির্যাতন মামলায় ঢুকিয়ে দিব। প্রথম বউয়ের হক আদায় না করে বহু বিবাহের অপরাধে।’

‘ কী হক আদায় করা বাকি রেখেছি তোমার?’
‘ মনে মনে বহু বিবাহের কথা ভেবেছ এতেই আমার হক নষ্ট হয়েছে।’

মিজান সাহেব রাগে কাঁপছে। দ্বীপ হাসতে হাসতে বাবার রুম থেকে বের হয়েছে। এই টুনাটুনির খুনসুটি লেগেই থাকবে। ড্রইং রুমে আসতেই মেজাজ বিগড়ে গেল। ফুফু তফুরা আগের কেচ্ছা শুরু করেছে। সরাসরি নিজের রুমে এসে দরজা আটকে দিল। ভাই বোন দরজা ধাক্কানোর সত্ত্বেও দরজা খোলেনি। ব্যাগ থেকে ওয়াটার পট বের করে পানি খেতেই মন ভালো হয়ে গেল। এই ওয়াটার পট টা রিদির কাছ থেকে সেবার ছিনতাই করে এনেছিল। সবসময় সাথে থাকে। মেয়েটা ভীষন অদ্ভুত। এই আদুরে বাহানা ধরে তো কিছুক্ষণের মাঝে নিজের মন মত সব না হলেই গাল ফুলিয়ে ফেলে। এইতো শেষ বার যখন দুজনের মাঝে সুন্দর আলাপ হল সেই সময় মেয়েটা প্রশ্ন করল,

‘ আচ্ছা দ্বীপ আমি যদি মরে যাই তুমি কী করবে?’

দ্বীপ ভীষণ বিরক্ত হয় এসব কথা শুনলে । মুখ কালো করে বলল, ‘ আজেবাজে কথা আমার পছন্দ না। মরবে কেন?’

‘ মানুষ মরণশীল। মরা তো স্বাভাবিক। ‘

‘ তাই বলে সারাক্ষণ মরব মরব করতে হবে নাকি?’

‘ তোমাকে যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দাও।’

‘ উফ! বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম প্রেমিকারা এসব বোকা বোকা আজব প্রশ্ন করে, আজ দেখছি আমার ক্ষেত্রেও সেই রকম হল। এই প্রশ্নের কি কোনো উত্তর আছে?’

রিদি গাল ফুলিয়ে ফেলল। দ্বীপ কপাল চাপড়ে বলল,

‘ আচ্ছা ঠিক আছে উত্তর দিচ্ছি। জানিনা ওই মুহুর্তে কেমন অনুভূতি হবে তবে তোমাকে ভীষন মিস করব।’

রিদি অগ্নিমূর্তির মত রূপ ধারণ করে বলল, ‘ এ আমি কাকে ভালোবাসলাম হে আল্লাহ! শুধু মিস করবে! এদিকে বিভূতিভূষণ বউ মরে যাওয়ার পর ডিপ্রেশনে পড়ে প্ল্যানচেট করে বউয়ের সাথে কথা বলতে চেয়েছে। আর আমার প্রেমিক নাকি মিস করবে শুধু।’

দ্বীপ তব্ধা খেয়ে বলল, ‘ তুমি তো আমার বউ এখনো হও নি। আর এখানে বিভূতিভূষণ আসলো কোথা থেকে?’

রিদি গর্জে উঠে উত্তর দিল, ‘ মানলাম বউ হই নি তাই বলে এভাবে বলবে? আর বিভূতিভূষণ এর কথা আসবে না কেন? উনি কত জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন। তার প্রেম তো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সে যদি বউকে এত ভালোবাসতে পারে তুমি কি করছো? ‘

দ্বীপ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছেনা। শান্তস্বরে বলল, ‘ আমি তো প্ল্যানচেট করতে পারিনা তুমি শিখিয়ে দিও।’

রিদি চোখ বড় করে বলল, ‘ তার মানে তুমি চাও আমি মরে যাই যাতে করে আরেকজনকে বিয়ে করতে পারো।’

দ্বীপের চিৎকার দিয়ে কাঁদতে মন চাইল। সে ডানে গেলেও দোষ, বামে গেলেও দোষ। মেয়ে মানুষের মন বুঝার চেয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করাও শ্রেয়। এতে শরীরের কাঁপুনি ছুটলেও সমস্যা নেই, সমাধান আছে। কাঁথা, কম্বল গায়ে দেয়া যায়। অসুখ হলেও সমাধান আছে। ঔষধ সেবন করা যায়। কিন্তু মেয়ে মানুষের রাগের কোনো সমাধান নেই। হাত জোড় করে মাফ চাইলেও এরা গলে না। লোহাও গলে যায় কিন্তু এরা গলে না। দ্বীপের অকস্মাৎ শান্ত হয়ে যাওয়াতে রিদি হেসে ফেলল। বলল, ‘ মজা করেছি রাগ করো না। তোমার মাঝে সাহিত্য রস নেই বললেই চলে। টেস্ট করলাম তোমাকে। আসলে তুমি একটু বলদ গোছের আছ। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে কতগুলো বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করত। এনিওয়ে একটু তো গল্প উপন্যাস পড়তে পারো।’

দ্বীপ বুকে হাত দিয়ে বলল, ‘ আরেকটু হলে দম আটকে যেত। যা শুরু করেছিলে। আমি এসব গল্প উপন্যাস বেশিক্ষন পড়তে পারিনা। মাথা গরম হয়ে যায়। জীবনে পড়েছিই তিনটা বই। তাও আবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে। অনেক কষ্টে, সময় কাটছিল না বলে। ‘

‘ কী কী?’

‘ দাঁড়াও মনে করি…হুমায়ুন আহমেদ এর দুইটা। মীরার গ্রামের বাড়ি আর সমুদ্র বিলাস না বৃষ্টি বিলাস কি যেন একটা। আর হলো, ইমদাদুল হক মিলনের মন।’

‘ মন পড়ে কী লাভ হল, আমার মন তো পড়তে পারো না।’

‘ কারো মনের কাহিনি এত সহজে বুঝা যায় না। অনেক বছর ঘর করলে পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটলে বুঝা যায়।’

‘ বাদ দাও। ‘মন’ উপন্যাসের কাহিনি কি?’

‘ মনে নেই। ভুলে গিয়েছি। আমাকে দিয়ে এসব হবে না। মনে থাকলে তো তোমাকে প্রতিদিন মজার মজার কথা বলে হাসাতাম। কথা খুঁজে পাই না বলেই তো শুধু বলি মন দিয়ে পড়, ভালো রেজাল্ট করো যাতে তোমার বাবা আমার কাছে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর কাছাকাছি থাকব। তখন কথা শিখিয়ে দিও।’

ধুমধাম দরজা ধাক্কানোর শব্দে ধ্যান ভাঙলো দ্বীপের। সখিনা বানু লাঠি দিয়ে দ্বীপের দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম। দ্বীপ দরজা খুলে দেখে দাদী আর ফুফু দাঁড়িয়ে আছে। আগেই বলেছিলাম সখিনা বানুর একমাত্র কাজ দ্বীপের দরজা ভাঙা।

__

রিদির এই নিয়ে কয়েকশো বার চুমু দেয়া শেষ কলমটা কে। দ্বীপের কাছ থেকে উপহার পাওয়া কলম দিয়ে আজ পরীক্ষা দিয়ে। পরীক্ষা আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে। মানুষ কত কি উপহার দেয় সঙ্গীকে। আর দ্বীপ দেখা হলেই উপহার দেয় ঘড়ি, কলম, সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর, জ্যামিতি বক্স। রিদি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘ একটু শাড়ি, চূড়িও তো দিতে পারো।’

দ্বীপ হেসে বলে, ‘ পারি তো, কিন্তু তোমার এখন এসব উপহার নেয়ার সময় নয়। ইউনিভার্সিটিতে উঠলে যখন বড় হবে তখন দিব। এছাড়া আমি শাড়ি দিলে ওটা মিরা বা প্রমার বাসায় রাখবে। তো দিয়ে লাভ কি? এরচেয়ে উপকারী জিনিস নাও। পরীক্ষার হলে এগুলো ব্যবহার করলে আমার ভাল লাগবে।’

এখন মনে হচ্ছে দ্বীপই ঠিক। আজকে পরীক্ষাটা খুব ভাল হল। মায়ের হাতের বিফ ভুনা খিচুড়ি ভালবাসে রিদি। মেয়ের পরীক্ষা তাই ভাল খাওয়াতে চাইলেন আমিনা। রাতে খিচুড়ি করলেন। মেয়েকে খাওয়ার টেবিলে ডাকছেন। রিদি বাবা আর মায়ের সাথে খেতে বসেছে। আজ হঠাৎ মা খাইয়ে দিতে চাইলে রিদি অবাক হল। জাবেদ সাহেব মেয়েকে বললেন পরীক্ষার সময় বেশি দুশ্চিন্তা না করতে, নতুন করে পড়ার কোনো দরকার নেই। খাবারের মাঝখানে জাবেদ সাহেব বললেন,

‘ রায়হান এত দিন যে পাত্রের কথা বলল সেটা নাকি গতকাল নিষেধ করে দিয়েছে। পাত্র এখনি বিয়ে করতে চাইছে। আমি রাজি হইনি। এখন মেয়ের পরীক্ষা, এখন কিসের বিয়ে? আমাদের তো এত তাড়া নেই।’

আমিনা মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে স্বামীকে বললেন, ‘ ভাল করেছ। তাড়াতাড়ির কাজ ভাল না। আস্তে-ধীরে নামতে হয় শুভ কাজে। এছাড়া মেয়ে মেডিকেল কলেজে উঠলে ভাল পাত্রের অভাব হবে না।’

জাবেদ সাহেব মাথা নাড়লেন। হঠাৎ রিদি বলল, ‘ আব্বু আমি যদি মেডিকেল না টিকি?’

আমিনা চোখ রাঙালেন। রিদি ভয় পেয়ে ঢোক গিলল। জাবেদ সাহেব বললেন, ‘ এইচএসসি টা দাও। রেজাল্ট কেমন হয় দেখো। তুমি তোমার সর্বোচ্চ দাও। আল্লাহ যদি রিজিকে না রাখে আমি, তোমার আম্মু আর তুমি জান দিলেও টিকবে না। কিন্তু তাই বলে হাল ছাড়বে না কেমন মা?’

রিদি বাবার কথা শুনে হাসি দিল। জাবেদ সাহেব মেয়ের চোখে মুখে আতঙ্ক দেখতে পেলেন যা উনার পছন্দ হয় নি। খেতে খেতে পুনরায় বললেন, ‘ তুমি যদি মেডিকেলে না ভর্তি হতে পারো কোনো অসুবিধা নেই। ভার্সিটিতে পড়বে। বাবার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। তুমি খুশি মনে পরীক্ষা দাও।’

রিদি খেয়ে পড়ার জন্য রুমে চলে আসল। রাহার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল মায়ের ফোন থেকে। রিদির এন্ড্রয়েড ফোনটার গ্লাস তো ফেটেই গিয়েছে। সেটার খোঁজ অবশ্য রিদি জানে না। ঘুমানোর সময় আমিনা আসলেন রিদির ঘরে। প্রশ্ন করলেন , ‘ ছেলেটার নাম কি?’

রিদি প্রথমে ভাবল মা কোন ছেলের কথা বলছে? মনে পড়ার পর বলল, ‘ পুরো নাম শাহদ্বীপ জিহান। বাসায় জিহান ডাকে। আমি দ্বীপ ডাকি।’

‘ কিসে পড়ে? ‘

‘ পড়াশোনা শেষ। জব করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে।’

‘ স্বভাব চরিত্র কেমন?’

‘ ভদ্র’

‘ ওকে ফোন দিয়ে বলো সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করতে। তোমার পরীক্ষা শেষে আমি ওর সাথে দেখা করব। তবুও আল্লাহর ওয়াস্তে পরীক্ষায় একটু ভালো ফলাফলের চেষ্টা করো। তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। ‘

রিদি চোখে মুখে বিস্ময়। দুই অধর আলগা হয়ে গেল। আমিনা ফোন খাটে রেখে চলে গেলেন। রিদি কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিল। এত গুলা মাস পর বিনা আতঙ্কে, বিনা সংকোচে দ্বীপের সাথে কথা বলবে সে!

__

এখন তফুরা শান্ত। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে সবার সাথে। কিছুক্ষণ আগে অঞ্জনা এসেছে। এসেই নিজের হাতে কেক বানিয়েছে। সেই কেক খাওয়ানোর জন্য সখিনা বানু নাতীর দরজা ভাঙছিল। সবার সাথে ডাইনিং এ এসে বসল দ্বীপ। অঞ্জনা এক পিস কেক পিরিচে তুলে দ্বীপকে দিল। খেতে ভালোই হয়েছে। এমন সময় রিদন বাইরে থেকে আসল। দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে অঞ্জনাকে দেখে বলল, ‘ কিরে ঢংগী কবে আসলি?’

অঞ্জনা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল, ‘ আসছি একটু আগে, কেক খাবি?’

অঞ্জনা আজ শাড়ি পরে এসেছে। দেখতে ভাল লাগলেও চেহারার কূটনামি ফুটে উঠেছে। রিদন হেসে বলল, ‘ ঢংগী ঢং করে, কুত্তার লগে প্রেম করে।’ সাজিনা কেক খেয়ে পানি খাচ্ছিল। ভাইয়ের মুখে এই কথা শুনে ভুশ করে পানি ছেড়ে দিল মুখ দিয়ে। রিদন নিজের পিস টা খেতে খেতে বলল,

‘ বাহ বাসার দ্বিতীয় কাজের বুয়া পাইছি। অঞ্জু তুই আমার বউরে মজার মজার রান্না করে খাওয়াবি, এরপর হাত পা টিপে দিবি। কি যেন মেনি কিউট, পেডি কিউট বলে না ওগুলা করে দিবি।’

সাজিনা হেসে ফেলল। বলল, ‘ ওটা ম্যানিকিউর, পেডিকিউর হবে।’

‘ ওই একই কথা, হাত ঠ্যাং কিউট হইলে মেনি কিউট, পেডি কিউট হবে। কিন্তু মেনি তো বিলাই রে কয়। অবশ্য মেয়ে মানুষ বিলাইয়ের মত কিউট। মানে ব্যতিক্রম ও আছে ডাইনির মত।’

এই কথাটা তফুরার দিকে তাকিয়ে বলল। পুনরায় চোখ ঘুরিয়ে অঞ্জনাকে বলল, ‘তাহলে অঞ্জু সেই কথাই রইল আমার বিলাইয়ের মত বউকে কিউট করে পেডিকিউট, মেনি কিউট করে দিবি।’

তফুরা গলার স্বরে ক্রোধ এনে বলল, ‘ তোর বউরে অঞ্জু কেন রান্না করে খাওয়াবে, ও কেন তোর বউয়ের হাত পা ডলবে?’

রিদন জবাবে বলল, ‘ ওম্মা তোমরাই তো কইলা অঞ্জুরে এই বাড়িতে বউ বানাইয়া আনবা। বউ মানেই তো কামের বুয়া যেমন টা তুমি আম্মুরে ভাবতা। ‘

‘ তোর বউ ও তো কামের বুয়া তাইলে।’

‘ আমি কোনো ফইন্নির মাইয়া বিয়া করমু না। ‘

‘ তুই কি আমারে ফইন্নি কইলি? তাইলে তো তোর আম্মাও ফইন্নি। ‘

রিদন হি হি করে হেসে বলে, ‘ যার মনে যা, ফাল দি উডে তা। তোমার নাম লইছি আমি? আম্মুরে তো তোমরা ফইন্নির মাইয়াই কইতা। আমার নানার অত টাকা পয়সা ছিল না। কিন্তু আত্মসম্মান ছিল। আসল ফইন্নি তো তোমরা। এখন যে সোফায় বইসা আছ এটাও আমার নানা দিছে। খাইছ ও তো আজীবন আমার নানার দেয়া প্লেটে। অথচ ঠিকই অত্যাচার করছ আম্মুরে। শুনো অঞ্জুরে বউ বানাইয়া পাঠাইলে অবশ্যই ফার্নিচার পাডাইবা। তোমার কাছ থেকে যৌতুক নেয়া ফরজ। সাথে আমারে একটা আর ওয়ান ফাইভ বাইক দিবা। ভাইরে মার্সিডিস। মাথায় থাকে যেন। নাহলে অঞ্জুরে প্রতিদিন চ্যালা কাঠ দিয়ে বাইরামু। ‘

তফুরা চেতে বলল, ‘ থাপড়ায় দিব বেয়াদব। অঞ্জুরে মারলে আমি চুপ করে থাকব তো?’

‘ আমি মারলে তো তোমার ইগো তে লাগব, তাই তোমার মায়েরে এক খিলি মহেশখালীর পান খাওয়ামু আর কমু তফুরারে বাইরান। তোমার মায় নাচতে নাচতে তোমারে বাইরাইয়া হাত ঠ্যাং ভাইঙ্গা ঝুলায় দেবে নে।’

দ্বীপ খুব জোরে ধমক দিল, ‘ রিদন, একদম চুপ। আমার চড় খেতে না চাইলে সামনে থেকে যা। আর ফুফু তুমি প্লিজ চুপ কর। সন্তানের বয়সী বাচ্চার সাথে ঝগড়া করে কী মজা পাও?’

‘ সব তোর মায়ের শিক্ষা…।’

ঘটনা খারাপের দিকে যাচ্ছে। অঞ্জনার পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। দ্বীপের জন্য সেজে এসেছে অথচ দুটো মিনিট দ্বীপের সাথে কথা বলতে পারছেনা মায়ের ঝগড়ার জন্য। মাকে ধমকে উঠল, ‘ আম্মু আর একটা কথাও না।’

তফুরা আর রিদন দুজনই চুপ হয়ে গেল। টেবিলের উপর কিছু কদম ফুল এবং কচুরিপানা ছিল। দেখে সুন্দর লাগছে। দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ এগুলো কে এনেছে?’

অঞ্জনা হেসে বলল, ‘ আমি সুন্দর না?’

দ্বীপ মাথা নেড়ে বলল, ‘ সুন্দর।’

রিদন সাথে সাথে প্রতিবাদ করল, ‘ ইছ কিয়ের সুন্দর, যত্ত সব গু মুতের ফুল।’

সাজিনা চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ কি বলিস এসব?’

রিদন বলল, ‘ ভুল কি বললাম, কচুরি পানা ডোবায় হয়। ওখানে সব মানুষের ইয়ে ফালায়। ইয়াক। আর কদম ফুল এগুলা শুকায় গেলে মুতের গন্ধ বের হবে। যে যেমন আনছেও তেমন ফুল। বাজারে এত ফুল থাকতে আনছে নিজের মস্তিষ্কের মত ফুল। খবিশ ছেমরি।’

দ্বীপ হাসি চাপিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে রিদন অঞ্জুকে অপমান করতে এসব বলছে। এদের ঝগড়া সামলাতে গেলে নিজের মুড নষ্ট হবে। ফোনে একটা কল আসল। বাঁচাল তাকে কলটা। রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে প্রিয় নারীর সালাম শুনতে পেল। চমকে উঠল। সকলকে উপেক্ষা করে উঠে চলে আসল নিজের কামরায়। দরজা দিয়েই প্রশ্ন করল, ‘ রিদিইই, কিভাবে ফোন দিয়েছ? তোমার আম্মু দেখলে…’

রিদি ফোনের ও পাশ থেকে খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ প্রিয়তম, আমাকে আম্মু ফোন দিয়ে বলল আপনার সাথে কথা বলতে।’

‘ মজা করছ?’

‘ একদম না সত্যি,সত্যি,তিন সত্যি। তার বিনিময়ে অবশ্য পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করতে হবে। আমিও কথা দিয়েছি ইনশাআল্লাহ ভালো করব।’

দ্বীপ খুশিতে প্রশ্ন করল, ‘ তার মানে আজ রাতে আমরা অনেক কথা বলতে পারব?’

‘ অবশ্যই।’

দ্বীপ চোখ বুজল। মনে হল স্বপ্ন দেখছে। বুক ধুকপুক করছে। রিদিকে বলল, ‘ এই মুহুর্তে আমার মন চাচ্ছে খুশিতে চিৎকার দিয়ে নিজের আনন্দ প্রকাশ করি। ‘

‘ আম্মু শর্ত দিয়েছে সরকারি চাকরি করতে হবে তোমাকে।’

চুপসে গেল দ্বীপের মুখ টা। তাই তো ভাবছে এত সহজে হবু শাশুড়ি ভালো হল কি করে? এখন সুনামি তার উপর দিয়ে বয়ে যাবে। দ্বীপের নিরবতা দেখে রিদি প্রশ্ন করল, ‘ কি হল? চেষ্টা করবে না?’

দ্বীপ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ জানো আমি মাস্টার্স পাস কেনো করেছি?’

‘ কেনো?’

‘ আমাদের বংশের সবাই শিক্ষিত, মাস্টার্স করেছে। মানে আব্বু,চাচ্চু,কাজিনরা। আমি যদি না করি আব্বুর মান সম্মান শেষ হয়ে যাবে তাই। পড়াশোনার প্রতি আমার কোনো আগ্রহই নেই। আর সেখানে আমাকে যদি কেউ বলে সরকারি চাকরির জন্য পড়তে ব্যাপার টা আমার কাছে আগুনের কুয়োয় ঝাপ দেয়ার মত হবে।’

রিদি বিস্মিত। তব্ধা খেয়ে মাথায় হাত দিয়েছে। খানিকবাদে দ্বীপ বলল, ‘ আচ্ছা দেখি, আমার এক বন্ধু সরকারি চাকরি করে তার কাছ থেকে হেল্প নিতে হবে। কিভাবে কি পড়তে হয়। কিন্তু আমি এই ব্যাপারে গ্যারান্টি দিতে পারছিনা। ‘

রিদি উত্তরে বলল, ‘ আমার জন্য তোমাকে নিজের শখ ছাড়তে হচ্ছে তাই না?’

দ্বীপ হেসে ফেলল। বলল, ‘ তোমার জন্য না, সুখের জন্য ।’

আচমকা রিদি বলল, ‘ একটা কথা বলি?’

‘ বল’

‘ জব তো করছোই। সরকারি চাকরি করতে হবে না।পাশাপাশি ফুটবল টা কন্টিনিউ করো। বাসা আমি ম্যানেজ করব।’

‘ আমি কোনো রিস্ক নিতে রাজি না। শেষ চেষ্টা করব। তোমার বাবা সম্পর্কে যা শুনেছি উনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল ও নড়েন না।’

বেশ কিছুক্ষন কথা বলল দুজন। সেদিন রাতটা বেশ সুন্দর কেটেছিল দুজনের।

পরদিন তফুরা অঞ্জনাকে নিয়ে চলে গেল মনে ক্ষোভ নিয়ে। দ্বীপ দুদিন বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেল। রিদির পরীক্ষা গুলো খুব ভালো হচ্ছিল। পরীক্ষার শেষ দিন বাসায় একা যাবে রিদি। আজ জাবেদ সাহেব এর ব্যবসায়ীক মিটিং আছে। বাসা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র কাছে হওয়াতে রিদি চলে যেতে পারবে জানাল বাবাকে। পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় লক্ষ্য করল রানা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিদি শুকনো ঢোক গিলল। মিরা আজ ওর স্বামীর সাথে যাবে বলেছিল। নিশ্চয়ই চলেও গিয়েছে।
দ্রুত রিকশায় উঠে গেল। বার বার লক্ষ্য করল রিকশাওয়ালা পেছনে তাকাচ্ছে। বুঝতে পারছে রানা হয়ত ফলো করছে। তবুও রিকশাওয়ালাকে রিদি প্রশ্ন করল, ‘ চাচা কোনো সমস্যা?’

রিকশাওয়ালা বলল, ‘ মা পিছনে একটা মটর সাইকেল আমাগো রিকশা রে ফলো করতাছে? এক্কেরে শুরু থেইকা।’

রিদির বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। কলেজ প্রাঙনে রানা বাড়াবাড়ি করে না। কিন্তু বাইরে যদি কিছু করে? পেছন থেকে কেউ একজন রিকশাওয়ালাকে ধমক দিল, ‘ এ্যই চাচা জোরে চালান, এমনে কেউ রিকশা চালায়? ‘

রিদি রিকশার পর্দা তুলল দেখার জন্য কে ধমক দিয়েছে? ধমক দেয়া মানুষটাকে দেখে চোখের মধ্যে বাল্ব জ্বলে উঠল। বিস্মিত হয়ে মুখে হাত দিল। রিদির রিকশা আগে চলে গেল। দ্বীপের রিকশা মাঝে। রানার বাইক পেছনে। রানা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে দ্বীপের রিকশাওয়ালার সাথে। ততক্ষনে রিদির রিকশা পাড়ার গলিতে চলে এসেছে। রানার বাইক ও চলে গেল।

রিদি বাসায় ঢুকেই হাপাচ্ছে। আমিনা ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল মেয়েকে এমন দেখে। শরবত খেতে দিল। রিদি রানার কাহিনি বলতেই আমিনা চমকে গিয়ে বলল, ‘ ছেলেটা এত বেয়াদপ হয়েছে?’

‘ আম্মু, রানা প্রায় এমন কাজ করত, আমি আমলে নি নাই। প্রতিদিন হেলমেট থাকে। আজ ছিল না বলে চিনতে পেরেছি।’

দ্বীপের আসার ব্যাপার টা রিদি লুকিয়েছে। নতুবা মা ভাববে হয়ত রিদির পরিকল্পনা ছিল দ্বীপের সাথে দেখা করার। আমিনা চিন্তায় পড়ে গেলেন। শুরু থেকেই তিনি রানার ব্যাপারটা তে দ্বিমত প্রকাশ করছেন। রাতে আসলে কথাটা জাবেদ সাহেবের কানে উঠাতে হবে।

__

দ্বীপ দোকানের সামনে থেকে বাসার জন্য কিছু ঔষধ কিনছিল। প্রায় এক মাস পর এসেছে বাড়ি। পেছন থেকে একটা মেয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। ভাল আছেন?’

চমকে উঠল। সালামের উত্তর নিয়ে মাথা নাড়ল। মেয়েটার কাঁধে স্কুল ব্যাগ ঝুলছে। দ্বীপকে বলল, ‘ আপনাকে দেখে ছুটে এসেছি। এই মাত্র আমার স্কুল ছুটি হয়েছে। ‘

দ্বীপের বিস্ময় কমছে না। সে কি এই মেয়েকে চেনে? মেয়েটা নিজ থেকে বলল, ‘ ভাইয়া আমি প্রমি। রিদনের বন্ধু?’

দ্বীপ বিস্মিত হলেও সামলে নিল নিজেকে। মাথা নেড়ে ভাবল এ কেমন বন্ধু রিদনের যে স্কুলে পড়ে। পরক্ষনে মনে হল হয়ত রিদির মত। দ্বীপ ঔষধের টাকা টা মিটিয়ে দিতেও প্রমি বলল, ‘ ভাইয়া আমি একটা চকলেট নিব।’

দ্বীপ মুচকি হাসল। দোকানদারকে বলল একটা চকলেট দিতে। প্রমি চকলেট টা দ্বীপেত সামনে খুলেই খাওয়া শুরু করল। দুজন একসাথে দোকান থেকে বের হল। প্রমি নিজ থেকে বলছে, ‘ আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। গার্লস স্কুলে। আপনি তো অনেক হ্যান্ডসাম। রিদন ঠিক বলে।’

দ্বীপ শুধু মাথা নাড়ছে। প্রমি চকলেট খেতে খেতে বলল, ‘ রিদনকে ফোন দিলে ও ফোন ধরে না কেন ভাইয়া? আমাকে বলেছে আপনি বিয়ে না করলে ওর বিয়ে হবে না। আপনি বিয়ে করছেন না কেন?’

দ্বীপ হতবিহ্বল হয়ে গেল। হাঁটা থামিয়ে বলল, ‘ তোমার বয়স কত?’

প্রমি হাতে গুনল কি যেন। এরপর দ্বীপকে বলল, ‘আমি রিদি ভাবী থেকে তিন বছরের ছোট।’

দ্বীপ বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মৃদু ধমকে বলল, ‘ বাসায় যাও। স্কুলের পর এতক্ষন বাইরে কি করো। তোমার বাবা মা দুশ্চিন্তা করে না? ‘

প্রমি ভয় পেয়ে গেল। ঢোক গিলে সরি বলে দিল দৌঁড়। এদিকে দ্বীপের মাথায় হাত। রিদির কথা তো মা ছাড়া বাসায় কেউ জানে না। মায়ের পেট থেকে কথাও বের হয় না। তবে কি রিদন তার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করছে? আশ্চর্য!

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৯

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
প্রচ্ছদ ক্রেডিট : Toukey Tahmida Khan Showmik
৯.
( কপি করা নিষেধ)
ফখরুল এখন আর রিদিকে পড়াতে আসে না। নতুন শিক্ষক রাখা হয়েছে। ফখরুলকে এই বাসা থেকে নিষেধ করা হয় নি, নিজ থেকেই বলল পড়াবে না। তবে যাওয়ার আগের দিন আমিনা এবং জাবেদ সাহেবের সামনেই রিদিকে ফাঁসিয়ে দেয়ার পরিকল্পনায় প্রশ্ন করেছিল, ‘ জিহান ভাই কে চেনো?’
রিদি প্রথমে বুঝে নি, পরে বুঝেও না বুঝার ভান করে বলল, ‘ চিনি না কে উনি?’

‘ তোমাকে পছন্দ করে, এসব ছেলে থেকে দূরে থাকবে। ভালো না ওরা। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে কিছু গ্যাং থাকে না যাদের কাজ সব নিজেদের আয়ত্তে রাখা। জিহান ভাই ওরকম একজন। কলেজের সাবেক ভিপি। ‘

রিদি বিরক্ত নিয়ে বলল, ‘ এমন কত ভিপি পেছনে ঘুরে। রানা ভাই ও কয়েকদিন ঘুরছিল। চেনেন তো? বর্তমান ভিপি।’

ফখরুল একপেশে হেসে বলল, ‘ রানা ভাই হচ্ছে মাছি বুঝছ? জিহান ভাইয়ের কাছে কিচ্ছু না। জিহান ভাই জায়গা না ছাড়লে রানা ভাই ভিপি হতে পারত না। জিহান ডেঞ্জারাস। উনি ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে ভাল করছে। নতুবা এতদিনে পাউডার হয়ে যাইত। এনামুল করিম কে চেনো?’

জাবেদ সাহেব প্রশ্ন করলেন এবার, ‘ আমাদের এমপি এনামুল করিম? ‘

‘ জি আংকেল। জিহান ওনার ডান হাত ছিল শুনছি। হঠাৎ করে নাকি রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে। কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা জানিনা।’

রিদির রাগে গা জ্বলে উঠল। বদমাশটা বাবার সামনে সব হড়বড় করে বলে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে কাটা কম্পাস দিয়ে চোখ দুটো তুলে ফেলতে আর হাতুড়ি দিয়ে গালের চাপা ভেঙে দিতে। এমনিতেই বাবা রাজনীতি করা ছেলে পছন্দ করে না, দ্বীপ সম্পর্কে এসব শুনলে তো শুরু থেকেই নেতিবাচক ধারণা জন্মাবে। অথচ দ্বীপ কত শান্ত থাকে। রিদি মুখের রাগী ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক করে বলল, ‘ এসব জিহান মিহান চিনে আমার কাজ নাই ৷ আমার ঘরে বাইরে সব দেখি বদমাশেরা ঘুরে। বাইরে রানা, বাসার নিচেও কত বখাটে। দেখলে মনে হয় কত ভদ্র। অথচ ভেতর টা নষ্ট। ‘

ফখরুলের কিছুটা সম্মানে লাগল। সে আরেকটু বাড়িয়ে বলল, ‘ আমি তো এমনি বললাম রিদি। এসব রানা জিহান এদের আগে পিছে মেয়েরা ঘুরে। কলেজের কত মেয়ে ওদের সেবা করে।’

জাবেদ সাহেব কাশি দিয়ে থামিয়ে দিলেন। বড্ড বেয়াদপ এই ছেলে। রিদি বাবার দিকে তাকিয়ে দেখল উনার ভাবমূর্তি বেশ জটিল। এত কিছুর পরও রিদি স্বাভাবিক। আমিনা মেয়ের দিকে তাকিয়ে কোনো ভাবান্তর দেখতে না পেয়ে ফখরুলকে বলল, ‘ মেয়ে যখন হয়েছে কত কি ঘটবে, কিছুদিন আগেও তোমার আংকেল দুজনকে বুঝিয়েছে। সমস্যা হলে তোমাকে জানাব।’

এতক্ষণ জাবেদ সাহেবের মুখের ভঙ্গি বোঝা যাচ্ছিল না। স্ত্রী কন্যার কথা শুনে ফখরুলকে বললেন, ‘ শোনো ফখরুল আমার দাদী বলতেন, বাড়ির সামনে বরই গাছ থাকলে ধনী-গরীব, ফকির-মিসকিন সবাই একবার ঢিল মারবেই। তো সেই ক্ষেত্রে মেয়ে যখন আছে কতজন পছন্দ অপছন্দ করবে। এসব নিয়ে ভাবলে হয় না। তুমিও তো ছেলে মানুষ। ওইসব ভাবলে তোমাকে সন্দেহের তালিকায় সবার আগে ফেলতে হবে। ‘

ফখরুল ঘাবড়ে গেল। মনে হল রিদির বাবা কথাটা ইচ্ছে করে বলেছেন। রিদি কি বাসায় কিছু জানিয়েছে? ফখরুল আর দেরি না করে বেরিয়ে গেল। জাবেদ সাহেব ফখরুল যাওয়ার পর বললেন, ‘ ছেলেটা সুবিধার না। ওর কাছ থেকে দূরে থাকবে মা।’

রিদি মাথা কাত করল। রুমে এসে কিছুক্ষন একা একাই নাচল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে দ্বীপ সম্ভবত কঠিন কিছু করেছে ফখরুল এর সাথে। নতুবা দ্বীপ সম্পর্কে এভাবে বলত না।

পরদিন থেকে নতুন শিক্ষক রাখা হল। বাসা প্রাইভেট করতে করতে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে । পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। রিদি পড়ায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু । আমিনার সাথে রিদি এখন কথা কম বলে। আগের মত ছটফটে স্বভাব হারিয়ে গিয়েছে রিদির। জাবেদ সাহেব আফসোস করে বলেন মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেছে। কিছুক্ষন আগে জাবেদ সাহেব এসে মেয়েকে বললেন আর বেশি না পড়তে। খেয়ে ঘুমিয়ে যেতে।

এক টানা পড়ে যাচ্ছে। আগামীকাল বাংলা প্রথম পত্র। পড়তে পড়তে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল। নিজের অজান্তে চোখ দুটো ভরে এলো। ভিজে গেল মাথা রাখা টেবিলের অংশ টুকু। আমিনা ফোন এনে দিল রিদিকে। মাকে দেখে ওড়না দিয়ে চোখ মুছে ফেলল। ফোন হাতে দিয়ে আমিনা বললেন,

‘ রাহা ফোন দিয়েছে কথা বলো।’

রিদি ফোন ধরে সালাম দিল। আমিনা কাজে চলে গেলেন। রাহা এবং রায়হান ওইপাশ থেকে টুকটাক কুশলাদি বিনিময় করল। ঠিকভাবে পরীক্ষা দিতে বলল, দুশ্চিন্তা না করতে বলল। সবশেষে রাহা বলল,

‘ লাইনে থাক , একজনকে এড করি।’

রিদি চুপ করে আছে। ঠিক সেই মুহুর্তে ওই পাশে থাকা প্রিয় মানুষ টা সালাম দিল। বুক কেঁপে উঠল রিদির। রাহা সতর্ক করল,

‘ তুই চুপচাপ শুনবি রিদি, ভাইয়া কথা বলুক। আম্মু টের পেলে আমাকেও গিলে ফেলবে। ‘

রায়হান বলল, ‘ রিদি পাখি, আমাকে ধন্যবাদটা আগে দিয়ে দে। তোর বোনকে আমি রাজি করিয়েছি। ‘

রিদির গলা কাঁপছে৷ কম্পিত গলায় ধন্যবাদ দিল। দ্বীপ ও পাশ থেকে বলল, ‘ আশা করি ভাল আছ। আবেগী কথা বলার সময় এখন না। পরীক্ষার জন্য অনেক শুভকামনা। ফলাফল ভালো কর। এরপর যা বলবে সব শুনব। রাহার কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। প্র্যাক্টিকেল পরীক্ষার সময় আমি দেখা করব কলেজে। আজ রাখি। ভালো থেকো।’

দ্বীপ কল কেটে দিল। রাহা বোনকে মন দিয়ে পড়তে বলে ফোন রাখল। রিদির ঠোঁটের কোণে হাসি। নতুন উদ্যমে পড়া শুরু করল। রাহাকে মেসেজ দিয়েছিল দ্বীপ যাতে রিদির কাছে নিজের কথাগুলো পৌঁছাতে পারে। দ্বীপের কনভিন্স করার কৌশলে আটকা পড়ে গেল রাহা এবং রায়হান। তাদের দুজনেরই দ্বীপকে পছন্দ হয়েছে। রায়হান তো বলেই বসল,’ ভদ্রলোকের সাহস আছে।’

___

৩রা এপ্রিল, ২০১৬

রিদি আজ নিজ থেকে মায়ের সাথে কথা বলছে। আমিনা ফজরের সালাত আদায় করে আর ঘুমায় নি। মেয়ের জন্য নাস্তা বানিয়েছেন। নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছেন। জাবেদ সাহেব মেয়ের ফাইল ব্যাগ টা চেক করে দেখলেন এডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ড সব ঠিকঠাক মত নিয়েছে কিনা। বের হওয়ার সময় বাবা মা দুজনকে সালাম করল রিদি৷ প্রচন্ড নার্ভাস। পুরো রাস্তা দোয়া পড়ে এসেছে। কেন্দ্রের সামনে রিকশা দাঁড়াতেই রিদি এ পাশ, ও পাশ তাকিয়ে দ্বীপকে খুঁজছে। ওর মন বলল দ্বীপ আসবে। জাবেদ সাহেব তাড়া দিলেন। দ্বীপ আসবে না এই কথা রিদি জেনেও আশা করেছিল। অবশ্য এই ভিড়ে এসেও লাভ নেই। জাবেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘ পরীক্ষা ঠান্ডা মাথায় দিবে। কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় রাখবে না। তুমি যা চাও বাবা তাই দিব, কিন্তু মন ভাল করে পরীক্ষা দিবে। উত্তর রেখে আসবে না।’

রিদি মাথা কাত করে সায় দিল বাবার কথায়। রিদি পরীক্ষার কেন্দ্রে ঢুকে যেতেই দ্বীপ আড়াল থেকে বের হয়ে কিঞ্চিৎ হাসল। এখন দেখা হলে অতি উত্তেজনায় পরীক্ষা খারাপ দিত।

__

বড় ছেলেকে পেয়ে রাহেলার আজ ঈদ লেগেছে। সাজিনা বেড়াতে এসেছে গতকাল। অন্যদিকে রিদনের সেমিস্টার ব্রেক চলছে। তিন সন্তানকে কাছে পেয়ে তার খুশির অন্তঃ নেই। সবার প্রিয় খাবার রান্না করতে ব্যস্ত। সাদা পোলাও, রোস্ট দ্বীপের প্রিয় খাবার। সাজিনার পছন্দ খাসীর রেজালা আর রিদন ভালোবাসে চিকেন ফ্রাই। হরদম রান্নার প্রস্তুতি চলছে। সখিনা বানু নাতীর পাশে বসে নাতীর হাতে একশো টাকার নোট গুজে দিয়ে বলল,

‘ ভাই মায়েরে কইও না। তুমি এইডা দিয়া চকলেট খাইও। ‘

দ্বীপ মুচকি হেসে দাদীকে বলল, ‘ আচ্ছা। তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করো?’

দ্বীপকে এখনও সখিনা বানু ছোটবেলার দ্বীপ ভাবে। দাদীর এই ব্যাপারটা সে অনেক উপভোগ করে। রিদন বা সাজিনা কখনও-ই দাদীর কাছ থেকে এভাবে আদর পায় নি। তাই দাদীর প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও মায়া তুলনামূলক কম কাজ করে।

সখিনা বানু আফসোস করে বলল, ‘ হ রে ভাই, আমাগো গেরামে কত মাইয়া নাগরের লগে ভাগছে। কিন্তু বেশিদিন হেই সংসারডাও টিকে নাই।

দাদীর আবার মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাজিনা কপাল চাপড়ে বলল, ‘ ভাইয়া এবার তুমি সহ্য কর। কি থেকে কি বলে নিজেও বুঝে না। ‘

দ্বীপ হাসলো ইষৎ। সখিনা বানু পুনরায় বললেন, ‘ আমার বড় পুতেরে চেনো? হের নাম মিজান।’

দ্বীপ দু পাশে মাথা নেড়ে দাদীর কথা আগ্রহ ভরে শুনছে। সখিনা বানু পান চিবাতে চিবাতে বলল,

‘ মিজান যে রাহেলা রে বিয়া করছে, ওই বিয়াতে আমি মত দিই নাই তো। রাহেলা সুন্দর ছিল। ওর দেমাগ বেশি। হে ফরসা, আমাগো মইধ্যে তো কেউ এরম ফরসা কেউ ছিল না। ওর রূপ দিয়া ভুলায় রাখত মিজানরে। মিজান খালি ওর আঁচল ধইরা ঘুরত। পত্থম দিকে তো রাহেলা রে মুখে তুইলা খাওয়াই দিত। একদিন বকছি। এরপর থেইকা আমার সামনে খাওয়ায় না। হুনো নাতী বউরে এত মাথাত তোলন ভালা না। বউ থাকে পায়ের তলে, বুঝলা। ‘

দ্বীপ ক্ষীণ দৃষ্টিতে দাদীর দিকে তাকিয়ে আছে। এটা যে দাদীর বানানো কত নম্বর গল্প তার জানা নেই। রিদন চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘ শুনো বুড়ি, তোমারে আমি আমার বউয়ের কামের বেডি বানামু। যা করছ আমার মায়ের লগে, সব মনে রাখছি। ‘

রাহেলা রান্নাঘর থেকে নাস্তা হাতে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করছিল। রিদনকে এসব বলতে দেখে ধমকালেন। সাজিনা দাদীর কথা শুনে বলল, ‘ এই কারণেই তো তোমার বাকি দুই পুতের বউ ঠেঙ্গায় বাইর করছে তোমারে।’

দ্বীপ বোনকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল, ‘ কাকে কি বলছিস? কিছু শুনে, না বুঝে? উলটো তোকে ঠোঁট নাড়তে দেখে নতুন কিচ্ছা আওড়াবে। মাথায় যা আসছে তাই বলছে৷ ধরিস কেন এসব কথা? বয়স হয়েছে না। শ্রদ্ধাবোধ কি কমে যাচ্ছে তোদের? ‘

রিদন মাকে প্রশ্ন করল, ‘ আম্মু, আব্বু নাকি আপনার আঁচল ধরে ঘুরত?’

রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে বলল, ‘ কোনদিন?’

‘ দাদী-ই না বলল।’

‘ তোর দাদায় তোর দাদীর আঁচল ধইরা ঘুরত। এই কারণে আমার দাদী শাশুড়ী তোর দাদারে লাঠি দিয়া পিডাইছিল। দাদী শাশুড়ী জল্লাদ মহিলা ছিল এ কথা তো জানিস-ই। তোর দাদীর উপর অনেক অত্যাচার করছে। অবশ্য তোর দাদীও করছে আমার উপর তবে আমার দাদী শাশুড়ীর তুলনায় কম করছে। তোর দাদী তো হুঁশ আসলেই আমাকে বলে, বউ আমারে মাফ কইরা দিও। কিন্তু আমার দাদী শাশুড়ী মরতে মরতে ও তোর দাদীরে অভিশাপ দিয়ে মরেছে। উনার ভয়ে কেউ কথাও বলত না। ঝগড়া করার সময় হুঁশে থাকত না। হাঁটুর উপর কাপড় তুলে পাগলা নাচ নেচে নেচে ঝগড়া করত। তখন দেখলে মনে হত একটা রাক্ষসী। ‘

সাজিনা বলল, ‘ দাদী মনে হয় শাশুড়ী কে ভুলে নাই, তাই সেই গল্প নিজের উপর দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে।’

সখিনা বানু আবার শুরু করলেন, ‘ আমাগো বাড়িতে একটা কুত্তা পালত আমার শ্বশুর। একবার কুত্তার পেডে বাচ্চা আইছিল, বাচ্চা হওনের পরে দেখি কুত্তার পেডে বিলাইর বাচ্চা…’

দ্বীপ সাজিনাকে সজোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘ যা দাদীরে রুমে নিয়ে যা। আর কতক্ষন এসব বলতে দিলে মানুষের পেডে হাতির বাচ্চা হইছে কইব। কই পায় এসব আজগুবি কাহিনি আল্লাহ জানে।’

রিদন ঠোঁট উলটে বলল, ‘ ভাই এত দিন ঘর টা ছিল পাগলাগারদ, এখন হচ্ছে চিড়িয়াখানা। ‘

__

দুপুর একটার আগেই জাবেদ সাহেব মেয়ের জন্য কেন্দ্রের গেইটে দাঁড়িয়ে আছেন। রিদি ঠেলাঠেলি করে বের হল। মেয়েকে দেখে জাবেদ সাহেব হাত তুললেন। ভিড়ের মাঝে বাবাকে পেয়ে ছুটে এলো রিদি।

রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে রিদির হাতে এক বোতল জুস দিয়ে বললেন, ‘ আগে এটা খাও মা। ‘

রিদি জুস খেতে ব্যস্ত। জাবেদ সাহেব প্রশ্ন দেখছেন। কিন্তু মেয়েকে একটি বার ও জিজ্ঞেস করেন নি পরীক্ষা কেমন হয়েছে? তার ভাষ্যমতে পরীক্ষা যা দেয়ার দিয়েছে। এখন এই প্রশ্ন করা অবান্তর৷ জুস খেতে খেতে রিদি নিজেই বলল, ‘ আব্বু দুটো নৈর্ব্যক্তিক ভুল হয়েছে। বাকি গুলো মনে হয় হয়েছে। ‘

জাবেদ সাহেব হেসে বললেন, ‘ সমস্যা নেই বাবা, যা হওয়ার হয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও কেমন।’

রিদি মাথা কাত ঘাড় ঘুরাতেই চমকে গেল। দম আটকে আসার উপক্রম। খানিক দূরত্বে দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপের ঠোঁটের কোণে হাসি। চোখ দিয়ে ইশারা করল প্রশ্নের দিকে। রিদি দু চোখের পলক ঝাপটে বুঝাল, পরীক্ষা ভাল হয়েছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে নিয়ে রিকশায় উঠলেন। যতক্ষন রিকশা দেখা যাচ্ছে ততক্ষন তাকিয়ে ছিল দ্বীপ। রিদির প্রথম পরীক্ষা দ্বীপ আসবে না তা কি করে হয়? সেই সাথে সবচেয়ে খারাপ আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। সকালে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে নি কিন্তু এখন রিদির সাথে তার বাবাকে দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা। সেদিন রিকশার উপর বসা ভদ্রলোকই রিদির বাবা যিনি দ্বীপকে পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে শাসিয়েছিলেন। তিনি যদি ঘুনাক্ষরে ও টের পান সেই অসভ্য, অভদ্র ছেলেটার সাথে তার মেয়ে একটা সম্পর্কে জড়িয়েছে , মেয়েকে কেটে সম্ভবত মেঘনায় ভাসিয়ে দিবেন ।

___

অনেক দিন পর রিদিকে দেখে মন ভালো আবার মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা। বিকেলে একটা টুর্নামেন্ট আছে। বন্ধুরা সবাই থাকবে। কথা দিয়েছিল খেলবে, বারণ করতে পারে নি। হয়ত আজই শেষ খেলা। অফিস থেকে দুদিনের ছুটি নিয়েছে। জার্সি পরে তৈরি হয়ে নিল। বের হওয়ার সময় ফুফু তফুরা এসে হাজির। অঞ্জুকে সাথে আনেনি, কিছুক্ষন পর আসবে বলল । দ্বীপ সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেল। নতুন কোনো কাহিনি করতে হয়ত হাজির হয়েছে ফুফু। ফুফু তফুরার ধারণা দ্বীপ যদি অঞ্জুকে বিয়ে করে তবে অঞ্জু রানী হয়ে থাকবে। গত বছর মিজান সাহেব তার তিন বোনকেই নিজেদের হকের টাকা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এতেও লোভ কমে না তফুরার। মিজান সাহেবের বাবা দ্বীপের নামে গ্রামের একটা দিঘী লিখে দিয়েছেন। সেই দিঘীর প্রতি লোভ সবার। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলতে পারেন না। এছাড়া আরও একটা কারণ আছে অঞ্জুকে এই বাড়িতে বিয়ে দেবার। রাহেলা খানমকে তফুরা অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় বান্দা ভাবে। কারণ তিনি সবসময় চুপচাপ থাকেন। এতে তফুরার সুবিধা, মেয়ের উপর অহেতুক অত্যাচার করার সুযোগ নেই। তখন তফুরা ভাইয়ের বাড়িতে এসে থাকতে পারবে৷ শুনেছে বাপের বাড়ির হক নিয়ে গেলে ভাইয়েরা আর বাড়িতে জায়গা দেয় না।

ইদানীং রাহেলা খানম তফুরাকে এড়িয়ে চলে এটা তফুরা বেশ খেয়াল করেছে। ঘরে ঢুকেই বলল, ‘ ভাবী এক কাপ চা দিও।’

মনে হয় যেন রাহেলা তার কাজের বুয়া। সাজিনা বিকেলের নাস্তা ভাজছিল। ফুফুকে মায়ের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে মুখের উপর জবাব দিল, ‘ ফুফু কেবল আসছেন, বিশ্রাম নেন আগে। চা সময় মত পাবেন। আম্মুর শরীর ভালো না। কিছুক্ষন পর বুয়া আসলে চা পাঠাচ্ছি।’

তফুরা চমকে গিয়ে বলল, ‘ বিয়ার পর তো দেখি তোর মুখ ফুটছে৷ ‘

সাজিনা ফ্রিজ থেকে দই বের করতে করতে বলল, ‘ কি আর করব আম্মুর মত শাশুড়ী আর ননদের অত্যাচার সহ্য হয় না। সেদিন স্বামীকে বলেছি তোমার বোনটা আমার সাথে ঝগড়া লাগতে আসলে আমি কিন্তু থাপ্পড় দিব। আলহামদুলিল্লাহ আমার স্বামী আব্বুর মত বোকা না, বলেছে শুধু থাপ্পড় না, প্রয়োজনে যে মুখ দিয়ে বড় ভাবীকে অসম্মান করে ওই মুখের জিব কেটে দিও। ভেবে দেখেন এমন স্বামী সহজে পাওয়া যায়? মাশা আল্লাহ, কারো নজর না লাগুক। তবে আমার ননদ ও আলহামদুলিল্লাহ ভাল। জবান কম চলে।’

তফুরা গজ গজ করতে করতে বলল, ‘ তোর মা র উপর কে অত্যাচার করছে?’

পাশের রুমে রিদন ছিল। ঘুমাতে পারছেনা এদের চেঁচামেচির জন্য। শোয়া থেকে উঠে এসে জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল, ‘ কিরে আপু বস্তি হয়ে গেল বাসাটা। কে আসছে বাসায়?’

তফুরা বড় বড় চোখ করে বলল, ‘ তুই আমারে বস্তি বললি?’

রাহেলা ছেলে মেয়েদের ধমক দিতে দিতে তফুরাকে বলল, ‘ তুমি আম্মার কাছে যাও তফুরা। ওরা তো ঝগড়া করে জানোই তুমি। এত গায়ে মাখিও না এসব কথা। ‘

সাজিনা আর রিদনকে চোখ রাঙালেন রাহেলা। পেছন থেকে সাজিনা আর রিদন হাই ফাইভ দিয়ে হাসতে লাগল। রিদন বলল, ‘ আপু, অঞ্জুর সাথে ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হলে আগুন লাগিয়ে দিব ঘরে। ‘

সাজিনা হেসে বলল, ‘ হবে না, ভাইয়ার ‘ম্যাডাম’ আছে।’
রিদন চমকে বলল,’ ম্যাডাম মানে?’

‘ ম্যাডাম মানে আমাদের হবু ভাবী।’

‘ ভাইয়া আর হবু ভাবী? কি বলো এসব? কেমনে সম্ভব? ভাইয়া প্রেম করে? আমার সন্দেহ হয়েছিল কিন্তু বিশ্বাস হয় নি?’

‘ আমার ও হয়নি। কিন্তু ফোন কলে দেখেছি। সত্যতা কতটুকু জানিনা।’

রিদন হঠাৎ করে হো হো করে হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে পড়ল। সাজিনা রিদনের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘ এমন করিস কেন? হাসি থামা। ভাইয়া জানলে রাগ করবে। ভাইয়ার কি প্রেম করার অধিকার নেই নাকি?’

রিদন পেট ধরে হাসি থামিয়ে বলল, ‘ আচ্ছা আর হাসব না। আমি শুধু ভাবছি ভাইয়া প্রেম নিবেদন কিভাবে করেছে? ভাইয়া তো সব কথা সরাসরি বলে, রোমান্টিকতার র ও দেখা যায় না। দাঁড়াও অভিনয় করে দেখাই, ‘ও গো সুন্দরী আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ আমাকে এক্সেপ্ট করো। না হলে বাসার হারপিক খেয়ে মরে যাব।’
‘ ছিহ! এত কিছু থাকতে হারপিক কেন?’
‘ শুনছি প্রেমে পাগলা হলে হারপিক খায়।’

সাজিনা ভাইয়ের চুল টেনে দিয়ে বলল, ‘ তুই আমাকে ফাঁসাবি রিদন। আস্তে কথা বল। ‘

ভেতর থেকে মিজান সাহেবের ডাক এলো। দুই ভাই বোন ছুটে গেল। রিদনের ঠোঁটে এখনও হাসি। তার মতে তার বড় ভাই অনুভূতি প্রকাশে ঘোড়ার আন্ডা। মাকে বলতে শুনেছিল, ছোটবেলায় একবার এক মেয়ে জিহানকে বলেছে জিহান তুমি খুব সুন্দর, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তখন জিহান ক্লাস টু তে পড়ত।এই কথা বাসায় এসে মাকে বলেছিল। এরপর জিহান তিনদিন স্কুলে যায়নি যদি মেয়েটা তাকে ছেলেধরা সেজে নিয়ে যায়। কারণ সে মেয়েটাকে ভালোবাসে না। মেয়েটা দাঁত দিয়ে কলমের ক্যাপ কামড়ায়। থুতু দিয়ে পেন্সিলের দাগ মুছে খাতা থেকে। স্কেল দিয়ে জিহানের হাতে মারে। জিহানের টিফিন খেয়ে ফেলে। আর রেগে গেলে কামড় দেয় । সেই থেকে জিহানের মনে আতঙ্ক ঢুকে গিয়েছে মেয়েরা রেগে গেলে কামড় দেয়।

রান্নাঘরে এসে সাজিনা চা বানাচ্ছে তফুরার জন্য। রিদন বলল, ‘ সরো, আমার ফুফু চা খাবে না। শরবত বানিয়ে দিই। ‘

সাজিনা ভ্রু কুচকে ভাইকে দেখছে। রিদন কোথায় থেকে যেন দুই প্যাকেট ট্যাং এর গুড়া বের করে সেগুলো পানিতে দিয়ে বেশি করে চিনি, লবন,বিট লবন দিয়ে শরবত বানাল। সাজিনা বলল, ‘ ফুফুর জন্য এত প্রেম?’

‘ একটা মাত্র জল্লাদি বাসায় আসে, তারেও যদি আপ্যায়ন না করি কেমনে হবে বলো? বাকি দুই জল্লাদি তো আসে না।’

সাজিনা রিদনের পেছনে এলো। তফুরা ভাতিজা- র হাতে শরবতের গ্লাস দেখে বলল, ‘ ওমা রে মা, আমার ভাই পুতটা কত কষ্ট করে বানায় আনছে।’

ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত খেয়ে কলিজা জুড়িয়ে গেল তফুরার। কত কত দোয়া দিল। রিদনের ঠোঁটে হাসি। রাহেলা রিদন কে প্রশ্ন করল, ‘ ট্যাং তো শেষ, কখন নিয়ে আসছ?’

‘ আনিনি তো, কিচেনে পেয়েছি। ‘

রাহেলা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, ‘ কিচেনের তাকের উপর ছিল যে ওই দুই প্যাকেট ? ‘

‘ হ্যাঁ ‘

‘ আরেহ ওগুলার তো মেয়াদ নাই।’

সাজিনার মুখে হাত। রিদন কাজটা ইচ্ছাকৃত করেছে। এদিকে রিদন মেকি অভিনয় করে দুহাতে মুখ ঢাকল। তফুরা আহাজারিতে উপর তলার আশপাশের লোকজন ছুটে আসার উপক্রম।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৮

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৮.

বর্তমান প্রেক্ষাপট,

হোটেল হাইওয়ে ইন, কুমিল্লা

গাড়ি থামল। শাহদ্বীপ গাড়ি থেকে নেমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল। খ্যাতির বিড়ম্বনা জীবনকে তেজপাতা বানিয়ে দেয়, এটি সে প্রতিনিয়তই টের পাচ্ছে। ওয়াশরুমে এসেও শান্তি নেই। হোটেল কতৃপক্ষ ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল বিখ্যাত ফুটবল প্লেয়ার শাহদ্বীপ জিহান এসেছে। আপ্যায়নের জন্য অস্থির হয়ে উঠল।

সেলফি তুলতে ব্যস্ত তার ভক্তকুল। তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ওয়াশরুম সেরে আসল। বেসিনে হাত ধুতে ধুতে ছবি তুলছে। মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে ভিড় ঠেলে কোনো রকম বের হয়ে আসল। মাসুদ তার নির্দেশে আগে থেকেই কিছু হালকা খাবার কিনে নিয়েছে। এখানে বসে খাওয়ার অবস্থান নেই। হোটেলের বাইরে গ্লাসের ভেতর রসমালাই দেখা যাচ্ছে। রসমালাইয়ের কথা ভাবতেই স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠেছে দূরন্ত বালিকার স্নেহ মাখা মুখটা। আদুরে সব আবদারে জড়ানো স্বর,

‘ দ্বীপ জানো আমার প্রিয় ডেজার্ট কী? অবশ্য জানবে কিভাবে আমি তো বলিই নিই। আমি রসমালাই খেতে প্রচন্ড ভালবাসি৷ আমাদের যখন বিয়ে হবে, তখন তুমি আমাকে সপ্তাহে দুদিন রসমালাই খাওয়াবে। দুদিন খেলে পরেরবার খাওয়ার ইচ্ছে থাকবে, দুদিনের বেশি খেলে থাকবে না।’

রিদির কথা ভাবতে ভাবতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। খুব জোরে হোঁচট খেল। কয়েক সেকেন্ড থমকে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মাসুদ গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। গাড়িতে বসতেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে রিদনের নাম ভেসে উঠল। রিদন ভাইয়ের লোকেশন জানতে চাচ্ছে। সঠিক লোকেশন বলতেই রিদন অনুরোধ করে বলল, ‘ ভাইয়া রাগের মাথায় কিছু করো না। ভাবীকে একটা সুযোগ দাও। অতীত ভুলে যেতে বলো আমাকে, অথচ নিজে অতীত মনে করে সুন্দর একটা সম্পর্ক শেষ করতে যাচ্ছ। এসব কি ঠিক? ‘

বেশ ভারী, শক্তগলায় বলল দ্বীপ, ‘ মাই লাইফ, মাই হেডেক। ডোন্ট ইন্টারফেয়ার।’

ফোন কেটে দিল। গাড়ির সিটে নীল ফাইলটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। ওই ফাইলের ভেতর কি আছে জানেন? জীবনের হিসেব নিকেষ, সম্পর্কের ভাঙা গড়া, কিছু ডকুমেন্টস আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেপার। কলমের খোঁচায় সই হলেই দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর, নিকটতম প্রিয় সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটবে। মাসুদ বেশ কয়েকবার খাবার সাধল। দ্বীপ এক ঢোক পানি গিলে গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে আছে। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। গাড়ির গ্লাসে বিন্দু বিন্দু জল। সে জল গ্লাস বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। গ্লাসের জলধারণ ক্ষমতা শূন্য। দ্বীপের নিজের জীবনটাকেও শূন্য মনে হয়। বাইরে থেকে মনে হয় দ্বীপের সব আছে ; নাম, যশ, খ্যাতি। ভেতরের খবর উপর ওয়ালা ছাড়া কেউ জানেন না। মাসুদকে বলল, ‘ মাসুদ আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। লো ভলিউমে একটা সফট মিউজিক দাও। ঢাকা পৌঁছে গেলে আমাকে জানাবে।’

‘ জি স্যার। ‘

মাসুদ গান ছাড়ল। এই গানটা কানে আসতেই দ্বীপ চট করে কেবল বন্ধ করা চোখ খুলে ঢোক গিলল। আয়নাবাজি সিনেমার বেশ জনপ্রিয় গান,

‘ ধীরে ধীরে যাও না সময়, আরও ধীর বও। আর একটু ক্ষণ রও না সময়, একটু পরে যাও।’

গান টা রিদির প্রিয়৷ নাকের পাটাতন ফুলে উঠেছে দ্বীপের। গাড়ির ভেতর লাইট বন্ধ। চোখের উপর হাত রাখল দ্বীপ। দু চোখ বেয়ে অবিরত বর্ষন। রিদি দেখলে নিশ্চিত বলত,’ এত বড় ছেলে কাঁদলে কেমন পঁচা দেখায়, তুমি কেঁদো না দ্বীপ আমার কষ্ট হয়।’

দ্বীপ পুনরায় ডুব দিল পুরনো ভাবনায়,

১১ই মার্চ, ২০১৬

ক্লান্ত শরীর নিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। মাথার উপর ফ্যানটা ঘুরছে। মেসে দ্বীপ একা এখন। বাকি মেম্বার রা আসেনি। কারো অফিস, কারো ইউনিভার্সিটি। যে যার যার কাজে ব্যস্ত। মাথার উপর ফ্যান টা ঘ্যাটর ঘ্যাটর করছে। ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। মাইগ্রেনের ব্যাথাটা ইদানীং বাড়ছে। অফিসে হেঁটে যায়, হেঁটে আসে। খুব সকালে বেরিয়ে যায়। ফযরের নামায পড়ে আর ঘুমায় না। বেতনের অঙ্ক টাও খুব সামান্য। ব্যবসা করলে হয়ত কিছুটা আরাম পেত, নিজের মর্জি মত চলা যেত কিন্তু চাকরিতে অসম্ভব। ভেবেছিল বাবার জায়গা টা বিক্রি করে ব্যবসায় মনোযোগ দিবে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ওইটা যদি বিক্রি করে বাকি ভাইবোন দুটোকে ঠকানো হবে। অন্যদিকে রিদির পরিবার তো কখনও মেনেই নিবে না।

চাকরি তার কপালে ছিল। গাধার খাটুনি খেটে, অফিসের বসের গালি গালাজ সহ্য করা কি চাট্টিখানি কথা। যেখানে বাসায় মা কখনও বেয়াদব পর্যন্ত বলে নি সেখানে অফিসে বস মাঝে মাঝে মা বাপ তুলে গালি দেয়। রাগ উঠে যায়। এমডি কে অভিযোগ করার পর টিম পালটে দিয়ে নতুন বসের আন্ডারে দিয়েছে। এই বস বাবা মাকে গালি না দিলেও তার মুখের ভাষা যে খুব একটা ভাল এমন নয়। পরের চাকর গিরী করলে গালি খেতেই হবে। এটাই ভবিতব্য। যার জন্য এত এত কষ্ট ওই মানুষটাকে গত কয়েক মাস চোখের দেখাও দেখার সুযোগ হয় নি। মাঝে মাঝে মনে হয় শূন্যের উপর একটা সম্পর্ক ভাসছে। দমকা হাওয়া এলে উড়ে যাবে। রিদির অনুভূতি আপেক্ষিক। কখনও গাঢ় তো কখনও হালকা। কিন্তু দ্বীপের অনুভূতি তো ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। দিন যত যাচ্ছে মনে হচ্ছে রিদি তার রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। এই অনুভূতি তাকে সারা টা জীবন ভোগাবে। প্রতিদিন ভাবে রিদির চিন্তা মাথায় আনবেনা, ভবিষ্যতে যা হওয়ার হবে। ভাগ্যে থাকলে রিদি তার হবে , না থাকলে অন্য কারো। যখনই ভাবে রিদি অন্য কারো হবে তখন মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

__

মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে রিদির। বাসার শিক্ষক যাওয়ার পর থেকে পড়ার টেবিলে বসে আছে। পড়া মাথায় ঢুকছে না। মা এসে কয়েক বার জিজ্ঞেস করেছে নাস্তার কথা। দ্বীপের সাথে দেখা হওয়ার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়েছে। মাঝে মাঝে মিরার ফোন থেকে কথা হয়। দ্বীপ চাকরির জন্য এখন চট্টগ্রাম থাকে। চাকরিতে চলে যাওয়ার আগের দিন দূর থেকে দেখা হয়েছিল দুজনের। এরপর টেস্ট পরীক্ষা চলে এসেছিল। পরীক্ষার জন্য বের হতে পারেনি, কথাও হয় নি। বাসায় তো সারাক্ষণ মায়ের পাহারায় থাকে। পরীক্ষার ফলাফল তেমন ভাল হয়নি। তাই নিজ উদ্যমে পড়ার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ পড়া থেকে উঠেই ইচ্ছে করল চেঁচাতে। রাহা এসেছে গত কাল। রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাইকে কিছু কথা বলবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিল।

জাবেদ সাহেব মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিলেন। সেই মূহুর্তে রিদি বলল,

‘ আব্বু আমি ফখরুল স্যারের কাছে পড়ব না আর। ‘

ভ্রু কুচকে তাকাল সবাই। গত এক বছর ধরে পড়াচ্ছে ফখরুল। কোনো অভিযোগ শুনেনি। আজ হঠাৎ মেয়ে পড়বেনা শুনে কিছুটা চিন্তিত হলেন জাবেদ সাহেব। মেয়েকে প্রশ্ন করলেন,

‘ কেন মা, কোনো সমস্যা হয়েছে?’

রিদি ছলছল চোখ। মুখ গোমড়া। বাবা আর দুলাভাইয়ের সামনে বলতে চাইল না। আমিনা মেয়েকে দোষারোপ করা শুরু করলেন। তখন রিদি বাধ্য হয়ে বলল,

‘ স্যার আমাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে উনি আমাকে পছন্দ করে। আমার এসব ভালো লাগে না। আজ হাত ধরতে চেয়েছে। ‘

জাবেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকালেন। আমিনা যেন স্বাভাবিক। তরকারি বেড়ে দিতে দিতে পুনরায় বললেন,

‘ ভালোই হল। ফখরুল ভালো ছেলে। তোমাকে যেহেতু পছন্দ করে তবে বিয়ে দিয়ে দিব তোমাদের। এমনিতেও তুমি পড়াশোনায় ঘোড়ার ডিম। এরচেয়ে সংসার কর। জামাই টা ভাল পাবে। ‘

রিদি জানে মা কথা গুলো ইচ্ছাকৃত বলছে। সেদিনের পর থেকে রিদিকে চোখে চোখে রাখে। রাহা এবং রায়হান দুজনই বিরক্ত হল ফখরুলের ব্যাপারটাতে। রায়হান নাখোশ হল শাশুড়ির কথায়। রিদিকে বলল,

– তুই কালকে ফখরুল আসলে আমাকে ডাকবি। দেখি ও কেমনে তোর হাত ধরে। ওর হাতটা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিব। আসলেই ব্যাপারটা লজ্জার। ছাত্রী পড়াতে এসে হাত ধরতে হবে কেন? পছন্দ হলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাক। লুকিয়ে চুরিয়ে আকাম করতে হবে কেন? এই ছেলে আমার পছন্দ হয় নাই আব্বু।

মেয়ের জামাইয়ের কথায় আমিনা লজ্জা পেলেন। জাবেদ সাহেব ও একমত। আমিনা হেসে বলল,

– বাবা ছেলেটা ভাল। আমাদের মেয়েই বেয়াদব। হয়ত বাড়িয়ে বলছে।

রিদি মায়ের দিকে ক্রব্ধ চোখে তাকিয়ে খাবারের প্লেটটা সরিয়ে উঠে গেল। কান্না করতে করতে বলল,

‘ হ্যাঁ পরের ছেলে বাজে কাজ করলেও ভাল। তোমার মেয়েই খারাপ। ওই ফখরুলের কাছে আমি জীবনেও পড়ব না। কালকে বাসায় আসলে আমি ওকে বটি দিয়ে কোপাব। শয়তানের বাচ্চা একটা। আশপাশে সব বেয়াদব। কলেজে রানা, বাসায় ফখরুল। কোথাও শান্তি নেই আমার।’

কাঁদতে কাঁদতে রুমে চলে গেল। রাহা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আব্বু আমার মনে হয় ফখরুল এর খারাপ ইঙ্গিত ছিল। নতুবা আমাদের রিদি এভাবে রিয়েক্ট করত না।’

__

কয়েকবার বেজে বেজে ফোন কেটে যায়। অন্যমনস্ক থাকাতে দ্বীপ লক্ষ্য করে নি। আরেকবার বাজতেই রিসিভ করল। ক্লান্ত গলায় সালাম দিয়ে জানতে চাইল কে? ও পাশ থেকে ক্রন্দনরত প্রিয় রমনীর গলা,

‘ দ্বীপ আমি, রিধিমা।’

দ্বীপ শোয়া থেকে উঠে বসে গেল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ রিদিইই, কাঁদছ কেন? কি হয়েছে?’

কাঁদতে কাঁদতে রিদি বলল, ‘ তুমি কবে আসবে? আমার ভাল লাগছেনা আমি একটু দেখা করব তোমার সাথে। ‘

চিন্তিত মনে জবাব দিল, ‘ এখন আসব?’

‘ না না এখন না। দু একদিনের মাঝে আসো। মিরাকে জানিয়ে দিও।’

‘ কার ফোন থেকে কল করেছ?’

‘ আপুর ফোন। আচ্ছা রাখি।’

রিদি ফোন কেটেই দিতেই চিন্তা ঘিরে ধরল। শুক্রবার আসতে বহু দেরি। আজকে মাত্র রবিবার। এখন ছুটি চাইলে দিবে বলে মনে হয়না। প্রভিশনাল পিরিয়ডে ছুটি থাকেনা। এই মূহুর্তে নিজেকে কতটা অসহায় লাগছে তা হয়ত যে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে সে ব্যতীত কেউ বুঝবে না। মেসের বুয়া এসে রান্না করছে। বুয়াকে ফ্রিজ থেকে লতি নামাতে দেখে মায়ের কথা মনে পড়ল। ভাবল আজ পেট ভরে দুটো ভাত খাবে। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল লতি না বেছে, আঁশ না ফেলে সমানে কুচাচ্ছে বটির নিচে ফেলে। রান্না করছে রুই মাছের টুকরো দিয়ে। আহারে ব্যাচেলর জীবন। রাতে কিভাবে খাবে তা ভেবে ফ্রিজ খুলে দেখে কিছুই নেই। নিচে থেকে ডিম এনে ওটা ভেজে খাবে পরিকল্পনা করল।

___

সকালে রাহা ঘুম থেকে উঠে বোনকে নাস্তা বানিয়ে দিল। রাতেও কিছু খায়নি মেয়েটা। বোনকে জিজ্ঞেস করল কালকে ফখরুল কী কী বলেছে। রিদি প্রথমে মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল, পরে সব খুলে বলতেই রাহার চোখে তীব্র ক্রোধ দেখতে পেল। ফখরুল প্রেম নিবেদন করেছে। রিদি নাকোচ করেছে। তবুও ফখরুল জোর গলায় বলেছে সে রিদির পরিবারকে রিদির সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। যাওয়ার সময় রিদির হাত ধরে ফেলল। যা রিদি বাবার সামনে তখন টেবিলে লজ্জায় বলেনি। বোনকে কলেজে পাঠিয়ে আপন মনে ভাবছে কিভাবে ফখরুলকে অপমান করা যায়।

রিদির রিকশা প্রাইভেটের সামনে দাঁড়াল। রিকশা থেকে নেমে সামনে পা ফেলতেই উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেল। হাঁটু আর কনুইয়ে ব্যাথা পেয়েছে। কেউ একজন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। মাথা তুলে মানুষটাকে দেখে চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল খুশিতে। দ্বীপ ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,

‘ আস্তে, ঠিক ভাবে এখনো হাঁটতেও পারো না। তোমাকে আসলেই আন্টি একা না ছেড়ে ঠিক কাজ করেন। ‘

রিদি হাসছে। রিদির হাসি দেখে দ্বীপ ও হাসছে। হাসতে হাসতে দুজন সামনের দিকে হাঁটছে। দ্বীপ প্রশ্ন করল,

‘ ম্যাডাম রাগ না করে হাসছে, বাহ দ্বীপ তোর কপাল খুলে গেছে।’

রিদি ভ্রু উঁচিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘ আমি বুঝি সবসময় রাগ করি?’

দ্বীপ হেসে দু পাশে মাথা নাড়ল। রিদি দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ তুমি তো আমার ম্যাজিশিয়ান। তোমার উপর রাগ করতেই পারিনা।’

‘ আমি ম্যাজিশিয়ান? ‘

রিদি উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল, ‘ হ্যাঁ, রিদির ম্যাজিশিয়ান। এই যে ব্যাথা পেলাম হাঁটুতে, কনুইয়ে কিন্তু ব্যাথা অনুভবই হচ্ছে না তোমাকে পেয়ে।’

দ্বীপের মুখের হাসি উবে গেল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল, ‘ আজকে প্রাইভেটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাসায় যাও। সামনে চল দেখি ঔষধ দোকান খোলা আছে কিনা। ‘

রিদি খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ সকাল সাতটা বাজে। এই সময় কেউ খোলে না। আমি ঠিক আছি। বাসায় গিয়ে স্যাভলন লাগিয়ে নিব। তোমাকে দেখেছি এই শান্তি। ‘

দ্বীপ মৃদু হেসে জানতে চাইল হঠাৎ গতকাল ফোন দিয়ে দেখা করতে চাওয়ার কারণ। রিদি সব খুলে বলল। দ্বীপের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। রিদির শিক্ষক সম্পর্কে এর আগে কখনও জানতে চায় নি। আজ বিস্তারিত জেনে ফোন বের করে একটি ছবি দেখাল। ছবি দেখেই রিদি জানাল এটা তার শিক্ষক, দ্বীপ যেন এই ছেলে থেকে দূরে থাকে। রিদি প্রাইভেটে চলে যাওয়ার পর দ্বীপ বাসায় ফিরে গেল।

রাহেলা ছেলেকে দেখে চমকে গেলেন। গত তিনমাসে অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। দ্বীপের গলা শুনে ভেতর থেকে ওর দাদী বেরিয়ে এল। লাঠি নিয়ে ঠকঠক করে এসে দ্বীপের পাশে বসেছে। দ্বীপকে প্রশ্ন করল,

‘ ভাই একা আইলি যে বউ লইয়া আইলি না কেন? ‘

রাহেলা ছেলের হাতে ঠান্ডা একগ্লাস ডাবের পানি দিল। এক চুমুক নিতেই দাদীর কথা শুনে নাকে মুখে বিষম খেল দ্বীপ। মায়ের দিকে তাকাতেই রাহেলা বললেন,

‘ দুদিন ধরে আমাদেরকে বলছে তোমাকে বলি যেন তুমি বউ নিয়ে আসো। ‘

দ্বীপ দাদীকে জোরে বলল, ‘ দাদী বিয়ে করিনাই তো, তুমি দোয়া কর যেন তাড়াতাড়ি করতে পারি। ‘

বৃদ্ধ সখিনা বানু কি বুঝলেন কে জানে? মাথা নেড়ে বললেন, ‘ হ ভাই ঠিক কইছ বউ পালা বহুত কষ্ট। তয় বউরে তিন বেলা সোহাগ করবা। যহনই বউয়ের মুখ কালা দেখবা তহনই কোলে তুইলা খাওয়ায় দিবা। এমনে কইরা শান্তি পাইবা। ‘

রাহেলা মুখে শাড়ির আঁচল গুজে রান্না ঘরে চলে গেলেন। এদিকে দ্বীপ লজ্জায় মাথা নুইয়ে রেখেছে। সখিনা বানুর থামার নাম নেই। দ্বীপ থামিয়ে বলল,

‘ ও দাদী তুমি আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠলা কেন, যাও আরেকটু ঘুমাও। ‘

সখিনা বানু এবার হেসে বললেন,’ হ তোমার দাদায় কইছেলো , বউ হইল আমলকীর লাহান। মুখে দিলে পেত্থম তিতা পরে মিডা। আগেই মিডা পাইবা না বুঝলা। বউয়ের আদর পাওন অত সহজ না। ‘

দ্বীপ কপাল চাপড় দিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করছে। দাদীর আমলকীর কির্তন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদীর কথার সাথে তাল মিলিয়ে মনে মনে বলল,

‘ হ দাদী জানি বউ আসলেই আমলকী। প্রথমে তিতা মুখে দিলে মিডা। তবে এখনো মুখে দি নাই তাই জানিনা তিতা না মিডা। ‘

__

রিদিকে আজ রাহা নিতে এসেছে। প্রাইভেট থেকে বের হয়ে রিদি দ্বীপকে দেখে সেদিকে আগাতেই মাঝে রাহা এসে আটকে দিল। দ্বীপ দেখতে পেল রিদি রাহার সাথে চলে যাচ্ছে। মুখ গোমড়া হয়ে গেল রিদির । বুঝতে পারছেনা এই মেয়েটা কে? রিদি চলে যাবার পর এগিয়ে গিয়ে মিরাকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল রিদির বড় বোন।

কলেজের গ্যালারিতে এসে চুপচাপ বসে আছে। যার জন্য আসা তার সাথে দুটো মিনিট মনের কথা সুন্দর ভাবে বলারও সুযোগ নেই। আকাশে হঠাৎ মেঘ করেছে। আকাশের দিকে তাকাতেই মুখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চাপা কষ্ট থেকে তিনটে শব্দ উচ্চারণ করল,

‘ আল্লাহ ধৈর্য দাও। ‘

ঝড় বইছে। সবাই ছুটছে যে যার মত। দ্বীপ ঠাঁই বসে আছে। ভাবছে কোন ঝড় বেশি প্রলয়ঙ্কারী? এই ঝড় নাকি তার মনের ঝড়? কবে থামবে সব! রাতে আবার বাস ধরতে হবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আজ অসুস্থতার বাহানায় ছুটি নিয়েছে। মাসের বেতন থেকে কেটে নিবে আজকের বেতন। তাতেও সমস্যা নেই, নিক। চোখের দেখা তো দেখল রিদিকে।

__

চায়ে চিনি কম হলেই মেজাজ খারাপ হয় মিজান সাহেবের। ডাক্তার চিনি কম খেতে বলেছেন। ডায়াবেটিস বর্ডার লাইনে। তার ভাষ্যমতে সে এত চিনি খায় না, শুধু তিনবেলা চায়ে আর মাঝে মাঝে মিষ্টিতে খায়। একটা মানুষ তিনবেলা চায়ে যদি দুই চামচ চিনি খায় তাহলে আর কি বাকি থাকে? কিন্তু তাকে এই কথা কে বুঝাবে?

স্বামীর ডাকে রাহেলা ছুটে আসলেন। আজ তিনি চিনিই দেন নি চায়ে। মিজান সাহেব চায়ে চিনি দিতে বলাতে রাহেলা জানালেন তিনি এই কাজ করতে পারবেন না। কারণ দ্বীপ বারণ করেছে। বাবা মায়ের ঝগড়ার মাঝে দ্বীপ বাসায় আসল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ভিজে ছুপছুপ হয়ে বাসায় ফিরেছে। তাকে দেখে ঝগড়া থেমে গেল।

গোসল সেরে হালকা নাস্তা করে বেরিয়ে গেল বৃষ্টি মাথায় করে দ্বীপ। চট্টগ্রামবাহী বাসে চড়ে মনে হতে লাগল একবার যদি কথা বলতে পারত রিদির সাথে মনের আফসোস টা কেটে যেত। ঠিক সেই সময়ে ফোন আসল। ও পাশ থেকে রিদি বলল,

– দ্বীপ আমি খুব দুঃখিত। আপু যাবে আমি জানতাম না।

দ্বীপের ঠোঁটে হাসির রেখা। জবাব দিল,

– সমস্যা নেই। ইনশাআল্লাহ আমাদের আবারও দেখা হবে।

সিক্তগলা রিদির,

– তোমার এত ভালো হওয়া ঠিক হয় নি দ্বীপ।

– আমি শুধু তোমার ক্ষেত্রেই ভালো রিদি, বাকিদের ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধার নই। বাদ দাও কার ফোন থেকে কল দিলে?

রিদি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘ আপুর ফোন থেকে। আর কখনো কথা হবে না আমাদের। আপু মাত্র বলল তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ এটা জানিয়ে যেন ফোন দিই৷ তাই দিলাম। কিছুক্ষন আগে মিরা এবং প্রমাকে ফোন দিয়ে বলেছে ওরা যেন আমাকে সাহায্য না করে। তুমি ভালো থেকো।’

জানালার বাইরে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল জিহান,

‘ আবার মার খেয়েছ আজ?’

রিদির কান্নার আওয়াজ দ্বীপকে এলোমেলো করে দিয়েছে ভেতর থেকে। সম্পর্কে জড়ালে এত কষ্ট হতে হবে কেন? ওর কত বন্ধু সম্পর্কে আছে কই তারা তো কষ্ট পায় না। তবে সে কেন পাচ্ছে?

হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল, ‘রাখি। ভাল থেকো।’

‘পরীক্ষা টা ভালো দিও। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।’

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৭

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৭.

আজ রিদির জন্মদিন। দ্বীপ অনুরোধ করেনি তাকে সময় দেয়ার জন্য কেবল বলেছিল প্রাইভেট এর সামনে এসে উপহার দিয়ে চলে যাবে। রিদি নিজ থেকেই বলল দেখা করবে, কোথাও বসবে। শহর থেকে কিছুটা দূরে রেস্টুরেন্ট আছে সেখানেই যাবে। বাসায় ভয় যদি আব্বু,আম্মু জেনে যায়, কলেজে ভয় রানা। জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে গেল রিদির। একটু স্বস্তি চাচ্ছে। জন্মদিন না হলেও দ্বীপকে বলত কোথাও একটা বসার জন্য। জন্মদিন হওয়াতে সুযোগটা লুপে নিল।

বিকেলের প্রাইভেটে আজ যাবে না, এ কথা দ্বীপকে বলেনি কারণ পড়ার ক্ষতি করে দেখা করবে জানলে রাজি হত না । জানিয়েছে আজ প্রাইভেট নেই। প্রাইভেটের সামনে থেকে রিকশা নিয়ে রিদি সামনে এগিয়ে গেল। দ্বীপ সেখান থেকে উঠল। রিদি এই প্রথম বাবা ছাড়া কোনো পুরুষের সাথে একই রিকশায় উঠেছে। দ্বীপের মনে হল রিদি অস্বস্তিবোধ করছে। নেমে যেতে চাইল। রিদি আটকে দিল। রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দেখল বেলুন বিক্রেতা, বেলুন বিক্রি করছে। রিদি সেদিকে ছুটে গেল। দ্বীপ বেলুন কিনে দিতে চাইলে রিদি বারণ করল। এই বেলুন নিয়ে যেতে পারবেনা বাসায় তাই কিনে লাভ নেই।

দুই গ্লাস লাচ্ছি অর্ডার দিয়েছে সাথে টুকটাক অ্যাপিটাইজার। লাচ্ছির গ্লাস টার দিকে রিদিকে ঠোঁট উলটে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল,

‘ কোনো সমস্যা? ‘

রিদি মুখটাকে প্যাঁচার মত বানিয়ে বলল, ‘ না এদের সার্ভিস ফালতু।’

দ্বীপ বুঝতে পেরে নিজের গ্লাসটা রিদিকে দিল। রিদির টা নিজে নিয়ে বলল, ‘ এখন খাও, আমি এটাতে মুখ দিই নিই।’

রিদি প্রশ্ন করল, ‘ তুমি কি টিস্যুসহ খাবে নাকি? গ্লাস টা চেঞ্জ করো৷ আমি বুঝিনা লাচ্ছির গ্লাসের উপর টিস্যু দিতে হবে কেন? দিলো যখন ওরা খেয়াল করবে না যে টিস্যু ড্রিংক্সে মিশে গিয়েছে। ‘

মুচকি মুচকি হেসে দ্বীপ বলল, ‘ ওরা তো আর জানত না এখানে ভুল ধরার জন্য রিদি আসবে৷ আমার সমস্যা নেই, তুমি তোমার টা খাও। টিস্যুই তো। উঠিয়ে ফেলে দিচ্ছি। খাবার নষ্ট করা উচিত না। মাথা ঠান্ডা কর৷ এছাড়া টিস্যু দিয়েছে হাইজিন মেইনটেইন করতে। আনহাইজেনিক হয়ে যাবে বুঝতে পারেনি। ‘

রিদি লজ্জা পেল। তৎক্ষনাৎ রেগে যাওয়ার স্বভাবটা আর গেল না। সব কিছুতেই রেগে যায়। দ্বীপ এত ঠান্ডা থাকে কেন সব পরিস্থিতিতে। রানার সাথে সেদিন কত ঠান্ডা মাথায় কথা বলল। প্রথম দিকের কিছু কথা শুনলেও পরের গুলো শুনতে পায় নি ভিড়ের জন্য। রেগে গেলেও প্রকাশ করে না। শুধু হাসে।

এই হাসিতেই আশেপাশের মানুষ সহজে গলে যায়। এই মাত্র রিদি আবার দ্বীপের প্রেমে পড়ল। দ্বীপ উপরের টিস্যু যতটুকু সম্ভব ফেলে স্ট্র দিয়ে লাচ্ছি টানতে গিয়ে রিদির দিকে চোখ গেল। রিদি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। লাচ্চির গ্লাস টা একপাশে রেখে লজ্জা পেয়ে হাসি দিয়ে বলে, ‘ এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আচ্ছা যাও খাব না এই লাচ্ছি। কিন্তু লাচ্ছি টা মজা। ‘

রিদি হেসে বলে, ‘ আমি তো তোমাকে দেখছিলাম। খাও খাও টিস্যু মিশ্রিত লাচ্ছি বেশ মজা। অনেক টুকুই তো খেয়ে ফেলেছ। ‘

দ্বীপ হেসে রিদির দিকে উপহার এগিয়ে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। রিদি খেতে খেতে উপহার খুলে দেখল একটা ঘড়ি। বেশ সুন্দর। সাথে এক বাক্স চকলেট। ঘড়িটা দ্বীপ পরিয়ে দিতে চাইল। রিদি বারণ করল। দ্বীপের মনে হল সে ভুল করেছে, অনুমতি না নিয়ে পরাতে চাওয়া উচিত হয় নি । রিদি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ পরিয়ে দাও।’

অনুমতি পেয়ে খুশি মনে পরিয়ে দিচ্ছে দ্বীপ। রিদি বলল, ‘ আমার ভয় হয় কাছাকাছি আসতে, পাশাপাশি বসতে, একসাথে খেতে ; যদি শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকতে না পারি।’

হাত থমকে গেল দ্বীপের। রিদির দিকে তাকাল। রিদি বলেই যাচ্ছে, ‘ গতকাল সন্ধ্যায় আব্বু আম্মু কথা বলছিল, তখন দুলাভাই ফোন দিয়ে আব্বুকে একটা পাত্রের কথা বলল। আমার বিয়ের জন্য। আব্বু পাত্র দেখতে বলল। যদি পছন্দ হয়ে যায়, আমার এইচএসসির পর বিয়ে হয়ে যাবে। এছাড়া ছোট চাচ্চু তো আব্বুকে রানার কথা বলেছে। আব্বু নিষেধ করে দিয়েছে। রাজনীতি করলে আব্বু বিয়ে দিবে না। আব্বুর ধারণা রাজনীতি করা ছেলেরা উগ্র হয়। এমন ধারণা হওয়ার পেছনে কারণ ও আছে। আমার ছোট মামা রাজনীতি করে। সারাক্ষণ মিটিং, মিছিল এসবে ব্যস্ত। বিয়ে করেছিল ভালোবেসে সেই সংসার ও টেকে নি। এসব দেখে আব্বু তিতিবিরক্ত। তবে দুলাভাই এর আনা পাত্রটা নাকি ভাল। ওটার দিকে বেশ মনোযোগ আব্বুর। ‘

দ্বীপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবে?’

‘ আমাদের বংশে মেয়েদের একটু আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পর যত খুশি পড়তে পারবে। আপুর বিয়েও তাড়াতাড়ি হয়েছে। বিয়ের পর পড়াশোনা শেষ করেছে। সেই হিসেবে আমার টাও হবে। যদি বিয়ে হয়ে যায় তখন কি হবে?’

দ্বীপ চুপ করে আছে। মনোযোগ দিয়ে শুনে বলল,

‘ কি আর হবে? বিয়ে করে আরেকজনের সংসার করবে৷ আর এদিকে আমার কি হবে জানি না। আচ্ছা এখন এসব না তুললে হয় না? আর যদি বল যে এখনই বিয়ে দিয়ে দিবে তোমাকে, তবে আমি আব্বুকে পাঠাচ্ছি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তোমার আব্বুর কাছে। চলবে?’

‘ ইন্না-লিল্লাহ! কি বলছ এসব। তুমি এখন কিভাবে বিয়ে করবে? আগে স্যাটেল হও। আব্বু যদি জিজ্ঞেস করে ছেলে কি করে? তখন কি উত্তর দিব? বিজনেসম্যান আব্বু পছন্দ করে না। ফুটবলার শুনলে তো মুখের উপর না করে দিবে। ‘

শান্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে দ্বীপ। কিছুক্ষন বসে রিদিকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের বাসায় গেল ৷ ফিরতে বেশ রাত হল। রাহেলা ছেলেকে ভাত বেড়ে দিয়ে বললেন, ‘ তুমি তো চাকরি করবে না, তোমার বাবা বলল সিতারাপুরের জায়গা টা বিক্রি করে তোমাকে কিছু টাকা দিবে যাতে ব্যবসা করতে পারো , ব্যবসার ব্যাপারে কিছু কি ভাবলে?’

দ্বীপ খেতে খেতে বলল, ‘ আম্মু বিজনেস করব না। চাকরি করব। আব্বুকে বলেন জায়গা টা থাক। ওটা আমাদের শেষ সম্বল। ‘

রাহেলা চমকে উঠলেন। কি বলে এই ছেলে! যে ছেলে চাকরির নাম শুনলে বাড়ি মাথায় করত সে ছেলে বলে চাকরি করবে! নিজেকে ধাতস্থ করে ছেলেকে বলল, ‘ তুমি তো চাকরি করতে চাও নি আগে, আজ হঠাৎ? ‘

‘ হঠাৎ না আম্মু, ব্যবসায় ঢুকার আগে তো অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন। আমার তো অভিজ্ঞতা নেই। তাই কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা নিই। পরের টা পরে ভাবব।’

‘ চাকরি কি পেয়েছ?’

‘ রেদোয়ান ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম আজ, উনি যে চাকরিটার কথা বলেছিলেন ওই ইন্টারভিউ টা দিব।’

‘ ওইটার তো বেতন কম।’

‘ শুরুতেই কে লাখ টাকা দিবে আম্মু? ওই দশ/ এগারো দিয়েই শুরু হয়। কষ্ট না করলে তো সফলতার মুখ দেখব না।’

রাহেলা ভাবলেন, ছেলের কথা তো ঠিক। ছেলের সাথে একমত হলেন। পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
‘ ফুটবল?’
‘ হয়ত ছেড়ে দিব। কি লাভ এত খেলে। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে খেলে যাচ্ছি অথচ এখন পর্যন্ত জাতীয় লীগে খেলতে পারলাম না।’
‘ এত তাড়াতাড়ি ধৈর্য্য হারা হয়ে যাবে?’
‘ দেখি চাকরির কি অবস্থা। হয়ে গেলে নাহয় টুর্নামেন্টের সময় ছুটি নিয়ে আসব।’

মাথা ঝাকালেন রাহেলা। চুপ করে কি যেন ভাবছেন। মাকে অন্যমনস্ক দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল,
‘ কি ভাবছেন আম্মু?’
‘ ভাবছি তোমার ফুফুর কথা। যা তান্ডব করে গেল, তোমার আব্বু তো চিন্তায় পড়ে গেছে। এদিকে তোমার দাদীকে কত কি বুঝিয়েছে। কানে কম শুনে বলে তাকে দিয়ে বলাতে পারল না। ‘
‘ আচ্ছা আম্মু আপনি আমাকে একটা কথা স্পষ্ট বলেন, অঞ্জু বউ হয়ে আসলে আপনি খুশি হবেন?’

রাহেলা খানম নিশ্চুপ। এই নিরবতা যেন অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বীপ হেসে শোবার ঘরে আসল। ফেসবুকে ঢুকে চেক করল কোনো মেসেজ এসেছে কিনা রিদির। না আসাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে রিদির মেসেজ আসল। দুদিন বাদে পরীক্ষা। এখন রাত জেগে পড়বে আর দ্বীপের সাথে কথা বলবে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ রিদি অফলাইন হয়ে গেল। সম্ভবত রিদির মা এসেছে। কিছুক্ষণ পর রিদি মেসেজ দিল,

‘ আম্মু এসেছিল। আমি শুয়ে তোমাকে মেসেজ দিচ্ছি।’

রিদি শুয়ে হেসে হেসে মেসেজ দিচ্ছিল। দ্বীপ কথা কম বলে। যা বলার সবসময় রিদি বলে। দ্বীপ মেসেজ দিল, ‘ ভালোবাসি কথাটা কি কখনও বলবে না?’

রিদি সরাসরি কখনওই বলে নি। দ্বীপ জোর ও করেনি। আজ এই প্রশ্ন করাতে রিদি বিচলিত হল। মেসেজ লিখল, ‘ সময় হলে বলব। ‘

ঠিক তখনই রিদির ফোনটা কেড়ে নিল নিল কেউ একজন। আচানক এমন কিছু ঘটাতে রিদি লাফিয়ে উঠল। চিৎকার দিল। আমিনা দ্রুত দরজা লাগিয়ে মেয়ের গালে কষে চড় মারলেন। ধরা পড়ে গিয়ে রিদি ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আমিনা বেগম এন্ড্রয়েড ফোন নিয়ে গেলেন এবং এর সাথে ছোট বাটন ফোনটাও। রিদির মাথায় হাত। সব শেষ! এভাবে ধরা পড়বে ভাবতে পারেনি৷ কেন শুতে এসেছিল? দ্বীপ সেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে,আজ কেন দ্বীপকে ঘুমাতে দিল না? কেন জাগিয়ে রাখল?

দ্বীপের সারা রাত অস্থিরতায় কেটেছে। ফোন বন্ধ রিদির। হয়ত রিদি ঘুমিয়ে গিয়েছে নতুবা চার্জ শেষ অথবা ওর মা ফোন নিয়েছে, কত কত চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । পরদিন সকালে প্রাইভেটেও আসেনি। ফোন বন্ধ। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। রিদির সব প্রাইভেটে গিয়েছে। মিরা এবং প্রমাকে জিজ্ঞেস করল। ওরাও জানেনা কিছু। মিরা বাসায় ফোন দেয়ার পর আমিনা জানালেন রিদি অসুস্থ। দ্বীপের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল।

__

এমনিতেই মন খারাপ, গত দুদিন ধরে রিদির কোনো খবর নেই। তার উপর রাস্তায় জ্যাম। সামনে একটা সাইকেল এক্সিডেন্ট হয়েছে। দ্বীপ নেমে গিয়েছে রিকশা থেকে। সাইকেল আর রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে। দ্বীপ সামনে এগিয়ে দেখে রিকশা যাওয়ার অবস্থা নেই। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর হেঁটে সামনে আসতেই এক বন্ধু বাইক সমেত সামনে এসে দাঁড়াল। বন্ধুর বাইকে উঠে বাসার পথে রওয়ানা দিল। অকস্মাৎ বাইক জোরে একটি রিকশার সাথে ধাক্কা খেল। বাইক থেকে ওরা দুজনই নিচে পড়ে গেল। রিকশাওয়ালা এবং যাত্রী সুস্থ আছে। দ্বীপের বন্ধু তো সরাসরি গালি দিয়ে বসল রিকশাওয়ালাকে। রিকশাওয়ালা ও গালি দিচ্ছে বাবা মা তুলে ৷ বাবা মা তুলে গালি দিচ্ছে দেখে রিকশাওয়ালাকে মারতে গেল দ্বীপ। যা কখনও করেনি। মারতে গিয়েও হাত নামিয়ে ফেলল।

চিৎকার দিয়ে ধমকে উঠল ,’ বাপ মা তুলে কথা গালি দিলি কেন, তোর রাস্তা এটা? উলটা পাশে আসছিস কেন? তোদের আসলে স্বভাবই খারাপ। উলটা পালটা রিকশা চালাবি আর এক্সিডেন্ট হলে দোষ বাইক এর নতুবা অন্য গাড়ির। ‘

রিকশায় বসা যাত্রীকে বললেন, ‘ আংকেল আপনিও বা কেমন? কিছু বললেন না কেন এই ফাজিল কে উলটা রাস্তায় আসছে যে? ‘

ভদ্রলোক চোখ গরম করে বলল, ‘ ও নাহয় ভুল করেছে, তুমি গায়ে হাত তুলতে চাইলে কেন? রক্তের গরম দেখাও? পারিবারিক শিক্ষা নেই?’

দ্বীপ মেজাজ হারিয়ে বলল, ‘ তুলিনি তো। না তুলতেই এভাবে কথা বলছেন, তুললে কি করতেন? আপনাদের জন্যই এক্সিডেন্ট গুলা হয় বুঝছেন। আপনি ওরে নিষেধ করলে এই রাস্তায় আসত না। নিজে তো ওর ভুল শুধরে দিলেন না উল্টো আমার শিক্ষার দিকে আঙুল তুলছেন। ওরে মাটিতে ফেলে মারা উচিত ছিল। ‘

‘ বেয়াদপ ছেলে, মুখ সামলে কথা বলো। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না? বাবা মা শেখায় নি কিভাবে বড়দের সম্মান দিতে হয়?’

‘ আপনি নিজের সম্মান রাখলেন কোথায়?’

মানুষ জড়ো হয়েছে। দু পাশে মীমাংসা করে যে যার যার পথে চলে গেল। দ্বীপ আর ওর বন্ধু ফার্মেসীতে ঢুকে ড্রেসিং করে নিল। দ্বীপের হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত অনেকটুকু ছিলে গিয়েছে। গুটানো হাতা খুলে হাত ঢেকে নিল যাতে মা না দেখে।

__

কাল থেকে কাঁদছে। রাতে আমিনা চড় মেরেছেন, দিনে কোনো প্রাইভেটে যেতে দেন নি। ইচ্ছেমতো বকেছেন। বাড়াবাড়ি করলে রিদির বাবাকে জানিয়ে দিবে বলেছেন। মেয়ে এত উচ্ছনে কখন গেল যে তিনি টেরই পান নি, ওই দুশ্চিন্তায় ঘুম উবে গেল।

সারাদিন রিদি তেমন কিছু খায়নি। আমিনা বেগমের রাগ উঠলে খাবার বেড়ে দেন না। রিদির সাথেও সেই কাজ করেছেন। জাবেদ সাহেব বেশ কয়েকবার ডাকলেন মেয়েকে। প্রতিবারই রিদি শরীর খারাপ বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। দম বন্ধ লাগছে তার। মা দুটো ফোনই নিয়ে গেল, কারো সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। এমনকি বান্ধবীদের সাথেও না।

রাত দুটো, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমিনা এবং জাবেদ সাহেব ৷ রিদি জানে ফোন রুমের ওয়ারড্রব এর উপর থাকে। পা টিপে টিপে বাবা মায়ের রুমে ঢুকে ফোনটা নিয়ে এল। এনেই সবার আগে মেসেজ দিল দ্বীপকে,

‘ দ্বীপ আমি ধরা পড়ে গিয়েছি। আম্মু দুটো ফোন নিয়ে গিয়েছে। আমাকে চড় মেরেছে৷ যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেছে তোমার সাথে।’

এতটুকু সেন্ড করার এক মিনিট পর রিপ্লাই, ‘ কালকে কলেজ আসো যেভাবে হোক। একবার তোমাকে দেখব শুধু।’

মেসেজ লিখে ঘাড় ঘুরাতেই দেখে আমিনা দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আৎকে উঠল বুকের ভেতর। আজকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। রিদির দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে। রুমের দরজা লাগয়ে বিছানা ঝাড়ার শলাটা নিয়ে রিদিকে এলোপাতাড়ি মারল। আর বকতে বকতে বলল,

‘ নিজের সব শেষ করছি তোদের জন্য। বাবার বাড়ি বেড়াতে যাই না, চাকরি হইছে তাও করি নাই সন্তান যদি মানুষ করতে না পারি, বাসায় অতিথিদের দাওয়াত দিই না তোর পরীক্ষা বলে। আর তুই কিনা ফষ্টিনষ্টি করিস। আজ মেরেই ফেলব। বেঁচে থেকে করবি কি? যেই মানুষটা মেয়ে মেয়ে করে জান দিচ্ছে সে যদি জানে মেয়ে দিন দিন উচ্ছনে যাচ্ছে দুঃখে কষ্টে মরে যাবে। এরচেয়ে তুই মর, তোর কারণে সাদা শাড়ি পরতে পারব না।

আছাড় দিয়ে রিদির এন্ড্রয়েড ফোনটা ভেঙে ফেলেছে। শলার মারের দাগ শরীর জুড়ে। এই অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে রিদি ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে আমিনা নিজে রিদিকে প্রাইভেট এবং কলেজে নিয়ে আসল৷ দূর থেকে রিদিকে দেখল দ্বীপ। রিদির সাথে ওর মাকে দেখে যা বুঝার বুঝে নিয়েছে। আমিনা মেয়েকে কলেজে দিয়ে বাসায় চলে এলেন। ছুটির সময় নিতে আসবেন। ঠিক তখন মিরার ফোনে মেসেজ আসল,

‘ আজকে এগারোটায় কলেজে দেখা করতে পারবে রিদিকে নিয়ে? পুরোনো বিল্ডিং এর সামনে।’

‘ জি ভাইয়া পারব।’

দ্বীপ বাসায় এসে থ মেরে বসে আছে। গতকাল রাত থেকে চোখের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। আগামীকাল একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। সেই সংবাদ টাও জানাতে পারল না রিদিকে। এগারোটা বাজার দশ মিনিট আগেই পুরোনো বিল্ডিংয়ের সামনে এসে অপেক্ষা করছে।

রিদি দূর থেকে দ্বীপ কে দেখে এগিয়ে এল। দ্বীপ কোনো কথা না বলে রিদির হাত এবং গাল দেখে শিউরে উঠল। দগদগে দাগ, ফুলে ফুলে আছে। কিছু জায়গায় র ক্ত ভেসে উঠেছে। ইচ্ছে করল ছুঁয়ে আদর করে দিতে। রিদি তখনও কাঁদছে। দ্বীপ কাঁপা গলায় বলল,

‘ আর কথা বলো না আমার সাথে। আমি নিজের একটা অবস্থান করে তোমার সামনে আসব। কাল একটা চাকরি ইন্টারভিউ আছে। দোয়া কর যেন হয়ে যায়।’

রিদি কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করল, ‘ তুমি চাকরি করবে?’

দ্বীপ ক্ষীণ হেসে বলল, ‘ উপায় আছে আর? ‘

‘ ফুটবল?’

‘ সুখ পেতে শখ ছাড়ব না হয়।’

রিদি কাঁদছে আর দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই ছেলেটা কি পাগল? ছোটবেলা থেকে ফুটবল ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না অথচ সে নাকি রিদির জন্য ফুটবল ছাড়বে? এও সম্ভব? কেউ এত ভালোবাসতে পারে?

মিরা এসে জানাল এদিকে লোকজন আসছে। রিদি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপের ছলছল চোখ দুটো অনেক কিছু বলে দিচ্ছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে নজর লুকানোর আপ্রান চেষ্টা চালাচ্ছে। যাওয়ার আগে দ্বীপের বলা অতি সাধারণ বাক্যটাও বুকের গভীরে গিয়ে লাগল রিদির ,

‘ ভালো থেকো। নিজের যত্ন কর। হাসিখুশি থেকো। পরীক্ষা যেন খারাপ না হয়। পরের বার দেখা হলে যেন আমার দূরন্ত রিদিকে দেখি। আমাকে ভুলে যেও না। খুব ভালোবাসি। ‘

রিদি দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপ চলে যাচ্ছে। মিরাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল রিদি। প্রমাও বান্ধবীর কষ্টে কাঁদছে। মিরা বলল,

‘ জানতাম আমি এমন কিছু হবে। তাই তোকে নিষেধ করেছিলাম। আর কাঁদিস না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ভাইয়া শেষ চেষ্টা করবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। দেখা যাক এবার কি হয়। ‘

চলবে…