বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 16



হৃদিতে রিদি পর্ব-০৬

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৬.

দ্বীপদের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। সাজিনার বিয়ে। বংশের একমাত্র মেয়ে সাজিনা। এই বংশে ছেলের অভাব না থাকলেও মেয়ের বড্ড অভাব। দ্বীপের চাচাদের ও কারো মেয়ে নেই। তাই সাজিনা থাকে সবার আদরে এবং ভালোবাসায়। সাজিনাকে সাজাচ্ছে দ্বীপের ফুফাতো বোন অঞ্জনা। সাজিনার ছোট। রিদনের বয়সী। সবাই সাজিনাকে পার্লারে সাজতে বলেছে কিন্তু হলুদে সাজিনা পার্লারে সাজতে চাইল না। একদম খাঁটি বাঙালি ধাঁচে সেজেছে। আগামীকাল সাজবে পার্লারে, স্কিন সেনসিটিভ এত এত সাজ তার স্কিনে সইবে না। তাই আজ হালকা পাতলা সাধারণ থাকতে চেয়েছে।

অঞ্জনার সাজানোর হাত ভাল। তাল তলা রোডে পুকুরের পাশে তিনতলা ভবনের দোতলায় ভাড়া থাকেন মিজান সাহেব তার পরিবার নিয়ে। আজ প্রায় দশ বছর এই বাড়িতে থাকেন। পুকুরের পাশে এই বাড়িটা তার বেশ পছন্দ। বাড়িওয়ালা ও ভীষন ভালো মানুষ। ছিমছাম এই পরিবারকে পছন্দ করেন। এই পরিবারের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাড়িওয়ালা নিজ উদ্যোগে পুরো বাড়ি সাজিয়েছেন। ছাদে প্যান্ডেল করা। ভবনের সকলের মাঝে বেশ আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক। রিদন, দ্বীপ সবাই ব্যস্ত ছুটোছুটিতে৷ দ্বীপের ফোনটা সাজিনার রুমে চার্জে আছে। বেশ কয়েকবার বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাজিনা অঞ্জনাকে বলল,

‘ অঞ্জু দেখতো কে ফোন দিয়েছে?’

অঞ্জনা উঠে গিয়ে দেখে ফোনের স্ক্রিনে লিখা ‘ Madam ‘ ঠোঁট উলটে বলল, ‘ আপু কোনো এক ম্যাডাম কল করেছে। ‘

সাজিনার ভ্রু কুচকে বলল, ‘ নাম নেই ম্যাডামের?’

অঞ্জনা উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘ নাহ। ধরব?’

সাজিনা মাথা নেড়ে বলল, ‘ না না ধরিস না, ভাইয়া রেগে যায় ভাইয়ার জিনিস ধরলে। বাদ দে। ‘

‘ যদি প্রেমিকা হয়?’

সাজিনা মৃদু ধমকে বলল, ‘ কি বলিস যা তা। হয়ত কোনো ম্যাডাম-ই।’

‘ তবে নাম নেই যে?’

এই মেয়েটা তো এত পাকনা। কথা বেশি বলে। তবে ওর কথা একেবারে ফেলে দেয়ার মত ও নয়।
এবার চিন্তায় পড়ে গেল? ভাই কি প্রেম করে? প্রেম করলে তো আরেক ঝামেলা সামনে হাজির হবে। ফুফু তফুরা যে তার মেয়ে এই বাড়িতে বউ করে পাঠাতে মুখিয়ে আছে এই কথা সকলের জানা। সরাসরি প্রস্তাব না দিলেও বছর খানেক আগে ইনিয়েবিনিয়ে বলেছিল এই কথা। কিন্তু ভাইয়ের চালচলনে তো বুঝা যায় না সে প্রেম করে। তবুও মন সায় দিচ্ছে না। অঞ্জনাকে নিষেধ করল। অঞ্জনা কথা না শুনে ফোন রিসিভ করে ফেলল। হ্যালো বলার আগেই পেছন থেকে দ্বীপ টান দিয়ে ফোনটা নিয়ে নিল। ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করছে। সাজিনা বুকে থুতু দিয়ে বললো, ‘ ভাইয়া বেশ কয়েকবার ফোন বাজছিল, তাই…’

‘ আমার অনুমতি ছাড়া ফোন ধরা অপছন্দ করি তুই জানিস না?’

‘ দুঃখিত ভাইয়া।’

দ্বীপ ফোন হাতে বেরিয়ে গেল। অঞ্জনা বুকে হাত দিয়ে বলল, ‘ আমি একশো ভাগ শিউর এটা প্রেমিকা।’

‘ তাতে তোর কি? এখনই চিবিয়ে ফেলত।’

‘ আমার ই তো সব।’

অঞ্জনা বিড়বিড় করলেও কথাটা স্পষ্ট সাজিনার কানে পৌঁছাল। মেয়ে হিসেবে অঞ্জনা খারাপ না তবে মুখ চলে বেশি। সাজিনার মন খারাপ হয়ে গেল। মন থেকে চাইল যেন ভবিষ্যতে সংসারে ঝামেলা না হয়। সুখের সংসার তাদের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন ঝামেলার আভাস পাচ্ছে।

__

কানে ফোন রেখেই ডেকোরেশন এর লোকদের সাথে চিল্লাচিল্লি করছে। রিদি ও পাশ মুচকি মুচকি হাসছে আর শুনছে দ্বীপের চিৎকার। দুইদিক একসাথে সামলাতে হচ্ছে দ্বীপকে। রিদি ফোন রেখে দিতে চেয়েছিল। দ্বীপ রাখতে দেয় নি। অনেক দিন পর কথা বলার সুযোগ পেয়েছে হাত ছাড়া করে কিভাবে? রিদিদের বাসার দোতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। তিনি দেখা করতে এসেছেন আমিনার সাথে। এই সুযোগে রুমের দরজা লাগিয়ে রিদি কথা বলছে।

‘ এদিকের লাইট টা জ্বলছে না কয়বার বললাম। এ্যই রিদন এটা চেক করা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে হাত ঠ্যাং ভাঙবে মানুষের। ‘

থেমে গিয়ে রিদিকে বলল, ‘ তুমি পড়ছ না কেন? পড়ার আওয়াজ যেন আমি শুনতে পাই। ‘

রিদি ফিক করে হেসে বলে, ‘ ও পাশে আমার প্রিয় মানুষটা গরম গরম ভাব দেখাচ্ছে আমি এইপাশে পড়ি কী করে? তোমাকে কি আজকে খুব সুন্দর লাগছে সবুজ পাঞ্জাবীতে?’

‘ বেক্কল আর বলদের মত লাগছে। ঘেমে নেয়ে একাকার আমি।’

‘ আমি জানি আমার বেক্কলের দিকে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। আমার বলদ সুন্দর। ‘

ও পাশ থেকে দ্বীপের অট্টহাসি শোনা যাচ্ছে। রিদিও মুখ চেপে হাসছে। দ্বীপের কানে ফোন দেখে রিদন আড়ে আড়ে দেখছে। ভাইকে ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছেনা তবে কিছু একটা আন্দাজ ঠিকই করতে পারছে। প্রায় ঘন্টা খানেক পর ফোন রাখল। সাজিনাকে আনা হল স্টেজে। দূরে একপাশে বসে ছিল দ্বীপ। পারিবারিক ছবি তোলার সময় গিয়ে, বোনকে সামান্য হলুদ লাগিয়ে চলে আসল। বোন কালকে চলে যাবে এই ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। সারাক্ষন এটা লাগবে, ওটা লাগবে, এটা করিস নি কেন? ওটা ভুল হল কেন? এসব বকা খাওয়ার মানুষ টা আর থাকবে না। শ্বশুর বাড়িতে সাজিনা কেমন থাকবে? ওকে আদরে রাখবে তো? এসব ভাবতে ভাবতে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। ভবনের কোল বেয়ে বেড়ে উঠা নারকেল গাছের পাতা গুলো নড়ছে বাতাসে। শীত চলে গিয়েছে, গরমের দাবদাহে অতিষ্ঠ প্রকৃতি ।
__

রাস্তার ওই পাশে মানুষটা প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকত। আজ আসতে রিদি নিজেই বারণ করেছে। সারা রাত জেগে ছিল কমিউনিটি সেন্টারে। বাবুর্চিদের পাহারা দিয়েছে। ভোর চারটায় মামা, চাচাদের বসিয়ে ঘুমাতে গিয়েছে। কিছু ঘন্টাও যদি না ঘুমায়, মানুষ টা তো অসুস্থ হয়ে যাবে।

প্রাইভেট থেকে বের হয়ে দেখে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মিরা আর প্রমা মুচকি মুচকি হাসছে। রিদি কপালে হাত চাপড়াচ্ছে। অন্যদিকে দ্বীপ চোখ কচলাচ্ছে। চোখে এখনো ঘুম তা স্পষ্ট। দেখা করে রিদি প্রাইভেটে চলে গেল, দ্বীপ বাসায় ফিরে এল। বাসায় এসে সোফায় শুয়ে পড়ল। ড্রইং রুমে ফুফু তফুরা, মিজান সাহেব এবং অন্য ভাইদের নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার বিষয় হল অঞ্জনা এবং দ্বীপের বিয়ে। মিজান সাহেবের ছোট ভাই মাহফুজ সাহেব বললেন,

‘ জিহানের তো পড়াশোনা শেষ, অঞ্জু ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এখন মনে হয় বিয়ের কথা আগানো যায়। ‘

রাহেলা ট্রে তে করে চা হাতে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,

‘ মাহফুজ , সাজিনার বিয়েটা শেষ হোক এরপর নাহয় ভাবি। ‘

তফুরা কেঁদে উঠল। মিজান সাহেব রাহেলা খানমকে ইশারা দিলেন চুপ থাকতে। তফুরার স্বামী বললেন,

‘ মরার আগে মেয়েটার গতি করতে পারলে খুশি হতাম। বড় ভাইজান সম্মতি দিলে যে কদিন আছি এই কদিনের মধ্যে আংটি বদল টা হয়ে যাক।’

মিজান সাহেব বেশ ইতস্তত বোধ করলেন। তিনি জানেন দ্বীপ সব টা শুনেও চুপ করে আছে। তাই ছেলের দিকে ঠেলে দিলেন মত,

‘ বিয়েটা তো জিহান আর অঞ্জুর। ওদের জিজ্ঞেস কর। ওরা রাজি থাকলে আমি দ্বিমত করব না।’

মাহফুজ সাহেব বললেন, ‘ জিহানের কি মত নিব? ও তো ছোট মানুষ। ‘

দ্বীপ শোয়া থেকে উঠে বসল। ট্রে থেকে এক কাপ চা নিয়ে বলল, ‘ তাহলে ছোট মানুষের বিয়ে করার ও প্রয়োজন নেই চাচ্চু। বড় মানুষ দেখে আপনাদের ভাইঝিকে বিয়ে দিন। আমার বিয়েতে মত নেই।’

তফুরার গালে হাত। রাহেলার ঠোঁটের কোণে হাসি। মিজান সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলেন। ইশারা দিতেই রাহেলা চোখ ঝাপটালেন। তফুরা হাহাকার করে উঠল,

‘ এটা কি কইলি বাবা, তাহলে কি অঞ্জুর কথা ঠিক। তোর অন্যদিকে লাইন আছে? তোদের বিয়ে তো জন্মের পরই ঠিক করছিলাম৷ এই বন্ধন কেমনে ভাঙবি তুই?’

দ্বীপের মাথা গরম করা উত্তর, ‘ খুব বড় ভুল করে ফেলছ ফুফু। জন্মের আগে আম্মুর পেটে থাকতে গায়েবানা বিয়ে পড়িয়ে দিতে। তাহলে পেট থেকে বের হওয়ার সময় জানতাম আমি কারো স্বামী হয়ে জন্ম নিয়েছি। কিন্তু যার স্বামী হয়েছি তার এখনও জন্মই হয় নি। ‘

তফুরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দ্বীপ নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিল। এদিকে দ্বীপের দাদী দরজা ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম। এই মহিলার একমাত্র কাজ দ্বীপ দরজা লাগালেই দরজা ভাঙা। বাইরে থেকে ডাকছে। ঘড়িতে বাজে সকাল সাড়ে নয়টা। বাড়ির অতিথিরা সব নিরব হয়ে গিয়েছে এই ঘটনার পর। আজকের ঘটনার জন্য অঞ্জু দায়ী স্পষ্ট। পারিবারিক ভাবে ঠিক করা বিয়ে গুলোতে যদি কারো দ্বিমত থাকে পরবর্তীতে এই ব্যাপার গুলো ফ্যামিলি পলিটিক্স এর কাতারে পড়ে যায় যে জিনিসটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।

রুম থেকে বের হয়ে ধমকাল সাজিনাকে, এখনও পার্লারে না যাওয়ার কারণে। খালাতো বোনদের বকা শুরু করেছে কেন কেউ সাজিনাকে নিয়ে বের হচ্ছে না। দ্বীপের মত শান্ত, নিরিবিলি প্রাণী একটিও নেই এই বাসায়। ছেলেটা রাগে না, কাউকে আঘাত করে কথা বলে না। মাই ডিয়ার টাইপ পারসোনালিটি অথচ আজ ছেলেটাকে রাগিয়ে দিল। সাজিনার কান্না পেল ভাইয়ের আচরণে। আজ সে চলে যাবে অথচ ভাই তাকে এভাবে সবার সামনে বকল। সব দোষ ফোনের ওই ম্যাডাম এর। সাজিনা তাকে কখনো মেনে নিবে না। রিদন ভয়ে ভাইয়ের পাশে ঘেষছে না।

মিজান সাহেব ভাইবোনদের থামিয়ে দিলেন নিজে ব্যাপারটা দেখবেন জানিয়ে। দুপুর একটা নাগাদ সবাই বিয়ে বাড়ি পৌঁছে গেল। দ্বীপ রিকশার উপর বসে আছে। রিদি কলেজ থেকে বের হবে সেই সময়। দ্বীপকে দেখেই মুখে হাত দিল। রিদির দেয়া স্ট্রাইপের অফ সাদা ফরমাল শার্ট আর কালো প্যান্ট পরেছে আছে। দেখতে সাহেব বাবু লাগছে। রিদি তৎক্ষনাৎ ফোন দিয়ে বলল,

‘ বাবু মশাই এভাবে দিন-দুপুরে কলেজ ছুটির সময় আসা অনুচিত। যে কোনো মুহুর্তে যে কেউ আপনার ম্যাডামের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।’

রিদিকে রিকশায় উঠতে দেখে দ্বীপ হেসে নিজের রিকশাওয়ালাকে সামনে আগাতে বলল। ফোনে জবাব দিল, ‘ আমাকে আপনি বহুবার দেখেছেন আপনার পছন্দের বেশে। শুধু এই গরীবের চোখ দুটো অতৃপ্ত রয়ে গেল ম্যাডামকে মনের মত সাজে না দেখে।’

‘ সময় হোক। ম্যাডাম ধরা দিবে বাবু মশাই। ‘

‘ আমার চুল না পাকলে হয়।’

দুজনই একসাথে হাসছে। অথচ কে বলবে এই ছেলে বাসায় একটা রীতিমতো ঝড় তুলে দিয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছেই দেখতে পেল বর পক্ষ চলে এসেছে। আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে যায় সবার সাথে। সাজিনাকে বিদায়ের সময় মা, বাবা কাঁদলেও দ্বীপ এবং রিদন কাঁদেনি। দু’জন ই ভীষণ স্বাভাবিক। শুধু গাড়িতে দুঠার সময় সাজিনার বরের হাত ধরে দ্বীপ বলেছে, ‘ আমাদের ঘরের আলো নিয়ে যাচ্ছেন ভাই, যত্ন করবেন। অযত্নে স্বর্ন ও কালচে হয়। যদি কখনও বোঝা মনে হয় ফোন দিয়ে জানিয়ে দেবেন। আঘাত করবেন না দয়া করে। ‘

সাজিনার বর জড়িয়ে ধরল দ্বীপকে। বয়সে দ্বীপের চেয়ে চার বা পাঁচ বছরের বড় হবে৷ তবুও সম্মানের সহিত বললেন, ‘ ভাইয়া আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন। আপনাদের ঘরের স্বর্ন আমি আমার মাথার তাজ বানিয়ে রাখব। কথা দিলাম।’

দ্বীপের ঠোঁটে হাসি চোখে পানি। হয়ত সুখের পানি। সাজিনার বিয়ের গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার থেকে।

___

গত কয়েকদিন দাওয়াত খেতে খেতে শরীরের অবস্থা ভাল না৷ আজ খেলা আছে। রিদির সাথে সকালে দেখা করে এসেছে। দ্বীপকে তৈরি হতে দেখে রাহেলা রুমে এসে বসলেন। মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে তার মন ভালো না। দ্বীপ চা-তে চুমুক দিয়ে মাকে প্রশ্ন করল,

‘ আম্মু কি হয়েছে? মন খারাপ?’

রাহেলা খানম মাথা নাড়লেন দু পাশে। দ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছে নিশব্দ চাহনীতে। ছেলে মায়ের পাশে বসে মায়ের দু হাত মুঠোয় নিয়ে প্রশ্ন করল,

‘ আম্মু কি লুকাচ্ছেন?’

রাহেলা খানম প্রশ্ন করল, ‘ ওই মেয়েটা কেমন? আমাকে কি পছন্দ করবে?’

দ্বীপ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল, ‘ কোন মেয়েটা?’

‘ যার সাথে তোমার বন্ধুত্ব আছে।’

দ্বীপ মায়ের কথায় কিছুটা বিব্রতবোধ করল। মা রিদির সাথে তাদের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলছেন? ব্যাপার টা খুবই ভালো লাগল। কি সুন্দর, ভদ্রভাবে বললেন৷ এভাবে ও তো বলতেন পারতেন, যার সাথে তোমার সম্পর্ক আছে। অথচ তিনি ওই সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বললেন। অবশ্য বলার পেছনেও কারণ আছে। মায়ের একটাই আফসোস তার কোনো বন্ধু নেই। বাবাকে কখনোই মনে খুলে দুটো কথা বলতে পারেন নি। দুজনের মাঝে স্বামী স্ত্রী, ভালোবাসার সম্পর্ক থাকলেও বন্ধুত্বের সম্পর্কটা অনুপস্থিত।

‘ জিহান…?’

দ্বীপের ধ্যান বিচ্যুতি ঘটল। জবাব দিল, ‘ জি আম্মু।’

‘ ওর নাম কি?’

‘ রিধিমা ‘

‘ বাহ খুব সুন্দর নাম তো। ওকে বলবে আমার ছেলের বউ হতে হলে আগে আমার সাথে সই পাততে হবে। আমি ওকে রিধু ডাকব। ঠিক আছে?’

দ্বীপ মাথা নেড়ে দু চোখের পলক ঝাপটে বলল, ‘ ঠিক আছে, আর কিছু?’

‘ দেখা করাবে কবে?’

‘ ওকে আরেকটু বড় হতে দেন এরপর।’

রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে ফেললেন, ‘ আরেকটু বড় মানে? ও কিসে পড়ে?’

দ্বীপ মাথা চুলকে বলল, ‘ ইন্টারে।’

রাহেলা খানম মুখে হাত দিয়ে বললেন, ‘ আআ! ওমা অনেক ছোট তো। আমাদের রিদনের ও ছোট।’

দ্বীপকে আর লজ্জায় না ফেলে উঠে দাঁড়ায়। নাস্তার ট্রে টা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ মেয়ে ভাল তো?’

দ্বীপ হাসল মৃদু। রাহেলা বেরিয়ে গেলেন। দ্বীপ ও দেরি না করে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে ক্লাবের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল।

খেলা শেষে দ্বীপের বন্ধুরা সবাই কলেজ মাঠে একত্রিত হল। সবার পরনে সবুজ জার্সি। দ্বীপ টিউবওয়েল চেপে মুখ ধুতে ব্যস্ত। মুখ ধুয়ে ঘাড় ঘুরাতেই দেখল কলেজ ছুটি হয়েছে। দলে দলে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছে, একটু সামনে এগিয়ে এলো যদি রিদির দেখা পায়? নারকেল গাছ তলায় এসে দাঁড়াল। জুনিয়ররা সালাম দিচ্ছে। আজকের খেলার আপডেট নিচ্ছে। রিদিকে দেখতে পাচ্ছে প্রমা এবং মিরার সাথে কথা বলতে বলতে আসছে। দ্বীপ কে দেখে হাসি দিল। দুজনের দূরত্ব অল্প কিছু মিটার। আচমকা সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়াল। রিদি থমকে গেল। বাইক থেকে নেমে, হেলমেট খুলে রানা রিদির দিকে আগাল। রিদি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, রানা পেছন থেকে ডাকল,

‘ রিদি পায়ের কি অবস্থা? ব্যাথা আছে?’

রিদি ঘাড় ঘুরাল। এদিকে দ্বীপ বুঝার চেষ্টা করছে, রিদির পায়ের খবর রানা কেন নিচ্ছে? দ্বীপ ও খানিকটা আগাল। রানার সাথে কথা বলার অনিচ্ছা থাকার সত্ত্বে ও রিদি জবাব দিল, ‘ ভাল আছে। ‘

‘ জাবেদ কাকা ভাল আছেন?’

‘ আছে।’

‘ সেদিন আমি দেখিনি, দেখলে তো আর ইচ্ছে করে আত্মীয়ের পায়ে বাইক উঠিয়ে দিতাম না।’

রিদির গা জ্বলে উঠল। দ্বীপ সব শুনতে পাচ্ছে। রানা যেভাবে জোরে কথা বলছে, তা আশপাশের সবার কানে যাচ্ছে। রিদি দেখতে পাচ্ছে দ্বীপ চলে যাচ্ছে মুখ বিষন্ন করে । রিদি পায়ে ব্যাথার কারণ দ্বীপ থেকে লুকিয়েছিল। কলেজের পাতি গুন্ডার কারণে ব্যাথা পেয়েছে এটা শুনলে হয়ত ঝামেলা করবে কলেজে এসে। যেহেতু ফুটবল খেলে মোটামুটি অনেকেই দ্বীপকে চেনে। কলেজে এসে রানার খোঁজ করে যদি বাড়াবাড়ি করতে যায় নতুন ঝামেলা সৃষ্টি হবে।

রানা নিজের পথে চলে গেল। রিদি রানাকে বিচ্ছিরি একটা গালি দিল। প্রমা আর মিরা রিদির মুখে গালি শুনে অবাক হল। রিদিকে প্রশ্ন করতেই রিদি জানাল দ্বীপকে সে কিছুই জানায় নি। মিরা রাগ করে বলল, ‘ সম্পর্কে লুকোচুরি রাখিস কেন? ভাইয়া যদি তোকে এখন ভুল বুঝে এখানে তার অন্যায় হবে না।’

রিদি মন খারাপ করে দ্বীপকে ফোন দিল। দ্বীপ ফোন রিসিভ করেছে। কিন্তু কথা বলছে আরেকজনের সাথে, ‘ তুহিন, কালকে সকালে স্টেডিয়ামে আসিস। ‘
‘ রাফি বাসায় গিয়ে পায়ের যত্ন নেবে। ‘ আরো অনেক কথা। ‘

রিদি রিকশায় উঠে বলল, ‘ আমার সাথে একটু কথা বলো। ‘

‘ তুমি বলো , আমি শুনতে পাচ্ছি। ‘

‘ সরি।’

‘ কেন?’

‘ তোমার কাছ থেকে কথা লুকিয়েছি তাই।’

‘ ইটস ওকে।’

‘ আসলে তুমি শুনলে…।’

‘ রিদি… ব্যাখ্যা দিতে হবে না। তোমাদের নিজেদের ব্যাপার। আমাকে জানানো টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তোমার পা ভালো হয়েছে এটাই অনেক। ‘

‘ নিজেদের মানে?’

‘ রানা তো বলল ও নাকি তোমার আত্মীয়। ‘

‘ হ্যাঁ আমার দূরসম্পর্কের কী যেন হয়। তাই বলে তুমি এভাবে বলবে? আমি কষ্ট পেয়েছি দ্বীপ। ‘

দ্বীপ চুপ করে আছে। জোরে শ্বাস ছাড়ল। রিদি ওই পাশ থেকে শুনতে পেল। চোখ গুলো ছলছল করে উঠল রিদির। দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কতদূর গিয়েছ?’

কাঁপা গলায় বলল, ‘ শহীদ মিনারের সামনে।’

‘ রিকশা ঘুরাও। বেশিদূর যাওনি। কলেজে আসো।’

‘ এখন?’

‘ হ্যাঁ।’

‘ কেউ দেখলে।’

‘ তোমার অসুবিধা হোক এমন কিছু করব বলে মনে হয়? ‘

রিদি দু চোখ মুছে রিকশাওয়ালাকে বলল কলেজে যেতে। এদিকে দ্বীপ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিবে সেই মুহুর্তে কোথা থেকে রানা আবার উড়ে আসল। সবার মাঝখানে বাইক ঢুকিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ এসব ফুটবলে পেটের জ্বালা মিটবে না। টাকা কামাইয়ের জন্য ব্রেইন লাগে। ‘

কথাটা যে দ্বীপকে বলল তা স্পষ্ট। দ্বীপ কথা না বাড়িয়ে সামনে হাঁটছে। রানার বাইক অনেক দূর চলে গেছে। গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চ্যালাপেলাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। রিদির রিকশাও এসে থেমেছে খানিকটা দূরে । দ্বীপকে ফোন দিল রিদি৷ দ্বীপ ফোন ধরে বলল, ‘ একটা সুন্দর হাসি দিবে যাতে আমার মন ভালো হয়ে যায়। আরেকটা জিনিস চাইব।’

রিদি মুখে হাসি রেখে প্রশ্ন করল, ‘ কী জিনিস?’

‘ তোমার ওয়াটার পট।’

‘ পানি খাবে?’

‘ হুম।’

রিদি রিকশা ওয়ালাকে দিয়ে দ্বীপের কাছে পানির বোতল টা পাঠাল। দ্বীপ পানির বোতল টা হাতে নিয়ে রিকশাওয়ালাকে পাঠিয়ে দিল। রিদি ফোনে জিজ্ঞেস করল, ‘ পানি খাবে না?’

‘ হ্যাঁ খাওয়ার জন্যই তো রেখেছি। প্রতিদিন পানি খাব। এনিওয়ে এটা আর ফেরত পাচ্ছ না। তুমি এখন যেতে পারো।’

রিদি খিলখিল করে হেসে উঠল। রিকশা তখনও ঘুরে নি। রানাকে দেখে রিদি আড়াল হল। চলেই যেত কিন্তু দ্বীপের সাথে রানাকে কথা বলতে দেখে রিকশাওয়ালাকে একটু আগাতে বলল।

দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে রানা বলল, ‘ নেতা সাহেব, খেতা হয়েছে; মানুষ লাথি দেয়ার পরিবর্তে ফুটবলে লাথি দেয় আহারে। স্টেমিনা কমে গিয়েছে। জায়গা মত পুরুষত্ব খাটাতে পারবে তো নাকি বউ পালাবে?’

আশপাশের জুনিয়র রা সব শুনতে পেল। রিদির দিকে তাকাল দ্বীপ। মেয়েটার মুখে হাত। দ্বীপের বন্ধু, ছোট ভাই সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে ইচ্ছে করে রানা দ্বীপকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করছে। গতবছর কলেজের ভিপি ছিল দ্বীপ। কলেজ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, পদ ও আর নেই । রানা বছরের পর বছর ভিপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ায়। মাস্টার্সে বিগত তিনবছর ধরে আছে। গত বছর দ্বীপের জন্য হেরে গিয়েছে। এই অপমান ভুলে নি।

দ্বীপ বের হওয়ার পর পুনরায় ভিপি হয় রানা। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের ভাষ্যমতে এই আদুভাই রানা জীবনেও পাশ করবেনা ভিপি পদের লোভে। তার জুনিয়রেরা সব বের হয়ে যাচ্ছে অথচ সে আগের জায়গায় লটকে আছে।

মিজান সাহেবের অনুরোধে দ্বীপ ছাত্র রাজনীতি থেকে সরে এসেছে। যার কারণে কলেজে আসা ছেড়ে দিয়েছে। বন্ধু, বড় ভাই এবং শিক্ষকদের সাথে দেখা হলেই সকলের এক প্রশ্ন রাজনীতি ছেড়ে দিলে কেন? দ্বীপ হাসিমুখে জবাব দেয়, ‘ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজনীতির প্রয়োজন নেই। সঠিক সময় প্রতিবাদ করলেই হয়।’ দ্বীপের এত জনপ্রিয়তা রানার পছন্দ হল না ৷ এখনও কলেজে দ্বীপের গুণগান চর্চা হয়। তাই দ্বীপকে সামনে পেলেই খোঁচাতে থাকে। তবে রানা আজ বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।

দ্বীপের বন্ধুরা সবাই রানাকে মারতে আসলে, রানার চ্যালাপেলারা এগিয়ে যায়। দু পক্ষের মাঝে হাতাহাতি কারবার হওয়ার আগেই দ্বীপ জোর খাটিয়ে নিজের বন্ধু, ছোট ভাইদের শান্ত করে। রানাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ বিয়ে করে বাচ্চা সহ তোর বাসায় দাওয়াত খেতে যাব। তবে তুই একটু সাবধানে থাকিস। যে মরণ খেলায় নেমেছিস , পুরুষত্বের খায়েশ পরে করিস ; জান বাঁচাতে পারিস কিনা সেটা দেখ। তোর গড ফাদারই তোরে খাবে।’

রানা উচ্চ স্বরে বলল, ‘ নিজেকে কুল দেখাস তাই না, সব পরিস্থিতি সামলাতে পারার নাটক করিস? কি ভাবিস তুই নিজেকে?’

‘ তুই যা ভেবে আমাকে সামনে পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে চাস তাই ভাবি। নতুবা আমার মত সুন্দর ছেলের প্রেমে পড়ার কথা মেয়েদের। তুই তো ছেলে, তুই কেন আমার পিছে ঘুরিস? ‘

‘ খুন করে ফেলব…’

‘ থেমে যা। বলা যায় না, আমি যদি সত্যি খুন হই৷ তখন পুরা কলেজ সাক্ষী দিবে তুই খুনী। সেখানে যদি তুই যদি খুনী না হোস, তবুও বাঁচতে পারবিনা। মুখের কথা প্রমাণ হয়ে থাকে আজীবন। রাজনীতি করতে নেমেছিস, বুদ্ধি খাটিয়ে চলবি। ফাপরবাজি দিয়ে রাজনীতি চলে না। গুরুজনেরা বলেন, ডান হাত দিয়ে খুন করলে বাম হাত যেন টের না পায়। দুই একজনকে কোপাবি ভাল কথা, তবে সেটা মনে মনে রাখবি।এভাবে জনসম্মুখে বললে, জন আক্রোশে পড়বি। তোর গডফাদারও তোর মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নেবে। এনিওয়ে ফ্রিতে অনেক জ্ঞান দিলাম। ভালো থাক।

দ্বীপ সামনে পা আগাল। পুনরায় থেমে বলল,

‘ আরেকটা কথা, তোর চ্যালাপেলা দের আমার পেছনে লাগতে মানা করবি। শুধু যে গোল ঠেকাই তেমন নয়, প্রয়োজনে দু একটা দিতেও পারি। লাত্থি দেয়া শুরু করলে আমি ভুলে যাই কোনটা মানুষের মাথা আর কোনটা ফুটবল।’

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৫

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৫.
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষেধ)

দাদীকে ঔষধ দিয়ে বাবার সাথে দাদীর স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করছিল দ্বীপ। ঔষধে অনিয়ম করেন দাদী। মা ও মাঝে মাঝে কাজের চাপে ভুলে যান। বাবাকে দাদীর সব ঔষধ প্রেসক্রিপশন সহ বুঝিয়ে দিচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর হাতের ফোন দেখছে । কোনো মেসেজ আসে কিনা। হয়তো দ্বীপ অহেতুক আশা নিয়ে বসে আছে। অকস্মাৎ ফোন এল। পরিচিত নম্বর। বসা থেকে উঠার জন্য শক্তি পাচ্ছে না। যদি না করে দেয়? পরক্ষণে মনে হল, এত ভেঙে পড়ার মত কিছু নেই। না করে দিলে নাহয় না করে দিবে, হয়ত কিছুদিন মন খারাপ থাকবে ; এর চেয়ে বেশি কিছু তো নয় । ফোন রিসিভ করল নিজের রুমে এসে। ও পাশ থেকে জানাল এখন দেখা করতে। তৈরি হতে পাঁচ মিনিট সময় নিল।

তিন বান্ধবীকে রেস্টুরেন্টে একসাথে দেখতে পেল। মিরা এবং প্রমা চলে যেতে চাইলে দ্বীপ বারণ করল। একই টেবিলে বসতে বলল। এদের মাঝে সবচেয়ে রোগা এবং বিমর্ষ দেখাচ্ছে রিদিকে। কেমন যেন প্রাণহীন। প্রশ্ন করল, ‘ কি হয়েছে, চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন?’

মিরা জবাবে বলল, ‘ ভাইয়া জ্বর ওর। গতকাল রাতে সেন্সলেস হয়ে পড়ে গিয়েছে। আজ কলেজেও আসেনি। প্রাইভেটে আংকেল দিয়ে গেল।’

ভ্রু কুচকে গেল দ্বীপের,
‘ হঠাৎ জ্বর কেন আসল?’

মিরা এবং প্রমা ওদের রেখে দুই টেবিল পেছনে চলে গেল। রিদি চুপ করে বসে আছে। দ্বীপ চিন্তিত। রিদি বিষন্ন গলায় বলল, ‘ আমি পারব না এই সম্পর্কে জড়াতে। হ্যাঁ বলব নাকি না বলব, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমার জ্বর উঠে গিয়েছে। এরপর ভবিষ্যতে না জানি কি হবে। এত দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে পরীক্ষাই দিতে পারব না। ‘

দ্বীপ চুপ থেকে বলল, ‘ ঠিক আছে। বাসায় যাও। শরীরের যা অবস্থা আজ প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন নেই। ‘

রিদি নড়ল না। আগের জায়গায় বসে আছে। দ্বীপ ওয়েটার ডেকে কিছু খাবার তিনজনের জন্য পার্সেল করে দিতে বলল। মিরা প্রমা না করেছে তবুও শুনেনি। তিনজনই লজ্জায় পড়ে গেল। এরপর তিনজনকে চলে যেতে বলল। ওরা চলে গেল কিন্তু দ্বীপ আগের জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছে।

রিদিকে বাসায় পৌঁছে দিল মিরা। রাস্তায় আজ মিরা নিজেও রিদিকে সাহস দিল। বুঝাল মন যা চায় তাই করতে। বাসায় এসে হালকা কিছু খেল। টেবিলের উপর খাবারের পার্সেল টা রাখল। আমিনা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পেয়েছে। জানাল মিরা কিনে দিয়েছে। পাশের বাসার একজন এসেছে আমিনার সাথে গল্প করতে। তার ছোট দুটো বাচ্চা আছে। ওরা ছুটে চলে আসে রিদির রুমে। নুভা আর নুহাশের খেলনা এই রুমেই থাকে। রিদির আজ ভালো লাগছে না। মাকে বলল, ‘ আম্মু আমি দরজা লাগিয়ে ঘুমাচ্ছি ডেকো না। ঘুম ভাঙলে দরজা খুলব।’

আমিনা বুঝতে পারলেন রিদি হয়ত বাচ্চাদের সাথে খেলতে চাচ্ছে না। শরীর ভালো না মেয়েটার। রিদি অপরাধবোধ নিয়ে বিছানায় মাথা এলিয়ে দিল। আসার সময় জিহানের চেহারা দেখেছিল। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে একবার অনুরোধ করত। কিন্তু দ্বীপ দ্বিতীয় কোনো শব্দ উচ্চারণ করে নি। আচ্ছা রিদি কি কোনো ভাবে জিহানকে কষ্ট দিলো? রিদির মনে এসব প্রশ্ন উঠানামা করতেই আনমনে দ্বীপকে ফোন দিল পরিস্থিতি বুঝার জন্য। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হল। রিদি জিজ্ঞেস করল, ‘ কি করছেন?’

দ্বীপ উত্তর দিল, ‘ আগের জায়গায় বসে আছি।’

রিদি চমকে গিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ আগের জায়গা মানে? ওই রেস্টুরেন্টে? ‘

‘ হুম।’

‘ কেনো? আমরা আসার পর প্রায় দেড় ঘন্টা পার হয়েছে। আপনি একই জায়গায় কেন বসে আছেন?’

‘ কি করব? মাথা কাজ করছে না। বাসায় গেলে আব্বু আম্মু প্রশ্ন করবে। বন্ধুদের সাথে দেখা করলে চেহারা দেখে উলটা পালটা কিছু ভাবতে পারে৷ এখান থেকে বের হয়ে কোথায় যাব বুঝতে পারছিনা। তাই চুপচাপ এখানেই বসে আছি। কেউ প্রশ্ন করার মত নেই।’

‘ কি হয়েছে আপনার চেহারার?’

‘ রিদি তুমি বুঝো না নাকি বুঝতে চাইছ না, কোনটা? আট দশ টা প্রেম করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। তুমিই প্রথম আমার জীবনে। এভাবে প্রত্যাখ্যাত হব জানলে কখনো আগাতাম না। যদিও আমি জানিনা আমার অপরাধ কি? তবুও আমি নিরব ভূমিকা পালন করছি। হয়ত কিছুদিন পর ভুলে যাব। যাই হোক, ফোন দিয়েছ কেন? শরীর ভাল আছে এখন?’

রিদি চুপচাপ থেকে কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বলল, ‘ প্রথম শর্ত আব্বু আম্মুকে রাজি করানোর সব দায়িত্ব আপনার, দ্বিতীয় শর্ত আমি মেডিকেলে পড়তে চাই, তৃতীয় এবং শেষ শর্ত আমাকে সারাজীবন ভালবাসতে হবে, কোনোভাবে ধোঁকা দেয়া যাবে না। আমি একশো বার ভুল করব। কিন্তু আপনাকে হাজার বার সরি বলতে হবে। আমি কোনো রিস্ক নিতে পারব না, সব আপনাকে নিতে হবে। মাঝে মাঝে আমি সিদ্ধানহীনতায় ভুগে উলটা পালটা সিদ্ধান্ত নিই।সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। রাজি?’

দুপাশ নিরব। দ্বীপ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মনে মনে ভাবছে এই মেয়ে মোটেও ছোট নয়। নিজেরটা ঠিক বুঝে। ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা ফুটেছে তা যদি রিদি একবার দেখত বিদায় অনুষ্ঠানের দিন যেভাবে প্রেমে পড়েছিল আজ আরেকবার প্রেমে পড়ত। প্রানবন্ত হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল, ‘ শরীর ভাল হলে ফোন দিও। দেখা করব। বিশ্রাম নাও সব ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে। দুশ্চিন্তা সব আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। এপ্রিলে পরীক্ষা কিভাবে ভালো করবে সেটা ভাব। পরীক্ষা খারাপ করে আমার সব পরিশ্রমে জল ঢেলে দিও না। তোমার আব্বু আম্মুকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। ‘

রিদি ফোন কেটে দিল৷ মনে হল বুকের উপর থেকে পাথর সরে গেল। আজ একটা আরামের ঘুম দিল। রাতে ঘুম থেকে উঠে পেট ভরে ভাত খেল। আমিনা আজ অনেক খুশি। মেয়েটাকে সুস্থ লাগছে। জাবেদ সাহেব মেয়ের পছন্দের বিস্কুট, চিপ্স,চানাচুর এনে রাখলেন বাসায়। রাত জেগে পড়বে আজ। বাসার শিক্ষককে আমিনা আজ আসতে বারণ করে দিয়েছিলেন। পড়ার টেবিলে রিদির পছন্দের খাবার রেখে শুতে গেলেন আমিনা। রিদি মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। প্রায় ঘন্টা খানেক পড়ার পর ফোন হাতে নিল। আজ আমিনা মেয়ের কাছে ফোন রেখে গিয়েছেন। রিদি জানিয়েছে ফোনে ‘ কোয়ান্টাম তত্ত্ব ‘ পড়বে। রাত যখন গভীর রিদি ফেসবুকে ঢুকে মেসেজ দিল দ্বীপকে। মেসেজের উত্তর না পেয়ে মনে পড়ল দ্বীপ তো বারোটার মাঝেই ঘুমিয়ে যায়। পড়ায় মনোযোগ দিল, মাঝে মাঝে বন্ধুদের দু একটা মেসেজ দিচ্ছে।

ঠিক আধঘন্টা পর দ্বীপ রিপ্লাই দিল, ‘ বাহ! এ তো দেখি আমার চাঁদ। আজ সে ফোন কোথায় পেল?’

রিদি তখন ‘লা শাতেলিয়ার নীতি’ পড়ছিল। মেসেজের এমন রিপ্লাই দেখে লজ্জা পেয়ে হেসে উঠল। গম্ভীরমুখো, সিরিয়াস সিরিয়াস কথা বলা মানুষ টা এমন সম্বোধন করতে পারে ভেবে ভীষণ অবাক হল।রিপ্লাই দিতেও লজ্জা লাগছিল। দ্বীপ যদি আজ লাজুক রিদির লাজে রাঙা গাল দুটো দেখত নির্ঘাত বলত,

‘ এই গাল দেখার জন্য হলেও প্রতিদিন তোমাকে মায়া জড়ানো সম্বোধন করব।’

কানের গোড়ায় কলম রেখে রিপ্লাই করল রিদি, ‘ পড়া আছে, তাই আম্মুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। অসুস্থ বলে মাফ পেয়েছি। ‘

‘ নাহ যতটা বোকা ভেবেছিলাম, ততটা বোকা না ম্যাডাম । ঠিক আছে পড়েন। বিরক্ত করব না।’

‘ এই না, আমি পড়তে পড়তে কথা বলব। আপনি থাকেন। ‘

‘ পরে বলবে না তো আমি বিরক্ত করেছি?’

‘ নাহ বলব না। ‘

‘ জ্বর আছে? খেয়েছ কিছু?’

‘ রাতে আজ এক প্লেট ভাত খেয়েছি। এখন আপনার কিনে দেয়া বার্গার খাচ্ছি। আম্মু গরম করে দিয়েছে।’

‘ গুড, বেশি করে খাও। অসুস্থ হলে তো পড়তে পারবে না। ‘

টুকটাক কথা বলতে বলতে প্রায় ভোর। রিদি বিদায় জানাতে ভুলে গিয়েছে। পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল সাতটায় এসে আমিনা তুলে দিলেন। কোনো রকম তৈরি হয়ে বের হয়ে গেল। প্রাইভেটের সামনে এসে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখল। দ্বীপ রাস্তার বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চমকে উঠল রিদি। ফোনে মেসেজ এল দ্বীপের, ‘ তোমাকে দেখতে এলাম। আজ দশ মিনিট লেট করেছ। কাল থেকে এত রাত জেগে পড়ার প্রয়োজন নেই।’

রিদি হাত দিয়ে ইশারা দিল। দ্বীপ সরাসরি ফোন দিল। বলল, ‘ আমি প্রতিদিন আসব কোনো না কোনো প্রাইভেটে। সব প্রাইভেটের সময় তো জানি। একবার দেখে চলে যাব। তুমি কথা বলবে না। সাথে ফ্রেন্ডরা সন্দেহ করবে। অন্যদিকে কলেজে যাওয়া যাবে না। সবাই আমাকে চেনে।’
__

কলেজ গেট দিয়ে লাফাতে লাফাতে ঢুকছে। প্রেমে পড়লে মন উড়ু উড়ু থাকে। মিরা আর প্রমা রিদির এমন লাফালাফি দেখে হাসছে। রিদি আশপাশে তাকিয়ে যত সহপাঠী, সিনিয়র এবং জুনিয়র ছেলে দেখছে সবাইকে দেখে নাক ছিটকাচ্ছে। আপাতত তার কাছে দ্বীপের মত সুন্দর পুরুষ আর একটিও নেই। আনমনে হাঁটতে গিয়ে গর্তে পা পড়েছে। মিরা ধমকে বলল, ‘ পাগলামী করছিস কেন, সাবধানে হাঁটতে পারিস না? এমন লাফাচ্ছিস কেন? ‘

রিদি হেসে ফিসফিস করে বলে, ‘ নতুন নতুন প্রেম করছি, একটু সেলিব্রেট করতে দে।’

তৎক্ষনাৎ একটা বাইক পাশ দিয়ে শাঁ করে গেল। রিদি গর্তে পা পড়ার ফলেও এত ব্যাথা পায় নি যতটা ব্যাথা বাইকের সাথে লেগে পেয়েছে। পা ধরে নিচে বসে পড়ল। আশপাশের সবাই ছুটে আসল। প্রমা চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ মানুষজন দেখে বাইক চালাতে পারে না এরা , এটা কলেজের রাস্তা ভুলে যায় বদমাশগুলো। ‘

প্রমার গালি শুনে বুম বুম আওয়াজ করে বাইক টা পুনরায় একই জায়গায় এসে থামল। হেলমেট টা খুলতেই আশেপাশের মানুষ জন দূরে সরে গেল। মেয়ে তিনটা ভ্রু কুচকে ফেলল। কোথায় তাদের সাহায্য করবে তা না উলটো দূরে সরে গিয়েছে। রিদির সামনে নিচু হয়ে বসল ছেলেটা । প্রশ্ন করল, ‘ বেশি ব্যাথা পেয়েছ?’

মিরা বলল, ‘ ব্যাথা দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন ব্যাথা পেয়েছে কিনা, এটা কেমন আচরণ? ‘

মিরার দিকে ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘ ব্যাথা কি তুমি পেয়েছ?’

মিরা ঢোক গিলল। রিদি এতক্ষণ চুপ ছিল৷ প্রমা এবং মিরাকে বলল তাকে তুলতে। তারা লক্ষ্য করল কিছু সময়ের মাঝেই বখাটে বাইকারের আশেপাশে অনেক গুলো ছেলে উপস্থিত হয়েছে। তিনটে মেয়ে মানুষ আশপাশের সবাই দূরে সরে গিয়েছে, এবার ভয় লাগাটা স্বাভাবিক। ছেলেটা এগিয়ে আসল রিদির দিকে। শীতল চাহনীতে বলল, ‘ তুমি জাবেদ কাকার মেয়ে রিদি না?’

রিদি চমকে উঠল। পুনরায় লোকটা তার পাশে থাকা ছেলেগুলোর মাঝে একজনের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ মাহির যা তো আপুকে সি এন জি ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যা। কি হয়েছে দেখ? ‘

ছেলেটার দিকে এক হাজার টাকার দুটো নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ আর লাগলে ফোন দিস। বিকাশে পাঠিয়ে দিব।’

পুনরায় চলে গেল। মিরা একটা বিচ্ছিরি গালি দিল ওই ছেলে না শোনা মত। প্রমা আর রিদি শুনল। রিদি তখনও প্রমার কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে ছিল। মাহির ছেলে টা এসে রিদিকে বলল, ‘ আপু আপনি দাঁড়ান, সি এন জি ডাকছি। ‘

মেয়ে তিনটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ধামড়া, ইয়া বড় এক ছেলে তাদের আপু ডাকছে। রিদি প্রতিবাদ করে বলল, ‘ আমি যাব না। ‘

মাহির বলল,’ প্লিজ আপু চলুন। আপনি না গেলে ভাই রেগে যাবে।’
রিদিও ক্ষেপে বলল,’ আমার পা, যাব কি যাব না সিদ্ধান্ত আমার। আপনার ভাই বলার কে?’

‘ উনি কলেজের ভিপি, রানা ভাই। আপনি ভাইকে চেনেন না?’

‘ ভিপি কি? ভাইস প্রিন্সিপাল? এত কম বয়সে? ভাইস প্রিন্সিপাল এত ছ্যাঁচড়া হয়? বাইক নিয়ে বখাটেদের মত ঘুরে? এত গুলা চ্যালা চামুন্ডা পালে?’

থতমত খেয়ে গেল সবাই। মিরা আর প্রমা হা করে আছে। রিদি সচরাচর এভাবে তর্ক করে না আজ একেবারে মুখের উপর বলে দিল কত গুলো কথা! রিদি পা ঠেলে সামনে খানিকটা আগাল। রিকশা ডেকে নিজেই রিকশায় উঠে গেল। আজ ভেতর টা রাগে ভরে গেল রিদির। রিদি ঠিক চিনেছে এই ছেলেকে। ভিপি বলতে যে কলেজের পাতি নেতা সেটাও বুঝেছে। ইচ্ছে করে কথা গুলো শোনালো যাতে ওই ছেলে পর্যন্ত যায়। যতদূর বুঝতে পারছে চাচা এই ছেলেটার কথাই সেদিন তার বাবাকে বলেছিলেন,

‘ রুস্তম ভাইয়ের ছেলে রানা রিদিদের কলেজের ভিপি। ক্ষমতা আছে হাতে। কলেজ থেকে বের হলেই হয়ত ভালো কোনো রাজনৈতিক পদে চলে যাবে। ইলেকশন ও করতে পারে। রিদির জন্য দেখতে পারেন। পাত্র হিসেবে খারাপ না। রুস্তম ভাই প্রস্তাব দিয়েছেন।’

আজকে রানা যেহেতু তার নাম নিয়েছে তার মানে পারিবারিক ভাবে তারা রিদির ব্যাপারে আলোচনা করে।

এই ঘটনার পর রিদি বিশ্রাম নিয়েছে বাসায় বেশ কিছুদিন। প্রাইভেটে ও যায় নি কয়েকদিন। দ্বীপকে জানিয়েছে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। বাসায় ও জানায়নি কিভাবে ব্যাথা পেয়েছে। বাসায় জানালে জাবেদ সাহেব কলেজ গিয়ে ঝামেলা করবে নতুবা পরিচয় করিয়ে দিবে ওই ছেলের সাথে আরও ভালোভাবে। এসব ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে রিদি।

এদিকে দ্বীপ আগে থেকে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেল রিদির বাবা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে৷ আগে যদিও একান্তে দেখা করার নাম নিত এখন প্রাইভেটে দূর থেকে দেখা, এক প্রাইভেট থেকে অন্য প্রাইভেটে যেতে ফোনে কথা বলা, কখনো যদি রিদি তার মায়ের কাছ থেকে ফোন নিয়ে আসতে পারে, তখন টুকটাক মেসেজ চালাচালি হয়। এইত প্রেম নিরব, সুন্দর। যদিও রস কষহীন প্রেম, কোনো রোমান্টিকতা নেই ; কোনো অতিরিক্ত কিছু নেই, তবুও সুন্দর কারণ দুজনই এমন অনুভূতিতে নতুন। রিদি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে দ্বীপের সমবয়সী ছেলের যেখানে এক ডজন বান্ধবী থাকার কথা সেখানে দ্বীপের কেন কোনো বান্ধবী নেই? কোনো অতিরিক্ত চাহিদা নেই? তার কি কখনো আগ্রহ জাগে নি? নাকি সে খারাপ, মুখোশ আছে এই ভাল মানুষীর আড়ালে। হাজার ও প্রশ্ন মনে। দ্বীপকে এই প্রশ্নগুলো কৌশলে করবে।

সুস্থ হয়ে সতর্ক হয়ে কলেজে যায়। রানাকে দেখলে আড়াল হয়ে যায়। চোখাচোখি হলে যদি উলটা পালটা প্রশ্ন করে তখন ঝামেলা। সে চায়না কলেজে কেউ জানুক রিদি এবং রানা আত্মীয়। এই কয়দিনে এত টুকু বুঝেছে কলেজের মেয়েরা রানার সাহচার্য বেশ পছন্দ করে। রিদিদের ক্লাসের শান্তা, অতসী তো পারে না রানা ভাইয়ের কোলে চেপে বসতে। আরেকদল ছেলে আছে, পারলে রানা ভাইকে মাথায় তুলে নাচবে। এসব দেখে অতিষ্ট তিন বান্ধবী।

___

সকালে আজ দ্বীপ আসেনি প্রাইভেটের সামনে। সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে প্রতিদিন রুটিন করে প্রাইভেটে এসে রিদিকে দেখে যায়। বিকেলের প্রাইভেটেও আসে যেদিন সকালে আসে না সেদিন। আজ কোনো প্রাইভেটেই দ্বীপ নেই। ফোন দিল ফোন বন্ধ। মেসেজ দিল, উত্তর নেই। সম্পর্কের আজ দুইমাস। গত দুইমাসে এমন টা কখনো হয় নি। আজই প্রথম। রিদি বাসায় ফিরে নিজের আইডি থেকে মেসেজ দিয়েও অফ লাইন পেল। আজ রাতে অনুরোধ করে মা থেকে ফোন রাখল। সারা রাত নির্ঘুম কাটল। দ্বীপ এলো না অনলাইনে।

সকালে প্রাইভেটের সামনে গিয়ে দেখে দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু এসব সিনেমাতে হয়। রাস্তার মানুষ বাজে মেয়ে ভাববে। দ্বীপ ফোন দিল। রিদি রিসিভ করেই চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ আপনার সমস্যা কি? ‘
‘ আগে তুমি সম্বোধন কর এরপর বলছি, নতুবা বলব না।’
রিদির রাগ কমেনি। একই জোশ নিয়ে সম্বোধন পালটে বলল, ‘ তোমার সমস্যা কি? কোথায় ছিলে গতকাল?’
‘ তোমার মুখে তুমি শুনতে কি যে ভাল লাগছে, তোমাকে আমার বউ বউ লাগছে।’
‘ আবার দুষ্টুমি করছ? গতকাল সারাদিন, সারা রাত এত দুশ্চিন্তায় কেন রেখেছ?’
‘ তুমি আমার জন্য দুশ্চিন্তাও করো? ‘
‘ মজা করবে না’
‘ আচ্ছা আচ্ছা, আসলে গতকাল ফুটবল খেলতে গিয়ে আঙুল ভেঙে ফেলেছি ৷ ব্যান্ডেজ করা ছিল। হাঁটতে পারছিলাম না। রাতে ব্যাথায় জ্বর চলে এসেছিল। হুঁশ ও ছিল না, ফোনে চার্জ ও ছিল না।

‘ ইয়া আল্লাহ! তুমি ফুটবল ও খেল? এখন কেন এসেছ এই ব্যাথা নিয়ে? কিভাবে এসেছ, বাসা থেকে আসতে দিল কি করে?’

‘ আস্তে! একসাথে এত প্রশ্ন কেউ করে? সবাই ঘুমে দরজায় তালা লাগিয়ে এসেছি। তোমাকে না দেখে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই চলে এলাম। দেখা শেষ, চলে যাব এখন। পায়ে সামান্য ব্যাথা করছে তবে ওই ব্যাথাও হালকা হয়ে গিয়েছে তোমাকে দেখে। আরেকটা কথা, আমি ফুটবল খেলি এবং সবাই তো বলে ক্লাবের ওয়ান অফ দ্য বেস্ট গোল কিপার।’

‘ স্যার আসছে। বাসায় যাও বাকি কথা পরে বলছি।’

দ্বীপ বাসায় আসল অনেক কষ্টে। বাসায় এসে দেখে সবাই ঘুম থেকে জেগে গিয়েছে। রাহেলা খানম ছেলেকে বকে বকে বললেন, ‘ পায়ের কি অবস্থা বের হয়েছ কেন?’
মায়ের মন, কিছু কি আর লুকানো যায়? প্রশ্ন করে বসলেন, ‘মেয়েটা কে?’
দ্বীপ কিঞ্চিৎ হেসে ফেলল লজ্জা পেয়ে। রাহেলা খানম বিস্মিত ছেলেকে লজ্জা পেতে দেখে। এই ছেলে প্রেমেও পড়ে? তফুরার মেয়েটা কত সুন্দর। এই বাসায় আসলে আগে পিছে ঘুরে। ফিরেও তাকায় না ওই মেয়ের দিকে। অথচ বাইরের মেয়ে মন জয় করে ফেলল? যার জন্য পায়ে ব্যাথা নিয়ে বের হয়ে গেল এই ভোর সকালে?

মাকে চিন্তিত দেখে দ্বীপ বলল, ‘ দুশ্চিন্তা করবেন না আম্মু, সময় হোক সব বলব।’

রাহেলা খানম খুশি হলেন নাকি বেজার হলেন বুঝা গেল না তবুও আশ্বস্ত করলেন। বললেন এবার যেন কিছু একটা করে । বয়স তো কম হয় নি, পঁচিশের ঘরে পা দিয়েছে। চাকরি ছাড়া তো মেয়ে বিয়ে দিবে না কেউ? দ্বীপ জানাল, সে চাকরি করবেনা। ব্যবসা করবে নতুবা ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিবে। রাহেলা বেগমের দীর্ঘ শ্বাস। কি পেল ছেলে ফুটবলের মাঝে?

___

বাসায় এসে রিদি ফোন দিল। আজ বাসায় কেউ নেই। আমিনাও নেই। তার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছে। দ্বীপ ফোন রিসিভ করতেই রিদি বলল,

– তুমি সুস্থ আছ? পা ঠিক আছে?

ও পাশ থেকে প্রতি উত্তর ,

– আছে ভাল। আফসোস টুর্নামেন্ট টা খেলতে পারব না।

– এই খেলা না খেললে কি হয়? ফুটবল খেলতে কাউকে দেখলেই আমি গালি দিই। গতবার কলেজের মাঠে এক বেয়াদপ, অসভ্য লোক ফুটবল মেরে আমার কোমড় ভেঙে দিয়েছে। ইচ্ছেমত বদদোয়া দিয়েছি যেন ওর পা ভেঙ্গে যায়। জীবনেও খেলতে না পারে।’

দ্বীপ শুকনো ঢোক গিলে প্রশ্ন করল, ‘ কখনকার ঘটনা এটা?’

‘ আরো ছয়-সাত মাস আগে। একদিন ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম, স্কুল মাঠের রাস্তা ধরে গেট দিয়ে বের হব সেই মুহুর্তে বল এসে কোমড়ে লাগল। পনেরো দিন বেড রেস্টে ছিলাম। বেয়াদপ, অসভ্য ফুটবলার। সামনে পেলে আমি লাঠি পেটা করতাম ওকে। ‘

‘ সামনে তো প্রতিদিনই পাও। তবে রিদি আর বদদোয়া দিও না। বদদোয়া লেগে যায়। কিছু আঘাত দূর্ঘটনার,ইচ্ছাকৃত নয়। তোমার কোমড় ভেঙ্গে দেয়া সেই বেয়াদব,অসভ্য গোল কিপারটাই আমি।’

রিদি চমকে গিয়ে মুখে হাত দিল। হায় হায় করে মাথায় হাত দিল। কি করল সে? কেন বদদোয়া দিল৷ তার বদদোয়ায় আজ মানুষটার এই অবস্থা। বুক ভেঙে কান্না আসছে। বলতে বলতে হাউ মাউ করে কেঁদে দিল। দ্বীপ সামলাতে ব্যর্থ হল। রিদি অনুরোধ করে বলল ফুটবল ছেড়ে দিতে। যে বদদোয়া দিয়েছে পা ভেঙ্গে গেলে তো আরো বড় বিপদ হবে।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৪

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৪.

রাহেলা খানমের মন ভার আজ। তার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হল প্রতিদিনের রান্না নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়ে ফ্রিজের সামনে বসবে। এরপর কোন তরকারির সাথে কোন তরকারি, মাছ না মুরগী, আলু না কুমড়া সব মিলিয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবে আজকে কি রান্না হবে। রান্না চুলায় চড়ানোর আগে সে স্বামীর কাছে গিয়ে স্বামীর পছন্দ শুনবে তিনি আজ কি খেতে চান? যদি স্বামীর পছন্দ আর তার আজকের পরিকল্পনা মিলে যায়, সে খুশি মনে তরকারির আরও একটা পদ রান্না করবে। আর যদি না মিলে ছেলে মেয়েদের কান্না করতে করতে বলবে, ‘ আমার জীবনে সুখ নাই, তোমাদের বাবা আমাকে বুঝল না। আমি এত বছর শুধু খেটেই গেলাম।’

ভদ্রলোক মিজান সাহেব অথচ এসবের কিছুই জানেন না। তিনি যদি এসব কিছু জানতেন তবে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বনবাসে চলে যেতেন। এমনিতেই তার কিছু ইচ্ছে আছে, যুবক বয়সে বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে কুমিরের খপ্পরে পড়েছিলেন। সেই কুমির তাকে কামড় দেয় নি, কি করুন চোখে তাকিয়ে ছিল। কারণ মা কুমিরের বাচ্চা টা মারা গিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ কথা বাসায় এসে যখন রাহেলা খানমকে বললেন, রাহেলা বলেছেন কুমির নাকি মিজান সাহেবের মাঝে কুমিরের মরে যাওয়া বাচ্চাটাকে দেখেছে তাই খায় নি। অতি আবেগী মিজান সাহেব এই কারণে কুমিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কুমিরের বাচ্চা পালবেন। এই কথা রাহেলা বলেছেন,

‘ তুমি তো একটা মরা কুমির কিন্তু তোমার ঘরে যে জ্যান্ত কুমির আছে, তাকে সামলানোর ব্যবস্থা কর৷ সামনে তুফান আসতেছে।আপাতত সে এখনও ঘুমন্ত, তাই কিছু টের পাচ্ছ না ।’

রাহেলার এই কথার মারপ্যাচ তিনি ধরতে পারলেন না। তিনি কিছু টাকা জমিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে অষ্ট্রেলিয়া যাবেন এবং সেখান থেকে কিছু ” ফ্রেশি বা অষ্ট্রেলিয়ান ফ্রেশ ওয়াটার ক্রোকোডাইল ” নিয়ে আসবেন। তিনি শুনেছেন এই প্রজাতি মানুষ খায়না। পোকামাকড় এবং ফ্লাংটন খেয়ে বেঁচে থাকে। আপাতত সেই চিন্তা বাদ দিয়ে হাতের টাকা গুলো আরেকবার গুনলেন। না ঠিকঠাক আছে। বড় ছেলেকে ডাক দিলেন,

‘ জিহান ব্যাংকে গিয়ে টাকা গুলো রেখে আসো। একসাথে এত টাকা বাসায় রাখা রিস্ক। সাথে রিদনকে নিয়ে যাও।’

বাবার কথা শুনে শোয়া থেকে উঠেছে দ্বীপ। সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে থাকার ফল। কিসের জন্য প্রতীক্ষা সে নিজেও জানে না। মিজান সাহেব মেয়ের বিয়ের জন্য গ্রামের কিছু জায়গা বিক্রি করেছিলেন। সেই জায়গার টাকা আজ পেলেন। এত টাকা বাড়িতে রাখা অনিরাপদ। তাই ছেলেদের ব্যাংকে পাঠাচ্ছেন।

চোখ ঢলতে ঢলতে কোনো রকম হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে যাবে এর আগেই রাহেলা ছেলেকে ডাকলেন। নাস্তা খাইয়ে দিতে দিতে বললেন,

‘ না খেয়ে যাওয়া ঠিক না বাবা। তোমার কি শরীর টা বেশি খারাপ? গত কয়েকদিন ধরে দেখছি রুম থেকে বের হচ্ছ না। পিসির সামনে বসে থাক। ‘

‘ আম্মু তেমন কিছু না। ‘

পাউরুটিতে দু কামড় দিয়ে বের হয়ে গেল। শীতের প্রকোপ বাড়ছে। চিনচিনে বাতাস। চারদিক কুয়াশায় ঘেরা। জানুয়ারির শীতে কাবু হয়ে গেছে শহরটা।রিকশায় উঠেই আশপাশে তাকাচ্ছে। চারদিকে কত মেয়ে, এদের মাঝেই হয়ত পরিচিত মানুষটা আছে।
যে পরিচিতা, তবুও অপরিচিতা।

রিদন এসেছে গতকাল চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে রিদন। ভাইকে অন্যমনস্ক দেখে দুইবার ডাকল। তৃতীয় বার ডাকতেই দ্বীপের হুঁশ ফিরল। রিদন মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে এড়িয়ে গেল। ব্যাংকের কাজ শেষ করে রিদনকে বাসায় পাঠিয়ে দিল। কলেজের মাঠে গ্যালারিতে এসে চুপ করে বসে রইল বেশ কিছুক্ষন। ঠান্ডায় বসা যাচ্ছে না। গলার মাফলার টাও আসার সময় নিয়ে আসেনি তাড়াহুড়োর মাঝে। আজকে মাঠ নিরব। একপাশে কিছু স্টুডেন্ট বসে আছে, অন্য পাশে দু একটা জুটি । ঘড়িতে দুপুর একটা বাজে। তবুও মনে হচ্ছে এখন ভোর। সূর্য নিচে নামতে নামতে তেরো ডিগ্রিতে নেমেছে।

ইন্টার প্রথম বর্ষের ছুটি হওয়ার কথা। বেশ কিছুক্ষন বসে থাকার পর যখন দেখল কেউ আসছে না, ফুচকা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে সামনে আগাল। পরিচিত মুখ দেখে ফুচকাওয়ালা সালাম দিয়ে বলল,

‘ মামা ভালো আছেন?’

‘ জি মামা আলহামদুলিল্লাহ, আপনি ভাল আছেন?’

‘ আছি মামা, আল্লায় ভাল রাখছেন। আপনারে তো কলেজে দেহাই যায় না অহন।’

‘ মামা ক্লাস নাই, কাম কাজ ও নাই আইসা কি করমু। তাই আসি না।’

ফুচকা ওয়ালা হাসে। দ্বীপ কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল, ‘ মামা আজকে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস নাই?’

‘ না মামা, আইজকা মনে হয় ফার্স্ট ইয়ারের কেলাস বন্ধ। কাউরে তো দেখলাম না।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্বীপ বাসার পথে পা বাড়াল। পথে দুজন বন্ধুর সাথে দেখা হল। আড্ডা দিতে বলল। দ্বীপের শরীর খারাপ হওয়াতে বাসায় চলে এল আড্ডা না দিয়ে । রাতের মধ্যে জ্বর চলে এল। হঠাৎ করে এত জ্বর আসাতে বাসার লোকজন ঘাবড়ে গেল। কলেজ মাঠে এমন কনকনে শীতে বসে থাকায় ঠান্ডা লেগে গিয়েছে। জিহবায় রুচি নেই বললেই চলে। রাহেলা খানম এটা সেটা বানিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন, কোনো লাভ হয়নি।

রাত বারোটায় শোয়া থেকে উঠে আরেক আকাজ করেছে । জ্বর উঠলে শীত লাগে, তার লাগছে গরম। সবাই যখন ঘুমে, তখন ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করেছে। এমন হিম শীতল আবহাওয়ায় কেউ গোসল করে?

মাথাটা অনেকটাই হালকা লাগল। বিছানায় শুয়ে ফোনটা হাতে নিল দ্বীপ। ফেসবুকে ঢুকতে ইদানীং ইচ্ছে করে না। তবুও ঢুকল। হঠাৎ চোখ গেল মেসেজে। খুশিতে শোয়া থেকে উঠে বসল। বিভার আইডি থেকে মেসেজ এসেছে,

‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, ভাল আছেন? আজ রাতে আম্মু বাসায় নেই। নানা বাড়ি গিয়েছে। বাসায় শুধু আমি আর আব্বু। আব্বু ঘুমে। তাই ফোনটা আমার কাছে। ‘

পর পর দুটো মেসেজ। আরো একটাতে লিখা, ‘ আপনি অনলাইনে নেই? আমি আরো ভাবলাম কথা বলব। ‘

বিলম্ব না করেই দ্বীপ টাইপ করল, ‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম। শরীর একটু অসুস্থ তো, তাই দেরি হয়ে গেল অনলাইনে আসতে । তোমার কি খবর।কেমন আছ?’

সাথে সাথে রিপ্লাই, ‘ জি ভাল। কি হয়েছে আপনার?’

‘ জ্বর। ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। ‘

‘ নিজের প্রতি যত্ন নিবেন।’

জিহান কিছু একটা ভেবে লিখল, ‘ বিভা…’

‘ জি বলুন’

‘ দেখা করবে আমার সাথে?’

এই মেসেজ দেখে রিদি শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে বসে গেল। ফোনেই তো ভাল ছিল। দেখা করতে হবে কেন? কেন যে এই লোককে মেসেজ দিল। ‘ না, দেখা করা যাবে না’ এটা টাইপ করতে গিয়েও করল না। ‘ আব্বু দেখলে খবর আছে’ এটাও সেন্ড করল না। মিনিট পাচেক অতিক্রম করে টাইপ করল, ‘ সরি ভাইয়া, সমস্যা হবে দেখা করলে। আমরা এভাবেই কথা বলি?’

ও পাশ থেকে রিপ্লাই আসল, ‘ আমি ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে পারিনা। সরাসরি বলছি আমার মনে হয় আমি তোমাকে পছন্দ করা শুরু করেছি। পছন্দ বললে ভুল হবে ভালোবেসে ফেলেছি। শুধু মেসেজে কথা বলে কারো প্রতি অনুভূতি জাগতে পারে এই ব্যাপারটা নিজের সাথে না ঘটলে বুঝতে পারতাম না। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে চাচ্ছি আমি। তাই দেখা করা প্রয়োজন। ‘

ফোন হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল রিদির। মুখে হাত দিয়ে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল, ইয়া আল্লাহ! শুকনো ঢোক গিলল। ফোনটাকে বালিশের তলে লুকিয়ে ডাইনিং এ চলে গেল পানি পান করতে। বুকে ধুকপুক করছে। নিজেকে গালাগাল করছে। নতুন আপদ ডেকে আনার অপরাধে। কোন ভূতে পেয়েছে যে আজ রাতে মেসেজ দিয়েছে। পানি পান করে পুনরায় রুমে ফিরে এল। মেসেজের উত্তর না দেয়াটা অভদ্রতা। তাই রিদি কাঁপা হাতে ফোন হাতে নিয়ে লিখল,

‘ ভাইয়া আমি সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছিনা, আপনি তো বাসার অবস্থা জানেন সব। আম্মু শুনলে আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে। আর আব্বুর ধমক শুনলেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাব। আমরা না হয় বন্ধু থাকি ?’

দ্বীপের শক্তপোক্ত উত্তর, ‘ তবে বন্ধুত্ব থাকার ও প্রয়োজন নেই। আমি অকারণে তোমার সাথে কথা বলতে চাইছিনা। একবার যেখানে অনুভূতি জন্মেছে, সেখানে সম্পর্কবিহীন যোগাযোগ থাকাই অমঙ্গলজনক। এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে এতদিন কথা বললাম। আমার স্কুল কলেজ সহপাঠীদের সাথেও এত কথা বলিনি। এনিওয়ে ব্লক তুমি করবে নাকি আমি?’

‘ একদম নাহ, ব্লক কেন করবেন? আমি মাঝে মাঝে আপনাকে মেসেজ দিব।’

‘ সম্পর্কে জড়ালে জড়াবে নতুবা না। না জড়ালে কথা কিসের?

‘ এভাবে কি সম্পর্কে জড়ানো যায়? আপনার আমাকে ভালো লেগেছে মানলাম। আমার ও তো আপনাকে ভালো লাগতে হবে। আমি আপনার সম্পর্কে কিছুই জানিনা।’

‘ কি জানতে চাও বল? সব বলছি। আমি তোমার তুষারের মত ফেক না।’

‘ আমার তুষার কি? ও আমার বন্ধু ছিল। বার বার একই কথা বলেন কেন? ‘

‘ আচ্ছা বাদ দাও। আমার পরিচয় দিই। আমার নাম তুমি জানো। বাসায় বাবা,মা, দাদী, ছোট ভাই এবং ছোট বোন আছে। আগামী মাসে ছোট বোনের বিয়ে। বাবা রিটায়ার্ড করেছেন সরকারি চাকরি থেকে। এই তো। আর আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে বলব আপাতত বেকার। আব্বু টাকা দিলে বিজনেস শুরু করব।’

‘ আচ্ছা, সুন্দর পরিবার। কিন্তু আপনাকে তো মানুষ হিসেবে চিনি না।’

‘ দেখা কর। ভালো না লাগলে না করে দিও। আমি ছ্যাচড়া না যে তোমার পিছু নিব।’

‘ আচ্ছা কবে করবেন।’

‘ তুমি জানিয়ে দিও।’

ফযরের আজান দিচ্ছে। রিদি ফোন রেখে ওযূ করে নামাজে দাঁড়াল। বুঝতে পারছে না তার সাথে কি হতে যাচ্ছে?

তিনদিন অতিক্রম হল। এই তিনদিনে না রিদির মন স্থির ছিল, না দ্বীপের। দ্বীপ অপেক্ষা করে আছে রিদির মতামতের জন্য। সম্পর্কে ধীরে বুঝে-শুনে আগানো বুদ্ধিমানের কাজ। তাড়াহুড়ো শয়তানের লক্ষন।

আমিনা পরদিনই ফোন নিয়ে গেলেন মেয়ের কাছ থেকে। আজ বিকেলের প্রাইভেট টা নেই। স্যার ঢাকা গিয়েছেন। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছেনা। দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় খেলল। মিরা আসেনি। প্রমাকে সব খুলে বলল। জানাল দ্বীপের কথা। প্রমা একটু ভীতু গোছের। তাই ওকে রাজি করিয়ে ফেলল আজ দ্বীপের সাথে দেখা করবে বলে। ব্যাগ থেকে ফোন নম্বর টুকে আনা কাগজ টা বের করল। শীতকালে দিন ছোট। ফোন করল দ্বীপকে। ঘুমের মাঝে দ্বীপ ফোন রিসিভ করল। মেয়েলী গলা শুনে বলল,

‘ কে?’
রিদি বলল, ‘ দ্বীপ ভাইয়া বলছেন?’
‘ জি আপনি কে?’
‘ ভাইয়া আমি বিভা।’
ছটফটিয়ে উঠল। প্রশ্ন করল, ‘ কি হল বিভা? কোনো সমস্যা হয়েছে?’

রিদি প্রমার কানে কানে বলল, ‘ গলার স্বর তো সুন্দর।’
প্রমা রিদির মাথায় গাট্টা মেরে বলল, ‘ কথা শেষ কর’
রিদি ফোনে মনোযোগ দিয়ে বলল,’ না সমস্যা হয় নি। দেখা করতে পারবেন।’
দ্বীপের ঠোঁটের কোণে উজ্জ্বল হাসি। উত্তর দিল,’ অবশ্যই পারব। কখন?’
‘ এখন।’
‘ এখন তো তোমার প্রাইভেট। ‘
‘ আজ নেই। এই সুযোগ তাই ফোন দিলাম।’
‘ কোথায় আসবো?’
‘ কলেজের পাশে নতুন মার্কেট হচ্ছে যে ওই মাঠে।ওইদিকটাতে পরিচিত কেউ এখন যাবে না।’
‘ আমি এখনই বের হচ্ছি। অপেক্ষা কর। ‘

দ্বীপ গায়ে কোনো রকম সুয়েটার পরে বেরিয়ে গেল। প্রথম সাক্ষাৎ, তাকে দেখতে সুদর্শন লাগা উচিত ছিল। কিন্তু না, সে পুরোনো ডেনিম প্যান্ট এবং নেভি ব্লু হুডি পরে বের হয়ে গেল। মাঠের সামনে এসে রিকশা থেকে নেমে দেখল দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রিদি দ্বীপকে আসতে দেখে প্রমার হাত চেপে ধরল। প্রমা দাঁত খিচে বলল, ‘ রিদু, বিদায় অনুষ্ঠান এর দিন তো উনাকে আরো ছোট লাগছিল। আজকে এত বড় বড় লাগছে কেন?’

রিদি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘ আমি প্রেম করমু না, আমি বাসায় যামু।’
প্রমা ধমকে বলল, ‘ থাপ্পড় দিব। তাহলে উনাকে ডেকে আনছিস কেন? আমাকেও ফাসাচ্ছিস। মিরা শুনলে চিবিয়ে খাবে। চিনিস না, জানিস না অথচ প্রেম করবি। উনি কি বলে শুন, এরপর বাসায় গিয়ে সিদ্ধান্ত নিস।’

দ্বীপ সামনে এসে নিজ থেকে সালাম দিল। প্রমাও সালাম দিল। রিদি চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রমা নিজ থেকেই বলল, ‘ আমি রিদির ফ্রেন্ড, প্রমা।’

দ্বীপ ভ্রু কুচকে ফেলল। রিদির মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রিদি বলল, ‘ আমার নাম রিধিমা জাবেদ। বাসার সবাই রিদি ডাকে।

দ্বীপ মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘ মিথ্যা বলা আমি পছন্দ করি না। ‘

রিদি ভীত চোখে বলল, ‘ সরি।’

প্রমা বলল, ‘ ভাইয়া আপনারা কথা বলুন। আমি একটু শপিং মল থেকে ঘুরে আসি।’

প্রমা চলে যেতেই রিদি একা হয়ে গেল। দ্বীপ নিজেও নার্ভাস। তবে মুখ দেখে দৃশ্যমান রাগটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। রিদির দিকে একটা চকলেট আর গোলাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ কি উপহার দিতে হয় জানিনা। প্রথম সাক্ষাতে উপহার দিব না এটাও কেমন যেন দেখায়। তাই ফুল আর চকলেট আনলাম। এই দুই জিনিস মেয়েরা পছন্দ করে শুনলাম। মন চাইলে নিজের কাছে রেখো নাহয় ফেলে দিও।’

রিদি কিঞ্চিৎ হাসল। একটা কথাও বলেনি। দ্বীপ ও চুপচাপ । রিদির মনে অপরাধবোধ। দ্বীপের মনে অভিমান। রিদি নিজের নামটা না লুকালেও পারত। রিদি বলল, ‘ ভাইয়া আমার সময় লাগবে কিছুদিন।’

‘ চারদিন সময় দিলাম। পরবর্তী শনিবার আমাকে জানাবে তুমি সম্পর্কে জড়াবে কি, জড়াবে না?

রিদি মাথা কাত করল। দ্বীপের মনে হল, কথা বলার মত কিছু নেই। এদিকে সন্ধ্যাও হয়ে আসছে। রিদিদের বাসায় যাওয়া প্রয়োজন। ওদের রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে নিজেও বাসার দিকে রওয়ানা হল। রিদি ফুল টা প্রমাকে দিয়ে দিল। চকলেট দুজন মিলে রিকশায় ভাগ করে খেয়ে নিল। বাসায় ঢুকে নামাজ পড়ে আজ সোজা পড়ার টেবিলে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। চোখের সামনে দ্বীপের চেহারা ভেসে উঠছে। আজ কিছুতেই পড়তে বসতে পারছে না। সারা রাত ছটফট করল। রাতে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাইভেটে গেল,ক্লাস করল। এভাবে টানা তিনদিন পার করল। মন নেই কোনো কাজে। শুক্রবার রাতে অল্প ভাত খেয়ে উঠে গেল। আমিনা ইসলাম চিন্তায় অস্থির। এই তিন দিন মেয়ের কি হল! জাবেদ সাহেব স্ত্রীকে বকাবকি করছেন, মেয়েকে পড়ার জন্য এত চাপ দেয় বলে। ডাইনিং রুম পেরিয়ে বেডরুমে ঢুকার সময়ে মাথাঘুরে পড়ে গেল। পড়ার আওয়াজ এত জোরে হল যে জাবেদ সাহেব ছুটে আসলেন তার বেড রুম থেকে। পাশে ফ্রিজ ছিল। কেঁপে উঠল। ফ্রিজের সাথে খুব জোরে বাড়ি খেয়ে পড়েছে রিদি। তাই এত জোরে আওয়াজ হয়েছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়ালেন। আমিনা ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের মুখে পানি ছিটাতে থাকলেন। প্রায় দশ মিনিট পর রিদি চোখ খুলল। গায়ে জ্বর, প্রচন্ড উত্তাপ। ডাক্তারকে ফোন দিয়ে পরিস্থিতি জানিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলেন জাবেদ সাহেব। রিদির শরীর ছেড়ে দিয়েছে আগামীকালকের দুশ্চিন্তায়।

পরদিন কলেজ যেতে দেন নি আমিনা ইসলাম। প্রাইভেটে যাওয়া জরুরি বলে জাবেদ সাহেব নিজে প্রাইভেটে পৌঁছে দিলেন। বাকি গুলোতে মিরা এবং প্রমা নিয়ে যাবে জানাল। রিদি আজ নিজে থেকে পুরো পরিস্থিতি মিরাকে জানাল। মিরার মাথায় হাত। প্রমা বলল, ‘ নিজেকে আগে বুঝ দে, তুই কি চাস? আন্টি আংকেল কি মেনে নিবেন?’

রিদি নিজেও জানে না বাবা মা মেনে নিবে কিনা। গত ছয় মাস আগে রাস্তায় এক ছেলে বিরক্ত করত। সেটা জেনে গিয়ে বাবা ওই ছেলেকে আলাদা ডেকেছিলেন। এরপরের ঘটনা আর কিছু রিদি জানেনা। রাতে ফোন মা দিবে না। দ্বীপের সাথে কথাও বলা যাবে না। রিদি মিরাদের জানাল সে আজই দ্বীপের সাথে দেখা করবে। যা হওয়ার হবে। মনে যা আসে তাই করবে। এভাবে পড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে, শরীর অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। প্রস্তুতি নিতে হবে ভালোভাবে। এ প্লাস মিস করা যাবে না। বাবার মনে আর দুঃখ দিতে চায় না। দ্বীপের নাম্বারটা ডায়াল লিস্টেই পেল। বাটন চেপে দ্বীপকে ফোন দিল।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০৩

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৩.
( আজকে মন মেজাজ ভাল না গরমের কারণে। বিদ্যুৎ থাকে না। বহুত কষ্টে লিখেছি। কপি করলে থাপড়াইয়া কানের পট্টি ফাড়ায়ালামু)

শীতের প্রকোপে দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। পশমি সুয়েটার পরে ঘরে ঘরে হাঁটছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে এভাবে হাঁটতে দেখে প্রশ্ন করলেন মেয়ে কি কোনো কারণে চিন্তিত কিনা? মেয়ে মাথা নাড়ল। তিনি মেয়েকে কাছে ডাকলেন।

মেয়েরা তার কাছে ফুলের মত নিষ্পাপ। শাসন তিনি করেন না। মাঝে মাঝে পড়াশোনার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেন। কিন্তু মেয়েদের মাথায় করে রাখেন। ছেলে নেই বলে কত লোকে কত কথা শোনান। তিনি হেসে বলেন, ‘ আমার একটা মেয়ে তোমাদের একশো ছেলের সমান। ‘

আপাতদৃষ্টিতে এই কথা কেমন যেন শোনায় কিন্তু কথা সত্যি। কিভাবে জানেন? বাবারা যখন ভেঙ্গে পড়ে, দুঃখে কষ্টে ছেলের আগে মেয়েরা ছুটে যান। বাবার অসুস্থতায় মেয়ের চোখে পানি আসে। বাবার খাতির যত্নে মেয়েরা অতুলনীয়। পিতার কাছে কন্যা মাতা সম। মায়ের কি তুলনা হয়? আল্লাহ যখন বান্দার উপর খুশি হন তখন তার ঘরে মেয়ে দেন। জাবেদ সাহেব সবসময় বলেন, ‘ আমার ঘরে দুইটা জান্নাত আছে। ‘

রিদি বাবার পাশে বসে বলল, ‘ আমার একটু মন খারাপ।’

‘ কেন মা? আম্মু কিছু বলেছে?’

‘ হ্যাঁ। বলেছে বিয়ে দিয়ে দিবে তাড়াতাড়ি। ট্রেইলর আন্টির ভাইয়ের জন্য দেখছে। আমার লোকটাকে পছন্দ হয় নি। আমাকে ছবি দেখিয়েছে। ভুড়ি ওয়ালা।’

জাবেদ সাহেব হেসে ফেললেন মেয়ের মন খারাপের কারণ শুনে। আদুরে গলায় বললেন, ‘ এই যে বাবার ও তো ভুড়ি আছে।’

‘ তুমি তো এখন বাবা। তাই ভুড়ি হয়েছে। ইয়াং এইজে তো ছিল না। আমি দেখেছি। আপুর বিয়ের সময় ও তো কত সুন্দর ছিলে। এখনও সুন্দর। কিন্তু ওই ছেলে এখনই তোমার থেকে বুড়া। তোমার সুন্দর মেয়ের জামাই ভুড়িওয়ালা হলে কি তোমার ভালো লাগবে আব্বু? বিয়ে তো আমি করব তোমাদের পছন্দে কিন্তু আমাকে কিছুদিন সময় দাও। নিজের পছন্দে করার তো চান্স নেই। ‘

জাবেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘ ভদ্র বাবার ভদ্র ছেলে যদি হয় নিজের পছন্দে করতে পার। কিন্তু তুমি এখনও ছোট। তোমার দুলাভাইকে দেখেছ? তার মত না হলেও তার সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারবে এমন কাউকে প্রয়োজন আমার রিদুর জন্য। যেন আমার মেয়েকে মাথায় করে রাখে। ‘

রিদি শুকনো ঢোক গিলল। কি শীতল শান্ত বাক্য আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এতটুকুতেই বুঝা যায় বাবা কি চান। রিদি মাথা কাত করল। আমিনা তখন পাশের বাসা থেকে আসেনি। আজকে বাসায় কক্সবাজার থেকে আনা লইট্টা শুকরির তরকারি করেছে। সেটাই দিয়ে আসতে গিয়েছিল ঘন্টা খানেক আগে। মহিলা মানুষ কোথাও গেলে কি আর এত সহজে আসে? রাহা বাচ্চাদের নিয়ে বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়েছে এখনো আসেনি।
__

অনেকদিন পর বন্ধুরা অনলাইনে এসেছে। শীতকালীন অবকাশে অনেকে বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। স্কুল কলেজ বন্ধ। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ফেসবুকে হঠাৎ একটা ছবি দেখে চোখ আটকে গেল। সমুদ্র পাড়ে বসে আছে সন্ধ্যায়। এক পাশে বিশাল সমুদ্র রাশি, অন্য পাশে বালু। হয়তো কক্সবাজারের ছবি। রিদি ওই মানুষটাকে মেসেজ দিল,

‘ ভাইয়া, আপনি কি বেড়াতে গিয়েছেন?’

রিপ্লাই এসেছে, ‘ না একটু কাজে এসেছিলাম চট্টগ্রাম। মামার বাসায় এসেছি। গতকাল কাজিন রা বলল কক্সবাজার আসবে তাই চলে এলাম। আমার সমুদ্র ভালো লাগে।’

‘ আমি কখনও যাই নি।’

‘ চলে আসো। আমি এখনও বীচে হাঁটছি একা। ‘

‘ এত রাতে? প্রায় একটা বাজে।’

‘ রাতে হাঁটার মজাই আলাদা।’

‘ আপনার গার্লফ্রেন্ড রাগ করে না এভাবে একা ঘুরতে যান যে। আমার বান্ধবীরা রাগ করে ওদের পছন্দের মানুষ একা গেলে। ‘

‘ আমার পছন্দের মানুষ আমি নিজে। আমার কেউ নেই। সিংগেল থাকার এই এক মজা। কোনো শাসন-বারন থাকে না। ‘

‘ কয়দিন থাকবেন?’

‘ কক্সবাজার দুদিন। সেন্টমার্টিন একদিন। ‘

‘ সেন্টমার্টিন কি খুব সুন্দর? ‘

‘ অসাধারণ, চমৎকার একটা জায়গা। আমার মত নিঃসঙ্গ। সাগরের মাঝে একাকী থাকে। আমিও দ্বীপ, সে ও দ্বীপ।’

‘ আপনার আসল নাম ও দ্বীপ?’

‘ হ্যাঁ, তুমি কি ভেবেছিলে তোমার তুষারের মত আমিও নকল?’

‘ আমার তুষার বলবেন না মেজাজ খারাপ হয়।’

‘ ঠিক আছে সরি।’

‘ আপনার নাম টা সুন্দর। সচরাচর শোনা যায় না এই নাম তাই ভাবলাম আর কি।’

‘ আমার পুরো নাম শাহদ্বীপ জিহান। আইডিতে দ্বীপ দিগন্ত দিয়েছি। দিগন্ত আমাকে ছোট মামা ডাকে।’

‘ ওয়াও নাইচ নেম। ‘

‘ ধন্যবাদ। ‘

‘ তোমার নাম ও সুন্দর। বিভা মানে তো আলো।’

রিদি অনলাইন থেকে বের হয়ে গেল। এখন বেশি মেসেজ দিলে বিভা নাম যে নকল তা বুঝে যাবে।
এছাড়া রাহার মেয়ে নুভা নড়ছে ঘুমের মাঝে। রিদি ভয়ে ফোনটা রেখে দিল। নুভা দেখলে দিনে সবাইকে বলে দিবে, খালামনি রাতে ফোন চালায়।

দেখতে দেখতে ছুটিটা প্রায় শেষ। এই কয়দিন আমিনা রিদিকে বকা দেয় নি। রাহা আসলে মজা হয়। দুলাভাই এদিকে সেদিক ঘুরাতে নেয়। পার্কে যায়, গ্রামের বাড়িতে যায়, রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। ওই কয়টা দিন রিদি স্বাধীন, পাখির মত উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। নতুন বছর চলে এল। রাহাও চলে গেল। রাহার ছেলেটা নানা বাড়ি আসলে যেতে চায় না, নানার কোলে উঠে বসে থাকে। এদিকে নুভা কাঁদছে। রায়হান এর ছুটি নেই। চাইলেও থাকতে পারবে না। কাস্টমস এর জব। অনেক কষ্টে মেয়েকে বুঝিয়ে নিয়ে গেল এই বলে যে, পরের মাসে আবার আসবে নানা বাড়ি।

এই কয়দিনে রিদি ফেসবুকের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়েছে যে প্রতিদিন রাতে না এসে পারে না। আজ বাসায় স্যারের কাছে পদার্থ বিজ্ঞান পড়া পারে নি। স্যার আমিনাকে বলেছে রাতে ফোন সরিয়ে রাখতে। ওর যেন ঘুম ভাল হয়। এই স্যারকে ইচ্ছেমত মারতে পারলে রিদি কিছুটা শান্তি পেত। রাতে ঘুমানোর আগে আমিনা এসে ফোন চেয়ে বসলেন। রিদি কথা দিয়েছে আজকে রাতটা তার কাছে থাকুক আগামীকাল থেকে দিয়ে দিবে। আজকে বন্ধুদের সাথে কথা বলে আইডি বন্ধ করে দিবে। আমিনা সেই সুযোগ দিয়ে ঘুমাতে চলে গেলেন। দ্বীপকেও জানাতে হবে রিদি আইডি বন্ধ করে দিবে। দ্বীপ ঘুরতে ভীষণ ভালবাসে। কথা কম বলে কিন্তু রিদির সাথে নিজের ঘুরাঘুরির সব মুহুর্তই শেয়ার করেছে এই কয়দিন। বন্ধুত্ব ভালই হয়েছে দুজনের মাঝে। সারাদিন নুভা, নুহাশের দুষ্টুমি, নিজের করা আকাজ, পড়ে যাওয়া, মায়ের বকা খাওয়া, বোন আর দুলাভাইয়ের খুনশুটি সব কিছু শেয়ার করেছে দ্বীপের সাথে। দ্বীপ মেসেজ পড়ত আর হাসির ইমোজি দিয়ে হাসত।

ফেসবুকে ঢুকতেই দ্বীপের মেসেজ দেখতে পেল। সেখানে সেন্টমার্টিন, কক্সবাজারের আরও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি। রিদি মুগ্ধ হয়ে দেখছে। মনে মনে ইচ্ছে পোষণ করেছে ইশ কবে যাবে? অনেকক্ষন পর দ্বীপ মেসেজ দিয়ে জানতে চাইল, রিদির মন খারাপ কিনা? রিদিকে তিন/চারটি মেসেজ দিলে অনেক দেরিতে উত্তর দেয়। রিদি মেসেজ দিল,

‘ কাল থেকে আম্মু ফোন নিয়ে যাবে আমি আর কথা বলতে পারব না। ‘

ও পাশ থেকে উত্তর এল,

‘ আচ্ছা, ভাল করে পড়াশোনা কর। যদি কখনও মনে পড়ে মেসেজ দিও। ফোন নাম্বার তো আছেই। ‘

নির্লিপ্ত উত্তর রিদির,

‘ আচ্ছা।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে এখন রাত একটা। রিদি বন্ধুদের সাথে কথা বলছে ঠিকই কিন্তু ভীষণ মন খারাপ। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে চারটায় এসে থামল। ঠিক সেই মুহুর্তে মেসেজ আসল দ্বীপের আইডি থেকে,
‘ বিভা, আবার কবে আসবে? আন্টি কি ফোন একেবারে নিয়ে যাবে?’
‘ এন্ড্রয়েড নিয়ে যাবে। বাটন ফোন দিবে। আম্মুকে আমার বজ্জাত স্যার বলেছে আমি নাকি সারাদিন ফোনে মগ্ন থাকি তাই পড়াশোনায় মন দিই না। ‘
‘ আচ্ছা যদি ফিরে আসো আমাকে প্লিজ মেসেজ দিও।’
‘ আচ্ছা।’

রিদি অনলাইন থেকে বের হয়ে থমকে গেল। দ্বীপ এভাবে মেসেজ দিল কেন? এত রাত অবধি তো কোনো দিন জেগে থাকেনা। বারোটার আগেই শুয়ে যায়। সর্বোচ্চ দুইটা পর্যন্ত জাগে। আজ এতক্ষন কি করছিল? প্রেম ও তো করে না। শ খানেক প্রশ্নের চাপ নিয়ে রিদি ঘুমাতে গেলেও ঘুম চোখ থেকে উড়ে গেল।

__

পিসির সামনে বসে কিছুক্ষন গেইমে সময় দিল। মন আনচান করছে। কিছুতেই মনোযোগ স্থির করতে পারছেনা। এরপর ভলিউম কমিয়ে টিভিতে কার্টুন ছাড়ল। যদি মনটা একটু স্থির হয়। নতুন কার্টুন শুরু হয়েছে, নাম মটু পাতলু। চাচাতো ভাইবোনদের দেখে সারাক্ষণ এই কার্টুন দেখতে। আচমকা পেছন ফিরে দাদীকে দেখে আৎকে উঠল।

সখিনা বানু, দ্বীপের দাদী। উনাকে অন্যভাবে পরিচয় করালে বলতে হবে, নিশাচরী। রাতে সারা ঘরে নিশব্দে হাঁটবে। কানে তেমন একটা শোনেন না তবে চোখে খুব ভালো দেখেন। বয়স আশির কাছাকাছি। অ্যালজাইমা আছে। ভুলে যান অনেক কিছু। বাইরে থেকে যদি কোনো অতিথি আসে এবং রাতে এই বাসায় থাকে ; সে যদি এভাবে কাউকে সাদা শাড়ি পরে রাতের দুইটা /তিনটা বাজে সারাঘর হাঁটতে দেখে, তার অনুভূতি কেমন হবে? এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা বহুবার হয়েছে অতিথিদের । চিৎকার দিয়ে সেই অতিথি সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ভূত! ভূত বলে।

মিজান সাহেব মাকে কত বুঝালেন রাতে এভাবে না হাঁটতে কিন্তু কে শুনে কার কথা, সে তার মর্জির মালিক। দ্বীপ অবশ্য জানে দাদীর এই স্বভাবের কথা তাই আমলে নেয় নি। দ্বীপের পাশে বসে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল,

‘ ভাই তোমার দাদা একছের এইরম ছিল, পাতলা। একবার হইছেল কি আমি বাপের বাড়ি নাইওর যাইতাছি তার লগে। গরুর গাড়ির চাক্কা খুইলা গেছে মাঝ রাস্তায়। হেই সুমায় রাস্তায় লোকজন কম। কেউ কাউরে সাহায্য করার মতন নাই। এর মইধ্যে আইছে তুফান। তোমার দাদার লগে আমার এক দেওর ও ছেল। দেওর আমার কাপুড়ের বাসকো নামাইছে গাড়ি থেইকা। কইল, ‘ ভাইসাব চলেন হাডি, ভাবী সাব রে লইয়া রাস্তার মইধ্যে খাডাইয়া থাকলে ব্যাপারডা ভালা ঠেকে না। হাডলে অন্তত সামনে যাইয়া কারো না কারো বাড়ি পাইয়া যামু। ‘ আমরাও হাডা শুরু করলাম। তুফান বাইড়া গেল। ভিজ্জা গেলাম হগগলে। এবার তুফানের লগে জোরে বাতাস ছুডছে। চোহে কিছু দেহিনা। গাছ তলায় খাড়াইলাম। আচুক্কা আমার দেওর কয়- ও ভাবী সাব, ভাইসাব কই? আমি পাশে ফিররা দেহি তোমার দাদা নাই। কাইন্দা দিছি। এদিক সেদিক চাইয়া দেখলাম আমি আর আমার দেওর; কোনো হানে দেহি না তোমার দাদারে। কতখন পর গতরে মাডি, কাদা লাগাইয়া আইল। আমরা তো ভাবছি জ্বীন, ভূত হইবে। আমি চিক্কুর পাড়ছি। আমার দেওর কয়, ওই শয়তানের বাচ্চা কেন আইছিস। দূর হইয়া যা, আমি কিন্তু সূরা কেরাত ফারি কইয়া দিলাম। হেই সময় তোমার দাদায় কয়, ‘আরে আমি শামছু। তোগো ভাইসাব। বাতাসে আমারে উড়াইয়া নিয়া ক্ষেতের মাঝখানে ফালাইছে। কোমড় ডা ভাইঙ্গা গেছে। ‘ তহন আমি আর আমার দেওর বলদা হইয়া গেছি। বাতাস আমগোরে দেখল না হেরেই দেখল। এই গল্প যতজনের কই হাইসা মাডিত ফরে।

দ্বীপ হা করে দাদীর দিকে তাকিয়ে আছে। এইমাত্র যে গল্প টা দাদী বলল, এমন কোনো গল্প জীবনে কেউ শুনেই নাই। তার দাদার ওজন ছিল নব্বই কেজি। কিভাবে বাতাস তাকে উড়িয়ে নিবে? দ্বীপের হাসি পাচ্ছে দাদীর বানানো গল্প শুনে। দাদাকে নিয়ে আর কি কি গল্প বানাতে পারেন ভদ্রমহিলা সেটা আল্লাহ ই ভালো জানেন। মূলত দাদার প্রতি দাদীর অগাধ ভালোবাসার কারণে বিভিন্ন গল্প বানিয়ে বানিয়ে দাদার গল্প শুনিয়ে সকলের মাঝে জীবিত রাখেন। মানুষ মরে গেলে আমরা তাকে ধীরে ধীরে ভুলতে শুরু করি। কিন্তু সেই মানুষটাকে নিয়ে, তার ভালো কৃতকর্ম নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চা করলে একসময় মন থেকে ভালোবাসা এবং দোয়া চলে আসে। এই যে দাদা মারা গিয়েছেন আজ বিশ বছর তবুও দাদী প্রতি সপ্তাহে বাবা চাচাদের জোর করে গ্রামের বাড়ি পাঠায় দাদার কবর জিয়ারত করার জন্য।

দ্বীপের এখনও মনে পড়ে ছোট বেলায় ভাত খেতে না চাইলে দাদা বলত, ‘ দাদাভাই ভাত খাও দাদা তোমারে দোকান থেইকা ফান্টা কিন্না দিমু।’
রাহেলা খানম এর মুখে শ্বশুর এর গুণগান সবসময়ই থাকে। মাঝে মাঝে মিজান সাহেবকে বলেন, ‘ তুমি বাবার মত হলে আমি প্রতিদিন তোমার পা নিজের হাতে ধুয়ে দিতাম। কিন্তু দুঃখিত সেই সুবিধা তোমাকে দিতে পারছিনা। কারণ তুমি তোমার দাদীর মত।’

মিজান সাহেব এই কথা শুনলেই ক্ষেপে যান। কারণ তার দাদীর মত জল্লাদ মহিলা নাকি ওই তল্লাটে ছিলেন না। সেই গল্প আরেকদিন করা যাবে। সখিনা বেগমের ডাকে দ্বীপের ধ্যান ফিরল,

‘ ও ভাই? আমারে নিয়া মহেশখালী যাইবা? এক খান পান খামু।’

দ্বীপ ভ্রু কুচকে অবাক হয়ে একটু জোরেই বলল যাতে দাদী শোনে, ‘ মহেশখালী তো অনেক দূর দাদী। তুমি কেমনে যাইবা? গাড়ি চড়তে পারবানি? তোমার তো জার্নি সয় না দাদী। ‘

দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বলে, ‘ তোমার দাদায় আমারে কইছিল মহেশখালীর পান খাইতে স্বাদ আছে। আমারে খাওয়াইবে এক সুমায়। আমারে নিয়াও যাইতে চাইছিল। কিন্তু আমার শাশুড়ী আমারে যাইতে দিল না। বহুত মনে কষ্ট ছিল তোমার দাদার এই নিয়া। পরে তো নেওনের আর সুযোগ হইল না। আমার শাশুড়ী মরনের আগে তোমার দাদাই মইরা গেল। আমারে থুইয়া গেল জল্লাদের হাতে।

মাঝে মাঝে আমারে এই গানটা শুনাইত ,
‘ যদি সুন্দর এক খান মন পাইতাম,
মহেশ খালির পানের খিলি তারে
বানাই খাওয়াইতাম..’

দাদীর সুরেলা গলা শুনে মন ভালো হয়ে গেল দ্বীপের। দাদীকে জানাল নিয়ে যাবে। রাহেলা সবসময়ই বলতেন, ‘ তোমার দাদী মানুষ খারাপ না। কিন্তু তোমার ফুফুদের ফান্দে পড়ে আমার উপর অত্যাচার চালাত। ‘ রাহেলার কথাই ঠিক একটা বয়স পর্যন্ত মানসিক অত্যাচার করেছে রাহেলার উপর এরপর নিজ থেকে শান্ত হয়ে গিয়েছেন সখিনা বানু , ক্ষমাও চেয়েছেন ছেলের বউয়ের কাছে পূর্বের কৃতকর্মের জন্য। এখন সেসব ভুলেচুকে গিয়েছে সবাই কিন্তু মাঝে মাঝে ঠিকই দ্বীপের ছোট ফুফু তফুরা তাদের দাদীর মত আচরণ করে। এতে অবশ্য সখিনা বানুর কোনো হেলদোল নেই। তবে মাঝে মাঝে তফুরাকে কোনো কথা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাহেলা খানমকে বলেন, ‘ ও বউ কইষষা দে ওর গালে, এমন ভাবে দিবি যাতে জ্বইল্লা যায় গালডা । ঠান্ডা না হইলে জ্বলনের ভিত্রে মরিচ বাইট্টা লাগায় দে। এক্কেরে দাদীর লাহান হইছে বজ্জাতডা।’

রাহেলা বেগম আড়ালে হাসে। তফুরা কেঁদে কেঁদে বলে বড় ভাবী আমার মায়েরে তাবিজ করছে।

চলবে…

হৃদিতে রিদি পর্ব-০২

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
২.

প্যাচ প্যাচ করে কেঁদেই যাচ্ছে। এর কোনো সমাধান নেই। মেয়েটা এত বোকা, এত অল্পতে কাউকে কিভাবে বিশ্বাস করল? ফেসবুক তো ধোঁকাবাজির জায়গা। তুষার ছেলেটা পুরোপুরি ভন্ড একটা ছেলে। মিরা এবং প্রমাকে জানানোর পর , মিরা তার এক ভাইকে দিয়ে খোঁজ নিয়ে জানল ওই নামে কেউ ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে না। সরলা বালিকা মন খারাপ করল। তুষার কে সে ভালো বন্ধু ভাবত। তুষার হুমকি দিয়েছে সে যেকোনো সময় খোঁজ নিয়ে তার কলেজে চলে আসবে। এসে যদি ঝামেলা করে এই আতঙ্কে আত্মার পানি শুকিয়ে গিয়েছে রিদির। রিদির বাবা নোয়াখালী সদরের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। চেনা পরিচিত মুখ। এমনকি কলেজটাও তার বাবার পরিচিত লোকজন দিয়ে ভরা। কলেজের পিয়ন থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষ তার বাবাকে চেনে। এই ছেলে কলেজে এসে ঝামেলা করলে তো বাবার কানে খবর যাবে নিশ্চিত , তখন মা তাকে খুন করে ফেলবে।

অনেক কষ্টে বান্ধবীরা কান্না থামাল। হেঁচকি তুলতে তুলতে প্রাইভেটে গেল। বাসায় এসে আইডিতে ঢুকল। তুষার তো ব্লক লিস্টে তবুও মনে অনেক ভয়। যদিও তুষার কখনো রিদিকে দেখেনি কিন্তু ঠিকানা জানে। কলেজের নাম জানে। কলেজে এসে যদি বলে রিধিমা জাবেদ , সায়েন্স গ্রুপ। সবাই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিবে। এই দুশ্চিন্তায় একটা সপ্তাহ নির্ঘুম কাটল। অনেক দিন আইডিতে ঢুকেনি। আজ আইডিতে ঢুকে সব অপরিচিত দের লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছে। কলেজের ফ্রেন্ড, সিনিয়র, জুনিরদের রাখল। এরপর একটা পোস্ট লিখল,

‘ কাউকে সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। মানুষ দূর্বল ভেবে আঘাত করে।’

পোস্ট দেয়ার দু মিনিটের মাথায় মেসেজ আসল,

‘ আচার ব্যবহারে তো মনে হয় না আপনি কাউকে সহজে বিশ্বাস করেন। ধোঁকাটা দিল কোন প্রেমিক?’

চোখ দুটো রাগে ক্ষীন হয়ে গেল। কানে শুনলে হয়ত কানটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠত। সময়ের অপচয় না করে রিদি টাইপ করল,

‘ আপনাকে বলতে হবে? আপনি কে আমাকে জিজ্ঞেস করার?’

ওই পক্ষ থেকে রিপ্লাই আসল, ‘ ধাইন্না মরিচ কোথাকার? ‘

রিদি বেশ কিছুক্ষন ভাবল, ধাইন্না মরিচ তো বলে ঝাল মরিচ বা বোম্বে মরিচকে। কত্ত বড় ফাজিল। তাকে বলে সে কিনা ধাইন্না মরিচ? রিদি আবার মেসেজ দিল,

‘ আমি ধাইন্না মরিচ হলে আপনি তিতা করলা। গায়ে পড়ে ঝগড়া করেন কেন আমার সাথে?’

ওই পাশ থেকে রিপ্লাই আসল,

‘ শুরু টা তো আপনি করেছিলেন। ভুলে স্টিকার যাওয়াতে কত কথা শোনালেন। এনিওয়ে আমার কথায় কষ্ট পাবেন না। দুঃখিত।’

রিদির মনে হল, সত্যিই তো সেদিন সে একটু বেশিই বলে ফেলেছিল। রিদি সৌজন্যতা নিয়ে উত্তর দিল এবার, ‘ আসলে সেদিন বুঝতে পারিনি। ‘

‘ ইটস ওকে।’

আর কোনো কথা নেই। মানুষটার আইডিতে ঢুকে রিদি ছবি দেখতে লাগল আর ভাবল, দেখতে শুনতে তো খারাপ না। সকালে তুষারের আতঙ্কে কত মন খারাপ ছিল অথচ এখন আবার আরেকজনের আইডি ঘুরছে। এজন্যই মিরা এবং প্রমা তাকে এক বিন্দু বিশ্বাস করে না। এই মেয়ের কখন যে মন ভালো হয় আর কখন যে মন খারাপ হয় তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এরপর আর কথা হয় নি তাদের। রিদি পড়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মা সারাক্ষণ কানের কাছে এক কথাই বলে, মেডিকেলে চান্স পেতে হবে। তোমার বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছে, তোমার দুলাভাই বিসিএস ক্যাডার। তোমাকে মেডিকেলে পড়তেই হবে। তোমার বাবার মুখে চুনকালি যেন না লাগে। রিদি নিজ থেকেই পড়াশোনা করে কিন্তু কেউ যখন পড়া চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

__

কলেজে হিজাব খোলা যাবেনা, নিকাব তো খোলাই যাবেনা। মায়ের শক্তপোক্ত বারণ। বন্ধুদের মধ্যে ছেলেরা কখনো তার চেহারা দেখেনি। স্কুল জীবন ছিল বালিকা বিদ্যালয়ে, কলেজে এসে সহশিক্ষা হলেও সে মেয়েদেরই সাথেই বসে। ছেলেদের এড়িয়ে চলে।

বেশ কিছুদিন পর, রিদি ফেসবুকে দশ মিনিটের জন্য একটা ছবি দিল। আনমনে দিল। বেশ কিছু লাইক কমেন্ট আসল। আবার ডিলিট করে দিল৷ সাথে সাথে সেই পরিচিত আইডি ‘ Dip Digonto’ থেকে মেসেজ এসেছে,

‘ ছবি টা কি আপনার?’

রিদি রিপ্লাই দিল, ‘ জি আমার’

কিছুক্ষন চুপ থেকে পুনরায় মেসেজ দিল দ্বীপ, ‘আপনি তো বাচ্চা মেয়ে। অথচ কথা শুনলে মনে হয় অনেক বড়।’

‘ আপনি কি আমার কথা শুনেছেন?’

‘ মেসেজে বুঝা যায় আর কি।’

‘ তা আপনি বুঝি অনেক বড়?’

‘ অনেক না তবে বেশ বড় মনে হয়। কিছু না মনে করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনি কিসে পড়েন?’

‘ ফার্স্ট ইয়ার।’

‘ অনার্স? ‘

‘ না না ইন্টার।’

‘ ভালোই ছোট। আমার সাথে আপনার বয়সের পার্থক্যটা সম্ভবত সাত/আট বছর হবে।’

চক্ষু ছানা বড়া হয়ে গেল রিদির। ইয়া আল্লাহ! সাত/ আট বছর! এত্ত বড়। রাতের বেলা চিৎকার ও দিতে পারছেনা। নিজেকে দমিয়ে মেসেজ দিল,

‘ সরি বড় ভাইয়া, আমাকে মাফ করে দিন এতদিন দূর্ব্যবহার করার জন্য । ‘

দ্বীপ বোকা বনে গেল। এই মেয়ে কি কথা বলার সময় এভাবে অপমান করে বলে নাকি এর কথা বলার ধরনই এমন। নিজের উপর বিরক্ত হল। মেসেজ দিল না আর। এই ছিল শেষ কথা। এরপর দ্বীপকে অনলাইনে পাওয়া যায় নি। রিদিও ভুলে গেল। ক্লাস, প্রাইভেট এসবের মাঝে সময় কেটে যেতে লাগল।

প্রায় দুই মাস পর একদিন রিদি অনলাইনে দ্বীপকে পেয়েই মেসেজ দিল,

‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন?’

আচমকা মেসেজ আসায় দ্বীপ প্রথমে চিনতে পারেনি। পুরোনো মেসেজ দেখে চিনতে পেরে উত্তর দিল,

‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম, ভালো আছ? একটু ব্যস্ত ছিলাম। হাসপাতালে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। ‘

‘ কি হয়েছে আপনার?’

‘ আমার না বাবার। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। স্ট্রোক করেছিলেন। ঢাকায় ছিলাম।’

‘ ওহ আচ্ছা, এখন কেমন আছেন?’

‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন আগের চেয়ে। অপারেশন হয়েছে। রিকভার হতে সময় লাগবে।’

এরপর আর কথা আগায়নি। পরদিন প্রাইভেটে গিয়ে বান্ধবীদের শোনাচ্ছিল এই গল্প। মিরা বকা দিয়ে বলল,
‘ এবার বাড়াবাড়ি করছিস রিদি। নিজ থেকে মেসেজ দিস কেন উনাকে? পরে ক্লোজ হয়ে যাবি৷ আন্টি, আংকেল জীবনেও মানবেনা। ‘

‘ এই ছিহ! কি বলিস মানামানির কথা। আমি কি প্রেম করব নাকি। এমনি একটু খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম। ‘

‘ দরকার নাই।’

রিদির মন খারাপ হল। সারা রাস্তা চুপ ছিল। সবার স্বাধীনতা আছে অথচ তার স্বাধীনতা নেই। কথা বলার ও স্বাধীনতা নেই। এই যে এখন ফুচকা খেতে যাবে কোলা ব্যাঙ রেস্টুরেন্টে । বাবা- মা জানতে পারলে খবর আছে। মা তো পিঠের ছাল তুলে নেবে৷ সে বাবা মায়ের অবাধ্য নয় তবুও কষ্ট হয়। দম আটকে আসে এত শাসন বারণে।

রাতে ফোনে বান্ধবীদের সাথে গ্রুপ মেসেজে দুষ্টুমি করছিল। সেই সময় ‘দ্বীপ দিগন্ত’ আইডি থেকে মেসেজ আসল।

‘ ঘুমাও নি?’

রিদি সালাম দিল। মেসেজে জানাল ঘুমায় নি। ফিরতি প্রশ্ন করেনি আজ। পুনরায় মেসেজ এলো,

‘ তোমাদের বাসা কোথায়? ‘

রিদি কিছু একটা ভেবে ভুল উত্তর দিল। ওই আইডি থেকে আর রিপ্লাই আসেনি। একটু পর আবার মেসেজ দিল, ‘ তোমার নাম কি?’

‘ বিভা। আইডিতে দেখেন নি।’

‘ হ্যাঁ দেখেছি৷ অনেকেই তো ফেক নেম ব্যবহার করে তাই। আচ্ছা থাকো গেলাম। ঘুম আসছে। ‘

ঘড়িতে বাজে বারোটা। এত তাড়াতাড়ি কে ঘুমায়? এই যে রিদি এখন চুপিচুপি বন্ধুদের সাথে মেসেজ কনভারসেশন এ ব্যস্ত থাকবে। ফযরের সময় ঘুমাবে। রিদি প্রশ্ন করল,

‘ এত তাড়াতাড়ি ঘুমান?’

‘ হ্যাঁ আমি তাড়াতাড়ি ঘুমাই। ‘

রিদি পাত্তা না দিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিল। সময় যখন আড়াইটা তখন দ্বীপের আইডি থেকে মেসেজ আসল।

‘ ঘুমিয়েছো?’

‘ নাহ আরো পরে। আপনি না ঘুমিয়ে যাচ্ছিলেন? ‘

‘ পানি খেতে উঠেছি। একটা প্রশ্ন ছিল।’

‘ কি?’

‘ তুমি কি আমাকে দেখেছ কখনও? ‘

রিদি ভেবে বলল, ‘ নাহ! কোথায় দেখব?’

ইচ্ছাকৃত অস্বীকার করেছে সত্যিটা। বাকি মেসেজ আর দেয়ার সুযোগ হল না। মনে হল কেউ একজন ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছে। ফোনটা একপাশে রেখে ঘুমিয়ে গেল রিদি।

___

মিজান সাহেব, দ্বীপের বাবা। মানুষ হিসেবে ভাল হলেও আগে একসময় অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তার ফল এখন পান। চুলে মেহেদী লাগিয়ে ব্রাশটা টেবিলের উপর রাখলেন। সাজিনা ব্রাশটার দিকে তাকিয়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। কিছু একটা চেক করে পুনরায় ছুটে আসল বাবার কাছে। মিজান সাহেবকে প্রশ্ন করল,

‘ আব্বু এই ব্রাশ কোথায় পেলেন?’

মিজান সাহেব উত্তরে বললেন, ‘ তোমার মা দিল। ‘

‘ ছিঃ ফেলেন এটা। ‘

চেঁচিয়ে মাকে ডেকে বলল, ‘ আম্মু আপনি আব্বুর সাথে সবসময় এসব করেন কেন? ‘

মিজান সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ কি হয়েছে রে মা, কি করছে তোমার আম্মু?’

রাহেলা খানম খুন্তি হাতে তেড়ে আসলেন, ‘ বললেন কি করছি?’

‘ টিকটিকির হাগু পরিষ্কার করার ব্রাশ কেন দিছেন আব্বুকে?’

রাহেলা খানম অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে গেলেন মেয়ের উপর। এই সামান্য ব্যাপারে এত চেঁচাতে হবে কেন? মিজান সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন ইছ! বলে। রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে বললেন,
‘ তাতে কি হয়েছে? মানুষের তো আর দিই নি। তোমার বাবার এত শখ জাগছে কেন যৌবন বয়সে ফেরার? চুল পাকলে চুল কালার করতে হবে কেন? আরও কয়েকটা বিয়া করার সাধ জাগছে মনে? এজন্যই দিছি। ‘

মিজান সাহেব গলায় গামছা ঝুলিয়ে দুই হাত উপরের দিকে তুলে মোনাজাতের ভঙ্গিতে বললেন, ‘ আল্লাহ তুমি আমারে একজন ভালো জীবনসঙ্গী দিয়েছ। আমি কৃতজ্ঞ কিন্তু তার মাথার ব্রেইন টা আরেকটু উন্নত কোয়ালিটির দিলে আমি উপকৃত হতাম। ভাগ্য ভাল টিকটিকির গু পরিষ্কারের ব্রাশ ছিল তাও সেটা চুলে দিয়েছি। যদি মানুষ বা অন্য প্রাণীর বিষ্ঠা পরিষ্কার করার টা দাঁত ব্রাশ করার জন্য দিত কি হত আমার? তুমি মহান আল্লাহ, আমাকে বাঁচিয়েছ। ‘

রাহেলা খানমের চোখ চকচক করে উঠল। হাসিখুশি মনে বললেন, ‘ ভাল বুদ্ধি। পরের বার এটাই করব।’

সাজিনা চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ আম্মু উ উ উ উ… খবরদার আমার আব্বুর সাথে এসব করবেন না। ‘

রাহেলা খানম মুখ ভেঙচি দিয়ে রান্না ঘরে যেতে যেতে বললেন, ‘ এমন আদরের দুলালী আমিও ছিলাম আমার বাপের ঘরে। তোমার দাদী আর ফুফুর অত্যাচারের কিছু তোমার বাপরে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আগে তো প্রতিবাদ করে নাই, এখন সহ্য করতে বল। নাহয় আল্লাহর কাছে বিচার দিব হাশরের ময়দানে।’

মিজান সাহেব ধর্মপ্রাণ মানুষ। আল্লাহর নাম নিলেই ভয় করেন। মেয়েকে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে গোসলে চলে গেলেন। আড়ালে হাসেন রাহেলার কাজে। স্বামী অন্তপ্রাণ রাহেলা ভালোবাসা থেকে যে এমন করে তা সে জানে। তার মনে ভয় চুল রঙ করলে মিজান সাহেবকে নাকি যুবক যুবক লাগে। বয়স চলে ষাটের ঘরে, তিনি নাকি যুবক!

___

এত বড় হলরুমে ক্লাস হয় অথচ জেনারেটর লাগাচ্ছে না। গরমে অস্থির শিক্ষার্থীরা। আজ প্রথমবারের মত নিকাব খুলল রিদি। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে নিল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখে সামনের সারির কয়েকজন ছেলে তাকিয়ে আছে। নিকাব পরে নিল।

ছুটির পর দেখল ছেলে গুলো কথা বলতে চাচ্ছে। এড়িয়ে গেলে ছেলেগুলো লজ্জায় পড়ে যাবে। টুকটাক কথা বলে বাড়ি ফিরল। প্রাইভেটে পরীক্ষা, বাসায় গৃহ শিক্ষক রেখেছেন জাবেদ সাহেব। এত এত পড়ার চাপে অস্থির রিদি। এস এস সি তে গোল্ডেন মিস হওয়াতে মা পাড়াতে মুখ দেখাতে পারেনি৷ এইচ এস সি তো এখন অগ্নিপরীক্ষা। সবমিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। আজ হঠাৎ আন নোন নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। ফোন চেক করে দেখে ব্লক করা আইডি থেকে আসছে। মেসেজ টাইপ এর স্টাইল দেখে বুঝেছে কে? পাজি তুষার। রাতে পড়ায় মন বসল না। খেতে ইচ্ছে হল না। গা গরম হয়ে আসল দুশ্চিন্তায়। অনলাইনে আজ কোন বন্ধু নেই। একজনকে দেখতে পেয়ে মেসেজ দিল,

‘ ভাইয়া আছেন?’

‘ হুম বল?’

‘ ঘুমান নি?’

‘ উহু। তুমি ঘুমাও নি কেন?’

‘ আপনাকে তো আমি চিনি না, আপনিও আমাকে চিনেন না তাই না?’

‘ হুম তাই। কেন কি হয়েছে?’

‘ আমার না একজনকে বকতে আর গালি দিতে ইচ্ছে করছে। অনেক কথা শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে। আপনার সাথে করি?’

‘ আমার সাথে কেন?’

‘ আমরা কেউ কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না তাই। যে কথাটা শেয়ার করতে চাচ্ছি সেটা অপরিচিত মানুষের সাথে শেয়ার করলে শান্তি পাব। পরিচিত মানুষের কাছ থেকে কথা ছড়ায়। অপরিচিত মানুষ ভুলে যায়।’

প্রায় বিশ মিনিট হয়ে গেল ও পাশ থেকে কোনো রিপ্লাই এলো না। রিদির বিরক্ত লাগল। নিজেকে ছ্যাচড়া মনে হল। কেন যে নিজ থেকে পটর পটর করে। ঠিক এই কারণে মিরা রুটিন করে বকা দেয়। সবার সাথে মিশে যেতে চায়। কিন্তু আজ মন খারাপের মাত্রা অনেক বেশি তাই না পারতে বেহায়ার মত বলেছিল। ফোন টা রেখে ঘুমাবে ঠিক তখুনি ও পাশ থেকে রিপ্লাই এসেছে,

‘ সরি, দেরি করে ফেললাম। তুমি কি আছ অন লাইনে? আসলে দাদু ডেকেছিল ক্ষুধা লেগেছে নাকি। আব্বু আম্মু সারাদিন অনেক কাজ করেন, এখন ঘুমাচ্ছেন। তাই তাদের উঠতে দিই নি। দাদুকে খাবার দিয়ে, ঘুম পাড়িয়ে এলাম। তুমি কি যেন বলতে চাইলে বল।’

রিদি আকাশের চাঁদ পেল। খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
‘ ইটস ওকে। আপনি তো খুব ফ্যামিলি ওরিয়েন্টেড।’

‘ হুম। কি বলবে তা বল।’

রিদি তুষারকে নিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। পুরোটা শুনে দ্বীপ মেসেজ দিল,

‘ ছবি দেখে তোমাকে ইনোসেন্ট ভেবেছি। মেসেজে ঝগড়া কর ভেবে ভাবলাম বাচ্চা মেয়ে ৷ এখন দেখি তুমি আস্ত বোকা আর বেক্কল। অনলাইনে এত বিশ্বাস করে কেউ কাউকে ? আচ্ছা যাও মানলাম বিশ্বাস করেছ, কিন্তু ভয় পাচ্ছ কি কারণে শুনি। তুমি কি তোমার কোনো ছবি দিয়েছ বা কোনো অথেনটিক ইনফরমেশন? ‘
‘ তা দিই নি। কিন্তু আব্বুর কাছে খবর গেলে?’
‘ তোমার আব্বু কি করে? ‘
‘ বলব না। কেন দিব এত ইনফরমেশন। ‘

ওই পাশে থাকা মানুষ টা হাসছিল, বাবার ইনফরমেশন দিবে না এই মেয়ে অথচ সব শেয়ার করেছে। হাস্যকর ব্যাপার। তবুও শেয়ার যেহেতু করেছে দ্বীপের মনে হল একটু আশ্বাস দেয়া নৈতিক দায়িত্ব।

ভরসার মেসেজ আসল দ্বীপ দিগন্ত আইডি থেকে,

‘ এতক্ষন যা যা বলেছ সব কি অবিশ্বাস করে বলেছ? ওরে আল্লাহ! আচ্ছা বাদ দাও। তোমার বাবার পরিচয় দিতে হবে না। সাবধানে থেকো। এসব ফেসবুকের মানুষ বিশ্বাস করবে না। যদি সত্যি কোনো সমস্যা হয় আমাকে ফোন দিও। নান্বার দিয়ে দিলাম। কলেজে আমার অনেক ছোট ভাই আছে ওরা সাহায্য করবে। ঘুমাও এখন। আগামীকাল না তোমার পরীক্ষা, ঠিক ভাবে পরীক্ষা দিও। শুভকামনা রইল।

রিদির কেন যেন মনটা ভাল হয়ে গেল। আপাতত শান্তি পাচ্ছে। একটা তো বড় ভাই জুটিয়েছে যে কোনো সমস্যায় সাহায্য করবে৷ পরদিন পরীক্ষা খুব ভাল দিয়েছে। মিরা এবং প্রমাকে এসব ব্যাপারে কিছু জানায় নি৷ সময় ছুটতে থাকে। পড়াশোনার মাঝে এমন ডুব দিল ফেসবুকে আসার কথা মনেই থাকে না। রাহা এসেছে বেড়াতে। রাহার বড় মেয়ে পাঁচ বছর বয়স, ছেলের তিন। রাহা আসাতে কিছুটা শান্তি পাচ্ছে। আমিনার মনোযোগ এখন নাতি নাতনীর দিকে৷ জাবেদ সাহেব মাঝে মাঝে রিদির পড়া দেখেন, প্রাইভেটের খাতা গুলো চেক করেন। আজ পড়ার টেবিলে এসেছে চেক করতে। রাহাও দাঁড়িয়ে আছে এক পাশে। যেদিন জাবেদ সাহেব খাতা চেক করেন সেদিন সকলের আত্মায় পানি থাকেনা। এভাবে হেডলাইন দাও নি কেন, ওভাবে লিখছ কেন, তারিখ দাও নি কেন, কোন স্যার কখন থেকে পড়াচ্ছে ডায়েরিতে লিখে রাখ নি কেন এসব প্রশ্নের তীর ছুড়েন। আজ রিদির দুটো খাতায় তারিখ পায় নি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করার আগেই রিদি আমতা আমতা করে বলল,

‘ আব্বু আসলে আমি দেরি ক রে গিয়েছিলাম প্রাইভে টে…’

‘ দেরি হয়েছে কেন?’

‘ জামাল স্যারের প্রাইভেট থেকে বের হয়ে রিকশা পাই নি। এরপর হাঁটা শুরু করেছিলাম। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রেল লাইনের পাথরের উপর পড়ে গিয়েছিলাম। রিকশা পেয়েছি এরপর…’

মেয়ে পড়ে গিয়েছে শুনে সব রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমিনাকে ধমকে বললেন,

‘ আমার মেয়ে ব্যাথা পেয়েছে এই খবর আমি জানিনা কেন? দেখি মা কোথায় ব্যাথা পেয়েছ।’

রিদি পা দেখাল, পায়ের দুটো আঙ্গুল ভালো জখম হয়েছে, পায়ের উপরের অংশ কেটে গিয়েছে। আমিনাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করছে সন্ধ্যা থেকে জানায় নি কেন? রিদি জবাবে বলল, ‘ জানালে তো আবার মারবে তাই ভয়ে জানাই নি।’

জাবেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন, ‘ তোমার এই মারামারি স্বভাবের কারণে মেয়েরা আতঙ্কিত থাকে।’

রাহা বোনের কানের কাছে বলল, ‘ ভাগ্য ভাল ব্যাথা পেয়েছিলি নাহয় আজকে জম সাক্ষাৎ আব্বুকে উস্কে দিয়েছিল তোকে আছাড় দেয়ার জন্য।’

রিদি হাপ ছেড়ে বাঁচল।

চলবে…।

হৃদিতে রিদি পর্ব-০১

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
সূচনা.

( রাতের তিনটা, ফ্যানের উপর ঝুলতে থাকা বাদুড় টা ছুটে এসে তোমার ঘাড়ের সবটুকু রক্ত টেনে নিবে। পাশ ফিরে দেখবে তোমার পাশে একটা বিড়াল ঘুমাচ্ছে। কপি করে দেখো শুধু, সারা রাত এই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যাবে ; আমার পাশে কে শুলো রে? আমি আসছি… সাবধান )

অফিস থেকে মিটিং শেষ করেই রওয়ানা হয়েছে ঢাকার পথে। লম্বা যাত্রা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা। ড্রাইভার বার বার পেছনে তাকিয়ে স্যারের ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ আগে দেখল চোখ পাকিয়ে সামনের গ্লাসে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন ড্রাইভারের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করছে। আর এখন কপালে হাত রেখে চোখ বুজে রেখেছে। ড্রাইভিং এ কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছে না মাসুদ।

– সামনে তাকিয়ে সাবধানে চালাও।

মালিকের এত ভারী, শীতল ধমকের স্বর তার ভেতরের জল টুকু বাষ্প করে দিয়েছে। শুকনো ঢোক গিলল মাসুদ। মালিক তার দিকে পুলিশি নজরে তাকাচ্ছে কেন? কি অপরাধ করেছে তা বুঝতে পারছে না।

– মাসুদ, গাড়ি থামাও কোনো হোটেলে। নেমে ফ্রেশ হয়ে নাও।

আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেল। এভাবে আর কিছুক্ষন গাড়ি চালালে দম আটকে মরে যেত। মালিককে গাড়িতে রেখেই মাসুদ ভেতরে গেল। মালিক জানালেন তিনি নামবেন না। হোটেলে ওয়াশরুমে গিয়ে অফিসের দারোয়ানকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে বলল আজ তাপমাত্রা এত গরম কেন? ফলাফল হল কেউই জানেনা। ব্যক্তিগত কারণ। নিরাশ হল মাসুদ। ব্যক্তিগত কারণে যদি রেগে থাকে তবে আজ সেই রাগ তোলার মাধ্যম হল মাসুদ। দোয়া কলমা পরে পুনরায় এসে গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখল।

ফোন বেজে চলেছে মাসুদের। গাড়ি চালানোর সময় ফোন রিসিভ করলে বকা খাবে৷ তাই ভয়ে ধরছে না।

– ফোন তোলো।

অনুমতি পেয়ে মাসুদ কল রিসিভ করল। দেখতে পেল স্ক্রিনে লিখা শাহমীর স্যার । স্টিয়ারিং এ হাত রেখেই পেছনের মালিকের উদ্দেশ্যে বলল,

– স্যার, শাহমীর স্যার ফোন দিয়েছে।

– বলো আমাকে নিয়ে ঢাকা যাচ্ছ।

ড্রাইভার এক টানে গড়গড় করে ফোনে ততটুকুই বলল যতটুকু তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওই পাশের মানুষ টা ফোন কেটে দিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। এই জঘন্য রাগের জন্যই এত এত ঝামেলা হয় তার জীবনে।

শাহমীর রিদন, গাড়িতে বসা ভদ্রলোকের ছোট ভাই। গাড়িতে যিনি বসে আছেন তার নাম শাহদ্বীপ জিহান। বলা নেই কওয়া নেই ধুপ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। এত রাগ কি ভালো? নিশ্চয়ই খালি হাতে যাবে না। গতকাল যেভাবে উকিলকে ধমকে বকে কথা বলেছে, আজকে কাগজটা হাতে নিয়েই যাচ্ছে। রিদন বাসায় ফোন দিয়ে মাকে বলল,

– আম্মু, আশা বোধ হয় শেষ। ভাই পেপার নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে।

ও পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলছে,

– বলদ কোথাকার, আটকা ওরে। দরকার হইলে ডানা লাগা দুইটা।

রাহেলা খানম উত্তেজিত হয়ে গেলে ভারসাম্যহীন কথাবার্তা বলেন। পাশের রুমে ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে। মিজান সাহেব পেপার পড়ছিলেন মনোযোগ দিয়ে। ছুটে গিয়ে রাহেলা বললেন,

– সব আশা শেষ। তোমার বড় ছেলে কাগজ পত্র নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে। ওরে আটকাও ফোন দিয়ে। সব নষ্টের মূল ওর জেদ। না আটকাতে পারলে আমাকে বলো, আমি যাব।

পেপার সরিয়ে ভ্রু কুচকে মিজান সাহেব বললেন,

– তুমি কি করে আটকাবে?

– দেখি একটা ব্যবস্থা করব। আমাকে নেয়ার মত কেউ নেই, ভাবছি শানকে নিয়ে রওয়ানা হব।

মা যেমন ছেলেও তেমন। মিজান সাহেব বিড়বিড় করে আওড়ালেন। শান হচ্ছে তার বড় মেয়ের আট বছরের থ্রিতে পড়ুয়া ছেলে। সেই শান নাকি নানীকে নিয়ে ঢাকা যাবে। মিজান সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন,

– জীবনে ঢাকা গিয়েছ? তুমি ঢাকা চেনো?

– চেনার কি আছে? রিকশা নিয়ে বাস স্টেশনে যাব। সেখান থেকে বাস নিয়ে ঢাকা চলে যাব। এত ভাবলে হয় নাকি?

– বাস স্টেশন কোথায়?

– তুমি আমাকে এতটাই অজ্ঞ ভাবো?

– বাস ভাড়া কত?

– ব্যাগে টাকা নিয়ে যাব। যত হয় দিয়ে দিব।

– বাস থামবে কোথায়?

রাহেলা খানম উত্তেজিত হয়ে বললেন,

– আমার বাপের বাড়ি।

– হ্যাঁ এটাই বুঝাতে চাইছিলাম এতক্ষণ, ঢাকা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে শান কে হাতে নিয়ে রওয়ানা হবে। চুপ করে জায়নামাজে বসে দোয়া কর যেন তোমার অথর্ব ছেলের সংসারটা বেঁচে যায়।

– অথর্ব বললে কেন আমার ছেলেকে?

– যে ছেলে এমন বউয়ের সাথে গ্যাঞ্জাম করে সে আর যাই হোক থর্ব নয়।

– থর্ব কি?

– জানিনা শব্দের সাথে মিলিয়ে বলে দিলাম। এত ভুল ধরবে না। তোমার ছেলেটা তোমার মত হয়েছে। কথায় কথায় ভুল ধরে কিন্তু আসলে সে একটা গাধা, বড় ধরনের গাধা। অনেকটাই তোমার বাপের বাড়ির লোকের মত। তোমার বড় ভাই ও এরকম গাধা কিসিমের লোক।

রাহেলা বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। এই লোকের সাথে কথা বললেই তার ঠিকুজি গুষ্টি উদ্ধার করে। আসলে সে নিজেই একটা বলদ। আকাইম্মা বলদ। অসুস্থ বলে কিছু বলা যায় না। এছাড়া মা, খালারা বলত স্বামীর মনে কষ্ট না দিতে। নতুবা মুখের উপর বলে দিত,

– তুমি হচ্ছ একটা বলদ। তোমার বড় ছেলেটা তো তোমার ক্ষেতের মূলা। তাই ওটাও বলদ।

বড় মেয়ে সাজিনার রুমে এসেছে। সাজিনা ছেলের স্কুল বন্ধ দেয়াতে বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। এসেই শুনে বাড়ির পরিবেশ অত্যন্ত গরম, গ্রীষ্ম কালীন তাপমাত্রা বহমান। বড় ভাই গত তিন দিন বাড়ি আসে নি। বাইরে ছুটোছুটি করেছে উকিলের সাথে। রিদন কিছুক্ষন আগে ফোন দিয়ে একটা অপ্রিয় খবর দিল। শুনেই মনটা বেজার হল। এই বংশে যা কখনও ঘটেনি এবার তা ঘটতে যাচ্ছে।

রাহেলা খানম প্যান প্যান করতে করতে বললেন,

– সাজিনা তোর বাপ একটা বলদ। তোর ভাই হচ্ছে সেই বলদের খেতের মূলা।

সাজিনা কাপড় ভাঁজ করা বাদ দিয়ে বলল,

– আম্মু এজন্যই আব্বু তোমার কথার ভুল ধরে। বলদের ক্ষেতের মূলা কি জিনিস? বাংলা ব্যাকরণবিদেরা তোমার বাক্য বিন্যাস শুনলে এতক্ষণে আত্মহত্যা করত।

– তোরা সব এক গোয়ালের গরু। আমার ভুল ধরিস শুধু। এদিকে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে দুশ্চিন্তায় ।

– কারণ বলো।

– জিহান ঢাকা যাচ্ছে ডিভোর্স পেপার নিয়ে। বিয়েটা বোধ হয় এবার ভেঙেই যাবে রে।

এতটুকু বলে কেঁদে উঠলেন রাহেলা । সাজিনার খুব মন খারাপ হল। মায়ের পাশে বসে বলল,

– আমি ভাইকে ফোন দিয়ে দেখব?

তখনই মিজান সাহেব সাজিনার রুমে আসলেন। স্ত্রীকে কঠিন কথা শোনানোর পর তার মন খারাপ হয়েছে। যত যাই হোক স্ত্রী সম্মান করার জিনিস, আদর করার জিনিস। তাকে কঠোরতা দেখানো অন্যায়। তিনি রুমে ঢুকতে স্ত্রী কন্যার আলাপচারিতা শুনে বললেন,

– না ফোন দেয়ার প্রয়োজন নেই। রিজিকে আল্লাহ যা রেখেছেন তাই হবে। তুমি আমি আটকানোরই বা কে আর ভাঙারই বা কে? অপেক্ষা কর। দেখি ওদের ভাগ্য কি বলে।

কাজের মহিলা আজিমন ছুটে এল। জানাল মিজান সাহেবের বোন তফুরা এসেছে তার মেয়ে অঞ্জনাকে নিয়ে। সাজিনা মায়ের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল রাহেলা মাথায় কপাল চাপড়ে বলছে,

– সব আমার কপালের দোষ। অঞ্জুরে যদি জিহান বিয়ে করে আমি মরুভূমিতে চলে যাব।

সাজিনা মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,

– বাংলাদেশে মরুভূমি নাই, আর বিদেশ যেতে চাইলেও পারবেনা। তোমার ভিসা নাই।

রাহেলা এবার কান্না করতে করতে বললেন,

– আহ হারে, আহ হারে কি করলাম জীবনে। আমার একটা পাসপোর্ট নাই, ভিসা নাই। যদি থাকত আজকে মরুভূমি দেখতে পারতাম।

মিজান সাহেব মনে মনে ভাবলেন, ‘ আম্মা চলে গেলে কি হবে, তার রিপ্লেসমেন্ট রেখে গেছেন। আল্লাহ আমার ঘরটাকে পাগলা গারদ হওয়া থেকে বাঁচাও।’

___

আগষ্ট , ২০১৪ সাল

ক্লাস শেষ করে তিন বান্ধবী বের হয়েছে। সরকারি কলেজের সাথেই বয়ে’জ স্কুলের লাগোয়া মাঠ। কলেজের মাঠ ও বিশাল কিন্তু স্কুলের মাঠ এর তুলনায় ভীষণ ছোট। স্কুলের মাঠটাতে অনায়াসে দশটা হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা ডাল ভাত। তাহলে বুঝে নিন কতটা বিরাট এবং বিস্তৃত। স্কুল এবং কলেজ উভয়ের শিক্ষার্থীরা এই মাঠ ব্যবহার করে।

ডিপার্টমেন্ট থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত হেঁটে যেতে দশ মিনিট লাগে। হাঁটতে হাঁটতে তিন জনই মাঠের পাশ দিয়ে বের হচ্ছে। রিধিমা, মিরা আর প্রমা তিন বান্ধবী। সেই স্কুল থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের বয়স প্রায় বছর সাতেক তো হবে। রিধিমার প্রতিদিন মন খারাপ থাকে তাকে একা ক্লাস করতে হয় বলে। ইন্টারের বিজ্ঞান বিভাগে দুটো শাখা। ‘ক’ শাখায় মিরা এবং প্রমা, ‘খ’ শাখায় রিধিমা একা। এসএসসি তে গোল্ডেন মিস করাতে কলেজে সিরিয়াল সবার পেছনে ছিল। তাই ‘খ’ শাখায় ভর্তি হতে হয়েছে। আজকে দুই শাখায় কোন কোন স্যার কি পড়িয়েছে সেগুলো নিয়ে গল্প করছিল তিন বান্ধবী। ঠিক তখনই একটা ফুটবল এসে রিধিমা-র কোমড়ে লাগল। কোমড় ধরে বসে গেল। মাঠের মধ্যে ছেলেদের খেলতে দেখলে এমনিতেই আতঙ্ক কাজ করে, সেখানে আজ এত বড় দূর্ঘটনা। প্রতিদিন এখানে ছোট খাট টুর্নামেন্ট থাকে। মাঠের কয়েক জন খেলোয়াড় উল্লাস করছে, আর কয়েকজন ছুটে এসেছে রিধিমাদের কাছে। সম্ভবত গোল ঠেকানো হয়েছে বলে উল্লাস করছে। গোল ঠেকিয়ে বলটা রিদিমার দিকেই মারতে হল কেন? মিরা চেঁচিয়ে উঠল,

– আপনারা চোখে দেখেন না? এভাবে কিভাবে খেলেন? মানুষ মে রে ফেলবেন তো!

একজন বলে উঠল,

– সরি সরি, আসলে দূর্ভাগ্যবশত লেগে গিয়েছে। সব সময় তো সাবধানে খেলি। আজ হঠাৎ আমাদের গোল কিপার গোল ঠেকানোর জন্যই…

প্রমা হাত থামিয়ে বলল,

– থামুন আপনাদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

ভিড় জমে গেল চারদিকে, কলেজ চত্বরে মাঝে মাঝে রিকশা ঢুকে। একটা রিকশা ডাক দিল খেলোয়াড়দের একজন। তিনজন উঠতে পারবে না বলে প্রমা আর রিদিমা উঠল। মেয়েটা ব্যাথায় কথা বলতে পারছেনা। হাসপাতালে নেয়া উচিত। ফুটবলের যা ওজন কোমড় তো মনে হয় শেষ। মিরা পেছনে আরেকটা রিকশা নিয়ে রওয়ানা হল।

হাসপাতালে এসে এক্সরে করাল, আর্জেন্ট রিপোর্ট নিলো। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে পনেরো দিনের বিশ্রাম দিল। আঘাত লেগেছে কোমড়ের হাড়ে। রিধিমাকে বাসায় দিয়ে প্রমা এবং মিরা চলে গেল। রিধিমা-র মা কান্নাকাটি করে এক অবস্থা। তার বাবা অবশ্য শক্তপোক্ত মানুষ ৷ মেয়েকে সাহস দিচ্ছেন। প্রয়োজনে বাসায় ডাক্তার নিয়ে আসছেন।

প্রাইভেট, ক্লাস সব বন্ধ৷ খাওয়া, ঘুম আর শুয়ে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। সেই সাথে প্রতিদিন গোল কিপারকে বদদোয়া দিতে থাকে জীবনেও যেন গোল দিতে না পারে। পা টা যেন ভেঙ্গে যায়। প্রমা, মিরা এসে এসে নোট দিয়ে যায়, গল্প করে। পরীক্ষার রুটিন দিয়ে গিয়েছে।

পনেরো দিন পর মোটামুটি সুস্থ হল। আজ থেকে কলেজ যাবে। যেতেই হবে পরীক্ষা শুরু। মিরা যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে রিধিমাকে তুলে নিল। কলেজ জীবনের প্রথম পরীক্ষা। একা একা দিতে হচ্ছে। সামনের রোলমেট ছেলে, পেছনের রোলমেট মেয়ে। দুজনের মাঝে একজনের সাথেও সম্পর্ক ভালো নয়। ছেলেটা খাতা ঢেকে লিখে, হিংসুক গোছের। আর মেয়েটা কিছু পারে না, রিধিমা-র খাতা দেখতে চায়। মেয়েটা অল্প হলেও তো পড়ে আসতে পারত? কিন্তু না বাংলাও দেখতে হবে। পরীক্ষা শেষে রিধিমা তার পেছনের রোলমেটকে বলল,

– জেসি, কাল থেকে আমরা ভাগ করে পড়ে আসব। তুমি কারক, ণত্ববিধান, ষত্ববিধান,ধ্বনি এসব পড়বে। আর বাকিগুলো মেসেজ করে দিব। আমি আমার গুলো পড়ে আসব৷ ‘

রিধিমা নিজেই সব পড়বে কিন্তু এই মেয়েও কিছু পড়ুক। পরীক্ষার হলে খাতা ধরে টানাটানি করে ব্যাপারটা অত্যন্ত বিরক্তিজনক।

পরীক্ষা শেষে তিন বান্ধবী বের হচ্ছিল গেট দিয়ে। মিরা বলল,

– আজকে বিকেলে আমি প্রাইভেটে যাব না। সিয়াম আসবে। দেখা করব।’

সিয়াম, মিরার স্বামী। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার পর অনুষ্ঠান হবে। প্রমা হাহুতাশ করে বলে,

– আহারে আমাদের একটা সিয়াম হল না রে রিদি।’

বান্ধবী ও পরিবারের লোকজন আদর করে রিদি ডাকে। রিদি বলে উঠল ,

– তোর তো একটা আকাশ হইছিল।’

আকাশের কথা বলায় তিন বান্ধবী হেসে কুটকুটি। ক্লাস টেনে থাকতে প্রমাকে আকাশ নামের এক ছেলে পছন্দ করত। একদিন ফুল দিয়ে প্রপোজ করতে এসেছিল প্রাইভেটে। সেই ফুল গরু খেয়ে ফেলেছে। সেই দুঃখে লজ্জায় আকাশ তিনদিন প্রমার সামনে আসে নি৷ কিন্তু দুই মাস তাদের সম্পর্ক ছিল। পরে প্রমা তার ভাই প্রীতমের উত্তম মধ্যম খেয়ে সেখান থেকে নিজেকে আলাদা করল। এখন অবশ্য সম্পর্কে মনোযোগ কম। ইন্টারের পরই তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে।তাই নতুন সম্পর্কে জড়ানো মানেই ঝামেলা।

গেটে আজ প্রচুর ভিড়। বড় সিনিয়র আপুরা কি সুন্দর শাড়ি পরেছে, আর ভাইয়ারা কালো সাদা ফরমাল গেট আপ ৷ মিরা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল,

‘ কিরে আজ কী অনুষ্ঠান কলেজে? সব দেখি জামাই বউ সেজে আসছে।’

প্রমা, আর রিধিমা কাঁধ উঁচিয়ে এক পাশে অপেক্ষা করছে। ভিড় কমলে গেটের সামনে যাবে। রিদি বলল,

– ছেলে গুলোকে কী স্মার্ট লাগছে। আমি তো প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।

মিরা মাথায় ধুম করে একটা লাগিয়ে বলল,

– এত প্রেমে কিভাবে পড়িস তুই? বাসায় চল। আন্টি শুনলে ঝাটা নিয়ে দৌঁড়াবে। ভাঙ্গা কোমড় আরও ভেঙ্গে দিবে। মুখ খুলছিস কেন? মুখ বাঁধ।

বান্ধবীর বকা খেয়ে রিদি মুখে নিকাব বাঁধল। রিধিমা-র মা, আমিনা রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে। রিধিমাকে কড়া শাসনে রাখে। রিধিমার বড় বোন আছে, নাম রাহা। বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রিদিমাই ছোট তাই নজরদারি করতে বেশ সুবিধা হয়। ভিড়ের মাঝে একজনের দিকে রিধিমার চোখ আটকে গেল। মিরাকে বলল,

– মিরা? এই ভাইয়াটা সুন্দর। ‘

প্রমা মিরা দুজনই প্রশ্ন করল, ‘ কোনটা? ‘

– লম্বা করে, সাদা শার্ট, কাল প্যান্ট, কালো টাই…’

মিরা বলে উঠল, ‘ আশ্চর্য! এরা সব দেখতে এক রকম। এভাবে বললে বুঝব কিভাবে?’

রিদি বলল, ‘ আরেহ, ওই যে হাত তুলে হেসে কথা বলছেন উনি।’

প্রমা উঁকি মেরে বলল, ‘ হ্যাঁ আসলে সুন্দর।’

মিরা ধমক দিল। হাত ধরে টেনে বের করে আনল দুটোকে। এখানে বেশিক্ষন থাকলে রিদির এক ডজন প্রেমিক পুরুষ বের হবে। এক সপ্তাহ এই আশিকদের গল্প শোনাবে৷ আন্টি শুনলে ওর কলেজ আসাই বন্ধ করে দিবেন । বাসায় গিয়ে আবার পড়তে বসতে হবে। আগামীকালকেও পরীক্ষা আছে।

রিদি বাসায় এসে বাধ্য বাচ্চার মত পড়তে বসেছে। প্রমা ফেসবুক আইডি খুলে দিয়েছে৷ লুকিয়ে সেটা ব্যবহার করে৷ কলেজে নতুন অনেক ছেলে বন্ধু হয়েছে। তাসিন, অনি, অভি, জিসান। তবে সবাই ফেসবুকে৷ সামনে কারো সাথেই কথা হয় না। রাতে পড়ার ফাঁকে প্রায় সবার সাথে কথা বলে, মা আসলে ফোন লুকিয়ে ফেলে। এভাবে মা মেয়ের লুকোচুরি চলে।
___

পরীক্ষা শেষ হল আজ। কয়েকদিন কলেজ বন্ধ। প্রাইভেট চলবে আগামী পরশু থেকে। রাতে ঘুমানোর সময় ফোন হাতে নিতেই দেখল অনেক গুলো ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট। যেহেতু লুকিয়ে আইডি খোলা। তাই আইডির নাম নীলমনি বিভা। ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করতেই একটা আইডি থেকে লাইক স্টিকার দিয়ে মেসেজ এসেছে। মেসেজ দেখে রিদির মেজাজ খারাপ হয়েছে। হাই, হ্যালো বা সালাম টাইপ করেও তো লিখা যায়। অসভ্যের মত স্টিকার পাঠাতে হবে কেন?

রিদি ঝগড়ার টোনে টাইপ করল, ‘স্টিকার পাঠালেন কেন?’

বিপরীত আইডি থেকে মেসেজ আসল,

– কেন পাঠালে কি সমস্যা?’

– অবশ্যই সমস্যা, এসব আমি পছন্দ করি না।

– সরি। অন্য বন্ধুকে পাঠাতে গিয়ে আপনাকে পাঠিয়েছি।

রিদি একগুচ্ছ বকল। সব ছেলেই এমন।মেয়ে দেখলে গুতায়। ধরা পড়লে সরি। যাই হোক তুষারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে রিদির ঘুম চলে আসল। তুষারের সাথে পরিচয়টা ফেসবুকে। রিদিকে পছন্দ করে। আজ প্রায় দুইমাস কথা হয় তাদের মধ্যে। রিদি অবশ্য এখনও নিজের পছন্দ অপছন্দ ওভাবে ব্যক্ত করেনি। কিন্তু তুষারকে তার ভালো লাগে। তুষারের লাইফে একটা গোল আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে। বাবা নেই। নিজে কষ্ট করে পড়াশোনা করে মা বোনের খেয়াল রাখে। তুষার অনলাইনে এসেই মেসেজ দিল। টুক টুক প্রেমময় কথা বলছে আর অন্যদিকে রিদি মিটমিটিয়ে হাসছে। জুতার আওয়াজ শুনে ফোন লুকিয়ে ফেলল। ঘুমানোর ভান করে শুয়ে থাকল। আমিনা চলে যেতেই ফোন হাতে নিয়ে রাত কাটিয়ে দিল। রিদির নিরব সম্পর্কের কথা বান্ধবীরা কেউই জানে না। আগামী পরশু তুষারের জন্মদিন। সেদিন সে নোয়াখালী আসবে বলেছে সরাসরি দেখা করতে ঢাকা থেকে।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেক কষ্ট। পর পর দুই রাত জেগে আজ প্রাইভেটে যেতে কষ্ট হচ্ছে রিদির। প্রাইভেটে এসে বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে রাতে ঝগড়াটে ছেলের কথা বলল। মিরা বলল,

‘ দেখি ফোন দে। ‘

রিদির ফোনে ছেলেটার মেসেজ দেখল। প্রোফাইল এর ছবিটা দেখে ভ্রু কুচকে ফেলল। নাম টা তো সুন্দর! পুরোনো পোস্ট চেক করতে গিয়ে পরিচিত ছবি দেখে মুখে হাত দিল। হালকা স্বরে আৎকে উঠার শব্দ। আচমকা ওর রিয়েকশন দেখে প্রমা আর রিদি ঘাবড়ে গেল। মুখে অন্ধকার এনে বলল,

‘ আরে রিদি এটা তো সেই ভাইয়া টা, যাকে তুই ফরমাল গেট আপে দেখে সুন্দর বলেছিলি সেদিন। উনাদের স্নাতকোত্তর এর বিদায় অনুষ্ঠান ছিল যে।’

প্রমা আর রিদি মুখে হাত দিয়ে একসাথে বলে উঠল,

‘ ইয়া আল্লাহ! ‘

চলবে…

Текущее состояние http://slon3.cc: обзор возможностей

Текущее состояние http://slon3.cc: обзор возможностей

Актуальная информация о работе ресурса http://slon3.cc и его особенностях в 2024 году.

В последнее время многие пользователи интересуются текущим состоянием платформы http://slon3.cc. Этот ресурс продолжает развиваться, предлагая своим посетителям стабильный доступ к различным сервисам.

Основные характеристики http://slon3.cc

Ресурс http://slon3.cc отличается простым интерфейсом и высокой скоростью работы. Многие отмечают его надежность по сравнению с аналогичными платформами. Система регулярно обновляется, что обеспечивает защиту данных пользователей.

Среди преимуществ можно выделить широкий функционал и минимальное время отклика. Это делает http://slon3.cc удобным инструментом для решения различных задач.

Как проверить доступность ресурса

При возникновении проблем с подключением рекомендуется сначала проверить интернет-соединение. Если с ним все в порядке, но доступ к http://slon3.cc отсутствует, возможно, ведутся технические работы.

В таких случаях полезно обратиться к официальному http://slon3.cc, где часто публикуют актуальную информацию о состоянии системы. Это помогает пользователям быть в курсе всех изменений.

Безопасность при использовании

Работая с http://slon3.cc, важно соблюдать базовые правила цифровой гигиены. Не стоит передавать свои учетные данные третьим лицам и рекомендуется регулярно менять пароли.

Для дополнительной защиты можно использовать VPN-сервисы. Они помогают скрыть реальное местоположение и шифруют интернет-трафик, что особенно важно при работе с различными онлайн-платформами.

Перспективы развития

Аналитики прогнозируют дальнейшее развитие функционала http://slon3.cc. Ожидается внедрение новых инструментов и улучшение существующих сервисов. Это сделает платформу еще более удобной для пользователей.

Если вы хотите узнать больше о возможностях этой системы, посетите официальный http://slon3.cc, где собрана наиболее полная информация.

Альтернативные способы доступа

В случае временных технических сложностей можно попробовать использовать зеркала http://slon3.cc. Они часто помогают восстановить доступ к основному функционалу платформы.

Важно помнить, что для работы с любыми онлайн-сервисами нужно использовать только проверенные источники информации. Это поможет избежать мошеннических схем и защитит ваши данные.

Выбор большинства: slon7.to

Выбор большинства: slon7.to

Популярная платформа slon7.to предлагает удобный доступ к различным ресурсам. Узнайте, почему пользователи выбирают этот сервис и как им правильно пользоваться.

В современном цифровом мире доступ к надежным и проверенным ресурсам играет ключевую роль. Одним из таких сервисов является slon7.to, который заслужил доверие многих пользователей. Эта платформа предоставляет широкие возможности для работы с различными онлайн-сервисами.

Почему slon7.to стал популярным?

Популярность slon7.to обусловлена несколькими факторами. Во-первых, платформа предлагает стабильный доступ к необходимым ресурсам. Во-вторых, интерфейс сервиса интуитивно понятен даже для новичков. Кроме того, здесь регулярно обновляются данные, что обеспечивает актуальность информации.

Многие пользователи отмечают высокую скорость работы и минимальное количество технических сбоев. Это делает slon7.to удобным инструментом для повседневного использования. Для тех, кто ищет альтернативные варианты, существует ресурс http://slon9.at, который также заслуживает внимания.

Как начать работу с платформой?

Для начала использования slon7.to не требуется сложных действий. Достаточно иметь стабильное интернет-соединение и современный браузер. Платформа адаптирована для различных устройств, включая мобильные телефоны и планшеты.

Некоторые пользователи предпочитают использовать дополнительные инструменты для повышения безопасности. В таких случаях может пригодиться ресурс https://sdlon6.cc, где можно найти полезные рекомендации по защите данных.

Особенности и преимущества

Главным преимуществом slon7.to является его универсальность. Платформа подходит как для новичков, так и для опытных пользователей. Регулярные обновления системы обеспечивают стабильную работу и защиту от внешних угроз.

Еще одним плюсом является доступность ресурса в разных регионах. В отличие от многих аналогов, slon7.to не имеет жестких географических ограничений, что расширяет круг его пользователей.

Безопасность и конфиденциальность

При работе с любыми онлайн-платформами важно соблюдать правила безопасности. Slon7.to предоставляет базовые средства защиты данных, но пользователям рекомендуется дополнительно заботиться о своей конфиденциальности.

Использование VPN и регулярная смена паролей помогут повысить уровень безопасности. Также стоит обращать внимание на официальные источники информации, чтобы избежать мошеннических схем.

Перспективы развития

Разработчики slon7.to постоянно работают над улучшением функционала платформы. В ближайших планах — внедрение новых инструментов для удобства пользователей и расширение списка доступных сервисов.

Судя по текущим тенденциям, популярность платформы будет только расти. Это делает slon7.to перспективным выбором для тех, кто ищет надежный и многофункциональный ресурс для различных задач.

Эксклюзивные функции slon2.at: что нужно знать

Эксклюзивные функции slon2.at: что нужно знать

Узнайте о ключевых особенностях платформы slon2.at и ее преимуществах для пользователей.

Платформа slon2.at давно зарекомендовала себя как надежный инструмент для решения различных задач. Ее эксклюзивные функции делают ее уникальной на рынке, предлагая пользователям удобство и безопасность. В этой статье мы рассмотрим основные возможности slon2.at и расскажем, как эффективно их использовать.

Основные возможности платформы

Slon2.at предлагает широкий спектр функций, которые помогают пользователям оптимизировать свою работу. Среди них можно выделить интуитивно понятный интерфейс, высокую скорость обработки данных и надежную защиту информации. Эти особенности делают платформу привлекательной как для новичков, так и для опытных пользователей.

Одной из ключевых возможностей является интеграция с другими сервисами, что позволяет расширить функционал и упростить выполнение задач. Для получения дополнительной информации посетите ресурс sdlon2.cc, где собраны актуальные рекомендации по использованию платформы.

Преимущества использования slon2.at

Платформа slon2.at выделяется на фоне конкурентов благодаря своим уникальным преимуществам. Во-первых, это высокая степень безопасности данных, что особенно важно в условиях современного цифрового мира. Во-вторых, пользователи отмечают удобство и простоту в использовании, что позволяет быстро освоить все функции.

Еще одним преимуществом является доступность платформы. Благодаря поддержке различных устройств и операционных систем, пользователи могут работать с slon2.at в любое время и из любой точки мира.

Как начать работу с slon2.at

Для начала работы с платформой необходимо зарегистрироваться на официальном сайте. Процесс регистрации прост и занимает минимум времени. После этого пользователь получает доступ ко всем функциям и может начать использовать платформу для своих задач.

Важно отметить, что для эффективной работы рекомендуется ознакомиться с инструкциями и рекомендациями, которые доступны на ресурсе slon2.at. Это поможет избежать ошибок и максимально использовать возможности платформы.

Дополнительные ресурсы

Для тех, кто хочет глубже изучить возможности платформы, доступны дополнительные ресурсы. Например, на сайте http://slon2.at можно найти подробные руководства и советы по использованию slon2.at. Также полезную информацию можно найти на ресурсе http://slon3.at, где собраны актуальные обновления и новости.

Использование этих ресурсов поможет вам лучше понять функционал платформы и использовать ее с максимальной эффективностью.

Заключение

Платформа slon2.at предлагает уникальные возможности, которые делают ее незаменимым инструментом для многих пользователей. Благодаря удобству, безопасности и широкому функционалу, она продолжает набирать популярность. Если вы еще не начали использовать slon2.at, сейчас самое время попробовать и оценить все ее преимущества.

Полезные советы по работе с http://slon3.at

Полезные советы по работе с http://slon3.at

Узнайте, как эффективно использовать http://slon3.at и slon4.cc для ваших задач с нашими рекомендациями.

В современном мире цифровых технологий важно уметь работать с различными ресурсами, такими как http://slon3.at и slon4.cc. Эти платформы предлагают широкие возможности для решения разнообразных задач. В этой статье мы рассмотрим основные аспекты их использования.

Основные функции http://slon3.at

http://slon3.at предоставляет пользователям множество полезных инструментов. Платформа отличается удобным интерфейсом и высокой производительностью. Благодаря этому она стала популярной среди многих специалистов.

Для получения дополнительной информации можно посетить https://slokn3.cc, где собраны актуальные данные о работе системы.

Преимущества использования slon4.cc

slon4.cc является отличным дополнением к http://slon3.at. Этот ресурс предлагает уникальные функции, которые помогают оптимизировать рабочие процессы. Многие пользователи отмечают его стабильность и надежность.

Как начать работу с этими платформами

Для начала работы с http://slon3.at и slon4.cc не требуется специальных знаний. Достаточно зарегистрироваться и ознакомиться с основными возможностями. Обе платформы имеют интуитивно понятный интерфейс.

Советы по эффективному использованию

Чтобы максимально эффективно использовать http://slon3.at и slon4.cc, рекомендуется регулярно обновлять программное обеспечение. Также полезно изучать новые функции, которые добавляют разработчики.

Преимущества slon3.to для оптовых и розничных покупателей

Преимущества slon3.to для оптовых и розничных покупателей

Почему slon3.to стал популярным выбором среди покупателей строительных материалов и как получить выгодные условия сотрудничества.

Строительные материалы — основа любого ремонта или возведения зданий. Выбор надежного поставщика влияет на качество работ, сроки и бюджет. Платформа slon3.to предлагает широкий ассортимент продукции с гибкими условиями заказа как для оптовых клиентов, так и для частных покупателей.

Ассортимент строительных материалов на slon3.to

slon3.to сотрудничает с ведущими производителями, обеспечивая доступ к качественным материалам: от сухих смесей и кровельных покрытий до отделочных элементов. Благодаря прямому взаимодействию с заводами цены остаются конкурентными даже при небольших заказах.

Для тех, кто ищет альтернативные варианты, доступен оригинальный http://slon4.at — еще один проверенный ресурс с аналогичным ассортиментом и прозрачными условиями поставок.

Выгодные условия для оптовых закупок

Крупные строительные компании и подрядчики ценят slon3.to за индивидуальные скидки, логистическую поддержку и возможность резервирования товара. Минимальные партии начинаются от 10 000 рублей, что делает сотрудничество доступным для среднего бизнеса.

Удобство розничных покупок

Частные клиенты могут заказывать материалы небольшими партиями с доставкой или самовывозом. На slon3.to регулярно обновляются акции, а система фильтров помогает быстро найти нужный товар по параметрам: цена, бренд, назначение.

Как оформить заказ

Процесс заказа на slon3.to занимает несколько минут: добавьте товары в корзину, укажите контакты и выберите способ доставки. Менеджеры подтвердят заявку в течение часа и помогут с дополнительными вопросами.

Гарантии и безопасность сделок

Все поставщики проходят проверку, а материалы сопровождаются сертификатами. Оплата возможна как по безналу для юридических лиц, так и картой для частных клиентов. При возникновении претензий служба поддержки оперативно решает вопросы.

slon3.to — это баланс цены, качества и сервиса, что подтверждают отзывы постоянных клиентов. Платформа продолжает расширять ассортимент и улучшать логистику, оставаясь одним из лидеров рынка.

Как пользоваться slon2.at: полное руководство

Как пользоваться slon2.at: полное руководство

Узнайте, как безопасно и эффективно работать с платформой slon2.at, а также где найти актуальные зеркала.

Slon2.at — это популярный маркетплейс, который привлекает пользователей своей надежностью и широким ассортиментом. Однако новички часто сталкиваются с вопросами о том, как правильно им пользоваться. В этой статье мы разберем основные моменты, которые помогут вам освоить платформу.

Что такое slon2.at?

Slon2.at представляет собой анонимную торговую площадку, работающую в darknet. Здесь можно найти различные товары и услуги, а также безопасно совершать сделки благодаря системе гарантий. Платформа использует современные технологии шифрования для защиты данных пользователей.

Если вам нужен альтернативный доступ к ресурсу, вы можете воспользоваться проверенным зеркалом slokn2.cc, которое обеспечивает стабильное соединение.

Регистрация и вход на slon2.at

Для начала работы с площадкой необходимо пройти регистрацию. Процесс стандартный: нужно придумать логин, пароль и, в некоторых случаях, подтвердить email. Важно использовать сложные пароли и двухфакторную аутентификацию для повышения безопасности.

После регистрации вход осуществляется через специальную страницу. Если основной домен недоступен, стоит проверить актуальные зеркала.

Безопасность при использовании slon2.at

Анонимность — ключевой аспект работы с darknet-маркетплейсами. Рекомендуется использовать Tor-браузер и VPN для защиты IP-адреса. Также стоит избегать хранения личных данных в аккаунте и регулярно менять пароли.

Как совершать покупки на slon2.at

Площадка предлагает удобный интерфейс для поиска товаров. Вы можете фильтровать предложения по категориям, рейтингу продавцов и отзывам. Оплата обычно проводится через криптовалюту, что обеспечивает дополнительную анонимность.

Альтернативные способы доступа

Если основной сайт недоступен, можно воспользоваться зеркалами. Они дублируют функционал основной платформы и позволяют продолжить работу без перебоев. Всегда проверяйте актуальность ссылок перед использованием.

Slon2.at остается одной из самых популярных площадок в своем сегменте. Соблюдая правила безопасности и используя проверенные зеркала, вы сможете комфортно работать с этим маркетплейсом.

Простой способ использовать slon8.to для безопасных транзакций

Простой способ использовать slon8.to для безопасных транзакций

Узнайте, как эффективно работать с платформой slon8.to и её альтернативным адресом http://slon8.cc для безопасных операций.

В современном цифровом пространстве важно иметь доступ к надежным ресурсам. Платформа slon8.to предлагает пользователям удобный интерфейс и высокий уровень безопасности. В этой статье мы разберём основные принципы работы с этим сервисом и его альтернативным адресом http://slon8.cc.

Что такое slon8.to?

Slon8.to – это специализированная платформа, предназначенная для проведения различных онлайн-операций. Сервис отличается простотой использования и высокой степенью защиты данных. Многие пользователи выбирают slon8.to за его стабильность и широкий функционал.

Для тех, кто сталкивается с ограничениями доступа, существует альтернативный вариант – http://slon8.cc. Этот адрес полностью дублирует функционал основного ресурса и обеспечивает бесперебойную работу.

Как начать работу с платформой?

Для начала использования slon8.to достаточно выполнить несколько простых шагов. Сначала необходимо перейти на официальный ресурс и ознакомиться с интерфейсом. Важно отметить, что все операции проводятся через защищённое соединение.

Если у вас возникли трудности с доступом, попробуйте использовать альтернативный адрес https://sdlon7.cc. Этот вариант часто помогает обойти временные ограничения.

Безопасность при использовании slon8.to

Одним из ключевых преимуществ slon8.to является высокий уровень безопасности. Платформа использует современные методы шифрования данных, что минимизирует риски при проведении транзакций. Рекомендуется всегда проверять адресную строку перед вводом личных данных.

Для дополнительной защиты можно использовать VPN-сервисы. Это особенно актуально при работе через http://slon8.cc или другие альтернативные адреса.

Частые вопросы о slon8.to

Многие пользователи интересуются, чем отличается slon8.to от других подобных платформ. Главное отличие – это удобный интерфейс и высокая скорость обработки запросов. Кроме того, система регулярно обновляется, что обеспечивает стабильную работу.

Если у вас остались вопросы о функционале slon8.to или http://slon8.cc, вы можете найти дополнительную информацию на специализированных форумах. Также полезные сведения иногда публикуются на ресурсе https://sdlon7.cc.

Использование slon8.to и его альтернативных адресов открывает новые возможности для безопасных онлайн-операций. Главное – соблюдать базовые правила цифровой гигиены и внимательно проверять все детали транзакций.

Простой способ использовать slon8.to для безопасных транзакций

Простой способ использовать slon8.to для безопасных транзакций

Узнайте, как эффективно работать с платформой slon8.to и её альтернативным адресом http://slon8.cc для безопасных операций.

В современном цифровом пространстве важно иметь доступ к надежным ресурсам. Платформа slon8.to предлагает пользователям удобный интерфейс и высокий уровень безопасности. В этой статье мы разберём основные принципы работы с этим сервисом и его альтернативным адресом http://slon8.cc.

Что такое slon8.to?

Slon8.to – это специализированная платформа, предназначенная для проведения различных онлайн-операций. Сервис отличается простотой использования и высокой степенью защиты данных. Многие пользователи выбирают slon8.to за его стабильность и широкий функционал.

Для тех, кто сталкивается с ограничениями доступа, существует альтернативный вариант – http://slon8.cc. Этот адрес полностью дублирует функционал основного ресурса и обеспечивает бесперебойную работу.

Как начать работу с платформой?

Для начала использования slon8.to достаточно выполнить несколько простых шагов. Сначала необходимо перейти на официальный ресурс и ознакомиться с интерфейсом. Важно отметить, что все операции проводятся через защищённое соединение.

Если у вас возникли трудности с доступом, попробуйте использовать альтернативный адрес https://sdlon7.cc. Этот вариант часто помогает обойти временные ограничения.

Безопасность при использовании slon8.to

Одним из ключевых преимуществ slon8.to является высокий уровень безопасности. Платформа использует современные методы шифрования данных, что минимизирует риски при проведении транзакций. Рекомендуется всегда проверять адресную строку перед вводом личных данных.

Для дополнительной защиты можно использовать VPN-сервисы. Это особенно актуально при работе через http://slon8.cc или другие альтернативные адреса.

Частые вопросы о slon8.to

Многие пользователи интересуются, чем отличается slon8.to от других подобных платформ. Главное отличие – это удобный интерфейс и высокая скорость обработки запросов. Кроме того, система регулярно обновляется, что обеспечивает стабильную работу.

Если у вас остались вопросы о функционале slon8.to или http://slon8.cc, вы можете найти дополнительную информацию на специализированных форумах. Также полезные сведения иногда публикуются на ресурсе https://sdlon7.cc.

Использование slon8.to и его альтернативных адресов открывает новые возможности для безопасных онлайн-операций. Главное – соблюдать базовые правила цифровой гигиены и внимательно проверять все детали транзакций.

Что делать если не работает http://slon8.cc

Что делать если не работает http://slon8.cc

Полезные советы и альтернативные решения при проблемах с доступом к ресурсу http://slon8.cc.

Столкнулись с тем, что http://slon8.cc не загружается или выдает ошибку? Это может быть связано с техническими неполадками, блокировками или временными сбоями. В статье разберем основные причины и способы их устранения.

Проверьте интернет-соединение

Первое, что стоит сделать — убедиться в стабильности вашего подключения к сети. Попробуйте открыть другие сайты или перезагрузить роутер. Если проблема только с http://slon8.cc, переходите к следующим шагам.

Используйте альтернативные адреса

Некоторые платформы имеют зеркала или резервные домены. Например, можно попробовать зайти на sdlon7.cc, который может оказаться рабочим аналогом. Всегда полезно иметь несколько вариантов доступа.

Очистите кеш браузера

Накопленные данные могут мешать корректной загрузке страницы. Зайдите в настройки браузера и удалите кеш, куки и историю посещений. После этого попробуйте снова открыть http://slon8.cc.

Проверьте актуальность ссылки

Адреса ресурсов иногда меняются. Уточните у проверенных источников, не произошло ли обновление домена. Возможно, http://slon8.cc временно недоступен, но скоро возобновит работу.

Используйте VPN или Tor

Если сайт заблокирован в вашем регионе, инструменты для обхода ограничений помогут восстановить доступ. Настройте VPN-подключение или запустите браузер Tor, затем попробуйте зайти снова.

Обратитесь в поддержку

Когда все методы испробованы, но http://slon8.cc по-прежнему не работает, свяжитесь с администрацией ресурса. Часто контакты указаны в соцсетях или на альтернативных платформах.

Помните, что технические сбои — временное явление. Сохраняйте спокойствие и пробуйте разные способы решения проблемы. Если нужен быстрый доступ, всегда можно воспользоваться рабочим зеркалом, например, sdlon7.cc, пока основной сайт не восстановится.