বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 6



Почему все выбирают кракен сайт зеркало

Почему все выбирают кракен сайт зеркало

Кракен сайт зеркало становится популярным решением для пользователей, ищущих стабильный доступ к платформе. Узнайте, почему его выбирают.

В последнее время все больше пользователей обращают внимание на кракен сайт зеркало как на надежный способ доступа к платформе. Этот метод позволяет обойти ограничения и обеспечивает стабильную работу даже в сложных условиях. В статье мы разберем основные причины, почему именно это решение становится таким востребованным.

Что такое кракен сайт зеркало?

Кракен сайт зеркало — это альтернативный адрес платформы, который используется для доступа к основным функциям. Он создается для обеспечения непрерывной работы, даже если основной сайт недоступен. Это особенно актуально в условиях блокировок или технических сбоев.

Многие пользователи отмечают, что использование зеркала позволяет сохранить доступ к своим данным и продолжить работу без перерывов. Это делает его незаменимым инструментом для тех, кто ценит стабильность и безопасность.

Преимущества использования зеркала

Одним из главных преимуществ кракен сайт зеркало является его доступность. Пользователи могут легко найти актуальные адреса и начать работу без длительных ожиданий. Кроме того, зеркала обеспечивают высокий уровень безопасности, что особенно важно для тех, кто работает с конфиденциальными данными.

Еще одно преимущество — это возможность обойти блокировки. В условиях ограничений доступ к основному сайту может быть затруднен, но зеркала позволяют продолжить работу без проблем. Это делает их незаменимыми для пользователей из разных регионов.

Как найти актуальное зеркало?

Для поиска актуального кракен сайт зеркало рекомендуется использовать проверенные источники. Например, можно обратиться к специализированным ресурсам, которые регулярно обновляют информацию о доступных адресах. Это поможет избежать мошеннических сайтов и сохранить свои данные в безопасности.

Также стоит обратить внимание на рекомендации других пользователей. Многие из них делятся опытом использования зеркал и дают советы по выбору наиболее надежных вариантов. Это может быть полезно для тех, кто только начинает знакомиться с этим инструментом.

Если вы хотите узнать больше о том, как работает веб-сайт кракен сайт зеркало, обратитесь к проверенным источникам информации. Они помогут вам разобраться в тонкостях использования этого инструмента и выбрать подходящий вариант.

Безопасность при использовании зеркал

Одним из ключевых аспектов использования кракен сайт зеркало является безопасность. Важно убедиться, что вы используете надежный адрес, который не подвержен атакам злоумышленников. Для этого рекомендуется проверять источники информации и избегать подозрительных ссылок.

Также стоит использовать дополнительные средства защиты, такие как VPN или антивирусные программы. Они помогут минимизировать риски и обеспечить безопасность ваших данных. Это особенно важно для тех, кто работает с конфиденциальной информацией.

Почему пользователи выбирают зеркала?

Многие пользователи отмечают, что кракен сайт зеркало — это удобное и практичное решение. Оно позволяет сохранить доступ к платформе даже в сложных условиях и обеспечивает стабильную работу. Это делает его популярным выбором среди тех, кто ценит надежность и удобство.

Кроме того, зеркала часто обновляются, что позволяет пользователям всегда иметь доступ к актуальным функциям. Это особенно важно для тех, кто активно использует платформу в своей работе или личных целях.

Заключение

Кракен сайт зеркало — это надежный способ обеспечить доступ к платформе в любых условиях. Его популярность растет благодаря удобству, безопасности и стабильности. Если вы ищете проверенное решение, обратите внимание на этот инструмент и используйте его для своих задач.

কবুল নামা পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

#কবুল_নামা🩷 [অন্তিম পর্ব]
~আফিয়া আফরিন

রাফসানের পেছন পেছন ঘরে ঢুকে নীরু দরজার পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা দুলছিল। রাফসান জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে আলতো করে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিল। নীরু ভাবল, রাফসান হয়তো মায়ের মুখে তরকারিতে লবণ বেশি হওয়ার কথা শুনে ওর ওপর রাগ করবে। কিন্তু রাফসান যখন ওর সামনে এসে দাঁড়াল, নীরু দেখল রাফসানের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। রাফসান ভারী গলায় বলল, “মা তোমাকে কী বলছিল?”

নীরু কেঁপে উঠল। শাশুড়ির কঠোর হুঁশিয়ারি আর সংসারের অশান্তির ভয়টা আবারও ওর মনে জেঁকে বসল। কোনোমতে চোখের পলক ফেলে আমতা আমতা করে বলল, “কিছু না তো।”

“মিথ্যা বলো না নীরু।” রাফসানের গলার আওয়াজ আরও একধাপ নেমে গেল, যা ঘরের ভেতরের থমথমে পরিবেশটাকে ভারী করে তুলল।
নীরু কিছু বলল না, অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ওর নীরবতা রাফসানের ভেতরের অপরাধবোধ আর চেপে রাখা ক্ষোভকে যেন উসকে দিল। সে নীরুর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কড়া সুরে বলল, “কথা বলছ না কেন? মা বাইরে যা যা বলছিল, সবটা আমি নিজের কানে শুনেছি। তারপরেও তুমি আমার কাছে লুকাচ্ছ? কেন নীরু? আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে কিন্তু!”

রাফসানের চড়া আর বিক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর নীরুকে চমকে দিল। মানুষটা সাধারণত এতটা উত্তেজিত হয় না। অন্তত নীরু কখনো দেখেনি। ও ওড়নার খুঁটটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল, “এতটুকুতে আপনার ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে? মা তো প্রতিদিন এসব কথাই বলেন, আজ নতুন করে তো কিছু বলেননি। আপনি আজ শুনেছেন, কিন্তু আমি বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন শুনে আসছি। তাই আমার কাছে এখন আর আলাদা কিছু মনে হয় না।”

নীরুর শান্ত অথচ নির্মম সত্য কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল রাফসানের বুকে। সে স্তম্ভিত হয়ে নীরুর দিকে তাকিয়ে রইল। অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল, “মা… মা তোমাকে প্রতিদিন এসব বলে?”

নীরু এবার চোখ সরাল না মলিন মুখে বলল, “বলে।”

“আগে বলোনি কেন?” রাফসানের কণ্ঠস্বরে তীব্র আকুলতা ফুটে উঠল।

“মা বলতে মানা করেছিল।” নীরুর ওড়নার খুঁট মোচড়ানোর গতি আরও বেড়ে গেল।

রাফসান নীরুর দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে তার অধিকারের সুরে জিজ্ঞেস করল, “তোমার স্বামী কে? আমি, নাকি মা?”

রাফসানের এমন আকস্মিক প্রশ্নে নীরু সম্পূর্ণ হতচকিত গেল, “আপনি!”

“তবে তুমি কার কথা শুনবে? আমার, নাকি মায়ের? কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে না? আমাদের বিয়ের প্রথম দিন রাতে তোমাকে কী বলেছিলাম, মনে আছে?”

নীরু নিচু স্বরে বলল, “কী?”

“বলেছিলাম না, এই ঘরটা যতটা আমার, ততটা তোমারও? কোনো কিছু নিয়ে মনে ভয় রেখো না? তবে কেন সব মুখ বুজে সহ্য করলে?”

নীরু অবুঝের মতো বলল, “মেয়েদের সবকিছু মানিয়ে নিতে হয়।”

“কে বলেছে তোমাকে?” রাফসান প্রায় চিৎকার করে উঠল।

“মা বলেছে। আমার মা, আপনার মা, আশেপাশের সবাই বলেছে। ছোটবেলা থেকেই তো দেখে আসছি, মেয়েদের মানিয়েই নিতে হয়।”

রাফসান নিজের কপাল চাপড়াল। তীব্র অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করল। সে নিজের চুলগুলো মুঠো করে ধরে বলল, “আজ যদি আমি হুট করে না আসতাম, তবে কোনোদিন জানতেই পারতাম না যে আমার মা তোমাকে প্রতিদিন এভাবে বাপের বাড়ি নিয়ে বিষাক্ত কথা শোনায়!”

রাফসান নিজের উপচে পড়া রাগ আর ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিছানার একপাশে ধপ করে বসল। নিজেকে একটু শান্ত করে নীরুর দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে অনুনয়ের সুর, “তুমি আমাকে সব সত্যিটা বলো। আমি জানতে চাই নীরু, আমার অনুপস্থিতিতে ঠিক কী কী হচ্ছে তোমার সাথে?”

নীরু নির্লিপ্ততায় মাথা নাড়ল। যেন এই অপমানগুলো ওর গা-সহা হয়ে গেছে। শান্ত স্বরে বলল, “বিশেষ কিছু না।”

“তবে?” রাফসান বিছানা থেকে উঠে আবার ওর সামনে এসে দাঁড়াল, “আমার থেকে এভাবে দূরে দূরে থাকার কারণ কী? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমার উপস্থিতিটাই পছন্দ করছ না।”

নীরু চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না। চোখের বাঁধের সাথে মুখের বাঁধও খুলল, “মা বলেছিলেন… আমি নাকি আপনাকে জাদু করেছি। আপনি প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে আসেন বলে আসা-যাওয়ার খরচের টাকা কি আমার বাপের বাড়ি থেকে দেবে? মা বলেছিলেন আপনার সামনে যেন বেশি না যাই, দূর দূর হয়ে থাকি। আমি যদি আপনাকে সব বলতাম, তবে আপনি হয়ত মায়ের সাথে অশান্তি করতেন নয়ত আমাকে ভুল বুঝতেন। আমি চাইনি আমার জন্য মা আর ছেলের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হোক।”

রাফসানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। এক লহমায় তার সব ভুল ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আকুল হয়ে বলল, “পাগলী একটা! মায়ের সাথে ছেলের দূরত্ব হওয়ার ভয়ে তুমি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিচ্ছিলে? আর খরচের কথা বলছ? আমি তোমায় এক নজর দেখার জন্য, তোমার পাশে থাকার জন্য নিজের উপার্জনের টাকা খরচ করে আসতাম। সেখানে তোমার বাপের বাড়ির কথা কেন আসবে? যে মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি আমার স্ত্রীর ওপর অন্যায় করবেন আর আমি মুখ বুজে তা দেখব।” রাফসান থামল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা আগের যুগের মানুষ নীরু, এতকিছু বোঝে না। প্রাচীনপন্থী চিন্তাভাবনা তার। তাই বলে তুমি মায়ের কথাগুলোই ধ্রুব সত্য ধরে বসে থাকবে? আমাকে একটুও ভরসা করতে পারো না? আমার চেহারা দেখে কি ভরসা করার মতো মানুষ মনে হয় না তোমার? চলো, মায়ের কাছে চলো। তার সাথে আজ আমার কথা আছে।”

নীরু আর দাঁড়াল না। নিজেই এক পা বাড়িয়ে খিলটা খুলে আগে বের হলো। কিন্তু দরজা খুলে বের হতেই চমকে উঠল। মাজেদা বেগম ঘরের দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতক্ষণ ধরে কান খাড়া করে ভেতরে ছেলে আর বউ কী বলাবলি করছে, সেই কথা শোনার জন্য ওত পাতছিলেন তিনি। বউকে ঘর থেকে বের হতে দেখেই মাজেদা বেগম কোমরে হাত দিয়ে মুখ বিকৃত করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “হইছে? শাশুড়ির নামে পোলার কানভারী করা শেষ হইছে? নির্লজ্জ কোনহানকার! ভরদুপুরে ঘরের দোর দেয়! কত বড় সোয়ামী সোহাগী রে আমার!”

তখনই নীরুর পেছন থেকে ঘর থেকে বের হয়ে এল রাফসান। মায়ের কুৎসিত বাক্যবাণ সে আবারও হাতেনাতে ধরে ফেলল। মায়ের অবিন্যস্ত আর কটু কথাগুলো শুনে ভেতরের রক্ত টগবগ করে ফুটলেও সে নিজেকে অসম্ভব দক্ষতায় শান্ত রাখল। এক পা এগিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। রাফসান নিরাসক্তি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি দুপুরের খাবার খেয়েছ? শরীর ভালো আছে তোমার?”

মাজেদা বেগম কেমন দমে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, “হ… হ খাইছি। শরীর তো আগের লাহানই আছে। তা তুই হঠাৎ অফিস কামাই কইরা আইলি যে? শরীর ভালো তো বাজান?”

রাফসান সোফায় বসতে বসতে বলল, “আমার শরীর ভালো আছে মা। তবে তোমার কথাগুলো শুনে মনে হলো তুমি ভালো নেই। এই যে এত রাগ তোমার, তরকারিতে সামান্য লবণ বেশি হওয়া নিয়ে এত চিল্লাচিল্লি; সবটার পেছনে কারণ কি আসলেই লবণ? নাকি অন্য কিছু?”

মাজেদা বেগম ছেলের ঠান্ডা চাল বুঝতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন ছেলে হয়তো তার পক্ষই নিচ্ছে। তিনি আবার চড়ে বসলেন, “অন্য কিছু না তো কী! তোর চোখ নাই বাজান? তুই দেখস না কেমন আক্কেলহীন মাইয়া ঘরে আনছি? বিয়ার পর এতদিন পার হয়া গেল, এখনো রান্ধন-বাড়ন ঠিকঠাক শিখল না। আর শিখবই বা কেমনে? বাপের বাড়ি থেকে তো খালি হাতে আলগা গায়ে উইঠা আইছে। একটা খাট-পালঙ্ক, আলমারি কিচ্ছু দেওয়ার মুরোদ নাই বাপের। তোরে তো এক্কেরে পথের ফকির বানায়া ছাইড়া দিল! পোলার শ্বশুরবাড়ির কোনো জিনিস নিয়া যে বুক ফুলায়া চলব, সেই কপাল কি আমার আছে?”

মায়ের কথাগুলো শেষ হতেই রাফসান সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার মুখের শান্ত ভাবটা এবার কেটে গিয়ে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা চলে এল। সে মায়ের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে ধারালো গলায় বলল, “মা, আমরা কি ফকির?”

মাজেদা বেগম আকাশ থেকে পড়লেন, “কী কইলি বাজান?”

“আমি জিজ্ঞেস করছি, আমরা কি ফকির? আমাদের কি নিজেদের থাকার ঘর নেই, শোয়ার খাট নেই, নাকি আমাদের তিন বেলা খাওয়ার অন্ন নেই?” রাফসানের গলার আওয়াজ একটু ভারী হলো, “আমি আমার নিজের যোগ্যতায় আমি উপার্জন করি। ঘরে একটা খাট বা আলমারি কেনার সামর্থ্য কি আমার নেই? নীরুর বাবা অনেক কষ্ট করে তার কলিজার টুকরো মেয়েটাকে লালন-পালন করেছেন তারপর আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি সওদা করতে বসেননি যে আমাকে খাট-পালঙ্ক দিয়ে ঘর সাজিয়ে দিতে হবে। একটা খাট আর আলমারির জন্য তুমি প্রতিদিন একটা মেয়েকে ভিখারিদের মতো খোঁটা দেবে? এত লোভ কেন মা তোমার?”

ছেলের মুখ থেকে ‘লোভ’ শব্দটা শুনে মাজেদা বেগমের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি চিরাচরিত অস্ত্র ধরলেন। কান্নার সুরে বললেন, “তোর মুখে এই কথা শুনন লাগল বাজান? বিয়ার কয়দিন যাইতে না যাইতেই তুই মায়েরে লোভী বানাইলি? তোর বউ তোরে ঘরের ভেতর কী মন্ত্র পড়ায়ে দিছে শুনি? ও তোরে কী কী বানায়া বলছে?”

“নীরু আমাকে কিচ্ছু বলেনি মা। ও বরং তোমার কথাই শুনছিল আর মায়ের সাথে ছেলের দূরত্ব হওয়ার ভয়ে সব মুখ বুজে সহ্য করছিল। আমি যা শোনার, বসার ঘর দিয়ে আসার সময় নিজের কানে শুনেছি।”

মাজেদা বেগম এবারও দমে না গিয়ে কেঁদে কেঁদে বললেন, “আমি ঘরে নতুন বউ আনছি। ও যদি ভুল করে, আমি কি ওরে একটু শাসনও করতে পারব না? শাশুড়ি হয়ে এইটুক অধিকারও আমার নাই?”

রাফসান মায়ের সামনে গিয়ে কাঁধে হাত রাখল। বলল, “শাসন আর অপমান সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস, মা। শাসন করা হয় ভালোবেসে, আড়ালে ডেকে ভুলটা শুধরে দেওয়ার জন্য। আর তুমি তরকারিতে লবণ বেশি হওয়ার অজুহাতে ওর বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থা নিয়ে, খাট-পালঙ্ক না দেওয়া নিয়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিলে। এটা শাসন নয় মা, এটা অপমান। একটা মেয়ের আত্মসম্মান চূর্ণ করে দেওয়া শাসন হতে পারে না।”

মাজেদা বেগম ছেলের কথার পিঠে আর কোনো কথা বলতে পারলেন না, মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাফসান মায়ের হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বলল, “মা, তুমি আমার মা। আমাকে কষ্ট করে বড় করেছ, তোমার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আর শোধ করতে চাইও না। এই সংসারে তোমার জায়গা সবার উপরে, তোমাকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। কিন্তু মা, নীরুও তো এই বাড়ির একটা অংশ। ও নিজের জগৎ, নিজের বাবা-মাকে ছেড়ে আমাদের বিশ্বাস করে এই ঘরে এসেছে। ওর সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু আমারই। তুমি যদি ওকে বাড়ির বউ না ভেবে নিজের মেয়ে মনে করে ভালোবেসে ভুলগুলো শুধরে দিতে, ও কি শুনত না? ওর বাপের বাড়ি যেমনই হোক, ও এখন আমার অর্ধাঙ্গিনী। ওকে ছোট করা মানে আমাকেই ছোট করা, মা।”

মাজেদা বেগম কিন্তু এত সহজে হার স্বীকার করার পাত্রী নন। ছেলের যৌক্তিক কথার পরেও ওনার ভেতরের অহংকারটা চট করে দমে গেল না। তিনি একঝটকায় নিজের হাতটা ছেদের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর নীরুর দিকে বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে আক্ষেপের সুরে বললেন, “মিষ্টি মিষ্টি কথা আর কয়দিন? ঢুইকাই তো গেছে বউয়ের আঁচলের তলায়! হায়রে, আমার দুঃখের দিন শুরু হলো!” এই বলে তিনি আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে গজগজ করে ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেলেন। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বসার ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। নীরু অপরাধবোধে জড়সড় হয়ে রাফসানের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “মা কষ্ট পেল।”

“কষ্ট পায়নি, মা বুঝেছে।”

“কথাগুলো না বললেও হতো।”

“হতো, কিন্তু চলত না।”
নীরু আর কথা বাড়াল না। ব্যস্ত হয়ে বলল, “আচ্ছা অনেক তো হলো, আপনার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করি। সেই কখন এসেছেন, হাত-মুখও ধোয়া হয়নি।” কথাটা বলেই মাথায় ঘোমটা টেনে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। তবে যাওয়ার সময় বুকের ভেতরটা হালকা লাগছিল, অজানা আনন্দে মনটা ভরে উঠছিল। মানুষটা এত ভালো? রাফসান যদি আজ পাশে এসে না দাঁড়াত, তবেও কিন্তু নীরু মনে কষ্ট রাখত না, কিছু মনেই করত না। কারণ ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছে স্বভাবগতভাবেই ছেলেমানুষ এমনই হয়। তুলির স্বামীটাও ওকে কারণে-অকারণে গালমন্দ করে, ভুল বোঝে। এমনকি বাবা-মাকে দেখে এসেছে; বাবা সামান্য কারণে, পান থেকে চুন খসলে মায়ের ওপর রাগারাগি করতে আর মা মুখ বুজে সহ্য করত। সেই চেনা জগতের বাইরে রাফসানের মতো একজন গম্ভীর মানুষ যে নিজের মায়ের মুখের ওপর স্ত্রীর আত্মসম্মানের জন্য এভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে, এটা নীরুর কল্পনারও অতীত ছিল।
.
রান্নাঘরের কাজ চটপট সেরে রাতের খাবার বেড়ে দিল নীরু। মাজেদা নিজের ঘর থেকে বের হলেন না, খাবার ঘরেই দিয়ে আসা হলো। রাফসান আর নীরু একসাথে বসে রাতের খাবার খেল। খাওয়ার টেবিলে রাফসান খুব স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করলেও নীরুর ভেতরের আড়ষ্টতা আর জড়তা পুরোপুরি কাটেনি। ও এখনো মেপে মেপে পা ফেলছে।
রাত তখন প্রায় দশটা। ঘরের জানালা দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস আসছে। নীরু সমস্ত জড়তা আর এক বুক দ্বিধা নিয়ে ঘরে পা রাখল। দেখল, রাফসান বিছানায় বসে একটা বই উল্টেপাল্টে দেখছে। নীরুকে ঢুকতে দেখে বইটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসল। নীরু দরজার কাছে ইতস্তত করে দাঁড়াতেই রাফসান বিছানা থেকে নেমে ধীরপায়ে এগিয়ে এল। কোনো দ্বিধা না রেখে আলতো করে নীরুর নরম হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরল। তারপর টেনে এনে ওকে বিছানার একপাশে বসাল। নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা নীরু করল না।
রাফসান ওর মুখোমুখি বসে শান্ত গলায় বলল, “তোমার সাথে কিছু কথা আছে নীরু।”

নীরু ফিসফিস করে বলল, “হুম…”

রাফসান ওর বসার ভঙ্গি আর আড়ষ্টতা দেখে মৃদু হাসল। বলল, “নীরু! সাধারণ কথাবার্তা বলব, এত আড়ষ্ট হওয়ার কিছু নেই। একটু সহজ হও তো। আমি কি তোমাকে কামড়ে দেব?”

রাফসানের মুখে এমন কথা শুনে নীরু চোখ তুলে তাকাল, পরক্ষণেই আবার চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “বলুন।”

রাফসান নীরুর একটা হাত নিজের হাতের তালুতে রেখে আঙুলগুলো ছুঁয়ে বলল, “বিকেলে তুমি মনে মনে ভাবছিলে না, মানুষটা এত ভালো কেন? পুরুষমানুষ তো সাধারণত এমন হয় না!”

নীরু চমকে উঠল। রাফসান ওর মনের কথা এমন নির্ভুল পড়ে ফেলবে, ও ভাবতেই পারেনি। লজ্জায় আর বিস্ময়ে লাল হয়ে গেল। রাফসান হেসে বলল, “নীরু, তুমি বড্ড সহজ-সরল। দুনিয়াটা এখনো পুরোপুরি চেনার আর বোঝার বয়স তোমার হয়নি। তুমি ছোটবেলা থেকে তোমার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দেখে ভেবে নিয়েছ, মেয়েমানুষের জীবন মানেই শুধু মুখ বুজে সব অন্যায় মেনে নেওয়া। কিন্তু শোনো, সব পুরুষ এক রকম হয় না। আর সব পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মানিয়ে নিতেও হয় না। অন্যায় যেখানে হবে, সেখানে মাঝেমাঝে নিজের অধিকারের জন্য গর্জে উঠতে হয়। অন্তত নিজের আত্মসম্মানটুকু বিলিয়ে দিয়ে কখনো কোনো কিছু মানাবে না।”

নীরু রাফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই চোখের ভাষা ও পড়তে পারছে না, কিন্তু কেন যেন শুনতে খুব ভালো লাগছে।
রাফসান একটু ঝুঁকে এসে আহ্লাদী গলায় বলল, “আর তাছাড়া, কার ঘরের বউ তুমি? আমার! আমার অর্ধাঙ্গিনী তুমি! এই ঘরের ওপর, এই মানুষটার ওপর তোমার ষোলো আনা অধিকার। এখন থেকে কোনো অন্যায় দেখলে সবার আগে এই মানুষটাকে এসে নালিশ করবে, মনে থাকবে? নাকি এখনো আমাকে পর ভেবে খাটের শেষ মাথায় পালিয়ে যাবে?”

রাফসানের কথা শুনে নীরুর ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। বুকের ভেতর যে ড্রামটা এতক্ষণ থমকে ছিল, সেটা আবার দ্বিগুণ বেগে বাজতে শুরু করেছে। ও চট করে নিজের হাতটা রাফসানের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢাকল। নীরুর লজ্জা পাওয়া দেখে রাফসান মৃদু হাসল। নীরুর এক হাত মুখ থেকে সরিয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য করল। তারপর বলল, “তুমি হয়তো ভাবছ আমি বড্ড গম্ভীর, মেপে মেপে কথা বলি। আসলে কী জানো নীরু? আমি গুছিয়ে প্রেম করতে পারি না, ওসব আমার আসে না। সিনেমা-থিয়েটারের মতো সস্তা রোমান্স করা, বানিয়ে বানিয়ে ডায়ালগ মারা; এসবের ধাতে আমি কোনোদিন ছিলাম না। কিন্তু প্রেম জিনিসটা কী আর ভালোবাসাই বা কী, তফাতটা আমি খুব ভালো করে বুঝি। প্রেম সাময়িক, কিন্তু ভালোবাসাটা চিরকালের। আমি হুট করে আসা বসন্তের মতো আসিনি তোমার জীবনে, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

রাফসান নীরুর হাতের আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে নিয়ে আরও বিস্তারিত বলল, “এই যে আমি ঢাকায় একা একা দিন কাটিয়েছি, একটা মুহূর্তের জন্যও তোমার মুখটা আমার চোখের সামনে থেকে সরেনি। ঘরটা আমার কাছে কেবলই ইট-পাথরের দেয়াল মনে হত। ওটাকে একটা সুন্দর ঘর বানানোর মায়াটা তো তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে, নীরু। আমি ঢাকা থেকে প্রতি সপ্তাহে তোমার জন্য আসতাম। আমার বউটার জন্য বুকে এক সমুদ্র টান তৈরি হয়েছিল। যার মুখটা এক নজর না দেখলে আমার পুরো সপ্তাহের ক্লান্তি কাটত না। অথচ তুমি আমাকে দেখলেই পালিয়ে যেতে!”

রাফসানের অকপট ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে নীরুর বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেল। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “ইয়ে… আমি আসলে…”

রাফসান ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মৃদু হাসল। নীরুর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “নীরু, কবুল শব্দটার অর্থ বোঝো?”

রাফসানের এমন আকস্মিক প্রশ্নে নীরু থতমত খেয়ে গেল। বড় বড় চোখ করে রাফসানের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো উত্তর দিতে পারল না।

রাফসান বলতে শুরু করল, “বিয়ের দিন কাজী সাহেব যখন তোমাকে তিনবার কবুল বলাচ্ছিলেন, তখন তা শুধু মুখের শব্দ ছিল? কবুল মানে হলো, আমি আজ থেকে তোমার ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, রাগ-অভিমান সবকিছুকে নিজের করে গ্রহণ করলাম। এর আসল অর্থ হলো স্বীকার করে নেওয়া। শুধু একটা মানুষকে স্বীকার করা নয়, তার সাথে জড়িয়ে থাকা তার চারপাশের পরিস্থিতি, তার আত্মসম্মান, তার অধিকার; সবকিছুকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় সত্য বলে মেনে নেওয়া।”

রাফসান থামল। নীরুর চোখের দিকে তাকিয়ে ওর চুলে আঙুল বিলি করতে করতে আবার বলল, “সমাজ তোমাকে যা শিখিয়েছে সেটাই নিয়ম? মেয়েদের শুধু মুখ বুজে সব অন্যায় মেনে নিতে হয়? না নীরু, ওটা হলো দাসত্ব। এর সাথে স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক নেই। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তিন কবুলে। একটা অলিখিত চুক্তি, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ঢাল হবে। সমাজ বা চারপাশের মানুষ যখন তোমার দিকে আঙুল তুলবে, তখন তোমার হয়ে লড়ার প্রথম অধিকারটা আমার। তোমার ভয়, জড়তা দূর করে তোমাকে ঘরের রানি বানিয়ে রাখার অধিকারও আমার।”

নীরু কিছু বলল না, শুধু পলকহীন চোখে রাফসানের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো কান্নায় ছলছল করে উঠল। রাফসান নীরুর চোখের অশ্রুটুকু বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে ম্লান হাসল, “আমি জানি তুমি মুখে কিছু বলবে না, বলতে পারবেও না। কারণ তোমাকে শুধু মুখ বুজে সহ্য করতেই শেখানো হয়েছে, নিজের অধিকার চেয়ে নিতে শেখানো হয়নি। বিয়ের র সময় তোমার কাছে কবুল শব্দটা ছিল অজানা ভয়ের নাম, অচেনা ঘরের খাঁচায় বন্দী হওয়ার দলিল। তুমি শুধু নিজের কপালকে মেনে নিয়েছিলে। কিন্তু আজ… আজ যখন আমি মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার অপমানের প্রতিবাদ করলাম, তখন তোমার ভেজা চোখ দুটো আমাকে বলে দিচ্ছে যে তুমি মনে মনে আমাকে তোমার স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছ। মুখে না বললেও, তোমার নরম হাতের আঙুলগুলো যেভাবে আমার শার্টের হাতাটা আঁকড়ে ধরেছে, তাতেই আমি আমার কবুল নামা’র জবাব পেয়ে গেছি, নীরু।”

রাফসানের কথায় হুট করে নীরুর সম্বিৎ ফেরে। ও খেয়ালই করেনি যে অবচেতন মনে রাফসানের শার্টের হাতাটা খামচে ধরে রেখেছিল! নিজের কাণ্ড দেখে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে শার্ট থেকে হাত সরিয়ে নিতে নেয়, কিন্তু রাফসান ওকে সেই সুযোগ দিল না। সে চট করে নীরুর হাতটা আরও শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বলল, “থাকুক। তুমিও থাকো।”

রাফসানের স্পর্শে নীরুর পুরো শরীর শিউরে উঠল। বুকের ভেতরের ড্রামটা এবার যেন কান ফাটানো আওয়াজে বাজতে শুরু করেছে। ও নিজের হাতটা ছাড়ানোর মৃদু চেষ্টা করে, চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী মাথাটা একদম নিচু করে, গাল দুটো লজ্জায় লাল করে ফিসফিসিয়ে বলল, “ছাড়ুন না… কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে! খিলটাও ঠিকঠাক দেওয়া হয়নি।”

রাফসান নীরুর অবুঝ কথায় শব্দ করে হেসে উঠল। ঘরের থমথমে পরিবেশটা তার হাসিতে হালকা হয়ে গেল। সে নীরুর হাতটা না ছেড়েই বলল, “আরে বোকা মেয়ে! মাঝরাতে আমাদের ঘরে কে আসবে শুনি? আর দেখলেই বা কী? নিজের বউয়ের হাত ধরেছি, চুরি তো আর করিনি!”

নীরু আর যুক্তি খুঁজে পেল না। লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গাও খুঁজে পেল না। রাফসান আলতো করে নীরুর মাথায় হাত রেখে বলল, “এবার বলো, আগামী পরশু আমার সাথে ঢাকায় রওনা হচ্ছ তো? নাকি এবারও বলবে, না না?”

নীরু রাফসানের বুকে মুখ গুঁজে রেখে মাথা নেড়ে সায় দিল। ফিসফিস করে বলল, “যাব।”

এরপর সত্যি সত্যি নীরু রাফসানের সাথে ঢাকায় চলে গেল। তবে এই ক’দিনের অভিজ্ঞতায় নীরু একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝে গেছে, ও যদি এই বাড়িতে থেকে যেত তবুও মনে ভয় বা সংশয় কাজ করত না। চারপাশের মানুষের কটু কথা, শাশুড়ির কড়া চাউনি কিংবা তরকারিতে লবণের অজুহাতে খোঁটা দেওয়া; সবকিছুই এখন তুচ্ছ। যেখানে স্বামী পাহাড়ের মতো অটল হয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে দুনিয়ার কোনো ঝড়ই ওকে স্পর্শ করতে পারবে না।
আসলে ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাফসানের মায়ের মুখোমুখি হওয়াটা নীরুর জন্য প্রয়োজন ছিল। অন্যায় যে নীরু করেনি, সেটা মায়ের চোখে আঙুল দিয়ে যেমন দেখানোর প্রয়োজন ছিল, ঠিক তেমনি নীরুর ভেতরের আত্মসম্মানবোধটাকে জাগিয়ে তোলার জন্যও এই ঝড়টার দরকার ছিল। এই এক চিলতে ঝড় না এলে হয়তো নীরু কোনোদিনও বুঝত না যে, সংসার মানে কেবল দাসত্ব আর মুখ বুজে সহ্য করা নয়; সংসার মানে একে অপরের পরিপূরক হওয়া, একে অপরের সম্মানের ঢাল হওয়া।
তবে এই মুহূর্তে নীরুর জন্য রাফসানের শহরের ছোট্ট বাসাটায় যাওয়াটাও দরকারি ছিল। যৌথ সংসারের গণ্ডি, সারাক্ষণের পিছুটান আর লোকলজ্জার ভয় থেকে দূরে গিয়ে রাফসানের একান্ত সান্নিধ্য ওর বড্ড প্রয়োজন। যেখানে শুধু শাশুড়ির বউ কিংবা বাপের মেয়ে পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে শ্বাস নিতে পারবে। রাফসানের গম্ভীর রূপের আড়ালে যে এক সমুদ্র ভালোবাসা আর নির্ভরতা লুকিয়ে আছে, তা এই নির্জন বাড়িতে প্রতিটি দিন কাটানোর মাঝে নীরু নতুন করে আবিষ্কার করে। একান্তে থেকে নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা আর অধিকারের কথাগুলো স্বামীকে মুখ ফুটে বলতে পারছে। ঘরের জানালা খুলে বাইরের আকাশ দেখতে পারছে, লোকলজ্জার ভয় ছাড়াই বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাফসানের সাথে গোধূলির আলোমাখা বিকেল উপভোগ করতে পারছে। এতদিন যে মেয়েটির দিন কাটত অন্যের মন জুগিয়ে চলার অলিখিত নিয়মে, ও এখন অবলীলায় নিজের ভালো লাগার গানটা গুনগুন করে গাইতে পারছে। রাফসানের আনা নতুন উপন্যাসের পাতা উল্টে নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারছে। সবচেয়ে বড় কথা, নীরু বুঝতে পারছে যে এই বাড়িটায় শুধু রাফসানের নয়, ওর নিজেরও সমান অধিকার আর একচ্ছত্র স্বাধীনতা রয়েছে।
একজন নারীকে পুরো পৃথিবী জয় করার শক্তি জোগাতে যে স্বামীর চেয়ে বড় কোনো শিক্ষক হতে পারে না, তা রাফসানের হাত ধরেই নীরু প্রথম শিখেছে!
.
.
.
সমাপ্ত।

[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ৩২৯৯।

কবুল নামা পর্ব-০১

#কবুল_নামা🩷 [সূচনা পর্ব]
~আফিয়া আফরিন

তীব্র ভীতি আর এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিছানার এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে নীরু। গায়ের ভারী বেনারসি শাড়িটা এই মুহূর্তে ওর কাছে লোহার বর্মের মতো ভারী ঠেকছে। বয়সটা মাত্র উনিশ পেরিয়ে বিশে পড়েছে। নীরুর বয়সী অন্য মেয়েরা যখন পড়াশোনা, আড্ডা আর স্বপ্নের জাল বুনতে ব্যস্ত, তখন নীরু এক অচেনা ঘরের খাটে নতুন বউ সেজে বসে আছে। বিয়ে! বিয়ে জিনিসটা আসলে কী, সংসার কীভাবে করতে হয়; তার মারপ্যাঁচ বোঝার আগেই হুট করে বিয়েটা হয়ে গেল।
মাঝারি আলোতে নিজের হাতের মেহেদির গাঢ় রঙের দিকে তাকিয়ে নীরুর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। রাফসান মানুষটা কেমন? আজ পর্যন্ত মাত্র দু-একবার সামনাসামনি দেখা হয়েছে। কথাবার্তা একদমই বলে না বললেই চলে। ভীষণ গম্ভীর আর অল্পভাষী একটা মানুষ। এই রকম একটা মানুষের সাথে সারাটা জীবন কীভাবে কাটবে, ভেবেই নীরুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। রাফসান এখনও ঘরে আসেনি, বাইরের আত্মীয়স্বজনদের বিদায় দিতে হয়তো ব্যস্ত। এই অপেক্ষার প্রতিটা সেকেন্ড নীরুর ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে নীরুর মনে পড়ে গেল সবচেয়ে কাছের বান্ধবীর কথা। ওর বিয়েটাও মাস ছয়েক আগে এমন দেখেশুনে, ধুমধাম করেই হয়েছিল। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগেই মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। নীরুকে বলছিল, “আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে রে। শাশুড়ি সারাদিন বাপের বাড়ি নিয়ে খোটা দেয়। যার ওপর ভরসা করে এই ঘরে এলাম, সেই মানুষটা পাশে থাকা তো দূরের কথা, উল্টো মায়ের পক্ষ নিয়ে আমাকে চারটে বিশ্রী কথা শুনিয়ে যায়।”

বান্ধবীর কান্নাভেজা কণ্ঠটা নীরুর কানের কাছে অবিরত বাজতে লাগল। নীরু চোখ দুটো বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর নিজের বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থাও তো খুব একটা ভালো না। বাবা অনেক কষ্ট করে বিয়েটা দিয়েছেন। নীরুর শরীরটা ভয়ে শিউরে উঠল। হঠাৎ করেই দরজার লক খোলার মৃদু শব্দ হলো। নীরু চমকে উঠে মাথার ঘোমটাটা আরও একটু টেনে দিল। রাফসান ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল। নীরুর মনে হলো, ওর হৃদস্পন্দন বুঝি এখনই বন্ধ হয়ে যাবে…

রাফসান ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। তার পরনে হালকা রঙের পাঞ্জাবি। বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নীরুর কাছাকাছি এসে সে দাঁড়াল। নীরুর মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন ড্রাম বাজাচ্ছে। রাফসান একপাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, “অনেক রাত হয়েছে। ভারী শাড়ি আর গহনা পরে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে? ওদিকের ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নাও।”

নীরু ঘোমটার আড়াল থেকেই আলতো করে মাথা নাড়ল। কোনো কথা বলল না। মানুষটা আসলেই কেমন যেন! একদম মেপে মেপে এতটুকু কথা বলছে! রাফসানও আর কথা না বাড়িয়ে আলমারি থেকে নিজের একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নীরু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, মানুষটা অন্তত জোর জবরদস্তি করার মতো খারাপ নয়। তবে মনের ভেতরের ভয়টা কাটল না। তুলির কথাগুলো বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে যখন রাফসান বের হলো, নীরু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো বাঁধছিল। আয়নার প্রতিফলনে রাফসানকে দেখে ও একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। রাফসান খাটে এসে বসল। ভেজা তোয়ালেটা পাশে রেখে শান্ত চোখে নীরুর দিকে তাকাল। নীরু কী করবে বুঝতে না পেরে খাটের একদম শেষ মাথায় গিয়ে বসলে রাফসান মৃদু একটু হাসল। তারপর খুব গম্ভীর গলায় বলল, “নীরু, তোমার নাম নীরু তো?”

নীরু মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলল, “জি।”

রাফসান একটু থামল। তারপর আবার বলতে শুরু করল, “শোনো নীরু, আমি জানি এই মুহূর্তে তোমার মনের ভেতর কী চলছে। চেনা পরিবেশ ছেড়ে, চেনা মানুষদের ছেড়ে হুট করে একটা অচেনা ঘরে এসে মানিয়ে নেওয়াটা কতটা কঠিন, সেটা আমি বুঝি। আমি মানুষটা একটু গম্ভীর, গুছিয়ে বা বানিয়ে কথা বলতে পারি না…” নীরু চোখ তুলে তাকাল না, শুধু কোলের ওপর রাখা নিজের আঙুলগুলো খুঁটতে লাগল। রাফসান ফের বলল, “বিয়ে জিনিসটা আমাদের দুজনের জন্যই নতুন। আমাদের পরিচয় মাত্র কয়েকদিনের। তাই আমি তোমার কাছ থেকে আজকেই অলৌকিক ভালোবাসা বা অধিকার আশা করছি না। আমি তোমাকে শুধু একটা কথাই বলতে চাই, এই বাড়িটাকে খাঁচা মনে করে নিজেকে বন্দী ভেবে বসে থেকো না। এই ঘরটা যতটা আমার, ঠিক ততটাই তোমার। একে অপরকে বুঝতে আমাদের কিছুটা সময় লাগবে, আর আমি সেই সময়টা তোমাকে দিতে রাজি আছি। কোনো কিছু নিয়ে মনে ভয় রেখো না, কেমন?”

নীরু অবাক হয়ে রাফসানের কথাগুলো শুনছিল। তার কথায় ভরসা ছিল। নীরু মুখে কিছু বলল না, আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রাফসান বালিশ টেনে নিয়ে বলল, “অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমিয়ে পড়ো।” নীরু লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘরের অন্ধকারটার মতোই ওর ভবিষ্যৎটাও এখন আবছা, কিন্তু রাফসানের ওই কথাগুলো যেন মনের ভেতরের ভয়টা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিল।
.
রাফসান একজন সরকারি কর্মকর্তা। বিয়ের জন্য মাত্র সাতদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে নিজের বাড়িতে এসেছিল। তার কর্মস্থল রাজধানীতে। এমনিতেই সে ভীষণ দায়িত্ববান আর কাজের মানুষ, মাসে একবার হয়তো কোনোমতে বাড়ি আসার সময় পেত।
বিয়ের ধুমধাম শেষ হলো, দিন গড়াল। ছুটি শেষে রাফসান যথারীতি ঢাকা ফেরত চলে গেল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠিক তার পরের বৃহস্পতিবার বিকেলেই রাফসান আবার বাড়ি ফিরে এলো! যেখানে মাসে একবার আসাই দায়, সেখানে সপ্তাহ ঘুরতেই ছেলের হুট করে বাড়ি ছুটে আসাটা চোখে লাগল মা মাজেদার। ছেলের সামনে তৎক্ষণাৎ মাজেদা বেগম কিছু বললেন না বটে, ওনার পিত্তি জ্বলে গেল। পরদিন সকালে রাফসান যখন একটু বাজারের দিকে গেল, নীরুকে একা পেয়েই মাজেদা কোমরে কাপড় গুঁজে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখটা বিকৃত করে, গলার আওয়াজ সপ্তমে চড়িয়ে বললেন, “কী জাদু করছিস শুনি? কী এমন মধু পাইছে এই ড্যাকরা মেয়েটার মধ্যে! আগে পোলা আমার মাসে একবার বাড়িত আসত। আফিসের কাম ফেলে কখোনো নড়ত না। আর এখন? ছ্যাহহহহ! লজ্জা-শরম এক্কেবারে ধুয়ে খাইছিস! কেমন ছেমড়িরে বাবা, বিয়ার কয়দিন যাইতে না যাইতেই জোয়ান পোলাডারে আঁচলে বাইন্ধা রাখছিস? ঢং দেখলেই আমার গা জ্বলে!”

নীরু ম্লান মুখে মাথা নিচু করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, “না, আমি তো…”

নীরুকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই মাজেদা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন, “মুখ সামলায়া কথা ক! মুখে মুখে তর্ক করিস না। আমার বাজান ঢাকা থেকে বাড়িত আইলে তুই অত বেশি ওর সামনে জ্যাবজ্যাব করবি না, বুঝছিস? দূর দূর হয়া থাকবি। পোলার সামনে এমুন ঢং করিস যে পোলা লোভ সামলাইতে না পাইরা টানে টানে প্রত্যেক সপ্তাহে ঢাকা থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে ছুটে আসে! তা ঢাকা থেকে এইখানে প্রতি সপ্তাহে আসা-যাওয়ার যে এত টাকা খরচ, এই খরচের টাকা কি তোর হাভাতে বাপের বাড়ি থেকে দিবে? বাপের তো একটা খাট দেওয়ার মুরোদ নাই, আবার আমার পোলার টাকা ওড়ানোর ধান্দা করতাছিস!”

শাশুড়ির বিষাক্ত কথাগুলো তীরের মতো এসে লাগল নীরুর বুকে। বাপের বাড়ির প্রতি শ্বাশুড়ির নির্মম গঞ্জনা শুনতে নীরুর চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চাইল। কিন্তু ও দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটা আটকে রাখল। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নীরুকে ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাজেদা বেগম তাচ্ছিল্যের হুংকার ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে হনহনিয়ে চলে গেলেন। শাশুড়ি চলে যেতেই নীরু আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দুই হাঁটু ভেঙে ওখানেই মেঝেতে বসে পড়ল। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। বিয়ে বুঝি এমনই? তুলি ঠিকই বলেছিল। বিয়ে মানেই নরকযন্ত্রণা। একটা মানুষ দেখতে যত ভালোই হোক, দিনশেষে পরনারীর ঘরে নিজের কোনো আত্মসম্মান থাকে না। নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে এভাবে অন্যের মুখে অপমানিত হতে দেখতে হয়।
নীরুর চোখ ফেটে জল নামল। বিয়ের এই অল্প কদিনের মাথায় নিজেকে ওর বড্ড অসহায় আর একা মনে হতে লাগল।

মাজেদা বেগমের কড়া নির্দেশের পর থেকে নীরু নিজেকে গুটিয়ে নিল। রাফসান বাড়ি থাকার দিনগুলোতে ও পারতপক্ষে রাফসানের ছায়াও মাড়াত না। রাফসান যখন ড্রয়িংরুমে বসত, নীরু তখন রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকত। আর রাফসান ঘরে এলে ও কোনো না কোনো বাহানায় ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। শাশুড়ির কথামতো সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলত।
রাফসানও নীরুর নির্লিপ্ততা খেয়াল করে। সে মনে মনে ভাবে, উনিশ-বিশ বছরের একটা মেয়ে! হয়তো এখনো নতুন পরিবেশের সাথে পুরোপুরি সহজ হয়ে উঠতে পারেনি। সেদিন রাতে রাফসান যখন ঘরে এল, দেখল নীরু বিছানার এক কোণে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। রাফসান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে খাটের পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল, “নীরু, তুমি কি এখনো অস্বস্তি ফিল করছো এই বাসায়? কোনো সমস্যা হচ্ছে তোমার? আমাকে বলতে পারো।”

নীরু ঝট করে উঠে বসল, কিন্তু রাফসানের চোখের দিকে তাকাল না। গায়ের ওড়নাটা টেনে নিচু স্বরে বলল, “না না, কিছু না।”

রাফসান একটু সময় নিয়ে আবার বলল, “তবে কি আমার সাথে কয়েকদিন ঢাকা থেকে ঘুরে আসবে? ওখানে থাকলে হয়তো তোমার মনটা একটু হালকা হতো।”

নীরু শাশুড়ির খরচের খোঁটার কথা মনে করে শিউরে উঠল। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, “না না।”

রাফসান একটু অবাক হলো। বলল, “তাহলে কি তোমাদের বাসায় যাবে? দু-একদিন থেকে আসবে?”

নীরু এবারও একই রকম ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না।”
সবকিছুতেই এক রোখা ‘না’ শুনে রাফসান আর কিছু বলল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। সে ভাবল নীরু হয়তো তাকে এখনো মেনে নিতে পারছে না। আর নীরু অন্ধকারে চোখ মেলে ভাবল, দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো নইলে আবার বাপের বাড়ি নিয়ে শাশুড়ির গঞ্জনা শুনতে হবে।
.
এইভাবেই দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। রাফসান ছুটি শেষে আবারও ঢাকায় নিজের কর্মস্থলে ফিরে গেল। তবে আগের মতো সে আর প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসছে না। ঢাকা শহরের ব্যস্ত লজিংয়ে বসে একা একা রাফসান প্রায়ই জানালার বাইরে তাকিয়ে নীরুর নির্লিপ্ত চেহারার কথা ভাবে। ভাবে, “বিয়েটা হুট করেই হলো। মেয়েটার বয়স কম, ওর মাথার ওপর সংসারের কোনো দায় চাপাতে চাইনি। ভেবেছিলাম, বিয়ের শুরুর সময়টায় ওর পাশে থাকা দরকার। মাথার ওপর অফিশিয়াল দায়িত্ব যতই থাকুক, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম শুধু ওর একটু ভরসা হব বলে। কিন্তু নীরু তো আমার উপস্থিতিটাই পছন্দ করছে না! আমাকে দেখলেই কেমন গুটিয়ে যায়, পালিয়ে বেড়ায়। যে মানুষটা আমাকে এখনো মনে-প্রাণে মেনেই নিতে পারছে না, তার সামনে বারবার গিয়ে দাঁড়ালে তো ওর অস্বস্তি আর মানসিক চাপ আরও বাড়বে। তারচেয়ে ওকে আরেকটু সময় দেওয়াই ভালো। জোর করে তো আর সহজ হওয়া যায় না। যখন ও নিজে থেকে চাইবে, তখনই না হয় আবার যাব।”

এই ভেবে রাফসান নিজের যাওয়া-আসা একদম কমিয়ে দিল। মাস পেরিয়ে গেলেও সে আর গ্রামে পা রাখল না। এদিকে রাফসানের এই না আসাটা নীরুর জীবনে নতুন ঝড় নিয়ে এল। মাজেদা বেগম দ্বিগুণ উৎসাহে নীরুকে খোটা দেওয়া শুরু করলেন। একদিন দুপুরে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, “কী অলক্ষ্মী বউ ঘরে আনলাম! বিয়ার এক মাস যাইতে না যাইতেই পোলার মন বিষাইয়া দিছে। পোলা আমার আগে তাও মাসে একবার আইত, আর এখন বাড়িত আসার নামই নেয় না! কেমন অপয়া মাইয়া, জামাইয়ের মন একটুও ধইরা রাখতে পারল না। মুখপুড়ির লাহান সারাদিন গোমড়া মুখ কইরা থাহে, পোলডায় এই রূপ দেইখা ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়া আর এইমুখো হয় না!”

শাশুড়ির নতুন গঞ্জনা শুনে নীরুর বুকটা ভেঙে যেতে চাইল। ও রান্নাঘরের এককোণে জলচৌকির ওপর বসে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। বুক চিরে শুধু একটা প্রশ্নই বারবার উঁকি দিচ্ছিল, আমি এখন কী করব? কাকে বলব আমার মনপোড়ানির কথা? হুট করেই নীরুর মনে হলো, রাফসানকে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? খাম আর পোস্টকার্ড তো পড়ার ঘরের ড্রয়ারেই আছে। কিন্তু চিঠিটা পাঠাবে কিসের মাধ্যমে? এই অজপাড়াগাঁয়ে ডাকপিয়ন তো সপ্তাহে মাত্র দুদিন আসে। তাও যদি চিঠির খবর মাজেদা বেগম জেনে যান, তবে তো রক্ষে নেই! আর সবচেয়ে বড় কথা, চিঠি দিলেই কি রাফসান আসবে? সে তো ভেবে বসে আছে নীরুই তাকে পছন্দ করে না। একটা সামান্য চিঠির কথা শুনে মানুষটা কেনই বা এতদূর থেকে ছুটে আসবে?
দিনকাল বড্ড অদ্ভুত। না আছে হুট করে কথা বলার মতো কোনো কিছু, না আছে নিজের মনের কথা পলকে পৌঁছে দেওয়ার কোনো উপায়। পরবাসে থাকা স্বামীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র সুতো চারকোনা কাগজের টুকরো, যা পৌঁছাতেও সপ্তাহ পার হয়ে যায়। চোখের পানি আড়াল করে নীরু ভাবল, কি করে ও ভাঙা সংসারটাকে জোড়া লাগাতে পারবে? নাকি ভুল বোঝাবুঝির দেয়ালটা আরও উঁচু হবে?

সেদিন ছিল পরের মাসের মাঝামাঝি বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে কি সাড়ে চারটে। রান্নাঘরে দুপুরের বাসি পাতিলগুলো ধুয়ে রাতের রান্নার জোগাড় করছিল নীরু। তরকারিতে ভুলবশত লবণের পরিমাণটা একটু বেশি পড়ে গিয়েছিল, আর তাতেই মাজেদা বেগম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। রান্নাঘরের দরজায় এসে দুই হাত নেড়ে কড়া গলায় চিৎকার শুরু করলেন, “কী লো নবাবের বেটি! তরকারিতে একসের লবণ ঢালছিস কোন আক্কেলে? বাপের বাড়িতে বুঝি কোনোদিন নুন জোটে নাই? খাইতে বসলেই তো গোগ্রাসে গিলিস, অথচ রান্নার বেলায় আক্কেল নাই!”

নীরু উনুন থেকে ডেকচিটা নামাতে নামাতে ভাঙা গলায় বলল, “মা, ভুল করে একটু বেশি পড়ে গেছে। আমি চালের গুঁড়ো দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছি…”

মাজেদা বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন, “তোর বাপের বাড়ির যে হাল, তাতে নুন-ভাত জুটাই তো দায়! একটা খাট-পালঙ্ক দেওয়ার মুরোদ নাই, অথচ আমার পোলার উপার্জনের অন্ন ধ্বংস করার মুরোদ তো ষোলো আনা আছে! বাপের জন্মে এমন রাজভোগ খাইছিস কোনোদিন?”

ঠিক তখনই সদর দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মাজেদা বেগম গজগজ করতে করতে বসার ঘরের দিকে গেলেন দরজা খুলতে। কিন্তু বসার ঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল রাফসান। ঘরটা পেরোনোর সময়ই মায়ের উথলে ওঠা প্রতিটা বিষাক্ত শব্দ রাফসানের কানে এসে ঠেকেছিল। ছেলেকে দেখে মাজেদা বেগমের মুখের কথা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “আরে বাজান! তুই হুট কইরা? চিঠিও দিলি না, কিছু জানাইলিও না…”

রাফসান কোনো কথা বলল না। তার গম্ভীর ফর্সা মুখটা রাগে আর অপরাধবোধে থমথম করছে। সে হাতের ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে শান্ত কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় চোখে মায়ের দিকে তাকাল।
ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে উঠে এসেছে নীরু। দরজায় রাফসানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাফসানের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বুকের ভেতরটা আবার অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। রাফসান মায়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি নীরুর ম্লান মুখের দিকে তাকাল। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “নীরু, ঘরে এসো।”
.
.
.
চলবে…

নোনা জল পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব

#নোনা_জল #অন্তিম_পর্ব
দীপান্বিতা শান্ত, নিরেট গলায় বলল, “পরিস্থিতির চাপ সবার জীবনেই আসে সৃজিত। কিন্তু তার জন্য মানুষ মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায় না। আর তুমি তো পালাওনি, তুমি নিজের পিঠ বাঁচাতে একটা চলন্ত গাড়ি থেকে আমাকে আচমকা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলে। আজ যে তুমি ফিরে আসতে চাইছ, সেটাও আমার প্রতি ভালোবাসার টানে নয়… আমি যেহেতু বলেছি অফিসে বা বাড়িতে গিয়ে কৈফিয়ত চাইবো তাই নিজের সম্মান হারানোর ভয়ে তুমি আজ এই ফোনগুলো করছ.. আমার ভুলটা কোথায় ছিল বলতে পারো? তোমাদের মত মানুষরা যখন কোন সম্পর্কে সিরিয়াসলি নিজেকে হান্ড্রেড পারসেন্ট দিতেই পারবে না, তাহলে আর একটা মানুষকে সেই সম্পর্কে এত সিরিয়াস করে তোলো কেন?
-আমি নিজেও সিরিয়াস ছিলাম.. ফোনের ওপাস থেকে সাফাই দিতে চায় সৃজিত..
-সেটা তো আমিও ভাবতাম.. আজ বুঝতে পারি, কতটা বোকা বলে তোমার মত একটা ছেলের ওপর চোখ বুজে এতদিন ভরসা করেছি..
-আমি কিন্তু চাই.. সম্পর্কটা আবার আগের মত হয়ে যাক।
-কিন্তু আমি আর চাই না.. একদমই চাই না..
-দীপ শোনো শোনো.. প্লিজ..
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ফেলে দীপান্বিতা.. তারপর দূর থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো শুনতে শুনতে মুখের চোয়াল শক্ত করে ফেলে.. এককালে এই দীপ নাম টুকু ওর মুখ থেকে শুধু শোনার জন্য কত এফোর্ট ই না দিয়েছে.. ওই টুকু শুনলেই মাখনের মতো গলে যেত ও.. আর আজ ওই নামটাই যেন ওর কানে গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে.. এত মিথ্যা এত নাটক অকারণে একটা মানুষ করতে পারে!!
ওপাশ থেকে সৃজিত তখনো কত কিছু বলে চলেছে.. মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে কলটা কেটে দেয় দীপান্বিতা.. তারপরে নাম্বারটা ব্লক লিস্টে পাঠিয়ে বিছানা থেকে নেমে বেসিনের সামনে গিয়ে কলটা ছেড়ে দেয়.. আঁজলা ভরে জল নিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা দেয়..এক বার, দু বার, তিন বার। জলের হিমেল স্পর্শে চোখের কোণের তপ্ত নোনা জলটুকু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। আয়নার দিকে তাকায় ও। ভেজা মুখের ওপর চুইয়ে পড়া জলবিন্দুগুলোর নিচে মুখটা এখনো লালচে হয়ে আছে..বেসিনের কলটা বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে নেয় দীপান্বিতা.. আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে “শোন মেয়ে, সৃজিত কোনদিনই তোকে ভালবাসেনি.. শুধু তুই ই বোকার মত… নির্বোধ নাকি তুই!! একটা লোক তোকে ঠকাচ্ছে আর তুই নিজেকে ঠকতে দিলি?
ভালবাসলে কেউ কোনদিন ছেড়ে যায় নাকি !! প্রমিতকে দেখে বুঝিস না!!”
ঘরের জানলাটা খুলে দিতেই এক ফালি বিকেলের আলো এসে পড়ে ওর মুখে…বুক ভরে একটা শ্বাস নেয় ও—
তারপরে বারান্দায় বসে নিজের ফোন থেকে গ্যালারিতে জমে থাকা সৃজিতের প্রায় হাজার দুয়েক ফটো ডিলিট করতে শুরু করে..
এক সময় শেষ ছবিটাও মুছে যায় ফোন থেকে..
ফোনটা হাতে নিয়ে দরজা লক করে ৪১২ নম্বর রুমে গিয়ে নক করে ও.. দরজা খোলে গৌরব।
-আপনারা চা খেতে যাবেন?
গৌরব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দীপান্বিতার দিকে.. প্রমিত পাশ থেকে উত্তর দেয়, যে কথাটা এইমাত্র বলা হলো এটা যদি আপনি থেকে তুইতে চলে গেছে দেখতে পাই তাহলে বোধহয় বেশি ভালো লাগবে শুনতে!
এক মুহূর্ত না ভেবে দীপান্বিতা বলে
-চা খেতে যাবি তোরা?
গৌরব মুচকি হেসে বলে,
-যাব.. যত কাপ চা খেলে তোর লালচে নাকের ডগাটা আবার নিজের রং ফিরে পাবে ঠিক তত কাপ চা খাব.. চল..
প্রমিত সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বন্ধুর কানে কানে বলে আমার সঙ্গে তুই তোকারি একদম ঠিক আছে.. কিন্তু তোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না?.. একবার ফ্রেন্ডজোন হয়ে গেলে কিন্তু ওখান থেকে বেরোতে পারবি না..
গৌরব ফিসফিস করে বলে “ওসব ভাবতে যাস না এখন.. বন্ধুত্বটা ভালো করে হোক আগে.. যে কোন জিনিস স্বতঃস্ফূর্তভাবে হওয়া দরকার..বাকি কথা পরে চিন্তা করা যাবে.. সারা জীবন একসাথে চলার কথা যখন ভাবতে চাই তখন আর তাড়াহুড়ো করে লাভ কি!”
-আরি শালা!! তোর পেটে পেটে এত!!
-আরে ধুর শালা..মেয়েটা সবেমাত্র ব্রেকআপ করে বেরিয়েছে। ওকে হিল হতে দে আগে..
-ওরে বাবা! এতো গাছে না উঠতেই এক কাঁদি..
গৌরব আর থাকতে না পেরে দুঘা বসিয়ে দেয় প্রমিতের পিঠে।
ওদের থেকে কয়েক কদম আগে চলা দীপান্বিতা পিছন ফিরে চোখ গরম করে হুংকার দেয় “তোরা দুটোতে কি এত ফিসফিস করছিস রে”
প্রমিত উত্তর দেয় “গৌরব বলছিল বিকেলের প্রথম চা টা তোর ঘাড় ভেঙে খাবে.. আর ফিস ফ্রাই টাও”
-তোর ওই বক রাক্ষস বন্ধু কি খাওয়া ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না?
-পারে রে.. আমিও ভাবতাম ও খাওয়া, ড্রাইভিং আর টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝেনা .. তবে ইদানিং দেখছি অন্য কয়েকটা জিনিস ওর মাথায় ঢুকতে শুরু করেছে.. সময় হোক বুঝতে পারবি.. এখন বল ফিস ফ্রাই খাওয়াবি?
-তা চল খাইয়ে দিচ্ছি.. তবে আমি কিন্তু কাল সকালেই কলকাতা ফিরব.. একটা দিন বাড়ি গুছিয়ে পরের দিন সকালে অফিস জয়েন করব.. একটু পরে বাসের একটা টিকিট বুক করব”
-তোকে বাসে ফিরতে হবে না। আমরা এখান থেকে লাঞ্চ করে কাল বেরোবো.. তোকে বাড়িতে ড্রপ করে আমরা বাড়ি চলে যাব.. কিরে গৌরব দীপান্বিতা কে বাড়িতে ড্রপ করে দিতে পারবি না? বাড়িটা চিনে নেওয়াও তো দরকার বল।
-হ্যাঁ ছুটি ছাটায় মালতিদির হাতের রান্না খেতে আসতে পারা যাবে.. গৌরব মৃদু হেসে উত্তর দেয়।
-মালতিদির হাতের রান্না খাওয়ার লোভ যখন এত, তখন আর না করব না।
দীপান্বিতা প্রমিতকে বলে.. তারপর তনয়া কোন রেসপন্স করেছে আর?
-মেসেজ করে যাচ্ছে.. আমি উত্তর দি নি।
হঠাৎই একটা অচেনা নম্বর থেকে ভিডিও কল আসে প্রমিতের মোবাইলে..
ওরা তিনজনে তখন ফোর্থ রাউন্ডের চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেওয়া সবে শুরু করেছে..
-হ্যালো
-কতগুলো মেসেজ করেছি প্রমিত.. উত্তর দিচ্ছ না যে..
প্রমিত ওদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে ..
গৌরব দীপান্বিতার কানে কানে বলে “তনয়ার ফোন.. বেটাকে স্পিকারে দিতে বলি..চল শুনি ”
দীপান্বিতা গৌরবকে আটকে দেয় “না ওর যুদ্ধটা ওকেই শেষ করতে দে”..
গৌরব দীপান্বিতার কথা মেনে প্রমিতকে ইশারায় ওপাশের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়.. তারপরে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলে
“এইসব ঠিকঠাক ব্যাপার গুলো আমি ঠিক ধরতে পারি না..আমায় একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিবি?”
দীপান্বিতা কোন কথা না বলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়..

-কি হলো প্রমিত কোন কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন.. ফেসবুকে তোমার স্ট্যাটাস টা দেখে আমি একদম অবাক হয়ে গেছি..
-কেন এতে অবাক হওয়ার কি আছে? আমায় কেউ ভালবাসতে পারে না?
-না মানে এত বড় একটা খবর তোমার জীবনের.. অথচ আমি তার আভাসও পেলাম না সেটাই আমাকে আরো অবাক করেছে.. একটা কল করে বলতে পারতে যে তুমি সম্পর্কে জড়িয়েছো।
গলা খাঁকারি দিয়ে প্রমিত বলে “ও চায় না আমি আমার কোন এক্স এর সাথে কোন রকম কন্টাক্ট এ থাকি! এই কলটাও ধরতাম না.. নেহাত নাম্বারটা সেভ করা ছিল না তাই ধরে ফেলেছি..”
-বাবা তোমার গার্লফ্রেন্ড তো দেখছি তোমায় নিয়ে ভীষণ পজেসিভ.. এরকম হলে তো তোমার দম বন্ধ হয়ে আসবে..
-আমার গার্লফ্রেন্ড, আমার দম.. আমার জীবন.. পুরোটাই আমার ব্যাপার.. এ নিয়ে কোন বাইরের লোকের মাথা না ঘামালেও চলবে.. তারপর হঠাৎই অন্যদিকে তাকিয়ে অকারণে গলা তুলে বলে “হ্যাঁ বাবু, আসছিইই..”
-তুমি কি ওই মহিলার সঙ্গে আছো নাকি এখন?
-অবশ্যই.. এইতো আমার দু হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে.. কোন ফ্লেভারের আইসক্রিম খাবে পছন্দ করে দিতে বলছে.. আমি রাখি…আর শোনো আর কোনদিন আমায় ফোন করবে না.. ও কষ্ট পাবে..
তনয়ার হতবাক মুখের দিকে তাকিয়ে ফোন কেটে দেয় প্রমিত.. ওদিকে দূর থেকে সবটাই শুনতে পেয়েছে ওরা…
টেবিলে এসে চায়ের ভাঁড়টা তুলে নিয়ে প্রমিত এক চুমুক দিল, তারপর দীপান্বিতা আর গৌরবের দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্যস, চ্যাপ্টার ক্লোজড! আর কোনোদিন ওপাশ থেকে কোনো মেসেজ বা কল আসবে না।”
গৌরব হেসে প্রমিতের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “শাবাশ গুরু! অ্যাক্টিংটা কিন্তু ফাটাফাটি করেছিস। ওই ‘হ্যাঁ বাবু, আসছিইই’ বলার সময় তোর গলার টোনটা জাস্ট অস্কার পাওয়ার মতো ছিল!”

ছয় মাস পরের এক মনোরম সন্ধে। কলকাতার বুকে তখন হালকা বাসন্তী হাওয়া দিচ্ছে। প্রমিতের নতুন ফ্ল্যাটের আলো-ঝলমলে বারান্দাটা চমৎকার করে সাজানো—টবে ঝুলছে কিছু মানিপ্ল্যান্ট আর ইনডোর পাম, আর এককোণে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে একটা লণ্ঠন শৈলীর ল্যাম্প।
বারান্দার কাচের স্লাইডিং ডোরটা ঠেলে প্রমিত ভেতরে ঢুকল। ওর পেছনেই হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের কুর্তি আর অফ-হোয়াইট ট্রাউজার্স পরা এক চশমাপরা মিষ্টি মেয়ে। লম্বা কালো চুলগুলো একপাশে বিনুনি করা, আর দু-চোখে মস্ত বড় এক কৌতূহল মেশানো হাসি।
প্রমিত নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, যার কথা এতদিন তোরা শুধু ফোনেই শুনেছিস, আজ সামনাসামনি আলাপ করে নে। দিস ইজ মীনাক্ষী। আর মীনাক্ষী, এরা হলো আমার সেই দুই রত্ন—গৌরব আর দীপান্বিতা।”
মীনাক্ষী হাত দুটো জোড় করে চমৎকার মিষ্টি বাংলায় বলে উঠল, “নমস্কার! আপনাদের সাথে দেখা করে খুব ভালো লাগল।”মেয়েটির মুখে দক্ষিণী টোনের ভাঙা বাংলা শুনে দীপান্বিতা আর গৌরব দুজনেই হেসেই ফেলল। দীপান্বিতা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মীনাক্ষীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “আরে বাঃ! মীনাক্ষী তো দারুণ বাংলা বলে! বসো বসো এখানে। কেরালা থেকে কলকাতায় এসে এই বাঁদরটার খপ্পরে কীভাবে পড়লে, সেই গল্পটা আগে তোমার থেকে শুনতে হবে।”
মীনাক্ষী হেসে ফেলে প্রমিতের দিকে এক ঝলক তাকাল, তারপর সোফায় বসতে বসতে বলল, “অফিসের প্রজেক্টে আলাপ। প্রমিত খুব ভালো কথা বলে… মানে খুব ফ্লার্ট করতে পারে।”
“আই অবজেক্ট!” প্রমিত সোফার হাতলে বসতে বসতে বুক চাপড়ে বলল, “আমি স্রেফ ট্রু লাভ করতে পারি। আর তোরা বিশ্বাস করবি না, ও কিন্তু মালতিদির চেয়েও ভালো ফিল্টার কফি বানায়। আজ তোদের জন্য নিজ হাতে কেরালা স্টাইলের কফি আর স্ন্যাক্স বানিয়ে এনেছে।”
প্রমিতের নতুন জীবনের এই সহজ আনন্দ দেখে দীপান্বিতার মনটা এক অজানা শান্তিতে ভরে গেল। ও আড়চোখে গৌরবের দিকে তাকাল। গৌরবও তখন ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই একটা নীরব বোঝাপড়ার হাসি বিনিময় হলো।
বিগত ছয় মাসে প্রমিত যেমন তার অতীতকে ভুলে মীনাক্ষীর হাত ধরে নতুন করে বাঁচতে শিখেছে, ঠিক তেমনি দীপান্বিতার জীবনেও গৌরব এক অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থেকে গেছে। তাড়াহুড়ো নেই, জোর খাটানো নেই—শুধু বিশ্বাস ও গভীর বন্ধুত্বের টানে ওরা দুজন দুজনকে চিনে নিচ্ছে প্রতিদিন.. যদিও দুজনেই জানে সেই বন্ধুত্ব আর নিছক বন্ধুত্বে থেমে নেই।বারান্দার বাইরে তখন কলকাতার বুকে অজস্র নিয়ন আলো জ্বলছে।
প্রমিত আর মীনাক্ষীর খুনসুটি, গৌরবের মৃদু হাসি আর ফিল্টার কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে দীপান্বিতা মনে মনে ভাবে—জীবন সত্যিই সুন্দর, শুধু সঠিক মানুষের হাতটা ধরতে জানতে হয়।

সমাপ্ত
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

নোনা জল পর্ব-০৫

#নোনা_জল #পঞ্চম_পর্ব
দীপান্বিতা প্রমিতের চোখের গভীরে সেই দীর্ঘদিনের লালিত কষ্টটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। যে ছেলেটা এতক্ষণ ওর মেন্টর সেজে ওকে জীবনের পাঠ দিচ্ছিল, সে নিজেই নিজের তৈরি এক মায়ার খাঁচায় বন্দি।
কচুরির টুকরোটা আলুর দমে ডুবিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে প্রমিত তাকিয়ে বলল, “পাগল নাকি দীপান্বিতা! আমি হুট করে ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দেবো? লোকে কী ভাববে? আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি তো কারও সাথে রিলেশনে নেই! এটা তো স্রেফ মিথ্যে নাটক হবে।”
দীপান্বিতা নিজের প্লেট থেকে একটা কচুরির কোণ ছিঁড়ে মুখে পুরে শান্ত গলায় বলল, “এটা নাটক নয় প্রমিত, এটা কাউন্টার সাইকোলজি.. এরকম দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়ালে কিন্তু আপনার চলবে না… সামনে পুরো জীবনটা পড়ে আছে”
গৌরব প্রমিতের কাঁধে হাত রেখে বলল “একবার করেই দেখ না.. যদি একটু ভালো থাকতে পারিস”
প্রমিত খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পকেট থেকে ফোনটা বার করল। ফেসবুক অ্যাপটা খুলে প্রোফাইলে গিয়ে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস এডিটের জায়গায় আঙুলটা ছোঁয়াতেই ওর বুকটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল। ও দীপান্বিতার দিকে তাকাল। দীপান্বিতা অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
এক প্রকার চোখ বুজেই প্রমিত আপডেট বোতামটা টিপে দিল—‘In a relationship’. তারপর গৌরবের দিকে তাকিয়ে বলল
“যদি গড়বড় কিছু হয়!!”
“কচু পোড়া হবে!!! তুই কচুরি খা.. কিছু হলে আমি সামলাবো..”
স্ট্যাটাসটা লাইভ হতেই যেন বোমা ফাটল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রমিতের চেনা-পরিচিত সার্কেল, কলেজের পুরোনো বন্ধুদের লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। অনেকেই ইনবক্সে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল—”কী রে ভাই? লুকানো কনেটি কে?”, “পার্টি কবে দিচ্ছিস?”
দীপান্বিতা প্রমিতের ফোনটা টেনে নিয়ে দু-একটা কমেন্টে খুব কায়দা করে রিপ্লাই লিখে দিল—”থ্যাঙ্কস ভাই, খুব শিগগিরই জানাচ্ছি” বা কয়েকটাতেএকটা স্রেফ হাসিমুখের ইমোজি। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এমন একটা রহস্য আর আনন্দের আবহ তৈরি হলো যে যে কেউ দেখলে ভাববে প্রমিত সত্যি তার জীবনের সেরা ফর্মে আছে।
দীপান্বিতা সকলের কচুরির দাম মিটিয়ে দিল… তারপরে সমুদ্রের ধারে এসে ওরা আবার বসলো..
ঠিক তখনই গৌরবের পকেটে থাকা ফোনটা একটা তীব্র ভাইব্রেশনের সাথে একসাথে কয়েকবার বেজে উঠল। গৌরব চটপট পকেট থেকে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই চোখ দুটো গোল গোল করে ফেলল। ও উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, “আরে ম্যাডাম! কেল্লাফতে! ব্যাটার রিপ্লাই চলে এসেছে!”
দীপান্বিতা আর প্রমিত দুজনেই একসঙ্গে গৌরবের ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্ক্রিনে সৃজিতের সেই অচেনা নম্বর থেকে পরপর তিনটে মেসেজ ভেসে উঠেছে:
“দীপান্বিতা, প্লিজ শান্ত হও। তুমি এসব কী বলছ? অফিস বা বাড়িতে আসার কোনো প্রয়োজন নেই।”
“আমি কোনো ছেলেখেলা করিনি। পরিস্থিতির চাপে পড়ে অমনটা করতে হয়েছিল।”
“কোথায় আছ তুমি এখন? প্লিজ ফোনটা তোলো, সামনাসামনি কথা বলে সব মিটিয়ে নিচ্ছি।”
সৃজিতের এই ছটফটানি আর খেই হারিয়ে ফেলা মেসেজগুলো পড়ে দীপান্বিতার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। যে মানুষটা এতদিন ওকে কোনো উত্তর দেওয়ার যোগ্য মনে করেনি, স্রেফ একটা ব্লক করে দিয়ে দায় এড়িয়েছিল—আজ নিজের সাজানো কেরিয়ার আর সম্মানে ধাক্কা লাগার ভয়ে সে কত তাড়াতাড়ি উত্তর দিচ্ছে!!
দীপান্বিতা হাত বাড়িয়ে বলল, “গৌরব, ফোনটা দাও। আমি ওকে একটা উত্তর লিখি..”
“আরে না, না! একদম নয়!” গৌরব চট করে ফোনটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ও মাথা নেড়ে একগাল হেসে বলল, ” আমি প্র্যাক্টিক্যাল জগতের লোক, বিজনেসের স্ট্র্যাটেজিটা আমার চেয়ে ভালো কেউ বুঝবে না। ব্যাটা এখন চরম খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ছটফট করছে। এখন যদি আপনি চট করে রিপ্লাই দিয়ে দেন বা ফোন তোলেন, তবে ও আবার নিজেকে সামলে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে। তার চেয়ে এখন সৃজিতবাবুকে একটু সাসপেন্সে রাখাটাই সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি।”
প্রমিতও গৌরবের কথায় সায় দিয়ে বলল, “গৌরব একদম ঠিক বলেছে দীপান্বিতা। যে মানুষটা আপনাকে সাত দিন ধরে কোনো কারণ না দেখিয়ে গুমরে মরার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল, তাকে অন্তত কয়েক ঘণ্টা এই ছটফটানির আগুনে পুড়তে দিন। ও বুঝুক যে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ওর হাতে থাকে না। আপাতত ও নোটিফিকেশন দেখতে থাকুক, কিন্তু কোনো উত্তর পাবে না। এই উত্তরগুলো যে আপনার প্রতি কোন অনুভূতির জন্য ও দিচ্ছে না সেটা আশা করি আপনি বুঝতে পেরে গেছেন…”
দীপান্বিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর..
নিজের ফোনটা সাইলেন্ট করে দিল… সেখানে তখন ঘন ঘন সৃজিতের কল ঢুকছে…
দুপুরের দিকে সমুদ্রের রূপটা যেন আরও বেশি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ঢেউগুলো ফেনিল হয়ে আছড়ে পড়ছে তটে, আর সেই নোনা হাওয়ায় তিন বন্ধুর আড্ডা এবার সম্পূর্ণ অন্য একটা ছন্দে বইতে শুরু করল। এতদিনের জমে থাকা মেঘগুলো কেটে যেতে শুরু করলো আস্তে আস্তে..
গৌরব প্যান্টের পকেট থেকে নিজের ফোনটা বার করে রিসোর্টের ম্যানেজারের নম্বরটা ডায়াল করল। ওপাশে ফোনটা রিসিভ হতেই গৌরব বেশ দরাজ গলায় বলল, “হ্যালো, রয়্যাল রিসোর্ট? হ্যাঁ, ৪১২ আর ৪২২ নম্বর রুম থেকে বলছি। আমাদের দুপুরের লাঞ্চের মেনুটা একটু নোট করুন তো… হ্যাঁ, একদম খাঁটি বাঙালি স্টাইলে ফার্স্ট ক্লাস চালের ভাত, মুগের ডাল, আলু ভাজা আর মেইন মেনুতে থাকবে একদম কড়া করে বানানো মন্দারমনির স্পেশাল কাঁকড়ার ঝাল! ঝালটা একটু বেশি দেবেন মশাই..”
গৌরবের এই খ্যাপাটে অর্ডার দেওয়ার ধরন দেখে দীপান্বিতা আর প্রমিত দুজনেই একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল।
ঘণ্টা কয়েক চুটিয়ে আড্ডা মারার পর, তখন ওরা রিসোর্টের লবিতে ফিরে এসেছে। প্রমিতের ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। প্রমিত ফোনটা পকেট থেকে বের করে ওদের দুজনের চোখের সামনে মেলে ধরল…একটা চেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন—
প্রমিত বিড়বিড় করে বলল “সাড়ে চার বছর পর তনয়া নিজে থেকে মেসেজ করেছে!”
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে: “ফেসবুকে ওটা কী দেখলাম প্রমিত? তুমি রিলেশনে আছ? কে ও? আমাকে তো একবারও জানাওনি!”
তনয়ার মেসেজটা দেখামাত্রই গৌরব উত্তেজনায় প্রমিতের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, “লে হালুয়া! আমি বলেছিলাম না তোকে?””
প্রমিত অবশ্য গৌরবের মতো লাফালাফি করতে পারল না। ও স্তব্ধ হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সাড়ে চার বছর ধরে যে একটা মেসেজের জন্য ও চাতক পাখির মতো বসে থাকত, কত রাত একা একা ওর প্রোফাইল স্টক করে কাটাত—আজ সেই তনয়া নিজে থেকে মেসেজ করেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, প্রমিতের বুকের ভেতর আজ আর চেনা কোনো তোলপাড় হচ্ছে না। বরং ওর নিজেরই অবাক লাগল এটা ভেবে যে, এই সামান্য তিন লাইনের অধিকার খাটানো মেসেজটা দেখার পর ওর মনে ভালোবাসার চেয়ে বেশি এক তীব্র বিতৃষ্ণা জেগে উঠছে।
দীপান্বিতা প্রমিতের মুখের চটজলদি বদলে যাওয়া ভাবটা লক্ষ্য করছিল। ও প্রমিতের আরও একটু কাছে এসে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত অথচ গভীর গলায় বলল, “কী প্রমিত? তনয়ার মেসেজটা দেখে মনটা আবার গলে জল হয়ে গেল না তো? নাকি আমার লজিকটা এবার সত্যি বলে মনে হচ্ছে?”
প্রমিত একটা ম্লান হাসি হাসল। ওর খসখসে গলাটায় এবার কোনো দ্বিধা ছিল না, ও বলল, “না দীপান্বিতা। আপনি এক ফোঁটাও ভুল বলেননি। তনয়া যদি আমার ভালো চাইত, তবে ও এই স্ট্যাটাস দেখে খুশি হতো, কংগ্রাচুলেট করত। কিন্তু ওর এই ‘আমাকে তো একবারও জানাওনি’ লাইনের অহংকারটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে ও আমাকে স্রেফ নিজের একটা সম্পত্তি ভেবে রেখেছিল। ও ভাবতেই পারছে না যে আমি ওকে ছাড়াও ভালো থাকতে পারি।”
গৌরব নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করে সৃজিতের চ্যাটটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “উফ্! ওদিকে সৃজিতবাবুও এখনও টাইপিং আর ডিলিটিংয়ের খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনও কোনো রিপ্লাই পায়নি বলে ব্যাটার ছটফটানি স্ক্রিন ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। আর এদিকে তনয়া ম্যাডামও লাইনে হাজির! প্রমিত, এবার ফাইনাল স্ট্রোকটা তুই দিবি নাকি আমি তোর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ব্লক মারব?”
দীপান্বিতা গৌরবের হাত ফোন থেকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে প্রমিতকে বলল, “না গৌরব, নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্ম বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার অধ্যায়টা প্রমিতকে নিজেকেই লিখতে হবে। প্রমিত, তনয়ার এই মেসেজটা আপনি সিন করবেন। ও দেখুক যে আপনি ওর টেক্সট পড়েছেন। কিন্তু একটা অক্ষরেরও কোনো উত্তর এখন দেবেন না। ও উত্তরের আশায় বসে থাকুক…”
“চলুন আমরা বরং স্নান সেরে লাঞ্চটা করেনি… বেলা একটা বাজতে চলল..”
দীপান্বিতা আলতো করে প্রমিতের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে তনয়ার চ্যাট উইন্ডোটা ওপেন করে দিল। স্ক্রিনে দুটো নীল টিক ফুটে উঠতেই ও ফোনটা আবার প্রমিতের হাতে ফেরত দিয়ে হাসল, “ও উত্তরের আশায় বসে থাকুক প্রমিত… অবহেলা কাকে বলে, ও এবার প্রতি মিনিটে টের পাক। চলুন, আমরা বরং স্নান সেরে লাঞ্চটা করে নিই… বেলা একটা বাজতে চলল। শরীরটাকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ নেই।”
গত সাতটা দিন দীপান্বিতার ওপর দিয়ে যেন একটা কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। ঠিকমতো খাওয়া নেই, ঘুম নেই, আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকানোর মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। আজ ঘরে ফিরে ও বাথরুমের শাওয়ারটা খুলে দিল। অনেকদিন পর আজ ও মন ভরে, অনেক সময় নিয়ে স্নান করল। চুলে ভালো করে শ্যাম্পু দিয়ে ঘষে ঘষে যেন গত কয়েকদিনের সমস্ত গ্লানি আর বিষাদ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল ও। স্নান শেষে যখন ও গা মুছে বেরোলো, আয়নায় নিজেকে দেখে ওর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। এক ঝটকায় যেন চোখের নিচের কালি আর মুখের ম্লান ভাবটা উধাও হয়ে গেছে। ও একটা হালকা আকাশি রঙের সুতির কুর্তি পরল। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে মেলে দিল। নোনা বাতাসে সেই ভেজা শ্যাম্পুর সুবাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত সতেজতা তৈরি করল।
ওদিকে ৪১২ নম্বর ঘরে প্রমিতও আজ এক অন্য মানুষ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও নিজের এক গাল অবিন্যস্ত দাড়ির দিকে তাকাল। যে দাড়িটা ছিল তনয়ার চলে যাওয়ার পর নিজের প্রতি চরম অবহেলার প্রতীক, আজ সেটাকে ও ট্রিমার দিয়ে এক্কেবারে চেঁছে সাফ করে ফেলল। বহুদিন পর পরিষ্কার দাড়ি-গোঁফ কামানো প্রমিতকে আয়নায় বেশ ঝকঝকে আর আকর্ষক লাগছিল। স্নান সেরে একটা হালকা রঙের শার্ট গলিয়ে ও যখন রুম থেকে বেরোলো, ওর মনের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে গুনগুন করে একটা লোকসংগীত গাইতে গাইতে ও নিচে নামছিল। সাড়ে চার বছর পর ওর গলায় আজ আবার সুর ফিরে এসেছে।
লবিতে নামতেই প্রমিত দেখতে পেল গৌরব আর দীপান্বিতা ইতিমধ্যেই এসে একটা টেবিলে বসে পড়েছে। প্রমিতের চোখটা গিয়ে আটকাল দীপান্বিতার ওপর। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, দু-একটা অবাধ্য ভেজা চুলের গোছা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর গাল। দুপুরের চড়া আলোয় দীপান্বিতাকে আজ বড় বেশি স্নিগ্ধ আর মায়াবী লাগছিল। প্রমিতের চোখ থমকে গেল, ওর হাঁটার গতিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্লথ হয়ে পড়ল… উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা বন্ধুটির চোখের সেই অকৃত্রিম মুগ্ধতা প্রমিতের চোখ এড়ালো না। ও মনে মনে একটু মুচকি হাসল, কিন্তু মুখে কিচ্ছুটি প্রকাশ করল না।
গৌরব প্রমিতকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, “ওরে বাবা! এ তো পুরো হিরো আলমের উল্টো কেস রে! প্রমিত, তোকে তো দাড়ি কাটার পর জাস্ট চেনা যাচ্ছে না মাইরি!”
টেবিলে বসতেই ধোঁয়া ওঠা গরম বাসমতি চালের ভাত, সোনা মুগের ডাল আর মুচমুচে আলু ভাজা চলে এলো। দীপান্বিতা আজ প্রথম এক হাতা ডাল দিয়ে ভাতটা ভালো করে মাখল। এক গ্রাস ভাত আর আলু ভাজা মুখে তুলতেই ওর চোখের কোণটা হঠাৎ ভিজে উঠল। কতদিন পর ও ভাতের আস্বাদ পাচ্ছে! এই ডাল-ভাতের সাধারণ স্বাদটাই যেন ওকে ওর চেনা পৃথিবীতে, ওর নিজের অস্তিত্বে ফিরিয়ে এনে দিল। মনের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কান্নার শেষ বাঁধটা ভেঙে এক ফোঁটা জল ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
গৌরব ও প্রমিত দুজনেই খাওয়া থামিয়ে দিল। গৌরব এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বার করল।কোনো ইয়ার্কি না করে, অত্যন্ত যত্ন আর স্নেহের সাথে দীপান্বিতার গালের সেই জলটুকু আলতো করে মুছে দিল। মৃদু হেসে বলল, “ম্যাডাম, এই নোনা জলটা বিষাদের ছিল না, এটা জীবনে ফেরার আনন্দের। এবার চটপট চোখের জল মুছে ওই কাঁকড়ার ঝালটায় হাত দিন, রং দেখে মনে হচ্ছে ম্যানেজারবাবু কিন্তু লঙ্কা কম দেননি! আমি বরং রুমালটা বাইরেই রাখি।”
প্রমিত আস্তে করে গৌরবের কানে কানে বলল “তাহলে তোর মত ভবঘুরেও দায়িত্ব নিতে শিখছে কি বলিস!”
এই প্রথম গৌরবের মুখে কোন জুতসই উত্তর শোনা গেল না.. বেশ লজ্জা লাগছে তখন ওর কিন্তু ভালো ও লাগছে..
গৌরবের মুখে কোনো জুতসই উত্তর না পেয়ে প্রমিত একটু টিপ্পনি কাটার ভঙ্গিতে হাসল। গৌরব নিজের কান দুটো সামন্য লাল করে কাঁকড়ার ঝোলের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, “আরে ধুর! খা তোরা, বেশি বকবক করিস না।” তবে ওর চোখে-মুখে লজ্জা জড়ানো একটা অদ্ভুত ভালো লাগার আভা তখন স্পষ্ট।
লাঞ্চ শেষ করার পর ওরা যখন ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠল, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁইছুঁই। দীপান্বিতা নিজের ব্যাগ থেকে সাইলেন্ট করে রাখা ফোনটা বের করতেই তিনজনেরই চোখ কপালে উঠল। স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে—৩১টা মিসড কল! সৃজিত যেন গত দু-ঘণ্টায় পাগলের মতো একের পর এক রিং করে গেছে।
প্রমিত ফোনটার দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, পরিণত গলায় বলল, “দীপান্বিতা, এবার সময় এসেছে। ও এখন মারাত্মক ব্যাকফুটে। আপনি শান্ত মাথায় নিজের ঘরে যান এবং ওর সাথে কথা বলুন। কোনো রাগ বা উত্তেজনা নয়, স্রেফ একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের মতো ওর মুখোমুখি হোন।”
দীপান্বিতা মাথা নাড়ল..প্রমিত আর গৌরবের থেকে বিদায় নিয়ে ও নিজের ৪২২ নম্বর ঘরে ফিরে এলো। দরজাটা লক করে বিছানায় বসতেই ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে—’সৃজিত’। ও এবার আর দ্বিধা করল না, রিসিভ করে কানে ঠেকাল। ওপাশ থেকে একটা হাঁসফাঁস করা, অপরাধবোধে জড়ানো গলা ভেসে এলো, “দীপান্বিতা! থ্যাঙ্ক গড তুমি ফোনটা ধরলে! আমি… আমি সত্যি খুব দুঃখিত। প্লিজ আমার বাড়ি বা অফিসে যেও না, সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে।”
দীপান্বিতা জানলার বাইরে উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি কোনো সিন ক্রিয়েট করতে আসছি না সৃজিত। শুধু সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্কের শেষ কৈফিয়তটুকু শুনতে চাই। কেন করলে এমনটা?”
সৃজিত ওপাশ থেকে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলতে শুরু করল, “দীপান্বিতা, আমি আসলে পরিস্থিতির চাপে পড়েছিলাম। তুমি তো জানো আমার ফ্যামিলি কতটা কনজারভেটিভ। বাড়ি থেকে হঠাৎ বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল, কিন্তু মা-বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, বোনের বিয়ে না দিয়ে বড় ছেলের বিয়ে দেওয়া তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না.. বোনের সবে ক্লাস ইলেভেন.. আমার কাজের অসম্ভব প্রেসার আর বাড়ির এই অবাস্তব দাবি—এইসব সাত-পাঁচ ভেবে আমি মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আমি তোমাকে কোনোদিনও নিজের করে পাব না, তাই স্রেফ পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ওই তিন লাইনের মেসেজটা আমার কাপুরুষতা ছিল দীপান্বিতা… প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল বুঝতে পেরেছি, আমি আবার তোমার সাথে নতুন করে সম্পর্কটা শুরু করতে চাই। আমরা সব সামলে নেব, বিশ্বাস করো!”
দীপান্বিতার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল…

পরের পর্বে সমাপ্ত
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

নোনা জল পর্ব-০৪

#নোনা_জল #চতুর্থ_পর্ব
অনেকক্ষণ একটানা কথা বলার পর দম নেওয়ার জন্য দীপান্বিতা একটু থামলো… তারপরে প্রমিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “আসলে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়া খুব সহজ প্রমিত, নিজের বেলায় এই লজিকগুলো কাজ করে না। এই যে আপনাকে এত বড় বড় কথা বললাম, অথচ নিজের ঘরের ডিনারের থালাটা সাজানোই রয়ে গেল, এক গ্রাসও গিলতে পারলাম না সৃজিতের দেওয়া ওই তিন লাইনের মেসেজটার চক্করে।”
প্রমিত এবার বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল। ওর সেই খসখসে, ভারী গলার হাসিটা লনের পরিবেশটাকে এক ধাক্কায় অনেক হালকা করে দিল। ও বলল, “তার মানে দাঁড়াল—আপনি থিওরি ক্লাসে ফার্স্ট, কিন্তু প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার খাতায় গোল্লা! চলুন, অনেক রাত হলো। এবার সত্যিই রুমে ফেরা দরকার।”আর কথা না বাড়িয়ে প্রমিতের পাশাপাশি দীপান্বিতা ও রিসর্টের লবি ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। চারতলার করিডোরে এসে যখন প্রমিত ৪১২ নম্বরের দিকে আর দীপান্বিতা ৪২২ নম্বরের দিকে এগোবে, তখন প্রমিত হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে উঠল, “দীপান্বিতা?”
“হ্যাঁ?” ও ঘুরে তাকাল।
“কাল সকালে যদি গৌরব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে, তবে আমরা ওই বাঁদিকের কোণায় লাল ছাতাওয়ালা দোকানটায় চা খেতে যাব। আপনি আসবেন তো? প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার পরের চ্যাপ্টারটা না হয় ওখানেই আলোচনা করা যাবে… আপনার গল্পটা শোনা পুরোই বাকি থেকে গেছে”
দীপান্বিতা মাথা নেড়ে বলল, “আসব। গুড নাইট প্রমিত।”
“গুড নাইট।”
দীপান্বিতা ঘরে ঢুকে দরজাটা লক করল…আলতো হাতে থালা-বাটিগুলো ঢাকা দিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখল। রাতে আর নতুন করে খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না.. হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিল।

সকালের মন্দারমনি এক অন্য রূপ নিয়ে হাজির হয়..মেঘলা আকাশ কেটে গিয়ে হালকা একটা রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে বালুচরে…একটা হালকা সুতির কুর্তি পরে, চুলটা আলগা করে খোঁপা বেঁধে চটপট নিচে নেমে এলো।
রিসোর্টের গেট থেকে বাঁদিকের মোড়টা ঘুরতেই চোখে পড়ল সেই লাল ছাতাওয়ালা চায়ের দোকান। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে বেঞ্চিতে বসে গৌরব হাত-পা নেড়ে জম্পেশ গল্প করছে, আর প্রমিত একটা মাটির ভাঁড় হাতে নিয়ে শান্ত মুখে ওর কথা শুনছে। গৌরবই প্রথম দীপান্বিতাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল, “আরে ম্যাডাম! আসুন, আসুন! এই প্রমিত ব্যাটা তো সকাল থেকে জপ করছিল আপনি আসবেন কি না। আমি তো বললাম, আমার মতো ঘুমকাতুরেই যখন উঠে পড়েছি, আপনি তো তো আসবেনই!”
গৌরবের এই স্বভাবসুলভ চটপটে কথায় দীপান্বিতার সমস্ত আড়ষ্টতা কেটে গেল… ও হাসিমুখে বেঞ্চির একপাশে এসে বসল।দোকানি ছেলেটি ততক্ষণে তিনটে ধোঁয়া ওঠা গরম এলাচ চায়ের ভাঁড় ওদের সামনে এনে নামিয়ে দিয়েছে। চায়ের সুগন্ধ আর সকালের তাজা বাতাস মিলে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি হলো..দীপান্বিতা চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে একটা ছোট চুমুক দিল.. প্রমিত চায়ের ভাঁড়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে দীপান্বিতা কে বলল “সৃজিতের গল্পটা আমায় কিন্তু বলতে হবে ..”
দীপান্বিতা অন্যমনস্ক হয়ে বললো.. “কি বলবো বলুন তো.. শুরুই বা কোথা থেকে করবো.. আমার গল্পের শুরু শেষ সবটাই কেমন যেন গোলমেলে..”
গৌরব চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে লুজ বিস্কুটটা মুখে পুরে বলল, “আরে সৃজিত কে? একটা দিনই শুধু আগে ঘুমিয়েছি তার মধ্যে আবার নতুন ক্যারেক্টার তৈরি হলো কি করে?”
প্রমিত গৌরবকে একটা হালকা ধমক দিয়ে বলল, “তুই একটু চুপ করবি গৌরব? সবসময় শুধু রেডিওর মতো বাজিস। দীপান্বিতা, আপনি বলুন…আমরা শুনছি.. আর কিছু না হোক আমরা দুজন ছেলে তো, পুরো ঘটনাটা শুনলে যদি কিছুটা হলেও ওনার মানসিকতা বুঝতে পারি”
লাল ছাতার নিচে, সকালের মিঠে রোদে মাটির ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিতে দিতে দীপান্বিতা এবার নিজের সাড়ে তিন বছরের সেই অসমাপ্ত গল্পটা বলতে শুরু করলো..
“সৃজিত মানুষ হিসেবে কিন্তু খারাপ ছিল না, অন্ততঃ ও যেভাবে নিজেকে আমার সামনে রিপ্রেজেন্ট করত, তাতে কোনো খুঁত ধরার জায়গা ছিল না। খুব যত্ন করত, আমার ছোট ছোট ভালো লাগাগুলোর খেয়াল রাখত। আমরা দুজনেই কলকাতায় একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি…ওর সঙ্গে আলাপ হয় আমাদের এক কমন ফ্রেন্ড এর মাধ্যমে, তারপর কাছাকাছি আসা। আমাদের বিয়ের কথাও প্রায় পাকা.. সবাই অন্তত সেরকমই জানতো.. হঠাৎ যে কি হলো,
একটা তিন লাইনের মেসেজে এতদিনের সম্পর্কে ফুলস্টপ ফেলে ও আমার জীবন থেকে সরে গেল..
গৌরব এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল,এবার সত্যি রেগে গিয়ে বলল, “কী অসভ্য লোক মাইরি! সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্ককে একটা টেক্সট মেসেজে উড়িয়ে দিল?”
গৌরবকে হাতের ইশারায় থামিয়ে প্রমিত বলল এই মেসেজের আগের দু তিন সপ্তাহের কথা একটু ভালো করে মনে করার চেষ্টা করুন তো.. দুম করে এই তিন লাইনের টেক্সট কিন্তু আসার কথা নয়.. আগে নিশ্চয়ই কিছু ইঙ্গিত ছিল যেটা আপনার চোখ ধরতে পারেনি। বা হয়তো ধরতে পেরেছিল মন মানতে চায়নি।
দীপান্বিতা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল.. তারপর বলল
“এই ঘটনার আগের দু তিন সপ্তাহে তেমন কোন পরিবর্তন আমি টের পাইনি। তবে হ্যাঁ গত প্রায় মাস খানেক ধরে ওর কাজের ব্যস্ততা খুব বেড়ে গেছিল.. অন্যমনস্ক থাকতো, ক্লান্ত হয়ে যেত…সারাদিনে হয়তো প্রায় কথাই হতো না আমাদের.. রাতের দিকে ফোন করলে ওর ঘুমে জড়ানো গলা শুনতে পেতাম বলতো কাজের অস্বাভাবিক প্রেসার বেড়ে গেছে।শরীর খুব ক্লান্ত। কাল সকালে কথা বলছি!
আমিও আর ঘাঁটাতাম না, ভাবতাম সত্যিই হয়তো কাজের চাপ.. আমার খারাপ লাগতো.. মনের মধ্যে কথা জমে জমে পাহাড় তৈরি হতো..

দীপান্বিতা চায়ের ভাঁড়টা দুহাতে একটু শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখ দুটো তখন চায়ের ধোঁয়া ভেদ করে সামনের ফাঁকা বালুচরে গিয়ে আটকেছে। ও আবার বলতে শুরু করল, “মনের ভেতর যে অভিমানের পাহাড়টা জমছিল, সেটা আমি একটু একটু করে চেপে রাখতাম। ভাবতাম, ও তো আমার জন্যই খাটছে, আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই তো এই উদয়াস্ত পরিশ্রম। কিন্তু আসল সত্যিটা যে অন্য কিছু ছিল, সেটা এই বোকা মন বিন্দুমাত্র টের পায়নি।”প্রমিত চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর নামিয়ে রাখল। ওর মুখটা বেশ গম্ভীর। ও দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “দীপান্বিতা, একটা কথা বলব? এই যে কাজের অস্বাভাবিক প্রেসার, সারাক্ষণ ক্লান্তি আর রাতে ঘুমে জড়ানো গলায় ‘কাল কথা বলছি’ বলে ফোন রেখে দেওয়া—এটা আসলে কাজের চাপ নয়। এটা হলো একটা মানুষকে একটু একটু করে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে পুরোনো আর চেনা স্ক্রিপ্ট। যখন একটা মানুষ সরাসরি ‘আমি আর সম্পর্কে থাকতে চাই না’ বলার সাহস পায় না, তখন সে এই ক্লান্তির আর ব্যস্ততার দেওয়ালটা খাড়া করে। যাতে ওপাশে থাকা মানুষটা নিজেই আস্তে আস্তে দূরে সরে যায় কিংবা মানসিকভাবে তৈরি হয়ে নেয়।”গৌরব এতক্ষণ বিস্কুট চিবোচ্ছিল, ও চট করে বলে উঠল, “একদম ঠিক বলেছিস প্রমিত! ওই ব্যাটা আসলে গিল্ট ফিলিং থেকে পালাচ্ছিল। সামনাসামনি কথা বলার ক্ষমতা ছিল না চোরের!”
দীপান্বিতা একটা ম্লান হাসল..”ওই মেসেজটা আসার আগে পর্যন্ত আমার চোখে সৃজিত ছিল আমার জন্য একদম পারফেক্ট একটা মানুষ.. এখনো আমি ওর কোন ভুল দেখতেই পাই না.. আমার সব সময় মনে হচ্ছে হয়তো আমার মধ্যেই এমন কোন খামতি আছে, আমারই কোন ভুলের জন্য ও আমার সঙ্গে থাকতে পারলো না..”
বলতে বলতে দীপান্বিতার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল চায়ের ভাঁড়ে গিয়ে পড়ল। সকালের মিঠে রোদটাও যেন এক মুহূর্তের জন্য ওর মুখের ওপর ম্লান দেখাল।
গৌরব ঝাঁঝিয়ে উঠলো “আপনি ফোন করে কারণ জানার চেষ্টা করেননি?”
-কতবার করেছি.. শেষে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে..
-ইল্লি আর কি! একটা মেয়ের জীবনের সাড়ে তিন বছর বরবাদ করে তিন লাইনে মেসেজ করে হাওয়া হয়ে যাওয়া!! একদম মেনে নেবেন না এটা..
প্রমিত অবাক চোখে গৌরবের দিকে তাকায়..”মেনে না নিয়ে উপায় কি! জোর করে কি কারো সঙ্গে সম্পর্কে থাকা যায় নাকি!”
-আরে ধুর আপদ ..সম্পর্কে থাকতে হবে কেন.. কিন্তু আমি যে জায়গায় এত বছর ধরে ইনভেস্ট করেছি.. আমার টাইম এফর্ট, এনার্জি,আবেগ সমস্ত ইনভেস্ট করেছি সেইখান থেকে বিনা কারণ দেখিয়ে পুরো ইনভেস্টমেন্ট টাকে তো কেউ নস্যাৎ করে চলে যেতে পারে না.
দীপান্বিতাও তখন অবাক চোখে গৌরবের দিকে তাকিয়ে আছে..প্রমিত চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর নামিয়ে রেখে মাথা নেড়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “বাহ্ গৌরববাবু বাহ্! সাড়ে তিন বছরের একটা খাঁটি রিলেশনকে তুই একদম শেয়ার বাজারের মিউচুয়াল ফান্ড বানিয়ে দিলি? ইনভেস্টমেন্ট, এফর্ট, এনার্জি! তোর মাথায় কি সারাক্ষণ ওই চার্ট আর গ্রাফ ঘোরে রে?”
-আরে ধুর, তুই টেকনিক্যাল দিকটা বুঝবি না প্রমিত?গৌরব বেশ উত্তেজিত হয়ে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর চায়ের দোকানের একটা খুঁটি ধরে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন, ও ইঞ্জিনিয়ার হলেও শিল্পী মানুষ, ও শুধু সুর আর কষ্ট বোঝে। আমি প্র্যাক্টিক্যাল জগতের লোক, আমি লাভ-ক্ষতি বুঝি। আপনি সৃজিতকে ভালোবেসেছিলেন, সেটা আপনার আবেগ। কিন্তু ওই সাড়ে তিনটে বছর যে আপনি আপনার জীবনের গোল্ডেন টাইমটা, আপনার মেন্টাল স্পেসটা ওই মানুষটার পেছনে খরচ করলেন—সেটার একটা জাস্টিফিকেশন লাগবে না? আপনি কোনো ভুল করেননি, ছেড়েও যেতে চাননি অথচ ও স্রেফ একটা ‘সরি, কন্টিনিউ করতে পারছি না’ লিখে হাত ধুয়ে চলে গেল! এতে আপনার সেলফ-রেস্পেক্টটা কোথায় গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে ভেবেছেন? আপনার নিজের খামতি খোঁজার চেষ্টার কারণ তো ওই ধাক্কাটা খাওয়ার জন্য.. আজকের দিনে একটা সম্পর্ক যে কোন সময়ে শেষ হতেই পারে.. কিন্তু তার জন্যেও একটা পারফেক্ট ক্লোজার লাগে.. ওটা না পাওয়ার জন্যই আপনি গুমরে মরছেন কারণ আপনার কাছে আপনাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার কোন কারণই জানা নেই.. এটা তো হতে পারে না..
গৌরবের এই অকপট আর খ্যাপাটে যুক্তির সামনে দীপান্বিতা প্রথমে একটু থতমত খেলেও, ধীরে ধীরে ওর মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত জোর ফিরে আসতে লাগল। গত সাত দিন ধরে ও শুধু নিজেকেই অপরাধী ভেবে এসেছে—কখনো বোকার মত ভেবেছে ওর রূপ কম? নয়তো ভেবেছে ও সৃজিতকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেনি? হয়তো ছেলেটাকে ঠিক বুঝেই উঠতে পারেনি..কিন্তু গৌরব এক ঝটকায় ওর চোখ খুলে দিল।প্রমিত একটু এগিয়ে এসে দীপান্বিতার চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটোতে এবার এক চিলতে আলো। ও বলল, “গৌরবের কথা বলার ধরনটা একটু অদ্ভুত হতে পারে দীপান্বিতা, কিন্তু ও খাঁটি কথাটাই বলেছে। আপনি একটু মনে করে দেখুন তো আমি যদি খুব ভুল না করি তবে ল াস্ট দুটো উইকে সৃজিত আপনাকে ঠিক কতবার কল করেছে আপনি হয়তো কর গুনে বলতে পারবেন..
দীপান্বিতা নিচের ঠোঁটটা কামড়ে পুরনো কথা মনে করার চেষ্টা করে… এর আগে কে ফোন করছে এই বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার আছে বলেই ওর কোনদিন মনে হয়নি.. তবু কেন জানি মনে হলো শেষ দশ পনের দিন হয়তো ও একাই বেশিরভাগ সময় কল করতো… কখনো বেশ কয়েকবার মিসডকল দেখার পর হয়তো বেলার দিকে ও একটা ফোন করে বলতো “বিশেষ কিছু কথা আছে কি”..

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ধারে বালির ওপরে গিয়ে বসলো.. দীপান্বিতা তখনো স্মৃতি সাঁতরে যাচ্ছে.. ওকে চুপ করে থাকতে দেখে গৌরব বলল..
“অত আপনার মগজে জোর লাগানোর দরকার নেই ম্যাডাম..
আপনার কল হিস্ট্রি না দেখেই আমি বলতে পারি বেশিরভাগ কল গুলো আপনি করেছেন.. আর কাজের চাপ? আমি অত প্রেম ভালোবাসা বুঝিনা তবে আমি এটুকু জানি আমরা ছেলেরা যতই ব্যস্ত থাকি না কেন নিজের মানুষটার কথা আমাদের ঠিক মনে থাকে… ঠিক ওই জায়গাটাতেই আপনি বুঝতে পারবেন একটা ছেলে তার সম্পর্কে কতখানি খাঁটি.. যে ছেলে নিজের সম্পর্কের প্রতি কমিটেড সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের গার্লফ্রেন্ড বা স্ত্রীর জন্য সময় বের করে নেবে।
গৌরবের এই কথার পিঠে আর কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না দীপান্বিতা। সমুদ্রের ঢেউগুলো তখন মৃদু ছন্দে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওদের পায়ের কাছের বালুচর। নোনা বাতাসের এক একটা ঝাপটা যেন এতক্ষণের জমে থাকা সমস্ত গ্লানি আর সংশয়কে এক এক করে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ও হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে বসল। তারপর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “তোমরা দুজনেই আজ আমার একটা মস্ত বড় ভুল ভেঙে দিলে। আমি এতদিন নিজেকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো আমারই কোনো খামতি ছিল।
-তবে ব্যাটাকে ছাড়বেন না.. সবকিছু নিয়ে ছেলে খেলা যে করা যায় না এটা ওনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে..
-তা কি করে করব!
-সাড়ে তিন বছর প্রেম করছেন.. বাড়ি চেনেন না? অফিস চেনেন না? প্রথমে অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করে বলুন যে সম্পর্কে থাকতে আপনিও চান না কারণ যে ছেলে এত বছরের একটা সম্পর্কের প্রতি মিনিমাম দায়িত্বটুকু পালন করার অবকাশ দেখায় না তার সঙ্গে সম্পর্কে থাকতে আপনার বয়ে গেছে… কিন্তু ওনার দিক থেকে এই সম্পর্ক ভাঙার পারফেক্ট কারণ ওনাকে বলে যেতে হবে.. যেতে হবে মানে বলতেই হবে আর তা না করে যদি উনি এই নম্বরও ব্লক করেন তবে বলে দেবেন আপনি বাড়িতে বা অফিসে গিয়ে হাজির হবেন..
-আমি ওর বাড়িতে বা অফিসে হানা দেবো?
-কেন নয়? উনি আপনার কনফিডেন্স নিয়ে খিল্লি ওড়াতে পারেন আর আপনি ওনার কনফিডেন্সে একটু ধাক্কা মারতে পারবেন না?
প্রমিত এতক্ষণ চুপচাপ বালির ওপর আঙুল দিয়ে হিজিবিজি কাটছিল। ও গৌরবকে থামানোর জন্য হাতটা তুলল, তারপর দীপান্বিতার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল, “গৌরব যেটা বলছে, সেটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে দীপান্বিতা। কিন্তু ওর মূল ভাবনাটা ভুল নয়। আমি আপনাকে ওই চোরের বাড়ি বা অফিসে গিয়ে সিন ক্রিয়েট করতে বলব না। কারণ, তাতে ওই মানুষটার চেয়ে আপনার সম্মানটাই বেশি হালকা হবে। তবে… এটাও ঠিক উনি কিন্তু সুকৌশলে আপনাকে নিজেকে অপরাধী,অযোগ্য ভাবতে বাধ্য করেছেন.. তাই উত্তর চাওয়া আপনার অধিকার..”
গৌরব নিজের সিগারেটের শেষ অংশটা বালিতে চেপে নিভিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “একদম! প্রমিত আজ লাইনে এসেছে। ম্যাডাম, আপনি জাস্ট আমার ফোনটা নিন। ও তো এই নম্বরটা চেনে না। এখনই একটা টেক্সট করুন। কোনো কান্নাকাটি নয়, কোনো মিনতি নয়। স্রেফ একটা সলিড স্টেটমেন্ট..”
দীপান্বিতা গৌরবের বাড়িয়ে দেওয়া ফোনটার দিকে তাকাল। স্ক্রিনটা সকালের রোদে চকচক করছে। ওর ডান হাতের আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। সাড়ে তিন বছর ধরে যার একটা মেসেজের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকত—আজ তাকে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ করতে হবে!
প্রমিত মৃদু হাসল, ওর চোখে এখন এক অদ্ভুত রকমের সমীহ। ও নিচু গলায় বলল, “টাইপ করুন দীপান্বিতা… নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মানটা এবার নিজে হাতেই টাইপ করে ফেরত নিন।”
দীপান্বিতা ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। সমুদ্রের হাওয়াটা যেন ওর চুলে আর কুর্তির হাতায় এসে চাবুক মারছিল। ও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে একটা লম্বা শ্বাস নিল। এতদিনের জমে থাকা কান্না, শেষ সাতটা রাতের বিনিদ্র গ্লানি, আর নিজেকে অযোগ্য ভাবার সেই বিষাক্ত যন্ত্রণাটা যেন এক মুহূর্তে একটা শক্ত পাথরে পরিণত হলো। ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো এবার স্থির হলো গৌরবের ফোনের কিপ্যাডের ওপর।
“সৃজিত, আমি দীপান্বিতা। অন্য নম্বর থেকে মেসেজ করছি দেখে ঘাবড়ে যেও না, তোমার ভাঙা রিলেশনের অবশিষ্টাংশ কুড়োতে আমি আর আজ আসিনি। তবে সম্পর্ক শেষ করার কারণ যে তোমাকে বলতেই হবে…আমি জানি, এর পর তুমি এই নম্বরটাও ব্লক করতে পারো। তবে মনে রেখো, তোমার এই পালিয়ে যাওয়াটা কিন্তু এত সহজে হবে না। উত্তর তোমাকে দিতেই হবে। নয়তো খুব শিগগিরই তোমার বাড়িতে বা অফিসে এসে এর একটা মুখোমুখি জাস্টিফিকেশন আমি বুঝে নেব—কথা আমাদের হচ্ছেই।”
মেসেজটা শেষ করে দীপান্বিতা এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করল না। ‘সেন্ড’ বোতামটায় একটা তীব্র চাপে আঙুল ছোঁয়াতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল—’মেসেজ ডেলিভার্ড’।
আমার ফোনে ও যদি কোন রিপ্লাই করে আমি সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে জানাবো।
-থ্যাঙ্ক ইউ..
-আরে ধুর সকাল থেকে শুধু চা বিস্কুটের উপর দিয়ে চলছে.. থ্যাংক ইউ দিয়ে কি হবে.. চলুন তিনজনে মিলে জমিয়ে কটা কচুরি খেয়ে আসি.. কাল রাতে আপনি এমনিও কিছু খাননি শুনেছি।ফিরে গেলে কিন্তু ওই প্রাইভেট কোম্পানির বস খাটিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না.. তাই এবার থেকে নিজের দিকে একটু নজর দিন..
প্রমিত দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে বলে “এবারের মন্দারমনি ঘোরা আমার চিরকাল মনে থাকবে… আমি নিজে যদিও সেভাবে মুভ অন করতে এখনো পারিনি.. তবুও হঠাৎ পাওয়া বন্ধুর জন্য কিছু করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।”
গৌরব প্রমিতের মাথায় চাঁটি মেরে বলে “দিনরাত তনয়ার প্রোফাইল যদি স্টক করতে থাকিস তাহলে মুভ অন করবি কি করে?”
দীপান্বিতা প্রমিতের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকায়.. তারপর বলে “তনয়া আপনাকে ব্লক করেনি তাই না?”
প্রমিত মাথা নাড়ে…
দীপান্বিতা বলে “এবার ব্লকটা আপনি ওকে করবেন..”
-আমি? তবে যে চোখের দেখা হওয়াটাও বন্ধ হয়ে যাবে..
-ওই চোখের দেখাই তো আপনার মধ্যে হতাশা, আফসোস টেনে আনছে.. এর থেকে বেরোতে হবে তো! আর একটা কথা তনয়া আপনাকে কেন ব্লক করেনি বলুন তো?
এবার হো হো করে হেসে ওঠে গৌরব..”আর কেন!! যাতে ওই বড়লোক বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যে ফানটুশী লাইফ স্টাইল কাটাচ্ছে সেটা ওর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ওর অযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে”
-সেটা তো আছেই..তার সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার আছে.. শুনতে খুব খারাপ লাগলেও আসলে তনয়া চায় না আপনি কোনদিন ওকে ভুলুন.. সম্ভবত ও ধরেই নিয়েছে আপনার যা যোগ্যতা তাতে আপনি সিঙ্গেল হয়ে চিরকাল থেকে যাবেন এবং ওকে নিয়ে আফসোস করতে করতে বাকি জীবনটা কাটাবেন..
গৌরব প্যান্টের বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে “এবং এই উদ্দেশ্যে তনয়া হান্ড্রেড পার্সেন্ট সফল”
কচুরির দোকানে চারটে করে কচুরি আর আলুর দম অর্ডার দেওয়ার পর দীপান্বিতা প্রমিতকে বলে “ফেসবুকে আজ একটা স্ট্যাটাস দিন.. রিলেশনশিপের জায়গাটায় লিখুন আপনি রিলেশনশিপে আছেন।
-আ্য্য্য্য!!!
-এ্যা নয় মশাই..হ্যাঁ.. এই স্ট্যাটাস টা দিয়ে চুপ করে বসে থাকুন কয়েক ঘন্টা.. কেউ কনগ্রাচুলেট করলে বা শুভেচ্ছা জানালে খুব ভালো করে এমন রিপ্লাই দেবেন যাতে প্রমাণ হয় আপনি ভীষণ হ্যাপি তারপরে তনয়াকে ব্লক করে দেবেন..

ক্রমশ
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

নোনা জল পর্ব-০৩

#নোনা_জল #তৃতীয়_পর্ব
রুম সার্ভিসের মৃদু টোকাটা দীপান্বিতার মনের ভেতরের সেই কষ্টের ঘোরটাকে এক ঝটকায় ভেঙে দিল। ও চোখের কোণের জলটা হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিল, তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রিসোর্টের সেই চেনা বয়, যার হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের থালা আর পাতলা মুরগির ঝোল।
“আসুন,” মৃদু গলায় বলল দীপান্বিতা।
ছেলেটি বেশ অমায়িক হেসে ঘরের ভেতর ঢুকল। ঘরের কোণায় রাখা কাঁচের টেবিলটার ওপর খুব গুছিয়ে থালাটা নামিয়ে রাখল সে। গরম ভাতের সুগন্ধ আর লেবুর টুকরোটার তাজা গন্ধ এক মুহূর্তের জন্য ঘরটার গুমোট ভাবটা যেন কাটিয়ে দিল। ছেলেটি খাবারগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে, জলের গ্লাসটা ঢাকা দিয়ে বিনম্রভাবে বলল, “ম্যাম, খাবার দিয়ে দিয়েছি। আর কিছু লাগবে?”
“না, ধন্যবাদ,”
ছেলেটি মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দীপান্বিতা ওর পিছন পিছন গেল দরজাটা লক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ও যেমনই দরজার পাল্লাটা ধরে টানতে যাবে, ঠিক তখনই করিডোরের বাঁদিকের মোড় ঘুরে একটা চেনা অবয়বকে এগিয়ে আসতে দেখল।জলপাই রঙের ট্রাউজার পরা প্রমিত!
প্রমিতের হাতে তখন একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট, সম্ভবত কোনো দোকান থেকে কিছু একটা কিনে ফিরছে। দীপান্বিতার দরজার সামনে আসতেই প্রমিত হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর নিজের কপালে আলতো করে একটা চাপড় মেরে বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল।
দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে ও রসিকতার সুরে বলল, “এই দেখুন! আর একবার ভুল করে এই পাশের উইং-এ চলে এসেছি! আমার এই ডান আর বামের গোলমালটা কোনোদিন মিটবে না দেখছি।”
দীপান্বিতা দরজার পাল্লাটা ধরে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। প্রমিতের এই সহজ, সাবলীল কথাবার্তা ওর ভেতরের আড়ষ্টতা যেন নিমেষে কমিয়ে দেয়।প্রমিত হাসির রেশটুকু কাটিয়ে এবার একটু ভালো করে দীপান্বিতার দিকে তাকাল। তারপরে হাতের প্যাকেটটা একটু নাড়িয়ে মৃদু হেসে বলল, “একটা কথা বলব? খাবার দাবার খেয়ে নেওয়ার পরে যদি একটু সৈকতে হাঁটতে যান… মানে রাতের সমুদ্রটা দেখতে চান, তাহলে আমার সাথে চলতেই পারেন। আমি একটু পরেই বেরোব। গৌরব তো অলরেডি বিছানায় ছিটকে গেছে, ও নাক ডেকে ঘুমোবে এখন। একা একা হাঁটার চেয়ে দুজনে হাঁটলে আমি ভাবছি বেশ ভালোই লাগবে…”
দীপান্বিতা একটু লাজুক অথচ শান্ত হেসে বলল, “আপনার প্রস্তাবটা খারাপ নয়। তবে এত রাতে বাইরের সমুদ্রতীরটা কিন্তু বড্ড নির্জন হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে অতটা দূরে যাওয়া কি ঠিক হবে? বরং রিসোর্টের লনটা সেক্ষেত্রে অনেক বেশি সেফ। ওখানে পর্যাপ্ত আলোও আছে, আর হাওয়া খেতে খেতে হাঁটার জায়গাও বেশ ছড়ানো।”
প্রমিত খুব সহজেই দীপান্বিতার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, প্রশান্ত হাসিটা লেগে রইল। ও হাতের প্যাকেটটা একটু সামলে নিয়ে বলল, “একদম ঠিক বলেছেন। লনই সই। আসলে খোলা আকাশের নিচে নোনা হাওয়া খেতে খেতে হাঁটাটাই আসল, জায়গাটা কোনো ব্যাপার নয়। আপনি বরং আর দেরি করবেন না, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। শান্তিতে ডিনারটা সেরে নিন। আমি নিচে লনেই আছি, আপনি খেয়ে আসুন।”
প্রমিত আর কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। ওর যাওয়ার পথের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে দীপান্বিতা খুব সন্তর্পণে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ঘরের ভেতরে তখন ডিনারের গরম ভাতের হালকা সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বারান্দা দিয়ে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জনটা এখন আর ততটা বিষণ্ণ লাগছে না..
প্লেটের ঢাকনাটা একপাশে সরিয়ে রেখে চামচটা হাতে তুলে নিতে গিয়েও থমকে গেল। কেন জানি না, আজ আর চামচ দিয়ে কৃত্রিমভাবে খেতে ইচ্ছে করল না ওর। ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ে ও গরম ভাত আর হালকা সোনালী রঙের মুরগির ঝোলটা এক সাথে মাখতে শুরু করল। পাশে রাখা পাতিলেবুর টুকরোটা তুলে নিয়ে বেশ ভালো করে চেপে রসটা ছড়িয়ে দিল ভাতের ওপর। লেবুর সেই তাজা, টক গন্ধটা ঝোলের সুবাসের সাথে মিশে এক নতুন সুগন্ধ তৈরি করল। কিন্তু প্রথম গ্রাসটা মুখে দিতেই দীপান্বিতার মনে হলো, খাবারটা আজ আর অন্য দিনগুলোর মতোই একদম বিস্বাদ ঠেকছে । গত সাতটা দিন ধরে প্রতিটা দানাকে বিষের মতো মনে হয় ওর, গলার কাছে এসে যেন আটকে যায় সব..
তেল মসলা হীন মুরগির ঝোল,তুলতুলে নরম চিকেন সবকিছুই যেন বিস্বাদ ঠেকতে লাগলো… দীপান্বিতা জানে এখন জোর করে মুখে গ্রাস ঢোকানোর মানে আবার বমি পাওয়া। তাই খাওয়া থামিয়ে জলের গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে এক গ্লাস ঠান্ডা জল খেয়ে উঠে পড়ল…
হাত-মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একটু ঠিক করে নিল ও। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ.. চোখের নিচে কালি.. চেহারাটার উপর দিয়ে মনে হচ্ছে যেন একটা বড় ঝড় বয়ে গেছে… দরজা লক করে ও লনের দিকে পা বাড়ালো.. ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর দিক থেকে ওকে দেখতে পেয়ে প্রমিত এগিয়ে আসলো..
রিসোর্টের সাজানো লনটা রাতে বেশ মনোরম দেখাচ্ছে। চারধারে ছড়ানো মৃদু আলো আর সমুদ্রের দিক থেকে ধেয়ে আসা নোনা বাতাস এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। দীপান্বিতা আর প্রমিত পাশাপাশি হাঁটছে, কিন্তু দুজনের কারও মুখেই কোনো কথা নেই। শুধু ঘাসের ওপর ওদের চারচটি জুতোর মৃদু খসখস শব্দ আর কয়েক হাত দূরের সমুদ্রের অবিরাম গর্জন।কখনো কখনো কোনো মানুষের সাথে চুপচাপ হেঁটে চলাটাও এক বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।
বেশ কিছুটা পথ এভাবে নিরুদ্দেশে চক্কর কাটার পর, প্রমিত হঠাৎ নিজের হাঁটার গতিটা একটু কমিয়ে দিল। তারপর পকেটে হাত রেখে দীপান্বিতার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “খাননি নিশ্চয়ই কিছু?”
দীপান্বিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও নিজের ভেতরের দুর্বলতা বা খিদে না পাওয়ার কষ্টটাকে এত সহজে এই অচেনা মানুষের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। ও চট করে মুখের ওপর একটা স্বাভাবিকতার মুখোশ টেনে এনে অস্বীকার করার সুরে বলল, “খাবো না কেন? এই তো এক্ষুনি ডিনার সেরেই নিচে নামলাম।”
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে ছেলেটি দীপান্বিতার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “খেলে সাত মিনিটের মধ্যে কেউ নিচে নেমে আসতে পারে?”
প্রমিতের এই মোক্ষম হিসেবটার সামনে দীপান্বিতা একদম থতমত খেয়ে গেল। ও যে মাত্র কয়েকটা গ্রাস মুখে তুলে, থালাটা একপাশে সরিয়ে রেখে নিচে চলে এসেছে—সেটা এই ছেলেটা এত নিখুঁতভাবে ধরে ফেলবে, ও কল্পনাও করতে পারেনি।
প্রমিতের ভাসা ভাসা চোখে তখন একরাশ গভীর সহমর্মিতা মাখানো। দীপান্বিতা আর কোনো মিথ্যে অজুহাত খুঁজে পেল না, ও শুধু একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল…
প্রমিত বলল আমার থেমে যাওয়া গল্পটার নাম তনয়া… আপনার?
-সৃজিত..
-বুঝলাম..
দীপান্বিতা আড় চোখে দেখল প্রমিতের মুখে কোনো বাড়তি কৌতূহলের ছোঁয়া নেই। ও খুব স্বাভাবিকভাবে লনের নরম ঘাসের ওপর দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। ওর দুই হাত তখন ট্রাউজারের পকেটে। ও আকাশের দিকে মুখ তুলে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, ” তা সৃজিতবাবু হঠাৎ ছন্দের পতন ঘটালেন কেন?”
দীপান্বিতা একটু থমকাল। ও প্রমিতের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিজের হালকা চাদরটা গায়ের সাথে আর একটু জড়িয়ে নিল। সমুদ্রের দিক থেকে আসা হাওয়াটা এখন আরও জোরালো হচ্ছে। ও নিচু গলায়, যেন নিজের মনেই বলল, “কোনো কারণ নেই। সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্ককে স্রেফ তিন লাইনের একটা টেক্সট মেসেজ দিয়ে ব্লক করে দেওয়া যায়, এটা বোধহয় আমার জানা ছিল না। কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অশান্তি হয়নি… জাস্ট একটা অদ্ভুত নীরবতা দিয়ে মানুষটা উধাও হয়ে গেল।”
বলতে বলতে দীপান্বিতার গলাটা একটু বুজে এলো। কিন্তু ও নিজেকে সামলে নিল। এই লনের আবছা আলোতেও ও খেয়াল করল প্রমিতের মুখের অবয়বটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে।
প্রমিত একটা ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। তারপর একটা শুকনো ডাল পায়ে ঠেলে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।তনয়া অবশ্য আমাকে ব্লক করার চেষ্টা করেনি। ও সরাসরি এসে আমার এই গিটারটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল—’প্রমিত, তোমার ওই আদর্শ আর নীতিকথা দিয়ে আর যাই হোক, একটা ফ্যামিলি চালানো যাবে না। আমি অন্য কোথাও সেটল হচ্ছি।’ ব্যস, গল্প শেষ। পরে শুনেছিলাম আমাদেরই গ্রুপের আরেক বন্ধুকে পটিয়ে তার সাথে সম্পর্কের শুরু নাকি আমি থাকতেই করে ফেলেছিল… সাড়ে চার বছর ধরে একটা সম্পর্কে নিজের মন আবেগ উজাড় করে ঢালার পর যদি বোঝেন যেখানে নিজেকে সবটুকু দিয়ে বসে আছেন সেই জায়গাটাই ভুলে ভরা তখন ভেতরের কনফিডেন্সটা কোথায় গিয়ে যেন শূন্য হয়ে যায়”
প্রমিতের শেষ কথাটা যেন এক লহমায় দীপান্বিতার বুকের ভেতরের অবরুদ্ধ কষ্টের বাঁধটা পুরোপুরি ভেঙে দিল। ‘কনফিডেন্স শূন্য হয়ে যাওয়া’—ঠিক এই অনুভূতিটাই তো গত সাত দিন ধরে প্রতিটা মুহূর্তে ও নিজের ভেতরে টের পাচ্ছে! নিজের বিচারবুদ্ধি, নিজের পছন্দ, নিজের আবেগ—সবকিছুর ওপরেই তো একটা মস্ত বড় সংশয়ের দেওয়াল খাড়া হয়ে গেছে। ও যার হাত ধরে জীবনের বাকি পথটা হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মানুষটা আদৌ কোনোদিন ওকে ভালোবেসেছিল, নাকি পুরোটাই একটা নিখুঁত অভিনয় ছিল.. নাকি ও নিতান্তই অযোগ্য একটা মানুষ যাকে কেউ ভালোবেসে দীর্ঘদিন হাত ধরে রাখতেই পারে না—এই ভাবনায় তো ও প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
দীপান্বিতা আর হাঁটতে পারল না। ও ইউক্যালিপটাস গাছের মায়াবী আলো-আঁধারিতে ওভাবেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। নোনা হাওয়া ওর গায়ের হালকা চাদরটাকে প্রবল শক্তিতে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ওর সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। ও প্রমিতের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “একদম ঠিক বলেছেন… নিজের ওপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে যায়। মনে হয়, আমি বোধহয় কোনোদিন এই মানুষের যোগ্যই ছিলাম না। সাড়ে তিন বছর কম সময় নয় প্রমিত… একটা মানুষের অভ্যাস, তার কথা বলার ধরন, তার রাগ-ভালোবাসা সবটা আপনার মুখস্থ হয়ে যায়। তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ আবিষ্কার করবেন, যাকে আপনি নিজের চেয়েও বেশি জানতেন বলে ভাবতেন, তাকে আসলে আপনি মোটেই চেনেন নি।”
প্রমিত দীপান্বিতার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ওর ভাসা ভাসা বড় চোখ দুটোতে তখন গভীর এক সমবেদনা। ও পকেট থেকে হাত দুটো বের করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “জানি। এই ধাক্কাটা সহ্য করা সত্যিই কঠিন। চারপাশের মানুষগুলো তখন খুব সহজে এসে জ্ঞান দিয়ে যায়—‘ধুর, একটা মেয়ের জন্য বা একটা ছেলের জন্য জীবন আটকে থাকে নাকি? মুভ অন করো!’ কিন্তু তারা তো জানে না, মুভ অন করাটা কোনো সুইচ টেপার মতো সহজ কাজ নয়। সাড়ে চার বছর আমি তনয়ার প্রতিটা ভালো লাগা, খারাপ লাগাকে নিজের করে নিয়েছিলাম। ওর একটা সামান্য মন খারাপ আমার গোটা দিনটাকে ওলটপালট করে দিত। অথচ তার কাছে আমার এই আবেগটার কোনো মূল্যই ছিল না… ও স্রেফ একটা সাজানো কেরিয়ার আর অনেক টাকার কাছে আমার ভালোবাসাকে বিক্রি করে দিল।”
প্রমিত একটু থামল। সমুদ্রের একটা জোরালো ঢেউয়ের গর্জন লনের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। প্রমিত আবার আলতো হেসে বলল, “তবে জানেন তো, এই যে গৌরব আমার ‘পার্মানেন্ট ড্রাইভার উইদাউট স্যালারি’ বলে খ্যাপায়, ও কিন্তু ভুল বলে না। ও জানে, আমি যদি কলকাতায় চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধ থাকতাম, তবে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। এই মন্দারমনির সমুদ্র, এই নোনা হাওয়া আর আমার হাতের গিটারটা… এরা আমাকে আস্তে আস্তে বেঁচে থাকতে শেখাচ্ছে। সমুদ্রের এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে যখন নিজের কষ্টটাকে মেলাবেন, তখন দেখবেন আপনার সাড়ে বুকের হাহাকারটা কেমন যেন একটু ছোট হয়ে আসছে..
দীপান্বিতা প্রমিতের কথার কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু ও অনুভব করল, ওর চোখের কোণ ঘেঁষে আবার একটা নোনা জলের ধারা নেমে আসছে। তবে এবারের কান্নাটায় কোনো তীব্র যন্ত্রণা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত হালকা হওয়ার অনুভূতি। এই বিশাল পৃথিবীতে ও যে একা নয়, ওর মতোই আরেকটা ভেঙে যাওয়া মন ও যে এই বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে—এই ভাবনাটুকুই যেন ওকে এক লহমায় অনেক বড় একটা আশ্রয় দিল..
একটু ইতস্তত করে দীপান্বিতা বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব প্রমিত? কিছু মনে করবেন না… কিন্তু আপনার তনয়া তো আপনার সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করল। সাড়ে চার বছর একসাথে থাকার পর আপনাকে না জানিয়ে অন্য একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াল, আপনার আবেগটাকে স্রেফ টাকার কাছে বিক্রি করে দিল… তারপরেও সেই মানুষটার জন্য আপনি এতদিন ধরে মনের মধ্যে এত কষ্ট পুষে রেখেছেন কেন?”
প্রমিত করিডোরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটু ম্লান হাসল। ওর ভাসা ভাসা চোখে এক লহমায় যেন এক সমুদ্র ক্লান্তি নেমে এলো। ও শান্ত গলায় বলল, “অনেক ভেবেছি জানেন, তারপরে মনে হয়েছে কষ্টটা আসলে হয়তো তনয়ার জন্য নয় দীপান্বিতা, কষ্টটা আমার নিজের জন্য। ও হয়তো সেভাবে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেইনি, পুরোটাই ওর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমার দিক থেকে আমার ভালোবাসার তো কোনো খামতি ছিল না। আমি তো ওকে আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। সেই খাঁটি অনুভূতিটাকে, সেই সাড়ে চার বছরের নিজেকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।”দীপান্বিতা প্রমিতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে খুব পরিণত এক অদ্ভুত দার্শনিকতার সুরে বলল, “একবার অন্যভাবে ভেবে দেখুন তো প্রমিত… প্রেমের যে স্মৃতিগুলো আজ আপনাকে এত কষ্ট দিচ্ছে, সেই স্মৃতিগুলোর নাটকে আপনি আসলে দুটো চরিত্রের মধ্যে একটা চরিত্র হয়ে অভিনয় করে গেছেন মাত্র। আপনি শুধু নিজের দৃশ্যটাকে সত্যি ভেবে, নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে অভিনয়টা করেছেন। কিন্তু ওপাশে থাকা অন্য চরিত্রটা… সে তো খুব ভালো করেই জানত যে এই দৃশ্যগুলো কতটা মেকি, কতটা সাজানো! সে স্রেফ একটা স্ক্রিপ্ট মেনে পার্ট প্লে করে গেছে। একটা মানুষ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার অভিনয় করছে, আর আপনি সেটাকে পরম সত্যি জেনে নিজের মন উজাড় করে দিচ্ছেন—এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? একবার ভেবে দেখেছেন, যে স্মৃতিগুলোকে আগলে আপনি কাঁদছেন, তার অন্য পিঠটা কতটা ফাঁপা ছিল?”
লনের আলোয় দীপান্বিতা দেখতে পেল প্রমিতের চোখের কোন চিক চিক করে উঠছে..
“আসলে কি বলুন তো ম্যাডাম.. শেষ ছ মাস ও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ঠিকই কিন্তু তার আগের সময়টুকু তো আমার কাছে ও আমার হয়েই ছিল.. ওই সময়ের কথাগুলো আমি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না..
দীপান্বিতা মৃদু হাসলো.. তারপর বলল.. “একটা মেয়ে যদি সত্যি কাউকে মন থেকে ভালোবাসে তাহলে সে ওই সম্পর্কে থাকাকালীন অন্য কোন দিকে তাকাতেই পারে না.. একটি মেয়ে সম্পর্কে থাকাকালীন দ্বিতীয় জনের দিকে তাকাতে পারছে, তার সম্পদ.. ক্যারিয়ার তাকে আকর্ষণ করছে যখন তখন তার মানে আপনার থেকে তার মন অনেক আগেই উঠে গেছে। সে এস্কেপের একটা রুট খুজছিল শুধু, সেই রাস্তাটা এবার সে দেখতে পেয়ে গেছে। ভাববেন না ওই বন্ধুটিই তার প্রার্থিত পুরুষ…. ওই বন্ধুর জায়গায় অন্য কোন ছেলে যদি তার লোভনীয় অর্থ বা ক্যারিয়ার নিয়ে সামনে আসতো তাহলে সে হয়তো তাকেও গ্রহণ করত। কারণ তার তখন মূল উদ্দেশ্য আপনার সাথে সম্পর্ক শেষ করে বেটার লাইফস্টাইল দিতে পারে এমন কাউকে পছন্দ করা মাত্র..
-“তার মানে আমি অযোগ্য এটাই আসল কথা তাই না?”
-না প্রমিত.. আপনাকে আপনার মত করে গ্রহণ করার যোগ্যতা তনয়ার ছিল না.. ভালোবাসা শুধুমাত্র সুখের সাগর হতে পারে না বলেই আমি বিশ্বাস করি… ভালোবাসা একটা জার্নি…একটা মানুষকে তার দোষগুণ খামতি সমেত জানার পরেও তার হাতটাই শক্ত করে ধরে রাখার নাম ভালোবাসা। সেই কঠিন পথ অতিক্রম করার যোগ্যতা সকলের থাকে?…

ক্রমশ
✍️#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

নোনা জল পর্ব-০২

#নোনা_জল #দ্বিতীয়_পর্ব
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দীপান্বিতার বিরক্তিটা এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে রূপ নিল। উস্কোখুস্কো চুল, গালে কয়েকদিনের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর বিভ্রান্তি। ছেলেটার পরনে একটা ঢিলেঢালা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা.. আর তার সাথে একটা জলপাই রঙের ট্রাউজার..দীপান্বিতা কিছু বলার আগেই ছেলেটি নিজেই দু-পা পিছিয়ে গিয়ে দরজার ওপরের রুম নম্বরটার দিকে তাকাল। তারপর কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, “ওহ গড! আই অ্যাম সো সরি… আসলে আমি ৪১২ নম্বর রুমটা খুঁজছিলাম। ভুল করে ৪২২-এর বেল বাজিয়ে ফেলেছি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি ফর দ্য ডিস্টার্বেন্স।”
“শুনুন…” দীপান্বিতার গলা দিয়ে শব্দটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো।
যুবকটি থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন একরাশ অস্বস্তি..
দীপান্বিতা একটু ইতস্তত করে বলল, “৪১২ নম্বর রুমটা এই করিডোরের একদম শেষ মাথায়, বাঁদিকের কোণায়। আপনি ভুল করে ডানদিকের উইং-এ চলে এসেছেন।”
ছেলেটি হালকা একটু হাসার চেষ্টা করল.. তারপর করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল শেষ মাথার দিকে। দীপান্বিতা দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেষেএকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা বন্ধ করে দিল…
সন্ধ্যা নেমে এল মন্দারমনিতে। সমুদ্রের গর্জন এখন আরও জোরালো, আরও গম্ভীর। রিসোর্টের আলো শোপিসগুলোর গায়ে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। দীপান্বিতা ঘরে আর টিকতে পারল না। একটা হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে ও নিচে নেমে এল..ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুকে শুধু সাদা ফেনার মতো ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে সৈকতে। ও বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রিসোর্ট থেকে কিছুটা দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে বসল। নোনা বাতাস ওর চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই কয়েক হাত দূরে ও কাউকে বসে থাকতে দেখল.. শুধু দেখল না.. কিছু শুনতেও পেল..
সমুদ্রের গর্জনের মাঝখান থেকেও একটা চেনা সুর আর গিটারের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছিল। দীপান্বিতা একটু ভালো করে তাকাতেই দেখল, বালির ওপর একটা বিয়ারের বোতল নামানো রয়েছে। আর তার পাশেই বসে আছে বিকেলে ভুল করে ওর ঘরের বেল বাজানো সেই জলপাই রঙের ট্রাউজার পরা ছেলেটি। তার হাতে একটা অ্যাকোস্টিক গিটার। উস্কোখুস্কো চুলে সমুদ্রের হাওয়া লেগে কপালে এসে পড়ছে, আর সে একমনে, যেন এই পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে একটা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে চলেছে।বিচ্ছেদের সেই সুরটা নোনা বাতাসের ডানায় ভর করে দীপান্বিতার কানে এসে পৌঁছাল—
আমার নিশীথরাতের বাদলধারা,
এসো হে গোপনে,
আমার স্বপনলোকে দিশাহারা।
ওগো অন্ধকারের অন্তরধন
দাও ঢেকে মোর পরানমন,
আমি চাই নে তপন, চাই নে তারা॥

ছেলেটির ভারী, একটু খসখসে গলায় গানটা যেন বেশ মানিয়ে গেছে..দীপান্বিতা লক্ষ্য করল, গিটার হাতে ছেলেটির ঠিক পাশেই বসে আছে আরেকটি ছেলে। সে চুপচাপ হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে গানটা শুনছে। মাঝে মাঝে বিয়ারের বোতলটা তুলে চুমুক দিচ্ছে, কিন্তু তার মুখে কোন কথা নেই..হঠাৎ করেই ছেলেটা গিটার পাশে সরিয়ে রেখে বিয়ারের বোতলটা হাতে তুলে নিল। তারপর একঝলক তাকিয়ে অন্ধকারেই কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দীপান্বিতাকে দেখতে পেল। সমুদ্রের আবছা আলো-আঁধারিতে ও প্রথমে চিনতে পারেনি, তারপর একটু সোজা হয়ে বসে বলল, “আরে! আপনি… ৪২২ নম্বর রুমে উঠেছেন না? তারপর বিয়ারের বোতলটা সরিয়ে রেখে পাশে বসে থাকা ছেলেটিকে বলল গৌরব জানিস, ওনার রুমেই আমি ভুল করে বেল বাজিয়ে ফেলেছিলাম..”
সমুদ্রের আবছা আলোতেও বোঝা গেল গৌরবের চোখেমুখে এক চিলতে ভদ্রতার হাসি। সে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে একটা সৌজন্য প্রকাশ করল..সমুদ্রের জোরালো নোনা হাওয়া দীপান্বিতার গায়ের হালকা চাদরটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। ও আলতো হাতে চাদরের কোণটা সামলে নিল.. গৌরব নামের ছেলেটি বলল “মন্দারমনিতে আসলে আমরা এই রিসর্টেই উঠি.. বেশ নিরিবিলিতে দু-একটা দিন কাটিয়ে আবার শহরে ফিরে যাই.. আর তাছাড়া রিসর্টটা এমনিতেও বেশ পকেট ফ্রেন্ডলি..”
-সে তো বুঝলাম.. কিন্তু এতবার আসার পরেও তো আপনার বন্ধু ডান বাম গুলিয়ে ফেলেন..
-ছেলেটি বেশ শব্দ করে হাসলো, তারপর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল হৃদয়ে চোট পেয়েছে বুঝলেন না! এখনো তার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি.. আর ওর ধাক্কা সামলানোর সঙ্গী হতে গিয়ে আমারও গত দু বছরে বেশ কয়েকবার মন্দারমনি আসা হয়ে গেল..
গৌরবের মুখে ‘গত দু বছর’ শব্দটা শুনে দীপান্বিতা একটু অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে তাকাল। ও ভেবেছিল ঘটনাটা হয়তো একেবারেই টাটকা, যেমনটা ওর নিজের সাথে ঘটেছে মাত্র সাত দিন আগে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এই ক্ষতটা দু বছরের পুরনো, অথচ আজও তা কেমন জীবন্ত, তার মানে সময়ের প্রলেপও সব সময় স্মৃতিকে ফিকে করতে পারে না।
নিজের গিটারটার ওপর আলতো চাটি মেরে ছেলেটি গৌরবকে বলল, “নেহ্‌, অনেক হয়েছে, এবার তোর ইয়ার্কিটা বন্ধ কর তো! ভদ্রমহিলা কী ভাবছেন বল তো?”
-না আমি বিশেষ কিছুই ভাবছি না.. বরং আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালই লাগলো, এই ব্যস্ত জগতে দুবছর আগে হওয়া ব্রেকআপের স্মৃতি কোন পুরুষ মানুষকে আজও এতটা ঘিরে আছে দেখে কোথাও যেন একটু স্বস্তি পেলাম..
গৌরব আবার হেসে ফেলল.. “আপনি আর প্রমিত দুজনেই বেশ গভীরে গিয়ে ভাবেন দেখছি.. আমার এত গভীরতা নেই.. বেশি ডিপে চিন্তা করতে গেলে আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় নয়তো খুব খিদে পায়.. তাই ঐসবের মধ্যে আমি আর ঢুকিনা..
গৌরব এবার একটু সোজা হয়ে বসে দীপান্বিতাকে বলল, “আসলে প্রমিতের একটা স্বভাব আছে। ও যখনই খুব বেশি আপসেট হয়ে পড়ে, ও কাউকেই কিছু বলে না। স্রেফ গিটারটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে চায়.. সেই লক্ষণ দেখা গেলে আমি আর ওকে একা ছাড়তে পারিনা..ওর পার্মানেন্ট ড্রাইভার—উইদাউট স্যালারি! হয়ে কলকাতা থেকে গাড়ি ছুটিয়ে সোজা মন্দারমনি।”
দীপান্বিতার মোবাইলে তখন মালতি দির ফোন ঢুকছে.. ওদের থেকে সরে এসে ফোনটা রিসিভ করতে করতেই দেখল দুই বন্ধু ওকে হাত নেড়ে সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে… দীপান্বিতা কিছুক্ষণ এলোমেলো লনে ঘোরার পর ব্যালকনিতে এসে বসলো।
রিসোর্টের এই চারতলার ব্যালকনি থেকে রাতের সমুদ্রটাকে এক বিশাল কালো ক্যানভাসের মতো লাগছে। নিচে বাগানের আলোগুলো বাতাসে দুলছে। ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিতেই নোনা বাতাস আবার ওর চুলে বিলি কেটে গেল। নিচে সৈকতে প্রমিত আর গৌরব হয়তো এতক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। প্রমিতের সেই খসখসে গলার গানটা এখনো দীপান্বিতার মগজে গুনগুন করছে—”আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা.”
রাতের সমুদ্রের একটানা গর্জন আর নোনা বাতাসের শোঁ-শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দীপান্বিতা ইজি চেয়ারটায় এসে বসল। রুম সার্ভিসকে ও আগেই এক পট লিকার চায়ের কথা বলে রেখেছিল। একটু আগেই দিয়ে গেছে।অন্ধকারের মধ্যেই ও কাপে আলতো করে চুমুক দিল।
চড়া রোদের মন্দারমনি আর রাতের মন্দারমনির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এখন নিচে তাকালে শুধু সীমাহীন কালো অন্ধকার আর ঢেউয়ের সাদা ফেনাগুলো চিলতে আলোর মতো আবছা দেখা যায়।চায়ের কাপটা পাশে কাঠের টেবিলটায় নামিয়ে রাখল ও। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। পেটে দুপুরের সেই জোর করে খাওয়া দু-এক গ্রাস ভাত ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। এতক্ষণে শরীরটা যেন নিজের অধিকার বুঝে নিতে চাইছে—অল্প অল্প খিদে পাচ্ছে ওর। মনের অসাড়তা কাটিয়ে শরীরটা যেন এই নোনা বাতাসের স্পর্শে আবার একটু বেঁচে উঠতে চাইছে।
দীপান্বিতা চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভেতর এলো। বেডসাইড টেবিল থেকে ইন্টারকমের রিসিভারটা তুলে ও ডাইনিং হলের নম্বরটা প্রেস করল। ওপাশে রিং হতেই এক যুবক কর্মীর বিনীত গলা ভেসে এলো, “ইয়েস ম্যাম..,
দীপান্বিতা ব্যালকনির অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ। আচ্ছা, ডিনারে হালকা কী পাওয়া যাবে?”
-ম্যাডাম, রুটি পাবেন। সাথে চিকেন কষা, এগ কারি বা মিক্সড ভেজ হতে পারে। আর যদি হালকা চান, তবে গরম ভাত আর পাতলা মুরগির ঝোলও করে দেওয়া যাবে।”
পাতলা মুরগির ঝোল আর গরম ভাতের কথা শুনে দীপান্বিতার হঠাৎ কলকাতার নিজের ফ্ল্যাটের কথা মনে পড়ে গেল। এমন ক্লান্তির রাতে মালতি দি ঠিক এই খাবারটাই রেঁধে ওর সামনে দিত। ও আর দ্বিধা করল না। বলল, “ঠিক আছে, আপনি গরম ভাত, সাথে একদম হালকা করে করা মুরগির ঝোল আর একটু লেবু পাঠিয়ে দিন। তেল-মসলা যেন একদম কম থাকে।”
“আচ্ছা ম্যাম, নটার মধ্যে আপনার রুমে পৌঁছে যাবে।”
“ধন্যবাদ,” বলে দীপান্বিতা রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসতে চাইছে সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়ায়… মোবাইলে কিশোর কুমার চালিয়ে বারান্দার আলো অফ করে দিল দীপান্বিতা…চোখ দুটো আলতো করে বুজে ফেলল। ডিনারটা আসার আগে এই আধো-ঘুম, আধো-জাগরণের ক্ষণটুকু যেন ওর ক্ষতবিক্ষত মনের জন্য এক পরম শান্তি… মোবাইলে বেজে চলেছে
“ও শাম কুছ আজীব থি, ইয়ে শাম ভি আজীব হ্যায়..”
গানের প্রথম দুটো লাইন স্পিকারে বাজতেই দীপান্বিতার বুকের ভেতরটা আচমকা কেমন যেন মুচড়ে উঠল.. আর ও নিজের কান্নাটাকে আটকে রাখতে পারল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওর চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল নিঃশব্দে গাল বেয়ে নেমে আসতে লাগল..
এই বিশাল পৃথিবীর একটা একচিলতে বারান্দায়, সম্পূর্ণ একলা একটা মেয়ে সমুদ্রের হাওয়া আর কিশোর কুমারের গানের সুরের সামনে নিজের সমস্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। চোখ দুটো বুজে ও শুধু টের পেতে লাগল, কান্নার নোনা জল আর সমুদ্রের নোনা বাতাস—দুটো মিলে ওর চারপাশটাকে এক অতলান্ত বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই রুমের সদর দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল..
দীপান্বিতা ঘোর কাটিয়ে চোখ মেলল। একটা তীব্র কষ্টের কবল থেকে নিজেকে জোর করে টেনে বের করে ঘড়ির দিকে তাকাতেই বুঝলো নটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেজে গেছে..আর রুম সার্ভিস হয়তো ওর ডিনারের থালা নিয়ে এতক্ষণে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ও হাত দিয়ে গালের জলটা মুছে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দরজাটা খোলার জন্য.. দরজা খুলতে যেতে যেতে ই দীপান্বিতা এই প্রথমবার অনুভব করল একা একা নিজের কষ্টে বেশ কিছুক্ষণ মন খুলে কাঁদলে ভিতরটা বেশ হালকা লাগে..

#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

নোনা জল পর্ব-০১

#নোনা_জল #প্রথম_পর্ব
আজ ৭ দিন হয়ে গেল সৃজিতের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই… সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটা এইভাবে হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে দীপান্বিতা সত্যি কোনদিন ভাবতে পারেনি… ঘটনাটা যখন ঘটছে তখনও কি ছাই অনুভব করতে পেরেছিল কিছু?
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার.. সেদিন অফিসে কাজের চাপ খুব বেশি ছিল।.. তাই মোবাইলের দিকে প্রায় ঘন্টা দেড়েক তাকাতেই পারেনি। ঋষি হঠাৎ জোর করছিল একটু কফি ব্রেকে যাওয়ার জন্য.. ঈশিতারও বেশ ইচ্ছে ছিল.. ওদের কথা শুনে দীপান্বিতার মনে পড়েছিল সকাল থেকে দু কাপ চা ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি.. মালতি দি সেদিন বারবার বলা সত্ত্বেও দুগাল ভাত খাওয়ার মত সময়ও ওর হাতে ছিল না। এতক্ষণে খিদেটাও বেশ চাগাড় দিচ্ছে.. ভেবেছিল কফি আর হালকা কিছু স্ন্যাকস খাওয়াটা এখন সত্যিই খুব দরকার তা না হলে এবার ওর মাথা ধরে যাবে।তাই তিনজনে মিলে একটু ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিল.. লিফ্টে উঠে ট্রাউজারের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে প্রায় ৪৫ মিনিট আগে করা সৃজিতের একটা মেসেজ পড়ে আছে.. একেবারেই ক্যাজুয়ালি মেসেজটা ওপেন করার পরেই ওর সামনে গোটা ব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠেছিল..
মাত্র তিনটি বাক্য লেখা.. “সরি দীপ,সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হলো না.. আমার সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করো না .. নিজের মতো করে ভালো থেকো”
ঋষি আর ঈশিতা কি একটা সিনেমা নিয়ে তখন অনর্গল বকবক করছে.. ওদের একটা কথাও দীপান্বিতার মগজে তখন ঢুকছে না.. সেদিন ক্যান্টিনে না গিয়ে কি একটা আজগুবি অজুহাত দিয়ে দীপান্বিতা ফোনটা নিয়ে আবার ফিরে এসেছিল ওর কাজের জায়গায়.. তার আগে সৃজিতকে ওর ৪-৫ বার কল করা তখন হয়ে গেছে… শুধু রিং হয়ে গেছে সে ফোন রিসিভ করার প্রয়োজনই অনুভব করেনি
দীপান্বিতা বুঝেছিল ওর মাথা ঘুরছে.. কোন কিছু সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছে না.. ঈশিতা ফিরে এসে বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ওর হয়েছে.. বারবার জিজ্ঞেস করছিল “তুই ঠিক আছিস তো? কি হয়েছে? তোর চোখমুখ এরকম লাগছে কেন”
দীপান্বিতা সেদিনও ঈশিতাকে কিছু বলতে পারেনি.. আজও পারেনা.. কি বলবে.. সাড়ে তিন বছর একটা মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার পর কোন কারণ না বলেই মানুষটা ওকে ছেড়ে চলে গেছে? সবাই তো কারণ জানতে চাইবে.. আর দীপান্বিতার জানা এমন কোন কারণ আজও ওর মাথায় আসে না যার জন্য ওদের সম্পর্কটা এইভাবে শেষ করে দেওয়া যেতে পারে।
গত সাতদিন ধরে ও সৃজিতের মোবাইলে অজস্রবার ফোন করেছে.. রবিবার অবধি মেসেজগুলো যাচ্ছিল..কলটাও ঢুকছিল.. রবিবার রাতের দিকে দেখেছিল ওকে ব্লক করে দিয়েছে.. তারপরেও হ্যাংলার মত মালতীদির ফোন থেকে দুই বার ফোন করেছিল.. দ্বিতীয়বারে ফোনটা রিসিভও করেছিল.. কিন্তু দীপান্বিতার গলার শোনামাত্র কেটে দিয়েছে।
ওই ফোনটা কেটে দেওয়ার পরে মেয়েটা বুঝতে পেরেছিল সৃজিত সত্যিই আর কোনভাবে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে না.. ঘড়ির কাঁটা বলছিল রাত তখন দশটা পনেরো.. মালতি দি ড্রয়িংরুমে বসে সিরিয়াল দেখছিল… স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করেই দীপান্বিতা সেই প্রথম হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল… মালতি দি সিরিয়াল ফেলে অবাক চোখে ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল “কি হয়েছে তোমার? হঠাৎ করে কোনো খারাপ খবর পেলে নাকি?
কেউ মারা গেছে বুঝি?”
মালতিদির কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দীপান্বিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল.. তারপরে সেই শূণ্য ঘরে পাগলের মত সারারাত যতক্ষণ জেগে ছিল কেঁদে গেছে… এখনো মনে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন ও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল নিজেও জানে না… অদ্ভুতভাবে মালতি দি কিন্তু সেই রাতে এক বার ও দরজায় নক করেনি.. ওরা সাড়ে দশটায় প্রতি রাতে ডিনার করে.. সেই ডিনারের জন্যেও মালতি দি ওকে একবারও ডাকতে আসিনি। পরের দিন সকালে উঠে দেখেছিল আটা মেখে টিফিন বক্স করে ফ্রিজে তুলে দেওয়া হয়েছিল… বুঝেছিল পরিস্থিতি নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছে বছর চল্লিশের ওই মহিলা।
পরের তিন-চারটে দিন দীপান্বিতা প্রাণপণে যুদ্ধ করে গেছে নিজের সাথে স্বাভাবিক জীবনটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য.. সোমবার সকালে উঠে স্নান সেরে অল্প কিছু মুখে দিয়ে অফিসে গেছে ..কাজকর্মে মন লাগানোর চেষ্টা করেছে, সহকর্মীদের সঙ্গে ইচ্ছে না করলেও কথা বলেছে.. কিন্তু দিনের শেষে আশেপাশের সবাই বুঝতে পেরেছে ও নিজের মধ্যে নেই.. ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কারণ জানারও চেষ্টা করেছিল.. কিন্তু দীপান্বিতার এ ব্যাপারটা নিয়ে কারোর সঙ্গে কথাই বলতে ইচ্ছে করে নি.. শেষে কাজকর্মে কোন ক্রিয়েটিভ চিন্তাভাবনা মাথা থেকে আর বের করতে পারছে না দেখে সুদেষ্ণাদি বলেছিল “কদিন ধরেই লক্ষ্য করছি তোকে একদম অন্যরকম লাগছে। আই থিঙ্ক ইউ নিড এ ব্রেক..”ঋষি ও সায় দিয়েছিল কথাটায়.. অফিস থেকে দিন তিনেকের ছুটি ও অ্যাপ্রুভ হয়ে গেল.. কিন্তু বাড়ি যেতে একদম ইচ্ছে করছিল না কারণ ওর চোখমুখের যে অবস্থা হয়ে আছে বাবা মা দাদা বৌদি প্রশ্ন প্রশ্নে ওকে জেরবার করে দেবে.. তাই মালতি দিকে দিন তিনেকের ছুটি দিয়ে পরের দিন ভোরবেলায় বেরিয়ে একাই এসে পৌঁছেছে মন্দারমনিতে..
আপাতত উঠেছে সমুদ্রের ধারের একটা নির্জন রিসর্টে.. সপ্তাহের মাঝখানে টুরিস্টদের ভিড় একটু কম.. এই রিসোর্ট টাও একদম নতুন হয়েছে, তাই ও ছাড়া আর গোটা তিনেক ফ্যামিলি আছে বলেই মনে হয়.. দীপান্বিতার এই সময় কোন লোকজন একদম ভালো লাগছিল না.. বরং নিজেকে নিয়ে বড় বেশি চিন্তা করছিল..কেবলই মনে হচ্ছিল ওর ভেতরের গোলমাল টা ঠিক কোথায় আছে… কারণ ওর ভেতরে তেমন কোন গোলমাল আছে বলেই সৃজিত নিশ্চই সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটা চুকিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে..
দুপুরের চড়া রোদ তখন মন্দারমনির বালিয়াড়ি আর সমুদ্রের নোনা বাতাসে এক অদ্ভুত অলসতা ছড়িয়ে দিয়েছে। দীপান্বিতার ডাইনিং হলের কৃত্রিম আড়ম্বরটুকু সহ্য করার মতো ইচ্ছে হলো না।রিসোর্টের ইন্টারকমে ফোন করে ও ঘরেই খাবার আনিয়ে নিল।
রুমে খাবার দিয়ে যাওয়ার পর ও থালাটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, ডাল আর হালকা মাছের ঝোল—সবটাই বড্ড অচেনা লাগল। জোর করে মুখে দু-এক গ্রাস তুলতেই গলার কাছে কেমন যেন দলা পাকিয়ে এল। অগত্যা চামচটা নামিয়ে রেখে ও জলের গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে দিল। খিদে আসলে পেটের নয়, মনের অনুভূতির সাথে জড়িয়ে থাকে; মন যখন অসাড়, তখন শরীরও যেন কোনো জ্বালানি নিতে অস্বীকার করে।
সময় কাটানোর একটা মরিয়া চেষ্টায় ও রিমোট তুলে টিভিটা চালাল। রিমোটের বোতাম চেপে একের পর এক চ্যানেল পাল্টে যেতে লাগল—কোথাও চড়া সুরের গান, কোথাও কোনো হাসির সিরিয়াল, কোথাও আবার হাই ভোল্টেজ খবরের তরজা। কিন্তু কোনো একটা শব্দও ওর কানের পর্দা পেরিয়ে মগজে পৌঁছাল না। স্ক্রিনের রঙিন আলোটা ওর চোখের মণি ছুঁয়ে চলে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারটাকে বিন্দুমাত্র আলোড়িত করতে পারল না। বিরক্তি আর ক্লান্তিতে টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে ও উঠে দাঁড়াল।
কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা সরিয়ে ও ব্যালকনিতে এসে বসল কাঠের ইজি চেয়ারটায়।
বিকেলের দিকে হেলে পড়া সূর্যটার দিকে তাকিয়ে ও টের পেল, একাকীত্ব আসলে কোনো নিস্তব্ধতা নয়, একাকীত্ব হলো নিজের ভেতরে হাজারটা প্রশ্নের এক তুমুল শোরগোল, যার কোনো উত্তর নেই। সমুদ্রের ঢেউগুলো একের পর এক বালিতে আছড়ে পড়ছে, আর ফেনিয়ে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। দীপান্বিতার মনে হলো, ওর সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটাও ঠিক এই ঢেউগুলোর মতোই—কতটা আড়ম্বর নিয়ে এসেছিল, আর যাওয়ার সময় শুধু একটু নোনা জল আর এক বুক শূন্যতা রেখে গেল।
চেয়ারের হাতলে হাত দুটো রেখে ও চোখ বুজল। বাতাসে ওর চুলে এসে লাগছে সমুদ্রের নোনা গন্ধ। এই বিশাল পৃথিবীর একটা একচিলতে বারান্দায় ও বসে আছে সম্পূর্ণ একা। আগে একাকীত্ব মানে ও বুঝত ঘরে কেউ না থাকা, কিন্তু এখন ও জানে—চারপাশে এত মানুষ থাকার পরেও একান্ত নিজের একটা মানুষ না থাকাই হলো আসল একাকীত্ব। নিজের ভেতরের এই শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও যেন নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
বিকেলের নরম আলোয় সমুদ্রের জল তখন রূপোলি থেকে আস্তে আস্তে তামাটে রঙ ধারণ করছে। ব্যালকনি থেকে দৃষ্টিটা একটু দূরে প্রসারিত করতেই দীপান্বিতার চোখে পড়ল সমুদ্রের ঠিক ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে এক নববিবাহিত দম্পতি। মেয়েটির পরনে লালচে রঙের শাড়ি, বাতাসে উড়ছে তার আঁচল, আর ছেলেটি পরম ভরসায় তার হাতটা ধরে আছে। ঢেউয়ের জল যখন ওদের পা ছুঁয়ে যাচ্ছে, দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠছে। সেই হাসির শব্দ এই দূর বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছাল না ঠিকই, কিন্তু ওদের শরীরের স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল ওরা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী।দৃশ্যটা দেখামাত্রই দীপান্বিতার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল। এক লহমায় ওর চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল নোনা জল। সাড়ে তিনটে বছর… কম দিন তো নয়! ও আর সৃজিতও কি এমন স্বপ্ন দেখেনি? তবে আজ কেন ও এই বারান্দায় একলা কয়েদি, আর সৃজিত নিজের মতো করে মুক্ত? চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে নেমে এল. তখনই হঠাৎ রুমের বেলটা বেজে উঠল.. পরপর তিনবার.. যেন কেউ খুব ব্যস্ত হয়ে বেল দিচ্ছে… বিরক্ত লাগলো দীপান্বিতার
জোর করে নিজেকে বারান্দা থেকে বের করে দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকালো আগন্তুকের দিকে..
ক্রমশ
✍️#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা

হৈমন্তী পর্ব-০২ এবং শেষ পর্ব

‎#হৈমন্তী
‎#লেখা: আফরা আরনাজ
‎#পর্ব: ০২( অন্তিম পর্ব)

‎প্রিয়মের যাওয়ার পরেও হৈমন্তী মেঝেতে ঠাই বসে রইলো।ঘরের মধ্যে থাকা হলদে আলোয় হৈমন্তী আশেপাশে চোখ বুলালো। প্রিয়মদের বাড়িটা পুরনো আমলের। বাড়িটা দেখতে কিছুটা পুরনো জমিদারদের বাড়ির মতো কিন্তু এক তলা বিশিষ্ট। বাড়ির ভেতরের নকশাগুলো খুব মনোরোম।যে কারোরই এক দেখায় বাড়িটি ভালো লাগবে।

‎কিন্তু এ মুহূর্তে বাড়ির আকর্ষণ হৈমন্তী কে টানলো না।মেঝেতে ছুরে মারায় ওর খোপা খুলে গেছে। একদম বিধ্বস্ত অবস্থা। হৈমন্তী মেঝে থেকে ওঠে দাড়ালো। কেটে যাওয়া হাতটির দিকে তাকালো, রক্ত শুকিয়ে গেছে।ও আলগোছে চুলগুলো খোপা করলো।তারপর গুটিগুটি পায়ে জানালার পাশের টেবিলের কাছে গেলো।একটা খাতা আর কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসলো।হাত টা কেটে যাওয়ায় কলম ধরতে কষ্ট হলেও হৈমন্তী লেখা শুরু করলো ,

‎আমার প্রিয়ম,
‎তোমাকে এখন আমার বলে দাবি করতেও ঘেন্না হচ্ছে। প্রিয়ম তুমি তো এমন ছিলে না। কেমন করে এমন হলে!আমাদের প্রেমের দু বছর আর বিয়ের পাঁচ বছর, এ সাত বছরে ও আমি তোমায় চিনতে পারলাম না।তোমার অভিনয়গুলো বুঝতে পারলাম না।অভিনয়ে তুমি যে এতো পাকা তা আমি জানতাম না।শুনেছি তুমি নাকি আগে থেকেই এমন ছিলে।আমি যখন প্রথম এ বাড়ি বউ হয়ে এলাম তখন শুনেছিলাম তুমি নাকি তোমার খুড়তুতো বোনের সাথে বাজে কিছু করতে চেয়েছিলে কিন্তু পারো নি।
‎জানো?,,,তখন একথা আমি অতো গুরুত্ব দিই নি। কারন আমি ভেবেছিলাম হয়তো এগুলো সব মিথ্যে কথা বা তুমি হয়তো আগে এমন ছিলে।আমি তো আর স্বচক্ষে কিছু দেখলাম না।কারন তখন তুমি আমার চোখে সুপুরুষ ছিলে। জানো?,,,,আমার মা আমায় বলতেন,আমি নাকি অনেক বোকা।আজ সেটা হারে হারে টের পাচ্ছি।হয়তো তুমি আমায় বিয়ে করেছিলে এইজন্য যে আমি বড্ড বোকা, আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে খুব সহজেই।সে যাক গে,এতো কিছুর পর আমার আর তোমার সাথে থাকা সম্ভব না। আমি হারিয়ে যাচ্ছি তোমার জীবন থেকে। আমায় খুঁজো না। ডিভোর্স পেপারটা রেখে যাচ্ছি, সই করে দিও।
‎শেষবেলায় বলতে চাই, বড্ড ভালোবেসেছিলাম তোমায় প্রিয়ম। কিন্তু তুমি প্রতারক, নরপশু।আমি এটাও বুঝলাম যে নারীরা প্রথম থেকেই বোকা হয় কিন্তু কাউকে ভালেবাসলে আরো বেশি বোকা বনে যায়।নিজের সর্বস্ব দিয়েছিলাম তোমায়।তুমি ঠকালে।আমি আর তোমার সাথে থাকতে চাই না।
‎ইতি
‎হৈমন্তী

‎হৈমন্তীর লেখা শেষ হলো।সঙ্গে সঙ্গে চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল চিঠির পাতায় গড়িয়ে পরলো।যদিও ও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রিয়মের কাছ থেকে পায়নি। আগে সে প্রশ্নগুলো করতে চাইলে ও এখন সেই ইচ্ছা মরে গেছে। এ বাড়ি আর প্রিয়ম ওর কাছে এখন নরক লাগছে।

‎ও চোখ মুছে উঠে দাড়ালো।চিঠিটি ভাজ করলো অতপর টেবিলেই সেটিকে কলম দিয়ে আটকে রেখে দিলো।ড্রেসিং টেবিল হতে নিজের ব্যাগটা এনে সেখান থেকে ডিভোর্স পেপারখানা বের করে টেবিলে রেখে দিলো। ওখানে ওর সই আগে থেকেই করা।

‎প্রিয়মের সকল কারসাজির বিষয়ে হৈমন্তী আগেই জেনেছিলো।ও শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলো এতদিন। আজ সবকিছু একদম ওর পরিকল্পনা মতো হলো।হৈমন্তী ইচ্ছে করেই আজকে বাইরে বেরিয়েছিলো। পরে রাত করে বাড়ি ও ফিরলো যেনো প্রিয়ম ওর সাথে ঝগড়া করে এবং ও যেনো প্রিয়মের সব কালো সত্যিগুলো বলতে পারে। হৈমন্তী সোজা হয়ে দাড়ালো।শেষবারের মতো নিজের সংসার, নিজের ঘরের দিকে নজর বুলালো।চোখদুটি ছলছল করে উঠলো।কিন্তু চোখের পানি এবার গাল বেয়ে গড়ালো না। চোখেই শুকিয়ে গেলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হৈমন্তী নিজের ব্যাগটা নিয়ে প্রিয়মের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো।
‎__________________
‎কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো চারপাশে। পাখিরা ডেকে ডেকে জানান দিচ্ছে ভোরের।তখনই প্রিয়ম দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকলো।

‎পুরো ঘর শূণ্য,হৈমন্তী নেই।মেঝেতে চোখ পরতেই দেখলো ফোঁটা ফোঁটা শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।ঘরের মধ্যে থাকা টেবিলের পাশের জানালা টা খোলা।প্রিয়ম বুঝলো হৈমন্তী জানালা দিয়ে পালিয়েছে।ওর মাথা গরম হয়ে গেলো। তখন রাগের মাথায় মনেই ছিলো না ওর যে জানালায় শিক নেই।ও রাগে খাটের পায়ায় লাথি দিলো সজোরে। তখনই ওর নজর পড়লো টেবিলে থাকা দুটো সাদা কাগজে।

‎প্রিয়ম টেবিলের কাছে গিয়ে প্রথমেই চিঠিটি খুললো।চিঠির পাতায় দুফোঁটা জলের ছাপ। প্রিয়ম বুঝলো হৈমন্তীর চোখের জলের ছাপ এটা। চিঠিটি পরে ও ডিভোর্স পেপার টা খুললো। সেখানে হৈমন্তীর সই দেখে একটি ফিকে হওয়া তিক্ত হাসি দিলো। ও চিঠি আর ডিভোর্স পেপার টেবিলেই রাখলো। তারপর খুলে থাকা জানালার কাছে গেলো।

‎সকাল শুরু হচ্ছে,কি মিষ্টি লাগছে!
‎প্রিয়ম সিগারেট ধরালো।একের পর এক টান দিতে লাগলো।যেনো সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে উড়িয়ে দিতে চাইলো।ও বুঝে গেলো হৈমন্তী কে ও খুঁজে পাবে না।কারন, “আমরা তাদেরকেই খুঁজে পাই যারা হারিয়ে গিয়ে ও ফিরে আসতে চায়। তাদের খুঁজে পাই না যারা স্ব-ইচ্ছায় হারিয়ে যায়।”
‎প্রিয়ম শেষমেশ সব হারালো। ওর সব যে হৈমন্তীই ছিলো।

‎(সমাপ্ত)

হৈমন্তী পর্ব-০১

‎‎#হৈমন্তী
‎#লেখা: আফরা আরনাজ
‎#পর্ব: ০১

“কোথায় ছিলে? ফিরতে এতো রাত হলো যে?”

‎রাত বাজে দেড়টা। হৈমন্তী সবে বাড়ি ফিরলো। ও ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়াতেই প্রিয়ম প্রশ্নটি করলো।হৈমন্তী পেছন ফিরে প্রিয়মের পানে চাইলো। ও চোখ মুখ শক্ত করে পা ঝুলিয়ে খাটের এক কোনে বসে আছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ রেগে আছে।হৈমন্তী তা দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।ও নিজের ব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখলো।কপালের টিপটা খুলে আয়নায় আটকে দিলো। তখনই নিরবতা কাটিয়ে প্রিয়ম আবার বলে ওঠলো,
‎‎”কি হলো বলছো না যে, আমার কথা কী শুনতে পাও নি?”

‎হৈমন্তি আবার ওর দিকে তাকালো বললো,
‎‎”তা তোমায় বলার প্রয়োজন মনে করছি না।”

‎প্রিয়ম এ কথা শুনে কপাল কুঁচকালো। এই একই কথা ও নিজেও বলেছিলো হৈমন্তীকে কিছুদিন আগে।হৈমন্তী কী তবে বদলা নিলো!
‎প্রিয়ম চোয়াল শক্ত করে খাট থেকে নেমে হৈমন্তীর কুনুই চেপে ধরলো।

‎”আমার কথা আমাকেই ফেরত দিচ্ছো,ভুলে যেও না তুমি আর আমি এক না।”

‎হৈমন্তির স্বাভাবিক মুখশ্রী। ও একটা গা জ্বালানি হাসি দিয়ে বললো,
‎”কেনো!এক না কেনো?তুমিও মানুষ আমিও মানুষ। শুধু লিঙ্গটারই ভেদাভেদ। আর তো কিছু ভিন্ন নেই।”

‎”ভিন্ন আছে।একটা মেয়ে মানুষের এতো রাত অবধি বাহিরে থাকা নিরাপদ না।”

‎হৈমন্তী হাসলো, “ভয় পাচ্ছ? যে রাস্তা ঘাটে তোমার বউ এর দিকে যদি তোমার মতই কোনো নরপশু নজর দিয়ে দেয়।”

‎প্রিয়ম থমকালো।ওর হাত ও ঢিলে হয়ে এলো।হৈমন্তী তাই হাত ছাড়িয়ে নিলো। প্রিয়ম বললো, “কি উল্টো পাল্টা বকছো”।
‎” উল্টো পাল্টা না প্রিয়ম। তুমি একটা পশু। ”

‎প্রিয়ম চিৎকার করে ওঠলো,”হৈমন্তী,,,,,, অনেক হয়েছে।নিজের দোষ ঢাকতেএখন আমার ওপর উল্টো পাল্টা কথা বলছো।”

‎হৈমন্তী ঘৃণার চোখে চাইলো প্রিয়মের পানে।
‎”কী করে পারলে প্রিয়ম! কী করে?
‎তারপর একটু দম নিয়ে বললো, “একটা বাচ্চা মেয়ে ছিলো ও। কী করে তুমি ওকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দিলে? ”

‎প্রিয়ম হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সামলে বললো,”দেখো হৈমন্তী এসব বাজে বকা বন্ধ করো।তুমি কি বলছো আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”

‎হৈমন্তির চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠলো রাগে ঘেন্নায়। ওর গায়ে লাল পাড়ের সাদা শাড়ী,সিঁথির লাল সিদুর, হাতের শাখা-পলা। সব মিলিয়ে ওকে ভয়ংকর লাগছে। যেনো সব ধ্বংস করে দিবে ও এক নিমিষে।

‎হৈমন্তী রাগান্বিত স্বরে চিবিয়ে বললো,
‎”কার কথা বলছি বুঝতে পারছো নাহ?আমাদের কাজের মেয়ে জগত্রী ওর মেয়ে বীণা। তুমি ওকে অফিস থেকে ফেরার পথে বাজেভাবে ছুঁয়ে দাওনি?ওকে নিজের সাথে অন্য কোথাও যেতে জোর করো নি?”

‎প্রিয়ম ঘাবড়ালো এবার।তুতলিয়ে বললো,”ক,,কে বলেছে এসব তোমায়?”

‎হৈমন্তি আবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।ওর চোখে জল এলো।ও প্রিয়মের কাছে গিয়ে ওর বুকে দুুহাত রেখে চোখের দিকে চাইলো। হৈমন্তীর চোখ বেয়ে অনবরত জল গরিয়ে পড়ছে। কান্নার তোপে ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। একটা ঢোক গিলে ও বললো,
‎”এসব নাহয় বাদই। আমার শরীরে কী এমন কমতি ছিলো প্রিয়ম! যে তোমাকে নষ্টগলিতে যেতে হয়?”

‎প্রিয়মের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।ও হৈমন্তীর বাহু চেপে ধরলো,”এসব কী বলছো তুমি?”
‎হৈমন্তি কাঁদছে ই।ও পারছে না চিৎকার করে কাঁদতে।

‎”আমি নিজের চোখে তোমায় ওখানে যেতে দেখেছি প্রিয়ম।আর নাটক করো না। ”

‎প্রিয়ম ঢোক গিললো।ও বুঝে গেলো হৈমন্তী ওর পিছু নিয়েছিলো কিন্তু ও টের পাই নি। অবিন্যস্ত পরিবেশ কে সামাল দিতে প্রিয়ম ক্রন্দনরত হৈমন্তীর গাল স্পর্শ করলো।কোনো ছোটো বাচ্চাকে বুঝ দেয়ার মতো করে বললো,”তুমি যেমন ভাবছো তেমন কিছু নয় সোনা।আমি ওখানে কাজে গিয়েছিলাম।”

‎হৈমন্তী ওর হাত ঝামটা মেরে সরিয়ে দিলো।একটা ঘৃণাভরা হাসি দিয়ে বললো,”কী এমন কাজ যা আমাকে বলা যায় না। লুকিয়ে করতে হয়। তারপর একটু থেমে নাক টেনে প্রিয়মের চোখে কড়াভাবে তাকিয়ে বললো,”কী কাজ যার জন্য প্রতি সপ্তাহে তোমার ওই নষ্টগলিতে যেতে হয়?”

‎প্রিয়ম এবার বুঝে গেলো হৈমন্তী অনেক আগে থেকেই ওর ওপর নজর রেখেছিল। তখনই হৈমন্তী আবার প্রিয়মের কাছে আসলো।একদম কাছে।ওর গালে পরম আবেশে হাত বুলিয়ে বললো,

‎”প্রিয়ম! আমার প্রিয়ম!তুমি কী করে এতো বদলে গেলে?তুমি তো শুধু আমার ছিলে কী করে পারলে আমার হয়েও অন্য নারীর কাছে যেতে?
‎হৈমন্তীর চোখ বেয়ে আবার জল গরিয়ে পরলো।
‎”আমাদের না প্রেমের বিয়ে ছিলো!তুমি না আমায় বড্ড ভালোবাসতে! কী করে এতো বদলে গেলে প্রিয়ম?

‎প্রিয়ম হৈমন্তী কে ধাক্কা দিয়ে সরালো।ওর মুখ শক্ত।হৈমন্তীর বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো প্রিয়ম,
‎”তুমি আমার ওপর নজর রাখছিলে?এতো বড় সাহস তোমার! ”
‎হৈমন্তি একটা রহস্যময় হাসি দিলো। তারপর মুখ শক্ত করে করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো,
‎”হাত ছাড়ো আমার। তোমার ওই নোংরা হাত দিয়ে আমার ছোঁবে না। আর সাহস,,, সে তো তুমি দেখোই নি।আমি ডিভোর্স দেবো তোমায়।”

‎প্রিয়মের মাথায় রক্ত ওঠলো।ও বুঝে পেলো না কি করবে। হৈমন্তী ওকে ছেড়ে গেলে ওকে গুছিয়ে রাখবে কে!হৈমন্তী কে ওর লাগবেই।প্রিয়ম হৈমন্তীর বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরলো।
‎”এতো সহজ আমাকে ছেড়ে দেওয়া?আমি তোমায় এতো সহজে ছাড়ছি না, কোথাও যেতে দেবো না তোমায়। ”

‎হৈমন্তী ওর চোখের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”তোমার মতো নরপশু কে আমি তোয়াক্কা করি না। তুমি আমায় না ছাড়লে ও আমি তোমায় ছেড়ে দেবো।আমার সিঁথির সিদুর আমি একাই মুছতে পারবো।”একথা শুনে প্রিয়ম হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লো।ও হৈমন্তীর হাত চেপে মেঝেতে ছুড়ে দিলো।হৈমন্তী ছিটকে ড্রেসিং টেবিলের কোনায় গিয়ে পরলো। টেবিলের পায়ার তারকাঁটার সাথে লেগে ওর ডান হাতের অনেকখানি অংশ কেটেও গেলো।

‎প্রিয়ম ওকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‎”ছেড়ে দিবি, আমায় ছেড়ে দিবি। এতো সহজ!আমিও দেখবো তুই এ ঘর ছেড়ে কী করে বের হোস। “এই বলেই প্রিয়ম তালা চাবি নিয়ে ঘরের দরজা আটকে চলে গেলো।

‎(চলবে)

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব

#নীল_ধ্রুবতারা [অন্তিম পর্ব]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাকে যখন হাসপাতালে আনা হলো, তখন আমার অনাগত সন্তানের জীবনের সলতেটা মিটমিট করে জ্বলছে। গর্ভস্থ বাচ্চার কোনো নড়াচড়া টের পাচ্ছি না। বুকটা হাহাকার করে উঠছে ভয়ে। ডাক্তাররা এমন পরিস্থিতিতে সিজারের কথা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার ভয়ানক ডায়রিয়া হয়েছে। মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। স্যালাইন চলছে। ডাক্তার ম্যাডাম আমার মা আর ওই ভদ্রলোক স্বামীকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ে বেশ ভালোই ধমকালেন।

হাসপাতালে যতগুলো দিন ছিলাম, ওই তরুণী ডাক্তারটির মতো অমায়িক মানুষ খুব একটা দেখিনি। অসম্ভব রূপবতী, আবার কণ্ঠস্বরও চমৎকার। আমার ডায়রিয়াটা একদিনের মধ্যেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এল, বাচ্চাটাও টিকে গেল। কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফির হিসাব অনুযায়ী, আমার প্রসবের তারিখ পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহ আগেই। ডাক্তাররা বেশ চিন্তিত। সি-সেকশন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমার স্বামী মাহতাব অনেক ছোটাছুটি করে রক্ত জোগাড় করল। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতেই আমি হঠাৎ বাধা দিলাম। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বললাম,
“সিজার করব না। ভুলেও না। আমার প্রচণ্ড ভয় করে।”

তরুণী ডাক্তার আমাকে ধমকে উঠলেন,
“নয় মাস এত কষ্ট করার পর কি মরা বাচ্চা প্রসব করতে চাও?”

কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল, কিন্তু জেদ কমল না। মাহতাব আমার হাত ধরে করুণ গলায় বলল,
“কী চাও নবনী? আমাদের বাচ্চাটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে যাক?”

আমি কোনোমতে বললাম,
“মানুষের কি নরমালে বাচ্চা হয় না?”
“তোমার ডেলিভারি ডেট এক সপ্তাহ আগেই পেরিয়ে গেছে!”
“গেলে গেছে। সময় হলে আল্লাহর হুকুমে সে আসবেই। জোর করে টেনেহিঁচড়ে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?”

মাহতাব আমাকে অনেক বোঝাল, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলও করল—কিছুই আমার জেদ গলাতে পারল না। আমি পাথরের মতো অনড় হয়ে বললাম,
“যে আল্লাহ আমার বাচ্চাকে এত ঝড়-ঝাপটার পরেও বাঁচিয়ে রেখেছেন, তিনিই তাকে রক্ষা করবেন। ভুল ওষুধ খাওয়ার পরেও তার কিছু হয়নি, এক্সিডেন্টের পরেও সুস্থ ছিল, ডায়রিয়ার পরেও সে ঠিক আছে। শুধুমাত্র সময় হয়নি বলেই সে আসছে না। এর জন্য তাকে নিয়ে টানাটানি করব? না, কক্ষনো না।”
মাহতাব অসহায়ের মতো হাসল, বলল,
“বোকার মতো কথা বলো না। টানাটানি আবার কী?”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“টানাটানি নয় তো কী? সময় হলে সে নিজেই আসবে।”

ডাক্তারদের সামনে অবশ্য এসব যুক্তি ধোপে টিকল না। উনি শুনলেনই না আমার কথা। যুক্তির বাহারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বরং আমাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন। অত সুন্দর একটা মেয়ের গলায় যে এতটা কঠিন ধমক লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। ওনারা সিজারের সিদ্ধান্তে অটল। আমার খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিন্তু সব ঠিকঠাক হওয়ার আগমুহূর্তে বিপত্তি ঘটল আমার রক্তচাপ নিয়ে। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় প্রেশার বেড়ে গেছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে তো আর সিজার করা যায় না। ডাক্তাররা আমার ওপর মহা বিরক্ত হলেন। মাকে ডেকে কঠিন গলায় বললেন,
“আপনার মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যান। রিক্সে নিতে পারব না। রক্ত-পানি ভেঙে যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে আবার হাসপাতালে যেন না আনা লাগে। জীবনে এমন রোগী দেখিনি!”

মা আমাকে অনেক বোঝালেন, কিন্তু প্রেশার তো মায়ের কথা শোনে না! বরং আমিই উল্টো মাকে বোঝাতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার বিরক্ত হয়ে আমাকে ছাড়পত্র দিয়ে দিলেন। কিন্তু বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তরুণী ডাক্তারটি বললেন,
“দাঁড়ান, একবার পেলভিসের মুখটা পরীক্ষা করে দেখি। সময় তো অনেক পার হয়েছে। একবার দেখে দিই।”

তিনি পরীক্ষা করলেন। সামান্য হলেও পেলভিসের মুখ খুলেছে। তিনি কোনো কথা না বলে ছাড়পত্রটা ছিঁড়ে ফেলে শান্ত গলায় বললেন,
“থাকুন। আজ-কালের মধ্যেই ডেলিভারি হবে।”

শুনে আমি স্বস্তি পেলাম। অযথা কাটাকুটির ঝামেলা নেই ভেবেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আচ্ছা, বাচ্চা প্রসবে দেরি হলে মানুষ কেন এত ভয় পায়? কেন এত নিয়ম? প্রকৃতির নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। সেই ছন্দেই তো গাছ বড় হয়, বৃষ্টি পড়ে, চাঁদ ওঠে। আমার সন্তানও সেই ছন্দে পৃথিবীতে আসবে। সিজারের ছুরি দিয়ে পেট কেটে তাকে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?

পরদিন সকালে আরেকবার পরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল আরও খুলেছে পেলভিসের মুখ। খুলেছে, তবে সামান্য। বিকেলের মাঝে না খুললে শেষ অবধি ব্যবস্থা সি-সেকশন। অবশ্য তার প্রয়োজন পড়ল না। দুপুর বারোটার দিকেই আমার চিনচিন করে কোমর ব্যথা করতে লাগল। তীক্ষ্ণ তীব্র ব্যথায় নীল হয়ে যেতে থাকলাম আমি। তলপেটে অনুভব করতে লাগলাম তীব্র টান। সময় যত গড়াল, যন্ত্রণা তত বাড়ল। মনে হলো, আমার শরীরের সমস্ত হাড়গুলো একেকটা খড়ের আঁটির মতো মড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে। যন্ত্রণার সংজ্ঞা যদি হয় তীব্রতা, তবে এই ব্যথা সেই সংজ্ঞা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে আছি। মনে হলো, চোয়ালের হাড়গুলোও বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। ব্যথাটা একটু কমে এলেই আমার ঘুম পেতে লাগল ভীষণ করে। মনে হলো সহস্র বছর ধরে আমি ঘুমাই না। ঘুম নামক বস্তুটি চোখের পাতায় ধরা দেয় না বহু বহু কাল। আমি বেডে শুতে গেলাম। বিড়বিড় করতে লাগলাম,
“আমি ঘুমাব, একটুখানি ঘুমাব।”

মায়ের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বললাম,
“মা, আমি ঘুমাই। বাচ্চা হওয়ার সময় আমাকে ডাক দিলেই হবে। আমি ঘুম থেকে উঠে যাব।”
আমার অতি দুঃখের মুহূর্তেও মা হেসে ফেললেন। কোমল গলায় বললেন,
“তোমাকে ডাকতে হবে না, মা। বাচ্চা হওয়ার কালে তুমি নিজেই উঠে যাবা। এখন তুমি ঘুমাও দেখি।”

কিন্তু ঘুম! সে কি আর আসে? ঘুম আসার আগেই তীব্র যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠতে হয়। আবার যখন ব্যথাটা চলে যায়, খুব করে ঘুম পায়। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা!

সময়ের সাথে সাথে টের পেলাম, প্রচণ্ড ব্যথায়, চাপে কে যেন আমার পুরো অস্তিত্বকে পিষে ফেলছে। তলপেট থেকে উঠে আসা ব্যথাটা শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোতে এক ধরনের বৈদ্যুতিক শকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল। প্রতিটি হাড় যেন তার জায়গা ছেড়ে সরে গেল তীব্র বেগে। আমি তলিয়ে যেতে লাগলাম এক অতল গহ্বরে, যেখানে অক্সিজেনের বড্ড অভাব। যেখানে কেবল যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা।
যন্ত্রণা সইতে না পেরে মাহতাবের হাতটা পিষে ফেলতে লাগলাম। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও দিলাম বোধহয়।
যন্ত্রণার দাপটে আমার কপালে বিন্দু বিন্দু মরণঘাম জমতে শুরু করেছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। প্রসবের ব্যথা বুঝি একেই বলে! খুবই অসহ্য! ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক!

হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো এই কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতা মায়েদের শরীরে কোত্থেকে আসে, কে জানে! প্রসবের প্রতিটি সেকেন্ডকে একটা যুগের সমান মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই যন্ত্রণা বুঝি অনন্তকাল ধরে চলবে। আচ্ছা, আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি এই ভাঙনের পরেই কোনো এক নতুন জন্মের শুরু হবে?

মাহতাব আমার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়েছিল। মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনলাম তখন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
“যাও নামাজে যাও। আমার জন্য দোয়া করো। আমাদের সন্তানের জন্য দোয়া করো। যাও।”

মাহতাব চলে যাওয়ার পরপরই ব্যথার যে প্রচণ্ড ঝড়টা আমার শরীরের হাড়-মাংস সব চুরমার করে দিচ্ছিল, হঠাৎ করেই তা থেমে গেল। আমার কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসে। তারপরই শোনা গেল নবজাতকের প্রথম কান্নার স্বর। কী আছে এক কান্নার শব্দে? তা শুনেই ঘরের গুমোট আবহাওয়াটা সতেজ হয়ে উঠল কেন? আমার মনে হলো বাচ্চাটার কান্নার শব্দের প্রতিটি স্পন্দনে আমার শরীরের সব ভাঙা হাড় যেন জোড়া লেগে যাচ্ছে। মুহূর্তেই সমস্ত যন্ত্রণার ক্লান্তি ধুয়ে মুছে চলে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে।
নার্স আমার বুকের ওপর আলতো করে তুলে দিল বাচ্চাটাকে। তাকে জড়িয়ে ধরার মতো শক্তি আমার নেই। আমি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তাকে অনুভব করতে লাগলাম। এই তো আমার সেই কোহিনূর হীরে। পৃথিবীর কোনো রাজকোষের ধনদৌলত দিয়ে যার মূল্য মাপা যায় না। কত কত রাজা-বাদশা কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে ওই এক টুকরো হীরের জন্য, অথচ বিধাতা আজ আমাকে তার চেয়েও দামি এক রত্ন দিয়েছেন। এই রত্ন আমার সন্তান। এই বাচ্চা আমার একান্ত। আমার নিজের। ওর ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি পৃথিবীর সেরা ধনী, সেরা সুখী মানুষ। এই হীরের কোনো কাট নেই, কোনো পালিশ নেই, কিন্তু এর দ্যুতি আমার চোখের সামনে জগতটাকে উজ্জ্বল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সাগরের অতল গহ্বরে লুকানো কোনো দুষ্প্রাপ্য মুক্তো আজ আমার হাতের মুঠোয়। যার জন্য জগতের সকল মানুষ হাহাকার করে, পাহাড়ের চূড়ায় খুঁজে ফেরে মণি-মানিক্য, কিংবা মহাকাশের দূরতম নক্ষত্র থেকে টেনে আনে আলো—সেসবই যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে ওর অস্তিত্বের কাছে।

মাহতাব নামাজ থেকে ফিরল দেরি করে। মোনাজাতে বোধহয় খুব কাঁদল সে, কারণ যখন এল দেখলাম বিন্দু বিন্দু জলকণা হয়ে জমে আছে তার চোখের পাতায়। কপালে গভীর একটা স্পর্শ করে আমার গায়ের উষ্ণতা পরখ করল মাহতাব। অবসন্ন শরীর নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। সে অস্ফুটে বলল,
“কেমন আছো বৌ? জানো— আমাদের একটা চাঁদের মতো ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”

আমি চোখ বুজে নিলাম। শরীরের অবসাদ ছাপিয়ে মরে যাওয়ার মতো সুখ-সুখ অনুভূতি হচ্ছে আমার। মাহতাব বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চুমু খেল, আজান দেওয়ার পর আমার আকাশ উজ্জ্বল করা ধ্রুবতারার কানের কাছে মুখ নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন আর মধুর মন্ত্রের মতো ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু… আমার আম্মু!”

আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটির দিকে। আমার ধ্রুবতারাটি মাহতাবের হাতের আলিঙ্গনে কেমন শান্ত হয়ে আছে, দীপ্তি ছড়াচ্ছে। অনিন্দ্য সুন্দর সেই দৃশ্যটি দেখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটের কোণে। আমি জগতের সকল যন্ত্রণা উপেক্ষা করে হাসলাম। একটুখানি হাসলাম।

—সমাপ্ত—
,

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-১০

#নীল_ধ্রুবতারা [১০]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

শশুরবাড়ি যাবার সময় বাসে বসে আমি ডুব দিলাম আবার স্মৃতিমন্থনে। ভদ্রলোকের সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়েছিল আয়োজন ছাড়াই। আমি যে প্রেম করছি, সেই খবরটা ছোট বোনের কল্যাণে মা-বাবার কানে উঠে গিয়েছিল। আমার বোনকে সিআইডি অফিসার এসিপি প্রদ্যুমানের থেকে কম কিছু মনে হয় না। সে করল কী, ঘুমন্ত আমার আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে চুরি করে ফোন খুলে ফেলল, আর প্রেমের সব প্রমাণ উজার করে দিল মায়ের সামনে। আমাদের রক্ষণশীল পরিবারে প্রেম বস্তুটিকে খুবই অপরাধের নজরে দেখা হয়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে আমি হয়ে উঠলাম আমার পরিবারের ভয়ংকর আসামী। খুনের আসামীকে থানায় ধরে নিয়ে পুলিশ যেমন করে পেটায়, বাবা আমাকে চ্যালাকাঠ দিয়ে তেমন করে পিটালেন। আমার ফোন কেড়ে নেওয়া হলো। রাতভর কান্নাকাটি করে খুব ভোরে ফোন আর কিছু ক্যাশ টাকা চুরি করে বাড়ি থেকে পালালাম আমি। আমার সারা গায়ে তখন রাজ্যের ব্যথা। জ্বরের তোপে চোখ খুলে রাখা দায়। আমি প্রথমে সরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার আমাকে জ্বরের ওষুধ দিলেন। সেই ওষুধ খেয়ে ঝিম ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলাম হাসপাতালের বেঞ্চিতে। ঘণ্টাখানেক পরে একটু চাঙ্গা হয়ে কল লাগালাম মাহতাবের নাম্বারে। রিসিভ হতেই বললাম,
“আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে মাহতাব?”

সে খুব অবাক হলো। বেশ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। নিজেকে কোনো রকমে ধাতস্থ করে নিয়ে এক সময় জানতে চাইল,
“কী হয়েছে? তুমি আমার কাছে আসবে মানে কী?”
“মানে বোঝো না! আমি তোমার কাছে চলে যাব। আমাকে বিয়ে করবে?”
“বিয়ে!”

মাহতাবের বিস্ময় দেখে আমিও বিস্মিত হলাম। বিয়ের কথা শুনে এমন আঁতকে ওঠার কী আছে? ড্যাংড্যাং করে প্রেম করেছে আর বিয়ে করবে না? রাগে শরীর জ্বলে গেল। বললাম,
“কেন? প্রেম করেছো কি সারাজীবন ঘাস কাটার জন্য? বিয়ের জন্য নয়?”
“আরে না। মানে এখন বিয়ে? হঠাৎ!”
“এমনি। তুমি স্পষ্ট করে বলো তো, বিয়ে করবে আমায়?”

মাহতাব আমতা-আমতা করতে লাগল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছি। কোথায় যাব জানি না। যদি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি থাকো, আমি তোমার কাছে চলে যাব। এখন ভেবে বলো। দশ মিনিট সময় দিচ্ছি।”

বলেই খট করে কল কেটে দিলাম আমি। মাহতাব বোধহয় বলতে চাচ্ছিল—বিয়ের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দশ মিনিটে নেওয়া যায় না। আমি তার কোনো কথা শুনলাম না। রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেললাম। এই পৃথিবী এতো নিষ্ঠুর কেন? কেনই বা আমার বাবা-মা এতো পাষাণ? ভাবতে ভাবতে চার মিনিটের মাথায় মাহতাব কল দিল। রিসিভ করে বললাম,
“এর মাঝেই ভাবনা শেষ? তা বলো, কী ভেবেছো?”
সে অসহায় গলায় ডাকল,
“নবনী…”
“হুঁ।”
“তুমি প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তা করছেন।”
“করুক চিন্তা। উনারা আমাকে জানোয়ারের মতো পিটিয়েছেন। আমি ভুলেও আর বাসায় যাব না। এসব বাদ দিয়ে বলো, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? বিয়ের খরচ আমার কাছে আছে। বিশ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছি।”

মাহতাব করুণ গলায় বলল,
“টাকা চুরি করেছো?”
“হ্যাঁ। আমাকে মেরেছে না! তার ক্ষতিপূরণ।”
“প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছেন। এখানে-সেখানে খোঁজ করছেন।”

তার কথা শুনে আমার কপাল কুঞ্চিত হলো। আমার বাবা-মা কী করছে সেই খবর সে কীভাবে জানল? জিজ্ঞেস করলাম সে কথা—
“তুমি কীভাবে জানলে?”
“তোমার বান্ধবী ফোন করেছিল। উনারা ভাবছেন তুমি আমার সাথে পালিয়ে এসেছো। তোমাকে সাহায্য করেছে ওই মেয়ে।”
“বাহ, ভালো তো!”
“ভালো নয়। এলাকায় তাদের মানসম্মান নষ্ট হবে।”
“তাতে আমার কী?”
“উনারা কষ্ট পাবেন।”
“আমাকে মারার সময় তাদের মনে ছিল না, আমিও কষ্ট পাচ্ছি? তুমি ওদের হয়ে সাফাই গেয়ো না প্লিজ!”

মাহতাব শুনল না আমার কথা। সে আরও অনেকক্ষণ ধরে আমার বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষার চেষ্টা চালাল। অনুরোধ-উপরোধের পর আমি মেনে নিলাম। সে আমাকে আশ্বস্ত করল, আগামীকাল সে আসবে আমার সাথে দেখা করতে। আজকে যেন আমি কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে যাই। আমি তাই গেলাম। আমার দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম সেদিন। বাবা-মা খবর শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। ঘটনা যতটা সহজভাবে উল্লেখ করেছি, ততটা অবশ্য সহজ ছিল না। মাহতাবের আচরণে আমি খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল—এই লোক সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে তো?
মাহতাব সত্যি সত্যি পরদিন আমার সাথে দেখা করতে এল। প্রথম সাক্ষাতের ঠিক এক মাস এগারো দিন পর। কলেজের কথা বলে দাদুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি দেখা করলাম তার সাথে। আমার শরীরে বাবার করা আঘাতের অনেক চিহ্ন লক্ষ্য করল সে। সারাদিন একসাথে কাটিয়ে যাবার আগে সে বলল,
“এরপর তোমাকে আমার বউ হিসাবে দেখব।”

আমি বিশ্বাস করিনি। তবে সত্যিই আমাদের তৃতীয়বার দেখা হয়েছিল বিয়ের দিন। অবশ্য সম্পর্কটাকে বিয়ে অবধি নিয়ে যেতে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল আমাদের। মাহতাবের সাথে দেখা করে সেদিন বাড়িতেই এসেছিলাম আমি। এবং সাহস করে মাকে নিজের মুখেই মাহতাবের কথা বলেছিলাম। আমার নাছোড়বান্দা আবদারে, নির্লজ্জতার বাড়াবাড়ি দেখে মা কথাও বলেছিল মাহতাবের সাথে। শেষে যখন জানল ছেলেটার বাড়ি বহুদূর, তখনই বেঁকে বসল। আমাকে অন্য স্থানে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। আমি কিন্তু হার মানলাম না। তাদের গালাগাল, তিরস্কার, অবহেলা, তির্যক দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিয়মিত উৎপীড়ন করতে লাগলাম সবাইকে। পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে হ্যাবলার মতো বসে থাকি, প্রশ্নের উল্টাপাল্টা জবাব দেই। মেরেও আমাকে সোজা পথে আনা যায় না। শেষে গিয়ে হতাশ হয়ে মেনে নিল তারা। ওদিকে মাহতাব নিজের বাড়িতে বলেছে তখন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ির এখনই ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার কোনো প্রবৃত্তিই ছিল না।

সুতরাং পুত্রের অন্যায় আবদার মেনে নিলেন না তারা। মাহতাবও নাছোড়বান্দা। শেষে তারাও হার মানল। পারিবারিকভাবে বিয়ের কথা এগোতে থাকল আমাদের। আমার বাবা-মা তাদের বাড়ি গিয়ে ছেলে দেখে এল। মোটামুটি পছন্দই হলো সব। তারাও এল আমায় দেখতে। সব দেখেশুনে আনন্দিত মনেই ফিরে গেল। যেহেতু এখানে আমাদের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিয়ে আটনোর প্রশ্নই নেই। কিন্তু বিপত্তি বাঁধালেন উনারা। আমাকে উনাদের এক ফোঁটাও পছন্দ হয়নি। মাহতাবের বাড়ির সকলের গায়ের রঙ মারাত্মক ফর্সা। সেখানে আমি শ্যামবর্ণা এক কুশ্রী তরুণী। তাদের সুন্দর ছেলের পাশে আমাকে আদৌ মানায়?

উনারা বলে দিলেন, এই বিয়ে হবে না। মাহতাবের উপর কঠিন নির্দেশ জারি হলো যাতে আমার সাথে আর কোনোরূপ যোগাযোগ না রাখে। জেদী মাহতাব সেটা শুনল না। সে আমার সাথে আগের মতোই যোগাযোগ করল। আমিও বিচ্ছিন্ন হতে পারলাম না তার থেকে। সে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিল। ছেলে এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখে জেনেই মাহতাবকে ওয়ার্ক পারমিটে দুবাই পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করল তারা। কিন্তু মাহতাব সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলে একদিন ঘোর বর্ষার দিনে এসে আবার উপস্থিত হলো আমার শহরে, আমার বাড়িতে। সে এল একা একা। মা-বাবা তাকে দেখে মুখ কালো করে ফেলল। তার বাবা-মায়ের অপমান হজম করতে পারেনি বলেই হয়তো কঠিন স্বরে জানতে চাইল,
“তুমি! তুমি আবার কী চাও?”

মাহতাব সেদিন কী বলেছিল জানি না। তবে বাবা-মা তাকে নিয়ে ঘরের দোর দিয়ে মিটিং করেছিল ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে। এরপর বেরিয়ে এসে আমাকে আদেশ করল,
“রেডি হয়ে কাজী অফিসে চল।”

এই আদেশের পেছনে, এতো সহজে মেনে নেওয়ার পেছনে একটাই ভয় ছিল তাদের—যদি আমরা পালিয়ে যাই! সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবেই সেদিন সম্মতি দিয়েছিল তারা। এবং রাত নয়টার সময় পাঁচ লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়ে গেল আমার আর মাহতাবের। আড়ম্বরহীন বিয়ে। বিয়ের প্রথম রাত্রিটা ছিল বড্ড সাদামাটা। সারারাত পাশাপাশি গল্প করে ভোররাতের দিকে আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমিয়েছিলাম আমরা, কারণ গ্রামে প্রচলিত নিয়ম—বিয়ের প্রথম রাত্রেই নবদম্পতিকে একসাথে ঘুমাতে নেই। এতে নাকি অকল্যাণ হয়। তবে দ্বিতীয় রাতে জগতের সমস্ত কল্যাণ নিয়ে মাহতাবের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম আমি। ‘ঘুমিয়েছিলাম’ শব্দে অবশ্য ভুল আছে। মাহতাব সেদিন উন্মাদ প্রেমিক হয়েছিল। এক মুহূর্ত ঘুমাতে দেয়নি আমাকে। আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল। কী মারাত্মক সুখের ছিল সে রাত্রি! এমন সুখের রজনী দ্বিতীয়বার আসেনি আমার জীবনে। অবশ্য মাহতাব আমাকে আদর করেছে আরও বহুবার, তবে সেই দিনের অনুভূতি ছিল ভিন্ন।

বিয়ের সপ্তাহ ঘুরতেই আমাদের এলাকায় একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলল মাহতাব। বউ নিয়ে শ্বশুরের পয়সায় বসে বসে খাওয়া যায় না। বিয়ের দুদিন পরেই অবশ্য মাহতাবের আগের অফিসের কলিগের কাছ থেকে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ঘটনাটি জেনে যান এবং ফোন করে মাহতাবকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। কান্নাকাটির অন্ত থাকে না তাদের। নির্বিকার মাহতাব আমাকে বুকে জড়িয়ে রাখেন সম্পূর্ণ ভরসা দিয়ে। শ্বশুর-শাশুড়ির ত্যাজ্যপুত্র করার ঘটনাটি অবশ্য স্মরণ থাকে না। এক মাসের মাথায় মাহতাব আর আমাকে ঘটা করে তুলে নিয়ে যান তারা। বেশ ঝড়ঝাপটা আসে আমার উপর। মাহতাব বরাবর সাংসারিক এসব পলিটিক্স থেকে গা বাঁচিয়ে চলেছে। তবে আড়ালে আমার যত্নও করেছে খুব। সেই যত্ন-আত্তির এক আনাও কারো চোখে পড়ে গেলে তীব্র তিরস্কার সইতে হয়েছে তাকে। শুনতে হয়েছে—
“এই কালী বউয়ের এতো খাতির? তাবিজ করে পোলাডারে শেষ করে দিল। বউ যেখানে যায়, এই পোলাও সেখানেই যায়। বউয়ের আঁচলের নিচে নিচে থাকে।”

তার নাম হয়ে গেল বউ পাগল। এর মাঝেই কতজনে কত কী বলল! আমার স্বামীকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী দেখার কাজটা করল একজন আত্মীয়। আমি দেখলাম। কাঁদলাম। আর মাহতাব খুব যতনে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিল। শ্বশুরবাড়িতে আমরা মাস তিনেক থাকার পরে আবার আমাদের এলাকায় ফিরে আসি। কারণ চাকরির ঠিক সুবিধা পাচ্ছিল না মাহতাব। কারণ এটা দেখালেও আমি জানি, সে চাইছিল এসব যন্ত্রণা থেকে যেন আমি মুক্তি পাই। পেলাম মুক্তি। পূর্বের অফিসেই আবার যোগ দিল মাহতাব। আমরা কাছেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করি। এরপর এই সংসার! সুখী সুখী সংসার।

প্রতি ঈদের সময় ঈদ করতে চলে যাই আমরা। ঈদের ছুটি কাটিয়ে আবার হৃষ্টচিত্তে ফিরে আসি। এবারও যাচ্ছি। কিন্তু এবারের যাত্রায় কোনো আনন্দ নেই। আমার মনটা বড় বিষণ্ণ। শরীর ভীষণ খারাপ। দুর্বলতায় ঠিক করে দাঁড়াতে পারি না। সারাক্ষণ মাথা ঘোরে।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আমার অসুস্থতা আরও বাড়ল। জ্বর-ঠান্ডায় কাহিল হয়ে গেলাম। যন্ত্রণা দিতে থাকলাম মাহতাবকে। ঈদের আগের রাতে মাহতাব একটা মেহেদী নিয়ে এসে আমাকে বলল,
“নবনী এসো, তোমাকে মেহেদী লাগিয়ে দেই।”

সে মেহেদী দিতে পারে না ঠিক করে। তবে আমার হাতে খুব শখ করে কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং এঁকে দেয়। তার ওই চিত্রকর্ম দেখে আমিও ভীষণ খুশি হই। যতটা না হই, প্রকাশ করি তার চেয়েও বেশি। কিন্তু আচমকা আমার কী যেন হলো। জানালা দিয়ে ঢিল দিয়ে আমি মেহেদী ছুঁড়ে ফেললাম দূরের কাদামাটিতে। মাহতাব হতাশ হয়ে সেটা গিয়ে তুলে আনল। নিয়ে এসে আমার পাশে বসে মায়ের নাম্বারে ফোন দিয়ে নালিশ করল আমার নামে। আম্মা বলল,
“তুমি এক থাপ্পড় দিয়ে ওর দাঁত ফেলে দাও। এই মেয়ে চিরকালের বেয়াদপ। ফাজিলটাকে নিয়ে যাওয়াই ভুল হয়েছে তোমার। দাও, আমি কথা বলছি।”

মা আমাকে খুব করে বকে দিল। আমি পাত্তাই দিলাম না সেই সব। তারা তো আর জানে না আমার অস্থিরতা কোথায়! আজ কতদিন বাচ্চাটাকে দেখি না আমি! আমাকে এতো মানুষজনের ভিড়ে এনে আমার শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে তারা।

ঈদের দিন থেকেই আমার প্রচুর বমি শুরু হলো। বমির কারণে কিছুই খেতে পারি না। রাতে ঘুম হয় না। ভোরের দিকের খারাপ লাগাটা বাড়ল খুব। কান্নাকাটি আর অস্থিরতায় বাড়ির সবাইকে তটস্থ করে রাখলাম আমি। ঈদের পরদিনই আমাকে নিয়ে গাজীপুর ব্যাক করল মাহতাব। ফিরে এসে বড় ডাক্তার দেখালাম আমি। উনি আমার পূর্বের রিপোর্টগুলো দেখে আমাকে ধমকালেন অনেকক্ষণ। সরকারি ডাক্তার না দেখিয়ে কেন ওখানে গিয়েছি, দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কেন কাজ করি, উল্টাপাল্টা ওষুধ কেন খাচ্ছি ইত্যাদি। আমি বুঝলাম না নিজের ভুলটা। ডাক্তার আমাকে মধুর ভাষায় বললেন,
“মা, তুমি আরেকটা আল্ট্রা করে এসো।”

আমার আল্ট্রা করা হলো। রুমের সামনে অনেকটা সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাহতাব। পায়চারি করতে লাগল এখান থেকে ওখানে। রিপোর্ট আসার পর আমি ডাক্তারকে দেখালাম এবং নিজের সমস্যাগুলো বললাম বিস্তারিত। খুব বমি হয় আজকাল সেটাও জানাতে ভুললাম না। ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে বললেন,
“বমি ছাড়া কে কবে মা হয়েছে, শুনি?”

আমি উনার কথাটা প্রথমে বুঝতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। মানে কী এই কথার? কেন বললেন বমি ছাড়া কেউ মা হয় না? এবং যখন কারণ বুঝতে পারলাম, তখন আনন্দে আমার চোখ ছলছল করছে। রিপোর্টে দেখা গেল আমার ওভারিতে সিস্ট এবং বাচ্চা—দুটোই আছে। আমার সাথেই কেবিনে ঢুকেছিল মাহতাব। খবরটা শোনার পর আমি দেখলাম সে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে। এটা শুধু কথা নয়, সত্যিকার অর্থেই সে লাফিয়ে উঠল। পুরোটা সময় কেমন যেন উজ্জ্বল, প্রফুল্ল দেখাল তাকে। ডাক্তার আমার ওষুধ বদলে দিলেন। শুকরিয়া আদায় করলেন ভুল ওষুধে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি এটা জানিয়ে। নেক্সট টাইম যাতে ওই হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে না যাই, সেই নির্দেশও দিলেন।

বেরোনোর আগে আমি বললাম,
“ম্যাডাম, সিস্ট থাকলে নাকি বাচ্চা হয় না?”
“কে বলেছে হয় না? কার কাছে শুনেছো এসব ভুল কথা? যদি সিস্ট থাকলে বাচ্চাই না হবে, তবে তোমার গর্ভে যে ভ্রুণটি বেড়ে উঠছে সেটা কি?”

আমি আমতা-আমতা করতে লাগলাম। উনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন,
“ওভারিতে সিস্ট থাকলে বাচ্চা হয়না এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। বর্তমান সময়ে সিস্ট থাকা খুব সাধারণ একটি বিষয়। অধিকাংশ মেয়েদের সিস্টের সমস্যা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হরমোনের ছোটখাটো অসামঞ্জস্য ছাড়া আর কিছুই নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো নিয়ম নেই যে সিস্ট থাকলে কনসিভ করা যাবে না।
​আমরা শুধু দেখি সিস্টের ধরনটা কী এবং সেটি পেসেন্টের ওভুলেশনে (ডিম্বস্ফোটন) কতটা বাধা দিচ্ছে। প্রয়োজন হলে ছোট কিছু ওষুধ বা সামান্য লাইফস্টাইল পরিবর্তনে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক করা যায়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সিস্ট থাকা বহু মা এখন সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের মানসিক চাপ বাড়াবে না, এতে হরমোনের ভারসাম্য আরও নষ্ট হবে। শান্ত থাকো, হাসিখুশি থাকো। নিজের যত্ন নাও। বেস্ট অফ লাক!”

আমি মুগ্ধ হয়ে গেলার উনার বিশ্লেষণ শুনে। অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে পড়া যে কোনো রোগীর জন্যই কত বড় আতঙ্ক সেটা হারে হারে টের পেলাম আমি। কেবিন থেকে বেরিয়ে মাহতাব শক্ত করে চেপে ধরে রইল আমার হাত। মা আনন্দিত হয়ে অনেকের কাছে ফোন করে নিজের নানি হওয়ার খবর জানালেন। আমি এবার আনন্দে কেঁদে ফেললাম। মনে হতে লাগল—পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বোধহয় আমি। ইশ! এই পৃথিবী এতো ভালো কেন? বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাহতাব আমাকে জ্ঞান দিল খুব। যার সারমর্ম এই—দেখেছো, শুধু শুধু চিন্তা করে এতো অশান্তিতে ভুগলে তুমি। এই জন্যই বলি, এতো অধৈর্য হয়ো না। আল্লাহর বিচার সবচেয়ে উত্তম।

আমি সন্তানসম্ভবা জানার পর থেকে আরও ভীষণ করে ডুবে গেলাম বাচ্চার সাথে সময় কাটানোতে। অবশ্য অবাস্তব পৃথিবীর সেই গোলগোল চোখের বাচ্চাটার সাথে নয়। আজকাল তাকে আর দেখতে পাই না। সে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বহু দূরে। এখন আমি কথা বলি আমার গর্ভের বাচ্চাটার সাথে। তাকে ফিসফিস করে ডাকি,
“সোনা, তুমি কি ভালো আছো? শুনতে পাচ্ছো মায়ের কথা?”

আরও অনেক কথা থাকে তার সাথে আমার। তবুও ওই গোলগোল আঁখিদুটির জন্য আমার মন কেমন করে। সে এখন কেন আসে না? কেন দেখতে পাই না তাকে? তার কি খুব অভিমান হয়েছে? মনের কথাগুলোই মাহতাবকে বলে বলে অতিষ্ঠ করে তুলি। একদিন খুব বুঝিয়ে সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল আমায়। তিনি অনেক অনেক প্রশ্ন করলেন। আমি জবাব দিলাম। শেষে তিনি আমাকে বললেন—
“শুনুন, ওই বাচ্চাটা স্রেফ আপনার মনের কল্পনা। আপনার কোনো বাচ্চা ছিলই না। অনেক মেয়েদের মাতৃত্বের প্রতি দুর্বলতা থাকে। বিয়ের পরপরই তারা মা হতে চায়। হয়তো আপনার মাঝেও ছিল। এরপর যখন আপনি শুনলেন মা হতে পারবেন না, আপনার মন সেটা মানতে পারেনি। আপনমনে একা একা এক অবাস্তব কল্পনায় আপনি খুঁজে নিলেন সন্তান সুখ।”

“কিন্তু আমি তো তাকে সত্যি সত্যিই দেখতাম। তার খিলখিল হাসির শব্দ আজও আমার কানে বাজে।”

আমার কথায় উনি একটুখানি হাসলেন মনে হলো। আমি বিব্রত বোধ করতে লাগলাম। মাহতাব নেই আশেপাশে কোথাও। আমার অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। ভদ্রলোক সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন,
“এগুলোও সব আপনার কল্পনা। ডিপ্রেশন থেকেই এইসব অলীক ভাবনার সৃষ্টি। শুনুন, কখনো একা থাকবেন না। যখন একা থাকবেন, নিজের গর্ভের বাচ্চার সাথে অনেক কথা বলবেন। ভালো লাগবে।”

কতটুকু কী বুঝেছিলাম তা জানি না। সামান্য কিছু মেডিসিন দিয়েছিলেন তিনি আমায়। সাথে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার দায়িত্বশীল স্বামীর দায়িত্বের ভার। সেদিনের পর থেকে মাহতাব আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি। আমাকে দেখাশোনা করার জন্য মাকে নিয়ে এল। যখন মা থাকে না, তখন মাহতাবের কল্যাণে ছোট বোন হলো আমার সঙ্গী। আরও কয়েকবার ডাক্তার দেখানোর পর ধীরে ধীরে আমার স্মৃতি থেকে মিলিয়ে যেতে লাগল পরাবাস্তব ওই বাচ্চাটা। যার চোখ বড় মায়াবী। বড় মায়াবী যার চোখ!
অনেকের গর্ভাবস্থার সময়টা চোখের পলকে কেটে যায়। আমার কিন্তু কাটল না। দিন দিন নানা সমস্যায় নানান রোগে আক্রান্ত হলাম আমি। বমির সমস্যা মিটে গিয়ে বুক জ্বালাপোড়া শুরু হলো। ঘুমের সমস্যা বাড়ল। সর্বোপরি বাড়ল আচমকা মেজাজের গতিবিধির পরিবর্তন। এই কাঁদি, এই হাসি। মাহতাব আমাকে সামলে নেয়। ক্ষমা চায়। তবে রাগ করে না একবারও। গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসের মাথায় আমার অনার্স-এর প্রথম পরীক্ষা শুরু হলো। সেন্টার বেশ দূরে। তৃতীয় পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে গুরুতর এক্সিডেন্ট করলাম আমি। আমাদের অটোরিকশা উলটে পড়ে গেল ধানখেতের মাঝে। অচেতন হয়ে পড়ে রইলাম কিছুক্ষণ। যখন হুঁশ ফিরল, খেয়াল করলাম কপাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে রক্তের ধারা। আমার তখন সে রক্ত দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কথা। আমি হলাম না। আমি নিজের পেটে হাত রেখে গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলাম। বলতে লাগলাম,
“আমার বাচ্চা! আল্লাহ গো, আমার বাচ্চা!”

আমার চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠেছিল আশেপাশের সকল মানুষ। আমাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়িতে খবর দেওয়া হলো। মা-বাবা এসে আমার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল। মা ভেজা গলায় বলল, “কীভাবে কী হইল মা?”

আমি বললাম,
“মা, আমার বাচ্চাটা বাঁচব তো!”
“আল্লাকে ডাকো মা। আল্লাহকে ডাকো।”

আমার আল্লাহর আমার প্রতি দয়ার শেষ নেই। এতো ঝড়ঝাপটার পরেও আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হলো না। সৃষ্টিকর্তার এই মেহেরবানির কথা স্মরণ করে আজও শুকরিয়া আদায় করি আমি। কী দয়াময় তিনি!
এমনি করেই আমার জীবনের পাতা থেকে ঝরে গেল নয়টি মাস। ধরণীতে তখন শীত নেমেছে। জেঁকে বসেছে হিম। ঘরে ঘরে উঠেছে নতুন ধান। সোনালী ধান থেকে গৃহিণীরা খেটেখুটে বের করে নিচ্ছে চাল। আমার হঠাৎ নতুন চালের পিঠা খেতে ভীষণ ইচ্ছে হলো। ভাড়া বাসা ছেড়ে নিয়ে ততদিনে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছি আমরা।

সেই এক্সিডেন্টের পর থেকেই নিজেদের বাড়িতে থাকি। মাহতাব বাবার হাতে খাওয়া বাবদ কিছু টাকা-পয়সা দেয়। মাঝে মাঝে বাজার করে। পিঠার প্রতি এতো আগ্রহ দেখে মা বাজার থেকে উপকরণ কিনে আনালেন। বানিয়ে দিলেন আমার আরাধ্য খাদ্যদ্রব্যটি। খেজুরের গুড়ের তৈরি তেলে ভাজা পিঠা খেলাম পেট ভরে। সন্ধ্যায় পেট ভরে পিঠা খাওয়ার শখ মিটল মাঝরাতে। পিঠার দল আমার পেটের মধ্যে নৃত্য করতে লাগল। এবং একই সাথে শুরু হলো বমি। লক্ষণ বুঝে মা বললেন,
“নবনীর তো মারাত্মক ডায়রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। ওকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।”

আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো সকালে। ততক্ষণে আমার অবস্থা শোচনীয়। সিরিয়াস অবস্থা দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমাকে রাখল না। তারা ট্রান্সফার করে দিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। নিজের উঁচুপেটটা নিয়ে আমি চড়ে বসলাম সিএনজিতে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ময়মনসিংহ।

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৯

#নীল_ধ্রুবতারা [৯]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“খোকা ঘুমাল
পাড়া জুড়াল,
বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?”

আমি বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বিড়বিড় করে কবিতা আওড়াচ্ছি। ঘুমন্ত বাচ্চাটার মাথা আমার কাঁধের উপর। সে পরম নিশ্চিন্তে আমার কোলে ঘুমাচ্ছে। আমার বুক ভরে উঠছে খুশিতে। আজকাল আমার দিন কাটছে বড় আনন্দে। ওই যে সেদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটা বাচ্চার মা আমি। সেদিন থেকেই সময়ে-অসময়ে ঘুমানোর অভ্যাস হয়েছে আমার। ঘুমালেই দেখতে পাই আদুরে বাচ্চাটাকে। কী যে দারুণ বাচ্চাটা! আমার কোলে সে খুব করে হাসে। আজকাল অবশ্য বাচ্চাটাকে দেখার জন্য ঘুমাতেও হয় না। যখন খুব একা থাকি, তখনই আবিষ্কার করি বাচ্চাটা আমার আশেপাশেই আছে। বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে দারুণ দিন কাটে আমার। সারাদিন ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকি। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই। গোসল করিয়ে দেই। দেখতে পাই, লাল টকটকে বাথটাবের পানিতে হাত-পা ছুঁড়ে খেলা করছে বাচ্চাটা। কতবার যে বললাম তাকে, বাচ্চার এটা লাগবে, ওটা লাগবে—মানুষটা ভুলে যায় খালি। মাঝে মাঝে বলে,
“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নবনী। দিনদিন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছো তুমি!”

আমি তখন হাসি। চিরকাল এই এক কথাই বলে গেল মানুষটা। আমি নাকি পাগল! এতোদিন ঠাট্টা করে বললেও, আজকাল সে কেমন করে যেন আমার দিকে তাকায়—যেন সত্যি সত্যি আমাকে পাগল ভাবছে সে। বিশেষ করে যখন বাচ্চার কথা বলি। আশ্চর্য! মাহতাব এমন করে কেন? আমি বুঝতে পারছি, মাহতাব দায়িত্বশীল স্বামী হলেও চমৎকার বাবা হতে পারেনি। আমার বাচ্চাটার প্রতি সে বড্ড উদাসীন। আমার পুচকে সোনা তার বাবাকে একদম সহ্য করতে পারে না। তাই তো মাহতাব ঘরে এলে সে লুকিয়ে যায়। ঘরময় খুঁজেও কোথাও পাই না আমি তাকে। এজন্যই মাহতাবকে দেখলেই আমার খুব রাগ লাগে। আমি খুব ঝগড়া বাঁধাই তার সাথে। সে যতক্ষণ ঘরে থাকে, অহেতুক চিল্লাতে থাকি। আমি আজকাল কারো সাথেই কথা বলি না। আমার ভালো লাগে না কিছু। শুধু আমার সোনা বাচ্চার সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। আমার এখনো পিরিয়ড হয়নি। নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি, অথচ সুস্থতার বদলে শরীর আরও খারাপ হয়েছে। মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। খাবারের রুচি উঠে গেছে। মাহতাব আমাকে নিয়ে বড়ই চিন্তিত। আমি তার চিন্তাকে কোনো পাত্তা দেই না, আপনমনে থাকি। সে যখন ঘরে থাকে, আমি বারান্দায় গিয়ে বসে বসে আকাশ দেখি। যখন সামান্য টু শব্দটিও করতে আসে, আমি খুব করে ঝগড়া করি তার সাথে। তার চোখ দেখে বোঝা যায়, সে হৃদয়ে চাষ করছে অসহ্য যন্ত্রণা আর বেদনা।

অনেক ঝগড়াঝাটির পর যখন তার বিষাদগম্ভীর মুখটা দেখি, আমার বুকটা তখন হু হু করে ওঠে। পরক্ষণেই কেঁদে-কেটে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। মানুষটা আমাকে ক্ষমা করে দেয় কিনা জানি না। তবে মুখে বলে, “আচ্ছা, আচ্ছা, করলাম ক্ষমা। তবুও প্লিজ কেঁদো না।”

আমিও তবুও কাঁদি। ফিরে আসি বাস্তবতায়। বুঝে নেই আমার ঘরে কোনো বাচ্চা নেই। কোনো পুচকে সোনার হাসির শব্দে মুখরিত হয় না আমার ঘর। সত্যটা উপলব্ধি করতেই যেন আরও বাড়ে আমার পাগলামি। সারাক্ষণ উল্টাপাল্টা চিন্তা করি, কান্নাকাটি করি। মোবাইলে তখন রিলস, ইউটিউব সবখানে শুধু এই জাতীয় নাটকগুলোই আসতো যে—বাচ্চা না হওয়ায় বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি, কিংবা পরকীয়া, লুকিয়ে বিয়ে ইত্যাদি। স্বপ্নেও তাই দেখতাম। আর উন্মাদের মতো কাঁদতাম। আমার তখন হিতাহিতজ্ঞানশূন্য অবস্থা।
রান্না করলে একদিন লবণ হয় না তো আরেকদিন লবণে তিক্ত। তেল, ঝাল, মসলার অপ্রতুলতার পরিমাণ এতোটাই বাড়ে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। ভদ্রলোক অফিস থেকে ফিরে সেই অখাদ্য সোনামুখ করে খেয়ে নেয়। কারণ ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্য করলেই যে আমি ফনা ধরা ফণা ধরানো ফণিনীর মতো ফোঁস করে উঠব, সেই তথ্য ততদিনে বুঝে গিয়েছেন তিনি। আমাদের সংসারের অবস্থা তখন—কখনো আমরা চিরশত্রু বা কখনো চির অচেনা। কিন্তু এভাবে কত দিন? একই ছাদের নিচে এমন অপরিচিতের মতো বাস করা যায় না। আবার দুজন চিরশত্রুও একই বিছানায় ঘুমাতে পারে না। অবশ্য সবসময় অশান্তির সূচনা আমিই করতাম। সমাপ্তি ঘটতো তার, “আচ্ছা, আমার-ই ভুল। প্লিজ ক্ষমা করে দাও” বাক্যে।

একদিন পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি আমার কাছে এলেন। ভদ্রমহিলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। দারুণ মার্জিত কথাবার্তা, নমনীয় ব্যবহার, বাচনভঙ্গি চমৎকার। উনার সাথে কথা বললে খুব শান্তি শান্তি লাগে। শান্তিপ্রিয় মানুষটি আমার ঘরে এসে মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন,
“কেমন আছো নবনী? কী হয়েছে তোমার? এমন শুকিয়ে গিয়েছো কেন?”

আমি সত্যিই জানি না আমার কী হয়েছে? কেন বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে বসবাস করছি আমি? কেন ভুলে যাই নিজের অস্তিত্বের কথা? কেন অবাস্তব এক পৃথিবীতে খুঁজে বেড়াই সন্তান সুখ? অপার্থিব ওই জগৎ যে আমার নয়! বুঝেও কেন অবুঝের মতো কাজ করছি? কেন আমার সুখের সংসারে স্বেচ্ছায় বপন করছি অশান্তির বীজ?

আন্টির প্রশ্নের জবাবে ছোট করে বললাম, “ভালো।”
“তোমাদের মাঝে কী হয়েছে বলো তো! যদিও কারো দাম্পত্য জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমার নেই, তবুও রোজ রোজ তোমার চিৎকার কানে লাগছে। তুমি রাগ কোরো না নবনী, তোমার স্বামীর কন্ঠ তো কখনোই আসে না। একা একা তুমিই চিল্লাতে থাকো। কারণ কী নবনী?”

কারণ যে আমি নিজেও জানি না। তবে এটা জানি, ভদ্রমহিলা আমার স্বামীকে অতিমাত্রায় পছন্দ করেন। আমার স্বামীর ভদ্রতা, নমনীয়তা, যত্নশীল স্বভাবের কারণে উনি প্রায়ই গুণগান করেন। তার উপর সে রূপবান পুরুষ। এমন সৌন্দর্য আর মধুর ব্যবহার কোনো মানুষের মাঝে একসাথে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই কারণেই সকলে তাকে পছন্দ করেন ভীষণ। করেন কারণ, আশেপাশের অন্য ভাড়াটে পুরুষরা যখন অবসর সময়ে বাসায় থেকে এখানে ওখানে উঁকিঝুঁকি মারেন, প্রকাশ্যে সিগারেট ফোঁকেন, মেয়েদের আড্ডায় কেমন হ্যাংলামি করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন আমার স্বামী ঘরে বসে আমার সাথে খোশমেজাজে গল্প করেন। রান্নায় সাহায্য করেন। ঘরদোর পরিষ্কার করেন। আজ অবধি সে ভিন্ন কোনো মেয়ের দিকে চোখে চোখ রেখে কথা বলেনি, মাহতাব। নত মস্তকে সে চলাফেরা করে সবসময়। ওর এই ভদ্রতার কারণে সকলের কাছেই উনি প্রশংসিত। এই আন্টি যে আমার স্বামীকে নিপাট ভদ্রলোক ভেবে প্রগাঢ় এক স্নেহ অনুভব করেন তা আমি জানি। তাই উনার কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারলাম না।

আন্টি আবারও বললেন,
“সংসারে রোজ রোজ অশান্তি করা উচিত নয় নবনী। তোমার হাজবেন্ড খুবই ভালো ছেলে। ওর সাথে কেন ঝগড়াঝাটি করো? ও পুরুষ মানুষ, সারাদিন বাইরে খেটেখুটে আসে। বাসায় এসেও যদি একটু শান্তি না পায় তবে ওর কী ভালো লাগে? এমন চলতে থাকলে একটা সময় পর ওর ঘর থেকে মন উঠে যাবে। একটি সুন্দর সংসার কিন্তু এমনি এমনি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সহনশীলতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। তোমাকে এটা বুঝতে হবে।”

ভদ্রমহিলা একটু থামলেন। আমি মন দিয়ে উনার কথা শুনছি। উনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগে। দারুণভাবে উনি সামান্য বিষয়কেও অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেন। উনি আবার বললেন,
“দেখো নবনী, আমি জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এইটুকু বুঝেছি—সংসার আসলে একটা ফুলের বাগানের মতো। প্রতিদিন একটু করে যত্ন না নিলে সেখানে আগাছা জন্মাতে দেরি হয় না। স্বামী হচ্ছে মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে অবহেলা বা ঝগড়া দিয়ে নষ্ট কোরো না। দিনশেষে কিন্তু ক্ষতি তোমারই হবে। শোনো, ভালোবাসা দিয়ে যা আদায় করা যায়, তা ঝগড়া করে কোনোদিন হয় না। ও পুরুষ মানুষ, ওর উঁচু গলা আজ অবধি শুনলাম না আমি, অথচ তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার গলার স্বর আশেপাশের সবাই চেনে। অদ্ভুত না! ও কি চাইলেই তোমার সাথে চিৎকার করতে পারে না?”

ভদ্রমহিলা আরও অনেক অনেক জ্ঞানের কথা বিতরণ করলেন। আমি শুনলাম মন দিয়ে। কোনো কথা বললাম না। যাবার আগে উনি বললেন,
“তুমি কিন্তু আর ঝগড়া করবে না মাহতাবের সাথে। আজ বাসায় ফিরলে হাসিমুখে কথা বলবে। বুঝেছো?”

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম। বুঝালাম হাসিমুখেই কথা বলব। অশান্তি করব না আর। কিন্তু দেখা গেল আমি অশান্তি না করে থাকতে পারলাম না। চাপাস্বরে অশান্তি করলাম সেদিন। কারণ সে আসার কিছুসময় আগেই বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম আমি। হঠাৎ সে এসে যাওয়ায় আমার ঘুমন্ত বাচ্চাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রাণভরে দেখতেও পেলাম না। আর তখন থেকে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম আমি। তীক্ষ্ণ এক ধরণের ব্যথায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল আমার পৃথিবী। মাহতাবকে খুব করে গালি দিলাম সেদিন। একপর্যায়ে তুই-তুকারি করে পরিস্থিতি করে তুললাম আরও জটিল। আশ্চর্য, আমার সব অন্যায় মেনে নিলেও মাহতাব তুই সম্বোধন মেনে নিতে পারল না। চাপা আক্রোশে আমার বাহু চেপে ধরে বলল,
“এই যে এতো ঝগড়াঝাটি করি দুজনে। বিবাহিত জীবনের এতো বছরে খুব রাগ করেও কখনো তোমাকে তুই বলে ডেকেছি আমি?”

তার কন্ঠস্বর খুব অচেনা ঠেকল। আমি বুঝতে পারি মানুষটা ভয়ংকর রেগে গিয়েছে। এতোবছরের বিবাহিত জীবনে এতোটা রাগ করতে তাকে কখনোই দেখিনি। আমি ভয় পেলাম। মাহতাবের এই রূপ বড্ড অচেনা লাগল আমার। আমি এই মাহতাবকে চিনি না। আমি যাকে চিনি, সে আমার উপর চিৎকার করতে পারে না। সে আমার হাত এতো জোরে চেপে ধরার এখতিয়ার রাখে না। তার লাল টকটকে চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে ফেললাম। মাহতাব আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি তখন কাঁদলাম। ভীষণ করে কাঁদলাম। আমার কান্নায় ভিজে গেল বালিশ।

মানুষটা ঘরে ফিরল অনেক রাত করে। দরজা ভিড়িয়ে ঘর অন্ধকার করে আমি জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে ছিলাম তখন। সে এসে গলা খাঁকারি দিল। অন্ধকারেও কীভাবে যেন টের পেল আমি বসে আছি জানালার ধারে। ভারিক্কি কন্ঠে বলল,
“ঘুমাওনি কেন?”

আমি জবাব দিলাম না। তার সন্ধ্যার ব্যবহার আমি ভুলতে পারি নি। আমার মনটা তীব্র অভিমানে দ্রবীভূত হয়ে আছে। তীব্র অভিমান প্রকাশের ভাষা থাকে না। তাই তো নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে আমি বসে রইলাম নির্বিকার। মাহতাব এগিয়ে এসে বিছানায় পা তুলে আমার সামনে বসল। তার গা থেকে ভদভদ করে সিগারেটের গন্ধ আসছে। এই মানুষটা সিগারেট খেয়েছে? রাগে, ঘৃণায় আমার শরীর কাঁপতে লাগল। সিগারেটের গন্ধ আমার একদম সহ্য হয় না এটা সে জানে। তবুও? সে কাছে এগিয়ে আসায় আমি নাকে ওড়না চাপা দিলাম। তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে থাকলাম অন্যদিকে। মাহতাব জোরপূর্বক আমার হাত টেনে নিয়ে কোমল গলায় বলল,
“তখনকার ব্যবহারের জন্য সরি নবনী। আসলে আমার মাথা ঠিক ছিল না। তুই ডাকটা আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি তো আমার বৌ, ভালোবাসি তোমায় আমি। তুমি আমাকে তুই করে ডেকেছো দেখে আমার মাথাটা হুট করে গরম হয়ে গিয়েছিল।”

আমি ছোট করে শ্বাস ফেলে বললাম,
“ওহ আচ্ছা।”
“দেখো নবনী, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে সম্মানের। সেখানে তুই ডাকটা মানায় না। যতই ঝগড়া হোক, ঝামেলা হোক তবুও তুমি প্লিজ কখনো তুই করে ডাকবে না আমায়।”
এই প্রসঙ্গে কথা বাড়ালাম না। বরং বললাম,
“তুমি সিগারেট খেয়েছো?”

সে লজ্জায় মাথা নত করে নিল। অন্ধকারের মাঝেও স্পষ্ট দেখলাম তার অপরাধীর মতো নামিয়ে নেওয়া মুখ। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তার দিকে ধরতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। টকটকে লাল হয়ে আছে চোখ। বোঝা যাচ্ছে খুব কেঁদেছে। কিংবা সিগারেটের ধূম্রজালের কারণে জ্বলছে চোখ-মুখ। সিগারেটের গন্ধে আমার বমি বমি লাগছে। আমি করুণ গলায় বললাম,
“তুমি প্লিজ গোসল করে আসো। সিগারেটের গন্ধে আমার মাথা ঘুরছে।”

মাহতাব গোসল করে এল। এবং শুয়ে শুয়ে সারারাত এপাশ-ওপাশ করল সে। সকালে উঠে হঠাৎ বলল,
“ভাবছি তোমাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাব। এমন করে তো চলতে পারে না!”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কেন? পাগলের ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমার কী কাজ? আমি কি পাগল?”
সে কিছু বলল না। তবে চোখ-মুখ দেখে ধারণা করলাম সে আমাকে সত্যিকার অর্থেই পাগল ভাবছে। আচ্ছা, আমি কি সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি? ভাবতে গিয়েই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমার সমস্ত বোধ অসাড় হয়ে গেল। লোপ পেতে থাকে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা। আমার জগৎ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় একটা বাচ্চা। গোলগাল চেহারার সুন্দর একটা বাচ্চা।

পরবর্তী কয়েকদিন মাহতাব খুব চেষ্টা করল আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার। কিন্তু আমি তো পাগল নই। কেন যাব পাগলের ডাক্তারের কাছে? বরং মাহতাব আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় ভেবেই আমার কান্না পায়। শেষ অবধি আমাকে পাগল প্রমাণের জন্য এমন উঠেপড়ে লাগল মাহতাব? অবশ্য লাগবেই তো! আমাকে পাগল প্রমাণ করে কোনোভাবে দায়মুক্ত হতে পারলেই তো আবার বিয়ে করতে পারবে সে। তীব্র আর প্রচন্ড একটা দম বন্ধ করা অনুভূতি বয়ে চলে আমার বুক জুড়ে। কী করব, কোথায় যাব? আমার ভবিষ্যৎ কী ভেবেই অস্থির হই। আর সংসারে বাধাই অশান্তি।

পনেরো দিন কেটে যাবার পরেও যখন পিরিয়ড হলো না, তখন মাহতাব চিন্তায় পড়ে গেল। আমাকে আবার নিয়ে যেতে চাইল ডাক্তারের কাছে। কিন্তু আমার ভয় হলো, ভুলিয়ে মিথ্যে বলে সে যদি আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়? আমি ডাক্তারের কাছে যাবার প্রসঙ্গে নিমরাজি হলাম। শত চেষ্টা করেও মাহতাব আমার সংকল্পে কিঞ্চিৎ ফাটল ধরাতে পারল না। বুঝাতে পারল না, আমাকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নয়, গাইনি চিকিৎসকের কাছে যাবে সে।

তবে মাহতাব নিজেও তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তারও তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। একদিন প্রচন্ড ঝগড়ার পর আমার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা দেখে আমাকে মায়ের কাছে রেখে গেল সে। এছাড়াও আরেকটা কারণ বোধহয় ছিল। কোনো এক বজ্জাত পাগলের ডাক্তার সব শুনে তাকে বলেছে,
“আপনার স্ত্রীর থেকে কয়েকদিন দূরত্ব বজায় রাখুন আপনি। দেখুন তার মানসিক অবস্থা কী হয়। হতে পারে একা একা থাকার কারণে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছেন। উনাকে সবসময় লোকসমাগমের মাঝে রাখা দরকার।”

মাহতাব আমাকে রেখে চলে গেল। এখানে আমার খুব সমস্যা হয়েছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। আমার তিন চাচার পাশাপাশি বাড়ি। সুতরাং জায়গা সংকুলান থাকলেও মানুষের সংকট নেই। সারাদিন বাচ্চাকাচ্চা-র ক্যাঁচক্যাচ। আমার এসব বাচ্চাকে ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে নিজের ওই সোনা বাচ্চাকে। অথচ তাকে দেখতে পাই না আমি। ওই যে বললাম, খুব যখন একা থাকি তখন সে আসে। এখানে একা থাকার পরিবেশ কোথায়? তাছাড়া আরেক যন্ত্রণা হয়েছে আমার। আমি কিছুই খেতে পারি না। শুধু লেবু আর মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাই। চেহারা শুকিয়ে শেষ। নিয়মিত ডাক্তারের ওষুধ খাবার পরেও আমার পিরিয়ড হচ্ছে না দেখে মা আবার ভালো বড় ডাক্তার দেখাবেন বলে ভাবলেন। এদিকে কোরবানির ঈদ আসন্ন। জেলা শহরের বড় গাইনি ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়া গেল ঈদের পর। আমি সন্দেহের সুরে মাকে ডেকে বললাম,
“আচ্ছা মা, তুমিও আমাকে মিথ্যে বলে পাগলের ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে না তো!”
মা কঠিন মুখে জবাব দিল, “পাগলের ডাক্তার কেন দেখাব, তুই কি পাগল? আশ্চর্য! আর শোন, আজকে জামাই আসবে। ওর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঈদ করবি।”

আমি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলাম। এবং ওর অফিস ঈদের ছুটি হবার দিনেই চলে গেলাম শ্বশুরের ভিটেতে ঈদ করতে। কিন্তু আনন্দের ঈদ তো সকলের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না, কারো কারো জন্য বয়ে আনে বিষাদ!

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৮

#নীল_ধ্রুবতারা [৮]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“তোমায় দেখতে দেখতে আমি,
যেন অন্ধ হয়ে যাই।
দুনিয়াতে তুমি ছাড়া,
কিছু দেখার তো আর নাই।”

গোসল সেরে বের হয়ে ওয়াশরুমের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল মাহতাব। গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল প্রিয় গানটি। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ওর মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। বুকে হাত দিয়ে মাহতাব বলে উঠল,
“এমন করে হেসো না, নবনী। তোমার হাসি যে আমার মরণাস্ত্র।”

এই লোকটা বরাবর অতিরিক্ত প্রশংসা করে। কখনো যদি সামান্য মাথায় ঘোমটা দিয়েও তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, সে বলবে,
“কী আশ্চর্য, আজ তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে কেন, নবনী?”

আমি কৃত্রিম অভিমান করে বলি,
“শুধু আজ লাগছে? অন্য সময় লাগে না?”
“সবসময় লাগে।”— দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয় সে।

কোনো খাবার রান্না করলে প্রশংসায় ভাসায় আমাকে। এমন একটা ভাব করে যেন এতো সুস্বাদু খাবার সে জীবনেও খায়নি। কে জানে— এটা হয়তো আমাকে খুশি করার একটা টেকনিক। তার এই অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে আমি ফুলে-ফেঁপে বেলুন হয়ে যাই। আজও হলাম। এগিয়ে গিয়ে তার সদ্য মেদ জমতে থাকা পেটে একটু গুতো দিয়ে কপাল কুঁচকে শুধালাম,
“সারাক্ষণ ফ্লার্টিং! আমাকে পটানোর জন্য এতো পাম দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমার বিয়ে করা বউ।”
“আমি তোমাকে পাম দেই? এটাই মনে হয় তোমার?”

মাহতাব ভারী বিস্মিত হয়। যেন এমন মিথ্যে দোষারোপ শুনে সে খুবই মর্মাহত হয়েছে। আমি হতাশ হয়ে তার কাঁধের তোয়ালে কেড়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলাম। দড়িতে ভেজা তোয়ালে মেলে দিয়ে ফিরে আসার সময় টের পেলাম মাহতাব আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার উন্মুক্ত বুকে ধাক্কা খেলাম আমি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“ভূতের মতো চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো, খাবে চলো।”

মাহতাব আমাকে কায়দা করে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নাক ডুবাল আমার ঘাড়ে। তার উষ্ণ নিশ্বাস তোলপাড় তুলল আমার বুকে। ফিসফিস করে বললাম,
“কী করছ, কেউ দেখে ফেলবে।”
“কেউ দেখবে না। আর দেখলেই বা কী? আমি আমার বউকে জড়িয়ে ধরেছি। তাতে কার কী?”

চারদিকে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে বহু আগে। দেখাদেখির কোনো বিষয় নেই। তবুও আমি করুণ গলায় বললাম,
“ছাড়ো।”
“কেন ছাড়ব? ছাড়ার জন্য ধরেছি নাকি?”
“তোমার না খিদে পেয়েছে। এসো, ভাত দিই।”
“যার বউ রাত দুপুরে পরী সেজে বসে থাকে, তার খিদে ভাতে মিটে না।”

আমি জোর দিয়ে ওর হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে নাক টেনে দিয়ে বললাম,
“কিসে মিটে তবে?”
“বোঝো না?”
“না।”
“ঘরে চলো, বুঝাচ্ছি।”
মানুষটা আমাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক আক্রমণে আমি আঁতকে উঠে বললাম,
“আরে, পড়ে যাব তো!”

মানুষটা আমাকে পড়ে যাওয়ার সুযোগ দিল না। সেই রাতে খুব করে ভালোবাসল সে আমায়। রাতের খাওয়ার চিন্তা বেমালুম ভুলে গিয়ে মত্ত হলো আমাতে। মধুর মিলন শেষে তার বুকে মাথা রেখে আহ্লাদী গলায় বললাম,
“আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“আমি কি তোমাকে কখনো মিথ্যে কথা বলি?”
“না, বলো না। কিন্তু আজ খুব সত্যি করে একটা কথা বলো তো…”

মাহতাব কান খাড়া করে রইল। আমি আলতো হাতে আঁচড় কাটতে লাগলাম তার বুকে। কথাটা কীভাবে গুছিয়ে বলা যায়, সেটাই ভাবতে লাগলাম। মাহতাব আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল,
“চুপ করে আছো কেন? বলো, কী জানতে চাইছ?”

আমি শুকনো ঢোক গিললাম। অন্ধকারে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। বিড়বিড় করে বললাম,
“আচ্ছা, আমার যদি বাচ্চা না হয়, তবে কি তুমি আরেকটা বিয়ে করবে?”

মাহতাব তার বুক থেকে আমাকে সরিয়ে দিল। তার দিকে তাকিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে রইলাম আমি। সে দুই হাতে আমার গাল চেপে ধরে আক্রোশ নিয়ে বলল,
“পাগলের মতো কথা বলছ কেন, নবনী? বাচ্চা না হলে আমি আবার বিয়ে করব কেন? একটা সংসারে বাচ্চাই কি সব? আল্লাহ যদি আমাদের বাচ্চা না দিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তবে তাই সই। আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনার ওপর অখুশি হবার তুমি-আমি কে? এসব আজাইরা কথা ভেবো না। এই যে আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি, তুমি আমায় ভালোবাসো—এসব কি কিছুই নয়?”

আমি চুপ করে রইলাম। মাহতাব গাল ছেড়ে কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। করুণ গলায় জানতে চাইল,
“নবনী, আমাদের এতো ভালোবাসার পরেও কি একটা সংসার পূর্ণতা পায় না? এই ভালোবাসা নিয়ে আমরা কাটিয়ে দিতে পারি না গোটা জীবন?”

আমি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। এই মানুষটার সাথে গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো সৌভাগ্যের আর কী-ই বা আছে? সে আমাকে যতটা ভালোবাসে, এতো ভালো আর কেউ কখনোই বাসে নি। তবুও আমার ভয় লাগে। সেই ভয় থেকেই চোখের কোণ বেয়ে নামে অসহায়ত্বের অশ্রু।

আমার কান্না দেখে হতাশ হলো মাহতাব। বলল, “বোকার মতো কাঁদছ কেন? এই কান্না যদি বাচ্চার জন্য হয়, তাহলে বলব—বিয়ের এতোদিন পরেও তুমি এখনো আমাকে চিনতে পারোনি, নবনী।”

আমার কান্না বাড়ল। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম। মাহতাব আমাকে আগলে নিয়ে সান্ত্বনা দিল,
“শোনো, বাচ্চা হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া আমানত। এখন আমার মালিক যদি আমাকে সেই আমানত না দিয়ে খুশি থাকেন, তবে আমাদের কি উচিত নয় ভাগ্যকে মেনে নেওয়া? তুমি জানো, আমার দূরসম্পর্কের এক আপুর বিয়ের বিশ বছর পর বাচ্চা হয়েছে। উনি একটা মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন। সেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর, যখন মেয়ের বাচ্চা হবে, তখন দেখা গেল এতো বছর পর উনিও প্রেগন্যান্ট। তাহলে বোঝো, আল্লাহর বিচার কত চমৎকার!”

মাহতাব আরও অনেক হাদিস, কুরআনের কথা বলল। নিজের জানা এমন অনেক ঘটনার বিস্তারিত জানাল আমাকে। শেষে আমাকে এটা বলেও আশ্বস্ত করল যে—সিস্ট থাকলেও বাচ্চা হয়। শুধু নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা প্রয়োজন। তার এসব ছেলেভুলানো কথায় অবশ্য আমার হৃদয় তৃপ্ত হলো না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। এবং ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম।

একটা ফুটফুটে বাচ্চা আমার কোলে বসে আছে। বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। সে খুব হাসছে। কী যে সুন্দর হাসি! মায়াবী মুখ। গোল গোল চোখ। সেই চোখ চকচক করছে খুশিতে। আমার এতো ভালো লাগল বাচ্চাটাকে। আমি তাকে খুব করে আদর করলাম। স্বপ্নে মনে হলো এটা আমারই বাচ্চা। আমি নিজের বাচ্চার গালে অসংখ্য চুমু খেলাম। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলাম তার ছোট্ট মুখ। অনেকক্ষণ খেলার পরে বাচ্চাটা কাঁদতে লাগল। আমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরময় হাঁটতে লাগলাম। একসময় তার কান্না থামল। আমি নিঃশব্দে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম।

“বউ!”
আমার ঘুম ভাঙল মাহতাবের ডাকে। ঘুম ভাঙলেও ঘোর কাটল না আমার। মাহতাবের ‘বউ’ ডাকে মেজাজ হারালাম হঠাৎ। কঠিন চোখে তাকিয়ে মুখ চেপে ধরে চাপা স্বরে বললাম,
“হুশ! দেখছ না, বাবু ঘুমাচ্ছে। একদম শব্দ করবে না।”

সে অবাক হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। অবশ্য পরপরই নিজেকে সামলে নিলাম আমি। খেয়াল করলাম—মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে নামাজের আহ্বান। তার মানে ভোর হয়ে এসেছে। শুনেছি ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। যদিও আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হওয়ার নয়। ইশ! আফসোসের অনলে দ্রবীভূত হলো আমার মন।

মাহতাব বলল,
“স্বপ্ন দেখছিলে নাকি?”
“হুঁ।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম। আমার জীবনে এই স্বপ্নটা ভয়ংকর সুন্দর। ইশ! এমন সুন্দর স্বপ্ন যদি রোজ দেখতে পেতাম। গোসল করে মাহতাব নামাজে চলে গেল। আমিও গোসল সেরে এসে চা বানালাম। রান্না করলাম। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে দিনের কাজকর্ম গুছিয়ে নিলাম আমি। মাহতাব অফিসে চলে গেলে অখণ্ড অবসর নিয়ে ভাবতে বসলাম। ভাবতে লাগলাম আমাদের প্রেম থেকে বিয়ের ঘটনাগুলো। মাহতাব আমাকে প্রথম সাক্ষাতের দিন কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। অথচ আমি ভেবেছিলাম সে বোধহয় হাঁটু মুড়ে বসে আমাকে গোলাপফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
“নবনী, আই লাভ ইউ। ডু ইউ লাভ মি?”

কিন্তু সে দাঁড়িয়ে থেকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে ফটাফট বলে দিল, “আই লাভ ইউ।”

তার গলা কাঁপল। দৃষ্টি এলোমেলো হলো। আশ্চর্য! কথাটা বলার সময় সে একটা বার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। তার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছিল দূরের সুপারি গাছ, উড়ন্ত পাখি, দূরের পাঁচতলা বিল্ডিং ইত্যাদি ইত্যাদিতে। তখন আমার মনে হলো, ইশ! কী গাধা ছেলের প্রেমেই না পড়েছি। গাধা ছেলের আমাকে প্রেম নিবেদনের মাঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বৃষ্টি। ঝকঝকে সূর্যের আলো সরে গিয়ে হঠাৎ আকাশ ঢেকে গেল কালো মেঘে। আমাদের ভালোবাসা-বাসির দৃশ্য বদলে গেল তখন। দুজনে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম আমরা। দিঘির মাঝে যে সুন্দর ছাতাটা আছে, তার নিচেই দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাহতাব অপূর্ব ব্যবস্থা দেখে বিড়বিড় করে বলল,
“বাহ, এটা খুব দারুণ তো!”

বলতে বলতে সে অপার মুগ্ধতা নিয়ে চারপাশে দেখতে লাগল। আমি এক দৃষ্টিতে অন্যমনস্ক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আকাশ থেকে রুপোলি সুতোর মতো টিপটিপ করে বৃষ্টি নামছে। বিরামহীন বৃষ্টি। আমরা দুজনে একসাথে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় বৃষ্টি দেখলাম। কোনো কথা বললাম না। আমি বোধহয় বৃষ্টি নয়, এক নজরে পলক না ফেলে তাকেই দেখছিলাম। আর অনুভব করছিলাম অসম্ভব সুপুরুষ একজন মানুষের সাথে আমার প্রেম হয়েছে।
সুদর্শন পুরুষটি একসময় আমাকে বলল,
“তোমার হাতটা দেবে, নবনী?”

তার এই আবদার শুনে আমার শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। সে আমার হাত ধরতে চাইছে? কী আশ্চর্য কথা! জীবনে কখনো পুরুষের সংস্পর্শে না যাওয়া আমি ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেলাম। নিজের হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালাম। সে অনুরোধের স্বরে বলল,
“প্লিজ দাও।”

আমি আরও গুটিয়ে নিলাম নিজেকে। পিছিয়ে গেলাম দু কদম। মানুষটা আমার দিকে দু কদম এগিয়ে এল। তীব্র অধিকারবোধ থেকে আমার হাত টেনে নিয়ে পকেট থেকে আঙটি বের করে পরিয়ে দিল অনামিকায়। আমি এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিতে পারলাম না। আমার সমস্ত বোধ, শক্তি অসাড় হয়ে গিয়েছে। আমি টের পাচ্ছি, যতটা সাহস নিয়ে উনি আমার হাত ধরেছিলেন, সেই সাহস কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে আকাশে। তিরতির করে তার হাত কাঁপছে। আমার তখন খুব হাসি পেল। ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম,
“ওরে আমার সাহসী রে! এমন ইঁদুরের কলিজা নিয়ে প্রেম করলেন কীভাবে আপনি?”

মানুষটার সাথে সেই আমার বাস্তবে বলা প্রথম কথা। মেসেজে সারাক্ষণ ‘তুমি’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা আমি, ‘আপনি’ বলেই সম্ভোধন করেছিলাম তাকে। আমার কথা শুনে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সে। আমতা আমতা করে বলছিল,
“আসলে নার্ভাস লাগছে খুব।”
“আমারও।”
সে আমার কথা শুনে মুচকি হাসল। আমি তার হাসি দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। মানুষটা কি জানে হাসলে তাকে কতটা সুন্দর লাগে? সে কি জানে—তার হাসি দেখে একটা রমণীর হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে? এবং সে একজন ভয়ানক সুপুরুষ! জানে মানুষটা? কী ভীষণ রূপবান সে!

আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইলাম। আমার এই উনিশ বছরের জীবনে এমন সুদর্শন পুরুষ কখনোই দেখিনি আমি। একসময় সে বলল,
“তারপর বলো, কেমন আছো?”
“ভালো। আপনি?”
“আগে শুধু ভালো ছিলাম। এখন খুব বেশি ভালো আছি।”
“কেন? বেশি ভালো কেন?”
“কারণ নবনী নামের এক সুন্দরী মেয়ের সাথে আজ আমার দেখা হয়েছে। তাকে দেখার পর থেকে আমি ভীষণ ভীষণ ভালো আছি।”

আমার ভীষণ লজ্জা লাগল। আমি সুন্দরী নই। তবুও মানুষটা কেমন গর্বের সহিত ‘সুন্দরী’ দাবি করছে আমাকে! যেন আমি বিশ্বসুন্দরী। আচ্ছা, এই মানুষটা এতো ভালো কেন? কেন এতো ভালো সে? আমার খুব কাঁদতে মন চাইল। সুখের কান্না। নিজের হাতের চিকন সোনার আঙটির দিকে আমি একমনে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটা খুলতে খুলতে তাকে বললাম,
“এটা আমি নিতে পারব না, মাহতাব। আপনি এটা নিজের কাছে রাখুন।”

মাহতাব আঙটিটা নিল না। মর্মাহত হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
“কারণ, মা আমার হাতে আঙটি দেখলে সন্দেহ করবে। এটা আবার স্বর্ণের আঙটি। আমাকে জিন্দা দেখতে চাইলে এইটা আপনি সাথে নিয়ে যান।”

মাহতাব জোর দিয়ে বলল,
“আমি এটা তোমার জন্য এনেছি। তিন মাসের স্যালারি থেকে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে কিনেছি আঙটিটা। প্লিজ ফিরিয়ে দিও না।”

অনেক জোরজবরদস্তি করেও আমি তাকে হারাতে পারলাম না। শেষ অবধি এই আঙটির সৎগতি করলাম বান্ধবীর কাছে গচ্ছিত রেখে। সে লুকিয়ে রাখল তার বাড়িতে নিয়ে। তার আরও অনেক দিন পরে সেটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বললাম,
“মা, একটা আঙটি পেয়েছি। দেখো তো এটা স্বর্ণের কিনা!”

মা হাতে নিয়ে দেখেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় পেয়েছি। আরও অনেক জেরার পরেও যখন সন্দেহের অবকাশ রইল না, তখন স্বর্ণের আঙটি বলেই ঘোষণা দিলেন। এবং যেহেতু এটা কুড়িয়ে পেয়েছি আমি, সেহেতু এই বস্তুর আসল উত্তরাধিকারীও আমি। আঙটিটা সেভাবেই হস্তগত হয়েছিল আমার।

যা ভাবছিলাম—সেদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে হুড়তোলা রিকশায় সারা শহর ঘুরেছিলাম আমরা। বসেছিলাম নামী-দামী রেস্টুরেন্টে। অবশ্য কাবাবের মাঝে হাড্ডি হয়েছিল আমার প্রিয় বান্ধবী। একা একা একটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সাহস আমার কোনো কালেই ছিল না। সেদিন আমাদের আরও অনেক মধুর আলাপ হয়েছিল। হাস্যরসের সাথে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম তিনজন। এরপর সন্ধ্যার ঠিক আগে বিষণ্ণ মনে সে বিদায় নিয়েছিল আমার থেকে। আমার শহর থেকে। দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে ধরণীতে যখন আয়োজন করে সন্ধ্যা নামছে, তখন মাহতাবকে বিদায় দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। সে এখন চলে যাবে! সারাদিনের এতো মধুর ঘটনাগুলো কেবলই স্মৃতি হয়ে রবে আমার মনে। এই পৃথিবী কী ভীষণ নিষ্ঠুর! যে পৃথিবীতে মাহতাব নেই, সেই পৃথিবী কী ভীষণ জঘন্য!
মানুষটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা হু হু করে উঠল। মনে মনে হাজারবার তাকে প্রশ্ন করলাম, কেন এলে মাহতাব? কেনই বা চলে যাচ্ছো? আমাকে এতো কষ্ট দেওয়ার কী-ই বা প্রয়োজন ছিল? সে শুনল না আমার প্রশ্ন। বরং অতলান্ত বিষাদের ছায়া মুখে মেখে এগিয়ে এল আমার দিকে। চোখের চপল চাহনি মিলিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। সেথায় বাসা বেঁধেছে এক পৃথিবী বিষাদ। তার ওই আর্দ্র চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বড় মায়া হলো। চোখের জলকে বাঁধন দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম আমি। মাহতাব ভেজা কণ্ঠে, নিচু স্বরে শুধাল,
“আবার কবে দেখা হবে, নবনী?”

তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া নিবিড় আকুলতা আমার বুকের ভেতরে তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিঁধল। মনে হলো মরণবাণ কেউ ছুঁড়ে দিয়েছে আমার হৃদয়ে। চোখের কোণায় এসে জমা হয়েছে এক পৃথিবী কান্না। কিন্তু এখন আমি কাঁদলে মাহতাবও যে কেঁদে ফেলবে। ভরা বাজারে পুরুষের কান্নার মতো লজ্জার দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি না আমি। নিজের ভেতরের সবটুকু হাহাকার এক ম্লান, করুণ হাসির আড়ালে চেপে রেখে নির্লিপ্ত গলায় বললাম,
“তুমি যখন চাইবে…”

কথাটা বলেই চোখ নামিয়ে নিলাম। এর বেশি কিছু বলার অধিকার বা শক্তি—কোনোটাই তখন আমার ছিল না। আমি তাকে চাইলেও বলতে পারতাম না, ‘আরেকটু থেকে যাও!’ কিংবা, ‘যেও না, মাহতাব।’ সেই অধিকারটুকু পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কিছু মাস।
সেই বিদায়ের লগ্নে মাহতাব আর একটি কথাও বলেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের বিষণ্ণ অবয়বটা টেনে নিয়ে সে বাসের দিকে পা বাড়িয়েছিল। আমিও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এক মহাসমুদ্র শূন্যতা বুকে নিয়ে। দূরপাল্লার বাসটা আমার প্রিয় পুরুষকে বুকে টেনে নিয়ে ছেড়ে গেল আমার শহর। আচ্ছা, আমি কেন বাস হলাম না? কেন হলাম না, প্রিয় মানুষ বুকে নিয়ে বেড়ানো যান?

—চলমান—