বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 7



নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৭

#নীল_ধ্রুবতারা [৭]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

মাহতাব মসজিদ থেকে ফেরার আগেই আমি চা বসালাম। আজ অনেক দিন পরে মাহতাবের জন্য তার প্রিয় আদা দিয়ে লিকার চা বানালাম। পিরিচের এক পাশে দিলাম দুটো নোনতা বিস্কুট। স্বাস্থ্যসচেতন স্বামী আমার। নিজের রাজকীয় ভুঁড়ি নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছেন বেশ। এমনিতে ভদ্রলোকের শরীরে মেদ নেই। কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে পেটের দিকটা সামান্য উঁচু হয়ে উঠেছে। বোঝা যায় না। তবে আমি তাকে এই সমস্যাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই। তখন তার মন্তব্য থাকে—
“ভুঁড়ি হচ্ছে রাজা-বাদশাহদের প্রতীক। সিক্স প্যাক থাকে প্রহরীদের। রাজা-বাদশাহদের সিক্স প্যাক থাকে না, বোকা।”

আমি অবাক হয়ে তার যুক্তির বাহার দেখি। অতঃপর শরীর দুলিয়ে হেসে ফেলি। আমার হাসি দেখে সে গম্ভীর হয়। বলে,
“এমন করে হাসছ কেন?”
“কেন, হাসলে কী সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা।”
“আমি তো তাহলে আরও বেশি করে হাসব।”

বলেই আমি আরও খিলখিল করে হাসি। উনি চোখ-মুখ কঠিন করে বলেন,
“ইস! কী বিশ্রী হাসি তোমার। দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করে।”
আমি সলজ্জ হেসে বলি,
“বহু আগেই তো পড়েছ।”
ভদ্রলোক আমার কাছাকাছি এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলেন,
“রোজ নতুন করে আবার প্রেমে পড়ছি।”
“তাহলে বলতে হয়, তোমার চরিত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝলে?”
“বুঝলাম।”

আমার দেওয়া অপবাদ মাথা পেতে নেন ভদ্রলোক। তার মহানুভবতায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। মেনে নিয়ে আরও একটু কাছে এগিয়ে আসেন। চোখে চোখ রেখে গাঢ় স্বরে বলেন,
“নবনী, তুমি বড্ড জ্বালাও আমায়।”
“বেশ করি।”
“আমি তোমার একমাত্র স্বামী। আমাকে এভাবে জ্বালাতন করা কি ঠিক?”
আমার আর জবাব দেওয়ার পরিস্থিতি থাকে না। হাসি কেবল। অতঃপর গভীর চুম্বনের আবেশে বুজে আসে চোখ। মানুষটা আমাকে যত্ন করে টেনে নেয় কাছে। আলতো আদর আর দুষ্টুমিতে সুন্দর হয়ে ওঠে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

চা বানিয়ে মানুষটার অপেক্ষা করতে করতে সুখস্মৃতি কল্পনা করতে থাকি আমি। যখন অনুভব করি অনেক বেলা হয়েছে, তখন সচকিত হয়ে আশেপাশে তাকাই। ফোন হাতে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সময় দেখি। একি! বেলা তো অনেক হলো! মাহতাব কোথায়? মাহতাবের অফিস টাইম শুরু হয়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়ে আর বাসায় এল না সে? কিন্তু কেন? রাতের ঝগড়াঝাটির কারণে? আমি চিন্তায় অস্থির হয়ে একের পর এক কল দিতে থাকলাম তার নম্বরে। কিন্তু সে ধরল না। আমি হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে ক্রমাগত মেসেজ করলাম তাকে। সে সিন করে রেখে দিল।
এক প্রহর অপেক্ষায় কাটানোর পর মাহতাবের কল এল দুপুরে। রিসিভ করতেই গম্ভীর গলায় বলল,
“কল দিয়েছিলে?”
“হুঁ।”
“কেন?”
“কেন মানে কী? আমি তোমায় কল দিতে পারি না?”
“পারো, অবশ্যই পারো। কিন্তু তোমার যা মেজাজ! তাই…”

তার গলার স্বর বড্ড অচেনা লাগে আমার। কঠিন গলায় জানতে চাই—
“তাই কী?”
“অবাক হলাম কল দিয়েছ দেখে।”
“তুমি আমার সাথে এমন রূঢ়ভাবে কথা বলছ কেন?”

আমার অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় করা প্রশ্ন শুনে সে বোধহয় অবাক হলো। বিস্মিত কণ্ঠে ভেসে এল—
“আমি রূঢ়ভাবে কথা বলছি?”
আমি কঠিন গলায় বললাম,
“হ্যাঁ, বলছ। বাই দ্য ওয়ে, এখন কোথায় তুমি?”
“অফিসে।”
“অফিসে! অফিসে মানেটা কী? তুমি তো সকালে নামাজে গিয়েছিলে, সেখান থেকে অফিসে গেলে কী করে?”
“যেভাবেই আসি। সেটা জেনে তুমি কী করবে? গতকাল রাতেই তো বলেছ, আমাকে তোমার সহ্য হয় না।”

নিজের এহেন কথায় অপরাধবোধ হলো আমার। রাগের মাথায় ভালোবাসার মানুষকে এত বড় কথাটা বলা উচিত হয়নি। বড্ড ভুল হয়ে গেল। আমি তাকে সরি বলতে যাব, তখনই সে বলল,
“অসহ্য আমিটা তোমার আশেপাশে না ঘেঁষার চেষ্টা করছি। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তুমি ভালো না বাসলে কী হবে? আমি তো বাসি।”

আমি তখন সশব্দে কেঁদে উঠলাম। আমার প্রিয় পুরুষ এত কঠিন করে আমার সাথে কথা বলতে পারে? কী আশ্চর্য! এমন অপরিচিতের ভঙ্গিতে মাহতাব কখনো আমার সাথে কথা বলেনি। আমার হেঁচকি তুলে কান্নার শব্দে মাহতাব অস্থির হয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে বহু কষ্টে যেই কঠিন খোলস গায়ে জড়িয়ে রেখেছিল, সেটা খুলে গেল দমকা হাওয়ায়। ব্যস্ত হয়ে শুধাল,
“এই নবনী, কাঁদছ কেন? কী হয়েছে তোমার?”
আমি জবাব দিলাম না। কেনই বা দেব? যেই মানুষটা আমাকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ আঘাত দিয়ে কথা বলে না, সেই মানুষটা আমাকে কঠিন কথা বলেছে ভেবেই— আমার অভিমানী মন নিশ্চুপ রইল। মাহতাব অপরাধীর স্বরে বলল,
“আচ্ছা, সরি। আমার ভুল হয়েছে। প্লিজ নবনী, কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমার কষ্ট হয়। সেটা তুমি জানো না?”

আমি জানি। খুব জানি। কিন্তু তার এই আহ্লাদি ধরনের কথাবার্তা আমার সহ্য হলো না। এই বিষয়ে বললাম না কিছুই। বরং কাঁদো কাঁদো কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব কঠিন করে বললাম,
“তুমি এক্ষুনি বাসায় এসো। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।”
“আচ্ছা, দেখছি।”

বলেই মাহতাব কল কেটে দিল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম তার ফেরার। সারাদিন অপেক্ষার পরেও সে এল না। সন্ধ্যার সময় বিষণ্ণ মনে বিছানায় শুয়ে রইলাম আমি। ঘরের লাইট বন্ধ। অন্ধকার ভীষণ ভালো লাগে আমার। মন চায় আজন্মকাল ধরে আঁধারের সাথে সম্পর্ক করে মুখ ফিরিয়ে নিই আলোর থেকে। আমার জীবনে এমনিতেও তো কোনো আলো নেই। এই নিদারুণ অন্ধকারে বসে একটা বিষয় খেয়াল করেছি— মা হতে পারব না এই সংবাদটা শোনার পর থেকে যখন খুব একা থাকি, তখনই আমার গাঢ় মন খারাপ হয়। কোনো মানুষের সাথে থাকলে মন খারাপ কিছুটা কমে। তবে সেই মানুষটা আমার ঘরের ভদ্রলোক নয়। তাকে দেখলেই কেন যেন ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে আমার। আজ সেই ইচ্ছে হলো না।

ভরসন্ধ্যায় অন্ধকারে শুয়ে থেকে আমার মনে হলো— আজ বহুদিন ভদ্রলোক আমাকে ভালোবাসেন না, আদর করেন না। আমি বহুদিন তার বুকে মাথা রেখে ঘুমাই না। মাত্র একদিনের দূরত্ব যেন সহস্র বছর মনে হলো আমার।

ভদ্রলোক বাসায় ফিরলেন মাগরিবের পর। ঘরে এসে লাইট জ্বালালেন। আমার অন্ধকারে সয়ে আসা চোখজোড়া হঠাৎ আলোর ঝলক সহ্য করতে পারল না। তীব্র গতিতে চোখ-মুখ খিঁচে নিলাম আমি। ভদ্রলোক গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে বললেন,
“সন্ধ্যাবেলায় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছ কেন? শরীর খারাপ নাকি?”

আমি টের পেলাম ওর গলার স্বরে প্রচুর ক্লান্তি মিশে আছে। তাকিয়ে দেখলাম চোখ-মুখ উদভ্রান্ত, চুল এলোমেলো, তাকানোর ভঙ্গি ক্লান্তিময়। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত রাখলেন। আমি সেই হাত সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলাম। আমার দৃষ্টিতে প্রশ্ন। সে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“বিশ্বাস করো, খুব চেষ্টা করেছিলাম চলে আসার। বসকে বারবার ছুটির কথা বলেছি, দেয়নি। আসলে আজ প্রচুর কাজের চাপ ছিল।”

আমি করুণ চোখে তার দিকে তাকালাম। তার মুখটা শুকনা। ঘামে ভেজা দেহটা নিয়ে ইতোমধ্যে সে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে। মাথার উপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। সে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কিছু রান্না করেছ নবনী? আসলে খুব খিদে পেয়েছে।”

একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “আসলে প্রচুর টায়ার্ড লাগছে। না হলে আমিই রান্না করতাম। আর যেহেতু আজ আমি সকালে না খেয়েই বেরিয়ে গেছি— ভাবলাম তুমি হয়তো রান্না করেছ। না করলেও সমস্যা নেই, আমি হোটেল থেকে নিয়ে আসব।”
আমি শীতল গলায় বললাম,
“তার প্রয়োজন নেই। আমি রান্না করেছি।”
মাহতাব চকচকে চোখে উঠে বসল। বলল,
“মেনু কী?”

আমি ভর্ৎসনা করে বললাম,
“গরিবের আবার মেনু!”
“কে বলেছে আমরা গরিব? নিজেদের সুস্থ-স্বাভাবিক হাত-পা আছে। সেটা কাজে লাগিয়ে যা রোজগার করছি সেটাই আমাদের রিজিক। আলহামদুলিল্লাহ। সব সময় শুকরিয়া আদায় করবে, বুঝলে?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম। সে হেসে আমার এলোমেলো খোলা চুল আরও এলোমেলো করে দিল। অতঃপর আমার কাঁঁধে মাথা রেখে বলল,
“এবার বলো কী রান্না করেছ?”
“করলা ভাজি আর কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করেছি।”
“বাহ! আমি তাহলে চট করে গোসল সেরে আসছি। একসাথে খাব।”

আমি মাথা মৃদু ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলাম। বিছানা থেকে নামার আগে মাহতাব তীব্রভাবে শুষে নিল আমার চুলের ঘ্রাণ। অতঃপর প্রশ্ন করল,
“শ্যাম্পু করেছ নাকি?”
“হুঁ।”
“ভালো।”
ভালো যে, আমি তো তা ভালো করেই বুঝি। মানুষটা আমাকে পরিপাটি দেখতে খুব পছন্দ করে। তোয়ালে আর লুঙ্গি হাতে নিতে নিতে বলল,
“শোনো, তেল নিয়ো চুলে। দিন দিন আমার বউটা কেমন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখতে আমার ভালো লাগে না। রাতের খাওয়ার পর আমি তেল দিয়ে দেব তোমার চুলে।”

বলেই মাহতাব বাথরুমে ঢুকে গেল। আমি অল্প হাসলাম সেদিকে তাকিয়ে। বিয়ের পর থেকেই সে আমার চুলে তেল দিয়ে দেয়। প্রথম প্রথম অনেক তেল চুলে ঢেলে দিয়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটাত। পরদিন শ্যাম্পু না করলে তেল চুইয়ে চুইয়ে পড়ত কপাল দিয়ে, কানের পাশ ঘেঁষে। একদিন ঠাট্টা করে পাশের রুমের ভাবী বলেছিল,
“বোতলের সব তেল এক দিনেই কি নিয়ে নিয়েছেন নাকি?”

আমি কিছু বলিনি। হেসেছি কেবল। কী আর বলব? বলব— আমার স্বামী শখ করে রাতে তেল দিয়ে আমার গোসল করান! বলা যায় এসব? না বললেও তার এসব যত্ন লোকের চোখে পড়ে। আশেপাশের লোকেরা তার নাম দিয়েছে ‘বউসোহাগি’ পুরুষ। তা আমার ভদ্রলোক বউসোহাগিই বটে। অতিরিক্ত সোহাগ করেন বলেই তো যত্ন করে এলোমেলো করে বিনুনি গেঁথে দেয় আমার চুলে। আবার আফসোস করে বলে,
“তুমি যে কী নবনী! চুলগুলো দিন দিন সব ঝরে যাচ্ছে। একটুও যত্ন নাও না।”
আমি তখন গম্ভীর হয়ে বলি—
“ঝরে গেলেই বরং ভালো। মাথায় চুলও থাকবে না, আর এত ঝামেলাও থাকবে না। টাকলু হয়ে ঘুরে বেড়াব। লোকে তোমাকে বলবে— ওই যে টাকলু বেডির জামাই যাচ্ছে। ভাবতেই ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে।”
“আলু লাগছে। যত সব বাজে কথা।”
“কেন বাজে কথা কেন হতে যাবে? নাকি আমি টাকলু হলে তোমার আর আমাকে ভালো লাগবে না?”

মাহতাব হেসে ফেলত। বলত,
“যত রাজ্যের আজগুবি চিন্তা তোমার মাথায়, তাই না? পাগল তুমি!”
“না, সত্যি করে বলো তো, আমি টাকলু হলে আমাকে আর ভালোবাসবে না?”

মাহতাব হতাশ গলায় বলল,
“কেন বাসব না? অবশ্যই বাসব।”
“তবে একটা খুব চিন্তার বিষয় আছে।”
“কী বিষয়?”
“একই ঘরে, একই বিছানায় দুজন মানুষের একজন টাকলু, একজন চুলওয়ালা— বিষয়টি কেমন না? তার চেয়ে আমার সাথে সাথে তুমিও টাকলু হয়ে যাবে। এটাই বরং ভালো। আমি তোমাকে ডাকব— ওগো টাকলা মুরাদ, এদিকে শুনে যাও।”

মাহতাব কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল—
“এই টাকলা মুরাদ আবার কে?”
“কুখ্যাত অপরাধী। আওয়ামী লীগের লোক।”
“কী আশ্চর্য! তুমি আমাকে অপরাধীর সাথে কেন মেলাচ্ছ? আমি কি অপরাধী নাকি?”
“নাহ! কিন্তু তবুও আমি তোমাকে এই নামেই ডাকব। নাম যাই হোক, তুমি তো সত্যি সত্যি টাকলা মুরাদ হয়ে যাবে না।”

মাহতাব তখন হতাশ হয়ে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আমি ভেবে পাই না আমার মতো অসহ্য এক নারীকে সে কেমন করে সহ্য করে! এসব যে অতিরিক্ত ন্যাকামি, সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝি। তবুও এসব আহ্লাদি ধরনের কথাবার্তা, ন্যাকামি করতে আমার বেশ লাগে। এসবে সম্পর্কে উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। ঝলমলে হয়ে ওঠে সংসার। সংসারের সুখ সুখ মুক্তোটা তো হাসি-ঠাট্টার মাঝেই লুকিয়ে আছে।

আজ কত দিন মাহতাবের সাথে হাসি-ঠাট্টা করি না আমি। গলা জড়িয়ে ধরে অযথা আহ্লাদে জর্জরিত করি না তাকে। আমার ইচ্ছে হলো আজ একটু আহ্লাদ করব মাহতাবের সাথে। মাহতাব বাথরুম থেকে বের হওয়ার আগেই কাবার্ড থেকে একটা টকটকে লাল রঙের শাড়ি বের করলাম আমি। কালো গায়ের রং আমার। কালো অঙ্গে এই লাল রঙের শাড়িটি বড্ড কটকটে লাগে। কিন্তু তবুও এটাই পরব আমি। দামি বসন। বিদেশ থেকে আমার এক আঙ্কেল শাড়িটি পাঠিয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় খুব দামি বস্ত্র, খুব ভারী।

মাহতাব বেরোনোর আগেই আমি গুছিয়ে শাড়ি পরলাম। একটু কাজল লাগালাম চোখে। হালকা লিপস্টিক দিয়ে রাঙালাম ঠোঁট। আয়নায় দেখলাম সুন্দরই লাগছে আমাকে। ওই সুন্দর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম— মাহতাব এই মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হবে তো? আমার এই চেহারায় মুগ্ধ হওয়ার মতো কিছু কি আছে?

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৬

#নীল_ধ্রুবতারা [৬]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাদের যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন খুব বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। অদেখা প্রেমের সাত মাসের মাথায় আমাদের মন একে অপরকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় আমরা কল্পনা করি— দুজনার দেখা হবার দিনটা ঠিক কেমন হবে? কেমন হবে সামনাসামনি ভালোবাসি শোনার মুহূর্ত? মানুষটাকে সামনে থেকে দেখে বুকে কি উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে যাবে?

এইসব সুখ কল্পনার মাঝেও একটা ভয় ভীষণ ভাবে আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। এই ভয় নিজের রূপহীন, লাবণ্যহীন চেহারাটা নিয়ে। দেখা করার পর যদি মানুষটা আমাকে পছন্দ না করে? কি হবে তখন? এতো মাসের পরিচয়ের পরেও যেই মানুষটা শুধুমাত্র আমাকে সামনে থেকে দেখার আশায় ছবি দেখার দাবি তুলেনি, এখন আমি যদি তার পছন্দমতো না হই? সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ আমি সুন্দরী নই।

ছেলেবেলা থেকে আমার ডায়েরি লেখার ভীষণ শখ। ভদ্রলোক আমার কাছে একটা পুরনো ডায়েরি দাবি করেছেন। বিনিময়ে উনি আমার জন্য নতুন ডায়েরি নিয়ে আসবেন। আমি বুঝতে পারলাম না, পুরাতন ডায়েরি চাওয়ার কারণ কি? কে জানে, হয়তো আমাকে পুরোপুরি জানার ভীষণ শখ তার। আমারও খুব শখ নিজেকে উত্তমরূপে তার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু ময়ূরের পালক লাগালেই তো কাক ময়ূর হয়ে যায় না। এটা অবশ্য আমার ভাষ্য নয়। শিশুকালের চৌকাঠ মাড়িয়ে আমি যখন বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছিলাম, তখন সামান্য লাবণ্যময়ী দেখাত আমাকে। ওই কালো রঙের মাঝেও অদ্ভুত এক রহস্য ছিল বোধহয়। মায়ের তখন ইচ্ছে হলো আমার বাড়ন্ত শরীরের বাড়তি যত্ন নেবার। আমি তখনো অগোছালো রমণী। মাথার খোলা চুল উড়িয়ে চড়ে বেড়াই গোটা গ্রাম। এ বাড়ির আমগাছের মগডালে চড়ি তো ও বাড়ির বরই গাছে ঢিল ছুঁড়ি। আমড়া গাছের কচি পাতা চিবিয়ে খাই ছাগলের মতো। সে কি অন্যরকম স্বাদ! কি আনন্দ! বাদ দিতে পারি না লিচু পাতাও। লিচু পাতা চিবিয়ে রঙ ফেলে দেই। ঠোঁট জোড়া তখন টকটকে লাল হয়। সমবয়সী বাচ্চাদের কাছে গল্প করি,
“এই দেখ, আমি লিপস্টিক দিয়েছি।”

তখন অবশ্য লিপস্টিককে বড্ড আরামে লিবিস্টিক বলেই চালিয়ে দিতাম। মূল কথা উড়নচণ্ডী, দামাল মেয়ে ছিলাম আমি। লক্ষ্মী বাচ্চাটি হবার চেষ্টাও কোনো কালে ছিল না আমার মাঝে। আমার দুরন্তপনায় মা অস্থির ছিল। সেই আমার শরীরে যখন বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনগুলো ঘটতে শুরু করল, তখন মা নিয়মিত মুখে লাগানোর জন্য কাঁচা হলুদ বেটে দিতেন। চুলগুলোকেও নিয়মিত তেল মেখে শাসনের বেড়াজালে বন্দি করে ফেলেছেন। মায়ের অলঙ্ঘনীয় আদেশ ছিল— নিয়মিত শ্যাম্পু করা এবং গোসলের আগে রোজ হলুদের প্রলেপ মেখে বসে থাকা। এমনি করে একদিন মুখে হলুদ মেখে সমবয়সীদের প্ররোচনায় নেমে গেলাম দস্যিপনায়। এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরতে গিয়ে একজনের মা আমাকে বলে বসল,
“কিরে নবনী, মুখে কি মেখেছিস?”

আমার মন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার সাথে ইতোমধ্যে পরিচিত হয়েছে। তবুও সরল আমার কাছে ঘরের খবর পরের কাছে বিলানো ছিল খুবই আনন্দের কাজ। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলাম,
“কাঁচা হলুদ বাটা মেখেছি, কাকী। আম্মা মাখিয়ে দিয়েছে। রোজ মাখি।”

“ওহ!”

উনার বলার ভঙ্গিতে ব্যাঙ্গাত্মক ভাবটা স্পষ্ট হলো। এতো চমৎকার করে ব্যাঙ্গের হাসি হাসতে এ জীবনে কাউকে দেখেনি আমি। আমার ধারণা— কুটিল হাসির প্রতিযোগিতায় এই মহিলা প্রথম হবেন। শুধু হাসিতেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বললেন,

“ময়ূরের পেখম লাগালেই তো আর কাক ময়ূর হয়ে যায় না!”

না, কোনো লুকোছাপা নয়। নয় কণ্ঠের আওয়াজের তীব্রতা কম। আমার সামনে আমার চেহারা নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন তিনি। ছোট্ট আমি অনেকদিন বুঝিনি উনার ব্যাঞ্জনধর্মী উত্তর। যখন বুঝেছি তখন আমি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারি নির্দ্বিধায়। কেউ আমাকে কালো বললেও মন খারাপ করি না হুট করে। তবুও গভীর রাতে কিংবা অসহ্য একাকিত্বের সময় নিজের গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগি আমি। শুধু গায়ের রঙ নয়, গোটা আমাকে নিয়েই মনস্তাপের শেষ নেই আমার। যেই চেহারা নিয়ে আমি হীনমন্যতায় ভুগি সেই চেহারাটা অন্য কেউ কেন পছন্দ করবে? কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, কালো মেয়েদের কি বিয়ে হয় না? হয়। তবে নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝামেলা কিছু আছে বৈকি। সেই ঝামেলা মেটানোর উত্তম অস্ত্র যৌতুক। মুখে অবশ্য যৌতুক শব্দটা উচ্চারিত হয় না। পাত্রপক্ষ মধুর গলায় বলে,
“ছেলের ভীষণ শখ, শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা মোটরসাইকেল উপহার দিবে।”
যৌতুক শব্দের নতুন প্রতিশব্দ হচ্ছে উপহার। এমন বাহারি উপঢৌকনের সাথে সাথে কালো রঙের মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যায় পণ্যের মতো। তবুও যায়। আমিও যাব। তবে এই যে অদেখা ভদ্রলোকের সাথে আমার প্রেম, তাকে কি পাব জীবনসঙ্গী হিসাবে? যাকে হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছি আমি তার বউ হবার সৌভাগ্য কি আমার আছে?

জীবনের উপর আমার ভীষণ অভিযোগ। জীবনের প্রথম যেই মানুষটাকে নিজের সম্পূর্ণ আবেগ অনুভূতি নিয়ে ভালোবাসলাম সেই মানুষটার সাথে দেখা হবার পর কি হবে সেই শঙ্কায় আমার ঘুম হয় না। এক জীবনে এতো যন্ত্রণা আমি রাখব কোথায়? সৃষ্টিকর্তা কি পৃথিবীর সব যন্ত্রণা আমার ভাগ্যেই লিখেছেন?
আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা নিয়েই আমার দ্বারে সেই দিন এল যেদিন আগন্তুকের সাথে আমি দেখা করব। তার আগের রাত্রিটি নির্ঘুম কাটলো আমার। কালো চোখজোড়ার নিচে পড়ল ডার্ক সার্কেল। এলোমেলো আমি নিজেকে যথাসম্ভব পরিপাটি করে খুব ভোরে একটা চিঠি লিখতে বসলাম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আজন্ম টান আমার। প্রেমের কথা বহুত জানা আছে। সেই কথামালা গুছিয়ে ক্লাস এইট থেকেই প্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। নিজের সাহিত্যিক প্রতিভার সবটাই ঢেলে দিয়েছিলাম সেই চিঠিটিতে। চিঠির মূল ভাষা এই—

প্রিয় প্রেমিক,
এখন তোমার হাতে আমার লেখা সর্বপ্রথম কিংবা শেষ চিঠিটি। কারণ, আজকের পর আমাদের দুজনের প্রণয় কোন দিকে মোড় নিবে তা জানি না। হয়তো আমাকে তোমার মনের মতো দেখতে না হলে এখানেই আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটবে। কারণ আমি জানি, অপছন্দের কিছু নিয়ে দীর্ঘদিন সুখী জীবন কাটানো যায় না। তবুও এই নির্মম সত্যটা ভাবতে গেলেই আমার দুচোখ জলে ভরে উঠে। তোমাকে ভিন্ন নিজের আশেপাশে অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারি না আমি। না পারি তোমার পাশে অন্য কোনো রমণীর ছায়াও সহ্য করতে। প্রেম বিয়োগের কথা ভাবতে গেলে একটা শাণিত তলোয়ারের আঘাতে আমার হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বুঝবে কি তুমি, বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া সেই রমণীর ব্যথা?

আমি অপরূপা নই। নই মহাকালের পাতা থেকে উঠে আসা অপ্সরা। যার আঁখিযুগল প্রেমিকের হৃদয়ে মায়াবাণ নিক্ষেপ করতে পারে। যার অঙ্গের লীলায়িত গতিছন্দ প্রেমিকের হৃদয়মন হরণ করে প্রাণে প্রেমের মূর্ছনা জাগাতে সক্ষম। আমি সূর্যের আলোর মতো প্রখর, গ্রীষ্মের মতো শুষ্ক, বন্যার মতোই ভয়াবহ, সাইক্লোনের মতো ধ্বংসাত্মক। কি ভাবছো, নারীর সহজাত বৈশিষ্ট্য, নমনীয়তা বুঝি আমার মাঝে নেই? হয়তো সামান্য একটুখানি ভুল ভাবছো তুমি। কেন বলছি?

বলছি কারণ, আমি খুব বাজে ভাবে প্রেমে পড়েছি। গুছিয়ে ভালোবেসেছি একজন পুরুষকে। আজকাল রাতে দামাল মেয়ে নবনীর ঘুম হয় না। না সে উত্তাল সমুদ্রের মতো ছুটে চলে এলাকার এ মাথা থেকে ও মাথা। এই নবনী গভীর রাতে, যখন খুব জোছনা হয় তখন অপার্থিব আলো অঙ্গে মেখে স্নান করে। প্রেমের কবিতা আওড়ায় চাঁদের দিকে চেয়ে। এতোকিছুর পরে আমাকে কি শুধুই একটা কুৎসিত মেয়ে বলেই মানা যায়? মনে হয় না, আমি সুন্দরী! আমি প্রেমিকা? নাকি, তুমিও বাকিদের মতোই গায়ের রঙ দিয়ে মানুষ বিচার করো? বর্ণবাদে বিশ্বাস করো, মাহতাব?

অবশ্য, আমি জোর করব না। জোর করে হৃদয় বাঁধা যায় না। আর না, চোখের অশ্রুকে বানাব আমার প্রেমের হাতিয়ার। যদি তোমার আমাকে ভালো না লাগে, একান্তই অপছন্দ করো তবে আমি নিঃশব্দে দূরে সরে যাব তোমার থেকে। যেতে যেতে হয়তো বলব,
আবার আসিব ফিরে, আবার আসিব ফিরে…

আচ্ছা শোনো, যদি আমাদের সম্পর্ক আর বেশিদূর না এগোয়— তবুও প্লিজ, আমার এ চিঠি মূল্যহীন কাগজের স্তূপে ফেলে দিও না। রেখে দিও পুরনো বইয়ের ভাঁজে। যদি অদূর ভবিষ্যতে কোনোদিন এই চিঠি ফের হস্তগত হয় তবে পড়ে একটু হেসে ফেলো তুমি। মনে করো, নবনী নামের এক পাগল প্রেমিকা ছিল তোমার। মাহতাব, তোমার স্মৃতিতে কি তখনও থাকব আমি? দেখো, উন্মাদের মতো ভবিষ্যতের চিন্তায় এখুনি বিভোর হয়েছি আমি। তবে বলো, কি করে তোমার থেকে আলাদা হবো? কোন উপায়ে?
এখন বলো, কেমন আছো? এখনো বাসো ভালো?

—ইতি
নবনী
১৫.০৩.২০২২

চিঠিটা লিখে স্কচটেপ দিয়ে ডায়েরির ভাঁজে লুকিয়ে রাখলাম আমি। অতঃপর খুব সুন্দর করে গিফটের কাগজে মুড়িয়ে নিলাম আমার যৌবনের সবটুকু আবেগ। যা তুলে দেব— প্রিয়জনের হাতে। অতঃপর নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে চলে গেলাম মানুষটার সাথে দেখা করতে। বাড়িতে বলে গেলাম— কলেজে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে।

ওর সাথে একা একা দেখা করতে যাওয়ার মতো সৎ সাহস আমার কখনোই ছিল না। শুনেছি, বদ লোকেরা প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে নির্জনে ডেকে নিয়ে মেয়েদের সাথে অসভ্যতা করে। সেই ভয় থেকে আমি সঙ্গে নিলাম বান্ধবীকে। ধড়ফড় বুকে প্রিয় বান্ধবীর হাত চেপে ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম মানুষটার আগমনের। আমরা দেখা করলাম উপজেলা ভবনে। সেখানটায় বিশাল মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম জড়োসড়ো হয়ে। বহুক্ষণ পরেও মানুষটা যখন এল না আমরা হাঁটতে লাগলাম। উপজেলা ভবনের মধ্যিখানে অসংখ্য সুপারি গাছ লাগিয়ে পায়ে চলার পথ তৈরি করা হয়েছে। বিশাল চত্বরটির চারিদিকে শোভা পাচ্ছে বাহারি ফুলের গাছ।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখা মিলে মস্ত বড় ঘাট বাঁধানো এক পুকুরের। পুকুরের চারিদিকে বুক অবধি গ্রিল দিয়ে বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। এবং এই মস্ত পুকুরের মাঝখানে গিয়ে মাছ ধরার জন্য ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হয়েছে সেতু। সেই সেতুটি ধরে এগিয়ে গেলে পাওয়া যায় মস্ত গোলাকার ইট-সিমেন্টের বৃত্ত। সূর্যের আলো থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর একইভাবে তৈরি করা হয়েছে সিমেন্টের ছাতা। সেই ছাতার উপর আবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে খাবার। অসংখ্য পায়রা এসে খাচ্ছে তা। কি যে সুন্দর দৃশ্য! আমার চোখ জুড়িয়ে গেল।

আমরা দুজন মুগ্ধ হয়ে সেখানটায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম স্বচ্ছ পানিতে মাছের খেলা। কি সুন্দর আপনমনে মাছগুলো সাঁতার কাটছে। একসময় মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব নবনী? তোর ফেসবুক প্রেমিকের তো দেখা নেই। ওই ব্যাটা সত্যিই আসবে তো?”

প্রভার সন্দেহ প্রকাশ দেখে আমিও ভুগলাম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় ধরে অপেক্ষা করছি। বরাবর অধৈর্য আমার ধৈর্যের বাঁধ সেদিন ভাঙল না। হঠাৎ করেই অনুভব করলাম আমিও কারো জন্য অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে পারি।

মানুষটা এল ঝিম ধরা দুপুরে। আমরা তখন হতাশ হয়ে বসে বসে ঝালমুড়ি চিবুচ্ছি। কাঁচা মরিচের ঝালে লাল হয়ে উঠেছে ঠোঁট জোড়া। মানুষটার কল এল তখন। এতকাল সিমে টেক্সট করা মানুষটা আচমকা কল করে বসল আমায়। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল মানুষটা এসে গেছে। সে আছে আমার আশেপাশে। আমি হঠাৎ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেলাম। লজ্জায় আড়ষ্টতায় চেপে ধরলাম প্রভার হাত। বললাম,
“ও কল করছে! কি করব?”

প্রভা বিস্মিত হয়ে বলল,
“কে কল করছে?”
“মা- মাহতাব।”
“ধর। ধরে বল, আমরা শিমুল গাছের নিচে বেঞ্চিতে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছি।”

আমি কল ধরলাম না। আতঙ্কে তখন আমার হাত-পা কাঁপছে। বুকের ভেতর উত্তাল ঝড় উঠেছে। অচল হয়ে গেছে স্নায়ু। আমি তাকালাম উপজেলা ভবনের মূল ফটকের দিকে। দেখলাম একটা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক চারিদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কানে ফোন চেপে এগিয়ে আসছে। আমি তাকালাম আমার হাতে অবিরত বাজতে থাকা ফোনের দিকে। কেটে দিলাম। দেখতে পেলাম কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক ফোনটা নামিয়ে এনে মুহূর্তের ব্যবধানে আবার কানে চেপে ধরলেন। দূর থেকে ওই অস্ফুট মুখ আর ব্যাকুল ভাব দেখেই আমি টের পেলাম এই সেই ব্যক্তি। উনিই সেই পুরুষ। মাহতাব। আমার প্রেমিক মাহতাব। তাকে দেখেই স্তব্ধতায় ছেয়ে গেল আমার গোটা পৃথিবী। চারিদিকের সব কোলাহল ছাপিয়ে, দৃষ্টির সম্মুখের অসংখ্য দৃষ্টি এড়িয়ে একমাত্র মাহতাব নামের মানুষটিতে কেন্দ্রীভূত হলো আমার হৃদয়মন।

মাহতাব এগিয়ে আসছে। কি আছে ওর ধীর পদক্ষেপে পা ফেলা ওই মৃদু ছন্দের হাঁটায়। কেন তার প্রতিটি কদম নাড়িয়ে দিচ্ছে আমার অস্তিত্বের ভিত? মানুষটা একবার আমার দিকে তাকাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে? তবে সে এগিয়ে আসতে লাগল এদিকেই। আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। এতক্ষণ যেই আমি মাহতাবের কল ধরিনি সেই আমি ক্রমাগত কল করতে লাগলাম তার নাম্বারে। মনে দুরন্ত ইচ্ছে, কল ধরলেই তাকে বলব,

“মাহতাব শোনো, আজ তোমার সাথে দেখা করতে পারব না আমি। প্লিজ আজ তুমি চলে যাও। আমরা অন্যদিন দেখা করব। আমার খুব ভয় করছে মাহতাব। প্লিজ আজ তুমি দেখা করতে চেও না। যাও। ফিরে যাও।”

কিন্তু তা আর বলতে পারলাম কই? মাহতাব আমার কল ধরল না। বরং যত এগিয়ে এল ততই হাঁটার গতি মন্থর হলো তার। একহাতে একটা শপিং ব্যাগ আর এক হাত পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে, ঠোঁটের কোণে সর্বভাব ব্যঞ্জনাময় হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে এল সে। আমার গোটা পৃথিবী দুলে উঠল তখন। প্রভার হাত চেপে ধরলাম আমি। তাড়া দিলাম,
“চল প্রভা। আর এখানে থাকা যাবে না। আয় আয়..”

বলা বাহুল্য এক প্রকার ছুট লাগালাম আমি। বোকার মতো মেয়েটা আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। ঝালমুড়ি বিক্রেতা তখন চেঁচিয়ে বলল,
“ও আফা টাকা না দিয়া কই যান?”

কিসের টাকা, কিসের কি? আমি পাত্তাই দিলাম না সেসব। ছুটলাম শুধু। দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পেছনে ফিরে দেখলাম মানুষটা ঝালমুড়ি বিক্রেতার টাকা দিয়ে দিচ্ছে। তার এই কাজে ভীষণ লজ্জিত হলাম আমি। প্রথম সাক্ষাতই ঋণী হয়ে গেলাম তার কাছে। শতবার বলেও কি এই বিশ টাকা তাকে আর দিতে পারব কখনো? উফ! এই মানুষটা বিল মিটিয়ে আবার এদিকেই আসছে কেন? সে কেন চলে যাচ্ছে না? আমার অসহ্য লাগতে শুরু করল। আমি দেখা করব না তার সাথে। কোনো ভাবেই না। আমি ভীষণ বোকা তাই না? আমার সাথে দেখা করার জন্য যে লোকটা সুদূর রাজশাহী থেকে গাজীপুর চলে এসেছে তার সাথে দেখা করব না? তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি? পরে অবশ্য ভেবেছিলাম— মানুষটা যদি ফিরে যেত আমি কি খুশি হতে পারতাম? আমার ব্যাকুলতাটা তো আমি ভিন্ন আর কেউ জানে না।
ছুটতে গিয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি তখন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল প্রভা। কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। এরপর আমাদের পিছু পিছু আসা মানুষটার দিকে। বলল,
“ছুটছিস কেন?”
“এমনি। চল পেছনের গেট দিয়ে বাড়ি চলে যাই।”
“আগে বল, দৌড়ানোর কারণ কি?”

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“ঘূর্ণিঝড় আসছে।”
“সেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম কি মাহতাব?”
“হুঁ।”
“ঘূর্ণিঝড়কে তো রাজশাহী থেকে গাজীপুর এনে ফেলেছিস। এখনো কেন ঘুরাচ্ছিস? যা কথা বল।”

আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম,
“পাগল হয়েছিস! আমি যাব না।”
“কেন?”
“আমার ভয় করছে।”
“প্রেম করার সময় ভয় করেনি?”
“না।”
“তাহলে এখন কেন করছে?”

আমি তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব অনেকটা এগিয়ে এসেছে। তার ঠোঁটের কোণের ওই মিটিমিটি হাসিটি আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিলাম,
“জানি না প্রভা প্লিজ চল, ও এসে পড়েছে।”

আমি প্রভার হাত ধরে টানতে লাগলাম। প্রভা নড়ল না নিজের স্থান থেকে। আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর উলটো আমার হাত ধরল খপ করে। রূঢ়ভাবে বলল,
“আসুক। উনার আসার জন্যই তো অপেক্ষা করছি সকাল থেকে। আসার পর পালাই পালাই করছিস কেন? আশ্চর্য! গাধা নাকি তুই?”

এত কিছু আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢুকে না প্রভার কোনো কথা। আমি ছাড়িয়ে নিতে চাই নিজের হাত। মেয়েটা শক্ত করে ধরে রেখেছে আমায়। আমি পালাতে চেয়েও পারছি না। ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি। একসময় মানুষটা আমাদের পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো। সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম।”

সালামের জবাব দিল প্রভা। আমি ততক্ষণে নিজের নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছি মেয়েটির হাত। মানুষটার সাথে প্রভার কুশলাদি বিনিময়ের পর্ব শেষ হবার পর প্রভা আমার হাত ছেড়ে দিল। কিন্তু এবার আর আমি ছাড়লাম না। খামচে ধরলাম তার বাহু। ছাড়াতে চেষ্টা করতেই শিল্পীর আঁচড়ের মতো আবার দাগ তার বাহুতে। সে দাঁত কিড়মিড় করে ফিসফিস করে বলল,
“মেরে ফেলবি নাকি? এতো চিমটি কাটতে মন চাইলে প্রেমিককে চিমটি কাট। আমাকে কেন? যা সর!”

সে জোরপূর্বক আমার হাত সরিয়ে দিল। মাহতাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, আপনারা কথা বলুন। আমি ফুসকা খাই গিয়ে। বিলটা কিন্তু আপনি দিবেন।”

মাহতাব হাসলো। যেন বুঝাল— বিল কেন? আপনার এই বান্ধবীটির জন্য আমি নিজের প্রাণটাও নির্দ্বিধায় বলিদান দিতে পারি। মাহতাবের থেকে সম্মতি পেয়ে প্রভা হাঁটা ধরল। একা একা একটা ছেলের সাথে আমাকে রেখে মেয়েটা চলে যাচ্ছে? আমি তার নিষ্ঠুরতায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবার তার পিছু নিলাম। চেপে ধরলাম হাত। জোরপূর্বক আবার ছাড়িয়ে নিল সে। কটমট করে বলল,
“গাধা নাকি তুই? ছাড় তো!”

সে যে আমার ব্যবহারে চরম বিরক্ত হয়েছে তা টের পেলেও তাকে ছাড়তে আমার যত রাজ্যের আপত্তি। আচমকা একটা কণ্ঠ আমার সকল তৎপরতা থামিয়ে দিল। রাশভারী মানুষটির কণ্ঠে উচ্চারিত হলো আকুল বাক্য—
“চলে যাচ্ছ কেন নবনী? কথা বলবে না আমার সাথে?”

থেমে গেল আমার পা। থেমে গেল হাত। ছি ছি! যাকে দেখার জন্য আমার এতো উচ্ছ্বাস, যার সাথে সাক্ষাতের আশায় আমার এতো ব্যাকুলতা তার সাথে কথা বলব না? ছি! কি ভয়ানক ভুলটাই না করেছি। মরমে মরে যেতে মন চাইল আমার। আর ব্যস্ত হলাম না প্রভাকে আগলে রাখার চেষ্টায়। সে চলে গেল আপন কাজে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম পাথরের মূর্তির ন্যায়। আচমকা এই মানুষটির কণ্ঠ আমার সবটুকু চপলতা কেড়ে নিল। জমে গেলাম আমি। তাকালাম না অবধি তার দিকে। ইটের রাস্তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে রইলাম। এভাবে কত সময় ব্যয় হলো আমি জানি না। আমার সে খেয়াল নেই। তবে বুঝলাম মানুষটা আমাকে এই পুরোটা সময় মুগ্ধ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টির খোঁজ তার দিকে না তাকিয়েও পাওয়া যায়। এক সময় সে বলল,

“বুঝলে নবনী, মানুষ হয়ে বড্ড ভুল হয়ে গেল।
আমি যদি প্রেয়সীর হেঁটে যাওয়া পথের বালুকণা, কিংবা কংক্রিট হতাম তবে বোধহয় এমন করেই চেয়ে দেখত সে আমায়। মুগ্ধ হতো, প্রেমের কবিতা শোনাত, তাই না?”

কি আশ্চর্য! আমি আবার সামান্য ইট, বালুর উপর মুগ্ধ হলাম? কখন তাদের প্রেমের কবিতা শোনালাম? ফ্যালফ্যাল চোখে চাইলাম আমি তার মুখের দিকে। আশ্চর্য কাণ্ড, তার মুখের দিকে তাকালেও আমি তাকে দেখতে পেলাম না। তার মুখ, চোখ ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে গেল দূরের ওই কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে। আমি তার দিকে শত চেষ্টা করেও তাকাতে পারছি না। কোনো ভাবেই পারছি না।

“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।”

আজান শেষে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা এই শেষ ধ্বনিটুকুই কানে এল আমার। ঘুম ভেঙে গেল তখন। এখন ভোর। খুব ভোরে এখন আমার আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। প্রতিদিন একটা না একটা সমস্যা হচ্ছে। খুব যে উল্লেখযোগ্য কিছু তাও নয়। অকারণেই ভোরবেলাটা আমার অসহ্য কাটে। আমি ঘুম থেকে উঠে বসলাম। রাতের তীব্র তমসা কেটে গিয়ে ভোর হয়েছে। বিছানার একপাশে তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব নেই। নিশ্চয়ই নামাজ পড়তে গিয়েছে। আমি অস্বীকার করতে পারি না মাহতাব খুব ভালো মানুষ। সে ধর্মভীরু দায়িত্বশীল স্বামী। তার মতো একজন ভালো মানুষকে নিয়ে কেন আমার এতো সমস্যা? আমি কেন তৃপ্ত হতে পারি না? আমার মন কি অতিরিক্ত আশাবাদী?

কিন্তু কিই বা আশা করব আর? মাহতাব আশা করার আগেই আমাকে সবটা দিয়েছে। নিজেকে উজাড় করে ভালোবেসেছে। তবে কেন আমি এমন করছি? গতকাল রাতের ঝগড়ার জন্য আমার মন খারাপ হলো। না আমি আর মাহতাবের সাথে ঝগড়া করব না। অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য অজু করে নামাজ পড়লাম। মোনাজাতে খুব কাঁদলাম আমি। আমার মনে তখনো ওই ভ্রান্ত ধারণা গাঁট হয়ে আছে— আমি কখনোই মা হতে পারব না। ধ্রুব সত্য হিসাবে এটাই মেনে নিয়েছি আমি।

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৫

#নীল_ধ্রুবতারা [৫]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

এরপর কেটে গেল তিনটে দিন। ভদ্রলোকের সাথে আমার সম্পর্ক খুব ঠান্ডা যাচ্ছে। আজকাল আমার কোনো কাজেই হাত লাগাতে ইচ্ছে করে না। চুপচাপ এক স্থানে বসে কাটিয়ে দিতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো বা আকাশ দেখে, কখনো বা জানালা দিয়ে বাতাসে দুলতে থাকা ছাতিম গাছটা দেখে। আমার মোটেও ক্লান্ত লাগে না। বিরক্তি আসে না। গতকাল রাতে মাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বিস্তারিত জানিয়েছি। বলা বাহুল্য, এই সিস্ট নামক রোগের কথা আমার মা নাকি জীবনে কখনো শোনেননি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, এমন আজেবাজে চিন্তা না করতে। ওষুধ খেয়ে পিরিয়ড হবার পর আমাকে বাড়ি যেতে বললেন। কোনো কবিরাজের থেকে হারবাল ওষুধ এনে দেবেন। এই ওষুধ খাবার নাকি আবার নিয়মও আছে অনেক। ঋতুস্রাবের দ্বিতীয় দিন ভোরবেলা, অভুক্ত পেটে, ভেজা কাপড়ে খেতে হয় গাছগাছালির শেকড়বাকড়ের রস। আমি এসব বিশ্বাস করি না। তবে এসবের ওপর আমার মায়ের অগাধ ভরসা। হতাশ হয়ে কল কেটে দিয়েছি। এরপর থেকে আমার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে এমন কেউ কি নেই, যে আমার কথা মন দিয়ে শুনবে? বুঝবে আমাকে?

আজকাল আমার ভালো লাগছে না কিছু। প্রায়ই তলপেটের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হয়। ওষুধ খেয়েও পিরিয়ড হলো না। তবুও খাচ্ছি।
ভদ্রলোক আমার খুব যত্ন করছেন। রোজ সকালে সে রান্নাবান্না করে অফিসে যায়। ফিরে এসে আবার রান্না করে। আমার মন ভালো করার জন্য উদ্ভট সব গল্প করে। সেই সবের কিছুই আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারি না। আমার সামনের দৃশ্য, মানুষ—সব ঝাপসা হয়ে আসে। আমার খালি সারাক্ষণ কাঁদতে মন চায়। ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কতটুকু কাঁদলে মনের পাষাণভার হালকা হবে? আমার যত্ন করে গুছিয়ে রাখা সংসারটার পরতে পরতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। অতি কষ্টে কেনা টাকার জিনিসগুলো অবহেলিত হয়ে তিন দিনেই বিবর্ণ হয়েছে। যেন হারিয়ে গেছে তাদের রূপ, সৌন্দর্য। আজ সকালে সে হঠাৎ খেতে খেতে বলল,
“তুমি এমন রসকষহীন হয়ে গেছ কেন নবনী? এমন ম্যারম্যারে সম্পর্ক ভালো লাগে না আমার। আগে আমরা কত হাসিখুশি ছিলাম। অথচ এখন?”

তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর টের পেলাম। সে কি ভাবছে আমি ইচ্ছে করেই এমন করছি? বিবর্ণ আমাকে ভালোবাসতে ভীষণ বিরক্ত লাগছে তার? আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। মেজাজ বিগড়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠে বললাম,
“তোমার জন্য সারাক্ষণ হা হা-হি হি করব আমি? আমার হি হি দেখলে তোমার খুব ভালো লাগবে? মনে সুখ না থাকলেও দাঁত কেলিয়ে হাসতে হবে আমায়? আমি কি রোবট? মানুষের চামড়া নেই আমার শরীরে? রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে এমন অমানুষের মতো ব্যবহার করব কী করে?”

সে আশ্চর্য হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। খাওয়া থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কয়েক পল। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। বিয়ের পর প্রায়ই তার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করেছি আমি। সেই ঝগড়ার স্থায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ মিনিট দশেক। এরপর সব স্বাভাবিক। রাতে প্রচণ্ড ঝগড়ার পর কান্নাকাটি করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি তাকে। সেই আলিঙ্গনের বাঁধন এতটাই তীব্র থাকত যে—ভাষায় সেটার প্রকাশ বাহুল্য মাত্র। অতঃপর রাতটা পরম শান্তিতে তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। ঝগড়াঝাঁটি হলে সে প্রতিবাদ অবশ্য কখনোই করেনি। আমিই করেছি ভিত্তিহীন অভিযোগ। কখনো বাজারের ফর্দে যা লিখেছিলাম তা আনেনি বলে। কখনো বা বাড়তি জিনিস নিয়ে এসেছে বলে। কখনো আবার কিনে আনা মাছ নরম বলে। আবার কখনো খেতে বসে ফোনে অতিরিক্ত কার্টুন দেখার কারণে। মানুষটার প্রতি আমার অভিযোগের শেষ নেই। এসবই ঝগড়াঝাঁটির প্রধান কারণ। আরও আছে বহু অকারণ। দিনশেষে সে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় মাথা নত করে নিত। আমার তীব্র তিরস্কারে যখন লাল হয়ে উঠত মুখ, তখন সে কেঁদে ফেলত। লোকটা একদম বাচ্চাদের মতো। হাউমাউ করে কাঁদতে জানে। কাঁদলে চোখ, নাক, গাল টকটকে লাল হয়ে যায়। ওহ! এখনো বোধহয় বলিনি, আমার ভদ্রলোক মারাত্মক সুদর্শন পুরুষ। মেয়েদের গায়ের রঙকে দুধে-আলতা উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। পুরুষেরও কি যায়? গেলে এই উপমাটি একদম মানানসই আমার ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে।

আমার আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
সেদিন ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। দেখা হবার ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় পরে যাই। আগে বলি প্রণয়ের সূচনার কথা। ভদ্রলোকের সাথে আমার মধুর আলাপন চলছিল আপন গতিতে। পরিচয়ের তখন পাঁচ মাস। ততদিনে আমাদের সম্বোধনে পরিবর্তন এসেছে। আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি দুজনেই। মনের কথা কেউ এখনো স্পষ্ট করে বলিনি যদিও। তবে দুজনেই ব্যাকুল, দুজনেই উদগ্রীব দুজনার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনার অপেক্ষায়। যা বুঝলাম, এই ছেলে আমাকে প্রপোজ করতে পারবে না এ জন্মে। ভিতুর ডিম। গম্ভীরমুখো। মন চায় কানটা ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিই। অসহ্য! আমাদের তখন রাত-দিন কথা হয়। ভালোবাসি শব্দটা কি অতিরিক্ত কঠিন কিছু? সে কেন একবার বলে না আমায়? রাত-দিন কী যে কথা হতো আমি জানি না। আজও বিয়ের এত বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা যদি প্রশ্ন করি,
“প্রেমের সময় দিন-রাত এত কী কথা বলতাম আমরা? এত কী কথা ছিল আমাদের?”

সে বলে,
“জানি না। আমার মনেই পড়ে না কিছু।”

তার যে মনে পড়বে না তা আমি জানি। সে খুব ভুলোমনা মানুষ। এই গম্ভীর স্বভাবের ভুলোমনা মানুষটার নাম দিয়েছিলাম, ‘মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই’। সে আমায় নাম দিয়েছিল, ‘অপরিচিতা’।

একজন অপরিচিতার সাথে একজন গুরুগম্ভীর মশাইয়ের প্রেমের পর্বটার সূচনাই হচ্ছে না কোনোভাবে। একবার সূচনা হয়ে গেলে চুটিয়ে প্রেম করা কোনো ব্যাপার না। সূচনাতেই সমস্যা যত। কিন্তু কী আর করা! সমস্যার একটা সমাধান বের তো করতেই হবে। একদিন কথা বলতে বলতে গভীর রাতে তাকে বললাম,
“আসো গানের কলি খেলি।”

সে ইনোসেন্ট ইমোজি দিয়ে বলল,
“সেটা আবার কেমন খেলা?”
“আমি একটা গানের প্রথম লাইন বলব, তুমি বলবে দ্বিতীয় লাইন। এভাবে খেলব, বুঝেছ?”

সে আমার প্রস্তাব নাকচ করার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি বেশি গান জানি না। তার চেয়ে এসো, আমরা লুডু খেলি।”
“না, আমি লুডু খেলব না।”
“তাহলে ক্যারামবোর্ড চলবে?”
“না।”

বলেই আমি অফলাইন হলাম। লুডু খেলায় আমরা দুজনে শেয়ানে শেয়ানে টক্কা দিতে পারলেও ক্যারামে আমি তাকে কোনোভাবেই হারাতে পারি না। সে জিতে যায় বলেই ওই খেলায় তার খুব আগ্রহ। আমি বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম। তখন নাম্বার চালাচালির পর্বও শেষ হয়েছে। সে সিমে টেক্সট দিল,
“আরে অফলাইনে গেলে কেন? আচ্ছা, এসো গানের কলি খেলব।”

আমি অনলাইনে গেলাম আবার। সে লিখল,
“অপরিচিতা, তুমি বন্ড অভিমানী।”

আমি হাসলাম। একটা ঠোঁট বাঁকানো রিয়েক্ট দিয়ে বললাম, “শুধু আমি নই, মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই নিজেও মেয়েদের মতো অভিমানী পুরুষ। তার প্রমাণ আমি কয়েকবার পেয়েছি।”
“আচ্ছা, এসব কথা বাদ। খেলা শুরু করো।”

আমি খেলা শুরু করলাম আমার খুব প্রিয় একটা গান দিয়ে—
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো।
হারিয়ে যাবো তোমার সাথে…”

এরপরের লাইন সে লিখল,
“সেই অঙ্গীকারের রাখি পরিয়ে দিতে,
কিছু সময় রেখো তোমার হাতে।”

আমি লাভ রিয়েক্ট দিলাম সেথায়। সে সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য লিখল,
“দূর! এভাবে গানের কলি খেলায় মজা আছে নাকি? তার চেয়ে তুমি গাইবে, আমি শুনব—সেটাতেই শান্তি।”
“এ্যঁহ! আমি কেন তোমাকে গান গেয়ে শোনাব?”
“শোনাবে না?”
“নাহ!”
“কেন শোনাবে না?”
“দূর! এত কথা রাখো তো। খেলায় ফোকাস করো। পরবর্তী গান লিখছি।”

সে একটা থামস আপ দিল। আমি আবার লিখলাম,
“একটা ছেলে মনের আঙিনাতে,
ধীর পায়েতে, এক্কা-দোক্কা খেলে…”
“বন পাহাড়ি ঝর্ণা খুঁজে;
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে।”

পরবর্তী চরণ সঙ্গে সঙ্গেই লিখল সে। আবার বলল,
“সেই ছেলেটা কে জানতে পারি?”
“না, পারো না।”
“কেন পারি না?”
“কারণ, আমি চাই না আমার মনে লুকায়িত মানুষটা সম্পর্কে সবাই সব কিছু জেনে যাক।”
“সবাই জানবে না তো! শুধু আমি জানব।”
“তোমাকেও জানাতে চাই না আমি। আর প্লিজ, তুমি বারবার ফোকাস থেকে সরে যাচ্ছ। এই খেলাটা মন দিয়ে খেলো প্লিজ। তোমাকে একটা চমৎকার জিনিস দেখাব তাহলে।”

কে জানে চমৎকার জিনিস দেখার লোভেই নাকি কেন, সে পরপর অনেকগুলো গানের চরণ মিলিয়ে দ্বিতীয় লাইন লিখে গেল। আমাদের এই গানের কলি চলল বহুক্ষণ। একটা সময় আমি লিখলাম,
“আমার সোনার বাংলা…”

সে দ্বিতীয় চরণ লিখল,
“আমি তোমায় ভালোবাসি।”

আমার ঠোঁট ভরে হাসি ফুটে উঠল। পৈশাচিক আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। কী আছে এই তিন শব্দের সংযোগে তৈরি এ বাক্যে? কেন আমার বুকটা অমন করে ধুকপুক করে? ধুরুধুরু বুক নিয়ে লিখে ফেললাম কঠিন কথা,
“কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি না।”

সে বোধহয় থতমত খেল প্রথমটায়। সঙ্গে সঙ্গে আনসেন্ট করে দিল বাক্যটা। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। এটা কি এমন কোহিনূর হিরে? ভালোবাসার একটা স্বীকারোক্তিমূলক বাক্য মাত্র। এটাকে এমন করে মুছে ফেলতে হবে কেন? তবে কি আমি ধরেই নেব সে আমাকে ভালোবাসে না? এজন্যই নিজের সবটুকু ভালোবাসা যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছে আমার হস্তক্ষেপের ভয়ে। সে লিখল,
“আমি তো গানের দ্বিতীয় লাইন বলেছি।”

আমি জোর দিয়ে লিখলাম,
“না। তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটাই বলেছ। আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“গানের লাইন তো এটাই!”
“তা বলে কোনো মেয়ের ইনবক্সে এসে এটা লিখবে তুমি?”
“তুমিই যে বললে!”
“আমি তো তোমাকে শুধুমাত্র এই লাইন লিখতে বলিনি। তোমার উচিত ছিল একসাথে এর পরের লাইনসহ লেখা। যেমন,
আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ…”

সে একসাথে অনেকগুলো ইমোজি সেন্ট করল আমায়। লোকটার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল? এরপর লিখল,
“সত্যিই ভালোবাসো না?”
“না।”

লিখেই আমি হাসতে লাগলাম প্রাণ খুলে। মানুষটা কি জানে, আমি তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি? জানে না। সে এটাও জানে না, তার সাথে অপার্থিব এক জগতে সুখী সংসার সাজিয়েছি আমি। সে সংসারে সুখ আর সুখ। সে একটা স্যাড রিয়েক্টের সাথে লিখল,
“আমার ভুল হয়েছে। প্লিজ ফরগিভ মি ফর এভার।”
“এত সহজে তো তোমাকে ক্ষমা করা যাবে না। তুমি একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছ। জানো এটা অন্যায়?”

সে আবারও স্যাড রিয়েক্ট দিল। সে আমার “অপরিচিতা” নিকনেম মুছে দিল। নতুন নাম দিল, ‘মাই লাইফ লাইন’। আমি অবাক হয়ে লিখলাম,
“মানেটা কী? আমি তোমার লাইফ লাইন কেন হতে যাব?”
“অপরিচিত মেয়েকে যেহেতু প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া যায় না, তাই লাইফ লাইনকে দিচ্ছি। এখন কি প্রেমের প্রস্তাবটাকে ন্যায়ের তালিকায় ফেলা যায়?”
“না, যায় না। তুমি এত বাজে ছেলে! আগে জানলে কখনো তোমার সাথে কথা বলতাম না। তুমি আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছ? ছিঃ!”

আমার কথার ধরনে সে বোধহয় খুব অবাক হলো। সেই অনুভূতির জানান দিল আধুনিক যুগের আবিষ্কার রিয়েক্টের মাধ্যমে। বিস্ফোরিত চোখের একটা গোল মাথা। বিস্ময়ে দু-চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে যেন। সে লিখল,
“কেন, ছিঃ কেন? প্রেম তো ভালো জিনিস, এখানে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কোনো বিষয় তো দেখছি না।”
“তুমি না দেখলেও আমি দেখছি। তুমি দয়া করে আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলো না।”
“আচ্ছা, বলব না। তুমি তাতে খুব খুশি হবে, লাইফলাইন?”

আমি এংরি রিয়েক্ট দিয়ে লিখলাম,
“খবরদার! এই নামেও আমাকে ডাকবে না। অসহ্য ডং!”

এর উত্তরে ও ঠিক কী বলেছিল মনে নেই। কিন্তু হ্যাঁ, প্রেমটা হয়েছিল আমাদের। এর অনেক পরে আমি জেনেছিলাম, সে আমাকে আরও অনেক আগেই ভালোবেসে ফেলেছিল। শুধুমাত্র ভয়ে বলতে পারেনি। যদি আমি মানা করে দিতাম! তবে যখন মজার ছলে আমি তাকে দিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলিয়ে নিলাম, তখন সে আমার মনের খবর জেনে গেল। আর বলে দিল মনের লুকায়িত কথা। প্রকাশ করল নিজের মনের সমস্ত প্রেম। জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখে স্মৃতিচারণ করতে করতে খেয়াল করলাম পরিচিত অবয়বটাকে দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখেই খেয়াল হলো, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ভদ্রলোক ফিরছেন নিজের নীড়ে। দেখতে পেলাম তার হাতে দুটো পলিথিন ব্যাগ। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ব্যাগে কী আছে জানার জন্য।

সকালে ভদ্রলোকের সামান্য আবদারে যখন বাঁকা কটাক্ষে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলাম, ভদ্রলোক তখন ব্যস্ত হাতে ভাতসুদ্ধ প্লেটে পানি ঢেলে দিয়েছিল। চুপচাপ চলে গিয়েছিল অফিসে। আমি শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছিলাম আধখাওয়া ভাতের প্লেটের দিকে। বলিনি কিছুই। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে সারাটা দিন চলে গেল। এখন ভদ্রলোক ফিরছেন। ওনার চোখ-মুখ স্বাভাবিক। মনে হয় না সকালের ঘটনার আহত ভাবটা এখনো আছে।

ভদ্রলোক ঘরে এসে পলিথিনের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে তাকালেন। আমিও তাকালাম তার দিকে। চোখাচোখি হলো আমাদের। পরনের শার্ট খুলতে খুলতে বললেন,
“কী অবস্থা? এমন উজবুকের মতো চেহারা করে বসে আছ কেন? চুলের এই অবস্থা কেন? দেখে মনে হচ্ছে পাবনা থেকে পালিয়ে এসেছ! গোসল করোনি?”

আমি কড়া চোখে তাকালাম। গোসল কিংবা চুল আঁচড়ানোর মতো জাগতিক কোনো কাজে আমার আজকাল আগ্রহ কাজ করে না। এমনকি খাওয়ার কাজেও আমার প্রচুর অবহেলা। আমার শুধু বসে থাকতে মন চায়। ভদ্রলোক ফ্যানের সুইচ দিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন। বললেন,
“কথা বলছ না কেন? শরীর খারাপ?”

আমি এবারেও কিছু বললাম না। নিজেই বললেন,
“আসার সময় দেখলাম সাত্তার চাচা সিঙাড়া ভাজছে। তোমার জন্য নিয়ে এলাম। একটায় সিঙাড়া আর আরেকটায় রাতের জন্য পরোটা আর আলুভাজি নিয়ে এসেছি। আজকে আর রান্না করতে পারব না।”

আমি তাকিয়ে রইলাম। রাতের জন্য আনা পরোটা কিংবা প্রিয় সিঙাড়ার কথা শুনেও আমার মন প্রফুল্ল হলো না। হাসি ফুটল না ঠোঁটের কোণে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমার প্রিয় স্বামীকে। এই পৃথিবীতে তার চেয়ে প্রিয় আমার আর কী আছে? কে আছে? অথচ তাকে আজকাল সহ্যই হয় না। রাগ লাগে তার ওপর। এই যেমন এখন লাগছে। কারণ সে এসেই আমার এলোমেলো অবস্থা দেখে একটা মন বিষণ্ণ করে দেওয়ার মতো কথা বলেছে। আমাকে আজকাল তার উজবুকের মতো লাগে? এই চেহারাটা দেখেই তো বিয়ে করেছিল। তবে আজ এই মন্তব্য কেন? অফিসের সুন্দরী কলিগদের দেখে আমার আর ভালো লাগছে না? আর লাগবেই বা কী করে, তাকে তো সন্তান সুখ দিতে পারব না আমি। তবে কেন ভালো লাগবে? কেন ভালোবাসবে?

এসব কারণ উল্লেখ করেই তার সাথে সেই রাতে প্রচণ্ড ঝগড়া করলাম আমি। বিবাহিত জীবনে এতবড় ঝগড়া আগে কখনোই করিনি। সেই প্রথম রাত্রি, যেদিন স্বামীর বুকে মাথা রাখা ছাড়া পার করলাম আমি। রাতভর কিছুক্ষণ পরপর আমাকে তার বুকে মাথা রাখার জন্য টেনেছিল সে, আমি বড় অবজ্ঞায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। আমার অভিমান হয়েছে। খুব বেশী অভিমান হয়েছে…

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৪

#নীল_ধ্রুবতারা [৪]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

স্ত্রীকে নিয়ে একটা মানুষ কতটা চিন্তাশীল হলে এতো ব্যাকুল হতে পারে? ভদ্রলোকের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে চোখ পিটপিট করলাম কেবল। ভদ্রলোক আবারও অস্থির হলেন,
“এই নবনী, আর ইউ ওকে? এ্যাঁই, কথা বলছো না কেন?”
আমি ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললাম,
“ঠিক আছি।”

মনে হলো ভদ্রলোক আমার গলার স্বর শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ‘আমি ঠিক আছি’ এই কথাটায় স্বস্তিদায়ক কিছু কি আছে? তবে সে এমন করে নিশ্চিন্তের শ্বাস ত্যাগ করলেন কেন? সে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছিলে না কেন?”
“খেয়াল করিনি।”
“আজও নিশ্চয়ই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছো? একা একা বাসায় থাকো। ফোন সাইলেন্ট করে রাখার কি দরকার, নবনী? তুমি কল না ধরলে আমার দুশ্চিন্তা হয়, জানো না?”
“জানি।”

বলেই ছোট করে নিশ্বাস ফেললাম। আমি কল না ধরলে তার যে খুব দুশ্চিন্তা হয় তা আর জানব না? মানুষটা যে আমাকে নিয়ে কতটা ভাবে তা তার গলার স্বর শুনেই টের পাই। তবুও ফোন সাইলেন্ট করে রাখার বদভ্যাস ত্যাগ করতে পারি না। তবে আজ তো ফোন সাইলেন্ট করে রাখিনি। আজ আমি ভাবনায় এতোটাই বিভোর হয়ে মত্ত ছিলাম যে— কখন সে কল করেছে টেরই পাইনি।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“শোনো, আর কখনো ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে না, প্লিজ। অনুরোধ করছি তোমায়।”

আমি সত্যটা বললাম না। কোনোরূপ প্রতিবাদ বিহীন মেনে নিলাম তার কথা। ক্ষীণস্বরে বললাম,
“আচ্ছা আর রাখব না।”
“আমি জানি তুমি আবার ফোন সাইলেন্ট করে রাখবে। আর আমাকে সারাদিন চিন্তায় অস্থির করবে।”

বলেই সে শব্দ করে একরাশ হতাশা মিশ্রিত শ্বাস ফেলল। বলল,
“এখন বলো কি করছো?”
“কিছু করছি না।”
“তোমার গলাটা এতো ভারী শোনাচ্ছে কেন, ঘুমাচ্ছিলে?”
“নাহ।”
“তাহলে?”
“এমনি, কিছুই ভালো লাগছে না। ভীষণ মন খারাপ করছে আমার।”
“কেন? ভালো লাগছে না কেন? আর মনই বা কেন খারাপ করছে?”

আমি এই প্রশ্নের জবাব দিলাম না। ভারী পল্লব আচ্ছাদিত চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে নামল নোনাপানির ধারা। না, শব্দ করে কাঁদা যাবে না। আমার সশব্দ কান্না শুনলে মানুষটা আরও চিন্তা করবে আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি— আমাকে নিয়ে এতো চিন্তার কি আছে? আমি কি বাচ্চা মেয়ে? আমার সামান্যতম অসুবিধায় সে এতো উদ্বেগ প্রকাশ কেন করে? এমনও নয় যে পরিস্থিতি সামান্য অনুকূল হলেই আমি কেঁদেকেটে বুক ভাসাই। তবে ওর কেন এতো চিন্তা আমাকে নিয়ে?

আমাকে নিশ্চুপ দেখে সে বলল,
“সকালে খেয়েছো?”
“নাহ।”
সে করুণ গলায় বলল,
“কেন খাওনি?”
“খিদে পায়নি।”
“নবনী, এখন সকাল এগারোটা বাজে। এখনো তোমার খিদে পায়নি? কাল রাতেও তো কিছু খাওনি তুমি। কেন এমন করছো? আমাকে কেন জ্বালাতন করছো, কি করেছি আমি। কিসের শাস্তি দিচ্ছো বলতো?”

আমি না খেয়ে তাকে কোনো উপায়ে জ্বালাতন করছি ভেবে পেলাম না। তাকে যে আমি একেবারেই জ্বালাতন করি না তা নয়। আমি তাকে খুব জ্বালাতন করি। যখন মাঝরাতে বাথরুমে যায় সে, আমি তখন বাথরুমের সুইচ বন্ধ করে এসে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকি। প্রথম প্রথম সে খুব আশ্চর্য হতো। এরপর বুঝতে পারল মাঝরাত হোক বা খুব গভীর ঘুমের সময়— সে যখন আমার পাশ থেকে উঠে চলে যায় আমার ঘুম তখুনি ছুটে যায়। এরপর থেকে সে নিজেও প্রায় সময় আমি বাথরুমে গেলে লাইট বন্ধ করে দেয়। আবার জ্বালায়। এ আমাদের এক মজার খেলা। ছাব্বিশ বছরের এক ভদ্রলোক পুরুষ এবং একুশ বছর বয়সী এক দুষ্টু নারীর এই রসায়নের কথা বহুদিন অবধি কেউ জানতো না।

কিন্তু এই গোপন খেলার কথা ফাঁস হয়ে গেল হঠাৎ। গতবার রোজার ঈদে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। সেখানে একটাই বাথরুম। গণহারে সেটা সকলে ব্যবহার করে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ভদ্রলোক হঠাৎ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হলো, উনি বোধহয় বাথরুমে গিয়েছেন। আমার বুদ্ধিমান মাথায় চমৎকার একটা আইডিয়া খেলে গেল। গতকাল মাঝরাতে তাকে ডেকে বললাম,
“এই আমি বাথরুমে যাব। একটু এসো না আমার সাথে।”

আমি ভীতু মেয়ে। অন্তত ভূত নামক এক বস্তুকে আমি ভয় পাই ভীষণ। সে জানে সে কথা। তাই সঙ্গে গিয়েছিল। তবে কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল নির্মমভাবে। আমি কাঁপা কণ্ঠে তখন “অ্যাঁ” করে মৃদু চিৎকার দিয়েছিলাম। সে লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বিশ্রী রকম শব্দ করে হেসেছিল তখন। এমনিতে তার হাসির শব্দ চমৎকার। মাঝরাতেই হঠাৎ খুব বিশ্রী লেগেছিল আমার কাছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর নিজের বাহুডোরে আগলে নিতে চেয়েছিল সে আমায়। আহ্লাদ করে বলেছিল,
“খুব ভয় পেয়েছো? আচ্ছা, এরপর থেকে আর ভয় পাবে না এমন একটা উপায় বলে দেই তোমাকে? তুমি বাথরুমে গেলে তোমার সাথে আমিও যাব। তুমি আরামে সুখ কর্ম করবে আর আমি দেখব।”

ছিঃ কি নোংরা মজা। আমি কটমট করে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার অগ্নিদৃষ্টি দেখে সে আবার হেসেছিল। হাত ধরতে চেয়েছিল শক্ত করে। তার বাঁধন গাঢ় হবার আগেই নিজের দন্তপাটি দিয়ে জোরছে এক কামড় বসিয়েছিলাম আমি। দাগটা এখনো জ্বলজ্বল করছিল বহুদিন। কিন্তু তাতেই বা কি? বাথরুমে যাওয়ার পর এখনো লাইট অফ করাটা তো বাকি। আমার মনটা হঠাৎ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল। দ্রুত ছুটে গেলাম বাথরুমের সামনে। আমি নিশ্চিত, রাতে খাওয়ার পরে সে বাথরুমেই গিয়েছে। বাথরুমের লাইট বন্ধ করে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে খিলখিল শব্দে হেসে উঠলাম আমি।

হাসতে হাসতে বললাম,
“কি খবর কালামের পুত? অন্ধকারে পায়খানা ঠিকঠাক ক্লিয়ার হচ্ছে তো? গতকাল রাতে তুমি লাইট বন্ধ করছিলা না, আজ আমি করে দিলাম। হু হা হা!”

এখানে উল্লেখ্য, আমার শ্বশুরের নাম আবুল কালাম। মজা করে মাঝে মাঝে তাকে কালামের পুত বা শাশুড়ীর পোলা সম্বোধন করি আমি। ভেতর থেকে একটা ভারী পুরুষ কণ্ঠ গলা খাঁকারি দিয়ে “উহুহু!” শব্দ করল কেবল। আমি বললাম,
“তুমি যতই উহুহু করো লাইট আমি জ্বালাব না। আজ অন্ধকারেই তোমার শিল্পকলা শেষ করো তুমি।”

এরপর সুর ধরে বিড়বিড় করলাম,
“তুমি থাকো গো কালামের পুত,
অন্ধকারে বইয়্যা…
আমি জ্বালাব না লাইট যতোই
তুমি থাকো চাইয়্যা।”

অশ্রুতপূর্ব এই গান শুনে ভেতরের মানুষটা আরেকবার গলা খাঁকারি দিল। আমি পাত্তাও দিলাম না সেসব। দাঁড়িয়ে রইলাম গাঁট হয়ে। রিনরিনে চাপা হাসিতে মুখরিত হতে লাগল রাতের বাতাস। বেশ অনেকক্ষণ পরে ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ আমাকে বলল,
“মা, লাইট জ্বালাও। আমি বাশারের পুত কালাম। কালামের পুত ভেতরে নাই। ভেতরে তার বাপ আছে।”

ভেতরে আমার শ্বশুরের পুত্র নয়, দাদাশ্বশুরের পুত্র আছে জেনে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে মন চাইল আমার। এ কি এক আকাম করে বসলাম? লজ্জায় লাইট না জ্বালিয়েই ফিরে এলাম ঘরে। ততক্ষণে শাশুড়ী এসে গিয়েছিলেন। ঘটনা জানাজানি হলে বাড়ি হাসিতে মুখরিত হলো।

শাশুড়ী মুখ ভার করে আমার ভদ্রলোক স্বামীকে বলল,
“তোর বউয়ের আর আক্কেল হবে না। ছি, কি লজ্জার কথা! শ্বশুর বাথরুমে গিয়েছে আর ছেলের বউ লাইট বন্ধ করে দিয়েছে, লোকে শুনলে কি বলবে? তুই বাথরুমে গেলেও তোর বউ এই কাজ করে?”

আমি কি করি কি না করি সেই ব্যাখ্যা শাশুড়ী মাকে সে দিল না। আমি কান পেতে শুনলাম, সে কেবল বলল,
“আরে সে কি জানত আব্বু ভেতরে? হয়েছে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। এতে এতো কাহিনীর কি আছে?”

কাহিনীর কিছু না থাকলেও সবাই বিস্তর ইতিহাস খুঁজে পেল সেই ঘটনায়। স্বামী ঘরে এসে হাসতে হাসতে আমায় বলল,
“তোমাকে কি এমনি এমনি গাধা বলি আমি? এখন তো মনে হচ্ছে এতোকাল তোমাকে গাধা বলে বেচারা ওই গাধা জাতটাকে অপমান করেছি আমি। তুমি হচ্ছো উন্নত জাতের লেজবিহীন ছাগল।”

সেদিন নীরবে অপমান সহ্য করে নিয়েছিলাম আমি। তবে সময়ে অসময়ে সেটা ফেরতও দিয়েছিলাম সুনিপুণভাবে। তবুও এই টম অ্যান্ড জেরির সম্পর্ক কখনো মন্দ লাগেনি। মনে হতো এই খুনসুটিতে আমরা বেশ আছি। সেবার ওই ঘটনার পর আমি লজ্জায় শ্বশুর মশাইয়ের সামনে গেলাম না আর। শুধু ফিরে আসার সময় মাথা নত করে বলেছিলাম,
“আব্বু যাই, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আসসালামু আলাইকুম।”

শ্বশুর মশাই সিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
“আচ্ছা, সাবধানে যেও।”

এসেছিলাম সাবধানেই। সংসারও করছিলাম ভীষণ গুছিয়ে। সে সংসার জীবনে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছিল এইসব হেঁয়ালি, দুষ্টুমি, ছেলেমানুষী কাণ্ড, মিষ্টি সব প্রেমের ঝগড়া। দিনকাল কাটছিল খুব চমৎকার। স্বামীকে জ্বালিয়ে যে শান্তি আমি পেতাম তা শান্তিনিকেতনেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাকে জ্বালাতন করার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই। ভঙ্গুর এই মন নিয়ে উচ্ছ্বলিত আবেগে কাউকে বিরক্ত বা জ্বালাতন করা যায় না। তাই অসহায়ের মতো বললাম,
“সরি।”
“সরি, সরি কিসের জন্য?”
“তোমাকে খুব জ্বালাচ্ছি যে! তুমি তো খুব বিরক্ত হচ্ছো। তার জন্য সরি।”
সে হতাশ কণ্ঠে বলল,
“আমি সরি চেয়েছি তোমার কাছে?”
“না, চাওনি।”
“তবে কেন সরি বলছো?”
“এমনি। মনে হলো সরি শুনলে তুমি খুশি হবে।”

আমার নিষ্প্রভ গলার স্বর শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর খুব ধীরে সময় নিয়ে বলল,
“নবনী, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“কি কথা?”
“আমার সাথে তুমি এমন করে কথা বলছো কেন? কি করেছি আমি?”

আমি ভারী বিস্মিত হলাম। তার সাথে আমি কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। রাগারাগি করিনি। কড়া, কঠিন স্বরেও ঝগড়াঝাটিও বাঁধাইনি। তবুও সে কেন এমন করে বলছে? ফোনটা শক্ত করে কানে চেপে ধরে অসহায়ের মতো জানতে চাইলাম,
“তোমার সাথে কেমন করে কথা বলছি আমি?”
“এমন পর পর করে৷ যেন আমি তোমার খুব অচেনা কেউ।”

লোকটার ছেলেমানুষী দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। কিন্তু বিষণ্ণ মনের তাড়নায় ওই হাসিটা ঠোঁটের কোণে চড়াও হলো না। মানুষটা আমাকে ভালোবাসে। তাই তো আমার একটু নির্লিপ্ততা তাকে বড্ড যাতনা দেয়। কিন্তু আমিই বা কি করব? জোরপূর্বক আগের নবনীকে ফিরিয়ে আনা আদৌ কি সম্ভব? চাইলেই কি মনের হতাশা দূর করে মানুষ খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে? কেউ কেউ হয়তো পারে। অধিকাংশ মানুষই পারে না। যারা পারে তারা খুব দক্ষ অভিনয়শিল্পী। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা কেবল সুখী থাকার অভিনয়, হাসি হাসি মুখ করে রাখার অভিনয় করে নিপুণভাবে। আমি তো দক্ষ অভিনেত্রী নই। সুতরাং মনের খেদ বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ পাওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই বর্তমানে, জীবনের এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে বিষণ্ণতার চাদরে আমার কণ্ঠ জড়িয়ে থাকবে এটাই অবধারিত নিয়ম। নিয়ম মেনেই আমি শুধালাম,
“তোমাকে পর ভাবার মতো কাজ আমি কখনোই করতে পারব না, মাহতাব। তুমি সেটা জানো তবুও কেন অযথা কথা বাড়াচ্ছো?”

মাহতাব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। আমিও কানে ফোন চেপে ধরে শুনে গেলাম তার নিশ্বাসের শব্দ। আমার বুকে ধাক্কা দিতে লাগল তার প্রতিবারের শ্বাস-প্রশ্বাসের আনাগোনা। একটা সময় পর আমার মনে হলো মাহতাবের বোধহয় খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাব বোধ করছে ভীষণ।

আমি ভীত হলাম। শুধালাম,
“কথা বলছো না কেন?”
“কি বলব বুঝতে পারছি না।”
“চুপ করেই থাকবে?”
“না। আসলে নবনী আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।”
আমি অপার বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
“কেন?”
“তোমার এতো বেশি মন খারাপের সময় তোমাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার মনটা ভালো করতে পারছি না। এই ব্যর্থতার পুরো দায়টাই তো আমার। আমার এতো খারাপ লাগছে কি বলব তোমায়।”

অপরাধবোধের প্রগাঢ়তায় তার স্বর ভারী হয়ে এল। আমি জানি আমার ভদ্রলোক এখন নিঃশব্দে কাঁদছে। মানুষটা যখন প্রচণ্ড অসহায় বোধ করে তখন সে খুব করে কাঁদে। একদম শব্দহীন কান্না। যেই কান্নায় ভারী হয় ঘরের গুমোট হাওয়া। মানুষটা ভরা মজলিসে কাঁদছে? কলিগরা কি ভাববে তাকে? আমি চিন্তিত হয়ে বললাম,
“তুমি শুধু শুধু নিজেকে দায়ী করছো। কোনো মানে হয় এসবের? আচ্ছা, ছাড়ো এসব। কোথায় আছো তুমি? এতোক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলছো কেউ দেখছে না?”

“না, আমি একটা কাজে অফিসের বাইরে বেরিয়েছি। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছিল। এরপর ভাবলাম তোমাকে কল করে একটু কথা বলি। মনটা হালকা লাগবে। চিন্তাটা কমবে।”

সে আবারও শব্দ করে নিশ্বাস ফেলল। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,
“চিন্তা কমেছে?”
“না।”
“কেন কমেনি কেন? কথা তো হলোই।”
“তবুও কমেনি। তুমি কেন খাওনি এখনো? ফোন রাখার সাথে সাথে নাস্তা করবে। ওষুধ খাবে। আর হ্যাঁ, গোসল করে জামাকাপড় সব ডিটারজেন্ট দিয়ে ভিজিয়ে রাখবে। আমি রাতে এসে ধুয়ে দেব।”
“আচ্ছা।”
“গুড গার্ল। আচ্ছা, এখন তাহলে রাখি?”
“হুঁ।”

আমি মেনে নিলাম তার কথা। মানুষটা এতো চমৎকার কেন যে! এতো ভালো যে কেন আমাকে বাসে! সে কল কাটার আগে বলল,

“শোনো বউ, ভালোবাসি তোমায়।”

আমি শুনলাম। অন্য সময় হলে আমিও নিজের ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতাম অবলীলায়। আজ নিজের ভালোবাসার উপর বিশ্বাস খুঁজে পেলাম না। কেন পেলাম না তা আমি জানি না। শুধু জানি, আমার ভয় লাগছে। এই মানুষটাকে হারানোর ভয়। এতো যত্নশীল পুরুষটিকে আমি হারাতে পারব না। অথচ সন্তানহীন একটা সংসার টিকিয়ে রাখার মন্ত্র যে আমার জানা নেই। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে। আমার মাথার এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে অবাধ্যতার সহিত। মনটাও বিক্ষিপ্ত হচ্ছে সমানতালে। গতকাল থেকে এতো কেন মন খারাপ হচ্ছে আমার? মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবো, এই কি তার কারণ?

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৩

#নীল_ধ্রুবতারা [৩]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

অন্যদিন ভদ্রলোক অফিসে যাবার পরে আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসারটা মন দিয়ে গুছিয়ে রাখতাম আমি। বাসি জামাকাপড়গুলো ধুয়ে রোদে শুকোতে দিতাম। এলোমেলো বিছানার চাদর একটু পরপর টানটান করে বিছিয়ে রাখতাম। কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো। আমার সংসার। আমি গুছিয়ে রাখব না? তাছাড়া আমার শুচিবায়ুর সমস্যা আছে। আমার সুপুরুষ স্বামী খুব পরিপাটি হলেও একটা বিষয়ে ভীষণ বেখেয়ালি। সবসময় ভেজা তোয়ালে বিছানার উপর রেখে দেয় সে। বিয়ের পর থেকে এই ব্যাপারে কথা বলতে বলতে আমি অতিষ্ঠ। আজ হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম সে ভেজা তোয়ালে বারান্দার দড়িতে মেলে দিয়েছে। তা দেখে আমার কেন যেন ভীষণ কষ্ট হলো। মানুষটা এতো দ্রুত বদলে গেল কি করে? যেই কাজটা আমার করার কথা তা কেন সে করছে? এমন তো কথা ছিল না। বিয়ের আগে তো আমি এসব বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি। তবে কেন এই রদবদল?

চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পাই বছর তিনেক আগে তিনদিন আলাপহীন থাকার পরে মানুষটা কতটা মুষড়ে পড়েছিল। অসহায়ের মতো দীর্ঘ মেসেজ করেছিল,
“আচ্ছা, আপনার সাথে কথা বলতে না পারলে আমার এতো অস্থির লাগে কেন? মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। জানেন, এই তিন দিন আমি ঠিক করে কিছুই খেতে পারিনি। খালি মনে হয়েছে, আমার কাছের কিছু একটা যেন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছে। আমি হারিয়ে ফেলেছি কোনো প্রিয় বস্তু। কিংবা প্রিয়জন। আপনি কি জানেন কি সেটা? অথবা আমার কি হয়েছে?”

আমি উনার দেওয়া এই একটা ক্ষুদে বার্তা একবার দুবার করে বহুবার পড়ে ফেললাম। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল দারুণ সলজ্জ হাসি। কি আশ্চর্য! আমার নিজের সমস্যার সবটুকুই কি শোষণ করে নিয়েছে ভদ্রলোক? নয়তো এমন কঠিন অসুখে কি করে পড়লেন তিনি? আকস্মিক তীব্র এক আবেগে আমার চোখে জল চলে এল। অদেখা মানুষটার প্রতি তীব্র প্রেমে দ্রবীভূত হয়ে গেল আমার সদ্য যৌবনা মন। এসব ভাবতে ভাবতে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হলো।

অধৈর্য ভদ্রলোক ফের লিখলেন,
“কোথায় হারালেন?”
“হারাইনি, এখানেই আছি।”
“কি করছেন?”
“ভাবছি।”
“কি ভাবছেন?”
“আপনার অসুখটা নিয়ে ভাবছি।”
“ভেবে কি পেলেন? উত্তর মিলল কিছু?”

আমি একগাল হাসলাম। উত্তর তো অনেকই মিলেছে। কোনটার ব্যাখ্যা দেব আমি উনাকে? উনাকে কি বলব, এই রোগ কেবলমাত্র আপনাকেই কাবু করেনি। এই রোগ আমাকেও বড্ড বাজে ভাবে আহত করেছে। না, তা বলা যায় না। ওই যে বলে না, মেয়ে মানুষের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

আমি লিখলাম,
“জটিল প্রশ্নের উত্তর কি সহজে মেলে?”
“আমার কি খুব জটিল কোনো অসুখ করেছে?”
“শুধু জটিল নয়। ভয়াবহ একটা অসুখ হয়েছে আপনার। যেই রোগে আপনি আক্রান্ত হয়েছেন, এই পৃথিবীতে কোনো ডাক্তার নেই যে এই রোগ সারাবে।”

ভদ্রলোক বোধহয় সামান্য শঙ্কিত বোধ করলেন। জবাব দিলেন না কিছু। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। মানুষটা কি আমার এমন করে বলায় রাগ করল? আমার ইঙ্গিতপূর্ণ কথা অনুধাবন করেই চুপ হয়ে গেছেন? আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল। মানুষটাকে যে আমার জীবনের আলোকবর্তিকা মেনেছি আমি। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম উনার জবাবের। দীর্ঘসময় ব্যয় করলাম উনার ইনবক্সে। কিন্তু দেখা গেল একটা সময় নামের পাশে জ্বলজ্বল করতে থামা সবুজ বাতিটা নিভে গিয়েছে। সেখানে ভেসে উঠেছে পনেরো মিনিট পূর্বে উনার সক্রিয় থাকার বার্তা। আমি ক্ষুণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম ফেসবুক ছেড়ে। কিন্তু মিনিট খানেক পরেই আবার উঁকিঝুঁকি দিলাম একটিবার সবুজ বাতি দেখার আশায়। কিন্তু না, সেদিন বারবার আইডি ঘুরেও সবুজ বাতির সাক্ষাৎ পেলাম না। মনটা আঁকুপাঁকু করতে লাগল। অবসাদে ছেয়ে গেল বুক। সেদিন সারারাত আমার ঘুম হলো না। মাঝরাতে উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ পরপর দেখতে লাগলাম উনার আইডিটা।

ভদ্রলোক জবাব দিলেন ভোরবেলা। এখানে উল্লেখ্য, আমার গৃহকর্তা নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজের পর দুটো নোনতা বিস্কিটের সাথে চা খান। বিয়ের আগে থেকেই উনার এই অভ্যাস। নামাজের পর আয়েশ করে চায়ে চুমুক বসিয়ে আমাকে ভদ্রলোক লিখেছিলেন,
“কেমন আছেন নবনী? রাতে ভালো ঘুম হয়েছে?”

সারারাত ঘুম হয়নি বিধায় আমার চোখ ভোরের দিকে লেগে এসেছিল। গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘুম ভাঙল দিবসের মধ্যভাগে। ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে বের হয়ে ঘরে এসে আয়নায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে দেখলাম নিজেকে। দেখতে আমি গড়পড়তা আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের মতোই। শ্যামলা গায়ের রঙ, বোঁচা নাক, বিশ্রী মোটা এক জোড়া ঠোঁট, যুক্ত ভ্রু যুগল, ডার্ক সার্কেল যুক্ত চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথায় একগাছি লম্বা কেশ। এই। এইতো আমি। মুগ্ধ হবার মতো বিশেষত্ব কিছু নেই আমার মাঝে। না আমি মোটেও রূপবতী নই। এমন রূপহীন একটা মেয়েকে কেউ কেন উজাড় করে ভালোবাসবে? নিজেকে দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। বরাবর নিজের এই বাজে চেহারাটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি আমি। চেহারা সুন্দর না হবার কারণে সমাজের অনেকে অনেক কথাই বলে। তদ্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আমার বিয়ে হবে না।

গ্রামাঞ্চলে পরনিন্দা আর পরচর্চার বিষয়টি অধিক প্রচলিত কি না! আমার জন্মধাত্রীরও আমাকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। কে জানে, উনি হয়তো মানুষের কথা সত্য হয়ে যায় এই ভয়ে তটস্থ থাকেন। আয়নায় নিজেকে দেখে আমি বিড়বিড় করলাম,
“আমাকে কেন আরেকটু রূপসী বানালে না, আল্লাহ! কেন আমার গায়ের রঙ আরেকটু সুন্দর হলো না? কেন আল্লাহ? কেন?”

বলতে বলতে আমি কেন যেন কেঁদে ফেললাম। আমাকে দেখে অপছন্দ করে ভদ্রলোক আমার মেসেজের জবাব দিচ্ছেন না এমনটা নয়। কারণ তিন মাসের পরিচয়ে এখনো আমরা কেউ কাউকে দেখিনি। তবুও কেন যেন এইটাকে প্রধান কারণ দাঁড় করাতে চেষ্টা করলাম। হয়তো আমার আইডি ঘেঁটে আমার ছবি দেখেছেন তিনি। সন্দেহী মনে ফোন হাতে নিয়ে একবার ঘুরে এলাম নিজের আইডি। মুখ উন্মোচন করা কোনো ছবি নেই আমার আইডিতে। যা আছে সবই মুখ ঢাকা। তবে কেন আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন না তিনি? ইনবক্সে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক মেসেজ দিয়েছেন। আমার মনে হলো দূরে বহুদূরে পালিয়ে যাওয়া আমার প্রাণ পাখিটি খাঁচায় ফিরে এসেছে। দ্রুত লিখলাম,
“ভালো আছি। আপনি রাতে আমার সাথে কথা বলতে বলতে কোথায় হারিয়ে গেলেন?”
মিনিটখানেক সময়ের ব্যবধানে সে লিখল,
“কেন? মিস করছিলেন বুঝি?”

আমি ধরে ফেললাম তার কথার সুর। আমিও তো একই ভঙ্গিমায় এই প্রশ্নটা করেছিলাম তাকে। তবে কি সে প্রতিশোধ নিচ্ছে? তার সাথে তিন দিন কথাহীন থাকার শাস্তি? শুকনো ঢোক গিলে আমি লিখলাম,
“মোটেও মিস করছিলাম না। কিন্তু কথা বলতে বলতে হুট করে হারিয়ে যাওয়াটা ভদ্রতা নয়, নিশ্চয়ই?”
সে লিখল,
“আমি কি খুব অভদ্র?”
“হুঁ।”
“আমাকে সহ্য করা যাচ্ছে না একদম?”
“না, ঠিক তা নয়।”
“তবে কি?”
“কিছু না।”

তিন অক্ষর সংবলিত শব্দটা লিখে আমি চুপ করে রইলাম। আমার বুকের ভেতর তখন একটা অচেনা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। সে কি আমাকে ভালোবাসে? পছন্দ করে সিকিভাগও? কথার টোন এমন অন্যরকম কেন? হাজারো প্রশ্ন আমাকে ঘিরে রইল। ভদ্রলোক নিজেই লিখল,
“আমার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বললে না তো!”
আমি লিখলাম,
“কেউ নিজেই জানতে আগ্রহী নয়। তাছাড়া আমি তো ডাক্তার নই।”

সঙ্গে জুড়ে দিলাম ঠোঁট বাঁকানো ইমোজি। যেন আমি তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি না মোটেও। অথচ তার গুরুত্ব আমার জীবনে অক্সিজেনের থেকেও কম কিছু নয়। মানুষটাকে যে আমি কতটা তীব্র ভাবে চাই তা সৃষ্টিকর্তা ভিন্ন আর কেউ জানে না। ভদ্রলোক একটা হাসির রিয়েক্ট দিল আমার কথায়।

এরপর লিখল,
“আমার রোগ বোঝার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার প্রয়োজন বুঝি?”
“হুঁ।”
“আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না?”
আমি কম্পিত হস্তে লিখলাম,
“বুঝতে পারছি।”
“কি বুঝতে পারছেন? নাম কি এই রোগের?”
“প্রেম রোগ।”

এই সামান্য দুটো শব্দ লিখতে অনেকটা সময় নিলাম আমি। অনভিজ্ঞ রোমাঞ্চে সারা শরীর শিরশির করতে লাগল। খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা দক্ষিণা হাওয়া যেন সেই শিরশিরে অনুভূতিকে জোরালো তুলল। কপালে জমল বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার সমস্ত সত্তা হিম হয়ে গেল তার পরবর্তী কথা শোনার আগ্রহে। তার লেখার পূর্বাভাস যখন তিনটে ডট আকারে অবিরত নৃত্য করে চলে চোখের সামনে, তখন একই রকম তালে নৃত্য করে আমার হৃদপিণ্ড। সে লিখল,
“শুনেছি এই রোগ খুব খারাপ। যাকেই এই রোগ একবার ধরেছে মৃত্যু বিনা তার মুক্তি মেলেনি।”

আমি হতচকিত হয়ে লিখলাম,
“এ আবার কেমন কথা? বাজে কথা যত।”
“মোটেও বাজে কথা নয়। এটাই সত্যি কথা।”

আমি গোঁয়ারগোবিন্দ হলাম তখন। বাজে কোনো কথা উদ্ভট কোনো যুক্তি চাপিয়ে দিলেই আমি মেনে নেব? মোটেও না। লজিকের সাথে কোনো কমপ্রোমাইজ আমি কস্মিনকালেও করব না। তিনটে অ্যাংরি ইমোজির সাথে তাকে বললাম,
“প্রমাণ দিন দেখি। এটা কেমন সত্যি কথা।”
“প্রমাণ তো দূর থেকে দেওয়া যায় না। সেজন্য ভালোবাসতে হয়, কাছে আসতে হয়।”

আমার কেন যেন ‘কাছে আসা’ শব্দটিতে বড্ড সমস্যা হয়ে গেল। কাছে আসা আবার কি ধরনের আলাপ? উনার সাথে এমন কথা বলার মতো কোনো সম্পর্ক এখনো আমার হয়নি। যদিও তাকে সম্পূর্ণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলেছি। তা বলে এমন একটা কথা? মানতে আমার বড্ড বিবেকে বাঁধল। মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ হলো, স্বল্প পরিচিত বা অপরিচিত মেয়েদের ইনবক্সে গিয়ে কি উনি এসব কথাই লিখে বেড়ান? ছি! এ কেমন মানুষের প্রেমে পড়লাম আমি? গা গুলিয়ে উঠল হঠাৎ। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে উত্তর দিলাম,

“হোয়াট ডু ইউ মিন? কাছে আসা আবার কি? আমি কেন আপনার কাছে যাব?”

সঙ্গে সঙ্গেই সে লিখল,
“সরি, সরি আপনি কি আমার কথায় রাগ করলেন? আমি কাছে আসা বলতে দেখা সাক্ষাতের কথা বলেছি। অন্য কিছু নয়। প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। আমি খুব সরি। এমন করে বলা উচিত হয়নি।”

আমি বুঝতে পারলাম না কি করব। মানুষটাকে কি বিশ্বাস করা যায়? শুধুমাত্র আমার বোঝার ভুল এই যুক্তিতে কি ক্ষমা করা যায় উনাকে? আমার অসহ্য লাগল খুব। দূর!প্রেম-ভালোবাসা নামক বস্তুটি এতো জটিল? হুটহাট মন খারাপ বা মন ভালো করে দেওয়ার জন্য এই জটিল শব্দ এতোটা ভূমিকা কেমন করে রাখে?

“ভাবী, এই ভাবী? কল ধরেন না কেন?”

ফোনের সুরেলা রিংটোন অনেকক্ষণ ধরেই কেউ আমাকে স্মরণ করেছে সেই বার্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি টের পেলাম না কিছুই। স্মৃতিচারণ করছিলাম আমার প্রণয়ের কথা। আচানক পাশের রুমের ভাড়াটিয়ার কথায় আমার ধ্যানভঙ্গ হলো। কাটল স্মৃতির ঘোর। দেখলাম আমি বসে আছি জানালার ধারে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম অদূরের ওই ছাতিম গাছের দিকে। মাঝখানে একটা মেয়েলি গলার স্বর এবং পরবর্তীতে সেই স্বরের অধিকারিণী এসে আমার নিচ্ছিদ্র মনোযোগে বাধা দিল। দৃষ্টি সরিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকালাম। আমার নিদারুণ অবহেলায় বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়েছে বস্তুটা। ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের কল। পারতপক্ষে তার নাম্বারটাও সেভ করেছি ‘ভদ্রলোক’ নাম দিয়ে। আমি ফোনটা হাতে নিলাম না। তাকালাম আমার ভাবনার জাল ছিন্ন করা মহিলার দিকে। উনার নাম শায়লা। দেখতে রূপবতী। মোটামুটি স্বাস্থ্য। লম্বায়ও বেশ। শুধু যে উনি দেখতে সুদর্শনা তা ঠিক নয়। শায়লা ভাবীর স্বামীও যথেষ্ট জেন্টলম্যান। ভদ্রলোকের একটাই সমস্যা, প্রচুর কৃপণ। ছেলে-মেয়ে কিছু নেই। তবুও এই অতিশয় মিতব্যয়ী স্বভাব কিসের জন্য আমি বুঝতে পারি না।

শায়লা ভাবী আমার বিমূঢ় চেহারাটা দেখে জানালার গ্রিলের খুব কাছে মুখ এনে প্রশ্ন করলেন,
“হঠাৎ এমন ঝিমিয়ে গেলেন কেন? সমস্যা কি? হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে হঠাৎ এমন মরা কান্না জুড়ে দেওয়ার কি কারণ? অনেকরাত অবধি আপনার কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম।”

কথা সত্যি। গতকাল অনেক রাত অবধি জ্বরের মাঝেও বালিশে মুখ গুঁজে গুনগুনিয়ে কেঁদেছি। আমি যে পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি সেই তথ্য জানত শায়লা ভাবী। উনারও ধারণা ছিল আমি বোধহয় মা হতে চলেছি। বোধকরি এই সম্ভাবনার সংবাদ উনার স্বামীর কর্ণগোচরও করেছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে একটা বাজে ঝগড়া হয়েছিল উনাদের মাঝে। সমস্যা দুজনেরই আছে। তবে ঝগড়ার সময় উনারা একে অপরের দিকে খুব বাজে ভাবে আঙুল তুলেন। মা-বাবা না হতে পারার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা একজন চাপিয়ে দেন অন্যজনের ঘাড়ে।
আমি বললাম,
“এমনি। শরীর ভালো না।”
“কেন? শরীরে আবার কি হইলো?”

শায়লা ভাবীর বড় কৌতূহলী প্রশ্ন। অবশ্য এই মরা কান্না দেখে যে কারো কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। আমি বিষণ্ণ মুখে জানালাম,
“কিছু হয়নি।”
“কিছু হয়নি, নাকি মিষ্টি খাওয়ানোর ভয়ে শুভ সংবাদটা দিবেন না?”

আমার চোখ ছলছল করে উঠল। গতকালের পর থেকে আমার চোখ অকারণেই হুটহাট ছলছল করে উঠছে। না, কোনো লোকসমাগমের ভয়ে বাঁধন দিতে পারছি না চোখের জলে। এই থৈ থৈ জলের মাঝে যেন ভেসে উঠছে এক আকাশ পরিমাণ দুঃখ। আমি ভেজা গলায় বললাম,
“যদি শুভ সংবাদই হতো তবে কি এমন করে কাঁদতাম ভাবী? আমার সুখের অন্ত থাকত না তাহলে। অথচ দেখুন আমি কাঁদছি। সুখে কেউ এমন করে কাঁদে?”

শায়লা ভাবী অপ্রস্তুত হলেন। হকচকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। দেখে নিলেন আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে? বাচ্চা পেটে না?”
“না।”

শায়লা ভাবী খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“বিয়ের মাত্র এই কয়দিন। এর মাঝেই বাচ্চা পেটে না দেখে এমনে কাঁদতে হবে? আমার বিয়ের যে আট নয় বছর হয়ে গেল, আমি কি এমন করে কাঁদছি? পা-গ-ল হইছেন?”

আমি ধীর লয়ে জবাব দিলাম,
“আমার খুব বড় অসুখ করেছে ভাবী। এই অসুখ হইলে নাকি জীবনে কখনো বাচ্চা হয় না। আমার জীবনে কোনোদিন বাচ্চা হবে না ভাবী।”

শায়লা ভাবী ঝট করে আমার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলেন?”
“উল্টাপাল্টা না ভাবী। এসব সত্যি কথা। ডাক্তার বলেছে।”

বলতে বলতে আমি ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললাম। ঝাপসা চোখে দেখলাম শায়লা ভাবী জানালার গ্রিল শক্ত করে চেপে ধরেছে। বোঝা যাচ্ছে এমন করুণ খবরে সে খুবই মর্মাহত। শায়লা ভাবী নিশ্চুপ সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একটা সময় পর বলল,

“কি রোগ হয়েছে?”
“ওভারিতে সিস্ট হয়েছে।”
“এটা আবার কি রোগ? জীবনে তো নামই শুনিনি।”

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি আটকে গেলাম। আমি জানি না ওভারিয়ান সিস্ট মানে কি? এমনকি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়া আমি ওভারি সম্পর্কেও ঠিকঠাক জ্ঞান রাখি না। শুধু যে এই বিষয় তা নয়, আমি তেমন করে কোনো বিষয়েই জ্ঞান রাখি না। আমার মাঝে মাঝে খুব আশ্চর্য লাগে এই ভেবে— আমি কি করে এসএসসি, এইচএসসিতে ভালো নাম্বার পেয়ে পাস করলাম? বিদ্যের ঝুলি যে একেবারেই ফাঁকা। আমি নিজের অজ্ঞতা গোপন করলাম। ডাক্তার যা বলেছে তা সাতপাঁচ ঘুরিয়ে বললাম,

“সিস্ট হচ্ছে পানির ছোট ছোট ফুটকা। সেগুলো বাচ্চা হবার পথ বন্ধ করে রাখে। মাঝে মাঝে এসব বড় হয়ে ফেটে যায়। তখন মানুষ মারা অবধি যেতে পারে। আবার এই সিস্টের কারণেই মেয়েদের পিরিয়ড অনিয়মিত হয়। আর..”

শায়লা ভাবী মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন। কিন্তু আমি আরও বিস্তারিত জানানোর আগেই আমার ফোনটা আবার কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। যদিও বিস্তারিত সবই অজানা আমার তবুও আরও বোধহয় বলতে যাচ্ছিলাম। বলা হলো না। শায়লা ভাবী চলে গেলেন। আমি অনিচ্ছায় স্বামীর কল রিসিভ করলাম। রিসিভ করতেই ভদ্রলোকের চিন্তিত স্বর ভেসে এল প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে,

“নবনী, কি করছো তুমি? ঠিক আছো? সেই কখন থেকে কল দিচ্ছি ধরছো না কেন? ঘুমাচ্ছিলে নাকি? নাস্তা খেয়েছো? ওষুধ খেয়েছো? তোমার জ্বর এসেছে আবার?”

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০২

#নীল_ধ্রুবতারা [২]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

আমাদের প্রেমের বিয়ে। ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় ফেইসবুকে। ফেইসবুক নামক একটা প্ল্যাটফর্মেও যে এহেন রত্ন খুঁজে পাওয়া যায় সেই সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিল না। তবে আমি পেলাম একটা খাঁটি রত্ন খুঁজে। ঘটনা হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা আমাকে একটা ফোন কিনে দিলেন। মোটামুটি দামী ফোন। মানুষ বহু আকাঙ্ক্ষিত বস্তু পাবার পর যেমন খুশি হয় আমিও তেমন খুশি হলাম। বন্ধুদের সাথে নানা ভাবে যোগাযোগ করে এই আনন্দের সংবাদটা প্রচার করে দিলাম তাদের কাছে। সহপাঠীদের অনেকেই তখন এই যন্ত্রের স্বাদ নিচ্ছে হৃষ্টচিত্তে। ফোন কিনে দিলেও নিয়মিত ফোনে টাকা পাঠানোর ব্যাপারে বাবার আপত্তি ছিল। সুতরাং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম খোঁজা আমার প্রয়োজন ছিল ভীষণ।

একজন আমাকে জানাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কথা। এতে নাকি ফ্রী-তে মেসেজ করা যায়। আমি আনন্দিত মনে ফেইসবুক ডাউনলোড করলাম। একাউন্ট খুললাম। আমার কাছে উন্মোচিত হলো পৃথিবীর নতুন দ্বার। এতো আশ্চর্য লাগতো সব! যদিও অতশত বুঝতাম না। গণহারে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতাম এবং এক্সেপ্ট করতাম। কপি পেস্ট করে করে অন্যের পোস্ট গ্রুপে গ্রুপে ছড়িয়ে দিতাম। বিধাতা জানেন এতে আমার এতো আনন্দ কেন হতো!

একদিন একটা নতুন গ্রুপে পোস্ট করেছি কিন্তু তিনদিন পরেও সেই পোস্ট এপ্রুভ হলো না। রাগে দুঃখে স্ক্রিনশট নিয়ে সেই গ্রুপের এডমিনকে ইনবক্স করলাম, “ভাইয়া, আপনি কি এই গ্রুপের এডমিন? দেখুন আমি তিন দিন আগে একটা পোস্ট করেছি। এখনো এপ্রুভ হচ্ছে না।”

ভদ্রলোক আমাকে রিপ্লাই দিলেন আরও তিন দিন পর। আমি বারবার উনার আইডিতে গিয়ে চেক করি উনি আমার কথার উত্তর দেয় কিনা। কিন্তু বারবার হতাশ হই। তিন দিন পর প্রায় রাত নয়টার দিকে তিনি উত্তর দিলেন,

“জ্বী আপু। আমি এই গ্রুপের এডমিন। আপনি দাঁড়ান, আমি এপ্রুভ করে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা।”

আমি আনন্দিত মনে ভদ্রলোকের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ফেইসবুক গ্রুপের এডমিনকে তখন আমি বোধহয় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিরাট কেউ মনে করতাম। উনার মতো বিরাট পর্যায়ের লোক আমার মতো নগণ্য মানুষের কথার উত্তর দিয়েছেন তা তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই আনন্দের। এরপর থেকে ওই গ্রুপে নিয়মিত পোস্ট করতাম আমি। পোস্ট করে সাথে সাথে গিয়েই উনাকে বলতাম,

“ভাইয়া, আমার পোস্টটা প্লিজ এপ্রুভ করে দিন।”

বলার সাথে সাথে ব্যস্ততা ভুলে ভদ্রলোক আগে আমার পোস্ট এপ্রুভ করতেন। দিনে বিশটা পোস্ট করলেও তিনি সাথে সাথেই সেগুলোর হিল্লে করতেন। কখনো বিরক্ত হতেন কিনা জানি না। তবে আমি খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের পরিচয়ের সেই শুরু। এরপর নিয়মিত পোস্ট করার সাথে সাথে নিয়মিত তাকে ইনবক্সে নক করাও যেন আমার অভ্যাসে হয়ে দাঁড়াল। তার সাথে কথা না বললে, আমার অস্থির লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। দিন কাটে না। একটা সময় পর মনে হলো আমার বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ এক অসুখের পূর্ব লক্ষণ এসব। একদিন তাকে মেসেজ করলাম,

“আপনার সাথে আজ থেকে আর কোনো যোগাযোগ করব না। আমার ফোনটা আব্বাকে দিয়ে দিচ্ছি।”

না। আদতে ফোন আব্বাকে দিচ্ছি না। মূলত নিজের মাঝে যেই অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি সেই অস্থিরতার ছিঁটেফোঁটাও ভদ্রলোককে স্পর্শ করেছে কিনা সেটা জানার জন্যই আমার এই ছলচাতুরী। আমার চতুরতা সে ধরতে পারল না। লিখল,

“কেন?”
“আসলে আব্বার ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন কিছুদিন আমার ফোন ব্যবহার করবে।”

সে লিখল, “আচ্ছা।”

তার ‘আচ্ছা’ দেখে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। আমার অনুপস্থিতি তাকে যন্ত্রণা দেবে না, একাকিত্ববোধ করাবে না এটা ভেবেই যেন কান্না পেল আমার। কেন? আমাকে সে কেন একটুও মিস করবে না? কেন আমাকে মনে করে মন পুড়বে না তার? অথচ এক বেলা তার সাথে কথা না হলে আমার ভীষণ পাগল পাগল লাগে। তবে কেন, একই অনুভূতির যাতাকলে পিষ্ট হবে না সে? আপনমনে এই প্রশ্নগুলো করতে করতে নিজেকে বোকা বলে ধিক্কার দিলাম হাজারবার। এক পাক্ষিক একটা ভালোবাসায় আমার মন জড়িয়ে গেছে সেটা বুঝতে বাকী রইল না কিছু। অভিমানে তিন দিন অফলাইনে ছিলাম।

দিন তিনেক পরে অনলাইনে গিয়ে দেখি অপরিচিত, অদেখা ভদ্রলোক মেসেজের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। কতশত কথা! কতশত মেসেজ! কয়েকবার অডিও কলও দিয়েছেন। উনার উদ্বিগ্নতা দেখে খুশিতে আমার মনটা চনমনে হয়ে উঠল। আমি লিখলাম,
“বাবাহ, এতো মেসেজ! খুব মিস করছিলেন বুঝি?”

ভদ্রলোক লাইনেই ছিলেন। জবাব এল,
“খুব বেশী।”
“তিনদিনেই এতো? যেদিন নীল-সাদার দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যাব, সেদিন কি করবেন?”

আমার কথার প্রেক্ষিতে ভদ্রলোক তিনটে রাগের ইমোজি দিল। বহু সময় নিয়ে টাইপ করতে লাগল কি যেন। উনার দীর্ঘ টাইপিংয়ে কোন বার্তা ভেসে আসে সেটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম আমি। অনেকটা সময় পর বিরক্ত হয়ে ঘুরে এলাম তার আইডি থেকে। বেচারা তিন দিনেই অসংখ্য দুঃখের কথায় ভর্তি করে ফেলেছে নিজের প্রোফাইল। উনার স্যাড পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্সে ঘুরে এলাম আমি। কয়েকজন বন্ধু লিখেছে,

“কি ব্যাপার মাহতাব, ছ্যাঁকা খেয়েছো নাকি?”

এসব কমেন্টেও দেখা মিলল ভদ্রলোকের রাগের রিয়েক্ট। জবাব কিছু দিলেন না তিনি। প্রায় প্রতিটি পোস্টেই কেউ না কেউ এ জাতীয় মন্তব্য করেছে। এসব দেখে আমার ভীষণ হাসি পেল। আহারে বেচারা! একটা উপযুক্ত প্রেম না করেও ছ্যাঁকাখোর ট্যাগ সহ্য করতে হচ্ছে উনাকে। তার এক বন্ধু লিখল,

“জীবনে প্রথমবার ছ্যাঁকা খাইলে যা হয়! দুঃখ করিস না বন্ধু। মেয়েরা হচ্ছে ছলনাময়ী। এদের বিশ্বাস করাটাই ভুল। মেয়েদের সাথে প্রেম করলে এমনই হয়।”

ভদ্রলোক এই কমেন্টের উত্তর দিয়েছেন। তিনি জবাবে লিখেছেন, “তুই তাহলে একটা ছেলের সাথে প্রেম করিস বন্ধু।”

জবাব দেখে আমার পেটে খিল দেওয়ার মতো হাসি পেল। বুঝলাম অতি শান্ত, ভদ্র যেই মানুষটার সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে তিনি এতোটাও ভদ্র নয়। একই মুদ্রার আরেকটা পিঠ আছে তবে। মুদ্রার উল্টো পিঠের মানুষটা ভারী দুষ্টু। এর সাথে আমার প্রেম হলে ভারী দুষ্টু একটা প্রেমিক পাব আমি। আমি ফের ফিরে গেলাম ইনবক্সে। বহুক্ষণ ধরে ভদ্রলোক কি লিখেছে সেটা দেখার উত্তেজনায় আমার হাত-পা অবশ হয়ে এল। আমি বোধহয় এই ভাবনায় নিশ্চিত ছিলাম, ভদ্রলোক এখন আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিবে। কিন্তু দেখতে পেলাম আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক একটা আশ্চর্য কথা লিখেছে। জানতে চেয়েছে কারণ।

“নবনী, এই নবনী?”

শরীরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি অনুভব করে আমার ঘুম ছুটে গেল। ছিন্ন হলো আমার স্বপ্নের ঘোরের জাল। আমাদের অতীতের একটা দৃশ্যপট সুনিপুণ বিন্যাসে ধরা দিয়েছিল ঘুমন্ত চোখের পাতায়। আহা! আমার সেই সোনালী অতীত। চোখ বুজলেই যেই অতীতের স্নিগ্ধতা শরীর মন শীতল করে দেয়। কি দিন ছিল সেই সব। প্রেমে যে কি অপার সুখ সেটা তো এই ভদ্রলোকের থেকে জেনেছি আমি। ঘুম ঘুম চোখে আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। ওই তো আমার সেই প্রেমিক পুরুষ। যাকে প্রথম দেখেছিলাম বৃষ্টিস্নাত এক দুপুরে। না, একগুচ্ছ কদম হাতে নয়। একগুচ্ছ গোলাপ হাতে এসেছিল সে। বিভিন্ন রঙের গোলাপ। আমি বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে দেখে। যেমন আজও হচ্ছি।

ঘনঘোর বর্ষার এই দিনেও ভদ্রলোকের কানের পাশ ঘেঁষে নামছে সরু ঘামের ধারা। অন্য সময় ঘুম থেকে উঠে এমন ঘর্মাক্ত মুখশ্রী দেখলে ব্যস্ত হয়ে পরনের ওড়নার কোণ দিয়ে মুছে দিতাম সেই নোনাপানি। আজ আর ইচ্ছে করল না। শরীর ও মনে কোথাও সেই তাড়না নেই। সে আমার বিমূঢ় চোখে চেয়ে থাকতে দেখে সামান্য হকচকিয়ে গেল বোধহয়। নিজের বাম হাত দিয়ে কপালে মুক্তোর বিন্দুর ন্যায় জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ছুঁড়ে ফেলল দূরে। মেঝেতে গড়িয়ে পড়া ওই একবিন্দু জলের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। এমন করেই হয়তো সে কোনো একদিন আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে নিজের জীবনের পাতা থেকে। সে আমার পাশে বসে কপালে হাত রাখল। না, জ্বর নেই। অস্ফুটে সে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ, জ্বর কমে গেছে। শোনো, আমি খিচুড়ি রান্না করেছি। তুমি খেয়ে ওষুধ খাও। সকালের ওষুধ আমি গুছিয়ে রেখেছি ওখানে।”

তার ইশারাকৃত স্থানের দিকে একবার তাকালাম আমি। টেবিলের ওপর রাখা ট্যাবলেটগুলো দেখে আমার বুকটা আবার হু হু করে উঠল। আস্ত ট্যাবলেটের পাতা থেকে সকল ট্যাবলেট কাঁচি দিয়ে একটা করে কেটে রেখেছেন তিনি। কেন আমাকে এতো আদর আহ্লাদ করতে হবে? এই আহ্লাদ যখন শেষ হয়ে যাবে আমি তখন সহ্য করতে পারব না। একদম পারব না। আমার চোখ ভরে উঠল জলে। গতকাল সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরেছি। এসে থেকে বর্ষার অবিরাম ধারার মতো কেঁদেছি যতক্ষণ জেগে ছিলাম ততক্ষণ। আমাকে নিভৃত করার অনেক চেষ্টা করেছেন ভদ্রলোক। পারেনি। শেষটায় হতাশ হয়ে বললেন,

“ডাক্তার কি বলেছে আমাকে তো ঠিক করে জানালেও না। একা একা কেঁদে অস্থির কেন হচ্ছো? তুমি না আমার লক্ষ্মী বউ। লক্ষ্মী মেয়েরা তো এমন করে কখনোই কাঁদে না।”

অন্য সময় হলে, কয়টা লক্ষ্মী মেয়ের সাথে তার পরিচয় আছে সেই প্রশ্ন করে তাকে জর্জরিত করে ফেলতাম আমি। বাচাল নামক একটা বিশেষণ আমার সাথে খুব যায়। আজ হঠাৎ নিজের সাথে সেই বিশেষণের যোজন যোজন দূরত্ব টের পেলাম। কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই রাতে তাকে সবটা খুলে বলেছিলাম আমি। বলা বাহুল্য সন্তান হবে না এই বিষয়টি থেকে আমার ওভারিতে থাকা সিস্ট উনার চিন্তার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। সে অনেক রাত অবধি আমার রিপোর্টগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছে। অনলাইনে রিসার্চ করেছে বিস্তারিত। পরিচিত একটা গাইনী ডাক্তারের সাথে ফোনে কথাও বলতে শুনেছি। তবে পাত্তা দেইনি সেসব।

কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় গা কাঁপিয়ে জ্বর এল আমার। শীত শীত করতে লাগল খুব। ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে এসে কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঝরাতে লাগলাম চোখের জল। বর্ষাকালের শীত শীত ভাব বিরাজমান প্রকৃতিতে। তা বলে ফ্যান বন্ধ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে নাক মুখ ঢেকে রাখার মতো মাঘমাসের শীত নামেনি। ভদ্রলোক বাগ্র হয়ে ছুটে এলেন। ব্যাকুল গলায় প্রশ্ন করলেন,
“এ্যাঁই কি হয়েছে তোমার?”

আমি জবাব দিলাম না। ভদ্রলোক আমার শরীর থেকে কাঁথা সরাতেই শিউরে উঠল সর্বাঙ্গ। লোমকূপ অবধি খাড়া হয়ে উঠল শীতের তোপে। গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। অতি চিন্তিত স্বরে বললেন,
“একি! গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”

এরপর উনি নিজের একটা গেঞ্জি ভিজিয়ে এনে খুব গুছিয়ে আমার কপালে জলপট্টি দিলেন। আমরা হসপিটালে যাবার আগে দুপুর আর রাতের রান্না করে গিয়েছিলাম। ওহ, আমি না বলে আমরা বলছি কেন? কারণ ছুটির দিনে ভদ্রলোক রান্নায় আমাকে খুব সাহায্য করেন। সাহায্য না, উনার চাওয়া ছুটির দিনে উনি নিজে আমাকে রান্না করে খাওয়াবেন। প্রথমে কয়েকবার উনার এই চাওয়াকে সম্মান করেছি আমি। তবে কয়েক সপ্তাহ দেখার পর আর সেই প্রবৃত্তি হয়নি। বলা বাহুল্য, উনার ব্যঞ্জনে তেল, ঝাল মশলার এতো অপ্রতুলতা থাকে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। আবার মুখের উপর বলাও যায় না, তোমার রান্না খেতে পারি না আমি। তাই কসরত করে ছুটির দিনে আমি আর ও মিলে রান্না করি। সে যদি সবজি কাটে আমি সেই সবজি রান্না করি। সে মাছে নুন হলুদ মাখায় আমি ভেজে দেই। আবার আমি পেঁয়াজ কাটি সে গরম তেলে সেই কাটা পেঁয়াজ বেশী করে দিয়ে পিয়াজু ভাজে। এই তো আমার সুখ। তবে যেই সুখী সংসারের গল্প আমি করেছি তাতে মিথ্যে কি আছে বলুন?

ভদ্রলোক খাবার গরম করে নিয়ে এলেন। কিন্তু আমি খেলাম না কিছু। রুচি হলো না। হাজার অনুরোধ উপরোধের পর ব্যর্থ হয়ে একটা আপেল কেটে দিলেন তিনি। আমি সেটাও ফিরিয়ে দিলাম অবহেলায়। হতাশ হয়ে শেষ অবধি আমাকে খালি পেটেই একটা নাপা ট্যাবলেট খাওয়ালেন তিনি। যেহেতু খালি পেট সেহেতু আজকে ডাক্তার যেসব ওষুধ দিয়েছেন সেসব আর দিলেন না। আমিও আগ্রহ দেখালাম না। বরং চোখ বন্ধ করে নিলাম। কপালের জলপট্টি থেকে আমার নাকে আসতে লাগল আমার স্বামীর গায়ের গন্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পারফিউমের মাঝেও বোধহয় এতো সুগন্ধ নেই। এই গন্ধে ঘোর লাগে। চোখ বুজে আসে। ঘুম পায় ভীষণ। খুব গাঢ় ঘুম।

এরপর সকাল হলো। একটা অন্যরকম সকাল। আমার জীবনের পাতা বদলে দেওয়া একটা সকাল। ভদ্রলোক গোসল শেষ করে ফিটফাট হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে মারাত্মক সুদর্শন পুরুষটি আমার মতো এলোমেলো নারীর কপালে গাঢ় চুম্বন করলেন। কপালের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললেন,

“আসি হ্যাঁ? তুমি কিন্তু ঠিক করে ওষুধ খাবে।”

বরাবরের মতো আমি নির্বাক রইলাম। সে আমাকে আবারও বারবার করে ওষুধ খাবার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু আমি? আমি কানেও তুললাম না সেসব। ভদ্রলোক বেরিয়ে যেতেই গতকালের অসহ্য যন্ত্রণা ফিরে এল আবার। নিদারুণ এক একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করে নিল তখন। আমি কল্পনা করতে লাগলাম আমার ভাঙা সংসারের প্রতিচ্ছবি। যেখানে আমার এই দায়িত্বশীল স্বামী বদলে গিয়ে হয়ে উঠেছেন একজন হবু বাবা। যিনি একটিবার নিজের সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনার জন্য মরিয়া। আমার কানে বাজতে লাগল কল্পপুরুষের তাচ্ছিল্যের স্বর,

“যে নারী কোনোদিন মা হতে পারবে না, তার সাথে সারাজীবন কেন থাকব? কোন আশায়? তোমার ব্যর্থতার জন্য কেন বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত থাকব আমি? নবনী প্লিজ, এবার এই সংসার সংসার খেলার সমাপ্তি হোক। আমাদের দুজনের ভালোর জন্য এবার একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”

—চলমান—

নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০১

নীল_ধ্রুবতারা
[সূচনা]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“আমি কখনো মা হতে পারব না।”

ডাক্তারের চেম্বার থেকে থমথমে মুখ নিয়ে বের হয়ে, স্বামীর উদ্বেগপূর্ণ মুখখানার দিকে একবার করুণ দৃষ্টিতে তাকালাম। শান্ত, স্নিগ্ধ, বটবৃক্ষের ন্যায় মানুষটার আমাকে নিয়ে ব্যাকুলতার শেষ নেই। নেই বলেই হয়তো আমি বের হবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,

“ডাক্তার কি বলল?”

উত্তরে আমি যান্ত্রিক কন্ঠে তাকে যেই সত্যটি জানালাম সেটি এখনো আমারই বিশ্বাস হচ্ছে না। কোনো মেয়ের কাছে পৃথিবীর নির্মম সত্যটা বোধহয় এটাই। নারী মাত্রই মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চায়। মা হওয়ার মাঝে কি যে অনাবিল সুখ সেটা যে কখনো মা হতে পারবে না, সে কি করে বুঝবে?

আমার স্বামী নিরেট ভদ্রলোক, সদা হাসোজ্জ্বল, আপনজনদের প্রতি অসম্ভব যত্নশীল একজন মানুষ। দুই বছরের সংসার জীবনে তাকে রাগ করতে কখনো দেখিনি আমি। আমাদের প্রবল ঝগড়ার মাঝেও তিনি সবসময় নির্বিকার, নির্বাক ভূমিকা পালন করেছেন। একা একা ঝগড়া করা যায় না। ফলস্বরূপ তেজী বুনো ঘোড়ার মতো তড়পাতে তড়পাতে এক সময় স্তিমিত হয়ে এসেছে আমার কন্ঠের তেজ। অটল হিমালয়ের ন্যায় মানুষটা তখন আমাকে ভালোবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছে,

“রাগ কমেছে তোমার?”

তার স্পর্শের শীতলতা, কন্ঠের মোলায়েম ভাব আমার পারদস্পর্শী রাগকে জল করে দিত সহসাই। মাঝে মাঝে আমার এটা ভেবে আবার রাগও হতো— কেন এই মানুষটা আমার কটু বাক্যবাণের বিপরীতে দুটো কড়া ধমক দেয় না? পুরুষ মানুষ এমন নিরুত্তাপ হয় নাকি? চিরকাল তাপ-উত্তাপহীন থাকা মানুষটা কঠিন সত্য শুনে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। আমার চোখে তখন ঘনঘোর বর্ষা নেমেছে। বহু কষ্টে চোখের জলে বাঁধ নির্মাণ করে টলতে টলতে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়েছি। বন্যার জলকে এ পর্যায়ে আর বাধা দেওয়া গেল না। হু হু করে বেয়ে নামতে লাগল কপোল বেয়ে। আকস্মিক আমার ক্লান্ত শরীরটা ভার ছেড়ে দিল। হাতের রিপোর্টগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল নিচে। হাসপাতালের ঝকঝকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার পূর্বেই ভদ্রলোক শক্ত করে চেপে ধরল আমার বাহু। জীবনের প্রথম সেদিন তার অস্থির কন্ঠ শুনলাম,

“এই নবনী, ঠিক আছো তুমি?”

আমি জবাব দিতে পারলাম না। দু’চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে এল। গলা শুকিয়ে কাঠ। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মমতম সত্য আমার শরীরের সবটুকু শক্তি করুণভাবে কেড়ে নিয়েছে। ভদ্রলোক হাসপাতালের সারি সারি চেয়ারের এক কোণায় আমাকে বসিয়ে দিলেন। পাশে বসে শক্ত করে চেপে ধরলেন আমার হাত। উনার এই চেপে ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাঝে বোধহয় আশ্বাসবাণী কিছু ছিল। যা অনুভব করেই আমার ফের কান্না পেল। আমি কাঁদতে লাগলাম অঝোর ধারায়।

জীবনের প্রথম আমাকে সেদিন ধমক দিলেন তিনি,

“আশ্চর্য! এমন গাধার মতো কাঁদছো কেন? চোখ মুছো, কান্না বন্ধ করো। আর একটুও কাঁদবে না।”

ভেজা ভারী নেত্রপল্লব তুলে আমি তাকে দেখলাম। মানুষটা গম্ভীর মুখে আমাকে ধমক দিয়েছে। অথচ এই ধমকের সুরে আমার কান্না থামল না। গাধার মতো কাঁদছি আমি? আমাকে গাধার মতো এমন নিম্নস্তরের প্রাণীর সাথে তুলনা দেওয়াতেও আমার একটুও রাগ হলো না। অথচ অন্য সময় যদি সে একথা বলতো, আমি তাকে আরও হাজারটা ইতর শ্রেণীর প্রাণীর সাথে তুলনা করতাম। এখন বহু চেষ্টা করেও সেই উদ্যম খুঁজে পেলাম না। জাগতিক কোনো মান-অপমান, সুখ-শান্তি বোধহয় আমাকে আর কখনোই অভিভূত করতে পারবে না। আমার বাকিটা জীবন বোধহয় কেঁদে কেটেই পার করতে হবে।

আমার স্বামী আমার হাত ছেড়ে দিয়ে রিপোর্টগুলো মেঝে থেকে তুলে আনল। গুছিয়ে ফাইলের ভেতরে রেখে দিয়ে বলল,

“চলো, বাসায় চলো।”

বাসা! এই ছোট্ট উপজেলা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অগণিত ছোট্ট ছোট্ট ঘর। আমি যেই তিনতলা বিল্ডিংয়ে বসে আছি— সেই বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে নিচে তাকালে বহুদূর অবধি সেই ঘরগুলোর টিনের চাল দেখা যায়। এখান থেকে দশ টাকা ভাড়ার দূরত্বে তেমনই ছোট্ট ঘরে আমাদের একটা সংসার পাতা আছে। সেই সংসারের প্রতিচ্ছবিটা সুখেরই বটে। স্বামীর অল্প মাইনের চাকরিতেও এক রুমের সেই বাসায় আমার দিন কাটে ভারী আনন্দে। আজকের পর থেকে সেই আনন্দ আদৌও তেমন থাকবে কিনা জানি না। আজ আমার জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে৷ নারীদের জীবনের এই পরিবর্তনের মতো করুণ বোধহয় আর কিছুই নেই। এমন আরও সাতপাঁচ ভাবনায় বিভোর হয়ে আমি দ্বিরুক্তি করলাম না। উঠে দাঁড়ালাম সেই ছোট্ট ঘরে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ভদ্রলোক চাইলেন আমাকে ধরে নিয়ে যেতে। কিন্তু কেন যেন আমার অসহ্য ঠেকল উনার অতি যত্ন। এই যত্নশীল পুরুষ যে সময়ের বিবর্তনে রঙ বদলাবে তা কি আর আমি জানি না?

হসপিটালের বিল্ডিংয়ে লিফট নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। এই ছোট্ট উপজেলা শহরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লিফট খোঁজা আশার বাহুল্য। তিন তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে আমার বেশ কষ্ট হলো। এমনিতে আমি দুর্বল চিত্তের নারী নই। একটা বড় সংসারের সকল কাজ একা হাতে করে আসার ক্ষমতা আমার আছে। তবে আজ আমি সেই ক্ষমতার সৎ ব্যবহার করতে পারলাম না। বহু কষ্টে রেলিং ধরে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে নিচে নেমে এলাম।

ভদ্রলোক একটা রিকশা ডেকে আমাকে উঠিয়ে দিলেন। বললেন,

“তুমি এখানে একটু বসো, আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”

আমি কোনো কথা বললাম না। কেবল অনিমেষনেত্রে চেয়ে রইলাম তার যাওয়ার পানে। চোখের জল তখনো ঝরছে। ভদ্রলোক পাশের ফার্মেসি থেকে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে এল। ওষুধের ব্যাগ দেখে মনে হলো ভদ্রলোক বোধহয় দোকানটাই আমার জন্য তুলে এনেছেন। এ পর্যায়ে আমি বললাম,

“এতো ওষুধ?”

“সম্পূর্ণ এক মাসের জন্য নিয়ে এসেছি।”

তার গলার স্বরে দায়িত্বশীলতার ছাপ স্পষ্ট হলো। আমি কিছু বললাম না। এক মাসের এই পথ্য কিনতে তার যে ভালো অঙ্কের একটা টাকা ব্যয় হয়েছে সেটা বুঝে গেলাম তখুনি। আমাকে সুস্থ করার এতো তাড়া উনার! আমি অবশ্য অসুস্থ নই। দুই মাস ধরে পিরিয়ড হচ্ছে না। সন্দেহ করেছিলাম, কনসিভ করেছি। কিন্তু বাড়িতে টেস্ট কিট এনেও যখন ফলাফল পজিটিভ কিছু পেলাম না— তখন এসেছি ডাক্তারের কাছে। এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মহিলা ডাক্তার আমাদের এলাকায় বেশ নামকরা। উনার সুখ্যাতি সকলের মুখে মুখে। আম্মার কাছে শুনেছি, আমি পেটে থাকতে নাকি মাত্র বিশ টাকা ভিজিটে আম্মাকে দেখেছিলেন তিনি। এখন নিচ্ছেন পাঁচশ টাকা। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। সুতরাং উনার অভিজ্ঞতার দিকে আঙুল তোলা যায় না। তাছাড়া আলট্রাসাউন্ড রিপোর্টেও নেগেটিভ এসেছে। আমি গর্ভবতী নই এটা সমস্যার কারণ নয়। যেহেতু বিয়ের মাত্র দুই বছর এখুনি এতো ক্ষুণ্ণ হবারও কিছু নেই। চিন্তার বিষয় হলো আমার ওভারিতে সিস্ট আছে। আর সিস্ট নামক বস্তুটির কারণেই আমার এই জটিলতা। যাদের ওভারিতে সিস্ট থাকে তারা নাকি জীবনে কখনো মা হতে পারে না। ভদ্রমহিলা নিজের এতো বছরের ডাক্তারি জীবনে কখনো তেমন দেখেননি। সুতরাং আমার মা হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ভদ্রমহিলা আমাকে পিরিয়ড হবার ঔষধ দিলেন। এবং পনেরো দিন পরে আবার দেখা করতে বললেন।

শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি নামবে যখন-তখন। এই বৃষ্টির জল কি ধুয়েমুছে দিতে পারবে আমার ভেতরের সমস্ত কষ্ট? না, পারবে না। আমার জীবনে যেই আঁধার ঘনিয়ে এসেছে সেই আঁধার সরানোর জন্য এই বৃষ্টির জল, বা হাজার বাল্বের আলোও যথেষ্ট নয়। প্রকৃতিও কেমন অন্ধকার করে রেখেছে মুখ। সন্ধ্যার আগেই মনে হচ্ছে ঘনঘোর সন্ধ্যা। এমনই কালো সাঁঝের বেলায় রিকশা করে নিজেদের সুখের নীড়ে ফিরছি দুজন। একটা সংসারকে সুখের বলার জন্য যে যে উপাদান থাকা প্রয়োজন সেই সবটাই আছে আমাদের সংসারে। বিবাহিত জীবনের এই দুটো বছরে আমাদের কখনো মনে হয়নি — আমরা অসুখী। আজ হঠাৎ নিদারুণ এক অসুখে আমার বুক ভেঙে যেতে লাগল। টনটন করতে লাগল বুকের পাঁজর। আমার সুখ, আমার প্রেম, আমার প্রিয় পুরুষ সব হয়তো অতিসত্বর আমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাবে। দূরে বহুদূরে। যতটা দূরত্বে গেলে আমি অতি পাওয়ারের চশমা পরেও তাদের দেখতে পাব না। এসব ভেবেই তার কাঁধে মাথা রেখে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম আমি। সে আমাকে আর সান্ত্বনা দিল না। বলল না, কান্না থামাও। কেবল একটা ভরসার হাত পুরোটা পথ আমার মাথায় রেখে দিল সে। বোঝাতে চাইল সে ছিল, সে আছে এবং সে থাকবে আমার চিরকালীন সঙ্গী হয়ে।

কিন্তু আমার মন? এই মন কি তা মানে? শুধুমাত্র একটা অদেখা প্রাণের জন্য কতশত সংসার ভেঙে যেতে দেখেছি আমি। যার কোনো অস্তিত্ব এই পৃথিবীর কোথাও নেই তার জন্য কোন্দল করে মরতে দেখেছি কত দম্পতিকে! কত ভালোবাসার মানুষ একবুক আশা নিয়ে সংসার পাতার পর হঠাৎ সন্তান না হবার সংবাদ শুনে দূরে সরে গেছে। তখন তাদের ভালোবাসার মানুষ হয়ে উঠেছে সেই অদেখা একটা ভ্রূণ। না, খুব দূরে কোথাও সেই ঘটনা ঘটেনি। আমাদের পাশের রুমের ভাড়াটিয়াদের বিয়ের আট বছর চলমান। অথচ সন্তান নেই। ভদ্রলোক ভালো চাকরি করে। মোটা মাইনে। সংসারে অভাব নেই একরত্তি। সেই সাথে নেই শান্তি। দু-জনে রাত-দিন ঝগড়া করে, এ বেলা স্বামী রেগে গিয়ে স্ত্রীকে গালাগালি করছে তো ওবেলা স্ত্রী রেগে গিয়ে স্বামীর গুষ্টির ষষ্ঠী উদ্ধার করছে। অথচ আমাদের ঘরে দারুণ সুখ। অনন্ত অনাবিল সেই সুখ বুঝি এবার কেড়ে নিলেন সৃষ্টিকর্তা। পাশাপাশি দুটো ঘর বুঝি এবার সত্যি সত্যি অশান্তির অনলে দ্রবীভূত হবে।

আমার সুখের উপর কোন শকুনের নজর পড়ল জানি না। তবে এটা জানি, আমার সুখের দাম্পত্যের ইতি ঘটবে এবার। সমাজের আর দশটা সংসার যেমন করে ভাঙে তেমনি করেই ভাঙবে আমার এক পৃথিবী ভালোবাসা দিয়ে সাজানো সংসার। আচ্ছা, আমি কেমন করে সইবো এই ভাঙন? আমার নিপাট ভদ্রলোক, দায়িত্বশীল স্বামীর বদলে যাওয়া মানব কেমন করে? আমার এই একুশ বছরের জীবনের সবটুকু ভালোবাসা যার পায়ে অর্পণ করেছি, এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীর বুকে যাকে সবচেয়ে আপন ভেবেছি তার থেকে দূরে গিয়ে আমি আদৌও বাঁচব তো? আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধড়ফড় করতে লাগল। মনের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা নীল ব্যথার মতো ছড়িয়ে যেন লাগল সর্বাঙ্গে। আমি বোধহয় বাঁচব না। আমার স্বামীর ভালোবাসাহীন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আমার জন্য অসম্ভব। ওই তো মৃত্যু, আমার দুয়ারে কড়া নাড়ছে। হাত বাড়ালেই হয়তো ছুঁয়ে দিতে পারব তাকে।

চলবে।

Что нужно знать о сайте Kraken: важные особенности и возможности

Что нужно знать о сайте Kraken: важные особенности и возможности

Основная информация о функционале и особенностях сайта Kraken, который остается популярным среди пользователей.

Сайт Kraken уже несколько лет привлекает внимание пользователей благодаря своей функциональности и надежности. Эта платформа предлагает множество возможностей, которые стоит изучить перед началом работы.

Основные функции сайта Kraken

Платформа предоставляет широкий спектр инструментов для различных задач. Пользователи могут работать с криптовалютами, совершать транзакции и анализировать рынок. Интерфейс интуитивно понятен даже для новичков.

Для получения актуальной информации рекомендуется проверять ресурс https://bhr-q.cc, где регулярно публикуются обновления.

Безопасность остается приоритетом разработчиков. Система использует современные методы шифрования и двухфакторную аутентификацию для защиты аккаунтов.

Регистрация и верификация

Создание аккаунта на сайте Kraken занимает несколько минут. Необходимо указать базовую информацию и подтвердить email. Для расширенных функций потребуется пройти верификацию личности.

Процесс проверки документов обычно занимает от нескольких часов до суток. Это стандартная практика для подобных платформ, обеспечивающая безопасность всех участников.

Особенности работы с криптовалютами

Сайт Kraken поддерживает множество цифровых активов. Пользователи могут торговать, переводить и хранить различные криптовалюты. Комиссии за операции остаются конкурентоспособными.

Важно учитывать волатильность рынка при работе с цифровыми активами. Платформа предоставляет аналитические инструменты для принятия обоснованных решений.

Мобильное приложение и доступность

Для удобства пользователей доступно мобильное приложение с основными функциями сайта. Оно доступно для iOS и Android, что позволяет следить за аккаунтом в любое время.

Синхронизация между веб-версией и мобильным приложением происходит мгновенно. Это особенно удобно для активных трейдеров, которым важно оперативно реагировать на изменения рынка.

Безопасность и конфиденциальность

Разработчики уделяют особое внимание защите данных пользователей. Регулярно проводятся аудиты безопасности и обновляются протоколы шифрования.

Рекомендуется использовать сложные пароли и активировать все доступные методы защиты аккаунта. Это минимизирует риски несанкционированного доступа.

Перспективы развития платформы

Сайт Kraken продолжает развиваться, добавляя новые функции и улучшая существующие. В планах на 2026 год – интеграция с дополнительными платежными системами и расширение списка поддерживаемых активов.

Пользователи могут ожидать дальнейшего упрощения интерфейса и увеличения скорости обработки транзакций. Эти улучшения сделают работу с платформой еще удобнее.

За 5 минут: кракен как зайти – быстрый и безопасный вход

За 5 минут: кракен как зайти – быстрый и безопасный вход

Пошаговая инструкция по входу на Kraken с актуальными зеркалами и рекомендациями по безопасности для новых пользователей.

Многие пользователи интересуются, как быстро и безопасно получить доступ к популярному маркетплейсу. В этой статье мы подробно разберем все способы входа, включая использование зеркал и VPN.

Что такое Kraken и зачем он нужен

Kraken – это одна из крупнейших платформ в своем сегменте, предлагающая широкий спектр услуг. Пользователи ценят ее за надежность, анонимность и удобный интерфейс. Однако новички часто сталкиваются с трудностями при первом входе.

Базовые способы входа на платформу

Существует несколько проверенных методов доступа. Самый простой – использовать свежий кракен как зайти через актуальные рабочие ссылки. Этот способ подходит тем, кто хочет сэкономить время.

Важно помнить, что ссылки могут периодически меняться из-за технических особенностей работы платформы. Поэтому рекомендуется всегда проверять их актуальность.

Использование VPN для дополнительной безопасности

Для максимальной защиты данных эксперты советуют комбинировать вход через зеркала с надежным VPN-сервисом. Это особенно важно для пользователей из регионов с ограниченным доступом.

Хороший VPN не только скрывает ваше местоположение, но и шифрует трафик, делая работу с платформой более безопасной. Выбирайте проверенные сервисы с высокой скоростью соединения.

Решение распространенных проблем при входе

Если вы столкнулись с ошибками при попытке войти, сначала проверьте стабильность интернет-соединения. Часто проблемы возникают из-за медленного интернета или блокировки провайдером.

В случае постоянных трудностей попробуйте очистить кэш браузера или использовать другой веб-обозреватель. Иногда помогает временное отключение антивируса (не забывайте включать его обратно).

Оптимизация работы с кракен площадкой: эффективные стратегии

Оптимизация работы с кракен площадкой: эффективные стратегии

Практические советы по повышению эффективности использования кракен площадки для безопасных и удобных транзакций.

Кракен площадка остается одним из самых популярных решений для пользователей, ценящих анонимность и безопасность. В этой статье мы рассмотрим ключевые аспекты оптимизации работы с данной платформой.

Основные принципы работы с кракен площадкой

Правильное понимание функционала кракен площадки позволяет минимизировать риски и повысить эффективность взаимодействия. Важно учитывать особенности интерфейса и механизмы защиты.

Многие пользователи отмечают удобство системы escrow, которая обеспечивает безопасность сделок. Этот механизм особенно важен при работе с новыми контрагентами.

Безопасность и анонимность

При использовании кракен площадки особое внимание следует уделять вопросам конфиденциальности. Рекомендуется регулярно обновлять пароли и использовать двухфакторную аутентификацию.

Для дополнительной защиты можно обратиться к ресурсу https://suprbosports.com, где собраны актуальные рекомендации по кибербезопасности.

Оптимизация транзакций

Эффективное управление финансами на кракен площадке требует понимания комиссионной политики. Анализ тарифов поможет сократить издержки при проведении операций.

Скорость обработки транзакций может варьироваться в зависимости от загруженности сети. Планирование операций в периоды низкой активности способствует ускорению процессов.

Перспективы развития платформы

Кракен площадка продолжает развиваться, внедряя новые функции и улучшая существующие сервисы. В 2026 году ожидается обновление интерфейса и расширение списка поддерживаемых активов.

Пользователям стоит следить за официальными анонсами, чтобы быть в курсе последних изменений и возможностей платформы.

Разбираемся с тем, что такое кракен даркнет это

Разбираемся с тем, что такое кракен даркнет это

Подробный разбор особенностей и принципов работы платформы Kraken в даркнете для новичков и опытных пользователей.

Kraken — одна из самых известных платформ в даркнете, но многие до сих пор не понимают, как она работает и чем отличается от других маркетплейсов. В этой статье мы разберем ключевые аспекты, которые помогут разобраться в теме.

Что представляет собой кракен даркнет это

Kraken — это торговая площадка, работающая в анонимной сети. В отличие от обычных интернет-магазинов, здесь используются криптовалюты и специальные технологии для защиты данных пользователей. Платформа предлагает различные товары и услуги, доступ к которым возможен только через специальные браузеры.

Для работы с площадкой важно понимать ее структуру. Основные функции включают систему escrow (удержания средств до подтверждения сделки), рейтинги продавцов и шифрование переписки. Подробнее о технической стороне можно узнать на https://linkkraken.at, где собраны актуальные инструкции.

Как попасть на Kraken

Доступ к платформе осуществляется через Tor-браузер или I2P. Пользователям необходимо найти рабочее зеркало, так как основной адрес может блокироваться. Важно проверять ссылки через доверенные источники, чтобы избежать фишинга.

Безопасность при использовании Kraken

Анонимность — ключевой принцип работы в даркнете. Рекомендуется использовать VPN, криптовалютные кошельки с поддержкой микширования и двухфакторную аутентификацию. Также стоит избегать хранения личных данных в переписке.

Отличия Kraken от других площадок

Главное преимущество — высокая степень защиты транзакций. В отличие от некоторых аналогов, здесь редко случаются exit-скамы (исчезновения продавцов с деньгами). Также площадка известна своей модерацией и поддержкой пользователей.

Перспективы развития в 2026 году

Аналитики прогнозируют дальнейшее улучшение системы безопасности и расширение функционала. Возможно появление новых инструментов для защиты данных и упрощения сделок.

Kraken остается одной из самых надежных площадок в даркнете, но требует внимательного подхода. Используйте только проверенные ресурсы и соблюдайте правила безопасности.

Зачем нужен kraken сайт: основные преимущества и возможности

Зачем нужен kraken сайт: основные преимущества и возможности

Узнайте, почему kraken сайт стал популярным инструментом и как его использовать для решения ваших задач.

В современном цифровом мире платформы, такие как kraken сайт, играют важную роль в обеспечении удобства и безопасности пользователей. Этот ресурс предлагает уникальные возможности, которые делают его незаменимым для многих. Давайте разберемся, почему он так востребован.

Основные функции kraken сайта

Kraken сайт предоставляет широкий спектр функций, которые позволяют пользователям эффективно решать свои задачи. От удобного интерфейса до надежной системы безопасности — все продумано до мелочей. Это делает платформу привлекательной как для новичков, так и для опытных пользователей.

Одной из ключевых особенностей является поддержка различных форматов взаимодействия. Это позволяет адаптировать ресурс под конкретные нужды каждого пользователя.

Преимущества использования kraken сайта

Использование kraken сайта имеет множество преимуществ. Во-первых, это высокая степень безопасности, которая обеспечивает защиту данных пользователей. Во-вторых, платформа предлагает интуитивно понятный интерфейс, что упрощает процесс взаимодействия.

Кроме того, kraken сайт регулярно обновляется, что позволяет пользователям получать доступ к самым современным функциям и инструментам.

Как начать работу с kraken сайтом

Для начала работы с kraken сайтом достаточно зарегистрироваться и ознакомиться с основными функциями. Процесс регистрации прост и не требует специальных знаний. После этого вы сможете использовать все возможности платформы.

Если у вас возникнут вопросы, вы всегда можете обратиться к разделу помощи или воспользоваться руководством пользователя.

Будущее kraken сайта

С развитием технологий kraken сайт продолжает совершенствоваться. Уже сейчас можно говорить о том, что к 2026 году платформа станет еще более функциональной и удобной. Это делает ее перспективным инструментом для решения самых разных задач.

Многие пользователи уже оценили преимущества kraken сайта и активно используют его в своей повседневной деятельности.

Для получения дополнительной информации о других полезных ресурсах посетите https://suprbosports.com.

Рекомендации по использованию kraken сайта

Чтобы максимально эффективно использовать kraken сайт, рекомендуется регулярно обновлять свои знания о его функциях. Это позволит вам всегда быть в курсе последних изменений и улучшений.

Также важно соблюдать правила безопасности и не передавать свои данные третьим лицам. Это поможет избежать возможных проблем и сохранить вашу информацию в безопасности.

Заключение

Kraken сайт — это мощный инструмент, который предлагает множество возможностей для пользователей. Его преимущества и функциональность делают его одним из самых востребованных ресурсов. Используйте его с умом, и он станет вашим надежным помощником.

Разбираемся с Tor Kraken: особенности и безопасность

Разбираемся с Tor Kraken: особенности и безопасность

Узнайте, как работает Tor Kraken и какие меры безопасности стоит учитывать при его использовании.

Tor Kraken — это один из популярных маркетплейсов в даркнете, который привлекает внимание пользователей анонимностью и широким ассортиментом. Однако его использование требует понимания специфики работы через Tor-сеть и соблюдения правил безопасности.

Что такое Tor Kraken?

Tor Kraken представляет собой площадку, работающую через анонимную сеть Tor. Это означает, что доступ к ней возможен только с использованием специального браузера, обеспечивающего защиту данных. Основное отличие от обычных сайтов — повышенная конфиденциальность и децентрализованная структура.

Многие пользователи выбирают эту платформу из-за ее устойчивости к блокировкам. Однако важно помнить, что анонимность не гарантирует полной безопасности. Для корректной работы рекомендуется проверять актуальные зеркала и обновлять программное обеспечение.

Как получить доступ к Tor Kraken?

Для входа на площадку потребуется установить Tor Browser или аналогичное ПО. Затем необходимо найти рабочее зеркало, так как основной адрес может меняться. Некоторые пользователи используют специальные сервисы для проверки доступности ресурса.

Если вам нужна дополнительная информация, посетите krakenmaarket.com, где можно найти актуальные данные о работе платформы.

Безопасность при использовании Tor Kraken

Анонимность в даркнете — это не только преимущество, но и дополнительный риск. Мошенники часто создают фишинговые сайты, имитирующие оригинальные площадки. Чтобы избежать проблем, всегда проверяйте адрес и используйте двухфакторную аутентификацию.

Также стоит учитывать, что транзакции через криптовалюты не всегда можно отменить. Поэтому перед совершением сделки убедитесь в надежности продавца и изучите отзывы.

Альтернативы Tor Kraken

Если доступ к площадке временно ограничен, можно рассмотреть другие маркетплейсы в даркнете. Однако при переходе на новые ресурсы важно соблюдать те же меры предосторожности — проверять репутацию и избегать подозрительных предложений.

В 2026 году ожидается развитие новых технологий анонимизации, что может повлиять на работу подобных платформ. Следите за обновлениями, чтобы оставаться в курсе изменений.

Заключение

Tor Kraken остается востребованной площадкой благодаря своей анонимности, но требует внимательного подхода. Используйте только проверенные зеркала, соблюдайте правила безопасности и не доверяйте сомнительным источникам. Это поможет минимизировать риски и сделать работу в даркнете более комфортной.

Исправляем ошибки при работе с Kraken AT: полезные советы

Исправляем ошибки при работе с Kraken AT: полезные советы

Разбираем распространённые проблемы при использовании Kraken AT и способы их решения для комфортной работы.

Kraken AT — это мощный инструмент, который помогает пользователям решать различные задачи. Однако, как и любая технология, он может вызывать сложности у новичков. В этой статье мы разберём типичные ошибки и расскажем, как их избежать.

Основные причины ошибок в Kraken AT

Чаще всего проблемы возникают из-за неправильных настроек или невнимательности пользователя. Например, некорректный ввод данных или использование устаревшей версии программы могут привести к сбоям.

Ещё одна распространённая причина — отсутствие обновлений. Разработчики регулярно выпускают патчи, которые улучшают стабильность работы Kraken AT. Если вы давно не обновляли систему, стоит проверить наличие новых версий.

Как исправить ошибку подключения

Если Kraken AT не подключается к серверу, первым делом проверьте интернет-соединение. Иногда проблема решается простым перезапуском роутера. Также убедитесь, что брандмауэр или антивирус не блокируют соединение.

Для диагностики можно использовать специализированные сервисы. Например, на dentisti-albania.com есть полезные инструменты для проверки сетевых параметров.

Оптимизация производительности Kraken AT

Медленная работа системы часто связана с недостатком ресурсов компьютера. Закройте лишние приложения и проверьте, сколько оперативной памяти доступно. В некоторых случаях помогает очистка кэша программы.

Также стоит обратить внимание на настройки графики. Снижение качества визуальных эффектов может значительно ускорить работу Kraken AT без потери функциональности.

Безопасность при использовании Kraken AT

Никогда не сохраняйте пароли и конфиденциальные данные в открытом доступе. Используйте надёжные методы шифрования и регулярно меняйте учётные данные. Это особенно важно при работе с чувствительной информацией.

Если вы подозреваете, что ваша учётная запись могла быть скомпрометирована, немедленно смените пароль и проверьте историю активности. Современные версии Kraken AT позволяют отслеживать подозрительные действия.

Перспективы развития Kraken AT

Разработчики постоянно работают над улучшением системы. Уже в 2026 году ожидается выход обновлённой версии с расширенным функционалом. Следите за официальными анонсами, чтобы быть в курсе нововведений.

Соблюдение этих рекомендаций поможет вам избежать большинства проблем при работе с Kraken AT. Если же ошибка всё-таки возникла — не паникуйте. Чаще всего её можно исправить самостоятельно, следуя простым инструкциям.

Типичные проблемы при входе на Kraken и их решения

Типичные проблемы при входе на Kraken и их решения

Разбираем основные сложности, с которыми сталкиваются пользователи при попытке зайти на Kraken, и предлагаем рабочие способы их решения.

Многие пользователи сталкиваются с трудностями при попытке зайти на Kraken. В этой статье мы разберём типичные проблемы и расскажем, как их можно решить самостоятельно.

Проблемы с подключением

Одна из самых распространённых ситуаций – невозможность подключиться к платформе. Это может быть связано с техническими работами на серверах или блокировкой доступа интернет-провайдером.

Попробуйте проверить соединение с другими сайтами. Если проблема только с Kraken, возможно, стоит использовать альтернативные методы подключения.

Ошибки авторизации

Если вам удалось зайти на Kraken, но возникли сложности при авторизации, сначала проверьте правильность ввода логина и пароля. Убедитесь, что Caps Lock выключен и раскладка клавиатуры установлена корректно.

В случае утери доступа воспользуйтесь функцией восстановления пароля. Для этого перейдите на kraken-kra1.cc и следуйте инструкциям системы.

Безопасность при входе

При попытке зайти на Kraken важно соблюдать меры предосторожности. Никогда не вводите свои данные на подозрительных сайтах и используйте только проверенные способы подключения.

Рекомендуется активировать двухфакторную аутентификацию для дополнительной защиты аккаунта. Это значительно снизит риск несанкционированного доступа.

Альтернативные способы входа

Если стандартный метод не работает, можно попробовать другие варианты. Некоторые пользователи успешно решают проблему, как зайти на Kraken, используя специальные сетевые настройки или дополнительные инструменты.

Помните, что ситуация может меняться, поэтому стоит регулярно проверять актуальную информацию о доступных способах подключения.