বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 4



শরতের কাশফুল পর্ব-০৯

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_৯(১)

চপারের নিরন্তর ঘূর্ণন কম্পন সৃষ্টি করছে বাতাসে। সেই ভারী কম্পনে সৃষ্ট আওয়াজ সুর তুলছে নীরব শান্ত প্রকৃতির মাঝে। মাঝ আকাশে স্থির হয়ে আছে হেলিকপ্টারটা। উপরে নীল অম্বর, নীচে শেংসী দ্বীপ। ঘন সবুজে ঢাকা, কুয়াশার চাদরে মোড়া। বন এতটাই ঘন যে উপর থেকে এক চুল পরিমাণ ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে না।
চপারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একটি অবয়ব। রোটরের তীব্র আওয়াজ ও বাতাসের ঝাপটা, দুটোই একসাথে আছড়ে পড়ে তার উপর। কিন্তু তাকে নড়াতে পারে না এক চুলও। খোলা দরজায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে সে হ্যান্ডেল ধরে।

মাঝ আকাশে স্থির হয়ে আছে চপারটা এখন। সেখান থেকে একটা মোটা শক্তপোক্ত দড়ি ঝুলে পড়ে হারিয়ে যায় বনের ভেতর। কয়েক সেকেন্ড পর দড়িটা ধরে স্লাইড করে নীচে নামতে শুরু করে সে। মাঝ রাস্তায় ঠিক জঙ্গলের উপরে কিছুটা সময়ের জন্য থামে সে।
মুহূর্তের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে দড়িটা। শরীর দুলছে বাতাসের তোড়ে। কিন্তু কোন তাড়াহুড়ো নেই তার মাঝে। বরং আছে অদ্ভুত এক স্থিরতা। মুহূর্তটা ভয়ের হতে পারতো, কিন্তু মুহূর্ত শুধুই স্বাদ পায় মুক্তির।

কোন দেয়াল নেই, কোন শেকল নেই, নেই কোন অসহায়ত্ব। আছে শুধুই মুক্ত হাওয়া।
নিচের দিকে তাকায় মুহূর্ত। গাছগুলো অদৃশ্য রহস্যের হাতছানি দিয়ে ডাকছে যেন! দড়িটা ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে তাদের রহস্যের মাঝে। কিন্তু মুহূর্ত ছাড়ে না। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, রোটরের ঘূর্ণন, দুলতে থাকা অস্থির দড়ি, সবকিছু চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সে কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে ছেড়ে দেয় দড়িটা।
তার বুট শক্ত মাটি স্পর্শ করা মাত্র, সে দড়িটা ছেড়ে দেয়। সিগন্যাল পেয়ে হেলিকপ্টারটি দিশা বদলায়। আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে যায় সেটার শব্দ।

কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে মুহূর্ত হাঁটতে শুরু করে। নীচে ভেজা পাতার গন্ধ, আর উপরে অচেনা পাখির ডাক, এছাড়া নিস্তব্ধ চারদিক। সতর্ক দৃষ্টি মেলে এগিয়ে যেতে যেতে একটা হালকা শব্দ ভেসে আসে তার কানে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কিছুক্ষন পর আবারো ভেসে আসে শব্দটা। এবার সেটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যায় সে। গাছের শেকড়, ভেজা শুকনো পাতা ও ঝোপঝড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছায় একটি ছোট্ট খাদের পাশে। খাদের নীচে আটকা পড়েছে একটা ছোট্ট ক্লাউডেড লেপার্ড কাব। এক পা কাঁটাযুক্ত শেকড়ে জড়িয়ে আছে। কাদা ও শুকনো রক্ত লেগে আছে শরীরের নরম পশমে। চোখদুটোতে ফুটে আছে ভয় ও যন্ত্রণার ছাপ।

হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মুহূর্ত। মুখ থেকে নিচু স্বরে কিছু শব্দ বের করে সে। ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং বাচ্চাটাকে শান্ত করার জন্যে। বাঘের বাচ্চাটা হিসহিস করে ওঠে। মুখ খুলে ছোট ছোট দাঁতগুলো দেখায়। ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেও তার অসহায়ত্ব ও আতঙ্ক স্পষ্ট ফুটে ওঠে জ্বলজ্বল করতে থাকা ভেজা চোখ দুটোতে।
মুহূর্ত ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়। শেকড়টা সরিয়ে পা-টা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। বাচ্চাটা ব্যথায় মৃদু শব্দ করে ওঠে।

“আর একটু লিটল কাব। এইতো হয়ে গেছে।”

নিচু স্বরে বাচ্চাটাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে মুহূর্ত। কথাগুলো বুঝতে না পারলেও, আওয়াজের কম্পন অনুভব করতে পারে বাচ্চাটা। বুঝতে পারে আগন্তুক শত্রু নয় তার।
শেষমেষ পা-টা ছাড়াতে সক্ষম হয় মুহূর্ত। বাচ্চাটা নড়ে না। স্থির বসে থাকে সেখানে। মুহূর্ত দুহাতে সাবধানে কোলে তুলে নেয় বাচ্চাটাকে। পায়ের ক্ষতটা পর্যবেক্ষণ করে সে। খুব গভীর নয় সেটা। সেরে যাবে কদিনেই। মুহূর্ত তার ব্যাগ থেকে একটা পানির বোতল বের করে জায়গাটা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। বাচ্চাটা উষ্ণতা পেয়ে লেপ্টে থাকে তার বুকে।

বাচ্চাটার মাথায় দু কানের মাঝের জায়গাটায় আঙুল বুলিয়ে আদর করে দিতে থাকে মুহূর্ত। সেসময়ই পাশের ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে আসে একটা চাপা গর্জন। বেরিয়ে আসে একটা পূর্ণবয়স্ক ক্লাউডেড লেপার্ড। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মুহূর্তের কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে। সতর্ক, তীক্ষ্ম সে দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে স্নেহ। সেটা লক্ষ্য করে স্মিত হাসে মুহূর্ত। বাচ্চাটাকে আদর করতে করতে বলে,

“কি লাকি তুমি! মা আছে তোমার। ঐ যে তোমার খোঁজে এসেছে, দেখো!”

কোন তাড়াহুড়ো না করে, নিচু হয়ে বাচ্চাটাকে ধীরে ধীরে মাটিতে নামিয়ে দেয় সে। তারপর মা লেপার্ডটার চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাচ্চাটাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ঠেলে দেয় কিছুটা। ফিসফিস করে বলে,

“যাও, তোমার মায়ের কাছে যাও। আমাদের মধ্যে অন্তত একজনের ভাগ্যে তো মায়ের আদর জুটুক।”

বাচ্চাটা কিছুক্ষন থমকে থাকলেও, তারপর এক ছুটে চলে যায় মায়ের কাছে। মা লেপার্ডটা বাচ্চাটাকে পেয়ে গর্জন করে ওঠে। তবে এবারের গর্জনটা হিংস্রতার ছিল না, ছিল স্বস্তির। বাচ্চাটার চেহারা ও শরীর জিভ বের করে চেটে দিতে থাকে মা লেপার্ড। বাচ্চাটাও মা-কে পেয়ে আদুরে আওয়াজ তোলে। মিশে যেতে চায় মায়ের বুকে।

মুহূর্ত কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে দেখে তাদের। এরপর ধীরে ধীরে নিঃশব্দে পিছিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় জঙ্গলের সবুজ স্রোতে। বড় বড় গাছপালা ও উঁচু ডালপালার ছায়ায় ঘেরা সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুহূর্ত পৌঁছায় কাঙ্ক্ষিত জায়গাটায়। দূর থেকে দেখলে এটাকে মাটির টিবি বলে মনে হয়। কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায় এখানে আছে একটা বাড়ি। পুরনো, শক্ত, পাথরের তৈরি। বাড়িটার উপর দিয়ে ঘন সবুজ আইভি লতাগাছ এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, দেয়াল আর গাছ আলাদা করা যাচ্ছে না। জানালাগুলোও অর্ধেক ঢাকা পড়ে গেছে। লতাগাছের ফাঁক দিয়ে কাচের অংশ দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে ভূতুড়ে মনে হলেও, ভেতরে পরিষ্কার, আধুনিক ও বসবাসযোগ্য। এরকম আরো অনেক কাঠামো আছে এই বনে। জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকা এই পাথরের বাড়িগুলোকে বলা হয় ডোম।

“লিও!!!”

বাড়িটির সীমানায় দাঁড়িয়ে ডাক দেয় মুহূর্ত। পাথরের ভাঙ্গা একটা বাউন্ডারি লতাপাতায় ঢাকা পড়েছে। তবে সেটা বাড়ির সীমান নির্ধারণ করে না। নির্ধারণ করে গন্ধ। বাড়ির মালিক নিজের সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে নিজের ঘাম ও ইউরিনের গন্ধ দিয়ে। সাধারণ মানুষের নসিকারন্ধ এই গন্ধ আবিষ্কারে ব্যর্থ হলেও প্রাণীকুল ও হাইব্রিডার্সদের কাছে সেটা স্পষ্ট।

“লিও!!!!!”

ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আবারো কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ডেকে উঠলো মুহূর্ত। সে জানে, ঠিক ওর উপর নজর রাখছে লিও ভেতর থেকে, কিন্তু তবুও ইগনোর করা হচ্ছে তাকে। এজন্যই এই রেস্ট্রিক্টেড জোনে কেউ আসতে চায় না। এখানকার হাইব্রিডার্সদের কাছ থেকে সাড়া পেতে, দাঁতে দাঁত লেগে যায়।

অগণিত শিশু বলি হয়েছিল প্রজেক্ট পাওনের নিষ্ঠুরতার। বাচ্চাদের শারীরিক গঠন বড়দের মত পাকা পোক্ত নয়। তাদের বাড়ন্ত শরীরে পরিবর্তন আনা সহজ ছিল। ছোট থেকে তাদের ট্রেনিং দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য পূর্তির হাতিয়ার বানাতে চেয়েছিল শিনহোর ডাক্তাররা। তাদের এই লোভের শিকার হয়ে কেউ মরেছে, কেউ বেঁচেছে, কেউবা বেঁচে থেকে মরেছে ধুকে ধুকে। হাজারো বন্দীদের মাঝে কিছু কিছু বন্দী এমনও ছিল, যাদের শারীরিক, মানসিক ও প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য মানুষের চেয়ে পশুসদৃশ্য বেশি। তাদেরকে ডাক্তাররা অসফল পরীক্ষার ফল হিসেবে চিহ্নিত করতো। তবে মুক্তি দিতো না। সবচেয়ে শক্তিশালী, ঝুঁকিপূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঔষধগুলোর পরীক্ষা হতো তাদের উপর। ইচ্ছে হলেই, মনোরঞ্জনের জন্য পিটিয়ে বা টর্চার করে মেরে ফেলা হতো এদের। বন্দীদের মধ্যেও সবচেয়ে করুন জীবন ছিল তাদের। রেস্ট্রিকটেড জোন ঐ সব হাইব্রিডার্সদেরই আবাসস্থল। মুক্ত হাওয়া ও খোলা প্রকৃতির মাঝে মিশে থাকতে পছন্দ করে তারা। স্বর্গভূমির অন্যান্য জায়গায় মানুষদের আনাগোনা থাকলেও, এই এরিয়ায় প্রবেশ সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ। মানুষদের দেখলে হিংস্র হয়ে ওঠে রেস্ট্রিকটেড জোনের হাইব্রিডার্সরা। এমনকি অনেক সময় নিজেদের লোকেদের দেখলেও হুংকার তোলে।

এই যেমন এখন! এতবার ডাকার পরও সাড়া দিচ্ছে না লিও। সাধারণত ওদেরকে ওদের মতোই থাকতে দেওয়া হয়। শুধু নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা হয়, তারা ঠিক আছে কিনা। রেষ্ট্রিকটেড জোনের অসামাজিক এসব হাইব্রিডার্সদের সামলানো খুবই ঝামেলার কাজ যা পারতপক্ষে কেউ করতে চায় না। মুহূর্তেরও ইচ্ছে ছিল না এখানে আসার। কিন্তু আসতে হয়েছে দুটো কারনে। এক, ঘোস্টের সাথে মিলে প্লেন হাইজ্যাক করে বাংলাদেশে যাবার শাস্তিস্বরূপ ডিউটি পড়েছে এখানে। দুই, সপ্তাহখানেক ধরে লিও বের হচ্ছে না বাড়ি থেকে।

“আমি জানি তুমি ভেতরে আছো! বাইরে বের হও বলছি!”

“যাও এখান থেকে!”

এতক্ষণে ভেতর থেকে ভেসে আসে লিওর রুক্ষ, কর্কশ হুংকার।

“তোমার জন্য খাবার এনেছি।”

হাতের ব্যাগটা উঁচু করে শূন্যে তুলে ধরে রাখে মুহূর্ত। এখানে বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুর ব্যবস্থা করা আছে। মাসের শুরুতে নিয়ম করে রসদসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রতিটি ডোমে। এছাড়াও অন্য যেকোন কিছুর প্রয়োজনে একটা ফোন কলই যথেষ্ট। সমস্যা শুধু একটাই। রেস্ট্রিকটেড জোনের হাইব্রিডার্সদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করানো।

ভেতর থেকে লিওর আর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মুহূর্ত। আশেপাশে তাকিয়ে একটু দূরে গিয়ে কিছু খড়কুটো জোগাড় করে জ্বালানির ব্যবস্থা করলো আগে সে। তারপর লিওর বাড়ির গেটের বাইরে একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে পড়লো। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে রান্না শুরু করলো মুহূর্ত। সবকিছু আগে থেকে তৈরি করেই এনেছিল। তাই বেশি একটা বেগ পেতে হয়নি। কিছুক্ষন যেতেই হালকা মশলামেশানো ঝলসানো মাংসের সুবাস ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। সেই সাথে বড় একটা ব্রেড বের করে সেটা আগুনে হালকা ছেঁকে মাখন লাগিয়ে নিল।

“তোমার খাবারের গন্ধ শিকারি প্রাণীদের আকৃষ্ট করবে।”

রাগী গলায় গজগজ করতে করতে বললো লিও। মাংসের গন্ধে বেরিয়ে এসেছে সে। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে সে মুহূর্তের দিকে। মুহূর্ত সে দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে বললো,

“অবশ্যই, সেটা তো করবেই। একজনকে তো সামনেই দেখতে পাচ্ছি।”

লিও আর কিছু বললো না। মুহূর্তের পাশে মাটিতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে দেখতে লাগলো তাকে। মুহূর্ত হাতের কাজ করতে থাকলো চুপচাপ। রান্না শেষে মাংসের ঝলসানো বড় একটা টুকরো, আর রুটি এগিয়ে দিলো সে লিওর দিকে। লিও সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে এমনভাবে খাওয়া শুরু করলো, যেন একটু দেরি করলেই কেউ এক্ষুনি ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তার খাবার।
মুহূর্ত কিছুক্ষন নীরবে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হাইব্রিডার্সদের ভিন্ন শারীরিক গঠন আরো কঠোরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে লিওর মাঝে। গালের হাড়ের গঠন অনেকটা অস্বাভাবিক তার। চেপ্টা উঁচু নাক ও মুখের চারপাশে গজানো পশমের কারণে চেহারার সাদৃশ্য অনেকটা সিংহের সাথে করা যায়। এটুকুও যেন যথেষ্ট ছিল না। তাকে আরো ভালোভাবে বিচ্ছিন্ন করতে, কোমড়ের পেছন দিক থেকে বেরিয়েছে একটা লেজ। প্রথম প্রথম এই লেজ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছিল লিও। অন্তর্বাস বা প্যান্ট পরতে চাইতো না। পরে বিশেষভাবে পোশাক তৈরি করে দেওয়া হয় তাকে, যাতে লেজ নিয়ে অসুবিধা না হয়। লিওর পোশাকবিহীন এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে বেড়ানো দিনগুলোর কথা মনে করে হেসে ফেলে মুহূর্ত।

“হাসছো কেন?”

খাওয়া বন্ধ করে মুহূর্তের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে লিও।

“কিছু একটা মনে পরে গেল। তুমি বাড়িতে ঘাপটি মেরে থাকো কেন কদিন পর পর? বাইরের এত সুন্দর খোলা প্রকৃতি ছেড়ে ভেতরে থাকতে ভালো লাগে?”

লিও উত্তর দেয় না। আগুনের তাপে ধীরে ধীরে ঝলসাতে থাকা মাংসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মুহূর্ত আরেক টুকরো মাংস এগিয়ে দেয় তার দিকে। মিনিটখানেক চুপ থাকে সে। খাওয়া শেষ করতে দেয় লিওকে। তারপর ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে,

“বলতে পারো আমাকে। কি হয়েছে?”

“ভয় করে। ওরা যদি আবার এসে নিয়ে যায়…”

মাংসের টুকরোটা চিবুতে চিবুতে লিও চাপা স্বরে উত্তর দেয়। মুহূর্ত মাথা নেড়ে একটু পর বলে,

“আমারও ভয় করতো, নতুন নতুন মুক্তি পাবার পর। এখনো হয়ত করে। আমাদের সবারই করে। কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রাখলে কি সেই ভয় শেষ হবে কখনো? মুক্তি পাবার পরও যদি আমরা নিজেদের বন্দী করে রাখি, তবে এই মুক্তির কি কোন মানে হয়?”

“তুমি ঐ মাথামোটাইদের মত কথা বলছো!”

চাপা গর্জন ছেড়ে অভিযোগের সুরে বলে লিও। চেহারা বিকৃত করে তাকায় মুহূর্তের দিকে। হাসে মুহূর্ত সেটা দেখে। আসলেই সে মাথামোটাইদের মত কথা বলছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের হাইব্রিডার্সরা মাথামোটাই বলে ডাকে, অর্থাৎ যাদের মাথা মোটা। শিনহো থেকে ছাড়া পাবার পর হাইব্রিডার্সদের জন্য থেরাপি সেশনের ব্যবস্থা করা হয়। বাধ্যতামূলক সব হাইব্রিডার্সদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্যে। শুধুমাত্র তারা ক্লিয়ারেন্স দিলেই হাসপাতাল ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনুমতি পায় হাইব্রিডার্সরা।
বলাবাহুল্য, এসব বিশেষজ্ঞদের বিশেষ একটা পছন্দ করেনি হাইব্রিডার্সরা। তারা একটা সবজান্তা ভাব নিয়ে এমনভাবে কথা বলতো যেন তারাই সঠিক, বাকি সব ভুল, যেন হাইব্রিডার্সরা ছোট অবুঝ বাচ্চা বৈ কিছু নয়। যেন মুখ ফুটে নিজেদের দুঃখ প্রকাশ করে, দু’দণ্ড কেঁদে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। হাইব্রিডার্সরাও বুঝে যায়, এদের মোটা মাথার বুদ্ধির সাথে তর্কে গিয়ে লাভ নেই। তাই এই মাথামোটাইদের সব কথা মেনে নিয়ে, হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে ছাড়পত্র আদায় করে নেয় তারা।
কাজের কাজ ধরতে গেলে কিছুই হয়নি। তবে হওয়ার আশা করাটাও বোকামি। যাদের সারাজীবন কেটেছে আলোবিহীন অন্ধকূপে, শেকলে বন্দী ছিল যাদের ভাগ্য, জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত যারা জেনে এসেছে বিভীষিকাময় নরকের উপাখ্যান, তাদের ঠিক কি বলে সান্ত্বনা দেয়া যায়? ঠিক কিভাবে স্বাভাবিক করে তোলা যায় তাদের?

“কথাগুলো কিন্তু সত্যি। আচ্ছা, তোমার যখন ভালো লাগছে না, তখন আর বলবো না। এখন শোনো, একটা কাজে এসেছি আমি। তোমার এদিকটায় আসার সময় দেখলাম, একটা ফাঁদে আটকা পড়েছিল একটা বাচ্চা লেপার্ড। পুরোনো শেকড়, বাকর আর জংলায় ভর্তি চারপাশ। তুমি আশপাশটা একটু পরিষ্কার করতে পারবে?”

লিও আশেপাশে নজর বুলায় একবার। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আবারো মুচকি হাসে মুহূর্ত। সে জানে, কথায় কাজ হবে না, কিন্তু কাজে কাজ হলেও হতে পারে।

“তাহলে কাজ শুরু করো। তোমার ডোমের চারপাশটাই আগে পরিষ্কার করো। আমি তোমাকে সব সরঞ্জাম এনে দেব, ঠিকাছে?”

***

“স্বর্গভূমি কেমন লাগছে?”

মমর দিকে একপলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি।

“বাড়ি আর গাড়ির জানালা দিয়ে যতটা দেখেছি, তাতে তো ভালোই মনে হলো।”

“কোন অসুবিধা হচ্ছে শ্রেয়ার বাড়িতে?”

“না, আমার আবার কি অসুবিধা হবে? অসুবিধা তাদের হওয়া জায়েজ, যাদের অসুবিধা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা আছে। আমাকে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে নাকি কারো?”

মমর এহেন উত্তরে এবার সামনের ফাইলটা বন্ধ করে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো পাখি। ইদুরের মত কুট কুট করে চিপস চিবুচ্ছে মম আর জানালার ফ্রেমের সাথে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। উদাস চেহারা। যেন কালো মেঘেদের ঘনঘটায় ছেয়ে আছে তার মনের আকাশ।

“এভাবে বলছিস কেন? কোন সমস্যা হলে আমাকে বল!”

পাখির অফিসে নিয়ে এসেছে সে আজ মমকে। শ্রেয়ার বাড়ি থেকে পনেরো মিনিটের দূরত্বেই অফিস। দোতলায় পাখির অফিস, আর চারতলায় বসেন স্বর্গভূমির ডিরেক্টর দেনিজ ইলকার। তিনতলা ব্যবহৃত হয় কনফারেন্সের জন্যে, আর নিচতলায় রিসেপশন ও গেস্টদের ওয়েটিং রুম। এতটুকুই ঘুরে ফিরে দেখেছে মম। এখন পাখির রুমে বসে আছে একগাদা স্ন্যাকস নিয়ে। মনের দুঃখে খেতে খেতে জানালা দিয়ে আসা সোনালী রোদে দুঃখবিলাস করছে সে।

“কি বলবো তোমাকে? তুমি তো নিজের কাজ আর জামাইকে নিয়েই হিমশিম খাচ্ছো। আমি শুধুই তোমার কাছে উটকো ঝামেলা।”

“কে বলেছে তুই আমার কাছে উটকো ঝামেলা?”

“বলতে হয় নাকি, আচরণেই বোঝা যায়। আমাকে এখানে এনে সম্পূর্ণ অচেনা একজনের বাড়িতে ফেলে রেখেছো। দায় সারাতে কোনমতে দিনে একবার দেখা দাও। আগে ঝিনুক আপুর বাড়িতে আশ্রীতা ছিলাম, এখন তোমার ঘাড়ে চেপেছি। সব বুঝতে পারি আমি।”

“একটু বেশীই বুঝে ফেলছিস না?”

সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে পাখি। মম সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে মুখভার রেখে বলে,

“বিয়ের পর যে বোনরা আর আপন থাকে না এটুকু বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি হয়েছে আমার। তখন জামাই নিয়েই তুলুতুলু করতে ব্যস্ত থাকে তারা। আমি বুঝিনা, কি এমন মজা আছে জামাইয়ের মাঝে যে, পেলেই তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে!”

বিরক্ত হয় পাখি। কিছু বলতে নিয়েও মুখ বন্ধ করে নেয় সে। তারপর মুখে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে বলে,

“আয়! তোকে কোলে নিই, আয়। সাথে একটা ফিডারও মুখে তুলে দেই?”

মুহূর্তেই মমর টনক নড়ে। বেশি বলে ফেললো না তো আবার? পাখির মেজাজ চড়লে খবর আছে। কান টেনে লম্বা করে দেবে পাখি। আহ্লাদীপনা একদম পছন্দ না পাখির। সে নিজে যেমন শক্ত চরিত্রের, বোনদেরও সেরকমই পরিপক্ব হতে শিখিয়েছে। তাই তার কাছ থেকে আহ্লাদের আশা করাও বৃথা।

“আমি কি সেটা বলেছি!”

মিনমিনে স্বরে বললো মম।

“তাহলে কি বোঝাতে চাইছিস? দেখছিস, বুঝছিস যে, পরিস্থিতি কেমন। তাহলে এসব ফালতু প্যাচালের মানে কি? এটা কি পিকনিক স্পট? ভ্যাকেশনে নিয়ে এসেছি আমি তোকে?”

পাখির ধমক খেয়ে চুপসে গেল মম। ডেস্কে রাখা গ্লাস থেকে কয়েক ঢোক পানি পান করলো পাখি। এরপর যে প্রশ্নটা সে মমকে করলো, সেটা শুনে মমর মান অভিমান সব হাওয়ায় উড়ে গেল। বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার!

“তোর এইচ.এস.সি-র রেজাল্ট যেন কবে দেবে?”

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৯(২)

“তোর এইচ.এস.সি-র রেজাল্ট যেন কবে দেবে?”

পাখির প্রশ্নে বুকটা ধ্বক করে উঠলো মমর। রেজাল্টের সময় নিকটে। বেশিদিন বাকি নেই। আগামী সপ্তাহের মধ্যে না দিলেও, তার পরের সপ্তাহে পাক্কা। কিন্তু কথাটা চেপে গিয়ে মম হেঁয়ালি করে বললো,

“দেবে ঐ আরকি। মাসখানেকের মধ্যে।”

“রেজাল্ট ভালো হবে তো? পরীক্ষা তো বলেছিল ভালোই দিয়েছিস।”

সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো পাখি। গলা শুকিয়ে এলো মমর। সে মাথা উপর নীচে দুলিয়ে কোনমতে শুধু শব্দ করে জানালো,

“হুম…”

“তারপরের কি প্ল্যান?”

“কিসের প্ল্যান?”

“কোথায় ভর্তি হবি? কোন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে চাস?”

“কোথায় আর ভর্তি হবো? যেখানে আমাকে ঢুকতে দেবে, ঢুকে যাবো। আর বিষয়? ওরা যেটাতে পড়তে দেবে, সেটাই পড়বো।”

বোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন পাখি। মম পটাপট কয়েকটা চিপস মুখে গুজে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চিবুতে লাগলো। জানালার বাইরের দৃশ্যটা একটু বেশীই সুন্দর লাগছে তার হঠাৎ।
স্টুডেন্ট মম খারাপ না। তবে দুইটা সমস্যা আছে তার। প্রথমটা, মারাত্মক কিছু না। কমবেশি সবারই থাকে। সেটা হচ্ছে ‘ভাল্লাগেনা’। পড়তে বসলে মমর কিছুই ভালো লাগে না। কোনমতে চেপে ধরে পড়াতে হয় তাকে। ছোটবেলায় ওকে পড়াতে বসিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো পাখি। পাহাড়া দিত, চোখ কি বইয়ে আছে, নাকি অন্যদিকে ঘুরঘুর করছে।
দ্বিতীয় সমস্যাটা অবশ্য গম্ভীর। পরীক্ষার হলে ঢুকলে মমর আর লিখতে মন চায় না। কেন চায় না, এর সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা বের করা যায়নি আজ অবধি। সব উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও, সে পরীক্ষার খাতা শূন্য রেখে আসে। এ নিয়ে প্রচুর বকা খেয়ে এসেছে সে ছোটবেলা থেকে। কিন্তু বিশেষ একটা পরিবর্তন আসেনি তার মাঝে। স্কুলে পড়াকালীন বিশেষভাবে মমর সামনে চেয়ার টেনে বসে স্যাররা ওকে লিখতে বাধ্য করতো। এমনকি মাধ্যমিকেও হলে গিয়ে খাতা চেক করে দেখেছে স্যাররা। কলেজেও মোটামুটি একই হাল ছিল মমর। ঝিনুকের কড়া নজরদারিতে কেটেছে কলেজজীবন। সেই বদৌলতেই টেনেটুনে ইন্টার পরীক্ষায় বসতে পেরেছে সে।

“এডমিশন টেস্টের প্রস্তুতি কেমন?”

আবারো জিজ্ঞেস করলো পাখি।

“প্রস্তুতি? নিচ্ছি তো! আগে ঐ রিপন স্যারের কোচিং করতাম না? স্যার পড়াতেন ভালোই।”

“তোর জন্যে আমি অনলাইন টিউটরের ব্যবস্থা করেছি। কাল একটা টেস্ট নেবে তোর। প্রগ্রেস কতটুকু, কি পড়েছিস এ পর্যন্ত সেটা দেখার জন্যে।”

“আবার পড়াশুনা!”
বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো মম। পরক্ষনেই পাখিকে তার দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকাতে দেখে আমতা আমতা করে জানালো,
“মানে, করতে তো হবেই। কিন্তু আপু এখানে তো আমার বইখাতা কিচ্ছু নেই।”

ডেস্কের নিচ থেকে দুটো ব্যাগ বের করলো পাখি। মমকে ইশারায় কাছে ডেকে, সেগুলো খুলে দেখতে বললো সে। প্রথম ব্যাগটা কিছু প্রয়োজনীয় বই, নোটবুক, পেন, পেন্সিল, মার্কার ইত্যাদি জিনিসপত্রে ভর্তি।

“ল্যাপটপ!!!”

দ্বিতীয় ব্যাগের ভেতর একটা চকচকে নতুন ল্যাপটপ দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো মম। এর আগে কত বলেছে সে পাখিকে একটা ল্যাপটপের কথা। কিন্তু পাখি বলেছে পরীক্ষার পর। সত্যি সত্যি যে পরীক্ষার পর ল্যাপটপ হাতে পাবে, ভাবেনি মম। জানা সত্ত্বেও বিস্ময়ের সাথে সে প্রশ্ন করলো,

“আমার জন্যে?”

পাখি উত্তর না দিয়ে আরেকটা বক্স এগিয়ে দিলো তার দিকে।

“আইফোন!!!!!”

বক্স খুলে ফোনটায় পটাপট কয়েকটা চুমু খেয়ে নিল মম খুশির চোটে। সেটা দেখে না হেসে থাকতে পারলো না পাখি।

“ল্যাপটপ কিন্তু শুধুমাত্র পড়াশুনার জন্যে। আর মনে রাখিস, ইন্টারনেটে যা ঘাটাঘাটি করবি, ফোনে যা কথা বলবি, সব ডাটা কিন্তু রেকর্ড হয় এখানে। উল্টোপাল্টা কিছু করতে যাস না।”

সতর্ক করে দিল পাখি। তবে তাতে মমর উৎসাহে ভাটা পড়লো না। সে লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো পাখিকে।

“ওকে! থ্যাঙ্কু আপু! আমার লক্ষি ময়না পাখি!”

মমর কান্ড দেখে হাসছে পাখি। ফোনে সব সেট করাই ছিল। সেটা চালু করে এটা সেটা ঘেঁটে দেখা শুরু করলো মম। সে সাথে পাখিকেও দেখাচ্ছে। দু’বোন যখন হেসে কুটিকুটি হচ্ছে, তখনই বজ্রপাতের মত শব্দ করে সজোরে খুলে গেল পাখির অফিসের দরজাটা। চকিত দৃষ্টিতে দু’বোন তাকালো সেদিকে।

ইয়া লম্বা চওড়া এক হাইব্রিডার্স প্রবেশ করলো দরজা দিয়ে। সেটা ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে সে একা আসেনি। তার কাঁধে চালের বস্তার মত ঝুলছে কমপক্ষে সত্তর কি আশি বছরের এক ছোটখাট এশিয়ান বৃদ্ধা মহিলা।

“ছা…ড়ো…! ব…লছি…ছা…ড়ো……!!!”

বৃদ্ধা শক্ত করে ধরে রেখেছেন ছেলেটিকে। কিন্তু কাঁপা কাঁপা, আতঙ্কিত গলায় চেচিয়ে যাচ্ছেন একটানা। তাতে অবশ্য ছেলেটির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হেলে দুলে ভেতরে এসে কর্ণারের সোফাটার উপর ছেড়ে দিলো বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে ভয়ংকর বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। পাখি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দাড়ালো মহিলার সামনে। একটা গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিলো হাঁপাতে থাকা মহিলার দিকে। ওনার হাঁপানি একটু কমলে সে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে মিস সু?”

বৃদ্ধা কটমট করে তেজী গলায় বললেন,

“এই ছেলেটার কান মলে দেবো কিন্তু আমি মিসেস অনামিকা। আমি বললাম আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারি। কিন্তু ও তারপরও আমাকে কাঁধে তুলে নিল! আমি কি চালের বস্তা?”

মহিলার কথা শুনে হাসি পেল পাখির। যেভাবে ওনাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে তাতে চাল কম, তুলোর বস্তা বেশি মনে হচ্ছিলো।

“রিলাক্স, মিস সু! এমনিতেও আপনার কাঁধে ওঠার বয়স হয়েছে। আগে পরে আপনাকে কাঁধে উঠতেই হবে। ওঠার তো কথা চারজনের কাঁধে, শ্বাস চলছে বলে আমি একা উঠিয়েছি।”

ছেলেটার হেঁয়ালি করে বলা কথা শুনে মিস সু’র চোখজোড়া কোটর থেকে প্রায় বেরিয়েই এলো! রাগে থরথর করে কাপছেন মহিলা। সেটা দেখে পাখি চোখ রাঙিয়ে ধমকালো ছেলেটাকে।

“স্বাধীন!”

“চিন্তা করো পাখি, এই ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে এই মহিলা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চেয়েছিল! দেখা যেত অর্ধেক সিঁড়িতে তার পার্থিব শরীর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে গেছে। আমি ভাবলাম, ওনার হাড়গোড় সিঁড়ি থেকে কুড়িয়ে তোলার বদলে, ওনাকে আস্ত তুলে নিয়ে আসাই শ্রেয়।”

চোখ বন্ধ করে ব্যর্থ হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো পাখি। এই ছেলের মুখে কোন ফিল্টার নেই। যা মুখে আসে, তাই বলে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, HCO- এর ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বাধীন। আর বেচারি মিস সু হচ্ছেন ন্যায়ের এসিস্ট্যান্ট। মহিলার বয়স সত্তরের কম হবে না। কাঁপা কাঁপা শরীরে রুমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেই ওনার দম বেরিয়ে যায়। কিন্তু তবুও ওনাকে রেখে দিয়েছে ন্যায়। দরকারি কাজ সে সব চাপিয়ে দেয় স্বাধীনের ঘাড়ে। সেই বদৌলতে এই প্রৌঢ়া ও স্বাধীনের টম এন্ড জেরী শো চলতেই থাকে নিত্যদিন।

পাখি যখন বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে স্বাধীনের দিকে, তখন মিস সু রাগটাগ রেখে মিষ্টি হেসে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন স্বাধীনকে। স্বাধীন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেও, ঝুঁকে এলো তার দিকে। মিস সু সাথে সাথে খপ করে ওর কান টেনে ধরলেন সর্বশক্তি দিয়ে।

“মিস সু! ব্যথা পাচ্ছি তো!”

“তোমাকে বলেছিনা, আমাকে নিয়ে মজা করবে না! এই ভাঙাচোরা হাত দিয়েই তোমার কান টেনে নেব আমি!”

“সরি, মিস সু! এবার তো ছাড়ুন!”

মিস সু ছেড়ে দেওয়ার পর কানে হাত বুলাতে বুলাতে মমর জন্যে এনে রাখা স্ন্যাক্সের পাকেটগুলোর দিকে এগিয়ে যায় স্বাধীন। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে পাখি মিস সু-কে জিজ্ঞেস করে,

“আপনি এখানে কেন মিস সু? কোন দরকার ছিল?”

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মিস সু এদিকটায় আসেন না। ন্যায়ের অফিসেই টুকটুক করে যা পারেন, যেটুকু পারেন করেন এই প্রৌঢ়া।

“ইয়েস, ইয়েস। মিসেস অনামিকা চাইনিজ নিউ ইয়ার আসছে। আপনি বিদেশী, হয়ত জানেন না। কিন্তু এখানে আমরা এটাকে অনেক ধুমধাম করে পালন করি। আমারা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও শান্তির জন্য। পুরোনো সকল মলিনতা ও অশুভ শক্তিকে বিদায় জানাই। আমাদের সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ন অংশ এই উৎসব।”

এত লম্বা বিবৃতির পর থেমে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন মিস সু। একসাথে বেশি কথা বলতে পারেন না উনি। হাঁপিয়ে ওঠেন তাড়াতাড়ি।

“ওকে। বুঝতে পেরেছি। আপনি কি নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের জন্যে ছুটি চাইতে এসেছেন?”

“না, না। এখানে চাওয়ার কি আছে, ওটা তো আমি এমনিতেই নেব। আমি অন্য একটা ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি। আসলে আমি চাইছি, স্বর্গভূমিতে একটা বারবিকিউ পার্টির আয়োজন হোক। সবাই মিলে একসাথে সেলিব্রেট করবো আমরা নিউ ইয়ার।”

পাখি একটু ভেবে কাঁধ ঝাঁকালো। হাইব্রিডার্সদের নিজস্ব কোন ধর্ম বা সংস্কৃতি নেই, নেই কোন নির্দিষ্ট সামাজিক রীতি নীতি। নিজেদের একটু একটু করে গুছিয়ে নেবার চেষ্টায় আছে তারা। যখন যেখানে যেটুকু প্রয়োজন, তারা জেনে, বুঝে, শিখে নেয়।

“আইডিয়া খারাপ না। আপনি চাইলে পার্টির আয়োজন করতেই পারেন!”

“না, আমি না। আপনি করবেন।”

“সরি?”

চোখ কপালে উঠলো পাখির। সে করবে পার্টির আয়োজন? এত সময় আছে নাকি তার হাতে?

“আমার কি আর পার্টির আয়োজন করার বয়স আছে? এই শরীর নিয়ে এসব ধকল আমাকে দিয়ে হবে না। তাই পার্টির সব দায়িত্ব আপনার তত্ত্বাবধানেই হোক।”

পাখি হতভম্ভ হয়ে চেয়ে রইলো মিস সু-র দিকে মিনিটখানেক। তারপর আমতা আমতা করে বললো,

“মিস সু, আমি তো আপনাদের কালচার সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি কিভাবে কি করবো?”

“না জানলে, জেনে নেবেন। সমস্যা নেই, আমি তো আছি। তাহলে ঐ কথাই রইলো। আমি এখন আসি।”

পাখিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মিস সু। এদিকে মিস সু ও পাখির কথপোকথনের মাঝে ফোনেই ব্যস্ত ছিল মম। চোখ তুলে সে যখন সামনে তাকালো, তখন দেখলো তার জন্যে আনা স্ন্যাক্সের প্যাকেটগুলো আছে, কিন্তু ভেতরের খাবার কিছুই অবশিষ্ট নেই। মিস সু-র সাথে আসা ঐ হাইব্রিডার্স সব সাবার করে ফেলেছে। মুখটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে যায় মমর। হাতের প্যাকেটটাও খালি করে ফেলেছে স্বাধীন। এখন অবশিষ্ট শেষ চিপসের প্যাকেটটার দিকে হাত বাড়াতে যাবে সে। তার আগেই লাফিয়ে ঝাপিয়ে এসে ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে নিল মম। বড় বড় চোখে স্বাধীনের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে প্যাকেটটা বুকের সাথে আগলে ধরে রাখলো, যেন এটার ভেতরে তার কলিজা ঢুকানো আছে। মমর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে স্বাধীন পাখিকে জিজ্ঞেস করলো,

“এটা কে?”

“আমার বোন। মুমতাহিনা আহমেদ মম।”

“ওহ্, এটাই মুহূর্তের মোমো?”

“কি? কিসের মোমো?”

স্বাধীনের কথা শুনে ছ্যাত করে উঠলো পাখি। সেটা দেখে ঠোঁট চেপে একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে স্বাধীন বললো,

“নাহ্, কিছু না। ওকেও নিয়ে এসো পার্টিতে, কেমন?”

বলেই মমর দিকে ঘুরে তাকিয়ে ঠোঁট খুলে দাঁতগুলো বের করলো স্বাধীন। জানালা দিয়ে আসা বিকেলের রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠলো তার ধারালো দাঁত। সেই ঝিলিকদেখে মমর হাত থেকে আপনাআপনিই পরে গেল চিপসের প্যাকেট। তবে মাটি ছোঁয়ার আগেই সেটা ক্যাচ করে নিল স্বাধীন। তারপর দরজার দিকে কচ্ছপের গতিতে টলমলে পায়ে এগিয়ে যেতে থাকা মিস সু-কে কোলে তুলে নিয়ে হাটা দিল। করিডোর থেকে আবারো ভেসে এলো মিস সু-র চিৎকার,

“ছাড়ো! ছেড়ে দাও বজ্জাত ছেলে! ছাড়ো আমাকে!”

***

চলবে…

শরতের কাশফুল পর্ব-৭+৮

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৭

রাতের আকাশটা বিশাল কালো মখমলের পর্দার মত মনে হচ্ছে। দূর দূরান্তে জ্বলছে অসংখ্য নক্ষত্র। মেঘেদের দেখাচ্ছে রূপালী ধোঁয়ার মত।

আকাশের এই নীরব সৌন্দর্য্য জানালার পাশে বসে উপভোগ করছে মম। একটা শান্ত, নীরব প্রশ্বাস ফেলে সে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো। কিছুটা সামনে, অন্য পাশের রো-তে বসে আছে পাখি। তার মুখোমুখি বসেছে ঘোস্ট। মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু করছে পাখি। কানে ইয়ারফোন, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। বাংলাদেশ থেকে সাংহাই পুডং ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পুরোটা সময় ঠিক এভাবেই কাজে মগ্ন ছিল সে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার ফ্লাইট কেটেছে নীরবে। ভূত ভাইয়া তখন বেঘোরে ঘুমিয়েছে। সাংহাই এয়ারপোর্টে নেমে চোখ খুলেছে সে। এখন অবশ্য আর ঘুমাচ্ছেন না ভূত ভাই। ব্যস্ত পাখিকে প্লেটে সাজানো ফল একটু একটু করে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন।

বিরক্ত হয় মম। এই লোকটা সবসময় তার বোনের সাথে চিপকে থাকে কেন? পাখির সাথে যে আলাদা করে দুটো কথা বলবে তারও সুযোগ নেই। এই লোক যদি বাংলাদেশে এসে ঝামেলাটা না বাঁধাতো, তবে তো আর এভাবে তাড়াহুড়ো করে দেশ ছাড়তে হতো না তাদের। ওদের সিকিউরিটি নিয়েই তো মূল বিপত্তি। দু দুটো হাইব্রিডার্স ঢাকার রাস্তায় উন্মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে! পাবলিক টের পেলে খবর হয়ে যেত। দেখা যেত, ইনফ্লুয়েন্সাররা এসে হামলা করে দিত। ব্লগ বানাতো এদের ধরে ধরে। মুখের সামনে কাঁচা মাংস ধরে বলতো, একটু চিবিয়ে দেখান দেখি!
কি এমন হয়ে যেত দুটো দিন পাখিকে একা ছাড়লে? বিয়ে হয়েছে বলে কি তাকে নিয়েই থাকতে হবে চব্বিশ ঘণ্টা? ন্যাকামি যত্তসব!

ঘাড় ঘুরিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকায় মম। বাংলাদেশ থেকে সাংহাইয়ের জন্যে রওনা দিয়েছিল তারা আজ সকালে। সাংহাই এয়ারপোর্টের ঝামেলা মিটিয়ে এখন পাখির প্রাইভেট জেটে রওনা দিয়েছে শেংসী দ্বীপের উদ্দেশ্যে। মাত্র ত্রিশ মিনিটের ছোট্ট যাত্রা শেষে সোজা গিয়ে ল্যান্ড করবে তারা স্বর্গভূমিতে।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে তাদের থাকাটা নিরাপদ নয় বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাখি। তাকে তো ফিরতেই হবে ঘোস্টের সাথে। মামুন সাহেবকেও চিকিৎসার জন্যে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সে। রইলো মম। আপাতত ওকে নিয়ে স্বর্গভূমিতে ফেরা ছাড়া অন্য রাস্তা দেখেনি পাখি।

বাবার কথা মনে পরতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় মমর। আসার আগে বাবাকে ইমার্জেন্সী এয়ার এম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিয়ে এসেছে তারা দুই বোন। ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মামুন সাহেবকে। সেখানকার বেস্ট মেডিক্যাল টিমের হাতে ওনার চিকিৎসার ভার দেওয়া হয়েছে। একা ছাড়তে ইচ্ছে না করলেও উপায় ছিল না। বাবার কোন অযত্ন হবে না জানে মম। সেখানে লোক আছে ওনার দেখাশোনার। তবুও মনটা মানতে চাইছে না।

“মন খারাপ করে আছো কেন মোমো? আমরা স্বর্গভূমিতে ফিরে যাচ্ছি। দেখবে, ওখানে কোন বিপদ নেই। তুমি সুরক্ষিত থাকবে ওখানে।”

পাশ থেকে মুহূর্তের গলার আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো মম। মমর মুখোমুখি সিটটায় এসে বসেছে সে। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মম তাকে জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা, স্বর্গভূমি কেমন?”

“ঠিক স্বর্গের মত।”

ঠোঁটজোড়া প্রশস্ত করে একটা হাসি দিয়ে বললো মুহূর্ত। সতর্ক থাকলো যেন তার দাঁত দেখা না যায়। মোমো ভয় পায় ওগুলো দেখলে। কিন্তু তারপরও মোমোটা কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে। উত্তরটা বিশ্বাস হচ্ছে না হয়ত তাই। মুহূর্ত আবারো জোর দিয়ে বললো,

“আরে এটা আমার কথা না। মানুষরা বলে। ওখানে যারা থাকে, তারা।”

শেংসী দ্বীপপুঞ্জ মূলত তিনশো চৌরানব্বইটি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এরমাঝে মাত্র আঠারোটি দ্বীপে রয়েছে মানুষের বাস। হাইব্রিডার্সদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল শেংসান দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের কিছু অংশ, কিছু পরিত্যক্ত ভূতুড়ে গ্রাম এবং কয়েকটি অব্যবহৃত দ্বীপ। মূল ভূখণ্ড থেকে পুল বা টানেল তৈরির মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করা হয় দ্বীপগুলোর মাঝে। আর এভাবেই গড়ে ওঠে স্বর্গভূমি।

“কিন্তু ওখানে না শুধু হাইব্রিডার্সরা থাকে? আমি তো শুনেছি স্বর্গভূমিতে মানুষদের প্রবেশ নিষেধ?”

“স্বর্গভূমি দু’ভাগে বিভক্ত। মূল এন্ট্রেন্সের কাছাকাছি মানুষরা থাকে। ওখানে ওদের অফিস, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য ভবন আছে। স্টাফ ও গেস্টরা সেখানে থাকার অনুমতি পায়। আমাদের কেউ সেখানে থাকে না। এই এরিয়া থেকে কয়েক মাইল ভেতরে শুরু হয় হাইব্রিডার্স জোন। ওটা আমাদের কমিউনিটি। আমাদের এরিয়া পুরোপুরি আমরা কন্ট্রোল করি। সেখানে আমাদের অনুমতি ছাড়া মানুষদের প্রবেশ নিষেধ।”

“আপু কোথায় থাকে?”

“পাখি আগে হাইব্রিডার্স জোনের বাইরেই থাকতো। স্টাফ কোয়ার্টারে। কিন্তু এখন ঘোস্টের সাথে কলোনীতে থাকে।”

কথা বলতে বলতে একটা কমলার খোসা ছাড়িয়ে মমর দিকে একটা কোয়া বাড়িয়ে দিল সে। রুদ্ধশ্বাসে মুহূর্ত অপেক্ষা করলো। মম অবশ্য অতকিছু না ভেবে সেটা নিয়ে নিল। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ নিজেদের কথপোকথনে। কমলার কোয়াটা নেবার পর মুহূর্তের ঠোঁটে যে লাজুক হাসিটা খেলে গেল, সেটা সে খেয়ালই করলো না।

“কলোনী?”

“কলোনী…” একটু থেমে ভাবলো মুহূর্ত।
“এটাকে আবাসিক এলাকা বলতে পারো। বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট একতলা বা ডুপ্লেক্স বাড়ি সারিবদ্ধভাবে সাজানো সেখানে। বড় খোলামেলা এরিয়া নিয়ে বানানো বাড়িগুলো। মাঝখানে প্রশস্থ রাস্তা। তবে গাছপালা ও সবুজে ঘেরা এই অঞ্চল। আমরা প্রকৃতি ও খোলামেলা পরিবেশ পছন্দ করি। তাই যতটা সম্ভব প্রকৃতি সংরক্ষণ করেই সংস্করণ করা হয়। তোমার পছন্দ হবে।”

“আমি তাহলে কোথায় থাকবো? আমাকে কি কলোনীতে থাকার অনুমতি দেবে?”

চিন্তিত দেখালো মমকে। কিন্তু মুহূর্ত দু’কাঁধ ঝাকিয়ে জানালো,

“না। তোমাকে সম্ভবত হোটেলে রাখবে পাখি।”

“আমি হোটেলে একা থাকবো কিভাবে? আপু আমাকে তার সাথে রাখবে না?”

“প্রথমত, তোমাকে হাইব্রিডার্স জোনে থাকার অনুমতি দেবে না। তুমি পাখির বোন বলে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাবে ভাবলে সেটা ভুল। আমাদের মধ্যে এসব চলেনা।
দ্বিতীয়ত, অনুমতি পেলেও, ঘোস্ট তোমাকে নিজের বাড়িতে রাখবে না। ওর অসুবিধা হবে।”

“আশ্চর্য! আমি আমার বোনের সাথে থাকবো, তাতে তার কি সমস্যা? আমি তো আর তাদের বেডরুমে ঢুকে বসে থাকবো না।”

“আমরা এরকমই। নিজেদের সীমানাতে আমরা কাউকে ঢুকতে দেই না। এমনকি অন্য কোন হাইব্রিডার্সকেও না। আমাদের অসুবিধা হয়।”

মুহূর্ত বিষয়টাকে কোন গুরুত্ব না দিলেও, মমর কাছে এটা খুবই গম্ভীর ঠেকলো। সে কেন তার বোনের সাথে থাকতে পারবে না? কি ক্ষতি করেছে সে ঐ ভূতটার যে তাকে তার বোনের থেকে আলাদা করে দিতে চায়? সম্পূর্ণ নতুন, অচেনা পরিবেশে সে একা কীকরে থাকবে? পাখি কি সত্যিই তাকে একা ছেড়ে দেবে? মমর মস্তিষ্কে যখন এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই মুহূর্ত উৎসাহের সাথে বলে উঠলো,

“আহ্, এসে গেছি।”

ল্যান্ডিং এর সময় হয়ে গেছে। মম তেতো মুখে ওর দিকে তাকালেও, মুহূর্ত একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বললো,

“ওয়েলকাম টু স্বর্গভূমি, মাই মোমো!”

***

“এটা হচ্ছে তোমার রুম। দেখো তো পছন্দ হয় কিনা।”

উৎসাহের সাথে মমকে গেস্ট রুমটা দেখিয়ে দিয়ে বললো ডক্টর শ্রেয়া। একটা পানির বোতল রাখলো সে বেডসাইড টেবিলে। মম মাথা নেড়ে বোঝালো ঠিক আছে, তার পছন্দ হয়েছে। যদিও মুখ ভার করে রেখেছে সে।

“ঠিকাছে, তাহলে। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করছি।”

মম আবারো মাথা নাড়লো শুধু। শ্রেয়া বেরিয়ে গেল রুম থেকে। মম আরেকবার রুমটার চারদিকে চোখ বুলালো। মাঝারি আকারের ছিমছাম, গোছানো একটা রুম। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া তেমন কিছু নেই এখানে। মাঝারি আকৃতির একটা কুইন সাইজ বেড, একপাশে একটা এক পার্টের আলমারি, বেডের একপাশে ড্রয়ারসহ একটা ছোট টেবিল, তার উপরে রাখা একটা টেবিল ল্যাম্প, আর বেডের ঠিক মুখোমুখি এক সিটের বড়সড় একটা সোফা। ব্যস, গুণে গুণে এই আছে রুমটিতে। দেয়ালে হালকা লেমন ইয়েলো কালারের রং করা। বেডের উপরে দেয়ালে শোভা পাওয়া জলরঙের ছবিটা রেখেছে রুচিশীলতার ছাপ। আলো বাতাসের জন্যে দুটো বড় বড় জানালা আছে রুমটিতে। বেডের একপাশের দেয়ালের অর্ধেকটায় জায়গা করে নিয়েছে বিশাল এক জানালা। আর অন্য জানালাটা সোফার পেছনে। দুটোতেই ক্রীম কালারের মোটা ভারী পর্দা টানা।

পাদুটো ভেঙে আসছে মমর। ক্লান্তিতে আর দাঁড়িয়ে থাকার জো নেই। সে ধীর পায়ে গিয়ে বেডের একপাশে বসলো। বড় জানালাটা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ রাখল সে। সামনে কিছুটা দূরে একটা লেক দেখা যাচ্ছে। গাছপালায় ঘেরা। লেকের চারদিকে বিভিন্ন রঙের আলো জ্বলছে। মম ঠাঁয় তাকিয়ে থাকে সেদিকে।

ডক্টর শতাব্দী শ্রেয়া।

স্বর্গভূমিতে কর্তব্যরত অন কলে থাকা রেসিডেন্ট ডক্টর, সেই সাথে পাখির খুব ভালো বন্ধু। মেয়েটা বাঙালি। কলকাতায় বাড়ি। এখানে এসে যে বাঙালি কাউকে পাবে, ভাবেনি মম। তবে পেয়ে মন্দ হয়নি। যখন থেকে স্বর্গভূমিতে ল্যান্ড করেছে কারো কোন কথা বুঝতে পারছে না সে। সবাই চাইনিজ ভাষায় কি সব বলছে। এমনকি পাখিও! পাখি যে চাইনিজ ভাষায় কথা বলতে পারে, সেটাই জানা ছিল না মমর।

মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে আছে তার। মুহূর্ত ঠিকই বলেছিল। পাখি তাকে নিজের সাথে রাখেনি। তাকে বলেছে, কিছুদিন শ্রেয়ার সাথে থাকতে। ডক্টর হওয়ার সুবিদার্থে একটা একতলা ছোট বাড়ি বরাদ্দ করা শ্রেয়ার জন্যে। হাইব্রিডার্স জোনের কাছাকাছি বাড়িটা। সেখানেই থাকবে মম আপাতত কয়দিন। পাখির এতটাই ব্যস্ততা যে প্লেন থেকে নামার পর মমকে শ্রেয়ার কাছে পৌঁছে দিয়ে সে আবার কোথায় যেন ছুটেছে। মমর সাথে বসে দুদণ্ড কথা বলার সময় হয়নি তার। তাকে যদি নিজের সাথে নাই রাখবে, তবে এখানে নিয়ে আসার দরকার কি ছিল? জিজ্ঞেস করতে পারেনি মম। বোনের মনে যে অভিমানী মেঘেরা জড়ো হয়েছে, সে খবর অজানাই রয়ে গেছে পাখির।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ায় মম। সারাদিনের ধকলে হাত পা নাড়ানোর শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই তার। কিন্তু শরীরটা কেমন আঠালো আঠালো লাগছে। ধুলো বালি লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। শাওয়ার না নিয়ে স্বস্তিতে ঘুমাতে পারবে না মম। নিজের ছোট্ট ব্যাগটা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে নিয়ে হলরুমের বাথরুমটায় চলে গেল সে। অল্প কিছু জরুরী জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে মম। পাখি বলেছিল, যা প্রয়োজন সব স্বর্গভূমিতেই আছে।

শাওয়ার নিয়ে রুমে ফিরে এসে খটকা লাগে মমর। যাবার সময় লাইট তো অন করাই ছিল। তবে এখন রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। বাইরে থেকে আসা আলো পর্দা ভেদ করে হালকা আলোছায়া তৈরি করলেও, তেমন কিছু ঠাহর করতে পারছে না মম। রুমের ভেতরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজতে থাকে সে।
খুঁজতে খুঁজতে অন্ধকারে খট করে একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ ভেসে আসে মমর কানে। একদম স্থির হয়ে যায় সে। একটা উপস্থিতির আভাস পায়, ঠিক তার পেছনে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে মমর। পেছনে ফিরে তাকালো না সে। বরং মনোবল জোগাড় করে দেয়াল হাতড়ে লাইটের সুইচটা চেপে ধরলো। সাথে সাথে পুরো রুমটা আলোতে ভরে যায়। সেই আলোতে আড়চোখে তাকিয়ে মম দেখলো, ঠিক তার পেছনে দাড়িয়ে আছে কেউ। লম্বা দীর্ঘদেহী কারো ছায়া পড়েছে মাটিতে। এটা যে কোন হাইব্রিডার্সই হবে, সেটা বুঝতে বাকি নেই তার।

চোখজোড়া একবার শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে চট করে ঘুরে দাঁড়ালো সে। চোখ খুলে দেখলো সত্যি সত্যিই এক হাইব্রিডার্স দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। দীর্ঘ, শক্তপোক্ত গড়ন তার। মুখটা আপনাআপনি ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল মমর। এখন পর্যন্ত মমর দেখা সবচেয়ে ভারী গঠনের হাইব্রিডার্স সে। বেশ রুক্ষ ও কর্কশ চেহারার। কপালের এক পাশে একটা গভীর দাগ। তীক্ষ্ণ সন্দেহ মেশানো ধূসর রঙের চোখ। কালো লম্বা চুলগুলো বেঁধে রেখেছে মাথার পেছনে।
মম মিনিটখানেক নীরবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর চোখ বন্ধ করে গলা ছেড়ে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো সে।

আচমকা মমর চিৎকার শুনার জন্য প্রস্তুত ছিল না ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকা সেই হাইব্রিডার্স। তার সংবেদনশীল কানে সেই প্রচণ্ড শব্দ ভীষণভাবে আঘাত করলো। চোখমুখ কুচকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল সে। রাগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো হাড় হীম করা এক হিংস্র চাপা হুংকার।

“আক্রোশ!!!”

মমর চিৎকার শুনে দৌড়ে ছুটে এসেছে শ্রেয়া। আক্রোশকে দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিল সে। দ্রুত এগিয়ে এসে মমর সামনে ওকে আড়াল করে দাঁড়ালো শ্রেয়া। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি এখানে কি করছো?”

“এই মেয়েটা কে? এখানে কেন?”

রাগে গরগর আওয়াজ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো আক্রোশ।

“ও পাখির বোন। আমার সাথে থাকবে কিছুদিন।”

“তোমার সাথে কেন থাকবে?”

“তাতে তোমার কি সমস্যা? তুমি এখানে কেন এসেছো?”

বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো শ্রেয়া। উত্তরে নাকমুখ খিঁচে ঝাঁঝালো গলায় আক্রোশ বললো,

“সমস্যা আছে। স্বর্গভূমির সুরক্ষার দায়িত্ব আমার। এই মেয়েকে বিদায় করো এখান থেকে।”

“আশ্চর্য! ও এখানে থাকলে কি এমন সুরক্ষা ঝুঁকি আছে?”

“আছে, ওকে বের করো।”

এবার মেজাজ খারাপ হলো শ্রেয়ার। সাধারণত সে নিজেও ভয় পায় আক্রোশকে। কিন্তু এভাবে বাড়াবাড়ি সহ্য হলো না তার আজ। আক্রোশের জেদের পরিবর্তে সেও উল্টো রাগ দেখিয়ে বললো,

“ঠিকাছে, তাহলে আমি ন্যায়কে ফোন করছি। ও এসে আগে বলুক, কি সমস্যা হবে মম এখানে থাকলে। ততক্ষণ ও কোথাও যাবে না।”

বলতে বলতে নিজের ফোনটা ট্রাউজারের পকেট থেকে বের করে হাতে নিল শ্রেয়া। তবে ন্যায়ের নম্বর ডায়াল করতে পারার আগেই ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে গেল আক্রোশ। শুধু নিলোই না, হাতের মুঠোয় চেপে ফোনটা ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে ফেললো সে।
বিস্ময়ে চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল মমর। জীবনে এই প্রথম সে কাউকে একটা শক্তপোক্ত স্মার্ট ফোন হাতের মুঠোয় চেপে ভাঙতে দেখলো। শ্রেয়াকে দেখে মনে হলো না সে অবাক হয়েছে। কিন্তু ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে মমর। দুজনের মধ্যে কি কথা হচ্ছে, ভাষাগত কারণে সেটা বুঝতে পারছে না মম। তবে এটা বুঝতে পারছে, তাকে নিয়েই কথা কাটাকাটি চলছে।

“খুব খাতির হয়েছে দেখছি ন্যায়ের সাথে। কথায় কথায় ওকে সবকিছুর মাঝে টেনে আনা চাই!”

দাঁতে দাঁত চেপে বললো ন্যায়। শ্রেয়াও দমে না গিয়ে একই তেজে বললো,

“হ্যাঁ, চাই তো। কারণ তোমার সাথে কথা বলা বৃথা। তুমি কিছু বোঝোনা, পারো শুধু রাগে গজগজ করতে!”

“আর ন্যায় তোমাকে বোঝে? কখন এত ভালো বোঝাপড়া শুরু হলো তোমাদের?”

“যখন তুমি আমার গলা চেপে ধরে মারতে চাইছিলে, আর ও আমাকে বাঁচিয়েছে, তখন থেকে।”

জ্বলন্ত চোখে চেয়ে আছে আক্রোশ। একটু আগেও ধূসর রঙের চোখগুলো এখন গলিত লাভার ন্যায় দেখাচ্ছে। চোখের মণির চারপাশে সেই লাল রঙের রিং চকচক করছে ধারালো ছুরির ফলার মত।
শ্রেয়ার দিকে ঝুঁকে এসে ওর গলাটা একহাতে আলতো করে চেপে ধরলো সে। ঘাড়ের পেছনে মৃদু চাপ প্রয়োগ করে গমগমে ভারী আওয়াজে বললো,

“মারতে তো তোমাকে আমি এখনও পারি ডক্টর। তুমি কি ভেবেছো, আমাকে কেউ আটকাতে পারবে?”

হালকা একটু কেঁপে উঠলো শ্রেয়ার চোখের কোণটা। তবে আজ আর ভয় তাকে কাবু করতে পারলো না। আক্রোশের ঐ জ্বলন্ত চোখে চোখ রেখে সে ফিসফিস করে বললো,

“কাউকে এতটাও ভয় দেখিও না আক্রোশ, যে ভয়টাই মরে যায়। পাখি আর ঘোস্টের বিয়ের রাতে তুমি কি করেছো জানি আমি। আমি নেশায় ছিলাম, কিন্তু এতটাও নির্বুদ্ধ আমি না যে নিজের শরীরের খবর রাখবো না।”

একমুহুর্তের জন্য থমকালো আক্রোশ। হাতটা আলগা হয়ে এলো কিছুটা। সরু হয়ে এলো চোখজোড়া। তবে পরক্ষণেই ফিচেল এক হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। ঝিলিক দিয়ে উঠলো ধারালো দাঁতের অগ্রভাগ। শ্রেয়ার দিকে আরো বেশি করে ঝুঁকে এলো সে। তার গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে শ্রেয়া। দুজনার মাঝে ইঞ্চিমাত্র দূরত্ব এখন।

“ভালো তো। জানার পর কেমন লাগছে ডক্টর? সুখসুখ লাগছে, নাকি নোংরা লাগছে?”

নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে সে। কথাগুলো কান দিয়ে শোনার চেয়ে বেশি যেন উপলব্ধি করছে শ্রেয়া। জিভের ছোঁয়ায় শুকনো ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে শ্রেয়া উত্তরে তাচ্ছিল্যের সাথে বললো,

“করুণা হচ্ছে তোমার উপর। আমি তোমার গলায় বিধে আছি, তাইনা? না গিলতে পারছো, আর না পারছো উগড়ে দিতে।”

আক্রোশের হাতের বাঁধন শক্ত হতে শুরু করে। চোয়াল শক্ত করে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় সে শ্রেয়ার দিকে। এদিকে শ্রেয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাস নিতে না পেরে চোখে জল জমে যায় মেয়েটার। তবুও টু শব্দটি করেন সে। আক্রোশের ঘৃণাভরা অগ্নিদৃষ্টি টলাতে পারে না তাকে। মুখটা রক্তিম বর্ন ধারণ করতে শুরু করেছে তখন শ্রেয়ার। পাশ থেকে চকিত এবং আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় মম। ঠিক যখন সাহস করে এগিয়ে যেতে চায় সে শ্রেয়ার দিকে, তখনই শ্রেয়াকে এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে আক্রোশ। শ্রেয়া গিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ে। কাশতে কাশতে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেয় সে ফুসফুসে। মম দ্রুত ওর কাছে গিয়ে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। বেডসাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে শ্রেয়ার হাতে তুলে দেয়। একটু শান্ত হয়ে মাথা তুলে যখন তাকায় শ্রেয়া, তখন আর আক্রোশকে চোখে পড়েনা রুমে।

***

“ভয়ে পেয় না। ভয় দেখানো ছাড়া ও কিছু করবে না। হাইব্রিডার্সরা মেয়েদের কোন ক্ষতি করে না।”

মমকে নিয়ে কিচেন কাউন্টারে বসে আছে শ্রেয়া। কিছু স্প্রিং রোল, স্যুপ আর ফিস চিপস সামনে নিয়ে বসেছে তারা। এটাই আজ রাতের খাবার।
একটা আইসব্যাগ গলার কাছে ধরে রেখেছে শ্রেয়া। লাল হয়ে ফুলে আছে জায়গাটা। ব্যথা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ঢোক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। শ্রেয়া নিঃশব্দে দুটো ট্যাবলেট মুখে গুজে গিলে ফেললো। মম ওকে দেখতে দেখতে কিছুটা সংকোচের সাথে জিজ্ঞেস করলো,

“উনি কে? এত রেগে ছিল কেন?”

“ওর নাম আক্রোশ। হাইব্রিডার্সদের কমান্ডার-ইন-চিফ। ও সবসময়ই রেগে থাকে। বিশেষ কোন কারণের প্রয়োজন পড়েনা।”

নির্লিপ্ত চেহারায় উত্তর দিল শ্রেয়া। গরম স্যুপ নেড়ে চেড়ে সামান্য একটু মুখে তুললো সে। মম চিন্তিত স্বরে আবারো জিজ্ঞেস করলো,

“আমাদের কি কাউকে জানানো উচিত না? সে যদি আবার আসে?”

“আপাতত আর আসবে না। আর কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। তুমি চিন্তা করো না। হাইব্রিডার্সরা মেয়েদের কোন ক্ষতি করে না। মেয়েদের ব্যাপারে ওরা বেশ সেনসিটিভ।”

কথাটা সত্যি। হাইব্রিডার্সরা বন্দিদশায় মেয়েমানুষ দেখেছে খুব কম। আবার অনেকে কখনো দেখেইনি। মেয়েদের ওরা ভঙ্গুর ও কোমল প্রকৃতির বলে মানে। প্রকৃতিগতভাবেই ওদের মধ্যে মেয়েদের প্রতি সুরক্ষামূলক প্রবৃত্তি কাজ করে। তাই সহজে ওরা মেয়েদের উপর আক্রমণ করে না। কিন্তু আজ আক্রোশকে দেখার পর সেসব মিথ্যা মনে হচ্ছে মমর। কেমন হিংস্র, বুনো আচরণ ছিল লোকটার! শ্রেয়ার ফুলে ওঠা গলার দিকে তাকিয়ে মম বিরস মুখে বললো,

“সেটা তো দেখতেই পারছি।”

“বিষয়টা তুমি যেরকম ভাবছো তেমন নয় মম। আমি…..”

মুখের কথা মুখেই আটকে রইল। কিভাবে মমকে বোঝাবে ভেবে পেল না শ্রেয়া। মম বাচ্চা একটা মেয়ে। নতুন এসেছে স্বর্গভূমিতে। হাইব্রিডার্সদের বিষয়ে বিশেষ তেমন কিছু সে জানেনা। আবার তাকে জানতে দেওয়াও যাবে না। যতই পাখির বোন হোক না কেন, বহিরাগতই থাকবে সে। কিন্তু আক্রোশ কোন ঝামেলায় পড়ুক, সেটাও চায়না শ্রেয়া। একটু ভেবে চিন্তে সে মমকে বললো,

“আমার আর আক্রোশের হিসেবটা আলাদা। আমাদের কিছু পুরোনো অসমাপ্ত ইতিহাস আছে, যার প্রভাব পড়ছে বর্তমানে। সমাপ্তি খুঁজে পাচ্ছি না আমরা।”

কপালে হালকা ভাঁজ পড়লো মমর। শ্রেয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। শ্রেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনুরোধ করলো,

“আমি চাইনা আমাদের মধ্যকার বিষয়টায় অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করুক। তুমি প্লীজ কাউকে বিষয়টা জানিয়ো না।”

মনে মনে বিরক্ত হলো মম। তাদের মধ্যকার বিষয় নিয়ে একটু আগেই শ্বাস আটকে মরতে বসছিল মেয়েটা। তারপরও কি করে বলছে কাউকে না জানাতে? যাক গে। মম ভাবলো, এতকরে যখন বলছে এবারের মত বিষয়টা চেপে যাওয়াই ভালো। তাছাড়া এমনিতেও ওদের কথোপকথন কিছুই বুঝতে পারেনি মম। ঠিক করে কিছু বলতেও পারবে না সে কাউকে। সেটা ভেবে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে খাবারে মনোযোগ দিল মম।
ঝেড়ে ফেললো মাথা থেকে আক্রোশের ব্যাপারটা।

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৮

বিকেলের সূর্য তখন হেলে পড়তে শুরু করেছে। বড় বড় গাছেদের পাতার ফাঁক গলে সোনালী আলোরা খেলা করছে নরম সবুজ ঘাসে। সমুদ্রের দিক থেকে আসা দমকা হাওয়া কোন এক গোপন আলাপচারিতায় ব্যস্ত সেই পাতাগুলোর সাথে। পাখিরা ডানা ঝাপটে বিকেলের শেষ আলোটুকু গায়ে মেখে ফিরছে নিজেদের নীড়ে।
স্বর্গভূমির বাতাসে এক অদ্ভুত স্থিরতা আছে। কোন শোরগোল নেই, নেই কোন দূষণ, নেই ব্যস্ত কোলাহল। আছে শুধু শান্ত নীরবতা।

সরু পথ ধরে হাঁটছে মম। দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছায়া দিচ্ছে গাছগুলো। পথের পাশে, গাছগুলোর নীচে ছোট করে ছেঁটে রাখা সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো। সেটা পেরিয়ে শুরু স্বচ্ছ পানির লেকের পাড়। আলোর প্রতিফলন ঘটে চিকচিক করছে লেকের পানি। কিছুটা দূরত্ব পর পর সাজানো ছোট ছোট অচেনা ফুলের গাছ। সুন্দর, কিন্তু নিস্তব্ধ। পাখিদের কিচির মিচির ছাড়া আর কোন শব্দ নেই চারপাশে।

এরকম পরিবেশ প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে স্বর্গ হলেও, মমর কাছে বিরক্তিকর ঠেকছে। ঢাকার কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মম, তার আঠারো বছরের জীবনে কখনও এতটা শূন্য, নীরব, স্তব্ধ পরিবেশ দেখেনি; যেখানে কথা বলে তো শুধু প্রকৃতি। গত তিনদিনে বিরক্তি এসে গেছে তার এই পরিবেশের উপর। ডক্টর শ্রেয়া নিয়ম করে সকালে বেরিয়ে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। দুপুরে ফিরে লাঞ্চ করে আবার চলে যায়। তারপর ফিরতে ফিরতে রাত। লাঞ্চ বা ডিনার টাইমে দু চারটা কথা হলেও হয়, নইলে সারাদিন অনেকটা গৃহবন্দি দশায় কাটে মমর। সময় কাটানোর মত কিছুই খুঁজে পায় না মম।
ইয়া মোটা মোটা বইয়ে ভর্তি শ্রেয়ার বুকশেলফ। ম্যাগাজিনও আছে। কিন্তু সেসব শুধু জ্ঞানের কথায় ভর্তি। বেশিরভাগ বই চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক, নয়ত মনোবিজ্ঞানের। আর টেলিভিশন? প্রথমদিনই আবিষ্কার করে মম সেটা কোন কাজের না। বসার ঘরে একটা চকচকে কালো টিভি থাকলেও, তাতে কোন বিনোদন নেই। আছে শুধু কয়েকটা ডকুমেন্টারি চ্যানেল, যেখানে সারাদিন চলে বোরিং সব প্রোগ্রাম। শ্রেয়া অবশ্য সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। এইযে! আজকেও লাঞ্চ টাইমে বাড়িতে এসে চপস্টিক দিয়ে ভাত খেতে খেতে হা করে শ্রেয়া দেখছিল, কিভাবে একজন আগুনে পুড়ে যাওয়া লোকের দগ্ধ শরীরে তেলাপিয়া মাছের চামড়া লাগিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, এই দৃশ্য দেখে মমর খাবারে অরুচি এসে গেছে। ভাতগুলো আর গিলতে পারেনি সে।

পাখি নিয়ম করে তাকে একবার দেখে যায় সন্ধ্যায়। অভিমানী মম তার সাথে খুব একটা কথা বলেনি। কিন্তু ব্যস্ত পাখি, এখনো সেটা লক্ষ্যই করেনি। সে আসে, দ্রুত দু চারটা প্রয়োজনীয় কথা বলে চলে যায়। শ্রেয়ার কাছে মম শুনেছে, আজকাল নাকি দম ফেলারও ফুরসৎ পায়না পাখি। হাইব্রিডার্সদের নিয়ে হওয়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন, হাইব্রিডার্স কালেকটিভ অর্গানাইজেশন (সংক্ষেপে HCO) এর বিশ্বের মঞ্চে আত্মপ্রকাশ, ন্যায়কে HCO-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, পাখি ও ঘোস্টের সম্পর্কের খোলাসা এবং প্রেস ব্রিফিংয়ে হামলা, সবকিছু মিলিয়ে এখন প্রচন্ড প্রেশার যাচ্ছে। তার উপর ঐ ভূতটাও বেশ জ্বালাচ্ছে তাকে। অসুস্থ শরীর নিয়েও রেস্টে থাকতে নারাজ সে। যে সময়টুকু পাখি ধরে বেঁধে রাখে, সেই সময়টুকুই বিশ্রামে থাকে সে।
শ্রেয়ার কাছে মম আরো জানতে পারে ভূত ভাইয়াটার তার বোনকে জ্বালানো ছাড়াও আরো একটা কাজ আছে। HCO এর চিফ সিকিউরিটি অফিসার সে। পুরো স্বর্গভূমির টেকনিক্যাল সিকিউরিটি তার আয়ত্ত্বে। নিজের বাড়ি থেকে এক চুল না নড়েও, সে যেকোন সময় যেকোন জায়গায় নজর রাখতে পারে। এজন্যই নাকি তার নাম পড়েছে ঘোস্ট। আর ঠিক এই কারণেই স্বর্গভূমি থেকে এত সহজে প্লেন হাইজ্যাক করে বাংলাদেশে উড়াল দিতে পেরেছিল সে।

বিরক্তি কাটাতে হাঁটতে বেরিয়েছে মম। চারপাশটা খানিকটা ঘুরে দেখছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার কানে একটা শব্দ ভেসে আসে। কৌতূহলী মম ঘুরে তাকিয়ে দেখে একটা ইলেকট্রিক বগি দ্রুতবেগে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে লেকের দিকেই। এসব বগি সাধারণত গলফ কোর্ট বা রিসোর্টে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্বর্গভূমিতেও কাছাকাছি দূরত্বে যাতায়াতের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ছোট বড় বিভিন্ন আকারের এসব ইলেকট্রিক বগি।

অস্বাভাবিক বেগে এগিয়ে আসা বগিটার স্টিয়ারিং ধরে আছে একটা মেয়ে। নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বগিটা সোজা গিয়ে পতিত হয় লেকের পানিতে। ভারী ওজনের বগিটা ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে মমর চোখের সামনে। সে ছুটে এগিয়ে যায় লেকের পাড়ে। দেখে, ভেতরে থাকা মেয়েটা আটকা পড়েছে। হাত পা ছোড়াছুড়ি করে বের হবার চেষ্টা করছে। কিন্তু বগির নীচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সে। না পারছে বের হতে, না পারছে উপরে উঠে আসতে।

আতঙ্কিত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে মম সাহায্যের আশায়।

“হেল্প! হেল্প! কেউ আছেন? বাঁচাও!!!! পানিতে ডুবে যাচ্ছে!!!”

কিন্তু মমর সাহায্যের আবেদন কারো কানে পৌঁছায় না। পৌঁছাবে কি করে, সে ছাড়া তো সেখানে আর কেউ নেই। এদিকে বুক ধড়ফড় করছে মমর। কি করবে সে এখন? সে তো সাঁতারও জানে না। এখন উপায়?

এদিক ওদিক তাকিয়ে মম দেখলো কাছাকাছি একটা রাবারের হোস পাইপ পড়ে আছে। সে চট করে পাইপখানা তুলে সেটা ছুঁড়ে মারলো পানিতে মেয়েটার দিকে। মেয়েটা প্রথমে বুঝতে পারলো না, পাইপটাও ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। সেটা টেনে এনে মম আবার ছুঁড়ে দিল মেয়েটার দিকে। সেই সাথে চেচিয়ে মেয়েটাকে বললো সেটা ধরতে। তৃতীয়বারের সময় মেয়েটা ঠিক বুঝতে পারলো। বগিটা এখন সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। মেয়েটাও তলিয়ে যাচ্ছে সাথে। কোনমতে পাইপটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো সে। মম লম্বা পাইপটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে একটা গাছের গুড়িতে পেঁচিয়ে দিল কয়েকবার। তারপর আবার লেকের কাছে গিয়ে পাইপটা টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো সে। অন্যদিকে পাইপটা আঁকড়ে ধরে মেয়েটাও প্রাণপণে উঠে আসার চেষ্টা করছে।
দুজনের মিলিত প্রচেষ্টা সফল হলো শেষমেষ। পাড়ে পৌঁছাতেই ওকে হাত ধরে টেনে উপরে তুলে আনলো মম। এই কসরতের পর শরীরের ভর ছেড়ে দিলো মম। হাঁপিয়ে উঠেছে সে। ঘাসের উপর শুয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।

মিনিটখানেক পর উঠে বসে মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকালো মম। মেয়েটার ত্বক মসৃণ, একেবারে নিখুঁত। গোলাপি আভা ফুটে আছে ফর্সা চামড়ায়। ফর্সা ত্বকে ঘষা দিলে রক্তের আভা ভেসে উঠে যেমনটা হয়, তেমনই। পিঠে ছড়িয়ে আছে ঝলমলে রেশমের মত লালচে খয়েরী রঙের চুল। আর মেয়েটার চেহারা? সে যেন কোন শিল্পীর হাতে গড়া নিখুঁত কারুকাজ। সরু নাক, সুগঠিত চোয়াল, সামান্য ফোলা গাল, পরিপাটি একদম মেপে বসানো ভ্রু, ঘন চোখের পাপড়ি!
অদ্ভুত সুন্দর ও নিখুঁত এই মেয়েটির মাঝে কিছু একটা খটকা আছে। সেটা কি, মম ওর চোখের দিকে তাকিয়েই ঝট করে বুঝে গেল।

হাইব্রিডার্স!

বড় বড় টানা দুটো চোখ মেয়েটার। নীলচে ধূসর চোখের মনি ও তার চরপাশে লাল রঙের রিং। কান দুটো পাতলা লম্বাটে গড়নের, ঠিক ছেলেদের মতোই। তবে কিছুটা ছোট।

“তোমাকে ধন্যবাদ। আমাকে বাঁচিয়েছ তুমি। নইলে ওই বগিটার সাথে ডুবে যেতাম, কেউ টেরও পেত না।”

কিছুটা অস্বস্তি ও সংকোচ নিয়ে বললো মেয়েটা। কিন্তু মম ওর চাইনিজ কথাবার্তা কিছুই বুঝলো না। সে ভ্রু দ্বয় কপালে তুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে শব্দ করলো,

“হু?”

মেয়েটা সরু চোখে তাকালো মমর দিকে। দৃষ্টিতে তার সন্দেহ, কিন্তু কিসের সন্দেহ সেটা বুঝলো না মম। সে আমতা আমতা করে বললো,

“নো চাইনিজ। বাংলা বা ইংলিশ প্লীজ!”

মেয়েটা মমর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বুঝতে পেরে এবার ইংরেজিতে বললো,

“আমি শুধু তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আমাকে বাঁচানোর জন্য।”

“ওহ্, ধন্যবাদ।”

“না, তোমাকে ধন্যবাদ।”

“ধন্যবাদ, ওকে।”

দুহাত তুলে দুই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মম বোঝালো সে ধন্যবাদ স্বীকার করে নিয়েছে। মেয়েটা আর কিছু বললো না। ডান পায়ের বুট জুতোটা খুলে গোড়ালির কাছের ক্ষতটা দেখতে লাগলো সে। মম দেখলো মেয়েটার পায়ের বেশ খানিকটা অংশ কেটে গেছে। হয়ত পানির নীচে ধারালো কিছুর সাথে আটকে গিয়েছিল বগি থেকে বেরোবার সময়।

“তোমার পা তো অনেকখানি কেটে গেছে।”

“দেখেছি আমি।”

মেয়েটার রসকসহীন উত্তরে কিছুটা দমে গেল মম। ভাবলো এবার তার ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু এভাবে মেয়েটাকে ফেলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? একটু ভেবে মম আবারো তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা কাজ চালিয়ে নেবার মত ইংরেজি দক্ষতা খাটিয়ে বললো,

“আমি কাছাকাছিই থাকি। তুমি যাবে আমার সাথে? ফার্স্ট এইড আছে ওখানে।”

মেয়েটা প্রথমে বিরক্তি নিয়ে তাকালেও, একটু ভেবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। নিজে নিজে উঠে দাঁড়াতে পারলেও, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সে। কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেরে, মম ওর একটা হাত চেপে ধরে সাহায্য করতে লাগলো। মেয়েটা প্রথমে কপাল কুঁচকে তাকালেও, পরে আর কিছু বললো না।

দুজনে মিলে পৌঁছালো শ্রেয়ার বাড়িতে। আশেপাশে জনমানবহীন এই স্বর্গভূমিতে দরজা লক করার প্রয়োজন দেখেনি মম। বাইরে থেকে শুধু তালা টালা ছাড়া এমনি আটকে রেখেছিল। মেয়েটাকে নিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসালো সে। তারপর একটা টাওয়াল নিয়ে এসে মেয়েটাকে ধরিয়ে দিলো। মেয়েটা চুলগুলো মুছে নিতে নিতে সে কিচেন কেবিনেট থেকে ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে এলো। রান্নার সময় দেখেছিল মম সেটা ওখানে। তাই আর খুঁজে পেতে অসুবিধা হলোনা। মেয়েটার কাছে বসে ওর পায়ের ক্ষতে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল মম।

“হয়ে গেছে!”

“ধন্যবাদ।”

“ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই। আমার নাম মম, আর তুমি?”

“চেরী”

“চেরী! সুন্দর তো।”

তৎক্ষণাৎ মেয়েটার চুলের দিকে নজর গেল মমর। মেয়েটার নাম ওর চুলের সাথে মিলিয়ে রাখা মনে হয়। আচ্ছা, মেয়েটা কি চুলে রং করেছে, নাকি এটাই ওর চুলের আসল রং? মনে প্রশ্ন জাগলেও, সেটা চেপে গেল মম। পাছে আবার মেয়েটা প্রশ্ন শুনে রাগ করে! এমনিতেই মেয়েটিকে গম্ভীর, নিরস স্বভাবের মনে হচ্ছে।

“তুমি কিছু খাবে? আমি এই সময়টাতে চা না খেয়ে থাকতেই পারি না। ওহ্, ভালো কথা! তোমার ড্রেস তো ভিজে আছে। এভাবে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে। চেঞ্জ করবে?”

কথাটা বলে নিজেই ভাবনায় পড়ে গেল মম। হাইব্রিডার্স ছেলেদের মত অত পেশীবহুল ও ভারী না হলেও মেয়েটা লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি তো হবেই। কিন্তু শরীরের গড়ন ছিমছাম, হালকা। অনেকটা বলিউডের অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের মত। ফ্লোরাল প্রিন্টের একটা মিডি ড্রেস পরে আছে সে। ভেজা থাকায় শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।সেদিকে থেকে চোখ সরিয়ে একবার নিজের গোলগাল তুলতুলে পেটটার দিকে তাকায় মম। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায় তার অন্তর থেকে। চোখের সামনে এমন নিখুঁত মেয়েটাকে দেখে, নিজেকে বড্ড বেক্ষাপ্পা লাগছে মমর।

“দরকার নেই। আমরা তোমাদের মত অত দূর্বল নই। এইটুকুতে অসুখে পরবো না।”

ভাবনার সুতো কেটে বেরোতে সেকেন্ড খানেক সময় লাগে মমর। বুঝতে পারে ড্রেস চেঞ্জ করার ইচ্ছে নেই চেরীর। আর কথা না বাড়িয়ে কিচেনে গিয়ে চায়ের বন্দোবস্ত শুরু করে মম। কিছুক্ষন পর মেয়েটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে বসে কিচেন কাউন্টারে। চারদিকে তাকিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টেনে নেয় সে। তারপর সন্দেহের চোখে তাকিয়ে মমকে প্রশ্ন করে,

“তুমি এখানে নতুন? আগে তো দেখিনি।”

“হ্যাঁ। এইতো তিনদিন হলো এসেছি।”

“কেন এসেছো? কি কাজে? ন্যায় জানে?”

“সেটা তো বলতে পারছি না। আমাকে আমার আপু নিয়ে এসেছে।”

“কে তোমার আপু?”

“পাখি…” মম ভাবে এই নামে হয়ত তাকে চিনবে না। ভালো নামটা বলা দরকার।
“মানে অনামিকা আহমেদ।”

কিন্তু তাকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে মেয়েটা জানায়,
“আমি জানি পাখি কে। স্বর্গভূমিতে সবাই চেনে ওকে।”

“ওহ্।”
অযথাই মাথা নাড়ে মম। চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে। দুটো কাপ নিয়ে সেটা সাবধানে ঢেলে নেয় মম। তারপর একটা কাপ চেরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“তুমি পানিতে পরে গিয়েছিলে কীকরে? কোথায় যাচ্ছিলে?”

চেরী তখন নিজের ড্রেসের গোপন পকেটে রাখা স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে কাকে যেন কল করছে। ওপর পাশ থেকে ফোনটা রিসিভ করা হলে, তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে ফোনটা কাটে সে। এরপর মমর দিকে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তার প্রশ্নের উত্তর দেয়।

“আমি বগি চালানোর ট্রেনিং নিচ্ছি। আজকে ভালোই চালাচ্ছিলাম। ভাবলাম এদিকে একটা চক্কর দিয়ে যাই। কিন্তু পরে স্পিড সামলাতে না পেরে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

“আচ্ছা।”

“তোমার সাথে পাখির অনেক মিল আছে।”

“তাই?”

“হুম। বিপদ দেখলে ওর মাথাও ভালোই কাজ করে। একবার জুতো মেরে আমাদের এক হাইব্রিডার্সকে বেঁহুশ করে দিয়েছিল। হোস্টেলে সবাই ওকে মোটামুটি পছন্দ করে।”

“জুতো মেরে বেঁহুশ করে দিয়েছিল?”

চোখ পিট পিট করে তাকায় মম। জীবনে পাখির বহু গুণকীর্তন সে দেখেছে এবং শুনেছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ তার মাথার এক হাত উপর দিয়ে গেল। চেরী হয়ত বুঝতে পারলো সেটা। মেয়েটার ঠোঁটের কোণটা সামান্য কেঁপে উঠলো। চেহারায় ধরা পড়লো কৌতুকের আভাস।

“লম্বা কাহিনী। অন্য কোন একদিন শোনাবো। এখন আমাকে বেরুতে হবে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে হোস্টেল সুপার আবার ঝামেলা শুরু করবে।”

“তুমি হোস্টেলে থাকো? মানে হাইব্রিডার্সদের হোস্টেলে?”

“হ্যাঁ। মেয়েদের হোস্টেল। পাখি কিছুদিন ছিল আমাদের সাথে, ওর বিয়ের আগে।”

“আপু তোমাদের সাথে থাকতো?”

আরেকচোট অবাক হলো মম।

“হুম, ছিল কিছুদিন। পরে ঘোস্ট ওকে তেরামি করে নিয়ে গেছে।”
কথাটা বলে একটু থমকালো চেরী। তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকালো মমর দিকে। প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা, তোমরা মানুষের মেয়েরা বিয়ের পর নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে ছেলেগুলোর কাছে চলে যাও কেন? কি দরকার? শারীরিক সম্পর্কের জন্যে নির্দিষ্ট একটা শিডিউল মেনটেইন করলেই তো হয়। কতটুকু সময়ই বা লাগে! এভাবে একা একটা দূর্বল মেয়ে একটা ছেলের সাথে সবসময় থাকা, কি ভয়ংকর ব্যাপার!”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কিছুটা শিউরে উঠলো সে। যেন ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে তার। চেরীর প্রশ্নের কি প্রতিক্রিয়া দেবে ভেবে পেলনা মম। তবে ভাবার খুব বেশি সময়ও পেল না সে। বাইরে জোরে জোরে হর্ন বাজাচ্ছে কেউ। নতুন একটা বগি নিয়ে এসেছে চেরীকে নিয়ে যেতে। চায়ের খালি কাপটা রেখে উঠে দাড়ালো চেরী।

“আচ্ছা, আজ আমি আসি। তোমার সাথে পরে দেখা হবে।”

***

চলবে…

শরতের কাশফুল পর্ব-৫+৬

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৫

সকাল গড়িয়ে এগারোটা বেজে চলেছে ঘড়ির কাঁটায়। ঢাকা এখন পুরোপুরি জেগে ওঠা এক অস্থির শহর। রাস্তাজুড়ে হর্নের অবিরাম শব্দ, যানবাহনের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস, মানুষের ভিড়ে ফুটপাতগুলো নিজেদের সীমানা ভুলে গেছে। এই শহরে থেমে থাকার যোগাড় নেই। সবাই কোথাও না কোথাও ছুটছে, জীবন ও জীবিকার তাড়নায়।

হাসপাতালের লবিতে লিফটের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মম। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার। অস্বস্তিতে ঘামছে সে। পাখি ঠিক তার সামনে দাঁড়ানো, আর মুহূর্ত পেছনে। ঘোস্ট বসে আছে একটা হুইলচেয়ারে। চেয়ারের হাতল ধরে রেখেছে পাখি। কেন সেটা বুঝতে পারছে না মম। তার বোনের ভাবখানা এমন যেন ছেড়ে দিলেই কেউ নিয়ে পালাবে তার জামাইকে।

অথচ, পাখিকে এক সেকেন্ডের জন্যেও একা ছাড়তে রাজি না ঘোস্ট। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়েও কাজ হয়নি। তাই না পারতে ওকে নিয়েই হাসপাতালে এসেছে পাখি। মুহূর্তকে তো আর একা ফেলে আসতে পারে না, তাই সে-ও এসেছে পিছু পিছু। দুজনকেই মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ, চোখে গগলস, মুখে মাস্ক পরিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে এনেছে। দেখতে জ*ঙ্গি জ*ঙ্গি লাগছে তাদের।
ঘোস্ট এমনিতেই অসুস্থ, রেস্টে থাকার কথা তার। উপরন্তু, দুজন সাড়ে সাত ফুটের শক্ত পোক্ত পুরুষ ঢাকা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে, সেটা দৃষ্টি আকর্ষন করতে বাধ্য। ভেবে চিন্তে তাই হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে ঘোস্টকে পাখি। কাকে ফোন করে যেন একটা গাড়ি ও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে ফেলেছে ফটাফট।

পাখি যে বেশ ভালো চাপের মধ্যে পরে গেছে, সেটা বুঝতে পারছে মম। একের পর এক ফোনের উপর আছে সে সকাল থেকে। কথাবার্তায় যা বুঝলো মম তাতে, এই দুই বান্দা কাউকে না জানিয়ে স্বর্গভূমি থেকে প্রাইভেট জেট নিয়ে কোনরকম ল্যান্ডিং পারমিট ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারপর এয়ারপোর্টে বেশ ভালো রকমের ঝামেলা পাকিয়ে জেট ফেলে পালিয়ে এসেছে। এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বিমানটি শনাক্তের চেষ্টায় আছে। কোথা থেকে এসেছে, মালিকানা কার, কি উদ্দেশ্য এসব জানার তোড়জোড় চলছে। এয়ারপোর্ট এরিয়ায় রেড এলার্ট জারি করেছে তারা। লোকাল অথরিটি খুঁজছে দুজনকে। এ অবস্থায় স্বর্গভূমি থেকে বাংলাদেশ এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু ঝামেলা আছে সেখানেও।
স্বর্গভূমি ও বাংলাদেশের মাঝে আছে চীনের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। অনুমতি ছাড়া বৃহত্তর চীনের বাইরে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ হাইব্রিডার্সদের জন্য।
মোটকথা, এক ফ্লাইটেই বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আকাশসীমা আইনকে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে এরা।

“শোনো, তোমার পরিচিত ছেলেটা?”

লিফটের লাইনে দাড়ানো এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মমকে। কৌতূহলী মহিলা বেশ অনেক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল ওদেরকে। শুধু উনি কেন, আরো অনেকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আর এটাই মমর অস্বস্তির কারণ। মহিলার ফিসফিসানো কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না মম হুট করে। তাই কপাল কুঁচকে তাকালো সে।

“জ্বি?”

“ঐযে তোমার পাশের লম্বা ছেলেটা। কি হয়েছে ওর? এরকম চোখ মুখ ঢেকে রেখেছে কেন?”

মহিলার প্রশ্নের উত্তরে একপলক মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে মম বললো,

“অসুস্থ।”

“ওহ্! কি হয়েছে?”

“ইনফেকশন।”

“ওহ্, তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছো বুঝি?”

মাথা নেড়ে সায় জানালো মম। কথা বাড়াতে চাইলো না সে। কিন্তু মহিলার সে উদ্দেশ্য নেই। উনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয় ছেলেটা তোমার?”

মহিলার কথা শুনে তার দিকে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইলো মম। কি বলবে ভেবে পেল না সে। মহিলা তখনও উত্তরের অপেক্ষা করছেন অধির আগ্রহে। না পারতে মম বলে উঠলো,

“ভাই।”

মমর উত্তর শুনে হাসি ফুটে উঠলো মহিলার চেহারায়। ঠিক ওনার মনমত উত্তরই পেয়েছেন উনি। স্মিত হেসে উনি বললেন,

“এত লম্বা চওড়া ছেলে আজকাল দেখা যায়না। আমার বড় মেয়েটার জন্যে ছেলে খুজছি। আমার মেয়েটাও লম্বা। ৫ ফুট ৮। কিন্তু লম্বা ছেলে পাচ্ছিনা। তোমার ভাইয়ের কি বিয়ে শাদী হয়েছে?”

মহিলা যে সহজে থামবেন না সেটা বুঝতে পারলো মম। কথা কোনদিকে আগাতে পারে বোঝা হয়ে গেছে তার। তাই এবার সে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বললো,

“জ্বি হয়েছে। তিনটা। তিন নম্বর বউয়ের ডেলিভারি আজকে। দোতলার কেবিনে আছে। বাকি দুই বউ এসে চুলোচুলি করে নাক ফাটিয়ে দিয়ে গেছে দুদিন আগে। সেই থেকেই তো ইনফেকশনটা হলো!”

মমর এহেন কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেলেন মহিলা। একবার মম তো আরেকবার মুহূর্তের দিকে তাকালেন অবাক হয়ে।

“বুঝলেন আন্টি, ভাইটার আমার কপালটাই খারাপ। একটা বউও ভালো পরেনি। ভাবছি, এবার বিয়ে করানোর আগে বাড়িতে এনে আগে কদিন লিভ টুগেদার করাবো মেয়েকে। যদি দেখি মেয়ে সাংসারিক, মানিয়ে নিতে পারছে, তাহলেই কথা আগে বাড়ানো হবে, নইলে ক্যান্সেল।”

মমর কথা শুনে চোখমুখ কুচকে তাকালেন মহিলা। মেয়েটা তার সাথে মজা করছে কিনা, সেটা বুঝতে না পারলেও, মনে মনে তাকে বেয়াদব উপাধি দিয়ে দিলেন। মুখে আর কিছু না বললেও, দৃষ্টি দেখে সেটা ঠিক স্পষ্ট বোঝা গেল। মম সেটা বুঝেও, আবার প্রশ্ন করলো,

“আপনার মেয়েটা কি সাংসারিক আন্টি?”

মহিলা কোন উত্তর না দিয়ে উল্টো ঘুরে চলে গেলেন কিছুটা দূরত্বে। হাসি পেল মমর মহিলাকে বিব্রত করতে পেরে। ঠোঁট চেপে রেখে হাসি আটকালো সে। লিফটও এসে পড়েছে ততক্ষণে। ওরা চারজনই উঠে গেল। ধীরে সুস্থে প্রতি এক ফ্লোর পরপর থেমে, লিফট অবশেষে পৌঁছালো এগারো তলায়। ওরা চারজন ছাড়া আর কেউ নামার নেই। প্রাইভেট ফ্লোর এটা। খুব বেশি লোকজন দেখা যায়না এখানে।

লিফট থেকে বের হয়ে এসে নিচু গলায় মুহূর্ত মমকে বললো,

“আমি কিন্তু সব শুনেছি।”

শিউরে উঠলো মম ওর ভারী কর্কশ কন্ঠ শুনে। এখনো অভ্যস্ত হয়নি সে এই রুক্ষ কর্কশ কণ্ঠস্বরে। কি বলছে সে বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মম।

“আমি ঐ মহিলার মেয়েকে বিয়ে করবো না মোমো।”

রাশভারী গলায় বলে উঠলো মুহূর্ত। কি বিষয়ে কথা হচ্ছে বুঝতে পেরে মাথা নেড়ে মম জানালো,

“ঐ মহিলার মেয়েও আপনাকে বিয়ে করবে না। আর আমার নাম মম, মোমো না।”

বলেই দ্রুত পা চালিয়ে কেবিনের দিকে চলে গেল মম। সাড়া সকাল এদের দেখতে দেখতে, ভয় কমে এসেছে তার। এখন কিছুটা বিরক্ত সে শুধু। সকাল থেকে মমর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে গেছে মুহূর্ত। এই প্রথম সফল সে। মোমোটা কথা বলেছে তার সাথে! সেই বিজয়ের আনন্দে মাস্কের আড়ালে হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে।

দরজা খুলে কেবিনের ভেতরে ঢুকে মম দেখলো, ঝিনুক বসে আছে মামুন সাহেবের বেডের পাশে। পাখিকে ঘোস্ট ও মুহূর্তসহ ঢুকতে দেখে ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়লো ঝিনুকের। মমর উদ্দেশ্যে সে জিজ্ঞেস করলো,

“এরা কারা?”

মম বুঝতে পারলো না কি উত্তর দেবে সে। পাখির দিকে আড়চোখে তাকালো সে অস্বস্তিতে। কিন্তু পাখির কোন ভাবান্তর নেই। যেন সে দেখেইনি ঝিনুককে। ঘোস্টের চেয়ারটা একপাশে রেখে সে এগিয়ে গেল বাবার দিকে। ওপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেইল নার্সটিকে সে জিজ্ঞেস করলো,

“বাবার কি অবস্থা এখন?”

“ডাক্তার এসে সকালে চেকাপ করে গেছে ম্যাডাম। স্যুপ খেয়ে একটু আগে ঘুমিয়েছেন।”

“মেডিসিন?”

“জ্বি, দিয়েছি।”

ক্লান্ত দেখাচ্ছে মামুন সাহেবকে। জীবনের ভারে ক্লান্ত উনি। স্ত্রী মারা যাবার পর বহু কষ্টে মেয়েদের একটু একটু করে বড় করেছেন কাঁপা হাতে। আর কত!

“তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি মম। শুনতে পাসনি?”

গলার স্বর কঠিন করে জিজ্ঞেস করলো ঝিনুক এবার। মম আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই পাখি শান্ত স্বরে জানালো,

“ওরা আমার পরিচিত।”

চোখমুখ শক্ত করে ঝিনুক ফিরে তাকালো পাখির দিকে। তারপর আবারো ঘুরে মমকে গলা চড়িয়ে বললো,

“বাড়ি হাসপাতাল সব জায়গায় নাটক শুরু করেছিস? তোরও উচ্ছন্নে যাবার শখ জেগেছে? কথা নেই, বার্তা নেই, বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় না কোথায় যার তার সাথে চলে যাস! পেয়েছিসটা কি?”

মেজাজ খারাপ হলো মমর। বাবার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখলো, ঘুমের মধ্যে সামান্য কেঁপে উঠেছেন উনি। ঝিনুকের কি বিবেক বুদ্ধি সব গেছে? সে দেখছে না বাবা অসুস্থ। এখানে এসব নিয়ে ক্যাচাল করাটা কি খুব জরুরি?

মম কিছু বলবে ঝিনুককে, তার আগেই পাখি ঝিনুকের এক বাহু চেপে ধরে ওকে কেবিনের বাইরে নিয়ে গেল। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল মমর। পাখিকে একদম শান্ত দেখালেও, ভয় পেল সে। ছুটে গেল তাদের পেছনে পেছনে।

“নাটক কে করছে ঝিনুক? যার তার সাথে বলতে কাকে বুঝাচ্ছিস? কে কি পেয়েছে শুনি একটু।”

কেবিনের বাইরে এনে ঝিনুককে প্রশ্ন করলো পাখি। কেবিনের বাইরে খালি করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। পেছনে তাকিয়ে মম দেখলো ভেতরে থাকা মেইল নার্সটা উঁকি দিচ্ছে খোলা দরজা দিয়ে। হাইব্রিডার্স দুজন কোথায় তাকিয়ে আছে তা বোঝার উপায় নেই, তবে ঘাড় দুটো এদিকেই ঘুরিয়ে রেখেছে তারা। মম বুঝলো আজ ভালো একটা ঝামেলা হবে পাখি ও ঝিনুকের মাঝে। সে চাইলো না, বাইরের কেউ এসব দেখুক। দরজাটা বন্ধ করে দিল সে বাইরে থেকে।

“সেটা তো তুমি বলো। নিজেকে কি মনে করো তুমি? যখন যা খুশি তাই করছো! আজ সকালে আমার বাড়িতে এক ট্রাক পঁচা ডিম পাঠিয়েছ কোন সাহসে? জোর করে সব ডিম বাড়ির ভেতরে রেখে গেছে তোমার লোকেরা। দুর্গন্ধে টিকতে পারছি না। তোমার কোন ধারণা আছে কি পরিস্থিতি সেখানে?”

অবাক হয়ে একপলক তাকালো মম পাখির দিকে। এসব আবার পাখি কখন করলো!

“আমি তো বেছে বেছে ভালো ডিমই পাঠিয়েছিলাম। তোর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পচে গেল কীকরে, বুঝলাম না!”

পাখি বুকের উপর দুহাত ভাঁজ করে দাঁড়ালো। চেহারায় একটা ভাবুক ভঙ্গি এনে সেকেন্ড কয়েক পর সে বলে উঠলো,

“ওহ্! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। সেখানকার লোকগুলোর তো ভেতরটাই পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত। সেজন্যেই হয়ত ডিমগুলোও পচে গেছে।”

তেঁতে উঠলো ঝিনুক। ঝাঁঝালো কণ্ঠে সে কিড়মিড় করে বললো,

“আমার বাড়ির লোকগুলো পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত? আর তুমি? তুমি খুব সাধু, তাইনা? তোমার কীর্তি কারখানার দুর্গন্ধ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা দেখছ না? বাবার এই অবস্থা আজ কার জন্যে? কার কারণে বাড়িতে হামলা হয়েছে? সবকিছুর জন্য দায়ী তুমি! এত কিছুর পরও বড় গলায় কথা বলতে লজ্জা করছে না তোমার?”

বাবার অসুস্থতার কথা টেনে আনায় রাগ উঠে গেল মমর।
স্ত্রী মারা যাবার পরপরই মামুন সাহেবের স্নায়বিক রোগটা ধরা পড়ে। হাঁটাচলা ধীর হয়। শরীরের কাঁপন ও ভারসাম্যহীনতার কারণে দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মগুলোই করা কষ্টকর হয়ে পড়ে তার জন্যে। সেসময় পাখি হয়েছিল বাবার লাঠি। ছোট দুবোনের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট পাখি। নিজের শৈশব বিসর্জন দিয়ে তাদের পরিবারটাকে আগলে রেখেছে। কত শত ছোট ছোট শখ আহ্লাদ ভুলে গেছে হাসতে হাসতে!
সেই পাখিকে এখন বাবার অবস্থার অবনতির জন্যে দায়ী করা কি উচিত? সব দায় কি তার একার?

“নাহ্! একদম করছে না। একটু নির্লজ্জ না হলে, পৃথিবীতে টেকা খুব মুশকিল। যেমন, নিজের কথাই ধর !”
ঝিনুকের কথায় মম রেগে গেলেও, শান্ত রইলো পাখি। মুচকি হেসে সে ঝিনুককে বললো,
“নির্লজ্জের মত তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমার কাছ থেকে সব সুযোগ সুবিধা হাত পেতে নিয়েছে। আর তুই আরেক নির্লজ্জ, আমার করা সব উপকার ভুলে, আমার দিকেই থু থু ছিটাচ্ছিস। কত বড় নির্লজ্জ তুই, যে আমার করা উপকারকে নিজের প্রাপ্য ধরে নিয়েছিস।”

“কিসের এত বড়াই তোমার? টাকার গরম দেখাও আমাকে? কে চেয়েছে তোমার টাকা? আমি চেয়েছি? কে বলেছে তোমাকে উপকার করতে? আসলে টাকা ছিটিয়ে মানুষকে নিজের আনুগত্যে রাখতে চাও বলেই, এসব করেছো। আমার ভালোর জন্য করোনি কিছু! নিজের স্বার্থে করেছো!”

এবার আর চুপ থাকতে পারলো না মম। পাশ থেকে কটাক্ষের সুরে বলে উঠলো,

“তাই নাকি ঝিনুক আপু? তোমার কোন স্বার্থ নেই, না? তোমার চাকরির জন্য যে ত্রিশ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল, সেটা কোথা থেকে এসেছিল, বলো তো?
গত কোরবানেও যে বাবাকে বললে, তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হবে। শুধু তাই না, নিজের জায়ের সাথে পাল্লা দিতে বাবার কাছে আবদার করলে, জামাইকে আস্ত খাসির রেজালা করে খাওয়ানো চাই। নইলে নাকি তোমার সম্মান থাকবে না। তখন স্বার্থটা কার ছিল, বলো? বাবার অসুস্থতার জন্য তুমি আপুকে দায়ী করছো। অথচ, নিত্যনতুন এসব আবদার করে তুমি নিজেই বাবাকে মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছো। একবার ভেবে দেখেছো, আমাদের অসুস্থ বাবা এসব কীকরে যোগাড় করবে? টাকাটা আসবে কোথা থেকে বা আয়োজন করতে খাটাখাটনিটা কে করবে?
কিন্তু তুমি ভাবোই নি। কারণ তোমার আবদারগুলো বাবার কাছে ছিলনা, বরং ইন্ডাইরেক্টলি আপুর কাছে ছিল। তুমি জানতে, আপুর কানে কথা গেলে, সে বিনাবাক্যে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে। সুযোগ নিয়েছি তুমি ঠিকই। কিন্তু ঝিনুক আপু, একবার বাবার মনের অবস্থার কথা ভেবেছো তুমি? তোমার এসব আবদার পূরণে নিজেকে অক্ষম ভেবে, যে কষ্টটা সে পেয়েছে, সেটা চোখে পড়েনি কেন তোমার?”

“বড্ড বেড়েছিস তুই মম! বড়দের মাঝে কথা বলতে তোকে কে বলেছে?”

মমকে চোখ পাকিয়ে ধমকে উঠলো ঝিনুক। আরো কয়েকটা কথা বড়দের মাঝে বলার ইচ্ছে ছিল মমর। তবে পাখির ইশারায় থেমে গেল সে। পাখি গলার স্বর তীক্ষ্ম করে এবার বললো,

“আমি বলেছি। বড়রা ভুল কথা বললে, চুপ না থেকে প্রতিবাদ করতে বলেছি। তোকেও শিখিয়েছিলাম, কিন্তু তুই সেসব ভুলে গেছিস।”

“আপু, তুমি কিন্তু…”

“যা আমিও সব ভুলে গেলাম। তুই মানসম্মানওয়ালী মানুষ হয়েছিস এখন, আমার কাজ কারবারে লজ্জা পাস। ঠিকাছে।
এখন থেকে আর আমার জন্য তোর লজ্জিত হতে হবে না। টাকার গরম এখন থেকে আমি নিজের কাছেই রাখলাম নয়ত। আমাকে কোথাও বোন হিসেবে পরিচয় দিসনা আর।
এখন তোর মানসম্মান নিয়ে তুই বিদায় হ। অনেক তামাশা করেছিস। আর চাচ্ছি না আমি।”

“আমি তামাশা করছি নাকি তুমি….”

“আমাকে তুই খুব ভালো করে চিনিস ঝিনুক। ভালো ব্যবহার করছি, মেনে নে। চুপচাপ কেটে পড় এখান থেকে।”

“তোমার কথায় তো আমি যাবো না। ভুলে যেওনা, বাবা যতটা তোমার, ততটা আমারও।”

পাখি আর কিছু বললো না ঝিনুককে। মাথা নেড়ে ঝিনুকের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
মম বিরক্তি নিয়ে ঝিনুককে বললো,

“বাবা অসুস্থ আপু! এখানে এই মুহূর্তে ঝগড়া করাটা কি খুব জরুরি?”

“আমি ঝগড়া করছি? নাকি তুই আর তোর বোন মিলে সিনক্রিয়েট করছিস? শুরুটা তো তোর বোনই….”

বলতে বলতে থেমে গেল ঝিনুক। মমও চমকে উঠলো। করিডোরে থাকা ময়লা পানির বালতিটা ঝিনুকের মাথায় ঢেলে দিয়েছে পাখি।
খালি বালতিটা একদিকে ছুঁড়ে ফেলে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পাখি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,

“শেষটাও আমিই করলাম। আরো থাকবি এখানে?”

রাগে দুঃখে কাঁপছে ভেজা ঝিনুক। চোখে পানি চলে এসেছে তার। এরকম ব্যবহার আগে কখনো করেনি পাখি তার সাথে। মমও তাকিয়ে আছে হতভম্ব হয়ে।
ঝিনুক আর কিছু বললো না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। সেদিকে তাকিয়ে পাখি মমকে বললো,

“এভাবেই জীবন থেকে ফালতু মানুষগুলোকে ধুয়ে ফেলতে হয়, বুঝলি?”

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৬

ফার্মেসীর সামনে মানুষের ভীড় জমে আছে। সবাই হাতে প্রেসক্রিপশন নিয়ে অপেক্ষা করছে। কাঁচের কাউন্টারের ওপর পাশে তিনজন লোক ব্যস্ত হাতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাক্স খোলা, স্ট্রিপ গোনা, বিল লেখা, সব চলছে একসাথে।
ভীড় ঠেলে ভেতরের লোকগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে মম। হাতে প্রেসক্রিপশন। মাস্কের আড়ালে মুহূর্ত চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে সেদিকে।

কিছুক্ষন আগেই নার্স এসে জানায়, মামুন সাহেবের জন্যে বাইরে থেকে একটা মেডিসিন আনানো প্রয়োজন। পাখি তখন ফোনে ব্যস্ত। মম নিজে গিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলে, মুহুর্তও রওনা দেয় তার পিছু পিছু। মানা করলেও, পাত্তা দেয়নি সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, মোমোটার কথা মেনে নিলেই বোধহয় ভালো হতো।

জঘন্য পরিবেশ এখানকার। হাসপাতাল থেকে বেরোতেই বিশাল বড় এক ময়লার স্তুপের সামনে পড়েছে তারা। মুহুর্তের অত্যধিক সংবেদনশীল নাকে তীব্রভাবে হানা দেয় সে দুর্গন্ধ। কোনমতে পা চালিয়ে সেটা পার হয়ে এসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার আগেই যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া এসে আঘাত করে ফুসফুসে।
কোথায় স্বর্গভূমির নির্মল, বিশুদ্ধ বাতাস, আর কোথায় ঢাকা শহরের দূষিত বায়ু!

ফুটপাত ধরে একটু এগোতেই রাস্তার পাশে দেখা যায় কিছু খাবারের দোকান। পঁচা-গলা খাবারের দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার যোগাড় মুহূর্তের। তার সাথে আবার মিশে আছে অত্যধিক মশলাযুক্ত খাবারের গন্ধও। ছোট খুপড়ির মত দোকানগুলোর সামনে ময়লা নোংরা পানি ও উচ্ছিষ্টের ঢের। সেখানে ঘুরঘুর করছে কয়েকটা কুকুর। পোকা মাকড় ও মাছি ভনভন করছে দোকানের সামনে সাজানো খোলা খাবারের উপর। হতভম্ব হয়ে দেখে মুহুর্ত, এসব দোকানের ভেতরেও মানুষের ভীড় লেগে আছে। মানুষরা টাকা দিয়ে কিনে খাচ্ছে এসব খাবার!

“ভাইজান কি দিমু? খাইবেন না লইয়া যাইবেন? পার্সেল দিমু?”

দোকানের সামনে দিয়ে ভীড় ঠেলে আসার সময় একটা ছেলে জিজ্ঞেস করে মুহূর্তকে। মুহূর্ত চশমার আড়াল থেকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বোঝায়। ছেলেটা সাথে সাথে অন্য আরেকজন লোককে ধরে দোকানের ভেতরে নিয়ে বসায়। ঘামে ভেজা হাতটা পশ্চাৎদেশে জড়ানো নোংরা গামছাটায় মুছে, সেই হাত দিয়ে একটা হাফপ্লেট ধরে গরম ভাতের পাতিলে ঢুকিয়ে দিলো ছেলেটা।

মুহূর্ত আর দাঁড়ালো না। চলে এলো মমর পিছু পিছু। কিছুদূর হেঁটে এসে রাস্তা পার হয়ে ফার্মেসিতে পৌঁছালো তারা। সেখানে এসে আরো বেশি অস্বস্তিতে পড়ে গেল সে। বিভিন্ন ধরনের ঔষধ ও কেমিক্যালের গন্ধটা হাসপাতালের চাইতেও এখানে বেশি তীব্রতর। সেই সাথে বাতাসে ছড়িয়ে আছে ফিনাইল ও অ্যালকোহলের স্মেল।
হুট করেই চোখের সামনে ঝাপসা দেখতে শুরু করলো মুহূর্ত। কানে বাড়ি দেওয়া আশপাশের তীক্ষ্ম শব্দগুলো মিলিয়ে একটা যন্ত্রণাদায়ক বিপবিপ শব্দ মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো পুরোনো কিছু স্মৃতি।

সংকীর্ণ, ঠান্ডা, অন্ধকার কুঠরিতে জ্বলে ওঠা আবছা লাল আলো।
মোটা লোহার শেকলের ঝনঝন শব্দ।
দেওয়ালে লেগে থাকা শুকনো রক্তের দাগ।
সিরিঞ্জের সূচালো ধাতব সূচ বেয়ে গড়িয়ে পরা তরল।
মাথার উপর জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল সার্জিক্যাল লাইট।
তাজা রক্তে ভেজা সাদা গ্লাভসে আবৃত হাত।

শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসে মুহূর্তের। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা ঘাম। বাম হাতটা কাঁপছে মৃদু। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। যেন কেউ তুলো গুঁজে দিয়েছে সেখানে। অতীত ও বর্তমানের মাঝে আটকে যাচ্ছে সে। বারকয়েক চোখের পলক ফেলে দৃষ্টির ভ্রম দূর করার চেষ্টা করলো মুহূর্ত। সামনে দোকানের ভীড় ঘুরছে।
নাহ্, মাথাটা ঘুরছে তার। গলা থেকে একটা চাপা গর্জন বেরিয়ে আসতে চাইছে হিংস্র হুংকার হয়ে। কিন্তু না। মানুষের ভিড়ে নিজেকে সামলাতে হবে। পইপই করে বলে দিয়েছে পাখি, বাইরে মানুষের সামনে যেন কথাও না বলে, গর্জে ওঠা তো দূরের বিষয়। তাদের রুক্ষ, ভারী কন্ঠস্বর মানুষদের চাইতে আলাদা। কথা বললে, ধরা পড়ে যাবার সম্ভবনা বাড়বে বৈ কমবে না।

কয়েক কদম পিছিয়ে গেল মুহূর্ত। ফুটপাতের এক কিনারে এসে থামলো। গলা থেকে গরগর শব্দ বের হচ্ছে তার। জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেবার চেষ্টা করছে সে। পাশে থাকা লোহার রড দিয়ে বানানো গেটটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরলো। হাতের চাপে রড বেঁকে যাচ্ছে, কিন্তু ছাড়লো না মুহূর্ত। ঘাড়টা কাত করে উপরের খোলা আকাশের দিকে তাকালো সে। মাথার উপর প্রকাণ্ড সূর্যটা আলো ছড়াচ্ছে পূর্ণ তেজে। অন্ধকারে অভ্যস্ত সংবেদনশীল চোখজোড়ায় জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে সে আলো। তবুও চোখ ফেরালো না মুহূর্ত। এই জ্বলন তাকে মনে করায়, মুক্ত সে এখন।

“শুনছেন? আপনি ঠিক আছেন?”

কোমল চিন্তিত কন্ঠস্বর মুহূর্তের কানে ভেসে এলো। সেই সাথে নাকে এসে ঠেকলো খুব ক্ষীণ হালকা নোনা এক সুবাস। খুব পরিচিত না হলেও, অল্প সময়েই তার মনে গেঁথে গেছে এই সুবাসটা। ঠোঁটজোড়া ঈষৎ ফাঁক করে গভীরভাবে শ্বাস নিলো সে। এতসব বিষাক্ত, ধোঁয়াশে দুর্গন্ধের ভিড়ে সূক্ষ্ম সে ঘ্রাণটায় মনোনিবেশ করলো সে শুধু।

ভ্রু কুঁচকে চিন্তিত চোখে তাকিয়ে আছে মম মুহূর্তের দিকে। দোকানের ভীড় ঠেলে মেডিসিন কেনার পর মুহূর্তকে আর সেখানে দেখতে পায়না সে। এক সেকেন্ডের জন্য বুকটা ধ্বক করে ওঠে মমর। কোথায় যেতে পারে মুহূর্ত ভেবেই আত্মা শুকিয়ে আসে। চারদিকে নজর ঘুরিয়ে তাকাতেই অবশ্য দেখা মেলে পুরুষটির। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে মম তার দিকে। ফুটপাতের একটু নিরিবিলি জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। কাছাকাছি আসতেই মমর মনে হয়, কিছু একটা গড়বড় আছে। কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকে লোকটার ভাবভঙ্গি। এই কড়া রোদে আকাশের দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে আছে ঘাড় বেঁকে। মৃদু গরগর আওয়াজ বের করছে থেমে থেমে।

“কি হয়েছে? এভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”

ঘাড় নামিয়ে মমর দিকে তাকালো মুহূর্ত। মাস্ক ও রোদ চশমার আড়ালে বোঝা যাচ্ছে না তার অভিব্যক্তি। চিন্তিত চোখে তাকিয়ে মম যখন উত্তরের অপেক্ষা করছে ঠিক তখনই, অকস্মাৎ ওর বাহু ধরে টেনে ওকে নিজের একদম কাছে নিয়ে এলো সে। চকিত মমর দুহাত গিয়ে ঠেকলো তার প্রশস্ত বুকে। বিস্ময়ের রেশ কাটবার আগেই, আরেকবার ঝটকা খেল সে। অনুভব করলো মাথাটা ঝুঁকিয়ে এনে তার গলার কাছে নাক ঠেকিয়েছে সে।

“তোমার ঘ্রাণটা অনেক সুন্দর। একদম সমুদ্রের হালকা নোনাধরা হওয়ার মত। মুক্ত, উষ্ণ, প্রশান্তির গন্ধ।”

নিচু স্বরে, ঘোর লাগানো নেশাক্ত কণ্ঠে বললো সে। মূর্তির মত জমে গেল মম। মাস্কের পাতলা আবরণ ভেদ করে তার গরম নিশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে মমর ঘাড়ের উন্মুক্ত ত্বক। উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে জায়গাটায়। অজানা এক অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেল অষ্টাদশীর কোমল কায়া জুড়ে।

“আপ- আ….পনি ঠিক আছেন?”

কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো মম। গলাটলা শুকিয়ে আসছে তার হঠাৎ। মুহূর্তকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলেও, হাতে খুব একটা বল পেল না সে। তার কোমল হাতের মৃদু ধাক্কা মুহূর্ত খেয়ালই করলো না।

“মুহূর্ত।”

মমর কানের কাছে ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো সে শব্দটা।

“হুম?”

“আমার নাম।”

“জানি।”

জানে? হ্যাঁ, জানারই তো কথা। তবে কেন সে ডাকে না তাকে? কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো মুহূর্তের। তবে কি নামটা পছন্দ হয়নি মোমোটার? সেজন্যেই ডাকে না?

“মুক্ত হবার আগে আমাদের কোন নাম ছিলনা। নাম তো মানুষের হয়। ওরা আমাদের মানুষ মনে করেনি কখনো মোমো, হতে দেয়নি মানুষ।”

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মম মুহূর্তের দিকে। রোদ চশমার আড়ালে থাকা ঐ মধুরঙা চোখগুলোকে নিজের অজান্তেই দেখতে ইচ্ছে করছে তার।

“মুক্তির পর আমরা নিজেরাই নিজেদের নাম রেখেছি, জানো?”

সংকোচ নিয়ে মাথাটা সামান্য নাড়লো মেয়েটা। বোঝালো জানে সে। শুনেছে পাখির কাছে। শিনহোতে বন্দী থাকাকালীন ওদেরকে দেওয়া হত শুধু একটা নম্বর। কারো নাম ছিল না।
নাম মানুষের নিজস্বতা বহন করে। নামের সাথে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্নেহ, সম্মান, আশা, স্মৃতি। এ পৃথিবীতে সবচেয়ে শূন্য, ব্যর্থ, খারাপ মানুষটারও একটা নাম থাকে। কিন্তু সেটুকুর অধিকারও দেয়া হয়নি হাইব্রিডার্সদের বন্দীদশায়।
মুক্ত হবার পর নিজেরা নিজেদের পছন্দ মত নাম বেছে নেয় ওরা। যেই শব্দ দিয়ে ইচ্ছা, অনুভূতি, ভালোলাগা, কিংবা মন্দলাগা প্রকাশ করা যায়, প্রকাশ করা যায় নিজেকে, সেটাই নাম হিসেবে বেছে নেয় ওরা।

“আমার বিশ্বাস হয়নি, আমরা মুক্ত হয়েছি। মনে হয়েছে, এটাও কোন নতুন এক্সপেরিমেন্ট। শিনহোর নতুন কোন খেলা। আমি ভাবতাম, ওরা যেকোন সময় আবার আমাদের শেকল পরিয়ে পরীক্ষাগারে ঢোকাবে। মুক্তির এই ছলনা শেষ হবে নিমিষেই।
হাতে ছিল, তো শুধু কিছুটা সময়, কয়েকটা মুহূর্ত।”

গমগমে গলায় কথাটা বললো সে। হঠাৎ করেই মনটা খারাপ হয়ে গেল মমর। একটু একটু কষ্ট অনুভব করছে সে হৃদয়ে। মুহূর্ত একটু থেমে আবারো বললো,

“আমি সেই প্রতিটা মুহূর্তে বাঁচতে চেয়েছিলাম, উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। সেই সাথে এটাও স্মরণে রাখতে চেয়েছিলাম, সময় ক্ষীণ। হাতে আছে, তো কেবলই এই মুহূর্ত।
না অতীতের স্মৃতি, না ভবিষ্যতের ভয়, জীবন তো এই মুহূর্তেই।”

মম তাকিয়ে রয় তার দিকে। কল্পনা করে নেয় তার রুক্ষ চেহারায় গভীর বেদনার ছাপ। ঠিক যার ধ্বনি সে উপলব্ধি করছে তার শব্দে।

“সেজন্যেই আমি এই শব্দটাকে বেছে নিয়েছিলাম নিজের জন্যে। বুঝতে পেরেছো?”

মম মাথা নাড়ে আবারো। জানায় বুঝেছে সে।

“তাহলে বলো, মু-হূ-র্ত।”

ঝুঁকে এসে দাবি জানায় সে। মমর দুই বাহু এখনো ধরে রেখেছে মুহূর্ত। দুজনার মধ্যে কিঞ্চিৎ মাত্র দূরত্ব।
শুকিয়ে থাকা ঠোঁটজোড়া জিভের ডগা ছুঁইয়ে ভিজিয়ে নিয়ে মম মৃদু স্বরে উচ্চারণ করে,

“মুহূর্ত!”

রোদের তেজকে উপেক্ষা করে ঠিক সে সময়টাতেই শীতলতা ছড়িয়ে দিয়ে যায় দিগন্ত কাঁপানো দখিনা হাওয়া।
চাপা স্বরের গভীর এক সন্তুষ্টির আওয়াজ ভেসে আসে মুহূর্তের বুক থেকে। সে আওয়াজের কম্পন নিজের হাতজোড়ার নীচে অনুভব করতে পারে মম। তৎক্ষণাৎ সেদিকে চোখ চলে যায় তার। ক্ষণেই মুহূর্তের বুকের গহীনের সে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে মমর সারা অঙ্গে। আঠারো বছরের জীবনে এই প্রথম তার অন্তর্লীন নারীসত্ত্বা নিজের উপস্থিতির জানান দেয়। চমকে উঠে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা।

মমর বাহুদ্বয় ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় মুহূর্ত। ডান হাতটা উঁচু করে মমর মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে সে বলে,

“গুড গার্ল।”

মম থমকে তাকিয়ে রয় আরো কিছুক্ষন। ছেলেটা এমনভাবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে যেন সে কোন পোষা বিড়ালছানা।

হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নেয় মম। সেই সাথে পরিষ্কার করে নেয় নিজের ধোঁয়াশে হয়ে থাকা মস্তিষ্ককে। হাত দুটো তড়িৎ গতিতে নামিয়ে আনে মুহূর্তের বুকের জমিন থেকে। উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে বলে,

“আমাদের যাওয়া উচিত এখন।”

এরপর আর অপেক্ষা করে না সে। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করে দেয় হাসপাতালের দিকে।

***

হাসপাতালে ফিরে লিফট থেকে নামতেই আবারো সেই নীরবতা ঘিরে ধরলো তাদের। ফাঁকা করিডোরে হালকা প্রতিধ্বনি তুলছে মমর পায়ের শব্দ। মুহূর্ত হাঁটছে একদম নিঃশব্দে। ভ্রু কুঁচকে তার পায়ের দিকে তাকায় মম। আশ্চর্য! এরকম আস্ত একটা জলহস্তীর আকারের লোক বিনা কোন শব্দছাড়া হাঁটে কীকরে? এতবড় শরীরটা কি হাওয়ায় ভাসিয়ে চলে নাকি?

তপ্ত শ্বাস ফেলে মম এগিয়ে যাচ্ছিলো কেবিনের দিকে।আচমকা, পাশ থেকে মুহূর্ত তার কব্জি চেপে ধরলো।
মম কিছু বোঝার আগেই এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনে সে। করিডোরের দেয়ালের সাথে চেপে ধরে তাকে। মমর পিঠ ঠেকেছে ঠান্ডা দেয়ালে, আর সামনে মুহূর্তের লম্বা দেহের ছায়া পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে তাকে।

বিরক্ত হয় মম। সেই সাথে রাগও ওঠে। সেসময় কিছু বলেনি বলে কি তাকে পেয়ে বসেছে? ভীষন বেয়াদব তো ছেলেটা! নাহ্, এবার তাকে দু চার কথা শুনিয়ে ছাড়বে সে।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে নিয়েছিল সে। কিন্তু তার আগেই মুহূর্ত এক আঙুল তুলে তার মুখের সামনে ধরে চুপ থাকার ইশারা করে। ঘাড় ঘুরিয়ে রেখেছে সে অন্যদিকে।

মুহূর্তের দৃষ্টি তখন ফাঁকা করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে স্থির। চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো সরু হয়ে এসেছে। মম কিছু বুঝতে পারছে না, তবে অনুভব করতে পারছে মুহূর্তের শরীরের টানটান সতর্ক ভাব।
কয়েক মিনিট কেটে যায় নীরবতায়।
মুহূর্তের দৃষ্টি যেখানে স্থির ছিল, সেখান থেকেই বেরিয়ে এলো দু’জন লোক। দৌড়ে এদিকেই আসছে তারা। মমর চোখজোড়ায় এসে ভিড় করলো বিস্ময় ও আতঙ্ক। কি হচ্ছে বোঝার সময়টাও পেল না সে।
সে শুধু শুনলো মুহূর্ত ফিসফিস করে বলছে,

“পেছনে থাকো।”

কথাটা শেষ হতেই সবকিছু চোখের পলকে একসাথে ঘটে গেল। লোকদুটোর হাতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো ধারালো কিছুর অস্তিত্ব। মমর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো ভয়ে। দেয়াল ধরে সিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
কিন্তু মুহূর্ত?
এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রথম লোকটার কব্জি চেপে ধরে নামমাত্র বল প্রয়োগ করে হাতটা বাঁকিয়ে দিলো। নিস্তব্ধ করিডোরে প্রচণ্ড শোনালো হাড় ভাঙার মৃদু শব্দ। সেই শব্দের রেশ কাটার আগেই লোকটার হাত মুড়িয়ে এনে তার গলার কাছে এক টান দিল মুহূর্ত। হাতে থাকা ধারালো ছুরির ফলা চিরে দিয়েছে অস্ত্রধারীর নিজেরই চামড়া। গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে। সেকেন্ড খানেকের মধ্যে মুখ থুবড়ে ফ্লোরে পরে গেল লোকটার মৃতদেহ।

দ্বিতীয়জন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। কাছাকাছি এসে পড়েছে সে। মুহূর্ত পা দিয়ে সজোরে লাথি মারলো লোকটার পেটে। লোকটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়লো পাশের দেয়ালে। পেট চেপে ধরে পড়ে রইলো ফ্লোরে।মুখ থেকে কাশির সাথে বেরিয়ে এলো রক্তের স্রোত। মুহূর্ত অলস পায়ে হেঁটে লোকটার কাছে গিয়ে টেনে তুললো তাকে। লোকটার মাথার একপাশ হাতের থাবায় খামচে ধরে, ওপর পাশটা সজোরে দেয়ালে বাড়ি মারলো সে। চুনপাথর খসে রক্ত ও মগজের সাথে মিশে সাদা দেয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

পুরো ঘটনাটা ঘটে গেছে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে। মমর মানব মস্তিষ্কের জন্যে এই সময়টা পর্যাপ্ত নয়। সে বুঝতেই পারলো না কি থেকে কি হয়ে গেল, কিভাবেই বা হলো। সে শুধু দেখলো একটা লোকের গলাকাটা লাশ পড়ে আছে সামনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সাদা টাইলসের ফ্লোর। কালো খয়েরী পিচ্ছিল তরল খুব বিচ্ছিরিভাবে ছিটিয়ে পড়েছে সাদা দেয়ালে। নিচে পড়ে আছে আরেকজনের নিথর দেহ। মাথাটা ফেটে বেরিয়ে আছে মগজের অংশবিশেষ।

এমন বিভৎস দৃশ্য জীবনে প্রথমবার দেখছে সে। থরথর করে কাঁপতে লাগলো মম। চোখজোড়া তার ছলছল করছে আতঙ্কে। পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে চাইছে। মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরলো সে। কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারলো না। ঝুঁকে পরে হরহর করে বমি করে দিল। কাশতে কাশতে গলা জ্বলছে তার। মাথাটা প্রচন্ড ঘুরছে। কতক্ষন এভাবে ঝুঁকে ছিল সে জানা নেই। একপর্যায়ে দূর্বল শরীরটা ভর ছেড়ে দিতে চাইলে, একটা বলিষ্ঠ পেশীবহুল হাত আঁকড়ে ধরে তাকে পাশ থেকে।

খানিকটা সময় পর মম ঘোলাটে দৃষ্টিতে দেখলো মুহূর্ত তাকে কোলে তুলে নিয়ে হাটা শুরু করেছে। মাথা তুলে তাকাতে পারছে না মম ঠিকভাবে। মনে হচ্ছে আবার বমি করে দেবে। মুহূর্তের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রইলো সে।

মুহূর্ত এক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। সতর্ক দৃষ্টি মেলে তাকালো চারদিকে। পেছনে ঘুরে লিফটের অপেক্ষা করা বোকামি হবে। এদের সাথীরা নিশ্চয়ই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ভবনে। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে।
করিডোরের শেষ মাথায় থাকা কেবিনটার দিকে তাকালো সে। ওখানে এখন কেউ নেই। অন্তত জীবিত কেউ নেই। রক্তের তীব্র গন্ধ হাসপাতালের ফিনাইলের গন্ধকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে। সাধারণ মানুষের নাকে সেটা ধরা না পড়লেও, সে করিডোরে পা রাখা মাত্রই বুঝতে পারে।

ইমার্জেন্সী ডোরটার দিকে চোখ পড়লো তার। বেরোবার সময়টাতেও সেখানে বড় একটা তালা ঝুলছিল। কিন্তু এখন নেই। দরজাটা ঠেলে মুহূর্ত ঢুকে পড়লো আধো আলো আঁধারে আবৃত গুমোট সিঁড়ির ঘরটায়। আবদ্ধ বাতাসে স্পষ্ট মিশে আছে কিছুক্ষন আগে এই পথে এগিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের উষ্ণ গন্ধ। সেটা অনুসরণ করে ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে নেমে যেতে থাকে মুহূর্ত।
মুহূর্তের কাঁধের কাছটা খামচে ধরে মম। এত দ্রুত গতিতে সে নামছে সিঁড়ি দিয়ে যে, মমর মনে হয় সে উপর থেকে শূন্যে পড়ে যাচ্ছে। আবারো গা গুলিয়ে এলো তার। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করতে থাকে মম। মুহূর্ত কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে, আপাতত সেই চিন্তা করার অবস্থায় নেই সে।

নামতে নামতে ছয় তলায় এসে মুহূর্ত টের পেল দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে গন্ধগুলো। উপরে দরজা খোলার মৃদু শব্দে বুঝলো মৃত মানুষগুলোর সাথীরা এসে গেছে। খোঁজ চালাচ্ছে তাদের। সময় নষ্ট না করে ছয় তলার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে মমকে নিয়ে। কিছুদূর গিয়ে দেখলো সামনেই লিফট। ভাগ্যক্রমে লাইনে দাড়াতেই খুলে গেল লিফটের দরজা।
মমকে কোলে নিয়ে দাড়ালো মুহূর্ত লিফটের ভেতর। লিফটে দাঁড়ানো লোকগুলো আড়চোখে দু একবার তাকালেও কিছু বললো না। এরকম দৃশ্য সচরাচর না দেখা গেলেও, একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা ধরে নিল, মেয়েটা নিশ্চয়ই অসুস্থ।

মমর ব্যাগের ভেতর ফোনটা বেজে উঠলো শব্দ করে। মুহূর্তের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সে সেটা ব্যাগ থেকে বের করে আনলো। হাতটা কাপছে মৃদু। সেটা উপেক্ষা করে বাজতে থাকা ফোনটা কানের কাছে ধরলো সে।

“হ্যালো?”

“মম! কোথায় তুই? মুহূর্ত কোথায়?”

ফোনের ওপর পাশ থেকে ভেসে এলো পাখির দুশ্চিন্তা মেশানো কন্ঠস্বর।

“আমি…”

“আমার কথা মন দিয়ে শোন। হাসপাতালের পাঁচ নম্বর গেটের বাইরে একটা এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। তুই মুহূর্তকে নিয়ে সোজা এদিকে চলে আয়। সাবধানে আসিস। আর ভুলেও হাসপাতালের ভেতরে ঢুকবি না। বুঝতে পারছিস আমার কথা?”

মমর উত্তরের অপেক্ষা না করে তাড়া দিয়ে বললো পাখি। মম একপলক তাকালো মুহূর্তের দিকে। কানে ধরে রাখা ফোনসহ মাথাটা গুঁজে রাখলো সে মুহূর্তের বুকে। তারপর ধীর কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে সে ফোনে জিজ্ঞেস করলো,

“ওরা কারা আপু?”

ওপাশে নেমে এলো নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড পর স্থির কণ্ঠে পাখি জানতে চাইলো,

“তুই কোথায় মম?”

“লিফটে।”

“মুহূর্ত আছে সাথে।”

“হুম।”

“গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে সোজা বাইরে চলে আয়। আমরা অপেক্ষা করছি।”

“বাবা?”

“বাবা ঠিক আছেন। চিন্তা করিস না। তুই আয় জলদি।”

ফোনটা কেটে গেল। শুকনো ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে নিয়ে মম মুহূর্তকে জানাতে চাইলো পাখির নির্দেশনা।

“আমাদেরকে….”

“শুনেছি।”

মমকে থামিয়ে দিয়ে ছোট্ট করে বললো সে। লিফট তখন দোতলা পার করে নীচে নেমে যাচ্ছে। ঝিমুতে থাকা লিফটম্যান ছাড়া আর কেউ নেই ভেতরে।

নীচ তলায় এসে লিফটের দরজা খুলতেই মমকে নিয়ে নেমে গেল মুহূর্ত। স্বাভাবিক গতিতে কদম ফেলে আগাচ্ছে সে। নেই কোন তাড়াহুড়ো।
হাসপাতালে ঢোকার পথে মূল এনট্রেন্সের পাশে বড় করে একটা ম্যাপ আঁকা আছে পুরো ভবনটার। সকালে পাখি গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢোকার সময়টাতেই সেটাতে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিল মুহূর্ত। তাই পাঁচ নম্বর গেটটা কোনদিকে, সেটা আর তাকে বলে দিতে হলো না।

দিনের আলোতেও এই দিকটা নির্জন। দু চারজন পরিচ্ছন্নকর্মী জটলা পাকিয়ে গল্প জুড়েছে গেটের কাছে। তাদের কৌতূহলী দৃষ্টিকে পার করে গেটের বাইরে বেরিয়ে এলো মম ও মুহূর্ত। সোজা কিছুদূরে দাঁড়ানো সাদা এম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে গেল দুজনে। কাছাকাছি যেতেই এম্বুলেন্সের পেছনের দরজাটা খুলে গেল। উদ্বিগ্ন পাখির চেহারা উকি দিল ভেতর থেকে। মমকে কোলে নিয়েই ভেতরে ঢুকে গেল মুহূর্ত। বসিয়ে দিল পাখির পাশে।

“আপু…”

বোনকে দুহাতে আগলে নিল পাখি। উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে আসা গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“মম! ঠিক আছিস তুই?”

মম মাথা নেড়ে বোঝালো সে ঠিক আছে। এম্বুলেন্সের ভেতরে ঘোস্টও আছে। সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে আছে দুজন অপরিচিত মানুষ। মুহূর্ত উঠে এসে দরজা বন্ধ করে দিতেই গাড়ি স্টার্ট হয়ে গেছে।

সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই নিজের ব্যক্তিগত সিকিউরিটি গার্ডদের এলার্ট করে দিয়েছিল পাখি। যেখানে কিছুদিন আগে তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে হাইব্রিডার্সদের জন্য ঘৃণা পোষণকারী হেটার্স গ্রুপ, সেখানে যে যেকোন সময়, যেকোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, সেটা আন্দাজে ছিল পাখির। তাই সাদা পোশাকে গার্ডদের হাসপাতালের ভেতরে ও আশেপাশে পাহারারত রেখেছিল।
পাখির ধারণাই সঠিক হয়েছে। মামুন সাহেবের উপর নজর রাখছিল ওরা। মম ও মুহূর্ত ঔষধ আনতে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষন পরপরই কেবিনে ঢুকে হামলা করে দুজন লোক। লিফটের কাছে পাহারায় ছিল বাকি দুজন। অচেতন মামুন সাহেবকে ঘোস্টের হুইলচেয়ারে বসিয়ে মেইল নার্সটিসহ ওরা পালিয়ে আসে ইমার্জেন্সী এক্সিট দিয়ে। একসাথে থাকা বিপজ্জনক, তাছাড়া মামুন সাহেবকে এভাবে টেনে নিয়ে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।তাই ছয় তলায় এসে নার্সের সাথে ওনাকে ভেতরে ঢুকে রোগীদের ভিড়ে লুকিয়ে পড়তে বলে পাখি। ওর গার্ডদের ইনফর্ম করে দিতেই মামুন সাহেবকে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় অন্যত্র। এদিকে সে ঘোস্টকে নিয়ে বেরিয়ে আসে পাঁচ নম্বর গেটের কাছে। সেখানে নির্দেশমত এম্বুলেন্স নিয়ে অপেক্ষায় ছিল দুজন গার্ড।

“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

প্লাস্টিকের বোতল থেকে ডকডক করে বেশ অনেকখানি মিনারেল ওয়াটার গলায় ঢেলে শান্ত হলো মম। গাড়ি ছুটে চলেছে ঢাকার রাস্তায়। তবে গন্তব্য কোথায়, সেটা অনিশ্চিত।

মমর প্রশ্নে পাখি তাকালো সামনে বসা ঘোস্টের দিকে। চশমা থাকলেও মাস্ক ও মাঙ্কি ক্যাপটা খুলে রেখেছে সে আপাতত। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তার। ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে মুখটা। টু শব্দটি মুখ থেকে বের না করলেও, ডান পাশের ক্ষতের জায়গাটা চেপে ধরে রেখেছে সে। খুব খারাপ ধকল যাচ্ছে তার অসুস্থ শরীরের উপর।

সিদ্ধান্ত পাখি নিয়ে ফেলেছে বহু আগেই, এখন শুধু তাতে অটল থাকার পালা। যে পথ সে নিজের জন্য বেছে নিয়েছে, সেটাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়স্থল।

মমর দিকে এবার শান্ত, অবিচল দৃষ্টিতে তাকালো পাখি। জানালো নিজেদের গন্তব্যের নাম।

“স্বর্গভূমি।”

***

চলবে…

শরতের কাশফুল পর্ব-৩+৪

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৩

রাতের গহীন অন্ধকারকে ভেদ করে নির্মল, শীতল আলো ছড়াচ্ছে রূপালী চাঁদ। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত সড়কে চলছে পায়ে ঠেলা রিকশাটা। তাল মিলিয়ে সাথে সাথে চলছে চাঁদটাও। আপুর হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে সেই চাঁদ দেখছে মম। একরাশ ক্লান্তি ঘিরে রেখেছে তাকে। একই সাথে এসেছে স্বস্তিও।

হাসপাতালে পাখিকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে মম। এতদিনের জমিয়ে রাখা অভিমান, অভিযোগ, আতঙ্ক, সব উগড়ে দেয় সে। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদে মেয়েটা। নাকের পানি, চোখের পানি এক করে কাঁদে ঠিক ছোটবেলার মত। প্রথমে পাখির সাথে অভিমান করে, এতদিন তাদের ছেড়ে দূরে দূরে থাকার কারণে। তারপর মান ভাঙলে ঝিনুকের নামে একগাদা বিচার দেয়। কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট উল্টে বলে, ঝিনুক একটুও ভালো না। তাকে এত্ত জোরে মেরেছে যে মনে হচ্ছে গালটাই থেতলে গেল!
সর্বোপরি সে কেঁদেছে বাবার অসুস্থতার জন্যে। অসহায়ত্বের মোটা মোটা অশ্রুকণা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তার। বাবা মানে মাথার উপর সেই বটবৃক্ষ, যে সব ঝড়, তুফান, সুনামী থেকে আগলে রেখেছে মেয়েদের। তার এই অবস্থা কি মেনে নেয়া যায়!

পাখি মনোযোগ দিয়ে শোনে ছোট বোনের অভিযোগগুলো। পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ঠিক ছোটবেলার মত। কোমল গলায় শান্ত হতে বলে তাকে, সান্ত্বনা দেয়। বলে যে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না।’
ব্যস! এই আশ্বাসটুকুই যথেষ্ট ছিল মমর জন্যে। গত নয়দিনে এই ভরসার হাতটাই খুঁজে বেরিয়েছে সে। ঝিনুকের বাড়িতে রাতের পর রাত জেগে থেকেছে। নিঃসঙ্গতা, দুশ্চিন্তা, আর হাহাকার গলা চেপে ধরেছে তার। কেউ জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছিস। কেউ মাথায় হাত রাখেনি, একটু সান্ত্বনা দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি। সবাই ধরেই নিয়েছে, পরিস্থিতি বোঝার মত যথেষ্ট বড় হয়েছে মম। তাকে মিছি মিছি সান্ত্বনা দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সব বুঝলেও, মাঝে মাঝে একটু সান্ত্বনার উষ্ণতাই যে বুকের ভেতরে জমা হতাশার বরফকে গলিয়ে আশা দিতে পারে, সেটা বুঝতে চায়নি কেউ।

মাঝখানে অল্প সময়ের জন্যে জ্ঞান ফিরেছিল মামুন সাহেবের। পাশ ফিরে পাখিকে দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলেন উনি। কিছুটা স্বস্তি ফুটে উঠেছিল চেহারায়, তবুও দৃষ্টিতে ছিল অসহায়ত্ব। কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না উনি। চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়ে দুফোঁটা অশ্রু। পাখি কোমল হাতে সে অশ্রুকণা মুছে দিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বলে তাকে। শুনে ঠোঁটের কোণটা সামান্য কেঁপে ওঠে ওনার। হালকা হাসার চেষ্টা করেন মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে।

এরমধ্যে একজন প্রবীণ ডাক্তার দেখতে আসেন মামুন সাহেবকে। এর আগে তাকে দেখেনি মম। তাকে ঘিরে অন্য ডাক্তারদের ব্যস্ততা ও আচরণ বলে দেয়, এই হাসপাতালের রেগুলার ডাক্তার নন উনি। পাখিই বিশেষভাবে ডেকে এনেছেন ওনাকে মামুন সাহেবের চেকআপের জন্যে।
ডাক্তারের সাথে আলাদাভাবে কথা বলে পাখি বাবার অবস্থা সম্পর্কে। দূর থেকে দেখে মম।

রাতে থাকার নিয়ম নেই হাসপাতালে। এতদিন মামুন সাহেবকে কর্তব্যরত নার্সদের ভরসায় ছেড়ে আসলেও, আজ একজন মেইল নার্সের ব্যবস্থা করেছে পাখি। সে-ই থাকবে রাতে পুরোটা সময় মামুন সাহেবের সাথে।

সবশেষে হাসপাতাল থেকে বের হয়েছে দু’বোন বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু মমরা যেখানে থাকতো সে বাড়ি এখনো বিদ্ধস্ত দশায় পরে আছে। তাই পাখির সাথে ওর বাড়িতেই যাচ্ছে মম।

মম ভেবেছিল, পাখি বোধহয় একগাদা বডিগার্ড নিয়ে, চকচকে কোন দামি গাড়িতে করে চলাফেরা করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে হাসপাতালের বাইরে বের হয়ে রিকশা ভাড়া করে সে। চোখে গগলস, মাথায় পেঁচানো স্কার্ফ আর মুখে লাগানো মাস্কের বদৌলতে পাখিকে চেনার উপায় নেই যদিও। হাসপাতালের লবিতে লাগানো টিভিতে পাখিকে নিয়েই আলোচনা চলছে। আর এই মেয়ে নিশ্চিন্তে সবার সামনে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসে হাসপাতাল থেকে।

মিনিট তিরিশেক পর রিকশাটা এসে থামে পাখির বাড়ির সামনে। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তারা।

“তুই দাড়া। আমি লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি।”

ফোনের টর্চ জ্বেলে পাখি তালা খুলে ভেতরে চলে যায়। মম দাঁড়িয়ে থাকে দরজার বাইরে। দরজা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে পুরোনো একতলা দালানটার দিকে ভালো করে নজর বুলায় মম।

এই সেই বাড়ি, প্রায় আট বছর আগে যেখানে নিজেদের ছোট্ট সংসার সাজিয়েছিল পাখি ও সৌবীর আজওয়াদ। হাতে গুনে তিনবার এসেছে এই বাড়িতে মম। প্রথমবার এসে দেখে গিয়েছিল পাখির ভালোবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ সংসার জীবন।
আর এরপর দু’বার এসেছিল তখন, যখন সৌবীর নিখোঁজ। বিদ্ধস্ত পাখি দরজার সামনে বসে থাকতো অপেক্ষায়। ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মামুন সাহেব। কিন্তু পাখি রাজি হয়নি। পাছে সৌবীর ফিরে এসে যদি তাকে না পায়, সেই ভয়ে!

কি পাগলামিটাই না করতো পাখি সৌবীরের জন্যে! একটা সময় পরে বাড়িটাতে এসে ঘুরে গেলেও, এখানে থাকতো না আর পাখি। স্মৃতিরা গলা চেপে ধরতো তার। পাখির অনুপস্থিতিতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোক ঠিক করে রাখা আছে। যার দরুন আজো এই বাড়ির প্রতিটি কোণা ঠিক আগের মতই রয়ে গেছে। প্রতিটি দেওয়াল আজো বহন করছে পাখি ও সৌবীরের ভালোবাসার চিহ্ন।

মমর ভাবনার মাঝেই হুট করে আলো জ্বলে উঠলো বাড়ির ভেতরে। অন্ধকারাচ্ছন্ন বাড়িটা প্রাণ ফিরে পেয়ে জেগে উঠলো পুনরায়। মম ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। চারপাশটা দেখতে দেখতে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো সে। ছিমছাম গোছানো ঠিক সাত বছর আগের মতই। সময়টা যেন থমকে গেছে এই বাড়ির ভেতর। পাখির নিজ হতে সাজানো সংসার, রয়ে গেছে সেভাবেই। সোফার ওপাশে দেওয়ালে আজও শোভা পাচ্ছে পাখি ও সৌবীরের বড় করে বাঁধাই করা ছবিটা। হুইলচেয়ারে বসা সৌবীরের পাশেই বসে আছে পাখি। দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে একরাশ মুগ্ধতা ও ভালোলাগা নিয়ে, ঠোঁটে লেগে আছে হাসি।

“মম, তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি অনলাইনে খাবার অর্ডার করে দিয়েছি। এসে পরবে এক্ষুনি। কাপড় চোপড় কিছু এনেছিস?”

পেছন থেকে এসে ডাক দিলো মমকে পাখি। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে মাথা নেড়ে না জানালো মম।

“আমার পুরোনো কিছু জামা কাপড় থাকার কথা আলমারিতে। চল, তোকে পড়ার মত কিছু খুঁজে দিচ্ছি।”

পাখি মমকে নিয়ে চলে গেল তার পুরনো শোবার ঘরটায়। সেখানে আলমারি খুঁজে একটা শুভ্র সাদা ও আকাশী রঙের মিশেল সালোয়ার কামিজ বের করে দিল তাকে। মম সেটা নিয়ে চলে যায় বাথরুমে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে পাখি একটা হলুদ রঙের কামিজ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে উল্টে পাল্টে দেখছে। মমকে আসতে দেখে পাখি বিরক্তি সূচক ‘চ’ শব্দটা বের করে জিজ্ঞেস করলো,

“আশ্চর্য! জামাটা গায়ে লাগছে না কেন? আমি কি মোটা হয়ে গেছি মম?”

পাখির প্রশ্নে এক সেকেন্ড থমকে তার দিকে তাকালো মম। মোটা তো পাখি হয়েছে। তবে এটা নাদুসনুদুস টাইপের মোটা না, আগের চেয়ে একটু ভরাট হয়েছে শরীর, এই যা! কিন্তু সেটা পাখি কেন, পৃথিবীর কোন মেয়েকেই বোঝানো সম্ভব হবে না। তাই মম একগাল হেসে বললো,

“কই? নাতো! তুমি তো আগের মতোই আছো আপু।”

“তাহলে কামিজটা লাগছে না কেন?”

বছর সাতেক আগের জামা গায়ে কেন লাগছে না, সে প্রশ্নের কি উত্তর দেওয়া উচিত, ভাবতে লাগলো মম।

“কয়েক বছর ধরে আলমারিতে ছিল তো, না পরতে পরতে মনে হয় ছোট হয়ে গেছে আপু।”

মমর কথায় চিন্তিত পাখি একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝতে পারলো, মম তাকে ঢপ দিচ্ছে।
সরু চোখে তাকিয়ে সে বললো,

“জামা ছোট হয়ে গেছে, না? পাম দিস আমাকে?”

“আরে না! থাকে না কিছু কাপড়, ধোয়ার পর ছোট হয়ে যায়? সেরকমই কিছু কাপড় অযথা ফেলে রাখলে ছোট হয়ে যায়। এটা মনে হয় সেই কাপড়ের তৈরি কামিজ।”

মমর বানিয়ে বলা কথা শুনে হেসে দিল পাখি। ছোট বোনটাকে যে কি সাংঘাতিক মিস করেছে সে!

এরপর এক অদ্ভুত কাণ্ড করলো পাখি। নিজের কাপড় বাদ দিয়ে সৌবীরের ভাঁজ করে রাখা পুরোনো একটা টিশার্ট পরে নিল সে। মম অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো বোনকে। আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরে ফিরে দেখছে পাখি। গলার কাছ থেকে টিশার্টটা উঁচু করে ধরে দু একবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিল সে। যেন এখনো সৌবীরের গন্ধ মিশে আছে তাতে।

মম শুধু অবাকই হয়নি, বিভ্রান্ত সে। এই পাখিকে সে মেলাতে পারছে না সেদিন টিভিতে দেখা অনামিকার সাথে। যেখানে সে কণ্ঠে আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে বলেছিল,

‘আমি প্রেমে পড়েছি এমন এক পুরুষের, যার কাছে জীবনকে ঘৃণা করার হাজারটা কারণ থাকা সত্ত্বেও, সে ভালোবাসাকে বেছে নিয়েছে। আমি ভালোবেসেছি তাকে, দিনশেষে যার কাঁধে আমি নির্দ্বিধায় মাথা রেখে জীবনের সবটুকু সুখ বা কষ্ট ভাগ করে নিতে পারবো।
আমি তাকেই বিয়ে করেছি, যে সব রকম পরিস্থিতিতে শক্ত করে আমার হাত আঁকড়ে রাখার সামর্থ্য রাখে।’

***

ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই ছুঁই করছে। খাবারের পার্সেল এসেছে আরো ঘন্টাখানেক আগে। দু’বোন মিলে সোফায় বসে টিভিতে নাটক দেখতে দেখতে খাচ্ছে আর টুকটাক কথা বলছে। মাঝখানে ঝিনুক একবার ফোন করেছিল মম কোথায় আছে জানতে। পাখির কথা শুনেই টুস করে কল কেটে দিয়েছে সে।

“আপু?”

কিছুক্ষন নীরব থেকে ডেকে উঠলো মম। অনেক বদলে গেছে পাখি। সাত বছর আগের সেই পাখি আর এখনকার অনামিকার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। তখনকার পাখি হলে এতক্ষণে ডিটারজেন্ট ছাড়াই ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ধুয়ে শুকিয়ে ফেলতো।

“হুম?”

“তুমি কি… মানে সেদিন টিভিতে…”

ইতস্তত করতে থাকে মম। বুঝতে পারেনা কিভাবে জিজ্ঞেস করবে পাখিকে এ ব্যাপারে। সব ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝেই একটা স্পষ্ট অদৃশ্য দেওয়াল টানা থাকে। সেই গণ্ডি পেরিয়ে উকি ঝুঁকি দেওয়া মোটেও সভ্যতার লক্ষণ নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কৌতূহল দমিয়ে রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে মম জিজ্ঞেস করেই ফেললো পাখিকে।

“তুমি কি সত্যিই ওদের একজনকে বিয়ে করেছো?”

“হুম।”

টিভির দিকে চোখ রেখে সংক্ষেপে হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিল পাখি। ভাবান্তর নেই তার। কিন্তু মম ভীষণ অবাক হলো। অথচ তার তো অবাক হওয়ার কথা না। সে তো সবটাই শুনেছে এবং দেখেছে টিভিতে। তবুও অবাক হতে বাধ্য হলো সে। আমতা আমতা করে বলতে শুরু করলো,

“কিন্তু… ওরা…ওরা তো আমাদের মত না! তুমি কি করে…তাছাড়া সৌবীর ভাইয়া? তুমি তো এত বছরেও তার আশা ছাড়ো নি, তবে এখন কেন? আর ওদের একজনকেই কেন? মানুষ কত রকম কথা বলছে। এই সম্পর্ককে কি সমাজ গ্রহণযোগ্যতা দেবে? এটা কি আদোও বৈধ?”

পাখি টিভির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে কিছুক্ষন নীরবে তাকিয়ে রইলো মমর দিকে। কোন উত্তর দিল না সে মমর প্রশ্নগুলোর। উল্টো গা ছাড়া ভাবে বললো,

“এসব ছাড় তো! তুই আমাকে এটা বল, চীনের গ্রেট ওয়াল সম্পর্কে কি জানিস?”

“কি?”

প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলায় ভ্রু জোড়া কুচকে তাকালো মম। সে বুঝতে পারলো এই ব্যাপারে পাখি কোন কথা বলতে চাইছে না। কিন্তু মমর ভালো লাগলো না বিষয়টা। পাখির এই সিদ্ধান্তের বড় একটা প্রভাব তাদের সবার জীবনে পড়েছে। সেদিন পুলিশ এসে উদ্ধার না করলে, হয়ত জান হারাতো অথবা, মান। এতকিছুর পর এর কোন দায়ভার কি পাখি নেবে না?

“হুম, বল তো দেখি। খুব তো হাতে পায়ে বড় হয়েছিস। বুদ্ধিতেও কিছু বেড়েছিস নাকি এখনো ঢেঁড়সই আছিস? তোকে বলেছিলাম না তোর পরীক্ষার পর বেড়াতে নিয়ে যাবো। এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারলে, সত্যি নিয়ে যাবো।”

হাসিহাসি মুখে জানালো পাখি। তর্ক করতে ইচ্ছে করলো না মমর। হয়ত পরে নিজে থেকেই সব খুলে বলবে সে। তাই মম আর ঘাটালো না তাকে। বিরস মুখে সে উত্তর দিলো পাখির প্রশ্নের।

“চীনের গ্রেট ওয়াল মানুষের হাতে তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি দীর্ঘ এই প্রাচীরের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৮৮৫১.৮ কিলোমিটার। এটি শুরু হয়েছে সাংহাই পাসে এবং শেষ হয়েছে লোপনুর নামক স্থানে। এগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম থেকে খ্রিস্টীয় ১৬শ শতক পর্যন্ত চীনের উত্তর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়।”

একনাগাড়ে গরগর করে বলে গেল মম। বোনের মুখস্ত বিদ্যের বাহার দেখে, মুচকি হাসলো পাখি। ফোনে কিছু একটা বের করে মমকে কাছে এনে দেখালো সে।

“ভেরি গুড! এবার এটা দেখ।”

পাখির ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে প্রথমে মম বুঝতে পারলো না সে কি দেখাতে চাইছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল তার।

চীনের গ্রেট ওয়ালের গুগল রিভিউ বের করে দেখাচ্ছে তাকে পাখি। অনেকেই সেখানে এক স্টার রিভিউ দিয়ে রেখেছে। কারো যেতে সমস্যা হওয়ায়, তো কারো গাইড ঠিকঠাক না পাওয়ায়। তবে এর মধ্যে কিছু হাস্যকর রিভিউও আছে। যেমন, একজন লিখেছে,

‘আসলে এত বড়াই করার মতো কিছু দেখলাম না। সবাই বলে, এটা নাকি মহাকাশ থেকে দেখা যায়। আমি গিয়েছিলাম, কিছুই দেখতে পেলাম না।
এমনকি বসার জন্যে কোন চেয়ারও নেই সেখানে।
কোন বলদ যে এটা বানিয়েছে, কে জানে। যখন ফাইটার জেট ব্যবহার করা যায়, তখন দেয়াল বানানোর দরকার কী ছিল? smh.’

রিভিউটা পড়ে হাসতে শুরু করলো দু’বোন। রিভিউদাতার মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে। হাসি থামিয়ে পাখি অবশেষে বললো,

“চিনের গ্রেট ওয়াল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে প্রথম স্থানে আছে। আজ থেকে ২২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো স্থাপত্য শিল্পকে মানুষ গুগলে এক স্টার রিভিউ দিয়ে রেখেছে।
আর সেই মানব সমাজের কাছ থেকে আমরা গ্রহণযোগ্যতা খুঁজি! ব্যাপারটা বোকামি হয়ে যায় না? smh!”

হাসি থামিয়ে বোনের দিকে তাকালো মম। পাখি কি বুঝাতে চাইছে, সেটা উপলব্ধি করতে পারলো সে। আসলেই তো! কোনভাবে, যেকোন কিছু করেও কি সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া সম্ভব? আমরা যাই করিনা কেন, যত নিখুঁতভাবে, নিয়ম মেনেই করিনা কেন, সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া দুঃসাধ্য। দিনশেষে, কেউ না কেউ ঠিক সেখানে খুঁত বের করবেই। তাহলে কেন আমরা সমাজকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেব? সেটা তো বোকামিই।

চুপ করে রইলো মম বেশ অনেকটা সময়। ভাবলো বিষয়টা নিয়ে। সমাজের চিন্তা বাদ দিলে প্রশ্ন থাকে, পাখি সুখী কিনা। সেটাই তো মুখ্য, নয় কি? পাখি যদি সমাজের বাইরে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হতে পারে, তবে তাতে কি দোষের কিছু আছে?

টিভির স্ক্রিনে চোখ পাখির। মমকে নিজের মত করে ভেবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার সময় দিচ্ছে সে। মম পাশ ফিরে দেওয়ালে টাঙানো পাখি ও সৌবীরের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। কম তো কষ্ট পায়নি পাখি। এখন নয়ত নিজের শর্তেই একটু সুখ খুঁজে নিল।

“নতুন ভাইয়ার নাম কি আপু?”

একটু পর জানতে চাইলো মম। কিছুটা কৌতূহল থেকে, তো কিছুটা জড়তা কাটাতে। তার এই প্রশ্নে রয়েছে নীরব স্বীকৃতি। সেটা বুঝতে পেরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো পাখির ঠোঁটে।

“ঘোস্ট”

“হ্যাঁ? এটা আবার কেমন নাম? মানুষের নাম আবার ঘোস্ট হয় নাকি?”

কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো মম। পাখি আড়চোখে তাকালো বোনের দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর কপালের ভাঁজ মসৃণ হলো মমর। জিভে কামড় দিয়ে সে নিজেই নিজেকে ফিসফিসিয়ে বললো,

“রাইট, মানুষদের হয়না।”

পাখি হালকা হেসে মাথা নাড়লো শুধু। মমর চেহারাই বলে দিচ্ছে, তার মস্তিষ্ক এই সময় ফুল স্পিডে ঘুরছে।

“দেখতে কিরকম সে?”

একটুপর আবার জিজ্ঞেস করে উঠলো মম। পাখি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে আঙুল তাক করে বললো,

“ঐরকম।”

“সৌবীর ভাইয়ার মত?”

পাখি দু’কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ-না এর মাঝামাঝি কিছু একটা বোঝালো। কপাল কুঁচকে আসে মমর আবারো। সে আরো কিছু প্রশ্ন করবে, তার আগেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল আচমকা। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল মুহুর্তেই।

“এই লাইটের আবার কি হলো?”

“আর বলোনা আপু! ইলেক্ট্রিসিটি যে কি বিরক্ত করে আজকাল! জেনারেটর ছাড়া তো চলাই মুশকিল।”

“তুই বস। রান্নাঘরে মোমবাতি আছে, আমি খুঁজে নিয়ে আসছি।”

“আমাকে ফেলে যেওনা আপু! চলো, একসাথে যাই।”

“দরকার নেই। তুই অন্ধকারে ঠুসঠাস এটা সেটার সাথে বাড়ি খেয়ে চিল্লাবি, আর আমার কানের পর্দা ফাটাবি। তুই বস, আমি আসছি।”

পাখি নিজের ফোনের টর্চ জ্বেলে রেখে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। মমর কাছে বাবার ফোনটা থাকে এখন। কিন্তু সেটার টর্চ কাজ করে না।

ফোনের টর্চ একটু পরেই বন্ধ হয়ে গেল। চার্জ শেষ পাখির ফোনের। ঘন আঁধার নেমে এলো চারদিকে। এমনিতেই অন্ধকারে ভয় পায় মম। তার উপর এই পুরোনো বাড়িতে এবং অচেনা পরিবেশে গা ছমছম করতে শুরু করলো তার।

চারদিকে এক অস্বাভাবিক নীরবতা! এর মাঝেই বাইরে থেকে আসা আলোতে সামনে দিয়ে একটা ছায়ার নড়চড় টের পেল সে। মনে হলো, এখানে সে একা নেই, আরো কেউ আছে। শিউরে উঠলো মম।

“কে?”

কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো মম। কোন উত্তর এলো না। পিনপতন নীরবতা ঘিরে রেখেছে ঘরটাকে। এমনকি পাখিরও কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভয়ার্ত গলায় মম জোরে ডাকলো,

“আপু!!!”

কিন্তু এবারও কোন উত্তর এলো না। উল্টো অন্ধকারে কিছু একটা আছে, সেই ধারণা আরো প্রগাঢ় হলো। সোফা থেকে উঠে দাড়ালো মম।

“কে ওখানে? চোর নাকি?”

কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে মম আপনমনে বিড়বিড় করে বললো,

“চুরি করতে এসে থাকলে ফিরে যান ভাই। আমার কাছে নিজের বলতে একপাটি জুতো ছাড়া কিছু নেই।”

অন্ধকারে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের রাস্তা খুঁজতে লাগলো মম। কিন্তু দু’কদম না যেতেই বাড়ি খেলো দেওয়ালের সাথে। হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে মমর মনে হলো, রুমের মধ্যিখানে তো কোন দেওয়াল নেই! তবে তার সামনে এটা কি?

চোখ পিটপিট করে সামনে তাকালো সে। বাইরে থেকে আসা আলোতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো একটা অবয়ব। নীচ থেকে মাথা তুলে আস্তে আস্তে উপরের দিকে তাকালো মম। ইয়া লম্বা চওড়া অবয়বটি। ঘাড় বাঁকাতে বাঁকাতে বেঁকেই যাচ্ছে। খুঁজতে খুঁজতে মমর চোখ দুটো গিয়ে ঠেকলো অস্বাভাবিক, অতিপ্রাকৃত একজোড়া নিষ্ঠুর চোখে।

বাঘের মতো সরু, তীক্ষ্ম, মধুরঙা একজোড়া চোখ। চোখের মণির চারপাশে লালচে এক বৃত্ত, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে।

বুকের ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে এলো মমর। কলিজা তখন পানিশূন্য হয়ে গেছে। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল আতঙ্কের শীতল স্রোত। কোনকিছু আর চিন্তা করতে পারলো না মম। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে জোরে হাঁকিয়ে উঠলো সে,

“ভূত!!!!!”

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০৪

“ভূত!!!!!”

চোখজোড়া খিচে বন্ধ করে নিয়ে চেচাচ্ছে মম। অন্ধকার নিস্তব্ধতায় প্রচন্ড কর্কশ শোনালো সে ধ্বনি। সামনের অবয়বটি বিরক্ত হলো এতে। তার সংবেদনশীল শ্রবণেন্দ্রিয় সহ্য করতে পারছে না এই অত্যাচার।

“চুপ!”

রুক্ষ স্বরে এক ধমক দিলো অবয়বটি মমকে। সাথে সাথে মমর গলার আওয়াজ ফুরিয়ে এলো। ভারী, কর্কশ গলার স্বর তার। ঠিক যেন শিকারী বাঘের চাপা গর্জন! কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মুখ থেকে এরকম শব্দ বের করা সম্ভব নয়। মম কি তবে অন্ধকারে ভুল শুনলো?

“আমি ভূত না। ভূত ওঘরে আছে, তোমার বোনের সাথে।”

নাহ্! একদম ভুল শোনেনি মম। ঠিকই শুনেছে সে প্রথমবার। অদম্য কৌতূহল পরাজিত করলো ভয়কে। চোখজোড়া ধীরে ধীরে মেলে তাকালো মম সামনে দাঁড়ানো অবয়বটির দিকে।
কিন্তু অন্ধকারে সেই জ্বলজ্বল করতে থাকা তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছাড়া কিছুই নজরে এলো না।

কারো কারো বিশ্বাস, সৃষ্টির সূচনা থেকেই নাকি প্রতিটি ঘটনা পূর্বনির্ধারিত ও প্রকৃতি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। যদি সেটা মেনে নেওয়া হয়, তবে এই ক্ষনটাকেও প্রকৃতির কারসাজিই বলা চলে।

মম যখন ভয় ও বিভ্রান্তি নিয়ে দাড়িয়ে আছে অন্ধকারে, ঠিক তখনই জ্বলে উঠলো আলো। বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। আর সেই সাথে স্পষ্ট করেছে সামনে থাকা অবয়বটিকে। মমর চিন্তা চেতনা সে সময়টাতে শূন্য হয়ে গেল। ঠোঁটজোড়া আপনাআপনি ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল তার। চারপাশে নেমে এলো কঠোর নীরবতা। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

দীর্ঘকায় এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির মমর মাথা থেকে কমপক্ষে দুই-আড়াই ফুট উঁচু ছেলেটা। কালো পোশাকে আবৃত তার সারা শরীর। মাথার কালো চুলগুলো আড়াল হয়ে আছে একটা বেসবল ক্যাপের নীচে। তবে সামনের দিকে কিছু চুল বেরিয়ে এসে ঢেকে রেখেছে ললাটের সিংহভাগ।
এ পর্যন্ত মেনে নেওয়াই যায়। কিন্তু সমস্যাটা হলো যখন ছেলেটির চেহারার দিকে ভালো করে তাকালো মম।

মুখখানি তীক্ষ্ণ রেখায় গঠিত তার। চোয়ালের হাড় স্পষ্ট, অনমনীয়। সেই গঠনে কোমলতার কোনো স্থান নেই। বরং প্রকাশ পাচ্ছে শুধুই রুক্ষতা। ত্বক মসৃণ, কিন্তু অস্বাভাবিক। সোনালী রঙের চামড়ায় আলো পড়তেই ভেসে উঠছে ক্ষীণ নীলচে আভা। কান দুটো কিছুটা লম্বাটে ও সরু ধাঁচের। শার্টের কলার ভেদ করে দৃশ্যমান গলার দুপাশে থাকা রেখা। যেন হাড়ের অস্বাভাবিক গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কিন্তু এরপরই বাঁধলো বিপত্তি! ঘন কালো ভ্রুজোড়ার নীচে থাকা শিকারি বাঘের ন্যায় ঐ মধুরঙা চোখগুলো সহ মাথাটা হালকা নিচু করে হাসলো লোকটা! দাঁত দেখিয়ে হাসলো! সরু সূচালো দাঁত উঁকি দিলো তার প্রশস্ত ঠোঁটের ফাঁক থেকে। ডানহাতটা উঁচু করে তুলে হালকা নেড়ে সে বললো,

“হাই! কেমন আছো মানবকন্যা?”

***

সকালের মিষ্টি রোদ চেহারায় এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল মমর। আড়মোড়া দিয়ে, উবাসী নিতে নিতে উঠে বসলো সে। মাথাটা ভার হয়ে আছে। ঘুমঘুম ভাবটা কাটেনি এখনো। কিছুক্ষন ঝিম ধরে বসে থাকার পর আস্তে আস্তে মস্তিষ্ক সচল হলো তার।
রাতের কথা মনে পরতেই এক ঝটকা খেল সে।

মধুরঙা চোখের লোক!
কে ছিল ওটা? কি ছিল? কেন ছিল? কোথা থেকেই বা এসেছিল? আচ্ছা, সে স্বপ্ন দেখছিল না তো?
না, না! স্বপ্ন এতটা সুস্পষ্ট হতে পারে না কখনো।

একসাথে অনেক প্রশ্ন মনে এসে জড়ো হলেও, তাদের উত্তর খুঁজে পেল না মম। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলো শোবার ঘরে আছে সে। কিন্তু এখানে এলো কি করে? রাতে ঐ লোকটার চকচকে ধারালো দাঁতের দিকে তাকিয়ে এমন ভয় পেয়েছিল মম যে, ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছা যায় সে। এরপর আর কিছু মনে পড়েনা তার।

বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায় মম। পাখিকে আগে খুঁজে বের করা দরকার। সে হয়ত কিছু বলতে পারবে। সেটা ভেবে নিয়েই দরজার দিকে পা বাড়ায় মম। সাবধানে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে সে।
পুরো বাড়িটা স্তব্ধ হয়ে আছে। গা ছমছম করে ওঠে মমর। পাখি আবার তাকে একা ফেলে কোথাও চলে যায়নি তো? পরমুহুর্তেই আশঙ্কাটা মন থেকে মুছে ফেললো সে।
নাহ্! পাখি তাকে ফেলে যাবেনা।

পা টিপে টিপে ড্রইং রুমের কাছাকাছি এলো মম। ভেতর থেকে পাখির গলার স্বর ভেসে আসছে। দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিলো সে ভেতরে। সোফায় বসে আছে পাখি। আর ঠিক তার পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় আছে কেউ একজন। পেছন থেকে কে সেটা বুঝতে পারলো না মম। তবে পাখির কথাগুলো ভেসে এসে পৌঁছালো তার কানে।

“কি করছো তোমরা এখানে? এখানে আসার অনুমতি আছে? বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঢুকেছো, এটা নিয়ে কি পরিমান ঝামেলা হতে পারে, সেই ধারণা আছে তোমাদের?”

“তুমি আমাকে না বলে এসেছো।”

গমগমে আওয়াজ তুলে উত্তর দিল পাখির পাশে বসা পুরুষটা। মম চমকে উঠলো।
এইতো! সেরকমই তো!

কাল রাতে ওই মধুরঙা চোখের লোকটা যেভাবে ভারী কর্কশ গর্জন তুলে কথা বলছিল, সেরকম আওয়াজ এই লোকটারও। ভ্রু কুঁচকে ভাবলো মম, তবে কি এই লোকটাকেই দেখেছিল সে কাল রাতে? কিন্তু এই লোকটার স্বর তো কিছুটা ভিন্ন। কেমন নির্লিপ্ত, যান্ত্রিক শোনাচ্ছে তাকে। আওয়াজটা রুক্ষ হলেও, কথাগুলো শান্ত, সাবলীল।

“তো? আমার বাবা হাসপাতালে ভর্তি আছেন ঘোস্ট, অবস্থা ক্রিটিক্যাল! আমি আসবো না?”

“আমি কি তোমাকে আসতে মানা করতাম? একসাথে আসতে পারতাম আমরা।”

“এই জন্যেই তোমাকে বলিনি। তিন তিনটা গুলি লেগেছিল তোমার শরীরে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ নও তুমি। বেডরেস্টে থাকতে বলেছে ডক্টর। আর তুমি? এই শরীরে স্বর্গভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে পড়েছো!”

গুলি? স্বর্গভূমি?

মমর মস্তিষ্কে শব্দগুলো ঘুরতে থাকে।
চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায় তার। স্বর্গভূমি থেকে কেউ এসেছে? মানে, হাইব্রিডার্স?

বছর তিনেক আগের কথা।

বৃহত্তর চীনের একটি গোপন পরীক্ষাগারে অভিযান চালায় ইউ.এন. সিকিউরিটি কাউন্সিল ম্যান্ডেট ও চীনের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ টিম। উদ্ধার করে আনে কয়েক শত টেস্ট সাবজেক্টকে।
না, পরীক্ষাগারগুলোতে কোন পশু পাখি ছিলনা। বন্দী ছিল জ্বলজ্যান্ত মানুষ। বিভিন্ন দেশ থেকে ছোট ছোট বাচ্চা ও শিশু-কিশোরদের পাচার করে নিয়ে যাওয়া হতো এসব পরীক্ষাগারে। মাটির নীচে গড়ে তোলা এই গোপন পরীক্ষাগারে তাদের উপর চলতো অমানবিক নির্যাতন ও নৃশংস পরীক্ষা নিরীক্ষা।

প্রথমে ড্রাগের মাধ্যমে তাদের স্মৃতিশক্তি মুছে ফেলা হতো। তারপর ঔষধ ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিএনএ মিউটেশন করে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলা হতো তাদের। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ডিএনএ-র সাথে বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ-র ক্রসলিঙ্কিং এর মাধ্যমে একটা শক্তিশালী সুপার পাওয়ার তৈরি করা। এমন একটা আর্মি তৈরি করা, যার উত্তর পৃথিবীর কোন সৈন্য-সামন্ত বা অস্ত্র দিয়ে দেওয়া অসম্ভব!

শিনহো ফার্মাটিক্যাল কর্পোরেশন নামক চীনের একটি বিখ্যাত ড্রাগ কোম্পানি প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গোপনে এই বর্বরতা চালিয়ে যায়। কড়া নিরাপত্তায় রাখা বন্দীদের জীবন নিয়ে নোংরা খেলা খেলে তারা বাজারজাত করে নতুন নতুন ঔষধ, স্টেরয়েড ও প্রতিষেধক। এছাড়াও তদন্তে উঠে আসে বড় বড় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাজনীতিবিদদের নাম, যারা জড়িত ছিলেন শিনহোর সাথে এই কাজে।

বর্বরতার এই অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছিল #প্রজেক্ট_পাওন। এ পর্যন্ত চীনের বিভিন্ন জায়গায় এরকম পাঁচটি পরীক্ষাগার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কয়েক হাজার বন্দীকে।

নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দিতে নারাজ তারা, অন্যদিকে মানুষ বলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দিতে নারাজ সভ্যসমাজ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছে ঠিকই, তবে মানব সমাজের জন্যে তাদের উপস্থিতি নিয়ে এসেছে শুধুই আতঙ্ক ও অস্বস্তি। তাই প্রজেক্ট পাওনের বন্দীদের পরিচয় হয়ে ওঠে হাইব্রিডার্স নামে।
চীনের শেংসী দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি পরিত্যাক্ত মিলিটারি বেস ক্যাম্পে পুনর্বাসিত করা হয় হাইব্রিডার্সদের। স্বতন্ত্রতা দেওয়া হয় তাদের। চীনের বুকে একটুকরো স্বতন্ত্র, সার্বভৌম ভূখণ্ড হয়ে ওঠে এই মিলিটারি ক্যাম্প।
হাইব্রিডার্স দ্বারা চালিত এই ভূখণ্ডেরই নাম স্বর্গভূমি।

মুক্তির পর পৃথিবীর দ্বার হাইব্রিডার্সদের জন্যে সাদরে খুলে দেওয়া হয়নি, বরং খুলেছিল শুধু অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিন। শুরু হয় অস্তিত্বের লড়াই। সেই লড়াইয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় HFT।
হাইব্রিডার্সদের পুনর্বাসন ও অধিকার রক্ষার্থে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সাতজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় হাইব্রিডার্স ফিউচারস্ ট্রাস্ট (HFT)। আর এই সাতজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত, সবচেয়ে দুঃসাহসী নামটিই,

অনামিকা আহমেদ পাখি।

অনামিকা শুধু হাইব্রিডার্সদের পাশে দাঁড়ায়নি, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েই দায়িত্বের ইতি টানেনি, বরং সহযোদ্ধা হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমেছে এই লড়াইয়ে। স্বর্গভূমিকে বেছে নিয়েছে নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে।

শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি সে। সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়ম, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, ভয়, প্রশ্ন, অস্বস্তি, সবকিছুকে উপেক্ষা করে মাসখানেক আগে এক হাইব্রিডার্সকে বিয়ে করে অনামিকা।

হাইব্রিডার্সদের ইতিহাসেও প্রথম, একমাত্র এবং অবিশ্বাস্য ছিল এই ঘটনা। তাদের নিজেদেরও মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে যে, যেই মানব জাতিকে তারা বর্বর ও ঘৃণ্য হিসেবে জেনে এসেছে, সেই জাতেরই একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তাদের একজন। কৌতূহলী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তারা এই জুটিকে। বুঝতে চায়, কেন একটা মানুষের মেয়ের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে ঘোস্ট।

আর উত্তরটা হয়ত এতটা স্পষ্ট আগে কখনোই ছিল না, যতটা হয়েছে দিন দশেক আগে।

অনামিকা ও ঘোস্টের সম্পর্ক ও বিয়েটা গোপন রাখা হয়েছিল স্বর্গভূমিরে বাইরে। এমনকি পাখির পরিবারও জানত না কিছু। কিন্তু খবরটা মিডিয়ায় লিক করে দেওয়া হয় দশদিন আগে। ঠিক হাইব্রিডার্সদের নিয়ে করা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর, প্রেস কনফারেন্সে। পরিকল্পিতভাবে পাখিকে হেনস্তা ও হত্যার চেষ্টা করা হয় সেদিন।

কিন্তু যেটা পরিকল্পনায় ছিল না, সেটা ছিল পাখির সাহসী স্বীকারোক্তি। পরিকল্পনায় ছিল না, পাখিকে বাঁচাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঘোস্টের নিজেকে ঢাল বানানো।
একদিকে, মিডিয়ার আক্রমণাত্মক ও কুরুচিপূর্ণ প্রশ্নবানের বিপরীতে, পাখি দৃঢ় থেকে হাইব্রিডার্সদের পক্ষে কথা বলে অর্জন করে নেয় তাদের চোখে সম্মান। অন্যদিকে, গুলি লাগা সত্ত্বেও নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে পাখিকে সুরক্ষিত কনফারেন্স হল থেকে বের করে আনার দৃশ্য মন ছুঁয়েছে মানব সমাজের।

“এখানে কি করছো মানবকন্যা?”

নিজ জায়গায় জমে যায় মম। ভাবনার সুতো কাটা পরে আচমকাই। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে চেয়ে সে দেখে, রাতের সেই মধুরঙা চোখের ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। তখন না বুঝলেও, এখন ঠিকই বুঝতে পারছে মম। ছেলেটা মানুষও নয়, ভূতও নয়।

সে আসলে হাইব্রিডার্স।

গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না মমর, নিজের সামনে এই দানবাকৃতির ছেলেটাকে দেখে। গোলগোল চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করে মম। কিন্তু ঠিক তখনই পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে যায় সে ধপাস করে।

“মম! ঠিক আছিস তুই?”

মমর মাটিতে পড়ার আওয়াজ শুনে ছুটে আসে পাখি। পাখির হাত ধরে উঠে দাড়ায় সে। কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখ সরায়নি সে সামনে থাকা ছেলেটার দিক থেকে। ভয়ে ভয়ে পাখির হাত শক্ত করে চেপে ধরে তার পেছনে লুকায় সে।

“আপু!”

“মোমো? এটাই তাহলে সেই মোমো, যে তোমাকে ফোন করে বারবার?”

ঘন ভ্রূজোড়া উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো ছেলেটা পাখিকে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবারো করুন কণ্ঠে ডেকে উঠলো মম,

“আপু?”

“শান্ত হ। ভয়ের কিছু নেই।”

পাখি তাকে আশ্বস্ত করলে কি হবে, রাতে তাকে যে ধারালো দাঁতের ঝিলিক দেখিয়েছে মুহূর্ত, সেটা মস্তিষ্কে গেঁথে আছে মমর।

“আপু!”

“তুমি কি এই একটা শব্দ ছাড়া অন্য কিছু বলোনা মোমো?”

সরাসরি তার সাথে কথা বলায়, ভয়ে আরো গুটিয়ে গেল মম। আরো শক্ত করে চেপে ধরলো সে পাখিকে। কাঁদো কাঁদো স্বরে সে আবার ফিসফিস করে ডাকলো,

“আপু,”

“এক মিনিট! মুহূর্ত? তুমি বাংলা বলা শিখলে কবে?”

কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে। উত্তরে ছেলেটা তার সূচালো দাঁত দেখিয়ে প্রশস্ত একটা হাসি দিয়ে জানালো,

“যখন জেনেছি তোমার একটা অবিবাহিত বোন আছে, তখন থেকে।”

“মানে কি?”

সরু চোখে তার দিকে তাকালো পাখি। কিন্তু ছেলেটা সে দৃষ্টিকে পাত্তা দিল না। উল্টো জানালো,

“মানে বাংলাটা জানা থাকলে তোমার বোনকে পটাতে সুবিধা হবে, তাই শিখেছি।”

“আমার বোনকে পটাবে মানে? তুমি ওকে কেন পটাবে?”

“ঘোস্ট তোমাকে কেন পটিয়েছিল?”

“তুমি এখানে আমার বোনকে পটাতে এসেছো?!”

“অবশ্যই! নইলে স্বর্গভূমির সিকিউরিটি ফাঁকি দিয়ে, তোমার এই ভাঙাচোরা জামাইটাকে নিয়ে আমি বাংলাদেশে আসবো কেন?”

পাখি কিছু বলার আগেই এবার পেছনে বসা পুরুষটি গম্ভীর আওয়াজে বলে উঠলো,

“আমি তো তোমাকে আসতে বলিনি।”

ছেলেটা আবারো ভাবান্তরহীন উত্তর দিল,

“আমিও তো সেটাই বলছি। তুমি না বলা সত্ত্বেও আমি এসছি তো এই জন্যেই।”

“মুহূর্ত! আমার বোনের থেকে দূরে থাকবে তুমি!”

কড়া গলায় সতর্ক করে দিল পাখি। কিন্তু মুহূর্ত নামের ছেলেটা সেটা শুনে চোখজোড়া সরু করে তাকিয়ে বললো,

“কৃতজ্ঞতা বলতে কিছু নেই মানুষদের মধ্যে! দু দুবার তোমার জীবন বাঁচিয়েছি আমি পাখি, আর তুমি তোমার বোনটাকে দিতে পারবে না? তোমার আর ঘোস্টের মিষ্টি প্রেম দেখতে দেখতে আমি তেতো হয়ে গেলাম! আমারও তো ইচ্ছে করে একটা বিয়ে করতে, নাকি?”

মুহূর্তের কথা কর্ণগোচর হতেই মুখটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে গেল মমর। বলে কী এই ছেলে! মাথায় সমস্যা আছে নাকি? সে কোন দুঃখে তাকে বিয়ে করতে যাবে? পৃথিবীতে কি মানুষের ছেলেদের অভাব পড়েছে? আর পড়লেও বা কি? এরকম জলহস্তীর মত বিশালকায় দেহের ছেলেকে সে কোনদিনই বিয়ে করবে না। এর নিচে চাপা পড়লে সোজা স্বর্গে যেতে হবে!

“দুবার বাঁচিয়েছ মানে?”

পেছন থেকে আবারো ভেসে এলো সেই কণ্ঠস্বর। তবে এবার সেটা একটু বেশীই স্থির ও শীতল শোনালো মমর কানে। পাখি হঠাৎ করেই তটস্থ হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তবে হেলদোল হলো না শুধু মুহূর্তের।

“একবার, স্বর্গভূমির গেটে। হেটার্স গ্রুপের হাত থেকে। আরেকবার, দশদিন আগে যখন তুমি অপারেশন থিয়েটারে….”

বলতে বলতে থেমে গেল মুহূর্ত। এতক্ষণে তার খেয়াল হলো, মুখ ফসকে ভুল কথা বলে ফেলেছে সে। পাখি কটমট করে তাকিয়ে আছে মুহূর্তের দিকে তখন। কোনমতে জান নিয়ে ফিরেছে ঘোস্ট অপারেশন থিয়েটার থেকে। এরপর কারো সাহস হয়নি তাকে এটা জানানোর যে, যেই পাখিকে বাঁচাতে সে নিজের জীবন বিপন্ন করেছে, অপারেশন চলাকালীন সেই পাখির উপর আবারো হামলা করা হয়েছিল।

“আমি যখন অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম, সে রাতে পাখির উপর আবার হামলা করা হয়েছিল?”

গরগর আওয়াজ করতে করতে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো ঘোস্ট।

একটা শুকনো ঢোক গিললো মম। এরকম হিংস্র হুংকার সে জীবনে শোনেনি। রক্ত হীম করা সে কন্ঠ। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পেছনে তাকিয়ে সে উঁকি দেবার চেষ্টা করলো সোফায় বসা লোকটার দিকে। পেছন ফিরে বসে থাকায় এখনো দেখা যাচ্ছে না তাকে।

“আমার কোন দোষ নেই। ন্যায় ওকে একা বাথরুমে যেতে দিয়েছিল। যা বোঝার, ফিরে গিয়ে ন্যায়ের সাথে বুঝে নিও।”

চওড়া দু কাঁধ সামান্য ঝাকিয়ে বললো মুহূর্ত। পাখি আরো একবার চোখ রাঙিয়ে তাকালো মুহূর্তের দিকে। দিলো তো ন্যায়কে ফাঁসিয়ে! বেচারা ন্যায় কি যে যন্ত্রণায় আছে হাইব্রিডার্সদের প্রেসিডেন্ট হয়ে! যে যেভাবে পারে তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে চালিয়ে দেয়।

“আর তুমি এতসবের পরও, একা একা বাংলাদেশে এসেছো?”

এবারের কথাটা পাখির উদ্দেশ্যে বলা। পাখি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর পা বাড়ালো তার দিকে। সোফায় বসা পুরুষটির পাশে হাঁটু মুড়ে বসে তার এক হাত নিজের দুহাতের মুঠোতে পুড়ে নিয়ে অনুরোধের সুরে বলে,

“বাথরুমে কি কেউ দলবল নিয়ে যায় নাকি! বোঝার চেষ্টা করো, এখানে কারো দোষ নেই। ঐ সময় পরিস্থিতি কারো নিয়ন্ত্রণে ছিল না ঘোস্ট।”

পাখি সরে যাবার পর একপলক মুহূর্তের দিকে তাকায় মম। মুহূর্তের দৃষ্টি তখন তার দিকেই নিবদ্ধ। ঐ বাঘের ন্যায় তীক্ষ্ম মধুরঙা চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে আরেকটা ঢোক গিললো মম। চোখ সরিয়ে নেবার সময়টাও নিল না সে। ওভাবেই ছুটে গেল পাখির কাছাকাছি। মাটিতে বসে থাকা পাখির পেছনে দাঁড়িয়ে এবার সে তাকালো সোফায় বসে থাকা পুরুষটির দিকে।

প্রথমবারের মত তাকে দেখে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো মমর।

পুরুষটির চামড়া একদম ফ্যাকাশে। কিছুটা ধূসর ভাব বিদ্যমান সেখানে। মুখে কাটা দাগের মতো সরু সরু রেখা আছে কিছু জায়গায়। বিশেষ করে কপালের বাম পাশে এবং গলার নিচে। ডান চোখটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাম চোখটা? ধূসর এক আবরণের মাঝখানে নীল রঙের লেন্সের মত অংশ রয়েছে চোখের জায়গায়। বসে থাকলেও এই পুরুষটিও যে মুহূর্ত নামক হাইব্রিডার্সের মতোই দীর্ঘদেহী, সেটা বোঝা যাচ্ছে খুব। দুজনের শরীরই শক্ত পোক্ত পেটানো গোছের, তবে ইনি বেশ অনেকটা শুকনো শাকনা গড়নের।

চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। কিন্তু কোথায় দেখেছে তাকে মম, সেটা মনে পড়ছে না। একজন হাইব্রিডার্স কে সে কোথায়ই বা দেখতে পারে? টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়ায়? ভাবতে ভাবতে মাথাটা ঘুরিয়ে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা ঝটকা খেল মম। চোখ পিটপিট করে তাকালো সে দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে। তারপর আবারো ঘুরে তাকালো সোফায় বসা পুরুষটির দিকে। বারকয়েক মাথা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিশ্চিত করলো সে যা দেখছে তা ভুল দেখেনি।

পরিবর্তনগুলো সরিয়ে নিলে, পুরুষটি দেখতে ঠিক দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার মত। ঠিক সৌবীর আজওয়াদের মত! তবে কি…

আর ভাবতে পারলো না মম। তার আগেই এতক্ষণ নরম গলায় ঘোস্টের সাথে কথা বলতে থাকা পাখি উঠে দাড়িয়ে ঘোষণা দিলো,

“ওকে, অনেক হয়েছে। তোমরা আজই চুপচাপ স্বর্গভূমি ফিরে যাচ্ছো। কোন ঝামেলা চাচ্ছি না আমি এখানে।”

“আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না কোথাও।”

শান্ত স্বরে জানালো ঘোস্ট। পাখি এবার তাকে বিরক্তি নিয়ে বললো,

“ঘোস্ট! জেদ করোনা প্লীজ। আমার এখানে থাকাটা জরুরি।”

পাখির দিকে একপলক তাকিয়ে পুরুষটি বসা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালো এবার। পাখির হাতটা ধরে সেটা নিয়ে বুকের বাম পাশে রেখে মাথাটা ঝুঁকিয়ে নরম সুরে সে বললো,

“তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারিনা সুকন্যা। আমার কষ্ট হয়।”

কপাল কুঁচকে এলো মমর। এতক্ষণ পাখির চেহারায় বিরক্তির ভাঁজ থাকলেও, এখন আর তার ছিটে ফোঁটাও নেই। বরং গালে লাল আভা ও ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে লোকটার অস্বাভাবিক চোখের দিকে।

নিশ্চিত এবার মম। নির্ঘাত এই লোক সৌবীর আজওয়াদই হবে! সে-ও ঠিক এরকমই করতো। আলাভালা সেজে মিষ্টি কথায় মন ভোলাতো পাখির। অথচ ভেতরে ছিল জিলাপির চেয়েও কঠিন প্যাঁচ।
সবে দশ বছর ছিল মমর যখন পাখির বিয়ে হয়। ছোট্ট মমর সাথে সৌবীরের দু’দণ্ড ভালো করে কথাও হয়নি কখনো। মম শুধু দেখেছে, লোকটা নবাবী হালে চেয়ারে বসে তার বোনের উপর ছড়ি ঘোরাতো। সৌবীর আসার আগে সব ঠিক ছিল। কিন্তু সে এসেই পাখিকে সবার কাছ থেকে দূরে করেছে। পঁচা দুলাভাই!
হাতে পায়ে বড় হলেও, মমর সেই ধারণা খুব একটা বদলায়নি এখনও।

মিনিটখানেক পেরিয়ে গেলেও হুশ এলোনা পাখির। সে এখনো ঘোস্টের সাথে হারিয়ে আছে নিজেদের দুনিয়ায়। মমর আর সহ্য হলনা। সে গলা হাঁকিয়ে নাকী সুরে ডেকে উঠলো,

“আপু!”

“আবার আপু? মোমোটাকে কথা বলা শিখাওনি তোমরা পাখি?”

একদম ঘাড়ের উপর থেকে মুহূর্তের আওয়াজ পেয়ে সেদিকে চমকে উঠে তাকালো মম। আশ্চর্য! সে তো টেরই পায়নি কখন এই ছেলেটা এসে ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে পাখির উপর পড়লো সে। আর পাখির পিঠ গিয়ে ঠেকলো অসুস্থ ঘোস্টের বুকের উপর।

“আপু!”

করুন স্বরে আবারো বোনকে ডেকে উঠলো মম। সেটা শুনে পাখি চোখ রাঙিয়ে সাবধান করলো,

“মুহূর্ত!”

“আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি শিখিয়ে নেব। ঠিকাছে, মোমো? বলো, ঠি-কা-ছে।”

“আপু….”

“মুহূর্ত! ওকে জ্বালানো বন্ধ করো! মম, তুই আয় তো আমার সাথে।”

***

চলবে…

শরতের কাশফুল পর্ব-১+২

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০১

“বোনের শ্বশুরবাড়িতে এসে চুরি করে খাচ্ছো? ছিঃ ছিঃ! এই শিক্ষাই দিয়েছে তোমার বাবা? কেমন হাভাতে ঘরের মেয়ে গো তুমি!”
অমলেটের একটু অংশ ছিঁড়ে ঠান্ডা ভাতের সাথে মেখে সবে মুখে পড়েছিল মম। তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কর্কশ কন্ঠস্বর। চিনতে অসুবিধা হলো না মমর কণ্ঠের মালিককে। শুকনো ভাত গলাতেই আটকে গেলো। সেটা আর গেলা হলো না মমর। তার আগেই পাশ থেকে যোগ হলো আরেকটা পরিচিত কন্ঠ।

“মা ছাড়া বড় হলে যা হয় আরকি! বড় বোনের তো কেলেংকারীর শেষ নেই। এখন দেখছি ছোটটার স্বভাবেও দোষ আছে। যত্তসব জ্বালা হয়েছে আমার! সব আপদ আমার ঘাড়েই এসে জুটলো!”

জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে তাতে চুমুক দিল মম। এই ভাত আর তার খাওয়া হবে না, সেটা সে বুঝে গেছে। মম পানিটা শেষ করার আগেই প্রথমজন আবারো বলতে শুরু করলো,

“আমরা ভালোমানুষি দেখাতে গিয়েই ফেঁসে গেছি আম্মা! বড় বোন তো মান ইজ্জত সব পাটায় বেটে খেয়ে সেরেছে। সেই ধকল সামলাতে না পেরে বাপটা গিয়ে ভর্তি হলো হাসপাতালে। আর আমরা এখন বাড়িতে এসব ছোটলোক জায়গা দিয়ে ঝামেলা পোহাচ্ছি।”

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো মমর। কথাগুলো হজম করা কষ্টসাধ্য হলেও বোনের কথা চিন্তা করে শান্ত রইলো সে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর আওয়াজে বললো,

“সরি আন্টি। আমি আসলে মাংস খেতে পারিনা। তাই একটা ডিম ভেজে নিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি, এই সামান্য একটা ডিমের জন্যে আপনারা আমাকে চোরের অপবাদ দিয়ে বসবেন।”

মমর কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালেন জান্নাতী। সম্পর্কে মমর মেঝ বোন, ঝিনুকের জা হয় সে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ঝিনুকের শ্বাশুড়ি।

মুমতাহিনা আহমেদ মম।

বয়স সবে সতেরোর গণ্ডি পেরিয়ে আঠারোতে পড়েছে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়েছে এইতো কিছুদিন। এই বয়সটা সাধারণত অন্যরকম থাকে। সদ্য তারুণ্যে প্রবেশ করা কিশোরীরা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে হাওয়ায় ভাসে এসময়। তবে মমর ক্ষেত্রে স্বপ্নগুলো ঠিক ধরা ছোঁয়ার নাগালে আসার সুযোগ পায়নি।
জন্মলগ্নে মাকে হারিয়ে বড় দুই বোনের ছায়ায় বড় হয়েছে মম। সেই ছায়াটা শুধু মমতার ছিল না, ছিল অভ্যাসেরও। কিন্তু বাস্তবতার প্রচন্ড তেজী রোদের সামনে টেকেনি সেই ছায়াটা। বড় বোন, পাখি ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবনে, আর ঝিনুক ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের সংসারে।
মম, আর মামুন সাহেব অনেকটাই একা হয়ে যান এরপর। মম দেখে তার দুই বোনকে। গর্ব করার মত দুই মেয়ে মামুন সাহেবের। তবে কোথাও না কোথাও অপূর্ণতা, অসম্পূর্ণতা ঠিক ঘিরে রেখেছে তাদের।

পাখি আপুর নাম এখন সর্বত্র। টিভিতে, অনলাইনে, পত্রিকার হেডলাইনে, এখন শুধু একটাই নাম শোনা যাচ্ছে, অনামিকা আহমেদ পাখি। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবী, উইমেন আইডল, আরও কত বিশেষণ যোগ হয়েছে তার আপুর নামে! অনামিকা আহমেদ পাখি সেই নাম, যেটা নেবার আগে দুবার ভেবে কথা বলতে বাধ্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া।

কিন্তু এবারের সমালোচনার ঝড়টা ভিন্ন। সেই ঝড় যখন ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়লো তাদের ছোট্ট পরিবারে, তখন বিশেষণগুলো কোনো কাজে আসেনি। দুর্বৃত্তরা দরজা ভাঙল, বাড়িঘর তছনছ করলো। মামুন আহমেদ সব দেখলেন, সব সহ্য করলেন। পাখির সাথে ও তার ব্যাপারে কথা বলা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন উনি। বুকের ভেতরে একরাশ ভয়, অপারগতা ও ক্লান্তি এসে জমেছিল ওনার। এই ঘটনার পর আর শেষ রক্ষা হলোনা।
হাসপাতালের বেডে এখন শুয়ে আছেন তিনি। হার্টে ব্লক, রিং পরানোর মতো অবস্থা নেই। চব্বিশ ঘণ্টা অবজার্ভেশনে রাখা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে একা থাকাটা নিরাপদ নয়। সেকথা ভেবেই ঝিনুক নিয়ে এসেছে ছোট বোনকে নিজের কাছে। ঢাকার একটা স্বনামধন্য কলেজে অধ্যাপনা করে ঝিনুক। শ্বশুরবাড়িতে আলাদা কদর আছে তার।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাড়ির ছোট বউ হিসেবে সে নিজেকে গড়ে নিয়েছে যত্নে, বুদ্ধিতে, ধৈর্যে। কিন্তু পাখির কথা উঠলে এই বাড়ির লোকেদের জিভ একটু আলগা হয়ে যায়। সমালোচনা করেন বাইরের লোকেদের সাথে তাল মিলিয়ে, তবে শব্দ মেপে, নিপুণ দক্ষতার সাথে। যতটুকু বললে গা বাঁচিয়ে হাসি ঠাট্টায় কথা উড়িয়ে দেয়া যায় ততটুকুই। কারণ অনামিকা আহমেদ নামের একটা ওজন আছে, যা সময়ে সুযোগে বেশ ভালোভাবেই ব্যবহার করে আসছে এই পরিবার।

মম এই সমীকরণের কোথাও পড়ে না।

সে পাখি নয়, ঝিনুকও নয়। সে শুধু একটা আঠারো বছরের তরুণী মেয়ে, যার বাবা হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়, যার বাড়িতে হামলা হয়েছে, যার যাওয়ার জায়গা এই মুহূর্তে নেই। এই বাড়িতে সে এসেছে আশ্রয় নিতে। কিন্তু সেটা যে ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির কেউ পছন্দ করছে না, সেটা উঠতে বসতে টের পায় সে।

এই যেমন এখন! সারাদিন ডাক্তারদের পেছনে পেছনে দৌড়েছে মম। কিছু টেস্ট করিয়ে, রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে, আবার নতুন করে টেস্ট করাতে নিয়ে যেতে হয়েছে মামুন সাহেবকে। ঝিনুক ব্যস্ত কলেজে, আসার সময় করে উঠতে পারেনি। দৌড় ঝাঁপ, ধকল যা যাবার মমর উপর দিয়েই যাচ্ছে। সকালে নাস্তাটাও করা হয়ে ওঠেনি। দিনশেষে বাড়ি ফিরে তাই সাতপাঁচ না ভেবেই খেতে বসে পরেছিল সে। ভুলে গিয়েছিল, এটা তার নিজের বাড়ি নয়। এখানে ভাতের হাঁড়িতে হাত দেবার আগে, অনুমতির প্রয়োজন।

“কথা শুনেছেন আম্মা! বলি এই মেয়ে, তোমার কি চক্ষুলজ্জাও নেই? বাপটা হাসপাতালে মরতে বসেছে, তোমার গলা দিয়ে খাবার নামে কি করে? আমরা হলে তো পানিও গিলতে কষ্ট হতো। আর তুমি? নবাবী হালে থাকছো, খাচ্ছো-দাচ্ছো, ঘুমাচ্ছো, বেড়াচ্ছো। তারউপর আবার এটা না সেটা চাই। ফরমায়েশের শেষ নেই! কেমন মেয়ে জন্ম দিয়েছে তোমার বাবা!”

ঝাঁঝালো গলায় ধিক্কার জানিয়ে বললেন জান্নাতী বেগম। বড় ছেলের বউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে এবার ঝিনুকের শ্বাশুড়িও বলে উঠলেন,

“ওকে বলে আর কি হবে? বড়টাকে দেখেই শিক্ষা নিচ্ছে। দেখছো না? বাপ যে হাসপাতালে ভর্তি, মেয়ের কোন হুশ আছে? না কোন ফোন, না কোন খবর! কোন দেশে, কার সাথে গিয়ে পড়ে আছে কে জানে! এইজন্যেই বলে মেয়ে মানুষ অনেক সাবধানে পালতে হয়। এত ছুট দিতে নেই। দুনিয়া চষে বেড়ানো মেয়েছেলেরা কি ভালো হয় নাকি! আগে কেউ মুখ খোলার আগেই গায়ে ফোস্কা পড়তো ওর বাপের। কিন্তু এখন? এখন তো পুরো দুনিয়া দেখছে, বলছে, থু থু ছিটাচ্ছে! টাকার নেশায় পরে উচ্ছন্নে গেছে মেয়ে, এখন ঠেলা সামলাও!”

চোখমুখ বিকৃত করে বলা ঝিনুকের শ্বাশুড়ির কথাটা গরম সিসার মত ঠেকলো মমর অন্তকর্নে। মা সমতুল্য বোনকে নিয়ে এধরনের বাজে মন্তব্য একদম নিতে পারে না সে। তবুও নিজেকে সংযত রেখে সে থমথমে মুখে বললো,

“আন্টি, দয়া করে একটু ভেবে চিন্তে কথা বলুন। আমার কোন আচরণে যদি আপনাদের সমস্যা হয় বা খারাপ লেগে থাকে, তার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি। তবে আমার আপুকে নিয়ে আমি কোন কথা সহ্য করতে পারবো না। ওনাকে নিয়ে কোন কথা বলবেন না, প্লীজ।”

“ওরে বাবা রে! ওনার বোনকে নিয়ে কিছু বলা যাবেনা! কেন গো? তোমার বোন জাত-পাত ভুলে আকাম কুকাম করে বেড়াবে, আর আমরা বলতেও পারবো না? তোমার বোনের কারণে মানসম্মান তো আমাদেরও থাকলো না। মানুষ তো আমাদেরকেও কথা শুনাচ্ছে। আর এমন তো না যে কিছু মিথ্যে! তোমার বোন নিজের মুখে স্বীকার করেছে সব। টিভিতে লাইভ দেখেছে সবাই। রাস্তা ঘাটের বে*শ্যারাও তোমার বোনের চেয়ে ভালো হয়। অন্তত টাকার জন্যে পুরুষ মানুষের বিছানায় যায়। তোমার বোন তো উল্টো টাকা দিয়ে একটা পশুর সাথে…..”

লাগামছাড়া হয়ে উঠলো জান্নাতী। চোখজোড়া বড় হয়ে গেল মমর। সে শুনতে পারলো না এসব। তেজী গলায় জান্নাতীকে থামিয়ে দিয়ে সে বলে উঠলো,

“চুপ করুন! আমার আপুর নামে আর একটাও বাজে কথা বলবেন না! নইলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

“কি বললি, কি বললি তুই! আমাদের খেয়ে, আমাদের বাড়িতে থেকে আমাদেরকেই শাসাচ্ছিস!”

তেড়ে এসে বললো ঝিনুকের জা। মমরও সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে দমে না গিয়ে এবার উল্টো ঝাঁঝালো গলায় বললো,

“কি আমাদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি করছেন? এই বাড়িটা করার সময় যে ধারের নাম করে আমার আপুর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা খসিয়েছেন সেটা ভুলে গেছেন? আপনার রুমের এসি, রান্নাঘরের ডাবল ডোরের ফ্রিজ, ড্রয়িং রুমের মাল্টিপ্লেক্স টিভি, বড় ছেলের বাইক, ছোট ছেলের চাকরি, এমনকি আপনার মেয়ের বিয়ের সময় যৌতুকের টাকাটা পর্যন্ত নিয়েছেন আমার আপুর কাছ থেকে! এসব হাত পেতে নেবার সময় মানসম্মান যায়নি, এখন হঠাৎ আপনার মান সম্মান জেগে উঠেছে, না?”

“মম!”

অকস্মাৎ সজোরে একটা থাপ্পর পড়লো মমর গালে।

“তোর সাহস কি করে হয় আমার শ্বাশুড়ির সাথে এভাবে কথা বলার!”

অভিমানী চোখজোড়ায় মুহূর্তেই ভিড় জমালো অশ্রুরা। নাহ্, গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে যাবার ব্যথায় নয়। বরং বোনের একতরফা পক্ষপাতিত্বে। তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় সে অভিযোগের সুরে জানাতে চাইলো,

“ঝিনুক আপু! আপু তুই জানিস না, উনি কিসব আজেবাজে কথা বলছিল পাখি আপুর নামে…”

“তোকে কতবার বলেছি, ঐ স্বার্থপর মহিলার নাম নিবি না আমার সামনে! কি বলেছে আমার শ্বাশুড়ি? নিশ্চয়ই মিথ্যে কিছু বলেনি। ঐ মহিলা যা করেছে, সেটাই হয়ত বলেছে। চুপ চাপ শোন, আর হজম করা শেখ!
নিজে তো দিন দুনিয়া ভুলে, নোংরামি করে বেড়াচ্ছে। জ্বালা হয়েছে যত আমাদের। এখন শুনতে তো হবেই!”

“আপু!”

গলা জড়িয়ে আসলো মমর।
পরিবর্তনটা ঠিক কখন এসেছে, জানা নেই মমর। তবে কোন এক ফাঁকে মিষ্টতার জায়গায় তিক্ততা এসে ভর করেছে পাখি ও ঝিনুকের সম্পর্কে। আর সেই তিক্ততা এখন এতটাই চরমে যে, নিজের আপন বোনকে নিয়ে কটুক্তিতে নীরব অবস্থান ঝিনুকের।

“সত্যি কথা যতই তেতো লাগুক, হজম তো করতেই হবে। তুই পাল্টা জবাব দেবার সাহস কোথায় পাস? আমার সংসারে ঝামেলা করতে এনেছি আমি তোকে?”

ঝিনুকের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মম। চিনতে চেষ্টা করলো তাকে। এই কি সেই ঝিনুক যার সাথে ছোটবেলায় এক বিছানায় ঘুমাতো সে? সেই ঝিনুক যার হাত ধরে স্কুল থেকে আসা যাওয়া হতো? রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেত? পাখির চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদে চড়ে এক বয়াম আচার ভাগাভাগি করে, এক বসাতেই শেষ করে ফেলতো?

“দেখো, দেখো, তোমার ছোটবোনের কীর্তি দেখো! এক রত্তি মেয়ের জবান একহাত লম্বা হয়েছে। আমাকে কথা শোনায়! আমার বাড়িতে এই মেয়েকে আমি আর রাখতে পারবো না বাপু। তুমি তোমার বোনকে বিদায় করো দেখি।”

চেয়ার টেনে বসে বিরক্তি নিয়ে বললেন ঝিনুকের শ্বাশুড়ি। মমর দিকে চোখ তুলে তাকালেন না আর। হাত নেড়ে নিজের কথার গুরুত্ব বোঝালেন। যেন অনেক অত্যাচার চালাচ্ছে মেয়েটা তাদের উপর। ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এখন।

“আম্মা, মম ছোট মানুষ। না বুঝে বেয়াদবি করে ফেলেছে। আমি তার জন্যে ক্ষমা চাইছি।”

নরম গলায় শ্বাশুড়ীকে বোঝাতে চাইলো ঝিনুক। মম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু। ঝিনুকের চেহারায় একরাশ বিরক্তি এসে ভর করেছে। এই বাড়িতে তার অবস্থান বোনেদের কারণে নড়বড়ে হয়ে উঠছে, এটা সে মানতে পারছে না।

“আর কত ঝিনুক? কত আর সহ্য করবো বলো! তোমার বোনেদের কীর্তি কারখানার জ্বালায় ঘরে বাইরে কোথাও টেকা মুশকিল। এইযে তোমার ছোটবোন, ওকে কি কম যত্নআত্তি করছি আমরা, তারপরও আম্মার সাথে কি খারাপ ব্যবহারটাই না করলো!”

আগুনে ঘি ঢালতে আফসোসের সুরে বলে উঠলো ঝিনুকের জা, জান্নাতী।

“জানো, ফ্রিজে একটাই ডিম ছিল। আমি বলেছিলাম বাবুর জন্যে রেখেছি। কিন্তু তোমার বোন মানা করা সত্ত্বেও চুরি করে সেটা ভেজে খেয়ে নিল! আচ্ছা, ও যদি বলতো, আমরা কি ওকে বাজার থেকে ডিম এনে খাওয়াতাম না, বলো? সেটাই বোঝাচ্ছিলেন আম্মা ওকে। কিন্তু এই মেয়ে উল্টো আমাদেরকেই যা নয় তাই বলে যাচ্ছে! যদি আমার বোন হতনা, তবে আম্মার পায়ে ধরে মাফ চাওয়াতাম!”

বিরক্তি নিয়ে তাকালো ঝিনুক তার জায়ের দিকে। এই মহিলা থাকেই তক্কে তক্কে। কীকরে শ্বাশুড়ীকে ঝিনুকের বিরুদ্ধে কানপড়া দেওয়া যায়! এখন সুযোগ পেয়েছে আরকি।

“মম, ক্ষমা চা আম্মার কাছে।”

মম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। যেন বোনের কথা তার কর্নগোহরে পৌঁছাতেই ব্যর্থ। সেটা দেখে ঝিনুকের মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। সে ধমকে বলে উঠলো,

“কি হলো, কথা কানে যায়নি?”

“আমি ক্ষমা চাইতে পারবো না আপু। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।”

মমর নির্লিপ্ত কণ্ঠের উত্তর শুনে তেঁতে উঠলো ঝিনুক।

“এত বেয়াদব হয়েছিস কবে তুই! বড়দের মুখে মুখে তর্ক করিস! তোকে বললাম না ক্ষমা চাইতে?”

“আমি ক্ষমা চাইবো না। কারণ আমি কোন অন্যায় করিনি। বরং উনি অসম্মান করেছেন বড়াপুকে। আমি যা বলেছি সত্যিই বলেছি।”

“মম, তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস!”

“করলে করছি। আজকে বাড়াবাড়ি হয়েই যাক। এই নয় দিনে, তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তো কম করেনি। এখন শেষটা আমিই করে যাচ্ছি।
কি যেন বলছিলে তুমি? পাখি আপু স্বার্থপর। আর তুমি? আজ তুমি নামকরা কলেজের লেকচারার হয়েছো, শ্বশুরবাড়িতে ছড়ি ঘোরাচ্ছো। এসব কার বদৌলতে? বিয়ের সময় তোমার রান্নাঘরের রুটি বেলার মেশিন থেকে শুরু করে, বিছানার চাদরটা পর্যন্ত কিনে পাঠিয়েছে আপু। আর সেই পাখি আপুকে তুমি আর তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মিলে যা ইচ্ছে শুনাচ্ছো। আজ তার নাম শুনতেও তুমি রাজি না। কারণ লোকে আপুকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলছে। অথচ, বোন হয়ে একটাবার তুমি আপুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা পর্যন্ত করোনি। জানতে চাওনি একবারো, আসলে কি হয়েছে, কেন হয়েছে, কেমন আছে সে এসবের মাঝে!
নাহ্, তুমি শুধু আছো নিজেকে নিয়ে। তোমার চিন্তা লোকে কি বলছে সেটা নিয়ে। তোমার শাশুড়ি, জা, ননদ কি চাইছে সেটা তোমার প্রায়োরিটি। নিজের বাবা বা বোনকে নিয়ে ভাববার মত সময় কোথায় তোমার?”

“তুই কি নির্বোধ? কিচ্ছু বুঝিস না? দেখিসনি কিছু, কানে ঢোকেনি তোর বোন নিজের মুখে কি বলেছে মিডিয়ার সামনে?”

“হ্যাঁ, শুনেছি। আর দেখেছিও। দেখেছি কিভাবে এতগুলো লোকের সামনে আমার বোনের উপর হামলা চালানো হয়েছে! দেখেছি কিভাবে তোমরা যাকে পশু বলো, সেই লোকটাই আমার বোনের জীবন বাঁচাতে নিজেকে ঢাল বানিয়েছে। আপুকে বাঁচাতে নিজে গুলি খেয়েছে। এসবের মাঝে তোমার মনে একটাবারও প্রশ্ন জাগেনি, যে আপু ঠিক আছে কি না? আপুর কোন ক্ষতি হয়নি তো?”

ঝিনুকের চোখ যেখানে শুধু পাখির অধঃপতন দেখছে, সেখানে মম প্রার্থনা করছে বড় বোনের সুস্থতার।

“তুমি তোমার মান সম্মান নিয়েই থাকো ঝিনুক আপু। আরামে সম্মানজনক জীবন কাটিয়ে যাও। তবে আমাকে এসবে টেনো না। নিজের মা সমতুল্য বোনের অপমানে, তোমার সম্মান অক্ষুণ থাকলেও, আমার থাকবে না। আমি সহ্য করতে পারবো না চুপচাপ।”

“কোথায় যাচ্ছিস তুই? মম!”

“আপাতত হাসপাতালে যাচ্ছি, বাবার কাছে।”

বলেই বেরিয়ে গেল মম। মনে মনে ঠিক করে নিল সে, দরকার হয় হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে ঘুমাবে, তবুও আর ফিরবে না এ বাড়িতে।

***

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_০২

রিকশা থেকে নামতে নামতে মম একবার আকাশের দিকে তাকালো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে। শীতের আকাশ একরকম গুমোট আকার ধরে রেখেছে। যেন শত ব্যথা, অভিমান, অভিযোগ নিজের বুকে ধারণ করে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সেই অব্যক্ত অভিযোগগুলো ব্যক্ত করা হয়ে ওঠেনা। চাপা পড়ে রয় মেঘেদের আড়ালে।

হাসপাতালের গেটের সামনে চেনা সেই বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। মানুষের ভিড়, অ্যাম্বুলেন্সের তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ, বাতাসে ভেসে থাকা ফিনাইলের তীব্র গন্ধ, অদ্ভুতভাবে, সবটাই এখন পরিচিত মনে হয় মমর। নয়দিনের ব্যবধানে সবকিছুই চেনা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। মনে পড়ে যায় আজ থেকে দশদিন আগের কথা।

*

অন্যান্য দিনের মতোই মামুন সাহেব মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে বসেছিলেন টিভির সামনে। নিউজ চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল পাখির প্রেস কনফারেন্স। মেয়ের সাথে মনোমালিন্য থাকলেও, নিউজ চ্যানেলে পাখিকে নিয়ে করা প্রতিটি সংবাদ মনোযোগ দিয়ে শোনেন তিনি। পাখির মনোবল ও অদম্য সাহস গর্বিত করে ওনাকে ঠিকই। তবে প্রচলিত সামাজিক নিয়মের মধ্যে মেয়েকে টেনে না আনতে পারাটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন উনি। আর দশজন বাবার মতোই পাখির ছন্নছাড়া জীবনটাকে গুছিয়ে দিতে চান মামুন সাহেব, কিন্তু পাখি চায় বাঁধনহারা হয়ে বাঁচতে।

বাবার সাথে বোনের এই নীরব সংঘাত ব্যাহত করে মমকে। সে বুঝতে পারে না, কেন বিয়ে করে সংসার সামলানোটাই মেয়েদের জীবনে মুখ্য হতে হবে। কেন এর বাইরে গিয়ে জীবনটাকে সাজানো অপরাধ? ভালোই তো আছে পাখি স্বামী সংসার ছাড়া। যদিও বা এটা সে নিজে থেকে বেছে নেয়নি, কিন্তু সে যখন নিজেকে সামলে বাঁচতে শিখে গেছে, তখন কেন তাকে জোর করতে হবে পুনর্বিবাহের জন্যে?

বাবা, আর নিজের জন্যে দু কাপ গরম গরম চা নিয়ে এসে বসেছিল মম সোফায়। প্রশস্ত হাসি ছিল ঠোঁটে। থাকবে নাই বা কেন? চিনের গুয়াংঝু শহরে আয়োজিত হয়েছে বিশাল বড় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সেখানেই আছে পাখি। এত বড় একটা ইভেন্টের মুলহোতাদের মাঝে তার বোন একজন। এটা কি কম!

এসবে পাখি কখন, কিভাবে, কেন জড়িয়েছে সেটা জানা নেই মমর। সে শুধু জানে, তার বোন ভুল কিছু করতেই পারে না! অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই ভুল কিছু নয়। তারা নয়ত একটু ভিন্নই, তাতে কি? অসহায় তো। তার বোন ঠিক কাজই করছে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে।

বাবার সাথে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বড় বোনকে টিভিতে দেখছিল মম। ঠিক তখনই সাংবাদিকদের আক্রমণাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়তে দেখা যায় পাখিকে। দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় মম বাবার দিকে। দেখে, মামুন সাহেবের কপালেও ফুটে উঠেছে অসন্তোষ ও উদ্বেগের ছাপ। দুরুদুরু বুকে দেখে মম, কি নির্দ্বিধায় পুরো বিশ্বের মিডিয়ার সামনে শান্ত হয়ে বসে পাখি অকপটে স্বীকার করে নেয় নিজের ভালোবাসা ও বিয়ের কথা!

পাখির বলা কথাগুলো যখন মস্তিষ্কে বাড়ি খাচ্ছে, সেই রেশ কেটে ওঠার আগেই টিভিতে দেখা যায় বিশৃংখলাকারীদের। ভীড় থেকে গুলি ছোঁড়া হয় পাখির উদ্দেশ্যে!

“পাখি!”

অস্পষ্ট সুরে ডেকে ওঠেন মামুন সাহেব। চোখজোড়া আতঙ্কে লাল হয়ে উঠেছে তার। বুকের বা পাশটা চেপে ধরেন উনি। ঘোরে থাকা মম ছুটে যায় বাবার কাছে।

দুঃস্বপ্নের মত কেটে যায় সে রাতটা। পাখিকে বার বার ফোন করে মম। কিন্তু একবারও ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ করা হয়নি। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি মামুন সাহেব। পায়চারি করতে থাকেন একটু পরপর। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মামুন সাহেবকে জোর করে হালকা কিছু খাইয়ে একটা ঘুমের ঔষধ দেয় মম পরদিন সকালে। পাখির ফোন তখন বন্ধ দেখাচ্ছে। তবুও কিছুক্ষন পর পর যোগাযোগের চেষ্টা করেই যাচ্ছিলো মম। মিডিয়া হাউজগুলো তখন উত্তাল! ভাইরাল হয়ে গেছে প্রেস কনফারেন্সের ঘটনা।

মম বিশ্বাস করতে পারে না। প্রেস কনফারেন্সে দেওয়া পাখির নিজের মুখের বিবৃতির পরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। কীকরে সম্ভব এটা? যেই পাখি আপু দীর্ঘ সাতটা বছর ধরে নিজের ভালোবাসার মানুষটির স্মৃতি বুকে আগলে বেঁচে আছে, যেই মানুষটিকে হারিয়ে ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়েছে সে, যাকে পাগলের মত অলিতে গলিতে খুঁজে বেরিয়েছে এত বছর, তাকে ভুলে হঠাৎ কি করে অন্য কাউকে আপন করে নিতে পারে সে?

ঘড়ির কাটায় এগারোটা বাজে তখন। সোশ্যাল মিডিয়াতে পাখিকে নিয়ে করা একের পর এক সংবাদ দেখতে ব্যস্ত মম। তখনই প্রচন্ড শব্দে ঝনঝন করে ভেঙে যায় ড্রয়িং রুমের কাচের জানালাটা।

চমকে উঠে মম। হাত থেকে পড়ে যায় ফোনটা। একটা বড় ইটের টুকরো এসে পড়েছে তার পায়ের কাছে। সেটার দিকে বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মম কয়েক সেকেন্ড। বাইরে থেকে ভেসে আসে মানুষজনদের চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ। কি হচ্ছে দেখার জন্য দু কদম এগিয়ে যেতে চায় মম। তবে তার আগেই প্রকাণ্ড শব্দে কেঁপে উঠলো বাড়ির সদর দরজাটা।
চমকে উঠে উল্টো পিছিয়ে যায় মম।

অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে মন। সাহস করে জানালার দিকে উঁকি দেয় সে। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে দেখতে পায় বাইরে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে।
তাদের ঘৃণায় বিকৃত রাগান্বিত চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে মেয়েটা। কয়েকজন মিলে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল দিতে দিতে জানালার মোটা লোহার গ্রীল ধরে এমনভাবে টানছে, যেন গায়ের জোরেই খুলে ফেলবে সেটা।

আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে মম দেখলো ভাঙ্গা জানালা দিয়ে একটা লোক আবারো একটা ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারছে তাকে উদ্দেশ্য করে। উড়ে আসা ইটের টুকরোটাকে পাশ কাটিয়ে মম ছুটে যায় তার বাবার কাছে। মামুন সাহেব ঔষুধের প্রভাবে তখনও ঘুমাচ্ছিলেন। ভেতরে ঢুকেই মম দরজা জানালা সব বন্ধ করে দেয়। বাইরে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ আরো তীব্র হচ্ছে। জানালার ভারী পর্দা টেনে দরজার সামনে চেয়ার টেবিল জড়ো করে যথাসম্ভব আটকে দেয় মম।

ইতিমধ্যে সদর দরজা ভেঙে লোকজন ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে। ভাংচুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে ড্রয়িং রুম থেকে। এত শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে মামুন সাহেবের। বুক চেপে ধরে উঠে বসেন উনি। ছোট মেয়েটাকে রুমের ভেতর হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি করতে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যান। ধীর গলায় ডেকে ওঠেন,

“মম,”

বাবার দিকে ফিরে তাকায় মম। কি বলবে ভেবে পায়না সে। শব্দ শুনে বুঝতে পারে, লোকগুলো পুরো বাড়ি তছনছ করছে। তাদেরকে হাতের নাগালে পেলে রক্ষা থাকবে না আর। কি করবে ভাবতে গিয়ে মমর মনে হয় পুলিশকে ফোন করা দরকার। কিন্তু নিজের ফোনটা তো ড্রয়িং রুমেই ফেলে এসেছিল, তবে এখন?

“মম? কি হচ্ছে বাইরে?”

অসুস্থ বাবার প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করে অস্থির দৃষ্টিতে চারদিকে নজর ঘুরিয়ে মামুন সাহেবের ফোনটা খুঁজে বের করে মম। দ্রুত ডায়াল করে পুলিশের ইমার্জেন্সী নম্বরটিতে। ফোনে কথা বলার সময়ই মম দেখে রুমের দরজায় জোরে জোরে আঘাত করা শুরু করেছে লোকগুলো। খুব বেশি সময় লাগবে না তাদের দরজা ভাঙতে। আতঙ্কিত মম ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে।
মামুন সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে তার। চোখজোড়া ফুলে লাল হয়ে আছে। বহু বছর ধরে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত মামুন সাহেব অস্থিরতা ও উদ্বেগের কারণে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেন। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু জিভটা নাড়াতে পারছেন না ঠিকমত। মুখ দিয়ে লালা ঝরা শুরু হয় তার। বাবাকে এই অবস্থায় দেখে মমর ভয় বাড়লো বৈ কমলো না।

“মম? ওরা…ওরা কি আমাদের মারতে এসেছে?”

বহু কষ্টে ঠোঁট নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন মামুন সাহেব। তারপর আর সহ্য করতে পারলেন না। চোখ উল্টে গেল ওনার। বিছানায় কাত হয়ে পড়ে গেলেন মামুন সাহেব।

বাবার এই অবস্থা দেখে শব্দ করে কেঁদে উঠলো মম। ওনাকে ধরে ঝাঁকিয়ে বেশ কয়েকবার ডেকেও কোন সাড়া পেলনা সে। ভয়ে হাত পা কাঠ হয়ে আসে মমর। এই মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন বাবাকে। কিন্তু কিভাবে? দরজায় শব্দ বাড়ছে। চৌকাঠ আলগা হয়ে এসেছে প্রায়। ওরা ভেতরে ঢুকে পড়বে যেকোন সময়ে! সেদিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মম।

কিন্তু না! পরক্ষনেই মনে পড়ে এভাবে বসে থাকলে হবেনা। কিছু করতেই হবে! বাঁচতে না পারলেও, বাঁচার চেষ্টা তো করতে হবে। দ্রুত হাতে চোখমুখ মুছে বাবার আলমারি খোলে মম। ভেতরে পেয়ে যায় কাঙ্খিত জিনিসটা। একটা প্লাস্টিকের বাক্স। টুকটাক রিপেয়ারিংয়ের কাজের জন্যে এতে প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতি রাখেন মামুন সাহেব। বাক্সটা খুলে সেখান থেকে একটা বড় সাইজের প্লায়ার্স ও কেঁচি হাতে তুলে নেয় মম।

শুকনো একটা ঢোক গিলে বাবার অচেতন পরে থাকা শরীরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। ছোট থেকে বাবা বুকে আগলে মানুষ করেছেন তাদের। আজ মমর পালা। বাবাকে আগলে রাখতে না পারলেও, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে সে। আড়াল করে রাখবে তাকে। দেবেনা কাউকে এই মানুষটার ক্ষতি করতে। দু হাতের মুঠোয় শক্ত করে জিনিস দুটো চেপে ধরে ভয়ংকরভাবে কাপতে থাকা দরজাটার দিকে তাকিয়ে রয় মম।

হঠাৎ করে থেমে যায় কম্পন। তবে দরজার বাইরে এখনো শোনা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ লোকেদের আওয়াজ। অপেক্ষা করতে থাকে মম। শ্বাস প্রশ্বাস চলছে দ্রুত গতিতে। চোখের পলক ফেলে না সে। একটাই কথা মাথায় ঘুরছে, বাঁচতে হবে! বাঁচাতে হবে!

এক একটা সেকেন্ড যেন এক এক যুগের মত দীর্ঘায়িত হয়। বাইরের শোরগোল কমে এসেছে। ভাংচুরের আওয়াজ এখন আর শোনা যাচ্ছে না। কি হচ্ছে বুঝতে পারে না মম। সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে বাবাকে আড়াল করে। সেখান থেকেই কান পেতে শোনার ও বোঝার চেষ্টা করে বাইরের পরিস্থিতি। আচমকা দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। ভেসে আসে জোরালো আওয়াজ।

“কেউ আছেন ভেতরে? আমরা পুলিশের লোক। পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আর ভয় নেই, বেরিয়ে আসুন!”

*

শিউরে উঠলো মমর ভঙ্গুর কায়া। সেদিন সঠিক সময়ে পুলিশ না এলে যে কি হতো!

মানুষ সমাজের নির্মাণ করেছে জীবনের তাগিদে। আমরা ভাবি, সমাজ মানে আশ্রয়। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করি আমরা। ভাবি, এত মানুষের মাঝে কাউকে না কাউকে তো পাশে পাওয়া যাবে বিপদে। কিন্তু না।
ভিড় কোন সত্ত্বা নয়। বিবেক, আবেগ বা দ্বিধা মানুষের থাকে, ভিড়ের নয়। ভিড় শুধুই একটা শক্তি, নিরপেক্ষ ও অন্ধ শক্তি। এই শক্তিকে যেদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সেদিকেই চলে। সত্য-মিথ্যা বা ন্যায়-অন্যায়ে বিভেদ করে না। যুক্তি শুধু একটাই। আমরা সংখ্যায় বেশি, তাই আমরাই সঠিক। এই ভয়ংকর সরলতা নিয়ে এগিয়ে যায় ভিড়। যদি সেটা আমাদের পক্ষে হয়, তবে আমরা সুরক্ষিত। আর যদি বিপক্ষে হয়,
তবেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি, সমাজ আমাদের আশ্রয় নয়, কেবলই একাকিত্বকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার মাধ্যম।

মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে সেই ভয়ংকর স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে মম। ফাঁকা করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে সে। একদম কর্ণারের শেষ কেবিনটায় আছেন মামুন সাহেব। পুলিশ এসে উদ্ধার করার পরপরই তাকে এনে এডমিট করা হয় ইমার্জেন্সী বিভাগে। ডাক্তার জানিয়েছেন, ওনার বহু বছরের পারকিনসন্স রোগটা এখন এডভান্সড স্টেজে চলে গেছে। বারবার শরীর শক্ত হয়ে আসছে। শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তার। হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। সেদিক থেকেও কন্ডিশন ভালো না। অপারেশন করা জরুরি হলেও, সেই ধকল সামাল দেবার মত শারীরিক স্থিতি ওনার নেই।

অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবার কেবিনের সামনে পৌঁছায় মম। আনমনে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। ভেতরে নজর বুলাতেই থমকে যায় মম। পা জোড়া থেমে যায় আপনাআপনি।

মামুন সাহেবের বেডের পাশে একটা টুল টেনে ওনার হাত ধরে বসে আছে এক রমণী। নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে সাদা ট্যাংক টপ পরনে তার। সেটার উপর পা অবধি লম্বা একটা মিক্সড প্রিন্টের শ্রাগ ঝুলছে কাঁধে। পায়ে শোভা পাচ্ছে স্টিভ ম্যাডেনের উঁচু হিলের পাম্প সু। পরিপাটি, অভিজাত এবং আত্মবিশ্বাসী এই রমণীটির চেহারা অবশ্য আড়াল করে রেখেছে মাথায় জড়ানো লম্বা একটা স্কার্ফ এবং চোখের বাদামি শেডের গগলস।
কিন্তু মমর সেকেন্ড মাত্র সময় লাগে তাকে চিনতে। চোখজোড়া ভরে উঠলো তার মুহূর্তেই। গলায় কিছু একটা যেন এসে আটকে গেছে। এতদিনের দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক, অসহায়ত্ব, সব একসাথে বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পা দুটো অসাড় হয়ে গেছে মমর। চাইলেও নাড়াতে পারছে না সে। হাঁটু ভেঙে আসছে মমর। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও যেন ফুরিয়ে এসেছে। এতদিন যে সাহস শরীরে শক্তির যোগান দিয়েছে, এই মুহূর্তে তারাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পিছিয়ে যায়। অস্পষ্ট স্বরে মম কোনমতে ডেকে উঠলো পাখিকে।

“আপু…”

***

চলবে…

অবহেলার দিনগুলি পর্ব-০৫ এবং শেষ পর্ব

#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম -১
#ইলোরা_ফারদিন

জহির শরীর দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছে। শরীর দুর্বল হয়ে পরেছে। এই তো এক বছর আগেই সুঠাম দেহের সুদর্শন একজন পুরুষ ছিল, কিন্তু আজ, আজ গলার নিচের হাড় বেরিয়ে এসেছে, মাথার চুল পরে যাচ্ছে, গালের চাবা বসে গিয়েছে। সব সময় জ্বর সর্দি লেগেই থাকে। অফিসের কাজ কর্মও আর আগের মতো করতে পারে না। তাই অফিস থেকে নোটিশ জারি করেছে তার জন্যে। যদি তিন মাসের মধ্যে সে আবার আগের মতো কাজের প্রতি মনোযোগী না হতে পারে, তবে তাকে নিচু পোস্টে ট্রান্সফার করা হবে। যদি সেখানেও সে নিজের কাজ দেখাতে না পারে তাহলে তাকে অফিস থেকে বরখাস্ত করা হবে। এসব চিন্তায় জহিরের মন ভালো নেই। তবে তার মন খারাপের আরো কিছু কারণ রয়েছে।

সেবার ডায়রিয়া থেকে সারার পর সে সুমনা আর তার বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু সুমনা দেখা করতে দেয় নি, নিজেও জহিরের সামনে আসে নি। তার কথা সে কোনো প্রতারকের সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক না আর নাই বা ইচ্ছুক তার বাচ্চারা। বিচ্ছেদের সময় আদালতে জহির স্বেচ্ছায় বাচ্চাদের উপর নিজের সব অধিকার ছেড়েছিল। কিন্তু এখন অনুশোচনা হচ্ছে তার। বাধ্য হয় বাচ্চাদের স্কুলে যায় দেখা করতে। কিন্তু শিক্ষক যখন প্যারেন্টস রূমে নির্জন নাদিয়াকে ডেকে পাঠায়, তখন নির্জন নিজের বাবাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর শিক্ষককে কড়া কন্ঠে বলে,” আমার বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছে স্যার। ইনি আমার বাবা ইন। যেদিন থেকে ইনি আমার মাকে আমাদেরকে ছেড়ে আরেকটি আন্টির কাছে চলে গিয়েছিল সেদিন থেকে ইনি আমাদের কাছে মৃত।আর আপনি আমার মায়ের পারমিশন না নিয়ে কোন সাহসে এই লোকের সামনে আমাদের আনলেন। ইনি যদি আমাদের ক্ষতি করে। আমার বোনটার মানসিক অবস্থা ভালো নেই। এই মনস্টারটার জন্য আমাদের জীবনটাই এমনিতেই ট্রমাটাইজ। ইনাকে দেখে আমাদের ম্যান্টাল কন্ডিশন আরো খারাপ হয় যায়। তাই দয়া করে আর কোনোদিন এনার কথায় আমাদের সামনে আনবেন না। আমাদের মা ছাড়া আমাদের আর কোনো গার্ডিয়ান নেই।” বলেই বোনকে নিয়ে সে চলে যায়। এদিকে টিচারদের সামনে, অন্য প্যারেন্টস দের সামনে লজ্জায় মাথা নত করে জহির। তারপর আর সে সুমনা বা বাচ্চাদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে নি। তবে দু মাস আগে সুমনার বড় বোন রোমানা সুমনার বিয়ের ছবি দিয়েছে। সুমনার পাশে লোকটিকে মারাত্মাক মানিয়েছে। এমনকি বিচ্ছেদের পর সুমনার বয়স যেন দশ বছর কমে গিয়েছে। এতো সুন্দর লাগছিল সুমনাকে। জহির নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিল যে তার সংসারে সুমনার এই রূপ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল?? কিন্তু উত্তর পায় নি। কিন্তু স্বার্থপর জহির বুঝলো না যে তার সংসারে সে সুমনার যত্ন নেয় নি বলেই সুমনা নিজের রূপ হারিয়েছিল।

জহিরের ভাবনার মাঝেই রিতা ঘরে আসলো। হিসহিসিয়ে বলল,” আমি আজ রাতে মৌনতাদের সাথে সিলেট যাচ্ছি। তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পরিও।”

” সিলেট যাচ্ছো মানে? আজ যাবে, আর তুমি এখন আমাকে বলছো? ফাজলামি পেয়েছো? আমার ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। আমাকে এই অবস্থায় ফেলে তুমি ঘুরতে যাচ্ছো রিতা? একবারও মনে হচ্ছে না যদি রাতে আমার শরীর আরও খারাপ হয় তখন কি হবে? একটাবারও ভেবে দেখেছো?
শুনতে খারাপ লাগলেও আমার সত্যি মনে হচ্ছে তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোই বাস নি রিতা। এই যে আমি এতোগুলো মাস ধরে অসুস্থ, একটা দিনও আমাকে এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দাও নি, সেবা তো আমার কল্পনা। এই যে আজ দুপুরেও আমি সব খাবার বমি করে ফেলেছি। কিন্তু সে সময় তুমি আমার পাশে থেকেও এগিয়ে আসো নি। উলটো আমার বমি দেখে নাক চেপে খাবার ফেলে বারান্দায় চলে গিয়েছিল। এরপর আমার আশেপাশেও আসো নি। এই যে আমার অসুস্থ শরীর, পেট খালি খোজ নিয়েছো? নাও নি?
এটাকে কি ভালোবাসা বলে রিতা? এই তোমাকে ভালোবেসে আমি আমার বারো বছরের সংসার, স্ত্রী, সন্তান সব ছেড়েছি। কিন্তু বিনিময়ে কি পেলাম? নিজের অসুস্থতায় তোমার নির্লিপ্ততা, তোমার উদাসীনতা?
এই আমি যখন সুমনার সাথে ছিলাম, আমার সামান্য হাচিতে সে বিচলিত হয়ে যেত। আমার জ্বর হলে সারারাত সে পাশে বসে থাকত, সময়মতো আমাকে ওষুধ দিত, আমার জন্য আলাদা করে খাবার রান্না করতো। এখন তো মনে হয় সুমনাই আমাকে ভালোবাসতো।”

জহিরের কথায় চটে গেল রিতা। রাগে ফুল দানিটা হাতে নিয়ে ফিকে মারলো মিররের দিকে। মুহুর্তের মাঝে ফুলদানিটা ভেঙে গুড়োগুড়ো হয়ে গেল। তারপর হিসহিসিয়ে বলল,” ভুলেও তোমার প্রথম স্ত্রীর সাথে আমার তুলনা করবে না জহির। আমি সুমনা নই। সুমনা যদি এতোটাই ভালো হতো, তাহলে ছাড়লে কেনো? ওহ তখন তো তোমার আমার সুন্দর শরীরের প্রতি লোভ জেগেছিল। তাই না? ”
” রিতা, মুখ সামলে কথা বলো।”
” পারব না। আমি সুমনা না, আমি রিতা। তাই আমার সাথে সুমনার তুলনা করতে এসো না। এতো খারাপ লাগলে যাও সুমনার কাছে চলে যাও।” রেগে বলল রিতা
রিতার কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো জহির। তারপর বলল,” এই আমাকে নিজের কাছে রাখার জন্য সুই*সাইড করতে চেয়েছিলে তুমি। আর সেই তুমি আজ আমাকে চলে যেতে বলছো? আজ আমার বড্ড বেশি অনুশোচনা হচ্ছে জানো তো রিতা। নিজের সুখকে আমি নিজের হাতেই কবর দিয়েছি। আর সেটার শাস্তিই বুঝি আজ পাচ্ছি।”

জহিরের কথায় রিতা কি উত্তর দিবে খুজে পেল না। আসলেই তো, এই জহিরকে পাওয়ার জন্য কত কিই না করেছে, কত পাগলামিই না করেছে। অতীতের দিনগুলো কত সুখেরই না ছিল। কিন্তু হুট করে যে কি হলো। সব এলোমেলো হয়ে গেল। জহিরের অসুস্থতা যত বাড়তে লাগলো, জহিরের প্রতি রিতার বিরক্তিগুলোও নাড়তে লাগলো। তার উপরে আবার ধীরে ধীরে জহির কেমন জানি হয়ে গেল। সব কিছুতেই জহিরের অনুমতি নিতে হয়। দম বন্ধ লাগে রিতার। রিতা আর কিছু না বলে নিজের ব্যাগটা নিয়ে বাসার বাহিরে চলে গেল।

আর জহির বারান্দায় থম মেরে বসে থাকলো।

—————-

অস্ট্রেলিয়ায় একটি ছিমছাম বাড়িতে সুমনার নতুন সংসার। হ্যা, সুমনা বিয়ে করেছে। তবে বিয়েটা ছিল নিজের আর তার সন্তানদের জন্য। কারণ আমরা মেয়েরা যত বড় বড় কথা বলিই না কেনো, আমাদের একজন অভিভাবকের খুব প্রয়োজন, কারণ আমরা মেয়েরা খুবি আবেগ প্রবণ, তাই বিপদ আমাদের পিছনে ঘুরে। এই অভিভাবক আপনার বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে। যেহেতু সুমনার বাবা বেচে নেই, তার ভাইও নেই, স্বামীও নেই, ছেলেটার বয়স কম, তাই তার একজন অভিভাবকের প্রয়োজন ছিল। তাই তো দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে করেছে মিনহাজ আহমেদকে। দুই বছর আগে তার স্ত্রী মারা যায়। তারপর থেকেই দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়।

নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে চা খাচ্ছে সুমনা। মনে পরে গেল মিনহাজ আর তার প্রথম দেখা।

অতীত,

ঢাকার একটি ব্যস্ত রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে মিনহাজ আর সুমনা।
নিরবতা সুমনাই নিজের কথা শুরু করলো,” মিনহাজ সাহেব, আমি বেশি লুকোচুরি পছন্দ করি না। আমি বিয়েটা করছি শুধুমাত্র আমার আর আমার বাচ্চাদের মেরুদণ্ড শক্ত করতে, আমাদের একজন অভিভাবক দরকার। স্ত্রী হিসেবে আপনার সব চাহিদাও মেটাব। কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসার আশা করবেন না। বারো বছর একটা কাপুরষকে শয়তান জানো*য়ার প্রতারককে ভালোবেসে ঠকেছি। তাই আর এইসব অনুভূতি নিজের মনে জাগানোর সাহস নেই। এখন দেখেন আমাকে বিয়ে করলে আপনার পোষাবে কি না।”

মিনহাজ হালকা হেসে বললো,” আপনি আমার সাথে মানিয়ে নিতে পারলে আমার সমস্যা নেই। আমার একটি পরিবার দরকার। তাই আপনাকে আপনার বাচ্চা সহ বিয়ে করতে চাই। আমার বাবা মা নেই। দুটো বোন আছে, তারা যে যার সংসারে ব্যস্ত। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি অস্ট্রেলিয়ায় একাকীত্বের জীবন কাটাচ্ছি। কিন্তু দু মাস আগে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। আমি বাসায় একা ছিল। ভাগ্যক্রমে সেদিন আমার পিএ অফিসিয়াল কাজে আমার বাসায় এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় পায়। সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সেই যাত্রায় আমি বেচে যাই। কিন্তু সেদিন আমি অনুভব করি আমার একটি পরিবার দরকার। আপনার দুলাভাই আমার বন্ধু হওয়ায়, সে আপনার কথা আমাকে বলে।”

সুমনা কি মনে করে জিজ্ঞেস করলো, ” আপনার স্ত্রী কিভাবে মারা গিয়েছে?”

” মারা যায় নি, আমি নিজেই তাকে মে*রেছি।”

হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সুমনা, কথার খেই যেন হারালো।

চলবে….

#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম -২
#ইলোরা_ফারদিন

“আমার আর ভালো লাগছে না চৈতী। দম বন্ধ লাগছে এই সম্পর্কটাতে। এখন মনে হচ্ছে বিয়ে করেই ভুল করেছি।” হতাশ কন্ঠে বলল রিতা

” কি বলিস? নিজেই তো ওই বুইড়াটাকে নাচতে নাচতে বিয়ে করলি। ও নাকি তোর ট্রু লাভ। ” হাসতে হাসতে বলল চৈতী

“সত্যি বলতে বিয়ের আগে তাই ই মনে হতো। জহির সব সময় আমাকে সব বিপদ থেকে প্রোটেক্ট করতো। আমাকে আগলে রাখতো। আমার ছোট খাটো বিষয় খেয়াল রাখতো। ধর কখনো কাজের মাঝে যদি আমার বিরক্তি লাগলো, সাথে সাথে সে আমার মন ভালো করতে আমার পছন্দের বার্গার অর্ডার দিত। সব সময় আমাকে স্পেশাল ফিল করাতো। ও যখন আমার পাশে থাকতো আমার নিজেকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হতো। ও আমার পছন্দ অপছন্দ সব কিছুর প্রতি দৃষ্টি রাখতো। আমি বলেছিলাম আমার সমুদ্র পছন্দ। সে আমার জন্মদিনে আমাকে সেন্ট মার্টিন নিয়ে যায়। সৈকতে স্পেশাল ডেটের আয়োজন করে। চারপাশে কি সুন্দর লাইটিং করা ছিল। এরকম হাজার হাজার বার সে আমাকে স্পেশাল ফিল করিয়েছে। একদম বাচ্চাদের মতো কেয়ার করতো। তার চলাচল, তার গোছানো কথাবার্তা সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করতো। আমি তার প্রতি ভয়ংকর ভাবে আসক্ত হয়ে পরেছিলাম।
বিয়ের পর কয়েকমাস সব ঠিক থাকলেও ধীরে ধীরে সব এলোমেলো হতে লাগলো। আমি আবিষ্কার করলাম যেই গোছানো মানুষকে আমি ভালোবেসেছিলাম ওটা মোটেও জহিরের আসল রূপ ছিল না।
তুই জানিস চৈতী, টয়লেট করে ও ফ্লাশ করতে ভুলে যায়। পরে আমি গেলে দেখি পুরা কোমডে ময়লা। আর গন্ধ তো আছেই। মাঝে মাঝে সে মনের ভুলে আমার ব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করে। তাই এখন আমি নিজের ব্রাশ লুকিয়ে রাখি। গোসল করে ভেজা গামছা বিছানায় ফেলে রাখে। ঘর অগোছালো করে রাখে। বিছানায় বসে টিভি দেখতে দেখতে খায়, আর পুরো ঘর নোংরা করে রাখে। দিনে নাহয় বুয়া এসে কাজ করে দেয়। রাতে আমাকেই করতে হয়। তার উপর আবার দুই দিন পর পর তার শরীর খারাপ হচ্ছে। সারাদিন নাক দিয়ে ফ্যাস ফ্যাস করে সর্দি পরে আর জ্বরে কোকায়। ঘেন্নায় আমার গা গুলায়। কয়েকমাস আগে তো আবার ডায়রিয়া হলো। ভাইরে ভাই সেই কি গন্ধ ঘরে। ওর দেখতে এখন সত্তর বছরের বুড়া মনে হয়। আমি শারীরিক ভাবেও স্যাটিসফাইড না। আর ঘোরাঘুরি? সেটা আমার জন্য স্বপ্ন। অফিসেও ওর ডিমোশন হয়েছে। মে বি চাকরিটাও থাকবে না। পরের মাস থেকে একটি বুয়াও আসবে না। কারণ টাকার সংকট।
বিয়ের পর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম জহির তো আছেই। কিন্তু এখন দেখি আমি নিজের মেকাপের জিনিসপত্রও ঠিকভাবে কিনতে পারছি না। বিয়ের আগে জহির আমাকে কেয়ার করতো, আর এখন আশা করে যে আমি ওর দাসী হয়ে থাকব, ওর সেবা যত্ন করব, ওর জন্য তিন বেলা খাবার বানাবো।
পারবো না এসব করতে চৈতী। আমার দ্বারা এসব সম্ভব না।” মন খারাপ করে বলল রিতা

“বিয়ের এই কয়েক মাসেই এই অবস্থা, তাহলে ভাব জহিরের প্রথম স্ত্রী বারো বছর কিভাবে সংসার করলো। কত সেক্রিফাইস করেছিল সে নিজের সংসারের জন্য। আর তুই তার হাতে গড়া সেই সংসারটাই কেড়ে নিল। এমনকি তার হাতে সাজানো বাসাটাও নিয়ে নিলি। আর এখন বলছিস জহিরকে ভালো লাগে না?” তাচ্ছিল্য স্বরে বলল চৈতী।
সুমনার কথা উঠতেই তেতে উঠলো রিতা। হিসহিসিয়ে বলল,” খবরদার ওই মহিলার সাথে আমার তুলনা করতে আসবি না। ওর নিজের স্বামী আটকানোর মূরদ ছিল না বলেই ওর স্বামী আমার পেছনে আসছে। এমন কি আমি যদি জহিরকে লাথিও মারি, তবু ও এসে আমার পা চাটবে। কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না। এটা আমার যোগ্যতা। আর ওই সুমনার ব্যর্থতা। এখানে আমার কোনো দোষ নেই।” বলেই উঠে চলে গেল রিতা

রিতার চলে যাওয়া দেখলো চৈতী। বিরবিরিয়ে বলল,” আমি দোয়া করি রিতা তোর এই অহংকার ভাঙ্গুক। একটা মেয়ের সাজানো সংসার ভাঙার শাস্তি তুই যেন পাস, দুটো বাচ্চা থেকে তাদের বাবা কেড়ে নেয়ার শাস্তি যেন তুই পাস। মন থেকে দোয়া করি আমি।”

____________

“আমার স্ত্রী রুপন্তির সাথে আমার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। ওর বয়স কম ছিল। সবে ১৭… কিন্তু পড়াশুনার প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। আমিও ওকে সেই সুযোগ দিলাম। এরই মধ্যে আমাদের মেয়ে প্রিয়া পৃথিবীতে আসলো। প্রিয়ার ভালো ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি অস্ট্রেলিয়া চলে আসলাম। সময় যেতে লাগলো।
একদিন হুট করেই বাংলাদেশ থেকে খবর এল আমার মেয়ে নিখোঁজ। আমি আর দেরি না করে দেশে ফিরে গেলাম। সাত দিন পর আমার মেয়ের খন্ডিত দেহ পাওয়া গেল। সেদিন আমি পাগলের মতো কেদেছিলাম। তারপর নিজেকে ঘিরবন্দি করে ফেললাম। এভাবে পুরো একটা মাস কেটে গেল। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী একদম স্বাভাবিক। তার মাঝে কোনো কষ্ট নেই। উলটো সে আমাকে বোঝাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার জন্য। আমার সন্দেহ লাগলো। আমি গোপনে পুলিশকে এ বিষয়ে জানালাম। তারপর তদন্ত করে পাওয়া গেল আমার স্ত্রীর পর*কীয়া বিষয়ে আমার মেয়ে জেনে গিয়েছিল। মেয়ে আমাকে সব জানাতে চেয়েছিল বলে আমার স্ত্রী আর তার প্রেমিক নির্মম ভাবে আমার বাচ্চাটাকে মে*রে ফেলে। পেপারেও উঠেছিল এই ঘটনা। রুপন্তিকে জেলে নেওয়ার পরেও আমার রাগ কমে নি। তাই আমার ওই পুলিশ বন্ধুর সহায়তায় জেলে ঢুকি। এরপর নিজের হাতে ওর মু*খে বি*ষ ঢে*লে দিই। পরবর্তীতে টাকা দিয়ে মিথ্যে রিপোর্ট বানানো হয় যে রুপন্তি হার্ট অ্যাটাক করেছে।
এখন আপনিই বলুন সুমনা, আমি কি ভুল করেছি?” সুমনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো মিনহাজ

সুমনা মিনহাজের দিকে তাকিয়ে, হালকা হেসে উত্তর দিল,” মোটেও না। এর চেয়েও করুন মৃ*ত্যু হলে আমার আত্মাটা শান্তি পেত। যেই মা নিজের স্বার্থে, নিজের গর্ভজাত সন্তানকে এতো হিং*স্রভাবে মে*রে ফেলতে পারে, সেই মা কোনো ক্ষমা ডিজার্ভ করে না মিনহাজ।”

চলবে…

#অবহেলার_দিনগুলি
#অন্তিম
#ইলোরা_ফারদিন

“জহির তোমার এইচ আই ভি পজিটিভ। ”
কথাটি শোনা মাত্রই জহিরের গলা শুকিয়ে গেল। কিভাবে কি হল, তার মাথা কাজ করছে না। কাপা কাপা গলায় ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলো, ” এটা কিভাবে সম্ভব ডক্টর। ”

” যদি আপনি কোনো এইডস রোগীর ব্যবহৃত ব্লেড, রেজার, সুচ ব্যবহার করেন, বা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করেন, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শা*রিরীক সম্পর্ক স্থাপন করেন , তবে আপনিও এই রোগে আক্রান্ত হবেন।”

” কিন্তু আমি তো এসব করি নি।”

“তা তো জানি না আমি।”

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছে জহির। কিন্তু পা যেন তার চলছেই না। কি থেকে কি হয়ে গেল। কিভাবে হলো এসব? মাথা কাজ করছে না তার! আর রিতা? সে তো এই কথা জানতে পারলে সাথে সাথেই তাকে ছেড়ে দিবে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবে জহির। প্রথম স্ত্রী সন্তানরা নেই, চাকরি নেই, টাকা নেই, এখন যদি রিতাই না থাকে। ঘামতে শুরু করলো জহির।
কাপা কাপা শরীরে বসে পরলো ফুটপাতে। চোখের সামনে ভাসতে লাগলো তার জীবনের শুরু থেকে এখন অব্দি ঘটা পুরো ঘটনা।

নিজে পছন্দ করেই বিয়ে করেছিল সুমানাকে। সংসারে তখন অনেক অভাব। কিন্তু সুমনা কিভাবে যেন সব মানিয়ে নিয়েছিল। কোনো আলাদা চাহিদা ছিল না তার। কোনোদিন মুখ ফুটেও বলতো না আমাকে একটি শাড়ি কিনে দেও। উলটো জহিরের যখন প্রথম চাকরিটা চলে যায় তখন তার মায়ের দেয়া এক ভরির গলার চেনটি বিনা বাক্যে বেচে দিল। সেই চেন বিক্রির টাকায় ছয় মাস চলেছিল। খুজে দেখলে এরকম হাজারটা ঘটনা সামনে চলে আসবে যেখানে সুমনা নিজের হাজার হাজার শখ-আহ্লাদ-শখের জিনিস বিসর্জন দিয়েছে শুধুমাত্র সংসারের পেছনে। তার ইনকাম বাড়ার পরেও সুমনা কোনোদিন বারতি খরচ করে নি। টাকা জমিয়েছে, একটি নিজের সুন্দর বাসা বানাতে। কতই না সুখের সংসার ছিল তার।কিন্তু জহির কি করলো নিজের স্ত্রী সন্তানদের সাথে প্রতারণা করলো। রিতাকে পেতে স্ত্রী সন্তানকে ছাড়লো, এমনকি সুমনা আর বাচ্চাদের উপর থেকে আশ্রয়ও কেড়ে নিল। বাবা হিসেবেও সে ব্যর্থ। তার আপন সন্তানরাও তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু যেই রিতার জন্য সে এতো অন্যায়, এতো পাপ করলো সেই রিতা তাকে কোনোদিনও ভালোবাসে নি। সে ছিল রিতার চাহিদা পুরণের মেশিন। যখন দেখলো সেই মেশিনটা আর কাজে দিচ্ছে না, টাকা-বিলাশিতা দিতে পারছে না তখনি তার আসল রূপ বেরিয়ে আসলো।
জহির মনে মনে ভাবলো, পাপ তো সে একা করে নি। রিতাও সে পাপের সমান ভাগিদার। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর ঘর ভেঙেছে, ইচ্ছে করে মাথার আশ্রয় কেড়ে নিয়েছে, সন্তানদের থেকে তাদের বাবাকে আলাদা করেছে। শাস্তি তো রিতারও প্রাপ্য। মনে মনে নতুন খেলার ছক কষলো জহির।

————–

” জহির তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।” নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল রিতা

” ডিভোর্স চাও?” তাচ্ছিল্য হেসে বলল জহির

” বুঝতে পেরেছো যেহেতু, ভালো। আমার দমবন্ধ লাগছে তোমার এই সংসারে। আমি একটু শান্তিতে বাচতে চাই জহির।”

অট্টস্বরে হেসে উঠলো জহির। তারপর বলল,” শান্তি চাও? যাও চলে, কিন্তু আমার প্রথম স্ত্রী আর সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে পারবে যাদের আমি তোমার জন্য ছেড়েছিলাম?”

” তুমি কোনো দুধ খাওয়া বাচ্চা নও জহির। যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে নিজে নিয়েছিলে। আমি জোর করি নি।”

” আত্মহ*ত্যার হুমকি কে দিত রিতা? আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল কে করতো?”

” আমি কে ছিলাম? কেনো তুমি আমার ওসব হুমকিকে পাত্তা দিয়েছিলে। কেনো হুমকিতে নিজের সংসার ভেঙেছো। দোষী তুমি। আমি না। যাই হোক। কাবিনের ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে দিও।”

” তুমি জানো রিতা আমার কাছে ত্রিশ লাখ কেনো, পঞ্চাশ হাজার টাকাও নেই।” করুণ কন্ঠে বলল জহির

“সেটা আমার ব্যাপার না। এই বাসাটা আছে, এটা বিক্রি করে দিও।”

” আচ্ছা দিব, কিন্তু তার বিনিময় চাই।” বাকা হেসে বলল জহির

” কি চাও?” অবাক কন্ঠে বলল রিতা

” আজকের রাতটা।”

“রাজি আমি।”

জহির আর কিছুই বলল না। এগিয়ে গেল রিতার দিকে।

——————-

আজ এক বছর হলো জহির আর রিতার ডিভোর্সের। রিতা এখন ব্যস্ত তার নতুন অফিসের বসকে পটাতে। কিন্তু রিতার শরীরের অবস্থা ভালো নেই। শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পরছে। জ্বর সর্দি লেগেই থাকে।

রিতা আজ ছুটি নিয়েছে। জ্বরটা বেরেছে। হুট করেই কলিং বেল এর শব্দে সে তড়িঘড়ি যেয়ে দরজা খুললো। তার নামে পারসেল এসেছে। পারসেল খুলতেই একখানা মেডিকেল রিপোর্ট চোখে পরলো। নাম দেখলো জহিরের। তারপর রিপোর্ট এ চোখ বুলাতেই হাত পা কেপে উঠলো তার। এক বছর আগের রিপোর্ট। এউচ আই ভি পজিটিভ। তার মানে!!! বুঝতে বাকি রইলো না রিতার। সেদিন জহির বিনিময়ে তার কাছে একটা রাত চেয়েছিল বটে, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল নিজের রোগ রিতার মাঝে দেয়ার। আর সেটাই হয়েছে। রিতা ভয়ে, আতংকে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো। এখন কি হবে তার?

__________

বাড়ি বিক্রির পর জহির তার গ্রামের বাসায় ফিরে গিয়েছে। বাসা বিক্রির ভালোই টাকা পেয়েছিল। ওখান থেকে ত্রিশ লাখ রিতাকে দিয়ে বাকি পঞ্চাশ লাখ জহিরের কাছে ছিল। ওগুলো ব্যংকে রেখেছে। প্রতিমাসে যা মুনাফা আসে ওটা দিয়েই দিব্যি চলে যায়। কিন্তু শরীরটা দিন দিন আরও ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে আশি বছরের বৃদ্ধা। তবু চলছে জীবন। চলুক। পাপ করেছে, শাস্তি তো পাবেই।

———-

সাত মাসের গর্ভবতী সুমনা। জীবনটা বেশ চলছে তার। মিনহাজ চমৎকার একজন মানুষ। বাচ্চারাও এখন খুব সুখী। মিনহাজকেই তারা নিজের বাবার মতো ভালোবাসে।
ধীর পায়ে সুমনা জানালার পাশে এসে দাড়ালো। মনে মনে বলল,” তুমি কোনোদিন জানতেই পারবে না জহির তোমার শরীরে ওই মরণব্যাধির ভাইরাস প্রবেশের মূল কারিগর আমি। সেদিন তোমার চায়ে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে রেখেছিলাম নিজের কার্য সিদ্ধির জন্য। তারপর জানোই তো একজন মানুষ কিভাবে ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়!!!!”
আমি সুমনা। আমি যেমন ভালোবাসতে জানি, ভালোবেসে জীবন দিতে জানি, তেমনি ভাবে যাদের ঘৃণা করে তাদেরকে তাদের প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতেও জানি।”

সমাপ্ত।

অবহেলার দিনগুলি পর্ব-০৪

#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_৪
#ইলোরা_ফারদিন

“আপা, আমার জন্য সুন্দর দেখে একটা বর খুজো তো। শুনো, ছেলের যাতে টাকা পয়শা ভালো থাকে আর আমার বাচ্চাদের যাতে মেনে নেয়। বারো বছর আগে শূন্য পকেটে বেকার এক পুরুষকে বিয়ে করেছিলাম। বারোটা বছরে নিজের শখ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে তার সংসার করেছি। কিন্তু বিনিময়ে কি পেলাম? প্রতারণা? বারো বছর পর সে যখন সফল হল জীবনে, তখন চোখের পলকে আমাকে ভুলে যেয়ে নতুন নারীতে মত্ত হলো। আমাকে একদম ছুড়ে ফেলে দিল। কি লাভ হল বলো?
তাই তো এবার ঠিক করেছি প্রতিষ্ঠিত পুরুষককে বিয়ে করব। সে কামাই করবে, আমি আরামে শুধু বসে বসে খাব। ঠিক বলেছি না?
শুনো আজই তুমি তোমার ওই পরিচিত ঘটকের সাথে কথা বলবে। ওই অমানুষ বেইমানটার সাথে আমার ডিভোর্সের চারমাস হয়ে গিয়েছে। আমি কেন আর একা থাকব বলো। নাচে নাচে বিয়ে করব।” কষা মুরগীর তরকারি দিয়ে ভাত খেতে খেতে বলল সুমনা

বোনের কথায় টাসকি খেল রোমানা। বোনটা একদম তার মায়ের মতো শক্ত মনের হয়েছে। কাউকে ভালোবাসলে জীবন দিতে রাজি, কিন্তু কেউ যদি এদের মন নিয়ে খেলে তাদের জীবন ধ্বংস করতে দ্বিতীয় বার ভাববে না।
রোমানা সুমনাকে আরেক পিস গোস্ত তুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো,” সত্যি কি ঘটক লাগাবো?”

“অবশ্যই। আমি কি সারাজীবন একা মরে পচব নাকি? বাচ্চারা বড় হচ্ছে। এক সময় ওরা বিয়ে করে নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত হবে। তখন? আমি কি করব? আমারও নিজের একটি সংসার প্রয়োজন আপা। আমারও একটু যত্ন আহ্লাদের প্রয়োজন আছে। আগের ভুল এবার আর করব না। এবার নিজেকে ভালোবাসব, একটু বেশিই ভালোবাসব। আমাকে স্বার্থপর ভাবলে ভাবতে পারো।” কথা বলার সময় চোখে অশ্রু জমলো সুমনার। যতই অস্বীকার করুক। আজও সে জহিরকে ভালোবাসে, ভুলতে পারে নি। কিভাবে ভুলবে? জহির প্রতারক হলেও, সুমনা তো সত্যি সত্যি তাকে ভালোবেসেছিল।

——————

আজকাল জহিরের শরীর ভালো যাচ্ছে না। দুদিন পর পর সর্দি জ্বর-এলার্জি আরও কত কি। শরীরটা যেন ভেঙে পরেছে। অফিসও অনেক মিস দিয়েছে এই কয়েকমাসে। ফলে সেখানেও একটি বাজে প্রভাব পরছে।
এদিকে দু দিন হল তার ডিসেন্ট্রি। একেবারে ভয়ানক লেভেলের। ওষুধ খেয়েও নিয়ন্ত্রণে আসচগে না। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে কালকের মধ্যে ঠিক না হলে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।

জহিরের খুব পানি পিপাসা পেয়েছে। এসব ডাক্তার বার বার সেলাইন আর ডাবের পানি খেতে বলেছে। কিন্তু এসব এগিয়ে দেয়ার মতো মানুষ নেই। রিতা তো কালকেই আলাদা রুমে চলে গিয়েছে। বলেছে জহির একেবারে সুস্থ হলে এ ঘরে আসবে। জহিরের কাছ থেকে নাকি পায়খানার গন্ধ আসে, এ ঘর নাকি পায়খানার গন্ধে ভরে গিয়েছে।

এসব ভাবনার মাঝে জহিরের মনে পরে যায় আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের ঘটনা। যাত্রাবাড়ীতে একটি হোটেলে খেয়ে তার ভয়ংকর ডায়রিয়া হয়েছিল। পুরো সাতদিন সে বিছানায় পরেছিল। এমনকি বিছানাতেই পায়খানা করে দিত। আর সেসব ময়লা কাপড় সুমনা নিজের হাতে পরিষ্কার করতো। একটু পর পর জহিরকে সেলাইন বানিয়ে খাওয়াতো। সাতটাদিন পরম যত্নে জহিরের সেবা করেছিল সুমনা। কই সুমনাতো একটাবারের জন্য নিজের নাট সিটকায় নি বা তার থেকে দূরে সরে যায় নি!
এই রিতাই তো একটা সময় জহিরকে পাওয়ার জন্য আত্মহ*ত্যা করতে চেয়েছিল, সেই রিতা আজ তার অসুস্থতায় এভাবে নাক সিটকাচ্ছে! এটা কেমন ভালোবাসা রিতার।

ইদানীং সুমনার কথা বড্ড বেশি মনে পরে জহিরের। অসুস্থ শরীরে এখন সে বিছানায় পরে আছে, কিন্তু রিতা তার পাশে নেই। কিন্তু রিতার জায়গায় যদি আজ সুমনা থাকতো তাহলে সে এক সেকেন্ডের জন্যও জহিরকে একা ছাড়তো না। জহিরের কেনোজানি আফসোস হচ্ছে। সে কি ভুল করলো সুমনাকে ছেড়ে। আচ্ছে বাচ্চারা কেমন আছে? যেই বাচ্চাদের সে এত ভালোবাসত, রিতাকে পেয়ে সেই বাচ্চাদেরও ভুলে গেল। একটা বারের জন্যও ভাবে নি বাচ্চারা বাবা ছাড়া কিভাবে বড় হব। কিন্তু এখন? এখন বড্ড বেশি আফসোস হয় বাচ্চাগুলোর জন্য। আচ্ছা সে যদি এখন বাচ্চাদের সামনে যায়, তাহলে কি তারা তাদের বাবার সাথে কথা বলবে? বাবার বুকে মাথা রাখবে?
এসব কথা ভেবেই চোখ ভরে আসে জহিরের।

——————

নির্জন আজ বাসায় আছে বোনের কাছে। বোনটা অসুস্থ। তাই সে আজ স্কুল যায় নি। তার বাবা মা যখন প্রথম সেপারেশনে গেল, তখন বয়স তার ১১ মাত্র। তার মা অবশ্য কিছু লুকায় নি তার কাছে। তার বাবার জীবনে যে নতুন আন্টি এসেছে, আর সেই আন্টিই তার বাবার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই তো বাবা ছেড়ে দিয়েছে তাদের, বোঝে নির্জন। এখন তার বয়স ১২। মায়ের কষ্ট, স্ট্রাগল বোঝে সে। সেজন্য তো চায় মায়ের উপর যাতে চাপ না পড়ে। মেয়ে অসুস্থ দেখে সুমনা আজ অফিস যেতে চায় নি। কিন্তু যেতে বাধ্য হয়েছে। এই চাকরি না থাকলে বাচ্চাদের খাওয়াবে কি? বাসা ভাড়া দিবে কিভাবে? স্কুলের ফি দিবে কিভাবে?
আর নির্জন বোঝে এখন মায়ের সমস্যা। নাদিয়া ছোট হলেও সেই একটু একটু বোঝে যে বাবা পচা। মাকে কষ্ট দিয়েছে। তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তাই তো সেও বাবাকে আর চায় না, বাবাকে ঘেন্না করে।
কিন্তু কষ্ট কি হয় না? দুই ভাই বোনেরি কষ্ট হয় যখন দেখে অন্যরা বাবা-মাকে নিয়ে কত খুশি, কিন্তু তাদের বাবা তাদের সাথে নেই….

চলবে…

অবহেলার দিনগুলি পর্ব-০৩

#অবহেলার_দিনগুলির
#পর্ব_৩
#ইলোরা_ফারদিন

“আমি আর রিতা এ বাসায় শিফট হতে চাচ্ছি সুমনা। তোমাকে আর বাচ্চাদের নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে দিব।” মাথা নিচু করে বলল জহির

জহিরের কথায় অট্টস্বরে হেসে উঠলো সুমনা। তারপর বলল,” এই একটা জিনিসই তো চেয়েছিলাম জহির, এটাও দিতে পারলে না? আচ্ছা আমাদের যে এতো বছরের সংসার ছিল, সামান্যতম সম্মান কি নেই আমাদের সংসারটির প্রতি? ভুলে গিয়েছ যখন শূন্য পকেটে ছিলে, তখন একটু একটু করে আমি এই সংসার গুছিয়েছিলাম। নিজের শখ আহ্লাস বিসর্জন দিয়ে আমি ব্যংকে টাকা রাখতাম এই বাসাটা বানানোর জন্য। আজ তুমি আমাকে আমাদের সন্তানদেরকে আশ্রয়হীন করতে চাচ্ছ? আমাদের মাথার উপরের ছাদ কেড়ে নিতে চাচ্ছ? রিতার ভালোবাসায় এতোটাই পাগল হয়েছো যে নিজের সন্তানদের মুখটাও চোখের সামনে আসে না? ওরা তো তোমারি অংশ জহির।”

নিজের মাথা নিচু করল জহিল। কিছু বলার নেই তার। সত্যি সুমনা বা বাচ্চাদের প্রতি সে কোনো টান অনুভব করে না। সে এখন শুধুমাত্র রিতার। তবু আমতা আমতা করে বলল,” আমি তো বলেছি তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব আমার। এতো কাহিনী করার কি আছে। আর এ বাসাটা যেহেতু আমার, আমি কেন বাহিরে ভাড়া বাসায় থাকব।”

” ভরণপোষণের দায়িত্ব সত্যি নিয়েছো? কিন্তু এই ছয় মাসে এক টাকাও তো সংসারে দাও নি। একবারও কি মনে হয় নি যে সুমনা তো গৃহিণী। ও কিভাবে সংসার চালাচ্ছে। একটি বারও খোজ নেও নি। ছয় মাস ধরে নিজের বাচ্চাগুলোর মুখটা দেখারও প্রয়োজন বোধ করো নি। তুমি কু স্বামীর পাশাপাশি কু পিতাও জহির।
যাই হোক। আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে না। আর না বাসা ভাড়া লাগবে আমাদের। কারণ তোমার প্রিয় দ্বিতীয় স্ত্রী বিষয়টি মেনে নিবে না। সে আবার তোমাকে আত্মহ*ত্যার হুমকি দিবে। তাই দরকার নেই। আমাদের টা আমরা বুঝে নিব। চা টা শেষ করও। এরপর আর কোনোদিন আমার হাতের চা খেতে পারবে না।”

জহিরও আর কিছু না বলে চা টা খেল। কিন্তু সোফা থেকে দাড়াতে যাবে তার আগের মাথাটা চক্কর দিল তার। তারপর চোখের সামনে সব অন্ধকার।

জহির যখন চোখ খুললো তখন সে বিছানায় শোয় তার সামনে বসে আছে সুমনা। হাতে সেলাইন লাগানো।
জহিরকে চোখ খুলতে দেখেই সুমনা বলল, ” মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলে। ডাক্তার এসেছিল। বলেছে স্ট্রেসের কারণে হয়েছে। তাই সেলাইন দিয়েছে।
আর তোমার ২য় স্ত্রী বার বার ফোন দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাও।”

সুমনার কথা শুনে জহির তড়িঘড়ি করে তার ফোন হাতে নিল, দেখলো রিতার ৩০০+ মিসড কল। তা দেখে তাড়াতাড়ি সে দৌড়ে বের হয়ে গেল সে।

জহিরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল সুমনা। তার কাজ শেষ। এখন সময় এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার।

______________

আজ প্রায় এক মাস হলো জহির রিতা কে নিয়ে জহিরের বাসায় এসেছে। সুমনা পরের দিনই বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। সুমনা আর যোগাযোগ করে নি। এদিকে জহিরও যোগাযোগের চেষ্টা করে নি। হুটহাট বাচ্চাদের কথা মনে পরলেও রিতা থেকে পাওয়া সুখের কাছে তা নগন্য। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফেসবুক স্ক্রল করছিল জহির। কিন্তু হুট করে তার চোখ আটকালো দশ মিনিট আগে পোস্ট করা একটি পোস্টের দিকে। পোস্টটি করেছে সুমনারি এক ফ্রেন্ড যে একটি বড় মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে। ছবিটি একটি অফিস ট্যুরের, রাঙামাটিতে। কিন্তু সেখানে সুমনা আর বাচ্চাদের দেখে চমকে গেল জহির। আরেকটি ছবিতে সুমনা তার ছেলে কলিগদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। সব চেয়ে বড় কথা সুমনাকে তাতের নীল শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে। জহিরের কেন জানি বিষয়টা সহ্য হচ্ছে না। তাই সে সাথে সাথেই কল দিল সুমনাকে।

জহির কল দিতেই সুমনা রিসিভ করলো। জিজ্ঞেস করলো,
” হ্যা, বলো। এতোদিন পর কি মনে করে?”

” তুমি আমার অনুমতি ছাড়া কোন সাহসে রাঙামাটি গিয়েছ সুমনা? যেয়ে আবার পর পুরুষদের সাথে ঢলাঢলি করছো?” রাগান্বিত স্বরে বলল জহির

” অনুমতি নেয়ার মতো সম্পর্কটা কি আছে আমাদের জহির? আর তুমিও তো অফিসিয়াল ট্যুরে যেতে, কতবার আমার পারমিশন নিয়েছো? অবশ্য সেগুলো অফিসিয়াল ট্যুর কম, তোমার প্রি ওয়েডিং হানিমুন ছিল। যাগ গে, যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমি ব্যস্ত আছি।”

” তুমি জব করছো? আমাকে জানিয়েছো? তোমাদের যা লাগবে আমাকে বললেই তো হতো।”

” তাই নাকি? আচ্ছা বলো তো জহির, এই সাত মাসে আমাদের ভরণপোষণের জন্য কত টাকা দিয়েছো। এই যে আমাকে আর আমাদের সন্তানদের বাসা থেকে বের করে দিলে, একবার খোজ নিয়েছিলে যে কোথায় যেয়ে আশ্রয় নিয়েছি? নাকি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। নাও নি তো। তাহলে এখন কোন মুখে জিজ্ঞেস করছো যে আমি কেনো চাকরি করছি। তুমি কি চেয়েছিলে তোমার আশায় আমরা না খেয়ে মরব? ”

সুমনার প্রশ্নের জবাব নেই জহিরের কাছে। চুপ করে থাকলো সে।

এদিকে জহিরকে চুপ থাকতে দেখে সুমনা আবার বলল,” শুনো, কাল তোমার বাসায় আইনি নোটিশ যাবে। আমাদের ডিভোর্সের। বাচ্চাদের ভরণপোষণের জন্য আমি এককালীন ১৫ লক্ষ টাকা আর আমার কাবিনের পাচ লক্ষ টাকা রেডি রেখো। যদি ঝামেলা করতে চাও তাহলে মামলা কোর্টে উঠবে। তখন তোমার আর রিতার মান সম্মান থাকবে কিনা ভেবো।”

সুমনার কথায় গা জ্বলে উঠলো জহিরের। সুমনার মতো মেয়ে নাকি তাকে ডিভোর্স দিবে। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,” তুমি না বলেছিলে আমাকে সারাজীবন স্বামী হিসেবে চাও, তাহলে এখন ডিভোর্সের এতো তাড়া কেনো? নতুন কাউকে পেয়েছো বুঝি।”

” ভুল ছিলাম আমি। তোমার মতো কাপুরুষ প্রতারকের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করা বোকামি। আর কি করেছো আমার জন্য তুমি যে আমি সারাজীবন তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে। আমার সাথে প্রতারণা করেছে, আমার বিশ্বাস ভেঙেছ, সন্তানদের অবহেলা করেছে, আমাদের আশ্রয় কেড়ে নিয়েছো। এখন কোন মুখে এসব কথা বলো? লজ্জা করে না? সে যাই হোক, আমি ব্যস্ত। বাকি কথা উকিলকে সাথে নিয়ে হবে।” বলেই ফোনটা রেখে দিল সুমনা।

অন্যদিকে জহির অবাক হলো। কেন জানি তার বুকটা ভাড় লাগছে। কই আগে যখন সে নিজে সুমনাকে তালাক দিতে চেয়েছিল, তখন তো এরকম লাগে নি। তাহলে এখন কেন???

চলবে…

অবহেলার দিনগুলি পর্ব-০২

#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_২
#ইলোরা_ফারদিন

জহির বেশ আনন্দেই আছে। থাইল্যান্ডে দুই সপ্তাহ হানিমুন করে আজ ফিরলো। সে এখন নতুন করে জীবনটাকে উপভোগ করছে। রিতার বেড পারফরম্যান্সও অসাধারণ। সুমনার মাঝে এই জিনিসটা ছিল না। একদম মরা মাছ। নিজের জীবনের এতোগুলো বছর সে সুমনার মতো একটা বোরিং মরা মাছের সাথে কাটিয়েছে ভেবেই বিরক্তিতে মুখ কুচকালো জহির। একটু পরেই চোখ যখন রিতার উপর পরলো মনটা মুহুর্তের মাঝে ভালো হয়ে গেল। পৃথিবীতে এখন সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ সুখী মানুষ মনে করে। চারদিকে শুধু সুখ আর সুখ। আর সেই সুখের মূল রহস্য রিতা।

এদিকে নতুন বিয়ের পর একটি বারের জন্যও সে সুমনাকে কল দেয় নি। বাচ্চাদের খোজ নেয় নি। এমনকি সে সুমনাকে সংসার খরচের টাকাটাও দেয় নি। এই যে বাজার খরচ, বাচ্চাদের স্কুল টিউশনির ফি এসব সুমনা কিভাবে দিবে একটা বারের জন্যও সে ভাবে নি। সে ব্যস্ত তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে। লোকে বলে না পুরুষ তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে বেশি যত্নে রাখে, দ্বিতীয় স্ত্রীই পুরুষের আসল শখের নারী, কথাটি যেন জহির নিজেই প্রমাণ করে দিল। নাহলে যেই সুমনা তার শূণ্য পকেটে তার পাশে ছিল, পকেট ভরতেই সেই সুমনাকে সে ছুড়ে ফেলে দিল। এইজন্যই হয়তোবা আজকাল মেয়েরা বিয়ে করার জন্য প্রতিষ্ঠিত পুরুষ খোজে। কারণ জানে ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর প্রথম স্ত্রীকে আর নিজের যোগ্য মনে করে না। অবশ্য যারা আসল পুরুষ তারা এমন না, তারা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে স্ত্রীকে আরও মাথায় তুলে রাখে।

___________

“এভাবেই ওই প্রতারকটাকে ছেড়ে দিচ্ছিস সুমনা?” আহত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো রোমানা

বোনের কথায় উম্মাদের মতো হেসে উঠলো সুমনা। হাসতে হাসতে বলল,” আমি ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পছন্দ করি আপা। সেজন্য যদি আমার একটা বছর সময়ও যায়, সমস্যা নেই। কিন্তু কাজটা যেন নিখুঁত হয়।
আমি যেখানে নিজের রক্তের বাপকেই ছাড় দিই নি, সেখানে জহির কে?

তোমার মনে আছে আপা, আব্বা যখন পরকীয়ায় জড়ালো তখন আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। যেই আব্বার চোখের মণি ছিলাম আমরা দুই বোন। সেই আব্বাই একদিন হুট করেই অচেনা হয়ে গেল। বাসাতে আসতো না, কথায় কথায় আম্মার গায়ে হাত তুলতো। আরও কত কি। ক্লাস সেভেনে থাকতে একদিন লোক মুখে জানতে পারলাম আব্বা নাকি পাশের গ্রামের শিউলি নামের আঠারো বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করবে।

২য় বিয়ে না করতেই আব্বা যেখানে আমাদের এতো অবহেলা করতো, ২য় বিয়ের করার পরে যে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না সে আমার ঢের জানা ছিল। তাই আমি আর মা মিলে আব্বার সাথে কি করেছিলাম মনে আছে না? আব্বা সারা জীবনের জন্য তার হাটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। তাই তো আর দ্বিতীয় বিয়ে করা হয় নি তার। কারণ কোনো মেয়েই তার স্ত্রী হয়ে গু মুত পরিষ্কার করতে রাজি ছিল না।
এরপর আম্মা আব্বার ব্যবসা নিজের হাতে নিয়ে নিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আব্বাকে দুনিয়াতেই নরক যন্ত্রণা সহ্য করিয়েছিলাম আমি আর আম্মা। তুমি তো তখন তোমার স্বামীর বাসায়। ভেবেছো সেদিন যদি আমি আর আম্মা আব্বার এই অবস্থা না করতাম তাহলে আব্বা ২য় বিয়ে করতেন। ব্যবসা বাড়ি সব যেত তার ২য় স্ত্রীর হাতে। তোমার সংসার ভাঙতো। আর আমি আম্মা রাস্তায় রাস্তায় আশ্রয়ের খোজে ঘুরে বেড়াতাম।
তবে আম্মা কিন্তু আব্বাকে ফেলে দেয় নি। সম্পত্তি ব্যবসা সব নিজ দায়িত্বে নিয়েছিলেন ঠিকি, কিন্তু আব্বার সেবাও করেছেন। তার গু মুত নিজে পরিষ্কার করেছেন। তার কথা ছিল সে আব্বার স্ত্রী হয়ে এ বাসায় এসেছেন, আব্বার স্ত্রী হয়েই মৃত্যুকে বরণ করবেন। আর আব্বার পাশে দ্বিতীয় নারীর অস্তিত্ব সে থাকতে দিবেন না।”

” তাহলে তুইও কি আবার জহিরের সাথে সংসার করতে চাস?” অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল রোমানা

” মাথা খারাপ নাকি? আমি আম্মার মতো এতো দয়ালু না। প্রতারকের আমার জীবনে জায়গা নেই। আমি একজন সুপুরুষের সাথে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ডিজার্ভ করি। কিন্তু তার আগে জহিরকে ধবংস করব। এমন ভাবে ধ্বংস করব যেন সে তার মৃত্যু কামনা করে। আমার এতো বছরের সংসারকে সে খু*ন করেছে, আমার আত্মাটাকে খু*ন করেছে, আমার সন্তানদের শৈশব টাকে খু*ন করেছে। এতোগুলো খু*নের খুনিকে এমনি কি করে ছেড়ে দিই বলো তো আপা? ”

” আর রিতা? ওকে এমনি এমনি ছেড়ে দিনি?”

” আগে জহিরের শাস্তি টা দিই।পরের টা পরে দেখা যাবে!”

____________

বুয়ার হাতের রান্না খেতে ভালো লাগে জহিরের কিন্তু জহির বাধ্য হয় খায়। রিতার রান্না বান্না করতে কষ্ট হয়। তাই তো বাসায় তিন তিনটে কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। যাতে রিতার বিন্দু মাত্র কষ্ট করতে না হয়। কিন্তু এই জহির যখন সুমনার সাথে সংসারে ছিল তখন বাসার সব কাজ সুমনা একা হাতে করতো। শুরুর দিকে অভাবের সংসার, তখন কাজের মেয়ে রাখা স্বপ্নের মতো।কিন্তু যখন জহিরের বেতন বাড়লো সুমনা অবশ্য কয়েকবার বলেছিল কাজের মেয়ের কথা। কিন্তু জহির না করে দেয়। সে নাকি সুমনার হাতের রান্না ছাড়া খেতে পারে না। কাজের মেয়েরা ভালো করে কাপড় ধুতে পারে না। আর আজ সেই জহিরই তার ২য় স্ত্রীর জন্য বেশি বেতনে তিনটে বুয়া রেখেছে।সুমনার সংসারে সুমনাই সব সেক্রিফাইস করতো, এডজাস্ট করে চলতো। কিন্তু রিতার সাথে সংসারে জহির সেক্রিফাইস করে, এডজাস্ট করে চলে।

বিয়ের ছয় মাস চলছে জহির আর রিতার। এই ছয় মাসে রিতাকে মাথায় করে রেখেছে জহির। কিন্তু ভুলে গিয়েছে তার প্রথম স্ত্রী আর সন্তানদের কথা।

অন্তরঙ্গ মুহুর্ত কাটিয়ে বিছানায় উদাম গায়ে শুয়ে আছে জহির। আর তার উন্মুক্ত বুকে মাথা দিয়ে রেখেছে রিতা। হুট করেই রিতা বলল,” আমরা কতদিন ভাড়া বাসায় থাকব জহির?”

” আর একটা বছর কষ্ট করো জান। ফ্লাট বুকিং দিয়ে দিয়েছি।”

” কিন্তু আমি নতুন ফ্লাটে থাকতে চাই না। আমি তো এখনকার বাসাটাতেই থাকতে চাই,যেখানে তোমার প্রথম বউ থাকছে।”

রিতার কথায় জহিরের হুট করেই সুমনা আর বাচ্চাদের কথা মনে পরলো। এই ছয়টা মাস সে একবারো তাদের খোজ নেয় নি। এমনকি ওরাও ফোন দেয় নি। বুকটা কেমন জানি করে উঠলো। সুমনা তো গৃহিণী। এই ছয় মাস কি করে সংসার চালিছে সে! মনটা মুহুর্তের মাঝে আনচান করে উঠলো তার।

জহিরকে চুপ থাকতে দেখে রিতা আবার বলে উঠল,” কি হলো চুপ করে আছো কেন? আমি ও বাসাতেই থাকব ব্যাস! এর বাহিরে আর কিছু বলতে চাই না।”

” রিতা বোঝার চেষ্টা করো। ও বাসাটা সুমনার হাতে গড়া। বাচ্চাদের স্মৃতি ওখানে। কি করে ওদের বের করে দিব? ওরা কোথায় যাবে? ”

” ওদের নতুন বাসা ভাড়া করে দেও।”

” এটা সম্ভব নয় রিতা। একটু বুঝদারের মতো কথা বলো! ওই বাসার প্রতিটা কোণা সুমনার হাতে গড়া। ও শুধু ওই বাসাটা আমার কাছে চেয়েছে। বাচ্চাদের আশ্রয়টা চেয়েছে।আর সবচেয়ে বড় কথা আমি তো তোমার কাছে আছি। ওদের ছেড়ে তোমার কাছে এসেছি। ওই সামান্য বাড়ি দিয়ে কি করবে। ওটা থাক না ওদের কাছে। আমি বনানীতে তোমার জন্য নতুন ফ্লাট কিনছি।”

এবার ক্ষেপে উঠলো রিতা। চোখ ভর্তি পানি এনে কাদতে কাদতে বলল,” ওটা সুমনার বাসা না এখন। ওটা আমার বাসা। ওখানেই আমি আমার সংসার গড়ব। তুমি যদি ওদেরকে ও বাসা থেকে বের না করো তাহলে আমি নিজেকে শেষে করে দিব জহির।” বলেই ফলের ঝুড়ি থেকে চাকু হাতে নিল।

রিতার এরূপ আচরণে ভরকে গেল জহির। বাধ্য হয়ে বলল,” ঠান্ডা হও জান৷ তুমি যা চাবে তাই হবে। তবু নিজের ক্ষতি করো না। তোমার কিছু হলে আমি বাচবো না জান।”

জহিরের কথায় খুশি হলো রিতা। সাথে সাথে হাতের ছুড়িটা ফেলে জড়িয়ে ধরলো জহির কে। তারপর বলল,” তোমাকে অনেক ভালোবাসি জহির। তুমি আমার সব।”

জহিরও রিতাকে বুকে আরও চেপে বলল,” আমিও তোমাকে ভালোবাসি জান।”

চলবে…

অবহেলার দিনগুলি পর্ব-০১

#অবহেলার_দিনগুলি
#পর্ব_১
#ইলোরা_ফারদিন

“সুমনা, প্রতিদিনের এসব ঝগড়া ভালো লাগছে না। আমরা বরং আলাদা হয়ে যাই। আমার নিজেরও আর এই সংসারের প্রতি আর তেমন টান নেই। এমনকি তোমার প্রতিও না। তোমার কাবিনের টাকা পেয়ে যাবে। আর বাচ্চাদের ভরণপোষণের টাকাও আমি পাঠিয়ে দিব। আমি শুধু মুক্তি চাই এই সম্পর্কটি থেকে। দমবন্ধ লাগে এই সংসারে।” অফিস থেকে ফিরেই জহির কথাগুলো বলল

” রিতাকে কি বিয়ে করেছো নাকি করবে?” ম্নান হেসে জিজ্ঞেস করল সুমনা

” বিয়ে করি নি। কিন্তু পরের মাসেই করব।” নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল জহির

” তাহলে তো ভালোই। যাই হোক, তোমার আর তোমার হবু স্ত্রীর জন্য শুভকামনা। কিন্তু জানোতো জহির, আমার জীবনের প্রথম আর একমাত্র পুরুষ তুমি। বিয়ের আগে নিজেই নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে তুমি ব্যতীত আমার জীবনে অন্য কোনো পুরুষ আসবে না। তাই আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারব না।
মনে করো না যে তোমাকে আমি ২য় বিয়েতে বাধা দিব। একদমি না। আমি তোমাকে জোর করে আটকে রাখতে চাই না। যে পাখি আগেই নিজের নীড় ছেড়ে উড়ে গিয়েছে, তাকে আবার জোর করব কি করে। কিন্তু তুমি আমার সন্তানদের পিতা। আমি চাই না তারা তাদের বাবা থেকে আলাদা হোক।
যেহেতু এই বাসাটা আমার হাতে সাজানো। এই সংসারটা আমার হাতে গড়া, এখানে আমার সন্তানদের বেড়ে ওঠা, তাই অনুরোধ করব তুমি তোমার নতুন স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা বাসায় থেকো। আর আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার দরকার নেই। এখানে আসারও দরকার নেই। সন্তানদের দেখতে মন চাইলে এসো, বাধা দিব না। তোমার জীবনে আমি কখনোই বাধা হয়ে দাড়াবো না। তুমি নিজের মতো ভালো থেকে নিজের নতুন ভালোবাসার মানুষটির কাছে। কিন্তু আমার কাছে ডিভোর্সের আশা করো না। এটা আমি তোমাকে দিতে পারব না।” বলেই সুমনা গেস্ট রূমে চলে গেল।

আজকাল সে আর নিজের বেড রুমে ঘুমোয় না। জহিরও বাসায় খুব একটা থাকে না। তার রাত কাটে প্রেমিকা রিতার বাসায়। মাঝে মাঝে যখন আসে, জহির একাই বেড রুমে ঘুমোয়।

সুমনার কথায় তব্দা খেল জহির। বারো বছরের সংসার তাদের। কত ভালো খারাপ পরিস্থিতি এক সাথে পার করেছে, তার হিসেব নেই। দুটো সন্তানও আছে তাদের। ভালোবাসার কমতি ছিল না। কিন্তু তিন বছর আগে কিভাবে যেন তার অফিসের জুনিয়র কলিগ রিতার মায়ায় আটকে গেল। প্রথমে নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারে নি। রিতার মোহে সে এমন ভাবে ফেসে গেল, সুমনাকে আর ভালো লাগতো না। সুমনার সব কিছুই বিরক্তিকর মনে হতো।
প্রথম প্রথম জহির আর রিতা অন্য সব সিনিয়র জুনিয়র কলিগের মতোই ছিল। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। তারপর রিতার বিভিন্ন সমস্যায় জহির ওকে মানসিক সাপোর্ট দিত। অন্যদিকে রিতাও জহিরকে মানসিক সাপোর্ট দিত। সুমনা সংসার বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, জহির রিতার দিকে আরো ঝুকে পরে। এরপর দুজনের মাঝে একটি কম্ফোর্ট জোন তৈরি হয়, মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে রিতার সাথে কথা না বললে জহিরের দম বন্ধ লাগতো। মানসিক নির্ভরতার জায়গা থেকে তারা আরও কাছাকাছি আসে। এরপর নিজেদের সীমা ভুলে ইন্টিমেট হয়। কিন্তু এসবে একবারো মনে পরে নি তার স্ত্রীর কথা যে কিনা নিজের সব টুকু দিয়ে তার সংসার সামলাচ্ছে, তার সন্তানদের লালন পালন করছে। এই সংসার গোছাতে গিয়েই তো সুমনা নিজের স্বপ্ন, নিজের রূপ, ক্যারিয়ার সব বিসর্জন দিয়েছিল। জহির যখন অন্য নারীর বিছানায় আনন্দ করছিল, সে সময় সুমনা নিজের বাচ্চাদের হোম ওয়ার্ক করাতে-স্বামীর পছন্দের রান্না করতে ব্যাস্ত ছিল।

জহিরের পরিবর্তনগুলো অবশ্য সুমনার চোখে আগেই পরেছিল। কম ঝগড়া হয় নি এসব নিয়ে। রাতের পর রাত সুমনা কান্না করতো। কিন্তু তার এসব বিরক্ত লাগতো। তার কাছে তার মানসিক শান্তির জায়গা ছিল রিতা। ধীরে ধীরে রিতার সাথে সম্পর্ক গভীর হতে লাগলো। তারপর শুরু হলো বিদেশ ভ্রমণ। বাসায় যে বউ বাচ্চা আছে নিমিষেই ভুলে গেল সে। রিতার চিকন ফিগার, সুন্দর চেহারা, মন ভুলানো কথা সব কিছুতে যেন পাকাপাকিভাবে আটকে গেল জহির। সুমনাকে আর নিজের যোগ্য মনে হতো না। সুমনা অনেক চেষ্টা করেছে জহিরকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। জহিরের চোখে সুখ মানেই রিতা। রিতাকে ছাড়া তার ইদানীং নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। কেমন যেন আদুরে বাচ্চা মেয়ে একটা। আর নিজের ঘর-সংসার-স্ত্রী-সন্তানকে আজাব মনে হতো। তাইতো ধীরে ধীরে বাসায় আসাও কমিয়ে দিল।

জহির চলে গিয়েছে। সুমনা জানে জহিরের ঠিকানা এখন রিতা। রিতা যখন শুনবে সুমনা ডিভোর্স দিতে চায় না, নির্ঘাত অভিমান করবে। জহিরও আদর করে, দামি গিফট দিয়ে সেই অভিমান ভাঙাবে। কিন্তু সুমনা এও জানে জহির তার কথা ফেরাবে না। রিতা অবশ্য আত্মহত্যার নাটকও করতে পারে। কিন্তু জহির তাকে কোনো না কোনো ভাবে মানিয়ে নিবেই।

জহির আর রিতার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক ভাবেই। জহির ছোট্ট একটি চাকরি করত। বেতন কম। অভাবের সংসার। সেই অভাবের সংসারটাকেই আপন করে নিল সুমনা। তারপর ধীরে ধীরে জহিরের বেতন বাড়লো। পরিবর্তন হলো অবস্থানে। দুটি সন্তান আসলো কোলজুড়ে। কত পরিকল্পনা তাদের এই দুই সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে সুমনা লক্ষ্য করলো জহির পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যে মানুষটা অফিস করে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতো, সে আজকাল দেরি করছে। মাঝে মাঝে বাহির থেকে রাতের খাবার খেয়ে আসছে। যেই মানুষটা আগে বাচ্চাদের মুখ না দেখে ঘুমোতে পারতো না, সেই মানুষ টা এখন দিব্বি এক সপ্তাহ বাচ্চাদের মুখ না দেখেই কাটিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে অফিসিয়াল ট্যুরের নামে শুরু হলো জহিরের বাহিরে রাত কাটানো। এক সপ্তাজ দুই সপ্তাহ গায়েব থাকতো সে। এমনকি সুমনা আর জহিরের মাঝে স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাও ছিল না। বাসায় এসে জহির হয় ঘুমিয়ে পরতো, আর নাহয় ফোনে ব্যস্ত থাকতো।

একদিন সুমনা সুযোগ বুঝে জহিরের ফোন হাতে নেয়। এরপর ভালোভাবেই বুঝে যায় তাদের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি এসেছে।
এমনকি রিতা জহিরের কাছে সুমনা আর জহিরের দাম্পত্য জীবনেরও জবাব দিহিতা চেত। একটি ম্যাসেজ এমন ছিল যেখানে রিতা লিখেছে,” তুমি কি আজ সুমনার সাথে শা*রীরিক সম্পর্ক করেছে? শুনো জহির, তুমি যদি ওকে স্পর্শ করো আমি কিন্তু সুই*সাইড করব। আমি তোমাকে কারো সাথে সহ্য করতে পারি না জহির, তুমি জানো। তুমি পুরোটাই আমার।”
” না জান, আমি ওকে স্পর্শ করি নি। বিশ্বাস না হলে ভিডিও কল দিই। আমি পুরোটাই তোমার। কথা দিচ্ছি।”

জহির আর রিতার ম্যাসেজ গুলো পরে সুমনার গা গুলিয়ে এসেছিল। এই মানুষটার সাথে তার বারোটা বছরের সংসার। কি করে পারলো এভাবে প্রতারণা করতে। তাদের সম্পর্ক কি এতোটাই ভঙ্গুর যে তাদের দাম্পত্য জীবনে আরেক নারী নাক গোলাচ্ছে। এরপর এই বিষয় নিয়ে জহির আর সুমনা নিয়মিত ঝগড়া হতো। সুমনা কত জহিরের পা ধরে কেদেছে তার হিসেব নেই। নিজের সংসার বাচাতে অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। শেষে সুমনা একেবারেই নিরব হয়ে যায়, অপেক্ষায় থাকে জহির শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নিবে।

সুমনা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,” আমি যেদিন থেকে চুপ হয়েছি জহির, সেদিন থেকেই তোমার নাম ধ্বংসের খাতায় লিখা হয়ে গিয়েছে। অপেক্ষা শুধু সময়ের। আমাকে অবলা ভেবে বড্ড বেশি ভুল করে ফেলেছো।

চলবে…

Что такое кракен сайт вход и как им пользоваться

Что такое кракен сайт вход и как им пользоваться

Узнайте, как работает вход на кракен сайт, какие существуют способы авторизации и как обеспечить безопасность при использовании платформы.

Кракен сайт вход — это процесс авторизации на одной из крупнейших платформ в своем сегменте. Многие пользователи сталкиваются с вопросами при первом посещении ресурса, поэтому важно разобраться в особенностях работы системы.

Основные способы входа на кракен сайт

Для доступа к функционалу платформы существует несколько вариантов авторизации. Наиболее распространенный — использование логина и пароля, созданных при регистрации. Некоторые пользователи предпочитают двухфакторную аутентификацию для дополнительной защиты.

Альтернативным методом является вход через специальные приложения или VPN-сервисы, которые помогают сохранить анонимность. Важно помнить, что безопасность данных зависит не только от платформы, но и от действий самого пользователя.

Проблемы при авторизации и их решение

Иногда пользователи сталкиваются с трудностями при попытке войти на кракен сайт. Это может быть связано с техническими работами, блокировками или ошибками ввода данных. В таких случаях рекомендуется проверить корректность вводимых учетных данных.

Если доступ к основному домену ограничен, можно воспользоваться альтернативными способами. Например, некоторые ресурсы предлагают актуальную информацию о работе платформы. Подробности можно уточнить на www.critorino.it, где регулярно публикуются обновления.

Безопасность при использовании кракен сайт вход

Защита личных данных — ключевой аспект работы с любой онлайн-платформой. Специалисты рекомендуют использовать сложные пароли, которые регулярно меняются. Дополнительные меры безопасности включают антивирусную защиту и осторожность при переходе по ссылкам.

Важно избегать фишинговых сайтов, которые имитируют официальные страницы для кражи данных. Всегда проверяйте адресную строку перед вводом учетных данных.

Перспективы развития системы авторизации

Технологии не стоят на месте, и методы входа на платформы постоянно совершенствуются. К 2026 году ожидается внедрение более сложных систем идентификации, включая биометрические данные и аппаратные ключи.

Эти изменения направлены на повышение уровня защиты пользователей и минимизацию рисков несанкционированного доступа. Однако базовые принципы работы кракен сайт вход останутся прежними — удобство и безопасность для всех участников системы.

Лидер рынка: как найти кракен актуальная ссылка в 2026 году

Лидер рынка: как найти кракен актуальная ссылка в 2026 году

Подробное руководство по поиску проверенных ссылок на маркетплейс Kraken с учетом современных технологий безопасности.

В условиях постоянно меняющегося цифрового ландшафта доступ к надежным платформам становится критически важным. Kraken остается одним из самых востребованных маркетплейсов, что делает вопрос поиска актуальных ссылок особенно значимым.

Почему важно использовать только проверенные ссылки

Использование непроверенных источников может привести не только к потере доступа, но и к серьезным рискам для безопасности. Фишинговые сайты часто маскируются под официальные ресурсы, что требует от пользователей особой бдительности.

Специалисты рекомендуют обращаться только к доверенным каналам информации. Например, полезные советы по кибербезопасности можно найти на https://budgethomerenovation.com, где регулярно публикуются актуальные материалы.

Основные способы найти кракен актуальная ссылка

Существует несколько проверенных методов получения доступа к платформе. Наиболее надежным считается использование специальных сервисов-агрегаторов, которые отслеживают изменения в доменных зонах.

Технически подкованные пользователи могут применять технологии децентрализованного поиска или специализированные форумы, где участники обмениваются актуальной информацией.

Технологические изменения 2026 года

С каждым годом методы обеспечения анонимности и доступа совершенствуются. В 2026 году ожидается внедрение новых протоколов шифрования, что может повлиять на способы получения кракен актуальная ссылка.

Эксперты прогнозируют развитие децентрализованных систем хранения данных, которые могут сделать процесс поиска ссылок более стабильным и безопасным.

Безопасность при переходе по ссылкам

Перед использованием любой ссылки необходимо убедиться в ее подлинности. Проверка цифровой подписи, анализ доменного имени и изучение отзывов других пользователей – обязательные этапы верификации.

Особое внимание стоит уделить защите персональных данных и использованию современных средств криптографии при работе с онлайн-платформами.

Перспективы развития маркетплейсов

Аналитики отмечают устойчивый рост сегмента децентрализованных торговых площадок. Это означает, что вопросы доступа и безопасности останутся актуальными и в ближайшие годы.

C развитием технологий блокчейна и систем распределенного хранения данных возможно появление принципиально новых способов обеспечения стабильного доступа к платформам типа Kraken.

<div class="c

Легкий старт с официальным Kraken: руководство для новичков

Легкий старт с официальным Kraken: руководство для новичков

Пошаговая инструкция по работе с официальным Kraken, включая регистрацию, верификацию и базовые операции.

Kraken остается одной из самых надежных платформ для торговли криптовалютами. Если вы только начинаете знакомство с этим сервисом, наше руководство поможет разобраться в основных функциях и возможностях.

Что такое Kraken и почему стоит выбрать официальную платформу

Kraken — это профессиональная биржа криптовалют, основанная в 2011 году. Платформа предлагает высокий уровень безопасности, широкий выбор активов и прозрачные комиссии. Работа через кракен официальный гарантирует защиту ваших средств и данных.

Среди преимуществ платформы — поддержка фиатных валют, низкие комиссии на крупные объемы и возможность маржинальной торговли. Эти особенности делают Kraken привлекательным как для новичков, так и для опытных трейдеров.

Регистрация на официальном Kraken

Процесс создания аккаунта на платформе занимает несколько минут. Вам потребуется указать электронную почту, придумать надежный пароль и подтвердить регистрацию по ссылке из письма.

Для полного доступа к функциям биржи необходимо пройти верификацию. Этот процесс включает подтверждение личности и места жительства. Уровень верификации определяет доступные лимиты на депозиты и вывод средств.

Пополнение счета и начало торговли

После завершения регистрации вы можете пополнить счет. Kraken поддерживает различные способы депозита: банковские переводы, кредитные карты и криптовалютные транзакции. Выбор метода зависит от вашего местоположения и уровня верификации.

Для удобства пользователей доступен интуитивно понятный интерфейс. На https://chicforcheap2.com вы найдете дополнительные материалы по настройке торгового терминала и использованию аналитических инструментов.

Безопасность при работе с Kraken

Официальная платформа предлагает несколько уровней защиты аккаунта. Рекомендуется активировать двухфакторную аутентификацию, использовать надежные пароли и регулярно проверять историю входов.

Kraken хранит большую часть средств в холодных кошельках, что минимизирует риски взлома. Также платформа предоставляет страховку на случай непредвиденных ситуаций.

Мобильное приложение Kraken

Для удобства торговли в любое время доступно официальное мобильное приложение. Оно включает все основные функции веб-версии: просмотр котировок, совершение сделок и управление портфелем.

Приложение регулярно обновляется, добавляя новые инструменты для анализа рынка. Скачивать его следует только из официальных магазинов приложений, чтобы избежать мошеннических копий.

Поддержка пользователей и обучение

Kraken предлагает обширную базу знаний и оперативную поддержку. В разделе помощи вы найдете ответы на частые вопросы, руководства по использованию платформы и советы по безопасности.

Для тех, кто хочет углубить знания, доступны образовательные материалы по торговле криптовалютами и анализу рынка. Эти ресурсы помогут вам принимать более обоснованные инвестиционные решения.

Проверенный временем: kraken at как надежный инструмент для инвестиций

Проверенный временем: kraken at как надежный инструмент для инвестиций

Узнайте, почему kraken at остается популярным выбором среди инвесторов и как эффективно использовать его возможности.

В мире цифровых активов и инвестиций kraken at зарекомендовал себя как проверенная временем платформа. С момента своего основания она привлекает пользователей надежностью, удобством интерфейса и широкими возможностями для работы с различными активами.

Основные преимущества kraken at

Популярность kraken at среди инвесторов обусловлена несколькими ключевыми факторами. Во-первых, платформа предлагает высокий уровень безопасности транзакций. Во-вторых, здесь доступен широкий выбор активов для торговли, включая криптовалюты, акции и другие финансовые инструменты.

Еще одним важным преимуществом является интуитивно понятный интерфейс, который подходит как начинающим, так и опытным трейдерам. Система регулярно обновляется, предлагая пользователям новые функции и улучшения.

Как начать работу с kraken at

Для начала работы с платформой необходимо создать учетную запись и пройти процедуру верификации. Этот процесс обычно занимает несколько часов и включает проверку личности пользователя. После завершения верификации вы получаете доступ ко всем функциям системы.

Если вы хотите зайти на kraken at и начать инвестировать, важно сначала ознакомиться с основными принципами работы платформы. Многие пользователи отмечают, что освоение базовых функций не требует специальных знаний и занимает минимальное время.

Безопасность на kraken at

Безопасность пользовательских данных и средств является приоритетом для kraken at. Платформа использует современные методы шифрования и двухфакторную аутентификацию для защиты аккаунтов. Регулярные аудиты безопасности подтверждают надежность системы.

Важно помнить, что ответственность за безопасность своего аккаунта частично лежит и на пользователе. Рекомендуется использовать сложные пароли, регулярно их менять и не передавать данные для входа третьим лицам.

Перспективы развития kraken at

Аналитики прогнозируют дальнейший рост популярности kraken at в 2026 году. Платформа продолжает расширять список доступных активов и улучшать пользовательский опыт. Особое внимание уделяется интеграции с традиционными финансовыми системами.

С развитием технологий блокчейн и увеличением интереса к цифровым активам, kraken at остается одним из лидеров в своей нише. Пользователи могут ожидать появления новых инструментов для анализа рынка и автоматизации торговли.

Что лучше: актуальная ссылка кракен или альтернативные варианты

Что лучше: актуальная ссылка кракен или альтернативные варианты

Разбираемся, как найти рабочую ссылку на Kraken и какие методы проверки актуальности существуют в 2026 году.

В условиях постоянных блокировок и изменений в сети, поиск актуальной ссылки кракен становится важной задачей для многих пользователей. Платформа остается востребованной, но доступ к ней требует определенных знаний и осторожности.

Почему важно использовать только актуальные ссылки

Неактуальные или поддельные ссылки могут привести к потере данных и средств. Мошенники часто создают фишинговые сайты, имитирующие оригинальный ресурс. Проверка актуальности ссылки – первый шаг к безопасной работе.

Современные технологии позволяют быстро обновлять информацию о рабочих зеркалах. Некоторые сервисы, такие как www.angliapropertysolutions.com, предоставляют дополнительные инструменты для верификации ресурсов.

Основные способы проверки ссылок

Существует несколько методов убедиться, что ссылка действительно ведет на нужный ресурс. Специальные форумы и тематические сообщества часто публикуют свежие данные о доступных адресах.

Техническая проверка включает анализ сертификатов безопасности и доменных имен. Эти параметры сложно подделать без доступа к оригинальной инфраструктуре проекта.

Рекомендации по безопасности

Даже при использовании актуальной ссылки кракен важно соблюдать базовые правила цифровой гигиены. VPN и Tor остаются обязательными инструментами для анонимного доступа.

Регулярное обновление программного обеспечения и антивирусных баз снижает риски при работе с любыми онлайн-платформами. Особое внимание стоит уделить защите персональных данных.

Перспективы развития в 2026 году

Технологии защиты и обхода блокировок продолжают развиваться. Эксперты прогнозируют появление новых методов верификации ссылок и улучшенных систем распределенного доступа.

Пользователям стоит следить за обновлениями и использовать только проверенные источники информации. Это минимизирует риски и обеспечит стабильный доступ к необходимым ресурсам.