Sunday, August 31, 2025
বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 2037



আংটি পর্ব ৮

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ-অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৮

আজ উপমাকে দেখতে আসবেন অরণ্য আর ওর বাবা-মা।সব কটা রুম নিজের হাতে গুছিয়ে স্নানে যায় উপমা।তারপর রান্নাঘরে এসে মাকে একটু হেল্প করে।যদিও ওর মা বারবার না করছিলেন।তারপর নিজের রুমে গিয়ে রেডি হয়।ওর আজ একটু একটু টেনশন হচ্ছে।আবার ভালোও লাগছে।উপমা পরেছে সবুজ রঙের সিল্ক শাড়ী।আঁচলের সাথে মিলিয়ে খয়েরী ব্লাউজ।কানে স্বর্ণের দুল।গলায় সোনার চেইন।বাঁ হাতে ব্রেসলেট।ডান হাতে চুড়ি পরেছে।পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে চুল আটকে দিয়েছে।চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছে।ঠোঁটে মেরুণ রঙের লিপস্টিক।কপালে খয়েরী টিপ।সেজেগুজে নিজের রুমে বসে আছে।

উর্মিলা দেবী আজ মহাব্যস্ত।কাজের মহিলা সবকিছু কেটেকুটে দিচ্ছে।তিনি রান্না করছেন।উপমার বাবা বার বার জিজ্ঞেস করছেন বাজার থেকে আর কিছু আনতে হবে কি-না।আর একটু পরপর রান্নাঘরে গিয়ে উপমার মাকে তাড়া দিচ্ছেন।অতিথি আপ্যায়নে যেন কোন ত্রুটি না হয়।

কলিংবেলের শব্দ শুনে দৌড়ে গেলেন উত্তম বাবু।অতিথিরা এসে গিয়েছেন।ওদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ড্রয়িংরুমে এনে বসান।অরণ্যরা ওদের রাজশাহীর বিখ্যাত ফজলি আম এক কার্টুন আর পাঁচ জাতের মিষ্টি নিয়ে আসছে।খাবারগুলো কাজের লোক ভিতরের রুমে নিয়ে যায়।অরণ্যের বাবা অরিন্দম চ্যাটার্জী ফুড অফিসে চাকরি করতেন।এখন রিটায়ার্ড করেছেন।মা রমিতা দেবী গৃহিণী।

একটু পর উর্মিলা দেবী কাজের মেয়ে সমেত নাশতা নিয়ে আসেন।টেবিলের ওপর ফলের জুস,ছানার মিষ্টি,ক্ষীরের সন্দেশ আর শিঙারার প্লেট রেখে বলেনঃ-

-এই সব নাশতা আমার মেয়ে উপমা ঘরে বানিয়েছে।এমনকি ফলের জুসটাও ও-ই ব্লেন্ড করেছে।

-সব খাবারই হোম মেইড।ফুড অফিসার বলে কথা!তাই আমরা আর বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে আসার রিস্ক নেই নি।
বললেন উপমার বাবা।এই কথা শুনে সবাই হাহাহা করে হেসে উঠলেন।

-আরে বাহ!প্রতিটা আইটেম খুব চমৎকার হয়েছে।
এবার মামণিকে নিয়ে আসুন।উর্মিলা দেবী বললেন।

একটু পর উপমা রুমে আসলো।সবাই কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।মেয়েকে দেখে উনাদের খুব পছন্দ হলো।

-মামণি, আমাদেরকে কিন্তু একটা গান গেয়ে শুনাতে হবে।ড্রয়িংরুম ভর্তি তোমার মেডেল আর প্রাইজগুলো দেখে তো আমাদের গান শুনার লোভ বেড়ে গিয়েছে।

অরণ্যের মায়ের কথায় উপমা তানপুরা হাতে নিয়ে একটি নজরুলগীতি গেয়ে শুনালো।

মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
নমো নম, নমো নম, নমো নম।
শ্রাবণ-মেঘে নাচে নটবর রমঝম, রমঝম, ঝমরম
(ঝমঝম, রমঝম, রমঝম)।।
শিয়রে বসি চুপি চুপি চুমিলে নয়ন
মোর বিকশিল আবেশে তনু নীপ-সম, নিরুপম, মনোরম।।
মোর ফুলবনে ছিল যত ফুল
ভরি ডালি দিনু ঢালি’ দেবতা মোর
হায় নিলে না সে ফুল, ছি ছি বেভুল,
নিলে তুলি’ খোঁপা খুলি’ কুসুম-ডোর।
স্বপনে কী যে কয়েছি তাই গিয়াছ চলি’
জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতায় প্রিয়তম, প্রিয়তম, প্রিয়তম।।

গান শেষে অরণ্যের বাবা বললেনঃ-

-এ মেয়ে তো দেখছি রূপে লক্ষী,গুণে সরস্বতী আর রন্ধনে অন্নপূর্ণা আপনি তো রত্নগর্ভা বেয়াইন সাব।তবে এমন রত্নটিকে আর বেশীদিন আপনাদের ঘরে ফেলে রাখবো না।খুব শীঘ্রই বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে হবে।

-আপনারাও কম কিসের?আমাদের অরণ্য বাবার মতো ছেলে লাখে একটা মিলে।আমরা সব খোঁজ খবর নিয়েছি।ওরকম ব্রিলিয়ান্ট,ভদ্র,নম্র,দায়িত্বশীল,পরোপকারী ছেলে এখনকার যুগে পাওয়া মুশকিল।উপমার মা বললেন।

-আজ থেকে আমাদের উভয় পক্ষেরই দুটো সন্তান হলো।আমরা পেলাম মেয়ে আর আপনারা পেলেন ছেলে।উর্মিলা দেবী বললেন।

অরণ্যের বাবা বললেনঃ-

-তবে আর শুভ কাজে দেরী কিসের?পুরোহিত মশাই দেখুন তো পঞ্জিকায় এ মাসে বিয়ের তারিখ কোনটা সবার প্রথমে আছে।সেটাই ফিক্সড করি তাহলে।

তার আগে মেয়েকে আশীর্বাদ করে নেই।একজোড়া কানের ঝুমকা দিয়ে উপমাকে আশীর্বাদ করলেন উনারা।উপমার বাবা-মাও সোনার চেইন দিয়ে অরণ্যকে আশীর্বাদ করলেন।

এবার অতিথিদের খাওয়ার পালা।ডাল,বেগুনী,রুই মাছ ভাজি,ইলিশের মাথা আর আলু দিয়ে মুড়িঘণ্ট,সর্ষে ইলিশ,পাবদা মাছের চচ্চড়ি,কৈ মাছে ঝোল,খাসির মাংস আর সবশেষে ঘরে পাতানো দই ও টমেটো চাটনি দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হলো।

-অনেকদিন পর এমন ভুড়িভোজ করলাম বেয়াই মশাই।যাও তো মা।অরণ্য কে নিয়ে একটু ছাদে ঘুরে এসো তো।

উর্মিলা দেবীর কথায় উপমা অরণ্যকে নিজেদের ছাদে নিয়ে গেলো।এই প্রথম ওরা একটু একান্তে কথা বলার সুযোগ পেলো।

-ব্রেইন উইথ বিউটি।তোমাকে দেখলেই বুঝা যায় উপমা।কি মিষ্টি দেখাচ্ছে তোমায় মাই বিউটি কুইন।

-তোমাকেও খুব সুন্দর লাগছে এই মেরুন রঙের পাঞ্জাবি তে।একেবারে জামাই জামাই ভাব।

-আহা!যা বললে।তোমাদের ছাদটা তো খুব সুন্দর।

নয়নতারা,অপরাজিতা,হিমচাঁপা,কুঞ্জলতা কতো জাতের ফুল।একপাশে একটা দোলনা ঝুলছে।উপমার ইচ্ছে হলেই এখানে বসে দোল খায়।পানির ট্যাংকির পাশে টাইলস দেয়া পাকা বেদী।উপমার বসার জায়গা এটা।

কিছুক্ষণ ছাদে থেকে নেমে আসলো ওরা।একটু পর খুশীমনে
অতিথিরা বিদায় হলেন।

*************

বিয়ের আর মাত্র বারো দিন বাকি।দুই পরিবারেই উৎসবের আমেজ।চলছে বিয়ের জোর আয়োজন।অরণ্যদের বাড়ি নতুন করে রঙ করানো হচ্ছে।অরণ্য নিজের রুমের দেয়ালে উপমার পছন্দ অনুযায়ী পেইন্টিং করিয়েছে।দরজা জানালার পর্দা,বেডকভার,এমনকি ঘরের ফুলদানি পর্যন্ত উপমার পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়েছে।বিয়ের শপিং করতে অরণ্য ঢাকায় আসে।একসাথে দুজন মিলে শপিং করেছে।বিয়ের কার্ড ছাপতে দিয়েছে।এখন শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় আছেন সবাই।যবে দুজনার চার হাত এক হয়ে যাবে।

উর্মিলা দেবী বিয়েতে সবাই কে নিমন্ত্রণ করবেন।যারা এতোদিন ধরে উনার মেয়েকে নিয়ে কুকথা বলেছে আড়ালে আবডালে ওদের কেউ বাদ যাবে না নিমন্ত্রিত লিস্ট থেকে।একমাত্র মেয়ের বিয়ে খুব ঢালাও করে দিবেন তারা।উপমার বাবাও দু হাত ঢেলে খরচা করবেন মেয়ের বিয়েতে।

এতোকিছুর মাঝেও মেয়ের বাড়ি বলে কথা।মাঝে মাঝেই অন্তরে বিষাদের সুর বেজে উঠে। এ সুর যে কনে বিদায়ীর সুর।

এক একটা দিনকে যেন এক একটা বছর মনে হচ্ছে অরণ্যর।কবে ওর মন মানসী কে একান্ত নিজের করে পাবে সে।কতো স্বপ্ন সাজিয়েছে উপমাকে নিয়ে।বিয়ের পর অনেক জায়গায় ঘুরতে যাবে তারা।হানিমুনে যাবে সুইজারল্যান্ডে।নতুন সংসারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে দুটি প্রাণ।দেখা যাক এই স্বপ্ন কি আদৌ সত্যি হয়।

#চলবে

আংটি পর্ব ৭

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৭

এক সপ্তাহ পর অরণ্য জুয়েলার্সে গিয়েছে আংটি নিয়ে আসতে।কিন্তু গিয়ে শুনলো কারিগর নাকি চার/পাঁচ দিন ধরে দোকানে আসছে না।ওর ছেলেটা নাকি খুব অসুস্থ।ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারখানায় ছুটাছুটি করতে হচ্ছে।আর ও জানিয়ে দিয়েছে সে ঐ আংটি বানাতে পারবে না।তাই অরণ্যের এডভান্সের টাকাটা ওরা ফেরত দিয়ে দেয়।অনেক বলার পরও অরণ্যকে ওরা ঐ কারিগরের বাড়ির ঠিকানা কিংবা ফোন নাম্বার কিছুই দেয় নি।অগত্যা অরণ্যকে বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়।তবে এডভান্সের টাকাটা সে ফেরত আনে নি।বলেছে এই টাকাটা যেন ঐ কারিগরের ছেলের চিকিৎসা বাবদ ব্যয় করার জন্য দেওয়া হয়।উপমাকে এতোকিছু বলে নি অরণ্য।শুধু বলেছে কারিগর অসুস্থ থাকায় আপাতত বানাতে পারবে না।উপমা যা বুঝার বুঝে নিয়েছে।তাই আর কোন প্রশ্ন করে নি।

অরণ্য নিজের দেখা স্বপ্নের বিষয়েও উপমাকে কিছু বলে নি।উপমা বিষয়টা কিভাবে নেবে কে জানে।যদি ঘাবড়ে যায়।যদি বিয়েটা না করতে চায়।অরণ্য কি পারবে উপমাকে ছেড়ে থাকতে?নাকি পারবে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করতে?অথচ বিয়ে না করলেও যে ওর বাবা-মা খুব কষ্ট পাবে।তার চেয়ে উপমাকে এখন কিছু না জানানোই ভালো হবে।বিয়ের পর না হয় বলবে স্বপ্নের কথাটা।

**************

রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে অরণ্য আর উপমা।ওদের কলেজ ঈদের ছুটি দিয়েছে।তাই ওরা যে যার বাসায় যাবে।উপমা আজকে রওয়ানা হয়েছে।অরণ্য আগামীকাল যাবে।উপমাকে বাসে তোলে দিতে অরণ্য এসেছে।অনলাইনে টিকিট কেটে নিয়েছে।

-এই যে প্রতিদিন তোমাকে দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে,এখন একদিন তোমাকে না দেখতে পেলেই কষ্ট হবে।তোমারও কি এমন লাগছে উপমা?

-আমার আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে।

-সেটা কেমন গো?

-এতোদিন পর বাবা-মাকে দেখতে পাবো তাই খুব আনন্দ হচ্ছে।আবার তোমাকে না দেখে থাকতে হবে সেজন্য মন খারাপ লাগছে।তবে এই ছুটিতেই তো বিয়ে হয়ে যাবে সেটা ভেবে ভালোও লাগছে।

-বাহ!বেশ বললে তো।

উপমাকে বাসের সীটে বসিয়ে দেয় অরণ্য।তারপর সে নীচে নেমে যায়।পাশের দোকান থেকে দুই প্যাকেট চিপস,কিছু চকলেট,এক প্যাকেট কেক,এক প্যাকেট টিস্যু এবং এক বোতল পানি কিনে নিয়ে আসে।বাসে উঠে উপমার হাতে এগুলো দেয় সে।সাথে একটা বড় খাম ওর হাতে দেয়।দিয়ে অরণ্য বলেঃ-

-উপমা,এই খামটা তুমি বাসায় গিয়ে খুলে দেখো।আর ফোনে কথা হবে সবসময়।সাবধানে যেও।বাসায় পৌঁছে সাথে সাথে আমাকে টেক্সট করে দিও।যাত্রা শুভ হোক।আসছি আমি।

-তুমিও সাবধানে যেও।আমাকে আপডেট জানিও।টাটা।

**************

বাসায় পৌঁছেই অরণ্যকে টেক্সট করে দেয় উপমা।এতোদিন পর মাকে দেখে জড়িয়ে ধরে ও।বাবা তো স্টেশনে গিয়ে ওকে বাসায় নিয়ে এসেছেন।স্নান করে মায়ের হাতে পেট ভরে ভাত খায় সে।তারপর নিজের বেডে এসে শুয়ে থাকে।ওর জানালায় নতুন পর্দা টানানো হয়েছে।ধুয়া বিছানার চাদর।সারা ঘর পরিপাটি করে গুছানো আছে।বুকশেলফে এতোটুকুও ধূলো জমে নেই।কে বলবে এই রুমে এতোদিন কেউ ছিলো না।এই না হলে মাই সুইট হোম।মনে মনে বলে উপমা।তারপরই অরণ্যের দেওয়া খামটা খুলে উপমা।খুলে তো পুরোই অবাক!খুব সুন্দর সুন্দর চারটে ছবি আছে উপমার।সেই যে বিছানাকান্দি ভ্রমণের সময় অরণ্য তুলেছিলো।ছবি দেখে অরণ্যকে ফোন দেয়।

-হ্যালো।ছবি দেখেছো উপমা।স্যরি।তোমার অনুমতি ছাড়াই ছবিগুলো তুলেছিলাম সেদিন।যদিও এটা খুব অনুচিত কাজ করেছি।তবু ক্ষমা করো আমায়।

-তুমি এতো সুন্দর ছবি তুলতে পারো আগে জানলে তো আর শুধু শুধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ছবি উঠানোর জন্য লোক ভাড়া করতাম না।বলেই হেসে দেয় উপমা।

-ওয়াও!তোমার পছন্দ হয়েছে?

-ভীষণ ভালো হয়েছে ছবিগুলো।আমি ফ্রেম করে ঘরে বাঁধিয়ে রাখবো।

-আমি ধন্য হলাম ম্যাডাম।এবার ভিডিও কলে তোমার রুম দেখাও তো।

ভিডিও কলে কথা হয় দুজনার।ব্লু টপস আর পিংক কালারের লং স্কার্টে উপমাকে পিচ্চি একটা মেয়ে দেখাচ্ছে।অরণ্যর সেটা দেখে খুব ভালো লাগে।

পরদিন অরণ্য নিজের বাড়ি চলে যায়।অন্যবার সারা রাস্তা কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে যেতো।এবার একটু পরপর উপমার সাথে ফোনে,মেসেজে কথা বলতে বলতে গিয়েছে।বাড়ি পৌঁছে উপমাকে জানায় অরণ্য।কথা হয় দুজনেই আগামীকাল নিজেদের ফ্যামিলিতে দু’জনার কথা বলবে।

*************
পরদিন মায়ের কাছে অরণ্যের কথা বলে উপমা।এ টু জেড সবটাই জানায় উপমা।এমনকি আংটি খুলতে পারার কথাও বলে।সব শুনে মনে মনে খুশীই হোন উর্মিলা দেবী।রাতে উপমার বাবার সাথে কথাটা শেয়ার করেন।উপমার বাবাও খুশী হোন খুব।অনেক বছর আগে সন্ন্যাসীর বলা সেই কথাটা মনে পড়ে উনাদের।সন্ন্যাসী বাবা তো বলেইছিলেন যে এই আংটিই একদিন উপমার সঠিক সঙ্গীকে খোঁজে নেবে।তবে কি অরণ্যই সেই ছেলে?

এদিকে অরণ্য ওর বাবা-মায়ের কাছে উপমার বিষয়টা জানায়।তবে আংটি প্রসঙ্গে কিছু বলে না।উপমার ছবি দেখেই মেয়েটাকে খুব বেশী পছন্দ হয় উনাদের।আর অরণ্যের মুখে ওর নানাবিধ গুণের কথা শুনে তো উনারা উপমাকে বৌমা হিসেবে পাবার জন্য আকুল হয়ে আছেন।

দু পক্ষ মিলে ঠিক হয় আগামী শুক্রবার উনারা উপমাকে দেখতে যাবেন।অরণ্যও সাথে যাবে।সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ঐ দিনই ছেলে-মেয়েকে আশীর্বাদ করে বিয়ের দিনতারিখ ঠিক হয়ে যাবে।অরণ্য আর উপমা অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে।

উপমা মনে মনে ভাবে কি থেকে কি হয়ে গেলো।ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়।কখন কার জীবনে প্রেম আসে তা কেউ বলতে পারে না।তা না হলে ছোটবেলা থেকেই কতো প্রেমের অফার পেয়েছে সে।কই,কাউকেই তো মনে ধরে নি।সবসময় নিজের পড়াশুনা নিয়েই থেকেছে।অথচ অরণ্যের চোখের দিকে তাকিয়েই এক মুহূর্তে প্রেমে পড়ে গেলো।গিয়েছিল চাকরি করতে।অথচ সেখানে গিয়ে জীবনসাথীকেও পেয়ে যাবে তা কি আর জানতো?

অরণ্যও এমনটাই ভাবছে।এতোগুলা বিয়ের আলাপ এসেছে ওর।অথচ একজনকেও পছন্দ হয় নি ওর।আর উপমা?সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মেয়েকে এই কদিনেই এতো আপন করে নিলো।মনে হয় উপমা যেন ওর কতো চেনা।এখন সবকিছু ভালো ভালোয় হয়ে গেলেই হয়।ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাই করে অরণ্য আর উপমা।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/963511327412920/

আংটি পর্ব ৬

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ-অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৬

কলেজের কাছেই একটা দো-তলা বাসায় একটা ফ্যামিলির সাথে সাবলেট থাকে অরণ্য।বাসায় তিনটা বেডরুম,ড্রয়িংরুম,ডাইনিং,কিচেন আর সাথে একটা বারান্দা আছে।একটা সিঙ্গেল রুমে অরণ্য থাকে,সাথে এটাচড ওয়াশরুম।ঐ ফ্যামিলির সাথেই খাওয়াদাওয়া করে।মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে দেয়।ভদ্রলোক স্ত্রী,দুই ছেলে আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকেন।তিনি একটা এনজিও তে চাকরি করেন।ছেলে দুটো স্কুলে পড়াশুনা করে।স্ত্রী গৃহিণী।

বাসায় বসে পত্রিকা পড়ছিলো অরণ্য।এমন সময় ওর মা কল করে বলেনঃ-

-অরণ্য,তোর বড় মামা একটা খুব ভালো সম্বন্ধ এনেছেন।মেয়ে মেডিক্যালে পড়ছে।দেখতে শুনতেও ভালো।উঁচু বংশ।বাবা-মা দুজনই সরকারি চাকুরিজীবী।তুই তো ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসবে।তখন না হয় দেখতে যাবো।

-আগে ছুটি হোক।তারপর দেখা যাবে।

একটু সময় ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর নিয়ে ফোন রেখে দেয় অরণ্য।তারপরই উপমাকে কল করে।উপমা রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো।অরণ্যের নাম্বার দেখে কেমন একটা সংকোচ লাগছে।সেদিনের ঘটনার পর থেকে আর ওরা মুখোমুখি হয় নি।কল রিসিভ করবে না ভেবেও হ্যালো বলে উঠলো উপমা।

-হ্যালো উপমা।আমি অরণ্য বলছি।

-নাম্বার সেইভ করা আছে।

-ও আচ্ছা।কোন ভণিতা না করে সরাসরিই বলছি।আমার মা অনেকদিন ধরে বিয়ের জন্য পাত্রী দেখছেন।বাবা-মা দুজনই একমাত্র ছেলের বৌকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।এতোদিন ধরে আমার নিজেরই কেন জানি বিয়ের প্রতি কোন ইন্টারেস্ট ছিলো না।তাই একটার পর একটা আলাপ নানান অজুহাতে না করে দিয়েছি।এখন আর বাবা-মাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখতে চাচ্ছি না।নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো এর কারণ হচ্ছো তুমি।তোমাকে তুমি করে সম্বোধন করলাম বলে আবার কিছু মনে করো না যেন।আপনজনকে আপনি করলে কেমন যেন পর পর মনে হয়।যা-ই হোক,ফাইনাল কথায় আসি।তোমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে চাই।তোমার এতে কোন আপত্তি নেই তো?

-বাহ!ভালো তো।এখন পর্যন্ত প্রপোজই করতে পারলেন না।আর উনি আসছেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।

-আরে দূর।ওসব টেস্ট পরীক্ষার সময় আছে নাকি আর।একেবারে সেমিস্টার ফাইনাল দিয়ে দেবো ভাবছি।

-হাহাহা…….এই তো হলো শিক্ষকের প্রেম।সবকিছুতেই পরীক্ষা খোঁজে।

-এবার তোমার মতামত টা বলো।

-আমার তোমাকে কিছু বলার আছে অরণ্য।বিয়ের ব্যাপারেই।

-ঠিক আছে।শুনবো।তবে ফোনে নয়।সরাসরি দেখা হোক তারপর বলবে।আগামীকাল বিকেলে একটা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবো তোমাকে।কাছেই একটা পার্ক আছে।যাবে নাকি?

-ঠিক আছে।আগামীকাল দেখা হচ্ছে।Bye.

**************

একটা পার্কে বসে আছে অরণ্য আর উপমা।অন্যদিন অরণ্যের সাথে দেখা হলে কখনো লজ্জা করতো না।আজ কেমন জানি লজ্জা লজ্জা করছে।লজ্জা হচ্ছে নারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুভূতির নাম।প্রেমের অন্যতম একটি উপাদান।যার প্রতি কোন ফিলিংস নেই,তার প্রতি লজ্জা আসবে কেন?ফিলিংস আছে বলেই তো লজ্জাও এসে ভীড় জমিয়েছে চোখের কোণে।তাই তো অরণ্যের দিকে চোখ তোলে তাকাতে পারছে না উপমা।

-উপমা,এমনিতেই তো তুমি লাল টুকটুকে কন্যা।তার ওপর এই লজ্জা রাঙা মুখটা তো লাল জবাকেও হার মানাবে।তাকাও আমার দিকে।

-হুম বলো।শুনতে পাচ্ছি।

-আমি কি বলবো?বলবে তো তুমি।সেদিন ফোনে তো সেভাবেই কথা হলো।আমার যা বলার তা তো ফোনেই বলে দিয়েছি।

-ও,হ্যাঁ বলছি।মাথা নীচু করেই জবাব দেয় উপমা।

-এভাবে বললে তো হবে না।আমার চোখের দিকে তাকাও।দেখো তো,সেদিনের মতো গভীরতা খোঁজে পাও কি-না।যাতে তুমি ডুব দিতে পারো।

এবার নড়েচড়ে বসলো উপমা।সরাসরি অরণ্যের চোখের দিকে তাকালো।আবার সেই অনুভূতি হচ্ছে।অদ্ভুত মায়াময় সেই অনুভূতি।পলকেই ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো উপমার মন।ওই দু চোখ যেন সম্মোহনের মন্ত্র জানে।এভাবেই কেটে গেলো কিছুক্ষণ।হঠাৎ করে বাদামওয়ালার ডাকে চমকে তাকালো দুজনেই।অরণ্য বাদাম কিনলো।উপমা বলতে শুরু করলোঃ-

-আমি বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।ক্লাস এইটে উঠেই বাবার ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় চলে যাই এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি।আমার বড় হওয়া ঢাকা শহরেই।আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে বুঝতেই তো পারছো প্রচুর বিয়ের প্রপোজাল আসতে থাকে বড় হওয়ার সাথে সাথে।বাবা-মা প্রথমে কোনটাই হাতে নেন নি।কিন্তু অনার্স কমপ্লিট করার পর কয়েকটা বেশ ভালো ভালো আলাপ আসে।এরমাঝে দু একটা প্রায় ঠিকঠাক হয়েও ভেঙে যায়।গতবছর এক ডাক্তার ছেলের সাথে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হবার পরও ওরা না করে দেয়।বলে সবকিছু বিশদভাবে বললো উপমা।এবার তোমার মতামত বলো অরণ্য।

সবটা মনযোগ সহকারে শুনলো অরণ্য।তারপর বললোঃ-

-দেখো,আমার কাছে সবটাই জাস্ট কো-ইনসিডেন্ট বলে মনে হচ্ছে।এগুলোর সাথে বিয়ের কোন যোগসূত্র আছে বলে আমি মনে করি না।তুমি এসব নিয়ে ভেবো না।আমি ছুটিতে বাড়ি গিয়েই বাবা-মাকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো।

-ঠিক আছে।আমিও ছুটিতে বাসায় গিয়ে বাবা-মার কাছে তোমার কথা বলবো।

-তবে এই কথাই রইলো।এবার একটা অন্য বিষয়ে একটু কথা বলতে চাই উপমা।তোমার আংটির বিষয়ে।

-কি জানতে চাও বলো।

-সেদিন তুমি বলেছিলে না তোমার হাতের ঐ আংটিটা আর কেউ খুলতে পারে না।আমি একটু ট্রাই করে দেখতে চাই।

হাতটা বাড়িয়ে দেয় উপমা।অরণ্য উপমার হাতটা নিজের হাতের ওপর নিয়ে রাখে।তারপরই এক টানে খুলে ফেলে এই আংটি।হতবাক হয়ে যায় উপমা!

-এটা কি করে সম্ভব!মিরাকল ঘটিয়ে ফেলেছো অরণ্য।বিলিভ মি।আমি সেদিন সত্যি বলেছিলাম।কেউ কোনদিন খুলতে পারে নি।এমনকি রিমি দিদিও সেদিন পারে নি।

-আমি জানি তো উপমা।তুমি মিথ্যে বলো নি।রিমিকে পিকনিকের দিন আমিই বলেছিলাম আংটি টা খুলে দেখতে।তবে আংটির বিষয়ে অন্যকিছু বলি নি।জাস্ট বলেছিলাম খুলে দেখিস তো এটা মনে হয় পুরনো দিনের নিখাঁদ স্বর্ণ দিয়ে তৈরী।

এবার যখন আংটি টা খুলতে পেরেছি আমি তবে আমি আর একটা কাজ করতে চাই।উপমার হাতে আংটি পরিয়ে দিতে দিতে বললো অরণ্য।

-কি কাজ?

-আমি এখন তোমাকে নিয়ে জুয়েলার্সে যাবো।তারপর এরকম একটা আংটির অর্ডার করবো।দেখা যাক এখানকার কোন কারিগর বানাতে পারে কি না।তারপর একসাথে কোন রেস্টুরেন্টে ডিনার করে তবেই বাসায় যাবো।

-ঠিক আছে চলো।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/963205194110200/

আংটি পর্ব ৫

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৫

আজ মাজেদা খালা পুঁইশাক দিয়ে পুঁটি মাছের চচ্চড়ি আর হাঁসের ডিম ভুনা রান্না করেছে।খাবার নিয়ে উপমার রুমে আসে।উপমাকে খাবার দিয়ে বলেঃ-
-একটা কথা কমু ম্যাডাম।
-নিশ্চয়ই বলেন খালা।
-আসলে এই যে আফনে পড়াশুনা করে চাকরি বাকরি করতাছেন এইটা আমার বেবাক ভালা লাগছে।মাইয়া মানুষ হইলেই কি খালি বিয়ে-শাদির চিন্তা করন লাগবো?পরতমে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করন দরকার।আমার মাইয়াটারেও আমি আফনার মতো বানাইতে চাই ম্যাডাম।ওর লগে আমি আপনার কথা আলাপ করছি।হে আপনেরে একটাবার দেখবার চায়।আজকে আমার মাইয়াটার জন্মদিন।আমি কি একবার ওরে আফনার রুমে নিয়া আইমু।আফনে একটু দোয়া কইরা দিবান।

-নিশ্চয়ই। নিয়ে আসেন।আপনার কয় ছেলেমেয়ে খালা?বাড়িতে আর কে কে আছেন?

-আর কেউ নাই।সবই আমার পোড়া কপাল।অল্প বয়সে বাপ-মা বিয়া দিয়া দিলো।কতো শখ ছিলো পড়াশোনা করুম।তা আর হইলো না।বিয়ার বছর দুই ভালাই গেলো।এরপরই সোয়ামীর আসল রূপ দেখলাম।মদ খাইয়া বাড়ি আয়।টেকার লাগি মাইরধর করে।বাপ-মারে কইলাম।হেরা সব মানায়া নিতে কয়।কতো আর মানানি যায়।একসময় ছোট্ট ফুলি রে নিয়া পথে বাইর হইলাম।বাপ-মায় আশ্রয় দেয় না।পরে মাইয়াটারে লইয়া এইখানে আইলাম।আপনাগোর কলেজের বড় স্যারে এই রান্দোনের কাম পাওয়াইয়া দিলো।ভাবলাম ওউয়ে যখন ডেগ মাস্টারি কইরা ওউ জীবন কাটানি লাগবো তহন কলেজে ওউ মাস্টরি করি।কারো উপর আমার কোন অভিযোগ নাই।বাপ-মায়ে সুখের আশায় বিয়া দিছিলো।কপালে সুখ নাই, হেরা কি করবো।আর সোয়ামী এই লাহান করায় আইজ নিজের পায়ে খাড়াইতে পারছি।মাইয়াটারে নিয়া ভালা আছি।মাইয়ার বাপ আর এক বিয়া করছে।হেরা ভালা থাহুক দোয়া করি।বলেই কেঁদে উঠেন মাজেদা খালা।

-খালা কাঁদবেন না।মেয়ের জন্মদিনে মায়ের চোখের জল মানায় না।এতে মেয়ের অকল্যাণ হবে।আপনার মেয়েকে নিয়ে আসুন।

১২ বছরের এক মেয়ে রুমে ঢুকে।উপমাকে সালাম করে।

-থাক,থাক।কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?

-ক্লাস সেভেনে।

-শুভ জন্মদিন।আশীর্বাদ করি অনেক বড় হও তুমি।জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা তোমার।পড়াশুনার ব্যাপারে যখনই কোন হেল্প লাগবে,আমার কাছে চলে আসবে।আর এই নাও তোমার জন্মদিনের উপহার।
বলেই নিজের টব থেকে একটা নীল অপরাজিতা ফুল আর বুকশেলফ থেকে একটা ডিকশিনারি উপহার দেয় উপমা ফুলিকে।আর মাজেদা খালার হাতে এক হাজার টাকার একটা নোট দিয়ে বলেঃ

-ফুলির জন্য পোলাও মাংস রান্না করবেন আজকে।আর একটা কেকও কিনে দেবেন।
খুশী মনে ওরা মা-মেয়ে চলে যায়।

***************

কলেজ থেকে পিকনিকের আয়োজন করা হয়।
পিকনিক স্পট ঠিক হয় রাতারগুল ও বিছানাকান্দি – সিলেট।
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রস্তুমপুর ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষা এ জায়গা এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। পাথর বিছানো বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপরে বয়ে চলা মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনাধারা বিছনাকান্দির মূল আকর্ষণ।

কোন এক শুক্রবারে সব টিচার্সরা মিলে রওয়ানা দেন সিলেটের উদ্দেশ্যে।উপমা আজ পরেছে বাসন্তী রঙের সালোয়ার-সালোয়ার কামিজ।সাথে লাল-হলুদ শেডের ওড়না।কপালে সিলভার স্টোনের টিপ।ঠোঁটে মেরুন কালারের লিপস্টিক।কানে ম্যাচিং দুল।হাতে সিলভার ব্রেসলেট।খোলা চুল বাতাসে উড়ছে।কলেজে উপমা প্রতিদিনই শাড়ি পরে যায়।তাই অন্য কোন পোশাকে ওকে কেউ দেখে নি।আজ এই নিউ লুকে উপমাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে।রিমি তো বলেই ফেললোঃ-

-আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বয়স দশ বছর কমে গিয়েছে উপমা দি।

-তাই নাকি?আপনাকেও তো অন্য রকম লাগছে দিদি।বুঝাই যাচ্ছে না আপনার সাত বছর বয়সী একটা ছেলে আছে।

-হাহাহা……ধন্যবাদ।

অরণ্য পরেছে মেরুন রঙের টি-শার্ট আর ব্লু জিন্স প্যান্ট।চোখে কালো সানগ্লাস।ডিএসএলআর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে।খুব হ্যান্ডসাম লাগছে অরণ্যকে।এমনিতেও লম্বা,ফর্সা,সুস্বাস্থ্যের অধিকারী,সুদর্শন ছেলে অরণ্য।কলেজে প্রতিদিন ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে যায়।আজ সবাই নিজেদের ইচ্ছেমতো পোশাক পরেছেন।গাড়ীতে সব কলিগরা মিলে খুব আনন্দ করে যাচ্ছেন।গানের কলি খেলা হচ্ছে।কৌতুক,কবিতা আবৃত্তি নানা রকম মজা হচ্ছে।

একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে গাড়ি থামে।সবাই চা বিরতি দেন।তারপর নৌকায় উঠেন রাতারগুলের উদ্দেশ্যে।দু পাশে সবুজের সমারোহ।মাঝখানে নৌকা ভেসে যাচ্ছে।হাত দিয়ে ছোট ছোট গাছগুলোকে ছোঁয়া যাচ্ছে।সত্যি!প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি সিলেট।অরণ্যের ছবি তোলার শখ!সে ফ্রেমে আটকে ফেলছে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে।অনেক উঁচুতে উঠা রাতারগুল টাওয়ারে উঠলো তারা।যাদের উচ্চতা ভীতি আছে তারা নীচে রয়ে গেলো।টাওয়ারের ওপর থেকে নীচের সৌন্দর্য দ্বিগুণ দেখাচ্ছে।সেখান থেকে নেমে আবার নৌকায় করে বিছানাকান্দির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন সবাই।

উপমা মুগ্ধ হয়ে বিছানাকান্দির সৌন্দর্য দেখছে।এখানে পাহাড় আর মেঘ একসাথে মিশে গিয়েছে।ছোট বড় অসংখ্য নুড়ি পাথর বিছানো আছে জলের ওপর।ঠিক যেন জলের ওপর পাথরের বিছানা পাতানো।ছবির মতো সুন্দর এ জায়গা।কি স্বচ্ছ জল!এতোটাই স্বচ্ছ যে গলা পর্যন্ত পানিতে নেমে গেলেও পায়ের পাতা দেখা যায়।এখানে আকাশ নীল,পানি নীল,আর পাহাড় সবুজ।আকাশ টা যেন নুয়ে পাহাড়কে ছুঁয়ে দিচ্ছে।উপমার একটা গানের কলি মনে পড়ায় গুনগুন করে গাইলোঃ-

“এই অবারিত সবুজের প্রান্ত ছুঁয়ে
নির্ভয়ে নীল আকাশ রয়েছে নুয়ে”।

পাথরের ওপর বসে কয়েকটা ছবি উঠালো উপমা।ওখানে ছবি উঠানোর জন্য ভাড়ায় ক্যামেরা ম্যান পাওয়া যায়।জলের ওপর বিশাল এক পাথর।তার ওপর বসে থাকা উপমাকে অরণ্যের চোখে জলপরীর মতোই লাগছে।যদিও অরণ্য কোনদিনও জলপরী চোখে দেখে নি।তবু গল্পে শুনে শুনেই কল্পনায় ছবি এঁকেছে।অনুচিত জেনেও বীনা অনুমতিতে উপমার কয়েকটা ছবি তোলে নেয় অরণ্য।জীবনে অনেকসময় এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন প্রচন্ড ন্যায়বান মানুষটাও ঠিক-ভুলের সংজ্ঞা ভুলে যায়।

দৃঢ় পায়ে হেঁটে যাচ্ছে উপমা।হুট করে একটা পিচ্ছিল পাথরে পা পিছলে পরে যায় উপমা।প্রচন্ড স্রোত এসে ওকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই অরণ্য ওকে টেনে তোলে।ভয়ে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরে উপমা।জানিনা কি ছিলো উপমার স্পর্শের মধ্যে।অরণ্য যেন কেমন একটা মায়ায় ডুবে যায়।একটু পর স্বাভাবিক হয় উপমা।অরণ্যের বুক থেকে মাথা তোলে ওর চোখের দিকে তাকায়।তাকাতেই যেন বিদ্যুৎ চমকে যায় উপমার চোখে।মনে হয় এই চোখ দুটি ওর চিরচেনা।যেন বহুকাল আগে এই চোখের ভাষা ও পড়তে পারতো।কি যাদু আছে ওই দুটি চোখে।
অরণ্য বলে উঠেঃ-
-এখানে স্রোত খুব বেশী।তাই তো সবসময় কলকল ধ্বনি হয়।সাবধানে চলবেন।আর একটু হলেই তো ডুবে যেতেন।
-ডুবেছি তো।তোমার ওই চোখের সাগরে।

এর মধ্যেই বাকি সবাই এসে যাওয়া ছিটকে স্মরে যায় অরণ্য আর উপমা।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/963078340789552/

আংটি পর্ব_৪

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০

লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব_৪

আজ কলেজে নবীনবরণ অনুষ্টান।সে উপলক্ষে আলোচনা সভা ও বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টিচার্সদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।আলোচনা সভা শেষে ফুল,ডায়েরি ও কলম দিয়ে নবীনদের বরণ করে নেয়া হলো।তারপর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।স্টুডেন্টসদের পারফরম্যান্স শেষে টিচার্সদের পালা।টিচার্সদের পক্ষ থেকে কয়েকজন কবিতা আবৃত্তি করলেন।রিমি গান গাইলো।এক ফাঁকে অরণ্য উপমাকে বললোঃ-
-দেখলেন তো।রিমি কি সুন্দর গান গায়!আমি বলেছিলাম না?
-হুম। তাই তো দেখছি।

এরপরই উপমাকে গান গাইতে ডাকা হলো।অরণ্যের অবাক করা দৃষ্টির সামনে দিয়েই উপমা উঠে মঞ্চে চলে গেলো।উপমা এতো সুন্দর গান গায়।এতো মিষ্টি কন্ঠস্বর ওর।এই স্মরটা তো অরণ্যের খুব চেনা।কোথায় যেন শুনেছে সে।কিছুতেই মনে করতে পারছে না।উফ!কিছুতেই মনে পড়ছে না কেন?কেমন একটা অদ্ভুত ভালো লাগায় মনটা ভরে গিয়েছে যেন।চোখ বন্ধ করে আছে অরণ্য।যেন পৃথিবীতে কেউ কোথাও নেই।উপমা গাইছে আর অরণ্য শুনছে।অনন্তকাল কেটে যাক এভাবে।গান শেষে দর্শকদের অগণিত হাততালি আর ওয়ান মোর ওয়ান মোর রিকোয়েস্ট শুনে চোখ খুলে তাকায় অরণ্য।সবার প্রশংসা কুড়িয়ে মঞ্চ থেকে দৃঢ় পায়ে নেমে আসছে উপমা।এসে অরণ্যের পাশের সীটে বসলো।অরণ্যের কেমন লজ্জা লজ্জা করছে।এই মেয়েকে সেদিন বলেছিলো এক্সট্রা কারিকুলামে এক্টিভ থাকলে কি আর পড়াশুনায় ওমন রেজাল্ট করা সম্ভব হতো।তাছাড়া রিমির গানের প্রশংসাও করেছিল খুব।যে মেয়ে নিজেই কোকিল কন্ঠী,তার কাছে বান্ধবীর গানের প্রশংসা করাটা কোন বাহাদুরির কাজ নয়।

-আচ্ছা।আপনি সেদিন বললেন না-তো নিজে এতো ভালো গান করেন।
-এতে বলার কি আছে?
-না বললে মানুষজন জানবে কি করে?
-আজকে যেভাবে জানলেন সেভাবেই জানতো সবাই। তাছাড়া না জানলেও হবে।এটা এমন জরুরী কোন ইস্যু না।
-হাহাহা……আচ্ছা আচ্ছা।

পাশ থেকে উপমা কখন উঠে গিয়েছে খেয়ালই করে নি অরণ্য।গানের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে নৃত্যানুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে।নৃত্যশিল্পী হিসেবে উপমাকে স্টেজে নাচতে দেখে অরণ্য খেয়াল করলো ওর পাশের সীটে অন্য কেউ বসে আছে।আজকাল তো ক্লাসিকাল নৃত্য তেমন একটা কেউ করেই না।উপমার নৃত্যের তালে চারদিকে সুনসান নীরবতা। একে তো ওমন রূপ,তার ওপর উপমার নাচে আছে শৈল্পিক ছোঁয়া।সব মিলিয়ে মুগ্ধ দর্শকরা।নাচ শেষে গ্রীন রুমে গিয়ে ড্রেস পাল্টে আবার দর্শক সারিতে এসে বসে উপমা।অরণ্য গলার স্মর নীচু করে বলেঃ-

-আপনার আর কি কি গুণ আছে বলুন তো ম্যাডাম?

-আকাশে চাঁদ উঠলে,বাগানে ফুল ফুটলে তা কি কাউকে বলে দিতে হয়?
এমনিতেই সবাই দেখতে পায়।

-দারুণ বলেছেন।

-ধন্যবাদ।আসুন আমরা পুরো অনুষ্ঠান টা উপভোগ করি এবার।

**************

রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিরিয়ানির প্যাকেটটা খুলে উপমা।কলেজ থেকে দিয়েছে সবাই কে।খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়।সন্ধ্যায় উঠে চা খেয়ে বাসায় ফোন দেয়।প্রতিদিন নিয়ম করে ওর মায়ের সাথে কথা বলতে হয়।কি খায় না খায় সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন উপমার মা।

-তুই তো অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছিস রে মা।

-না মা।একটুও শুকাই নি।আগেও ৫২ কেজি ছিলাম,এখনো তা আছি।ওয়েট মেশিন কিন্তু তা-ই বলছে।

-কিন্তু চোখমুখ এতো শুকনো লাগছে কেন?

-জানই তো মা আজ কলেজে একটা প্রোগ্রাম ছিলো।তাই হয়তো একটু টায়ার্ড লাগছে।

-দুপুরে কি খেয়েছিস?

-বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়েছে কলেজ থেকে।

-রানের পিসটা পেয়েছিলি?

-উফ মা!এতো চিন্তা কেন করছো?রান পাই নি।তবে ভালো একটা পিসই পেয়েছি।কলেজ ক্যান্টিনে রান্না হয়েছিলো।খেয়েছি তৃপ্তি সহকারে।লেবু,সালাদ, ডিম সব ছিলো প্যাকেটে।

-আচ্ছা মা ঠিক আছে।

-বাবাকে বলো আমি পরে কল দেবো।আগামীকালের ক্লাসের জন্য লেকচার শীট রেডী করতে হবে।রাখছি।

উপমার মা উর্মিলা দেবী।সন্তান স্নেহে অন্ধ বলা যায়।কতো সাধনার ধন এই কন্যাটি।উর্মিলা দেবীর সাধনা বিফলে যায় নি।মেয়েকে তিনি সবদিক দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলতে পেরেছেন।আজ একা একা এতোদূরে পড়ে আছে।মেয়েটা মুরগির রান খেতে খুব ভালোবাসে।মাছের লেজ ওর প্রিয়।উপমা যাবার পর বাসায় মুরগী এলেও রানগুলি তিনি ফ্রিজে জমিয়ে রেখেছেন।তেমনি বড় মাছের লেজও রাখা আছে।মেয়ে ছুটিতে এলে একসাথে খেতে দেবেন।মায়েরা তো এরকমই হোন।

কলেজ লাইব্রেরীতে উপমার সাথে আবার দেখা হয় অরণ্যের।এতোদিন শুধুমাত্র ওর আংটির প্রতিই অরণ্যের সব আগ্রহ ছিলো।এবার উপমার প্রতিও কিছুটা আকর্ষণ বোধ করছে।আংটি সম্পর্কে জানতেই হবে।সেজন্য আগে উপমার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে হবে।এক্ষুনি স্বপ্নের কথা বলা যাবে না।আর বললেও উপমা কখনোই এটা বিশ্বাস করবে না।বরং ভাববে ওকে আকৃষ্ট করার জন্য অরণ্য বানোয়াট গল্প সাজিয়েছে।

-ম্যাডামের উনি কি করেন?
-কার কথা বলছেন?
-মানে আপনার উড বির কথা বলছিলাম আর কি।
-এখনো ঠিক জানি না কি যে করেন।তবে এইটুকু জানি এখনো বিয়ে করেন নি।
-বাহ!বেশ বললেন তো।উনার নাম বুঝি “B” দিয়ে।
-“A” নাকি “B” তা এখনো ঠিক জানিনা।আসলে ঐটা আমার এনগেজমেন্ট রিং নয়।
-কি বলেন! আমি তো আংটিতে বি লেখা দেখে ভেবেছিলাম আপনার হবু স্বামীর নামের প্রথম অক্ষর বোধহয় বি।
-না,না।এই আংটিটা ছোটবেলা থেকেই আমার হাতে আছে।মা বলেছেন কোন এক সাধু বাবা এটা আমাকে দিয়েছেন।তবে এই বি লেখার মানে বুঝিনি।মা-ও ঠিক জানেন না।
-আপনার টাইটেল তো মুখার্জি।উপমা মুখার্জি।তবে তো টাইটেলে অক্ষরও বি নয়।
তাহলে ঐ সাধু বাবা বোধহয় জানতেন আপনি ভবিষ্যতে এই বনগাঁও কলেজের লেকচারার হবেন।তাই এটা আপনাকে দিয়েছেন।
-হাহাহা…….. এভাবে তো ভেবে দেখি নি।
-মজা করে বললাম।যা-ই হোক,”B” for the best.
-সেটাই।
-আংটি টা খুব আনকমন ডিজাইনের।তবে সুন্দর!হয়তো এটা অনেক পুরাতন ডিজাইন।
-এই আংটির একটা স্পেশালিটি আছে।আংটিটা আমি ছাড়া আর কেউ খুলতে পারে না।আবার এরকম আংটি আর কেউ বানাতেও পারে না।আমার এক বান্ধবী বানাতে চেয়েছিলো।বাট কারিগর অর্ডার নিয়ে আবার দু দিন পর না করে দিয়েছে। একটা মজার ব্যাপার হলো,একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে কিছু ছিনতাইকারী আমাকে ধরে।ওরা আমার রিকশা আটকে দেয়।মোবাইল,টাকা সব নিয়ে যখন আংটিটা নিতে চায় তখনি ওরা তিনজন একসাথে সেন্সলেস হয়ে যায় আর অনেক মানুষ জড়ো হয়ে ওদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।আমি আমার সব জিনিস নিয়ে নির্বিঘ্নে বাসায় চলে আসি।
-ভেরি ইন্টারেস্টিং!আমি এখন ক্যান্টিনে যাবো চা খেতে।আপনিও চলুন একসাথে যাই।
-ঠিক আছে চলুন।
চা-টা খেয়ে যে যার ক্লাসে চলে যায়।উপমা মনে মনে ভাবতে থাকে ও তো সবসময়ই স্বল্পভাষী।চট করে কারো সাথে ফ্রি হতে পারে না।অথচ অরণ্য কে কেমন জানি বন্ধু বন্ধু মনে হয়।এতো কথা অরণ্যের সাথে শেয়ার করলো।এমনকি আংটির বিষয়েও কতোকিছু জানালো।আবার একবার বলতেই চা খেতেও চলে আসলো।তবে কি উপমার জীবনে নতুন কিছু হতে চলেছে।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962952950802091/

আংটি পর্ব ৩

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৩

ক্লাস শেষে কোয়ার্টারে ফিরে আসে উপমা।কলেজ বিল্ডিং এর পাশেই টিচার্স কোয়ার্টার।কলেজের পিছন দিকে ছোট্ট একটা রাস্তা। রাস্তা মানে সরু গলি।দু পাশে শিমুল,কদম,মেহগনি,কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানো।এই এক ফালি পথটুকু হেঁটে আসতেই ভালো লাগে উপমার।
তারপরই ওর কোয়ার্টার।

উপমার ছেলেবেলা কেটেছে ছোট্ট এক মফস্বল শহরে।ক্লাস এইটে উঠার পর তারা ঢাকায় চলে আসে।তারপর থেকে ঢাকারই স্থায়ী বাসিন্দা তারা।বাবা-মাকে ছেড়ে এই প্রথমই একা একা থাকছে।কোয়ার্টারে উপমা একটা সিঙ্গেল রুমে থাকে,এটাচড ওয়াশরুম।রুমের সাথে ছোট্ট একটা ব্যালকনি।কমন কিচেন।মাজেদা খালা এই কোয়ার্টারের রাঁধুনী।রান্নার পর উপমার ঘরে এনে খাবারটা দিয়ে যায়।যদিও ডাইনিং রুমে অনেকগুলো চেয়ার পাতা আছে।তবু ঘরে বসেই খাবার খেতে পছন্দ করে উপমা।এই মাজেদা খালা মহিলাটাকে ভালোই লাগে উপমার।এই ধরণের মহিলা সাধারণত পান খেয়ে রসিয়ে রসিয়ে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে মজা পায়।ওদের পছন্দের টপিক হলো কোন অবিবাহিত মেয়ে দেখলে তার বিয়ে না হওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করা।কবে বিয়ে খাবো বলতে বলতে কাউকে বিরক্ত করা কিংবা বিবাহিত হলে বাচ্চা আছে কি-না,কবে হবে,কেন হচ্ছে না আবার বাচ্চাকাচ্চা থাকলে স্বামী-সংসার ফেলে এতোদূরে চাকরি করতে আসছেন কেন এইসব বিষয়ে বার বার বলে বলে মুখে ফেনা তোলা।কিন্তু উপমা দেখলো মাজেদা খালা পানও খান না।আবার ওসব বিষয়ে কখনো কিছু জিজ্ঞেসও করেন নি।নিজের কাজটুকু নিষ্ঠা সহকারে করে যান।বাড়তি কথা খুব একটা বলেন না।রান্নাটাও বেশ ভালোই করেন।সাধারণত এরকম ছুটা বুয়ারা খুব বেশী তেল আর হালকা মসলা দিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব রেসিপি রান্না করে।সেই সাথে প্রায় সবাই ম্যাজিক ডাল রান্না করতে বিশেষ পারদর্শী হয়।এই ডালটা এতোটাই পাতলা হয় যে সেটাকে একইসাথে ডাল এবং হাত ধুয়ার জল দুটোই বলা চলে।তাই এই ধরনের ডালকে উপমা মনে মনে নাম দিয়েছে ম্যাজিক ডাল।উপমা নিজে কখনোই বাসার বাইরে না থাকলেও কাজিন এবং বান্ধবীদের হোস্টেলে,মেসে অনেকবার গিয়েছে।তাই উপমা এসকল রান্নার সাথে খুব পরিচিত।তবে মাজেদা খালার রান্না এরকম না।মোটামুটি ভালোই রান্না করেন।সব থেকে প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে কোন রান্নাতেই অতিরিক্ত তেল লাগান না।ডালটাও ঠিকঠাক মতোই রাঁধেন।সেজন্য ঘরোয়া একটা আমেজ পাওয়া যায় খাবারে।এছাড়া এই মহিলা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।তাই তৃপ্তির সহিত খাওয়া যায়।সব মিলিয়ে মাজেদা খালাকে ভালোই লাগে উপমার।
উপমা নিজের রুমে রাইস কুকার,ইলেকট্রিক কেটলি,ব্লেন্ডার এগুলো রেখেছে।চা,কফি কিংবা গরম জলের জন্য যাতে কিচেনে যেতে না হয়।কিচেন শেয়ার করতে ভালো লাগে না উপমার।তাই রুমের ভেতরই ব্যবস্থা করে নিয়েছে।রুমের ভেতর আসবাবপত্র বলতে একখানা চৌকি ও একটা সস্তা চেয়ার-টেবিল ছিলো।উপমা নিজে একটা বুকশেলফ আর কাপড় রাখার জন্য একটা প্লাস্টিকের ওয়ারড্রব কিনে এনে রেখেছে।বুকশেলফ ছাড়াও ওয়ারড্রবের একটা ড্রয়ারে বই রাখা আছে।যেহেতু উপমার বই পড়ার খুব নেশা।

ব্যালকনিটা নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছে উপমা।একপাশে টবে কয়েকজাতের ফুল লাগিয়েছে।একপাশটা খালি রেখেছে।খালি পাশটায় ইচ্ছে হলেই ছোট্ট শীতলপাটি বিছিয়ে বই নিয়ে বসে যায় উপমা।সাথে থাকে চা কিংবা কফি।দেয়ালের সাথে বালিশ লাগিয়ে রাখে।বালিশে পিঠ দিয়ে পড়তে ভালো লাগে উপমার।

আজ শুক্রবার।ছুটির দিন।সকাল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে।উপমা রাইস কুকারে চাল-ডাল বসিয়েছে।খিচুড়ি আর ডিমভাজি দিয়ে লাঞ্চ করবে আজ।খিচুড়ি বসিয়ে হাতে এক কাপ চা নিয়ে ব্যালকনিতে আসে উপমা।বৃষ্টি ভেজা সবুজ প্রকৃতি দেখতে ভালোই লাগছে উপমার।গাছগুলো যেন একসাথে স্নান করছে সব।কানে হেডফোন গুঁজে দিয়েছে উপমা।রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে।

“এসো নীপবনে,ছায়াবিথী তলে এসো
করো স্নান নবধারা জলে এসো,নীপবনে”।

হঠাৎ ঐ সরু গলিটার দিকে চোখ পড়ে উপমার।দেখে অরণ্য বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কদম ফুল কুড়াচ্ছে।সাথে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।সবুজ টি-শার্ট আর সাদা-কালো ট্রাউজারে অরণ্য কে দেখতে কলেজ স্টুডেন্টদের মতোই লাগছে।কে বলবে অরণ্য এই কলেজের সিনিয়র লেকচারার।মনে মনে ভাবে উপমা।কলেজ ক্যাম্পাসের কথা মনে পড়ে উপমার।বৃষ্টি ভেজা ক্যাম্পাসটা নিশ্চয়ই সবুজ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে।শুক্রবার থাকায় কলেজের এই স্নিগ্ধ রূপটা দেখতে পারলো না উপমা।ছাতা মাথায় দিয়ে মাজেদা খালা হেঁটে আসছেন।খালাকে জানাতে হবে আজ দুপুরে ওর জন্য খাবার না দিতে।
নতুন চাকরি,নতুন কর্মস্থল,নতুন বাসস্থান,কিছু অপরিচিত নতুন মানুষ।সব মিলিয়ে এই নতুন জীবনটাকে উপভোগ করছে উপমা।

****************
সন্ধ্যাবেলা নিজ রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো অরণ্য।এমন সময় ওর মা ফোন করলেনঃ-
-হ্যাঁ মা বলো।

-আমি আর কি বলবো বাবা।বলবি তো তুই। তোর নীলিমা আন্টি একটু আগে কল করেছে।গতকাল জানানোর কথা ছিলো।অথচ আজো আমরা জানাতে পারলাম না।তুই তো এখনো কিছু বললি না।

-পছন্দ হলে নিশ্চয়ই বলতাম মা।কিছু যখন জানাই নি তার মানে তো তোমরা বুঝে নিতে এখানে আমার মত নেই।

-তোর অমতের কারণটা বল।

-ওসব বড়লোকের ন্যাকা ন্যাকা মেয়ে আমার একদম পছন্দ না মা।দেখার দিন দেখলে না কেমন ন্যাকামো করলো।রান্নার কথা জিজ্ঞেস করতেই কেমন উত্তর দিলো!ও নাকি পড়াশুনা নিয়েই বিজি ছিলো।তাই রান্নাঘরের ধারে কাছেও যায় নি।এটা কোন কথা হলো!যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না।

-দেখ বাবা,আজকালকার মেয়েরা এমন একটু হয়েই থাকে।এসব কোন ব্যাপার না।তাছাড়া আমার একমাত্র ছেলের বৌ।আমি ওকে রান্না করতে দেবোই বা কেন?আমি এটা বলছি না ঐ মেয়েকেই তোর বিয়ে করতে হবে।কিন্তু কাউকেই তো তোর পছন্দ হয় না।আমার কি ইচ্ছে করে না ঘরে বৌমা আনতে।তোর বাবার কতো শখ বৌমাকে নিয়ে।আর কতো অপেক্ষা করবো বল তো।

-অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় মা।আর বোধহয় বেশীদিন অপেক্ষা করতে হবে না।এখন রাখছি।আগামীকাল আমাদের কলেজে নবীনবরণ অনুষ্টান আছে।এখন এটা নিয়ে একটু কাজ করছি।পরে কথা হবে।

ফোন রেখে আবার কাজে লেগে যায় অরণ্য।হঠাৎ করে কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব আসে।তখনি সেই স্বপ্নটা আবার দেখে।একটা ছেলে একটা মেয়েকে আংটি পরিয়ে দিচ্ছে।তারপর ঐ মেয়েটার সীঁথি তে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছে।যদিও কারোরই চেহারা দেখা যায় নি।শুধু হাত আর কপাল দেখেছে।তখনই স্বপ্নটা ভেঙে যায়।ধড়ফড়িয়ে উঠে অরণ্য।কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।তারপর একগ্লাস পানি খেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ভাবতে থাকে এ স্বপ্নের মানে কি!এতো বছর তো শুধু আংটি পরানোই দেখতো।আজকে সিঁদুর দান দেখলো।আংটি টা তো একই আছে।উপমার হাতে যেটা থাকে।তবে কি ক্রমশই খুলবে এই রহস্যের জট।অপেক্ষায় থাকে অরণ্য।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962773780820008/

আংটি পর্ব_২

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব_২

বনগাঁও সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের লেকচারার অরণ্য চ্যাটার্জী।ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস,ঐতিহ্যের প্রতি খুব আগ্রহ তার।পুরাতন জমিদার বাড়ি,ভাঙা রাজপ্রাসাদ,প্রসিদ্ধ মন্দির,পুরাকীর্তি এগুলো ওকে খুব টানে।ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় অরণ্য ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে জেলা পর্যায়ে ফার্স্ট আর সারা বিভাগে মধ্যে ফোর্থ হয়েছিল।স্বভাবতই সবাই ভেবেছিলেন অরণ্য সায়েন্স নিয়ে পড়বে।কারণ কেউ পড়াশুনায় ভালো হলেই আমরা ধরে নেই যে সে হয় ডাক্তার নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হবে।অথচ রবি ঠাকুর, নজরুল ইসলাম,জয়নুল আবেদিন ওদের কারোরই যে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো না এটা কারোরই মনে থাকে না।

যা-ই হোক,অরণ্য নাইনে উঠে মানবিক শাখায় ভর্তি হওয়াতে সবাই খুবই অবাক হয়েছিলেন।অনেকেই উপযাচক হয়ে অনেককিছু বুঝালেন।কিন্তু কারো কথায়ই কোন কাজ হয় নি।অরণ্যের এক কথা।হয় মানবিকে পড়বে,নয়তো পড়াশুনা ছেড়ে দেবে।একমাত্র ছেলের জিদের কাছে বাবা-মা হেরে যান।তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে বিসিএস পাস করে এই বনগাঁও সরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে পাঁচ বছর ধরে কর্মরত আছে।

আজ এই কলেজে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন একজন লেকচারার এসে জয়েন করবেন।সেটা নিয়ে সবাই খুব বিজি।যদিও এটা বাংলা ডিপার্টমেন্টের বিষয়,তবু নতুনকে নিয়ে সবারই আগ্রহ আছে।তার ওপর প্রথমবারেই বিসিএসে ঠিকে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।তাই নতুন অতিথি কে দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় আছেন।

সকাল দশটায় উপমা এসে কলেজে পৌঁছায়।পরনে নীল জামদানি শাড়ী।থ্রী কোয়ার্টার ডিজাইন করা ব্লাউজ।চুলে লম্বা বেনী করা।কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ।ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। ম্যাচিং কানের দুল।সবমিলিয়ে উপমাকে আজ অন্যরকম লাগছে।বাংলা বিভাগের স্টুডেন্টরা ওকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়।প্রথম দিন হওয়ায় একটু নার্ভাস লাগছিলো উপমার।কিন্তু সবার আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ উপমা।স্টুডেন্টদের জন্য চকলেট নিয়ে এসেছিল উপমা।এক এক কার্টুন করে এক এক ইয়ারে পিয়নকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো।নতুন ম্যাডামকে দেখে তো ছাত্র-ছাত্রীরা ফিদা হয়ে যায়।এতো সুন্দরী ম্যাডাম!কি মিষ্টি হাসি।সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছাত্রটাও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো এই ম্যাডামের ক্লাস কিছুতেই মিস করবে না।ছাত্রীদের মধ্যে ম্যাডামের শাড়ী,স্টাইলিশ ব্লাউজ,ম্যাচিং কানের দুল এগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।সবচেয়ে অবাক হলো ম্যাডামের ফাঁকা সীঁথি দেখে।তবে ম্যাডামের সাহস আছে বলা যায়।নইলে এতোদূরে একা একা চলে আসেন।

নিজ বিভাগে পরিচয় পর্ব শেষ হবার পর প্রিন্সিপাল স্যার নিজে উপমাকে নিয়ে গিয়ে সব ডিপার্টমেন্টের টিচার্সদের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন।সবার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো উপমার।অনেক সিনিয়র জুনিয়র কলিগরা আছেন।যদিও প্রতিটা ডিপার্টমেন্টেই স্যারদের সংখ্যাই বেশী,তবু ম্যাডামরাও একেবারে কম নয় সংখ্যায়।সবশেষে আসলেন ইতিহাস বিভাগে।একে একে সবার সাথে পরিচয় শেষে এবার অরণ্যের পালা। অরণ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার পর উপমা নমস্কার জানালো।ঠিক তখনি অরণ্যের মাথাটা ঘুরে গেলো।কোনমতে নমস্কারের প্রতিউত্তর দিয়ে ক্লাস আছে বলে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো অরণ্য।ব্লু চেক-শার্ট আর কালো ফরমাল প্যান্ট পরা অরণ্যর আচরণ বেশ অদ্ভুত লাগলো উপমার কাছে।

ক্লাসে সর্বদা মনোযোগী অরণ্য স্যারকে আজ বেশ উদাসীন দেখাচ্ছে।যেটা ছাত্রদের চোখে পড়েছে।আসলে ক্লাসের মাঝেও উপমার কথা মনে হতে লাগলো অরণ্যর।উপমা বলতে উপমার হাতের ঐ আংটিটার কথাই ভাবতে লাগলো অরণ্য।এটা কি করে সম্ভব।ঐ আংটিটা দেখেই মাথা ঘুরে যায় অরণ্যের।অরণ্য ছোটবেলা থেকে প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখে।একটা ছেলে একটা মেয়েকে আংটি পরিয়ে দিচ্ছে।এই একই স্বপ্ন সে বার বার দেখে।মাকে বলার পর মা বলেছে স্বপ্নের কোন ব্যাখ্যা হয় না।বড় হবার পর বন্ধুদের সাথেও বিষয়টা শেয়ার করেছে।বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলেছে ও নাকি মনে মনে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে আছে।তাই এমন স্বপ্ন দেখে।অথচ এই কথাটা একদম ঠিক নয়।বিয়ে শাদী নিয়ে অরণ্যের মাঝে কোন ফ্যান্টাসি নেই।বিয়ে দূরে থাক, আজ পর্যন্ত একটা প্রেমও করে নি অরণ্য।অথচ স্বপ্নে দেখা সেই আংটিটাই আজ উপমার হাতে দেখলো অরণ্য।স্বপ্ন সত্যি হলো কি করে!কিন্তু পুরোটা তো সত্যি হয় নি।কিছুটা গড়মিল রয়েছে।এই রহস্যটা যেভাবেই হোক ভেদ করতে হবে অরণ্যকে।মাথায় কেমন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে।না,আজ আর ক্লাস নিতে পারবে না অরণ্য।

কয়েকদিন পরের ঘটনা।কলেজ লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ছে উপমা।ওকে দেখেই এগিয়ে আসছে অরণ্য।এই তো উপমার বাঁ হাতের অনামিকায় বসানো আছে সেই আংটিটা।এই আংটি অরণ্যের খুব চেনা।স্বপ্নে দেখেছে একটা ছেলে একটা মেয়েকে এই আংটিটা পরিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু ছেলে-মেয়ের চেহারা কখনোই স্বপ্নে দেখে নি অরণ্য।শুধু হাত দুটোই দেখেছে।স্বপ্নে দেখা সেই হাতের সাথে উপমার হাতের কোন মিল নেই।সেই দুইখানি হাত হলো শ্যামলা রঙের অতি সাধারণ হাত।আর উপমার হাত হচ্ছে টকটকে ফর্সা।খয়েরী রঙের নেইলপালিশ আঙুলের শোভাবর্ধন করেছে।অবিকল সেই আংটি।কি বলবে না বলবে মনে মনে ঠিক করে নিলো অরণ্য।যদিও অরণ্য খুব মিশুকে স্বভাবের ছেলে।যে কারো সাথে সহজেই বন্ধুত্ব করে নিতে পটু সে।তবু আজ কেমন জানি একটু একটু টেনশন হচ্ছে।তবু মনে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলো উপমার দিকে।অরণ্য মুখোমুখি চেয়ারে বসে বললোঃ-

-যা-ই হোক,আমার মতো আর একজন তো পেলাম যে কিনা এতো ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট নিয়েও আর্টসে পড়াশুনা করেছেন।

-হাহাহা…….আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যানুরাগী।আপনি যেমন অতীতকে ভালোবেসে ইতিহাসকে সঙ্গী করে নিয়েছেন,আমার ক্ষেত্রেও তা-ই।
-আমার খবর কি করে জানলেন?

-আমাদের বিভাগের রিমি ম্যাডাম বলছিলেন সেদিন।উনি তো আপনার ক্লাসমেট।

-ও হ্যাঁ।রিমি কি বললো?আমার রেকর্ডস ভেঙে যাওয়ার কথা?

উপমা প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে মিষ্টি করে হাসলো শুধু।

-আসলে কি জানেন তো ম্যাডাম।এতোদিন পর্যন্ত সকল টিচার্সদের মধ্যে আমার একাডেমিক রেজাল্ট ছিলো সবার ওপরে।আপনি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন।রিমি তো সবসময়ই বলে,রেজাল্ট নিয়ে এতো লাফালাফি করিস না।দিনরাত পড়ার টেবিলে মুখ গুজে বসে থাকলে ওমন রেজাল্ট সবাই করতে পারে।পড়াশুনা ছাড়া তো আর কোন কর্মই পারিস না।আমাদের মতো মাল্টি ট্যালেন্ট হলে বুঝতি।আপনিই বলুন, অন্যদিকে মন দিলে পড়াশুনায় বিঘ্ন ঘটতো না?এমন রেকর্ডস মার্কস পাওয়া কি সম্ভব হতো?আপনি এসবের মর্ম বুঝবেন।ও হ্যাঁ,রিমি কিন্তু খুব ভালো গান গায়।সামনেই তো নবীনবরণ অনুষ্ঠান আছে।তখন শুনতে পাবেন।
-ওহ,আচ্ছা।এখন আমার একটা ক্লাস আছে।উঠছি তবে।বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো উপমা।

অরণ্য বসে বসে ভাবছে।যাক,বাবা!আসল কথাই তো জানা হলো না।আংটির ব্যাপারে কথা বলার জন্যই তো এতোক্ষণ কথা বললো।থাক।সমস্যা নেই। একই কলেজে যখন আছে,অারো অনেকবারই তো দেখা হবে।অন্য কোনদিন জেনে নেয়া যাবে।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962498257514227/

আংটি পর্ব_১

0

আংটি পর্ব_১

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

এ গল্পের নায়িকার নাম হচ্ছে উপমা।নামের মতোই সুন্দর সে মেয়ে।যাকে বলে একেবারে রূপে লক্ষী,আর গুণে সরস্বতী।বিধাতা অতি যত্ন করে রূপে-গুণে সাজিয়েছেন মেয়েটাকে।দুধে-আলতা গায়ের রঙ।স্বচ্ছ দীঘির মতোই টলমল করছে টানা টানা চোখ দুটি।ডালিম ফলের মতো রাঙা দুটি ঠোঁট।মায়াবী চেহারা!মাথা ভর্তি দীঘল কালো চুল পিঠ ছাড়িয়ে গেছে।লম্বা, ছিপছিপে গড়নের মেয়ে।

এতো গেলো রূপের বর্ণনা।এবার গুণের কথায় আসি।সর্বদা স্বল্পভাষিণী,সুহাসিনী,মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে উপমা।বিদ্যা দেবীর কৃপায় জীবনের কোন পরীক্ষায় ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয় নি সে।মা সরস্বতী ওকে কন্ঠ ভরা সুর দিয়েছেন।নটরাজের আশীর্বাদ আছে উপমার মাথার ওপর।তাই তো সে নাচে-গানে সমানভাবে পারদর্শী।

বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে উপমা।আমাদের দেশে যেখানে কলেজের গন্ডি পেরোনোর আগেই অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়,সেখানে উপমার মতো মেয়ে এখনো অবিবাহিত।এটা সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়!
উপমা দু বছর আগে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে।সাহিত্যের ছাত্রী ছিলো সে।মধুসূদন বাবুর মতোই বাংলা ভাষার অমৃত সুধা পান করেছে সে।তাই তো ভাষা কে ভালোবেসেই অন্য সব সাবজেক্ট বাদ দিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাকেই বেছে নিয়েছিলো।শুরু থেকেই শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ ছিলো।সেভাবেই প্রিপারেশন নিয়েছে।প্রথমবারেই সফলতার সহিত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে।এখন পোস্টিং এর অপেক্ষায় আছে।
এর মাঝেই উপমার বিয়ের জন্য অনেকগুলি প্রপোজাল এসেছে।কিন্তু কথায় আছেঃ-

“অতি বড় সুন্দরী না পায় বর
আর অতি বড় ঘরণীর না হয় ঘর”।

উপমার ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে।একটার পর একটা বিয়ের সম্মন্ধ আসে।আবার কোন এক অদৃশ্য কারণে সেটা ভেঙেও যায়।এই তো গতবছর ওই ডাক্তার ছেলে যে কি-না কোন এক বান্ধবীর বিয়েতে উপমাকে দেখে পছন্দ করেছিলো।তার পরিবার নিজে থেকেই এসে উপমাকে আশীর্বাদ করে যান।খুব আগ্রহ ছিলো উনাদের।বিয়ের দিন-তারিখও প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিলো।অবশেষে পাত্রের বাবা ফোন করে সবকিছু বাতিল করে দেন।।উপমা উড়ো উড়ো শুনেছে সেই ছেলে নাকি মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট করে ছয়মাস হসপিটালাইজড ছিলো।কোনমতে বেঁচে ফিরেছে।এরকম ঘটনা আরো কয়েকবার ঘটেছে।উপমাকে দেখে যাবার পরই নাকি পাত্রপক্ষের পরিবারে কোন না কোন অঘটন ঘটে।তা-ই বিয়ে বাতিল হয়ে যায়।

উপমা আধুনিক যুগের শিক্ষিত মেয়ে।এসব বিষয় খুব একটা পাত্তা দেয় না।বিয়েটাই ওর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়।বিয়ে হলে হবে,না হলে নাই।তার থেকে ও ক্যারিয়ারের বিষয়েই বেশী কনশাস।উপমার বাবা-মা কিছুটা চিন্তিত হলেও কোথাও একটা স্থির বিশ্বাস আছে উনাদের মেয়ের বিয়ে খুব ভালোভাবেই হবে।শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।কিছু আত্মীয়স্বজন,বন্ধু-বান্ধব আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চান উপমা একটা অপয়া মেয়ে।
হায়রে আমাদের সমাজ!একদিন যারা উপমাকে নিয়ে গর্ব করতো,নিজেদের সন্তানদের কাছে উপমাকে আইডল সাজাতো।তারাই আজ উপমাকে অপয়ার অপবাদ দিচ্ছে।এখনো এ সমাজে বিয়েটাই যেন একটা মেয়ের যোগত্যার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।অবশ্য উপমার বাবা-মা কখনোই তা বিশ্বাস করেন না।উনাদের কাছে মেয়ে আগের মতোই আছে।মেয়ের জন্মের পর বাবার ব্যবসা দিন দিন বেড়েই চলেছে।ছোটবেলা থেকেই কতো সুনাম কুড়িয়ে এনেছে মেয়েটা।

এরমাঝেই একদিন সুখবরটা আসে।উপমার পোস্টিং হয়েছে কোন এক উপজেলা শহরে।আগামী সপ্তাহেই জয়েন করতে হবে।উপমার এতোদিনের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।এতে ওর বাবা-মাও খুব খুশী।কিন্তু মেয়ের এতোদূরে পোস্টিং হওয়ায় মনটা কিছুটা খারাপ।একটা অচেনা অজানা জায়গায় মেয়েটা চাকরি করতে যাবে।তাও বিবাহযোগ্য সুন্দরী কন্যা।তাছাড়া মেয়েটাকে না দেখে থাকবেন কিভাবে।কিন্তু উপমা ওদেরকে বুঝায় যে বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে না দেখে থাকার কিছু নেই।ভিডিও কলে রোজ দেখতে পাবেন মেয়েকে।আর এখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব উন্নত।যে কোনদিন মেয়েকে দেখতে যেতে পারবেন।আর উপমাও তো ছুটি পেলেই বাড়িতে আসতে পারবে।তাতে বাবা-মা কিছুটা আশ্বস্ত হোন।যেহেতু আগামী সপ্তাহেই জয়েন করতে হবে,তাই উপমা সবকিছু গুছগাছ করা শুরু করে দেয়।কিছু টুকিটাকি শপিং করতে হবে।কয়েকটা শাড়ী,দুটো শীতের পোশাক,একটা রেইনকোট,একটা ফার্স্ট এইডেড বক্স আর কিছু কসমেটিকস কিনে নেয় উপমা।এরপর ব্যাগ প্যাক করে নিতে হবে।

তারপর একদিন সকালবেলা অচেনা কর্মস্থলের উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়ে যায় সে।যদিও উপমার নিজেরও খুব খারাপ লাগছিলো বাসা ছেড়ে যেতে।ছেলেবেলার কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাসায়।ছাদের ওপর উপমার বসার একটা আলাদা জায়গা আছে।নিজের রুমের বেড,চেয়ার,টেবিল, বুকশেলফ,আলমারি, আয়না, সবকিছুর ওপরই মায়া লেগে আছে।তবু বাবা-মার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মন খারাপ ভাবটাকে দূরে স্মরিয়ে রাখলো উপমা।হাসিমুখে বিদায় নিলো।বাসা থেকে বের হতেই মনে হলো এই চেনা গলি,পরিচিত মুদির দোকান,ফ্ল্যাক্সি লোডের দোকান,পাড়া প্রতিবেশী সবকিছুই মিস করবে ভীষণ রকম।

বাবা স্টেশনে ছেড়ে দিলেন ওকে।বাসে বসে ম্যাগাজিন পড়া শুরু করলো উপমা।কিছুক্ষণ পর টিফিনবক্স টা বের করলো।মা রুটি-চিকেন বানিয়ে দিয়েছেন।পরিচিত হাতের রান্নার সুগন্ধ নাকে এলো।আর বহুদিন মায়ের হাতের রান্না খেতে পারবে না।বাবা ফল কিনে দিয়েছেন।বাবা-মায়ের আদরগুলি ব্যাগে ভরে নিয়ে নতুন জায়গায় যাচ্ছে উপমা।জানিনা নতুন জায়গায় কি অপেক্ষা করে আছে উপমার জন্য।

বাসায় এসে মেয়ের জন্য খুব মন খারাপ হয় উত্তম বাবুর।ঘন্টায় ঘন্টায় মেয়েকে ফোন করেন।মেয়েটা নিরাপদে পৌঁছাতে পারলেই বাবা নিশ্চিন্ত হোন।

লং জার্নি শেষে গন্তব্যে এসে পৌঁছে উপমা।এখানে কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা আছে।স্টেশনে নেমে সিএনজি ভাড়া করে নিজের বাসস্থানে পৌঁছে যায়।এখানকার কেয়ার টেকার রুস্তম চাচা ওর রুম দেখিয়ে দেন।এসেই স্নান সেরে নেয় উপমা।তারপর বাবা-মার সাথে কথা বলে লম্বা একটা ঘুম দেয়।ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খায়।রাতের খাবার রুমে এসে দিয়ে যায় এক মহিলা।আগামীকাল কলেজে জয়েন করবে।এটা নিয়ে খুব বেশী এক্সাইটেড উপমা।রাতে ভালো ঘুম হয় না।খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়।ঘুম ভাঙতেই মায়ের কথা খুব মনে পড়ে উপমার।প্রতিদিন এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙতো ওর।এলার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে যেতো ও।মা এসে জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেন।সকালের মিষ্টি রোদ এসে ঘরে ঢুকতো।মা ওকে আদর করে ডেকে তুলতেন ঘুম থেকে।ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে পড়তে বসতো সে।রুটিন করে গানের রেওয়াজ করতো।মা তখন আদা-চা বানিয়ে দিতেন।রাত জেগে পড়লেও মা ফ্লাস্কে চা বানিয়ে রাখতেন মা।মাঝে মাঝে অকারণেই মায়ের সাথে রাগারাগি করতো।মা সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিতেন।আগে এসব নিয়ে কখনো ভাবে নি উপমা।এখন দূরে এসে কেবল মনে পড়ছে কেন যে মায়ের সাথে এতো রাগ দেখাতো।আর কখনো এমনটা করবে না।এসব ভাবতেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো উপমার।চাকরি পাবার পর এতো খুশী হয়েছিল উপমা।তখন বুঝতে পারে নি একা থাকতে এতোটা কষ্ট হবে।যা-ই হোক,উপমা খুব বাস্তববাদী মেয়ে। কিছুতেই ভেঙে পড়বে না সে।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে আট টা বেজে গিয়েছে।স্নান করতে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962284550868931/

প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)

1

#গল্প_পোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
লেখায়: তানিয়া তানু

আজ আমার বিয়ে। তবে বিয়ের আয়োজন তেমন জাঁকজমক নেই। খুব সাদামাটা। এই বিয়েতে শুধুমাত্র ঐ বাড়ির আর এর বাড়ির লোকরাই থাকবে। তার সাথে নিলাদের পরিবারও। আপাকে বার বার ফোন করা হয়েছে। কিন্তু ফোন ধরেনি। ভেবেছিলো কোনো প্রয়োজনে ফোন করেছি।

পার্লার থেকে বিউটিশিউয়ান অয়ন আনিয়েছে। ওর মতে বাইরের জাঁকজমক না থাকলেও চলবে। কিন্তু আমার প্রেয়সীকে আমি সাজিয়েই নেবো। আমিও আর দ্বিমত পোষণ করিনি। বিয়ে নিয়ে সবারই একটা ইচ্ছা থাকে। তাই সেজেছি। বর্তমানে সাজুগুজু সব শেষ। উনার অপেক্ষায় কনে সেজে বসে আছি ।

“আপা, নিলা আপা এসেছে।”
বিথীর কথায় ভাবনা জগত থেকে ফিরে দেখলাম নিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারায় আমার বিয়ে নিয়ে তেমন আনন্দ দেখলাম না। নিলা ঘরে আসতেই দেখলাম রামিসাও তার সাথে এসেছে। তবে ওরে নিয়ে আর কোনো রাগভাব নেই। কারণ আমি চাই আকাশ ভাইয়াও সুখী হোক।

“ওহ হো দীপ্তি, সেজে তো তোকে পুরো বান্দর লাগছে।” আমার কাছে এসেই এই কথাটা বললো।

নিলার এমন কথায় অবাক হলাম। পরক্ষণে মজা করেছে বলে মলিন হাসি দিলাম।

“আচ্ছা, তোর মনে হয় না,বাদরের গলায় মানে তোর গলায় মুক্তোর মালা পড়েছে।”

নিলার অপমানজনক কথা শুনে চোখে জল চলে এলো। ছলছল চোখে না বুঝার ভান করে ওর দিকে তাকালাম।

“তুই না কোনোদিন সুখী হবি না। দেখিস, এটা আমার অভিশাপ রইলো।”
ওর এমন কথা শুনে বললা,
“কী হয়েছে নিলু? অভিশাপ দিচ্ছিস কেন?”

“চুপ কর দীপ্তি। আমকে নিলু বলে ডাকবি না। অবশ্যই তোর মুখ থেকে আমি একটা কথাও শুনতে চাই না।বিকজ আই হেইট ইউ দীপ্তি। আই হেইট ইউ। শুধু তোর জন্য আজ ভাইয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আই হেইট ইউ। আর হ্যাঁ, আমাদের বন্ধুত্ব আজ থেকে এখানেই শেষ। আর এটাই তোর কাছে আসার শেষ দিন।” এতটুকু বলেই কাঁদতে কাঁদতে নিলা চলে গেল।

এদিকে ওর কথা শুনে বুক ধক করে উঠলো। আকাশ ভাইয়ার কী হয়েছে? আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করারই বা কারণ কী? আমি কী করেছি?

নিলা চলে যাবার পর রামিসা আমার পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “খুব সুন্দর লাগছে। আমিও এমন সাজে সাজবো কয়েকদিন পর। এমাসে আমারও বিয়ে। এসো কিন্তু। যাইহোক, দীপ্তি তুমি কি জানো, মেয়েদের ছয়টা ইন্দ্রিয় থাকে। তারা এটা দিয়ে অনেক কিছু বুঝতে পারে। কিন্তু তুমি বুঝলে না।”

“কী বুঝিনি?”

“একটা ছেলে সেই ছোটবেলা থেকে তোমাকে এত ভালোবাসে। অথচ বলে নাই বলেই আজ তার ভালোবাসার মানুষ অন্য কারোর হতে চলেছে। জানো,আকাশ অনেক কষ্টে আন্টিকে রাজি করিয়েছে। শেষে একমাত্র ছেলে বলে তোমাকে বাড়ির বৌ বানাতেও রাজি হয়েছিলো। এতে কী খুশিটাই না আকাশ হয়েছিলো! কিন্তু আজ কী থেকে কী হয়ে গেল! ভালোবাসা পেলো না বলেই মা, বাবা আর বোনকে ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে।”

ওর এই কথা শুনে জলে পূর্ণ হলো আমার চোখ। তার মানে এতদিন আকাশ ভাইয়া আমাকে ভালোবাসতেন।

“আসি। সুখী হও। আর।হ্যাঁ, আমার বিয়েতে এসে কিন্তু। জানো আমার আর আমার বয়ফ্রেন্ডকে এক করতে আকাশ অনেক কিছু করেছে। আজ সেই বন্ধুই আমার বিয়েতে থাকতে পারবে না।”
এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ থেকে বললো, “এই নাও আকাশ তোমাকে এটা দিয়েছে। এই বলেই একটা গিফট দিয়ে মলিন মুখ নিয়ে চলে গেল।

গিফট বক্স খুলে দেখলাম নীল চুরি। সেবার ক্লাস সেভেনে থাকতে এক মেলায় ভাইয়া আমার জন্য এই চুরি কিনেছিলেন। আমি কত করে বললাম এইটা এখন দাও। কিন্তু ভাইয়া বলতো, সময় হলেই দেবো। আজ বোধয় তার সময় হলো। আকাশ ভাইয়া এতই যখন ভালোবাসতে তখন বললে না কেন? তাহলে তো আজ,,,,
নাহ আকাশ ভাইয়ার কথা আমি ভাববো না। সে যেহেতু বলেই নাই। তাহলে তার কথা ভেবে কী লাভ? আমার মনে তো একখন শুধু উনিই আছেন। উনাকে রেখে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবা ঠিক না।

কবুল বলার সময় গলা আটকে যাচ্ছে। কোনো কথাই বের হচ্ছে না। না জানি কিসের জন্য! আজ আমার ভিতর আর বাহিরের মালিকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার জন্যই বহুক্ষণ পর কবুল বললাম।

এক গাড়িতে আমি আর উনি। অন্য গাড়িতে উনার আত্মীয়। আর আরেক গাড়িতে আমার পরিবার। এই বাড়ির সব স্মৃতি তালা মেরে বন্ধ করে দিয়ে এলাম। গাড়ি চলছে উনার বাড়ির দিকে। কিন্তু মনে হচ্ছে বেবলি আমাকে ডাকছে। আমার গাড়ি ধরার জন্য দৌড় দিতে দিতে বলছে, আপা যাস না। তোদের ছাড়া বাবা আর আমি থাকবো কীভাবে? এই আপা, আপা,,
ডাক দেওয়ায় পিছনে থাকালাম। সেখানে উড়ন্ত ধুলাবালি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি মাথা বের করে সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলাম। যতক্ষণ না আড়াল হয়।

আচমকা কারোর শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম। ঘুরে উনাকে দেখে ঝাপিয়ে পড়লাম উনার বুকে।কেঁদে কেঁদে উনার বুক ভাসিয়ে দিচ্ছি। উনি হাত বুলিয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

রাত্রে আবারও নতুন করে দিবিয়া সাজিয়ে দিলো। ওর বিয়ে এ মাসেই ঠিক হয়েছে। পরের মাসে চলে যাবে। এখন এই সাজানো রুমে বসে আছি। বেলীফুলের সুবাসে পূর্ণ হলো ঘর। মনের মধ্যে আনন্দের জোয়ার। একটা মনের মানুষ পেলাম। পেলাম একটা সংসার। পেলাম প্রয়োজন ভাগ করার মানুষ।

স্নিগ্ধময় সকালে পর্দায় ভেদ করার খানিক সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙলো। কিন্তু মহাশয় এখনো ঘুমে বিভোর। পর্দা আর জানালা খুলে দিলে সূর্যের পূর্ণ আলো উনার চোখে মুখে এসে পড়ছে। উনি হাত দিয়ে মুখ ডেকে বললেন,
“কী হলো? এমন করছো কেন? ঘুমোতে দাও না। কাল তো ভীষণ জ্বালিয়েছো।”
উনার এই কথা শুনে কোমরে হাত দিয়ে রাগি চোখে তাকিয়ে বললাম, কাল আমি না আপনি আমাকে জ্বালিয়েছেন।”
“তাই নাকি। তাহলে এখন দেখা যাক কে জ্বালায়? যে এখন জ্বালাবে সে রাত্রেও জ্বালিয়েছে মনে হবে।”
এই বলেই কাছে আসলে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে চলে আসলাম বাইরে। ড্রয়িংরুমে নিয়ন আর বোনেরা খেলছে। দিবিয়া ফেসবুকিং। মা আর ফুপি রান্না ঘরে ব্যস্ত। এদের এমন দেখে মনে প্রশান্তির বাতাস বয়ে গেল। আনন্দে শিহরিত হলো মন। তবে মনের কোণায় স্মৃতি আর বাবার জায়গাটা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেল।
এমন সুখময় দিনে আপার কথাও বেশ মনে পড়লো। কত ফোন করলাম! কিন্তু একটাও রিসিভ করেনি। তাই এবার ভাবলাম চিঠি লিখে নেই। কুরিয়ারে দিয়ে দিলে গিফট হিসেবে আনন্দে গ্রহন করবে। কোনো প্রকার বাঁধা দিবে না। চিঠির খামে শুভাকাঙ্ক্ষী লিখে দিবে। ভিতরে নিজের কথা। যেই ভাবা সেই কাজ। উনি বাথরুমে যাওয়ার সুযোগে খাতা কলম নিয়ে বসে গেলাম।

প্রিয় আপা

ফোন তো ধরলি না তাই চিঠি লিখতে বাধ্য হলাম। সে যাইহোক, আশা করি দুলাভাই আর সংসার নিয়ে খুব ভালোভাবে জীবনযাপন করছিস। সুখেই আছিস। আমিও সুখে আছি। জানিস আপা, তুই চলে যাবার পরপরই না আমার জীবন বদলে গেছে। বিষাদময় দিনের কালো আঁধারে ঢাকা মেঘ সরে এক চিলতে রোদ হিসেবে এসেছে অয়ন। তবে ও বহু পূর্বে মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছিলো। সময় বুঝে ঠিক বৃষ্টির নামার খানিক পর রোদ্দুরে বৃষ্টি হয়ে এসেছে। এমন বৃষ্টিমুখর দিনে রোদের আলো দিয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিয়েছে। তুই তো পূর্বে থেকেই জানিস, মায়ের শখ ছেলেদের মুখে মা ডাক শুনা। তাই পাঁচ মেয়ের জামাইকে নিজের সন্তান হিসেবে দেখতে চেয়েছিলো। কিন্তু তোর জামাই অর্থাৎ স্বার্থপর দুলাভাই নিজের প্রয়োজনে আমাদের প্রিয়জন হয়েছে। তাই তো এমন দুঃসহ সময়ে কেটে পড়েছে। কিন্তু অয়ন ঐ যে পুলিশ ছেলেটা ও মায়ের বোনদের এমনকি আমার প্রয়োজনও মিটিয়েছে। কিছুটা অর্থ দিয়ে তবে বেশিরভাগ অংশই ভালোবাসা দিয়ে। যেটা তুই আর দুলাভাই করতে পারিস নাই। সে সময় অর্থের বেশ প্রয়োজন ছিলো না রে। প্রিয়জনের প্রয়োজন ছিলো। ছিলো এক টুকরো সান্ত্বনার। আপা জানিস, মানুষের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না। প্রয়োজন আসে। বার বার আসে। তবে ভিন্ন রূপে। আমারও আসবে। সে যাইহোক,তোকে একটা কথা জানাচ্ছি, কাল আমার বিয়ে উনার সাথে হয়ে গেছে। মা,বিথী ও দ্যুতি বর্তমানে উনার বাড়িতেই আছে। ঐ বাড়ি বন্ধ। তবে চিরতরে নয়। কিছুদিনের জন্য। কারণ যখনই স্মৃতির আর বাবার কথা মনে পড়বে তখনই ঐ বাড়িতে যাবো। শুন, পারলে একবার দেখা করে যাস।

চিঠিটা এখানেই সমাপ্ত করছি। কারণ তোর সাথে বেশিক্ষণ কথা বলে লিখতে ইচ্ছে করছে না। তুই যে বড্ড স্বার্থপর আপা। ভালো লাগে না তোকে। জানি না কেন এমন করছিস। এত ফোন করলাম তাও ধরলি না। হয়তো এর আড়ালে তোর জীবনের অনেক কাহিনী লুকিয়ে আছে। যেটা বলবো বোন হিসেবে একদিন আমার কাছে ভাগ করিস। সান্ত্বনা না হয় এক আকাশ ভালোবাসা দিবো।
ভালো থাকিস। সুখে থাকিস।

ইতি তোর
অপ্রয়োজনীয় বোন

চিঠিটা লিখেই বালিশের তলায় রেখে জানালার কাছে গেলাম। এখান থেকে শহরের ব্যস্ততাময় মানুষের কাজ কর্ম খানিক দেখা যায়। যেগুলো খোলামেলা কাজ। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার বাবাকে খুঁজছি। এই শহরের তিনি গাড়ি চালাতেন। এই বাড়ির অন্যদিক অনেক নিরিবিলি। সেদিকে গাড়ি চলাচল নেই। এটা সদর দরজার পাশে।

আচমকা কারোর শীতল হাতে স্পর্শ পেলাম। পিছন থেকে কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। গাঢ় নিশ্বাস পেলে কাঁধে মুখ গুজেছে। তবে এটা অয়ন সেটা বুঝতে বাকি নেই। এই ছেলেটার স্পর্শ চেনা আমার।

আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উনি বললেন, দীপ্তি,আমার কিন্তু ছোট্ট দীপ্তির প্রয়োজন!

_____সমাপ্ত_____

বিঃদ্রঃ অবশেষে ত্রিশ পর্বে সমাপ্ত হলো আমার প্রয়োজন উপন্যাস। সামাজিক উপন্যাস হিসেবেই লিখেছি। জানি না কতটুকু সামাজিক হয়েছে। তাই বলবে শেষে পুরো গল্প নিয়ে আপনার কিছু মন্তব্যে দিয়ে পরের গল্প লেখার অনুপ্রেরণা দিবেন। আর হ্যাঁ, ভুল তো আমার আছে। অনেক হয়েছেও। তাই বলবো সমালোচনা দিক দিয়ে যা মনে হয়েছে তা নির্দ্বিধায় বলে দিবেন। শুধু বানান ছাড়া। কারণ অভ্র টাইপে তাড়াতাড়ি দুই পর্ব করে লিখতে গিয়ে অনেক ভুল হয়েছে। অনেক আপু তা বলে দিয়েছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। বানান ছাড়া অন্য কোনো ভুল হলে তা অবশ্যই বলবেন।

বিঃদ্র ০২ঃ এই গ্রুপ থেকে অনেক ভালো পাঠক পেয়েছি। মূলত পাঠক হিসেবে ধরবো না। তাদের নিজের আত্মার আত্মীয় হিসেবেই ধরবো। তাদের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা,কৃতজ্ঞতা অবশেষে ভালোবাসা দিয়েই সমাপ্ত করলাম।

প্রয়োজন পর্ব: ২৯

0

#গল্প_পোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
প্রয়োজন পর্ব: ২৯
লেখায়: তানিয়া তানু

ধর্ষণের পর হাজারটা শাহিন হাজারটা খুন করলেও তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে না।যদি তারা নাবালক হয়। শাহিনের বয়সও আঠারো বছর পেরোয়নি। তাই ওরও সর্বোচ্চ শাস্তি হবে না। বোনের এত কষ্টের মৃত্যু হলো। অথচ ওর অপরাধী তিন চার বছর পর ঠিকই বুক ফুলিয়ে রাস্তায় হাঁটা চলা করবে। ভাবতেই কান্নার দলা যেন পাকিয়ে আসছে।

“আপা, শুনো।”
সহসা বিথীর ডাক শুনে পিছনে তাকালে ও আমাকে অন্য জায়গায় আসতে বলে। এমনভাবে বলছে যেন কোনো গোপন কথা আমাকে বলতে যাবে। তাই যাতে কেউ না শুনে নিরিবিলি জায়গায় যাওয়া জন্য বললো। আমিও গেলাম। ওর দু হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অনেক কথাই বড় আপার সমন্ধে বললো। যা শুনে অবাক হলাম। আপা আর দুলাভাইয়ের কথোপকথন ও আড়াল থেকে শুনেছে। সেখান থেকেই বললো, আপার কাছে মা নাকি কাপনের কাপড় আর আরো টুকটাক জিনিসের জন্য টাকা খুঁজছিলো। এই টাকা দেওয়াতে নাকি ওদের দুজনের সমস্যা হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ায় এখন সব প্রয়োজন নাকি এদের মিটাতে হবে। বাকি তিন বোনের বিয়ে, পড়ালেখার খরচ এদের ওপর নাকি দায়িত্ব বর্তাবে। তাই ওরা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এখান থেকে কেটে গেছে। তবে আপা নাকি বলেছিলো, বেবলিকে শেষবারের মতো দেখে যেতে। কিন্তু দুলাভাই এতে নারাজ।

এতক্ষণ আমি আর বিথী আমার ঘরেই কথা বলছিলাম। মায়ের কান্না শুনে দৌড়ে গেলাম সেখানে। বেবলিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু মা দিতে চাচ্ছেন না। এবারও বলছেন,” আমি আমার কোল খালি করবো না। আমার সন্তান আমার কাছে থাকবে। কেউই মাকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। এক প্রকার জোরাজুরি অবস্থা চলছে সেখানে।মায়ের এই অবস্থা দেখে আমি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

কাঁদতে কাঁদতে আমি মায়ের কাছে যাবার পূর্বে উনি মায়ের সামনে হাটু ভেঙে বসে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললেন, জানেন, আপনার মতো আমিও এমন মৃত্যু দেখেছি। আপনি বুঝদার মানুষ। কিন্তু আমি যখন এমন মৃত্যু দেখেছি তখন আমার বয়স তেরো ছিলো। আমার ছোট ভাইয়ের বয়স ছয় বছর ছিলো। তখন একটা এক্সিডেন্টে আমার ছোট বোন যে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিলো। যার জন্যই বাবা-মা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আসার সময় একটা বাস তাদের ধাক্কা দেয়। পুরো গাড়ি ভেঙে টুকরো হয়ে যায়। ওদের সাথে না শেষ সময়ও কথা বলতে পারিনি। কারণ ওরা এক্সিডেন্টের সময়ই মারা যায়। জানেন, ওদের চেহারায় পুরো রক্তাক্ত ছিলো। মুখ।বিভৎস হয়ে গিয়েছিলো। সে সময় না আমি লুকিয়ে কেঁদেছি। কখনো সেই ভাইটার সামনেও কাঁদেনি। কাউকে বুঝতেই দেয়নি আমি আমার মা-বাবা আর সেই ছোট্ট বোনটাকে হারিয়েছি। নিজেকে বুঝ দিয়েছি। বলেছি, আমাকে সবল হতে হবে। ভাইকে সামলাতে হবে। আপনিও দেখুন না এইভাবে কাঁদার পর তারা নিজেদের কান্না আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নিজেদের দুর্বল করে দিয়েছে। ঐ পিচ্চি দুটোকে দেখুন আপনার এমন কান্না দেখে কেমন করে কাঁদছে। স্মৃতিকে যেতে দিন। ওর এখন আপন জায়গায় যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
এতটুকু বলেই উনি থেকে গেলেন। এক দৃষ্টিতে মায়ের ছলছল চোখে তাকিয়ে আছেন। মা তো সেই বোন দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের কাছে ডেকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। শেষে চোখ মুছে ওদের ঘরে যেতে বলায় ওরাও চলে গেল। মা এবার উনার দিকে তাকালেন। উনি এবার জোরে দম নিয়ে বললেন, জানেন, আমি আর আমার ভাই সেই কবে থেকে আমা ডাকি না! মায়ের মমতা পাইনি। ফুপির পেলেও তিনি এক বছর পরই বিয়ে করে বিদেশ চলে যান। আমাদের দায়িত্ব দিয়ে যান আমাদের বাড়ির এক আত্নার আত্মীয়কে। আমাদের কাজের লোক মকবুল চাচাকে। উনি বাবার দায়িত্ব কিছুটা পালন করতে পারলেও মায়েরটা পারেননি। মা ছাড়াই আমরা বড় হয়েছি। সেই মায়ের প্রয়োজন এখনো আমাদের আছে। আপনি কী আমাদের মা হবেন?”

উনার এই কথা শুনে মা অবাক হলেন। তার সাথে উনার কথার মর্মও বুঝতে পারলেন না। উনি একটু থেকে আবাও মাকে বললেন,
“আমি দীপ্তিকে বিয়ে করতে চাই। আপনাকে মা ডাকতে চাই। দুটো পিচ্চি বোনকে পেয়ে আমার মৃত বোনের প্রয়োজন মিটাতে চাই।”

উনার কথায় মায়ের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুঁটলো। মা আনন্দে কেঁদে দিলেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। আমিও মায়ের মতো অনেক খুশি।

মা উনার গাল দুটোতে হাত রেখে বললো, “তুই আমার ছেলে হবি। আমাকে মা মা বলে ডাকবি। জানিস, বড় মেয়ের জামাই না আমাকে বেশি মা ডাকেই না। আমার থেকে দূরে দূরে থাকে। আমি না চাই। কোনো ছেলে সারাক্ষণ আমাকে মা মা বলে ডাকুক। আমার ছেলের প্রয়োজন মিটাক। তুই মিটাবি। আমার ছেলে হবি।”

উনিও কেঁদে কেঁদে মাথা নাড়ালেন। উনার মায়ের প্রয়োজন আর মায়ের ছেলের প্রয়োজন মিটলো আজ।

ওদের দিকে চেয়ে অন্যদিকে মনেই রইলো না বেবলিকে অনেক আগেই নিয়ে গেছে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ভাইয়া। উনি মায়ের কাছে এগিয়ে মাকে কী বলবে তা ভেবে পেলো না। ছলছল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,”খালা আমি জানাজায় যাচ্ছি।”
উনি আকাশ ভাইয়াকে দেখে বলল, দোস্ত,দাঁড়া আমিও যাবো।”
মা বললো, “তুই এতক্ষণে এলি।”
“খালা তুমি তো আমাকে বলোনি। আর খবরের কাগজে পড়েই আমি হতবাক হয়ে এখানে এসেছি। আর অয়ন তুই একটু পর আয়। আমার একটা কাজ আছে। ওটা খুব প্রয়োজন করার।
এই বলেই দৌড়ে চলে গেলেন।

উনি মায়ের দিকে এবার তাকিয়ে বললেন, “পাঁচ দিনের শিন্নির পরপরই আমি ফুপিকে পাঠিয়ে দেবো। এখানে আমি সব সময় আসবো। শুধু থাকবো না।”

এটুকু বলে চলে গেলেন।
রাত্রে আমার রুমে আমি, মা,বিথী, ও দ্যুতি জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়েছি। বেবলির সাথে আর ঘুমানো হবে না বলে অনেক কেঁদেছি। সাথেও মায়ের কান্নাও পুরো রাত জুড়ে শুনলাম।

বিষাদময় কেটে গেল ছয় দিন
এই ছয় দিনে অনেক কিছু ঘটেছে। বাবার পাওনাদাররা এসে বারবার বিরক্ত করেছে। এই জ্বলায় বাবার কথামতো গাড়ি বিক্রি করতে চাইলে উনি কিনে নেন। মা উনার কাছে বিক্রি করতে চাইলেন না। বললেন, এটা তোমাদের বিয়ের যৌতুক। উনি না করলে মা বলেন, লাগবে না কেন, বাবা?বড় মেয়ের বিয়েতেও দিয়েছি। তার জন্যই তো এত পাওনাদার।”
উত্তরে উনি সেদিন বলেছিলেন, মা, আমি তোমার ছেলে হই। আর যৌতুক আমি ঘৃণা করি। ওগুলোতে আমার সংসার পূর্ণ হবে না। তাই নেবোও না।
“ছেলেই যখন তাহলে বাবার গাড়িটা কিনতে চাইছিস কেন?”
“বাবার গাড়িটা কিনতে চাই নিজের জন্য। আর ঐ টাকা দিয়ে তোমরা পাওনাদারদের দিয়ে দিবে।”

“তুই তো বাবা পুলিশ। গাড়ি দিয়ে কী করবি?”
“মা, এটা দিয়ে সপ্তাহে একদিন তোমাদের সকলকে নিয়ে ঘুরতে যাবো।”

উনার এই কথায় মা অনেক খুশি হলেন। নিয়নও সেদিন মাকে মা বলে ডেকেছিলো। মা তো দু দুটো ছেলে পেলেন। তাই খুশিতে তিনি আত্মহারা।

বাড়ি রঙ করা হয়েছে। উনার ফুপি আর দিবিয়া শিন্নির দিন এসেছিলো। পুরো শিন্নীর আয়োজনে তিনি থাকলেও আকাশ ভাইয়া আর কোনোদিন আসেনি। নিলাও না। এতে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। কেন ওরা আসেনি।

দিবিয়া আর ফুপির এমন সুন্দর ব্যবহারে মা এক্কেবারে অবাক। তিনি ভাবতেই পারেননি ওনাদের ব্যবহার এত সুন্দর হবে। এত শ্রদ্ধা করবে। মা তো আমাকএ রাজ কপালী হিসেবে উপাধি দিয়ে দিয়েছেন। উনারা বিয়েটা ঘটা করে আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাতে রাজি নই। কারণ চাই না বড় করে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হোক। নাচ-গান হোক। এতে যে বেবলির ইচ্ছা গুলো খুব কাঁদায়। আচ্ছা কেন এমন হলো? কী দোষ বেবলির ছিলো?

ঠিক হলো সাতদিন পরই আমাদের বিয়ে। আর এই বিয়েতে কয়েকজন আত্মীয় ছাড়া আর কেউই থাকবে না। শ্বশুরবাড়িতে শুধু আমি নয় আমআর পুরো পরিবার যাবে। কারণ এই বাড়িতে থাকলে অতীত বার বার হৃদয়ে হানা দেব।

চলবে„„„„„