Sunday, August 31, 2025
বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 2036



মায়াবী হরিণী পর্ব ৭

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ৭
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ ছাদে যাবে? ”
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, ছোঁয়া ও ঘুমিয়েই ছিলো। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন বলে বাইরে এসেছিলো। তখনই ফুয়াদ ওকে জিজ্ঞেস করলো ছাদে যাবে কিনা!
ছোঁয়া কি বলবে ভেবে না পেয়ে শুধু উপরে নিচে মাথা উঠালো আর নামালো৷ ওদের বাসা টা ৭ তলা। ছাদে উঠতে কষ্ট কম হয়, তাছাড়া ছাদ রাতেও খোলা থাকে। কেননা, চিলেকোঠায় একটা ঘর আছে, যদিও একজন থাকে। কিন্তু এতো রাতে জেগে থাকার সম্ভাবনা কম।

ছাদে আসতেই প্রাকৃতিক হাওয়া মন টা জুড়িয়ে দিলো। ভিতরে ভ্যাপসা গরম, অস্থির লাগছিলো ছোঁয়ার। অথচ ছাদে কতটা প্রশান্তি নিয়ে এসেছে। যে পাশে একটা ঘর আছে ওই পাশে টবে অনেক গুলো গাছ আছে। বুঝায় যাচ্ছে যিনি থাকেন উনি খুব সৌখিন। বেশ কয়েকটা গোলাপের ও গাছ আছে, যার একটায় গোলাপ ফুটেছে। ছোঁয়া ফুলের ঘ্রাণ ও নিয়ে নিলো৷ মিষ্টি ঘ্রাণ মন ভালো করে দেয়।

ফুয়াদ ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। ছোঁয়া একবার ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে দেখলো, এরপর ধীর পায়ে হেটে গেলো। একটু লজ্জা লাগছে, এই প্রথম ওরা একসাথে একা এসেছে। ছোঁয়া কাছে যেতেই ফুয়াদ বলল,
“ খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা!”
“ কীসের? ”
“ চোখ দুটো বসে গেছে৷ এতো হাতের কাজ করো না৷ ”
“ আমি ঠিক আছি৷ ”
“ তুমি ঠিক থাকলেও আমি ঠিক নেই৷ তোমার গভীর চোখের মায়া হারিয়ে যাচ্ছে। আমি চাইনা তুমি গয়না বানানোর অতিরিক্ত চাপ নাও৷ পড়াশোনা ও তো করতে হবে। ”

ছোঁয়া ফুয়াদের দিকে আড় চোখে তাকালো। ছেলেটা তাকে নিয়ে এতো ভাবে৷ অথচ সে মনে করে ফুয়াদ ওকে বিয়ে করে বিরক্ত। অথচ অপ্রকাশিত কেয়ারিং যে তার মধ্যে থাকতে পারে ছোঁয়া কখনো ভেবে দেখেনি। ছোঁয়া বলল,
“ আমি এখনো পড়াশোনা শুরু করিনি। আর দিনের আলোয় যতটুকু সম্ভব ততটুকু কাজ করি৷ চোখে এক্সট্রা প্রেসার দিই না তো। তাছাড়া আপনি নিজেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেন৷ আপনাকে রোদে গরমে কাজে পাঠিয়ে আপনার উপর আমাকে বহন করার মানসিক প্রেসার দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। ”
“ আমি তো আয় করি নাকি!”
“ হ্যাঁ আয় করেন, কিন্তু আপনার সেভ করা উচিৎ। কেননা, কোচিং করছেন৷ কিছুদিন পর ভর্তি যুদ্ধে নামবেন। ফর্ম তুলা, পরীক্ষা দেওয়া, টাকার প্রয়োজন আছে। তাছাড়া কোথাও চান্স পেলে সেখানে ভর্তি হতেও অনেক টাকা লাগবে৷ আমি যদি কিছু করে সবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করি তাহলে ক্ষতি কি!”
“ বাইরে গিয়ে কাজ করার দরকার নেই। যদি অর্ডার নিয়ে বাসায় এসে সুযোগ সুবিধা মতো কাজ করার সুযোগ দেয় ওরা তাহলে ওদের সাথে কাজ করিও। ”
ছোঁয়া চুপ থাকে, এই রাগী ছেলেটা কিনা আজ তার জন্য ভাবছে, তার খেয়াল রাখছে৷ মনে মনে খুশিই হলো ছোঁয়া৷ মনে একটু সাহস নিয়ে ফুয়াদের ডান হাত নিজের হাত দুটো দিয়ে চেপে ধরে। ফুয়াদ নিজেও চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়, ছোঁয়া ও লজ্জায় চোখ বন্ধ করে। ছোঁয়া শুধু বলল,
“ ভরসা রাখবেন, আমি নিজের ক্ষতি করে কোন কাজ করবো না। ”
এটা বলেই ফুয়াদের হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যায় ছোঁয়া। ফুয়াদ বুঝতে পারলো ছোঁয়া চলে গেছে, তাই দূর থেকে বলল
“ চাবি নিয়ে যাবে না!”

কে শোনে কার কথা, ছোঁয়া একদম ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফুয়াদ ভাবলো, ছাদে আসার সময় দরজায় তালা দিয়ে এসেছে। দরজা না খুলতে পারলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে মেয়েটা। তাই তাড়াহুড়ো করে নিজেও নিচে নেমে গেলো। ফুয়াদ দেখলো, ছোঁয়া একপাশে দাঁড়িয়ে আছে গুটিসুটি মেরে। ভালোই লজ্জা পেয়েছে তাহলে, ভেবে মনে মনে হাসলো। কিছুক্ষণ পর দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়, আরেকটু লজ্জা দেওয়ায় যায়। ভাবতেই সিড়ি ঘরের লাইট অফ করে দেয় ফুয়াদ। ছোঁয়া চমকে যায়, ফুয়াদ তখনই ছোঁয়ার ঘাড়ে হাত রাখে। ছোঁয়া আরও কাঁপতে শুরু করলো। তখনই ছোঁয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,
“ আমার মায়াবী বউ। ” বলে ছোঁয়ার কানে হালকা কামড় দেয়।
ছোঁয়া আরও কাঁপতে থাকে, তখন ফুয়াদ দরজা খুলে ভিতরে চলে যায়৷ ছোঁয়া না পারছে নড়তে, না কিছু বলতে৷ এক জায়গায় স্ট্যাচু হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
ফুয়াদ বলল,
“ ভেতরে এসো, লোকে দেখলে খারাপ ভাববে৷ ”
ছোঁয়া চোখ টা খুলে একদম ঘরের ভেতর দৌড়ে চলে আসে৷ জীবনে প্রথম প্রেমের পরশ পড়েছে শরীরে। অন্যরকম মাদকতা কাজ করছে। মনের ভেতর অস্থিরতা বেড়ে গেছে। কিভাবে এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাবে সে নিজেও জানেনা। ছোঁয়ার ছোট্ট হৃদয়ে এখন হরেক রকম স্বপ্নের জাল বুনছে৷ বিশেষ করে একই বাড়িতে থেকে কাছাকাছি যেতে না পারার জন্য খারাপ লাগা তৈরী হয়েছে৷
শুধু মন চায় কাছাকাছি যায়,
ভালবেসে করি আপন তোমায়।
নীল আসমানে চলে যাই,
ডানা মেলে উড়বো দুজনায়।
চল প্রজাপতির পাখনা লাগাই,
ভাসবো এই রঙের দুনিয়ায়।
ভোমরা হয়ে চল ফুলের মধু খাই ,
ফুলের মাঝে স্বপ্নের বাসর সাজাই৷
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাশে থাকতে চাই,
ভালবাসা দিয়েই করবো জয় তোমায়।

°°°
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ফারুক কে খুব চিন্তিত দেখলো সারা৷ মুখ মলিন দেখে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি ঠিক আছো তো!”

ফারুক কিছু না বলে মুখ ভার করে নেয়। কিছুক্ষণ সারা ফারুকের উত্তরের আশায় তাকিয়ে থাকে। উত্তর না পেয়ে নিরাশ হয় মন খারাপ করে ফেলে। তখন ফারুক বলল,
“ আমি বাবা হবার অযোগ্য তাইনা!”
“ কখনো কি তোমার সন্তানেরা অভিযোগ করেছে?”
“ ভালোবেসে তোমায় বিয়ে করেছিলাম বলে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করেছিলো আমার বাবা। আমার দুঃসময়ে তুমি আমায় ছেড়ে অন্য কারো হাত ধরোনি। ধনীর ঘরে আদরের দুলালী আমার ঘরে এসে সারাজীবন খেটে খেটে বুড়ি হয়ে গেলো তবুও একবার ও অভিযোগ করোনি, কিংবা এই সিকিউরিটি গার্ড কে হেলা করোনি। কখনো আর ৫ টা স্বামীর মতো তোমায় সুখে রাখতে পারিনি, তবুও সব সময় হাসিমুখে সব সময় আমার সঙ্গ দিয়ে গেছো। অভাবে ভালবাসা নাকি জানালা দিয়ে পালায়, কিন্তু তোমাকে দেখে কখনো মনে হয়নি তুমি পালিয়ে যাবে। ভালবাসার টান কতটা তোমার কাছ থেকে শিখেছি। কিন্তু সন্তানেরা হয়তো আমার প্রতি বিরক্ত। কারণ তাদের কোনো চাহিদা আমি পূরণ করতে পারিনি৷ বরং তাদের জীবন সংগ্রামে ফেলে দিয়েছি। ”

সারা এবার কেঁদে ফেললো, কিছুক্ষণ কেঁদে হালকা হয়ে ফারুকের হাত ধরে বলল,
“ ওরা তোমাকে ভয় পায়। ”
“ কারণ আমি ওদের শাসন ছাড়া কিছুই করিনি। করবোই বা কিভাবে, সামর্থ্যের অভাবে ওদের সামনে দাঁড়াতেই লজ্জা লাগতো। ভালবাসার সাহস হয় নি কখনো। ”
“ আজ হঠাৎ এসব বলছো যে! মনটা খুব খারাপ লাগছে তাইনা!”
“ আমার বড় ছেলেটা বিয়ে করেছে , অথচ আমি জানতেই পারলাম না! আমি জানলে কি ওদের তাড়িয়ে দিতাম! ”
“ ফারুক…”
“ আমি বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে পারিনা বলেই হয়তো এই লুকোচুরি! ”

সারা কিছু না বলে কাঁদতে শুরু করলো।

চলবে…

মায়াবী হরিণী পর্ব ৬

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ৬
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

ছোঁয়া খুশিতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে৷ সিজদাহ্ থেকে উঠে ফুয়াদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ আজ এসএসসি রেজাল্ট দিয়েছে জানেন? ”
“ হুম, কেউ ছিলো তোমার পরিচিত? ”
“ আমি গোল্ডেন এ+ পেয়েছি। ”
ফুয়াদ চরম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। ছোঁয়া আবার বলল,
“ অনেক কষ্ট করে এই ফলাফল অর্জন করেছি। বলতে পারেন স্বপ্ন গুলোর একটা ধাপ পার করলাম। ”

ফুয়াদ বলল,
“ তুমি পরীক্ষা দিয়েছিলে?”
“ জ্বি, দিয়েছিলাম। ”
“ কোন স্কুল থেকে পড়তে?”
“ বাসার কাছে বলে বাওয়া স্কুলে পড়েছিলাম। ”
“ প্রাইভেট পড়তে কার কাছে? ”
“ স্কুলেই মন দিয়ে পড়া বুঝে নিতাম, আর এরপরেও না বুঝতে পারলে আড়ালে দাঁড়িয়ে আপনার পড়ানো শুনতাম। ”
ফুয়াদের চোখ ছলছল করছে। হয়তো পানি বেরিয়ে পড়বে। সেইজন্য ইচ্ছেকৃত ছোঁয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। একে তো ওকে কাজের মেয়ে ভেবেছিলো ওই বাসার, এরপরে ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করতো বলে একটা সময় খারাপ মেয়েও ভেবে নিয়েছিলো। অথচ এই মেয়ের অন্তরে ছিলো অন্য উদ্দেশ্য। আবার ছোঁয়া কে অশিক্ষিত ও ভেবেছিলো। নিজের বউ শিক্ষিত হোক কে না চায় এই আধুনিক যুগে! এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে ফুয়াদের । কিছুটা সময় একা থেকে ওয়াশরুম থেকে বের হলো ফুয়াদ। এসেই দেখলো মা মেয়ে তে পরীক্ষা পাশের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। ফুয়াদ ছোঁয়ার দিকে একনজর দেখে বাইরে চলে গেলো। ছোঁয়া একটু অবাক হলো, উনি এভাবে এড়িয়ে চলে গেলেন কেন!

২ ঘন্টা পর ফুয়াদ ফিরে আসলো, হাতে এক প্যাকেট মিষ্টি। এসেই প্রথমে মিষ্টির প্যাকেট খুলে নিজ হাতে ছোঁয়ার দিকে মিষ্টি এগিয়ে দেয়। ছোঁয়া একটু লজ্জা করছিলো বলে ফুয়াদ বলল,
“ লজ্জার কি হলো! আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো!”
ছোঁয়া মিষ্টি মুখে নেওয়ার সময় ফুয়াদের হাত ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়৷ ছোঁয়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। অন্যরকম শিহরণ বয়ে যাচ্ছে তার ভিতরে। ধ্যান ভাঙলো ফারুকের কথায়,
“ কিরে, কিসের মিষ্টি খাওয়াচ্ছিস ওকে?”
ফুয়াদ খুশি মনে জবাব দেয়,
“ বাবা, আমার এই ছাত্রী গোল্ডেন পেয়েছে। সেইজন্যই…”
ফুয়াদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ফারুক বলল,
“ বাহ বাহ, এতো দুঃসংবাদের মধ্যে একটা ভালো খবর আসলো তাহলে। ”
সারা হাসিমুখে বলল,
“ এখন আগে খেয়ে নাও৷ পরে মিষ্টি খেও। ”
ফারুক ও মুচকি হেসে বলল,
“ হ্যাঁ তাই তো, ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। ” বলেই হাতমুখ ধুতে চলে যায়।
ছোঁয়া মনে মনে ভাবলো,
“ একটা পরিবার, এতো অমায়িক। এতো ভালোবাসা পেতে ভাগ্য লাগে৷ মানুষের টাকা থাকলেও সুখ থাকে না। অথচ এরা অভাব কে পাত্তা না দিয়ে সব কিছু তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলেই হয়তো এতো সুখে আছে। সবই আল্লাহর মেহেরবানী ”
রাত্রে ফারুক ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ৫ জন একসাথে গল্প করতে বসে৷ সারা ছোঁয়া কে বলল,
“ আচ্ছা তুই যে পরীক্ষা দিয়েছিস, কখনো বলিস নি কেন?”
ছোঁয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“ ভেবেছিলাম রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাবে! তাই লজ্জায় বলিনি৷ ”
ফুয়াদ ও বলল,
“ আমি নিজেও জানতাম না, ও নিজের মাঝে এতো রহস্য লুকিয়ে রাখে!”
নেহাও ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
“ ভালোই হয়েছে, আমরা সারপ্রাইজড হয়েছি বটে৷ মাঝে মাঝে অন্যরকম বিনোদন লাগে। তাহলে মন ভালো থাকে। ”
ফাহাদ ভাবীর ভালো রেজাল্ট শুনে আজ একটু খুশিই হয়েছে বটে৷ সেজন্যই বলল,
“ তা ভাই, ছোটাপু কে আর পড়াশোনা করাবি না?”
“কেন করাবোনা, ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করার আমি কে?” ফুয়াদ বলল
নেহা ও বলল,
“ হ্যাঁ পড়াবি, তবে ও যেখানে পড়তে চাইবে সেখানেই দিস। ”
এবার ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ তা ছোটাপু, তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী কেউই নেই দুনিয়ায়? ”
“ মামা খুব ভালো, কিন্তু উনি দেশে নেই৷ ”
“ কোথায় থাকে? কি করে?”
“ দেড় বছর আগে উনি ইতালি চলে গেছিলো। এখন ওখানে বিল্ডিং বানানোর কাজ করে। জানি খুব কষ্ট হপ্য উনার, তবে বাসায় এখন ভালোই টাকা পাঠাতো। ”
“ আর তোমার বাবা মা?”
নেহার কাছে বাবা মায়ের কথা শুনতেই একদম চুপসে যায়। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তবুও বলল,
“ আমি বাবা মা কে কখনো দেখিনি৷ আমার নানীর কোলে বড় হয়েছি । নানী মারা যাবার পর থেকে মামা আমার কাছে চলে আসে। ”
“ মা বাবা কি মারা গেছে? ”
“ বাবা মারা গেছেন, গ্যাস সিলিন্ডার নাকি বিস্ফোরণ হয়েছিলো। সে আমার জন্মের কিছুদিন পর। বাবাকে বাঁচানো যায়নি৷ নাকি পুরো দগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বাবার পোড়া লাশ দেখে দাদী স্ট্রোক করে মারা যায় সেদিনই। বাবাই দাদীর একমাত্র ছেলে ছিলো বলেই হয়তো সহ্য করতে পারেনি । আর দাদা তো আগেই মারা গিয়েছিলো। ব্যস, হয়ে গেলাম এতিম৷ আপন সবাই একসাথে চলে গেছে আল্লাহর কাছে। ”

ছোঁয়া খুব কাঁদতে লাগলো। সারা ওর মাথা নিজের ঘাড়ের ওপর নিয়ে শান্তনা দিচ্ছে। এসময় ফুয়াদ আবার জিজ্ঞেস করলো,
“ আর মা, কি হয়েছে উনার?”
ছোঁয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ফুয়াদের দিকে। ফুয়াদ বুঝতে পারছে ছোঁয়া কষ্ট পাচ্ছে, তবুও বলল,
“ জানা টা দরকার ছোঁয়া। ”
“ মা জেলে আছে, দেখতে ইচ্ছে করে না তাই দেখিনি। ” কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেছে ছোঁয়ার।
সারা বলল,
“ থাক, মায়ের কথা বলতে না চাইলে বলিস না, কিন্তু কি অপরাধ যে জেলে যেতে হলো?”

ছোঁয়া আর কিছু বললো না। সারার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে। ফাহাদ আগেই বেরিয়ে যায়, তাই ফুয়াদ ও বেরিয়ে যায় রুম থেকে, ঘুম আসবেনা হয়তো, মেয়েটার দুঃখী মুখ টা চোখের সামনে ভাসছে। কত কিছু সহ্য করছে ছোট্ট জীবনে, হয়তো ওর জন্মদাত্রী আরও কষ্ট দিয়েছে, যেটা বলতে চাইছেনা সে৷ কিন্তু জানার জন্য মন টা ছটফট করতে থাকে ফুয়াদের।
°°°
পরের দিন থেকে যে যার মতো কাজ শুরু করে। ছোঁয়া ও রাতে ঘন্টা খানিক কেঁদে ঘুমিয়ে গেছিলো। ঘুম থেকে উঠে আবারও স্বাভাবিক জীবন শুরু করে, যেন গত রাতে কিছুই হয়নি। আবার সবাই হাসিখুশি সব সামলাতে থাকে। ১০ টা দিন ভালোই কেটে যায়। সেদিন কাজ করছে সারা আর ছোঁয়া৷ বাসায় কেউ ছিলো না এমন সময় কলিংবেলের শব্দে সারা দেখতে গেলো কে এসেছে। মুখ পরিচিত বলে দরজা খুলে ভিতরে আসতে দেয় সারা। কথা বার্তার এক পর্যায়ে মেয়েটা বললো,
“ গয়না গুলো কি এই পিচ্চি টা বানায়?”
সারা খুশি হয়ে বলল,
“ ও ই করে। ধৈর্য আছে ওর৷ ”
“ কে হয় ও আপনার? ”
“ আমার ছোট মেয়ে। ”
মেয়েটা তখন বলল,
“ বাহহ, আপনার সব ছেলে মেয়েই দেখছি কাজের। “
“ আল্লাহর রহমতে সবাই অনেক ভালো। ”
মেয়েটা আবার বলল,
“ গয়নার ডিজাইন গুলো ভালো লেগেছে, একদম নতুন নতুন স্টাইলের। ও কে আমার বুটিকের শোরুমের গয়না বানানোর কাজ দিতে চাচ্ছি। বিভিন্ন জামা বা শাড়ির সাথে ম্যাচিং গয়না পেলে আমাদের ও বিক্রি ভালো হবে। আর ন্যায্য মূল্য ও দিবো আপনাদের। ”
সারা একটু ভেবে বললো,
“ ওর বাবা বাসায় আসুক, আগে কথা বলি। এরপর না হয় ভাবা যাবে এই প্রস্তাব সমন্ধে৷ ”
ছোঁয়া একটু খুশি হয়েছে, তবুও মনে একটা ভয় ফুয়াদ রাজি হবে কিনা!

চলবে….

মায়াবী হরিণী পর্ব ৫

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ৫
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ তোমার ভাগ্নী তো বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে মুহিদুল। ” সুহানার কথা বুঝে উঠার আগেই তারানা বলল,
“ হ্যাঁ বাবা, তাও আবার আমার গণিত মাস্টারের সাথে। ”
ভিডিও কলের ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মুহিদুল ইসলাম। শুধু বলল,
“ ছোঁয়া এমন করতে পারলো! কতো আশা করেছিলাম ও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে। ”
“ এহহহ! মেয়ের কি যৌবন চাহিদা। ও তো এখন রঙ করতে ব্যস্ত, ও আবার পড়বে কখন? ”
“ মুখ সামলে কথা বলো সুহানা। ভুলে যেও না আমি ওর মামা হই। ওর সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো৷ নইলে দেশে এসে তোমাকে দেখে নিবো৷ ”
“ ভাগ্নী প্রেম উথলে পড়ছে দেখছি, তা তোমার ভাগ্নী কই পালিয়ে গেছে দেখতে গেছি নাকি!”
“ তুমি একটা শয়তান মহিলা।”
বলেই ফোন কেটে দেয় মুহিদুল। বাবা বেছে বেছে এই শয়তান মহিলা টা কে ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলো বলে মৃত বাবা কে মনে মনে দোষারোপ করতে থাকে। এইজন্যই বুঝি মা এই মেয়েকে পছন্দ করতো না। আহারে, মা টা আমার দুখ পেয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে৷ যেমন মা, মেয়েটাও হয়েছে তেমন৷ শয়তানের পেট থেকে শয়তানই তো জন্মাবে। এগুলো ভেবে মন খারাপ করে নিজের ডিউটি তে মন দেয় মুহিদুল ইসলাম। প্রবাসে প্রচুর কষ্ট করতে হয়৷ ডে লেবার দের কষ্টের সীমা নেই৷ অথচ তাদের পরিবার এমন একটা ভাব ধরে, যেনো তাদের স্বামী বা বাবা বা ভাই খুব সুখে আছে। টাকা পাঠাচ্ছে বেহিসেবী। অথচ একবার ও খোঁজ নেয় না, তারা আছে কেমন? কিংবা তারা খাচ্ছে টা কি?
মুহিদুল আবারও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে৷ হায়রে জীবন! সবই শুধু স্বার্থপরতা।

°°°
সারা ফিরে এসে বিছানার কোণে বসে পড়ে। খুব পরিশ্রম হয়েছে আজ৷ তবুও ঠোঁটের কোণে হাসির ছোঁয়া। ১০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে ছোঁয়া কে ডাক দেয়৷ ছোঁয়া দৌড়ে আসে, যেন ডাকের অপেক্ষায় ছিলো।
“ গয়না গুলো অপির শাড়ির সাথে পুরো মিলে গেছে। অপি তো জানিয়ে দিয়েছে এই গয়না গুলো সে কিনবে৷ কিন্তু.. . “
বলে একটু থেমে আবার বলল,
“ বাজার দামের চেয়ে কম দিবে বলেছে। ”
ছোঁয়া হাসলো, বলল,
“ দিয়ে দিন মা, বিয়ের অনুষ্ঠানে অনেক মেয়ে আসবে। যদি কেউ পছন্দ করে, আবার অর্ডার করতে পারে৷ ”
সারা ও হাসলো, মেয়েটার বুদ্ধি আছে বৈকি।

এরই মাঝে ফারুক আসে ডিউটি শেষ করে। এসেই জিজ্ঞেস করে ,
“ মা মেয়েতে কি বিক্রির শলা পরামর্শ চলছে? ”
ছোঁয়া ফারুক কে খেয়াল করে আস্তে করে সরে আসলো। যাওয়ার সময় বলে গেলো,
“ বাবা আমি আসছি। ”
ফারুক অবাক হলো, সারা কে জিজ্ঞেস করলো,
“ আরেকজনের বাবাও হয়ে গেলাম রাতারাতি! ”
সারা হাসলো, হেসে বললো,
“ মেয়ে সন্তান কল্যাণ নিয়ে আসে। যেমন এই মেয়েটা আসতে না আসতেই পরিবারের জন্য কি পরিশ্রম টাই না শুরু করেছে দেখো। ”
বলে ছোঁয়ার বানানো গয়না দেখালো, আর বলল,
“ ফুল সেট বিক্রি করে ৪০০ মত লাভ থাকবে। ”
“ বাহহ! মেয়েতো ভালোই কাজের!”
“ দেখিও, এগুলো যদি আরও বিক্রি হয়, তাহলে হয়তো আরেকটু সুখের মুখ দেখবো আমরা। কারণ সেলাই করার চেয়ে এই কাজে লাভ বেশী। যদিও খাটনি প্রচুর, ধৈর্য লাগে অনেক। ”
ফারুক অবাক হয়ে বলল,
“ দেখো, অচেনা মেয়েকে আশ্রয় দিয়ে আবার বিপদ না আসে!”
সারা তবুও বিশ্বাসের সাথে বলল,
“ আল্লাহ আমাদের সাথে এমন করবেন না ইনশাআল্লাহ। ”
“ আচ্ছা চলো, খেতেও দিবে না নাকি!”
“ কেন দিবো না! ” বলে সারা হাসিমুখে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো।

ফারুক খাওয়া শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। সারাদিনে দাঁড়িয়ে থাকাই কাজ, খুব অল্প সময় বসার সুযোগ পায়। দুপুরে শুকনো রুটি খেতে যেটুকু বসার সুযোগ পায় সেটুকুই। এরই মাঝে সারা ঘরে আসলো ।
এসেই বলল,
“ ভাবছিলাম ড্রইংরুমে দুই ভাইয়ের থাকার তোষক টা বিছিয়ে দিবো। মেয়েরা একসাথে থাকুক, ছেলেরাও বড় হচ্ছে। ”
“ হু সেটাই করো, হাজার হোক বেগানা নারী ঘরে আছে৷ এক ঘরে সবাই থাকা ঠিক ও হচ্ছেনা। ”
সিড়িঘর থেকে ঢুকেই অল্প একটু জায়গা, এক কোণায় দুই ভাইয়ের তোষক টেনে নিয়ে আসে সারা। ছোঁয়া অবশ্য সাহায্য করেছে, কিন্তু বুঝেনি কেন বাহির করে দিলো বিছানা টা৷

রাত্রে ফাহাদ ফিরে এসে বাইরে বিছানা দেখে মন খারাপ করে। জিজ্ঞেস করে,
“ এখানে শুতে হবে?”
সারা তখনও হাসি মুখে বলল,
“ পড়াশোনা আমাদের ঘরে করিস, আর এখানে ঘুমাস। বিছানা তো আছেই, ঘুম হলেই হলো! কতো মানুষ তো শুবার জায়গা টুকুও পায়না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করো যে একটা থাকার জায়গা আমাদের আছে। ”
ফাহাদ মনে মনে ছোঁয়ার উপর বিরক্ত হয়ে গেলো, ওর জন্যই আমাদের আজ থেকে এখানে ঘুমাতে হবে।

নেহা ফিরে এসে দেখলো বাইরে বিছানা , কিছুই না বলে কাজ শেষ করে আসলো। এসেই মায়ের কানে কানে বলল,
“ ভালো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছো৷ ফাহাদের সামনে ছোঁয়া ইতস্তত বোধ করছিলো কালকে। ”
“ হাজার হোক, ছেলের বউকে তো পর্দা রক্ষার সুযোগ দিতেই হবে। ”

নেহা একটু হেসে ফাহাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকলো। ছোঁয়া তখনও গয়না বানাচ্ছে। নেহা অবাক হয়ে যায়। এতো সুন্দর ডিজাইন! বলেই ফেললো,
“ ইশশ, কি সুন্দর করে বানাচ্ছো! আমার তো লোভ লাগছে খুব। ”
ছোঁয়া মুচকি হাসলো।

°°°
চারদিন পর,
ছোঁয়ার বানানো ৩ সেট গয়না বিয়ে বাড়িতে বিক্রি হয়ে যায়। ভাগ্যিস ছোঁয়া এক্সট্রা আরেকটা বানাচ্ছিলো, নইলে আরেকটা অর্ডার আছে। পরেরদিন ই লাগবে সেটা৷
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই ছোঁয়া অস্থির হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় ফুয়াদ আসামাত্র ইশারা করে ডাকে ফুয়াদ কে। ফুয়াদ বুঝতে না পেরে বলল,
“ আগে খেয়ে নিই, এরপর কথা বলছি। ”

ছোঁয়া মন খারাপ করে বসে থাকলো, ফুয়াদ খেয়ে রুমে আসামাত্র বলল,
“ আপনার কাছে ফোন আছে? ”
“ কাকে কল করবে?”
“ না মানে, একটু জরুরী ছিলো। ”
ফুয়াদ নিজের ছোট্ট ফোন টা ছোঁয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়৷

চলবে….

মায়াবী হরিণী পর্ব ৪

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ৪
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ কমার্স নিয়ে পড়েছিলাম কেন জানো! আমার বাবা একটা ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড। অনেকে তাকে হেউ করে। সেই তাদেরকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, সিকিউরিটি গার্ড এর মেয়ে অফিসার হয়েছে। আর এখনো সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে লড়ছি। কিভাবে বিয়ে করে সে স্বপ্ন মাটি চাপা দিতে পারি! ”
নেহা এক বুক কষ্ট চেপে রেখে আবিরের উদ্দেশ্যে বললো। আবির ম্যাথ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। অনেক জায়গায় চাকরির জন্য এপ্লাই করেছে। হয়তো পেয়েও যাবে শীঘ্রই। নেহা খুব সুন্দরী না হলেও তার সংগ্রামী জীবনের প্রেমে পড়েছিলো আবির সেই প্রথম থেকেই। নেহা কে পারিবারিক ভাবেই চেনে। দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয়, তখন থেকেই দেখে আসছে নেহা কতটা পরিশ্রমী। আবিরের ইচ্ছে ছিলো নেহা কে বিয়ে করার। কিন্তু নেহা কিছুতেই রাজি হয়না। যখনই বিয়ের কথা বলে, তখনই বলে বিয়ে করলে চাকরি করতে পারবেনা। চাকরি ওকে করতেই হবে। যত কষ্টই হোক না কেন। আবির বারবার বুঝিয়েছে, বিয়ের পর পড়াবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আজও আবির বলে ব্যর্থ হয়েছে। নেহা জানিয়ে দিলো, বিয়ে করে নিজের স্বপ্ন মাটিচাপা দিবেনা। তবুও আবির বলল,
“ আমরা একসাথে ও তো তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।”
“ কিভাবে জানবো, যদি তোমার ফ্যামিলি বাধা দেয়।”
“ আচ্ছা, একবার ভাবো। তোমার বাবা নিশ্চয়ই তোমার জন্য পাত্র খুঁজছে। যদি জোর করে বিয়ে দেয়, তুমি রাজি হয়ে যাবে সেটা নিশ্চিত। তখন যদি তোমার পড়াশোনা তে বাধা আসে! তখন কি করবে?”
নেহা একটু ভেবে বললো,
“ বাবা কে চিনি আবির। উনি নিশ্চয়ই আমার ক্ষতি চাইবেন না। আমরা বন্ধুই থাকি প্লিজ…. ”

আবির আর কিছু না শুনেই চলে গেলো। মেয়ে টা কে কিছুতেই বোঝানো যায় না৷ আর কখনো ওর সামনে বিয়ের প্রস্তাব দিবেনা। বারবার অপমানিত হতে কার ভালো লাগে!

দুপুরে ফুয়াদ বাসায় খেতে আসে। হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলে ছোঁয়া ভাত বেড়ে দেয়। কাঁঠালের তরকারির সাথে ডাল আর ভাত। ছোঁয়া কে দেখে ফুয়াদ বলল,
“ মা কোথায়? তুমি দিচ্ছো যে?”
“ মা গোসল শেষ করে নামাজ পড়ছেন। আমাকে বলে গেছেন আপনি আসলে খাবার বেড়ে দিতে।”
“ আজ এতো দেরি! মা তো টাইম মতো নামাজ পড়েন। কি করছিলেন উনি?”
“ সেলাইয়ের কাজ। ”
“ আর তুমি কি শুয়ে বসে থাকছো নাকি!”

ছোঁয়ার একটু অভিমান হয়, চুপচাপ বসে থাকে। এটা দেখে ফুয়াদ বলল,
“ মা কে সাহায্য করবে বুঝলে। কখনো চুপচাপ বসে শুয়ে সময় নষ্ট করবেনা। ”
“ জ্বি আচ্ছা। ”
ফুয়াদ খেয়ে উঠে পড়ে। ছোঁয়া সব গুছিয়ে রেখে দেয়। সারা দুজন কে একসাথে খেতে বলেছিলো। অথচ ফুয়াদ একবার ও খাবার জন্য সাধলো না। খুব অভিমান নিয়ে না খেয়ে বসে থাকে। যার হাত ধরে এই বাড়িতে আসা, তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ পর ভাবলো, “ না আছে তাদের মধ্যে প্রেম, না টান। কেনই বা বলবে উনি৷ কিসের জন্য অভিমান, যার কোন মূল্যই নেই। ”
এটা ভেবে মন কে শান্তনা দিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসে। নামাজ শেষ করে সারা তসবিহ পড়ছিলো। সারা বলল,
“ কিরে ফুয়াদ চলে গেছে। ”
“ জ্বি মা …”
“ মন খারাপ কেন?”
“ মন খারাপ না মা, আপনি এখন খাবেন? ”
“ তুই ওর সাথে খাসনি?”
“ না মা, লজ্জা লাগে। ”
“ ধুর পাগলী, আমায় আপন করে নিতে পারিস আর বরকে আপন করে নিতে পারিস না?”
ছোঁয়া লজ্জায় মাথা নোয়ালো। এখানে তার কিছুই বলার নেই। বিয়েটাই একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে তাকে৷ কিসের অধিকার দাবি করবে সে!
“ আচ্ছা চল খেয়ে নিয়ে কাজ শেষ করি। ” সারা ছোঁয়ার লজ্জা ভাঙাতে বললো।
দুজনে খাওয়ার পর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন সারা বলল,
“ ফুয়াদ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, ভালো কোথাও চান্স পাওয়ার জন্য৷ তাই হয়তো ও তোকে নিয়ে এখন ভাববে না। তাই ওর আশায় বসে নিজের শরীর খারাপ করিস না। নিজের কাজ নিজে চালিয়ে যা। দেখবি একদিন সার্থকতা এসে ধরা দিবে। ”
“ মা উনি বাধ্য হয়ে বিয়ে করাতে আমার উপর এতো রাগ দেখাচ্ছেন। আমি ইচ্ছে করে কিছুই করিনি। ”
“ আহা! দেখো মেয়ের কাণ্ড, একটু কিছু হলেই ফেচফেচ করে কাঁদে। ”
“ সরি মা। ”
“ আচ্ছা, বিয়ের কথা ভুলে যা। মনে কর তুই আমার মেয়ে। এবার খুশি তো!”

ছোঁয়ার হাতের ছোঁয়ায় গলার মালা , কানের দুল, আর টিকলি প্রস্তুত। আর কয়েকটা জিনিস বানাতে হবে, আংটি আর বাহুবন্ধনী বানালেই সেট টা প্রস্তুত হয়ে যাবে। এখন বিয়ের কনের গয়না গুলো পছন্দ হলেই হয়। ছোঁয়া সংকোচ কাটিয়ে বলল,
“ মা, গয়নার ডিজাইন কনে কে দেখিয়ে আসলে কেমন হবে! যদি ওরা কিনে ফেলে আগে আগে। ”
“ হু, বিকেলে যাবো ভেবেই রেখেছি। ব্লাউজের মাপ টা ঠিক হলো কিনা!”

সারা কাজ শেষ করে । ফাহাদ তখন বাসায় আসলে ওকে খাবার দিয়ে দেয়। বলল,
“ তুই খেয়ে নে, আমি নিচ তলায় যাবো। নেহা এখুনি আসবে। দরজা খুলে দিস। ”
সারা চলে যাবার কিছুক্ষণ পর ফুয়াদ আসে। দুইটা টিউশনি শেষ করে এসেছে। এসেই ঘরে ঢুকে দেখলো ছোঁয়া চুল ছেড়ে চুল শুকাচ্ছে। হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে গেলো। দ্রুত ছোঁয়ার একগোছা চুল মুঠি করে ধরে। ছোঁয়া ভয়ে আঁতকে উঠল । ফুয়াদ ছোঁয়ার থুতনিতে হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল,
“ বেহায়া মেয়ে, পরপুরুষ কে সৌন্দর্য দেখাতে খুব ভালো লাগছে তাইনা!”
ছোঁয়া কিছুই বুঝলো না। শুধু চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। ফুয়াদ আরোও শক্ত করে চুল গুলো ধরে বলল,
“ সামনের ফ্লাটের ছেলে টা বারান্দা থেকে অপলক তাকিয়ে আছে, খেয়াল করেছো?”
ছোঁয়া খেয়াল করলো এইবার। অপরাধ বুঝতে পেরে চোখ নামিয়ে বলল,
“ মাফ করবেন। বুঝতে পারিনি। ”

ফুয়াদ ছোঁয়ার চুল ছেড়ে দেয়। রাগ দেখিয়ে বলল,
“ কমনসেন্স নেই তোমার! নাকি সবাই কে মায়াবী চেহেরার মুগ্ধতায় ডুবা ডুবাতে চাও? ”
ছোঁয়া কি বলবে বুঝতে না পেরে ফুয়াদের পা ধরে বসে।
“ সত্যিই বুঝতে পারিনি। আর হবেনা এমন। ”
ফুয়াদ সরে দাঁড়ায়।
“ আহা! এগুলো কি ধরনের ন্যাকামি? ”
ছোঁয়াকে বসে থাকতে দেখে ফুয়াদ ছোঁয়ার পাশে বসে। আস্তে করে বলল,
“ আমি চাই তুমি পর্দা করে চলবে। এমনি কি ফাহাদের থেকেও পর্দা করবে। আশা করি আর বলতে হবেনা। ”
“ জ্বি… ” ছোঁয়ার ছোট্ট জবাব৷
ফুয়াদ কিছু বলছেনা দেখে ছোঁয়া বলল,
“ লেবুর শরবত পান করবেন? ”
ফুয়াদ একবার ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ এতো বিলাসিতা তোমার মানায় না!”
ছোঁয়া না বুঝে তাকিয়ে থাকে। ফুয়াদ বলল,
“ শরবত খাওয়া বড়লোক দের কাজ৷ আমাদের মতো মানুষ দের জন্য না। ”
“ আপনি রোদ থেকে এসেছেন, তাই বলছিলাম। ”
“ লেবু কোথায় পেলে?”
“ মা এনেছেন। ”
“ কখন? “
“ সকালে উনার সাথে বাজারে গেছিলাম। তখন চার টা লেবু নিয়েছেন। ”

এটা বলেই ছোঁয়া গিয়ে লেবু গ্লাসে চেপে নুন দিয়ে শরবত করে নিয়ে আসে। ফুয়াদ কথা না বাড়িয়ে কয়েক ঢোকে শেষ করে ফেলে। ছোঁয়া বলল,
“ আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন৷ শুধু শুধু আপনার পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। ”
“ হঠাৎ? ”
“ নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনা। ছোট বেলায় বাপ মা খেয়েছি, আর এখন আপনাদের কষ্ট দিচ্ছি। ”

ফুয়াদ ছোঁয়ার ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। দুজনের মাঝে অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করছে। একে তাদের সম্পর্ক বৈধ, অন্যদিকে বয়স টাও কম৷ ছোঁয়া খুব কাঁপতে শুরু করে, ফুয়াদ খেয়াল করে হাত টা সরিয়ে নেয়। ফুয়াদ বলল,
“ কখনো নিজেকে দোষারোপ করবেনা। যাই হোক, তোমার মাথা যন্ত্রণা করছে বুঝি!”
“ কিভাবে বুঝলেন? ”
“ কথার মাঝে বিরক্ত প্রকাশ করতে দেখে। ”
“ ও তেমন কিছু না, আমি অভ্যস্ত মাথা ব্যথা নিয়ে। খুব কষ্ট পেলে ব্যথা করে, আবার কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে যায়। ”
“ চুল টেনে ধরে কষ্ট দিলাম। সরি, মাফ করে দিও। ”
“ সেইজন্য নয়৷ আগে থেকেই করছিলো। ”
“ মিথ্যে বলিও না। ”

এটা বলে ফুয়াদ রান্নাঘরে গিয়ে ছয় কাপ চা বসিয়ে দেয়। চা বানিয়ে এককাপ ছোঁয়া কে দেয়, অন্য কাপে নিজে নেয়। বাকিটা ফ্লাক্সে ঢেলে রাখে৷
চা শেষ করার পর ছোঁয়া বলল,
“ যতদিন মামা ছিলেন, খুব আদর করতো আমাকে। মামা বিদেশ যাবার পর থেকেই আমি ওই বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে গেছিলাম। ”
“ তার মানে, ওটা তোমার মামার বাড়ি?”
“ ফ্লাট টা আমারই, কিন্তু…. ”
“ মানে? কি বলছো তুমি? ”
“ ও কিছু না, অন্যদিন বলবো। “ বলে ছোঁয়া উঠে দাঁড়ায়। ফুয়াদের কাপ, নিজের কাপ নিয়ে গিয়ে ধুয়ে ফেলে। ফিরে এসে বলল,
“ আর টিউশনি করাবেন আজ?”
“ একটা কাছে, ওটা রাত ৮ টাই শুরু। ”
“ ওহহহ…”
“ তোমার অতীত সম্পর্কে কি জানার অধিকার নেই আমার? ”

ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। বলবে তো অবশ্যই, কিন্তু এখন বলা অসম্ভব৷ তাই বলল,
“ হ্যাঁ জানাবো, কিন্তু সময় হলে৷ ”

চলবে…

মায়াবী হরিণী পর্ব ৩

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ৩
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ ছোঁয়া মেয়েটা তোর বউ তাইনা! ” যেই ফুয়াদ টিউশনি শেষ করে বাসায় পা রেখেছে, ওমনি সারা ছেলেকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
ফুয়াদ মায়ের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। সারা আবার বলল,
“ মায়েরা সব বুঝতে পারে, কখন ছেলে মিথ্যে বলে। বুঝেছি বাবার ভয়ে কিছুই বলিস নি। ”
শুকনো মুখে ফুয়াদ বলল,
“ মাফ করো মা, এক স্টুডেন্ট এর বাড়িতে ফেঁসে গেছি৷ ও মেয়ে মানুষ, রাস্তায় ফেলে আসতে পারিনা। তাই আমার মহীয়সী মায়ের দরবারে হাজির করেছি। ” ফুয়াদ কথা গুলো আস্তে করে বলে ফ্রেস হতে ঢুকে গেলো৷

মাত্রই সবার খাওয়া শেষ করে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। ফুয়াদ প্রতিদিনই লেট করে আসে, তাই মা ছেলের জন্য প্রতিদিন না খেয়ে অপেক্ষা করে। ছেলের কাছে কনফার্ম হয়ে খাবার বাড়ে সারা। যেভাবেই হোক, মেয়েটা কে খুব মনে ধরেছে সারার। বিপদে যখন পড়েছে, তখন মেয়ের মতই থাকুক। একটা সময় না হয় বউ করে নিবো, আগে ফুয়াদের গতি তো হোক৷ কিন্তু ফুয়াদের বাবা কি মানবে! ভয় মনের মাঝে চাপা রেখে ফুয়াদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফুয়াদ আসলে একসাথে খেয়ে নেয়। সারা বেশী কথা বাড়ায় না, ফারুক শুনলে রাগারাগি করবে। তাছাড়া ফুয়াদের পড়াশোনা ও অনেক বাকি৷

ফুয়াদ ঘরে ঢুকে দেখলো নেহাপু পড়ছে। আর ছোঁয়া নেহাপুর পাশে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। পর্দার ওপারে ভাই ও পড়াশোনা করছে। একপলক দেখেই নিজের বই খুলে পড়তে শুরু করে। ঘন্টা খানিক পড়ার পর ছোট ভাই ফাহাদ ফিসফিস করে বলল,
“ ভাই, মেয়েটা তো ভালোই। মনে ধরেছে নাকি!”
“ কুনজর দিবিনা। পড়া শেষ করে ঘুমা। ”
ভাইকে এই প্রথম রেগে যেতে দেখলো ফাহাদ৷ বুঝতে পারলো না কি এমন হয়ে গেলো। তাই সম্মান দিয়েই বলল,
“ সরি ভাই, বুঝতে পারিনি। ”
নেহাও এপাশ থেকে উঠে আসলো ভাইদের কাছে। ভাইদের মাঝখানে বসে ফিসফিস করে বলল,
“ ভাই তো আমার বড় হয়ে গেছে, ভাবী হিসেবে মেয়েটা মন্দ নয়। ”
ফুয়াদ চোখ বড় বড় করে তাকায়, ছোঁয়া সব বলে দেয়নি তো আবার! নেহা আবার বলল,
“ মেয়েটাকে প্রথম দেখেই বুঝেছি অসহায়, তবে ভাই কে তো চিনি, সে কখনো অচেনা মেয়েকে বাসায় আনবেনা জানি৷ সে থেকেই বুঝে নিয়েছি যেভাবেই হোক ও তোর বউ। ”
ফুয়াদ ফিসফিস করে বলল,
“ ফেঁসে গেছি আপু, বিয়ে করতে চাইনি। একটা ছাত্রী আমাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে ওদের বাসার কাজের মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। বাবা কে বলিস না প্লিজ, বাবা জানলে খুব রাগ করবে৷ ”
“ ও কাজের মেয়ে! দেখে মনেই হচ্ছেনা। হয়তো ওর অন্য কোনো পরিচয় থাকতেও পারে! “
“ জানিনা আপু, আমি ওর নাম ছাড়া আর কিছুই জানিনা। ”
“ ওই ছাত্রীর বাসায় ভালো করে খোঁজ লাগাতে হবে। তাহলেই বুঝতে পারবি ওর পরিচয়। ”
“ ওরা মা আর মেয়ে ছাড়া ওই বাসাতে আর কেউ নেই। ”
“ ছোঁয়া নিশ্চয়ই বলবে। ”
“ ওকে আর কিছুই জিজ্ঞেস করিও না। বাবা বুঝে ফেলবে৷ কাল রাতে চারজন একসাথে ছাদে যাবো, এরপর না হয় ওর থেকে কথা নিবো৷ ”
ফাহাদ বলল,
“ তাহলে ওকে কি বলে ডাকবো? ”
“ খবরদার ভাবী বলিস না, ছোট আপু ডাকবি। ” ফুয়াদ সাথে সাথে বলল।
“ কেন?”
“ আরে গাধা, বাবা জানলে কি হবে বুঝতে পারছিস?”
ফাহাদ সম্মতি দেয়৷
সেদিনের মতো পড়ার বই খাতা গুটিয়ে যে যার মত ঘুমিয়ে পড়ে। পরেরদিন আবার কার্যক্ষেত্রে যেতে হবে। প্রয়োজন মতো না ঘুমালে এনার্জি পাবে না।

ফজরের ওয়াক্তে ছোঁয়ার আগে ঘুম ভাঙে। আগে থেকেই নামাজ পড়ার অভ্যাস আছে। ছোঁয়া উঠে নেহা কে ডাক দেয়,
“ আপু উঠুন, নামাযের সময় হয়ে গেছে। ”
নেহা চোখ কচলিয়ে উঠে পড়ে। মেয়েটা তো খুব ভালো, কাল রাতে গল্প করতে গিয়ে ঘুমাতে দেরি হয়ে গেছে বলে ফজরের নামাজ পড়তেও দেরি হয়ে গেছে । ছোঁয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে নেহা বলল,
“ অনেক শুকরিয়া ছোটাপু। ”
ছোঁয়া অবাক হয়, নেহা কত বড়, তবুও তাকে আপু ডাকছে দেখে। ছোঁয়া তাকিয়ে আছে দেখে নেহা বলল,
“ তাড়াতাড়ি নামায পড়ে নাও, এরপর কোরআন শরিফ পড়ে যে যার মত কাজ করবো। ”
ছোঁয়া খেয়াল করলো ফুয়াদ আর ফাহাদ নেই, ওরা আগেই মসজিদে চলে গেছে হয়তো। ওজু করে এসে যে যার মত নামাজ সেরে নেয় । এরপর কোরআন শরিফ পড়ে নেহা বাইরে যায়। ছোঁয়া ও পিছু পিছু যায়৷ নেহা বলল,
“ মা এর শরীর টা ভালো নেই, আজ আমিই নাস্তা বানাবো। তুমি চাইলে রেষ্ট নাও। ”
“ নেহাপু তুমি দেখিয়ে দাও, আমিই নাস্তা তৈরি করি। ”
“ তুমি নতুন মানুষ, তোমাকে এতো দায়িত্ব দিই কিভাবে বলো! শুতে না চাইলে চুপচাপ দেখো কি করছি। ”
নেহা আটা মাখালো, তখন ছোঁয়া নেহার হাত থেকে বেলন পিড়া কেড়ে নিয়ে নিজেই রুটি বেলতে শুরু করে। দুজনের ভালোই ভাব জমে গেছে৷ ছোঁয়ার রুটি হতে হতে নেহা আরেকটা চুলায় আলুভাজি তৈরী করে ফেলে৷ সকাল সকাল দুইজন মিলে নাস্তা মায়ের ঘরে নিয়ে যায়। সারা নামাজ পড়ে আরেকটু ঘুমিয়েছিলো৷ নাস্তা দেখে বলল,
“ আমায় বললেই হতো, তোরা খুব বড় হয়ে গেছিস তাইনা! আমি কি নাস্তা করতে পারিনা নাকি!”
নেহা বলল,
“ হ্যাঁ পারো, দুপুরের খাবার রেডি করে পারো কিনা দেখিয়ে দিও। এখন তোমার মেয়েরা যা করেছে সেগুলো খাও দেখি। ”
সারা হাসলো, নেহার সাথে কখনো কথায় পারে না। তিনজন মিলে খেয়ে নেয়। ততক্ষণে ফাহাদ আর ফুয়াদ ও চলে আসে। সারা জিজ্ঞেস করলো,
“ এতক্ষণ কোথায় গিয়েছিলিস?”
“ মসজিদে নামাজ পড়ে , কোরআন পড়া শেষ করে বারান্দায় কোচিং এর পড়া করছিলাম। ” ফুয়াদ বললো।
ফাহাদ ও বলল ওরা একসাথেই পড়ছিলো।
সকালের পড়া ভালো মনে থাকে। সেজন্য প্রতিদিন ই ওরা পড়ে। বাড়ি টা গলির ভিতর, আলো বাতাস কম। তাই মসজিদের বারান্দায় পড়া টা কেই নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করেছে দুই ভাই।
ফাহাদ খেয়ে নিয়ে কলেজ বের হয়, আর ফুয়াদ কোচিং এর উদ্দেশ্যে। নেহা ও ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়। নেহা সপ্তাহে তিন দিন বা দুই দিন ভার্সিটি যায়। প্রতিদিন ক্লাস থাকেনা, নইলে কষ্ট হতো প্রচুর। নেহা বেরিয়ে যাওয়ার পর ফারুক আলী আসে বাজার নিয়ে।
ডায়াবেটিস আছে, নামাজ শেষ করে হাটার পর একেবারে বাজার নিয়েই উঠে। ঘেমে গেছে ৫ তলা পর্যন্ত এত ভারী বাজারের ব্যাগ বহন করে আনতে গিয়ে।
সারা শাড়ির আঁচল দিয়ে ফারুকের মুখ মুছে দেয়। ওই মুহুর্তে কারেন্ট চলে গেছিলো দেখে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করা শুরু করে। ছোঁয়া দূর থেকে এই দম্পতির ভালোবাসা দেখে অবাক।
ফারুক বলল,
“ মেয়েটা কি এখানেই থাকবে? ”
“ আহা, অনাথ কে আশ্রয় দিলে আল্লাহ খুশি হন। ”
“ তাহলে বাসায় অনাথ আশ্রম খুলি!”
“ আরে, রাগ করো কেন? উঠতি বয়সের মেয়ে কে তাড়িয়ে দিই কিভাবে বলো! ওর যদি বিপদ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ কি আমাদের মাফ করবেন?”
“ উঁহু, সারা, পারোও ইমোশনাল ব্লাকমেইল করতে। বলো, মেয়েটা কে মনে ধরেছে। কাছেই রাখতে চাও। ”
“ সেটা নয়। যাও ফ্রেস হয়ে খেয়ে অফিসে যাও। ”
ফারুক এই একজনের কাছেই নরম। কিন্তু ছেলে মেয়েদের সামনে সবসময় গরম দেখায়। বাবা হিসেবে কখনো ছেলে মেয়েদের একটু আদর দেয় না। হয়তো আর্থিক সংকটের জন্য ছেলে মেয়েদের সামনে হাসিখুশি থাকতে লজ্জা বোধ করে।
ফারুক চলে যাবার পর ছোঁয়া আসে সারার সামনে। সারা হাতের কাজ করছে।
“ মা এটা কি করছেন? ”
“ আর বলো না মা, নিচের ফ্লাটে বিয়ের অনুষ্ঠান ৫ দিন পর। তাই ব্লাউজ আর পেটিকোট সেলাই এর অর্ডার নিয়েছি। ”
“ আপনি অর্ডারে কাজ নেন?”
“ এইতো, শুধুমাত্র হাতখরচ এর জন্য যতটুকু সম্ভব করি৷ ”
“ আচ্ছা মা, ওই আপুরা নিশ্চয়ই শাড়ির সাথে অর্নামেন্টস ও কিনবে! ”
“ কিনতেই পারে। কেন বলতো?”
“ আপনি আমার সাথে বাজারে যাবেন? তাহলে কিছু হাতের কাজ আমিও করতাম। ওরা যদি পছন্দ করে কিনে নেয়!”
“ তুমি কি বানাতে চাচ্ছো!”
“ প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে হলুদের সাজের জন্য গয়না৷ ”
“ তুমি ওগুলো পারো!”
“ এর আগে তারানা কে বানিয়ে দিয়েছিলাম। তখন ওগুলো দেখে অনেকে পছন্দ করেছিলো। কিন্তু অর্ডার নিতে দেয় নি মামী৷ ”
“ মামীর বাসায় থাকতে!”
“ মা, পরে বলবো এসব। উনি বলতে না করেছেন। ”
“ ও সব বলেছে, তুমি যে ওর বউ ও সেটা বলেছে। ”
ছোঁয়া অবাক হয়, ছেলেটা সত্যিই বলে দিলো! তাহলে কি বউ হিসেবে তাকে মেনে নিবে? নাকি আবার তাকে তাড়িয়ে দিবে? মনের ভেতর অনেক প্রশ্ন জাগে। সেগুলো দমিয়ে রেখে সারা কে সব খুলে বলে কি ঘটেছিলো কাল৷ অতঃপর সারা কে রাজি করিয়ে কর্ণফুলী মার্কেট এ যায়। প্রয়োজনীয় সব কিনে নিয়ে ফিরে আসে প্রায়ই দেড় ঘন্টা পর। কাজ করতে হবে ছোঁয়া কে, এভাবে এই মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ গুলোর মাথার বোঝা হবার কোন মানেই হয়না।

চলবে….

অনেক বড় করে দিচ্ছি প্রতিটি পর্ব দিনে দুইটা করে। যেন তাড়াতাড়ি শেষ করা যায়। যাই হোক কেমন লাগছে ওদের জীবন?

মায়াবী হরিণী পর্ব ২

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ২
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

আশেপাশে চিৎকার শুনে ফুয়াদ পিছনে ঘুরে দেখে। মেয়েটা রাস্তায় পড়ে আছে। মানবিকতার খাতিরে পিছনে ফিরে গেলো। ছোঁয়া রাস্তার উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ একটা লোক ছোঁয়ার হাত ধরে টান দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন ফুয়াদ লোকটার হাত থেকে ছোঁয়ার হাত ছাড়িয়ে নেয়।
“ একটা মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন? লজ্জা করে না!”
“ আরেএএ, বেঁচে আছে কি মরে গেছে দেখবোনা!” লোকটা অবাক হয়ে বললো।
“ ও মরে গেলে পুলিশ কেস হবে, আর ফিঙ্গার প্রিন্ট পেয়ে আপনি ফেঁসে যাবেন। সো ছোঁবেন না ওকে। ”

লোকটা ভয়ে হাত সরিয়ে ফেলে। ফুয়াদ ব্যাগের ভেতর থেকে পানি বের করে ছোঁয়ার মুখে ছিটা দেয়। ছোঁয়া কিছুক্ষণ পর চোখ পিটপিট করে তাকায়৷ ফুয়াদ রাগী গলায় বললো ,
“ মেয়ে নাটক করছো তুমি! অজ্ঞান হবার ভান ধরো! যাতে সদয় হয়ে তোমাকে নিয়ে যায়!”
ছোঁয়া কাঁদতে শুরু করে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“ কাল রাত থেকে কিছুই খাইনি৷ ”
“ ইসস, ন্যাকামি করছো৷ খাওনি বুঝি! ভনিতা বুঝি আমি। ”
“ আপনি চলে যান, আসলেন কেনো আবার!”
ফুয়াদ রাগ করে হাটা শুরু করে। লোকজন কিছু বুঝতে না পেরে ছোঁয়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ছোঁয়া বলল,
“ কোথাও যাবার জায়গা না পেয়ে উনার পিছু নিছিলাম। তাই উনি রাগ করে বকাবকি করছে৷ ”
নীচু মনের লোক একজন বলেই বসলো,
“ তাহলে আমার বাসায় চলো। কোন কিছুই অভাব হবেনা। ”

ফুয়াদের কানে কথা টা যায়। বিবেক বাঁধা দেয়, ছোঁয়া কে ফেলে যেতে। আবার ফিরে এসে বললো,
“ চলে এসো ছোঁয়া। ”
ছোঁয়া আশেপাশে কিছুই না দেখে ফুয়াদের পিছু নেয়। ফুয়াদ হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়, ফুটপাতের দোকান থেকে পাউরুটি কিনে ছোঁয়া কে দেয়। ছোঁয়া না খেয়ে তাকিয়ে আছে ফুয়াদের দিকে। অদৃশ্য এক মায়া কাজ করছে। এটা কি পবিত্র বন্ধনের টান! ছোট বেঞ্চের উপর বসে, ছোঁয়া ও বসে পড়ে। অনেক রাস্তা হেটেছে, ক্লান্ত বড্ড। ফুয়াদের দিকে একবার তাকিয়ে পাউরুটি চিবাতে শুরু করে। মনে হচ্ছে কতো দিনের ক্ষুধার্ত ।
ফুয়াদ ও বিস্কুট নেয় একটা। ছোঁয়ার পাউরুটি খাওয়া হলে দাম শোধ করে উঠে দাঁড়ায় ফুয়াদ। ছোঁয়া কে বলল,
“ তুমি এখানেই বসে থাকবে। কোথাও যাবে না৷ আমি একটা টিউশনি করে আসছি। ”
ছোঁয়া ভীত গলায় বলল,
“ আসবেন তো!”
“ না এসে উপায় আছে! টিউশনি না করলে তো পেটে ভাত জুটবে না। আজ বেশী পড়াবোনা, আধা ঘন্টা অপেক্ষা করো প্লিজ। ”

ফুয়াদ একটা বাড়িতে ঢুকে যায়। ছোঁয়া একটা গাছের গুড়িতে গিয়ে বসে। জানেনা ফুয়াদ ফিরে আসবে কিনা! তবুও অপেক্ষা, একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর৷

ফুয়াদ আলী, মাত্রই এইচএসসি দিয়েছে। ছোঁয়ার থেকে দুই বছরের বড়। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, পড়াশোনার খরচ চলে টিউশনির টাকা তে। বাবা ছোট চাকুরী করে, বেতন মাত্র ১০০০০ টাকা। এ দিয়ে চিটাগং এর মতো শহরে তিন ভাই বোন কে পড়ানো কষ্ট সাধ্য ব্যপার। তাও কুলিয়ে যেতো, যখন বাচ্চারা ছোট ছিল। কিন্তু এখন ওদের পড়াশোনা খরচ বেড়ে গেছে। সম্ভব হয় না ফারুক আলীর পক্ষে সব কিছু সামলানো। বড় মেয়েটা অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে। বিবাহ উপযুক্ত, তবে চিটাগং এর মতো শহরে যৌতুক ছাড়া বিয়ে ভাবা অসম্ভব। ছোট ছেলে ফাহাদ আলী এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার এ উঠে গেছে। দুই ভাই ই ছোট ক্লাসের টিউশনি করে নিজেদের খরচ চালায়। মেয়েটাও কম পরিশ্রম করে না! আশেপাশে তিন টা বাচ্চাকে পড়ায়, সাথে নিজের পড়াশোনা কন্টিনিউ করছে। এক কথায় সংগ্রামী পরিবার, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন এর যুদ্ধে অবিরাম লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের সাগর পেরিয়ে সুখের ভেলায় ওঠা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছেনা।

প্রায়ই ৪৫ মিনিট পরে ফুয়াদ আসে, এসে দেখে ছোঁয়া এখনো গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা মেয়ে কতটা নিরুপায় হলে এমন হয়ে বসে থাকে! বাস্তবতা অজানা ফুয়াদের কাছে। কাছে গিয়ে ছোঁয়ার হাতে থাকা পোটলা টা নিজের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। এরপর একটা লোকাল বাসে ছোঁয়া কে আগে উঠিয়ে দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থাকে। যেনো ছোঁয়া কে কোনো পরপুরুষ ছুঁতে না পারে।
লালখান বাজার থেকে ২নং গেট পর্যন্ত আসতে প্রায়ই আধাঘন্টা লাগিয়ে দিলো। খুব জ্যাম ছিলো বৈকি। লোকাল বাসে উঠলে কখন পৌছাবে কোন ঠিক নেই। দুজনেই ঘেমে নেয়ে একাকার। বাস থেকে আগে ছোঁয়া কে নামিয়ে নিজেও নেমে যায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে চললো। তবুও রোদের তেজ কমেনা। সারাদিন ভালোই তাপ সরবরাহের সার্ভিস দিচ্ছে।
অলিগলি হাটার পর ফুয়াদ একটা বাসায় ঢুকে। পাঁচ তলা পর্যন্ত সিড়ি বেয়ে উঠতে পা যায় যায় অবস্থা। সারাদিন কষ্ট, এরপর কি-না এতো লম্বা সিড়ি। কলিংবেল চাপতে একটা ছেলে দরজা খুলে দেয়। খুলেই জোরে করে বলল,
“ বাবা দেখো, ভাইয়া মেয়ে নিয়ে এসেছে। ”
ফুয়াদ রেগে গিয়ে বলল,
“ এই তুই থামবি। ”
“ মেয়েটা কে বল ভাইয়া। ”
এরি মধ্যে ফারুক আলী এসে দাঁড়ায়। ফুয়াদ ভয়ে ভয়ে বলল,
“ আমার ছাত্রী, ওর বাবা মা কাল এক্সিডেন্ট করে মরে গেছে। আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। তাই এখানে নিয়ে এসেছি। ”
ফারুক আলী মুখ ভার করে বলল,
“ খুবই দুঃখের সংবাদ বাবা। কিন্তু আমাদের অভাবের সংসারে কিভাবে আরেকজনের দায়িত্ব নিবো বল? ”
ছোঁয়া বুঝতে পারছে এই বাড়ি তার জন্য নয়৷ কোথায় যাবে এখন সে! মামী তো কখনো ওই বাড়িতে ঢুকতে দিবেনা।
এরই মাঝে ফারুক আলীর স্ত্রী সারা এসে বলল,
“ মেহমান তাড়িয়ে দিলে আল্লাহ নারাজ হন।”
এই বলে ছোঁয়া কে বলল,
“ এসো মা, ভিতরে চলো। ”
ছোঁয়া একটা ভরসার হাত পেলো। ছোঁয়া আবেগে সারা কে মা বলে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে।
দুই রুমের বাসা, ভাড়া ৮০০০ টাকা। ছেলে মেয়েরা একটু আধটু সাহায্য করে বিধায় শহরে দুই রুমের বাসাটা ভাড়া নিয়েছে। গ্রামে থাকলে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা করানো অসুবিধা, আবার শহরে টিউশনি করে আয় করা যায় ভালো। ফুয়াদ তিনটা টিউশনি করে ১০৫০০ আয় করে। তার মাঝে আজ একটা বাদ চলে গেলো। নতুন একটা টিউশনি না খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই ফুয়াদের।
এক রুমে মা বাবা, আরেক রুমে মাঝখানে পর্দা দিয়ে একপাশে বোন, অন্যপাশে দুই ভাই থাকে। পরিবারে ছোঁয়া এক্সট্রা যোগ হলো। নেহার সিঙ্গেল তোষকে দু’জন কে কষ্ট করে ঘুমাতে হবে।
একটু বিছানা পেয়ে ছোঁয়া ঘুমিয়ে পড়ে। ফুয়াদ আড়চোখে একবার খেয়াল করে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“ মা, ও কাল থেকে ক্ষুধার্ত, ঘরে খাবার থাকলে দিও। আমার আরেকটা টিউশনি আছে। ”
এই বলে মা কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়ে ফুয়াদ৷

রাত ৮ টা নাগাদ নেহা ফিরে আসে, এসেই বলল,
“ মা ক্ষুধা লেগেছে, খাবার রেডি করো৷ আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। ”
ঘরে ড্রেস নিতে গিয়ে ছোঁয়া কে দেখে বাইরে ফিরে এসে বলল,
“ ওই মেয়েটা কে মা ?”
“ কোন এক অনাথ মেয়ে, ফুয়াদের সাথে এসেছে। ”
“ ভাই চুপেচাপে বিয়ে করলো নাকি আবার!”
“ আরে না, ওর বাপ মা কাল এক্সিডেন্ট করে মারা গেছে নাকি। কেউ নেই আত্মীয় স্বজন। ”
“ ভাই চিনলো কিভাবে আবার!”
“ ওর ছাত্রী ছিলো নাকি!”
“ হায় আল্লাহ! তাহলে ভাইয়ের একটা স্টুডেন্ট কমে গেলো! ”

হতাশার ছাপ কাটিয়ে নেহা বলল,
“ ব্যপার না মা, আমার খোঁজে আরেকটা ছাত্র আছে। ভাই না হয় ওকেই পড়াবে কাল থেকে। ”
সারা বললেন,
“ রিজিকের মালিক আল্লাহ, তিনিই ব্যবস্থা করবেন। ” মা এর নির্লিপ্ত জবাব।
সারা মেয়ের বেডে বসে ছোঁয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ছোঁয়া খুব ভীতু ছোট থেকেই। এক লাফে উঠে বসে। ভীত গলায় বলল,
“ মাফ করবেন, কখন যে ঘুমিয়ে গেছিলাম, বুঝতেই পারিনি। ”
“ আরে আরে, ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। চলো খাবে, চোখ মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে তোমার। ”

ছোঁয়ার লজ্জা পাচ্ছে, এরা এমনিতেই মধ্যবিত্ত পরিবার। এদের খাবারে কিভাবে ভাগ বসাবে সে! তাই বলল,
“ আমার ক্ষুধা নেই, আপনারা এখন খেয়ে নিন প্লিজ। ”
“ অতিথি কে অভুক্ত রেখে কখনো খেতে নেই, আল্লাহ পাপ দিবে।”

ছোঁয়া আর কথা না বাড়িয়ে বলল,
“ ওয়াশরুম কোন দিকে? একটু গোসল করে নিলে ভালো লাগতো। ”
“ আচ্ছা, ১০ মিনিট পরে যেও। আমার মেয়ে নেহা এখন গোসলে গেছে। ”
“ আচ্ছা মা, সরি ভুলে মা ডেকে ফেলেছি। ” ছোঁয়া কে থামিয়ে দেয় সারা। এরপর বলে,
“ তুমি আমার মেয়ের মতই, মা বলেই ডেকো কেমন।”
ছোঁয়া অস্পষ্ট স্বরে মা ডেকে সারা কে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। উনি অনেক ভালো মহিলা, উনার সাথে কি মিথ্যা বলা ঠিক হচ্ছে! নিজের মাঝে আবার অপরাধ বোধ জেগে উঠে ছোঁয়ার।

চলবে….

মায়াবী হরিণী পর্ব ১

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
মায়াবী হরিণী পর্ব ১
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

“ স্যারের নজর এতো টা খারাপ, যখনই ছোঁয়া নাস্তা নিয়ে যায়, ড্যাবড্যাব করে ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, ছোঁয়া কে আস্ত গিলে খাবে এমন ভঙ্গি। ” মায়ের সামনে অভিযোগ করায় মা ও ক্ষেপে যায়। রেগে রেগে জবাব দেয়,
“ শুধু কি ছোঁয়া কেই নজর দেয় না-কি তোর দিকেও কুনজর দেয়?”

মা সুহানা খাতুনের প্রশ্নের উত্তরে মেয়ে তারানা বলল,
“ কি যে বলো মা! বলতেও লজ্জা লাগে। ও শুধু ছোঁয়া কে না, ছোঁয়া যখন কোমর বাঁকা করে নাস্তা রাখে তখন ওর বুকের দিকেও তাকিয়ে থাকে। ”
“ যাক বাবা! ভণ্ড মাস্টার তাহলে তোকে নজর দেয়নি!”
“ নাহহ মা, আমি তো ওর মতো এতো সুন্দরী না। যে আমার দিকে নজর দিবে। এই মেয়ে বাসায় থাকলে আমার বিয়েই হবেনা। ”
“ তুই ঠিক বলেছিস। তোর ওই লুইচ্চা স্যারের সাথে ওর বিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বিদায় করে দিবো ওকে। ”

মা মেয়ের কথা আড়াল থেকে শুনে ছোঁয়ার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এ এক বোবা কান্না, সারাজীবন কাঁদতে হবে, কেউ দেখবেও না, জানবেও না, শান্তনা দেওয়া তো দূরেই থাক।

পরেরদিন,

স্যারের পড়ানো প্রায়ই শেষ এই সময় সুহানা খাতুন ছোঁয়ার হাতে নাস্তার প্লেট ধরিয়ে দেয়। নাস্তা বলতে, দুইটা টোস্ট বিস্কুট আর এক কাপ চা।
ছোঁয়া বুঝতে পারছে হয়তো কোন বিপদ হবে তার। তবুও বিস্কুট এর প্লেট এক হাতে, অন্য হাতে চায়ের কাপ ধরে স্যারের সামনে গেলো। কোনরকম প্লেট আর কাপ রেখেই ঘুরে আসতে গেলে তারানা চিল্লিয়ে বললো,
“ আপনি তো বড় অসভ্য স্যার, প্রতিদিন ছোঁয়ার বুকের দিকে নজর দেন, আজ আবার কোমরেও নজর পড়লো! আপনার কুনজর এ তো মেয়েটার বিয়েই হবেনা! ”
তারানার কথা শেষ হওয়া মাত্রই সুহানা ঘরে ঢুকে। ছোঁয়ার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়, আর বলতে শুরু করে,
“ কি রে হারামজা…., শরীর দেখিয়ে পয়সা ইনকাম শুরু করবি নাকি! ”
বলেই স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ তোমরা ও দু টাকার মাস্টার, লজ্জা শরম খুইয়ে মেয়েদের দিকে তাকাও। লজ্জা থাকা উচিৎ। ”

ফুয়াদ থতমত খেয়ে যায়, কি হচ্ছে এসব! কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসুক ভাবে বলল,
“ কি সব বলছেন আন্টি? আমি পড়াই ঠিকই, কিন্তু কখনো এতো খারাপ দৃষ্টি দিই নি৷ মিথ্যা অপবাদ কেন দিচ্ছেন? ”
“ মিথ্যা অপবাদ মানে! প্রতিদিন খেয়াল করি। আর কতো মিথ্যে বলবেন আপনি? শাক দিয়ে মাছ ঢাকছেন? ”
তারানা চিৎকার করে বলল।

তারানার গলা এমনিতেই বড়, চিল্লাচিল্লি শুনে পাশের বাসার আন্টি চলে আসে। পাশাপাশি ফ্লাট, এ বাড়িতে কি হয় ও বাড়ির সবাই টের পায়। ও বাড়ির যা খবর এই বাড়িতে বসেই জানতে পারে সবাই৷
এসেই ফুয়াদ কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লেখা বেগম বললেন,
“ ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই জন্যই শিক্ষক সমাজ আজ ঘৃণিত। মেয়েরা এদের কাছে পড়া শিখবে নাকি যৌন…!”

ছোঁয়া কানে আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুহানা খাতুন ছোঁয়ার কানে আরেকটা চড় মেরে দেয়। আর চিৎকার করে বলল,
“ এক হাতে কি তালি বাজে! এই হারামি মা… র ও দোষ আছে। বাপ মা নেই, শাসন করবে কে?”
ছোঁয়া মাত্রই এসএসসি দিয়েছে, আর তারানা সামনের বছর দিবে৷ ক্লাস টেনে এইবার। একবছরের ছোট মেয়ে কিভাবে তাকে অপমান করছে। মন চাচ্ছে মাটি খুঁড়ে নীচে ঢুকে যায়। কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে উপরে চলে যায়। বাপ মা মরা মেয়ে গুলো হয়তো কপাল পোড়াই হয়৷

ফুয়াদ জোর গলায় বললো,
“ দেখুন আন্টি, আপনাদের ভুল হচ্ছে। হ্যাঁ, ওই মেয়ের দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু শুধু চোখ দেখতাম। কখনো আপনাদের মতো নীচু মন মানসিকতা নিয়ে দেখিনি। ”

আন্টি আবার চিল্লাতে চিল্লাতে বললো,
“ আইছে আমার সাধু পুরুষ, সব গুলারে আমার চেনা আছে। ”
সুহানা খাতুন বলল,
“ এই ছেমরি রে আমি ঘরে রাখতে পারবোনা, ওরে এখুনি এই ভণ্ড মাস্টারের লগে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেন ভাবী৷ ”
যেই বলা সেই শুরু, ফুয়াদ কে আটকে কয়েক বাসার প্রতিবেশী মিলে বিয়ের আয়োজন করে বসে৷ ছোঁয়া কেও ফুয়াদের পাশে জোর করে বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ বিয়ে করতে না চাইলেও জোর করে বিয়ে দিবেই এমন পরিস্থিতির স্বীকার ফুয়াদ৷ কি ভুল টাই না করেছে এই মেয়ের চোখ দেখে৷ মেয়েটার চোখে একটা নেশা আছে, কালো চোখের মনির ভিতর অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে। সেই গভীর কালো গর্তে ডুব দিয়ে কষ্ট গুলো খুঁজে পেতে তার সমাধান করতে খুব ইচ্ছে করতো। চোখ দুটো তে একপ্রকার মায়া আছে। একদম মায়াজাল, যে জালে একবার আটকে যাবে, কখনো ছুটতে পারবেনা। মায়ার অতলে আরও ডুবে যেতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু কখনো ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে নেই বলে একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো ফুয়াদ। কে জানতো এই একপলক দৃষ্টি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে কখনোই ওভাবে দেখত না ফুয়াদ।
অবশেষে ফুয়াদ আলীর সাথে মাইশা ইসলাম ছোঁয়ার বিয়ে হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বিয়ে করাতে একপ্রকার রেগে যায় ফুয়াদ। বিয়ের পর যখন সবাই ছোঁয়ার হাত তার হাতে তুলে দেয়, তখন রেগে গিয়ে ছোঁয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করলে আমাকে। না বউ হিসেবে মানবো, না তোমাকে নিয়ে সংসার সম্ভব।”
ছোঁয়া বুঝে যায়, এতিমের কখনো সুখ আসবার নয়। শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

অল্প কিছু কাপড় আর ছোঁয়ার ব্যবহার্য জিনিসপত্র একটা ব্যাগে দিয়ে দেয় তারানা। একপ্রকার দুজন কে বাড়ি থেকে বের করে যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুহানা।
ফুয়াদ খুব জোরে জোরে হাটছে, ছোঁয়া ওর সাথে হাটতে পারছেনা। কিন্তু অবলম্বন একমাত্র ফুয়াদ ই। আর যাওয়ার কোন যায়গা নেই বলে একপ্রকার দৌড়াচ্ছে ফুয়াদের সাথে।

চারিদিকে খাঁ খাঁ রোদ, দু’জনেই ঘেমে নেয়ে একাকার। হঠাৎ ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে ফুয়াদ। ছোঁয়া ও দাঁড়ালো৷ ফুয়াদ চিৎকার করে বলল,
“ আমার পিছনে আসছিস কেন? চলে যা আমার আশেপাশে থেকে। ”
“ কোথায় যাবো?”
এবার আর ছোঁয়ার মায়া ভরা চোখের দিকে না তাকিয়েই বলল,
“ জাহান্নাম থেকে এসেছিস, যে যাওয়ার জায়গা নেই! সেখানেই চলে যা।”
“ বাপ মা মরা মেয়ের যাওয়ার জায়গা থাকে না। আচ্ছা, আমি আমার ব্যবস্থা করে নিবো। আপনি চলে যান৷ আর আপনার সাথে সাথে হাটবো না। ”

ফুয়াদ হাঁটতে শুরু করে, আর ছোঁয়া একবার ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফুটপাতের উপর বসে পড়ে। কি আর করার, যাবেই বা কোথায়?

চলবে….

Protected: বঞ্চনা

0

This content is password protected. To view it please enter your password below:

আংটি পর্ব_১০( শেষ_পর্ব)

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব_১০( শেষ_পর্ব)

পরদিন খুব সকালেই তারা সন্ন্যাসী বাবার উদ্দেশ্য রওয়ানা হলেন।অনেক পথ পেরিয়ে এক গভীর জঙ্গলে গিয়ে দেখলেন একটা গুহার ভেতর একজন সন্ন্যাসী গভীর তপস্যায় মগ্ন।ওদেরকে দেখে চোখ খুলে তাকালেন সন্ন্যাসী বাবা।এসব সাধু সন্ন্যাসীদের অনেক অলৌকিক ক্ষমতা থাকে।যার ফলে তারা অতীত,বর্তমান,ভবিষ্যতের অনেককিছুই আগে থেকেই জানতে পারেন।গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন সন্ন্যাসী বাবা।অরণ্য আর উপমার কাছে এসে বললেনঃ-

-এসো,বিজয় কুমার আর মহুয়া।আমি এতো বছর ধরে তোমাদের অপেক্ষায়ই আছি।

ওরা অবাক হয়ে একে ওপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো।অরণ্য বললোঃ-

-কে বিজয় কুমার?আর কে-ই বা মহুয়া?

-অরণ্য,তুমি আর উপমা চোখ বন্ধ করে এখানে পাশাপাশি বসো।আমি যা বলবো তা তোমাদের চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠবে।আর বাকীরাও মনযোগ দিয়ে আমার বলা কাহিনী শুনো।এতে তোমাদের মনে জমে থাকা অনেক প্রশ্নের উত্তরই পাবে।বলতে শুরু করলেন সন্ন্যাসী বাবাঃ-

বহু বছর পূর্বে বৈজয়ন্তী নগরী নামে এক রাজ্য ছিলো।সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন মহারাজ বিক্রম আদিত্য।উনার একমাত্র পুত্র ছিলো রাজপুত্র বিজয় কুমার।এই পুত্রের জন্মের সময় মহারাণী কঙ্কাবতী মৃত্যুবরণ করেন।প্রিয়তমা স্ত্রীর অকাল মৃত্যুতে মহারাজ খুব মর্মাহত হোন।তিনি আর পুনরায় বিবাহ করেন নি।একমাত্র সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে স্ত্রী বিয়োগের বেদনা ভুলে থাকেন মহারাজ।রাজপুত্র বিজয় কুমার ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো।রূপে,গুনে,বিদ্যাশিক্ষা,অস্ত্রশিক্ষা সব ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শী সে।রাজপুত্রের শৌর্য-বীর্যের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।রাজপুত্রের বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলেই রাজ অভিষেকের মাধ্যমে তাকে রাজ সিংহাসনে বসিয়ে রাজ মুকুট পরানো হবে।তারপর থেকে রাজপুত্র বিজয় কুমারই হবে এই বৈজয়ন্তী নগরীর রাজা।২৫ বছর পূর্ণ হতে তখন আরো কয়েকমাস বাকী।একদিন রাজপুত্র রাজার কাছে আবদার করলোঃ-

-পিতা মশাই,আপনার অনুমতি পেলে আমি এই রাজ্য ছদ্মবেশে ঘুরে দেখতে চাই।দেখতে চাই প্রজাদের কার কি সমস্যা আছে।এতে করে ভবিষ্যতে রাজ্য পরিচালনা করা আমার জন্য সহজ হবে।

-এতো অতি উত্তম প্রস্তাব পুত্র।তুমি ঘুরে এসো তবে।

এরপর পথিক বেশে রাজপুত্র বিজয় কুমার সারা রাজ্য ঘুরে দেখতে লাগলেন।দেখলেন রাজা বিক্রম আদিত্যের রাজ্যে কোথাও কোন দুঃখ-জরা নেই।প্রজারা সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করছে।

ঘুরতে ঘুরতে একদিন রাজপুত্র বিজয় কুমার এক পাহাড়ী এলাকায় গেলেন।সেখানে কিছু গরীব সম্প্রদায়ের বাস।তারা কেউ বা মালির কাজ করে,কেউ ধুপার কাজ,আবার কেউ বা পাহাড়ে জুম চাষ করে।

পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।এমন সময় একটা মিষ্টি সুরেলা মেয়েলি কন্ঠের গান শুনতে পেলেন তিনি।সুরের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে দেখলেন এক ষোড়শী তরুণী গুনগুন করে গান গাইছে।সদ্য স্নান করা তরুণীর পরনে ছাপা প্রিন্টের ডোরা শাড়ী।মাথায় গামছা পেঁচানো আছে।ফুল তুলতে তুলতে আপন মনে গাইছে সে।ছিপছিপে গড়নের,শ্যামলা বরণের সেই মেয়েটিকে প্রথম দেখেই প্রেমে পরে যান রাজপুত্র।মেয়েটি গান শেষে চমকে তাকালে রাজপুত্র ইচ্ছে করে নিজের পরিচয় গোপন করে বললেনঃ-

-আমি এক ক্লান্ত পথিক।বড্ড পিপাসা পেয়েছে।এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবে?

তরুণী টি ছুটে গিয়ে মাটির সানকিতে করে কয়টা নারকেলের মুয়া আর এক গ্লাস জল নিয়ে আসে।

-খালি মুখে জল পান করতে নেই। এগুলো খেয়ে নিন।আপনার বাড়ি কোথায়?

-আমি এক ভীনদেশী।বেরিয়েছে নগর ভ্রমণে।পথে যেতে যেতে ওমন মিষ্টি কন্ঠ আমাকে থামিয়ে দিলো।

এ কথা শুনে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যায় তরুণী টি।এরপর থেকে প্রায়ই এদিকে আসতেন রাজপুত্র সেই তরুণী কে দেখার আশায়।কিন্তু আর তার দেখা মেলে নি।একদিন এক পাথরে ধাক্কা খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে যান রাজপুত্র।আর তখুনি সেই তরুণীটি কোত্থেকে দৌড়ে এসে কিছু বনের লতাপাতা দিয়ে মলম বানিয়ে রক্তাক্ত স্থানে লাগিয়ে দেয়।

ধীরে ধীরে প্রণয়ের সূত্রে বাঁধা পড়েন দুজনে।রাজপুত্র বাঁশি বাজায়।মহুয়া গান শুনায়।রাজপুত্রের চোখের মায়ায় ডুবে থাকে মহুয়া।বড় মায়াকাড়া চোখ দুটি যে বিজয় কুমারের।ওই চোখের মায়ায় পড়ে মহুয়া ভুলে যায় তাদের সমাজ কখনো ভীনদেশী কারো সাথে বিবাহ মেনে নেয় না।এই প্রেমের পরিণতি ভয়াবহ।সর্দার জানতে পারলে প্রাণ নেবে দুজনের। তার ওপর সর্দারের ছেলে রঘুনাথের মহুয়াকে পছন্দ।যদিও মহুয়া ওকে পাত্তা দেয় না।মহুয়া মজে আছে ভীনদেশীর প্রেমে।সুখের দিনগুলো এভাবেই যেতে লাগলো।

কিন্ত কোন সুখই চিরস্থায়ী হয় না।একদিন মহুয়া জানতে পারে তার ভীনদেশী হলো ছদ্মবেশী রাজপুত্র বিজয় কুমার।রাগে,দুঃখে,অপমানে জলে ডুবে মরতে চায় মহুয়া।তখনই রাজপুত্র এসে বাঁচায় মহুয়া কে।

-আমাকে মরতে দিন রাজকুমার।আপনি কখনো এই গরীব মালির মেয়ে কে বিয়ে করবেন না।শুধু শুধু আমার মনটা আমি অপবিত্র করলাম।না আমাদের সর্দার এই বিয়ে মানবেন,না মহারাজ এই বিয়ে মানবেন।

-এটা ঠিক যে আমি আমার মিথ্যা পরিচয় দিয়েছি।কিন্তু আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়।

এসো মহুয়া।বলেই মহুয়া কে হাত ধরে টেনে একটা মন্দিরে নিয়ে যান রাজপুত্র।সেখানে মহুয়ার সীঁথি তে সিঁদুর পরিয়ে ওকে বিয়ে করেন তিনি।তারপর মহুয়ার হাতে একটি আংটি পরিয়ে দেন।যে আংটি তে বি লেখা আছে।
-মহুয়া, এই আংটি আমাদের রাজবংশের চিহ্ন।এই আংটির ইতিহাস হলোঃ-

আমাদের বংশের ওপর কিছু অশুভ আত্মার কুদৃষ্টি পড়ে।আমার পূর্বপুরুষরা অতি অল্প বয়সে মারা যেতেন।তাদের স্ত্রীরা অকাল বিধবা হতেন।এই অভিশাপ ছিলো আমাদের এক পূর্ব পুরুষের কুকর্মের ফল।তিনি বহু নারীর ওপর অত্যাচার করে তাদের মেরে ফেলতেন।এদের মাঝে অনেকেই গর্ভবতী ছিলেন।এদের আত্মার অভিশাপেই এমনটা হতো।ওরা এই রাজবংশ কে নির্বংশ করতে চাইতো।পূর্বপুরুষের পাপের শাস্তি আমরা ভোগ করছি।এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের বংশের এক পূণ্যবতী রাণী কাজলরেখা রাজ পুরোহিতের নির্দেশে সাত দিন সাত রাত উপোস থেকে এক বিশেষ তপস্যা করেন।সেই তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি এক দৈবিক আংটি লাভ করেন।এই আংটিই আমাদের বংশের পুরুষদের বিপদ থেকে বাঁচাবে আর মহিলারা বৈধব্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন।বংশানুক্রমে সব রাজবধুরা এটা পরে আসছেন।আমার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা এটা আমাকে দিয়েছেন আমি যাতে বিয়ের পর আমার স্ত্রী কে এটা দিতে পারি।তুমি এটা যত্নে রেখো।আর কয়মাস পরই আমি রাজা হবো।তখন তো আর কেউ রাজ আদেশ অমান্য করতে পারবে না।তখন তোমাকে আমার রাণী করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবো।

তারপর মহুয়া বাড়ি চলে আসে।দুদিন পর মহুয়া কে এসে এক গুপ্তচর খবর দেয় হুট করে শত্রুপক্ষ এসে রাজ্য আক্রমণ করেছে।অন্যায়ভাবে আক্রমণ করায় রাজবাড়িতে ভয়ানক যুদ্ধ চলছে।অনেক সৈন্য শত্রুপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে।রাজপুত্র বিজয় কুমার তুমুল যুদ্ধ করছেন।মুহূর্তে মহুয়ার আংটির কথা মনে পড়ে যায়।রাজ কুমার কে বাঁচাতে হলে এই আংটি একবার ওর মাথায় ছুঁয়ে দিতে হবে।দিকবিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে ছুটতে থাকে মহুয়া।যে করেই হোক রাজ বাড়িতে তাকে পৌঁছাতে হবে।দৌড়াতে দৌড়াতে মস্ত বড় এক পাথর খন্ডে ধাক্কা খেয়ে পাহাড়ের নীচে গড়িয়ে পড়ে যায় মহুয়া।সেখানে এক সন্ন্যাসী বাবা বসে তপস্যা করছিলেন।তিনি মহুয়াকে বাঁচাতে না পারলেও ওর মুখে সব কথা শুনে ঐ আংটি টা সযত্নে তোলে রাখেন।আর মহুয়ার মৃতদেহ সৎকার শেষে গুহার কাছেই সমাধি দেন।

এদিকে রাজাসহ প্রায় সবাই শত্রুপক্ষপর হাতে নিহত হোন।যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া যদিও বীরের ধর্ম নয়,তবুও শুধুমাত্র মহুয়ার কথা চিন্তা করে রাজপুত্র বিজয় কুমার নিজের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসেন।রাজ্য,পিতা সব হারিয়ে বিজয় কুমার যখন জানতে পারেন মহুয়া গৃহত্যাগী হয়েছে তখন বিজয় কুমার নিজেও মহুয়ার খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ান।এক সময় জঙ্গলে ঐ সন্ন্যাসীর সাথে দেখা হয় বিজয় কুমারের।সন্ন্যাসীর কাছ থেকে সবটা শুনার পর মহুয়ার শোকে পাগল হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে বিজয় কুমার।

আমি হলাম সেই সন্ন্যাসী।আমি জানতাম বিজয় কুমার আর মহুয়া আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।বিয়ে করলেও মিলন হয় নি ওদের।ওদের মনে যে সংসার করার কামনা বাসনা রয়ে গিয়েছে।এই কামনা বাসনার জন্যই বার বার পৃথিবীতে আসতে হয়।

এই ঘটনার কয়েক বছর পর উর্মিলা আর উত্তম সন্তানের আশায় আমার কাছে আসে।মহুয়ার সমাধিতে বেড়ে উঠা ডালিম গাছ থেকে ডালিম ফল খেয়েই জন্ম হয় উপমার।মহুয়ার আত্মাই আছে উপমার মাঝে।সেজন্যই ঐ আংটি আমি উপমাকে দেই।জানতাম এই আংটিই একদিন বিজয় কুমার কে খোঁজে নেবে।মহুয়ার আত্মা উপমার সাথে থাকায়ই উপমা কে বিয়ে করতে চাইলে সবাই কে বাঁধা দেয় অশুভ আত্মারা।বাঁধা না মানলে ক্ষতি করে।যেমনটা ঐ ডাক্তার ছেলেসহ অনেকেরই করেছে।আর তাই তো ঐ আংটিটাও আর কেউ বানাতে পারে না।স্বপ্নে নিষেধ করা হয়।

এমন সময় অরণ্য বলে উঠেঃ-

-আমার সব মনে পড়েছে।আমি মহুয়াকেই স্বপ্নে দেখতাম।আমার মহুয়া।

উপমা বলেঃ-

-আমিও তোমায় চিনতে পেরেছি রাজ কুমার।ঐ চোখ দুটি যে আমার বড্ড চেনা।বলেই দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে।

এতোক্ষণে কথা বললেন অরণ্যের বাবা।

-এর সমাধান কি সন্ন্যাসী ঠাকুর।এই জনমে ওদের বিবাহ কি করে সম্ভব?

-স্বপ্নের কথা ভেবে তোমরা বিচলিত হইও না।এর সমাধান আছে।একজন শতবর্ষীয় পূণ্য আত্মার মৃত্যুতেই সব অশুভ আত্মার বিনাশ হবে।

-কোথায় পাবো সেই পূণ্য আত্মা?আর কে-ই বা নিজের জীবন দেবে।

-সেই আত্মা যে চোখের সামনেই আছে।আমি স্বেচ্ছায় দেহত্যাগ করবো আজ।আমার চিতায় ঐ আংটি পুড়িয়ে দিও।আর আমার সমাধি তে যদি আতাফলের গাছ হয়ে তবে বুঝবে অরণ্য আর উপমার পুত্র সন্তান হবে।আর ডালিম ফলের গাছ হলে বুঝবে কন্যা সন্তান হবে।বিয়ে নির্দিষ্ট তারিখেই হবে।বিয়ের পর উপমাকে যে কোন একটা ফল খাওয়াবে আমার সমাধিতে জন্ম নেওয়া গাছ থেকে।

-আপনি আমাদের জন্য এতো বড় ত্যাগ করবেন সন্ন্যাসী বাবা?

-মা রে,তোরা দুজন বার বার পৃথিবীতে আসবি আর মিলনের অতৃপ্তি নিয়ে চলে যাবি সেটা কি হয়?এবার এর একটা শেষ মীমাংসা হোক।

এরপরই সন্ন্যাসী বাবা দেহত্যাগ করেন।

***************

নির্দিষ্ট তারিখেই বিয়ে হয়ে যায় অরণ্য আর উপমার। নববধূ সেজে বাসরঘরে বসে আছে উপমা।একটু পর বর বেশে অরণ্য রুমে প্রবেশ করলো।টুকটুকে লাল কাতান শাড়ীতে উপমাকে পরীর মতো সুন্দর লাগছে।অরণ্য উপমার হাতে একটা সোনার আংটি পরিয়ে দিলো।সাথে ওর পায়ে একজোড়া নূপুরও দিলো।উপমার কানে কানে বললোঃ-

-আমার জনম জনমের সাথীকে সোনা-রূপা দিয়ে বরণ করে দিলাম।

-তুমি নিজেই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।

-উপমা,একটা বিষয় ভেবে দেখলাম।গত জনমের সাথে এ জনমের কিছু মিল আছে।গত জনমে তুমি মালির মেয়ে ছিলে বলে বোধহয় এ জনমেও তুমি ফুল এতো ভালোবাসো।টব ভর্তি ফুলগাছ লাগিয়েছো।আবার এ জনমেও বিছানাকান্দি বড় এক পাথর খন্ডে ধাক্কা খেয়ে ডুবতে বসেছিলে।আর গানটাও এ জনমেও এতো ভালো গাও।

-হুম।আর তুমি তো এ জনমেও এতো মায়াকাড়া চোখ পেয়েছো।আবার মনটাও সেই রকমই আছে।বার বার পৃথিবীতে আসবো আমরা।শুধু রঙ,রূপ বদলে যাবে।আমাদের ভালোবাসা কিন্তু একই থাকবে।

এক বছর পর অরণ্য আর উপমার একটা পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।সন্ন্যাসী বাবার সমাধিতে জন্ম নেওয়া আতাফলের গাছ থেকে একটা আতাফল খেয়েছিলো উপমা।সবার আদরে বড় হতে থাকে সেই ছেলে।অরণ্য আর উপমার জীবনে আর কোন অশান্তি আসে নি।

#সমাপ্ত

#বিঃদ্রঃ- এই পৃথিবীতে কতো রকম রহস্য লুকিয়ে আছে।তার সবটার সমাধান কি আমরা জানি?অরণ্য আর উপমার গল্প টা ছিলো এরকমই একটা রহস্য গল্প।যেটা আমি আমার কল্পনাশক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি।তাই কেউ এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা চাইবেন না।যারা কষ্ট করে পুরো গল্পটা ধারাবাহিকভাবে পড়েছেন তাদের প্রতি একমুঠো ভালোবাসা রইলো।আমি মাত্র দুদিন আগে এই প্রতিযোগিতার কথা জেনেছি।তাই তাড়াহুড়া করে লিখতে গিয়ে হয়তো অনেক ভুল ত্রুটি রয়ে গেছে।সবাই ধরিয়ে দেবেন।আর গল্পটা কেমন লেগেছে জানালে খুশী হবো।এডমিন ও মডারেটরদের বিশেষ ধন্যবাদ এরকম একটি প্রতিযোগীতার আয়োজন করার জন্য।সকল লেখকদের জন্য শুভকামনা রইলো।

আংটি পর্ব ৯

0

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব ৯

বিয়ের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকী।আজ মঙ্গলবার।ঘোর অমাবস্যার রাত।সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় উর্মিলা দেবীর।উপমা,উপমা বলে চিৎকার করে উঠেন তিনি।পাশ থেকে উনার স্বামী উঠে লাইটের সুইচ অন করলেন।এক গ্লাস পানি খেতে দিলেন স্ত্রী কে।তারপর উপমাকে পাশের রুম থেকে ডেকে নিয়ে আসলেন।উপমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন ওর মা।তারপর কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বললেনঃ-

-উনি স্বপ্নে দেখেছেন এক ভয়ংকর ডাইনী বিশ্রীভাবে হাসছে আর বলছে তোর মেয়ে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই বিধবা হবে আর প্রথম সন্তান প্রসবের সময়ই সন্তানসহ মারা যাবে।তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে দে যদি ওর অমঙ্গল চাস।আর বাঁচতে চাইলে এ বিয়ে বন্ধ কর।আমার কথার অন্যথা হবে না।যারা আমার কথা না শুনেও বিয়েতে এগিয়েছিল প্রত্যেকের কোন না কোন ক্ষতি হয়েছে।তারপরই ওরা বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।তোর মেয়েকে বিয়ে করলে অরণ্যও বাঁচবে না।হাহাহা…….

এ স্বপ্ন দেখার পর তিনি মা হয়ে কি করে মেয়ের বিয়ে দেবেন।উত্তম বাবু এতোদিন কোনকিছু পাত্তা না দিলেও এবার তিনিও ভয় পেয়ে যান।উপমাও পুরো হকচকিয়ে গিয়েছে।ঠিক করা হয় আগামীকাল সকালে অরণ্যের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে সবকিছু জানানো হবে।বাকি রাতটা উপমা বাবা-মায়ের কাছেই থেকে যায়।

পরদিন সকালে অরণ্যের বাবাকে কল দেয়ার আগে উনিই কল করেন।কল করে জানান অরণ্যের মা গতকাল রাতে সেইম স্বপ্ন দেখেছেন।একই সময়টা দুই জায়গায় থাকা দুটো মানুষ কি করে এক স্বপ্ন দেখতে পারে।ব্যাপারটা খুবই রহস্যজনক।এরপর থেকে অরণ্যের মাও ছেলের বিয়ে এখানে করাতে রাজি নন।কিন্তু অরণ্য এই বিষয়টা কিছুতেই মানতে পারছে না।তাই উভয় পরিবার মিলে ঠিক করেন তারা একত্রিত হয়ে একজন ভালো জ্যোতিষিকে দিয়ে উপমা আর অরণ্যের হাত দেখাবেন।

একটা নির্দিষ্ট দিনে একজন জ্যোতিষির কাছে যান তারা।জ্যোতিষি প্রথমে অরণ্যের হাত দেখে বলেনঃ-

-এই ছেলের মৃত্যু খুবই সন্নিকটে।তবে চিরকুমার থাকলে এই মৃত্যু আটকানো যেতে পারে।

উপমার হাত দেখে বলেনঃ-

-এই মেয়ের বৈধব্য যোগ আছে।

এরপর আর কেউ কোন কথা বলেন নি।যে যার বাসায় ফিরে আসেন।ঠিক হয় এই বিয়েটা বাতিল হয়ে যাবে।

দুই বাড়িতে সুনসান নীরবতা।বুকে পাথর চাপা দিয়ে আছে উপমা।ভাগ্যের পরিহাস বুঝি একেই বলে।কতো স্বপ্ন সাজিয়েছিলো দুজন মিলে।দুই পরিবারের আয়োজনের কোন কমতি ছিলো না।সেই স্বপ্ন এক দুঃস্বপ্নে ভেঙে গেলো।অরণ্য একদিন ফোন করে বললোঃ-

-উপমা,অনেক ভেবে দেখলাম জন্ম যখন হয়েছে তখন মৃত্যু তো অনিবার্য।তাই আফসোস রেখে একটা জনম কাটানোর চেয়ে ভালোবেসে মরে যাওয়া ভালো।আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই উপমা।যদি তুমি রাজি থাকো তবে সবার অমতেই বিয়ে করবো আমরা।তাছাড়া কলেজ খুলার পর তো এমনিতেও আমাদের বাসায় থাকা হবে না।

-কিন্তু এটা করা কি ঠিক হবে?

-ভুল থেকে যদি ভালো কিছু হয়,হোক না তবে কিছু কিছু ভুল।আমার স্বপ্ন ভাঙার মরমর শব্দ কি তুমি শুনতে পাও না উপমা?তোমার হৃদয়ে কি এই বেদনার ঢেউ কম্পন তোলে না?

-শান্ত হও অরণ্য।আমি তোমাকে ভেবে জানাবো।

************

একদিন উপমার মা উপমাকে জানালেন আজ অরণ্য ওর বাবা-মাকে নিয়ে আসবে।উনি কিছু জরুরি কথা বলতে ওদের ডেকেছেন।তবে এটা বিয়ের ব্যাপারে নয়।উনারা আসতে সম্মত হয়েছেন।

সবাই একসাথে বসে আছেন।উপমার মা বলা শুরু করলেনঃ-

-বিয়ের দশ বছর পরও আমাদের কোন বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছিলো না।ডাক্তার, কবিরাজ কোনকিছুই বাদ রাখি নি।আমি তখন একটা সন্তানের আশায় প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছি।এমন সময় আমরা স্বপ্নে একজন সন্ন্যাসী বাবার খোঁজ পেলাম।গভীর জঙ্গলে বসে তিনি কঠিন তপস্যায় মগ্ন ছিলেন।আমরা স্বপ্নের নির্দেশমতো একদিন সেই জঙ্গলে গেলাম।সন্ন্যাসী বাবা আমাকে একটি ডালিম ফল খেতে দিলেন।আর বললেন এক বছরের ভেতর আমি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেবো।সাথে তিনি আমাকে একটি আংটি দিয়ে বললেন এই আংটিটা তোর মেয়ে প্রথম ঋতুবতী(প্রথমবার পিরিয়ড শুরু হলে) হবার পর ওর বাঁ হাতের অনামিকায় পরিয়ে দেবে।এই আংটি ওকে সব বিপদ-আপদ থেকে দূরে রাখবে।আর এই আংটিই ওকে ওর সঠিক সঙ্গী খোঁজে দেবে।তবে মনে রাখিস আমার কথা কোনদিন কাউকে বলবি না বিশদভাবে।শুধু বলবে এক সাধু বাবা এই আংটি দিয়েছেন।তবে জীবনে যদি কখনো আবার আমার কাছে আসার খুব প্রয়োজন পরে তবে এই ব্যাপারটা অন্যদের শুনাতে পারিস।

এরপর আমরা বাসায় চলে আসি।এক বছর পর উপমার জন্ম হয়।এগারো বছর বয়সে ও প্রথম ঋতুবতী হয়।তারপর থেকে এই আংটিটা ওর হাতে আছে।এই আংটিটা উপমা ছাড়া আর কেউ কখনো খুলতে পারে নি।এমনকি আমিও না।উপমার কাছে যেদিন শুনলাম অরণ্য এই আংটি খুলতে পেরেছে সেদিন থেকেই অরণ্য কে আমরা উপমার জন্য পছন্দ করে রেখেছি।তারপর সব খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম অরণ্য সবদিক দিয়েই আমাদের উপমার যোগ্য।আমরাও তখন খুব খুশী হলাম।আপনারা বাসায় এসে যখন আমাদের মেয়েটাকে পছন্দ করলেন তখন আমরা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হলাম।

এতোটুকু শুনার পর অরণ্য ওর স্বপ্নে দেখা এই আংটি থেকে শুরু করে একে একে সব কথা সবাই কে বলে।অরণ্যের কথা শুনার পর সবাই মিলে আরো বেশি আশ্চর্য হয়ে যান।কিন্তু কেউই কোন সমাধান দিতে পারেন না।কি আছে ছেলেমেয়ে দুটের ভাগ্যে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।বাবা মা হিসেবে ওদেরই বা কি করণীয়।

কিছুক্ষণ ভাবার পর সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে করেই হোক উপমাদের ঠিক করা বিয়ের তারিখের আগেই ওই সন্ন্যাসীর সাথে দেখা করতে হবে।একমাত্র উনিই এই রহস্যের জট খুলতে পারবেন।কথা হয় আগামীকালই উনারা সেই সন্ন্যাসী বাবার সন্ধানে বের হবেন।তাই আজকের রাতটা উপমাদের বাসায়ই থাকার অনুরোধ করা হয় অরণ্যদেরকে।কিন্তু রাত যেন কিছুতেই কাটছে না।কি দীর্ঘ এই রাত।ঘরে ঘরে প্রতিটা মানুষ জেগে আছেন।একটা নতুন সকালের আশায়।দেখা যাক আগামীকাল সকালের সূর্য কোনো আলোর দিশা দেখাতে পারে কি-না অরণ্য আর উপমার জীবনে।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/963860724044647/