বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 10



সুলেখার প্রেগনেন্সি পর্ব-০২

#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
পর্ব দুই
মাহবুবা বিথী

শরীরটা একটু ভালো লাগাতে সুলেখা রাতেই টিফিন রেডী করে রাখে। ডিনারের পর সুলেখা কিচেনে এসে এয়ারফ্রাই এ ম্যারিনাইড করে রাখা মুরগীর দুটো লেগ পিচ ঢুকিয়ে দেয়। এরপর চুলায় একটা ডিম সিদ্ধ করে নেয়। একটা আপেল ধুয়ে রাখে। লেগপিচটা ফ্রাই হয়ে গেলে সুলেখা টিফিন বক্সটা রেডী করে ফেলে।এমন সময় শাশুড়ী মা কিচেনে চলে আসে। টিফিন বক্সে দুটো লেগপিচ আর ডিম দেখে জিজ্ঞাসা বললেন,
—এগুলো কে কে খাবে?
সুলেখা শাশুড়ী মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
—মা,এগুলো আমার একার খাবার। সাথে আপেল আর কলা ও নিয়ে যাবো।
সুলেখাকে এতো খাবার নিতে করে উনি হা করে একবার খাবারের দিকে একবার সুলেখার দিকে তাকায়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—তুমি এগুলো একাই খাবে?
—জ্বী মা,
সুলেখা বক্সটা ফ্রীজে রেখে নিজের ঘরে চলে আসে।
পানির বোতলটা খালি হওয়াতে আশফাক রুম থেকে বের হয়ে পানি নিতে খাবার ঘরে চলে আসে। ফিল্টার থেকে পানি বোতলে ভরতেই সখিনা বেগমও হাতে খালি গ্লাস নিয়ে চলে আসেন। উনিও ফিল্টার থেকে পানি নিয়ে আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলে,
—আশফাক, একটা কথা তোকে না বলে পারছি না।
আশফাক বোতলের মুখের ছিপিটা লাগিয়ে নিয়ে বলে,
—এতো হ্যাজিটেট করছো কেন? কি বলবে বলে ফেলো।
—মানে,সুলেখা যেভাবে মাছ মাংস ডিম খাচ্ছে এতে পেটের বাচ্চাটা তো দ্রুত অনেক বড় হয়ে যাবে। তখন সিজার করা ছাড়া বাচ্চা হবে না। বরং বাচ্চা ছোটো থাকলে খুব দ্রুত নরমালে হয়ে যাবে। আমি তো ওকে বলতে পারি না তুমি মাছ মাংস কম খাও। তুই বরং ওকে বুঝিয়ে বলিস।
আশফাক মনে মনে একটু বিরক্ত হলো। কিন্তু মায়ের সামনে প্রকাশ করলো না। তবে মাকে খুব শান্তভাবে বলে,
—আমাদের ভাবনা তুমি আমাদের উপর ছেড়ে দাও। তুমি বরং তোমার শরীর স্বাস্থ্য, বাবার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবো। কথাটা বলেই নিজের ঘরে চলে আসে। মা সখিনা বেগম ছেলের কথা শুনে রেগে গেলেন। ঘরে এসে রায়হান সাহেবকে বলেন,
—,ভাবতে অবাক লাগে তোমার ছেলে কিভাবে এতো স্ত্রৈন হলো?
—কেন কি করেছে আমার ছেলে?
—এখানে আসা অবদি দেখছি তোমার ছেলে বৌয়ের হাতে হা আর নাতে না বলছে। কেন তোমার চোখে পড়ছে না?
— এখানে নতুন করে চোখে পড়ার কি হলো? ছোটো বেলা থেকে বাবাকে যা করতে দেখেছে তাই শিখেছে।
সখিনা বেগম আর কথা বাড়ালেন না। শুধু আপন মনে বললেন,
“গরীবের কথা বাসি হলে ফলে।”
আশফাক ঘরে আসতেই সুলেখা বলে,
–মা কি বললো?
—তেমন কিছু না,তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
—আমি কিন্তু মায়ের কথাগুলো শুনেছি।
—,মা তার পুরোনো ধ্যান ধারণা থেকে কথা গুলো বলে। তুমি কিছু মনে করো না।
সুলেখা আপাতত কিছু মনে করেনি। তবে কতদিন মনে না করে সুলেখা থাকতে পারবে ও অনুমান করতে পারছে না।
পরদিন সকালে আবার সুলেখার দৈনন্দিন জীবন শুরু হলো। শ্বশুর শাশুড়ী আর হাসবেন্ডকে নাস্তা দিয়ে নিজে খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। আজ সকাল থেকেই সুলেখার শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না। বসকে বলে একটু আগেই অফিস থেকে বের হয়ে উবার নিয়ে বাসায় চলে আসে। দরজার কাছে ওর ননদ রিস্তার জুতোজোড়া দেখা যাচ্ছে। ডোরবেল বাজাতেই রিস্তা দরজা খুলে দিয়ে বলে,
—বাবা মাকে দেখতে চলে আসলাম।
—ভালো করেছো।
সুলেখার খুব খারাপ লাগছে। শরীরটা আজ ভীষণ দুর্বল লাগছে। ও রিস্তাকে বললো,
—আমি একটু বিছানায় গড়িয়ে আসি। তারপর তোমার সাথে গল্প করবো।
–আমি অবশ্য আর বেশীক্ষণ বসবো না। অর্ণবকে না বলে এসেছি। আসলে বাবা মায়ের তো ফ্রিজের বাসি খাবার খাওয়ার অভ্যাস নেই। সে কারণেই আমি উনাদের জন্য কিছু খাবার রান্না করে এনেছি। তুমি রেস্ট করো। আমি একটু পরেই চলে যাবো।
অগত্যা সুলেখার আর বিছানায় গড়ানো হলো না। যদিও মনে মনে সুলেখা বিরক্ত হলো। কারণ ওর বাসায় মেইন তরকারীটা সুলেখা ছুটির দিনে রান্না করে রাখে। আর কাজের খালা এসে ডাল সবজি ভাত প্রতিদিন রান্না করে দিয়ে যায়। এখানে বাসি খাবার বলতে রিস্তা কি বুঝাতে চাইলো?
পোশাক বদলে শাশুড়ীর রুমে গিয়ে ননদ রিস্তাকে বলে,
—চায়ে কি চিনি দিবো?
রিস্তা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
—তুমি উঠে আসলে কেন? আমি বাসায় গিয়ে চা খাবো। তোমার শরীরটা যেহেতু অসুস্থ তুমি বরং শুয়ে থাকো।
সাথে সাথে সখিনা বেগম মানে সুলেখার শাশুড়ী বলেন,
—সে কি কথা,সুলেখা তো চা বানাবে নিশ্চয় পাহাড় ভাঙ্গবে না? তাহলে এখানে অস্বস্তির কি আছে? তাছাড়া—সুলেখার দিকে তাকিয়ে সখিনা বলেন,
–শরীর বেশী খারাপ হলে চাকরি ছেড়ে দাও।
এমন সময় আশফাক অফিস থেকে ঘরে ফিরে। মায়ের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলে,
–সুলেখা চাকরি না করলে আমার সংসারের চাকাটা ভালোভাবে সচল হবে না। কারণ আমাদের দুজনের চাকরিতেই আমাদের সংসারের চাকাটা সচল হয়। সুতরাং চাকরি ছাড়ার প্রশ্নই আসে না।
যাক সুলেখার কথাগুলো আশফাকের মুখ দিয়ে বের হওয়াতে সুলেখা মনে মনে খুশী হয়। কিচেনে গিয়ে চুলায়
চায়ের পানি চাপিয়ে দেয়। কিচেন থকে সুলেখা শুনতে পারছে,ওর শাশুড়ী মা ননদকে বলছে,
—সুলেখা আবার খাওয়া দাওয়া ভালোই করে। তোর মনে আছে, তুই পানি খেয়ে পানিও বমি করতি। তারপর তোকে হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দেওয়া হলো। ঐ অবস্থায় সংসারের সব কাজ তোকে করতে হতো।
এমনসময় রায়হান সাহেব বলেন,
—,কি বলছো তুমি? সে সময় আমি আর তুমি গিয়ে রিস্তার বাসায় চারমাস থেকে আসি। ও তো বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। শ্বশুর অসুস্থ থাকার কারণে শাশুড়ী আসতে পারলো না। অগত্যা তুমি আর আমি গিয়ে চারমাস থেকে আসি। তুমিই তো সব কাজ করেছো। সেদিক থেকে সুলেখা অবশ্য নিজের মতো করে সামলে নিচ্ছে।
রিস্তার মনে হয় বাবার বলা সত্যি কথাগুলো ভালো লাগছিলো না। সে কারণে একটু গম্ভীর হয়ে বলে,
—তুমি তো দুপুরে খাবার পর ঘুমালে না?
—প্রতিদিন তো ঘুমাই।
সখিনা বেগম ঝাঁমট মেরে বলেন,
—ঘুমাবে কেন? তা না হলে বেফাঁস কথা কে বলবে?
রায়হান সাহেব স্ত্রীর রাগের কারণটা বুঝতে না পেরে বলেন,
—আমি আবার কখন বেফাঁস কথা বললাম।
এমনসময় সুলেখা চা আর পাকোড়া ভেজে আনে। শ্বশুরের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বলে,
–বাবা পাকোড়াটা নিয়ে নেন।
এরপর শাশুড়ীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দেয়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সখিনা বেগম বলেন,
—বৌমা, কাল থেকে কি কি রাঁধতে হবে আমাকে বলে যেও। তোমার শ্বশুরের মনে হয় আমার বসে খাওয়াটা সহ্য হচ্ছে না।
—আমি আবার সে কথা কখন বললাম?
রিস্তা পাকোড়াতে কামড় দিয়ে বলে,
–একটু আগেই তো বললে। আমার প্রেগনেন্সির পিরিয়ডে মাকে নাকি বাসার সব কাজ করতে হয়েছে। ভাবির এখানে মাকে তেমন কিছু করতে হয় না। ভাবি কি ভাববে বলতো? মাকে কি আমার বাসায় শুধু কাজ করাতে নিয়ে গিয়েছি?
সুলেখা সবই বোঝে। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বলে,
—সন্তানের বিপদে তো বাবা মা পাশে থাকবেন। এটাই তো স্বাভাবিক।তোমার ঐ অবস্থায় মা তোমাকে কাজে সাহায্য করবেন এটা তো খুবই নরমাল ব্যাপার। তুমি আবার কষ্ট পাচ্ছো কেন? আর আমি কিছুই মনে করিনি।
তাছাড়া পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সংসার তার নিজের মতো চলে। এই যেমন আমার সংসারে প্রতিদিন ভাত ডাল সবজিটা টাটকা রান্না হয়। শুধু মাছ বা মাংসের মেইন কারীটা আমি ছুটির দিন রান্না করে রাখি। তুমি বলছিলে না, বাবাকে আমাদের বাসায় বাসি খায় কথাটা আসলে সঠিক নয়। সেখানে তথ্যগত ভুল রয়েছে।

চলবে

সুলেখার প্রেগনেন্সি পর্ব-০১

#সুলেখার_প্রেগনেন্সি
প্রথম পর্ব
মাহবুবা বিথী

সকাল বেলা উঠে সুলেখা কিচেনে গিয়ে দুটো ডিম সিদ্ধ বসিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসে চেয়ারে বসে ফজরের নামাজ পড়ে নেয়। প্রেগনেন্ট হওয়ার পর থেকেই মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে। ফজরের সময় ঘুম ভাঙ্গতে চায় না। যারফলে সকালে নামাজটা পড়ে নিতে হয়ে। এর মাঝে আশফাককে ডেকে দেয় সুলেখা। ওকে জুস বানাতে বলে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে দুটো ডিম দুই পিচ ব্রেড এক গ্লাস জুস আর একগ্লাস মিল্কসেক খেয়ে ও অফিসে যায়। গতকাল শাশুড়ী আর শ্বশুর আব্বা কুমিল্লা থেকে এসেছেন। প্রেগনেন্সির এই সময়টাতে সুলেখাকে সাহায্য করার জন্য তাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য। সে কারণে সুলেখা ওর নাস্তার পাশাপাশি শ্বশুর শাশুড়ী আর আশফাকের জন্য ফ্রোজেন পরোটা সেঁকে টেবিলে দিয়ে দেয়। সাথে ডিমভাজি আর কলা তারপর আশফাক চা তৈরী করে টেবিলে দেয়। রায়হান সাহেব আর উনার স্ত্রী সখিনা বেগম এসে টেবিলে বসেন। সুলেখা তখন একটা সিদ্ধ ডিম শেষ করেছে। আর একটা হাতে নিতেই শাশুড়ী মা সখিনা বেগম বলেন,
–তোমার বেশ খাওয়ার রুচি আছে তো? আমি বাবা পানিও খেতে পারতাম না। পানি খেলেও বমি করে দিতাম। তবে আপেল কমলা বেদানা খেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ীর সামনে কি করে সব নিজের প্লেটে তুলে নেই বলো? আমি আবার খুব লাজুক ছিলাম।
সুলেখা আশফাকের দিকে তাকায়। শাশুড়ী মায়ের কথার খোঁচাটা ভালোই বুঝতে পারে। সাথে সাথে আশফাক বলে,
—আম্মু সুলেখার না খেলে তো চলবে না। ওকে এই অবস্থায় অফিস সামলাতে হচ্ছে আবার ঘরে এসে রান্না করতে হয়। শরীরটা তো ফিট রাখতে হবে। বেচারা সারাদিন শোয়ার সময় পায় না।
বৌয়ের দিকে ঝোল টেনে কথা বলাতে সখিনা বেগম মনে মনে বলেন,
“বউ চাকরি একখান করে বলে ছেলে আমার ফুটানি কম দেখায় না।” তবে উনিও ছাড়বার পাত্রী নন।
সখিনা বেগম গলায় কাঠিন্য ভাব এনে বলেন,
—তাতো ঠিক। তাও ভালো অফিসের এসি রুমে বসে সখিনা কাজ করে। রোদে তেঁতে পুড়ে কিছু করতে হয় না। তোদের পেটে নিয়ে সেই কোন ভোরে উঠে আগে মাটির চুলা লেপে ঠিকঠাক করে রাখতাম। তারপর এঁটো বাসন কল তলায় নিয়ে মাঝাধোয়া সারতে হতো। এরপর চুলো জ্বালিয়ে তোর দাদা দাদী ফজরের নামাজ পড়ে চায়ের জন্য বসে থাকতো। চা আর মুড়ি জলপান সহ তাদের রুমে দিয়ে এসে চুলায় আঠার পানি চাপিয়ে দিতাম। এরপর সবজি কুটে চুলায় বসিয়ে দিয়ে ঐ ভরা পেট নিয়ে পিড়ে বেলুনে রুটি বেলতে হতো। এখনকার মত ফ্রোজেন রুটির সময় কাল আমাদের আমলে ছিলো না। এরপর তো আমার পোয়াতী হওয়ার খবর শুনে আমাকে দেখতে আত্মীয় স্বজন আসতো। তাদের আদর আপ্যায়ন আমাকেই করতে হতো। পরিবারের বড় বউ হওয়াতে তোর চাচা ফুফুদের দেখভালের দায়িত্ব আমার উপর এসে পড়ে। সে এক কঠিন জীবন পার করেছি।
সুলেখা তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে উঠে পড়ে। এরপর না জানি আরো কত কঠিন জীবনের ইতিহাস শুনতে হবে কে জানে?
সুলেখার উঠার ভাব দেখে সখিনা বেগম বলেন,
—আশফাক তোমাকে কত সাহায্য করে। এই যেমন জুস বানিয়ে দিলো। আমার কি আর সেই কপাল ছিলো? তোমার শ্বশুর আমাকে শ্বশুর শাশুড়ীর কাছে রেখে নিজে তার কর্মস্থলে চলে যেত। সপ্তাহে ছুটির দিনগুলোতে আসতো। আমার খেদমত কি করবে উল্টো তার খেদমত আমাকে করতে হতো।
শ্বশুর উুসখুস করে বলেন,
—তোমার শাড়িকাপড়, বিছানার চাদরগুলোতো আমি পুকুরে নিয়ে ধুয়ে দিতাম।
শাশুড়ী ফোঁস করে বলেন,
–ওতো কালেভদ্রে,সেটা আবার তুমি মুখ তুলে বলছো?
আশফাকও উঠে পড়ে। না জানি এরপর বাবা মায়ের খুনসুটি শুরু হয়। সুলেখার দিকে তাকিয়ে আশফাক বলে,
—চলো,তোমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো।
সুলেখা হাফ ছেড়ে বাঁচে। অফিসে যাওয়ার সময় শাশুড়ী মাকে বলে,
—মা ফ্রীজে রান্না করা তরকারী বক্সে করে রাখা আছে। মাছমাংস সবই আছে। যেটা খেতে মন চায় সেটা বের করে ওভেনে গরম করে নিয়েন। আর মিনারা খালা এসে ডাল ভাত সবজি করবে। আপনাকে কিছু করতে হবে না।
সাথে সাথে সখিনা বেগম বলেন,
—আমাদের দুই বুড়াবুড়িকে নিয়ে তুমি এতো ভেবো না। খাই তো পাখির আঁধার। সে একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বরং সাবধানে অফিসে যাও।
গাড়িতে উঠে সুলেখা সীট বেলটা বেঁধে নেয়। ড্রাইভিং সীটে আশফাক বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। সুলেখা আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলে,
—মা তার অভিজ্ঞতার লেকচার ভালোই দিলেন।
আশফাক জানে সুলেখার এগুলো পছন্দ নয়। তারপরও বলে,
—কি করবে বলো? উনার জীবনের কিছু ট্রমার কথা শেয়ার করলেন।
সুলেখা আর কিছু বলে না। রাস্তায় ভালোই জ্যাম লেগেছে। কি জানি কোনো ভি আইপি যাচ্ছে কিনা কে জানে? যাক এক ঘন্টার মধ্যে ও অফিসে পৌঁছে যায়।
অফিসে থাকাকালিন সময়ে সুলেখা দুইবার ফোন করে শ্বশুর শাশুড়ীর খবর নেন। আজ সুলেখার শরীরটা ভালো লাগছে না। বসকে বলে ছুটি নিয়ে একটা উবার ডেকে বাসায় চলে আসে। ডোর বেল বাজাতে মিনারা খালা মুখটা বাংলার পাঁচ বানিয়ে দরজা খুলে দেয়। সুলেখা ঠিক বুঝতে পারে শাশুড়ী মায়ের সাথে নিশ্চয় কোনো ঝামেলা হয়েছে। মিনারা খাল ওয়াশরুমে ঢুকে জোরে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। মিনারা খালার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে সুলেখার শতভাগ নিশ্চিত ঘরে নিশৃচয় একটা গোলমাল পেকেছে। নিজের রুমে এসে বিছানায় বসতেই শাশুড়ী মা এসে বলেন,
—তোমার মিনারা খালার গায়ে আজ যেন বিঁচুটি পাতা লেগেছে।
—,কেন কি হয়েছে মা?
—কি আর হবে? মেশিনে কাপড় ধুতে দিয়েছিলো। ধোয়া শেষ হলে আমি ওকে বললাম,”আমার কাপড়গুলো তুমি আবার একটু তিন খলা দিয়ে দাও। ওখানে ভালো মতো খলানো হয় কিনা কে জানে।” আর বলো না বেটির যে কি গজগজ শুরু হলো, বাধ্য হয়ে তোমার শ্বশুর বললো,
—এতো বকর বকর করার দরকার নাই। না পোষালে কাজ ছেড়ে দাও।
সাথে সাথে সুলেখার মাথা গরম হয়ে যায়। আজ তিনবছর ধরে ট্রেনিং দিয়ে মিনারা খালাকে ও তৈরী করেছে। এখন চলে গেলে ভারী মুশকিল হয়ে যাবে। সুলেখা বিছানা থেকে উঠে ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে কিচেনে যায়। মিনারা খালা তখন চুলার ধারগুলো মুছতে ছিলো। টাকাটা মিনারা খালার হাতের মুঠোয় ঢুকিয়ে দিয়ে বলে,
—খালা, আজ তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে তাই না? এই টাকাটা দিয়ে কিছু পান সুপাড়ী কিনে খেও।
সাথে সাথে মিনারা বেগমের মুখ খুশীতে ঝলমল করে উঠে। ভাত না পেলেও সমস্যা নাই কিন্তু পান ছাড়া চলবে না। এছাড়া মিনারা বেগম খুশী করার আর কোনো পলিসি সুলেখার জানা নেই।
সুলেখার আজ বেশ খিদে লেগেছে। ফ্রিজ থেকে বড় একটা মাছের পিচ বের করে ওভেনে গরম করে বিয়ে খেতে বসে। শাশুড়ী এসে ওর প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—প্রেগনেন্সি সময়ে বেশী খেলে বাচ্চা জন্মের পর শুধু খেতে চায়। তাছাড়া বাচ্চা বেশী বড় হয়ে গেলে নরমালে হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নরমালে বাচ্চা হলে মায়ের সাথে বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
এমনিতেই সুলেখার মাথা ধরে আছে তার উপর শাশুড়ী মায়ের এসব কথা বার্তায় মাথার দুপাশের শিরাগুলো দপদপ করতে থাকে। মাথাটা চক্কর মেরে উঠলো। সাথে সাথে শরীরটা গুলিয়ে উঠাতে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিনের উপর সুলেখা বমি করে ফেললো। বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলে,এবার যদি শাশুড়ী একটু খুশী হন। আর বকবকটা দয়া করে যদি একটু বন্ধ করেন।

চলবে

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৯ এবং শেষ পর্ব

#ইরাবতীর_চুপকথা
#অন্তিমপর্ব
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

ইরার মোবাইলে একটা ফোন আসছে কিন্তু ইরার হাত বন্ধ তাই দোলা ফোনটা রিসিভ করে,আগামী সপ্তাহে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান আছে,অফিস থেকে ইরাকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।
দোলা ফোন রেখে ইরার কাছে যায়,মেয়েটা এখন পুরোদস্তুর চাকরিজীবী হয়ে গেছে,
আগে থেকে তাকে সব জানানো হয়,বাড়িতে লোক এসে ওর সাথে বসে সব লিখে নিয়ে যায়।
কিন্তু মোবাইলটা ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারে না,যেখানে সেখানে ফেলে রাখে।

দোলা ইরাকে বলে,”এই যে ম্যাডাম আপনার অফিস থেকে কল এসেছে,হাতের কাজ হয়ে গেলে ফোন করতে বলেছে,তুই তো দিন দিন ভি আই পি হয়ে যাচ্ছিস,কদিন পর আমাকে চিনতে পারবি তো?
ইরা দোলার মুখে সবটা শুনে হেসে ফেলে।
দোলা অবশ্য কথাটা ভুল বলেনি,ওর কথায় আজকাল খাবারের মেন্যু ঠিক হয়।পরে অফিসে কথা বলা যাবে কারণ আজ একটা বিশেষ দিন।

শুভ দুই হাত ভর্তি করে বাজার করে নিয়ে এসেছে,আজ ইরার বাড়িতে একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে। তাই ইরা খুব ব্যস্ত।
বাজার দেখে দোলা সেগুলো গোছাতে বসে যায়।
আজ এই বাড়িতে দিয়া দিদির সাধের রান্না করা হচ্ছে।
ইরা আর দোলা মিলে দিদিকে সাধ খাওয়াবে।

ইরা এখান থেকেই সব রান্না করে নিয়ে যাবে দিদির বাড়ি।ওর খুব শখ নিজে সব করবে দিদি অবশ্য বলেছিলো তার ফ্ল্যাটে সবকিছু করতে কিন্তু ইরা মানেনি,ও চেয়েছিলো নিজেই বাজার হাট করবে,দিদির বাড়ি হলে সেটা পারতো না তাই এই ব্যবস্থা।
এখন বেশি লোকের আয়োজন করতে ইরার একটুও ভয় লাগে না তবে আজ শুধু তাদের জন্য রান্না করবে।

প্রথম দিন রান্নার জায়গায় যাওয়ার আগে ইরা খুব ভয় পেয়েছিলো।প্রথম কাজ তাই হাজারটা প্রশ্ন হাজারো আশংকা।
সেদিন শুভ ওকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু ইরা সব দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলো এতো বড় রান্নার জায়গা। সব ওর ফর্দ মতো হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা।আবার ওকে সাহায্য করার জন্য আরও কিছু লোক।

ইরার শশুরের ধানের ব্যবসা ছিলো,প্রতি বছর নতুন ধান গোলায় তোলার পর একদিন একটা ভোজের আয়োজন করতো,বাড়ির উঠানে সামিয়ানা টাঙানো হতো।
আর বাড়ির পেছনে হতো রান্নার আয়োজন বড় বড় হাড়িতে।
ইরা সেখানে তদারকি করতো আর নিজেও কয়েকটা পদ রান্না করতো সেই অভিজ্ঞতা এখানেও কাজে লেগেছিলো।
এখন ইরার রান্নার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ দিয়ার নতুন ক্যাটারিং এর কাজ দিন দিন বেরেই যাচ্ছে।

ইরা এখন খুব ব্যস্ত থাকে,বাচ্চাদের আনা নেয়া টাও ঠিকমতো করতে পারে না তাই দোলাই ভরষা।
দোলা দুই বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়েছে,দিশা আর বাবাইকে সে বেশি সময় দেখে রাখে।
এই নিয়ে দোলার কোনো খারাপ লাগা নেই,একজন এগিয়ে গেলে আরেক জনকে তো পেছন থেকে সাহায্য করতেই হয়।

দিয়ার নয় মাস পরে গেছে,যে কোনো দিন কিছু হতে পারে,ইরা আর দোলা ওকে দেখেশুনে রাখে।কিন্তু এখন আরও একজন খোঁজা হচ্ছে যে সারাক্ষণ দিয়ার পাশে থাকবে।
নতুন অতিথির দেখাশোনা করবে।

ইরা এই কয়মাসে খেয়াল করেছে দিয়ার বাড়িতে অফিসের কয়েকজন আর দু একজন বন্ধু বান্ধব ছাড়া আত্মীয় স্বজনরা কেউ আসে না।
যদিও রায়ান দাদা স্ত্রীর খুব খেয়াল রাখে তবুও নিজের কেউ কেন আসে না।
একদিন খুব আগ্রহ নিয়ে দোলাকে জিজ্ঞেস করেছিলো,
“দিদির বাড়ি থেকে কেউ আসেনা কেন?শশুর বাড়িরও কেউ নেই নাকি?

দোলা একটু মলিন হাসে,এই শহরে তার আর ইরার মতো সর্বহারা মানুষ যেমন আছে তেমন দিয়া দিদির মতো সব থেকেও নেই মানুষের সংখ্যাও কম না।

“দিয়া আর রায়ান দুজনেই সমবয়সী ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো কিন্তু তাদের দুই পরিবারের কেউ তা মেনে নেয়নি তাদের নাকি জাতের মিল নেই।
রায়ানের বাবা অনেক বড়লোক কিছু টাকা দিয়ে ছেলেকে আলাদা করে দেয়।
দিয়া দিদি এই শহরে আলাদা করেই নিজের সংসার সাজায়,নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে”

দিয়ার জন্য ইরার খুব কষ্ট হয় যে মানুষটা তাকে একটা নতুন পরিচয় দিয়েছে সেই মানুষটার জীবন এতোটা নিস্প্রভ।
তাই হয়তো সে দোলা ইরার মতো মেয়েদেরকেই আপন করে নেয় তাদের সাথেই সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়।

তখন থেকেই ইরার মনে হচ্ছিলো এই কথাটা একদিন সাহস করে দিদিকে বলেও দিয়েছিলো,”দিদি তোমাকে সাধ খাওয়াতে চাই”

দিয়া হেসে বলে তুই তো আমাকে প্রতিদিন ভালো ভালো রান্না করে দিচ্ছিস,আমার আর আলাদা কিছু খাওয়ার সাধ নেই।
ইরা তখন দিয়াকে বলে,এভাবে না দিদি একটু আলাদাভাবে।
মনের অনেক ইচ্ছাকে লুকিয়ে রেখেছে দিয়া কিন্তু কিছু কিছু স্বপ্ন পূরণ করার লোভ হয়।
তাই ইরাকে না বলতে পারেনা।

বাবাই হওয়ার সময় মা যেভাবে ইরার জন্য সব আয়োজন করেছিলো ইরা আজ সেভাবেই সব করবে।
ইরা দিদির জন্য অনেক কিছু করেছে,কাল থেকেই একটু একটু করে গুছিয়েছে।

দিদির টক খাবার খুব একটা পছন্দ না তাই “আমের মিষ্টি টক” করেছে,এটাও মায়ের কাছ থেকে শেখা।

কাঁচা আম আর টমেটো আগে অল্প লবণ আর হলুদ দিয়ে ভাপিয়ে নরম করে নেয়।
তারপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে খেজুর আর কিসমিস একটু উল্টো পাল্টে তুলে নেয় তারপর সেই তেলে শুকনা মরিচ আর সরষে ফোড়ন দিয়ে টমেটোটা দিয়ে দেয়,একটু বলক উঠে এলে পরিমান মতো চিনি দেয়।

ঘন হয়ে এলে একটা ঘরে বানানো আচারের মসলা আর খেজুর কিসমিসগুলো দিয়ে দেয়।কড়াই থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে রাখে।
কাল রাতে চাটনি করে রেখেছে আজ অন্য কাজ করবে।

ভোর বেলা উঠে স্নান সেরে আগে চুলায় দুধ বসায়,শুভকে দিয়ে আগেই খেজুরের গুড় আনিয়ে রেখেছে সেই গুড় একপাশে জ্বাল করতে দেয়।
গুড়ের গন্ধে মিশে আছে ইরার শৈশব।

পৌষ মাসের শুরুতেই গ্রামের শীত জাকিয়ে বসতো, সকালে হিম পরতো,ঘাসের উপর চিকচিক করতো,একটু বেলা হয়ে এলে রোদের দেখা মিলতো।প্রায় সব বাড়ির সামনে মৌসুমী সবজির চাষ,হালকা চাদর গেয়ে বাড়ির সামনে বাচ্চাদের হল্লা চলতো,
তার মধ্যেই ঝোলা গুড় আর খেজুরের রস নিয়ে আসতো গাছিরা।
বাবা ওদের কাছ থেকে এক কলসি গুড় রেখে দিতেন।

ইরার বাবার খুব প্রিয় ছিলো গুড়ের পায়েস,তাই মা খুব যত্ন করে বানাতো সেই পায়েসটা। আগের দিন সন্ধ্যায় দুধের মালসা চুলায় বসাতো।
অগ্রহায়ণের নতুন আতপ চাল বেশ কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে একটু কচলে আধভাঙ্গা করে ঘন দুধে দিয়ে দিতো।
চাল সিদ্ধ হয়ে এলে মালসা চুলা থেকে নামিয়ে এর মধ্যে ঝোলা গুড় দিয়ে হালকা হাতে নাড়া দিতো।
তারপর ঢাকনা দিয়ে দিতো পরদিন সকালে পায়েসের উপর একটা মোটা সর পরে থাকতো, সকালে গরম গরম লুচি ভাজতো আর সবার জন্য একবাটি পায়েস বাড়া হতো,উপরে ঘন সর পরা গুড়ের পায়েস, দেখলেই মনটা ভরে যায়।

ইরা দুধটা ঘন হয়ে এলে কালোজিরা চালটা একটু আধভাঙ্গা করে দিয়ে দেয়,কয়েকটা তেজপাতা ছিরে দেয় সেই দুধে।
চুলার আঁচ একটু বারিয়ে চাল সিদ্ধ করে নেয় তারপর আবার কমিয়ে দেয় ঘন হওয়ার জন্য,একফাঁকে অল্প একটু চিনি দেয়।
হাড়িটা চুলা থেকে নামিয়ে গুড়ের সিরাটা ঠান্ডা করে গরম দুধে দিয়ে দেয়।

আজ শুভ ইলিশ মাছ,রুই মাছ,চিংড়ি মাছ আর কিছু ছোট মাছ এনেছে।
মুরগি টা আগেই এনে রেখেছিলো।
ইরা আগে থেকেই ভেবে রেখেছে তাই কাজ করতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না।
যেহেতু ছুটির দিন তাই সবাই ঘরে আছে,ইরা সকালের জল খাবার করে মুল রান্নায় চলে যায়।
মাংসটা কিছু মসলা দিয়ে মেখে আলাদা করে রেখেছে,এরই মধ্যে
ডালের বড়া দিয়ে শুক্তো করেছে,আর চিংড়ি মাছ দিয়ে ভাপা করেছে, ছোট মাছের ঝাল চচ্চড়ি করেছে।
দোলা পাশে বসে মসলা কেটে বেটে দিচ্ছে।
রুই মাছটা দিয়ে একটু অন্য রকম কিছু করবে।
প্রথমে চুলায় একটা কড়াই বসিয়েছে রুই মাছের মাথা ভেজে নেয়ার জন্য
মাছের মাথা দিয়ে “মুড়িঘণ্ট” করবে।
মুরগির মাংস খুব ভালো করে কসিয়ে একটা চুলায় বসিয়ে রেখেছে। বেশি ঝোল হবে না তাই একটু সময় নিয়ে জ্বাল করবে।

ইলিশ মাছ দেখে ইরার অনেক কিছু মনে পরে যায়।
পদ্মা পাড়ের মেয়ে ইরা,ইলিশ মাছের সাথে তার গভীর সম্পর্ক।

হাটবারে হাট বসতো বট গাছ তলায়,সব আরতদার মাছ নিয়ে শহরে চলে যাবে তাই গ্রামে আগে অল্প মাছ রাখতো।
বাবা সেই হাট থেকে রুপালি ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন প্রায় সন্ধ্যায়।
সেই মাছ দেখে বাড়িতে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যেতো।
বাড়িতে মানুষ অনেক আর বর্ষার প্রথম ইলিশ তার স্বাদ সবাই নিতে চায়।
মা মাছটা কেটে ধুয়ে অল্প লবণ হলুদ আর একটু তেল মাখিয়ে রাখতো।
রাতের ভাতেও বসিয়ে দিতো তাড়াতাড়ি আজ একটু বেশি ভাত লাগবে।

কড়াইয়ে অল্প সরিষার তেল দিয়ে মাছগুলো ছেড়ে দিতো,মাছ ভাজার গন্ধ সারা বাড়ি ঘুরে বেরাতো
অন্যান্য দিন রাতে ঢুলু ঢুলু চোখে ভাত খেতে বসলে দুধ আর চিনি চাম্পা কলা দিয়ে ভাত মেখে মা খাইয়ে দিতো কিন্তু মাছ ভাজার গন্ধে ইরার ঘুম নিমেষেই গায়েব হয়ে যায়।
গরম গরম মাছের সাথে কিছুটা তেল, আর পেঁয়াজের বেরেস্তা।আহ্ মুখে পরতেই শান্তি।

পরে অবশ্য দিনের বেলাতেও ইলিশ কিনতেন তবে সেটা দিয়ে হতো অন্য পদ।
আজ ইরা সেরকমই একটা কিছু করবে।

দিদির লাউ শাক খুব পছন্দ তাই এই ভাবনা।
ইলিশ মাছের পেটির টুকরো গুলো কিছুটা হলুদ, লবণ আর মরিচের গুড়ো দিয়ে মেখে রাখে।
সরিষা আর কাচা মরিচ একসাথে বেটে নেয় তার মধ্যে কিছুটা কাচা সরিষার তেল দিয়ে মাছগুলো দিয়ে দেয়, লাউ পাতা ভালোভাবে লবণ জল দিয়ে ভিজিয়ে রেখে ধুয়ে নেয় তারপর সেই পাতা সমান করে বিছিয়ে একটা একটা মাছ রেখে মুড়িয়ে নেই।
কড়াইয়ে একটু তেল দিয়ে মোড়ানো পাতাটা একটু ভেজে আবার অল্প একটু জল ছিটা দিয়ে ঢেকে দেয়।
ঢাকা দিয়েই মাছটা রান্না হয়ে যাবে।
হয়ে গেলো “লাউ পাতায় ইলিশ পাতুরি”

মুড়িঘণ্ট টা যেহেতু চাল দিয়ে করবে তাই পোলাও এর চালটাও একটু হলুদ লবণ দিয়ে ভেজে নেয়,তারপর মসলা দিয়ে ভালোভাবে কসিয়ে ঝরঝরে মুড়িঘণ্ট করে নেয়।

রুই মাছ টা দিয়ে “টক ঝাল মাছ”
করেছে।
এটা শুভর জন্য ইরা করে,শুভ যদিও ইরার হাতের সব কিছু পছন্দ করে তবুও এটা একটু বেশি ভালোবাসে।

এবার ভাজা গুলো করে নিলেই রান্না শেষ,মিষ্টি কুমড়া,আলু,বেগুন, আর মাছ এই ভাজাগুলোই থাকবে।
সাধের অনুষ্ঠানে মাছ খুব শুভ মানা হয় তাই ইরা মাছের কয়েকটা পদ করেছে।

ইরা অবাক হয়ে দেখে এই রান্নাঘরে এতো রকম রান্না আর কোনোদিন হয়নি।তার টানাপোড়েনের সংসারে সে এটা সেটা মিলিয়ে রান্না করেছে এতোদিন,কোনো রকমে দিন পার করেছে।
আজ সেই ঘরে সুদিন ফিরেছে দিয়া দিদির জন্য।
দিদির কথায় ইরা নিজের নামে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে,প্রথম মাসে অফিস থেকে যে টাকাটা আসে তা দেখে শুভর চক্ষু চড়কগাছ।
শুধুমাত্র রান্না করে এতো টাকা পাওয়া যাবে এটা ওদের কল্পনাতীত।

কিন্তু ইরা নিজেকে একটুও বদলায়নি দিদির প্রতি তার সম্মান আর ভালোবাসা একই রকম আছে।
দিয়া ইরার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে,ইরার রান্নার কৌশলকে সবার সামনে তুলে এনেছে,নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ করে দিয়েছে তাই দিয়ার স্থান ইরার জীবনে অনেক ওপরে।

ইরা ভাবনা থেকে ফিরে আসে।
কয়েকটা পটল সামনে পরে আছে, পটল গুলো মনে হয় ইরার দিকে চেয়ে আছে বলছে,আমাদের একটা ব্যবস্থা করো।
ইরা মুচকি হাসে, হ্যা সত্যিই তো পটল গুলোর একটা গতি করতে হবে।
কয়েকটা পটল মাঝ বরাবর কেটে একটু ভাপিয়ে নেয়।
এইফাঁকে ইরা কয়েকটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে কুড়িয়ে নেয়,তারপর কড়াইয়ে পেঁয়াজ,রসুন আর কাচা মরিচ কুচি হালকা ভেজে নেয় একটু সোনালী হয়ে এলে আলু কুচিটা দিয়ে দেয়।
হলুদ, লবণ আর মরিচের গুড়ো দিয়ে একটু ভাজে তারপর একটু জল দিয়ে ঢেকে দেয় যতক্ষণ পর্যন্ত আলুটা একটু নরম হয় ততক্ষণ।
অন্য একটা কড়াইয়ে ডিম ঝুড়ি ভাজি করে নেয়,আলু নরম হয়ে গেলে এর মধ্যে ডিমটা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেয়, হয়ে গেল ভেতরের পুর।
এবার পটলের ভেতরের শাস টা ফেলে দিয়ে এর মধ্যে পুরটা ভরে দেয়।
চালের গুড়ার মধ্যে কিছু মসলা দিয়ে একটা পিঠালি করে নেয় তারপর পুর ভরা পটলগুলো দিয়ে মচমচে করে ভেজে নেয়।
হয়ে যায় মুচমুচে “পুর ভরা পটল”

দোলা অন্য বড়াগুলো করছে ইরা একটু হাতমুখ ধোয়ার জন্য নিজের ঘরে যায়।
বাবাই আর দিশা স্নান করে তৈরি হয়ে নিয়েছে ওরাও যাবে আজ মায়ের সাথে।
হঠাৎ দরজায় শব্দ এই সময় আবার কে এলো?
শুভ দরজা খুলে অবাক হয়ে যায়,দিয়া আর রায়ান দাড়িয়ে আছে।
দিয়া বলে,”সামনে থেকে সরে যা-ও আমাকে বসতে বলবে না”?

শুভ ওদের ঘরে নিয়ে আসে ঠিকই কিন্তু কোথায় বসতে বলবে বুঝতে পারছে না, তাদের এই দুই কামরার বাড়িতে আলাদা কোনো বসার ঘর নেই।
সে তাদের ইরার ঘরেই নিয়ে আসে।

দিয়াকে দেখে বাকিরাও অবাক হয়,ইরা বলে ওঠে,”আমরা তো এখনই তোমার বাড়ি যেতাম তুমি কেন কষ্ট করে এসেছ”?

দিয়া বলে,”আমার জন্যই এতো আয়োজন করেছিস আর আমি আসবো না?তোরা তো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ তোদের বাড়িতে আসতে আমার কোনো কষ্ট হয়নি”
ইরার চোখ ভিজে আসে।
দিদি সত্যিই সবার চেয়ে আলাদা,ইরা দিয়াকে বসতে বলে ভাতটা বসিয়ে দেয়।
ভেতর থেকে ইরার ডাক আসে,দোলা ওকে বলে,”তুই যা এতোটুকু আমি দেখে নিচ্ছি”
ইরা ঘরে যায়।
রায়ান দাদা শুভর সাথে কি সব কথা বলছে ইরা বুঝতে পারছে না।
সে দিদিকে ইশারায় জিজ্ঞেস করে, দিদি বলে,”শুভকে চাকরিটা ছেড়ে দিতে বলছে,আমার বেবি হয়ে গেলে
তুই একা সব দেখতে পারবি না তাই শুভ যেনো অফিসিয়ালি তোর পাশে থাকে তাই বলছে”
ইরা শুভর মুখের দিকে তাকায়,
ইরা কখনই শুভর উপর কিছু বলেনা,তাই এই বিষয়েও কিছু বলছে না।
শুভ আস্তে করে বলে,”আমি ইরা আর আপনাদের সাথে সব সময় আছি,আমাকে আলাদা কিছু দিতে হবে না”

রায়ান বলে উঠে,”আমি ব্যবসায়ী মানুষ এমনিতে কিছু করিনা,তোমাকে কিছুদিনের মধ্যেই জয়েন করতে হবে”

কথাটা শুনে সবাই একসাথে হেসে ফেলে।

দিয়া আজ খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছে,নিজের বাড়িতে টেবিল চেয়ারে বসে খেয়ে অভ্যস্ত হলেও আজ নিচে আসন পেতে বসে খাওয়ার স্মৃতি ওর জীবনের একটা সেরা মুহূর্ত হয়ে থেকে যাবে।
দিয়া ভেজা চোখে দেখে কতো সুন্দর আয়োজন করা হয়েছে শুধুমাত্র তার জন্য।এতো সুন্দর সাজিয়ে পরিবেশন করেছে ইরা আর দোলা দেখলেই মন ভরে যায়।
মা হওয়ার আগে এই অনুষ্ঠানটা সব মেয়ের জন্যই করা হয় নিজের পরিবার না হয়েও ইরা আর দোলা যা করেছে তা দেখে দিয়া কিছুতেই নিজের চোখকে বাধা দিতে পারছে না।

ইরা, দোলা, দিয়াদের চোখের জলে পূর্ণতা পায় আজকের সাধের অনুষ্ঠান।
তিনটা পরিবার তিনটা গল্প কিন্তু আজ একসাথে মিলে এক হয়ে গেছে।

এভাবেই ইরাবতী এগিয়ে যায় তার নিজ গুণে,নিজের যোগ্যতায়।

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৮

#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৮
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

ভোরের আলো এসে ইরার মুখে পরছে,অন্যান্য দিনের মতোই আজকের সকাল হচ্ছে, কিন্তু ইরাবতী নামের মেয়েটার জীবনে আজ এক নতুন সকাল।
প্রত্যন্ত গ্রামের সল্প শিক্ষিত মেয়েটা আজ একটা চাকরির সুযাগ পেয়েছে।
সংসারের অভাব দূর করতে যে মেয়েটা রাধুনির কাজ শুরু করেছিলো সেই পরিচয় আজ নতুন দিগন্ত ছুতে চলেছে।

ইরা প্রতিদিনই ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নেয় তারপর বাবাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করে, শুভর সকালের খাবার করে দিয়ে কাজে যায়।
আজকেও তার ব্যতিক্রম করছে না তবে শুভ আজ তার সাথে দিয়ার বাড়ি যাবে।বাবাই আর দিশা দোলার সাথে স্কুলে বেরিয়ে যায়।
শুভ ইরার হাত ধরে বলে,তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে ইরা,যদি কাজের যায়গায় কোনো অসুবিধা অনুভব করো তাহলে এক মুহুর্ত না ভেবে চলে আসবে,আমি একটু কষ্ট করে হলেও চালিয়ে নেবো,তুমি কিন্তু বেশি চিন্তা করতে যেয়ো না।

ইরা মুচকি হেসে বলে,তা আর বলতে,দেখে যদি মনে হয় পারবো তবেই শুরু করবো নাহলে দিদির বাড়ির কাজ করেই চলে আসব।

আমার এতো চাহিদা নেই,তোমাকে আর বাবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারলেই আমি খুশি।

দিয়ার বক্সগুলো খালি নিয়ে যেতে ইরার খারাপ লাগছে তাই গত কালের রান্না করা ছোট মাছ চচ্চড়ি টা নিয়ে নেয়,
এতো বড় বক্স ভরে দেয়ার সামর্থ্য ইরার নেই তাই যতটুকু আছে ততটুকুই নিয়ে যায়।

কলিং বেলের শব্দ শুনে দিয়া দরজা খুলে দেয়।
ইরার পাশে একজন যে শুভ এটা বুঝতে দিয়ার বেশি সময় লাগে না।
শুভকে বসার ঘরে বসতে বলে দিয়া ভেতরে চলে যায়।
ইরা এসে সকালের খাবার করলেও দিয়া একটু চা বসায় দুজনের জন্য।
শুভ এসেছে বলে চায়ের জলটা বাড়িয়ে দেয়।
ইরা দিয়ার হাত থেকে কাপ টা নিতে চাইলে দিয়া বলে,
একদম না।
“এখন তুই আমার রান্নার লোক হিসেবে আসিস নি আমরা আগে তোর সাথে মিটিং করবো তারপর তুই রান্নাঘরের কাজে আসবি”

দিয়ার কথা শুনে ইরা ফিক করে হেসে ফেলে।
মানুষ টা এতো মজার কথা বলে যে না হেসে পারা যায় না।

কিন্তু রায়ান দাদাকে দেখে সে সত্যিই অবাক হয়।
অফিসের পোষাক পরে ঘর থেকে বেরিয়েছে।
ইরাকে ডেকে বললো,”আগে তোমার সাথে মিটিং শেষ করে আমি কাজে যাবো তাড়াতাড়ি বসার ঘরে এসো”

দিয়া কাপে চা ঢেলে আর কিছু হালকা খাবার সাজিয়ে নিয়ে বসার ঘরে আসে।
ইরা লক্ষ্য করে চার কাপ চা আছে সেখানে।
এতো কিছু সে কল্পনাও করেনি।

রায়ান দাদাই কথা শুরু করে,

“আমাদের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে,
সেখানে খাবারের ব্যবস্থা থাকে।আমাদের পরিচিত কিছু রান্নার লোক আছে যারা আলাদা ভাবেও অন্যের সাথে কাজ করে।
কিন্তু আমরা চাচ্ছি নিজেদের আলাদা ক্যাটারিং সার্ভিস চালু করতে যেখানে আমাদের নিজস্ব রান্নার লোক থাকবে আর ইরা সব কিছুর তদারকি করবে। প্রধান দায়িত্বে থাকবে ওর নিজের আইডিয়া আর রেসিপিগুলো ব্যবহার করে আমাদের পাশে থাকবে।
এর জন্য তাকে মাস শেষে একটা বেতন আর প্রতিটি ইভেন্টের লাভের হিসেবে কিছু টাকা দেয়া হবে।

আগে দিয়া এই দিকটা দেখতো কিন্তু এখন একটু অসুস্থ আর পরেও বেশ কিছুদিন বাইরে কাজ করতে পারবে না তাই ও বাড়ি থেকেই সব দেখবে।
ইরা ও এখান থেকেই ওর সাথে কাজ করবে।

তবে যেদিন অনুষ্ঠান থাকবে সেদিন রান্নার যায়গায় যেতে হবে।
চাইলে শুভও যেতে পারে,আমাদের গাড়ি ওর যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। তবে একটা শর্ত ইরা আগামী এক বছর শুধু আমাদের সাথেই কাজ করবে।তারপর ও যদি চায় নিজের মতো আলাদা কিছু করতে পারবে”

রায়ানের কথাগুলো শুভ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো,একেই হয়তো বলে পারফেক্ট প্রেজেন্টেশন।
কোনো ফাক ফোকড় নেই, সবটাই স্পষ্ট।
আর সবচেয়ে বেশি যেটা স্বস্তির সেটা হলো দিয়ার সাথে এই বাড়িতেই সব মিটিং বা আলাপ আলোচনা হবে।
ইরাকে একা কোথাও যেতে হবে না।
শুভ আড়ালে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
ইরা মনে হয় এই পরীক্ষায় উৎরে যেতে পারবে।

ইরা চুপচাপ বসে শুনলো দাদার কথাগুলো এই বাড়ি থেকেই যদি হয় তাহলে ওর কোনো অসুবিধা হবে না দিদি তো পাশে থাকবে।
কিন্তু শুভ যা বলবে সেটাই হবে,শুভর উপর ইরার অগাধ আস্হা।

“ইরা যদি নিজের রান্নায় সবার মন জয় করে নিতে পারে তাহলে তো খুবই ভালো এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু ওর জন্য যদি কোনো ক্ষতি হয় সেটা আমার খুব খারাপ লাগবে তাই আপনারা সব সময় ওর পাশে থাকবেন,ওকে কাজ টা শিখিয়ে দিবেন এতোটুকুই চাই”

শুভর উত্তর শুনে দিয়ার মুখে হাসি ফুটে ওঠে,ইরা জীবনে একজন সত্যিকারের জীবন সঙ্গী পেয়েছে।
এমন মানুষ পাশে থাকলে কেউ পিছিয়ে থাকে না।

রায়ান শুভর হাত ধরে ওকে আস্বস্ত করে।

চায়ের কাপ শেষ করে ইরা উঠে যায়, এবার মিটিং শেষ আমার কাজের সময় শুরু হয়ে গেছে,আমি যতই অন্য কাজ করি না কেন এই বাড়ির রান্নার কাজ সবার আগে শেষ করবো।
ইরা ভেররের দিকে চলে যায়,রায়ান শুভর সাথে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে।
একটা মাস্টার্স পাশ করা ছেলে ছোট একটা চাকরি করে সংসার চালাচ্ছে, ছেলেটার ভদ্র মার্জিত নম্র স্বভাব সহজেই মানুষের কাছে ওকে আলাদা করে দেয়।
রায়ানের শুভকে ভালো লাগে।
ঘড়িতে সময় প্রায় দশটা,রান্নার কাজ শেষ করে ইরা দিয়ার সাথে বসবে।
অনুষ্ঠানের আর মাত্র চারদিন বাকি,অন্যেরা বাকি কাজ দেখছে তারা দুজন রান্নার দিকটা দেখবে।
টেবিলের উপর ছোট বাটি দেখে দিয়া অবাক হয়।

ইরাকে জিজ্ঞেস করায় বলে,
কাল রাতে একটু ছোট মাছের চচ্চড়ি করেছিলাম তাই তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।

দিয়া একটু মুখে দিয়েই বলে আজ অন্য কিছু করতে হবে না আমি এটা দিয়েই খাবো।
ইরা হেসে বলে ঠিক আছে।

রাতের জন্য কিছু করে দিচ্ছি,
দিদির বাড়ির বাজার করে দিয়ে যায় অফিসের একটা ছেলে ইরা একটা কাগজে আগের দিন সব লিখে রেখে যায় সেই মতোই বাজার আসে।
আজকে রান্নাঘরে কাঁঠাল দেখে ইরা খুশি হয়।
একদিন দিদি গল্প করতে করতে বলেছিলো তার নাকি কাঁঠালের তরকারি খেতে ইচ্ছে করছে,অনেক আগে দিদির মা রান্না করে খাইয়েছিলো।
গর্ভবতী মেয়েদের সব খাওয়ার ইচ্ছে পূরণ করতে হয় কথাটা ইরার মাথায় ঘুরছিলো তখন থেকেই তাই কাল বাজারের ফর্দে কাঁচা কাঁঠাল লিখে রেখেছিলো।
তবে ছেলেটা বুদ্ধি করে কেটে রাখা প্যাকেট নিয়ে এসেছে,দোলা বলেছিলো শহরে নাকি
সব সবজি কেটে বিক্রি করে আজ ইরা নিজের চোখে দেখলো।
ইরার হাতে বেশি সময় নেই তাই মনে মনে সব গুছিয়ে নেয়।

এক চুলায় কিছু ছোট আলু সিদ্ধ বসিয়ে দেয়,অন্যদিকে কাঁঠালগুলো ভালোভাবে ধুয়ে একটু তেল আর অল্প লবণ হলুদ দিয়ে ভাপিয়ে নেয়।
নিশ্চিন্তপুরে ইরাদের বাড়িতে দুইটা কাঁঠালের গাছ ছিলো।
বাড়ির উঠানে ছিলো একটা আর ঘরের পেছনে ছিলো একটা,মা বলতো উঠানের গাছটা ইরার ঠাকুমার হাতে লাগানো।
তার খুব গাছ পোতার নেশা ছিলো এই বাড়ির বেশির ভাগ গাছ তার হাতে লাগানো।
কাঁঠাল গাছের মুচি আসার পর থেকেই খাওয়া শুরু হয়ে যেতো।
মুচি হলো একদম ছোট ছোট কাঁঠাল,একটু টক স্বাদ ঝাল লবণ দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে জামার কোচড় ভর্তি করে বড়ই নিয়ে আসতো ইরা আর চম্পা।
তারপর সেগুলো একটা হামান দিস্তায় নিয়ে কিছুটা লবণ, মরিচ আর কাঠালের মুচি দিয়ে ভর্তা করে নিতো।
মাঝে মাঝে মাও বলতো আমাকে একটু দিস,
বৈশাখ মাসে কাঁঠাল একটু বড় হলে সেটা দিয়ে নিরামিষ তরকারি হতো, কোনোদিন ডালের বড়া দিয়ে তো কোনোদিন সরিষা বাটা দিয়ে।
মাঝে মাঝে কুচোচিংড়ি দিয়েও রান্না করতো।
মায়ের হাতের সেই স্বাদ ইরার হাতে আসে না,কিন্তু তারপরও সে করতে চায়।
নাহলে হয়তো এই রান্নাগুলো হারিয়ে যাবে।

আলু সিদ্ধ হয়ে গেছে,দিয়ার হাত খালি ফোন দেখছে তাই ইরা দিদিকে বলে, একটু আলুগুলো খোসা ছাড়িয়ে দাও।
আমি ডালের বড়া করবো।
দিয়া বাচ্চাদের মতো বলে,আমাকে কয়েকটা বড়া দিস আমার খুব ভালো লাগে।
ইরা হাসি মুখে রান্নাঘরে ঢুকে যায়,
ইরার মা অবশ্য অন্য ডাল দিয়ে বড়া করতো কিন্তু ইরা মুসুরের ডাল দিয়ে কয়েকটা ছোট ছোট বড়া করে নেয়।
কাঁঠাল ভাপ দেয়া হয়ে গেছে,এবার মুল রান্না।

আলুগুলো আগে একটু হলুদ লবণ দিয়ে ভেজে নেয় তারপর সেই কড়াইয়ে আবার খানিকটা তেল দিয়ে তাতে জিরা,গরম মসলা,তেজপাতা, ফোড়ন দেয়।আদা আর জিরা বাটা দিয়ে একটু কসিয়ে নেয় অন্যদিকে
একটা বাটিতে কিছুটা হলুদ মরিচ আর ধনের গুড়ো কিছুটা গরম জল দিয়ে মিশিয়ে একটা পেস্ট বানিয়ে নেয় তারপর সেটা কড়াইয়ে দিয়ে অল্প আঁচে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কসাতে থাকে।
মসলা কসানো হয়ে গেলে কাঁঠাল আর আলুগুলো দিয়ে একটু নাড়িয়ে নেয়।
তারপর প্রয়োজন মতো গরম জল আর লবণ দিয়ে একটু ঢেকে দেয়।
ঝোল ফুটে উঠলে ডালের বড়া আর কিছু কাচা মরিচ দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে রাখে একফাঁকে একটু চিনি দিয়ে দেয়।
ঘী আর গরম মসলা দিয়ে চুলা বন্ধ করে ঢেকে রাখে।
আর কিছু করতে হবে কি-না ভাবতে ভাবতে ফ্রিজ খুলে।

ফ্রিজে ডাল রান্না করা আছে আর কয়েকটা বেগুন আছে।
রায়ান দাদা বেগুন খুব পছন্দ করে তাই ইরা একটু “ডিম বেগুন পোড়া”করবে বলে ভাবে।
সময় প্রায় বারোটা বাজছে বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হবে,কিন্তু কাজতো শেষ হয়নি?
দিয়া বাইরে থেকে ইরাকে ডাকে।

“বাচ্চাদের নিয়ে এখানেই চলে আয়,একটা বাবুর্চি আসবে কিছুক্ষণ পর তোর সাথে কথা বলতে
রান্নাটা তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নে”
এমন সময় কলিং বেল,দোলা এসেছে, ইরা দৌড়ে গিয়ে ওকে বলে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে চলে আয়।
দোলা কিছু না বলে বেরিয়ে যায় ও ইরাকে খুব ভালো ভাবে বোঝে ইরার চোখের ভাষা ওর খুব চেনা তাই অনেক না বলা কথাই ও বুঝে যায়।

একটা বেগুনের গায়ে অল্প একটু সরষের তেল মাখিয়ে পুড়ে নেয় ইরা, অন্য চুলায় একটা কড়াইয়ে অল্প তেল দিয়ে একটা ডিম ঝুড়ি ভাজি করে।
তারপর সেই কড়াইয়ে কিছুটা সরষের তেল দিয়ে পেঁয়াজ আর কাচা মরিচ কুচি হালকা করে ভেজে নেয় তারপর পুড়ে রাখা বেগুন খোসা ছাড়িয়ে কড়াইয়ে দিয়ে দেয় সাথে ঝুড়ি করে রাখা ডিমগুলো।অল্প একটু লবণ আর কিছুটা ধনে পাতা দিয়ে নামিয়ে নেয়।
গরম ভাতের সাথে খুব ভালো লাগে “ডিম বেগুন পোড়া”
ইরা রান্নাঘর পরিস্কার করে বেরিয়ে দেখে বাবাই আর দিশা চলে এসেছে।
দোলার আজ অন্য বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই তাই সে একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছে।
দিয়া স্নান করে একটা সুন্দর সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে।
ইরার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলে গেস্ট রুম থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে এটা পরে নে,
বাইরের লোকের সামনে সব সময় নিজেকে গুছিয়ে রাখতে হবে।
এখন থেকে এটা যেহেতু তোর অন্য কাজের যায়গা তাই নিজেকে একটু সাজিয়ে রাখবি।
ইরা লজ্জা পেয়ে যায়,
সত্যিই তো তার একটুও খেয়াল নেই।
তার শাড়িতে তেল মসলার দাগ লেগে আছে এভাবে কি কারো সামনে যাওয়া যায়?
সে দিদির দেয়া শাড়িটা নিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়।
দিয়া বাচ্চাদের কিছু ফল খেতে দেয়,আর রান্নাঘরে ঢুকে রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দেয়।
দোলা বসার ঘর মুছে শোয়ার ঘরের দিকে তাকায় একটা গোলাপী রঙের শাড়ি পরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরা,কে বলবে এই মেয়েটা দোলার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
ইরাকে খুব সুন্দর লাগছে, একটা হাত খোপা আর একটা লাল টিপ এতেই অসামান্য লাগছে মেয়েটাকে।

বাবাইও মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার মা’কে,মা এমন শাড়ি আগে পরতো কিন্তু এখন আর পরে না মাকে খুব ভালো লাগছে।
কলিং বেলের শব্দ শুনে সবাই হুরমুড়ি করে উঠে, দিয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে ওদের বসার ঘরে বসতে বল,
আমি আসছি।
দোলা দরজা খুলে দিয়ে ওদের ঘরে বসায়।
দিয়ার খুব খিদে পেয়েছিলো তাই একটা বাটিতে অল্প তরকারি নিয়ে খেয়েছে। বাচ্চাগুলোর সামনে খায়নি ওদের যদি খারাপ লাগে তাই।

দিয়া একটা ফাইল আর ইরাকে সাথে নিয়ে বসার ঘরে যায়।

দোলাকে ডেকে বলে,বাচ্চাদের জন্য ভাত রান্না হয়ে গেছে ওদের একটু ফ্রেশ করিয়ে খেতে দিবি আর গেস্ট রুমে থাকবি ওদের নিয়ে।

ইরা দিয়ার পাশের সোফায় বসে,
সেদিন যারা এসেছিলো তাদের মধ্যে দুজন আছে আর একজন নতুন
দিয়া সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।সুমন ইরাকে সাহায্য করবে রান্নার কাজে আর আদি সব বাজার সদাইয়ের দায়িত্বে থাকবে।
শোভা ফিনানশিয়াল ব্যাপারটা দেখছে, সব দেখে অফিসে বিল দিতে হবে তার।

এবার ওরা লিস্ট মিলিয়ে একটা মোটামুটি রান্নার ধারণা করে নেয়।

যেহেতু মেন্যুটা ইরার করা তাই সে রান্নাটা মুখে বুঝিয়ে দিচ্ছে সুমনকে।
এই যেমন ,সবজির মধ্যে ছোট করে মুরগির মাংস দেয়া হবে,সাদা পোলাও এর সাথে বুটের ডাল এর মধ্যে কিমা করে খাসির মাংস দেয়া যায়।

বড় টুকরার মাছ ভাজার পরিবর্তে রুই বা কাতলা মাছের পেটির টুকরো কাটা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করে ডিম আর কিছু মসলার একটা ব্যাটারে চুবিয়ে মুচমুচে ভাজা করা যায়।
চিকেন ফ্রাই টা একদম শেষে গরম গরম ভাজা হবে।
অনুষ্ঠান যেহেতু রাতে তাই পায়েসটা সবার আগে করে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।
যেহেতু বাচ্চা থাকবে তাই ঝালের দিকে একটু নজর দিতে হবে আরও অনেক হিসেব নিকেশ আরও কিছু রান্নার টিপস।

সুমন ইরার বলা কথাগুলো মাথায় রাখলেও কাগজে কলমে লিখে নেয়।
রান্নার উপর দুই বছরের কোর্স করে
গত ছয় বছর ধরে একটা হোটেলে রান্না করে।সে এখন এই কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে কিন্তু তার এর অনেককিছুই জানা নেই।
অথচ এই মহিলা কি অবলীলায় সব বলে দিচ্ছে।
কতো টা অভিজ্ঞতা থাকলে এভাবে করা যায় এটাই ঘুরছে সুমনের মাথায়।

আদি একটা বড় লিস্ট করে নেয় আজ থেকেই বাজার শুরু করতে হবে।
কিছু জিনিস ফোনে অর্ডার দেওয়া আছে এবার শুধু মিলিয়ে নিতে হবে।
সে এখানে দুই বছর ধরে আছে এসব কাজে সে দক্ষ।
শোভা মুটামুটি একটা এমাউন্ট ঠিক করে অফিসে নিয়ে যায়।
সবাই চলে গেছে,বেলা এখন প্রায় দুইটা।
ইরা এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে,সে কি সত্যিই জীবনের প্রথম মিটিংটা শেষ করেছে।
কিন্তু কেউ তো তাকে নিয়ে হাসেনি বা তার মতের উপর আঙুল তোলে নি,তারপরও বুকটা ধুকধুক করছে।

বেলা প্রায় দুইটা,দোলা পাশের ঘরে বসে সব শুনছিলো,ইরা সত্যিই সবার থেকে আলাদা।
সব জায়গায় নিজের যোগ্যতার প্রমান দিয়েই ছাড়ে।
বাচ্চারা খেয়ে নিয়েছে,বারান্দায় বসে খেলছে।
ইরা জলদি শাড়িটা পালটে নিয়ে দিয়াকে বলে,আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে তুমি খেয়ে নিও,আমরা এখন আসি।
সত্যিই তাই ইরার রান্না করা একবাটি তরকারি খেয়ে দিয়ার পেট একটু ভরলেও মন ভরেনি।সে রায়ানের জন্য অপেক্ষা না করেই খেতে বসে যায়।
ইরার জন্য অবশ্য কিছুটা বাটিতে করে দিয়ে দেয়।

মেয়েটা তার স্বপ্নের নৌকায় একটু হাওয়ার মতো হয়ে এসেছে।

স্বামী স্ত্রী মিলে যে ব্যাবসা টা শুরু করেছিলো আস্তে আস্তে সেটা বড় হয়ে উঠছে।
ইরার উপর তার আস্থা আছে তাই এতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দুইবার ভাবেনি।
মেয়েটাও যদি একটা নতুন পরিচয় খুঁজে পায় তাহলে তো সে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে।

শুভ বাড়ি ফেরে বিকাল পাঁচটায়, অন্যান্য দিন বাবাই দুই একবার ঘর বারান্দা করে বাবার ফেরার অপেক্ষায়।
আজ ইরা এই কাজ করছে,শুভকে সব না বলা পর্যন্ত ইরার মনে শান্তি হবে না।
ইরা আজ একটা বিশেষ খাবার রান্না করবে।এর জন্য দোলাকে দিয়ে দুধ আর কিসমিস কিনিয়েছে।

বাড়িতে যখনই ভালো কিছু হতো মা এই খাবারটা রান্না করতো,মা বলতো এটা ইরার ঠাকুমার কাছ থেকে শেখা।বাবার খুব প্রিয় ছিলো হাতে বানানো “চসীর পায়েস”।

তখনকার সময় বিনোদন বলতে একটা সাদা কালো টিভিতে বিটিভি দেখা।
পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দিনের বেশির ভাগ সময়ই থাকতো না,ইরার মা সেই সময়টা বসে পিড়ির উপর চসী বানাতো।
চুলায় দুধ জ্বালে বসানো থাকতো দুধ ঘন হয়ে উপরে মোটা লাল সর পরে যেতো চিনি বা গুড় দিয়ে বানাতো মা। ও বানাতে চাইলেই হাত দিতে দিতোনা মা বলতো সব এক মাপের না হলে দেখতে ভালো লাগে না।

ইরা তখন বুঝতো না খাবারের স্বাদের সাথে দেখার কি সম্পর্ক?
কিন্তু এখন সে অনেক কিছুই জানে বোঝে।
শুভ বাড়ি ফিরে এসেছে,ইরার মুখে সব শোনার জন্য সে নিজেও খুব উদগ্রীব।
ইরা শুভকে সব বলে মন থেকে একটা শান্তি পায়।

একটা হাড়িতে বেশ কিছুটা দুধ জ্বাল করতে বসায়।
দুধে বলক এলে চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়,কয়েকটা এলাচি আর দুটো তেজপাতা আর কিসমিস দিয়ে দেয়।
এবার এটা ঘন্টা খানেকের জন্য কম আঁচে জ্বাল হবে।

অন্য চুলায় একটা পরিস্কার কড়াইয়ে কিছুটা লবণ দিয়ে জল গরম করে নেয়।
তারপর কিছুটা আটা এর মধ্যে দিয়ে নারিয়ে একটা খামির বানিয়ে নেয়।
একটু গরম থাকা অবস্থায় ময়াম দিয়ে রুটি বানানোর মতো ডো মেখে নেয়।কিছুক্ষণ নরম ভিজে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাচ্চারা নিয়মমাফিক পড়তে বসেছে ইরা আর দোলা একটু টিভির সামনে বসেছে।

সেই আটার ডো থেকে হাতের তালুর সাহায্যে ছোট ছোট চসী বানিয়ে নেয়।
একটা একটা চসী যেন আলাদা থাকে তার জন্য উপর থেকে একটু আটা ছড়িয়ে দেয়।
সবগুলো বানানো হয়ে গেলে ইরা চুলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দুধটা জাল হয়ে ঘন হয়ে এসেছে,দুধের ওপর একটা মোটা সর পরে আছে, ইরা এবার সব চসী এর মধ্যে দিয়ে চুলার আচ বাড়িয়ে দেয় এরপর স্বাদমতো চিনি দেয়।
বেশি সময় জ্বাল করতে হয় না,দুই একটা বলক উঠে গেলে চুলা নিভিয়ে দেয়, হয়ে গেছে “চসীর পায়েস”

রাতে আর বেশি কিছু করবে না একটু বুটের ডাল আর লুচি ভেজে নেবে।
আজকের দিনটাকে একটু অন্যরকম করে রাখার চেষ্টা।
বাবাই এর মধ্যে একবার একটু টেস্ট করে গেছে।
ওর এই অভ্যাস টা একদম ইরার মতো ছোট বেলায় মা যখন ভালো কিছু করতো ও নানা বাহানা করে রান্নাঘরের আসে পাশে ঘুর ঘুর করতো আর চেখে দেখার জন্য উশখুশ করতো সেই মায়ের ছেলে তো মায়ের মতোই হবে।
ইরা মনে মনে হাসে।
ওর সামনে আরও বড় পরীক্ষা আছে, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে তাকে।
চলবে,,,,

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৭

#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৭
কলমে – প্রমা মজুমদার

দিয়া রান্নাঘরের দিকে যায়,ইরা একপাশে দাড়ানো ছিলো, দিয়া ওকে জড়িয়ে ধরে,
“তুই সত্যিই জিনিয়াস।
আজকে তোর আরেকটা পরীক্ষা আছে।দেখি পাশ করতে পারিস কিনা!”

দিদির কথার মাথামুণ্ডু ইরা কিছুই বুঝলো না।শুধু দেখলো দিদি ওর রান্না করা বিরিয়ানি টা প্লেটে সুন্দর করে সাজিয়ে বসার ঘরে নিয়ে যাচ্ছে।
দিদির মনে হয় মাথার ঠিক নেই এতো গণ্যমান্য অতিথিদের কেউ এই রান্না দেয়?
দিয়া প্লেটটা টেবিলের উপর রেখে বলে,”একটু টেস্ট করে দেখতে পারেন যদি পছন্দ হয় তাহলে এই শেফেকেই রান্নার দায়িত্ব দিব”

ভদ্রমহিলা আগে প্লেট টা তুলে নেয়,
দেখতে বিরিয়ানির মতো হলেও স্বাদটা বেশ অন্যরকম, তেল মসলার পরিমিত ব্যবহার আর সাথে সুন্দর গন্ধ।
আর স্বাদেও দারুণ,বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে তিনি খেয়েছেন কিন্তু এমন খাবার খাওয়া হয়নি।
তিনি তার স্বামীকে চোখে ইশারা করেন নেয়ার জন্য।
তার চোখ মুখেও একই অভিব্যক্তি।
এবার ফলাফলের পালা,দিয়া ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,
“আমার মেয়ের জন্মদিনে এই আইটেমটাও চাই, আর আপনাদের এই শেফকেই কাজটা দেবেন।”

দিয়া একটা চওড়া হাসি এনে বলে,অবশ্যই।

বেলা প্রায় দুইটা বাজতে চললো,দিয়ার বাড়িতে বিরিয়ানির হাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি অবস্থা।
কেউ বলছে আমি আর একটু নেবো তো কেউ বলছে আমার কম পরেছে।
সব দোষ ইরার এতো ভালো রান্না কেউ করে?
কিন্তু ইরার মন উশখুশ করছে, বাড়িতে হয়তো সবাই না খেয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে সে দিদিকে খুজছে তাকে বলেই বেড়িয়ে যাবে।
কিন্তু দিয়া কোথায়?

যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পার্টনারের সঙ্গে আলোচনা করা ব্যাবসার নিয়ম।
দিয়া তাই রায়ানের সাথে দরজা বন্ধ করে কথা বলছে,দিয়ার মনের সঙ্গে যদি রায়ান একমত হয় তাহলেই একটা নতুন কিছু হবে।
দিয়ার বিচক্ষণতার উপর রায়ানের বিশ্বাস আছে আর ইরার গুণের উপর ভরষা তাই রায়ানের সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগলো না, সবটা শুনে হ্যা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

দিয়া নিশ্চিত মনে ইরার সামনে এসে দাঁড়ায়।
“ইরা তুই কি আমাদের সাথে কাজ করবি?”
ইরা অবাক হয় এই কথা শুনে,সে বলে, “আমি তো তোমার সাথেই আছি দিদি”

“এভাবে না কাগজে কলমে আমার অফিসের একজন হয়ে,আমাদের ক্যাটারিং এর হেড হিসেবে তোকে আমার চাই।
আমার কাছে দুজন শেফ আছে কিন্তু তারা তোর মতো গুণী না।ওরা রান্না সম্পর্কে পড়াশোনা করে হাতে কলমে শিখে কাজ করছে কিন্তু তুই এই কাজটা ভালোবেসে করিস এটা সম্পর্কে তোর আগাধ জ্ঞান আছে।

রান্নায় কেউ তোর ধারে কাছে আসতে পারবে না।
আমি চাই তুই আমার অফিসে কাজ করবি,অন্য সবার মতোই মাথা উঁচু করে বাঁচবি।
সপ্তর্ষির মায়ের পরিচয় একজন রাধুনি বা কাজের লোক না একজন অসাধারণ রাধুনি বা শেফ”

কথাগুলো শুনে ইরার গায়ে কাঁটা দেয়,কি বলছে দিদি এসব?

সে তো বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি,শুধু কাজ চালানোর মতো জ্ঞান ওর আছে,আর নিত্য নতুন রান্নার কিছুই সে জানেনা।
মায়ের কাছ থেকে পুরোনো দিনের কিছু রান্না শিখেছিলো আর বিয়ের পর বাড়িতে কয়েকজন ছিলো তাদের কাছে কিছু শিখেছে।

রান্না করতে সে ভালোবাসে তাই এটা শিখতেও সে পছন্দ করে কিন্তু তাই বলে হেড শেফ এটা কীভাবে সম্ভব।

ইরা বলে,”তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দিদি আমি তেমন কিছু পারিনা,তুমি যেহেতু বলছো তোমার অফিসের জন্য রান্না করতে সেটা আমি এমনিতেই করে দেব।
তোমার চিন্তা নেই এর জন্য আমাকে আলাদা চাকরি দিতে হবে না”

কিন্তু দিয়া নাছোড়বান্দা।

“তুই যা পারিস আজকাল অনেকেই তা পারে না,নতুন ধরনের রান্নার জন্য আমার লোক আছে কিন্তু তোর হাতের যাদু তো কেউ এনে দিতে পারবে না
তুই ভেবে দেখ আমার কিন্তু তোকে চাই।”

দিয়ার কথায় কে জেনো ছিলো তাই
ইরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,আমি বাবাইয়ের বাবার সাথে কথা বলে জানাবো দিদি।

ইরার গলায় স্বামীর প্রতি আনুগত্য বা ভয় নেই আছে সম্মান আর শ্রদ্ধা।
দিয়া সামনে থেকে উঠে যায়,ইরাও বাড়ির পথ ধরে।
দরজার সামনে আসতেই পেছন থেকে ডাক, দিয়া একটা বড় ব্যাগ ইরার হাতে ধরিয়ে দেয়।
“আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে এইবেলা এটা দিয়ে চালিয়ে নিস”

ইরা মুখে ধন্যবাদ দিলো না কিন্তু চোখে অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিলো।

বাবাই বারবার ঘর বারান্দা করছে,দোলা মাসী চলে এসেছে কিন্তু মা এখনো আসছে না।
ওর খুব ক্ষিধে পাচ্ছে,দোলা মাসী রান্নার জন্য কিসব নিয়ে বসেছে,মা ছাড়া এতোক্ষণ সে আগে কখনও থাকেনি,বাবাও ঘরে নেই তাই ওর খুব খারাপ লাগছে।

শুভ সামনের কাচা বাজারে এসেছে,এই সময় কিছু সবজি পাওয়া যায়,সে তাই ছুটির দিন দুপুর পরে বাজারে একটু ঘুরে যায়।
ইরাকে আসতে দেখলো শুভ,হাতে একটা বড়সড় ব্যাগ।
ইরার মুখে ক্লান্তি ফুটে উঠেছে, মেয়েটার অনেক খাটুনি পরে যাচ্ছে এখন।
শুভর মাঝে মাঝে মনে হয় ইরাকে কাজ ছেড়ে দিতে বলবে কিন্তু আবার ভাবে ওর যে আয় তাতে তো আর সারা মাস যায় না তাহলে কিভাবে চলবে,নিজেকে নিয়ে খুব হীনমন্যতায় ভোগে শুভ কিন্তু ইরার হাসিমাখা মুখ দেখে খুশি থাকতে চায়।

ইরা কাছাকাছি চলে আসার পর শুভ ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয়,ইরার ইচ্ছে করছে এখনই শুভকে সব খুলে বলে কিন্তু রাস্তায় তো সব বলা যায় না।
বাড়ি ফিরে ইরা ব্যাগ থেকে খাবার গুলো বের করে তাদের পাচজনের ভরপেট খাবার আছে।
দোলা তেমন কিছু রান্না করেনি শুধু ডাল সেদ্ধ বসিয়েছিলো ইরা ওকে বকে সবার থালা নিয়ে ঘরে আসার জন্য।
রাতে ডাল রান্না করবে।
ইরা বাথরুমে ঢুকে যায়, একটু ঠান্ডা জল মাথায় পরতেই শরীর সিরসির করে উঠে। দিদির কথাগুলো কানে বাজে সত্যিই কি সে পারবে বাইরে কাজ করতে?
ইরা বেরিয়ে দেখে সবাই ওর জন্য বসে আছে।

ইরা চুলে একটা গামছা পেঁচিয়ে সবার সাথে খেতে বসে।দোলা বুদ্ধি করে কয়েকটা লেবু,পেঁয়াজ আর মরিচ নিয়ে বসেছে।ইরা হাত দিয়ে গত বছর করা জলপাইয়ের আচার টা নিয়ে নেয়।।শুভ আচার দিয়ে বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে।

শুভ খেতে খেতেই বলে,আজ কি কোনো বিশেষ দিন নাকি?
ইরা সুযোগ পেয়ে সকাল থেকে যা যা হয়েছে সব বলে যায়।
শুভ আর দোলা খাওয়া ভুলে মগ্ন হয়ে ইরার কথা শোনে,দোলা দেখে এসেছিলো কিছুটা কিন্তু এতো কিছু হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি।

ইরা দিদির বলা কথাগুলো বলে চুপ হয়ে যায়।
দোলা ওর হাত খামচে ধরে বলে, “তুই না করিস না কাজ করবি বলে দে”

কথাটা বলেই চুপ করে যায়।
শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে, শুভ বসে আছে তবে নির্বিকার।
ও কি হ্যা বলবে নাকি না বলবে?

ইরা যেমন মেয়ে স্বামীর উপর একটা কথাও বলবে না কিন্তু এমন সুযোগ ক’জন পায়?

দোলার গলা দিয়ে খাবার নামছে না ওর খুব চিন্তা হচ্ছে।

বাচ্চাদের অবশ্য এই দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই,ওরা খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে উঠলো।

ইরা সব গুছিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে এসেছে,বাবাই দিশার সাথে দোলার ঘরে আছে টিভি দেখছে দুজন।
শুভ বিছানায় শুয়ে আছে,ইরা ওকে কিছু জিজ্ঞেস করছে না।
ইরা পাশ ফিরে শোয় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে যায়।

ইরার গুণ আছে এটা এই ক’বছরে শুভ খুব ভালো বুঝতে পারছে কিন্তু ও কি পারবে এতো বড় দায়িত্ব নিতে,দিয়া সম্পর্কে শুভ ইরার মুখে যতটুকু শুনেছে এতে মনে হয়েছে সে মানুষ ভালো কিন্তু তার স্বামী বা অফিসের বাকিরা তারা কেমন?
ইরাকে হেনস্তা করবে নাতো?
ইরা একা কাজ করতে গিয়ে কোনো বিপদে পরবে নাতো?
হাজারটা প্রশ্ন আসছে কিন্তু কোনো উত্তর নেই।

বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা,ইরা সবার জন্য চা আর মুড়ি ভেজে নিয়েছে।
বাচ্চারা মুড়ি খেয়ে পড়তে বসেছে শুভর কাছে।
বাবাই এই মাস থেকে একটা অংকের টিচারের কাছে পড়তে যায়,স্কুল ছুটির পর সেখানেই থাকে,দিশাও সেখানে পড়ে।
এতে করে ইরা একঘন্টা বেশি সময় থাকতে পারে দিয়ার বাড়িতে,ইরা মনে মনে ভাবে দিদির অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য করবে,যদি দরকার হয় রান্না করে দেবে বাড়ি থেকে।
আজ রাতের জন্য কিছু রান্না করা নেই,তাই ইরা সময় নষ্ট না করে রান্নাঘরের দিকে যায়।

বাজারের ব্যাগটা দোলা গুছিয়ে রেখেছে,এসব কাজ সে খুব ভালো পারে,চোখের নিমেষেই মাছ কাটা, মসলা বাটা,সবজি কাটা হয়ে যায়।
ইরা একটা পেপে আর কাচা কলা নিয়ে বসেছে কাটার জন্য।
ইরাকে বাইরে দেখে দোলা বলে আজ ফেরার সময় কিছু ছোট মাছ এনেছিলাম তুই একটু চচ্চড়ি করে দিবি,খুব ভালো হয় তোর হাতের ছোট মাছের চচ্চড়ি।
ইরা হাসি মুখে বলে নিয়ে আয় আর একটু ডাল বেটে দে।

বাড়ির উত্তর দিকে পুকুরের পাশে ছিলো একটা পেপে গাছ, সেই পেপে গুলো পাকলে কেমন যেন পানসে লাগতো তাই মা ওই গাছের পেপে তরকারিতেই ব্যবহার করতো।
ইরা একদম পেপে খেতে পছন্দ করতো না তাই মা কৌরা করে খাওয়াতো ও না জেনে পেপের কৌরা দিয়েই এক থালা ভাত খেয়ে নিতো।
আজ সে এই পদটাই রান্না করবে।
মা অবশ্য ঘরে বানানো ডালের বড়ি দিতো কিন্তু সে বড়ি পাবে কোথায় তাই ডালের বড়া দিয়েই করবে।

ইরা এক চুলায় একটা কাচা কলা আর একটা আলু সিদ্ধ বসায়। পেপে খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে গ্রেটার দিয়ে কুড়িয়ে নেয়।

আলু ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নেয়।
কড়াইয়ে অল্প তেল দিয়ে পেপে টা অল্প হলুদ আর লবণ দিয়ে ভাপ দিয়ে নেয়।
দোলার ডাল বাটা হয়ে গেছে এবার সে পেয়াজ কাটছে, মুসুর ডাল বাটা টা হলুদ আর লবণ দিয়ে খুব ভালো করে ফেটিয়ে নিয়ে ছোট ছোট কয়েকটা বড়া করে নেয়।
ছোট করে কাটা আলুগুলোও ওই তেলেএকটু ভেজে তুলে রাখে।
এবার কড়াইয়ে আরও একটু তেল দিয়ে মেথি,তেজপাতা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দেয়।
এর পর একে একে সব মসলা দিয়ে দেয় একটু আদা জিরা বাটা,হলুদ আর মরিচের গুড়ো।
অল্প গরম জল দিয়ে কসিয়ে নেয়, তারপর মসলা তেল ছাড়া হয়ে এলে পেপেটা দিয়ে আবার ভালোভাবে কসিয়ে রান্না করে।
আলুটাও এর মধ্যে দিয়ে দেয়,সব সিদ্ধ হওয়ার জন্য অল্প জল আর উপর দিয়ে কয়েকটা কাচা মরিচ আর ডালের বড়াগুলো দিয়ে অল্প আঁচে ঢেকে দেয়।
বাবাই ডালের বড়া খেতে খুব পছন্দ করে তাই একটা বাটিতে কয়েকটা বড়া ওদের ঘরে দিয়ে আসে একটু মুখন্তি হয়ে যায়।

কাচা কলা সিদ্ধ হয়ে গেছে খোসা ছাড়িয়ে আলুর সাথে কলাটা অল্প লবণ দিয়ে ভালোভাবে মেখে একপাশে রেখে দেয়।

“পেপের কৌরা” হয়ে গেছে এবার অল্প একটু ঘী আর গরম মসলা দিয়ে নামিয়ে নেয়।
আবার কড়াই বসায় একটু কালোজিরা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দেয় মেখে রাখা কলা সিদ্ধ টা দিয়ে দেয় অল্প একটু হলুদ ছিটিয়ে দেয় আর একটু সরিষার তেল।
অল্প আঁচে নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নেয় “কাচা কলার ভর্তা”
দোলা ছোট মাছ গুলো ইরার সামনে রেখে পাশে বসে।
পাঁচ মিশালী ছোট মাছ,পুঠি,চিংড়ি, কাচকি,মলা আর টেংরা।
ইরার মনে পরে বাড়ির পাশের পুকুরে সারাবছর এই মাছগুলো পাওয়া যেতো।
মাঝি পাড়ার কালু চাচা প্রতি মাসে একবার জাল ফেলতো আমাদের পুকুরে বাবার খুব মাছ ধরার সখ ছিলো তাই বেশ কিছু মাছের পোনা ছেড়ে দিতেন পুকুরে নিজেই দেখভাল করতেন সেগুলোর।
কালু চাচার জালে একটু ছোট সাইজের পোনা মাছ উঠলে সেগুলো আবার জলে ফেলে দেয়া হতো।
রাখা হতো ছোট মাছগুলো,আর হয়তো কিছু জিওল মাছ সেগুলো দিয়ে পাতলা ঝোল করতো মা।
আর ছোট মাছগুলো ধুয়ে বেছে একটা পদ করতো নাম “পাতা পোড়া চচ্চড়ি”

ছোট মাছগুলোর উপর পেয়াজ কুচি, রসুন কুচি, হলুদ আর শুকনা মরিচের গুড়ো,লবণ আর সরিষার তেল দিয়ে খুব ভালো করে হাতে মাখিয়ে নিতো।
কয়েকটা কাচা মরিচ চিরে দিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখতো।
বাড়ির পেছনের কলা গাছের সারি সেখান থেকে কয়েকটা পাতা এনে ধুয়ে একটু আগুনে তাতিয়ে নিতো তারপর একটা কড়াইয়ে একটা কলা পাতা বিছিয়ে এর উপর মাছগুলো দিয়ে দিতো ওপর থেকে আরও একটা কলাপাতা দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিতো।
চুলার নিভু নিভু আগুনে মাছ রান্না হতো,কিছু সময় পর আবার পাতা উল্টে দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখতো কিছুক্ষণ চুলার আচ তখনও নিভু নিভু।
একদম খেতে বসার সময় কড়াইয়ের ঢাকনা খোলা হতো,কলা পাতা পোড়ার গন্ধ সাথে তাজা মাছের ঝাল মিলে মিশে একটা অদ্ভুত স্বাদ হতো।
ইরার কথা শুনে দোলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,কোন ঘরের মেয়ে আজ কি করে খাচ্ছে?
তবে দিদির কথাটা যদি সত্যি হয় তাহলে হয়তো ওর ভাগ্য ফিরবে।
দোলা ইরাকে তাড়া দেয়,এখন সেই সময় নেই রে,যা পারিস একটা কিছু করে নে,রাত হয়ে যাচ্ছে।
ছেলে মেয়েগুলো বসে আছে।
দোলা এক চুলায় ভাতের হাড়ি বসায়।
ইরা মাছগুলোতে মায়ের মতোই সব মসলা মাখিয়ে সরাসরি কড়াইয়ে একটু তেল দিয়ে বসিয়ে দেয় আর যে বাটিতে মেখেছিলো সেই বাটি ধোয়া একটু জল দিয়ে কড়াইয়ের ঢাকনা দিয়ে দেয়।
চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়।
পনেরো বিশ মিনিট পর কড়াই নামিয়ে নেয় এর মধ্যে অবশ্য একবার নাড়িয়ে দিয়েছিলো আর একটু সরিষার তেল দিয়ে ঢেকে রেখেছিলো।
বাবাই হু হা করছে ঠিকই কিন্তু সেই ঝাল চচ্চড়িই খাচ্ছে।
দিশা অবশ্য পেপের কৌরা দিয়েই খেয়ে নিয়েছে।
শুভ অন্যান্য দিন খেতে বসে অনেক কথা বলে আজ তেমন কিছু বলছে না।
দোলা ইরা দুজনেই ব্যাপার টা বুঝতে পারছে কিন্তু কিছু বলছে না।
যেহেতু ওরা নিচে বসে খায় তাই খাওয়ার পাট চুকে গেলে ইরা ঘরটা একবার মুছে নেয় শুভ শোয়ার ব্যবস্থা করছে।
দোলা ইরাকে ইশারায় ডেকে নেয় বলে,”একবার জিজ্ঞেস করিস কি করবি?
দিদিকে তো জানাতে হবে।মানুষটা নিশ্চয়ই অনেক আশা নিয়ে বসে আছে”
ইরা মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে আসে।
বাবাই ঘুমিয়ে পরেছে,শুভ একটা কাগজে কি যেনো লিখছে।
ইরা সাহস করে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো কিছু বললে না?
কাল দিদিকে কি বলবো?
যদি অফিসে কাজের কথা বলে আমি কি করবো?”

এতো গুলো প্রশ্ন একসাথে শুনে শুভ ইরার দিকে তাকায়।
মেয়েটা কি ভাবছে সে বুঝতে পারে,
দিয়াকে সে পছন্দ করে তাই মুখের উপর না বলে দিতে পারবে না।

শুভ একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো,

“দিয়া দিদি তোমার গুণের কদর করতে চাইছে,তোমাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার একটা সুযোগ করে দিয়েছে আমার মনে হয় তুমি পারবে।
আমি তোমাকে না করবো না,তোমাকে সাহায্য করতে না পারলেও তোমাকে আঁটকে রাখবো না।
কিন্তু তাদের সাথে একবার কথা বলে দেখতে চাই”

শুভর গলায় কোনো প্রভুত্ব ফলানোর আভাস নেই উল্টো স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস স্পষ্ট।আবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।

ইরার বুকের উপর থেকে একটা ভারী পাথর নেমে যায়।
সে একবার চেষ্টা করার সুযোগ পাচ্ছে এতেই সে খুশি।
এই খবরটার জন্য আরেক জন খুব আগ্রহ নিয়ে বসে আছে সে এক মুহুর্তও সে অপেক্ষা করলো না।

দোলার ঘরের কড়া নাড়া দিতেই দোলা দরজা খুলে দিলো।ইরার মুখের হাসিই সব বলে দিচ্ছে, তারপরও মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ানো দেখেই দোলা বুঝে যায়।
ইরার জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৬

ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৬
কলমে – প্রমা মজুমদার

আজ ছুটির দিন।
অন্যদের ছুটি থাকলেও দোলা আর ইরার ছুটি নেই।

শুভ আজ বাড়ি থাকে তাই ইরা দিদির সাথে আগেই কথা বলে ঠিক করেছিলো,ছুটির দিনে সে নিজের ঘরের কিছু কাজ গুছিয়ে একটু দেরিতে আসবে।

কিন্তু আজ একটু তাড়া আছে,গতকাল যে কাজ টা হয়েছে আজও সেই কাজ দিদির বাড়িতে হবে তাই ইরাকে জলদি যেতে বলেছে দিদি।
শুভ নিজেও চাকরি করে তাই এসব ব্যাপার ভালোই বোঝে,তাই সে কিছু বলেনি।
আর কাল দিদি অনেক খাবার আর মিষ্টি দিয়ে দিয়েছিলো।বাচ্চারা সেগুলো খাবে ঠিকই কিন্তু শুভর ছুটির দিন সকালে একটু গরম গরম ভাত চাই।
ইরা তাই তাড়াতাড়ি হাত চালায়,ভাতের হাড়িতে জল দিয়ে তার মধ্যেই আলু দিয়ে দেয়,আর একই হাড়িতে একটা সুতি কাপড়ের মধ্যে একটু মুসুরের ডাল আর কিছুটা রসুন আর কয়েকটা কাচা মরিচ দিয়ে একটা পোটলা করে দিয়ে দেয়।
কিছুটা পেঁয়াজ আর কাচা মরিচ কুচি করে রাখে একবার ফুটে উঠলে ধুয়ে রাখা চাল দিয়ে দেয়।
গরম ভাত থালায় বেরে দিয়ে পোটলার মধ্যে থেকে ডাল সিদ্ধ নিয়ে নেয় সাথে আলু সিদ্ধ পেঁয়াজ মরিচ আর কিছুটা সরিষার তেল দিয়ে মেখে নেয়।
শুভর সামনে থালাটা দিয়ে ইরা কাপড় বদলে নেয়।
সে যতই রান্নার লোক হোক না কেন,একটু পরিপাটি হয়ে থাকা ওর অভ্যাস।
শুভ ইরার হাত ধরে ওকে পাশে বসায়,ভাত মেখে আগে ইরাকে খাইয়ে দেয়,মেয়েটা নিজের যত্ন নিতে ভুলে গেছে তাই এই খেয়লটা তো তারই রাখতে হবে।
ইরা আড়ালে চোখের জল মুছে,কিছু কিছু মুহূর্তর কোনো নাম হয় না থাকে শুধু আবেশ।

দোলা আরও আগে বেরিয়ে গেছে,তাই দিশা ওর ঘরে আছে।
বাবাই আর দিশা এখনো শুয়ে আছে।গতকালকের আনা খাবার টেবিলের উপর রেখে ইরা বেরিয়ে আসে।

সকাল প্রায় দশটা,বসার ঘরে প্রায় সাত আটজন চলে এসেছে রায়ান দাদা আর দিদি ওদের সাথে কথা বলে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ইরা আগে রান্নাঘরে ঢুকে সবার জন্য চায়ের জল বসায়,দিয়া এসে বলে যায় ও এখনো কিছু খায়নি।
ইরা দিদির উপর একটু কপট রাগ দেখায়,এতো বেলা পর্যন্ত না খেয়ে থাকা তার একটুও ঠিক হয়নি।
তাই ইরা তাড়াতাড়ি একটা বাটিতে কিছুটা চিড়া ধুয়ে দুধ,আম,কলা আর উপর থেকে কয়েকটা খেজুর টুকরো করে দিয়ে মেখে দেয়।
দিদির কলিগরা দেখে বলে এটা নাকি এক বাটি পুষ্টি।
ইরা অবশ্য এতো কিছু বোঝে না,ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় মা এভাবে মেখে খাইয়ে দিতো বলতো সারাদিন আর খিদে লাগবে না।
বাবাইকেও মাঝে মাঝে এভাবে বানিয়ে দেয় তবে সব ফল তো আর দিতে পারে না শুধু কলা আর দুধ দেয়।
ইরা এখন নিজেও এককাপ চা খায়, দিদি অভ্যাসটা খারাপ করে দিয়েছে।
চা নিয়ে টেবিলের একপাশে বসেছে,দিদিও আছে।
তবে হাতে কাগজ পত্র নিয়ে বসেছে,যাদের অনুষ্ঠান তারা নাকি আজ আসবে খাবারের মেন্যু ঠিক করতে।
দিদি একটা বড় লিস্ট করছে খাবারের,মুখে বলে বলে কাগজে লিখে নিচ্ছে।
এত্তগুলো খাবার একটা অনুষ্ঠানের জন্য!
এর অর্ধেকের বেশি তো ইরা নামই শোনেনি,সত্যি মানুষের সখের দাম ষোল আনা।

যেখানে দুই বেলা সারা মাস খাবার জোগাড় করার জন্য ইরার কাজ করতে হচ্ছে সেখানে প্রায় দুইশো মানুষের একবেলার খাবারের খরচ দাঁড়াবে প্রায় লাখ টাকা।
ইরা একটু সময় নিয়ে দিদিকে জিজ্ঞেস করে আজ কি রান্না করবে?
দিয়া বলে,”আজকে দুপুরেও বাইরের থেকে খাবার আসবে তুই শুধু রাতের জন্য একটা মাছের ঝোল করে রেখে দিবি।
আর কিছুক্ষণ পর একজন গেস্ট আসবে তার জন্য একটু চা মিষ্টি গুছিয়ে দিতে হবে।
আসলে একে তো অনুষ্ঠানটার বেশি দিন বাকি নেই তার উপর তারা খুব ব্যস্ত তাই মিটিং টা বাড়িতের করতে হচ্ছে।
আজকে খাবারের মেন্যু আর বাকি সব আয়োজন তাদের মুখে বলে বা ছবিতে দেখানো হবে,তারপর তাদের পছন্দ হলে বাকি কাজ হবে এর নাম প্রেজেন্টেশন”

ইরা কি বুঝলো জানেনা তবুও মাথা নাড়াল।
কিন্তু একটা কথা না বলে পারলো না,”রোজ রোজ বাইরে থেকে কিনে খেলে তোমার শরীর খারাপ করবে না?
তারচেয়ে ভালো আমি ঘরে বিরিয়ানি রান্না করি”

দিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে ইরার দিকে তাকায়,
তুই বিরিয়ানিও করতে পারিস?

ইরা একটু লজ্জা পেয়ে বলে,হুম বাবাইয়ের বাবার খুব পছন্দের খাবার তাই শিখেছি।

দিয়া ওর কাছে এসে বলে ঠিক আছে, আজ তাহলে আমাদের বিরিয়ানি পার্টি আর কাজটা যদি পেয়ে যাই তাহলে তোকে আমি পিজ্জা পার্টি দেবো।
ইরা হেসে রান্নাঘরে ঢুকে যায়,
মাত্র কয়েকটা দিন কিন্তু মেয়েটা এতো আপন হয়ে গেছে,দিয়ার মনে হাজর স্বপ্ন উঁকি দেয়।
ইরাকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারবে না।

ইরা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যায়,অতিথি আপ্যায়নের জন্য অনেক ধরনের মিষ্টি আর ফল আনা হয়েছে।তাই সে নিয়ে চিন্তা নেই।
রান্না করবে বলে তো দিয়েছে,কিন্তু বিরিয়ানির মসলা তো নেই?

বাড়িতে যতবারই সে রান্না করেছে শুভ বাজার থেকে বিরিয়ানির মসলা এনে দিয়েছে। আজ কিভাবে করবে এটা শুধু তার না দিদিরও সম্মানের ব্যাপার, সে আগ বারিয়ে বাইরের খাবার আনতে না করেছে এখন যদি ভালো রান্না না হয় ওর কথার দামটাই থাকবে না।

নিশ্চিন্তপুরে ইরাদের বাড়ির দুই বাড়ি পরে চম্পাদের বাড়ি।চম্পা ইরার সই,একসাথে বড় হয়ে উঠেছে।
চম্পার মা রাহেলা চাচী বিরিয়ানি রান্নায় সারা গ্রামে তার নাম।

ছোট ঈদের সময় চাচী আশে পাশের সব বাচ্চাদের দাওয়াত দিতেন।

দুদিন আগেই চাচী সুবল দার হাতে একটা বড় বাজারের ফর্দ ধরিয়ে দিতেন।কারণ চাচা গ্রামের বাইরে বেশি যেতেন না।
সুবলদা তাই একমাত্র ভরষা,সে প্রায় প্রতিদিন গঞ্জে যায়।
কি নেই সেই ফর্দে,বড় এলাচ,ছোট এলাচ,শাহী জিরা,বাদাম,কিসমিস
গোলমরিচ,তেজপাতা, লবঙ্গ,ধনিয়া,মিঠা আতর,গোলাপ জল কিছুই বাদ নেই।
সুবলদাকে বার বার বলে দেয় কোনোকিছু যেন বাদ না যায়।

চাচী বাইরের উঠানে তোলা আগুনে একটা বড় ডেকচিতে রান্না বসাতো।
তার আগে সব মসলা একটু টেলে নিয়ে একট গুড়া তৈরি করতো আর এক চুলায় বড় বড় আলু সিদ্ধ বসাতো।

ইরা একটু বড় হওয়ার পর চম্পার সাথে হাতে হাত দিতো চাচীকে রান্নায় সাহায্য করতো,সেই রান্নার গন্ধে সারা পাড়া ভরে উঠতো,যে বাড়িতে অন্য রান্না হতো তারাও চাচীর দোরগোড়ায় চলে আসতো।
কলা পাতায় পাত পরতো সবার একসাথে।
গরম গরম ধোয়া উঠা বিরিয়ানি সাথে এক টুকরো লেবু আর কাচা মরিচ।আহ্ কি তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া হতো সকলের।

এখানে তো এতোকিছু নেই তাই প্যাকেট মসলাই ভরশা।
তারপরও সে মূল রান্নায় চলে যায় হাতে যেহেতু বেশি সময় নেই তাই একটু ঝটপট সব গুছিয়ে নেয়।
ফ্রিজ থেকে কয়েকটা মুরগির মাংসের প্যাকেট বেড় করে হালকা গরম জলে ভিজিয়ে দেয়,আরেক দিকে পোলাওয়ের চাল ধুয়ে জলে ভিজিয়ে রাখে।

কলিং বেলের শব্দে আঁতকে উঠে,ইরা অতিথি কি এখনই চলে এসেছে?
না, দোলা এসেছে।
দোলাকে দেখে ইরা স্বস্তি পায়,ইরাকে সব বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য দোলা সবসময় হাজির থাকে, ইরা দোলাকে ডেকে বলে একটা মসলার প্যাকেট এনে দিতে।

দোলা আবার বেরিয়ে যায়।
দিয়া একবার কাজে ঢুকে গেলে আর কোনোদিকে খেয়াল থাকে না আর ৩
রান্নাঘরে যেহেতু ইরা আছে তাই সে একটু বেশি নির্ভার।
ইরা চুলায় একটু বড় সাইজের একটা হাড়ি বসায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে দোলা ফিরে আসে হাতে রোস্টের মসলার প্যাকেট!
ইরা এটা দিয়েই আজ রান্না করবে,নিজের হাতের ওপর ওর ভরষা আছে।
প্রথমে বেশ খানিকটা পেঁয়াজ ভেজে কিছু টা আলাদা করে রাখে তারপর তেজপাতা,এলাচ,দারুচিনি লবঙ্গ দিয়ে আদা রসুন বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ ভেজে নেয়।
ঘরে টক দই নেই তাই গরম দুধে লেবুর রস দিয়ে কিছুটা টক দই বানিয়ে নেয় তারপর সেই বাটিতে প্যাকেট মসলা লাল মরিচ গুড়া,জিরা,কিছুটা গরম মসলার গুড়ো আর গোল মরিচের গুড়ো মিশিয়ে একটা পেস্ট বানিয়ে নেয়।
চুলার আঁচ কমিয়ে মসলাটা দিয়ে অল্প গরম জল দিয়ে দুই তিনবার কসিয়ে নেয়।
হাতের কাছে টমেটো সস ছিলো সেটাও দিয়ে দেয়,এরপর মাংসটা দিয়ে দেয়।
একটু সময় ভেজে নিয়ে অল্প একটু জল দিয়ে ঢেকে দেয়, মাংস অল্প সিদ্ধ হওয়ার জন্য।
তারপর জল ঝরিয়ে রাখা চাল দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে পরিমাণ মতো গরম জল আর দুধ দিয়ে দেয়।
উপর থেকে কয়েকটা কাচা মরিচ, লবণ আর চিনি দেয়।
মাংস আর চাল ফুটে এলে চুলা বন্ধ করে দেয়,এর মধ্যে একে একে ঘী পেঁয়াজ বেরেস্তা,কিসমিস আর কয়েকটা চেরা কাচা মরিচ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দেয়। অন্য পাশের চুলায় আগে থেকে একটা তাওয়া গরমে বসিয়েছিলো তার উপর হাড়িটা তুলে দেয়।
এবার প্রায় আধঘন্টা অল্প আঁচে দমে থাকবে,ইরা ঘামে ভেজা মুখ মুছে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়ায়।

বাড়িতে খুব তোর জোড় চলছে,কেউ ঘর গুছিয়ে রাখছে তো কেউ কাগজ পত্র গুছিয়ে নিচ্ছে।
কয়েকজন ভেতরের ঘরে বসে আছে,দিদি একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি পরে আছে খুব মিষ্টি লাগছে দিদিকে।
আজকের প্রেজেন্টেশন দিদি আর দাদা দেবে।
অতিথি চলে এসেছে একজন ভদ্রলোক আর একজন সুশ্রী ভদ্রমহিলা।
তাদের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান।
দিয়া তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বসার ঘরে বসায়,
ইরা তাড়াতাড়ি একটু লেবুর শরবত আর বাকি সব কিছু সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে দেয়।
দিদির একজন সহকারী ট্রে টা বসার ঘরে দিয়ে আসে,সবাই পাশের ঘরে বসে আছে,দোলা কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে।
ইরা এক কোণায় বসে আছে,বসার ঘরের সব কথা তার কানে আসছে।
ভদ্রলোকের সাজানোর থীম টা খুব পছন্দ হয়েছে,অনুষ্ঠানের জায়গাটাও
ভালো লেগেছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খাবারের মেন্যু নিয়ে।
দিয়া প্রায় দশ বারো রকমের খাবারের নাম বলেছে কিন্তু তারা বলছে নতুনত্ব কিছু চাই।
রায়ান দাদা,ইন্ডিয়ান, চাইনিজ কতো ধরনের খাবারের নাম বলেছে।
ভদ্র মহিলা তো বলেই দিলেন,সবাই এক রকম করে আমরা আলাদা কিছু করতে চাইছি।
ইরার সামনে কাগজ কলম রাখা আছে সে গোটা গোটা হাতে কয়েকটা খাবারের নাম লেখে, ওর কাছে মনে হচ্ছে সবাই যখানে বিদেশি খাবার করে তারা সেখানে দেশি খাবার করতে পারে।
দিয়া খাবারের জল নিতে এই ঘরে আসে,ইরা দিদির হাতে কাগজটা তুলে দেয়।
ইরা কাগজে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হা হয়ে যায়।
এই মেয়েটার আর কি গুণ আছে?
দিয়া এবার আত্মবিশ্বাসী হয়ে বসার ঘরে যায়।
“আমরা বসে খাবারের আয়োজন করবো।
প্রথমে গরম গরম লুচি,সবজি সাথে চিকেন ঝাল ফ্রাই।
পরে সাদা পোলাও চিকেন ফ্রাই অথবা ফিস ফ্রাই, মাটন কষা আর চাটনি।
যেহেতু জন্মদিন তাই শেষ পাতে পায়েস।
আর বাচ্চাদের জন্য আইসক্রিম আর চকলেট কাউন্টার থাকবে।
কেমন হবে?”
দিয়া শুধু ইরার বলা বাংলা নামগুলো ইংরেজিতে বলেছে আর কিছু না।

রায়ান দিয়ার কথাগুলো শুনে চুপ হয়ে যায়,এই গুলো তো তাদের লিস্টে ছিলো না।
তবে খুব ভালো আইডিয়া।
তারা এককথায় হ্যা বলেছে এই খাবারই হবে তাদের মেয়ের জন্মদিনে।

দিয়া আর রায়ানের মুখে প্রাপ্তির হাসি।
এতোক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি,সারা বাড়ি বিরিয়ানির গন্ধে ভরে আছে।
ইরা হাড়ির মুখ খুলে একটু লবণ চেক করছিলো আর তাতেই এই অবস্থা।
ভদ্রলোক নিজে থেকেই প্রশ্ন করে, “আপনাদের কি নিজস্ব ক্যাটারিং সার্ভিস আছে?
আমার কিন্তু সবচেয়ে বেস্ট খাবার চাই।”
দিয়া বলে আপনারা একটু বসুন আমি আসছি।
দিয়ার মাথায় আবার কি ঘুরছে রায়ানের কপালে চিন্তার ছাপ।

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৫

#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব_৫
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

আজ মাসের দুই তারিখ, দিয়ার বাড়িতে ইরা যাচ্ছে আজ দশ দিন।
কাজ টা করে ইরার বেশ ভালো লাগছে,দিদি খুব ভালো,ওর সাথে সুন্দর ব্যবহার করে,ইরার মনে প্রথমে একটু ভয় ছিলো মালিক কেমন হবে না হবে এই নিয়ে কিন্তু দিদি সব ভয় ভাঙিয়ে দিয়েছে।
এইতো কাল তাকে পুরো একমাসের বেতন দিয়ে দিয়েছে ইরা যদিও নিতে চায়নি তবুও জোর করে দিয়েছে।

“আমার এখানে যারা আছে তারা সবাই মাসের এক তারিখেই বেতন পায়। তুইও তাই পেয়েছিস।”
কিন্তু আমি তো সারা মাস কাজ করিনি?

তাতে কী?

আগামী মাস তো সারা মাস করবি।
দিদির হাসিতে একটা মায়া আছে তাই বেশি কিছু বলা যায় না।
আজ ইরা বাবাইকে স্কুল থেকে আনার সময় ওকে একটা দোকানে নিয়ে যায়,ওকে আর দিশাকে কয়েকটা চকলেট কিনে দেয়।
আর শুভর জন্য একটা বডি স্প্রে কেনে।
মানুষটা খুব সৌখিন ছিলো আগে যখন ঢাকা থেকে বাড়ি যেতো,ওর গা থেকে সুন্দর গন্ধ আসতো ব্যাগে সবসময় একটা সেন্ট থাকতো।
এখন কয়েকবছর নিজের জন্য কিছু কেনে না।
কাল রাতে শুভর হাতে দুই হাজার টাকা দিয়ে ইরা বলেছে একটা ব্যাংক একাউন্ট খুলে তার নামে জমা করার জন্য।
বাকি টাকা সে সংসারের কাজে খরচ করবে।
শুভ হাত পেতে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু বলেছে আর কিছুদিন পর আমার প্রমোশন হবে তখন আর তোমাকে কাজ করতে হবে না।
ইরা হাসি মুখে মাথা নাড়ায়।
কাল দিদির বাড়িতে অনেক লোক আসবে তাই আজ বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে আবার দিদির বাড়িতেই যেতে হবে।
ইরা একটু ইতস্তত করছিলো বাচ্চাদের একা ঘরে রাখতে হবে ভেবে।
দিয়া ওর চোখ দেখেই বুঝতে পারে।
আরে পাগলি বাচ্চাদের নিয়ে এখানেই চলে আসবি,পরে দোলা এলে একসাথে চলে যাবি।
ইরা তা-ও চিন্তা করে,দিদির এতো সুন্দর গোছানো ঘরদোর বাচ্চারা এসে যদি কিছু নষ্ট করে ফেলে।
যদিও ওরা খুব একটা দুষ্টু না তবুও ভয় হয় মায়ের মন তো।
বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা ভ্যানে লাউ শাক দেখতে পায় ইরা।
এই সময়ে দিদির বেশি বেশি শাক সবজি খাওয়া দরকার,তাই ইরা নিজের টাকা দিয়েই কিছু শাক কিনে নেয়।
ঘরে ঢুকে ইরা অবাক বসার ঘরে প্রায় ছয় সাতজন ছেলে মেয়ে বসা,রায়ান দাদাও আছে।
দিদি সব কিছুর মধ্যমনি,দিদি জোরে জোরে কি সব বলছে আর বাকিরা কাগজে লিখে নিচ্ছে।
বাচ্চারাও খুব অবাক হয়,ওরা এই বাড়িতে আজই প্রথম এসেছে।
ইরা ওদের নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়।
দিয়া একটু পর রান্নাঘরে আসে,দুটো বাচ্চাকে এখানে দেখে ইরার উপর রাগ করে।
“এই গরমে ওদের এখানে বসিয়ে রেখেছিস?
তোর বুদ্ধি টা কি হাটুর নিচে থাকে নাকি?”

দিয়া ওদের হাত ধরে খাবার টেবিলে নিয়ে বসায়।একটা প্লেটে কিছু মিষ্টি আর ফল দেয়।
দুজনের গ্লাসে জল দিয়ে রান্না ঘরে ঢোকে, ইরা শাক বাছতে শুরু করে দিয়া চা বসাতে বসাতে বলে।

“একটা নতুন ইভেন্ট এর কাজ এসেছে,শহরের একজন নামকরা ব্যাবসায়ীর মেয়ের জন্মদিন।
এতোদিন তো আমি বাড়ি থেকেই কাজ দেখতাম কিন্তু আজ অফিসের সবাই বাড়ি এসেছে।
খুব চাপ আছে রে তুই এদিক টা একটু সামলে নে।”

ইরা বুঝতে পারে বিরাট ব্যাপার।ও জিজ্ঞেস করে, ওরা কি দুপুরে খেয়ে যাবে?
“না,তবে তুই চায়ের সাথে একটা কিছু করে দে।”

দিয়া আবার কাজের ঘরে চলে যায়।
ইরা লাউ শাক দিয়ে কিছু করার চিন্তা করে।একটু অন্য রকম কিছু।

বাড়ির পেছন দিকে একটু খোলা জমি ছিলো মা সেখানে লাউ এর মাঁচা করতো।
বর্ষার সময় সেখানে অল্প জল চলে আসতো কলার ভেলায় করে ইরা সুবল দার সঙ্গে সেখান থেকে কচি লাউ আর পাতা নিয়ে আসতো।
বাড়ির উঠানে তখন জল আসতো না,তারপরও বৃষ্টির জন্য সব ভেজা থাকতো।দুপুরে তাড়াতাড়ি রান্না খাওয়া মিটিয়ে ঘরে চলে আসতো মা।

বাবা বাড়িতেই থাকতো বেশিরভাগ সময়,তার বিকেলে একটা কিছু লাগবেই লাগবে।
মা তার জন্য বর্ষা মৌসুমের আগে থেকেই মুড়ি চিড়া করে কৌটায় ভরে রাখতো।
আর মুড়ির সাথে কখনো বেগুনি, কখনো আলুর বড়া আবার কখনো লাউ পাতার বড়া করে দিতো।
মাঝে মাঝে আবার চাল ভাজা বা আটা ভাজা করে দিতো।
টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ সাথে মুচমুচে ভাজা বড়া।

ইরা লাউ পাতাটা একটু পরিস্কার করে লবণ জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখে অন্যদিকে বেটে রাখা মুসুর ডালের মধ্যে কিছুটা হলুদ গুড়ো, অল্প শুকনা মরিচের গুড়ো,স্বাদমতো লবণ,কিছুটা পেঁঁয়াজ,আদা আর কাচা মরিচ কুচি দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত দিয়ে মেখে নেয়।
লবণ জল থেকে তুলে পাতাগুলো আবার ধুয়ে সমান করে বিছিয়ে নেয়।
তারপর একপাশে ডাল বাটার মিশ্রণটা সুন্দর ভাবে দিয়ে লম্বা করে ঘুরিয়ে নেয় একটা চাকু দিয়ে ছোট ছোট টুকরো কেটে গরম তেলে ভেজে নেয়।
চায়ের সাথে এই মুচমুচে বড়াটা বেশ ভালো লাগে।
ইরা চা আর বড়া নিয়ে বসার ঘরে দিয়ে আসে,সবাই খুব ব্যস্ত দিয়া সবাইকে বলে এখন একটু চা খেয়ে নাও,পরে আবার কাজ শুরু হবে।

ইরা দিদিকে বলে এখন কি করবে?
দিয়া বলে,
“দুপুরের রান্নাটা করতে হবে না,সবাই এখানেই খাবে বাইরে থেকে খাবারের অর্ডার দেয়া হয়েছে,তুই একটু বসে বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে যাবি।”

বসার ঘর থেকে লাউ পাতা বড়ার প্রশংসা ভেসে আসছে।
রায়ান এই কয়দিনে এসব খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তবুও প্রতিদিন আলাদা কিছু খেতে ওর খুব ভালো লাগে।
দিয়া অবশ্য ইরার কাছ থেকে সব রেসিপি নিয়ে রাখছে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
ইরা বাচ্চাদের পাশে গিয়ে বসে,বাবাই আর দিশা এতোক্ষণ চুপ করে বসে ছিলো কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না, বাড়ি থাকলে এখন টিভিতে কার্টুন দেখতো কিন্তু এখানে তো কিছুই করতে পারছে না।
হঠাৎ এত্তো বড় একটা টিভিতে কার্টুন চালিয়ে দিয়েছে কেউ।
এখান থেকে বসার ঘরের সবকিছু দেখা যায়।
কয়েকজন বড় ছেলে মেয়ে একসাথে বসে কার্টুন দেখছে দেখে দিশা খুব অবাক হয়।
সে আস্তে আস্তে বাবাইকে বলে,
“দেখ দাদা ওরাও আমাদের মতো কার্টুন দেখে,কিন্তু টিভিটা এতো বড় কেন?”
বাবাইও কিছু বুঝতে পারছে না।কিন্তু ভালোই হলো এই ফাঁকে ওরা কার্টুন দেখতে পারছে।
যেহেতু একটা বাচ্চা মেয়ের জন্মদিন তাই প্রিন্সেস আইল্যান্ড থীম করা হবে।
কেউ বলছে সিন্ড্রেলা তো কেউ বলছে র‍্যাপাঞ্জেল। তাই কার্টুন দেখে রঙ আর ডেকোরেশনের জিনিস ঠিক করা হচ্ছে।
খাবারেও কতো নতুনত্ব,কয়েক রকম কেক,চকলেট থাকবে।আবার বড়দের জন্য নান রুটি, মাংস আবার বিরিয়ানির ব্যবস্থা,কয়েক রকম মিষ্টি আর আইসক্রিম।
ইরা সব শুনছে কিন্তু ওর মনে আসছে নিজের ছোটবেলা।
জন্মদিন মানে পায়েস আর লুচি।
প্রতিবছর ওর জন্মদিনে মা সকাল বেলা মন্দিরে পূজা দিতে যেতো।

সেখান থেকে ফিরে রান্নাঘরে ঢুকে যেতো,সেদিন দুপুরে ইরার জন্য থালা সাজাতো মা।
বাড়ির কালোজিরা চালের ভাত,পাঁচ রকম ভাজা,যেখানে মাছ থাকবেই।
একটা সবজি,বুটের ডাল,নদীর ছোট মাছ চচ্চড়ি,মাছের মাথার মুড়িঘণ্ট,সরষে বাটায় ইলিশ মাছ,
খাসির মাংস,আচার দিয়ে টমেটোর টক,আর পায়েস।
ইরার সেদিন নিজেকে রাজকন্যা মনে হতো।
বিকেলে ইরার বন্ধুরা আসতো তাদের জন্য মা আলাদা আয়োজন করতো।
ছোট আলু দিয়ে আলুর দম,বুটের ডাল,পায়েস আর লুচি।
সেগুলো এখন আর হয় না,বাবাইয়ের প্রথম জন্মদিনেও শুভ বাবুর্চি দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করিয়েছিল কিন্তু ইরা ঠিকই ছেলের জন্য পায়েস করে দিয়েছিল।ওর কাছে এটাই নিয়ম।

বেলা প্রায় একটা।
দোলা এই বাড়িতে প্রায়ই এতো লোক দেখে কিন্তু ও সবচেয়ে অবাক হয় বাবাই আর দিশাকে সেখানে বসা দেখে।ইরা এখনো রান্নাঘরে কাজ করছে।
রাতের জন্য একটু হালকা করে মাছের ঝোল আর একটু ডাটা দিয়ে ছোট মাছ রান্না করেছে।
কয়েকটা লাউ শাক ছিলো সেগুলো দিয়ে একটু পাতা বাটা করেছে।
এখন সে মিক্সার চালানো শিখে গেছে তাই আর সমস্যা হয়না।
সবার জন্য বার্গার আর স্যান্ডউইচ এসেছে।
বাবাই আর দিশাও একপাশে বসে খাচ্ছে,ওরা এমন খাবার আগে কখনও খায়নি তাই খুব মজা পাচ্ছে।
ইরাকেও দিয়েছে কিন্তু সে খায়নি,শুভর জন্য নিয়ে যাবে।
কিন্তু ভর দুপুরে এসব খেয়ে কি পেট ভরে?
ইরা দিদিকে আলাদা করে ডেকে এনে বলে,”তুমি এগুলো খেয়ে সারাক্ষণ থেকোনা,তোমার জন্য ছোট মাছ আর লাউ পাতার ভর্তা করেছি একফাঁকে একটু ভাত খেয়ে নিও।”
যে মানুষটা দিয়ার এতো খেয়াল রাখে তার জন্য তো দিয়ার চিন্তা করতেই হবে।
ইরাকে নিয়ে দিয়ার অন্য ভাবনা আছে, সেই গল্প হবে অন্য আরেক পর্বে।

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৪

ইরাবতীর চুপকথা
পর্ব – ৪
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে,ইরা বাবাই আর দিশাকে দোলার ঘরে বসিয়ে রেখে রান্না করতে যায়।
আজ বেশি কিছু করতে পারবে না,একটা চুলায় ডালের হাড়ি বসিয়েছে আরেক দিকে মাছ ভাজার জন্য কড়াই বসিয়েছে।
সকালেই রুই মাছ গুলো ভিজিয়ে রেখেছিলো।মাছগুলো একটু ছোট ছোট করে কেটে ধুয়ে লবণ হলুদ দিয়ে ভেজে নেয়।
কয়েকটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট করে কেটে সেই তেলে একটু সাতলে নেয়।
তারপর একটু জিরা,তেজপাতা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দিয়ে জিরা আর আদা বাটা দিয়ে দেয়।
একটু কসিয়ে নিয়ে হলুদ আর মরিচের গুড়ো দেয়।
মসলা তেল ছাড়া হওয়া পর্যন্ত কসিয়ে নেয় তারপর কিছুটা জল আর কয়েকটা কাচা মরিচ ছিড়ে দেয় ঝোল ফুটে উঠলে মাছ দিয়ে একটু ঢাকা দিয়ে দেয়।
অন্য দিকে পাতলা ডালটাও হয়ে যায়।
চোখের সামনে আলুর খোসা গুলো পরে আছে দেখে আর একটা কিছু করার লোভ সামলাতে পারছে না ইরা।
বেলা প্রায় একটা বাজে।
এক চুলায় ভাত বসিয়ে দিয়ে,অল্প একটু ডাল সিল পাটায় বেটে নেয়।
আলুর খোসাগুলো কুচি করে কেটে নেয় সাথে কিছু পেয়াজ আর মরিচ কুচিয়ে নেয়।
ডাল বাটা ভালো করে ফেটিয়ে এর মধ্যে আলুর খোসা আর পেয়াজ মরিচ কুচি সামান্য হলুদ গুড়ো আর লবণ দিয়ে মাখিয়ে নেয়।
তারপর চেপ্টা চেপ্টা করে তেলের মধ্যে ছেড়ে দেয়।
এই বড়া একবার খেয়ে কেউ বুঝতেই পারবে না এটা কি দিয়ে বানানো।
রান্না শেষ হয়ে এলে দোলা চলে আসে,ও আজ একটা মুরগি কিনে এনেছে।
আজ একটা বিশেষ দিন,ইরা কাজ পেয়েছে তাই একটু ভোজ না হলে চলে?
ইরা মুখে একটা মলিন হাসি এনে বলে,তুই পারিস ও,শুধু শুধু কটা টাকা নষ্ট করলি।
সামনের মাসে বেতন পেলে না হয় কিছু করতাম।
দোলা ওর কথার উত্তর না দিয়ে মুরগি কাটতে বসে যায়।
ইরা আর কথা বারায় না জানে দোলা এই স্বভাবের, নিজে যা মনে করবে তা-ই করবে।
আসলে একা শহরে টিকে থাকতে হলে হয়তো এমনই হতে হয়।
দুপুরের খাওয়া ভালোভাবেই মিটে যায়।
শুভ বিকেলে এসে ইরার কাছে জানতে চায় প্রথম দিন কাজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে।
ইরা বলে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি,কটা মাসেরই তো ব্যাপার,দিদির বাচ্চা হয়ে গেলে আর বেশিদিন কাজ করতে হবে না।
দিয়া অবশ্য এই কথা বলেনি।
শুভ একটা আত্মগ্লানিতে ভুগছে,ইরাকে সে কিছুতেই কাজ করতে দিতে চাইতো না কিন্তু সংসার খরচ এতোটাই বেরে গেছে যে একা কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
ইরা সব বুঝতে পেরেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই শুভকে স্বাভাবিক রাখার জন্যই কথাটা বলেছে।
শুভ খুব খিচুড়ি পছন্দ করে তাই ইরা ভেবেছে আজ রাতে পাঁচমিশালী খিচুড়ি আর মুরগির ঝোল করবে।
বাবাই মায়ের কাছ ঘেসে বসেছে, মায়ের কাছে আবদার আজ দোলা মাসি যে মুরগি এনেছে তার একটা রানের পিস খেতে চায়।
ইরা হাসি মুখে উত্তর দেয়,অবশ্যই দেবো,একটা তোর একটা দিশার আর রাতে “চড়ুইভাতি”হবে।
আমরা একসাথে পাত পেড়ে খাব।
বাবাই জিজ্ঞেস করে চড়ুইভাতি কি মা?
ইরা ছেলেকে বলে এটা গ্রামের পিকনিক।
ছোটবেলায় ইরা আর ওর সমবয়সী বন্ধুরা প্রতি বছর শীতে চড়ুইভাতি করতো।
সবার বাড়ি থেকে এক কৌটো চাল,কিছু ডাল একটা ডিম আর কিছু সবজি নিয়ে আসতো।
একেক জনের ঘরের একেক রকম চাল আর ডাল সব একটা বড় গামলায় রাখা হতো।
ইরার পাশের বাড়ির মালতী দিদি ছিলো এর মাথা সে বয়সে একটু বড় রান্নাটাও জানতো।
বাইরের উঠানের চুলায় সব ডিম সিদ্ধ বসানো হতো,আর অন্যদিকে সব সবজি একসাথে কেটে ধুয়ে নেয়া হতো।
সেই চাল ডালের সাথে সবজি একসাথে মিশিয়ে নরম খিচুড়ি রান্না করতো।
সবাই গোল হয়ে চুলার পাশে বসে দেখতো কতোক্ষণে রান্না শেষ হবে।।ইরা মালতীদি কে বারবার জিজ্ঞেস করতো ও দিদি আর কতোক্ষণ?
রান্না হয়ে এলে মালতী ঘর থেকে একটু ঘী এনে খিচুড়ির হাড়িতে দিয়ে দিতো।
সেই গন্ধ নাকে আসতেই সবাই কলাপাতা নিয়ে বসে পরতো উঠানে।
সবার পাতে একটা করে ডিম সিদ্ধ আর কয়েক হাতা নরম খিচুড়ি।
আহ্ কি স্বাদ ছিলো সেই রান্নায়।
বাবাই দিশাকে নিয়ে ঘরের বাইরে খেলছে,দোলা ঘরে ঠোঙা বানাচ্ছে।
ইরা দোলার হাতে একশো টাকা দিয়ে বলে একটু ঘী এনে দিতে পারবি?রাতে খিচুড়ি রান্না করবো।
দোলা মুরগি টা কেটে ধুয়ে ফ্রিজে রেখেছে।
তখনই মনে হচ্ছিল যদি সাথে পোলাও বা খিচুড়ি হতো তাহলে বেশ হতো।
আসলে তারা তো প্রতিদিন ভালোমন্দ খেতে পারে না তাই যেদিনই খায় সেদিন একটু আয়োজন করেই খেতে চায়।
ওর ঘরে কয়েক কৌটো চাল আর একটু মুসুরের ডাল পরে আছে।
মাসের এখনো দশদিন বাকি তাই মুখে বলার সাহস হয়নি।
যাক ইরা ওর মনের কথাটাই বলে দিয়েছে।
ও বলে, একটু পর বের হবো তখন নিয়ে আসবো।
সন্ধ্যায় শুভ বাচ্চাদের নিয়ে বসেছে, দোলা গেছে ঠোঙা দিতে আর ইরা রান্নাঘরে খিচুড়ির আয়োজন করছে।
ঘরে কিছুটা মুগডাল আছে আর কিছুটা মুসুরের ডাল আছে।
পোলাও এর চাল তো নেই তাই ভাতের চাল দিয়েই রান্না করবে।
মুগ ডালটা আগে ভেজে একটু ভাপ দিয়ে নেয়।বাকি চাল ডাল একসাথে মিশিয়ে ধুয়ে নেয়।
এরপর চুলায় হাড়ি বসায়,
শুকনো মরিচ,জিরা আর গরম মসলা ফোড়ন দেয়।
একটু বেশি পেয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে নেয়, পেয়াজ লালচে হয়ে এলে আদা জিরা বাটা হলুদ আর সামান্য মরিচের গুড়ো দিয়ে মসলা কসিয়ে নেয়।
অল্প অল্প জল দিয়ে দুই তিনবার কসায়।
তারপর সব চাল ডাল দিয়ে একটু ভেজে নেয়।তারপর পরিমান মতো গরম জল দিয়ে দেয়।
অন্য কড়াইয়ে মাংস বসিয়ে দেয়।
একটু আলু দিয়ে মাংস রান্না করবে যেনো দুইবেলা চলে যায়।
এখন যেহেতু সকালে সে বাইরে যাবে তাই ঠিক করেছে আগের দিন অল্প কিছু করে রাখবে।
মাংস টা আগে একটু মসলা দিয়ে মাখিয়ে রাখে আলুটা একটু ভেজে নিয়ে তারপর সেই কড়াইয়ে মাংস রান্নাটা বসিয়ে দেয়।
ইরা আবার ফিরে যায় সেই নিশ্চিন্তপুর গ্রামে।
যেদিন মা মুরগির মাংস রান্না করতো সেদিন সকাল থেকেই একটু ব্যস্ততা থাকতো।বাড়িতেই মুরগি কাটাকাটি করতো তারপর বাইরের কল থেকে ধুয়ে রান্নাঘরের বারান্দায় দিয়ে যেতো পাশের বাড়ির সুবল দা,কারণ কাটাকুটির দায়িত্ব টা তার থাকতো,তবে সেদিন সুবল দা এই বাড়িতেই খেয়ে যেতো।মাটির চুলায় কড়াই বসানোর পর আর বেশি সময় হতো না তাই আগেই সব মসলা পাতি কেটে বেটে তৈরী করে রাখতো মা।
মায়ের হাতে হাতে শুকনো মরিচ, জিরা আর গরম মসলা বেটে দিতো কাকলী মাসি।

গরম ধোঁয়া উঠা কড়াইয়ে একের পর এক সব মসলা পরতো আর সারা বাড়ি গন্ধে ম-ম করতো।
সব শেষে গরম মসলা বাটা দিয়ে কড়াই অল্প আচে ঢেকে রেখে মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতো।

ইরা অবশ্য তার আগেই একটা বাটি নিয়ে মায়ের পাশে বসে যেতো ঝাল লবণ পরীক্ষা করার জন্য।
মা তার বাটিতে এক টুকরা মাংস আর এক টুকরো আলু তুলে দিতো।
ইরা বেশ সময় নিয়ে বাটিটা শেষ করতো।
মায়ের রান্নার স্বাদ ইরার মুখে আজও লেগে আছে,সে হাজার চেষ্টা করেও সেই রকম রান্না করতে পারেনা।

তবে এখন বাবাই সেই কাজটা করে,
একটু মাংস পেলেই খুশি হয়ে যায়। মায়ের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায়।
দোলা চলে এসেছে, খিচুড়িও প্রায় হয়ে গেছে এবার উপর থেকে একটু ঘী ছড়িয়ে চুলা বন্ধ করে দেয়।
কড়াইয়ে ঝোল একটা বাটিতে ঢেলে রেখে ইরা নিজের ঘরে চলে যায়।ইরা খেয়াল করেনি আজ তার রান্নার গন্ধেও এই ছোট্ট বাড়িটা ম-ম করছে তাই ঘর থেকে শুভ বেরিয়ে এসে দেখে গেছে আর অপেক্ষা করছে আর কতোক্ষণ লাগবে।
রাতের আকাশে একটা বড় চাঁদ উঠেছে আজ ইরা ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে,এটাতেই ওর সুখ ছেলে আর স্বামীর মুখে হাসি এর চেয়ে বেশি কিছু তো আর চাহিদা নেই তার।

সকাল আটটায় দিয়ার বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠে।
দোলা আর ইরা একসাথে চলে এসেছে,দোলা দুজনের সাথে কথা বলে সময়টা একটু এদিক সেদিক করে নিয়েছে আজ থেকে।
ইরা সকালেই আসবে কিন্তু দোলা আসবে এগারোটার পর।
দোলা এই বিল্ডিংয়ে আরেক বাড়ি কাজ করে তাদের সাথে কথা বলে সময়টা ঠিক করে নেয়।
আজ অবশ্য কাজ করে চলে যায় কিন্তু কাল থেকে পরে আসবে।
সকালে ইরা রুটি,সবজি আর ডিম ভাজি করেছে।
এটাও দিয়ার কাছে ভালো লাগছে,সবজিটা খুব স্বাদ হয়েছে।
এতোদিন সে এক ফোটাও শাক সবজি খেতে পারতো না সব কিছুই গন্ধ লাগতো কিন্তু আজ মনে হয় দুটো রুটি বেশি খাবে।
দিয়া একফাঁকে রান্নাঘরে ঢুকে চা বানায়।
রায়ানের আজ একটু তাড়া আছে তাই আগেই বেড়িয়ে গেছে।দুপুরের দিকে এককাপ চা দিয়ার চাই ই চাই,ইরা রান্নার জন্য সবজি কাটছে দিয়া কাজের ফাঁকে ওর সাথে গল্প করছে।

যে মানুষটাকে নিজের ঘরে এনেছে তার সম্পর্কে কিছু জানা থাকা দরকার।

দিয়া দুই কাপে চা ঢেলে একটা ইরার হাতে দিয়ে আরেকটা কাপ নিয়ে খাবার টেবিলের পাশে বসে।
ইরাকে ওর গ্রামের কথা পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করে।

ইরা সব খুলে বলে,শুভর কাজের কথা বলে,সপ্তর্ষির কথা বলে।
ইরাকে আজ বেশি কিছু রান্না করতে হবে না,রাতে দিদির একটা নিমন্ত্রণে যাওয়ার আছে তাই দুপুরের জন্য একটু মাছের মাথা আর সরিষা বাটা দিয়ে পুই শাক আর ছোট চিংড়ি দিয়ে মুসুর ডালের চচ্চড়ি করেছে।

দিদি রাইস কুকারে ভাত রান্না করে নেবে তাই সব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।
ইরার হাতে এখনো বেশ কিছুটা সময় আছে তাই সে দিদিকে জিজ্ঞেস করে আর কিছু করতে হবে কি-না?
দিয়া এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো, ইরার কথা শোনার পর ওর কিছু বলার ভাষা নেই।
একটা ভদ্র সচ্ছল পরিবারের মেয়ে আজ শুধুমাত্র পরিস্থিতির শিকার!
ইরার কথাবার্তা কাজের ধরন দেখলেই বোঝা যায় ও অন্য কাজের মেয়েদের চেয়ে আলাদা কিন্তু তাই বলে।
আর রান্নার হাত তো অসাধারণ, কাল একটা মাছের ঝোল করেছিলো সেটাই অসম্ভব সুস্বাদু হয়েছিলো আর আম ক্ষীর তো এখনো মুখে লেগে আছে।
ওর জন্য একটা কিছু করতে পারলে নিজের কাছেই ভালো লাগবে।
দিয়া কথাগুলো নিজের মনে ভাবছিলো।
ইরার গলা শুনে বললো,আর কিছু লাগবে না, বোস গল্প করি।
তুই এতো ভালো রান্না কার কাছ থেকে শিখেছিস?
ইরা মিষ্টি হেসে বলে,আমি তো কিছুই পারিনা দিদি।
আজকাল তোমরা কতো আধুনিক রান্না করতে পারো আমি তো এসব পারিনা।
মায়ের কাছ থেকে যতদূর যা শিখেছিলাম।আমার মা শিখেছিলো তার মা আর শাশুড়ির কাছ থেকে তারপর নিজের মতো করেছে।
আমার মায়ের বাবার বাড়ির সঙ্গে শশুর বাড়ির রান্নার মিল ছিলো না,মা এসে দুই জায়গার খাবারকে এক থালায় পরিবেশন করেছে।

আমিও এখন নিজের মতো করি।
আসলে পরিমাপ আর রান্নার ধরন জানা থাকলে সব রান্নাই ভালোভাবে করা যায়।
ইরার কথা শুনে দিয়া আরও অবাক হয় এতো সুন্দর ধারণা যার মনে আছে সে কেন চারদেয়ালে নিজের গুণকে আটকে রাখবে?চলবে,,,,,,

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৩

ইরাবতীর চুপকথা
পর্ব ৩
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

দোলা সকালে বাবাই আর দিশাকে স্কুলে দিয়ে কাজে বেরিয়ে যায়।
ইরা সেই সময়টা বাড়িতে থাকে,তিনঘন্টা পর ইরা গিয়ে দুজনকে নিয়ে আসে।
ইরা ভেবে দেখে ও চাইলে সেই সময় টা কাজ করতে পারে,যেহেতু স্কুলের কাছেই বাড়িটা তাই ফেরার সময় বাচ্চাদের নিয়ে ফিরে আসবে।
শুভ একটু ইতস্তত করলেও ইরা ওকে রাজি করিয়ে নেয়।
দোলা নিজেও থাকবে ঘন্টা খানিক তাই কোনো অসুবিধা হলে ওর সাথে চলে আসবে।
শুধু রান্নার জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা!
ওর সংসারে এটা অনেক বড় অংক,বাবাইয়ের পড়াশোনায় অনেক সাহায্য হবে।
দোলা ইরাকে নিয়ে আসে একটা এপার্টমেন্টের সামনে স্কুলে আসা যাওয়ার পথে এই বাড়িটা ইরা প্রতিদিন দেখে কিন্তু এই প্রথম ভেতরে ঢুকেছে।

দিয়া দিদিদের বাড়ি ছয় তলায়,ইরা ভেবেছে সিড়ি বেয়ে উঠতে হবে কিন্তু না,লিফট নামের একটা মেশিনে করে এক মিনিটেই ছয় তলায় পৌছে যায়।
দিয়া দিদি বাড়িতেই আছে,আর দাদাবাবুও আছে।
ইরা ভেবেছিলো তাদের স্যার মেডাম ডাকতে হবে কিন্তু দোলা বলেছে দিয়া দিদি ওসব আদবকেতা পছন্দ করে না।সে নিজেই বলেছে দাদা দিদি ডাকতে।
দোলার পাশে আরেকজনকে দেখে দিয়া অবাক হয়।
দোলা বলে,তুমি না কয়েকদিন ধরে একটা রান্নার লোক খুজছিলে তাই ওকে নিয়ে এলাম দিদি!
ও আমার বোনের মতো আমরা একই বাড়িতে থাকি আর ও খুব ভালো রান্না করে।
তোমার সাথে দেখা করাতে নিয়ে এলাম।”
দিয়া ইরার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে,আর পাচটা কাজের মহিলার চেয়ে অনেক আলাদা।পোশাক আশাকও ঠিক ঠাক।কথা বেশি কিছু বলছেনা।
দিয়ার সত্যিই এখন খুব খারাপ অবস্থা, ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট তার উপর ঘরে কেউ নেই।
রান্না করতে গেলে খুব খারাপ লাগে,আর কোনোকিছু খেতে ভালো লাগে না।
নিজের বাবার বাড়িতেও কেউ নেই যে আসবে।
শশুর বাড়িও অনেক দূরে তারা কেউ সাহায্য করবে না।
তাই কাজের লোকেরাই ভরষা।
দোলা দের বছর ধরে কাজ করছে খুব ভালো মেয়েটা।তার ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।
দিয়া ইরাকে বলে,আমি কিছুই খেতে পারি না মুখে কোনো স্বাদ নেই একটু ভালো কিছু রান্না করো।
ইরা মাথা নেড়ে বলে,আমি চেষ্টা করবো দিদি।
ইরা একফাঁকে দেখে নেয় দিয়া একটা বাটিতে দুধের মধ্যে কি সব দিয়ে খাচ্ছে ওর মধ্যে কলা আর খেজুরটা চিনতে পারছে।
দিদি মুখে দিচ্ছে কিন্তু তেমন স্বাদ পাচ্ছে না তা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
বাচ্চা পেটে থাকলে কতো ভালোমন্দ খেতে হয় আর সেখানে দিদি এসব কি খাচ্ছে?
দিয়া বলে এখানে তুমি কোনো লজ্জা পাবে না,স্বাধীন ভাবেই কাজ করবে।
আমার স্বামী সারাদিন বাড়ি থাকে না ওর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর ব্যাবসা তাই খুব ব্যাস্ত থাকে।
আমিও একই কাজ করি কিন্তু এখন বাড়ি থেকেই কাজ করছি।
ইরা একটু সাহস করে বলে আপনি এগুলো কি খাচ্ছেন দিদি?
দিয়া উত্তরে বলে,আমাকে দিদি বলছো আবার আপনিও?
আমাকে তুমিই বলবে।
আর এটা ওটস।
ডাক্তার বলেছে পুষ্টিকর খাবার খেতে, তাই ইচ্ছে না থাকলেও এগুলো খাচ্ছি।

আচ্ছা,তাই হবে।
আগে বলো তোমার রান্নাঘর কোথায়,আমি একটা কিছু বানিয়ে নিয়ে আসি,ইরা বললো।

দোলা এতোক্ষণ সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো এবার ও কাজে যায় এখানে বেশি সময় থাকলে পরের বাড়িগুলোতে যেতে দেরী হয়ে যাবে।
দিয়া ইরাকে নিজের রান্নাঘরে নিয়ে যায়।
ইরা একটু চোখ বুলিয়ে নেয়,একটু অগোছালো কিন্তু সব কিছুই আছে।
দিয়া আবদারের সুরে ইরাকে বলে,
একটা ভালো কিছু বানিয়ে দে,সকাল থেকে একটু ওটস ছাড়া কিছুই খাইনি।
ইরা মনে মনে ভাবে, এটাই তার পরীক্ষা, এখানে পাশ করতেই হবে।

ইরা একটা প্যানে কিছুটা দুধ জ্বাল করতে বসায়।
এখন থেকে এখানে ওর রোজ আসতে হবে তাই একটু গুছিয়ে নেয় নিজের মতো করে।
একটা কৌটোতে পোলাওয়ের চাল আছে দেখে মাথায় একটা চিন্তা আসে।
ইরা ফিরে যায় নিজের ছোট বেলায়,,,
প্রতি বছর জৈষ্ঠ্যমাসে তার মা গ্রামের কয়েকজন মানুষকে ফলাহার করাতো।
সকাল থেকেই তার তোড়জোড় শুরু হয়ে যেতো, মা একটা বড় মালশায় দুধ জাল করতে বসাতো তারপর উত্তরের কাঁঠাল গাছ থেকে দুই তিনটা কাঁঠাল নামানো হতো।
পশ্চিমের আম গাছেটার আম নাকি বেশি মিষ্টি কিন্তু আঁশ নেই তাই সেই গাছের পাকা আম ঝুড়ি ভরে পারা হতো।
দু’দিন আগেই বাড়ির পেছনের কলা গাছগুলোর কয়েক কাঁদী কলা ঘরের কোনায় রেখে দেয়া হতো পাকার জন্য।
আর বাড়ির ধানের চিড়া খই তো ছিলোই।
তারপরও গঞ্জের হাট থেকে বড় বড় রসগোল্লা আনা হতো।
দুপুর পরে সবাই চলে আসতো,বসার ঘরে নিচে সবার জন্য পাত পরতো।
সারাদিন জ্বাল করা দুধে ঘন সর পরে যেতো।
একবাটিতে দুধ আর অন্য বাটিতে আম,কাঁঠাল,কলা আর মিষ্টি।
সাথে বড় গামলায় থাকতো চিড়া আর খই।
সবাই নিজের মতো পেট পুড়ে খেতো।
বাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতেন।
ইরার মনে আছে,সেদিন রাতে বাড়িতে আর ভাত রান্না হতো না সবাই ওই একই খাবার খেতো তার অবশ্য অন্য কিছুতে আকর্ষণ ছিলো না সে শুধু একটা দুটো রসগোল্লা পেলেই খুশি।
মা বুঝতো তাই আগে থেকেই তার জন্য মিষ্টি সড়িয়ে রাখতো।

“কিরে কি ভাবছিস?”

দোলার আওয়াজে ইরার ভাবনার ছন্দ পতন ঘটে।

দুধ ফুটে ওঠেছে,হাতা দিয়ে একটু নাড়িয়ে দেয়।
ভাবছি কি রান্না করবো?

তোর হাতের ভর্তা ভাতও অমৃত,যাই করবি দিদি ঠিক পছন্দ করবে,আমি এবার যাই,নয়টা বেজে যাচ্ছে,তুই এগারোটার মধ্যে বেড়িয়ে যাস কেমন।
দাদাবাবু আর একঘন্টা পরে খাবার খাবে তারপর বেরিয়ে যাবে তাই একটু তাড়াতাড়ি করে নে।
কথাগুলো বলে দোলা চলে যায়।
দিয়া দিদি বসার ঘরে বসে ছোট কম্পিউটার কোলে নিয়ে কাজ করছে।
ইরা আবার রান্নায় মন দেয়।
দুধে কিছু ছোট এলাচ আর তেজপাতা দেয়।
কিছুটা পোলাওয়ের চাল ধুয়ে হাত দিয়ে আধভাঙ্গা করে জল ঝরিয়ে রাখে একটা আম কেটে রস বের করে নেয়,আর কিছু আম ছোট টুকরো করে রাখে
কিছুটা কিসমিস আর কাজু বাদাম সামনে রাখে।
দুধটা ঘন হয়ে এলে চালটা দুধে দিয়ে দেয়,অন্যদিকে কয়েকটা আলু ছোট ছোট করে কেটে কম ঝাল দিয়ে আলুর তরকারি করে।
এর মধ্যে দিদি একটা ফ্রোজেন পরোটার প্যাকেট বের করে দিয়ে গেছে।আজ এটা দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হবে কাল থেকে হাতে রুটি করতে হবে।
চাল ফুটে গেছে,এবার স্বাদমতো চিনি আর কিসমিস টা দিয়ে দেয়,চিনি দিয়ে কিছুক্ষণ জাল করে নেয় তারপর আমের রসটা দিয়ে ভালোভাবে নেরে আরো কিছু কিসমিস আর কাজু দিয়ে চুলা বন্ধ করে দেয়।ঠান্ডা হলে
কয়েক টুকরো আম উপর থেকে দিয়ে দুই বাটিতে পরিবেশন করে।
হয়ে গেলো “আমের ক্ষীর”
দশটা বাজার আগেই টেবিলে খাবার তুলে দেয়।
দিয়া আর ওর স্বামী একসাথেই খেতে বসে।
কিন্তু তার আগে সে ইরাকে একটা প্লেট সাজিয়ে দেয়।
ইরা রান্না ঘরে বসে খাবার নিয়ে তবে ওর মন পরে থাকে খাওয়ার টেবিলে। যদি তাদের পছন্দ না হয় তাহলে আজই তার চাকরি শেষ।
দিয়া পরোটার ছোট ছোট টুকরো আলুর তরকারি দিয়ে মুখে দিচ্ছে।
বেশ ভালো হয়েছে খেতে কিন্তু হলুদ রঙের পায়েস টা কিসের বুঝতে পারছে না।
প্রথম দিন না জানি কি করেছে?
রায়ান হয়তো মুখেই দিতে পারবে না।
রায়ান দিয়ার স্বামী।
প্লেট দেখে অবাক হয়ে আছে,পায়েসের মতো দেখতে কিন্তু উপরে ফল দেয়া জিনিসটার প্রতি তার নজর।
সকালে শুনেছে নতুন রান্নার লোক রাখা হয়েছে সে-ই নিশ্চয়ই এই এক্সপেরিমেন্ট করেছে কিন্তু অফিস যাওয়ার আগে এসব তার একটুও পছন্দ না। সে দিয়াকে বলে একটা ডিম ভাজি করে দিতে
তারপরও কৌতুহলে এক চামচ ক্ষীর মুখে তুলে।
রায়ান কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে বসে থাকে,অমৃত হয়তো এমন স্বাদেরই
হয়।
দিয়াকে আবার টেবিলে ডেকে নেয়,নিজের হাতে ওর মুখে এক চামচ তুলে দেয়।
দিয়ারও একই অনুভূতি।
দিয়া ইরাকে বলে, “এটা কি রান্না করেছো আমি তো পাগল হয়ে গেছি এক বাটিতে আমার মন ভরবে না
আমি রোজ এমন খাবার খেতে চাই।”

ইরা হেসে বলে, ঠিক আছে।
এই এক রান্নাতেই ইরার চাকরি পাকা হয়ে যায়, দিয়ার বাড়িতে।

দিয়া ইরার জন্য একটা বাটিতে ক্ষীর তুলে দেয় কিন্তু ইরা বলে আমার পেট ভরা খেতে পারবো না।
দিয়া বুঝতে পারে মায়ের মন সন্তানকে রেখে ভালো কিছু মুখে রুচবে না।

ইরা দুপুরের জন্য রান্না করে এগারোটার দিকে বেরিয়ে আসে,
বাবাই আর দিশার ছুটি হয়ে যাবে তাই।
আসার আগে দিয়া ইরাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয় বলে,এখানে কিছু ফল আছে বাড়িতে নিয়ে যা,আর এই বক্সে আম ক্ষীর আছে ছেলেকে দিবি।
ইরার চোখে কৃতজ্ঞতা।
যে মেয়েটা অন্যের হাত ভরিয়ে দিতো আজ সে অন্যের হাত থেকে নিচ্ছে,
নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে আসে।
ইরার জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
বাসায় ফিরে ইরা বাচ্চাদের ক্ষীর খেতে দেয়,ওরা খুব পছন্দ করে খায় এমন খাবার ওরা কখনো খায়নি তাই এতো মজা পেয়েছে।
ইরা বাচ্চাদের মুখে হাসি দেখে নিজের কষ্ট ভুলে যায়।

চলবে।

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০২

ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ২
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
দোলা দিশাকে নিয়ে শুয়ে আছে,দিশা মায়ের উম পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
ইরার কথাগুলো মনে পরছে।
“মা নিজের হাতে ঘী বানাতো,জমি থেকে সবজি তুলতো,,”
অন্য কেউ যদি এই কথা বলতো তাহলে হয়তো দোলা বিশ্বাস করতো না।
কিন্তু ইরার ব্যবহার আর রুচিসম্মত আচরণেই বোঝা যায় ও ভদ্র পরিবারের মেয়ে।
একটা একচালার হাফ বিল্ডিং ঘরটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে।
মাসের প্রথমে শুভদা ওর হাতে বেতনের টাকা দিয়ে দেয় এর মধ্যেই সুন্দর সংসার চালিয়ে নিচ্ছে।
ইরা অবশ্য দুই একবার বলেছে ওর জন্য কাজ খুঁজে দিতে কিন্তু শুভ দা রাজি হয়না।
ওর মতো মেয়ের কি এসব করা মানায়?

পদ্মা পাড়ের গ্রাম নিশ্চিন্তপুর।
সেই গ্রামের খুব অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে ইরাবতী।
বাবার অনেক জমিজিরাত,
বাড়িতে বাবা মা ছাড়া আরও অনেক লোক,কেউ গরু দেখার কাজ করে, কেউ ফসলের মাঠ দেখাশোনা করে।
বাবা খুব আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিল ইরাবতী, মেয়েটার মধ্যে খুব মায়া।
মা মেয়েকে হাতে ধরে ঘরকন্নার কাজ শিখিয়েছিলেন, নানা রকম রান্না জানতেন তিনি তার সব গুণ মেয়েকে দিয়েছেন।
গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে ফাইভ পর্যন্ত তারপর গঞ্জের হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছে।

দেখতে সুন্দর ছিলো তাই অল্প বয়সেই বিয়ের প্রস্তাব আসে।
শুভর বাবা গঞ্জে ধানের ব্যবসা করতো পাশের গ্রামে থাকতো।
ইরাকে পথে দেখে নিজের ছেলের জন্য পছন্দ হয়ে যায়।শুভ তখন একটা ভালো চাকরি করে শহরে।
গ্রামে জায়গা জমি আছে আর বাড়িতে অন্য কেউ নেই।তাই আর অমত করেনি কেউ।তারপর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর ইরা বেশ সুখেই দিন কাটে।
শুভ মাসে একবার বাড়ি যায়,ইরার শশুর কাজ পাগল মানুষ সারাদিন দোকান বাজার করে সন্ধ্যার পর হিসাব নিয়ে বসে।তবে বাড়িতে বউয়ের যেন কোনো অসুবিধা না হয় তার জন্য দুজন লোক রেখে দিয়েছিলেন।
রাত নয়টায় খাবার খেয়ে শুয়ে পরে আবার ভোর পাঁচটায় দিন শুরু করে।
দুই বছর পর সপ্তর্ষি আসে তাদের জীবনে।সুখের অন্ত থাকে না ইরা আর শুভর।
ইরার বাবার বাড়ি শশুর বাড়ি সবাই ওকে মাথায় তুলে রাখে।
আস্তে আস্তে বাবাই একটু বড় হয়।ইরার স্বপ্ন ছেলেকে গঞ্জের বড় স্কুলে পড়াবে।সেই জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করা শুরু করে।
সবকিছুই ভালো চলছিলো কিন্তু হঠাৎ পদ্মা তার সর্বনাশা রুপ দেখানো শুরু করে।
নিশ্চিন্তপুরে ঝড় আসে,নদী গ্রাস করে নেয় ইরার বাবার বাড়ির সব জমিজমা।
বসত বাড়িটাও তিনদিনের মাথায় বিলীন হয়ে যায় ক্ষ্যাপা পদ্মায়।
বাবা অনেক আগেই চলে গিয়েছিলো তাই এই দৃশ্য তাকে দেখতে হয়নি
কিন্তু ইরার মা পাগল প্রায় হয়ে ছুটে আসে মেয়ের কাছে।
ইরার শশুর বাড়ির গ্রামে সেবার জল আসেনি।
ইরা মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারে না যে মানুষটার রান্না খেয়ে তার মনে হতো সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা সেই মা মুখে খাবার তুলে না,চোখের সামনে সব হারিয়ে যেতে দেখেছে যে নারী সে কিভাবে ভালো থাকবে?
ইরাবতীর মা এই শোক সহ্য করতে পারেনি,তিন মাসের মাথায় দূর আকাশে পাড়ি জমায়।
দেখতে দেখতে বছর ঘুরে, এক মহামারী শুরু হয় দেশ জুড়ে।
হঠাৎ শুভর চাকরি চলে যায়,বাড়ি ফিরে আসে।বাবার কাজে বসতে চায়।কিন্তু শশুরের ধানের ব্যবসায় ভাটা পরে অনেকটা ধানের জমি চলে যায় পদ্মার কবলে।
বসত বাড়িটাই সম্বল,প্রতিটা রাত কাটে অজানা ভয়ে নদী ধিরে ধিরে কাছে আসতে শুরু করে।
একদিকে মহামারী অন্যদিকে ভয়াল পদ্মা ইরার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়।
ইরার শশুর ঘরে বসে থাকতে পারে না জোর করেই বাইরে যায় একদিন ঠান্ডা জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরে।
শুভ শিক্ষিত ছেলে তাই বাবার রোগের লক্ষণ বুঝতে পারে,ইরা আর বাবাইকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
দিন সাতেক রোগে ভুগে তিনিও পারাপারে পাড়ি দেন।
শুভ অথৈ সাগরে পরে,ব্যবসার কিছুই জানে না,জমি জমার হিসেব রাখেনি আগে কোনোদিন।
শহরে চাকরি করতো,মা চলে যাওয়ার পর বাবা একা হাতেই গ্রামের বাড়ি দেখাশোনা করেছে।সবকিছুই ওর কাছে এলোমেলো হয়ে গেছে।
একদিকে চাকরি নেই হাত খালি আর অন্যদিকে নদী ভাঙন সব চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে তবুও কিছু করার নেই।
মহামারীর প্রকোপ একটু কমার পর শুভ আবার কাজের খোঁজে শহরে আসে,কিছু অভিজ্ঞতা থাকার কারণে একটা চাকরি জুটে যায় কিন্তু বেতন আগের তুলনায় অনেক কম।
শুভ তাতেই রাজি হয়ে যায়,কাজ শুরু করার কিছুদিন পর আবার বন্যা শুরু হয়।এবার ইরাদের গ্রামের বাড়ির দিকে ধেয়ে আসে পদ্মা।
শুভ অনেক কিছু ভেবে ইরা আর বাবাইকে নিয়ে আসে শহরে।
তারপর এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে চলছে প্রতিটা দিন।
মাথা গুজার একটা ঠাই আর দুবেলা খাবারের জোগাড় করতেই কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছে।
তবুও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে শুভ বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম করছে।
অফিস থেকে ফেরার সময় একটা পত্রিকা নিয়ে আসে এই অভ্যাস তার বহুদিনের।
একটু পর বাবাই পড়তে বসবে, পাশের ঘরের দিশা ও আজকাল পড়তে আসে।
মেয়েটা খুব চটপটে,পড়ায় খুব ভালো।
ও যদি পড়াশোনা টা ভালোভাবে করতে পারে একদিন ঠিক মায়ের কষ্ট দূর করবে।

বাবাই পড়ায় খুব ভালো।শুভ ওদের পড়ায় ঠিকই কিন্তু আজকালকার নতুন নিয়মের অংক ওর খুব কঠিন লাগে। সে নিজে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছে অনেক আগে তারপরও চেষ্টা করে।
যদি কয়েকটা বেশি টাকা আসতো সংসারে তাহলে ছেলেটাকে একটা প্রাইভেটে দিতে পারতো।

ইরা সবার জন্য চা করেছে আর বাচ্চা দুটোর জন্য “গোলা রুটি”
একটা বাটিতে কিছুটা আটা, চিনি,দুধ আর অল্প একটু লবণ একটু এলাচিগুঁড়া দিয়ে একটা পিঠার মতো মিশ্রণ তৈরি করে নেয়।
তারপর রুটি তাওয়ায় একটু তেল দিয়ে একহাতা করে গোলা দিয়ে একটু ঘুরিয়ে দেয় কিছুক্ষণের মধ্যেই নরম তুলতুলে গোলা রুটি তৈরি।
গরীবের প্যান কেক বলা যায় এটাকে।
বাবাইকে প্রতিদিন দুধ খাওয়ানোর ক্ষমতা তার নেই তাই একটা ছোট দুধের প্যাকেট কিনে এটা সেটার সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দেয়।
ঘরের একটা বাচ্চা খাবে এর একজন খাবে না এটা কখনও করতে পারে না ইরা তাই অল্প হলেও দুজনের জন্যই করে।
ওরা চা মুড়ি খেয়ে নিবে।
আজ আর টিভি দেখতে পারবে না, শুভ বিকেলে বাজার নিয়ে এসেছে।
বাজারের ব্যাগের এক কোণে উঁকি দিচ্ছে কিছু “বক ফুল”।
এই ফুল ইরার খুব পছন্দের এটা শুভ জানে তাই হয়তো নিয়ে এসেছে।
কিন্তু না জানি কতো এর কতো দাম।

দোলা দুইটা ডিম নিয়ে এসেছে রান্নার জন্য।
ওর ঘরে আজ আর অন্য কিছু নেই,দুপুরে একহালি ডিম কিনে এনেছিল তার দুটো আগেই রান্না করেছে এখন বাকি দুটো আছে।
দুপুরে ইরার ঘরে খেয়েছে এইবেলা যদি ওকে কিছু না দেয় তাহলে খারাপ দেখাবে তাই ইরার হাতে দুটো ডিম ধরিয়ে দেয়।
“এগুলো দিয়ে রাতের জন্য কিছু করে নে,আমি সবার জন্য ভাত এক হাড়িতে বসিয়ে দিচ্ছি”
অনেক সময় সব বুঝলেও মুখে কিছু বলতে হায়না,তাই ইরা ডিম গুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে।
ডিম দুইটা আর মানুপা পাঁচজন!
রাতে ইরা রান্নাঘরে থাকলে দোলাও ওর পাশে আসে দুজনে টুকটাক কথা বলতে বলতে রান্না করে।
আর ইরা কি যে সুন্দর গুছিয়ে রান্না করে দেখতেও ভালো লাগে।
ইরা দোলাকে দেখে বললো,
একটু আলু আর কিছু পেয়াজ কুচি করে দে তো,আমি ডিমগুলো ভেজে নিচ্ছি।
দুটো ডিম একটু লবণ দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নেয়।
তারপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে ডিমটা টুকরো টুকরো করে ভেজে নেয়।
দুইবারে পাঁচ টুকরো করে।
আবার তেল দিয়ে একটা শুকনা মরিচ,তেজপাত একটু গরম মসলা ফোড়ন দেয়।
এবার কুচোনো পেয়াজ আর কয়েকটা কাচা মরিচ দিয়ে দেয়।
পেয়াজ একটু ভাজা ভাজা হয়ে এলে আদা রসুন বাটা আর একটা টমেটো কুচি দিয়ে দেয়। আদা রসুনবাটা একটু কশিয়ে নিয়ে এর উপর হলুদ গুড়ো আর মরিচের গুড়ো দিয়ে দেয়।
মসলা আরও কিছুক্ষণ কসিয়ে নিয়ে
আলু কুচিটা দেয়।
কিছুক্ষণ ঢেকে রান্না করে,আলুটা একটু নরম হয়ে এলে এক কাপ গরম জল দেয় সিদ্ধ হওয়ার জন্য ঢাকনা দিয়ে দেয়।
অন্য পাশে বকফুলের শাঁসটা বের করে নিয়ে ফুলগুলো ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখে।
ততক্ষণে আলুর ঝোল ফুটে গিয়েছে উপর থেকে ভাজা ডিমগুলো আর কিছু চেরা কাচা মরিচ দিয়ে দেয়।
ঘরের বাইরে একটা লেবু গাছ আছে সেখান থেকে দুই তিনটা পাতা এনে দুই ভাগ করে ছিড়ে গরম ঝোলের উপর দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দেয়।
এইতো হয়ে গেলো “ডিমালুর ঝালঝোল”।
দোলা ভাত নামিয়ে দুপুরের ডালটা গরম করে নেয়।
সে চুলায় একটা কড়াই বসিয়ে দেয়
বকফুল গুলোর বড়া হবে।
ইরা চালের গুড়ায় হলুদ, লবণ আর এক চিমটি কালোজিরা দিয়ে একটা পিঠালি বানিয়ে নেয় সাদা রঙের বকফুল গুলো একটা একটা করে পিঠালিতে গড়িয়ে নিয়ে গরম তেলে মুচমুচে করে ভেজে নেয়।
বড়া ভাজার গন্ধ পেয়ে বাবাই আর দিশা একটু উঁকি দেয়।
দোলা একটা বাটিতে ওদের দুটো বড়া দেয়।
ছেলেমেয়ে দুটো খুশি হয়ে যায়,
গরীবের সুখ কতো অল্পতেই লুকিয়ে থাকে।
ওর দুজন পিঠোপিঠি বাইরে থেকে দেখলে সবাই বলে দুই ভাই বোন।
রাতে শুভ, দোলা আর ইরা একসাথে খেতে বসে।
বাচ্চারা আগে খেয়ে নিয়েছে,সারাঘর ডিমালুর ঝোলের গন্ধে ম-ম করছে।
আজকে মনে হয় সবার একমুঠো ভাত বেশি লাগবে।
দোলার মাথায় একটা কথা সেই বিকেল থেকেই ঘুর ঘুর করছে কিন্তু বলতে পারেনি।
এখনই সুযোগ!
শুভদাকে দোলা বলে,
“জানো শুভদা আমি প্রাইমারি স্কুলে পাশে একটা বাড়ি কাজ করি সেই বাড়ির বউদিটা খুব কষ্টে আছে।
মেয়েটার বাচ্চা হবে কিন্তু ঘরে কেউ নেই দাদাবাবু ব্যাবসা করে সকালে বেরিয়ে যায় আবার বিকেলে ফিরে আসে।
মেয়েটা হাত পুড়িয়ে রান্না করে ঠিকই কিন্তু কিছুই মুখে তুলতে পারেনা।
এই সময় তো কত্তো সমস্যা হয়।
বাড়িতে অন্য কেউ থাকেনা শুধু বউদি একা থাকে।আমাকে বলছে একটু বেশি সময় থাকতে রান্না করতে কিন্তু আমি তো অন্য কাজ করি।
আর রান্নাটাও ভালো পারিনা,তুমি কি ইরাকে ওই বাড়িতে নিয়ে যেতে দেবে?
ও শুধু রান্না করে দিয়ে আসবে।
ওরা বেশ ভালোই টাকা পয়সা দেবে বলেছে।
তুমি কি রাজি?”

চলবে,,,

ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০১

#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ১
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

ইরার মনটা খুব খারাপ লাগছে,ছেলেটা একটা চকলেট চেয়েছিলো কিন্তু সে দিতে পারেনি।
অন্য দিন হলে হয়তো খারাপ লাগতো না কিন্তু আজ সপ্তর্ষি স্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে তাই মায়ের কাছে আবদার করেছিলো।
মাসের প্রায় শেষ ইরার হাত একদম খালি।স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব খুবই কম প্রতিদিন হেটেই যায় আসে তাই টাকা নেয় না।
কিন্তু আজ ছেলেটার জন্য খুব খারাপ লাগছে।
তার হাতে যদি সে আরও কিছু বেশি টাকা থাকতো তাহলে হয়তো ছেলেটার সখটা পূরণ করতে পারতো।
গরিবের এই এক সমস্যা সখ অনেক কিন্তু হাত সংগতি দেয় না।
যাই হোক,ছেলেটার মন ভালো করতে হবে।
সপ্তর্ষির নামটা ইরা নিজেই রেখেছিলো,ভেবেছে ছেলেটার ভবিষ্যত তারার মতোই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে কিন্তু দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখনই হাপিয়ে উঠছে।ছেলেটা মাত্র ক্লাস ফোরে আরও তো সময় পরেই আছে।
কিভাবে কি করবে?
শুভ গার্মেন্টসে চাকরি করে ওর বেতনের টাকায় কোনো রকমে মাস চলে।
মাসে দুএকবার মুরগির মাংস কেনা হয় সেটাই ছেলেকে ভাগে ভাগে রান্না করে দেয় কিন্তু আজ তো সেটাও নেই।
ইরা ফ্রিজ খুলে দেখে কয়েক টুকরা রুই মাছ আছে আর কিছু সবজি।
আজ বাজার করা হয়নি,শুভ বলেছে কাজ থেকে ফেরার পথে ভাঙা বাজার থেকে কিছু নিয়ে আসবে
তখন সবজির দাম কিছুটা কম থাকে।

ইরা মাছটাই বের করে নেই।
রান্নাঘর বলতে সামনের বারান্দার এক কোণে চুলা রাখা সেখানেই দুই পরিবারের রান্না হয়।
পাশাপাশি দুই ঘরে দুই পরিবারের বাস।ইরা ঘর থেকেই সব কাটাকুটি করে গুছিয়ে নিয়ে যায়।
পাশের ঘরে দোলা থাকে ওর মেয়ে দিশাকে নিয়ে।
ছেলেকা ইরা আদর করে বাবাই বলেই ডাকে।
বাবাই স্কুল থেকে ফিরে দিশার সাথে খেলতে যায়।
দোলা কাজে বেরিয়ে গেলে মেয়েটা একা থাকে তাই ইরা ওর খেয়াল রাখে।
শহরে এই একটা সুবিধা এক বাড়িতে দুই বা তিন পরিবার থাকে হয়তো সম্পুর্ণ অচেনা সবাই এক ছাদের নিচে থাকতে থাকতে আপন হয়ে ওঠে।
ইরা গ্রামে থাকতে এগুলো চিন্তাও করতে পারতো না কিন্তু গত দুই বছরে সব কিছুতেই মানিয়ে নিয়েছে।

ইরা দুই টুকরো মাছ আর একটা বড় সাইজের আলু খোসা ছাড়িয়ে লবণ হলুদ মাখিয়ে অল্প তেলে ভেজে নেয় পাশের চুলায় কয়েকটা কাঁকরোল ভাপে বসিয়ে দেয়।
অন্যদিকে কিছু পেঁয়াজ, কাচামরিচ আর আদা কুচি করে নেয়।
মাছ ভাজা হয়ে গেলে সেই কড়াইয়ের মধ্যে কয়েকটা শুকনো মরিচ লাল করে ভেজে নিয়ে সেই তেলে পেঁয়াজ, মরিচ আর আদাটা একটু নরম করে ভেজে নেয়।
ততোক্ষণে কাঁকরোল ভাপ দেয়া হয়ে গেছে।
এবার সব কিছু এক করার সময়।
মাছের কাটা বেছে আলুর সাথে মেখে নেয়।
শুকনো মরিচ টা ভালোভাবে চটকে তার মধ্যে দেয় পেঁয়াজ মরিচ আদার বেরেস্তাটা।কিছুটা আলাদা করে রাখে।
তারপর মাছ আলু ভর্তার সঙ্গে সেগুলো একটু লবণ আর সরিষার তেল দিয়ে মেখে নেয়।
এবার কাকরোল এর ভেতরের বিচি গুলো ফেলে দিয়ে সেখানে মাছের পুড়টা ভরে দেয়।
ছেলে মেয়েদের একফাঁকে গিয়ে দেখে আসে।
দুজনে মগ্ন হয়ে বসে কার্টুন দেখছে, দোলার ঘরে একটা ছোট্ট টিভি আছে।
বাবাই সেটা দেখার জন্যই ওখানে বেশি যায়।
ইরা এখানো টিভি কিনতে পারেনি,গত বছর বোনাসের টাকা দিয়ে শুভ একটা ছোট্ট ফ্রিজ কিনে দিয়েছে।
এখানে এটাও একটা সুবিধা দোলার ঘরে সন্ধ্যার পর দুজনে বসে টিভি দেখে আর দোলা ওর ফ্রিজটা নিজের মতো করেই ব্যবহার করে
দুজনের মধ্যে একটা অধিকার বোধের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে এই ক’বছরে।
দোলার মেয়েটা এবার ক্লাশ টুতে পড়ে বাবাই আর ও একসাথেই শুভর কাছে পড়তে বসে সন্ধ্যায়।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পাঁচজনের একটা পরিবার।
ইরা ভাতের চাল ধুয়ে নিয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দেয়।
একচুলায় ভাত বসিয়ে দেয়া আর তাতে দেয় একফালি মিষ্টি কুমড়া।
চালের গুড়োতে লবণ, হলুদ, মরিচ গুড়ো দিয়ে একটা পিঠালি বানিয়ে নেয় এবার সেই পুর ভরা কাঁকরোল গুলোতে পিঠালি ভরিয়ে গরম তেলে অল্প আঁচে মচমচে করে ভেজে নেয়।
বাবাই এই বড়াটা খুব পছন্দ করে ও এর নাম দিয়েছে “মাছ আলু বড়া”

অন্যদিকে ভাতে সিদ্ধ হওয়া মিষ্টি কুমড়া টা একটা থালায় নিয়ে ওর মধ্যে আলাদা করে রাখা পেয়াজ মাখাটা আরও একটু তেল লবণ দিয়ে মেখে নেয়।দু’টো পদতো হয়েই গেলো।

ইরা আবার ঘরের দিকে এগোয়,বাবাই আর দিশাকে স্নানের কথা বলে যায়।
কয়েকটা কাচা আম আছে সেগুলো দিয়ে পাতলা টক করে নেয়,বাবাই এটাও খুব ভালোবাসে।
একটা শুকনো মরিচ আর কিছু সরষে ফোড়ন দেয় তারপর ডুমো ডুমো করে কেটে রাখা আমগুলো দিয়ে দেয়,
উপর থেকে দেয় একটু হলুদ আর লবণ।
এরপর জল দিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখে।
সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি দিয়ে নামিয়ে নেয়।
এই বেলার জন্য রান্না শেষ,
দুপুর প্রায় একটা বাজতে যায়।
বাবাই একবার এসে দেখে গেছে রান্না কতদূর।

দোলা কাজ শেষ করে চলে এসেছে,ও চার বাড়িতে কাজ করে।
ঘর মোছা কাপড় ধোয়া আর অন্যান্য টুকটাক কাজ।
সন্ধ্যার পর ঠোঙ্গা বানায়।
তিন বছর আগে দিশার বাবা মারা যায়,দোলার নিজের বলতে আর কেউ নেই।এই শহরেই মেয়েকে নিয়ে থেকে যায়।
ঘুপচি বস্তিতে থাকলে মেয়েটাকে মানুষ করতে পারবে না তাই একটু কষ্ট করে একটা ভালো পরিবেশে থাকছে।
মেয়েকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াচ্ছে।
ইরা রান্না শেষ করে উঠে যায়,দোলা একটু পাতলা ডাল আর ডিম ভাজি করে নেয় দুজনের জন্য।
ইরা দোলাকে ডেকে নেয় নিজের ঘরে,
চল,আজ একসাথে খেতে বসি শুভ আজ দুপুরে আসবে না,একা খেতে ভালো লাগে না।
কথাটা বলা মাত্রই দিশা ওর ঘরে চলে আসে।
দোলা একটু ইতস্তত করছে কারণ সে বেশি কিছু করতে পারেনি শুধু ডাল কিভাবে নিয়ে যাবে?
ইরা ওর হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়।
কাঁকরোল পুর দেখে দোলার মনটা খুশি হয়ে যায়।
কতো বছর সরষে বাটা দিয়ে পুর খায় না,দিশার বাবা খুব পছন্দ করতো এসব খাবার।
কিন্তু মুখে দিয়েই বুঝতে পারে এটা অন্য রকম কিছু।অন্য সময়ে খাওয়া পুরের থেকে বেশ ভালো।
ইরার রান্নার হাত বেশ ভালো তাই খুব একটা অবাক হয়না।
দোলা জিজ্ঞেস করে, “কি দিয়ে বানালি এটা?
খুব স্বাদ হয়েছে রে,আলুর দমটাও অসাধারণ খেতে।
তুই এতো রান্না কোথা থেকে শিখেছিস?”

ইরা মুচকি হাসে,”এগুলো আমাদের বাড়িতে হর হামেশাই হতো।
আলুর দমটা কাল করেছিলাম আজ একটু জাল দিয়ে নিয়েছি তবে একটু ঘী দিতে পারলে আরও ভালো হতো কিন্তু ঘরে তো নেই।
মা নিজে বাড়িতে ঘী বানাতো,তারপর নিজেদের জমি থেকে সবজি তুলে আনতো,আর প্রায় প্রতিদিনই নতুন কিছু বানাতো।
এখন আর সেই দিন নেই,আমি কিছুটা শিখেছিলাম তাই এখন চেষ্টা করি।
কিন্তু মাছ মাংস আর ঘী কেনার সামর্থ্য তো নেই।
তাই জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি।
বাড়িতে মা শুধু মাছ দিয়ে এই পুর টা বানাতো আমার ঘরে তো আর এতো মাছ হবে না তাই কিছুটা আলু দিয়েছি।”
“তুই যা-ই বল,খেতে কিন্তু দারুণ হয়েছে।”

বাবাই আর দিশাও চেটেপুটে খেয়েছে ডাল টা ওদের দুজনের ভালো লেগেছে।
দোলা খাবার শেষ করে বাসন কটা ধুয়ে দিয়ে যায়।
দিশা মায়ের আঁচল ধরে নিজের ঘরে চলে যায়।
ইরা ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে দুপুরের ভাত ঘুমের আয়োজন করে।
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে আর ইরার মনের দুশ্চিন্তারা ভীড় করছে?
ছেলের ভবিষ্যৎ টা ভালো হবে তো?
শুভর বেতনের টাকায় এখন আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
কিভাবে কি করবে?
এসব ভাবতে ভাবতেই ইরা ডুবে যায় ঘুমের অতলে।

চলবে,,,,

রাগে অনুরাগে পর্ব-০৭

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৭
#সুহাসিনি_ফাতেহা

“তিতলি দমে গেল না। দমে যাবে বলে কী এতটা ঝুঁকি নিয়েছে? হেরে যাওয়ার পাত্রী সে নয়। ফারাজ খানের সাথে একটু কথা বলতে এসে যদি সেটা জ্বালানো হয় তাহলে এবার সত্যি সত্যি তিতলি ফারাজ খানকে জ্বালাবেই।” তাই সে ভীষন সাহস যুগিয়ে বলল,

“আপনি সত্যি মাঠে নামবেন স্যার?” আমার কিন্তু ফুটবল খেলা খুব পছন্দ! টিভিতে মেসি নেইমারের খেলা ও দেখি! কলেজে সুন্দর সুন্দর সিনিয়র ভাইয়ারা যখন খেলে আমার যে কি ভালো লাগে…”

“এই মেয়ে একদম চুপ! এক থাপ্পড় দিলে তো সোজা পাশের তাল গাছের উপর পড়বেন! এসব আজগুবি কথা আপনার মাথায় কই থেকে আসে হ্যাঁ?” বেয়াদব মেয়ে!”

“মনের ভেতর থেকে আসে স্যার?”

“আউট!”

ফারাজ খানের সাথে ঝগরায় জিততে না পেরে চঞ্চল তিতলির মাথা কাজ করছে না। তাতে কি? সময় তার ও আসবে তখন এই লোককে ছাড়বে না একদম ছাড়বে না। সপ্তাদশী উদাস মনে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। রুন্ধ মস্তিষ্কে বিরবির করে বললো,
“ কি খারাপ লোক তিতলি কে বলে থাপ্পড় দিলে নাকি তাল গাছের উপর পড়বে! তো বলি কি সাহস থাকলে থাপ্পড় মেরে দেখাতি ! আমি উপরে বসে বসে তোর মাথায় তাল ফেলতাম। তখন বুঝতি কত ধানে কত চাল।”

“কি বিরবির করছো তিতলি?”

পাশ থেকে পুরুষালী কণ্ঠ শুনে পাশে ফিরলো তিতলি। অয়ন কে দেখে বিনা দ্বিধায় জ্বিভ ফস্কে বলল,

“আপনার কাজিন ফারাজ খান আছে না ওই লোক টা একদম সুবিধার না ভাইয়া । কলেজে ও শুধু স্টুডেন্টদের ধমকের উপর রাখে। সবাই তো আড়ালে ভাল্লুক ফারাজ স্যার বলে ডাকে।”

“কি বলছো তুমি তিতলি? ভাইয়া শুনতে ফেলে কি হবে তুমি জানো?”

“শুনলে শুনোক আমার কি? ওনাকে আমি ভয় পায় না।”

অয়ন অসহায় চোখে তাকালো মেয়েটার মুখপানে। ছোট থেকে তুষারের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার ভালোই মেয়েটার স্বভাবের সাথে পরিচিত। মুখে যা আসে তাই বলে। তবে এটা অয়নের ভালোই লাগে। এমন চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে সে খুব পছন্দ করে। আর সে যদি হয় তিতলি তাহলে আর কি? কেন যেন ভয় হয় তিতলির দিকে অন্য নজরে তাকাতে! যদি তুষার তার সাথে বন্ধুত্ব চিহ্ন করে দেয়। ভাবনা বাদ দিয়ে আশপাশে তাকিয়ে দেখলো কোথাও ফারাজ খান নেই। তাই স্বঃস্থির নিশ্বাস ফেলল।
তিতলির দিকে চেয়ে স্নিগ্ধ কণ্ঠ বলল,

“সানগ্লাস টা তোমাকে অনেক মানিয়েছে তিতলি। ”

“আমি জানি ভাইয়া! আসার পথেও একজন বলেছে আমাকে মানিয়েছে ?”

অয়ন শক্ত কণ্ঠে বলল,

“কে বলেছে?”

তিতলির কি হলো কে জানে। সে ওই ছেলেটার কথা বলল না। বরং বলল,

“আপনার ফারাজ ভাইয়া বলেছে। আমাকে নাকি আগুন সুন্দরী লাগছে।”
বলে চঞ্চল তিতলি হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে এলো।

পেছনে রেখে গেলো অবাক, হতবাক,হতবিহ্বল চোখে চেয়ে থাকা অয়ন কে। সে যেন এখনো বুঝতে পারছে না মেয়েটার বলা কথাটা। ফারাজ ভাই! ফারাজ ভাই এই কথা বলবে? অয়নের জানামতে সে তো কোনো মেয়ের দিকে ও তাকায় না। আর সেখানে?…. ফারাজ ভাইয়ের সাথে কোনো ঝামেলা করলো না তো তিতলি! ভাই যদি রেগে যায়….. আর ভাবতে পারছে না অয়ন..। ত্রস্ত পায়ে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো।”

~~~~
ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ছয়টা।
ইতিমধ্যেই বরপক্ষ চলে যাওয়ার জন্য তাড়া করছেন। আয়েশার কান্না যেন থামছে না। বাবা মা ভাই সবাইকে ছেড়ে শশুড় বাড়িতে চলে যাবে। এটা যেন মেয়েটার মন মানছে না। ও কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। হেঁচকি উঠে গেছে মেয়েটার।

আমরুল খান নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ভদ্রলোকের চোখেও পানি। একমাত্র আদরের মেয়ে কে আগের মতো প্রতিদিন চোখের সামনে দেখবেন না। ভাবতেই ওনার কলিজা ফেঁটে যাচ্ছে। আয়েশা একে একে মা বাবা ভাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। আমরুল খান আর রুমানা বেগম বরপক্ষ চলে যাওয়ার সময় আয়েশার হাত সাইফের হাতে তুলে দিলেন,

আমরুল খান আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন,

“আমার মেয়েকে দেখে রেখো বাবা। আজকে তোমার হাতে আমানত হিসাবে তুলে দিলাম। আশা করি তুমি আমার মেয়েটাকে কখনো কষ্ট পেতে দিবে না। আমার বিশ্বাস আছে তোমার উপর।”

শশুড়ের কথায় সাইফ ভদ্রতায় ঠোঁঠ প্রসারিত করে হাসলেন। আবেগঘন কণ্ঠে জানাল,

“আমি আয়েশা কে কখনো কষ্ট পেতে দিবো না শশুড় আব্বু। আপনার মেয়ে আপনার বাড়িতে যেমন ছিলো,ঠিক তেমনই থাকবে। কোনো চিন্তা করবেন না আপনি।”

আমরুল খান, রুমানা বেগম দুজনের মনটা কিছুটা হালকা হলো।
ফারাজ খান ও এগিয়ে এলেন সেখানে। স্নেহে আয়েশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শাসনের সুরে বললেন,

“ওখানে কখনো কোনো সমস্যা হলে সোজা আমাকে ফোন করে জানাবি । সবার সাথে হাসি খুশি থাকবি। এখন কাঁদিস না।”——– বলতে বলতে ফারাজ খানের চোখ গেলো তিতলির মুখপানে। সপ্তাদশীর পেল্লব মুখখানার ওপর বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে বেয়াদব কেশগুচ্ছ। গোল মুখখানায় যেন রাজ্যের সকল মোহ নিহিত। তবে তা ফারাজ খানকে কাবু করতে পারলো না। তিতলি তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। তাতলি মুখ ভেঙচি কাটলো। ঠোঁট বেঁকালো মুখ বেঁকালো।

ফারাজ খান চোয়াল শক্ত করে আওড়ালো,

“সিংহ জেগে উঠলে যেমন হিংস্র হয়ে যায় ফারাজ খান জেগে উঠলে হিংস্র হতে সময় লাগবে না মিস তিতলি! — সাবধান করেছি শুনলেন না তো! এবার আমার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দেখান। আপনার পায়ের শিকল টানবো আমি। দেখি আপনি আর কতটা দৌড়াতে পারেন।”

.
.

আয়েশার কান্না দেখে তিতলির ও কেন যেন খুব কান্না ফেলো। সপ্তাদশী নিজের দিকটা উপলদ্ধি করছিল। কিন্তু চঞ্চল তিতলি অন্যভাবে ভাবছিলো যে, একদিন তাকেও তার সুন্দর নরম বিছানা ছেড়ে বাবা মা ভাই সবাইকে ছেড়ে — ❝ একজন পুরুষ মানুষের গায়ের ঘামের গন্ধের মাঝখানে শুয়ে থাকতে হবে ।❞
এটা নিয়ে সপ্তাদশীর মনে দুঃখে রীতিমত দুঃখবোধের শেষ নেই।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে বরপক্ষ রা চলে গেলো সে সময়। সাথে সাথে বিয়ে বাড়ির মানুষ জন ও কমে গেলো। কেউ কেউ চলে গেছে আবার কেউ কেউ থেকে গেছেন। অয়নদের একেবারে নিকটাত্মীয় রা একেবারে বৌভাত শেষ করে তারপর যাবেন।

তিতলি আসার সময় একটা ধূসর রঙা টপস জামা এনেছিলো। সফেদ রঙা গ্রাউন টা চেঞ্জ করে সেটা পড়ে নিয়েছে। কি যে গরম বলার বাহিরে। তিতলি বেশ ঘামছে। আবার কারেন্ট ও নেই। বিয়ে বাড়ির জেনাটারের লাইট জ্বলছে। সন্ধ্যা যে কারেন্ট গেছে এখনো আসে নি। এখন প্রায় সাতটা ত্রিশ মিনিট…
তুষার বাহির থেকে এসেই দেখলেন তিতলি ঝিলিকদের সাথে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ও এক পলক বোনের দিকে তাকিয়ে ফের রুমানা বেগমের কাছে গেলেন। ভদ্র মহিলাম মন খারাপ হয়ে আছে। চোখ দুটো সামান্য ফুঁলা ভাব। তুষার গিয়ে বললেন,

“আন্টি এবার আমাদের চলে যেতে হবে। আপনাকে বলতে এসেছি। ” ——-তৎক্ষণাৎ টি-শার্ট পড়তে পড়তে সেখানে অয়নও আসলো, এক কথায় বলল,

“আজকে তুদের যেতে দিবো না।”

রুমানা বেগম ও বললেন,

“আজকে থেকে যাও তুষার। কালকে ও তো থাকলে না রাত করে চলে গেলে। আর তো কখনো আসবেও না।”

আন্টি আমার চলে যেতে হবে। জুরুরী কাজ আছে। অন্য সময় আসবো কেমন! তিতলিও রাতে অন্য কোথায়ও ঘুমাতে পারে না।”

অয়ন তুষারের মাথায় থাপড়ে দিয়ে বলল,

“নাটক করিস না তো! এখন বোনের নাম দিয়ে চলে যাওয়ার বাহানা করবি কাজের বাহানা দিবি। তুই থাকবি আর তোর বোনও থাকবে।”

তুষার আমিও চাই আজকের দিনটা থেকে যাও বাবা। মেয়েটা চলে গেছে পুরো বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ——– বলতে বলতে রুমানা বেগম কেঁদে উঠলেন।

“আন্টি কাঁদবেন না প্লিজ! শান্ত হন!”

“তোরা চলে যাবি বলছিস তাই কাঁদতেছে!”

রুমানা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফের বললেন,

“আমি কোনো কথা শুনবো না । তোমরা থাকবে এটাই ফাইনাল!”

তুষার যেন একটা বড় ফাঁদে পরে গেছে। রুমানা বেগম কে তিনি মায়ের মতো স্নেহ করেন। কিভাবে কথা ফেলবে! রুমানা বেগম বললেন,

“তোমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসি বসো।”

“আমার খিদে নেই আন্টি!”
.
.
তুষার ড্রয়িংরুমে গিয়ে তিতলি কে দেখলো। তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারা করলো যাওয়ার কথা নিয়ে।
তুষারের হঠাৎ চোখ গেলো ঝিলিকের দিকে। মেয়েটাকে কেন যেন ওনার ভালো লাগে। কিন্তু বিষযটা তেমন পাত্তা দেয় না। ওনি ওদিকে একবার তাকিয়ে মোবাইল হাতে টাইপ করতে করতে বের হয়ে গেলেন।

তিতলি ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ভাইয়ের মেসেজ—-

“আজকে মনে হয় যেতে পারবো না । আন্টি কিভাবে ধরে রেখেছেন। তুই থাকতে পারবি তো?”

তিতলি মেসেজ টা সিন করে রেখে দিলো। আসলে তিতলির সবার সাথে ভালোই লাগছে। আর কখনো আসা হবে না। তাই সবার ফেসবুক আইডি ফ্রেন্ড লিস্টে যোগ করে নিলো। যাতে চলে গেলেও কথা বলতে পারে।

~~~
রাত নয়টার দিকে ওরা সবাই ছাঁদে গোল করে বসেছে। সবার ভাবনা একটাই কানামাছি খেলবে। বছর চারেক আগেও সপ্তাদশী তিতলি স্কুলে কানামাছি খেলতো। এখন আবার সে খেলা খেলতে পারবে বলে সপ্তাদশীর আনন্দে তর সইছে না।
ওরা ছয়জন আছে খেলার জন্য।

ঝিলিক বলল,

“আগে চো”র কে হবে?”

তিতলি নির্ধিদায় বলল,

“আপু আমার প্রথমে চোখ বাঁধো।”

“না হাত মিলানো হোক। যে সবার পরে হবে সে প্রথমে চোর হবে।”

তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলো সেটা।

ওরা সবাই তিনজন তিনজন করে হাত মিলালো। কিন্তু ভাগ্য কেন যেন তিতলি কে সবার শেষে তুললো। তিতলি নিজের পরনের ওড়না টা কাঁধ থেকে বুক পর্যন্ত গুঁজিয়ে নিলো ভালো ভাবে।

তারপর ওরা তিতলি কে চোখ বেঁধে দিলো। আর তিতলি হয়ে গেলো কানা। ওরা সবাই তিতলি বলল,

“এখানে কয়টা আঙুল বলো তো?”

তিতলি মুচকি হেসে বলল,

“দুইটা…..”

তিতলির কথা শুনে ওরা সবাই হেসে উঠলো। কারণ কোনো আঙুলই ওরা দেখায় নি। অতঃপর ওরা চারদিকে ছুঁটিয়ে পড়লো। তিতলি ও পায়ের দাপে দাপে ওদের দিকে এগাতে লাগলো।

“একজন বলছে আমি এখানে? আরেকজন বলছে আমি এখানে…. চঞ্চল তিতলি দ্বিকশূণ্য হয়ে আচমকা কাউকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,

“ধরে ফেলেছি তোমায় ঝিলিক আপু! এবার যাবে কই? দেখি আমার চোখ খুলে দাও তো?”

সপ্তাদশী কোনো উত্তর না পেয়ে সামনের মানুষটার শরীর ঝাঁকিয়ে ফের বলল,

“একি আপু তোমাকে এত চওড়া লম্বা লাগছে কেন? তোমার মুখ এমন খোঁচা খোঁচা লাগছে কেন? তোমার দাড়ি গোঁফ গজাইছে?”

#চলবে।

রাগে অনুরাগে পর্ব-০৬

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৬
#সুহাসিনি_ফাতেহা

“আপনি বড্ড বোকা নারী! পানিতে থেকেও জেনে বুঝে জ্বলন্ত আগুনে পা দিয়েছেন !”বেয়াদব মেয়েটা বোধ-হয় জানে না সে লঙ্কা মরিচ হলে ফারাজ খান বোম্বাই মরিচ। লঙ্কা মরিচ বেশি পুড়লে নিজেই ছাই হয়ে যায়। আপনি ছাই হতে চাইলে আমার কিছু করার নেই।”
“আফসোস আপনার জন্য আমার দুঃখ লাগে। মেয়ে মানুষ এত বাঁচাল পেঁচাল হলে মানায় না।”

বিরবির করে যুবক থামলেন । মোবাইল টা বিছানায় রেখে দিলেন।
একটু সময় নষ্ট না করে
পাঞ্জাবি প্যান্ট পরে যুবক আয়নার সামনে দাড়িয়ে ঝটপট রেডি হয়ে নিলেন।
নিজের পছন্দের পারফিউম গায়ে মেখে নিতেই ফারাজের চাচাতো ভাই আলভী ওর রুমে ডুকলো।
অয়নদের বাড়ি আগে ফারাজ খানদের ও বাড়ি ছিলো। এখনো আছে। প্রতিটা রুম এখনো যার যার রয়ে গেছে। এই দুতালা বিশিষ্ট বিশাল ভবন টা তাদের দাদার বানানো। বছর দুয়েক আগেও ওনারা সবাই একান্নবতী ফ্যামিলি ছিলেন। ফারাজ খানের বাবা আফজাল খান আলাদা বাড়ি করেছেন। এখন সেখানে থাকেন। কিন্তু চাচাতো বোনের বিয়ের উদ্দেশ্য পুরো পরিবার আবার এক হয়েছেন।

আলভী ও সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরেছে। এক কথায় বাড়ির সব পুরুষ আজকে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরবে। ফারাজ হাতে ঘড়ি লাগাতে লাগাতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“তুই এখানে কেন? আমি এখন বের হতাম।”

ফারাজের কথার বিশেষ একটা পাত্তা দিলো না আলভী। বরং ঠাট্টার সুরেই বলল,

“কি ব্রো বয়স তো কম হলো না। বিয়ে-শাদি করবি কবে? নাকি বুইড়া হইয়া স্যারগিরি করেই মরবি। এখনই তো বউ নিয়ে হানিমুনে যাওয়ার বয়স। তোর দশ বছরের ছোট চাচাতো বোনের বিয়ে খাইতেছিস! নিজের বিয়ার খবর নাই। লজ্জা করে না একা একা ঘুরতে? নাকি কেউ পছন্দই করে না তোরে?” হাহা হা—- আলভী জিভ কামড়ে ধরলো। ভাবনা আল্লাহ — ফারাজ যেন কিছু না বলে…..”

ঠেস লাগানো কথা শুনে ফারাজের চোয়াল শক্ত হলো। ফারাজ খান এগুলোকে নিয়ে আর পারছে না। নিজের পার্সোনাল বিষয়ে কারোর বা হাত ডুকানো পছন্দ না। অথচ তাও পাঞ্জাবির দু হাতা কনুই পর্যন্ত গুঁটিয়ে নিতে নিতে ঠোঁঠ বাঁকিয়ে বললেন,

“তোর মতো বাপের টাকায় হানিমুনে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আর বউ? ফারাজ খানের বউ হওয়া এত সহজ না । যে মেয়ে সহ্য করতে পারবে সে নিজেই আসবে।”

“কোনদিন আসবে সে সাহসী ভাবি। সাতাশ বছর তো হয়ে গেলো এখনো তো কোনো মেয়েকে আসতে দেখলাম না।”

“আমার বিয়ে নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না! তুই বরং তোর বউয়ের চিন্তা কর। শুনলাম তোর বউরে ধরলেই নাকি চিল্লানি দেয়! বউ সামলাতে পারিস না। আগে নিজে পুরুষ হ তারপর কথা বলিস।”

আলভী থতমত খেয়ে গেলো। ফারাজ কে খোঁচা দিতে এসে নিজেই খোঁচা খেয়ে বসলো। অবশ্যই ফারাজ সচারচর অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। আর যখন বলে তখন সামনের ব্যক্তিটার মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ধুঁয়ে দেয়। এখনও হলো তাই। আলভী আফসোস করলো কেন যে কাল সবাইকে বলতে গেলো না বললে এখন এই কথা শুনতে হতো না। দুঃখের সহিত বলল,

“তুই আজীবন সন্নেসী হয়ে থাক ভাই! তোকে বিয়ে করতে আর কখনো বলবো না।”

ফারাজ না চাইতেই ক্রুর হাসলো। ভালোমতে তেল মালিশ করে দিতে পেরেছে না হেসে পারে !
.
.
ঘড়ির কাঁটায় এখন দুপুর একটা বিশ মিনিট। ত্রিশ মিনিট হয়েছে তিতলি দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে বাড়িতে এসেছে। আসার পর আর ফারাজের সামনে পড়ে নি। পড়েনি বললে ভুল হবে বরং তিতলি ফারাজ কে দেখেই নি।

বিয়ে বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী আগে কনে পক্ষের সবাইকে ভাত খাওয়ানো হয়। বাহিরে বিশাল প্যান্ডেলের ভেতরে খাবার খাাওয়ার জন্য আয়োজন করা হয়েছে। তিতলি ইতিমধ্যেই খাওয়া শেষ করে ফেলছে। অয়নের বোন কনে আয়েশার সাথে। আয়েশার দুইটা বান্ধুবি সহ রুপসা, ঝিলিক ওরা ও আছে। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের দিন কনের সাথে বড় থালা করে পাঁচ-ছয় জন একসাথে খাওয়া হয়। সেখানে তিতলি কেও খেতে বলেছেন রুমানা বেগম। তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিয়েছে।

আয়েশা কে খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। মেরুন রঙা লেহেঙ্গার সাথে ভারী জুয়েলারি সহ মেকআপ সব মেয়েটার ফর্সা শরীরে দাড়ুন মানিয়েছে। ফার্লারের মেয়েরা সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। তিতলি মিষ্টি কণ্ঠে বলল,

“আপু তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে? ভাইয়া তো চোখ ফেরাতেই পারবে না। নিশ্চিত দেখার পর ছোটখাটো হার্টএটাক করবেন।”

আয়েশার মুখটা লজ্জায় লাল নীল হয়ে গেলো।

পাশ থেকে ঝিলিক বলল,

“আজকে দুলাভাইকে নগদ ত্রিশ হাজার ছাড়া বউ নিয়ে যেতে দিবো না।”

“তোরা পারলে নে। আমার মনে হয় বাবা,ভাই ধরেবেঁধে এক কিপ্টের সাথে বিয়ে দিচ্ছে? তোদের চার পয়সা ও দিবে না মিলিয়ে নিস।”

“হয়ছে নাটক করতে হবে না। জামাইর টাকা বাঁচাতে পারবে ভবিষ্যৎ এ।”

কিছু একটা ভেবে তিতলি আচমকা বলল,

“আচ্ছা রুপসা আপু ফারাজ খান এই বাড়ির কি কোনো আত্মীয় হয়?”

রুপসা, ঝিলিক, আয়েশা ওরা তিনজনই মুখ হা করে ফেলল। যেন ওরা বিশেষ কারো নাম শুনছে। রুপসা বলল,

“আরে ফারাজ ভাইয়া তো আমাদের কাজিন। বড় চাচুর ছেলে।”

তিতলি নেত্রযুগল কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে যেন। অবাকে অত্যন্ত হতবিহ্বলে বলল,

“কি বলছো আপু?”

“ফারাজ ভাইয়া যে রাগী। আমাদের তো বাহিরের কোনো ছেলের সাথেই মিশতে দেয় না। একবার আয়েশা আপুকে রাস্তায় একটা ছেলে….. ”’

ঝিলিক আর কিছু বলতে পারলো না….

ওদের কথার মাঝেই বাহিরে হৈচৈ শুরু হয়ছে
বরপক্ষ চলে এসেছে।

ঝিলিক, রুপসা, কথা ফেলে তিতলি কে টেনে নিয়ে গেলো। আজকে দুলাভাইয়ের থেকে টাকা না নিলেই নয়।
সত্যি ওরা তিনজন একপ্রকার তর্কবিতর্ক করেই ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে এলো। ভাগ্যিস ফারাজ খান সেখানে ছিলো না।
..

..
তিতলি একটা কালো সানগ্লাস পড়ে পড়ে হাঁটছে। সানগ্লাস টা ফর্সা মেয়েটাকে একদম দাড়ুন মানিয়েছে। নরম অধর জোড়ায় রক্তে রাঙা লাল টকটকে লিপিস্টিক টা যেন কালো সানগ্লাসেরর নিচে জ্বলজ্বল করছে। সপ্তাদশী ফুরফুরে মনে বাড়ির ভেতরে চলে যাবে এমন সময় ফারাজ খানকে তারই সামনে দিয়ে যেতে দেখলো তিতলি। ভাবখানা এমন যেন তিতলি কে দেখেইনি। তিতলি কেন যেন মুখ ফসকে ডেকে উঠলো।

“আরে আপনি পাঞ্জাবি পড়েছেন নাকি?”

মেয়েলী কণ্ঠ শুনে ফারাজের পা জোড়া থেমে গেলো। ঘাঁড় বেঁকিয়ে পেছনে ফিরে দেখতে ফেলো সপ্তাদশীর হাসোজ্জল মুখখানা। মেয়েটার এত হাসি কেন যেন ফারাজের সহ্য হলো না। যুবক বিরক্ত চোখে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। এই মেয়েকে কিছু না বললেই নয়। লম্বা কদমে এদকম রমনীর মুখামুখি দাড়ালেন।

লোকটার মুখখানা সে কি গম্ভীর। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। পাঞ্জাবিতে সুদর্শন পুরুষটার রূপটা যেন এবারে চোখে ষোলো আনাই ফুটছে।

ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

“তো কি জাহিঙ্গা পড়েছি? আমি কি পড়েছি সেটাও আপনাকে মুখে বলতে হবে? আপনি কি চোখ হাতে নিয়ে হাঁটেন নাকি?”

“দেখেন না সানগ্লাস পড়েছি। সব কালো কালো দেখতে পাচ্ছি। আপনাকেও কালো কালো দেখাচ্ছে। ”

ফারাজ ভ্রু বাঁকাল, চড়া কণ্ঠে জানাল,

“ একটা থালা এনে দিবো” বিয়ে বাড়ির গেইটে দাড়ালে সবাই অন্ধ ভেবে দয়া করে দু পয়সা দিলে চোখের চিকিৎসা করিয়ে নিবেন।”

“আমি অন্ধ না বুঝছেন? এটা স্টাইল। দেখুন না আমাকে কত সুন্দর লাগছে তাই না?”
তিতলির এই একটাই স্বভাব সে যেই কাউকে বলবে —“ এটা আমাকে খুব মানাবে তাই না…. আমাকে খুব সুন্দর লাগছে তাই না…..”

হঠাৎ পাশ থেকে পুরুষালী কণ্ঠে কেউ বলে উঠল,

“একদম আগুন সুন্দরী।”

ফারাজ, তিতলি দুজনেই সেদিকে তাকালো। বর পক্ষের একটা চিকন গরনের ছেলে। বয়স কি বাইশ তেইশ হবে। তিতলির দিকেই তাকিয়ে আছে। ফারাজ খান একবার তিতলির দিকে তাকালো ফের ছেলেটার দিকে।
তিতলি পাল্টা জবাব দিলো ছেলেটাকে,

“আমি জানি আমি আগুন সুন্দরী এটা সবাই বলে—- আপনি নতুন কিছু বলেন ভাইয়া….”’

ফারাজ খান আচমকা তিতলির একদম কাছে চলে আসলো। দুইঞ্চি সামান্য ফাঁক রেখে দাড়িয়ে ফের ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা থতমত খেলো যেন। অন্যের পার্সোনাল টাইম ভেবে মুহূর্তেই সেখান থেকে চলে গেলো। এদিকে তিতলি শ্বাস-প্রশ্বাস বেরিয়ে আসার যোগাড়। সে দ্রুত একপা দু পা পিছিয়ে গেলো। সপ্তাদশীর মুখপানে চেয়ে ফারাজের ঠোঁটের কোণে বাঁক এলো। বলল,

“এত খুশি হওয়ার কিছু নেই মিস তিতলি! ফারাজ খানের রুচি এতটা খারাপ না যে বেয়াদব মেয়ের দিকে নজর দিবে আপনার মতো মেয়ে ফারাজ খানের পছন্দের লিস্টে আসতেও দশ জনম লাগবে। আফসোস ততদিন আমি বাঁচবো ও না। তাই কুল ডাউন!”

“কথায় কথায় ঠেস না মা’রলে আপনার হজমশক্তিতে সমস্যা হয়, সেটা তো বলতে পারেন।”
একটু থেমে স্রেফ বললো,
“আর আমার বয়েই গেছে!” না আপনার নজরে পড়তে চাই” আর না আপনার পছন্দের তালিকায়!
ঘাড়ত্যাড়ামি বশত কথাটা বলে তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো।”

ফারাজ মেয়েটার ত্যাড়া কথা উপেক্ষা করলো। বেয়াদব মেয়েটাকে হুকুম ছেড়ে থামল,

“আপনার বেয়াদবি সহ্য করার ধৈর্য আমার নেই মিস তিতলি। ফারাজ খানকে কে জ্বালাতে এসে যেন নিজেই জ্বলে না যান। তিনি মাঠে নামলে তখন আপনার পালানের জায়গা থাকবে না।”

#চলবে।

রাগে অনুরাগে পর্ব-০৫

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৫
#সুহাসিনি_ফাতেহা

“আমার মতলব সুবিধার হোক না হয় অসুবিধার হোক! তাতে আপনার কি ?”

এই প্রশ্নটা ছুড়ে দিতেই ফারাজ তিতলির থেকে দুরুত্ব রেখে দাড়ালো। এই মেয়ে একদম স্বাভাবিক না! ফারাজ খানের মতে অতিরিক্ত বেয়াদব! বড়দের মুখের উপর কথা বলে। ফারাজ খান যদি এই বেয়াদব মেয়েটাকে সোজা করার চান্স পেতো। সোজা হতে হতে একদম তার চিহ্ন পাওয়া যেতো না। ফারাজ ফের গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিল,

“আপনার মতলব যে কী! সেটা আমি ভালোই জানি মিস তিতলি ! আর আপনি জানেন? ফারাজ খান কিভাকে ডিল করে? জানেন না তো? সেটাও খুব শিগগিরই বুঝবেন?”

তিতলি মুখ ভেঙ্গিয়ে বিদ্রুপ কণ্ঠে জানাল,

“আমার এত বুঝার দরকার ও নেই। আপনি কি ডিল করেন নাকি চিল করেন সেসব তিতলি জানতে চাই না।”

ফারাজ তাকালো সামনে দাড়িয়ে থাকা বেয়াদব মেয়েটার মুখপানে। সহসা অধরের প্রান্তে বাঁকা হাসির রেখা টানলো।

তিতলি অবাক হলো! ভরকালো চমকালো !গম্ভীর মুখে বাঁকা হাসি! ভাবা যায়? সহজে তো এই লোককে হাসতে দেখা যায় না। নিশ্চিত তার কোনো গোপন কথা জানতে পেরেছে। লোকটা জেন্টেলম্যান! তারউপর তার পেটে যে চাপ দিচ্ছে সেটার তো কোনো খবর নেই! তার ভাইটা কোথায় গেলো? তার আসলে আসায় উচিত হয়নি, কোথায় মজা করবে ভাবলো। হলো কই? হলুদের দিনই উঁচকা ঝামেলা! তিতলি পেটের চাপ কোনোরকম চেপে রেখেছে!আল্লাহ আল্লাহ যদি কোনোভাবে চলে যায়! সপ্তাদশী হাঁশফাশ করলো।
.
.
ফারাজ সরু চোখে দেখলো সব!সে একটু পরিক্ষা করবে নাকি এই মেয়েটাকে? করেই দেখা যাক! সচারচর সে কখনো কারো সাথে যেঁচে কথা বলে না। এটা তার ডিকশনারিতে নেই।এই বেয়াদব মেয়েটাকে যদি উচিত শিক্ষা দিতেই হয় তাহলে তার কিছু করার প্রয়োজন আছে।
তাই ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

“আপনার নাকি ডাইরিয়া?এখন ভালো হয়েছেন তো? না হলে কিন্তু আমার কাছে ঔষুধ আছে। একবার খেলে আর দশ জনমে ও আপনার ডাইরিয়া হবে না।”

তিতলি অবাক,বিস্ময়,হতবিহ্বল! তার ডাইরিয়া? সে কখন বললো এই লোককে? বাহিরের কাউকে তো বলেনি?এমনকি তার বন্ধুদেরও না যে কলেজে গিয়ে স্যারকে বলবে।এই লোক কি তার সাথে সিসি ক্যামেরা ফিট করে দিলো?যার জন্য করলো কলেজ চুরি! সে বললো চোর! তিতলি কি আর ইচ্ছে করে মিথ্যা ডাইরিয়া বানাইছে? সপ্তাদশীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো।ডাইরিয়া না হলেও এবার সত্যি ডাইরিয়া হয়ে যাবে মনে হয়!
তিতলি উশঁখোস করে বলল,

“আমি আপনাকে বলছি নাকি আমার ডাইরিয়া? তিতলি থামলো।
অতঃপর স্রেফ বললো,
“আর শুনুন ডাইরিয়া হলেও আপনার ঔষুধ এই তিতলি নিবে না। বেশি মানবদরদী দেখাচ্ছেন নাকি?”

ফারাজ ভ্রু কুঁচকালো!বলল,

“বেশ আমি মানবদরদী? আপনি যদি ভাবেন তবে আমি মানব দরদীই।”

তিতলিও খোঁচা দিয়ে বলল,

“আমি আপনার শার্টে একটু ডাইরিয়া করে দিতে পারি? আপনি তো মানবদরদী। আমার জানামতে মানবদরদী’রা কখনো মানুষের সাথে ব্যাঙের মতো গ্যাং”গ্যাং করে না তাই না? উল্টো মায়া দেখায়!”

একটু থেমে সপ্তাদশী ফারাজ খানের মুখ বরবার চাইলো। তিতলি যেন বেশ মজা ফেলো।
ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,

“কি রাগ করলেন?”

ফারাজ বিরক্তিতে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চোখের কোণে বিরক্তির ছাপ। মুখ থেকে একটা অসম্পূর্ণ ‘চ’ জাতীয় শব্দ বেরিয়ে আসে। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

ইডিয়ট!

‘তিতলি এই তিললি?কোথায় তুই?’

আশেপাশে তুষারের ডাক শুনে তিতলি একদম ধোঁয়া তুলশী পাতা হয়ে গেলো।যেন সে কিছু জানে না।সে এতক্ষণ যাবত কিছু করে নি। ভাবখানা এমন সে ফারাজ খানকে এখন দেখেছে। তার ভাই যদি জানতে পারে সে এখানে স্যারের সাথে ঝামেলা করেছে তাহলে তার আস্ত থাকবে না। আর সে কি ভুল কিছু করেছে। উচিত জবাব দিয়েছে। একদম ঠিক করেছে। তুষারকে না দেখার ভান করেই ফারাজের উদ্দেশ্য বলল,

“আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন? আপনি এখানে কেন স্যার? ”

ফারাজ এই বেয়াদব মেয়ের হাভবাব বুঝার চেষ্টা করছে না।মন চাচ্ছে একদম থাপড়ে সব দাঁত ফেলে দিতে।ফারাজ তিতলির কথা উপেক্ষা করেই তিতলির সামনে দিয়ে চলে যাবে এমন সময় তিতলি ডাকলো,

“কোথায় যাচ্ছেন স্যার?”

ফারাজ যেতে যেতে চিবিয়ে চিবিয়ে জানালো,

জাহান্নামে।

যেভাবে স্টুডেন্টদের ধমক দেন! নিশ্চিত আপনার জায়গা জাহান্নামেই হবে। তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো।

ততক্ষণে তুষার সেখানে উপস্থিত।ও এসেই তিতলিকে এক ধমক দিলো,

এই তোকে কখন থেকে খুঁজছি ফাজিল মেয়ে। ছাঁদ থেকে নামলি কেন?তোকে আমি নিষেধ করিনি?

সপ্তাদশীর মুখটা নিমিষেই ভয়ে পরিনিত হলো। বারবারই ভাইকে ভয় পায়। সে তো ভাইকেই খুঁজছিলো। তিতলি জানাল,

আমি কি ইচ্ছে করে নেমেছি! আমি তোমাকে খুঁজতে এসেছি ভাইয়া। আমি বাড়ি যাবো।

হঠাৎ এখন বাড়ি যাবি কেন? আসার সময় তো বাঁদরের মতো লাফিয়ে চলে এসেছিস?

আমার দুই নাম্বার ধরেছে ভাইয়া। প্লিজ বাড়ি চলো। আমি এখানে আর থাকবো না।

এই কথা তুই রুমানা আন্টি কে বলতে পারিস নি।

আমি কিভাবে বলবো। আন্টি কত মানুষের সাথে বসে কাজ করছেন?

তুষার চুপ হলো। অতঃপর বলল,

আয়?

কোথায়?

তোর না দুই নাম্বার ধরেছে?

হুমম।

তুষার তিতলি কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।

ড্রয়িংরুমে সব বয়স্ক মহিলারা আছেন।কেউ কেউ এদিক থেকে ওদিক ছুঁটছেন। বিয়ের বাড়ির কাজ কি আর কম থাকে? কত কাজ। করতে করতে ফজরের আযান ও দিয়ে দেয়। তাও শেষ হয় না। তুষার অয়নের মা রুমানা বেগম কে ডাকলেন।

আন্টি আর্জেন্ট একটু এদিকে আসেন।

রুমানা বেগম তুষার কে খুব স্নেহ করেন। তিনি কাজ রেখে এগিয়ে এলেন। বললেন,
কিরে তুষার? কিছু লাগবে?
পরপর তিতলির দিকে তাকালেন ভদ্রমহিলা। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
তিতলি এদিকে আসো? কাজের কারণে তোমাকে তো একটু দেখলাম ও না। কিছু খাবে?

না না আন্টি আমি কিছু খাবো না। বলে তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকালো।

তুষার বুঝে আস্তে করে বলল,

আসলে আন্টি তিতলি ভাতরুমে যাবে।ওকে একটু..’

রুমানা বেগম তুষারের কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন,

পাগলি মেয়ে।এটা আমাকে এসে বলতে পারতে।

আপনি কাজ করছিলেন তাই ডাকিনি আন্টি।

তখন সেখানে ফারাজ খান ও এলো। বাহিরে তিনি বেশ গরম উপভোগ করছেন তাই একটু এসির নিচে এসে বসেছেন। ফারাজ দেখলো বেয়াদব মেয়েটা তার চাচির সাথে যাচ্ছে। ফারাজ ফের মোবাইলের স্কিনে মনেযোগ দিলেন।

তুষার এসে ফারাজ খানের পাশে বসলো। ভদ্র ভাবে বলল,

কি খবর ভাই?

ফারাজ তাকালেন তুষারের দিকে।গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?

বয়সে তুষার ফারাজের দুইতিন বছরের ছোট হবে। ফারাজ নিজের বয়সের ছোট ছেলেদের তুমি বলেই সমোন্ধন করে।

তুষার বললো,

ভালো আছি। তারপর বেশ ভদ্রতায় বললো,

আমার বোন টা কলেজে পড়ালেখা ঠিকমতো করেতো?

ফারাজ খান নড়েচড়ে উঠলেন। ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন,

খুব ভালো পড়াশোনা করে। অনেক ভালো স্টুডেন্ট তো! কেউ না পারলেও তোমার বোন সবার আগে পড়া পেরে যায়।

পড়ায় একটু্ও ছাড় দিবেন না ভাই। কোনো ভুল করলে আমাকে জানাবেন। বলে তুষার চলে গেলো।

ফারাজ খান ক্রুর হাসলো। বেয়াদব মেয়ে! বিরবির করলেন,

আপনার ভাইও আপনার বিপক্ষে বেয়াদব মেয়ে।
___

আজ বিয়ের দিন।রাতে তিতলিরা সে বাড়িতে থাকে নি। তিতলি রাতে ঘুম না গিয়ে থাকতে পারে না। ওর সুন্দর ঘুমের জন্যই তুষার তিতলিকে নিয়ে চলে এসেছে।

ঘড়ির কাঁটায় এখন সকাল এগারোটা বাজে ত্রিশ মিনিট। বিয়ে বাড়িতে আজকে তিতলির আর যেতে ইচ্ছে করছে না। কারণ ওখানে ফারাজ খানকে দেখলে সপ্তাদশীর মন চাই খুন করতে। কিভাবে যেন তার শুধু ওই লোকের সাথে ঝগরা লেগে যায়। তিতলি ভাবলো পুরোটা।আসলে দোষটা তার! ঝগরা করার কথা সেই তুলছে ধাক্কাও সে দিয়েছে। পরক্ষনেই ভাবলো,
একদম ভালো করেছি। ওই লোক কে ধাক্কা দিতে পেরে মুখের উপর ঠিক কথা বলতে পেরে চঞ্চল তিতলির আনন্দের শেষ সীমানা নেই।
তারপরও ভাইয়ের এক কথায় তাকে আজকে আবার যেতে হবে ওই বাড়ি।তিতলি বড্ড ভাই পাগল মেয়ে।ভাই বললে উঠে ভাই বললে বসে।
.
গোসল করে তিতলি বিয়েতে যাওয়ার জন্য সুন্দর একটা গর্জিয়াস গ্রাউন পড়লো।গ্রাউন টা চোখে দেখার মতো। এবার কোরবানি ঈদে কিনেছে। কিন্তু পড়া হয় নি। তাই আজকে পড়েছে। সুন্দর করে সাজলো। রেডি হয়ে কয়েকটা ডং করে পিকও তুললো। তিতলির একটা খোরগশ আছে।ধবধবে সাদা এত সুন্দর! তিতলি তাকে খুব ভালোবাসে। সপ্তাদশী খোরগশ টাকে কোলে নিয়ে পিক নিলো। নিজের রিয়েল আইডিতে ডুকে একটা ক্যাপশন দেখলো। চঞ্চল তিতলির ক্যাপশন টা ভালো লেগে যায়। তাই সে নিজের দুইটা পিক ভালোমতে মুখ দেখা যায় না।সেগুলো দিয়ে ক্যাপশন টা দিয়ে পোস্ট করলো।
.
ফারাজ খান সদ্য গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছেন পরনে টাওয়াল পেঁছানো। ভেজা চুল গুলো দু হাত দ্বারা ব্যাকব্রাশ করে পেছনে ঠেলে দিলেন। বিছানায় সাদা-পাঞ্জাবি পাজামা রাখা। চাচাতো বোনের বিয়ে বলে কথা। অনেক দায়িত্ব। তার বোন নেই তাই ওনি নিজের চাচাতো বোনদের বোনের মতো ভালোবাসেন। ওনারা দুই ভাই। অন্যজনের নাম ফরহাদ খান। বিবাহিত। ফারাজ প্যান্টের ভেতরে আন্ডারওয়ার পরতে পরতে মোবাইলের স্কিন জ্বলে উঠলো। তিনি তাকালেন সেদিকে। কি মনে করে মোবাইল হাতে নিলেন। ফেসবুকে নোটিফিকেশন এসেছে। —”তিতলি তেহেরিন শেখ”

ফারাজ চিনে মেয়েটাকে। তার আইডির সাথে এড আছে। তিনি স্ক্রল করে ডুকলেন,দেখলেন মেয়েটা পোস্ট করেছে তিনি ছবি দেখার লোক না। বরং ক্যাপশন দেখলেন,

”পুরুষ মানুষদের বিশ্বাস করতে নেই! তারা ঘরে সুন্দুরী কিউট বউ রেখে বাহিরে অন্য নারীদের নিয়ে ফূর্তি করে।”

ফারাজ খান ভ্রু জোড়া কুঁচকাল। তিনি পড়া শেষে বিরবির করে বললেন,

”ক্যারেক্টারলেস!বেয়াদব মেয়ে! আমার সাথে লাগতে এসে আপনি নিজের পায়ে নিজে কু*ড়াল মারছেন না মিস তিতলি! পরে কিন্তু পস্তাবেন। আমি ফারাজ খান ছাড় দিলেও ছেড়ে দেই না।”

#চলবে।

রাগে অনুরাগে পর্ব-০৪

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৪
#সুহাসিনি_ফাতেহা

তিতলি শপিং ব্যাগ টা নিয়ে নিজের রুমে চলে এলো। একমুহূর্ত দেরি না করে শাড়ি টা বের করে উল্টে’পাল্টে দেখলো। এত পছন্দ হয়ছে যে তিতলি বলে বুঝাতে পারবে না। আজকে সে হলুদে খুব সুন্দর করে সাজবে। এমনিতেই বিয়ে বাড়িতে গেলে পাঁচ দশটা বাঁদর পেছনে আটার মতো লেগেই থাকে? তাতে তিতলির কি? বরং সে এটা ভীষন উপভোগ করে।”

তিতলি শাড়িটার কয়েকটা পিক তুলে মেসেন্জারে ডুকলো। ওর ফ্রেন্ডসার্কেলের একটা আড্ডাগ্রুপ রয়েছে। যেটাতে কমজোর ১০ জন সদস্যা আছে। দুইজন ছেলে বাকি আটজন মেয়ে। তিতলি শাড়ির পিক গুলো গ্রুপে সেন্ড করে দিয়ে লিখলো,

”হেই বন্ধুরা— শাড়ি টা কেমন? আমাকে খুব মানাবে তাই না?”

এক মিনিটের মধ্যেই নিধি, সিয়াম, প্রিমাকে সিন করতে দেখা গেলো। বাঁদর গুলো সারাক্ষণ লাইনে ঝুঁলে থাকে। তৎক্ষণাৎ টুংটাং আওয়াজে মেসেজ আসলো,

”শাড়িটা দাড়ুন! সমস্যা একটাই তোকে মানাবে না।” —- তা কোথায় যাচ্ছিস শুনি?” বর দেখতে নাকি বর ভাগাতে?

তিতলি দেখলো সেটা। সিয়ামের মেসেজ! ফ্রেন্ডমহলের মধ্যে সিয়ামের সাথে তিতলির সাপে নেউলে সম্পর্ক। তিতলিকে একশত জন সুন্দর লাগছে বললে ও সে একজন এটা বলবেই যে,
—-”তেতুল গাছের পেত্নীর মতো লাগছে।” ভাবা যায়?

তিতলি ভ্রু বাঁকায়! লিখলো,

”তোর বিয়েত যাচ্ছি —-ছাগলের ৩ নাম্বার বা*চ্চা।”

”তুই উটের বা*চ্চা! উটের যেমন পিঠ বাঁকা থাকে তোর ও ঘাঁড় বাঁকা।”

তিতলি পাল্টা মেসেজ দিলো না। চাইলে সে এখন সিয়ামের চৌদ্দ*গোষ্ঠী সহ উদ্ধার করে ফেলবে নিজের কথার দাপটে। কিন্তু এখন তার মন ভালো। আর মন ভালো হলে সে একদম ভদ্র হয়ে যায়। যেন সে সদ্য পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে। তাই দুইটা ভেঙ্গানো ইমোজি সেন্ড করে দিলো।

মোবাইল রেখে দিবে দিবে ভেবে হঠাৎ ডিয়েক্টিভ করে রাখা ফেক আইডির কথা মনে পড়লো। তিতলি মেয়েটা আসলে শুধরাবে না।
——একদিন ওর বাঁকা ঘাঁড় কেউ মটকাবেই!

আইডি ঠিক করে লগইন করেই ফারাজ খানের দেওয়া সেদিনকার মেসেজ টা দেখলো তিতলি। এই একটা মেসেজই দিয়েছে ১০০ টা মেসেজ
অাদান-প্রধান করার পর। তবে সে পাল্টা কোনো মেসেজ দিলো না। তাকে অপ*মান করার ফলস্বরুপ ফারাজ খানের প্রফোইলে ডুকে সব পোস্টে হা হা দিয়ে আসলো। তিতলির কি? তিতলি কে তো আর চিনতে পারে নি। খুশি মনে মোবাইল রেখে দিলো।
.
.

তিতলি হলুদ রঙা ছোট ছোট কারুকাজে আবৃত শাড়িটা গায়ে জড়িয়েছে। কোমর ছড়ানো রেশমের মতো সিল্কি চুলগুলো খুলে রেখে পেছনে একটা টানা হলুদ গাঁজরা দিলো। নরম মোলায়েম দু হাতে দুইটা ফুলের গাঁজরা বেঁধেছে। মুখে হাল্কা পাতলা মেকআপ করে অধর জোড়ায় রক্তে রাঙা লাল টকটকে লিপিস্টিক দিয়ে চোখে মোটা করে কাজল টানল। ব্যাস এইটুকুই যথেষ্ট ছিলো। তিতলি সত্যি খুব সুন্দর করে সেজেছে। গায়ের রং ফর্সা হওয়াতে শাড়িটাও বেশ ফুটছে যেন। তাকালেই চোখ শান্ত হয়ে আসছে এমন একটা সাঁজ নিয়েই তিতলি আয়না দেখল। আয়নায় দাড়িয়ে বেশ কয়েকটা ঢং রস করে পিক ও তুলে নিলো।

ইতিমধ্যেই দরজার বাহির থেকে——-
চড়া কণ্ঠ ভেসে এলো,

”তিতলি! বের হয়ে আসবি নাকি আমি তোকে রেখে চলে যাবো।”

তিতলি ও গলা ছেড়ে জানাল,

”আসছি ভাইয়া!”

তিতলির ভাইকে বিশ্বাস নেই। তোকে রেখে চলে যাবো মানে? একটু হেরফের হলে বলা নেই সত্যি তিতলি কে রেখে চলে গেলো। এটা কি তিতলি হতে দিবে? এতবড় সুযোগ পেয়ে সে হাতছাড়া করবে। হতে পারে এটা? এমনিতে বিয়ে টিয়ে খেতে পারে না। কারো বিয়ে হয় না। তাই তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো তুষারের পেছন পেছন নেমে গেলো।

নিচে নেমে আসতেই তিতলির দাদি ফরিদা বানু বললেন,

“মাশাল্লাহ! আমার নাতনি টারে কি সুন্দর লাগছে, কোনো পোলার নজর না লাগুক।”

দাদির কথায় তিতলি ঠোঁঠ প্রসারিত করে হাসলো।

আলেয়া শেখ তুষারের উদ্দেশ্য সাবধানতার বানী ছেড়ে দিলেন,

”তিতলি কে কিছুতেই একা ছাড়বি না তুষার।”

তুষার মোলায়েম কণ্ঠে বললেন,

”কোনো চিন্তা নেই আম্মু। আমি আছিতো।”

অতঃপর ওরা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে যেতে তিতলি শুনতে ফেলো ফরিদা বানুর আপত্তিকর কথা,

”নাতনি ডা বড় হচ্ছে। বিয়া সাদি দন লাইগবো না।”

—-তিতলির দাদি ফরিদা বানু গ্রামে থাকেন বেশির ভাগ। বয়স কম হয় নি।৭৫ বছর বয়স। তবে দেখতে মনে হবে ৬০ বছর। এখনো অনেক শক্ত! তিতলির পাঁচ জন চাচা আছে। তিতলির বাবা সবার ছোট। সবার নিজস্ব বাসা- বাড়ি করা। ফরিদা বানু সব ছেলের বাড়িতে একমাস করে থাকেন। বাকি মাস গুলো তিতলিদের বাড়িতেই থাকে।
.
.
বিয়ে বাড়ি গিয়ে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। গাড়ি দিয়ে পঁচিশ মিনিটের পথ। একটানেই চলে এসেছে মনে হলো। দুতালা বিশিষ্ট ভবন টা বিশাল আয়োজনে মুখরিত। ফেইরী লাইট থেকে শুরু করে ভারি ডেকোরেশনে সাজানো হয়েছে সামনের গেইট পর্যন্ত। বলা যায় তিতলি এই বাড়িতে আজ প্রথমবার আসলো।

বাড়ির ভেতরে ডুকতেই তুষারের বন্ধু অয়ন এগিয়ে এসে কৌশল বিনিময় করলো। ফের তিতলির দিকে তাকালো। মেয়েটাকে আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। অয়ন তিতলি কে নিজের বোনের মতোই ভাবে। ছোট থেকে তুষারের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকায় সে বাড়িতে আসা যাওয়া ছিলো। তবে আজকাল তিতলিকে নিয়ে অন্যচিন্তা আসে মনে। অয়ন নিজেই তুষারকে রাজি করিয়েছে যাতে তিতলি কে সাথে নিয়ে আসে। অয়ন তাকাতেই তিতলি সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল,

‘”আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।”

”ওয়ালাইকুম আসসালাম।”স্রেফ বললো,

”কেমন আছো তিতলি?”

”আলহামদুলিল্লাহ ভালো ভাইয়া।”

এরপর আরো টুকটাক কথা চললো।
.
.
ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় আটটা। চারদিক থেকে শুধু হৈচৈ,কোলাহল একেকজন একেক জায়গায় দাড়িয়ে ফটো তুলছে।

তিতলি অয়নের কাজিন রুপসা,ঝিলিক আরো কিছু মেয়ের সাথে ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে । ছাদে ও মানুষের আনাগোনা অনেক। নিচে তো আরো বেশি। বিয়ে বাড়ির সব ছেলেদের চোখ যেন ঘুরেফিরে তিতলির দিকেই পরছে। এমনকি এর মধ্যেই একজন প্রায় জোর করেই তিতলির হাতে একটা চিরকুট স্রেফ দুইটা সাদা গোলাপ দিয়ে গেলো। তিতলি মাইন্ড করলো না। বরং হেসে নেয়ে গোলাপ ফুল গুলোর লোভ সামলাতে না পেরে চিরকুট টা হাতে নিলো। ছেলেটা চলে যেতেই মুখ ভেঙচি কেটে তিতলি চিরকুট টা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো।

বিয়ে বাড়ির দোকানি সহ বিভিন্ন নাস্তা খেয়ে রীতিমত তিতলির পেট চাপছে। কাউকে বলতে গেলে কত লজ্জাজনক বিষয় ভাবা যায়। সব বেডরুম আনাচে-কানাচ মেহমান। তিতলি উপায় না পেয়ে সবার উদ্দেশ্য বলল,

রুপসা আপু আমি একটু আসছি— বলে ভাইয়ের খোঁজে ছাঁদ থেকে নেমে গেলো।
.

নিচে নাচ-গানের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির উঠোনে এবং ছাঁদে দুই জায়গাই স্টেজ তৈরি করা হয়েছে।
প্যান্ডেলের পাশে আলভী, নিহাদ, ফরহাদ, FK আরো কেউ কেউ বসে আছে। আলভী, ফরহাদ বিবাহিত। ওরা সবাই অয়নের কাজিন। কথার মাঝে আলভী হঠাৎ হতাশ গলায় বলল,

”কি একটা বউ বিয়ে করছি আমি! ধরলেই চিল্লানি দেয়!”

ফরহাদ ও ওর সাথে তাল মিলালো।
দুঃখের সহিত বলল,

”মনের কথা কইছস রে ব্রো। আমি ও চেষ্টা করছিলাম ফুলের টপ দিয়ে বারি দিছে।

আলভী, নিহাদ ওরা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ঠাট্টার সুরে বলল,

“কোথায়?”

”দেখানো যাবে না ..!”

মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেলো সেখান টায়। তবে একজন বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন আসায় কথা বলতে বলতে উঠে চলে গেলো।

_____

পেটের চাপের উত্তেজনায় তিতলি বর্তমান অবস্থাটা ভুলে গেলো। দ্বিকশূন্য হয়ে ভাইকে খুঁজছে। এমনকি তুষারের মোবাইল টাও তার কাছে। আইফোন হওয়ায় ছাঁদে আসার সময় নিয়ে ছবি তুলার জন্য এনেছে। তুষার’কে খুঁজতে খুঁজতে বেয়াখালি তে আচমকা কারো শক্তপোক্ত পিঠের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো তিতলির। অমনি খেই হারিয়ে পরে যেতে নিলে তিতলি যুবকের পেছনের শার্টের কলার খাঁমছে ধরলো। টান খেয়ে যুবক পেছনের দিকে মানে তিতলির উপর পরে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলো। পেছনে ফিরেই চাপা গর্জনে বলে উঠলেন,

”হোয়াট দ্য হেল?”

ধমকে সপ্তাদশীর সর্বাঙ্গ কম্পিত হলো। তার চেয়ে বেশি অবাক হলো সামনে থাকা ব্যক্তি টা আর কেউ নয় স্বয়ং ফরাজ খান দাড়িয়ে আছে। তিতলি অাশ্চর্য বনে গেল। এই লোক এখানে কি করছে? যার থেকে বাঁচতে নিজের মিথ্যা ডাইরিয়া বানালো। ঔষুধ দিলে খাওয়ার নাম করে জানালা দিয়ে ফেলে দিতো। আর সেই কিনা…”

ফারাজের রাগ তখন সীমা ছুঁয়ে গেছে। মেজাজ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সামনে থাকা রমনী টা কে সেটা ভালোভাবে না দেখেই যুবক চাপা রাগে শক্ত মুখাবয়বে কঠিন গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

”এই মেয়ে! আপনি কি চোখে দেখতে পান না? আপনার কি মাথায় কোনো অসুবিধা আছে নাকি?”

তিতলি কাপট রাগ দেখালো। সে কি এই লোকের কথা হজম করে নিবে? মোটে ও না,না,না।
ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল,

”বিশাল দৈত্যের মতো হাঁটার জায়গায় দাড়িয়ে থাকবেন। আর কেউ ধাক্কা দিলেই দোষ!”

ফারাজ খান এবার সরাসরি তাকালেন তিতলির মুখপানে। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানার ওপর বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে ছোট বড় বেয়াদব কেশগুচ্ছ। যুবকের চোখে মুখে বিরক্ত ভাব। ফারাজ খান এই বেয়াদব মেয়েটার উপর ভীষন বিরক্ত। চেঁচিয়ে বলল,

”আপনার সাহস কি করে হলো আমাকে ধাক্কা দেওয়ার? তার উপর মুখের উপর দিয়ে কথা বলছেন? আপনি কি কখনো শুধরাবেন না নাকি স্রেফ আমাকেই কিছু করতে হবে?”
বিরবির করল,
ক্যারেক্টারলেস গার্লস!

তিতলি ঝগরা করার মতো অবস্থাতে নেই। মুখখানা এমন যেন কেঁদেই দিবে এমন ভাব। একদিকে ভাইকে খুঁজে পাচ্ছে না!অন্যদিকে আরেক বিপদ এখন তাকে কে বাঁচাবে? এখন যদি এই ফারাজ খানের সাথে পাক্কা লাগতে যায় উল্টো ঘোর বিপদ।সময় বুঝে সেও ছাড়বে না এই ফারাজ খানকে। তাই মুখখানা অসহায় করে নত মস্তিষ্কে জানাল,

”সরি স্যার! ভুল হয়ে গেছে আমার! এবারের মতো মাফ করে দিন।”

উত্তর না পেয়ে তিতলি অসহায় নেত্রে ফের তাকালো ফারাজ খানের দিকে। কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিতলির মুখপানে চেয়ে আছে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নেত্রযুগল সরু করে রেখেছেন কৌতুকে। অতঃপর মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে তিতলির দিকে সামান্য ঝুকে গিয়ে ফিসফিস করে বলে থামল,

”তোহ ফাইনাললি নিজের দোষ নিজেই স্বিকার করলেন মিস তিতলি! এত ভালো হয়ে গেলেন? আপনার মতলব তো সুবিধার লাগছে না!”

#চলবে।